📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 আলেমদের যে সব বিষয়ে যাহেদের আপত্তি

📄 আলেমদের যে সব বিষয়ে যাহেদের আপত্তি


যাহেদরা যেসব বিষয়ে আলেমদের কুৎসা রটায় তন্মধ্যে একটি হলো, ইলম অর্জন ও শিক্ষাদানের নিমিত্তে শক্তিবর্ধক বৈধ খাবার গ্রহণ করা। অনুরূপভাবে তারা আলেমদের সম্পদ জমা করার বিষয়েও নিন্দা করে। তারা যদি বৈধতার সংজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হতো, তাহলে বোঝত যে, শরিয়ত বৈধ কাজ সম্পাদনকারীর নিন্দা করে না। বৈধতার বিষয়ে সর্বোচ্চ এতটুকু বলা যায়, তা পরিহার করে তাকওয়ার পথ অবলম্বন করা উত্তম। আচ্ছা বলুন তো, যে সারারাত সফল পড়ছে তার জন্য কি ওই ব্যক্তির নিন্দা করা সমীচীন হবে, যে ফরজ আদায়ের পর সারারাত ঘুমিয়েছে? একটি ঘটনা দ্বারা বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। মুহাম্মাদ বিন জাফর খাওলানী বলেন, আমার নিকট হাতেম আসাম্মের শাগরেদ আবু আবদুল্লাহ খাওয়াস বলেছেন, আমরা হাতেম বলখির সাথে রায় নগরীতে প্রবেশ করি। তার সাথে তার তিনশত বিশজন শিষ্য ছিল। তারা হজের উদ্দেশ্যে তার সাথে রওয়ানা হয়েছে। তাদের গায়ে ছিল পশমি পোশাক। তাদের কাছে না ছিল খাবার না ছিল থলে। আমরা এক ধার্মিক ব্যবসায়ীর বাড়িতে যাত্রাবিরতি করলাম। ব্যবসায়ী সে রাত আমাদের মেহমানদারী করেছেন। পরদিন সকালে ব্যবসায়ী হাতেমকে বলল, হে আবু আবদুর রহমান! আমাদের এলাকার আলেম সাহেব অসুস্থ, আমি তাকে দেখতে যাচ্ছি। আপনার ইচ্ছা হলে আমার সাথে চলুন। তখন হাতেম বলল, তোমাদের আলেম যদি অসুস্থ হন তাহলে তাকে দেখতে যাওয়া তো পূণ্যের কাজ, তদুপরি আলেমের দিকে তাকানো ইবাদতও বটে। আমি তোমার সাথে যাব। অসুস্থ আলেমের নাম ছিল মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল—যিনি রায় নগরীর বিচারক ছিলেন। তখন ব্যবসায়ী বলল, আপনি আদেশ করলে আমরা রওয়ানা হতে পারি।

আলেমের শানদার বাড়ি দেখে হাতেম চিন্তিত হয়ে বলল, হায় আল্লাহ! আলেমের বাড়ির এ অবস্থা! অনুমতি পেয়ে তারা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। হাতেম তাকিয়ে দেখল বাড়িটি অত্যন্ত প্রশস্ত। তার আসবাবপত্র অত্যন্ত মূল্যবান। তার বিছানা অত্যন্ত কোমল এবং তার পর্দা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। হাতেম চিন্তিত মনে এসব দেখতে দেখতে ইবনে মুকাতিলের মজলিসে প্রবেশ করে দেখল যে, তিনি কোমল সুন্দর বিছানায় আরাম করছেন। কিছু লোক তার শিয়রে বসে বাতাস দিচ্ছে, আর কিছু লোক তার সাথে আলাপ করছে। অনুমতি পেয়ে ব্যবসায়ী বসল, কিন্তু হাতেম দাঁড়িয়ে রইল। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল ইশারায় হাতেমকে বসতে বললে হাতেম বলল, আমি বসব না। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল হাতেমকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কোনো প্রয়োজন আছে? হাতেম বলল, একটি বিষয় আপনার নিকট জানতে চাই। মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল বললেন, জিজ্ঞেস করুন। হাতেম বলল, আপনি আগে সোজা হয়ে বসুন, যেন আপনাকে জিজ্ঞেস করতে পারি। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল খাদেমদেরকে নির্দেশ দিলে তারা তাকে হেলান দিয়ে বসায়। হাতেম বলল, আপনি ইলম কোথা হতে শিখেছেন? তিনি বললেন, রাসুলের সাহাবিদের থেকে। হাতেম বলল, রাসুলের সাহাবিরা কার থেকে শিখেছেন? তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। হাতেম বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কোথা হতে পেয়েছেন? তিনি বললেন, জিবরাঈল আলাইহিস সালাম থেকে, আর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন থেকে। হাতেম বলল, আচ্ছা জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ হতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং সাহাবারা তাবেঈদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং তাবেঈরা নির্ভরযোগ্য ওলামাদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরাম আপনাদের নিকট যা পৌঁছিয়েছেন তার কোথাও কি এমন পেয়েছেন, দুনিয়াতে যার বাড়ি উত্তম হবে, যার বিছানা নরম হবে এবং যার ভোগসামগ্রী বেশি হবে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তি সর্বাধিক মর্যাদাবান হবেন?

সে উত্তরে বলল, না। হাতেম বলল, তাহলে কেমন পেয়েছেন? তিনি বললেন, বরং এভাবে পেয়েছি, যে দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতায় বিমুখ হবে, আখিরাতের বিষয়ে আগ্রহী হবে, মিসকীনদেরকে ভালোবাসবে এবং আখিরাতের জন্য সৎকাজ করবে সে হবে আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান। লাভ করবে আল্লাহর নৈকট্য। হাতেম বলল, আপনি তাহলে কার অনুসরণ করেছেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার সাহাবায়ে কেরাম, তাদের অনুসারী তাবেঈগণ ও তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণকারী নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরামের, নাকি ফেরাউন ও নমরুদের? কেননা তারাই প্রথম মানুষ যারা সিমেন্ট-বালি ও চুনা-সুরকি দিয়ে ইমারত নির্মাণ করেছেন। হে নিকৃষ্ট আলেমের দল, দুনিয়াদার মূর্খ মানবজাতি যারা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতায় কুকুরের ন্যায় লালায়িত, তারা যদি তোমাদের হালত দেখে তাহলে মনে সংকল্প করবে যে, এরূপ যদি হয় আলেমদের বিলাসিতা তাহলে তো আমাকে আরও বিলাসী হতে হবে। হাতেম এসব কথা বলে তার দরবার থেকে চলে আসে। হাতেমের কথা শুনে মুহাম্মাদ বিন মুকাতিলের অসুস্থতা বেড়ে যায়।

হাতেম ও মুহাম্মাদ বিন মুকাতিলের মাঝে চলমান আলোচনা রায় নগরীতে ছড়িয়ে পড়লে নগরবাসী হাতেমকে বলল, কাযবিনের বিখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী তো তার চেয়ে অধিক ধন সম্পদের মালিক। তখন হাতেম তার সাক্ষাতে গিয়ে দেখেন, তিনি এক মজলিসে হাদিস বর্ণনা করছেন, আর লোকেরা মনোযোগের সহিত তার হাদিস শ্রবণ করছে। হাতেম মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসীকে বলল, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন', আমি একজন অনারবী লোক, দীনের প্রাথমিক শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে আমি আপনার নিকট এসেছি। আপনি কি আমাকে ওজু করার পদ্ধতি শিখাবেন? মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি এক খাদেমকে পানি আনার নির্দেশ দিলে খাদেম পানি উপস্থিত করে। তখন মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী বসে ওজু করলেন এবং প্রতিটি অঙ্গ তিনবার করে ধৌত করলেন। অতঃপর বললেন, ওজু এভাবে করতে হয়। হাতেম বলল, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। দয়া করে আপনার স্থানে বসে আমাকে অজু করার সুযোগ দিন, যেন আমার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন অধিক সহজতর হয়। তানাফিসী ওঠে দাঁড়ালে হাতেম তার স্থানে বসে ওজু শুরু করল। সে চেহারা তিনবার ধৌত করে বাহু চারবার ধুলে তানাফিসী বলল, আপনি তো অপচয় করেছেন। হাতেম বলল, কীভাবে অপচয় করলাম? তানাফিসী বলল, বাহু চারবার ধৌত করার মাধ্যমে। হাতেম বলল, সুবহানাল্লাহ। একমুষ্টি পানি বেশি ব্যবহার করেই অপচয়কারী হয়ে গেলাম, আর আপনি এতসব ধন-সম্পদ ভোগ করেও অপচয়কারী নন! তানাফিসী বুঝে গেলেন যে, এ ব্যক্তির শিক্ষালাভ উদ্দেশ্য নয়; বরং শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য। অতঃপর তানাফিসী ঘরে প্রবেশ করে চল্লিশ দিন পর্যন্ত কারও সাথে সাক্ষাৎ করেননি।

হিজায হয়ে মদিনায় পৌঁছলে হাতেম মদিনার আলেমদের সাথে ঝগড়া করার ইচ্ছা করল। মদিনায় প্রবেশ করে হাতেম জিজ্ঞেস করল, হে মদিনাবাসী! এটি কোন শহর? লোকেরা বলল, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর। হাতেম বলল, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাসাদ কোথায়? আমাকে তা দেখাবেন কি? যেন তাতে প্রবেশ করে দু'রাকাআত নামায পড়তে পারি। তারা বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তো কোনো প্রাসাদ ছিল না। বরং তার তো কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘর ছিল। হাতেম বলল, তাহলে তার স্ত্রী-পরিবার ও সাথি-সঙ্গীদের প্রাসাদ কোথায়? তারা বলল, তাদেরও তো কোনো প্রাসাদ ছিল না; বরং তারাও কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘরে বাস করতেন। হাতেম বলল, তাহলে তো এটা ফেরাউনের শহর। তখন লোকেরা তাকে গালমন্দ করে গভর্নরের নিকট নিয়ে যায়। তারা অভিযোগ করে বলল, এই অনারবী লোক বলে, এটা নাকি ফেরাউনের শহর। গভর্নর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এ রকম কেন বললেন? হাতেম বলল, গভর্নর সাহেব! আপনি আমার বিষয়ে তাড়াহুড়া করবেন না। আমি একজন মুসাফির লোক। আমি এ শহরে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন শহর? লোকেরা বলল, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর। আমি তাদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের প্রাসাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, তাদের তো কোনো প্রাসাদ ছিল না, তারা তো কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘরে বাস করতেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
‘নিশ্চয় আল্লাহর রাসুলের মাঝে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।’

সুতরাং আপনারা কার আদর্শ গ্রহণ করেছেন; রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাকি ফেরাউনের?

গ্রন্থকার বলেন, ওলামাদের কুৎসা ও নিন্দাকারী মূর্খ যাহেদদের জন্য আফসোস হয়; তারা অল্পজ্ঞানে তুষ্ট থেকে নফলকে ফরয মনে করে। কেননা হাতেম নামক এ যাহেদ যে বিষয়ের নিন্দা করেছে তা শরিয়তে বৈধ। আর বৈধ জিনিস গ্রহণের অনুমতি শরিয়তে বিদ্যমান। শরিয়ত কোনো বিষয়ে অনুমতি দিয়ে তার নিন্দা করে না। হায় আফসোস! মূর্খ লোকের আচরণ কত নিকৃষ্ট। সে যদি তাদেরকে বলত, সম্পদ ব্যবহারে আপনারা যদি মিতব্যয়ী হতেন, যেন মানুষ আপনাদের অনুসরণে ধন্য হয়, তাহলে তা কতই-না উত্তম হতো। এ ব্যক্তি যদি শুনত যে, সাহাবি আবদুর রহমান বিন আওফ, যোবায়ের বিন আওয়াম, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. প্রমুখ সাহাবাগণ মৃত্যুর সময় কী বিপুল সম্পদ রেখে গেছেন, তাহলে সে কী বলত বলুন তো? সাহাবি তামিম দারী একটি চাদর এক হাজার দিরহামে ক্রয় করেছেন এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে রাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন। তাই যাহেদদের ওপর ফরজ হলো প্রথমে আলেমদের থেকে শরিয়তের বিধি-বিধান শিক্ষা করা, আর যদি শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য তার না হয়, তাহলে কর্তব্য হলো এসব বিষয়ে চুপ থাকা।

মালেক বিন দিনার রহ. বলেন, শয়তান যাহেদদের নিয়ে এমনভাবে খেলা করে যেভাবে শিশুরা আখরোট নিয়ে খেলা করে থাকে। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালনাকারী এবং তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।

টিকাঃ
১. সুরা আহযাব: আয়াত ২১

যাহেদরা যেসব বিষয়ে আলেমদের কুৎসা রটায় তন্মধ্যে একটি হলো, ইলম অর্জন ও শিক্ষাদানের নিমিত্তে শক্তিবর্ধক বৈধ খাবার গ্রহণ করা। অনুরূপভাবে তারা আলেমদের সম্পদ জমা করার বিষয়েও নিন্দা করে। তারা যদি বৈধতার সংজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হতো, তাহলে বোঝত যে, শরিয়ত বৈধ কাজ সম্পাদনকারীর নিন্দা করে না। বৈধতার বিষয়ে সর্বোচ্চ এতটুকু বলা যায়, তা পরিহার করে তাকওয়ার পথ অবলম্বন করা উত্তম। আচ্ছা বলুন তো, যে সারারাত সফল পড়ছে তার জন্য কি ওই ব্যক্তির নিন্দা করা সমীচীন হবে, যে ফরজ আদায়ের পর সারারাত ঘুমিয়েছে? একটি ঘটনা দ্বারা বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। মুহাম্মাদ বিন জাফর খাওলানী বলেন, আমার নিকট হাতেম আসাম্মের শাগরেদ আবু আবদুল্লাহ খাওয়াস বলেছেন, আমরা হাতেম বলখির সাথে রায় নগরীতে প্রবেশ করি। তার সাথে তার তিনশত বিশজন শিষ্য ছিল। তারা হজের উদ্দেশ্যে তার সাথে রওয়ানা হয়েছে। তাদের গায়ে ছিল পশমি পোশাক। তাদের কাছে না ছিল খাবার না ছিল থলে। আমরা এক ধার্মিক ব্যবসায়ীর বাড়িতে যাত্রাবিরতি করলাম। ব্যবসায়ী সে রাত আমাদের মেহমানদারী করেছেন। পরদিন সকালে ব্যবসায়ী হাতেমকে বলল, হে আবু আবদুর রহমান! আমাদের এলাকার আলেম সাহেব অসুস্থ, আমি তাকে দেখতে যাচ্ছি। আপনার ইচ্ছা হলে আমার সাথে চলুন। তখন হাতেম বলল, তোমাদের আলেম যদি অসুস্থ হন তাহলে তাকে দেখতে যাওয়া তো পূণ্যের কাজ, তদুপরি আলেমের দিকে তাকানো ইবাদতও বটে। আমি তোমার সাথে যাব। অসুস্থ আলেমের নাম ছিল মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল—যিনি রায় নগরীর বিচারক ছিলেন। তখন ব্যবসায়ী বলল, আপনি আদেশ করলে আমরা রওয়ানা হতে পারি।

আলেমের শানদার বাড়ি দেখে হাতেম চিন্তিত হয়ে বলল, হায় আল্লাহ! আলেমের বাড়ির এ অবস্থা! অনুমতি পেয়ে তারা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। হাতেম তাকিয়ে দেখল বাড়িটি অত্যন্ত প্রশস্ত। তার আসবাবপত্র অত্যন্ত মূল্যবান। তার বিছানা অত্যন্ত কোমল এবং তার পর্দা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। হাতেম চিন্তিত মনে এসব দেখতে দেখতে ইবনে মুকাতিলের মজলিসে প্রবেশ করে দেখল যে, তিনি কোমল সুন্দর বিছানায় আরাম করছেন। কিছু লোক তার শিয়রে বসে বাতাস দিচ্ছে, আর কিছু লোক তার সাথে আলাপ করছে। অনুমতি পেয়ে ব্যবসায়ী বসল, কিন্তু হাতেম দাঁড়িয়ে রইল। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল ইশারায় হাতেমকে বসতে বললে হাতেম বলল, আমি বসব না। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল হাতেমকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কোনো প্রয়োজন আছে? হাতেম বলল, একটি বিষয় আপনার নিকট জানতে চাই। মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল বললেন, জিজ্ঞেস করুন। হাতেম বলল, আপনি আগে সোজা হয়ে বসুন, যেন আপনাকে জিজ্ঞেস করতে পারি। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল খাদেমদেরকে নির্দেশ দিলে তারা তাকে হেলান দিয়ে বসায়। হাতেম বলল, আপনি ইলম কোথা হতে শিখেছেন? তিনি বললেন, রাসুলের সাহাবিদের থেকে। হাতেম বলল, রাসুলের সাহাবিরা কার থেকে শিখেছেন? তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। হাতেম বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কোথা হতে পেয়েছেন? তিনি বললেন, জিবরাঈল আলাইহিস সালাম থেকে, আর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন থেকে। হাতেম বলল, আচ্ছা জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ হতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং সাহাবারা তাবেঈদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং তাবেঈরা নির্ভরযোগ্য ওলামাদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরাম আপনাদের নিকট যা পৌঁছিয়েছেন তার কোথাও কি এমন পেয়েছেন, দুনিয়াতে যার বাড়ি উত্তম হবে, যার বিছানা নরম হবে এবং যার ভোগসামগ্রী বেশি হবে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তি সর্বাধিক মর্যাদাবান হবেন?

সে উত্তরে বলল, না। হাতেম বলল, তাহলে কেমন পেয়েছেন? তিনি বললেন, বরং এভাবে পেয়েছি, যে দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতায় বিমুখ হবে, আখিরাতের বিষয়ে আগ্রহী হবে, মিসকীনদেরকে ভালোবাসবে এবং আখিরাতের জন্য সৎকাজ করবে সে হবে আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান। লাভ করবে আল্লাহর নৈকট্য। হাতেম বলল, আপনি তাহলে কার অনুসরণ করেছেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার সাহাবায়ে কেরাম, তাদের অনুসারী তাবেঈগণ ও তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণকারী নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরামের, নাকি ফেরাউন ও নমরুদের? কেননা তারাই প্রথম মানুষ যারা সিমেন্ট-বালি ও চুনা-সুরকি দিয়ে ইমারত নির্মাণ করেছেন। হে নিকৃষ্ট আলেমের দল, দুনিয়াদার মূর্খ মানবজাতি যারা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতায় কুকুরের ন্যায় লালায়িত, তারা যদি তোমাদের হালত দেখে তাহলে মনে সংকল্প করবে যে, এরূপ যদি হয় আলেমদের বিলাসিতা তাহলে তো আমাকে আরও বিলাসী হতে হবে। হাতেম এসব কথা বলে তার দরবার থেকে চলে আসে। হাতেমের কথা শুনে মুহাম্মাদ বিন মুকাতিলের অসুস্থতা বেড়ে যায়।

হাতেম ও মুহাম্মাদ বিন মুকাতিলের মাঝে চলমান আলোচনা রায় নগরীতে ছড়িয়ে পড়লে নগরবাসী হাতেমকে বলল, কাযবিনের বিখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী তো তার চেয়ে অধিক ধন সম্পদের মালিক। তখন হাতেম তার সাক্ষাতে গিয়ে দেখেন, তিনি এক মজলিসে হাদিস বর্ণনা করছেন, আর লোকেরা মনোযোগের সহিত তার হাদিস শ্রবণ করছে। হাতেম মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসীকে বলল, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন', আমি একজন অনারবী লোক, দীনের প্রাথমিক শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে আমি আপনার নিকট এসেছি। আপনি কি আমাকে ওজু করার পদ্ধতি শিখাবেন? মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি এক খাদেমকে পানি আনার নির্দেশ দিলে খাদেম পানি উপস্থিত করে। তখন মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী বসে ওজু করলেন এবং প্রতিটি অঙ্গ তিনবার করে ধৌত করলেন। অতঃপর বললেন, ওজু এভাবে করতে হয়। হাতেম বলল, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। দয়া করে আপনার স্থানে বসে আমাকে অজু করার সুযোগ দিন, যেন আমার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন অধিক সহজতর হয়। তানাফিসী ওঠে দাঁড়ালে হাতেম তার স্থানে বসে ওজু শুরু করল। সে চেহারা তিনবার ধৌত করে বাহু চারবার ধুলে তানাফিসী বলল, আপনি তো অপচয় করেছেন। হাতেম বলল, কীভাবে অপচয় করলাম? তানাফিসী বলল, বাহু চারবার ধৌত করার মাধ্যমে। হাতেম বলল, সুবহানাল্লাহ। একমুষ্টি পানি বেশি ব্যবহার করেই অপচয়কারী হয়ে গেলাম, আর আপনি এতসব ধন-সম্পদ ভোগ করেও অপচয়কারী নন! তানাফিসী বুঝে গেলেন যে, এ ব্যক্তির শিক্ষালাভ উদ্দেশ্য নয়; বরং শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য। অতঃপর তানাফিসী ঘরে প্রবেশ করে চল্লিশ দিন পর্যন্ত কারও সাথে সাক্ষাৎ করেননি।

হিজায হয়ে মদিনায় পৌঁছলে হাতেম মদিনার আলেমদের সাথে ঝগড়া করার ইচ্ছা করল। মদিনায় প্রবেশ করে হাতেম জিজ্ঞেস করল, হে মদিনাবাসী! এটি কোন শহর? লোকেরা বলল, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর। হাতেম বলল, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাসাদ কোথায়? আমাকে তা দেখাবেন কি? যেন তাতে প্রবেশ করে দু'রাকাআত নামায পড়তে পারি। তারা বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তো কোনো প্রাসাদ ছিল না। বরং তার তো কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘর ছিল। হাতেম বলল, তাহলে তার স্ত্রী-পরিবার ও সাথি-সঙ্গীদের প্রাসাদ কোথায়? তারা বলল, তাদেরও তো কোনো প্রাসাদ ছিল না; বরং তারাও কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘরে বাস করতেন। হাতেম বলল, তাহলে তো এটা ফেরাউনের শহর। তখন লোকেরা তাকে গালমন্দ করে গভর্নরের নিকট নিয়ে যায়। তারা অভিযোগ করে বলল, এই অনারবী লোক বলে, এটা নাকি ফেরাউনের শহর। গভর্নর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এ রকম কেন বললেন? হাতেম বলল, গভর্নর সাহেব! আপনি আমার বিষয়ে তাড়াহুড়া করবেন না। আমি একজন মুসাফির লোক। আমি এ শহরে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন শহর? লোকেরা বলল, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর। আমি তাদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের প্রাসাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, তাদের তো কোনো প্রাসাদ ছিল না, তারা তো কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘরে বাস করতেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
‘নিশ্চয় আল্লাহর রাসুলের মাঝে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।’

সুতরাং আপনারা কার আদর্শ গ্রহণ করেছেন; রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাকি ফেরাউনের?

গ্রন্থকার বলেন, ওলামাদের কুৎসা ও নিন্দাকারী মূর্খ যাহেদদের জন্য আফসোস হয়; তারা অল্পজ্ঞানে তুষ্ট থেকে নফলকে ফরয মনে করে। কেননা হাতেম নামক এ যাহেদ যে বিষয়ের নিন্দা করেছে তা শরিয়তে বৈধ। আর বৈধ জিনিস গ্রহণের অনুমতি শরিয়তে বিদ্যমান। শরিয়ত কোনো বিষয়ে অনুমতি দিয়ে তার নিন্দা করে না। হায় আফসোস! মূর্খ লোকের আচরণ কত নিকৃষ্ট। সে যদি তাদেরকে বলত, সম্পদ ব্যবহারে আপনারা যদি মিতব্যয়ী হতেন, যেন মানুষ আপনাদের অনুসরণে ধন্য হয়, তাহলে তা কতই-না উত্তম হতো। এ ব্যক্তি যদি শুনত যে, সাহাবি আবদুর রহমান বিন আওফ, যোবায়ের বিন আওয়াম, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. প্রমুখ সাহাবাগণ মৃত্যুর সময় কী বিপুল সম্পদ রেখে গেছেন, তাহলে সে কী বলত বলুন তো? সাহাবি তামিম দারী একটি চাদর এক হাজার দিরহামে ক্রয় করেছেন এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে রাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন। তাই যাহেদদের ওপর ফরজ হলো প্রথমে আলেমদের থেকে শরিয়তের বিধি-বিধান শিক্ষা করা, আর যদি শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য তার না হয়, তাহলে কর্তব্য হলো এসব বিষয়ে চুপ থাকা।

মালেক বিন দিনার রহ. বলেন, শয়তান যাহেদদের নিয়ে এমনভাবে খেলা করে যেভাবে শিশুরা আখরোট নিয়ে খেলা করে থাকে। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালনাকারী এবং তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।

টিকাঃ
১. সুরা আহযাব: আয়াত ২১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00