📄 যাহেদদের কিছু মতাদর্শ
অনেক যাহেদ নিরবচ্ছিন্নভাবে মসজিদে পড়ে থাকা এবং নিঃসঙ্গাবস্থায় পাহাড়ে অবস্থান করা—যাদের দৈনিক খাদ্য, তাদের নিঃসঙ্গতার কথা মানুষ জানুক এতেই তাদের তৃপ্তি। আবার কখনো সে নিঃসঙ্গ থাকার প্রমাণ দিয়ে বলে, আমার আশঙ্কা হয়, লোকালয়ে থাকলে মানুষ আমার গুনাহ বর্জনের বিষয়ে অবগত হবে। অথচ এসব কথা সে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বলে। তার উদ্দেশ্যসমূহের কয়েকটি হলো : নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা, মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা, সেবা লাভের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা করা, তার রীতিনীতি ও নেতৃত্ব রক্ষা করা। আর মানুষের সংস্পর্শে এসবের অর্জন অসম্ভব। অথচ সে চায়, তার আলোচনা দীর্ঘকাল লোকমুখে চাউর হোক।
স্বীয় দোষ-ত্রুটি, মন্দস্বভাব ও ইলম সম্পর্কে অজ্ঞতার বিষয়টি জনগণ থেকে গোপন রাখার নিমিত্তেও সে মাঝে-মধ্যে এমন ভান করে থাকে। অগত্যা সে এ পন্থা অবলম্বন করে। তার সাথে মানুষ সাক্ষাৎ করুক এটা সে পছন্দ করে কিন্তু সে কারও কাছে যায় না। তার দরবারে রাজা-বাদশা ও মন্ত্রীর আগমন, দরজায় জনসাধারণের সমবেত হওয়া এবং তারা তার হাত চুম্বন করায় সে আনন্দিত হয়, অথচ রোগী দেখা ও জানাযায় শরিক হওয়া থেকে সে দূরে থাকে। এ ব্যক্তি যদি খাদ্য গ্রহণের মুখাপেক্ষী হয় তাহলে সে ক্ষুধার ওপর সবর করে, যেন খাবার কিনতে নিজেকে বাজারে যেতে না হয়, কেননা মানুষের সাথে বাজারে হাঁটলে যশ-খ্যাতি কমে যেতে পারে। সে মনে করে যদি বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করি তাহলে খ্যাতি ভেস্তে যাবে। নিঃসন্দেহে নিজের উদ্ভাবিত রীতিনীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে এ ব্যক্তির মনে এ অহংবোধ বিরাজ করে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করতেন এবং নিজে বহন করে তা বাড়িতে নিয়ে আসতেন। রাসুলের সাহাবি আবু বকর রা. বিক্রির উদ্দেশ্যে কাঁধে কাপড় বহন করে বাজারে নিতেন এবং প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করে বাড়ি ফিরতেন।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَنْظَلَةَ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ سَلَّامٍ، مَرَّ فِي السُّوقِ وَعَلَى رَأْسِهِ حُزْمَةُ حَطَبٍ، فَقَالَ: أَدْفَعُ بِهِ الْكِبْرَ، إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرٍ
'আবদুল্লাহ বিন হানযালা বলেন, আবদুল্লাহ বিন সালাম রা. মাথায় লাকড়ির আঁটি বহন করে রাস্তায় পথ চললে লোকেরা তাকে বলল, হে আবদুল্লাহ, কোন জিনিস তোমাকে এ কাজে বাধ্য করল? অথচ আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন! তিনি বললেন, আমি এর মাধ্যমে অহংকার দূর করছি। কেননা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-এমন বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার রয়েছে।'
***
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়া এবং নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার যে উদাহরণ আমরা উল্লেখ করেছি তা ছিল আমাদের পূর্বসূরিদের অভ্যাস। অবশ্য সে অভ্যাস এখন পরিবর্তিত হয়েছে যেভাবে পরিবেশ ও পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তিত হয়েছে। তাই আলেমদের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়া আমি এখন উত্তম মনে করি না। কেননা আলেমদের এ আচরণ বর্তমানে মূর্খদের অন্তরে ইলমের মর্যাদা কমিয়ে দেয়। অথচ ইলমের মর্যাদা মানুষের দিলে বিদ্যমান থাকা শরিয়তসম্মত বিষয়। আর যে জিনিস মূর্খদের অন্তরে ইলমের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করে, আলেমদের জন্য তা অবলম্বন করা শরিয়তে নিষিদ্ধ। পূর্বসূরিদের যে আচরণ মানুষের মনে পরিবর্তন আনত না, বর্তমানেও তা পালন করা অবশ্যক নয়। ইমাম আওযায়ি বলেন, আমরা হাসাহাসি ও উপহাস করতাম। যখন মানুষ আমাদের অনুসরণ শুরু করল তখন নিজেদের জন্য আমরা তা অবৈধ মনে করলাম। ইবরাহিম ইবনে আদহামের সাথিরা একদিন রসিকতা করছিল, তখন এক লোক দরজায় কড়া নেড়ে তাদেরকে চুপ থাকার নির্দেশ দিলে তারা বলল, আমরা রিয়া শিখেছি। তখন সে তাদেরকে বলল, তোমাদের কাছ থেকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাক—তা আমি চাই না।
***
অনেক দুনিয়াবিরাগীকে যদি মসৃণ পোশাক পরতে বলা হয় তারা কিছুতেই তা পরবেন না। যেন দুনিয়াবিরাগিতায় তাদের যশ কমে না যায়। আর তাদেরকে যদি মানুষের উপস্থিতিতে খাবার গ্রহণের অনুরোধ করা হয় তাহলে দেহ থেকে প্রাণবায়ু বের হয়ে গেলেও তারা মানুষের সামনে খাদ্য গ্রহণ করতে চান না। তারা হাসি চাপিয়ে রেখে মানুষের সামনে মুচকি হাসেন, আর ইবলিস তাদের মনে এ প্ররোচনা ঢালে যে, তুমি যা করছ তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের আত্মশুদ্ধি। অথচ বাস্তবিকপক্ষে তা একটি জঘন্য রিয়া। কারো কারো মাথা সর্বদা অবনমিত থাকে, দুঃখের ছাপ তার চেহারায় সব সময় ভাসে, যেন সে পরকালের চিন্তায় অস্থির; অথচ মানুষ চলে গেলে আচার-ব্যবহারে হিংস্র প্রাণীর রূপ ধারণ করে।
***
দুনিয়াত্যাগী অনেক ভাই তার কাপড় ছিঁড়ে গেলে আর সেলাই করেন না। পাগড়ি নষ্ট হলে সংশোধন করেন না। দাড়ি এলোমেলা হলে তিনি তা আঁচড়ান না। তিনি এসব আচরণ দ্বারা দুনিয়ার কোনো বস্তুই তার নিকট উত্তম নয় বলে মানুষকে বোঝাতে চান। অথচ তিনি যা করছেন, তা একপ্রকার রিয়া। আর দুনিয়া ত্যাগের এ পদ্ধতি যদি সে সঠিক মনে করে, 'যেমন দাউদ তাঈকে যখন বলা হলো, আপনি কি দাড়ি আঁচড়াবেন না? তিনি উত্তরে বললেন, আখিরাতের ব্যস্ততার দরুন তা আঁচড়ানোর সময় কোথায়!' তাহলে তার জেনে রাখা উচিত—তার এ পদ্ধতি সঠিক নয়। কেননা এ পদ্ধতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের মধ্য থেকে কারও কাছে পাওয়া যায় না। বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুল আঁচড়াতেন। আয়নায় চেহারা দেখতেন। মাথায় তেল ব্যবহার করতেন এবং শরীরে আতর লাগাতেন। অথচ আখিরাতের বিষয়ে তিনি ছিলেন সর্বাধিক ব্যস্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবি আবু বকর ও ওমর রা. মেহেদী দ্বারা দাড়ি খেযাব করতেন, অথচ তারা ছিলেন সর্বাধিক মুত্তাকি ও দুনিয়াবিমুখ সাহাবি। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিদের ওপর কোনো গুণ ও বৈশিষ্ট্যের দাবি যদি কেউ করে তাহলে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা হবে না।
বহু যাহেদ সর্বদা চুপ থাকেন এবং পরিবারের সংস্পর্শ হতে বিরত থেকে নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। ফলে তিনি মন্দ স্বভাব ও পরিবারের প্রতি বিষণ্ণভাবাপন্ন হয়ে তাদেরকে কষ্টে নিপতিত করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী :
إِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقٌّ
'নিশ্চই তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক রয়েছে”-এ কথাকে ভুলে যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো মজাক করে শিশুদের সাথে খেলা করতেন, স্ত্রীদের সাথে আলাপ করতেন এবং স্ত্রী আয়েশা রা.- এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। হাদিসের অগণিত পাতা এ-জাতীয় কোমল আচরণের উদাহরণে ভরপুর।
এ সকল দুনিয়াত্যাগী মন্দ স্বভাব পরিবার হতে পৃথক থেকে সন্তানকে এতিমের মতো রাখে আর স্ত্রীকে বিধবার মতো রাখে। এসবের একমাত্র কারণ, সে মনে করে যে, পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখা আখিরাত থেকে বিমুখ করে। অথচ জ্ঞানস্বল্পতার দরুন তাদের জানা নেই যে, পরিবারের প্রতি উদারহস্ত হয়ে তাদের সাথে আনন্দ করা আখিরাতের পথকে সুগম করে। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.-কে বলেছেন,
هَلَّا تَزَوَّجْتَ بِكْرًا تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ
'তুমি যদি কুমারী মেয়ে বিবাহ করতে, তাহলে সে তোমার সাথে আনন্দ করত এবং তুমিও তার সাথে আনন্দ করতে।” আবার কখনো এ যাহেদগণের মনে শুষ্কদেহের অধিকারী হওয়ার চিন্তা প্রবল আকার ধারণ করে, ফলে সে স্ত্রী সহবাস বর্জন করে। নফল আদায়ে ফরজ বর্জন করে। অথচ এ ব্যাপারে শরিয়ত কাউকে উৎসাহিত করেনি।
অনেকে নিজ আমল দেখে মুগ্ধ হন। তাকে যদি বলা হয়, আপনি তো জমিনের খুঁটি, (অর্থাৎ আপনার কারণেই পৃথিবী টিকে আছে) তাহলে সে তা সত্য মনে করে। অনেক দুনিয়াত্যাগী আবার নিজের থেকে কারামত প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে এবং মনে এ ধারণা জন্মায় যে, সে যদি পানির নিকটবর্তী হয় তাহলে সে পানির ওপর হাঁটতে সক্ষম হবে। যদি সে বিপদের সম্মুখীন হয়ে দোয়া করে এবং সে দোয়ার ফলাফল তৎক্ষণাৎ না পায় তাহলে সে অসন্তুষ্ট হয়। যেন সে শ্রমিক—যে তার কাজের বিনিময় দাবি করছে। যদি তার প্রকৃত বোধশক্তি থাকত তাহলে সে বুঝত যে, তার অবস্থান এক কৃতদাসের ন্যায়, আর কৃতদাস নিজ কাজের দ্বারা মনিবের ওপর অনুগ্রহ ফলাতে পারে না। আর যদি সে ভেবে দেখত যে, আল্লাহর তাওফিকেই আমি এ কাজ করতে পেরেছি, তাহলে সে আমল করতে পারায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে জরুরি মনে করে আমলের ভুল-ভ্রান্তি থেকে ফিরে আসত।
মানুষের অবস্থা এমন হওয়াই কাম্য, আমলে ত্রুটি-বিচ্যুতির ভয় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে মনকে পেরেশান রাখবে। রাবেয়া বসরি রহ. বলতেন, আমি কথায় সততার স্বল্পতার কারণে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে বলল, এমন কোনো আমল কি আপনার আছে, যা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী? তিনি উত্তরে বললেন, কোনো কোনো আমলের ব্যাপারে যদিও আশাবাদী, তবে তা কবুল না হওয়ার আশঙ্কাও আমার অন্তরে সদা জাগ্রত।
অল্প জ্ঞানের কারণে বহু যাহেদকে শয়তান এমন কাজে উদ্বুদ্ধ করে শরিয়তে যা নিন্দনীয়। এতে তার উদ্দেশ্য ভালো থাকা সত্ত্বেও সওয়াব লাভের পরিবর্তে সে পাপিষ্ঠ হিসেবে সাব্যস্ত হয়। যেমন—ইবনে আকিল বলেন, আবু ইসহাক খাজ্জার একজন নেককার বুযুর্গ ছিলেন। তিনি এমন ব্যক্তি যিনি আমাকে সর্বপ্রথম কুরআন শিখিয়েছেন। তার অভ্যাস ছিল রমযান মাসে কথা বলা হতে বিরত থাকা। তাই কথা বলার প্রয়োজন হলে তিনি কুরআনের আয়াত দ্বারা সেদিকে ইশারা করতেন। যেমন কাউকে অনুমতি প্রদানকালে তিনি বলতেন- ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ ‘দরজা দিয়ে তাদের কাছে প্রবেশ করো।" বাজার করার জন্য ছেলেকে বলতেন- من بقلها وَقُتَائِهَا উদ্দেশ্য হলো, শাক-সবজি ক্রয়ের জন্য ছেলেকে আদেশ করা। ইবনে আকিল বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে আমি তাকে বললাম, আপনি ইবাদত মনে করে যা করেছেন তা মূলত নাফরমানি। তখন আমার এ কথা মানতে তার কষ্ট হলে আমি তাকে বললাম, দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার এ কাজের উদাহরণ তো কুরআনকে আপনার বালিশ হিসাবে ব্যবহার করার মতো। এতেও তিনি আমার কথার দিকে মনোযোগ দিলেন না।
গ্রন্থকার বলেন, স্বল্পজ্ঞানের কারণে অনেক যাহেদ লোকমুখে যা শোনেন সে অনুযায়ী অন্যকে ফতোয়া দেন। ফকিহ আবু হাকিম ইবরাহিম ইবনে দীনারের নিকট এক লোক ফতোয়া চেয়ে বলল, আপনি এমন মহিলার ব্যাপারে কি বললেন, যাকে তার স্বামী তিন তালাক দেয়ার পর সে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করে। এ মহিলা কি তার স্বামীর জন্য হালাল হবে? তিনি বললেন, না। তখন শরিফ দুহালী নামে এক প্রসিদ্ধ যাহেদ তার নিকট উপস্থিত ছিল, জনগণের মাঝে সে ছিল বড় সম্মানিত ব্যক্তি। সে তখন ফকিহ আবু হাকেমকে বলল, আপনি এ কী ফতোয়া দিলেন! বরং এ মহিলা তার স্বামীর জন্য বৈধ হবে। আবু হাকেম বলেন, এরূপ ফতোয়া তো আজ পর্যন্ত কেউ দেয়নি। তখন শরিফ দুহালী বলল, আল্লাহর কসম; আমি এখান থেকে বসরা পর্যন্ত এই ফতোয়া দিয়েছি।
গ্রন্থকার বলেন, দেখুন! দীন সম্পর্কে অজ্ঞতা অজ্ঞ ব্যক্তির সাথে কীরূপ আচরণ করে—যেন মানুষ তাকে মূর্খ যাহেদ না ভাবে। অথচ আমাদের পূর্বসূরি ওলামায়ে কেরাম যাহেদদেরকে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ফতোয়া দিতে নিষেধ করতেন। কেননা ফতোয়ার শর্তাবলি তাদের মাঝে বিদ্যমান নেই। ইসমাঈল ইবনে শিব্বাহ বলেন, আমি আহমদ বিন হাম্বলের দরবারে উপস্থিত হলাম, ইত্যবসরে আহমদ বিন হাজ্ব মক্কা থেকে এসে হাজির হলেন। আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বললেন, এ ব্যক্তি কে? আমি বললাম, ইনি একজন প্রসিদ্ধ যাহেদ ও পরহেজগার ব্যক্তি। তখন আহমদ বিন হাম্বল বললেন, যে নিজেকে যাহেদ বলে দাবি করে তার জন্য উচিত নয় ফতোয়ার কাজে মনোনিবেশ করা।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৯১
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৯৭৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১১৫৯
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২০৯৭, ৫০৮০, ৫৩৬৭, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭১৫
১. সুরা মায়িদা: আয়াত ২৩
২. সুরা বাকারা: আয়াত ৬১
অনেক যাহেদ নিরবচ্ছিন্নভাবে মসজিদে পড়ে থাকা এবং নিঃসঙ্গাবস্থায় পাহাড়ে অবস্থান করা—যাদের দৈনিক খাদ্য, তাদের নিঃসঙ্গতার কথা মানুষ জানুক এতেই তাদের তৃপ্তি। আবার কখনো সে নিঃসঙ্গ থাকার প্রমাণ দিয়ে বলে, আমার আশঙ্কা হয়, লোকালয়ে থাকলে মানুষ আমার গুনাহ বর্জনের বিষয়ে অবগত হবে। অথচ এসব কথা সে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বলে। তার উদ্দেশ্যসমূহের কয়েকটি হলো : নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা, মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা, সেবা লাভের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা করা, তার রীতিনীতি ও নেতৃত্ব রক্ষা করা। আর মানুষের সংস্পর্শে এসবের অর্জন অসম্ভব। অথচ সে চায়, তার আলোচনা দীর্ঘকাল লোকমুখে চাউর হোক।
স্বীয় দোষ-ত্রুটি, মন্দস্বভাব ও ইলম সম্পর্কে অজ্ঞতার বিষয়টি জনগণ থেকে গোপন রাখার নিমিত্তেও সে মাঝে-মধ্যে এমন ভান করে থাকে। অগত্যা সে এ পন্থা অবলম্বন করে। তার সাথে মানুষ সাক্ষাৎ করুক এটা সে পছন্দ করে কিন্তু সে কারও কাছে যায় না। তার দরবারে রাজা-বাদশা ও মন্ত্রীর আগমন, দরজায় জনসাধারণের সমবেত হওয়া এবং তারা তার হাত চুম্বন করায় সে আনন্দিত হয়, অথচ রোগী দেখা ও জানাযায় শরিক হওয়া থেকে সে দূরে থাকে। এ ব্যক্তি যদি খাদ্য গ্রহণের মুখাপেক্ষী হয় তাহলে সে ক্ষুধার ওপর সবর করে, যেন খাবার কিনতে নিজেকে বাজারে যেতে না হয়, কেননা মানুষের সাথে বাজারে হাঁটলে যশ-খ্যাতি কমে যেতে পারে। সে মনে করে যদি বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করি তাহলে খ্যাতি ভেস্তে যাবে। নিঃসন্দেহে নিজের উদ্ভাবিত রীতিনীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে এ ব্যক্তির মনে এ অহংবোধ বিরাজ করে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করতেন এবং নিজে বহন করে তা বাড়িতে নিয়ে আসতেন। রাসুলের সাহাবি আবু বকর রা. বিক্রির উদ্দেশ্যে কাঁধে কাপড় বহন করে বাজারে নিতেন এবং প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করে বাড়ি ফিরতেন।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَنْظَلَةَ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ سَلَّامٍ، مَرَّ فِي السُّوقِ وَعَلَى رَأْسِهِ حُزْمَةُ حَطَبٍ، فَقَالَ: أَدْفَعُ بِهِ الْكِبْرَ، إِنَِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرٍ
'আবদুল্লাহ বিন হানযালা বলেন, আবদুল্লাহ বিন সালাম রা. মাথায় লাকড়ির আঁটি বহন করে রাস্তায় পথ চললে লোকেরা তাকে বলল, হে আবদুল্লাহ, কোন জিনিস তোমাকে এ কাজে বাধ্য করল? অথচ আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন! তিনি বললেন, আমি এর মাধ্যমে অহংকার দূর করছি। কেননা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-এমন বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার রয়েছে।'
***
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়া এবং নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার যে উদাহরণ আমরা উল্লেখ করেছি তা ছিল আমাদের পূর্বসূরিদের অভ্যাস। অবশ্য সে অভ্যাস এখন পরিবর্তিত হয়েছে যেভাবে পরিবেশ ও পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তিত হয়েছে। তাই আলেমদের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়া আমি এখন উত্তম মনে করি না। কেননা আলেমদের এ আচরণ বর্তমানে মূর্খদের অন্তরে ইলমের মর্যাদা কমিয়ে দেয়। অথচ ইলমের মর্যাদা মানুষের দিলে বিদ্যমান থাকা শরিয়তসম্মত বিষয়। আর যে জিনিস মূর্খদের অন্তরে ইলমের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করে, আলেমদের জন্য তা অবলম্বন করা শরিয়তে নিষিদ্ধ। পূর্বসূরিদের যে আচরণ মানুষের মনে পরিবর্তন আনত না, বর্তমানেও তা পালন করা অবশ্যক নয়। ইমাম আওযায়ি বলেন, আমরা হাসাহাসি ও উপহাস করতাম। যখন মানুষ আমাদের অনুসরণ শুরু করল তখন নিজেদের জন্য আমরা তা অবৈধ মনে করলাম। ইবরাহিম ইবনে আদহামের সাথিরা একদিন রসিকতা করছিল, তখন এক লোক দরজায় কড়া নেড়ে তাদেরকে চুপ থাকার নির্দেশ দিলে তারা বলল, আমরা রিয়া শিখেছি। তখন সে তাদেরকে বলল, তোমাদের কাছ থেকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাক—তা আমি চাই না।
***
অনেক দুনিয়াবিরাগীকে যদি মসৃণ পোশাক পরতে বলা হয় তারা কিছুতেই তা পরবেন না। যেন দুনিয়াবিরাগিতায় তাদের যশ কমে না যায়। আর তাদেরকে যদি মানুষের উপস্থিতিতে খাবার গ্রহণের অনুরোধ করা হয় তাহলে দেহ থেকে প্রাণবায়ু বের হয়ে গেলেও তারা মানুষের সামনে খাদ্য গ্রহণ করতে চান না। তারা হাসি চাপিয়ে রেখে মানুষের সামনে মুচকি হাসেন, আর ইবলিস তাদের মনে এ প্ররোচনা ঢালে যে, তুমি যা করছ তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের আত্মশুদ্ধি। অথচ বাস্তবিকপক্ষে তা একটি জঘন্য রিয়া। কারো কারো মাথা সর্বদা অবনমিত থাকে, দুঃখের ছাপ তার চেহারায় সব সময় ভাসে, যেন সে পরকালের চিন্তায় অস্থির; অথচ মানুষ চলে গেলে আচার-ব্যবহারে হিংস্র প্রাণীর রূপ ধারণ করে।
***
দুনিয়াত্যাগী অনেক ভাই তার কাপড় ছিঁড়ে গেলে আর সেলাই করেন না। পাগড়ি নষ্ট হলে সংশোধন করেন না। দাড়ি এলোমেলা হলে তিনি তা আঁচড়ান না। তিনি এসব আচরণ দ্বারা দুনিয়ার কোনো বস্তুই তার নিকট উত্তম নয় বলে মানুষকে বোঝাতে চান। অথচ তিনি যা করছেন, তা একপ্রকার রিয়া। আর দুনিয়া ত্যাগের এ পদ্ধতি যদি সে সঠিক মনে করে, 'যেমন দাউদ তাঈকে যখন বলা হলো, আপনি কি দাড়ি আঁচড়াবেন না? তিনি উত্তরে বললেন, আখিরাতের ব্যস্ততার দরুন তা আঁচড়ানোর সময় কোথায়!' তাহলে তার জেনে রাখা উচিত—তার এ পদ্ধতি সঠিক নয়। কেননা এ পদ্ধতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের মধ্য থেকে কারও কাছে পাওয়া যায় না। বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুল আঁচড়াতেন। আয়নায় চেহারা দেখতেন। মাথায় তেল ব্যবহার করতেন এবং শরীরে আতর লাগাতেন। অথচ আখিরাতের বিষয়ে তিনি ছিলেন সর্বাধিক ব্যস্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবি আবু বকর ও ওমর রা. মেহেদী দ্বারা দাড়ি খেযাব করতেন, অথচ তারা ছিলেন সর্বাধিক মুত্তাকি ও দুনিয়াবিমুখ সাহাবি। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিদের ওপর কোনো গুণ ও বৈশিষ্ট্যের দাবি যদি কেউ করে তাহলে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা হবে না।
বহু যাহেদ সর্বদা চুপ থাকেন এবং পরিবারের সংস্পর্শ হতে বিরত থেকে নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। ফলে তিনি মন্দ স্বভাব ও পরিবারের প্রতি বিষণ্ণভাবাপন্ন হয়ে তাদেরকে কষ্টে নিপতিত করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী :
إِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقٌّ
'নিশ্চই তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক রয়েছে”-এ কথাকে ভুলে যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো মজাক করে শিশুদের সাথে খেলা করতেন, স্ত্রীদের সাথে আলাপ করতেন এবং স্ত্রী আয়েশা রা.- এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। হাদিসের অগণিত পাতা এ-জাতীয় কোমল আচরণের উদাহরণে ভরপুর।
এ সকল দুনিয়াত্যাগী মন্দ স্বভাব পরিবার হতে পৃথক থেকে সন্তানকে এতিমের মতো রাখে আর স্ত্রীকে বিধবার মতো রাখে। এসবের একমাত্র কারণ, সে মনে করে যে, পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখা আখিরাত থেকে বিমুখ করে। অথচ জ্ঞানস্বল্পতার দরুন তাদের জানা নেই যে, পরিবারের প্রতি উদারহস্ত হয়ে তাদের সাথে আনন্দ করা আখিরাতের পথকে সুগম করে। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.-কে বলেছেন,
هَلَّا تَزَوَّجْتَ بِكْرًا تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ
'তুমি যদি কুমারী মেয়ে বিবাহ করতে, তাহলে সে তোমার সাথে আনন্দ করত এবং তুমিও তার সাথে আনন্দ করতে।” আবার কখনো এ যাহেদগণের মনে শুষ্কদেহের অধিকারী হওয়ার চিন্তা প্রবল আকার ধারণ করে, ফলে সে স্ত্রী সহবাস বর্জন করে। নফল আদায়ে ফরজ বর্জন করে। অথচ এ ব্যাপারে শরিয়ত কাউকে উৎসাহিত করেনি।
অনেকে নিজ আমল দেখে মুগ্ধ হন। তাকে যদি বলা হয়, আপনি তো জমিনের খুঁটি, (অর্থাৎ আপনার কারণেই পৃথিবী টিকে আছে) তাহলে সে তা সত্য মনে করে। অনেক দুনিয়াত্যাগী আবার নিজের থেকে কারামত প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে এবং মনে এ ধারণা জন্মায় যে, সে যদি পানির নিকটবর্তী হয় তাহলে সে পানির ওপর হাঁটতে সক্ষম হবে। যদি সে বিপদের সম্মুখীন হয়ে দোয়া করে এবং সে দোয়ার ফলাফল তৎক্ষণাৎ না পায় তাহলে সে অসন্তুষ্ট হয়। যেন সে শ্রমিক—যে তার কাজের বিনিময় দাবি করছে। যদি তার প্রকৃত বোধশক্তি থাকত তাহলে সে বুঝত যে, তার অবস্থান এক কৃতদাসের ন্যায়, আর কৃতদাস নিজ কাজের দ্বারা মনিবের ওপর অনুগ্রহ ফলাতে পারে না। আর যদি সে ভেবে দেখত যে, আল্লাহর তাওফিকেই আমি এ কাজ করতে পেরেছি, তাহলে সে আমল করতে পারায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে জরুরি মনে করে আমলের ভুল-ভ্রান্তি থেকে ফিরে আসত।
মানুষের অবস্থা এমন হওয়াই কাম্য, আমলে ত্রুটি-বিচ্যুতির ভয় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে মনকে পেরেশান রাখবে। রাবেয়া বসরি রহ. বলতেন, আমি কথায় সততার স্বল্পতার কারণে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে বলল, এমন কোনো আমল কি আপনার আছে, যা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী? তিনি উত্তরে বললেন, কোনো কোনো আমলের ব্যাপারে যদিও আশাবাদী, তবে তা কবুল না হওয়ার আশঙ্কাও আমার অন্তরে সদা জাগ্রত।
অল্প জ্ঞানের কারণে বহু যাহেদকে শয়তান এমন কাজে উদ্বুদ্ধ করে শরিয়তে যা নিন্দনীয়। এতে তার উদ্দেশ্য ভালো থাকা সত্ত্বেও সওয়াব লাভের পরিবর্তে সে পাপিষ্ঠ হিসেবে সাব্যস্ত হয়। যেমন—ইবনে আকিল বলেন, আবু ইসহাক খাজ্জার একজন নেককার বুযুর্গ ছিলেন। তিনি এমন ব্যক্তি যিনি আমাকে সর্বপ্রথম কুরআন শিখিয়েছেন। তার অভ্যাস ছিল রমযান মাসে কথা বলা হতে বিরত থাকা। তাই কথা বলার প্রয়োজন হলে তিনি কুরআনের আয়াত দ্বারা সেদিকে ইশারা করতেন। যেমন কাউকে অনুমতি প্রদানকালে তিনি বলতেন- ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ ‘দরজা দিয়ে তাদের কাছে প্রবেশ করো।" বাজার করার জন্য ছেলেকে বলতেন- من بقلها وَقُتَائِهَا উদ্দেশ্য হলো, শাক-সবজি ক্রয়ের জন্য ছেলেকে আদেশ করা। ইবনে আকিল বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে আমি তাকে বললাম, আপনি ইবাদত মনে করে যা করেছেন তা মূলত নাফরমানি। তখন আমার এ কথা মানতে তার কষ্ট হলে আমি তাকে বললাম, দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার এ কাজের উদাহরণ তো কুরআনকে আপনার বালিশ হিসাবে ব্যবহার করার মতো। এতেও তিনি আমার কথার দিকে মনোযোগ দিলেন না।
গ্রন্থকার বলেন, স্বল্পজ্ঞানের কারণে অনেক যাহেদ লোকমুখে যা শোনেন সে অনুযায়ী অন্যকে ফতোয়া দেন। ফকিহ আবু হাকিম ইবরাহিম ইবনে দীনারের নিকট এক লোক ফতোয়া চেয়ে বলল, আপনি এমন মহিলার ব্যাপারে কি বললেন, যাকে তার স্বামী তিন তালাক দেয়ার পর সে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করে। এ মহিলা কি তার স্বামীর জন্য হালাল হবে? তিনি বললেন, না। তখন শরিফ দুহালী নামে এক প্রসিদ্ধ যাহেদ তার নিকট উপস্থিত ছিল, জনগণের মাঝে সে ছিল বড় সম্মানিত ব্যক্তি। সে তখন ফকিহ আবু হাকেমকে বলল, আপনি এ কী ফতোয়া দিলেন! বরং এ মহিলা তার স্বামীর জন্য বৈধ হবে। আবু হাকেম বলেন, এরূপ ফতোয়া তো আজ পর্যন্ত কেউ দেয়নি। তখন শরিফ দুহালী বলল, আল্লাহর কসম; আমি এখান থেকে বসরা পর্যন্ত এই ফতোয়া দিয়েছি।
গ্রন্থকার বলেন, দেখুন! দীন সম্পর্কে অজ্ঞতা অজ্ঞ ব্যক্তির সাথে কীরূপ আচরণ করে—যেন মানুষ তাকে মূর্খ যাহেদ না ভাবে। অথচ আমাদের পূর্বসূরি ওলামায়ে কেরাম যাহেদদেরকে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ফতোয়া দিতে নিষেধ করতেন। কেননা ফতোয়ার শর্তাবলি তাদের মাঝে বিদ্যমান নেই। ইসমাঈল ইবনে শিব্বাহ বলেন, আমি আহমদ বিন হাম্বলের দরবারে উপস্থিত হলাম, ইত্যবসরে আহমদ বিন হাজ্ব মক্কা থেকে এসে হাজির হলেন। আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বললেন, এ ব্যক্তি কে? আমি বললাম, ইনি একজন প্রসিদ্ধ যাহেদ ও পরহেজগার ব্যক্তি। তখন আহমদ বিন হাম্বল বললেন, যে নিজেকে যাহেদ বলে দাবি করে তার জন্য উচিত নয় ফতোয়ার কাজে মনোনিবেশ করা।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৯১
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৯৭৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১১৫৯
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২০৯৭, ৫০৮০, ৫৩৬৭, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭১৫
১. সুরা মায়িদা: আয়াত ২৩
২. সুরা বাকারা: আয়াত ৬১
📄 আলেমদের নিন্দা ও কুৎসা
শয়তান যাহেদ তথা সংসারত্যাগীদেরকে এমনভাবে প্ররোচিত করে যে, তারা আলেমদেরকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখে এবং তাদের নিন্দা করে। তারা বলে, ইলমের উদ্দেশ্য আমল, সুতরাং যে আমল করে তার জন্য ইলমের প্রয়োজন নেই। অথচ তাদের জানা নেই যে, ইলম হচ্ছে নূর। শরিয়ত রক্ষায় আলেমদের মর্যাদা তারা যদি জানত, তাহলে বাকশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির সামনে বোবা ব্যক্তি এবং দৃষ্টিবানের সামনে দৃষ্টিহীন ব্যক্তি নিজেকে যেরূপ মনে করে, নিজেদেরকে তারা সে রকমই ভাবত। আলেমরা হলেন পথপ্রদর্শক, যাদের অনুসারী গোটা মানবজাতি।
وَعَن سهل بن سعد ان النبي صلى الله عليه وسلم قال لعلي بن أبي طالب رضي الله عنه والله لأن يهدي الله بك رجلا واحدا خيرا لك من حمر النعم
'হজরত সাহল ইবনে সাআদ রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আলী ইবনে আবি তালেব রা.-কে বলেছেন, আল্লাহর শপথ! তোমার মাধ্যমে আল্লাহ এক ব্যক্তিকে হেদায়েত দেয়া তোমার জন্য লাল উষ্ট্রী লাভ হওয়া থেকে উত্তম।"
টিকাঃ
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৯৪২, ৩৭০১, ৪২১০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৪০৬
শয়তান যাহেদ তথা সংসারত্যাগীদেরকে এমনভাবে প্ররোচিত করে যে, তারা আলেমদেরকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখে এবং তাদের নিন্দা করে। তারা বলে, ইলমের উদ্দেশ্য আমল, সুতরাং যে আমল করে তার জন্য ইলমের প্রয়োজন নেই। অথচ তাদের জানা নেই যে, ইলম হচ্ছে নূর। শরিয়ত রক্ষায় আলেমদের মর্যাদা তারা যদি জানত, তাহলে বাকশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির সামনে বোবা ব্যক্তি এবং দৃষ্টিবানের সামনে দৃষ্টিহীন ব্যক্তি নিজেকে যেরূপ মনে করে, নিজেদেরকে তারা সে রকমই ভাবত। আলেমরা হলেন পথপ্রদর্শক, যাদের অনুসারী গোটা মানবজাতি।
وَعَن سهل بن سعد ان النبي صلى الله عليه وسلم قال لعلي بن أبي طالب رضي الله عنه والله لأن يهدي الله بك رجلا واحدا خيرا لك من حمر النعم
'হজরত সাহল ইবনে সাআদ রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আলী ইবনে আবি তালেব রা.-কে বলেছেন, আল্লাহর শপথ! তোমার মাধ্যমে আল্লাহ এক ব্যক্তিকে হেদায়েত দেয়া তোমার জন্য লাল উষ্ট্রী লাভ হওয়া থেকে উত্তম।"
টিকাঃ
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৯৪২, ৩৭০১, ৪২১০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৪০৬
📄 আলেমদের যে সব বিষয়ে যাহেদের আপত্তি
যাহেদরা যেসব বিষয়ে আলেমদের কুৎসা রটায় তন্মধ্যে একটি হলো, ইলম অর্জন ও শিক্ষাদানের নিমিত্তে শক্তিবর্ধক বৈধ খাবার গ্রহণ করা। অনুরূপভাবে তারা আলেমদের সম্পদ জমা করার বিষয়েও নিন্দা করে। তারা যদি বৈধতার সংজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হতো, তাহলে বোঝত যে, শরিয়ত বৈধ কাজ সম্পাদনকারীর নিন্দা করে না। বৈধতার বিষয়ে সর্বোচ্চ এতটুকু বলা যায়, তা পরিহার করে তাকওয়ার পথ অবলম্বন করা উত্তম। আচ্ছা বলুন তো, যে সারারাত সফল পড়ছে তার জন্য কি ওই ব্যক্তির নিন্দা করা সমীচীন হবে, যে ফরজ আদায়ের পর সারারাত ঘুমিয়েছে? একটি ঘটনা দ্বারা বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। মুহাম্মাদ বিন জাফর খাওলানী বলেন, আমার নিকট হাতেম আসাম্মের শাগরেদ আবু আবদুল্লাহ খাওয়াস বলেছেন, আমরা হাতেম বলখির সাথে রায় নগরীতে প্রবেশ করি। তার সাথে তার তিনশত বিশজন শিষ্য ছিল। তারা হজের উদ্দেশ্যে তার সাথে রওয়ানা হয়েছে। তাদের গায়ে ছিল পশমি পোশাক। তাদের কাছে না ছিল খাবার না ছিল থলে। আমরা এক ধার্মিক ব্যবসায়ীর বাড়িতে যাত্রাবিরতি করলাম। ব্যবসায়ী সে রাত আমাদের মেহমানদারী করেছেন। পরদিন সকালে ব্যবসায়ী হাতেমকে বলল, হে আবু আবদুর রহমান! আমাদের এলাকার আলেম সাহেব অসুস্থ, আমি তাকে দেখতে যাচ্ছি। আপনার ইচ্ছা হলে আমার সাথে চলুন। তখন হাতেম বলল, তোমাদের আলেম যদি অসুস্থ হন তাহলে তাকে দেখতে যাওয়া তো পূণ্যের কাজ, তদুপরি আলেমের দিকে তাকানো ইবাদতও বটে। আমি তোমার সাথে যাব। অসুস্থ আলেমের নাম ছিল মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল—যিনি রায় নগরীর বিচারক ছিলেন। তখন ব্যবসায়ী বলল, আপনি আদেশ করলে আমরা রওয়ানা হতে পারি।
আলেমের শানদার বাড়ি দেখে হাতেম চিন্তিত হয়ে বলল, হায় আল্লাহ! আলেমের বাড়ির এ অবস্থা! অনুমতি পেয়ে তারা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। হাতেম তাকিয়ে দেখল বাড়িটি অত্যন্ত প্রশস্ত। তার আসবাবপত্র অত্যন্ত মূল্যবান। তার বিছানা অত্যন্ত কোমল এবং তার পর্দা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। হাতেম চিন্তিত মনে এসব দেখতে দেখতে ইবনে মুকাতিলের মজলিসে প্রবেশ করে দেখল যে, তিনি কোমল সুন্দর বিছানায় আরাম করছেন। কিছু লোক তার শিয়রে বসে বাতাস দিচ্ছে, আর কিছু লোক তার সাথে আলাপ করছে। অনুমতি পেয়ে ব্যবসায়ী বসল, কিন্তু হাতেম দাঁড়িয়ে রইল। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল ইশারায় হাতেমকে বসতে বললে হাতেম বলল, আমি বসব না। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল হাতেমকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কোনো প্রয়োজন আছে? হাতেম বলল, একটি বিষয় আপনার নিকট জানতে চাই। মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল বললেন, জিজ্ঞেস করুন। হাতেম বলল, আপনি আগে সোজা হয়ে বসুন, যেন আপনাকে জিজ্ঞেস করতে পারি। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল খাদেমদেরকে নির্দেশ দিলে তারা তাকে হেলান দিয়ে বসায়। হাতেম বলল, আপনি ইলম কোথা হতে শিখেছেন? তিনি বললেন, রাসুলের সাহাবিদের থেকে। হাতেম বলল, রাসুলের সাহাবিরা কার থেকে শিখেছেন? তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। হাতেম বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কোথা হতে পেয়েছেন? তিনি বললেন, জিবরাঈল আলাইহিস সালাম থেকে, আর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন থেকে। হাতেম বলল, আচ্ছা জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ হতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং সাহাবারা তাবেঈদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং তাবেঈরা নির্ভরযোগ্য ওলামাদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরাম আপনাদের নিকট যা পৌঁছিয়েছেন তার কোথাও কি এমন পেয়েছেন, দুনিয়াতে যার বাড়ি উত্তম হবে, যার বিছানা নরম হবে এবং যার ভোগসামগ্রী বেশি হবে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তি সর্বাধিক মর্যাদাবান হবেন?
সে উত্তরে বলল, না। হাতেম বলল, তাহলে কেমন পেয়েছেন? তিনি বললেন, বরং এভাবে পেয়েছি, যে দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতায় বিমুখ হবে, আখিরাতের বিষয়ে আগ্রহী হবে, মিসকীনদেরকে ভালোবাসবে এবং আখিরাতের জন্য সৎকাজ করবে সে হবে আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান। লাভ করবে আল্লাহর নৈকট্য। হাতেম বলল, আপনি তাহলে কার অনুসরণ করেছেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার সাহাবায়ে কেরাম, তাদের অনুসারী তাবেঈগণ ও তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণকারী নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরামের, নাকি ফেরাউন ও নমরুদের? কেননা তারাই প্রথম মানুষ যারা সিমেন্ট-বালি ও চুনা-সুরকি দিয়ে ইমারত নির্মাণ করেছেন। হে নিকৃষ্ট আলেমের দল, দুনিয়াদার মূর্খ মানবজাতি যারা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতায় কুকুরের ন্যায় লালায়িত, তারা যদি তোমাদের হালত দেখে তাহলে মনে সংকল্প করবে যে, এরূপ যদি হয় আলেমদের বিলাসিতা তাহলে তো আমাকে আরও বিলাসী হতে হবে। হাতেম এসব কথা বলে তার দরবার থেকে চলে আসে। হাতেমের কথা শুনে মুহাম্মাদ বিন মুকাতিলের অসুস্থতা বেড়ে যায়।
হাতেম ও মুহাম্মাদ বিন মুকাতিলের মাঝে চলমান আলোচনা রায় নগরীতে ছড়িয়ে পড়লে নগরবাসী হাতেমকে বলল, কাযবিনের বিখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী তো তার চেয়ে অধিক ধন সম্পদের মালিক। তখন হাতেম তার সাক্ষাতে গিয়ে দেখেন, তিনি এক মজলিসে হাদিস বর্ণনা করছেন, আর লোকেরা মনোযোগের সহিত তার হাদিস শ্রবণ করছে। হাতেম মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসীকে বলল, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন', আমি একজন অনারবী লোক, দীনের প্রাথমিক শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে আমি আপনার নিকট এসেছি। আপনি কি আমাকে ওজু করার পদ্ধতি শিখাবেন? মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি এক খাদেমকে পানি আনার নির্দেশ দিলে খাদেম পানি উপস্থিত করে। তখন মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী বসে ওজু করলেন এবং প্রতিটি অঙ্গ তিনবার করে ধৌত করলেন। অতঃপর বললেন, ওজু এভাবে করতে হয়। হাতেম বলল, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। দয়া করে আপনার স্থানে বসে আমাকে অজু করার সুযোগ দিন, যেন আমার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন অধিক সহজতর হয়। তানাফিসী ওঠে দাঁড়ালে হাতেম তার স্থানে বসে ওজু শুরু করল। সে চেহারা তিনবার ধৌত করে বাহু চারবার ধুলে তানাফিসী বলল, আপনি তো অপচয় করেছেন। হাতেম বলল, কীভাবে অপচয় করলাম? তানাফিসী বলল, বাহু চারবার ধৌত করার মাধ্যমে। হাতেম বলল, সুবহানাল্লাহ। একমুষ্টি পানি বেশি ব্যবহার করেই অপচয়কারী হয়ে গেলাম, আর আপনি এতসব ধন-সম্পদ ভোগ করেও অপচয়কারী নন! তানাফিসী বুঝে গেলেন যে, এ ব্যক্তির শিক্ষালাভ উদ্দেশ্য নয়; বরং শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য। অতঃপর তানাফিসী ঘরে প্রবেশ করে চল্লিশ দিন পর্যন্ত কারও সাথে সাক্ষাৎ করেননি।
হিজায হয়ে মদিনায় পৌঁছলে হাতেম মদিনার আলেমদের সাথে ঝগড়া করার ইচ্ছা করল। মদিনায় প্রবেশ করে হাতেম জিজ্ঞেস করল, হে মদিনাবাসী! এটি কোন শহর? লোকেরা বলল, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর। হাতেম বলল, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাসাদ কোথায়? আমাকে তা দেখাবেন কি? যেন তাতে প্রবেশ করে দু'রাকাআত নামায পড়তে পারি। তারা বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তো কোনো প্রাসাদ ছিল না। বরং তার তো কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘর ছিল। হাতেম বলল, তাহলে তার স্ত্রী-পরিবার ও সাথি-সঙ্গীদের প্রাসাদ কোথায়? তারা বলল, তাদেরও তো কোনো প্রাসাদ ছিল না; বরং তারাও কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘরে বাস করতেন। হাতেম বলল, তাহলে তো এটা ফেরাউনের শহর। তখন লোকেরা তাকে গালমন্দ করে গভর্নরের নিকট নিয়ে যায়। তারা অভিযোগ করে বলল, এই অনারবী লোক বলে, এটা নাকি ফেরাউনের শহর। গভর্নর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এ রকম কেন বললেন? হাতেম বলল, গভর্নর সাহেব! আপনি আমার বিষয়ে তাড়াহুড়া করবেন না। আমি একজন মুসাফির লোক। আমি এ শহরে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন শহর? লোকেরা বলল, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর। আমি তাদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের প্রাসাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, তাদের তো কোনো প্রাসাদ ছিল না, তারা তো কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘরে বাস করতেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
‘নিশ্চয় আল্লাহর রাসুলের মাঝে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।’
সুতরাং আপনারা কার আদর্শ গ্রহণ করেছেন; রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাকি ফেরাউনের?
গ্রন্থকার বলেন, ওলামাদের কুৎসা ও নিন্দাকারী মূর্খ যাহেদদের জন্য আফসোস হয়; তারা অল্পজ্ঞানে তুষ্ট থেকে নফলকে ফরয মনে করে। কেননা হাতেম নামক এ যাহেদ যে বিষয়ের নিন্দা করেছে তা শরিয়তে বৈধ। আর বৈধ জিনিস গ্রহণের অনুমতি শরিয়তে বিদ্যমান। শরিয়ত কোনো বিষয়ে অনুমতি দিয়ে তার নিন্দা করে না। হায় আফসোস! মূর্খ লোকের আচরণ কত নিকৃষ্ট। সে যদি তাদেরকে বলত, সম্পদ ব্যবহারে আপনারা যদি মিতব্যয়ী হতেন, যেন মানুষ আপনাদের অনুসরণে ধন্য হয়, তাহলে তা কতই-না উত্তম হতো। এ ব্যক্তি যদি শুনত যে, সাহাবি আবদুর রহমান বিন আওফ, যোবায়ের বিন আওয়াম, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. প্রমুখ সাহাবাগণ মৃত্যুর সময় কী বিপুল সম্পদ রেখে গেছেন, তাহলে সে কী বলত বলুন তো? সাহাবি তামিম দারী একটি চাদর এক হাজার দিরহামে ক্রয় করেছেন এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে রাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন। তাই যাহেদদের ওপর ফরজ হলো প্রথমে আলেমদের থেকে শরিয়তের বিধি-বিধান শিক্ষা করা, আর যদি শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য তার না হয়, তাহলে কর্তব্য হলো এসব বিষয়ে চুপ থাকা।
মালেক বিন দিনার রহ. বলেন, শয়তান যাহেদদের নিয়ে এমনভাবে খেলা করে যেভাবে শিশুরা আখরোট নিয়ে খেলা করে থাকে। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালনাকারী এবং তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।
টিকাঃ
১. সুরা আহযাব: আয়াত ২১
যাহেদরা যেসব বিষয়ে আলেমদের কুৎসা রটায় তন্মধ্যে একটি হলো, ইলম অর্জন ও শিক্ষাদানের নিমিত্তে শক্তিবর্ধক বৈধ খাবার গ্রহণ করা। অনুরূপভাবে তারা আলেমদের সম্পদ জমা করার বিষয়েও নিন্দা করে। তারা যদি বৈধতার সংজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হতো, তাহলে বোঝত যে, শরিয়ত বৈধ কাজ সম্পাদনকারীর নিন্দা করে না। বৈধতার বিষয়ে সর্বোচ্চ এতটুকু বলা যায়, তা পরিহার করে তাকওয়ার পথ অবলম্বন করা উত্তম। আচ্ছা বলুন তো, যে সারারাত সফল পড়ছে তার জন্য কি ওই ব্যক্তির নিন্দা করা সমীচীন হবে, যে ফরজ আদায়ের পর সারারাত ঘুমিয়েছে? একটি ঘটনা দ্বারা বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। মুহাম্মাদ বিন জাফর খাওলানী বলেন, আমার নিকট হাতেম আসাম্মের শাগরেদ আবু আবদুল্লাহ খাওয়াস বলেছেন, আমরা হাতেম বলখির সাথে রায় নগরীতে প্রবেশ করি। তার সাথে তার তিনশত বিশজন শিষ্য ছিল। তারা হজের উদ্দেশ্যে তার সাথে রওয়ানা হয়েছে। তাদের গায়ে ছিল পশমি পোশাক। তাদের কাছে না ছিল খাবার না ছিল থলে। আমরা এক ধার্মিক ব্যবসায়ীর বাড়িতে যাত্রাবিরতি করলাম। ব্যবসায়ী সে রাত আমাদের মেহমানদারী করেছেন। পরদিন সকালে ব্যবসায়ী হাতেমকে বলল, হে আবু আবদুর রহমান! আমাদের এলাকার আলেম সাহেব অসুস্থ, আমি তাকে দেখতে যাচ্ছি। আপনার ইচ্ছা হলে আমার সাথে চলুন। তখন হাতেম বলল, তোমাদের আলেম যদি অসুস্থ হন তাহলে তাকে দেখতে যাওয়া তো পূণ্যের কাজ, তদুপরি আলেমের দিকে তাকানো ইবাদতও বটে। আমি তোমার সাথে যাব। অসুস্থ আলেমের নাম ছিল মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল—যিনি রায় নগরীর বিচারক ছিলেন। তখন ব্যবসায়ী বলল, আপনি আদেশ করলে আমরা রওয়ানা হতে পারি।
আলেমের শানদার বাড়ি দেখে হাতেম চিন্তিত হয়ে বলল, হায় আল্লাহ! আলেমের বাড়ির এ অবস্থা! অনুমতি পেয়ে তারা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। হাতেম তাকিয়ে দেখল বাড়িটি অত্যন্ত প্রশস্ত। তার আসবাবপত্র অত্যন্ত মূল্যবান। তার বিছানা অত্যন্ত কোমল এবং তার পর্দা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। হাতেম চিন্তিত মনে এসব দেখতে দেখতে ইবনে মুকাতিলের মজলিসে প্রবেশ করে দেখল যে, তিনি কোমল সুন্দর বিছানায় আরাম করছেন। কিছু লোক তার শিয়রে বসে বাতাস দিচ্ছে, আর কিছু লোক তার সাথে আলাপ করছে। অনুমতি পেয়ে ব্যবসায়ী বসল, কিন্তু হাতেম দাঁড়িয়ে রইল। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল ইশারায় হাতেমকে বসতে বললে হাতেম বলল, আমি বসব না। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল হাতেমকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কোনো প্রয়োজন আছে? হাতেম বলল, একটি বিষয় আপনার নিকট জানতে চাই। মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল বললেন, জিজ্ঞেস করুন। হাতেম বলল, আপনি আগে সোজা হয়ে বসুন, যেন আপনাকে জিজ্ঞেস করতে পারি। তখন মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল খাদেমদেরকে নির্দেশ দিলে তারা তাকে হেলান দিয়ে বসায়। হাতেম বলল, আপনি ইলম কোথা হতে শিখেছেন? তিনি বললেন, রাসুলের সাহাবিদের থেকে। হাতেম বলল, রাসুলের সাহাবিরা কার থেকে শিখেছেন? তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। হাতেম বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কোথা হতে পেয়েছেন? তিনি বললেন, জিবরাঈল আলাইহিস সালাম থেকে, আর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন থেকে। হাতেম বলল, আচ্ছা জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ হতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং সাহাবারা তাবেঈদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং তাবেঈরা নির্ভরযোগ্য ওলামাদের নিকট যা কিছু পৌঁছিয়েছেন এবং নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরাম আপনাদের নিকট যা পৌঁছিয়েছেন তার কোথাও কি এমন পেয়েছেন, দুনিয়াতে যার বাড়ি উত্তম হবে, যার বিছানা নরম হবে এবং যার ভোগসামগ্রী বেশি হবে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তি সর্বাধিক মর্যাদাবান হবেন?
সে উত্তরে বলল, না। হাতেম বলল, তাহলে কেমন পেয়েছেন? তিনি বললেন, বরং এভাবে পেয়েছি, যে দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতায় বিমুখ হবে, আখিরাতের বিষয়ে আগ্রহী হবে, মিসকীনদেরকে ভালোবাসবে এবং আখিরাতের জন্য সৎকাজ করবে সে হবে আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান। লাভ করবে আল্লাহর নৈকট্য। হাতেম বলল, আপনি তাহলে কার অনুসরণ করেছেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার সাহাবায়ে কেরাম, তাদের অনুসারী তাবেঈগণ ও তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণকারী নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরামের, নাকি ফেরাউন ও নমরুদের? কেননা তারাই প্রথম মানুষ যারা সিমেন্ট-বালি ও চুনা-সুরকি দিয়ে ইমারত নির্মাণ করেছেন। হে নিকৃষ্ট আলেমের দল, দুনিয়াদার মূর্খ মানবজাতি যারা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতায় কুকুরের ন্যায় লালায়িত, তারা যদি তোমাদের হালত দেখে তাহলে মনে সংকল্প করবে যে, এরূপ যদি হয় আলেমদের বিলাসিতা তাহলে তো আমাকে আরও বিলাসী হতে হবে। হাতেম এসব কথা বলে তার দরবার থেকে চলে আসে। হাতেমের কথা শুনে মুহাম্মাদ বিন মুকাতিলের অসুস্থতা বেড়ে যায়।
হাতেম ও মুহাম্মাদ বিন মুকাতিলের মাঝে চলমান আলোচনা রায় নগরীতে ছড়িয়ে পড়লে নগরবাসী হাতেমকে বলল, কাযবিনের বিখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী তো তার চেয়ে অধিক ধন সম্পদের মালিক। তখন হাতেম তার সাক্ষাতে গিয়ে দেখেন, তিনি এক মজলিসে হাদিস বর্ণনা করছেন, আর লোকেরা মনোযোগের সহিত তার হাদিস শ্রবণ করছে। হাতেম মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসীকে বলল, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন', আমি একজন অনারবী লোক, দীনের প্রাথমিক শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে আমি আপনার নিকট এসেছি। আপনি কি আমাকে ওজু করার পদ্ধতি শিখাবেন? মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি এক খাদেমকে পানি আনার নির্দেশ দিলে খাদেম পানি উপস্থিত করে। তখন মুহাম্মাদ বিন ওবাইদ তানাফিসী বসে ওজু করলেন এবং প্রতিটি অঙ্গ তিনবার করে ধৌত করলেন। অতঃপর বললেন, ওজু এভাবে করতে হয়। হাতেম বলল, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। দয়া করে আপনার স্থানে বসে আমাকে অজু করার সুযোগ দিন, যেন আমার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন অধিক সহজতর হয়। তানাফিসী ওঠে দাঁড়ালে হাতেম তার স্থানে বসে ওজু শুরু করল। সে চেহারা তিনবার ধৌত করে বাহু চারবার ধুলে তানাফিসী বলল, আপনি তো অপচয় করেছেন। হাতেম বলল, কীভাবে অপচয় করলাম? তানাফিসী বলল, বাহু চারবার ধৌত করার মাধ্যমে। হাতেম বলল, সুবহানাল্লাহ। একমুষ্টি পানি বেশি ব্যবহার করেই অপচয়কারী হয়ে গেলাম, আর আপনি এতসব ধন-সম্পদ ভোগ করেও অপচয়কারী নন! তানাফিসী বুঝে গেলেন যে, এ ব্যক্তির শিক্ষালাভ উদ্দেশ্য নয়; বরং শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য। অতঃপর তানাফিসী ঘরে প্রবেশ করে চল্লিশ দিন পর্যন্ত কারও সাথে সাক্ষাৎ করেননি।
হিজায হয়ে মদিনায় পৌঁছলে হাতেম মদিনার আলেমদের সাথে ঝগড়া করার ইচ্ছা করল। মদিনায় প্রবেশ করে হাতেম জিজ্ঞেস করল, হে মদিনাবাসী! এটি কোন শহর? লোকেরা বলল, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর। হাতেম বলল, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাসাদ কোথায়? আমাকে তা দেখাবেন কি? যেন তাতে প্রবেশ করে দু'রাকাআত নামায পড়তে পারি। তারা বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তো কোনো প্রাসাদ ছিল না। বরং তার তো কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘর ছিল। হাতেম বলল, তাহলে তার স্ত্রী-পরিবার ও সাথি-সঙ্গীদের প্রাসাদ কোথায়? তারা বলল, তাদেরও তো কোনো প্রাসাদ ছিল না; বরং তারাও কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘরে বাস করতেন। হাতেম বলল, তাহলে তো এটা ফেরাউনের শহর। তখন লোকেরা তাকে গালমন্দ করে গভর্নরের নিকট নিয়ে যায়। তারা অভিযোগ করে বলল, এই অনারবী লোক বলে, এটা নাকি ফেরাউনের শহর। গভর্নর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এ রকম কেন বললেন? হাতেম বলল, গভর্নর সাহেব! আপনি আমার বিষয়ে তাড়াহুড়া করবেন না। আমি একজন মুসাফির লোক। আমি এ শহরে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন শহর? লোকেরা বলল, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর। আমি তাদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের প্রাসাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, তাদের তো কোনো প্রাসাদ ছিল না, তারা তো কাদামাটির প্রলেপযুক্ত সাধারণ ঘরে বাস করতেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
‘নিশ্চয় আল্লাহর রাসুলের মাঝে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।’
সুতরাং আপনারা কার আদর্শ গ্রহণ করেছেন; রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাকি ফেরাউনের?
গ্রন্থকার বলেন, ওলামাদের কুৎসা ও নিন্দাকারী মূর্খ যাহেদদের জন্য আফসোস হয়; তারা অল্পজ্ঞানে তুষ্ট থেকে নফলকে ফরয মনে করে। কেননা হাতেম নামক এ যাহেদ যে বিষয়ের নিন্দা করেছে তা শরিয়তে বৈধ। আর বৈধ জিনিস গ্রহণের অনুমতি শরিয়তে বিদ্যমান। শরিয়ত কোনো বিষয়ে অনুমতি দিয়ে তার নিন্দা করে না। হায় আফসোস! মূর্খ লোকের আচরণ কত নিকৃষ্ট। সে যদি তাদেরকে বলত, সম্পদ ব্যবহারে আপনারা যদি মিতব্যয়ী হতেন, যেন মানুষ আপনাদের অনুসরণে ধন্য হয়, তাহলে তা কতই-না উত্তম হতো। এ ব্যক্তি যদি শুনত যে, সাহাবি আবদুর রহমান বিন আওফ, যোবায়ের বিন আওয়াম, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. প্রমুখ সাহাবাগণ মৃত্যুর সময় কী বিপুল সম্পদ রেখে গেছেন, তাহলে সে কী বলত বলুন তো? সাহাবি তামিম দারী একটি চাদর এক হাজার দিরহামে ক্রয় করেছেন এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে রাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন। তাই যাহেদদের ওপর ফরজ হলো প্রথমে আলেমদের থেকে শরিয়তের বিধি-বিধান শিক্ষা করা, আর যদি শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য তার না হয়, তাহলে কর্তব্য হলো এসব বিষয়ে চুপ থাকা।
মালেক বিন দিনার রহ. বলেন, শয়তান যাহেদদের নিয়ে এমনভাবে খেলা করে যেভাবে শিশুরা আখরোট নিয়ে খেলা করে থাকে। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালনাকারী এবং তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।
টিকাঃ
১. সুরা আহযাব: আয়াত ২১