📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সংসারবিরাগীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 সংসারবিরাগীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


শয়তান সংসারবিরাগীদেরকে ধোঁকায় ফেলার আরেক পদ্ধতি হলো, সে তাদেরকে দুনিয়াবিমুখতায় লিপ্ত রেখে ইলম অর্জন থেকে বিরত রাখে, ফলে সে উৎকৃষ্টের বিনিময়ে সাধারণকে গ্রহণ করে। ইলম অর্জনে লিপ্ত হওয়া দুনিয়াবিমুখতায় লিপ্ত হওয়ার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ার দলীল হলো জাহেদের ইবাদতের উপকারিতা ইবাদতখানার চৌকাঠও অতিক্রম করে না। আর আলেমের ইলমের উপকারিতা সংক্রমণশীল; সে উপকারিতা ছড়িয়ে পরে বিশ্বময়। এতে পথহারা মানুষ খুঁজে পায় পথের সন্ধান, অজ্ঞ ব্যক্তি লাভ করে শরিয়তের জ্ঞান-বিধি-বিধান, অনন্তকাল এ সবের সাওয়াব ও প্রতিদান তার আমলনামায় যোগ হতে থাকে।

শয়তান সংসারবিরাগীদেরকে ধোঁকায় ফেলার আরেক পদ্ধতি হলো, সে তাদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল করে যে, দুনিয়াবিমুখতার নিদর্শন হলো বৈধ ভোগসামগ্রী বর্জন করা। ফলে অনেকে ফলের স্বাদ গ্রহণ থেকে নিজেকে বিরত রাখে। আর কেউ কেউ খুবই অল্প আহার করেন, ফলে ক্রমান্বয়ে তাদের দেহ শুকিয়ে যায়। কেউ আবার পশমি পোশাক পরিধান করে নিজেকে কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন করেন। আবার কেউ শীতল পানি একেবারেই পান করেন না।

এদের খুব ভালো করে জেনে রাখা উচিত, তাদের এমন কর্মকাণ্ডের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ কারোই মিল নেই। বস্তুত তাঁদের সামনে যদি খাদ্য উপস্থিত হতো, যা পেতেন তা ভক্ষণ করে ক্ষুধার যন্ত্রণা লাঘব করতেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো গোস্ত খেতেন এবং তা পছন্দ করতেন। তিনি মুরগির গোস্ত খেতেন এবং রানের গোস্ত পছন্দ করতেন। তার জন্য সুমিষ্ট পানি সংগ্রহ করা হতো, তবে তিনি বাসি পানি পছন্দ করতেন, কেননা প্রবহমান তাজা পানি পাকস্থলিকে পীড়া দেয় এবং পানির তৃষ্ণা নিবারণে তা ভালো ভূমিকা পালন করে না।

হাসান বসরি রহ.-এর যুগে এক ব্যক্তি বলত, আমি খাবিস (খেজুর ও ঘি-মিশ্রিত একপ্রকার মিষ্টিদ্রব্য) খাব না, কেননা তার কৃতজ্ঞতা আদায় আমার দ্বারা সম্ভব নয়। একথা শুনে হাসান বসরি রহ. বললেন, এ-তো এক নির্বোধ লোক। খাবিস তো দূরের কথা, সে তো ঠান্ডা পানির কৃতজ্ঞতাও আদায় করে শেষ করতে পারবে না। পূর্ববর্তী মনীষীরা এলাকায় অবস্থানকালে এবং সফর-ভ্রমণেও উন্নতমানের খাবার খেতেন। বিখ্যাত বুযুর্গ সুফিয়ান সাওরি যখন সফর করতেন, সফরের খাবার হিসাবে ভুনা গোস্ত ও ফালুদা সাথে নিতেন।

জেনে রাখা কর্তব্য—আখিরাত নামক গন্তব্যে পৌঁছার জন্য দেহ হচ্ছে তার একমাত্র বাহন, সুতরাং তার সাথে কোমলতা প্রদর্শন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, যেন তার মাধ্যমে উদ্দিষ্ট গন্তব্যে শান্তি-নিরাপত্তার সাথে পৌঁছা যায়। তাই দেহের খোরাক হিসেবে উপকারী খাবার গ্রহণ করা এবং দেহের জন্য ক্ষতিকর সব ধরনের খাবার বর্জন করা দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের জন্য কল্যাণকর হিসেবে বিবেচ্য। অবশ্য মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি বিভিন্ন রকম। তাই আরব বেদুইনরা পশমি পোশাক পরিধান করে এবং খাদ্য হিসাবে দুধপানের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে। তাই বলে আমরা তাদের নিন্দা করতে পারি না। কেননা তাদের দেহ-মন তা ধারণ করতে সক্ষম।

অনুরূপভাবে আরব গ্রামবাসী যদি পশমি পোশাক পরিধান করে এবং শুধু আচারকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে তাহলে আমরা তাদের নিন্দা করতে পারি না এবং তাদের ব্যাপারে এক কথা বলতে পারি না। কেননা অভ্যাসবশতই তারা এমন খাচ্ছে ও পরছে।

এদিকে দেহ যদি বিলাসিতাপূর্ণ হয়, যা প্রতিপালিত হয়েছে বিলাসিতার ওপর তাহলে সেই ব্যক্তির ওপর কষ্টদায়ক বিষয় চাপিয়ে দেয়া যাবে না। যদি সে কাম-বস্তু গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করে প্রবৃত্তির চাহিদা বর্জনকে এ ভেবে প্রাধান্য দেয় যে, হালাল বস্তু গ্রহণের ক্ষেত্রে অপচয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যা শরিয়তে বৈধ নয়; কিংবা সুস্বাদু খাবার উদর পূর্ণ করে খেতে বাধ্য করে, শরিয়তে যা প্রশংসিত নয়। কেননা উদর পূর্ণ করে খাদ্যগ্রহণে ঘুমের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং অলসতা বাড়তে থাকে। সুতরাং কোন খাবার বর্জন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর আর কোনটি বর্জন ক্ষতিকর নয়—এটা আগে জানতে হবে। যে ধরনের খাদ্য হতে নিজেকে বিরত রাখা স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর তা থেকে ওই পরিমাণ গ্রহণ করবে যা দ্বারা দেহ সবল থাকে। তবে এত অধিক গ্রহণ করা যাবে না যা সুস্থতার পরিবর্তে অসুস্থতা বয়ে আনে।

গ্রন্থকার বলেন, কেউ কেউ মনে করে, প্রয়োজন পরিমাণ খাদ্য হিসাবে তরকারিবিহীন শুকনো রুটিই যথেষ্ট, তবে এর ওপর সীমাবদ্ধ থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কেননা মানুষের দেহরস টক-মিষ্টি, ঠান্ডা-গরম, তরলতা ও কঠিনতার মুখাপেক্ষী এবং মানুষের দেহ সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে এগুলো এক একটি বিশেষ উপাদান। যেমন- যদি কারও কফ শুকিয়ে যায় তাহলে দেহ দুধ পানের মুখাপেক্ষী হবে। কেননা দেহ-মন সবল রাখতে কফের অবদান অপরিসীম। আর কারও পিত্ত বেড়ে গেলে দেহ টকের চাহিদা অনুভব করবে। সুতরাং দেহ সবল থাকতে মানুষের দেহরস ওইসব খাবারের মুখাপেক্ষী। যদি এসব খাবার গ্রহণে কেউ নিজেকে বিরত রাখে তাহলে দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অবশ্য উদর পূর্ণ করে তৃপ্তিসহকারে খাদ্যগ্রহণ, লোভ-লালসার বশীভূত হয়ে বিনা প্রয়োজনে খাবার আস্বাদন এবং যে খাদ্যগ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তা থেকে নিজেকে বিরত রাখার বিষয়টি ভিন্ন। তবে শুধু শুকনো রুটিকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে বাকি সব ধরনের খাবার থেকে নিজেকে বিরত রাখা অনুচিত। তবে সাবধান! হারেস মুহাসেবি ও আবু তালেব মক্কির ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে তার অনুসরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখুন। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের জীবনাচারই আমাদের আদর্শ।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ২/১৯

শয়তান সংসারবিরাগীদেরকে ধোঁকায় ফেলার আরেক পদ্ধতি হলো, সে তাদেরকে দুনিয়াবিমুখতায় লিপ্ত রেখে ইলম অর্জন থেকে বিরত রাখে, ফলে সে উৎকৃষ্টের বিনিময়ে সাধারণকে গ্রহণ করে। ইলম অর্জনে লিপ্ত হওয়া দুনিয়াবিমুখতায় লিপ্ত হওয়ার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ার দলীল হলো জাহেদের ইবাদতের উপকারিতা ইবাদতখানার চৌকাঠও অতিক্রম করে না। আর আলেমের ইলমের উপকারিতা সংক্রমণশীল; সে উপকারিতা ছড়িয়ে পরে বিশ্বময়। এতে পথহারা মানুষ খুঁজে পায় পথের সন্ধান, অজ্ঞ ব্যক্তি লাভ করে শরিয়তের জ্ঞান-বিধি-বিধান, অনন্তকাল এ সবের সাওয়াব ও প্রতিদান তার আমলনামায় যোগ হতে থাকে।

শয়তান সংসারবিরাগীদেরকে ধোঁকায় ফেলার আরেক পদ্ধতি হলো, সে তাদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল করে যে, দুনিয়াবিমুখতার নিদর্শন হলো বৈধ ভোগসামগ্রী বর্জন করা। ফলে অনেকে ফলের স্বাদ গ্রহণ থেকে নিজেকে বিরত রাখে। আর কেউ কেউ খুবই অল্প আহার করেন, ফলে ক্রমান্বয়ে তাদের দেহ শুকিয়ে যায়। কেউ আবার পশমি পোশাক পরিধান করে নিজেকে কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন করেন। আবার কেউ শীতল পানি একেবারেই পান করেন না।

এদের খুব ভালো করে জেনে রাখা উচিত, তাদের এমন কর্মকাণ্ডের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ কারোই মিল নেই। বস্তুত তাঁদের সামনে যদি খাদ্য উপস্থিত হতো, যা পেতেন তা ভক্ষণ করে ক্ষুধার যন্ত্রণা লাঘব করতেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো গোস্ত খেতেন এবং তা পছন্দ করতেন। তিনি মুরগির গোস্ত খেতেন এবং রানের গোস্ত পছন্দ করতেন। তার জন্য সুমিষ্ট পানি সংগ্রহ করা হতো, তবে তিনি বাসি পানি পছন্দ করতেন, কেননা প্রবহমান তাজা পানি পাকস্থলিকে পীড়া দেয় এবং পানির তৃষ্ণা নিবারণে তা ভালো ভূমিকা পালন করে না।

হাসান বসরি রহ.-এর যুগে এক ব্যক্তি বলত, আমি খাবিস (খেজুর ও ঘি-মিশ্রিত একপ্রকার মিষ্টিদ্রব্য) খাব না, কেননা তার কৃতজ্ঞতা আদায় আমার দ্বারা সম্ভব নয়। একথা শুনে হাসান বসরি রহ. বললেন, এ-তো এক নির্বোধ লোক। খাবিস তো দূরের কথা, সে তো ঠান্ডা পানির কৃতজ্ঞতাও আদায় করে শেষ করতে পারবে না। পূর্ববর্তী মনীষীরা এলাকায় অবস্থানকালে এবং সফর-ভ্রমণেও উন্নতমানের খাবার খেতেন। বিখ্যাত বুযুর্গ সুফিয়ান সাওরি যখন সফর করতেন, সফরের খাবার হিসাবে ভুনা গোস্ত ও ফালুদা সাথে নিতেন।

জেনে রাখা কর্তব্য—আখিরাত নামক গন্তব্যে পৌঁছার জন্য দেহ হচ্ছে তার একমাত্র বাহন, সুতরাং তার সাথে কোমলতা প্রদর্শন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, যেন তার মাধ্যমে উদ্দিষ্ট গন্তব্যে শান্তি-নিরাপত্তার সাথে পৌঁছা যায়। তাই দেহের খোরাক হিসেবে উপকারী খাবার গ্রহণ করা এবং দেহের জন্য ক্ষতিকর সব ধরনের খাবার বর্জন করা দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের জন্য কল্যাণকর হিসেবে বিবেচ্য। অবশ্য মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি বিভিন্ন রকম। তাই আরব বেদুইনরা পশমি পোশাক পরিধান করে এবং খাদ্য হিসাবে দুধপানের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে। তাই বলে আমরা তাদের নিন্দা করতে পারি না। কেননা তাদের দেহ-মন তা ধারণ করতে সক্ষম।

অনুরূপভাবে আরব গ্রামবাসী যদি পশমি পোশাক পরিধান করে এবং শুধু আচারকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে তাহলে আমরা তাদের নিন্দা করতে পারি না এবং তাদের ব্যাপারে এক কথা বলতে পারি না। কেননা অভ্যাসবশতই তারা এমন খাচ্ছে ও পরছে।

এদিকে দেহ যদি বিলাসিতাপূর্ণ হয়, যা প্রতিপালিত হয়েছে বিলাসিতার ওপর তাহলে সেই ব্যক্তির ওপর কষ্টদায়ক বিষয় চাপিয়ে দেয়া যাবে না। যদি সে কাম-বস্তু গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করে প্রবৃত্তির চাহিদা বর্জনকে এ ভেবে প্রাধান্য দেয় যে, হালাল বস্তু গ্রহণের ক্ষেত্রে অপচয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যা শরিয়তে বৈধ নয়; কিংবা সুস্বাদু খাবার উদর পূর্ণ করে খেতে বাধ্য করে, শরিয়তে যা প্রশংসিত নয়। কেননা উদর পূর্ণ করে খাদ্যগ্রহণে ঘুমের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং অলসতা বাড়তে থাকে। সুতরাং কোন খাবার বর্জন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর আর কোনটি বর্জন ক্ষতিকর নয়—এটা আগে জানতে হবে। যে ধরনের খাদ্য হতে নিজেকে বিরত রাখা স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর তা থেকে ওই পরিমাণ গ্রহণ করবে যা দ্বারা দেহ সবল থাকে। তবে এত অধিক গ্রহণ করা যাবে না যা সুস্থতার পরিবর্তে অসুস্থতা বয়ে আনে।

গ্রন্থকার বলেন, কেউ কেউ মনে করে, প্রয়োজন পরিমাণ খাদ্য হিসাবে তরকারিবিহীন শুকনো রুটিই যথেষ্ট, তবে এর ওপর সীমাবদ্ধ থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কেননা মানুষের দেহরস টক-মিষ্টি, ঠান্ডা-গরম, তরলতা ও কঠিনতার মুখাপেক্ষী এবং মানুষের দেহ সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে এগুলো এক একটি বিশেষ উপাদান। যেমন- যদি কারও কফ শুকিয়ে যায় তাহলে দেহ দুধ পানের মুখাপেক্ষী হবে। কেননা দেহ-মন সবল রাখতে কফের অবদান অপরিসীম। আর কারও পিত্ত বেড়ে গেলে দেহ টকের চাহিদা অনুভব করবে। সুতরাং দেহ সবল থাকতে মানুষের দেহরস ওইসব খাবারের মুখাপেক্ষী। যদি এসব খাবার গ্রহণে কেউ নিজেকে বিরত রাখে তাহলে দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অবশ্য উদর পূর্ণ করে তৃপ্তিসহকারে খাদ্যগ্রহণ, লোভ-লালসার বশীভূত হয়ে বিনা প্রয়োজনে খাবার আস্বাদন এবং যে খাদ্যগ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তা থেকে নিজেকে বিরত রাখার বিষয়টি ভিন্ন। তবে শুধু শুকনো রুটিকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে বাকি সব ধরনের খাবার থেকে নিজেকে বিরত রাখা অনুচিত। তবে সাবধান! হারেস মুহাসেবি ও আবু তালেব মক্কির ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে তার অনুসরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখুন। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের জীবনাচারই আমাদের আদর্শ।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ২/১৯

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ইবাদতকারীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 ইবাদতকারীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


শয়তান মানুষকে গোপন রিয়ার মাধ্যমে তার চক্রান্তের জালে বন্দি করে। যেমন—দেহের জীর্ণতা ও চেহারার হরিদ্রাবর্ণ প্রকাশ করা এবং চুল এলোমেলো রাখা, যেন মানুষ মনে করে যে, এ ব্যক্তি যাহেদ তথা দুনিয়াবিমুখ। অনুরূপভাবে বিনয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে ছোট শব্দে কথা বলা, লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে নামায পড়া ও সদকা করা—এ সবগুলোই প্রকাশ্য রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। যা কারও নিকট অস্পষ্ট নয়। আমাদের আলোচনা হচ্ছে গোপন রিয়ার বিষয়ে। যে দিকে ইঙ্গিত করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
‘আমলের প্রতিদান নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল।"

সুতরাং আমলের উদ্দেশ্য যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন না হয়, তাহলে আল্লাহর নিকট তা গ্রহণযোগ্য হয় না। মালেক বিন দিনার রহ. বলেন, ইবাদত-বন্দেগিতে যার উদ্দেশ্য সৎ নয় তাকে বলে দাও, অযথা পরিশ্রম করে দেহ ক্লান্ত কোরো না।

জেনে রাখুন! মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই আমল করে। তবে ইবাদতকালে গোপন রিয়া তার অন্তরে প্রবেশ করে ইখলাস নষ্ট করে দেয়। এ গোপন রিয়া থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দুষ্কর। ইয়াসার বলেন, আমাকে ইউসুফ বিন আসবাত বলেন, তোমরা অসুস্থ আমল পরিহার করে সুস্থ আমল শিখ, কেননা বাইশ বছর সাধনা করে আমি তা শিখেছি।

ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. বলেন, আমি সুময়ান নামক জনৈক সংসারত্যাগী থেকে মারেফত শিখেছি। আমি একদিন তার গির্জায় প্রবেশ করে বললাম, হে সুময়ান, আপনি কতদিন যাবৎ এ গির্জায় অবস্থান করছেন? তিনি বললেন, সত্তর বছর যাবৎ। আমি বললাম, আপনার খাবার কী? তিনি বললেন, হে একনিষ্ঠ বন্ধু, কী প্রয়োজনে তুমি তা জানতে চাচ্ছ। আমি বললাম, আমার জানতে মন চায়। তিনি বললেন, প্রতিরাতে একটি মটরশুঁটি। আমি বললাম, খাদ্য হিসাবে এক মটরশুঁটির ওপর সীমাবদ্ধ থাকতে কোন জিনিস আপনাকে প্ররোচিত করল? তিনি বললেন, তুমি কি সামনে কাউকে দেখেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এরা বছরে একদিন আমার নিকট এসে আমার গির্জা সজ্জিত করে তার চতুষ্পার্শ্ব তাওয়াফ করে খাদ্য হিসাবে দিনে একটি মটরশুঁটির ওপর তুষ্ট থাকার কারণে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। ইবাদতে আমার দেহ যখন ক্লান্ত হয় তখন মনকে আমার সম্মানজনক এ মুহূর্তের কথা স্মরণ করালে দেহের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আমি একদিনের সম্মান লাভের জন্য এক বছরের কষ্ট সহ্য করি। সুতরাং হে আমার একনিষ্ঠ বন্ধু, তুমি চিরকালের শান্তি লাভের জন্য কিছু দিনের কষ্ট সহ্য করো। ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. বলেন, রাহেবের এ কথা শুনে আমার অন্তরে মারেফত বদ্ধমূল হয়। তিনি বললেন, আমি কি আরও কিছু তোমাকে বলব? আমি বললাম, হ্যাঁ, বলুন। তিনি বললেন, তুমি গির্জা থেকে নিচে অবতরণ করো। আমি তখন গির্জা থেকে নেমে এলে তিনি একটি ছোট বালতি আমার দিকে নামিয়ে দেন। পরে আমি গির্জায় প্রবেশ করলে তারা আমার চারপাশে সমাবেত হয়ে বলল, হে বন্ধু, শায়খ তোমাকে কী দিয়েছেন? আমি বললাম, তার দৈনিক খাবারের কিছু অংশ আমাকে দিয়েছেন। তারা বলল, তুমি তা দিয়ে কী করবে? আমরাই তার বেশি হক্বদার। তুমি মূল্য নির্ধারণ করো, আমরা তা কিনে নেব। আমি বললাম, বিশ দিনারের বিনিময়ে আমি তা বিক্রি করতে পারি। তখন বিশ দিনার দিয়ে তারা আমার থেকে তা কিনে নেয়। আমি তখন রাহেবের নিকট ফিরে গেলে তিনি আমাকে বললেন, তুমি ভুল করেছ। তুমি তার মূল্য বিশ হাজার দিনার বললেও এ দামে তা বিক্রি করতে পারতে।

এটা এমন ব্যক্তির মর্যাদা—যে তার ইবাদত করে না। তাহলে ভেবে দেখো, তুমি যার ইবাদত করছ তার কাছে তুমি কেমন মর্যাদাবান হিসেবে বিবেচিত হবে।

গ্রন্থকার বলেন, রিয়ার ভয়ে সৎ লোকেরা আমল গোপন করতেন। ইবনে সিরিন দিনে হাসতেন আর রাতে কাঁদতেন। ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. যখন অসুস্থ হতেন, তখন তার নিকট এমন খাবার দেখা যেত যা সুস্থ লোকেরা ভক্ষণ করে।

ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, এক ব্যক্তি তার যুগের শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ ছিলেন। লোকেরা তার সাক্ষাতে এলে তিনি তাদেরকে বিভিন্ন নসিহতমূলক কথাবার্তা বলতেন। একদিন বহুসংখ্যক লোক তার নিকট সমাবেত হলে তিনি তাদেরকে বললেন, আমরা স্বেচ্ছাচারিতার ভয়ে দুনিয়ার বেড়াজাল থেকে বের হয়েছি এবং পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ থেকে পৃথক হয়েছি। কিন্তু এখন আমার আশঙ্কা হচ্ছে, দুনিয়াদাররা ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে যেমন স্বেচ্ছাচারী হয় তার চেয়ে অধিক স্বেচ্ছাচারিতা আমাদের মাঝে প্রবেশ করেছে। কেননা আমি দেখছি, আমাদের প্রত্যেকেই নিজ প্রয়োজন পূরণ হওয়া এবং দ্বীনদারিতে প্রসিদ্ধ হওয়ার দরুন পণ্য ক্রয়ের সময় বিক্রেতার ঘনিষ্ঠ হওয়া পছন্দ করে। কারও সাথে সাক্ষাৎ করলে কেউ তার সাক্ষাতে এলে তার থেকে অভিবাদন পাওয়ার আশা করে এবং দ্বীনদারির উঁচু মাকাম অর্জিত হওয়ায় নিজেকে সম্মানিত মনে করে। তার এ নসিহত চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। একর্যায়ে বাদশাহর কানে তা পৌঁছলে বাদশাহ অত্যন্ত মুগ্ধ হন। তাকে সালাম দিয়ে এক পলক দেখার উদ্দেশ্যে বাদশাহ বাহনে আরোহণ করে তার দরবারে পৌঁছলে এক লোক তাকে বলল, আপনাকে সালাম দেয়ার উদ্দেশ্যে বাদশাহ আপনার নিকট এসেছেন। তিনি বললেন, সালাম দেয়ার পর বাদশাহ কী করবেন? সে বলল, যে নসিহত আপনি করেছেন তা আপনার জবান থেকে শ্রবণ করবেন। তিনি তখন খাদেমকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কোনো খাবার আছে? সে বলল, আপনি গাছের যে ফল দিয়ে ইফতার করতেন তা থেকে কিছু ফল আছে। তিনি ফল উপস্থিত করার নির্দেশ দিলে খাদেম তা উপস্থিত করে তার সামনে পেশ করলে তিনি তা থেকে ভক্ষণ করা শুরু করেন। অথচ তিনি ছিলেন রোযাদার এবং সর্বদা রোযা রাখা ছিল তার অভ্যাস।

এমন সময়ে বাদশাহ তার দরজায় উপস্থিত হয়ে তাকে সালাম দিলে তিনি ছোট্ট শব্দে সালামের উত্তর দেন। বাদশাহ তাকে ফল খেতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, লোকটি কোথায়? লোকেরা বলল, ইনিই সেই ব্যক্তি। বাহশাহ বললেন, যাকে খেতে দেখছি ইনি কী সেই ব্যক্তি? লোকেরা বলল, হ্যাঁ। বাদশাহ বললেন, তাহলে তো এর মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। অতঃপর বাদশাহ তার কাছ থেকে প্রস্থান করে রাজভবনে ফিরে আসেন। বাদশাহ চলে আসার পর লোকটি বলল, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমার কাছ থেকে তোমাকে নিরাশ করে ফিরিয়ে নিয়েছেন।

উপরোক্ত ঘটনাটি ভিন্ন রেওয়ায়েতে এভাবে এসেছে: ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, বাদশাহ আগমন করলে লোকটি খাবার উপস্থিত করে শাক-সবজি দিয়ে এক বড় লোকমা তৈয়ার করে তেলের ভিতর তা চুবিয়ে জোর খাটিয়ে খাওয়া শুরু করলে বাদশাহ বললেন, হে লোক, তুমি কেমন বলো তো! সে বলল, আমি সাধারণ মানুষের মতোই, আমার বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। বাদশাহ তখন ঘোড়ার লাগام ঘুরিয়ে বললেন, এর মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। বাদশাহ চলে আসার পর লোকটি বলল, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাকে আমার সম্পর্কে তিরস্কার করে এখান থেকে ফিরিয়ে নিয়েছেন।

আতা বলেন, ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেক ইয়াযিদ বিন মারসাদকে গভর্নরের দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন। ইয়াযিদের নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি একটি পশমযুক্ত চামড়া গায়ে জড়ালেন। চামড়াটির পশমমুক্ত অংশ ছিল গায়ের সাথে, আর পশমযুক্ত অংশ ছিল দেহের বহিরাংশে। অতঃপর হাতে এক টুকরো রুটি ও গোস্তবিহীন হাড় নিয়ে চাদর, টুপি, জুতা ও মোজা পরিধান করা ব্যতীত বাজারে হেঁটে হেঁটে তা খেতে লাগলেন। তখন ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেককে বলা হলো, ইয়াযিদ বিন মারসাদের বিবেক তো বিগড়ে গেছে। অতঃপর ইয়াযিদের আচরণ তার সামনে বললে তাকে গভর্নর নিযুক্ত করার চিন্তা বাদ দেন। এমন অনেক ঘটনার কথা ইতিহাসে লেখা আছে।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৯০৭

শয়তান মানুষকে গোপন রিয়ার মাধ্যমে তার চক্রান্তের জালে বন্দি করে। যেমন—দেহের জীর্ণতা ও চেহারার হরিদ্রাবর্ণ প্রকাশ করা এবং চুল এলোমেলো রাখা, যেন মানুষ মনে করে যে, এ ব্যক্তি যাহেদ তথা দুনিয়াবিমুখ। অনুরূপভাবে বিনয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে ছোট শব্দে কথা বলা, লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে নামায পড়া ও সদকা করা—এ সবগুলোই প্রকাশ্য রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। যা কারও নিকট অস্পষ্ট নয়। আমাদের আলোচনা হচ্ছে গোপন রিয়ার বিষয়ে। যে দিকে ইঙ্গিত করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
‘আমলের প্রতিদান নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল।"

সুতরাং আমলের উদ্দেশ্য যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন না হয়, তাহলে আল্লাহর নিকট তা গ্রহণযোগ্য হয় না। মালেক বিন দিনার রহ. বলেন, ইবাদত-বন্দেগিতে যার উদ্দেশ্য সৎ নয় তাকে বলে দাও, অযথা পরিশ্রম করে দেহ ক্লান্ত কোরো না।

জেনে রাখুন! মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই আমল করে। তবে ইবাদতকালে গোপন রিয়া তার অন্তরে প্রবেশ করে ইখলাস নষ্ট করে দেয়। এ গোপন রিয়া থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দুষ্কর। ইয়াসার বলেন, আমাকে ইউসুফ বিন আসবাত বলেন, তোমরা অসুস্থ আমল পরিহার করে সুস্থ আমল শিখ, কেননা বাইশ বছর সাধনা করে আমি তা শিখেছি।

ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. বলেন, আমি সুময়ান নামক জনৈক সংসারত্যাগী থেকে মারেফত শিখেছি। আমি একদিন তার গির্জায় প্রবেশ করে বললাম, হে সুময়ান, আপনি কতদিন যাবৎ এ গির্জায় অবস্থান করছেন? তিনি বললেন, সত্তর বছর যাবৎ। আমি বললাম, আপনার খাবার কী? তিনি বললেন, হে একনিষ্ঠ বন্ধু, কী প্রয়োজনে তুমি তা জানতে চাচ্ছ। আমি বললাম, আমার জানতে মন চায়। তিনি বললেন, প্রতিরাতে একটি মটরশুঁটি। আমি বললাম, খাদ্য হিসাবে এক মটরশুঁটির ওপর সীমাবদ্ধ থাকতে কোন জিনিস আপনাকে প্ররোচিত করল? তিনি বললেন, তুমি কি সামনে কাউকে দেখেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এরা বছরে একদিন আমার নিকট এসে আমার গির্জা সজ্জিত করে তার চতুষ্পার্শ্ব তাওয়াফ করে খাদ্য হিসাবে দিনে একটি মটরশুঁটির ওপর তুষ্ট থাকার কারণে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। ইবাদতে আমার দেহ যখন ক্লান্ত হয় তখন মনকে আমার সম্মানজনক এ মুহূর্তের কথা স্মরণ করালে দেহের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আমি একদিনের সম্মান লাভের জন্য এক বছরের কষ্ট সহ্য করি। সুতরাং হে আমার একনিষ্ঠ বন্ধু, তুমি চিরকালের শান্তি লাভের জন্য কিছু দিনের কষ্ট সহ্য করো। ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. বলেন, রাহেবের এ কথা শুনে আমার অন্তরে মারেফত বদ্ধমূল হয়। তিনি বললেন, আমি কি আরও কিছু তোমাকে বলব? আমি বললাম, হ্যাঁ, বলুন। তিনি বললেন, তুমি গির্জা থেকে নিচে অবতরণ করো। আমি তখন গির্জা থেকে নেমে এলে তিনি একটি ছোট বালতি আমার দিকে নামিয়ে দেন। পরে আমি গির্জায় প্রবেশ করলে তারা আমার চারপাশে সমাবেত হয়ে বলল, হে বন্ধু, শায়খ তোমাকে কী দিয়েছেন? আমি বললাম, তার দৈনিক খাবারের কিছু অংশ আমাকে দিয়েছেন। তারা বলল, তুমি তা দিয়ে কী করবে? আমরাই তার বেশি হক্বদার। তুমি মূল্য নির্ধারণ করো, আমরা তা কিনে নেব। আমি বললাম, বিশ দিনারের বিনিময়ে আমি তা বিক্রি করতে পারি। তখন বিশ দিনার দিয়ে তারা আমার থেকে তা কিনে নেয়। আমি তখন রাহেবের নিকট ফিরে গেলে তিনি আমাকে বললেন, তুমি ভুল করেছ। তুমি তার মূল্য বিশ হাজার দিনার বললেও এ দামে তা বিক্রি করতে পারতে।

এটা এমন ব্যক্তির মর্যাদা—যে তার ইবাদত করে না। তাহলে ভেবে দেখো, তুমি যার ইবাদত করছ তার কাছে তুমি কেমন মর্যাদাবান হিসেবে বিবেচিত হবে।

গ্রন্থকার বলেন, রিয়ার ভয়ে সৎ লোকেরা আমল গোপন করতেন। ইবনে সিরিন দিনে হাসতেন আর রাতে কাঁদতেন। ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. যখন অসুস্থ হতেন, তখন তার নিকট এমন খাবার দেখা যেত যা সুস্থ লোকেরা ভক্ষণ করে।

ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, এক ব্যক্তি তার যুগের শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ ছিলেন। লোকেরা তার সাক্ষাতে এলে তিনি তাদেরকে বিভিন্ন নসিহতমূলক কথাবার্তা বলতেন। একদিন বহুসংখ্যক লোক তার নিকট সমাবেত হলে তিনি তাদেরকে বললেন, আমরা স্বেচ্ছাচারিতার ভয়ে দুনিয়ার বেড়াজাল থেকে বের হয়েছি এবং পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ থেকে পৃথক হয়েছি। কিন্তু এখন আমার আশঙ্কা হচ্ছে, দুনিয়াদাররা ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে যেমন স্বেচ্ছাচারী হয় তার চেয়ে অধিক স্বেচ্ছাচারিতা আমাদের মাঝে প্রবেশ করেছে। কেননা আমি দেখছি, আমাদের প্রত্যেকেই নিজ প্রয়োজন পূরণ হওয়া এবং দ্বীনদারিতে প্রসিদ্ধ হওয়ার দরুন পণ্য ক্রয়ের সময় বিক্রেতার ঘনিষ্ঠ হওয়া পছন্দ করে। কারও সাথে সাক্ষাৎ করলে কেউ তার সাক্ষাতে এলে তার থেকে অভিবাদন পাওয়ার আশা করে এবং দ্বীনদারির উঁচু মাকাম অর্জিত হওয়ায় নিজেকে সম্মানিত মনে করে। তার এ নসিহত চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। একর্যায়ে বাদশাহর কানে তা পৌঁছলে বাদশাহ অত্যন্ত মুগ্ধ হন। তাকে সালাম দিয়ে এক পলক দেখার উদ্দেশ্যে বাদশাহ বাহনে আরোহণ করে তার দরবারে পৌঁছলে এক লোক তাকে বলল, আপনাকে সালাম দেয়ার উদ্দেশ্যে বাদশাহ আপনার নিকট এসেছেন। তিনি বললেন, সালাম দেয়ার পর বাদশাহ কী করবেন? সে বলল, যে নসিহত আপনি করেছেন তা আপনার জবান থেকে শ্রবণ করবেন। তিনি তখন খাদেমকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কোনো খাবার আছে? সে বলল, আপনি গাছের যে ফল দিয়ে ইফতার করতেন তা থেকে কিছু ফল আছে। তিনি ফল উপস্থিত করার নির্দেশ দিলে খাদেম তা উপস্থিত করে তার সামনে পেশ করলে তিনি তা থেকে ভক্ষণ করা শুরু করেন। অথচ তিনি ছিলেন রোযাদার এবং সর্বদা রোযা রাখা ছিল তার অভ্যাস।

এমন সময়ে বাদশাহ তার দরজায় উপস্থিত হয়ে তাকে সালাম দিলে তিনি ছোট্ট শব্দে সালামের উত্তর দেন। বাদশাহ তাকে ফল খেতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, লোকটি কোথায়? লোকেরা বলল, ইনিই সেই ব্যক্তি। বাহশাহ বললেন, যাকে খেতে দেখছি ইনি কী সেই ব্যক্তি? লোকেরা বলল, হ্যাঁ। বাদশাহ বললেন, তাহলে তো এর মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। অতঃপর বাদশাহ তার কাছ থেকে প্রস্থান করে রাজভবনে ফিরে আসেন। বাদশাহ চলে আসার পর লোকটি বলল, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমার কাছ থেকে তোমাকে নিরাশ করে ফিরিয়ে নিয়েছেন।

উপরোক্ত ঘটনাটি ভিন্ন রেওয়ায়েতে এভাবে এসেছে: ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, বাদশাহ আগমন করলে লোকটি খাবার উপস্থিত করে শাক-সবজি দিয়ে এক বড় লোকমা তৈয়ার করে তেলের ভিতর তা চুবিয়ে জোর খাটিয়ে খাওয়া শুরু করলে বাদশাহ বললেন, হে লোক, তুমি কেমন বলো তো! সে বলল, আমি সাধারণ মানুষের মতোই, আমার বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। বাদশাহ তখন ঘোড়ার লাগাম ঘুরিয়ে বললেন, এর মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। বাদশাহ চলে আসার পর লোকটি বলল, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাকে আমার সম্পর্কে তিরস্কার করে এখান থেকে ফিরিয়ে নিয়েছেন।

আতা বলেন, ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেক ইয়াযিদ বিন মারসাদকে গভর্নরের দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন। ইয়াযিদের নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি একটি পশমযুক্ত চামড়া গায়ে জড়ালেন। চামড়াটির পশমমুক্ত অংশ ছিল গায়ের সাথে, আর পশমযুক্ত অংশ ছিল দেহের বহিরাংশে। অতঃপর হাতে এক টুকরো রুটি ও গোস্তবিহীন হাড় নিয়ে চাদর, টুপি, জুতা ও মোজা পরিধান করা ব্যতীত বাজারে হেঁটে হেঁটে তা খেতে লাগলেন। তখন ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেককে বলা হলো, ইয়াযিদ বিন মারসাদের বিবেক তো বিগড়ে গেছে। অতঃপর ইয়াযিদের আচরণ তার সামনে বললে তাকে গভর্নর নিযুক্ত করার চিন্তা বাদ দেন। এমন অনেক ঘটনার কথা ইতিহাসে লেখা আছে।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৯০৭

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 যাহেদদের কিছু মতাদর্শ

📄 যাহেদদের কিছু মতাদর্শ


অনেক যাহেদ নিরবচ্ছিন্নভাবে মসজিদে পড়ে থাকা এবং নিঃসঙ্গাবস্থায় পাহাড়ে অবস্থান করা—যাদের দৈনিক খাদ্য, তাদের নিঃসঙ্গতার কথা মানুষ জানুক এতেই তাদের তৃপ্তি। আবার কখনো সে নিঃসঙ্গ থাকার প্রমাণ দিয়ে বলে, আমার আশঙ্কা হয়, লোকালয়ে থাকলে মানুষ আমার গুনাহ বর্জনের বিষয়ে অবগত হবে। অথচ এসব কথা সে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বলে। তার উদ্দেশ্যসমূহের কয়েকটি হলো : নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা, মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা, সেবা লাভের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা করা, তার রীতিনীতি ও নেতৃত্ব রক্ষা করা। আর মানুষের সংস্পর্শে এসবের অর্জন অসম্ভব। অথচ সে চায়, তার আলোচনা দীর্ঘকাল লোকমুখে চাউর হোক।

স্বীয় দোষ-ত্রুটি, মন্দস্বভাব ও ইলম সম্পর্কে অজ্ঞতার বিষয়টি জনগণ থেকে গোপন রাখার নিমিত্তেও সে মাঝে-মধ্যে এমন ভান করে থাকে। অগত্যা সে এ পন্থা অবলম্বন করে। তার সাথে মানুষ সাক্ষাৎ করুক এটা সে পছন্দ করে কিন্তু সে কারও কাছে যায় না। তার দরবারে রাজা-বাদশা ও মন্ত্রীর আগমন, দরজায় জনসাধারণের সমবেত হওয়া এবং তারা তার হাত চুম্বন করায় সে আনন্দিত হয়, অথচ রোগী দেখা ও জানাযায় শরিক হওয়া থেকে সে দূরে থাকে। এ ব্যক্তি যদি খাদ্য গ্রহণের মুখাপেক্ষী হয় তাহলে সে ক্ষুধার ওপর সবর করে, যেন খাবার কিনতে নিজেকে বাজারে যেতে না হয়, কেননা মানুষের সাথে বাজারে হাঁটলে যশ-খ্যাতি কমে যেতে পারে। সে মনে করে যদি বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করি তাহলে খ্যাতি ভেস্তে যাবে। নিঃসন্দেহে নিজের উদ্ভাবিত রীতিনীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে এ ব্যক্তির মনে এ অহংবোধ বিরাজ করে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করতেন এবং নিজে বহন করে তা বাড়িতে নিয়ে আসতেন। রাসুলের সাহাবি আবু বকর রা. বিক্রির উদ্দেশ্যে কাঁধে কাপড় বহন করে বাজারে নিতেন এবং প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করে বাড়ি ফিরতেন।

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَنْظَلَةَ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ سَلَّامٍ، مَرَّ فِي السُّوقِ وَعَلَى رَأْسِهِ حُزْمَةُ حَطَبٍ، فَقَالَ: أَدْفَعُ بِهِ الْكِبْرَ، إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرٍ
'আবদুল্লাহ বিন হানযালা বলেন, আবদুল্লাহ বিন সালাম রা. মাথায় লাকড়ির আঁটি বহন করে রাস্তায় পথ চললে লোকেরা তাকে বলল, হে আবদুল্লাহ, কোন জিনিস তোমাকে এ কাজে বাধ্য করল? অথচ আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন! তিনি বললেন, আমি এর মাধ্যমে অহংকার দূর করছি। কেননা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-এমন বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার রয়েছে।'
***
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়া এবং নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার যে উদাহরণ আমরা উল্লেখ করেছি তা ছিল আমাদের পূর্বসূরিদের অভ্যাস। অবশ্য সে অভ্যাস এখন পরিবর্তিত হয়েছে যেভাবে পরিবেশ ও পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তিত হয়েছে। তাই আলেমদের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়া আমি এখন উত্তম মনে করি না। কেননা আলেমদের এ আচরণ বর্তমানে মূর্খদের অন্তরে ইলমের মর্যাদা কমিয়ে দেয়। অথচ ইলমের মর্যাদা মানুষের দিলে বিদ্যমান থাকা শরিয়তসম্মত বিষয়। আর যে জিনিস মূর্খদের অন্তরে ইলমের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করে, আলেমদের জন্য তা অবলম্বন করা শরিয়তে নিষিদ্ধ। পূর্বসূরিদের যে আচরণ মানুষের মনে পরিবর্তন আনত না, বর্তমানেও তা পালন করা অবশ্যক নয়। ইমাম আওযায়ি বলেন, আমরা হাসাহাসি ও উপহাস করতাম। যখন মানুষ আমাদের অনুসরণ শুরু করল তখন নিজেদের জন্য আমরা তা অবৈধ মনে করলাম। ইবরাহিম ইবনে আদহামের সাথিরা একদিন রসিকতা করছিল, তখন এক লোক দরজায় কড়া নেড়ে তাদেরকে চুপ থাকার নির্দেশ দিলে তারা বলল, আমরা রিয়া শিখেছি। তখন সে তাদেরকে বলল, তোমাদের কাছ থেকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাক—তা আমি চাই না।
***
অনেক দুনিয়াবিরাগীকে যদি মসৃণ পোশাক পরতে বলা হয় তারা কিছুতেই তা পরবেন না। যেন দুনিয়াবিরাগিতায় তাদের যশ কমে না যায়। আর তাদেরকে যদি মানুষের উপস্থিতিতে খাবার গ্রহণের অনুরোধ করা হয় তাহলে দেহ থেকে প্রাণবায়ু বের হয়ে গেলেও তারা মানুষের সামনে খাদ্য গ্রহণ করতে চান না। তারা হাসি চাপিয়ে রেখে মানুষের সামনে মুচকি হাসেন, আর ইবলিস তাদের মনে এ প্ররোচনা ঢালে যে, তুমি যা করছ তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের আত্মশুদ্ধি। অথচ বাস্তবিকপক্ষে তা একটি জঘন্য রিয়া। কারো কারো মাথা সর্বদা অবনমিত থাকে, দুঃখের ছাপ তার চেহারায় সব সময় ভাসে, যেন সে পরকালের চিন্তায় অস্থির; অথচ মানুষ চলে গেলে আচার-ব্যবহারে হিংস্র প্রাণীর রূপ ধারণ করে।
***
দুনিয়াত্যাগী অনেক ভাই তার কাপড় ছিঁড়ে গেলে আর সেলাই করেন না। পাগড়ি নষ্ট হলে সংশোধন করেন না। দাড়ি এলোমেলা হলে তিনি তা আঁচড়ান না। তিনি এসব আচরণ দ্বারা দুনিয়ার কোনো বস্তুই তার নিকট উত্তম নয় বলে মানুষকে বোঝাতে চান। অথচ তিনি যা করছেন, তা একপ্রকার রিয়া। আর দুনিয়া ত্যাগের এ পদ্ধতি যদি সে সঠিক মনে করে, 'যেমন দাউদ তাঈকে যখন বলা হলো, আপনি কি দাড়ি আঁচড়াবেন না? তিনি উত্তরে বললেন, আখিরাতের ব্যস্ততার দরুন তা আঁচড়ানোর সময় কোথায়!' তাহলে তার জেনে রাখা উচিত—তার এ পদ্ধতি সঠিক নয়। কেননা এ পদ্ধতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের মধ্য থেকে কারও কাছে পাওয়া যায় না। বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুল আঁচড়াতেন। আয়নায় চেহারা দেখতেন। মাথায় তেল ব্যবহার করতেন এবং শরীরে আতর লাগাতেন। অথচ আখিরাতের বিষয়ে তিনি ছিলেন সর্বাধিক ব্যস্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবি আবু বকর ও ওমর রা. মেহেদী দ্বারা দাড়ি খেযাব করতেন, অথচ তারা ছিলেন সর্বাধিক মুত্তাকি ও দুনিয়াবিমুখ সাহাবি। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিদের ওপর কোনো গুণ ও বৈশিষ্ট্যের দাবি যদি কেউ করে তাহলে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা হবে না।

বহু যাহেদ সর্বদা চুপ থাকেন এবং পরিবারের সংস্পর্শ হতে বিরত থেকে নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। ফলে তিনি মন্দ স্বভাব ও পরিবারের প্রতি বিষণ্ণভাবাপন্ন হয়ে তাদেরকে কষ্টে নিপতিত করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী :
إِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقٌّ
'নিশ্চই তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক রয়েছে”-এ কথাকে ভুলে যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো মজাক করে শিশুদের সাথে খেলা করতেন, স্ত্রীদের সাথে আলাপ করতেন এবং স্ত্রী আয়েশা রা.- এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। হাদিসের অগণিত পাতা এ-জাতীয় কোমল আচরণের উদাহরণে ভরপুর।

এ সকল দুনিয়াত্যাগী মন্দ স্বভাব পরিবার হতে পৃথক থেকে সন্তানকে এতিমের মতো রাখে আর স্ত্রীকে বিধবার মতো রাখে। এসবের একমাত্র কারণ, সে মনে করে যে, পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখা আখিরাত থেকে বিমুখ করে। অথচ জ্ঞানস্বল্পতার দরুন তাদের জানা নেই যে, পরিবারের প্রতি উদারহস্ত হয়ে তাদের সাথে আনন্দ করা আখিরাতের পথকে সুগম করে। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.-কে বলেছেন,
هَلَّا تَزَوَّجْتَ بِكْرًا تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ
'তুমি যদি কুমারী মেয়ে বিবাহ করতে, তাহলে সে তোমার সাথে আনন্দ করত এবং তুমিও তার সাথে আনন্দ করতে।” আবার কখনো এ যাহেদগণের মনে শুষ্কদেহের অধিকারী হওয়ার চিন্তা প্রবল আকার ধারণ করে, ফলে সে স্ত্রী সহবাস বর্জন করে। নফল আদায়ে ফরজ বর্জন করে। অথচ এ ব্যাপারে শরিয়ত কাউকে উৎসাহিত করেনি।

অনেকে নিজ আমল দেখে মুগ্ধ হন। তাকে যদি বলা হয়, আপনি তো জমিনের খুঁটি, (অর্থাৎ আপনার কারণেই পৃথিবী টিকে আছে) তাহলে সে তা সত্য মনে করে। অনেক দুনিয়াত্যাগী আবার নিজের থেকে কারামত প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে এবং মনে এ ধারণা জন্মায় যে, সে যদি পানির নিকটবর্তী হয় তাহলে সে পানির ওপর হাঁটতে সক্ষম হবে। যদি সে বিপদের সম্মুখীন হয়ে দোয়া করে এবং সে দোয়ার ফলাফল তৎক্ষণাৎ না পায় তাহলে সে অসন্তুষ্ট হয়। যেন সে শ্রমিক—যে তার কাজের বিনিময় দাবি করছে। যদি তার প্রকৃত বোধশক্তি থাকত তাহলে সে বুঝত যে, তার অবস্থান এক কৃতদাসের ন্যায়, আর কৃতদাস নিজ কাজের দ্বারা মনিবের ওপর অনুগ্রহ ফলাতে পারে না। আর যদি সে ভেবে দেখত যে, আল্লাহর তাওফিকেই আমি এ কাজ করতে পেরেছি, তাহলে সে আমল করতে পারায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে জরুরি মনে করে আমলের ভুল-ভ্রান্তি থেকে ফিরে আসত।

মানুষের অবস্থা এমন হওয়াই কাম্য, আমলে ত্রুটি-বিচ্যুতির ভয় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে মনকে পেরেশান রাখবে। রাবেয়া বসরি রহ. বলতেন, আমি কথায় সততার স্বল্পতার কারণে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে বলল, এমন কোনো আমল কি আপনার আছে, যা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী? তিনি উত্তরে বললেন, কোনো কোনো আমলের ব্যাপারে যদিও আশাবাদী, তবে তা কবুল না হওয়ার আশঙ্কাও আমার অন্তরে সদা জাগ্রত।

অল্প জ্ঞানের কারণে বহু যাহেদকে শয়তান এমন কাজে উদ্বুদ্ধ করে শরিয়তে যা নিন্দনীয়। এতে তার উদ্দেশ্য ভালো থাকা সত্ত্বেও সওয়াব লাভের পরিবর্তে সে পাপিষ্ঠ হিসেবে সাব্যস্ত হয়। যেমন—ইবনে আকিল বলেন, আবু ইসহাক খাজ্জার একজন নেককার বুযুর্গ ছিলেন। তিনি এমন ব্যক্তি যিনি আমাকে সর্বপ্রথম কুরআন শিখিয়েছেন। তার অভ্যাস ছিল রমযান মাসে কথা বলা হতে বিরত থাকা। তাই কথা বলার প্রয়োজন হলে তিনি কুরআনের আয়াত দ্বারা সেদিকে ইশারা করতেন। যেমন কাউকে অনুমতি প্রদানকালে তিনি বলতেন- ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ ‘দরজা দিয়ে তাদের কাছে প্রবেশ করো।" বাজার করার জন্য ছেলেকে বলতেন- من بقلها وَقُتَائِهَا উদ্দেশ্য হলো, শাক-সবজি ক্রয়ের জন্য ছেলেকে আদেশ করা। ইবনে আকিল বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে আমি তাকে বললাম, আপনি ইবাদত মনে করে যা করেছেন তা মূলত নাফরমানি। তখন আমার এ কথা মানতে তার কষ্ট হলে আমি তাকে বললাম, দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার এ কাজের উদাহরণ তো কুরআনকে আপনার বালিশ হিসাবে ব্যবহার করার মতো। এতেও তিনি আমার কথার দিকে মনোযোগ দিলেন না।

গ্রন্থকার বলেন, স্বল্পজ্ঞানের কারণে অনেক যাহেদ লোকমুখে যা শোনেন সে অনুযায়ী অন্যকে ফতোয়া দেন। ফকিহ আবু হাকিম ইবরাহিম ইবনে দীনারের নিকট এক লোক ফতোয়া চেয়ে বলল, আপনি এমন মহিলার ব্যাপারে কি বললেন, যাকে তার স্বামী তিন তালাক দেয়ার পর সে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করে। এ মহিলা কি তার স্বামীর জন্য হালাল হবে? তিনি বললেন, না। তখন শরিফ দুহালী নামে এক প্রসিদ্ধ যাহেদ তার নিকট উপস্থিত ছিল, জনগণের মাঝে সে ছিল বড় সম্মানিত ব্যক্তি। সে তখন ফকিহ আবু হাকেমকে বলল, আপনি এ কী ফতোয়া দিলেন! বরং এ মহিলা তার স্বামীর জন্য বৈধ হবে। আবু হাকেম বলেন, এরূপ ফতোয়া তো আজ পর্যন্ত কেউ দেয়নি। তখন শরিফ দুহালী বলল, আল্লাহর কসম; আমি এখান থেকে বসরা পর্যন্ত এই ফতোয়া দিয়েছি।

গ্রন্থকার বলেন, দেখুন! দীন সম্পর্কে অজ্ঞতা অজ্ঞ ব্যক্তির সাথে কীরূপ আচরণ করে—যেন মানুষ তাকে মূর্খ যাহেদ না ভাবে। অথচ আমাদের পূর্বসূরি ওলামায়ে কেরাম যাহেদদেরকে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ফতোয়া দিতে নিষেধ করতেন। কেননা ফতোয়ার শর্তাবলি তাদের মাঝে বিদ্যমান নেই। ইসমাঈল ইবনে শিব্বাহ বলেন, আমি আহমদ বিন হাম্বলের দরবারে উপস্থিত হলাম, ইত্যবসরে আহমদ বিন হাজ্ব মক্কা থেকে এসে হাজির হলেন। আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বললেন, এ ব্যক্তি কে? আমি বললাম, ইনি একজন প্রসিদ্ধ যাহেদ ও পরহেজগার ব্যক্তি। তখন আহমদ বিন হাম্বল বললেন, যে নিজেকে যাহেদ বলে দাবি করে তার জন্য উচিত নয় ফতোয়ার কাজে মনোনিবেশ করা।

টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৯১
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৯৭৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১১৫৯
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২০৯৭, ৫০৮০, ৫৩৬৭, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭১৫
১. সুরা মায়িদা: আয়াত ২৩
২. সুরা বাকারা: আয়াত ৬১

অনেক যাহেদ নিরবচ্ছিন্নভাবে মসজিদে পড়ে থাকা এবং নিঃসঙ্গাবস্থায় পাহাড়ে অবস্থান করা—যাদের দৈনিক খাদ্য, তাদের নিঃসঙ্গতার কথা মানুষ জানুক এতেই তাদের তৃপ্তি। আবার কখনো সে নিঃসঙ্গ থাকার প্রমাণ দিয়ে বলে, আমার আশঙ্কা হয়, লোকালয়ে থাকলে মানুষ আমার গুনাহ বর্জনের বিষয়ে অবগত হবে। অথচ এসব কথা সে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বলে। তার উদ্দেশ্যসমূহের কয়েকটি হলো : নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা, মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা, সেবা লাভের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা করা, তার রীতিনীতি ও নেতৃত্ব রক্ষা করা। আর মানুষের সংস্পর্শে এসবের অর্জন অসম্ভব। অথচ সে চায়, তার আলোচনা দীর্ঘকাল লোকমুখে চাউর হোক।

স্বীয় দোষ-ত্রুটি, মন্দস্বভাব ও ইলম সম্পর্কে অজ্ঞতার বিষয়টি জনগণ থেকে গোপন রাখার নিমিত্তেও সে মাঝে-মধ্যে এমন ভান করে থাকে। অগত্যা সে এ পন্থা অবলম্বন করে। তার সাথে মানুষ সাক্ষাৎ করুক এটা সে পছন্দ করে কিন্তু সে কারও কাছে যায় না। তার দরবারে রাজা-বাদশা ও মন্ত্রীর আগমন, দরজায় জনসাধারণের সমবেত হওয়া এবং তারা তার হাত চুম্বন করায় সে আনন্দিত হয়, অথচ রোগী দেখা ও জানাযায় শরিক হওয়া থেকে সে দূরে থাকে। এ ব্যক্তি যদি খাদ্য গ্রহণের মুখাপেক্ষী হয় তাহলে সে ক্ষুধার ওপর সবর করে, যেন খাবার কিনতে নিজেকে বাজারে যেতে না হয়, কেননা মানুষের সাথে বাজারে হাঁটলে যশ-খ্যাতি কমে যেতে পারে। সে মনে করে যদি বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করি তাহলে খ্যাতি ভেস্তে যাবে। নিঃসন্দেহে নিজের উদ্ভাবিত রীতিনীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে এ ব্যক্তির মনে এ অহংবোধ বিরাজ করে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করতেন এবং নিজে বহন করে তা বাড়িতে নিয়ে আসতেন। রাসুলের সাহাবি আবু বকর রা. বিক্রির উদ্দেশ্যে কাঁধে কাপড় বহন করে বাজারে নিতেন এবং প্রয়োজনীয় পণ্য খরিদ করে বাড়ি ফিরতেন।

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَنْظَلَةَ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ سَلَّامٍ، مَرَّ فِي السُّوقِ وَعَلَى رَأْسِهِ حُزْمَةُ حَطَبٍ، فَقَالَ: أَدْفَعُ بِهِ الْكِبْرَ، إِنَِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرٍ
'আবদুল্লাহ বিন হানযালা বলেন, আবদুল্লাহ বিন সালাম রা. মাথায় লাকড়ির আঁটি বহন করে রাস্তায় পথ চললে লোকেরা তাকে বলল, হে আবদুল্লাহ, কোন জিনিস তোমাকে এ কাজে বাধ্য করল? অথচ আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন! তিনি বললেন, আমি এর মাধ্যমে অহংকার দূর করছি। কেননা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-এমন বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার রয়েছে।'
***
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়া এবং নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার যে উদাহরণ আমরা উল্লেখ করেছি তা ছিল আমাদের পূর্বসূরিদের অভ্যাস। অবশ্য সে অভ্যাস এখন পরিবর্তিত হয়েছে যেভাবে পরিবেশ ও পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তিত হয়েছে। তাই আলেমদের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়া আমি এখন উত্তম মনে করি না। কেননা আলেমদের এ আচরণ বর্তমানে মূর্খদের অন্তরে ইলমের মর্যাদা কমিয়ে দেয়। অথচ ইলমের মর্যাদা মানুষের দিলে বিদ্যমান থাকা শরিয়তসম্মত বিষয়। আর যে জিনিস মূর্খদের অন্তরে ইলমের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করে, আলেমদের জন্য তা অবলম্বন করা শরিয়তে নিষিদ্ধ। পূর্বসূরিদের যে আচরণ মানুষের মনে পরিবর্তন আনত না, বর্তমানেও তা পালন করা অবশ্যক নয়। ইমাম আওযায়ি বলেন, আমরা হাসাহাসি ও উপহাস করতাম। যখন মানুষ আমাদের অনুসরণ শুরু করল তখন নিজেদের জন্য আমরা তা অবৈধ মনে করলাম। ইবরাহিম ইবনে আদহামের সাথিরা একদিন রসিকতা করছিল, তখন এক লোক দরজায় কড়া নেড়ে তাদেরকে চুপ থাকার নির্দেশ দিলে তারা বলল, আমরা রিয়া শিখেছি। তখন সে তাদেরকে বলল, তোমাদের কাছ থেকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাক—তা আমি চাই না।
***
অনেক দুনিয়াবিরাগীকে যদি মসৃণ পোশাক পরতে বলা হয় তারা কিছুতেই তা পরবেন না। যেন দুনিয়াবিরাগিতায় তাদের যশ কমে না যায়। আর তাদেরকে যদি মানুষের উপস্থিতিতে খাবার গ্রহণের অনুরোধ করা হয় তাহলে দেহ থেকে প্রাণবায়ু বের হয়ে গেলেও তারা মানুষের সামনে খাদ্য গ্রহণ করতে চান না। তারা হাসি চাপিয়ে রেখে মানুষের সামনে মুচকি হাসেন, আর ইবলিস তাদের মনে এ প্ররোচনা ঢালে যে, তুমি যা করছ তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের আত্মশুদ্ধি। অথচ বাস্তবিকপক্ষে তা একটি জঘন্য রিয়া। কারো কারো মাথা সর্বদা অবনমিত থাকে, দুঃখের ছাপ তার চেহারায় সব সময় ভাসে, যেন সে পরকালের চিন্তায় অস্থির; অথচ মানুষ চলে গেলে আচার-ব্যবহারে হিংস্র প্রাণীর রূপ ধারণ করে।
***
দুনিয়াত্যাগী অনেক ভাই তার কাপড় ছিঁড়ে গেলে আর সেলাই করেন না। পাগড়ি নষ্ট হলে সংশোধন করেন না। দাড়ি এলোমেলা হলে তিনি তা আঁচড়ান না। তিনি এসব আচরণ দ্বারা দুনিয়ার কোনো বস্তুই তার নিকট উত্তম নয় বলে মানুষকে বোঝাতে চান। অথচ তিনি যা করছেন, তা একপ্রকার রিয়া। আর দুনিয়া ত্যাগের এ পদ্ধতি যদি সে সঠিক মনে করে, 'যেমন দাউদ তাঈকে যখন বলা হলো, আপনি কি দাড়ি আঁচড়াবেন না? তিনি উত্তরে বললেন, আখিরাতের ব্যস্ততার দরুন তা আঁচড়ানোর সময় কোথায়!' তাহলে তার জেনে রাখা উচিত—তার এ পদ্ধতি সঠিক নয়। কেননা এ পদ্ধতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের মধ্য থেকে কারও কাছে পাওয়া যায় না। বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুল আঁচড়াতেন। আয়নায় চেহারা দেখতেন। মাথায় তেল ব্যবহার করতেন এবং শরীরে আতর লাগাতেন। অথচ আখিরাতের বিষয়ে তিনি ছিলেন সর্বাধিক ব্যস্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবি আবু বকর ও ওমর রা. মেহেদী দ্বারা দাড়ি খেযাব করতেন, অথচ তারা ছিলেন সর্বাধিক মুত্তাকি ও দুনিয়াবিমুখ সাহাবি। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিদের ওপর কোনো গুণ ও বৈশিষ্ট্যের দাবি যদি কেউ করে তাহলে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা হবে না।

বহু যাহেদ সর্বদা চুপ থাকেন এবং পরিবারের সংস্পর্শ হতে বিরত থেকে নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। ফলে তিনি মন্দ স্বভাব ও পরিবারের প্রতি বিষণ্ণভাবাপন্ন হয়ে তাদেরকে কষ্টে নিপতিত করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী :
إِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقٌّ
'নিশ্চই তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক রয়েছে”-এ কথাকে ভুলে যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো মজাক করে শিশুদের সাথে খেলা করতেন, স্ত্রীদের সাথে আলাপ করতেন এবং স্ত্রী আয়েশা রা.- এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। হাদিসের অগণিত পাতা এ-জাতীয় কোমল আচরণের উদাহরণে ভরপুর।

এ সকল দুনিয়াত্যাগী মন্দ স্বভাব পরিবার হতে পৃথক থেকে সন্তানকে এতিমের মতো রাখে আর স্ত্রীকে বিধবার মতো রাখে। এসবের একমাত্র কারণ, সে মনে করে যে, পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখা আখিরাত থেকে বিমুখ করে। অথচ জ্ঞানস্বল্পতার দরুন তাদের জানা নেই যে, পরিবারের প্রতি উদারহস্ত হয়ে তাদের সাথে আনন্দ করা আখিরাতের পথকে সুগম করে। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.-কে বলেছেন,
هَلَّا تَزَوَّجْتَ بِكْرًا تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ
'তুমি যদি কুমারী মেয়ে বিবাহ করতে, তাহলে সে তোমার সাথে আনন্দ করত এবং তুমিও তার সাথে আনন্দ করতে।” আবার কখনো এ যাহেদগণের মনে শুষ্কদেহের অধিকারী হওয়ার চিন্তা প্রবল আকার ধারণ করে, ফলে সে স্ত্রী সহবাস বর্জন করে। নফল আদায়ে ফরজ বর্জন করে। অথচ এ ব্যাপারে শরিয়ত কাউকে উৎসাহিত করেনি।

অনেকে নিজ আমল দেখে মুগ্ধ হন। তাকে যদি বলা হয়, আপনি তো জমিনের খুঁটি, (অর্থাৎ আপনার কারণেই পৃথিবী টিকে আছে) তাহলে সে তা সত্য মনে করে। অনেক দুনিয়াত্যাগী আবার নিজের থেকে কারামত প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে এবং মনে এ ধারণা জন্মায় যে, সে যদি পানির নিকটবর্তী হয় তাহলে সে পানির ওপর হাঁটতে সক্ষম হবে। যদি সে বিপদের সম্মুখীন হয়ে দোয়া করে এবং সে দোয়ার ফলাফল তৎক্ষণাৎ না পায় তাহলে সে অসন্তুষ্ট হয়। যেন সে শ্রমিক—যে তার কাজের বিনিময় দাবি করছে। যদি তার প্রকৃত বোধশক্তি থাকত তাহলে সে বুঝত যে, তার অবস্থান এক কৃতদাসের ন্যায়, আর কৃতদাস নিজ কাজের দ্বারা মনিবের ওপর অনুগ্রহ ফলাতে পারে না। আর যদি সে ভেবে দেখত যে, আল্লাহর তাওফিকেই আমি এ কাজ করতে পেরেছি, তাহলে সে আমল করতে পারায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে জরুরি মনে করে আমলের ভুল-ভ্রান্তি থেকে ফিরে আসত।

মানুষের অবস্থা এমন হওয়াই কাম্য, আমলে ত্রুটি-বিচ্যুতির ভয় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে মনকে পেরেশান রাখবে। রাবেয়া বসরি রহ. বলতেন, আমি কথায় সততার স্বল্পতার কারণে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে বলল, এমন কোনো আমল কি আপনার আছে, যা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী? তিনি উত্তরে বললেন, কোনো কোনো আমলের ব্যাপারে যদিও আশাবাদী, তবে তা কবুল না হওয়ার আশঙ্কাও আমার অন্তরে সদা জাগ্রত।

অল্প জ্ঞানের কারণে বহু যাহেদকে শয়তান এমন কাজে উদ্বুদ্ধ করে শরিয়তে যা নিন্দনীয়। এতে তার উদ্দেশ্য ভালো থাকা সত্ত্বেও সওয়াব লাভের পরিবর্তে সে পাপিষ্ঠ হিসেবে সাব্যস্ত হয়। যেমন—ইবনে আকিল বলেন, আবু ইসহাক খাজ্জার একজন নেককার বুযুর্গ ছিলেন। তিনি এমন ব্যক্তি যিনি আমাকে সর্বপ্রথম কুরআন শিখিয়েছেন। তার অভ্যাস ছিল রমযান মাসে কথা বলা হতে বিরত থাকা। তাই কথা বলার প্রয়োজন হলে তিনি কুরআনের আয়াত দ্বারা সেদিকে ইশারা করতেন। যেমন কাউকে অনুমতি প্রদানকালে তিনি বলতেন- ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ ‘দরজা দিয়ে তাদের কাছে প্রবেশ করো।" বাজার করার জন্য ছেলেকে বলতেন- من بقلها وَقُتَائِهَا উদ্দেশ্য হলো, শাক-সবজি ক্রয়ের জন্য ছেলেকে আদেশ করা। ইবনে আকিল বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে আমি তাকে বললাম, আপনি ইবাদত মনে করে যা করেছেন তা মূলত নাফরমানি। তখন আমার এ কথা মানতে তার কষ্ট হলে আমি তাকে বললাম, দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার এ কাজের উদাহরণ তো কুরআনকে আপনার বালিশ হিসাবে ব্যবহার করার মতো। এতেও তিনি আমার কথার দিকে মনোযোগ দিলেন না।

গ্রন্থকার বলেন, স্বল্পজ্ঞানের কারণে অনেক যাহেদ লোকমুখে যা শোনেন সে অনুযায়ী অন্যকে ফতোয়া দেন। ফকিহ আবু হাকিম ইবরাহিম ইবনে দীনারের নিকট এক লোক ফতোয়া চেয়ে বলল, আপনি এমন মহিলার ব্যাপারে কি বললেন, যাকে তার স্বামী তিন তালাক দেয়ার পর সে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করে। এ মহিলা কি তার স্বামীর জন্য হালাল হবে? তিনি বললেন, না। তখন শরিফ দুহালী নামে এক প্রসিদ্ধ যাহেদ তার নিকট উপস্থিত ছিল, জনগণের মাঝে সে ছিল বড় সম্মানিত ব্যক্তি। সে তখন ফকিহ আবু হাকেমকে বলল, আপনি এ কী ফতোয়া দিলেন! বরং এ মহিলা তার স্বামীর জন্য বৈধ হবে। আবু হাকেম বলেন, এরূপ ফতোয়া তো আজ পর্যন্ত কেউ দেয়নি। তখন শরিফ দুহালী বলল, আল্লাহর কসম; আমি এখান থেকে বসরা পর্যন্ত এই ফতোয়া দিয়েছি।

গ্রন্থকার বলেন, দেখুন! দীন সম্পর্কে অজ্ঞতা অজ্ঞ ব্যক্তির সাথে কীরূপ আচরণ করে—যেন মানুষ তাকে মূর্খ যাহেদ না ভাবে। অথচ আমাদের পূর্বসূরি ওলামায়ে কেরাম যাহেদদেরকে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ফতোয়া দিতে নিষেধ করতেন। কেননা ফতোয়ার শর্তাবলি তাদের মাঝে বিদ্যমান নেই। ইসমাঈল ইবনে শিব্বাহ বলেন, আমি আহমদ বিন হাম্বলের দরবারে উপস্থিত হলাম, ইত্যবসরে আহমদ বিন হাজ্ব মক্কা থেকে এসে হাজির হলেন। আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বললেন, এ ব্যক্তি কে? আমি বললাম, ইনি একজন প্রসিদ্ধ যাহেদ ও পরহেজগার ব্যক্তি। তখন আহমদ বিন হাম্বল বললেন, যে নিজেকে যাহেদ বলে দাবি করে তার জন্য উচিত নয় ফতোয়ার কাজে মনোনিবেশ করা।

টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৯১
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৯৭৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১১৫৯
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২০৯৭, ৫০৮০, ৫৩৬৭, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭১৫
১. সুরা মায়িদা: আয়াত ২৩
২. সুরা বাকারা: আয়াত ৬১

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 আলেমদের নিন্দা ও কুৎসা

📄 আলেমদের নিন্দা ও কুৎসা


শয়তান যাহেদ তথা সংসারত্যাগীদেরকে এমনভাবে প্ররোচিত করে যে, তারা আলেমদেরকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখে এবং তাদের নিন্দা করে। তারা বলে, ইলমের উদ্দেশ্য আমল, সুতরাং যে আমল করে তার জন্য ইলমের প্রয়োজন নেই। অথচ তাদের জানা নেই যে, ইলম হচ্ছে নূর। শরিয়ত রক্ষায় আলেমদের মর্যাদা তারা যদি জানত, তাহলে বাকশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির সামনে বোবা ব্যক্তি এবং দৃষ্টিবানের সামনে দৃষ্টিহীন ব্যক্তি নিজেকে যেরূপ মনে করে, নিজেদেরকে তারা সে রকমই ভাবত। আলেমরা হলেন পথপ্রদর্শক, যাদের অনুসারী গোটা মানবজাতি।

وَعَن سهل بن سعد ان النبي صلى الله عليه وسلم قال لعلي بن أبي طالب رضي الله عنه والله لأن يهدي الله بك رجلا واحدا خيرا لك من حمر النعم
'হজরত সাহল ইবনে সাআদ রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আলী ইবনে আবি তালেব রা.-কে বলেছেন, আল্লাহর শপথ! তোমার মাধ্যমে আল্লাহ এক ব্যক্তিকে হেদায়েত দেয়া তোমার জন্য লাল উষ্ট্রী লাভ হওয়া থেকে উত্তম।"

টিকাঃ
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৯৪২, ৩৭০১, ৪২১০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৪০৬

শয়তান যাহেদ তথা সংসারত্যাগীদেরকে এমনভাবে প্ররোচিত করে যে, তারা আলেমদেরকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখে এবং তাদের নিন্দা করে। তারা বলে, ইলমের উদ্দেশ্য আমল, সুতরাং যে আমল করে তার জন্য ইলমের প্রয়োজন নেই। অথচ তাদের জানা নেই যে, ইলম হচ্ছে নূর। শরিয়ত রক্ষায় আলেমদের মর্যাদা তারা যদি জানত, তাহলে বাকশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির সামনে বোবা ব্যক্তি এবং দৃষ্টিবানের সামনে দৃষ্টিহীন ব্যক্তি নিজেকে যেরূপ মনে করে, নিজেদেরকে তারা সে রকমই ভাবত। আলেমরা হলেন পথপ্রদর্শক, যাদের অনুসারী গোটা মানবজাতি।

وَعَن سهل بن سعد ان النبي صلى الله عليه وسلم قال لعلي بن أبي طالب رضي الله عنه والله لأن يهدي الله بك رجلا واحدا خيرا لك من حمر النعم
'হজরত সাহল ইবনে সাআদ রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আলী ইবনে আবি তালেব রা.-কে বলেছেন, আল্লাহর শপথ! তোমার মাধ্যমে আল্লাহ এক ব্যক্তিকে হেদায়েত দেয়া তোমার জন্য লাল উষ্ট্রী লাভ হওয়া থেকে উত্তম।"

টিকাঃ
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৯৪২, ৩৭০১, ৪২১০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৪০৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00