📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 গনীমতের মালের ব্যাপারে মুজাহিদদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 গনীমতের মালের ব্যাপারে মুজাহিদদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


শয়তান বহু মুজাহিদকে গনীমত লাভের পর ধোঁকায় পতিত করে। ফলে গনীমতের সম্পদ সে এ পরিমাণ গ্রহণ করে, যা তার অধিকারবহির্ভূত। এদের অনেকে অজ্ঞতার কারণে মনে করে, কাফেরদের সম্পদ যে যা নিতে পারবে তা তার জন্য বৈধ। অথচ তাদের জানা নেই যে, গনীমতের মাল আত্মসাৎ করা মারাত্মক গুনাহ।

হজরত আবু হোরায়রা রা. বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে খাইবারের যুদ্ধে বের হলাম। যুদ্ধের একপর্যায়ে আল্লাহ আমাদেরকে বিজয় দান করলে খাবার, জামা-কাপড় ও বহু আসবাবপত্র আমরা গনীমতস্বরূপ লাভ করি। তবে কোনো সোনা-রুপা আমাদের হস্তগত হয়নি। অতঃপর আমরা এক উপত্যকার দিকে যাত্রা শুরু করি। এ যাত্রায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মালিকাধিন এক গোলাম তার সাথে ছিল। আমরা উপত্যকায় যাত্রাবিরতি করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোলাম তার মালপত্র খোলার প্রস্তুতি নিলে এক তির এসে তার রুহ ছিনিয়ে নেয়। তখন আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কী সৌভাগ্য তার! সে তো শাহাদাতের মৃত্যু লাভ করেছে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিছুতেই নয়; বণ্টনবিহীন যে আলখেল্লা খাইবারের যুদ্ধে যে আত্মসাৎ করেছে তার আগুনে সে অবশ্যই দগ্ধ হবে। এ কথা শ্রবণে উপস্থিত লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হলো। তখন এক ব্যক্তি জুতোর দু'একটি ফিতা এনে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি তা খাইবারের দিন নিয়েছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ তো আগুনের ফিতা; অথবা বলেছেন, এ ফিতাদ্বয় তো আগুনের।

বণ্টনের আগে গনীমতের মাল গ্রহণ জায়েয নেই—এ কথা জানা সত্ত্বেও অনেক মুজাহিদ সম্পদের আধিক্য দেখে ধৈর্যহারা হয়ে মনে করেন, আমার জিহাদ মাল আত্মসাতের ক্ষতিপূরণ হবে। এসব ক্ষেত্রেই ঈমান ও ইলমের নিদর্শন স্পষ্ট হয়ে যায়। আর ওবায়দা আলআশআরী বলেন, মুসলমানরা যখন মাদায়েইন অবতরণ করে গনীমতলব্ধ মাল জমা করতে লাগল, তখন এক ব্যক্তি এসে তার নিকট বিদ্যমান গনীমতের মাল জমাকারীর নিকট জমা দিলে জমাকারীর সাথী বলল, এমন উদার দিল মানুষ তো আমি আগে দেখিনি। সে যা জমা দিয়েছে তার মূল্য তো আমাদের গনীমতলব্ধ সব সম্পত্তি ছাড়িয়ে যাবে। সে তখন বলল, তুমি কি এখান থেকে নিজের জন্য কিছু রেখেছ? লোকটি বলল, আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ ভয় আমার অন্তরে না থাকত তাহলে তোমাদের নিকট আমি তা কিছুতেই জমা দিতাম না। তারা তখন বুঝল যে, লোকটি বড় মাপের কোনো ব্যক্তি হবেন। তারা পরিচয় জানার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল, কে আপনি? কী আপনার পরিচয়? সে বলল, আল্লাহর কসম! তোমাদের প্রশংসা লাভের উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে আমার পরিচয় দেব না এবং তোমাদের উচ্চ প্রশংসা পাওয়ার আশায় তোমাদেরকে প্রচারিতও করব না; বরং আমি আল্লাহর প্রশংসা করি এবং তারই প্রতিদানেই আমি সন্তুষ্ট। তখন পরিচয় জানার উদ্দেশ্যে তারা এক ব্যক্তিকে তার পিছু পাঠায়। লোকটি নিজ সম্প্রদায়ের নিকট পৌঁছলে সে তার সাথিদেরকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, ইনি আমের বিন আবদে কায়েস রহ.।

টিকাঃ
২. সহিহ বুখারি: ৪২৩৪; সহিহ মুসলিম: ১১৫।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সরকাজে আদেশ ও সৎকাজে বাধাদানকারীদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 সরকাজে আদেশ ও সৎকাজে বাধাদানকারীদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


এ ধরনের লোক দু’প্রকার—আলেম ও জাহেল। ইবলিস আলেমদেরকে দুই পদ্ধতিতে ধোঁকা দেয়।

১. শয়তান তার কাজে খ্যাতি ও আত্মশ্লাঘার স্পৃহা সৃষ্টি করে। আবু সোলায়মান বলেন, জুমার খুৎবায় খলিফা আবু জাফর মানসুরকে কাঁদতে দেখে আমি ভীষণ রাগান্বিত হই। ফলে খুৎবা শেষে নামার সময় দাঁড়িয়ে তার কৃতকর্মের ব্যাপারে তাকে নসিহত করার সংকল্প করি। কিন্তু মানুষের উপস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কোনো খলিফাকে নসিহত করা আমার নিকট অপছন্দনীয় মনে হলো। কেননা এতে মানুষের দৃষ্টি আমার দিকে নিবদ্ধ হবে এবং তা আমার খ্যাতি অর্জনের কারণ হবে। তাই আমি চুপ করে বসে রইলাম। কারণ আমার নিয়তে এখন ইখলাস নেই।

২. প্রবৃত্তির তাড়নায় ক্রোধান্বিত ও রাগান্বিত হওয়া। এ অবস্থা কখনো কখনো শুরুতেই সৃষ্টি হয়ে যায়। আবার কখনো আদেশ-নিষেধের মাঝে সৃষ্টি হয়। ফলে যে ক্রোধ আল্লাহর জন্য ছিল তা উল্টো নিজ স্বার্থ হাসিলের কারণ হয়ে যায়। এরূপ পরিস্থিতিতে আমাদের আকবিররা তো দণ্ড প্রয়োগ হতেও বিরত থাকতেন। হজরত ওমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. এক ব্যক্তিকে বললেন, যদি আমি ক্রোধান্বিত না হতাম তাহলে তোমার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করতাম। তার এ কথার মর্ম হলো, তুমি যেহেতু আমাকে ক্রোধান্বিত করেছ তাই আমার আশঙ্কা হলো যে, এ মুহূর্তে তোমাকে শাস্তি প্রদান করলে আল্লাহর জন্য উৎসারিত ক্রোধের সাথে নিজ ক্রোধের সংমিশ্রণ ঘটবে।
***
শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমনকারী ব্যক্তি যদি আলেম না হয় তাহলে শয়তান তাকে নিয়ে খেলা করে। ফলে তার আদেশ-নিষেধের দ্বারা সংশোধনের চেয়ে বিশৃঙ্খলা বেশি ছড়ায়। কারণ সে অজ্ঞতাবশত এমন বিষয়ে বাধা প্রদান করে যা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। আর কখনো এমন বিষয়ে বিরোধিতা করে যাতে ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে এবং কতক মাজহাবেও তার ওপর আমল রয়েছে। আবার কখনো দরজা ভেঙ্গে অথবা দেয়াল টপকিয়ে মন্দকর্ম সম্পাদনকারীদের মারধর করে তাদেরকে দোষারোপ করে। যদি তারা কোনো উত্তর দেয় তাহলে তা তাকে ভীষণ পীড়া দেয়। ফলে আল্লাহর জন্য উৎসারিত ক্রোধের ওপর নিজ ক্রোধ প্রাধান্য পায়। আবার কখনো সে এমন বিষয় প্রকাশ করে দেয় শরিয়ত যা গোপন করার আদেশ করেছে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে এমন সম্প্রদায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, যাদের সাথে রয়েছে ঢাকনাবৃত মদ। তিনি বললেন, যদি তা ঢাকনাবৃত হয় তাহলে তোমরা তা ভেঙ্গো না। তাকে আরেক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যিনি বাঁশি ও তবলার আওয়াজ শোনেন কিন্তু সে আওয়াজ কোথা হতে ভেসে আসে তা তার জানা নেই। তিনি বললেন, অদৃশ্য বিষয়ে অনুসন্ধান তোমার দায়িত্ব নয়, সুতরাং তার অনুসন্ধান হতে নিজেকে বিরত রাখো। আবার কখনো দুষ্টের দমনকারী এ ব্যক্তি মন্দকর্ম সম্পাদনকারীর বিষয়টি এমন ব্যক্তির নিকট পেশ করে, যে তার ওপর জুলুম করবে, অথচ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেছেন, তুমি যদি জানো যে, এ ব্যক্তির মন্দ কর্মের বিষয়টি বাদশার নিকট পেশ করলে তিনি শরিয়ত মোতাবেক শাস্তিদান করবেন তাহলে তার নিকট তা পেশ করো।

দুষ্টের দমনকারীদেরকে শয়তান ধোঁকা দেয়ার আরেক পদ্ধতি হলো, সে যখন মন্দ কাজের বিরোধিতা করে তখন কোনো এক মজলিসে বসে মন্দ কাজের বিবরণ তুলে ধরে এবং তা নিয়ে সে গর্ববোধ করে। অতঃপর সে মন্দকর্ম সম্পাদনকারীদেরকে ক্রোধান্বিত ব্যক্তির ন্যায় গালিগালাজ করে তাদেরকে অভিশাপ দিতে থাকে। অথচ এমনও হতে পারে, যাদেরকে সে গালিগালাজ করে অভিশাপ দিচ্ছে—তারা কৃত মন্দকাজ হতে তাওবাহ করেছে। ফলে মন্দকর্মের ওপর অনুশোচনার দরুন তারা হয়ে যায় শ্রেষ্ঠ, আর বড়ত্ব প্রকাশের দরুন সে হয়ে যায় নিকৃষ্ট। আর মুসলমানদের দোষ প্রকাশ করে সে ওইসব লোকদের দলভুক্ত হয় যাদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের দোষ অনুসন্ধান করবে আল্লাহ তার দোষ প্রকাশ করে দেবেন, আর আল্লাহ যার দোষ প্রকাশ করবেন তাকে তিনি লাঞ্ছিত করবেন, যদিও সে রুদ্ধদ্বার কক্ষে থাকুক। আমি দুষ্টের দমনকারীদের রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ—এমন ব্যক্তি সম্পর্কে শুনেছি, সে ধারণার বশীভূত হয়ে মন্দ কর্মকারীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাদেরকে কষ্টদায়ক শাস্তি দেয়, তাদের পাত্রে কি রয়েছে তা নিশ্চিতভাবে জানার আগেই পাত্রসমূহ ভেঙ্গে ফেলে। এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, শরিয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতাই তাদেরকে এ রূপ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

আমাদের পূর্বসূরিরা মন্দকাজে বাধাদানের ক্ষেত্রে কোমলতা প্রদর্শন করতেন। সিলাহ ইবনে আশাম কোন ব্যক্তিকে এক মহিলার সাথে কথা বলতে দেখে বললেন, দেখো, আল্লাহ কিন্তু তোমাদেরকে দেখছেন; আল্লাহ আমাদের এবং তোমাদের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখুন।

আরেকদিন খেল-তামাসায় লিপ্ত এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে তাদেরকে বললেন, হে ভাইয়েরা! এমন ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের কী মন্তব্য, যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার ইচ্ছা করেছে, অথচ রাত কাটে তার নিদ্রাবস্থায় আর দিন অতিবাহিত হয় খেল-তামাসায়। আচ্ছা বলো তো, এ ব্যক্তির সফর কবে শেষ হবে! তখন তাদের একজন সতর্ক হয়ে বলল, হে সম্প্রদায়ের লোকেরা, এ ব্যক্তি তো আমাদেরকে শিখাচ্ছেন। সে তখন তাওবা করে তার সাহচর্য গ্রহণ করে।
***
মন্দকাজের বিরোধিতার ক্ষেত্রে কোমল ব্যবহার লাভের সর্বাধিক হকদার রাজা-বাদশাহ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। তাই তাদেরকে হেকমতের সাথে এভাবে বলা, আল্লাহ আপনাদের মর্যাদা উঁচু করেছেন, আপনারা তার নেয়ামত লাভ করেছেন। তাই নেয়ামত ভোগের বিপরীতে আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত হওয়া তো অনুত্তম আচরণ।
***
ইবলিসের প্ররোচনায় পড়ে কিছু ইবাদতকারী এমনও আছেন, যারা কোনো মন্দ কাজ হতে দেখলে তার বিরোধিতা করেন না। তারা বলেন, সৎকাজে ও মন্দকাজে বাধাদান তো ওই ব্যক্তি করবে, যে সৎকর্মশীল ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী। আর আমি তো সৎকর্মশীল নই, তাই সৎকাজে আদেশ ও মন্দকাজে বাধাদান আমার জন্য শোভনীয় নয়। এমন ব্যক্তিদের জেনে রাখা উচিত, তারা যা ধারণা করেছে তা সম্পূর্ণ ভুল। কেননা সৎকাজে আদেশ ও মন্দকাজে বাধাদান তো প্রত্যেকের ওপর ওয়াজিব, যদিও মন্দকাজের এ প্রবণতা তাদের মাঝে থাকুক। তাই মন্দকাজে তার বাধাদানকারীর উচিত নিজেকে পরিশুদ্ধ করা, যেন তার বাধাদান মানুষকে প্রভাবিত করে।

ইবনে আকিল বলেন, আমাদের জমানায় আমি আবু বকর আকফালিকে খলিফা থাকাকালীন দেখেছি, তিনি যখন কোনো মন্দকাজে বাধাদানের প্রস্তুতি নিতেন তখন তার সাথে এমন বুযুর্গদের নিয়ে যেতেন যারা নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্য দ্বারাই আহার করতেন। কারও কাছে হাত পাততেন না বা কারও হাদিয়ার আশায় থাকতেন না। আবু বকর খাব্বায রুটি তৈরি করতেন। তারা ইবাদতের ক্ষেত্রেও ছিলেন অধ্যবসায়ী। দিনে রোযা রাখতেন আর রাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00