📄 তাওয়াক্কুলের ব্যাপারে শয়তানের চক্রান্ত
শয়তান একদলকে এমন চক্রান্তের জালে আটকায়, যারা তাওয়াক্কুলের দাবিদার, তাই তারা পাথেয় তথা টাকা-পয়সা ছাড়াই হজে বেরিয়ে যান। তাদের ধারণা এটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল। অথচ প্রকৃতপক্ষে এটা তাওয়াক্কুল নয়। তারা চরম ভ্রান্তিতেই নিমজ্জিত। এক ব্যক্তি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে বলল, আমি পাথেয় ছাড়া আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে হজের উদ্দেশ্যে মক্কায় যেতে চাই। তখন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. তাকে বলল, তাহলে কোনো কাফেলার সাথে শরিক হওয়া ব্যতীত একাকী সফর করো। তখন লোকটি বলল, কাফেলার সাথে শরিক হওয়া ব্যতীত একাকী সফর আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তখন আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বললেন, তাহলে তো তুমি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করোনি; কাফেলার ওপরই তোমার তাওয়াক্কুল। আমরা আল্লাহর কাছে তাওফিক প্রার্থনা করছি।
📄 জিহাদের ক্ষেত্রে মুজাহিদদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত
গ্রন্থকার বলেন, শয়তান মুজাহিদদের পিছুও ছাড়ে না। ফলে কারও উদ্দেশ্য হয় গৌরব-প্রতিযোগিতা ও আত্মপ্রদর্শন, যেন মানুষ তাকে গাজী কিংবা সাহসী বীর উপাধিতে ভূষিত করে। অথবা গনীমত লাভের আশা তাদেরকে জিহাদের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। অথচ আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।
عَنْ أَبِي مُوسَى، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا القِتَالُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟ فَإِنَّ أَحَدَنَا يُقَاتِلُ غَضَبًا، وَيُقَاتِلُ حَمِيَّةً، فَرَفَعَ إِلَيْهِ
رَأْسَهُ، قَالَ: «وَمَا رَفَعَ إِلَيْهِ رَأْسَهُ إِلَّا أَنَّهُ كَانَ قَائِمًا، فَقَالَ: «مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ العُلْيَا، فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
হজরত আবু মুসা আশআরি রা. বলেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আচ্ছা বলুন তো হে আল্লাহর রাসুল, এক ব্যক্তি বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে লড়াই করে, এক ব্যক্তি অহংকার প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে লড়াই করে, আরেক ব্যক্তি আত্মপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে লড়াই করে; এদের ভেতর কে আল্লাহর রাস্তায় রয়েছে? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর দীন পৃথিবীতে সমুন্নত হওয়ার উদ্দেশ্যে যে লড়াই করে সে আল্লাহর রাস্তায় রয়েছে।'
হজরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, খবরদার! কেউ যদি জিহাদের ময়দানে মারা যায়, তবে এ কথা বলো না যে, অমুক শহিদ হয়েছে। কেননা জিহাদে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ত বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কেউ জিহাদ করে গনীমত লাভের আশায়, কেউ জিহাদ করে আলোচিত হওয়ার আশায়, আবার কেউ জিহাদ করে বীর উপাধির আশায়।
হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, কেয়ামতের দিন যে তিন ব্যক্তির ফয়সালা হবে তাদের একজন হবেন শহিদ। তাকে উপস্থিত করে তার প্রতি আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামতরাজির কথা উল্লেখ করলে সে তা স্বীকার করবে। তখন আল্লাহ তাকে বলবেন, এ নেয়ামত ভোগ করে তুমি কী আমল করেছ? সে উত্তরে বলবে, তোমার রাস্তায় জিহাদ করে জীবন উৎসর্গ করেছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং বীর উপাধি লাভের আশায় তুমি লড়াই করেছ এবং সে উপাধি তোমার লাভ হয়েছে। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে তাকে অধোমুখ করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
দ্বিতীয় ব্যক্তি এমন, যে ইলম শেখার পর অন্যকে শিখিয়েছে এবং কুরআন তেلاওয়াত করেছে। তাকে উপস্থিত করে তার প্রতি আল্লাহর প্রতি নেয়ামতরাজির কথা উল্লেখ করলে সে তা স্বীকার করবে। তখন আল্লাহ তাকে বলবেন, এ নেয়ামত ভোগ করে তুমি কী আমল করেছ? সে উত্তরে বলবে, তোমার সন্তুষ্টির অর্জনের উদ্দেশ্যে ইলম শিখে অন্যকে তা শিখিয়েছি এবং নিয়মিত কুরআন তেلاওয়াত করেছি। তখন আল্লাহ তাকে বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং আলেম উপাধি লাভের আশায় তুমি ইলম শিখেছ এবং সে উপাধি তোমার লাভ হয়েছে, আর কারী উপাধি লাভের আশা তুমি কুরআন পড়েছ এবং সে উপাধিও তোমার লাভ হয়েছে। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে তাকে অধোমুখ করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তৃতীয় ব্যক্তি এমন, যাকে আল্লাহ বিপুল পরিমাণে সব ধরনের ধন-সম্পদ দান করেছেন। তাকে উপস্থিত করে তার প্রতি আল্লাহর প্রতি নেয়ামতরাজির কথা উল্লেখ করলে সে তা স্বীকার করবে। তখন আল্লাহ তাকে বলবেন, এ নেয়ামত ভোগ করে তুমি কী আমল করেছ? সে উত্তরে বলবে, আপনার পছন্দনীয় এমন কোনো খাত নেই যাতে আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমার সম্পদ ব্যয় হয়নি। তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং সম্পদ ব্যয় তুমি এজন্য করেছ, যেন মানুষ তোমাকে দানশীল বলে, আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে তাকে অধোমুখ করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
আবু হাতেম রহ. বলেন, আমি আবদাহ ইবনে সোলাইমানকে বলতে শুনেছি, আমরা রোম দেশে আব্দুল্লাহ বিন মোবারকের সাথে এক অভিযানে ছিলাম। হঠাৎ আমরা এক শত্রু বাহিনীর সম্মুখীন হলাম। দু'দল মুখোমুখি হলে শত্রুপক্ষের এক ব্যক্তি বের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান জানালে আমাদের একজন তার দিকে এগিয়ে গেল এবং কিছুক্ষণ তার সাথে লড়াই করে তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিল। অতঃপর অন্য ব্যক্তি এগিয়ে এলে তাঁকেও জাহান্নামে পাঠিয়ে দিল। এভাবে চার-পাঁচ জনকে জাহান্নামে পাঠানোর পর আমাদের লোকটি শত্রুপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান জানালে শত্রুপক্ষের এক ব্যক্তি বের হয়ে পরস্পর লড়াই শুরু করলে শত্রুপক্ষের লোকটি একপর্যায়ে আমাদের লোককে শহিদ করে দেয়। তখন লোকেরা তাঁর লাশের পাশে ভিড় করলে আমি তাঁদের সাথে সমবেত হয়ে দেখতে পাই, তিনি জামার আস্তিন দ্বারা চেহারা ঢেকে রেখেছেন। তখন আমি তাঁর আস্তিনের এক প্রান্ত ধরে হাত প্রসারিত করলে দেখতে পাই, তিনি আব্দুল্লাহ বিন মোবারক রহ.। তখন আমি বললাম (আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন) তোমরা এ মুখলিস নেতাকে দেখো, মানুষ তাঁকে দেখে তাঁর প্রশংসা করার ভয়ে কীভাবে সে নিজেকে গোপন করেছে। ইবরাহিম বিন আদহাম জিহাদ করতেন। যখন লোকেরা গনীমতের মাল ভাগ করত তিনি গনীমতের কোনো অংশ নিতেন না, যাতে অধিক সাওয়াব লাভ হয়।
টিকাঃ
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১২৩, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৯০৪
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৯০৫
📄 গনীমতের মালের ব্যাপারে মুজাহিদদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
শয়তান বহু মুজাহিদকে গনীমত লাভের পর ধোঁকায় পতিত করে। ফলে গনীমতের সম্পদ সে এ পরিমাণ গ্রহণ করে, যা তার অধিকারবহির্ভূত। এদের অনেকে অজ্ঞতার কারণে মনে করে, কাফেরদের সম্পদ যে যা নিতে পারবে তা তার জন্য বৈধ। অথচ তাদের জানা নেই যে, গনীমতের মাল আত্মসাৎ করা মারাত্মক গুনাহ।
হজরত আবু হোরায়রা রা. বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে খাইবারের যুদ্ধে বের হলাম। যুদ্ধের একপর্যায়ে আল্লাহ আমাদেরকে বিজয় দান করলে খাবার, জামা-কাপড় ও বহু আসবাবপত্র আমরা গনীমতস্বরূপ লাভ করি। তবে কোনো সোনা-রুপা আমাদের হস্তগত হয়নি। অতঃপর আমরা এক উপত্যকার দিকে যাত্রা শুরু করি। এ যাত্রায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মালিকাধিন এক গোলাম তার সাথে ছিল। আমরা উপত্যকায় যাত্রাবিরতি করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোলাম তার মালপত্র খোলার প্রস্তুতি নিলে এক তির এসে তার রুহ ছিনিয়ে নেয়। তখন আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কী সৌভাগ্য তার! সে তো শাহাদাতের মৃত্যু লাভ করেছে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিছুতেই নয়; বণ্টনবিহীন যে আলখেল্লা খাইবারের যুদ্ধে যে আত্মসাৎ করেছে তার আগুনে সে অবশ্যই দগ্ধ হবে। এ কথা শ্রবণে উপস্থিত লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হলো। তখন এক ব্যক্তি জুতোর দু'একটি ফিতা এনে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি তা খাইবারের দিন নিয়েছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ তো আগুনের ফিতা; অথবা বলেছেন, এ ফিতাদ্বয় তো আগুনের।
বণ্টনের আগে গনীমতের মাল গ্রহণ জায়েয নেই—এ কথা জানা সত্ত্বেও অনেক মুজাহিদ সম্পদের আধিক্য দেখে ধৈর্যহারা হয়ে মনে করেন, আমার জিহাদ মাল আত্মসাতের ক্ষতিপূরণ হবে। এসব ক্ষেত্রেই ঈমান ও ইলমের নিদর্শন স্পষ্ট হয়ে যায়। আর ওবায়দা আলআশআরী বলেন, মুসলমানরা যখন মাদায়েইন অবতরণ করে গনীমতলব্ধ মাল জমা করতে লাগল, তখন এক ব্যক্তি এসে তার নিকট বিদ্যমান গনীমতের মাল জমাকারীর নিকট জমা দিলে জমাকারীর সাথী বলল, এমন উদার দিল মানুষ তো আমি আগে দেখিনি। সে যা জমা দিয়েছে তার মূল্য তো আমাদের গনীমতলব্ধ সব সম্পত্তি ছাড়িয়ে যাবে। সে তখন বলল, তুমি কি এখান থেকে নিজের জন্য কিছু রেখেছ? লোকটি বলল, আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ ভয় আমার অন্তরে না থাকত তাহলে তোমাদের নিকট আমি তা কিছুতেই জমা দিতাম না। তারা তখন বুঝল যে, লোকটি বড় মাপের কোনো ব্যক্তি হবেন। তারা পরিচয় জানার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল, কে আপনি? কী আপনার পরিচয়? সে বলল, আল্লাহর কসম! তোমাদের প্রশংসা লাভের উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে আমার পরিচয় দেব না এবং তোমাদের উচ্চ প্রশংসা পাওয়ার আশায় তোমাদেরকে প্রচারিতও করব না; বরং আমি আল্লাহর প্রশংসা করি এবং তারই প্রতিদানেই আমি সন্তুষ্ট। তখন পরিচয় জানার উদ্দেশ্যে তারা এক ব্যক্তিকে তার পিছু পাঠায়। লোকটি নিজ সম্প্রদায়ের নিকট পৌঁছলে সে তার সাথিদেরকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, ইনি আমের বিন আবদে কায়েস রহ.।
টিকাঃ
২. সহিহ বুখারি: ৪২৩৪; সহিহ মুসলিম: ১১৫।
📄 সরকাজে আদেশ ও সৎকাজে বাধাদানকারীদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত
এ ধরনের লোক দু’প্রকার—আলেম ও জাহেল। ইবলিস আলেমদেরকে দুই পদ্ধতিতে ধোঁকা দেয়।
১. শয়তান তার কাজে খ্যাতি ও আত্মশ্লাঘার স্পৃহা সৃষ্টি করে। আবু সোলায়মান বলেন, জুমার খুৎবায় খলিফা আবু জাফর মানসুরকে কাঁদতে দেখে আমি ভীষণ রাগান্বিত হই। ফলে খুৎবা শেষে নামার সময় দাঁড়িয়ে তার কৃতকর্মের ব্যাপারে তাকে নসিহত করার সংকল্প করি। কিন্তু মানুষের উপস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কোনো খলিফাকে নসিহত করা আমার নিকট অপছন্দনীয় মনে হলো। কেননা এতে মানুষের দৃষ্টি আমার দিকে নিবদ্ধ হবে এবং তা আমার খ্যাতি অর্জনের কারণ হবে। তাই আমি চুপ করে বসে রইলাম। কারণ আমার নিয়তে এখন ইখলাস নেই।
২. প্রবৃত্তির তাড়নায় ক্রোধান্বিত ও রাগান্বিত হওয়া। এ অবস্থা কখনো কখনো শুরুতেই সৃষ্টি হয়ে যায়। আবার কখনো আদেশ-নিষেধের মাঝে সৃষ্টি হয়। ফলে যে ক্রোধ আল্লাহর জন্য ছিল তা উল্টো নিজ স্বার্থ হাসিলের কারণ হয়ে যায়। এরূপ পরিস্থিতিতে আমাদের আকবিররা তো দণ্ড প্রয়োগ হতেও বিরত থাকতেন। হজরত ওমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. এক ব্যক্তিকে বললেন, যদি আমি ক্রোধান্বিত না হতাম তাহলে তোমার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করতাম। তার এ কথার মর্ম হলো, তুমি যেহেতু আমাকে ক্রোধান্বিত করেছ তাই আমার আশঙ্কা হলো যে, এ মুহূর্তে তোমাকে শাস্তি প্রদান করলে আল্লাহর জন্য উৎসারিত ক্রোধের সাথে নিজ ক্রোধের সংমিশ্রণ ঘটবে।
***
শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমনকারী ব্যক্তি যদি আলেম না হয় তাহলে শয়তান তাকে নিয়ে খেলা করে। ফলে তার আদেশ-নিষেধের দ্বারা সংশোধনের চেয়ে বিশৃঙ্খলা বেশি ছড়ায়। কারণ সে অজ্ঞতাবশত এমন বিষয়ে বাধা প্রদান করে যা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। আর কখনো এমন বিষয়ে বিরোধিতা করে যাতে ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে এবং কতক মাজহাবেও তার ওপর আমল রয়েছে। আবার কখনো দরজা ভেঙ্গে অথবা দেয়াল টপকিয়ে মন্দকর্ম সম্পাদনকারীদের মারধর করে তাদেরকে দোষারোপ করে। যদি তারা কোনো উত্তর দেয় তাহলে তা তাকে ভীষণ পীড়া দেয়। ফলে আল্লাহর জন্য উৎসারিত ক্রোধের ওপর নিজ ক্রোধ প্রাধান্য পায়। আবার কখনো সে এমন বিষয় প্রকাশ করে দেয় শরিয়ত যা গোপন করার আদেশ করেছে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে এমন সম্প্রদায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, যাদের সাথে রয়েছে ঢাকনাবৃত মদ। তিনি বললেন, যদি তা ঢাকনাবৃত হয় তাহলে তোমরা তা ভেঙ্গো না। তাকে আরেক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যিনি বাঁশি ও তবলার আওয়াজ শোনেন কিন্তু সে আওয়াজ কোথা হতে ভেসে আসে তা তার জানা নেই। তিনি বললেন, অদৃশ্য বিষয়ে অনুসন্ধান তোমার দায়িত্ব নয়, সুতরাং তার অনুসন্ধান হতে নিজেকে বিরত রাখো। আবার কখনো দুষ্টের দমনকারী এ ব্যক্তি মন্দকর্ম সম্পাদনকারীর বিষয়টি এমন ব্যক্তির নিকট পেশ করে, যে তার ওপর জুলুম করবে, অথচ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেছেন, তুমি যদি জানো যে, এ ব্যক্তির মন্দ কর্মের বিষয়টি বাদশার নিকট পেশ করলে তিনি শরিয়ত মোতাবেক শাস্তিদান করবেন তাহলে তার নিকট তা পেশ করো।
দুষ্টের দমনকারীদেরকে শয়তান ধোঁকা দেয়ার আরেক পদ্ধতি হলো, সে যখন মন্দ কাজের বিরোধিতা করে তখন কোনো এক মজলিসে বসে মন্দ কাজের বিবরণ তুলে ধরে এবং তা নিয়ে সে গর্ববোধ করে। অতঃপর সে মন্দকর্ম সম্পাদনকারীদেরকে ক্রোধান্বিত ব্যক্তির ন্যায় গালিগালাজ করে তাদেরকে অভিশাপ দিতে থাকে। অথচ এমনও হতে পারে, যাদেরকে সে গালিগালাজ করে অভিশাপ দিচ্ছে—তারা কৃত মন্দকাজ হতে তাওবাহ করেছে। ফলে মন্দকর্মের ওপর অনুশোচনার দরুন তারা হয়ে যায় শ্রেষ্ঠ, আর বড়ত্ব প্রকাশের দরুন সে হয়ে যায় নিকৃষ্ট। আর মুসলমানদের দোষ প্রকাশ করে সে ওইসব লোকদের দলভুক্ত হয় যাদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের দোষ অনুসন্ধান করবে আল্লাহ তার দোষ প্রকাশ করে দেবেন, আর আল্লাহ যার দোষ প্রকাশ করবেন তাকে তিনি লাঞ্ছিত করবেন, যদিও সে রুদ্ধদ্বার কক্ষে থাকুক। আমি দুষ্টের দমনকারীদের রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ—এমন ব্যক্তি সম্পর্কে শুনেছি, সে ধারণার বশীভূত হয়ে মন্দ কর্মকারীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাদেরকে কষ্টদায়ক শাস্তি দেয়, তাদের পাত্রে কি রয়েছে তা নিশ্চিতভাবে জানার আগেই পাত্রসমূহ ভেঙ্গে ফেলে। এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, শরিয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতাই তাদেরকে এ রূপ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
আমাদের পূর্বসূরিরা মন্দকাজে বাধাদানের ক্ষেত্রে কোমলতা প্রদর্শন করতেন। সিলাহ ইবনে আশাম কোন ব্যক্তিকে এক মহিলার সাথে কথা বলতে দেখে বললেন, দেখো, আল্লাহ কিন্তু তোমাদেরকে দেখছেন; আল্লাহ আমাদের এবং তোমাদের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখুন।
আরেকদিন খেল-তামাসায় লিপ্ত এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে তাদেরকে বললেন, হে ভাইয়েরা! এমন ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের কী মন্তব্য, যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার ইচ্ছা করেছে, অথচ রাত কাটে তার নিদ্রাবস্থায় আর দিন অতিবাহিত হয় খেল-তামাসায়। আচ্ছা বলো তো, এ ব্যক্তির সফর কবে শেষ হবে! তখন তাদের একজন সতর্ক হয়ে বলল, হে সম্প্রদায়ের লোকেরা, এ ব্যক্তি তো আমাদেরকে শিখাচ্ছেন। সে তখন তাওবা করে তার সাহচর্য গ্রহণ করে।
***
মন্দকাজের বিরোধিতার ক্ষেত্রে কোমল ব্যবহার লাভের সর্বাধিক হকদার রাজা-বাদশাহ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। তাই তাদেরকে হেকমতের সাথে এভাবে বলা, আল্লাহ আপনাদের মর্যাদা উঁচু করেছেন, আপনারা তার নেয়ামত লাভ করেছেন। তাই নেয়ামত ভোগের বিপরীতে আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত হওয়া তো অনুত্তম আচরণ।
***
ইবলিসের প্ররোচনায় পড়ে কিছু ইবাদতকারী এমনও আছেন, যারা কোনো মন্দ কাজ হতে দেখলে তার বিরোধিতা করেন না। তারা বলেন, সৎকাজে ও মন্দকাজে বাধাদান তো ওই ব্যক্তি করবে, যে সৎকর্মশীল ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী। আর আমি তো সৎকর্মশীল নই, তাই সৎকাজে আদেশ ও মন্দকাজে বাধাদান আমার জন্য শোভনীয় নয়। এমন ব্যক্তিদের জেনে রাখা উচিত, তারা যা ধারণা করেছে তা সম্পূর্ণ ভুল। কেননা সৎকাজে আদেশ ও মন্দকাজে বাধাদান তো প্রত্যেকের ওপর ওয়াজিব, যদিও মন্দকাজের এ প্রবণতা তাদের মাঝে থাকুক। তাই মন্দকাজে তার বাধাদানকারীর উচিত নিজেকে পরিশুদ্ধ করা, যেন তার বাধাদান মানুষকে প্রভাবিত করে।
ইবনে আকিল বলেন, আমাদের জমানায় আমি আবু বকর আকফালিকে খলিফা থাকাকালীন দেখেছি, তিনি যখন কোনো মন্দকাজে বাধাদানের প্রস্তুতি নিতেন তখন তার সাথে এমন বুযুর্গদের নিয়ে যেতেন যারা নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্য দ্বারাই আহার করতেন। কারও কাছে হাত পাততেন না বা কারও হাদিয়ার আশায় থাকতেন না। আবু বকর খাব্বায রুটি তৈরি করতেন। তারা ইবাদতের ক্ষেত্রেও ছিলেন অধ্যবসায়ী। দিনে রোযা রাখতেন আর রাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন।