📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 রাতের বেলা দীর্ঘ নামায পড়া

📄 রাতের বেলা দীর্ঘ নামায পড়া


একদল আবেদ আছেন, যাদের ওপর শয়তান এমন প্ররোচনা দিতে থাকে যে, তারা রাতের বেলা অধিক পরিমাণে নফল পড়ে, কেউ-বা সারারাত নফল ইবাদতের পর ফজরের পূর্ব মুহূর্তে ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে তার ফজর নামায কাযা হয়ে যায় কিংবা জাগ্রত হয়ে নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বেই জামাত শেষ হয়ে যায় অথবা জামাতের সাথে নামায পড়ে ঠিকই, কিন্তু রাত জাগরণের দরুন শারীরিক দুর্বলতার কারণে পরিবারের জন্য উপার্জনের ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, আমি হোসাইন কাযবিনী নামক এক বড় আবেদকে দেখেছি, যিনি দিনের বেলায় জামে' মানসূরের ভেতর অধিক পরিমাণে হাঁটতেন। আমি হাঁটার কারণ জিজ্ঞেস করলে আমাকে বলা হলো, ঘুম দূর করার জন্যই এ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। তখন আমি বললাম, শরিয়ত এবং বিবেক-বোধের দাবিমতে এটা মারাত্মক মূর্খতা ও অজ্ঞতার পরিচায়ক। শরিয়তের দৃষ্টিতে মূর্খতার প্রমাণ হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَقُمْ وَنُمْ 'তোমার ওপর তোমার নফসের হক রয়েছে। সুতরাং ইবাদতের পাশাপাশি বিশ্রাম গ্রহণ করো।" তিনি আরও বলেন,
عَلَيْكُمْ هَدْيًا قَاصِدًا فَإِنَّهُ مِنْ يُشَادَّ هَذَا الدِّينَ يَغْلِبُهُ 'তোমাদের উচিত, সহজ পন্থা অবলম্বন করা। কেননা যে এই দীনের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করবে সে পরাজিত হবে।"'

হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন,
دَخَلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَسْجِدَ، وَحَبْلٌ مَمْدُودٌ بَيْنَ سَارِيَتَيْنِ فَقَالَ: " مَا هَذَا؟ " قَالُوا : لِزَيْنَبَ تُصَلَّى ، فَإِذَا كَسِلَتْ أَوْ فَتَرَتْ أَمْسَكَتْ بِهِ، فَقَالَ: " حُلُّوهُ ". ثُمَّ قَالَ: " لِيُصَلِّ أَحَدُكُمْ نَشَاطَهُ، فَإِذَا كَسِلَ أَوْ فَتَرَ فَلْيَقْعُدْ
'একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করে দুই স্তম্ভের মাঝে একটি রশি বাঁধা অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? তখন উপস্থিত লোকেরা বলল, এটা যয়নব তৈরি করেছে। নামায পড়তে পড়তে যখন সে অলস কিংবা দুর্বল হয়ে যায়, তখন রশির সাথে নিজেকে বেঁধে রাখে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের প্রত্যেকে যেন উদ্যমের সাথে নামায পড়ে, অলস কিংবা দুর্বল হয়ে পড়লে সে যেন বিশ্রাম নেয়।'

হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرْقُدْ، حَتَّى يَذْهَبَ عَنْهُ النَّوْمُ، فَإِنَّهُ إِذَا صَلَّى وَهُوَ يَنْعَسُ لَعَلَّهُ يَذْهَبُ يَسْتَغْفِرُ، فَيَسُبُّ نَفْسَهُ
'তোমাদের কারও তন্দ্রা এলে সে যেন শুয়ে ঘুমের চাহিদা পূরণ করে। আর যদি তন্দ্রাভাব নিয়ে নামায পড়ে তাহলে হতে পারে সে ইস্তেগফার করতে গিয়ে নিজেকেই গালমন্দ করবে।"

এটা হচ্ছে শরিয়তের প্রমাণ। অন্যদিকে বিবেক-বুদ্ধির দাবি-জাগ্রত অবস্থায় কর্ম সম্পাদনে ব্যয় হওয়া শক্তিতে ঘুম নতুনত্ব দান করে, ফলে সে হৃত শক্তি ফিরে পায় এবং কর্ম সম্পাদনের নতুন উদ্যম লাভ করতে পারে। তাই প্রয়োজনের মুহূর্তে যদি মানুষ ঘুম থেকে বিরত থাকে, তাহলে ঘুমের প্রভাব তার দেহে বিচরণ করে দেহ ও মস্তিষ্কের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আগেকার যুগের মনীষীরা তো রাতব্যাপী ইবাদত করতেন এবং তা তাদের নিয়মিত আমলে পরিণত হয়েছিল। এ প্রশ্নের উত্তর—তারা প্রথমেই রাতব্যাপী ইবাদত করতে শুরু করেননি; বরং ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে অনুশীলনের মাধ্যমেই রাত্রি জাগরণের সক্ষমতা অর্জন করেছেন। তাছাড়া এ সব মনীষী রাত জাগরণ সত্ত্বেও ফজরের নামায জামাতের সহিত আদায় করার ব্যাপারে নিজেদের প্রতি আস্থাবান ছিলেন। এ ছাড়া অল্প আহারে অভ্যস্ত হওয়ার দরুন দুপুরের সামান্য বিশ্রামেই তাদের ঘুমের চাহিদা মিটে যেত। সুতরাং রাত্রি জাগরণ সত্ত্বেও তারা ক্লান্ত হতেন না; বরং পূর্ণ উদ্যমের সাথেই নামায আদায়ের সৌভাগ্য লাভ করতেন। হাদিসের কোনো বাক্যে এমন নেই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো একটি রাতও না ঘুমিয়ে ইবাদত করেছেন। অতএব অনুসরণ করতে হবে একমাত্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতকেই।

কিছু ইবাদতকারীর ক্ষেত্রে শয়তান এমন ফাঁদ পেতে থাকে যে, তারা রাতব্যাপী ইবাদত করে দিনে তা মানুষের নিকট বলে বেড়ায়। তবে বলার কৌশল হয় ভিন্ন ও চমকপ্রদ। কেউ বলে, আজ ফজরের আযান অমুক মুয়াজ্জিন দিয়েছে। এতে তার উদ্দেশ্য-মানুষ যেন বুঝতে পারে, আযানের সময় সে জাগ্রত ছিল। আর এ আচরণকে আমরা যদি রিয়ামুক্ত মেনেও নিই, তার ক্ষতির জন্য এটুকু যথেষ্ট যে, তার গোপন আমলের সাওয়াব প্রকাশ্য আমল দ্বারা রূপান্তরিত হলো। ফলে তার সাওয়াবের পরিমাণ কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে বলে বিবেচিত হবে।

অনেক ইবাদতকারী এমনও আছেন, যারা সর্বদা মসজিদে নফল ইবাদত ও যিকির-আযকার করে থাকেন। এতে এক পর্যায়ে ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রে তারা খ্যাতি লাভ করেন এবং ক্রমান্বয়ে লোকজন তাদের নিকট সমবেত হয়ে তাদের মতো নামায পড়া শুরু করেন। এভাবে তাদের ইবাদতের বিষয়টি দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ে। কোনো সন্দেহ নেই, এরা শয়তানের ফাঁদে পা দিয়েই এমনটি করে থাকেন। কেননা মানুষের মাঝে তাদের ইবাদতের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়া এবং মানুষের মুখে তাদের উচ্চ প্রশংসার বিষয়টি জানতে পেরেই ইবাদত-বন্দেগিতে তাদের প্রবৃত্তি শক্তিশালী হয় এবং নফল ইবাদত অধিক পরিমাণে করা তাদের জন্য সহজ থেকে সহজতর হতে থাকে। তারা যা করছে, তা যে শয়তানের একটি চক্রান্ত, তা প্রমাণ করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদিসই যথেষ্ট।

হজরত যায়দ ইবনে সাবিত রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِنَّ أَفْضَلَ صَلَاةِ الْمَرْءِ فِي بَيْتِهِ إِلَّا الصَّلَاةَ الْمَكْتُوبَةَ
'পুরুষের জন্য ফরয নামায ব্যতীত অন্য সব নামাযের সর্বোত্তম স্থান হলো ঘর।'

আমের ইবনে আবদে কায়েস—তার নামায পড়া মানুষ দেখুক—এটাও তিনি পছন্দ করতেন না। এ কারণেই তিনি কখনো মসজিদে নফল পড়তেন না। অথচ তার দৈনিক নফলের পরিমাণ ছিল এক হাজার রাকাত। ইবনে আবি লায়লার অবস্থা ছিল—তিনি নামায পড়াকালীন কেউ তার ঘরে প্রবেশ করলে তিনি তৎক্ষণাৎ শুয়ে পড়তেন।

কতেক ইবাদতকারীকে দেখা যায়, তারা দোয়াকালীন কান্না শুরু করলে যদি মানুষ তাদের নিকট সমবেত হয় তাহলে কান্নার গতি বাড়িয়ে দেন। অথচ নিঃশব্দে ক্রন্দন যার পক্ষে সম্ভব, সে যদি সশব্দে ক্রন্দন করে তাহলে সে নিজেকে রিয়াকার হিসেবে প্রকাশ করল। আসেম বলেন, আবু ওয়ায়েল ঘরে নামায পড়াকালে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। অথচ দুনিয়ার সমুদয় সম্পদের বিনিময়ে যদি কেউ তার কাঁদার দৃশ্য দেখার প্রস্তাব করত, তিনি তা কখনোই করতেন না। আইয়ুব সাখতিয়ানির কান্নার বেগ বেড়ে গেলে তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন।

কতেক আবেদের অবস্থা তো এমন, যারা রাত-দিন নফল পড়েন, কিন্তু অন্তর সংশোধন কিংবা খাদ্যের হালাল-হারামের পরোয়া করেন না। অথচ নফলের আধিক্য হতে অভ্যন্তরীণ চরিত্র সংশোধনের প্রতি লক্ষ করা ছিল অধিক দরকারি।

টিকাঃ
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৯৭৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১১৫৯
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৯
২. সহিহ বুखারি: হাদিস নং ১১৫০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭৮৪
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২১২, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭৮৬
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৭৩১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭৮১

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 কোরআন তেলাওয়াতের ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা

📄 কোরআন তেলাওয়াতের ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা


কিছু কারী অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করেন, কিন্তু তারতিল তাযভিদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না। অথচ এটা শরিয়াসিদ্ধ পন্থা নয়। এখন প্রশ্ন হতে পারে, পূর্ববর্তী ওলামাদের একদল তো দিনে এক খতম কিংবা প্রতি রাকাতে এক খতম কুরআন পড়তেন। এর জবাবে বলা যায়, তাদের থেকে এরূপ আমল কখনো কখনো প্রকাশ পেত। আর সর্বদা এভাবে তেলাওয়াত যদিও জায়েয, কিন্তু তারতিল ও তাযভিদ রক্ষা করে কুরআন তেলাওয়াত ওলামাদের নিকট মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لَا يَفْقَهُ مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ فِي أَقَلَّ مِنْ ثَلَاثٍ
'যে তিন দিনের কমে কুরআন খতম করে, কোরআন বোঝা তার পক্ষে সম্ভব হয় না।'

একদল কারীর অবস্থা তো এমন, যারা গভীর রাতে মসজিদের মিনারে আরোহণ করে উচ্চ আওয়াজে কুরআন তেলাওয়াত করে, আর শয়তানও এ বিষয়ে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে। তাদের জেনে রাখা উচিত যে, এ ধরনের তেলাওয়াত দু' ধরনের গুনাহকে অন্তর্ভুক্ত করে।

১. মানুষের ঘুমে বিঘ্ন ঘটিয়ে কষ্ট দেয়ার গুনাহ।
২. তেলাওয়াতের উদ্দেশ্য লোকদেখানো হওয়ার রিয়াকারের গুনাহ। তাদের কেউ তো এমন, যারা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে আযানের সময় মসজিদে তেলাওয়াত করেন, কেননা তা হচ্ছে লোক সমাগমের সময়।

আল্লামা ইবনুল জাওযি বলেন, এসব কারীর যে বিষয়টি আমাকে অবাক করেছে তা হলো, এক কারী ইমাম জুমআর দিন ফজর নামাজের পর মুসল্লিদের অভিমুখী হয়ে সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে কুরআন খতমের দোয়া করতেন। উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন মনে করে যে, তিনি কুরআন খতম করেছেন। এমন কারীদের জেনে রাখা উচিত, আমাদের পূর্বসূরিদের রীতিনীতি এরূপ ছিল না; বরং তারা তো ইবাদত করতেন অতি গোপনে। কেউ তাদের ইবাদত দেখুক কিংবা ইবাদত সম্পর্কে অবগত হোক, এটা তারা মোটেও পছন্দ করতেন না। রাবি বিন খুসাইম তো সব আমলই গোপনে করতেন। যদি দেখে কুরআন পড়াবস্থায় কেউ তার ঘরে প্রবেশ করত তাহলে কাপড় দিয়ে কুরআন ঢেকে ফেলতেন; যেন তার কুরআন তেলাওয়াতের বিষয়টি আগন্তুক বুঝতে না পারে। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তো অধিক পরিমাণে কুরআন পড়তেন, অথচ কখন তিনি কুরআন খতম করেন তা কেউ জানতেন না।

গ্রন্থকার বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা কারীদের ওপর শয়তানের চক্রান্তবিষয়ক অধ্যায়ে গত হয়েছে। আল্লাহই সঠিক জ্ঞাত এবং তিনিই তাওফিকদাতা।

টিকাঃ
২. মুসনাদে আহমদ, আলবানি রহ. প্রণীত 'সিফাতু সালাতিন নাবী (সা): পৃষ্ঠা ১১৯

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 রোজার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা

📄 রোজার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা


কিছু লোকের অবস্থা তো এমন, শয়তান যাদেরকে সর্বদা রোযা রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। এটা জায়েজ, যদি সে রোযা রাখতে গিয়ে নিষিদ্ধ দিনগুলোতে রোযা হতে বিরত থাকে। তবে আপত্তি আসে দুই কারণে।

১. অনবরত রোযা রাখার দরুন শরীর দুর্বল হওয়ায় পরিবারের রুজি উপার্জনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং স্ত্রী মিলনে অক্ষম হওয়ার দরুন স্ত্রীর চারিত্রিক পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায়। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
ان لزوجكَ عَلَيْكَ حَقًّا 'নিশ্চই তোমার ওপর আপন স্ত্রীরও হক রয়েছে।”
সুতরাং এ নফলের দরুন কত ফরজ যে নষ্ট হয় তা গণনা করা দুষ্কর।

২. অনবরত রোযা রাখার দরুন সে রোযার সর্বোত্তম ফযিলত হাতছাড়া করে। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় রোযা দাউদ আলাইহিস সালামের রোযা, তিনি একদিন রোযা রাখতেন একদিন পানাহার করতেন।”

হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস রা. বলেন, আমার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হলো যে, ইবনুল আস বলে, আমি যতদিন জীবিত থাকব ততদিন রাতভর নামায ও দিনভর রোযা রাখব। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি কি এমনটি বলো? আমি তখন বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি এমনটি বলেছি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কিছুতেই তা পারবে না। সুতরাং তুমি একদিন রোযা রাখো, একদিন পানাহার করো। রাতের কিছু সময় ঘুমাও, কিছু সময় নামায পড়ো। আর মাসের তিনদিন রোযা রাখো। কেননা ভালো কাজের প্রতিদান দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়, আর দাউদ আলাইহিস সালাম এর রোযা এমনই ছিল। তখন আমর ইবনুল আস রা. বললেন, আমি এর চেয়ে বেশি রাখতে সক্ষম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে একদিন রোযা রাখো আর দুই দিন পানাহার করো। তখন আমর ইবনুল আস বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি এর চেয়ে বেশি রাখতে সক্ষম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে একদিন রোযা রাখো একদিন পানাহার করো। আর এটাই দাউদ আলাইহিস সালাম এর রোযা এবং এ রোযাই সর্বাধিক ভারসাম্যপূর্ণ। তখন আমর ইবনুল আস রা. বললেন ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি এর চেয়ে বেশি রাখতে সক্ষম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর চেয়ে উত্তম কোনো রোযা নেই।"

কেউ যদি প্রশ্ন করে যে, পূর্ববর্তী বুযুর্গদের কেউ কেউ অনবরত সারা বছর রোযা রেখেছেন। আমরা বলব, তারা ধারাবাহিকভাবে রোযা রাখা সত্ত্বেও পরিবারের রুজি উপার্জনের সক্ষম ছিলেন। কিংবা এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, তাদের অধিকাংশের পরিবার ছিল না; ফলে তারা উপার্জনেরও মুখাপেক্ষী ছিলেন না। অবশ্য তাদের অধিকাংশই ধারাবাহিকভাবে রোযা রাখার আমলটি জীবনের শেষ সময়ে করেছেন। তদুপরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা- لَا أَفْضَلَ مِنْ ذَلِكَ 'এর চেয়ে উত্তম কোনো রোযা নেই' এর সামনে অন্য কারও কাজকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো সুযোগ নেই। এসব লোক স্বল্প পরিমাণে শুকনো খাবার ভক্ষণের দরুন দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং মগজ-মস্তিষ্ক রুক্ষ হয়ে যায়। এটা নিজের প্রতি এমন জুলুম, শরিয়ত যার সমর্থন করে না।

অনেক ইবাদতকারী বছরব্যাপী অনবরত রোযা রাখেন এবং রোযার দরুন তাদের যশ-খ্যাতি লোকসমাজে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তারা কখনোই রোযা হতে বিরত হন না। আর যদি কখনো রোযা ভঙ্গ করেন তাহলে লোকচক্ষুর অন্তরালে পানাহার করেন, যেন তাদের যশ-খ্যাতি লোপ না পায়। এটা তো গোপন রিয়া। যদি তার মাঝে ইখলাস থাকত এবং নিজ আমল গোপনের সদিচ্ছা থাকত তাহলে সে ওই ব্যক্তির সামনে পানাহার করত, যে তার রোযার বিষয়ে অবগত। অতঃপর পুনরায় সে এমনভাবে রোযা রাখত যেন কেউ বুঝতে না পারে। অনেকের অবস্থা তো এমন, যারা রোযার বিষয়ে মানুষের নিকট বলে বেড়ায়। তাই সে বলে, আজ বিশ বছর যাবৎ আমি রোযা ভাঙ্গিনি। আর শয়তানও এ বিষয়ে তাকে প্ররোচনা দিয়ে বলে, তোমার রোযা রাখার বিষয়টি মানুষকে বলা উচিত, যাতে মানুষ তোমার অনুসরণ করতে পারে। আল্লাহই মানুষের মনের খবর ভালো জানেন।

সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন, এক ব্যক্তি দীর্ঘ দিন একটি আমল গোপনে করতে থাকে। পরে শয়তানের প্রলোভনের জালে আটক হয়ে সে অন্যের নিকট তা প্রকাশ করে দেয়। ফলে সে গোপনীয়তা রক্ষাকারীর দল থেকে বের হয়ে রিয়াকারদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কিছু কিছু আবেদ আছেন, যারা স্বভাবত সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখেন। যদি সেদিন তাদেরকে কেউ দাওয়াত করে তাহলে তারা বলেন, আজ না বৃহস্পতিবার! এ কথার উদ্দেশ্য হল মানুষ যেন বুঝে নেয় যে, এ ব্যক্তি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার নিয়মিত রোযার আমল করে থাকেন। অনেক ইবাদতকারী নিয়মিত রোযা রাখার দরুন অন্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তার প্রতি বাঁকা দৃষ্টিতে তাকান। কেউ কেউ আবার নিয়মিত রোযা রাখা সত্ত্বেও না ইফতারিতে হালাল-হারামের যাচাই-বাছাই করেন, না রোযাবস্থায় গীবত-শেকায়েত, মহিলাদের প্রতি কুদৃষ্টি নিক্ষেপ এবং অশালীন কথাবার্তা থেকে বিরত থাকেন। আর শয়তানও তাদের মনে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করে যে, রোযাই তোমার এসব গুনাহ মিটিয়ে দেবে। অথচ এর সবই শয়তানের সূক্ষ্ম চক্রান্ত।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৯৭৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১১৫৯
২. প্রাগুক্ত
৩. প্রাগুক্ত

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 হজের ব্যাপারে শয়তানের চক্রান্ত

📄 হজের ব্যাপারে শয়তানের চক্রান্ত


গ্রন্থকার বলেন, একবার হজ পালনের দ্বারাই মানুষের ওপর থেকে হজের ফরযিয়্যাত রহিত হয়ে যায়। এতৎসত্ত্বেও বহু লোক এমন আছেন, যারা হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে সফর করেন। এটা যে পুণ্যের কাজ এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ ও আপত্তি উত্থাপন এক মারাত্মক অন্যায়। কিন্তু আপত্তি তখনই আসে, যদি এ হজ পালন পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির কারণ হয়, অথবা হজ পালকারী মাজলুম থেকে জুলুমের ক্ষমা না নিয়ে থাকে, অথবা হজ পালনের উদ্দেশ্য যদি হয় আনন্দ-বিনোদনে মন উৎফুল্ল করা, অথবা এমন মাল দ্বারা হজ করা যা সন্দেহযুক্ত, কিংবা এ উদ্দেশ্যে হজ পালন করা, যেন মানুষ তাকে হাজী সাহেব বলে। এদের অধিকাংশের অবস্থা এমন, যারা হজের সফরে পবিত্রতা ও নামাজের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ফরয নষ্ট করেন, আর কা'বার চারপাশে সমাবেত হন এমন অন্তর নিয়ে যা কলুষিত, এমন হৃদয় দিয়ে যা অপবিত্র। অথচ হজের উদ্দেশ্য হলো অন্তরের নৈকট্য; দেহের নৈকট্য নয়, আর অন্তরের নৈকট্য তো তাকওয়া বিনে অর্জন সম্ভব নয়।

কতেক হাজী বহুবার হজ করে মানুষের কাছে বলে, আমি বিশবার হজ করেছি। আবার কিছুলোক এমনও আছেন যারা কা'বার পাশাপাশি অবস্থান করা সত্ত্বেও অন্তর পবিত্র করার প্রতি মনোযোগ দেন না; বরং দম্ভ করে বলেন, আজ বিশ বছর যাবৎ কা'বার পাশে অবস্থান করছি। এসব বিষয় রিয়ার অন্তর্ভুক্ত।

অনেক হাজী নামায ছেড়ে দেয় এবং ওজনে কম দেয়, আর শয়তান তাদেরকে এই ধোঁকা দেয় যে, এসবের ক্ষতিপূরক হিসেবে হজই তোমার জন্য যথেষ্ট। শয়তানের প্ররোচনায় আকৃষ্ট হয়ে অনেক হাজী হজের পালনীয় কাজসমূহে এমন রীতি-নীতি আবিষ্কার করেন যার অস্তিত্ব শরিয়তে নেই। হাজীদের এক জামাতকে আমি দেখেছি, যারা এক কাঁধ হতে ইহরাম কাপড় খুলে দেন এবং দীর্ঘ সময় সূর্যের নিচে অবস্থান করেন, ফলে তাদের ত্বক নষ্ট হয়ে যায় আর মাথার চামড়া ফেটে যায় এবং এর মাধ্যমেই তারা মানুষদের নিকট নতুন বেশ ধারণ করেন। বুখারি শরিফের হাদিসে ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ وَهُوَ يَطُوفُ بِالكَعْبَةِ بِإِنْسَانٍ يَقُودُ إِنْسَانًا بخِزَامَةٍ فِي أَنْفِهِ، فَقَطَعَهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ، ثُمَّ أَمَرَهُ أَنْ يَقُودَهُ بِيَدِهِ
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে দেখলেন, সে মুখে লাগام বেঁধে কাবা ঘর তাওয়াফ করছে, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার লাগাম কেটে দেন। অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন, এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির নাকে লাগামের আংটা লাগিয়ে তাওয়াফ করাচ্ছে, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কেটে দেন এবং লোকটিকে হাত ধরে তাওয়াফ করানোর নির্দেশ দেন।'

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, এ হাদিস ধর্মের বিষয়ে এমন কিছু উদ্ভাবনের নিষেধাজ্ঞাকে অন্তর্ভুক্ত করে, যার উপমা শরিয়তে নেই। যদিও সে ভালো উদ্দেশ্যে এটি করে থাকে।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৬২১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00