📄 সুন্নত ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা
শয়তান কোনো কোনো আবেদকে প্ররোচনা ও ধোঁকা দিতে থাকলে সে বহু সুন্নত ছেড়ে দেয়। তাদের কারও অবস্থা হচ্ছে, নামাযে প্রথম কাতারে দাঁড়ান না। তাদের যুক্তি— পেছনের কাতারে দাঁড়ানো একাগ্রতার জন্য অধিক সহায়ক। তাই প্রথম কাতারে না দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় কাতারে দাঁড়ানোই আমার জন্য উত্তম। আবার কেউ কেউ নামাযে হাত বাঁধেন না। তারা বলেন, নামাযের প্রতি এমন একাগ্রতার বহিঃপ্রকাশ আমার নিকট অপছন্দনীয়, যা আমার অন্তরে নেই।
গ্রন্থকার বলেন, কিছু কিছু প্রসিদ্ধ বুযুর্গ থেকেও এরূপ আমল প্রকাশ পেয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, জ্ঞানের স্বল্পতাই তাদেরকে এরূপ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম রহ. তাঁদের বিশুদ্ধ গ্রন্থ সহিহ বুখারি ও মুসলিমে হজরত আবু হোরায়রা রা. এর সূত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস নকল করেন, যা সুস্পষ্টভাবে তাদের আমলকে সুন্নতপরিপন্থী হিসেবে প্রমাণিত করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যদি মানুষ আযান ও প্রথম কাতারের ফজিলত জানত, তাহলে লটারির মাধ্যমে হলেও তা লাভের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখত।'
সহিহ মুসলিমের অন্য রেওয়ায়েতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
خَيْرُ صُفُوفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا، وَشَرُّهَا آخِرُهَا
“প্রথম কাতার পুরুষের জন্য শ্রেষ্ঠতর আর শেষ কাতার তাদের জন্য নিকৃষ্টতর।”
অনুরূপভাবে নামাযে হাত বাঁধা সুন্নত হওয়ার বিষয়টিও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
وضع اليد على اليد من السنة
"নামাযে হাতের ওপর হাত রাখা সুন্নত।”
অন্য বর্ণনায় এসেছে- হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. নামাযে ডান হাতের ওপর বাঁ হাত রাখতেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি লক্ষ করে তাঁর বাঁ হাতের ওপর ডান হাত রেখে ভুল শুধরে দেন।'
প্রসিদ্ধ বুযুর্গদের উল্লেখিত আমলের প্রতি আমাদের নিন্দা দেখে আপনি আশ্চর্য হবেন না। কারণ, প্রকৃত নিন্দাকারী তো আমরা নই; শরিয়তের প্রমাণাদিই তাদের আমলের অসারতা প্রমাণ করে। আমরা শুধু আপনার নিকট তা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটুকু পালন করছি।
জনৈক লোক ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে বলল, ইবনুল মোবারক তো এমন এমন বলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ইবনুল মোবারক তো আকাশ থেকে অবতীর্ণ হননি। তাকে বলা হলো, ইবরাহিম ইবনে আদহামও এরূপ বলেন। তিনি বলেন, তোমরা এ বিষয়ে শরিয়তের দলিল উপস্থাপন করো, কেননা শরিয়তের অনুসরণই তোমাদের জন্য আবশ্যক। তাই স্বীয় হৃদয়রাজ্যে আসনগ্রহণকারী কোনো ব্যক্তির কথায় শরিয়তের অনুসরণ ছেড়ে দেয়া যাবে না। কেননা শরিয়ত সবার উপরে। সকলেই শরিয়তের অনুসারী, শরিয়ত কারও অনুসারী নয়। এমনও হতে পারে-এ বিষয়ক হাদিস তাঁর নিকট পৌঁছেনি।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৬১৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৪৩৭
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৪৪০
৩. সুনানে আবি দাউদ: ৭৫৪।
১. দেখুন আলবানি রহ. প্রণীত 'সিফাতু সালাতিন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম): পৃষ্ঠা ৮৭
📄 মাযহাবের ব্যাপারে নামাযির ওপর শয়তানের ধোঁকা
বহু নামাযিকে শয়তান আরবি শব্দের মাখরাজ তথা আদায়ের উৎপত্তিস্থলের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলে থাকে। তাই তারা الحمد الحمد 'আলহামদু আলহামদু'-এভাবে বারবার উচ্চারণের দরুন নামাযের শিষ্টাচারজনিত নিয়ম-কানুন থেকে বের হয়ে যায়। আবার কখনো তাশদিদ উচ্চারণের ক্ষেত্রে ধোঁকায় ফেলে, কখনো-বা المغضوب 'আল মাগদুবি' এর ضاد উচ্চারণের বেলায় ধোঁকায় পতিত করে থাকে।
আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, আমি এমন ব্যক্তিকে দেখেছি, যে 'আল মাগদুবি আলাইহিম' উচ্চারণ করছে আর ضاد উচ্চারণে চাপ প্রয়োগের দরুন তার থুথু বের হচ্ছে। এসব লোকের জেনে রাখা উচিত-উচ্চারণের ক্ষেত্রে এরূপ চাপ প্রয়োগ শরিয়াসমর্থিত নয়; বরং মাখরাজ থেকে প্রতিটি হরফকে সাবলীলভাবে উচ্চারণ করাই নামায বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
শয়তান এ জাতীয় লোকদেরকে উচ্চারণের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির দরুন শুদ্ধতার সীমা অতিক্রম করায়, আর উচ্চারণের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জনের দরুন তাদেরকে তেলাওয়া বোঝা হতে বঞ্চিত করে। কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান যার রয়েছে, সে পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারবে যে, শয়তান কর্তৃক দ্বিধা-সন্দেহ ও প্ররোচনার কারণেই তারা এরূপ করে থাকে। প্রমাণস্বরূপ হজরত আনাস বিন মালেক রা. এর হাদিস এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে-
সাঈদ বিন আবদুর রহমান বিন আবিল আমইয়া বলেন, সাহল বিন আবু উমামা আমাকে বলেছেন, আমি ও আমার পিতা একবার সাহাবি হজরত আনাস রা. এর দরবারে উপস্থিত হই। তিনি তখন এত সংক্ষিপ্ত নামায পড়ছিলেন যে, মনে হলো তা মুসাফিরের নামায। তিনি সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করলে আমরা বললাম, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। যে নামায পড়তে আমরা আপনাকে দেখেছি, তা কি ফরয নামায নাকি নফল নামায? যদি ফরয হয়ে থাকে, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি এভাবেই নামায পড়েছেন? তিনি বললেন, তা ফরয নামায এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এভাবেই নামায পড়েছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই বলতেন-
لَا تُشَدِّدُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ فَيُشَدِّدَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَإِنَّ قَوْمًا شَدَّدُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ فَشَدَّدَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ، فَتِلْكَ بَقَايَاهُمْ فِي الصَّوَامِعِ، وَالدُّيُورَاتِ رَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ
'তোমরা ইবাদত-বন্দেগিতে নিজেদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করো না। তাহলে হতে পারে অচিরেই তোমাদের প্রতি কঠোরতা চাপিয়ে দেয়া হবে। ইতোপূর্বে এক সম্প্রদায় নিজেদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করেছিল, ফলে আল্লাহ তাদের ওপর কঠোরতা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেছেন, তারা এমন সন্ন্যাসধর্ম আবিষ্কার করেছে, যা আমি তাদের ওপর ফরয করিনি।”
عَنْ أبى الْعَلَاءِ، أَنَّ عُثْمَانَ بْنَ أبى الْعَاصِ، أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ حَالَ بَيْنِي وَبَيْنَ صَلَاتِي وَقِرَاءَتِي يَلْبِسُهَا عَلَى، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ذَاكَ شَيْطَانٌ يُقَالُ لَهُ خَنُزَبُ، فَإِذَا أَحْسَسْتَهُ فَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْهُ، وَانْفِلْ عَلَى يَسَارِكَ ثَلَاثًا قَالَ: فَفَعَلْتُ ذَلِكَ فَأَذْهَبَهُ اللهُ عَنِّي
উসমান ইবনে আবিল আস রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! শয়তান আমার নামায, কেরাত এবং আমার মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা এক শয়তান। এর নাম 'খিন্যাব'। এরূপ অনুভব হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং বাঁ দিকে থুথু দেবে। অতএব আমি এরূপ করাতে আল্লাহ তায়ালা এ অবস্থা দূরীভূত করে দিয়েছেন。
শয়তানের এই ধোঁকার ফলে বহু মূর্খ আবেদ লম্বা লম্বা নামায পড়ে এবং বেশি পরিমাণে কেরাত পড়ে, কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ। তবে আপত্তির বিষয় হলো, তারা এ সব ক্ষেত্রে নামাযের বহু সুন্নত ছেড়ে মাকরুহে লিপ্ত হয়।
গ্রন্থকার বলেন, আমি জনৈক আবেদের সাক্ষাতে উপস্থিত হয়ে দেখি, তিনি দিনের বেলা নফল নামায পড়ছেন এবং নামাযে উচ্চ শব্দে তেলাওয়াত করছেন। আমি তাকে বললাম, দিনের বেলা উচ্চ শব্দে তেলাওয়াত করা মাকরুহ। তখন সে আমাকে বলল, আমি ঘুম তাড়ানোর উদ্দেশ্যে উচ্চ শব্দে তেলাওয়াত করছি। আমি তাকে বললাম, ঘুম তাড়ানোর জন্য তো সুন্নত ছাড়া যাবে না। যখন ঘুম তোমাকে কাবু করবে, তখন তুমি ঘুমিয়ে নাও। কেননা তোমার ওপর তোমার নফসের হক রয়েছে। হজরত বুরাইদা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
جهر بالقراءة في النهار فارجموه بالبعر 'যে ব্যক্তি দিনের বেলা উচ্চ শব্দে (নামাযে) কুরআন তেলাওয়াত করে তাকে গোবর নিক্ষেপ করো।"
টিকাঃ
১. [যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৬২৩২; সুনানে আবি দাউদ: ৪৯০৪; মুসনাদে আবি ইয়ালা : ৩৬৯৪।
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২২০৩
৩. [যঈফুন জিদ্দান] এটি কানযুল উম্মালে উল্লেখ আছে। হাদিসটির একজন রাবী 'মাতরূক'।
📄 রাতের বেলা দীর্ঘ নামায পড়া
একদল আবেদ আছেন, যাদের ওপর শয়তান এমন প্ররোচনা দিতে থাকে যে, তারা রাতের বেলা অধিক পরিমাণে নফল পড়ে, কেউ-বা সারারাত নফল ইবাদতের পর ফজরের পূর্ব মুহূর্তে ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে তার ফজর নামায কাযা হয়ে যায় কিংবা জাগ্রত হয়ে নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বেই জামাত শেষ হয়ে যায় অথবা জামাতের সাথে নামায পড়ে ঠিকই, কিন্তু রাত জাগরণের দরুন শারীরিক দুর্বলতার কারণে পরিবারের জন্য উপার্জনের ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, আমি হোসাইন কাযবিনী নামক এক বড় আবেদকে দেখেছি, যিনি দিনের বেলায় জামে' মানসূরের ভেতর অধিক পরিমাণে হাঁটতেন। আমি হাঁটার কারণ জিজ্ঞেস করলে আমাকে বলা হলো, ঘুম দূর করার জন্যই এ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। তখন আমি বললাম, শরিয়ত এবং বিবেক-বোধের দাবিমতে এটা মারাত্মক মূর্খতা ও অজ্ঞতার পরিচায়ক। শরিয়তের দৃষ্টিতে মূর্খতার প্রমাণ হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَقُمْ وَنُمْ 'তোমার ওপর তোমার নফসের হক রয়েছে। সুতরাং ইবাদতের পাশাপাশি বিশ্রাম গ্রহণ করো।" তিনি আরও বলেন,
عَلَيْكُمْ هَدْيًا قَاصِدًا فَإِنَّهُ مِنْ يُشَادَّ هَذَا الدِّينَ يَغْلِبُهُ 'তোমাদের উচিত, সহজ পন্থা অবলম্বন করা। কেননা যে এই দীনের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করবে সে পরাজিত হবে।"'
হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন,
دَخَلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَسْجِدَ، وَحَبْلٌ مَمْدُودٌ بَيْنَ سَارِيَتَيْنِ فَقَالَ: " مَا هَذَا؟ " قَالُوا : لِزَيْنَبَ تُصَلَّى ، فَإِذَا كَسِلَتْ أَوْ فَتَرَتْ أَمْسَكَتْ بِهِ، فَقَالَ: " حُلُّوهُ ". ثُمَّ قَالَ: " لِيُصَلِّ أَحَدُكُمْ نَشَاطَهُ، فَإِذَا كَسِلَ أَوْ فَتَرَ فَلْيَقْعُدْ
'একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করে দুই স্তম্ভের মাঝে একটি রশি বাঁধা অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? তখন উপস্থিত লোকেরা বলল, এটা যয়নব তৈরি করেছে। নামায পড়তে পড়তে যখন সে অলস কিংবা দুর্বল হয়ে যায়, তখন রশির সাথে নিজেকে বেঁধে রাখে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের প্রত্যেকে যেন উদ্যমের সাথে নামায পড়ে, অলস কিংবা দুর্বল হয়ে পড়লে সে যেন বিশ্রাম নেয়।'
হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرْقُدْ، حَتَّى يَذْهَبَ عَنْهُ النَّوْمُ، فَإِنَّهُ إِذَا صَلَّى وَهُوَ يَنْعَسُ لَعَلَّهُ يَذْهَبُ يَسْتَغْفِرُ، فَيَسُبُّ نَفْسَهُ
'তোমাদের কারও তন্দ্রা এলে সে যেন শুয়ে ঘুমের চাহিদা পূরণ করে। আর যদি তন্দ্রাভাব নিয়ে নামায পড়ে তাহলে হতে পারে সে ইস্তেগফার করতে গিয়ে নিজেকেই গালমন্দ করবে।"
এটা হচ্ছে শরিয়তের প্রমাণ। অন্যদিকে বিবেক-বুদ্ধির দাবি-জাগ্রত অবস্থায় কর্ম সম্পাদনে ব্যয় হওয়া শক্তিতে ঘুম নতুনত্ব দান করে, ফলে সে হৃত শক্তি ফিরে পায় এবং কর্ম সম্পাদনের নতুন উদ্যম লাভ করতে পারে। তাই প্রয়োজনের মুহূর্তে যদি মানুষ ঘুম থেকে বিরত থাকে, তাহলে ঘুমের প্রভাব তার দেহে বিচরণ করে দেহ ও মস্তিষ্কের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আগেকার যুগের মনীষীরা তো রাতব্যাপী ইবাদত করতেন এবং তা তাদের নিয়মিত আমলে পরিণত হয়েছিল। এ প্রশ্নের উত্তর—তারা প্রথমেই রাতব্যাপী ইবাদত করতে শুরু করেননি; বরং ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে অনুশীলনের মাধ্যমেই রাত্রি জাগরণের সক্ষমতা অর্জন করেছেন। তাছাড়া এ সব মনীষী রাত জাগরণ সত্ত্বেও ফজরের নামায জামাতের সহিত আদায় করার ব্যাপারে নিজেদের প্রতি আস্থাবান ছিলেন। এ ছাড়া অল্প আহারে অভ্যস্ত হওয়ার দরুন দুপুরের সামান্য বিশ্রামেই তাদের ঘুমের চাহিদা মিটে যেত। সুতরাং রাত্রি জাগরণ সত্ত্বেও তারা ক্লান্ত হতেন না; বরং পূর্ণ উদ্যমের সাথেই নামায আদায়ের সৌভাগ্য লাভ করতেন। হাদিসের কোনো বাক্যে এমন নেই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো একটি রাতও না ঘুমিয়ে ইবাদত করেছেন। অতএব অনুসরণ করতে হবে একমাত্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতকেই।
কিছু ইবাদতকারীর ক্ষেত্রে শয়তান এমন ফাঁদ পেতে থাকে যে, তারা রাতব্যাপী ইবাদত করে দিনে তা মানুষের নিকট বলে বেড়ায়। তবে বলার কৌশল হয় ভিন্ন ও চমকপ্রদ। কেউ বলে, আজ ফজরের আযান অমুক মুয়াজ্জিন দিয়েছে। এতে তার উদ্দেশ্য-মানুষ যেন বুঝতে পারে, আযানের সময় সে জাগ্রত ছিল। আর এ আচরণকে আমরা যদি রিয়ামুক্ত মেনেও নিই, তার ক্ষতির জন্য এটুকু যথেষ্ট যে, তার গোপন আমলের সাওয়াব প্রকাশ্য আমল দ্বারা রূপান্তরিত হলো। ফলে তার সাওয়াবের পরিমাণ কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে বলে বিবেচিত হবে।
অনেক ইবাদতকারী এমনও আছেন, যারা সর্বদা মসজিদে নফল ইবাদত ও যিকির-আযকার করে থাকেন। এতে এক পর্যায়ে ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রে তারা খ্যাতি লাভ করেন এবং ক্রমান্বয়ে লোকজন তাদের নিকট সমবেত হয়ে তাদের মতো নামায পড়া শুরু করেন। এভাবে তাদের ইবাদতের বিষয়টি দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ে। কোনো সন্দেহ নেই, এরা শয়তানের ফাঁদে পা দিয়েই এমনটি করে থাকেন। কেননা মানুষের মাঝে তাদের ইবাদতের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়া এবং মানুষের মুখে তাদের উচ্চ প্রশংসার বিষয়টি জানতে পেরেই ইবাদত-বন্দেগিতে তাদের প্রবৃত্তি শক্তিশালী হয় এবং নফল ইবাদত অধিক পরিমাণে করা তাদের জন্য সহজ থেকে সহজতর হতে থাকে। তারা যা করছে, তা যে শয়তানের একটি চক্রান্ত, তা প্রমাণ করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদিসই যথেষ্ট।
হজরত যায়দ ইবনে সাবিত রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِنَّ أَفْضَلَ صَلَاةِ الْمَرْءِ فِي بَيْتِهِ إِلَّا الصَّلَاةَ الْمَكْتُوبَةَ
'পুরুষের জন্য ফরয নামায ব্যতীত অন্য সব নামাযের সর্বোত্তম স্থান হলো ঘর।'
আমের ইবনে আবদে কায়েস—তার নামায পড়া মানুষ দেখুক—এটাও তিনি পছন্দ করতেন না। এ কারণেই তিনি কখনো মসজিদে নফল পড়তেন না। অথচ তার দৈনিক নফলের পরিমাণ ছিল এক হাজার রাকাত। ইবনে আবি লায়লার অবস্থা ছিল—তিনি নামায পড়াকালীন কেউ তার ঘরে প্রবেশ করলে তিনি তৎক্ষণাৎ শুয়ে পড়তেন।
কতেক ইবাদতকারীকে দেখা যায়, তারা দোয়াকালীন কান্না শুরু করলে যদি মানুষ তাদের নিকট সমবেত হয় তাহলে কান্নার গতি বাড়িয়ে দেন। অথচ নিঃশব্দে ক্রন্দন যার পক্ষে সম্ভব, সে যদি সশব্দে ক্রন্দন করে তাহলে সে নিজেকে রিয়াকার হিসেবে প্রকাশ করল। আসেম বলেন, আবু ওয়ায়েল ঘরে নামায পড়াকালে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। অথচ দুনিয়ার সমুদয় সম্পদের বিনিময়ে যদি কেউ তার কাঁদার দৃশ্য দেখার প্রস্তাব করত, তিনি তা কখনোই করতেন না। আইয়ুব সাখতিয়ানির কান্নার বেগ বেড়ে গেলে তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন।
কতেক আবেদের অবস্থা তো এমন, যারা রাত-দিন নফল পড়েন, কিন্তু অন্তর সংশোধন কিংবা খাদ্যের হালাল-হারামের পরোয়া করেন না। অথচ নফলের আধিক্য হতে অভ্যন্তরীণ চরিত্র সংশোধনের প্রতি লক্ষ করা ছিল অধিক দরকারি।
টিকাঃ
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৯৭৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১১৫৯
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৯
২. সহিহ বুखারি: হাদিস নং ১১৫০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭৮৪
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২১২, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭৮৬
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৭৩১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৭৮১
📄 কোরআন তেলাওয়াতের ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা
কিছু কারী অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করেন, কিন্তু তারতিল তাযভিদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না। অথচ এটা শরিয়াসিদ্ধ পন্থা নয়। এখন প্রশ্ন হতে পারে, পূর্ববর্তী ওলামাদের একদল তো দিনে এক খতম কিংবা প্রতি রাকাতে এক খতম কুরআন পড়তেন। এর জবাবে বলা যায়, তাদের থেকে এরূপ আমল কখনো কখনো প্রকাশ পেত। আর সর্বদা এভাবে তেলাওয়াত যদিও জায়েয, কিন্তু তারতিল ও তাযভিদ রক্ষা করে কুরআন তেলাওয়াত ওলামাদের নিকট মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لَا يَفْقَهُ مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ فِي أَقَلَّ مِنْ ثَلَاثٍ
'যে তিন দিনের কমে কুরআন খতম করে, কোরআন বোঝা তার পক্ষে সম্ভব হয় না।'
একদল কারীর অবস্থা তো এমন, যারা গভীর রাতে মসজিদের মিনারে আরোহণ করে উচ্চ আওয়াজে কুরআন তেলাওয়াত করে, আর শয়তানও এ বিষয়ে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে। তাদের জেনে রাখা উচিত যে, এ ধরনের তেলাওয়াত দু' ধরনের গুনাহকে অন্তর্ভুক্ত করে।
১. মানুষের ঘুমে বিঘ্ন ঘটিয়ে কষ্ট দেয়ার গুনাহ।
২. তেলাওয়াতের উদ্দেশ্য লোকদেখানো হওয়ার রিয়াকারের গুনাহ। তাদের কেউ তো এমন, যারা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে আযানের সময় মসজিদে তেলাওয়াত করেন, কেননা তা হচ্ছে লোক সমাগমের সময়।
আল্লামা ইবনুল জাওযি বলেন, এসব কারীর যে বিষয়টি আমাকে অবাক করেছে তা হলো, এক কারী ইমাম জুমআর দিন ফজর নামাজের পর মুসল্লিদের অভিমুখী হয়ে সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে কুরআন খতমের দোয়া করতেন। উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন মনে করে যে, তিনি কুরআন খতম করেছেন। এমন কারীদের জেনে রাখা উচিত, আমাদের পূর্বসূরিদের রীতিনীতি এরূপ ছিল না; বরং তারা তো ইবাদত করতেন অতি গোপনে। কেউ তাদের ইবাদত দেখুক কিংবা ইবাদত সম্পর্কে অবগত হোক, এটা তারা মোটেও পছন্দ করতেন না। রাবি বিন খুসাইম তো সব আমলই গোপনে করতেন। যদি দেখে কুরআন পড়াবস্থায় কেউ তার ঘরে প্রবেশ করত তাহলে কাপড় দিয়ে কুরআন ঢেকে ফেলতেন; যেন তার কুরআন তেলাওয়াতের বিষয়টি আগন্তুক বুঝতে না পারে। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তো অধিক পরিমাণে কুরআন পড়তেন, অথচ কখন তিনি কুরআন খতম করেন তা কেউ জানতেন না।
গ্রন্থকার বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা কারীদের ওপর শয়তানের চক্রান্তবিষয়ক অধ্যায়ে গত হয়েছে। আল্লাহই সঠিক জ্ঞাত এবং তিনিই তাওফিকদাতা।
টিকাঃ
২. মুসনাদে আহমদ, আলবানি রহ. প্রণীত 'সিফাতু সালাতিন নাবী (সা): পৃষ্ঠা ১১৯