📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 আযানের ক্ষেত্রে শয়তানের চক্রান্ত

📄 আযানের ক্ষেত্রে শয়তানের চক্রান্ত


শয়তান ইবাদতকারীদের মনে আযানে সুর সংযোজনের ব্যাপারে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। অথচ ইমাম মালেক ইবনে আনাসসহ অন্যান্য ওলামায়ে কেরাম তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। কেননা সুর সংযোজিত আযান গানের সাদৃশ্য লাভ করে। এতে আযানের মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্য বিনষ্ট হয়।

অনেকে আযানের আগে ও পরে যিকির, তাসবিহ-তাহলিল এবং ওয়াজ নসিহত করে থাকেন। এতে আযানের সাথে এ-সবের সংমিশ্রণ ঘটে। অথচ বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম আযানের সাথে কোনো কিছু সম্পৃক্ত করাকে মাকরুহ বলেছেন।

অনেক ইবাদতগুজার লোক অধিকাংশ সময় গভীর রাতে মসজিদের মিনারে আরোহণ করে কিংবা মাইকযোগে ওয়াজ-নসিহত, যিকির-আযকার ও উচ্চৈঃস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করে থাকেন। এতে ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘুমে বিঘ্ন ঘটে, নামাযরত ব্যক্তির একাগ্রতা বিনষ্ট হয় এবং তেলাওয়াতকারী বিভ্রান্তির শিকার হন। আফসোস লাগে, এরা কখনো অনুভব করার সুযোগ পায় না যে, এ দ্বারা শরিয়তের কী পরিমাণ ক্ষতি সাধিত হলো!

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 নামাযে শয়তানের বিভ্রান্তি ও ধোঁকা

📄 নামাযে শয়তানের বিভ্রান্তি ও ধোঁকা


ইবাদতকারীদেরকে শয়তান শরীরের পরিধেয় বস্ত্রের ব্যাপারে সন্দেহে পতিত করে। ফলে তাদের কাউকে পবিত্র কাপড় একাধিকবার ধৌত করতে দেখা যায়। আবার কোনো সময় যদি কোনো মুসলমান তার কাপড় স্পর্শ করে তাহলে তা ধৌত করা জরুরি মনে করে থাকেন। অনেকে আবার এমনও আছেন, যারা নিজেদের কাপড় নদীতে ধৌত করে থাকেন। বাড়িতে ধৌত করাকে তারা যথেষ্ট মনে করেন না। আবার কেউ ইহুদিদের মতো কূপের পানিতে কাপড় ঝুলিয়ে রাখেন। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবারা এর কোনোটাই করেননি। তারা তো পারস্য বিজয়ের পর পারস্যের কাপড় পরিধান করেছেন। তাদের ব্যবহৃত বস্ত্রসমূহ ব্যবহার করেছেন।

আবেদ তথা ইবাদতকারী কেউ কেউ এমনও আছেন—যদি ওপর থেকে তাদের গায়ে পানির ফোঁটা পড়ে, তাহলে পুরো কাপড় ধৌত করাকে তারা খুবই জরুরি মনে করেন। আবার কাউকে দেখা যায়, পানির ছিটা গায়ে পড়ার ভয়ে সামান্য বৃষ্টি হলেই আর জামাতে শরিক হন না। কারও মনে এমন ধারণা আসার কোনো সুযোগ নেই যে, আমরা পরিচ্ছন্নতা ও তাকওয়াবান হতে বারণ করছি; বরং সেই সীমালঙ্ঘন ও মূল্যবান সময় অপচয় থেকে বিরত থাকতে বলছি, কেননা তা শরিয়া অনুমোদিত নয়।

অনেক লোককে শয়তান নামাযের নিয়তের ব্যাপারে ধোঁকা দিতে থাকে। তাই সে তাকবীরের পূর্বে বলে, আমি অমুক নামায পড়ছি। অতঃপর নিয়ত ভেঙ্গে গেছে মনে করে পুনরায় বলে, আমি অমুক নামায পড়ছি। তাদের জেনে রাখা উচিত—নিয়ত কখনো ভাঙ্গে না। অন্তর হচ্ছে নিয়তের স্থান। সুতরাং ফরয নামাযের জন্য কারও দণ্ডায়মান হওয়া—এটাই নিয়তের জন্য যথেষ্ট। 'আমি অমুক নামায পড়ছি'-মুখে এ কথার উচ্চারণ একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। যদি কেউ মুখে উচ্চারণ করে, তবে একবার উচ্চারণই যথেষ্ট। 'নিয়ত ভেঙ্গে গেছে'— এমন ধারণার ভিত্তিতে বারবার উচ্চারণ শয়তানের নিছক একটি প্ররোচনামূলক চক্রান্ত, যা কখনো ইসলাম সমর্থন করে না।

অনেককে দেখা যায়, তাকবীরের পর হাত বেঁধে তা ছেড়ে দেয়। পুনরায় তাকবির বলে হাত বেঁধে তা ছেড়ে দেয়। এমন করতে করতে ইমাম যখন রুকুতে যায়, তখন প্ররোচনার শিকার এ ব্যক্তিও ইমামের সাথে রুকুতে যায়। তাদের জন্য দুঃখ লাগে—এতক্ষণ নিয়ত উপস্থিত হয়নি মনে করে বারবার সে হাত বেঁধেছে আর হাত ছেড়েছে। এখন কিসে তার নিয়ত উপস্থিত করল? এ অসার কর্মকাণ্ডের একমাত্র কারণ, তেলাওয়াতের ফজিলত থেকে শয়তান তাকে বঞ্চিত করতে চেয়েছে। আর সেও শয়তানের প্রলোভনে এমন কাজে লিপ্ত হয়েছে নিজের অজান্তেই।

তাদের জেনে রাখা উচিত—শরিয়ত সহজ ও উদার। এসব আপদ-বিপদ ও সন্দেহের কোনো স্থান ইসলামি শরিয়তে নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবা রা.-এর কারও থেকে এমন আচরণ প্রকাশ পায়নি। আবু হাজামের ঘটনা—তিনি একবার মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল, আরে তুমি তো অযু ছাড়া নামায পড়ছ! তখন আবু হাজাম বলল, তোমার উপদেশ আমার কানও শ্রবণ করবে না, অন্তরও তাতে সায় দেবে না।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, এক লোক ইবনে আকীলের সাক্ষাতে এসে বলল, অযুতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধোয়া সত্ত্বেও আমার মনে হয় আমি তা ধৌত করিনি। নামাযে তাকবির বলা সত্ত্বেও মনে হয় আমি তা বলিনি। তখন ইবনে আকিল তাকে বললেন, তুমি নামায পড়া বন্ধ করো; কেননা নামায তোমার ওপর ফরয নয়। তখন লোকেরা তাকে বলল, আপনি তাকে এ কথা কীভাবে বলছেন? তখন ইবনে আকিল তাদের বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَنَّ القَلَمَ رُفِعَ عَنِ المَجْنُونِ حَتَّى يُفِيقَ
“জ্ঞান ফিরে পাওয়া পর্যন্ত পাগল থেকে সকল বিধান রহিত করা হলো।” আর তাকবির বলা সত্ত্বেও যে বলে, 'আমি তাকবির বলিনি’—সে তো বোধশক্তিহীন ও পাগল। আর পাগলের ওপর নামায ফরয নয়।

গ্রন্থকার বলেন, মানুষ বিবেক-বুদ্ধির ভারসাম্যহীনতা এবং শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই নামাযের নিয়তের ব্যাপারে দ্বিধা, সন্দেহ ও শয়তানের প্ররোচনায় পতিত হয়। এ কথা সহজে বুঝতে একটি উদাহরণ দেয়া যাক—যদি কারও বাড়িতে কোনো বড় আলেমের আগমন ঘটে, তাহলে সে ব্যক্তি আলেমের সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যায়। আর দাঁড়ানোর পূর্বে সে মনে মনে বলে, তিনি একজন বড় আলেম, সুতরাং তার সম্মানার্থে দাঁড়ানো উচিত।

আর আলেমকে দেখামাত্র তার সম্মানার্থে দাঁড়ানোর বিষয়টি মনে উদিত হওয়ার নামই নিয়ত। তদ্রূপ ফরয পালনার্থে নামাযের জন্য দাঁড়ানো এমন একটি বিষয়, যার কল্পনা সে এক মুহূর্তেই করতে পারে। তাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না; বরং সময় তো দীর্ঘ হয় কল্পনার বিষয়টি উচ্চারণের ক্ষেত্রে। আর নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা কোনো জরুরি বিষয় নয়; বরং তা হচ্ছে একটি সন্দেহ ও দ্বিধা-মুর্খতাই যার উৎপত্তিস্থল। আর সন্দেহবাতিকপ্রবণ ও দ্বিধাগ্রস্ত লোক মনের বিষয় মুখে উচ্চারণের দ্বারা নিজেকে অনর্থক কষ্টের সম্মুখীন করে। অথচ আলেমের সম্মানার্থে দাঁড়ানোর সময় এই ব্যক্তিও লজ্জার দরুন এমনটি করতে অক্ষম হবে। এই উদাহরণ যার বুঝে এসেছে, আশা করি নিয়তের বিষয় তার নিকট পরিষ্কার ও স্পষ্ট হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে নিয়ত তাকবীরের পূর্বে করাও বৈধ। সুতরাং নিয়তকে তাকবীরের সাথে মিলিয়ে অযথা নিজেকে কষ্টের মুখে ঠেলে দেয়ার কী যুক্তি! এটা তো বিনা কষ্টেই অর্জন করা সম্ভব।

সন্দেহবাতিক রোগে আক্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত এমন কিছু লোক আছেন, যারা বিশুদ্ধভাবে নিয়তের পর তাকবির বলেন। কিন্তু নামাযের বাকি বিষয়ে থাকেন চরম উদাসীন ও অসতর্ক। তাকবির হচ্ছে দরজার ন্যায়, যা দ্বারা নামায নামক গৃহে প্রবেশ করা হয়। সুতরাং দরজার প্রতি যত্নবান হয়ে ঘরের যত্ন ছেড়ে দেয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ বলে বিবেচিত হতে পারে?

গ্রন্থকার বলেন, আমি শৈশবে আপন শায়খ আবু বকর দীনুরীর পেছনে নামায আদায় করতাম এবং অনুরূপ কাজ করতাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, বৎস! ইমামগণ সুরায়ে ফাতিহা ওয়াজিব কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। আর সুবহানাকা সুন্নত হওয়ার ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। অতএব তুমি উক্ত অবস্থায় সুন্নত বাদ দিয়ে ওয়াজিবে মগ্ন হয়ে যায়।

টিকাঃ
১. হাদিসটি ইমাম বুখারি রহ. তালাকের অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। সুনানে আবি দাউদ: ৪৩৯৮; সুনানে নাসায়ি: ২/১০০; সুনানে দারেমি: ২/১৭১; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪১।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সুন্নত ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা

📄 সুন্নত ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা


শয়তান কোনো কোনো আবেদকে প্ররোচনা ও ধোঁকা দিতে থাকলে সে বহু সুন্নত ছেড়ে দেয়। তাদের কারও অবস্থা হচ্ছে, নামাযে প্রথম কাতারে দাঁড়ান না। তাদের যুক্তি— পেছনের কাতারে দাঁড়ানো একাগ্রতার জন্য অধিক সহায়ক। তাই প্রথম কাতারে না দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় কাতারে দাঁড়ানোই আমার জন্য উত্তম। আবার কেউ কেউ নামাযে হাত বাঁধেন না। তারা বলেন, নামাযের প্রতি এমন একাগ্রতার বহিঃপ্রকাশ আমার নিকট অপছন্দনীয়, যা আমার অন্তরে নেই।

গ্রন্থকার বলেন, কিছু কিছু প্রসিদ্ধ বুযুর্গ থেকেও এরূপ আমল প্রকাশ পেয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, জ্ঞানের স্বল্পতাই তাদেরকে এরূপ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম রহ. তাঁদের বিশুদ্ধ গ্রন্থ সহিহ বুখারি ও মুসলিমে হজরত আবু হোরায়রা রা. এর সূত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস নকল করেন, যা সুস্পষ্টভাবে তাদের আমলকে সুন্নতপরিপন্থী হিসেবে প্রমাণিত করে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যদি মানুষ আযান ও প্রথম কাতারের ফজিলত জানত, তাহলে লটারির মাধ্যমে হলেও তা লাভের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখত।'

সহিহ মুসলিমের অন্য রেওয়ায়েতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
خَيْرُ صُفُوفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا، وَشَرُّهَا آخِرُهَا
“প্রথম কাতার পুরুষের জন্য শ্রেষ্ঠতর আর শেষ কাতার তাদের জন্য নিকৃষ্টতর।”

অনুরূপভাবে নামাযে হাত বাঁধা সুন্নত হওয়ার বিষয়টিও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
وضع اليد على اليد من السنة
"নামাযে হাতের ওপর হাত রাখা সুন্নত।”

অন্য বর্ণনায় এসেছে- হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. নামাযে ডান হাতের ওপর বাঁ হাত রাখতেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি লক্ষ করে তাঁর বাঁ হাতের ওপর ডান হাত রেখে ভুল শুধরে দেন।'

প্রসিদ্ধ বুযুর্গদের উল্লেখিত আমলের প্রতি আমাদের নিন্দা দেখে আপনি আশ্চর্য হবেন না। কারণ, প্রকৃত নিন্দাকারী তো আমরা নই; শরিয়তের প্রমাণাদিই তাদের আমলের অসারতা প্রমাণ করে। আমরা শুধু আপনার নিকট তা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটুকু পালন করছি।

জনৈক লোক ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে বলল, ইবনুল মোবারক তো এমন এমন বলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ইবনুল মোবারক তো আকাশ থেকে অবতীর্ণ হননি। তাকে বলা হলো, ইবরাহিম ইবনে আদহামও এরূপ বলেন। তিনি বলেন, তোমরা এ বিষয়ে শরিয়তের দলিল উপস্থাপন করো, কেননা শরিয়তের অনুসরণই তোমাদের জন্য আবশ্যক। তাই স্বীয় হৃদয়রাজ্যে আসনগ্রহণকারী কোনো ব্যক্তির কথায় শরিয়তের অনুসরণ ছেড়ে দেয়া যাবে না। কেননা শরিয়ত সবার উপরে। সকলেই শরিয়তের অনুসারী, শরিয়ত কারও অনুসারী নয়। এমনও হতে পারে-এ বিষয়ক হাদিস তাঁর নিকট পৌঁছেনি।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৬১৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৪৩৭
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৪৪০
৩. সুনানে আবি দাউদ: ৭৫৪।
১. দেখুন আলবানি রহ. প্রণীত 'সিফাতু সালাতিন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম): পৃষ্ঠা ৮৭

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 মাযহাবের ব্যাপারে নামাযির ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 মাযহাবের ব্যাপারে নামাযির ওপর শয়তানের ধোঁকা


বহু নামাযিকে শয়তান আরবি শব্দের মাখরাজ তথা আদায়ের উৎপত্তিস্থলের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলে থাকে। তাই তারা الحمد الحمد 'আলহামদু আলহামদু'-এভাবে বারবার উচ্চারণের দরুন নামাযের শিষ্টাচারজনিত নিয়ম-কানুন থেকে বের হয়ে যায়। আবার কখনো তাশদিদ উচ্চারণের ক্ষেত্রে ধোঁকায় ফেলে, কখনো-বা المغضوب 'আল মাগদুবি' এর ضاد উচ্চারণের বেলায় ধোঁকায় পতিত করে থাকে।

আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, আমি এমন ব্যক্তিকে দেখেছি, যে 'আল মাগদুবি আলাইহিম' উচ্চারণ করছে আর ضاد উচ্চারণে চাপ প্রয়োগের দরুন তার থুথু বের হচ্ছে। এসব লোকের জেনে রাখা উচিত-উচ্চারণের ক্ষেত্রে এরূপ চাপ প্রয়োগ শরিয়াসমর্থিত নয়; বরং মাখরাজ থেকে প্রতিটি হরফকে সাবলীলভাবে উচ্চারণ করাই নামায বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

শয়তান এ জাতীয় লোকদেরকে উচ্চারণের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির দরুন শুদ্ধতার সীমা অতিক্রম করায়, আর উচ্চারণের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জনের দরুন তাদেরকে তেলাওয়া বোঝা হতে বঞ্চিত করে। কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান যার রয়েছে, সে পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারবে যে, শয়তান কর্তৃক দ্বিধা-সন্দেহ ও প্ররোচনার কারণেই তারা এরূপ করে থাকে। প্রমাণস্বরূপ হজরত আনাস বিন মালেক রা. এর হাদিস এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে-

সাঈদ বিন আবদুর রহমান বিন আবিল আমইয়া বলেন, সাহল বিন আবু উমামা আমাকে বলেছেন, আমি ও আমার পিতা একবার সাহাবি হজরত আনাস রা. এর দরবারে উপস্থিত হই। তিনি তখন এত সংক্ষিপ্ত নামায পড়ছিলেন যে, মনে হলো তা মুসাফিরের নামায। তিনি সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করলে আমরা বললাম, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। যে নামায পড়তে আমরা আপনাকে দেখেছি, তা কি ফরয নামায নাকি নফল নামায? যদি ফরয হয়ে থাকে, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি এভাবেই নামায পড়েছেন? তিনি বললেন, তা ফরয নামায এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এভাবেই নামায পড়েছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই বলতেন-
لَا تُشَدِّدُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ فَيُشَدِّدَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَإِنَّ قَوْمًا شَدَّدُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ فَشَدَّدَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ، فَتِلْكَ بَقَايَاهُمْ فِي الصَّوَامِعِ، وَالدُّيُورَاتِ رَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ
'তোমরা ইবাদত-বন্দেগিতে নিজেদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করো না। তাহলে হতে পারে অচিরেই তোমাদের প্রতি কঠোরতা চাপিয়ে দেয়া হবে। ইতোপূর্বে এক সম্প্রদায় নিজেদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করেছিল, ফলে আল্লাহ তাদের ওপর কঠোরতা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেছেন, তারা এমন সন্ন্যাসধর্ম আবিষ্কার করেছে, যা আমি তাদের ওপর ফরয করিনি।”

عَنْ أبى الْعَلَاءِ، أَنَّ عُثْمَانَ بْنَ أبى الْعَاصِ، أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ حَالَ بَيْنِي وَبَيْنَ صَلَاتِي وَقِرَاءَتِي يَلْبِسُهَا عَلَى، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ذَاكَ شَيْطَانٌ يُقَالُ لَهُ خَنُزَبُ، فَإِذَا أَحْسَسْتَهُ فَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْهُ، وَانْفِلْ عَلَى يَسَارِكَ ثَلَاثًا قَالَ: فَفَعَلْتُ ذَلِكَ فَأَذْهَبَهُ اللهُ عَنِّي
উসমান ইবনে আবিল আস রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! শয়তান আমার নামায, কেরাত এবং আমার মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা এক শয়তান। এর নাম 'খিন্যাব'। এরূপ অনুভব হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং বাঁ দিকে থুথু দেবে। অতএব আমি এরূপ করাতে আল্লাহ তায়ালা এ অবস্থা দূরীভূত করে দিয়েছেন。

শয়তানের এই ধোঁকার ফলে বহু মূর্খ আবেদ লম্বা লম্বা নামায পড়ে এবং বেশি পরিমাণে কেরাত পড়ে, কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ। তবে আপত্তির বিষয় হলো, তারা এ সব ক্ষেত্রে নামাযের বহু সুন্নত ছেড়ে মাকরুহে লিপ্ত হয়।

গ্রন্থকার বলেন, আমি জনৈক আবেদের সাক্ষাতে উপস্থিত হয়ে দেখি, তিনি দিনের বেলা নফল নামায পড়ছেন এবং নামাযে উচ্চ শব্দে তেলাওয়াত করছেন। আমি তাকে বললাম, দিনের বেলা উচ্চ শব্দে তেলাওয়াত করা মাকরুহ। তখন সে আমাকে বলল, আমি ঘুম তাড়ানোর উদ্দেশ্যে উচ্চ শব্দে তেলাওয়াত করছি। আমি তাকে বললাম, ঘুম তাড়ানোর জন্য তো সুন্নত ছাড়া যাবে না। যখন ঘুম তোমাকে কাবু করবে, তখন তুমি ঘুমিয়ে নাও। কেননা তোমার ওপর তোমার নফসের হক রয়েছে। হজরত বুরাইদা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
جهر بالقراءة في النهار فارجموه بالبعر 'যে ব্যক্তি দিনের বেলা উচ্চ শব্দে (নামাযে) কুরআন তেলাওয়াত করে তাকে গোবর নিক্ষেপ করো।"

টিকাঃ
১. [যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৬২৩২; সুনানে আবি দাউদ: ৪৯০৪; মুসনাদে আবি ইয়ালা : ৩৬৯৪।
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২২০৩
৩. [যঈফুন জিদ্দান] এটি কানযুল উম্মালে উল্লেখ আছে। হাদিসটির একজন রাবী 'মাতরূক'।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00