📄 আবেদদের অযুতে শয়তানের ধোঁকা দেয়ার বিবরণ
অনেক আবেদ এমন আছেন—যারা নিয়তের ব্যাপারে শয়তান কর্তৃক ধোকাগ্রস্ত হন। ফলে তারা অযুকালীন একবার বলেন, আমি নাপাকি দূর করছি। আবার বলেন, আমি নামাযের জন্য উপযুক্ত হচ্ছি। পুরনায় বলেন, আমি নাপাকি দূর করছি। শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞতাই এসবের একমাত্র কারণ। তাদের জেনে রাখা উচিত—নিয়তের স্থান অন্তর; জবান নয়। সুতরাং জবানে উচ্চারণ একটি অনাবশ্যক বিষয়। আর নিয়ত যদি কেউ জবানে উচ্চারণ করে তবে একবার উচ্চারণই যথেষ্ট, বারবার উচ্চারণ অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয়।
তাদের অনেকের অবস্থা এমন—যারা অযুর পানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। হতাশ হয়ে বলেন, এ পানিতে পবিত্র হওয়ার কী নিশ্চয়তা আছে? হতে পারে এতে নাপাকির সংমিশ্রণ ঘটেছে। এ-জাতীয় বহু অবান্তর ও অবাস্তব সম্ভাবনা তাদের মনে ঘুরপাক খেতে থাকে। তাদের জানা দরকার—যে পানি নাপাকির আলামত হতে মুক্ত, তা পবিত্র হিসেবেই গণ্য হবে। আর এটাই শরিয়তের মূলনীতি। সুতরাং সন্দেহের ভিত্তিতে এ মূলনীতি বর্জন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আবেদদের কেউ কেউ অযুতে প্রচুর পানি ব্যবহার করে থাকেন। আর শয়তান তাদের নিকট এ বিষয়টি উত্তম করে তোলে। তাদের জেনে রাখা উচিত—প্রয়োজনের অধিক পানি ব্যবহার চারটি মাকরুহকে অন্তর্ভুক্ত করে। ১. পানির অপচয়, ২. এমন বিষয়ে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয়, যা ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব নয়, ৩. শরিয়ত অল্প পানি ব্যবহারে তুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও বেশি পানি ব্যবহার করে শরিয়তের প্রতি অতুষ্টি প্রকাশ করা ও ৪. (ক) অঙ্গসমূহ তিনের অধিক ধৌতকরণ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তা অমান্য করে গর্হিত কাজে লিপ্ত হওয়া। (খ) অনেক সময় বেশি পানি ব্যবহারে অযু দীর্ঘ হওয়ার দরুন নামাযের ওয়াক্ত কিংবা নামাযের উত্তম ওয়াক্ত চলে যায় অথবা জামাত শেষ হয়ে যায়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. বলেন, হজরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. এর অযুকালীন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অতিক্রমকালে বললেন,
مَا هَذَا السَّرَفُ يَا سَعْدُ ؟ " قَالَ: أَفِي الْوُضُوءِ سَرَفٌ؟ قَالَ: " نَعَمْ، وَإِنْ كُنْتَ عَلَى نَهْرٍ جَارٍ
'হে সাআদ, কেন এ অপচয়? হজরত সাআদ রা. বললেন, অপচয় কি অযুতেও? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, যদিও তুমি প্রবহমান নদীতে অযু করো।”
হজরত উবাই ইবনে কা'আব রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لِلْوُضُوءِ شَيْطَانٌ يُقَالُ لَهُ: الْوَلَهَانُ، فَاتَّقُوهُ " أَوْ قَالَ: فَاحْذَرُوهُ
'নিশ্চয় অযুতে এক শয়তান নিযুক্ত রয়েছে, যার নাম ওলাহান। সুতরাং পানির বিষয়ে তোমরা তার কুমন্ত্রণা এড়িয়ে চলো।'” 'ওলাহান' অর্থ হতভম্ব হওয়া। অযুর শয়তানকে ওলাহান বলার কারণ হচ্ছে, সে পানির বিষয়ে অযুকারীকে করে তোলে হতভম্ব ও দ্বিধাগ্রস্ত। ফলে সে অযুর পূর্ণতা ও অপূর্ণতার বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে।
আবু নুয়ামাহ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল তার ছেলেকে দোয়ায় اللهم إني أسألك الفردوس، وأسألك জান্নাতুল ফেরদাউস এবং আপনাকে চাই'—বলতে শুনে বললেন, তুমি আল্লাহর নিকট জান্নাত চাও এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কেননা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-
سَيَكُونُ فِي هَذِهِ الأُمَّةِ قَوْمٌ يَعْتَدُونَ فِي الدُّعَاءِ وَالطَّهُور
'অচিরেই উম্মতের কিছু লোক দোয়া ও পবিত্রতার বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করবে।'
হাসান বসরি রহ. একবার ইবনে সিরিন রহ.-কে টিপ্পনি কেটে বললেন, কী ব্যাপার? আপনার দরবারে এক মশক পানি দিয়ে অযু করা হয় এবং এতগুলো পানি দিয়ে চুবিয়ে চুবিয়ে গোসল করা হয়! এতে তো শরীর কষ্ট পায়। তাছাড়া এটা সুন্নাহসমর্থিতও নয়। জনৈক আরব বেদুইন মসজিদে পেশাব করে দিলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জনৈক মহিলা জিজ্ঞেস করেছিল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার কাপড়ের আঁচল দীর্ঘ। আমি নাপাক স্থান দিয়ে গমন করি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন—ওই নাপাক জায়গার পরে পাক জায়গা আসে নাকি? ওই পাক জায়গা একে পাক করে দেবে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, আসওয়াদ ইবনে সালেম একজন উঁচু মাপের বুযুর্গ ছিলেন। প্রথম দিকে তিনি অযুতে প্রচুর পানি ব্যবহার করা সত্ত্বেও পরে তা বর্জন করেন। কেউ তাকে বর্জনের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন, এক রাতে ঘুমিয়ে পড়লে অদৃশ্য থেকে হঠাৎ কেউ আমাকে আওয়াজ দিয়ে বলল, হে আসওয়াদ! কেন এ অপচয়?
টিকাঃ
১. সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৪২৫
২. জামে' তিরমিযি: হাদিস নং ৫৭, ৪২১, ৯৪, ৪১৯
৩. সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ৯৬, সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৩৮৬৪
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২২, ৬১২৮, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৮৪, ৩৮০, ১৪৭, ৫৬, ৫২৯
৫. সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ৩৮৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৫৩১
📄 আযানের ক্ষেত্রে শয়তানের চক্রান্ত
শয়তান ইবাদতকারীদের মনে আযানে সুর সংযোজনের ব্যাপারে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। অথচ ইমাম মালেক ইবনে আনাসসহ অন্যান্য ওলামায়ে কেরাম তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। কেননা সুর সংযোজিত আযান গানের সাদৃশ্য লাভ করে। এতে আযানের মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্য বিনষ্ট হয়।
অনেকে আযানের আগে ও পরে যিকির, তাসবিহ-তাহলিল এবং ওয়াজ নসিহত করে থাকেন। এতে আযানের সাথে এ-সবের সংমিশ্রণ ঘটে। অথচ বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম আযানের সাথে কোনো কিছু সম্পৃক্ত করাকে মাকরুহ বলেছেন।
অনেক ইবাদতগুজার লোক অধিকাংশ সময় গভীর রাতে মসজিদের মিনারে আরোহণ করে কিংবা মাইকযোগে ওয়াজ-নসিহত, যিকির-আযকার ও উচ্চৈঃস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করে থাকেন। এতে ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘুমে বিঘ্ন ঘটে, নামাযরত ব্যক্তির একাগ্রতা বিনষ্ট হয় এবং তেলাওয়াতকারী বিভ্রান্তির শিকার হন। আফসোস লাগে, এরা কখনো অনুভব করার সুযোগ পায় না যে, এ দ্বারা শরিয়তের কী পরিমাণ ক্ষতি সাধিত হলো!
📄 নামাযে শয়তানের বিভ্রান্তি ও ধোঁকা
ইবাদতকারীদেরকে শয়তান শরীরের পরিধেয় বস্ত্রের ব্যাপারে সন্দেহে পতিত করে। ফলে তাদের কাউকে পবিত্র কাপড় একাধিকবার ধৌত করতে দেখা যায়। আবার কোনো সময় যদি কোনো মুসলমান তার কাপড় স্পর্শ করে তাহলে তা ধৌত করা জরুরি মনে করে থাকেন। অনেকে আবার এমনও আছেন, যারা নিজেদের কাপড় নদীতে ধৌত করে থাকেন। বাড়িতে ধৌত করাকে তারা যথেষ্ট মনে করেন না। আবার কেউ ইহুদিদের মতো কূপের পানিতে কাপড় ঝুলিয়ে রাখেন। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবারা এর কোনোটাই করেননি। তারা তো পারস্য বিজয়ের পর পারস্যের কাপড় পরিধান করেছেন। তাদের ব্যবহৃত বস্ত্রসমূহ ব্যবহার করেছেন।
আবেদ তথা ইবাদতকারী কেউ কেউ এমনও আছেন—যদি ওপর থেকে তাদের গায়ে পানির ফোঁটা পড়ে, তাহলে পুরো কাপড় ধৌত করাকে তারা খুবই জরুরি মনে করেন। আবার কাউকে দেখা যায়, পানির ছিটা গায়ে পড়ার ভয়ে সামান্য বৃষ্টি হলেই আর জামাতে শরিক হন না। কারও মনে এমন ধারণা আসার কোনো সুযোগ নেই যে, আমরা পরিচ্ছন্নতা ও তাকওয়াবান হতে বারণ করছি; বরং সেই সীমালঙ্ঘন ও মূল্যবান সময় অপচয় থেকে বিরত থাকতে বলছি, কেননা তা শরিয়া অনুমোদিত নয়।
অনেক লোককে শয়তান নামাযের নিয়তের ব্যাপারে ধোঁকা দিতে থাকে। তাই সে তাকবীরের পূর্বে বলে, আমি অমুক নামায পড়ছি। অতঃপর নিয়ত ভেঙ্গে গেছে মনে করে পুনরায় বলে, আমি অমুক নামায পড়ছি। তাদের জেনে রাখা উচিত—নিয়ত কখনো ভাঙ্গে না। অন্তর হচ্ছে নিয়তের স্থান। সুতরাং ফরয নামাযের জন্য কারও দণ্ডায়মান হওয়া—এটাই নিয়তের জন্য যথেষ্ট। 'আমি অমুক নামায পড়ছি'-মুখে এ কথার উচ্চারণ একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। যদি কেউ মুখে উচ্চারণ করে, তবে একবার উচ্চারণই যথেষ্ট। 'নিয়ত ভেঙ্গে গেছে'— এমন ধারণার ভিত্তিতে বারবার উচ্চারণ শয়তানের নিছক একটি প্ররোচনামূলক চক্রান্ত, যা কখনো ইসলাম সমর্থন করে না।
অনেককে দেখা যায়, তাকবীরের পর হাত বেঁধে তা ছেড়ে দেয়। পুনরায় তাকবির বলে হাত বেঁধে তা ছেড়ে দেয়। এমন করতে করতে ইমাম যখন রুকুতে যায়, তখন প্ররোচনার শিকার এ ব্যক্তিও ইমামের সাথে রুকুতে যায়। তাদের জন্য দুঃখ লাগে—এতক্ষণ নিয়ত উপস্থিত হয়নি মনে করে বারবার সে হাত বেঁধেছে আর হাত ছেড়েছে। এখন কিসে তার নিয়ত উপস্থিত করল? এ অসার কর্মকাণ্ডের একমাত্র কারণ, তেলাওয়াতের ফজিলত থেকে শয়তান তাকে বঞ্চিত করতে চেয়েছে। আর সেও শয়তানের প্রলোভনে এমন কাজে লিপ্ত হয়েছে নিজের অজান্তেই।
তাদের জেনে রাখা উচিত—শরিয়ত সহজ ও উদার। এসব আপদ-বিপদ ও সন্দেহের কোনো স্থান ইসলামি শরিয়তে নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবা রা.-এর কারও থেকে এমন আচরণ প্রকাশ পায়নি। আবু হাজামের ঘটনা—তিনি একবার মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল, আরে তুমি তো অযু ছাড়া নামায পড়ছ! তখন আবু হাজাম বলল, তোমার উপদেশ আমার কানও শ্রবণ করবে না, অন্তরও তাতে সায় দেবে না।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, এক লোক ইবনে আকীলের সাক্ষাতে এসে বলল, অযুতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধোয়া সত্ত্বেও আমার মনে হয় আমি তা ধৌত করিনি। নামাযে তাকবির বলা সত্ত্বেও মনে হয় আমি তা বলিনি। তখন ইবনে আকিল তাকে বললেন, তুমি নামায পড়া বন্ধ করো; কেননা নামায তোমার ওপর ফরয নয়। তখন লোকেরা তাকে বলল, আপনি তাকে এ কথা কীভাবে বলছেন? তখন ইবনে আকিল তাদের বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَنَّ القَلَمَ رُفِعَ عَنِ المَجْنُونِ حَتَّى يُفِيقَ
“জ্ঞান ফিরে পাওয়া পর্যন্ত পাগল থেকে সকল বিধান রহিত করা হলো।” আর তাকবির বলা সত্ত্বেও যে বলে, 'আমি তাকবির বলিনি’—সে তো বোধশক্তিহীন ও পাগল। আর পাগলের ওপর নামায ফরয নয়।
গ্রন্থকার বলেন, মানুষ বিবেক-বুদ্ধির ভারসাম্যহীনতা এবং শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই নামাযের নিয়তের ব্যাপারে দ্বিধা, সন্দেহ ও শয়তানের প্ররোচনায় পতিত হয়। এ কথা সহজে বুঝতে একটি উদাহরণ দেয়া যাক—যদি কারও বাড়িতে কোনো বড় আলেমের আগমন ঘটে, তাহলে সে ব্যক্তি আলেমের সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যায়। আর দাঁড়ানোর পূর্বে সে মনে মনে বলে, তিনি একজন বড় আলেম, সুতরাং তার সম্মানার্থে দাঁড়ানো উচিত।
আর আলেমকে দেখামাত্র তার সম্মানার্থে দাঁড়ানোর বিষয়টি মনে উদিত হওয়ার নামই নিয়ত। তদ্রূপ ফরয পালনার্থে নামাযের জন্য দাঁড়ানো এমন একটি বিষয়, যার কল্পনা সে এক মুহূর্তেই করতে পারে। তাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না; বরং সময় তো দীর্ঘ হয় কল্পনার বিষয়টি উচ্চারণের ক্ষেত্রে। আর নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা কোনো জরুরি বিষয় নয়; বরং তা হচ্ছে একটি সন্দেহ ও দ্বিধা-মুর্খতাই যার উৎপত্তিস্থল। আর সন্দেহবাতিকপ্রবণ ও দ্বিধাগ্রস্ত লোক মনের বিষয় মুখে উচ্চারণের দ্বারা নিজেকে অনর্থক কষ্টের সম্মুখীন করে। অথচ আলেমের সম্মানার্থে দাঁড়ানোর সময় এই ব্যক্তিও লজ্জার দরুন এমনটি করতে অক্ষম হবে। এই উদাহরণ যার বুঝে এসেছে, আশা করি নিয়তের বিষয় তার নিকট পরিষ্কার ও স্পষ্ট হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে নিয়ত তাকবীরের পূর্বে করাও বৈধ। সুতরাং নিয়তকে তাকবীরের সাথে মিলিয়ে অযথা নিজেকে কষ্টের মুখে ঠেলে দেয়ার কী যুক্তি! এটা তো বিনা কষ্টেই অর্জন করা সম্ভব।
সন্দেহবাতিক রোগে আক্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত এমন কিছু লোক আছেন, যারা বিশুদ্ধভাবে নিয়তের পর তাকবির বলেন। কিন্তু নামাযের বাকি বিষয়ে থাকেন চরম উদাসীন ও অসতর্ক। তাকবির হচ্ছে দরজার ন্যায়, যা দ্বারা নামায নামক গৃহে প্রবেশ করা হয়। সুতরাং দরজার প্রতি যত্নবান হয়ে ঘরের যত্ন ছেড়ে দেয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ বলে বিবেচিত হতে পারে?
গ্রন্থকার বলেন, আমি শৈশবে আপন শায়খ আবু বকর দীনুরীর পেছনে নামায আদায় করতাম এবং অনুরূপ কাজ করতাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, বৎস! ইমামগণ সুরায়ে ফাতিহা ওয়াজিব কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। আর সুবহানাকা সুন্নত হওয়ার ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। অতএব তুমি উক্ত অবস্থায় সুন্নত বাদ দিয়ে ওয়াজিবে মগ্ন হয়ে যায়।
টিকাঃ
১. হাদিসটি ইমাম বুখারি রহ. তালাকের অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। সুনানে আবি দাউদ: ৪৩৯৮; সুনানে নাসায়ি: ২/১০০; সুনানে দারেমি: ২/১৭১; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪১।
📄 সুন্নত ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা
শয়তান কোনো কোনো আবেদকে প্ররোচনা ও ধোঁকা দিতে থাকলে সে বহু সুন্নত ছেড়ে দেয়। তাদের কারও অবস্থা হচ্ছে, নামাযে প্রথম কাতারে দাঁড়ান না। তাদের যুক্তি— পেছনের কাতারে দাঁড়ানো একাগ্রতার জন্য অধিক সহায়ক। তাই প্রথম কাতারে না দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় কাতারে দাঁড়ানোই আমার জন্য উত্তম। আবার কেউ কেউ নামাযে হাত বাঁধেন না। তারা বলেন, নামাযের প্রতি এমন একাগ্রতার বহিঃপ্রকাশ আমার নিকট অপছন্দনীয়, যা আমার অন্তরে নেই।
গ্রন্থকার বলেন, কিছু কিছু প্রসিদ্ধ বুযুর্গ থেকেও এরূপ আমল প্রকাশ পেয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, জ্ঞানের স্বল্পতাই তাদেরকে এরূপ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম রহ. তাঁদের বিশুদ্ধ গ্রন্থ সহিহ বুখারি ও মুসলিমে হজরত আবু হোরায়রা রা. এর সূত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস নকল করেন, যা সুস্পষ্টভাবে তাদের আমলকে সুন্নতপরিপন্থী হিসেবে প্রমাণিত করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যদি মানুষ আযান ও প্রথম কাতারের ফজিলত জানত, তাহলে লটারির মাধ্যমে হলেও তা লাভের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখত।'
সহিহ মুসলিমের অন্য রেওয়ায়েতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
خَيْرُ صُفُوفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا، وَشَرُّهَا آخِرُهَا
“প্রথম কাতার পুরুষের জন্য শ্রেষ্ঠতর আর শেষ কাতার তাদের জন্য নিকৃষ্টতর।”
অনুরূপভাবে নামাযে হাত বাঁধা সুন্নত হওয়ার বিষয়টিও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
وضع اليد على اليد من السنة
"নামাযে হাতের ওপর হাত রাখা সুন্নত।”
অন্য বর্ণনায় এসেছে- হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. নামাযে ডান হাতের ওপর বাঁ হাত রাখতেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি লক্ষ করে তাঁর বাঁ হাতের ওপর ডান হাত রেখে ভুল শুধরে দেন।'
প্রসিদ্ধ বুযুর্গদের উল্লেখিত আমলের প্রতি আমাদের নিন্দা দেখে আপনি আশ্চর্য হবেন না। কারণ, প্রকৃত নিন্দাকারী তো আমরা নই; শরিয়তের প্রমাণাদিই তাদের আমলের অসারতা প্রমাণ করে। আমরা শুধু আপনার নিকট তা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটুকু পালন করছি।
জনৈক লোক ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে বলল, ইবনুল মোবারক তো এমন এমন বলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ইবনুল মোবারক তো আকাশ থেকে অবতীর্ণ হননি। তাকে বলা হলো, ইবরাহিম ইবনে আদহামও এরূপ বলেন। তিনি বলেন, তোমরা এ বিষয়ে শরিয়তের দলিল উপস্থাপন করো, কেননা শরিয়তের অনুসরণই তোমাদের জন্য আবশ্যক। তাই স্বীয় হৃদয়রাজ্যে আসনগ্রহণকারী কোনো ব্যক্তির কথায় শরিয়তের অনুসরণ ছেড়ে দেয়া যাবে না। কেননা শরিয়ত সবার উপরে। সকলেই শরিয়তের অনুসারী, শরিয়ত কারও অনুসারী নয়। এমনও হতে পারে-এ বিষয়ক হাদিস তাঁর নিকট পৌঁছেনি।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৬১৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৪৩৭
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৪৪০
৩. সুনানে আবি দাউদ: ৭৫৪।
১. দেখুন আলবানি রহ. প্রণীত 'সিফাতু সালাতিন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম): পৃষ্ঠা ৮৭