📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 দগ্ধ আলেমদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 দগ্ধ আলেমদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি বলেন, কুরআন-হাদিসের দক্ষ আলেমদের নিকট শয়তান এসে অভিনব চক্রান্তের নিত্যনতুন দ্বার তাদের সামনে উন্মোচন করে। সে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও অন্যের নিকট পৌঁছানোর অপরিসীম লাভের কথা তাদের সামনে তুলে ধরে নিজেদেরকে নিজেদের নিকট বড় করে তোলে। ফলে ইলম অন্বেষণে দীর্ঘ শ্রম ব্যয় করার কারণে, শয়তান আলেমের সামনে আরাম-আয়েশের বিষয়টি উত্তম করে তোলে। সে তাকে বলে, আর কতকাল এভাবে পরিশ্রম করবে? এখন সময় এসেছে, দুঃখ-কষ্ট ও ত্যাগ-তিতিক্ষা থেকে নিজেকে একটু বিশ্রাম দাও। মন যা চায় তা ভোগ করার জন্য নিজের একটু সুযোগ খুঁজে নাও। যদি কখনো তোমার স্খলন ঘটে যায় তাহলে শাস্তি হতে ইলম তোমাকে রক্ষা করবে। এভাবে শয়তান আলেমের সামনে স্বীয় শ্রেষ্ঠত্বের কথা বারবার তুলে ধরে। এমতাবস্থায় এ বান্দা যদি শয়তানের চক্রান্ত হতে রক্ষা পেতে ব্যর্থ হয় এবং শয়তানের চক্রান্তের ফাঁদে পা দেয়, তাহলে সে ধ্বংস হবে। আর যদি সে আল্লাহর অনুগ্রহে চক্রান্ত হতে রেহাই পায়, তবে শয়তানকে সোজাসুজি তিনটি কথা জানিয়ে দেয়া উচিত:

১. আলেমের শ্রেষ্ঠত্ব তার আমলের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং যদি ইলম অনুযায়ী আমল না থাকে তাহলে সে ইলম অর্থহীন। আমি যদি ইলম অনুযায়ী আমল না করি তাহলে তো আমি ওই ব্যক্তির মতো হয়ে যাব যে ইলমের উদ্দেশ্য বুঝতে অক্ষম। এছাড়া আমার দৃষ্টান্ত হবে ওই ব্যক্তির মতো, যে খাবার জমা করে ক্ষুধার্তদেরকে খাইয়েছে কিন্তু নিজে তা থেকে ভক্ষণ করেনি, ফলে সে খাবার ক্ষুধা নিবারণে তার জন্য অনর্থক বলে বিবেচ্য।

২. আমলবিহীন আলেমের নিন্দা প্রকাশ করে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে তা স্মরণ করে শয়তানের বিরোধিতা করা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- 'কেয়ামতের দিন সর্বাধিক কঠিন শাস্তি ওই আলেমের হবে, যে তার ইলম দ্বারা উপকৃত হয়নি।” অন্য রেওয়ায়েতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-'কেয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হলে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে জাহান্নামে পড়ে যাবে; তখন সে তার চতুষ্পার্শ্বে এমনভাবে ঘুরবে যেভাবে গাধা জাতাকলের চতুষ্পার্শ্বে ঘোরে। তখন জাহান্নামবাসী তার নিকট সমবেত হয়ে বলবে, হে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না আমাদের সৎকাজের আদেশ করতে এবং অসৎকাজ থেকে বারণ করতে? সে তখন বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎকাজের আদেশ করতাম কিন্তু নিজে তা করতাম না, আর তোমাদেরকে অসৎকাজ থেকে বারণ করতাম কিন্তু নিজেই তাতে লিপ্ত হতাম।” হজরত আবুদ্দারদা রা. বলেন, 'যে জানে না তার ধ্বংস একবার, আর যে জানে কিন্তু আমল করে না তার ধ্বংস সাতবার।'

৩. ইলম থাকা সত্ত্বেও আমল না করার কারণে যেসব আলেম ধ্বংস হয়েছে তাদের শাস্তির কথা স্মরণ করা, যেমন-ইবলিস ও বালআম প্রমুখ। অবশ্য বেআমল আলেমের নিন্দা প্রকাশের জন্য আল্লাহ তায়ালার একটি উদাহরণই যথেষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ أَسْفَارًا
'যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল তারপর তারা তা বহন করেনি, তারা গাধার মতো! যে বহু কিতাবের বোঝা বহন করে।"

টিকাঃ
১. [খুব দুর্বল] আলবানি রহ. প্রণীত যঈফুল জামে : হাদিস নং ৮৬৮, আয্যাঈফাহ: হাদিস নং ১৬৩৪
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩২৬৭, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৯৮৯
৩. সুরা জুমু'আ: আয়াত ৫

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 শয়তানের ধোঁকার ক্ষেত্রে আলেমদের শ্রেণি

📄 শয়তানের ধোঁকার ক্ষেত্রে আলেমদের শ্রেণি


যে সকল আলেম ইলম অনুযায়ী আমল করেন, তাদেরকেও শয়তান তার চক্রান্তের জালে আটকায়। তবে চক্রান্তের পদ্ধতি ভিন্নরকম। শয়তান তাদের মনে ইলমের কারণে অহংবোধ, সমকক্ষদের প্রতি কটাক্ষ ও বিদ্বেষভাব এবং নেতৃত্বলাভের জন্য আত্মপ্রদর্শনের প্রতি প্ররোচনা জোগাতে থাকে। কখনো সে তাদেরকে প্ররোচনা দিয়ে বলে, এটা তো তোমাদের প্রাপ্য অধিকার; আবার কখনো তা অর্জনের ভালোবাসা তাদের মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে দেয়। ফলে তা ভুল হওয়া সত্ত্বেও তা অর্জনের চেষ্টায় ফের তারা প্রয়াসী হয়ে ওঠে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো, অহংকার, বিষোদ্গার, অবজ্ঞা, বিদ্বেষ ও আত্মপ্রচারের পরিণামফল গভীরভাবে চিন্তা করা এবং নিজেকে এ বিষয় মনোযোগী করা যে, এসব পাপের শাস্তি প্রতিহত করার শক্তি ইলমের নেই, বরং ইলমের ভিত্তিতে দলিল-প্রমাণ দৃঢ় হওয়ার কারণে শাস্তির পরিমাণই কেবল বাড়াবে। আমাদের আকাবির আমলদার ওলামায়ে কেরামের জীবনাদর্শ গভীরভাবে চিন্তা করলে অন্তর অবশ্যই শান্ত হবে এবং অহংকার প্রদর্শন সে কিছুতেই করবে না। আর আল্লাহর মারেফত যে অর্জন করবে সে অবশ্যই রিয়া তথা আত্মপ্রদর্শনের নিন্দা করবে। আর যে এ বিষয়টি লক্ষ রাখে যে, মানুষের ভাগ্যের চাকা আল্লাহর ইচ্ছা অনুপাতে ঘোরে, সে কিছুতেই হিংসা করবে না।

অনেক আলেমের ওপর শয়তান ধোঁকার ক্ষেত্রে এমন কৌশলও অবলম্বন করে, যা অতি সূক্ষ্ম। সে তাদেরকে বলে, উচ্চ মর্যাদালাভের চেষ্টা তোমাদের জন্য অহংকার নয়; কেননা তোমরা হলে শরিয়তের প্রতিনিধি, ফলে তোমাদের মর্যাদা উঁচু হলে শরিয়তের মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং উচ্চ মর্যাদালাভের জন্য তোমাদের চেষ্টা—এটা তো দীনেরই স্বার্থে; যা দ্বারা দীন শক্তিশালী হবে এবং বিদয়াত ধ্বংস হবে। শয়তান আলেমকে আরও প্রলুব্ধ করে বলে, ইসলামবিদ্বেষীর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে তার সমালোচনায় নিজ জবান ব্যবহার করার ক্ষোভ তো নিজের স্বার্থে নয়; বরং তা শরিয়তের স্বার্থে, আর শরিয়ত তো এমন হিংসুকেরই নিন্দা করে যার হিংসা হয় নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে। আর তোমরা যে বিষয়টি রিয়া মনে করছ তা মূলত রিয়া নয়, কেননা তোমরা যদি বিনয় ও ক্রন্দনের ভান করো তাহলে মানুষ তোমাদের অনুসরণ করবে, যেভাবে ডাক্তারের অনুসরণ করে। অর্থাৎ ডাক্তার যদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বস্তু পরিহারের পরামর্শ দেন তাহলে মানুষ তার কথার অনুসরণ যতটুকু করবে, তার চেয়ে বেশি অনুসরণ করবে যদি ডাক্তার নিজে তা পরিহার করেন।

উপরোক্ত ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা হওয়ার দলিল হলো, কোনো অহংকারী যদি অন্য আলেমের সাথে অহংকারসুলভ আচরণ করে এবং মজলিসে তার চেয়ে উঁচু আসনে বসে অথবা কোনো হিংসুক যদি তার মানহানি করে, তাহলে সে ওই পরিমাণ ক্ষুব্ধ হবে না যে পরিমাণ ক্ষুব্ধ হবে এসব আচরণ তার সাথে করা হলে। সুতরাং আলোচিত এ আলেম যদি শরিয়তের সত্যিকার প্রতিনিধি হতো তাহলে সে অন্য আলেমের মানহানিতেও ওই পরিমাণ ক্ষুব্ধ হতো যে পরিমাণ ক্ষুব্ধ নিজের মানহানিতে হয়; কেননা আলেমের মানহানি তো ইলমেরই মানহানি।

অন্যদিকে রিয়া বা আত্মপ্রচার তো এমন একটি বিষয়—শরিয়তে যার অবকাশ কোনো মুসলমানের জন্য নেই, আর মানুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য রিয়ার পথ অবলম্বনও শরিয়তসম্মত নয়। আইয়ুব সাখতিয়ানির অবস্থা তো এমন, তিনি কোনো হাদিস বর্ণনা করলে ভীত-শঙ্কিত হয়ে চেহারা মুছতে বলতেন, কী ভীষণ ঠান্ডা। তদুপরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদিসই শয়তানের জালে আটকে পড়ার জন্য যথেষ্ট। এছাড়া আমলের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। এই শ্রেণির আলেমদের কতক এমনও আছেন, তাদের সামনে যখন অন্যের দোষ বর্ণনা করা হয় তারা মনে মনে আনন্দিত হন। অথচ এ কারণে সে তিন প্রকার গুনাহের সম্মুখীন হয়, ১. গীবতকারী থেকে নাফরমানি প্রকাশ পাওয়া সত্ত্বেও আনন্দিত হওয়া। ২. মুসলমানের সমালোচনায় আনন্দিত হওয়া এবং ৩. তার উপস্থিতিতে নাফরমানি হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবাদ না করা।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 আলেম লেখক ও গ্রন্থকারদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 আলেম লেখক ও গ্রন্থকারদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


অনেক প্রখ্যাত আমলদার আলেম রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়েন এবং সারাদিন লেখালেখি ও গ্রন্থ রচনার কাজে মগ্ন থাকেন। শয়তান তাদেরকে এই বলে ধোঁকা দেয় যে, এর দ্বারা তো দীনের বেশ প্রচার হচ্ছে। তবে ক্রমান্বয়ে শয়তান ধোঁকার কৌশল পরিবর্তন করে। ফলে তাদের অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য হয় লোকসমাজে আলোচিত হওয়া, খ্যাতি-সুখ্যাতি উঁচু হওয়া, নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হওয়া এবং লেখকের নিকট দূরদূরান্ত হতে লোকজনের আগমন ঘটা।

শয়তানের এ ধোঁকা সম্পর্কে অবগত হওয়ার উপায় হলো, যদি মানুষ তার গ্রন্থ দ্বারা দ্বিধাহীনভাবে উপকৃত হয় কিংবা ইলমে তার সমকক্ষ কারও সামনে তা পড়ে শুনানো হয় এবং গ্রন্থকারের নাম উল্লেখ করা না হয় তবুও সে আনন্দিত হবে, যদি তার উদ্দেশ্য হয় ইলমের প্রচার-প্রসার। আমাদের আকাবির তথা মনীষীগণ বলেন, ইলমের কোনো অধ্যায় আমার জানা হলে আমি পছন্দ করি যে, মানুষ যেন তা আমার থেকে শিখে উপকৃত হয়, কিন্তু শিখার বিষয়টি আমার দিকে সম্পৃক্ত না করে।

এ ধরনের আলেম লেখকদের অনেকে এমনও আছেন, যারা অধিক অনুসারী দেখে আনন্দিত হন। আর শয়তানও তাদের মনে এ ধারণা দেয় যে, এই আনন্দ তো ইলম অন্বেষণকারীদের আধিক্যের কারণে, যা দূষণীয় নয়। অথচ তার অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য হয় ছাত্রের আধিক্য দ্বারা তার খ্যাতি ও সুনাম যেন ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিক। এ ক্ষেত্রে শয়তানের ধোঁকা বোঝার উপায় হলো, যদি আগত ছাত্রদের কেউ তার চেয়ে অধিক ইলমের অধিকারী কোনো আলেমের দরবারে চলে যায় তাহলে তার মন ব্যথিত হয়; অথচ এটা কোনো মুখলিস তথা নিরেট ও নিষ্কলুষ শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। কেননা মুখলিস শিক্ষকের উপমা হলো ওই চিকিৎসকের ন্যায় যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় রোগীদের চিকিৎসা করেন। যদি কোনো রোগী তাদের অনুরূপ কোনো ডাক্তারের চিকিৎসায় সুস্থতা লাভ করে তাহলে অন্য ডাক্তারও এতে খুশি হন। একবার আবদুর রহমান ইবনে আবু লায়লা বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একশত বিশজন আনসার সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছি, কোনো লোক যদি তাদের কাউকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করত তাহলে তিনি মনে করতেন, এ বিষয়ে সমাধানের জন্য আমার আনসারি ভাই যথেষ্ট, আর যদি কোনো হাদিস বর্ণনা করতেন তাহলে সে মনে করতেন, এ হাদিস বর্ণনার জন্য আমার আনসারি ভাই যথেষ্ট।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কামেল আলেমগণ কখনো কখনো শয়তানের বাহ্যিক ধোঁকা হতে নিষ্কৃতি পান, কিন্তু শয়তান তাদেরকে সূক্ষ্ম কৌশলে ধোঁকা দেয়। সে তাদেরকে বলে, তোমার মতো মহান ব্যক্তি আমি দেখিনি। তুমি শয়তানের প্রতারণা খুব ভালো করে বুঝেছ। শয়তানের এ কথায় যদি সে স্বস্তি অনুভব করে তাহলে দম্ভ-অহংকারে সেই আলেম ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হতে পারে।

সাররি সাকতি রহ. বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি এমন বাগানে প্রবেশ করে যাতে আল্লাহর সৃষ্ট সকল প্রকার গাছ রয়েছে এবং ওইসব গাছের ডালে আল্লাহর সৃষ্ট সকল প্রকার পাখি রয়েছে এবং প্রত্যেক পাখি যদি নিজ নিজ ভাষায় তাকে বলে, আস্সালামু আলাইকা ইয়া ওলিয়্যাল্যাহ! আর তখন যদি সে তাদের কথায় স্বস্তি অনুভব করে তাহলে যেন সে শয়তানের খপ্পড়ে পড়ে গেল। আল্লাহ তায়ালাই হেদায়াত দেন তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00