📄 সাহিত্যিক ও ভাষাবিদদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত
অনেক লোক নাহু, সরফ ও সাহিত্য শেখার পেছনে জীবন কাটিয়ে দেন। কিন্তু শরিয়ত মোতাবেক জীবন পরিচালনা করতে যে জ্ঞানের প্রয়োজন, যা শিক্ষা করা প্রত্যেকের ওপর ফরজে আইন, তা শেখার প্রতি এবং শিষ্টাচার ও আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য যা শিক্ষা করা তাদের জন্য উত্তম তারা তা শেখার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না। এছাড়া তারা কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা ও ইসলামি আইনশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন থেকে বিমুখ হন, অথচ এসব বিষয়ে পাণ্ডিত্যর্জন তাদের জন্য অপরিহার্য ছিল। অথচ যা শিক্ষা করা ফরজ কিংবা যা শিক্ষা করা সর্বোত্তম তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে তারা জীবনের গোটা সময় এমন বিষয়ের জ্ঞানার্জনে ব্যয় করেন, যা শিক্ষা করা মুখ্য উদ্দেশ্য নয়; বরং তা শিক্ষা এ জন্যই করা হয় যেন তার মাধ্যমে জানা আবশ্যক বিষয়ের জ্ঞানার্জন সম্ভব হয়। সুতরাং কুরআন হাদিসের কোনো বিষয়ের অর্থ বোঝার সক্ষমতা যদি কেউ লাভ করে তাহলে তার কর্তব্য হলো, তার ওপর আমল করে পরকালের উন্নতি সাধন করা। যেহেতু ভাষার জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যই হলো কোরআন-হাদিস থেকে শরিয়তের বিধি-বিধান আহরণ করে তদনুযায়ী আমল করা। অথচ এসব সাহিত্যিকদের অনেকেই এমন আছেন, শরিয়তের বিধি-বিধান ও শিষ্টাচার যাদের তেমন জানা নেই এবং আত্মার পরিশুদ্ধি ও চরিত্র সংশোধনের প্রতি যাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
তথাপি তারা অহংকারের জোয়ারে ভেসে বেড়ায়। ইবলিস তাদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল করে যে, তোমরা তো ইসলামের আলেমসমাজ, কেননা নাহু-সরফ ও সাহিত্য হচ্ছে ইসলামেরই জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং তার মাধ্যমেই জানা যায় কুরআন-হাদিসের অর্থ ও মর্ম। আমার জীবনের শপথ করে বলছি, কুরআন হাদিসের অর্থ ও মর্মোদ্ধারে ভাষাজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য; কিন্তু আরবি ভাষায় কথা বলার যোগ্যতা অর্জন এবং কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও অর্থ বোঝার জন্য তো জীবনব্যাপী সাধনার প্রয়োজন নেই; বরং সেজন্য অল্প সময় ব্যয় করাই যথেষ্ট। যে পরিমাণ ভাষাজ্ঞান না হলে কুরআন-হাদিসের মর্মোদ্ধার অসম্ভব সে পরিমাণ ভাষাজ্ঞান এবং সে জন্য প্রয়োজনমাফিক সময় ব্যয় অত্যন্ত জরুরি, আর যে ভাষাজ্ঞান প্রয়োজনের আওতামুক্ত তা অর্জনে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করার কোনো মানে হয় কি? সুতরাং যে বিষয়ের জ্ঞানলাভ অত্যাবশ্যক সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে যা অর্জন অনাবশ্যক তা অন্বেষণে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করা এমন চরম ভুল যার কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, আর কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও ইসলামি আইনশাস্ত্র অধ্যয়নের ওপর আরবি ভাষাজ্ঞানকে প্রাধান্য দেয়া এমন লোকসান যার ওপর পরিতাপের কোনো সীমা নেই। যদি সকল বিষয়ে জ্ঞানার্জনের জন্য জীবন সংকুলান হতো তাহলে বড়ই উত্তম হতো। কিন্তু জীবন খুবই অল্প সময়ের সমষ্টি। তাই এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এ শ্রেষ্ঠ বিষয়ের অন্বেষণে কাটানো বুদ্ধিমানের কাজ।
এ কারণে তারা ভুলকে অনেক সময় সঠিক মনে করে বসেন। আবুল হাসান ইবনে ফারেস বলেন, আরবের জনৈক ভাষাপণ্ডিতকে জিজ্ঞেস করা হলো- هَلْ يَجِبُ عَلَى الرَّجُلِ إِذَا أَشْهَدَ الْوَضُوْء؟
যদি কেউ 'ইশহাদ' করে তাহলে কি তার ওপর ওজু ওয়াজিব হবে? সে উত্তরে বলল, হ্যাঁ।
গ্রন্থকার বলেন, এ-জাতীয় বহু মনগড়া ফতোয়া এই ভাষাসাহিত্যিকদের থেকে প্রকাশ পেয়েছে; তবে এ ভুলটি অতিশয় মারাত্মক। তার ফতোয়ার অশুদ্ধতা যাচাইয়ের পূর্বে আমদের জেনে নেয়া উচিত যে, 'ইশহাদ' এ আরবি শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। তার একটি অর্থ: স্বাক্ষর দেয়া, আরেকটি অর্থ-মযি নির্গত হওয়া। সুতরাং কোনো শব্দ যদি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয় তাহলে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পূর্বেই তার একটি অর্থ গ্রহণ করে তদনুযায়ী ফতোয়া দেয়া চরম অন্যায়। উদাহরণস্বরূপ-ফতোয়া তলবকারী ব্যক্তি যদি বলে, কোনো মহিলার 'কুরু' চলাকালীন সময়ে তার সাথে সংগম করার কী বিধান? ভাষাবিদদের নিকট 'কুরু' শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়; এক অর্থ অনুযায়ী তা হায়েজ, অন্য অর্থ অনুযায়ী 'তুহুর' সুতরাং কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই মুফতী সাহেব যদি 'কুরু' কে 'তুহুর' অর্থে গ্রহণ করে বলেন, 'কুরু' চলাকালীন স্ত্রী সাথে সংগম করা জায়েজ, অথবা 'কুরু'কে 'হায়েজ' অর্থে গ্রহণ করে বলেন, 'কুরু' চলাকালীন স্ত্রীর সাথে সংগম করা জায়েজ নয় তাহলে তা মারাত্মক ভুল হবে। সুতরাং আরবের ভাষাসাহিত্যিক যে ফতোয়া দিয়েছেন তা দুই কারণে ভুল; প্রথমত সে 'ইশহাদ' শব্দটির অর্থসমূহ ব্যাখ্যা করেনি, দ্বিতীয়ত সে ফতোয়াদানের ক্ষেত্রে শব্দটির দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করেছে এবং প্রচলিত অর্থ পরিহার করেছে। তদুপরি ভাষাজ্ঞানের পুঁজি নিয়েই এসব ভাষাবিদরা নিজেদেরকে ফতোয়াদানে গ্রহণযোগ্য মনে করে। এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, শরিয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানস্বল্পতাই তাদেরকে এরূপ পদস্খলনে উদ্বুদ্ধ করে।
যেহেতু ভাষাসাহিত্যিকদের মূল ব্যস্ততা জাহেলি যুগের কবিতা নিয়ে, হাদিস অধ্যয়ন ও পূর্বসূরি নেককারদের জীবনেতিহাস জানা তাদের নিকট নিষ্প্রয়োজন, তাই শয়তানের প্ররোচনা ও নফসের অনুসরণ তাদেরকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। আপনি তাদের কম লোককেই দেখবেন যারা তাকওয়ার ওপর চলেন এবং খাবারের হালাল-হারামের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখেন। কেননা ভাষাসাহিত্য এমন একটি বিদ্যা যা তার অন্বেষণকারীদেরকে রাজা-বাদশাহদের দ্বারস্থ হতে উদ্বুদ্ধ করে; ফলে তারা বাধ্য হন তাদের হারাম মাল ভক্ষণ করতে। যেমন : ভাষাসাহিত্যিক আবু আলী ফারেসী দ্বারস্থ হয়েছেন বাদশাহ আদুদ দাওলার এবং লালিত-পালিত হয়েছেন তার তত্ত্বাবধানে।
শরিয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে তাদের জ্ঞানস্বল্পতার দরুন তারা কোনো বিষয়কে জায়েয মনে করেন, অথচ শরিয়তে তা নাজায়েয। যেমন বিখ্যাত নাবিদ যুজাজ আবু ইসহাক ইবরাহিম বিন সারী বলেন, আমি কাসেম বিন আবদুল্লাহকে সাহিত্য শিখাতাম। একদিন আমি তাকে বললাম, আপনি যদি আপনার বাবার স্থলাভিষিক্ত হয়ে উজিরত্ব লাভ করেন তাহলে উপহারস্বরূপ আমাকে কী দেবেন? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী পছন্দ করেন? আমি বললাম, আমি পছন্দ করি যে, আপনি আমাকে বিশ হাজার দিনার দেবেন। তিনিও আমাকে তা দেয়ার ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ হলেন এবং এটাই ছিল চূড়ান্ত আশা। কয়েক বছর অতিবাহিত না হতেই কাসেম উজিরত্ব লাভ করে এবং আমিও তার সাথে সার্বক্ষণিক সম্পর্ক বজায় রাখি; ফলে একপর্যায়ে আমি হই তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। উজিরত্ব লাভের পর তাকে আমার সাথে কৃত ওয়াদার বিষয়টি স্মরণ করাতে মনস্থ হই। কিন্তু উজিরত্ব লাভের তৃতীয় দিন তিনি আমাকে বললেন, হে আবু ইসহাক! আমি দেখেছি, আপনি তো ওয়াদার বিষয়টি আমাকে স্মরণ করাচ্ছেন না! অমি বললাম, আমি তো উজির মহোদয়কে এটা স্মরণ করিয়ে দেয়া প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না, যেহেতু এটা তার নৈতিক দায়িত্ব। কাসেম বললেন, আপনি অবশ্যই সাহায্যপ্রাপ্ত। অতঃপর বললেন, আপনাকে এ বিশ হাজার দিনার একসাথে দেয়া আমার জন্য বড় বিষয় নয়, কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, এভাবে অর্থ প্রদান করলে মানুষ আমার সমালোচনা করবে। তবে তা পর্যায়ক্রমে গ্রহণের একটি উপায় আমি আপনাকে বলছি, আপনি তা অবলম্বন করুন। আমি বললাম, আপনি যা ভালো মনে করেন। তিনি বললেন, আপনি মানুষের সামনে বসে তাদের বড় ধরনের সমস্যাগুলো চিরকুটের মাধ্যমে আমার নিকট পেশ করুন এবং তাদের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আমার সাথে আপনার আলোচনার জন্য তাদের থেকে বিনিময় গ্রহণ করুন। আপনার সাথে আমার ওয়াদাকৃত সম্পদ যতদিন আপনার অর্জিত না হবে ততদিন এ পদ্ধতি অব্যাহত রাখুন।
তার কথামতো আমি কাজ শুরু করলাম। প্রয়োজনগ্রস্ত লোকদের একটি করে চিরকুট আমি প্রতিদিন উজিরের সামনে পেশ করতাম, আর তিনি তাতে সই করতেন; বিনিময়ে আমি গ্রহণ করতাম মোটা অঙ্কের অর্থ। মাঝে মাঝে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, আমার থেকে সই নেয়ার বিনিময়ে তারা আপনাকে কত দেবে? আমি একটি পরিমাণ উল্লেখ করলে তিনি বলতেন, এ তো খুবই কম; এর বিনিময় তো আরও অনেক বেশি। সুতরাং আপনি আরও বেশি দাবি করুন। আমি লোকদের নিকট গিয়ে আরও বেশি অর্থের দাবি করলে তারা আমাকে বাড়িয়ে দিত। তিনি বললেন, একদিন বড় ধরনের একটি কাজ উদ্ধারের জন্য আমি উজিরের স্বাক্ষর নেই, বিনিময়স্বরূপ তাদের থেকে যে অর্থ আমি লাভ করি তা দ্বারা আমার বিশ হাজার দিনার পূর্ণ হয়। এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হলে আমার আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
কয়েক মাস পর কাসেম আমাকে বললেন, হে আবু ইসহাক! আপনার সাথে ওয়াদাকৃত বিশ হাজার দিনার কি আপনার অর্জিত হয়েছে? আমি উত্তরে নেতিবাচক জবাব দিলে তিনি চুপ রইলেন, ফলে আমার স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী স্বাক্ষর করানোর বিনিময়ে মানুষ থেকে অর্থ উপার্জনের ধারা অব্যাহত রইল। প্রতিমাসেই উজির মহোদয় আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, ওয়াদাকৃত বিশ হাজার দিনার কি অর্জিত হয়েছে? আমি উত্তরে বলতাম, না; যেন মাল উপার্জনের এ ধারা বন্ধ না হয়। একপর্যায়ে সম্পদের পাহাড় আমার হস্তগত হলে কাসেম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ওয়াদাকৃত বিশ হাজার দিনার অর্জিত হয়েছে? আমি এবার মিথ্যা বলতে লজ্জাবোধ করলাম, উজির মহোদয়ের অনুগ্রহে আমার তা অর্জিত হয়েছে। তিনি তখন বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি আমার থেকে বিপদ দূর করেছেন। আপনার জন্য তা অর্জিত হওয়ার ব্যাপারে মানসিকভাবে আমি বেশ চিন্তিত ছিলাম। অতঃপর তিনি দোয়াত-কলম হাতে নিয়ে আমার জন্য তিন হাজার দিনারের চেক লিখে তার কোষাধ্যক্ষের নিকট পাঠালে আমি তার থেকে দিনারগুলো গ্রহণ করি।
পরদিন সকালে স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী তার সামনে উপবেশন করলে তিনি ইশারায় বললেন, চিরকুট নিয়ে আসুন, আমি তাতে সই করে দেই। আমি বললাম, আমি আজ কারও থেকে চিরকুট গ্রহণ করিনি। কেননা আপনার সাথে আমার যে ওয়াদা ছিল তা তো পূর্ণ হয়েছে; তাই আমার জানা নেই; কিসের ভিত্তিতে আমি উজির মহোদয় থেকে সই নেব। তিনি বললেন, হায় সুবহানাল্লাহ! আপনি মনে করেন যে, আমি আপনার কাছ থেকে এ দায়িত্ব ছিনিয়ে নেব! অথচ তা আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এবং তার মাধ্যমে আপনার অবস্থান মানুষের মাঝে সুউচ্চ হয়েছে, আর ছড়িয়ে পড়েছে আপনার খ্যাতি-সুখ্যাতি দেশের চতুর্দিকে, তদুপরি সকাল-সন্ধ্যা মানুষ দ্বারস্থ হয় আপনার কাছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আপনার থেকে এ দায়িত্ব রহিত হওয়ার কারণ তো মানুষের জানা নেই, ফলে মানুষ ধারণা করবে, আমার নিকট আপনার খ্যাতি হ্রাস পাওয়া এবং আপনার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার কারণেই আপনার থেকে এ দায়িত্ব রহিত করা হয়েছে। সুতরাং আপনার পূর্ব রীতির ওপর আপনি বহাল থাকুন এবং মানুষ থেকে চিরকুট গ্রহণ করে বেহিসাব অর্থ উপার্জন করুন। তখন আমি তার হাত চুম্বন করে পরদিন সকালে মানুষের চিরকুট গ্রহণ করে উজির মহোদয় থেকে স্বাক্ষর নিয়ে অর্থ উপার্জনের পথে দিনদিন অগ্রসর হই। কাসেমের মৃত্যু পর্যন্ত আমি প্রতিদিন মানুষের প্রয়োজন সম্বলিত চিরকুট তার থেকে স্বাক্ষর করাই, বিনিময়ে অর্জন করি তাদের থেকে বিপুল সম্পদ এবং গড়ে তুলি সম্পদের বিশাল পাহাড়।
গ্রন্থকার বলেন, চিন্তা করুন! শরিয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানস্বল্পতা মানুষের সাথে কীরূপ আচরণ করে। কেননা এ বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ ও সাহিত্যিক যদি জানত যে, অর্থ উপার্জনের যে পন্থা সে অবলম্বন করেছে তা শরিয়তে বৈধ নয়, তাহলে সে গর্ব করে তা বর্ণনা করত না। কেননা জুলুমকারীর জুলুমের বিচার এবং রাষ্ট্রের ওইসব দায়িত্ব উজিরকে নিযুক্ত করা হয়েছে তা পালন করা তার ওপর ওয়াজিব, তার বিনিময়ে কোনোরূপ ঘুষ গ্রহণ শরিয়তে বৈধ নয়। সুতরাং যে তার দায়িত্বে নিযুক্ত নয়, তার জন্য ঘুষ গ্রহণ কীভাবে বৈধ হবে! এর মাধ্যমেই অন্যান্য বিদ্যার ওপর ইসলামি আইনশাস্ত্রের মর্তবা স্পষ্টরূপে বুঝে আসে।
📄 কবিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কবিদের ওপর শয়তান এমন চক্রান্ত খাটাতে থাকে যে, তাকে প্রলোভন দিয়ে বলে, তোমরা কবি ও সাহিত্যিক। আল্লাহ তোমাদেরকে এমন যোগ্যতা দান করেছেন, যা অন্য কারও মধ্যে নেই। এটা তোমাদের অন্যতম বিশেষত্ব। অতএব তোমাদের ভুল ত্রুটিও আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। অতঃপর কবিরা এ ধারণা নিয়ে পরনিন্দা ও নির্লজ্জ কথাবার্তা বলার সুযোগ পেতে থাকে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজেদের কুকর্মের কথা প্রকাশ করতে থাকে। ন্যূনতম কবিদের মধ্যে এটা সচরাচর দেখা যায় যে, যদি তারা কারও প্রশংসা করে, তাহলে প্রশংসিত ব্যক্তি পুনরায় আবার তার কুৎসা বর্ণনার শিকার হতে পারেন— এমন আশঙ্কায় তাকে অপারগ হয়ে উপহারাদি দিতে হয়, যাতে কবি খুশি থাকেন। কখনো জনসমাবেশে কারও প্রশংসা শুরু করে দেয়। তখন লজ্জায় পড়ে তাকে কিছু দিতে হয়। এটা জবরদস্তি ও জোরপূর্বক অন্যের সম্পদ ভোগ করার সমতুল্য।
কতেক কবিকে দেখা যায়, তারা মুখে যা বলে, কাজে ও বাস্তবতায় ঘটে তার বিপরীত। অথচ আল্লাহ তায়ালার কাছে তাকওয়াশূন্য শুধু ভাষার চাতুর্যের কোনো মূল্য নেই। অনেক কবিকে দেখা যায়, তারা প্রায়শ তাকদির, ভাগ্য ও যুগের কুৎসা বর্ণনা করে বেড়ান, যা কখনো কখনো কুফরীতে গিয়ে ঠেকে।
তাদের কাউকে আবার মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতেও দেখা যায়। জনৈক কবি কবিতার মাধ্যমে তার অভাব-অনটনের অবস্থা প্রকাশ করেছে এভাবে:
لان سمت همتي في الفضل عالية * فإن حظي ببطن الأرض ملتصق كم يفعل الدهر بي ما لا أسر به * وكم يسيء زمان جائر حنق
'আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মনোবল যদিও সম্মানের দিক থেকে যথেষ্ট উন্নত, কিন্তু আমার ভাগ্য ভূগর্ভে নিমজ্জিত। জমানা আমার সাথে আমার চাহিদার বিপরীত আচরণ আর কতবার করতে পারবে? আর জালেম জমানা আত্মার সাথে আর কত দুর্ব্যবহার করতে পারবে?'
কবিরা ভুলে যান যে, পাপের কারণে রিযিকের দরজা সংকুচিত হয়ে আসে এবং তা হ্রাস পেয়ে থাকে। তারা কখনো চিন্তা করার সুযোগ পায় না যে, শরিয়তের নির্দেশ পালন করা অত্যাবশ্যক। তারা নিজেদের সম্বন্ধে জ্ঞানী বলে দাবি করছে, অথচ প্রমাণ দিচ্ছে চরম অজ্ঞতার।
📄 দগ্ধ আলেমদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি বলেন, কুরআন-হাদিসের দক্ষ আলেমদের নিকট শয়তান এসে অভিনব চক্রান্তের নিত্যনতুন দ্বার তাদের সামনে উন্মোচন করে। সে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও অন্যের নিকট পৌঁছানোর অপরিসীম লাভের কথা তাদের সামনে তুলে ধরে নিজেদেরকে নিজেদের নিকট বড় করে তোলে। ফলে ইলম অন্বেষণে দীর্ঘ শ্রম ব্যয় করার কারণে, শয়তান আলেমের সামনে আরাম-আয়েশের বিষয়টি উত্তম করে তোলে। সে তাকে বলে, আর কতকাল এভাবে পরিশ্রম করবে? এখন সময় এসেছে, দুঃখ-কষ্ট ও ত্যাগ-তিতিক্ষা থেকে নিজেকে একটু বিশ্রাম দাও। মন যা চায় তা ভোগ করার জন্য নিজের একটু সুযোগ খুঁজে নাও। যদি কখনো তোমার স্খলন ঘটে যায় তাহলে শাস্তি হতে ইলম তোমাকে রক্ষা করবে। এভাবে শয়তান আলেমের সামনে স্বীয় শ্রেষ্ঠত্বের কথা বারবার তুলে ধরে। এমতাবস্থায় এ বান্দা যদি শয়তানের চক্রান্ত হতে রক্ষা পেতে ব্যর্থ হয় এবং শয়তানের চক্রান্তের ফাঁদে পা দেয়, তাহলে সে ধ্বংস হবে। আর যদি সে আল্লাহর অনুগ্রহে চক্রান্ত হতে রেহাই পায়, তবে শয়তানকে সোজাসুজি তিনটি কথা জানিয়ে দেয়া উচিত:
১. আলেমের শ্রেষ্ঠত্ব তার আমলের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং যদি ইলম অনুযায়ী আমল না থাকে তাহলে সে ইলম অর্থহীন। আমি যদি ইলম অনুযায়ী আমল না করি তাহলে তো আমি ওই ব্যক্তির মতো হয়ে যাব যে ইলমের উদ্দেশ্য বুঝতে অক্ষম। এছাড়া আমার দৃষ্টান্ত হবে ওই ব্যক্তির মতো, যে খাবার জমা করে ক্ষুধার্তদেরকে খাইয়েছে কিন্তু নিজে তা থেকে ভক্ষণ করেনি, ফলে সে খাবার ক্ষুধা নিবারণে তার জন্য অনর্থক বলে বিবেচ্য।
২. আমলবিহীন আলেমের নিন্দা প্রকাশ করে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে তা স্মরণ করে শয়তানের বিরোধিতা করা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- 'কেয়ামতের দিন সর্বাধিক কঠিন শাস্তি ওই আলেমের হবে, যে তার ইলম দ্বারা উপকৃত হয়নি।” অন্য রেওয়ায়েতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-'কেয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হলে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে জাহান্নামে পড়ে যাবে; তখন সে তার চতুষ্পার্শ্বে এমনভাবে ঘুরবে যেভাবে গাধা জাতাকলের চতুষ্পার্শ্বে ঘোরে। তখন জাহান্নামবাসী তার নিকট সমবেত হয়ে বলবে, হে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না আমাদের সৎকাজের আদেশ করতে এবং অসৎকাজ থেকে বারণ করতে? সে তখন বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎকাজের আদেশ করতাম কিন্তু নিজে তা করতাম না, আর তোমাদেরকে অসৎকাজ থেকে বারণ করতাম কিন্তু নিজেই তাতে লিপ্ত হতাম।” হজরত আবুদ্দারদা রা. বলেন, 'যে জানে না তার ধ্বংস একবার, আর যে জানে কিন্তু আমল করে না তার ধ্বংস সাতবার।'
৩. ইলম থাকা সত্ত্বেও আমল না করার কারণে যেসব আলেম ধ্বংস হয়েছে তাদের শাস্তির কথা স্মরণ করা, যেমন-ইবলিস ও বালআম প্রমুখ। অবশ্য বেআমল আলেমের নিন্দা প্রকাশের জন্য আল্লাহ তায়ালার একটি উদাহরণই যথেষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ أَسْفَارًا
'যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল তারপর তারা তা বহন করেনি, তারা গাধার মতো! যে বহু কিতাবের বোঝা বহন করে।"
টিকাঃ
১. [খুব দুর্বল] আলবানি রহ. প্রণীত যঈফুল জামে : হাদিস নং ৮৬৮, আয্যাঈফাহ: হাদিস নং ১৬৩৪
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩২৬৭, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৯৮৯
৩. সুরা জুমু'আ: আয়াত ৫
📄 শয়তানের ধোঁকার ক্ষেত্রে আলেমদের শ্রেণি
যে সকল আলেম ইলম অনুযায়ী আমল করেন, তাদেরকেও শয়তান তার চক্রান্তের জালে আটকায়। তবে চক্রান্তের পদ্ধতি ভিন্নরকম। শয়তান তাদের মনে ইলমের কারণে অহংবোধ, সমকক্ষদের প্রতি কটাক্ষ ও বিদ্বেষভাব এবং নেতৃত্বলাভের জন্য আত্মপ্রদর্শনের প্রতি প্ররোচনা জোগাতে থাকে। কখনো সে তাদেরকে প্ররোচনা দিয়ে বলে, এটা তো তোমাদের প্রাপ্য অধিকার; আবার কখনো তা অর্জনের ভালোবাসা তাদের মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে দেয়। ফলে তা ভুল হওয়া সত্ত্বেও তা অর্জনের চেষ্টায় ফের তারা প্রয়াসী হয়ে ওঠে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো, অহংকার, বিষোদ্গার, অবজ্ঞা, বিদ্বেষ ও আত্মপ্রচারের পরিণামফল গভীরভাবে চিন্তা করা এবং নিজেকে এ বিষয় মনোযোগী করা যে, এসব পাপের শাস্তি প্রতিহত করার শক্তি ইলমের নেই, বরং ইলমের ভিত্তিতে দলিল-প্রমাণ দৃঢ় হওয়ার কারণে শাস্তির পরিমাণই কেবল বাড়াবে। আমাদের আকাবির আমলদার ওলামায়ে কেরামের জীবনাদর্শ গভীরভাবে চিন্তা করলে অন্তর অবশ্যই শান্ত হবে এবং অহংকার প্রদর্শন সে কিছুতেই করবে না। আর আল্লাহর মারেফত যে অর্জন করবে সে অবশ্যই রিয়া তথা আত্মপ্রদর্শনের নিন্দা করবে। আর যে এ বিষয়টি লক্ষ রাখে যে, মানুষের ভাগ্যের চাকা আল্লাহর ইচ্ছা অনুপাতে ঘোরে, সে কিছুতেই হিংসা করবে না।
অনেক আলেমের ওপর শয়তান ধোঁকার ক্ষেত্রে এমন কৌশলও অবলম্বন করে, যা অতি সূক্ষ্ম। সে তাদেরকে বলে, উচ্চ মর্যাদালাভের চেষ্টা তোমাদের জন্য অহংকার নয়; কেননা তোমরা হলে শরিয়তের প্রতিনিধি, ফলে তোমাদের মর্যাদা উঁচু হলে শরিয়তের মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং উচ্চ মর্যাদালাভের জন্য তোমাদের চেষ্টা—এটা তো দীনেরই স্বার্থে; যা দ্বারা দীন শক্তিশালী হবে এবং বিদয়াত ধ্বংস হবে। শয়তান আলেমকে আরও প্রলুব্ধ করে বলে, ইসলামবিদ্বেষীর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে তার সমালোচনায় নিজ জবান ব্যবহার করার ক্ষোভ তো নিজের স্বার্থে নয়; বরং তা শরিয়তের স্বার্থে, আর শরিয়ত তো এমন হিংসুকেরই নিন্দা করে যার হিংসা হয় নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে। আর তোমরা যে বিষয়টি রিয়া মনে করছ তা মূলত রিয়া নয়, কেননা তোমরা যদি বিনয় ও ক্রন্দনের ভান করো তাহলে মানুষ তোমাদের অনুসরণ করবে, যেভাবে ডাক্তারের অনুসরণ করে। অর্থাৎ ডাক্তার যদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বস্তু পরিহারের পরামর্শ দেন তাহলে মানুষ তার কথার অনুসরণ যতটুকু করবে, তার চেয়ে বেশি অনুসরণ করবে যদি ডাক্তার নিজে তা পরিহার করেন।
উপরোক্ত ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা হওয়ার দলিল হলো, কোনো অহংকারী যদি অন্য আলেমের সাথে অহংকারসুলভ আচরণ করে এবং মজলিসে তার চেয়ে উঁচু আসনে বসে অথবা কোনো হিংসুক যদি তার মানহানি করে, তাহলে সে ওই পরিমাণ ক্ষুব্ধ হবে না যে পরিমাণ ক্ষুব্ধ হবে এসব আচরণ তার সাথে করা হলে। সুতরাং আলোচিত এ আলেম যদি শরিয়তের সত্যিকার প্রতিনিধি হতো তাহলে সে অন্য আলেমের মানহানিতেও ওই পরিমাণ ক্ষুব্ধ হতো যে পরিমাণ ক্ষুব্ধ নিজের মানহানিতে হয়; কেননা আলেমের মানহানি তো ইলমেরই মানহানি।
অন্যদিকে রিয়া বা আত্মপ্রচার তো এমন একটি বিষয়—শরিয়তে যার অবকাশ কোনো মুসলমানের জন্য নেই, আর মানুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য রিয়ার পথ অবলম্বনও শরিয়তসম্মত নয়। আইয়ুব সাখতিয়ানির অবস্থা তো এমন, তিনি কোনো হাদিস বর্ণনা করলে ভীত-শঙ্কিত হয়ে চেহারা মুছতে বলতেন, কী ভীষণ ঠান্ডা। তদুপরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদিসই শয়তানের জালে আটকে পড়ার জন্য যথেষ্ট। এছাড়া আমলের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। এই শ্রেণির আলেমদের কতক এমনও আছেন, তাদের সামনে যখন অন্যের দোষ বর্ণনা করা হয় তারা মনে মনে আনন্দিত হন। অথচ এ কারণে সে তিন প্রকার গুনাহের সম্মুখীন হয়, ১. গীবতকারী থেকে নাফরমানি প্রকাশ পাওয়া সত্ত্বেও আনন্দিত হওয়া। ২. মুসলমানের সমালোচনায় আনন্দিত হওয়া এবং ৩. তার উপস্থিতিতে নাফরমানি হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবাদ না করা।