📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ফকিহ ও মুফতীদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 ফকিহ ও মুফতীদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


গ্রন্থকার বলেন, পূর্বেকার যুগে কুরআন ও হাদিসের পরিপক্ব আলেমদেরকে ফকিহ বলা হতো। অর্থাৎ যাদের ইজতেহাদের যোগ্যতা ছিল তারাই হতেন ফকিহ। এরপর তা কমতে কমতে এ পর্যারে ঠেকল যে, মুতাআখিরীন তথা পরবর্তীরা বললেন, কুরআন ও হাদিস থেকে কেবল ওই সব অংশ জানা এবং বোঝা জরুরি যেগুলো দ্বারা শরীয়তের বিধান সাব্যস্ত হয়। এরপর তো এমন লোকও ইজতেহাদের দাবি করে, যে নিজেই আয়াতের মর্ম বোঝে না। সহিহ না যঈফ—এই বুঝ যার নেই, এমন লোকও হাদিসকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে। হাদিস উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও এর বিপরীতে কেয়াস প্রয়োগের চেষ্টা চালায়। কখনো কোনো ফকিহ কোনো এক মাসআলা বলেন, আর তার দলিল হিসেবে দুর্বল হাদিস পেশ করেন। অথচ সহিহ ও বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে। একটু কষ্ট করে হাদিসের কিতাবে সন্ধান করলেই অনায়াসে তা পেতেন।

ফকিহদের ওপর শয়তানের একটি চক্রান্ত হলো, তারা প্রতিপক্ষের সাথে তর্ক করার উদ্দেশ্যে সূক্ষ্ম মাসআলা বের করেন, তার দলিল-প্রমাণ জোগাড় করেন এবং প্রতিপক্ষকে কীভাবে ঘায়েল করা যায়, সে কৌশল বের করার পেছনে বহু মূল্যবান সময় নষ্ট করেন। অথচ জনসাধারণের দীনের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় বহু সাধারণ মাসআলা সম্পর্কে তিনি থাকেন অজ্ঞ। তাদের ওপর শয়তানের আরেকটি চক্রান্ত হলো, কেয়াসকে হাদিসের বিপক্ষে অগ্রাধিকার দেয়া। এতে করে নিজের মনের ঘোড়াকে তারা খোলা মাঠে দৌড়ানোর প্রয়াস পায়। অথচ আদবের চাহিদা ও দাবি অনুযায়ী কোনো হাদিস সামনে এলে কেয়াসকে পেছনে রেখে হাদিসকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত এবং এটাকেই দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা যুক্তিসংগত।

অনেক ফকিহ পূর্ণ মনোযোগ ও সময় দিয়ে শুধু মাসআলা বের করার চিন্তায় বিভোর থাকেন। কিন্তু যে-সব বিষয়ের মাধ্যমে অন্তরে নম্রতা সৃষ্টি হবে, যেমন, কুরআন তেলাওয়াত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনী ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনী অধ্যয়ন করা বা শ্রবণ করাকে নিজ কর্তব্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন না। মাসায়েল জরুরি বিষয়- এতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব কিছুর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্তরে নম্রতা, আল্লাহ ও পরকালের ধ্যান জাগরূক করা।

আত্মশুদ্ধি ও সুন্দর আখলাক বিনির্মাণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনী অধ্যয়নও খুব জরুরি বিষয়। তাঁদের অবস্থা যখন আমাদের সামনে আসবে তখন আমাদের মন মেজায ওই দিকে আকৃষ্ট হবে, অন্যথায় যুগের পঙ্কিল স্রোতে ভেসে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। জনৈক মনীষী বলেন, কাজী শুরাইহ'র শত ফয়সালার চেয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদিস উত্তম। কেননা এ দ্বারা আমার অন্তর নরম হয়। আর মন নরম হলে যে কোনো আমল-ইবাদত সহজতর হয়ে যায়।

কখনো দেখা যায়, বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের দাবিই সঠিক কিন্তু এক পক্ষের দাবি ইসলামের জন্য অধিক উপকারী। এমতাবস্থায় উচিত হলো, যে বিষয়টি অধিক উপকারী, সেটিই বেছে নেয়া। অথচ সমাজ বাস্তবতায় এর উল্টোটিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। কোনো কোনো সময় ফকিহদের পরস্পর মুনাযারা ও বিতর্কে একটি হক বিষয় প্রকাশ হওয়ার পরও তা মেনে নেয়া হয় না। এটি একেবারেই পরিত্যাজ্য। হক প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যেই তো মুনাযারা ও বিতর্ক।

ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, কেউ যদি আমার সাথে মুনাযারা করে আর মুনাযারায় হেরে যায় অতঃপর হক বিষয় তার সামনে প্রকাশ হওয়ার পর তা গ্রহণ না করে, তবে সে ব্যক্তি আমার দৃষ্টিতে হেরে যায়। আর যে ব্যক্তি হক বিষয় মেনে নেয়, তার মর্যাদা আমার কাছে বেড়ে যায় এবং আমি তার কাছে প্রভাবিত থাকি। আর কোনো মুনাযারায় যদি আমার প্রতিপক্ষ জয়ী হয়ে যায় এবং তার দলির হক বলে প্রমাণিত হয়, তবে আমি তার পক্ষ অবলম্বন করে ফেলি।

অনেক সময় দেখা যায়, মুনাযারার মাধ্যমে অন্তরে অহংকার সৃষ্টি হয়ে যায় এবং কখনো গীবতেরও পথ খুলে যায়। হক বিষয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য মুনাযারা করার প্রয়োজন হয়, তবে এসব অপছন্দনীয় বিষয় থেকে বিরত থেকেই বিতর্ক চর্চা করতে হবে। ফকিহদের ওপর শয়তানের আরও একটি চক্রান্ত হলো, তাদের কেউ ফতোয়াদানের ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে যান। অনেক সময় সুষ্ঠু প্রমাণের বিপরীত ফতোয়া দিয়ে ফেলেন। অথচ জটিল বিষয় সামনে এলে সে ক্ষেত্রে অপেক্ষা করা উচিত।

আবদুর রহমান ইবনে আবি লায়লা বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফতী ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, আমি একশ বিশজন সাহাবিকে পেয়েছি, যাঁদের কাছে হাদিস জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বলতেন, হায়! আমার কোনো ভাই যদি এ হাদিসটি বলে দিত। অনুরূপভাবে ফতোয়া জিজ্ঞেস করা হলে একজন অপরজনের সোপর্দ করতে থাকতেন। শেষে পুনরায় সেই প্রথম ব্যক্তির কাছে চলে যেতে হতো।

ইবরাহিম নখয়ি রহ. ছিলেন বিখ্যাত একজন ফকিহ। একবার জনৈক ব্যক্তি তার কাছে মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ভাই! তুমি কি মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার জন্য আর কাউকে পেলে না? ইমাম মালেক রহ. বলেন, ফতোয়া দেয়ার পূর্বে আমি ফতোয়া দেয়ার যোগ্য হয়েছি কি-না—এ ব্যাপারে সত্তরজন মাশায়েখকে জিজ্ঞেস করেছি। তাঁরা সবাই সম্মতি দিলে আমি ফতোয়া দেয়া শুরু করি। মানুষ জিজ্ঞেস করল, হুযুর! যদি মাশায়েখরা আপনাকে ফতোয়া দিতে নিষেধ করতেন, তবে কী করতেন? তিনি বললেন, তখন আমি ফতোয়া দেয়া থেকে বিরত থাকতাম। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, আমি কসম করেছিলাম, কিন্তু কী ধরনের কসম করেছিলাম, তা মনে নেই। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বললেন, আফসোস! যদি জানতে কী ধরনের কসম করেছিলে, তাহলে আমিও জানতাম যে কীভাবে ফতোয়া দেব। পূর্বের মনীষীদের এ রীতির কারণ হলো, তাঁদের অন্তর ছিল তাকওয়ায় পরিপূর্ণ।

শয়তানের প্ররোচনায় আকৃষ্ট হয়ে অনেক ফকিহ ধনী ও রাজা-বাদশাহদের কাছে যাতায়াত করেন। উদ্দেশ্য থাকে দুনিয়া অর্জন করা। কখনো তাদের সাথে দীনি ব্যাপারে বেশ শৈথিল্য প্রদর্শন করা হয়। অথচ এটা মোটেই বৈধ নয়। উক্ত আচরণের ফলে তিন প্রকার ব্যক্তি ফিতনার শিকার হয়। প্রথমত : ওই ধনী বা বাদশাহ। কেননা সে মনে করে, আমি সঠিক পথে আছি। আমি যা কিছু করছি—সব ঠিক, নতুবা ফকিহ আমার কাছে আসতেন না বা আমার সম্পদ গ্রহণ করতেন না। দ্বিতীয়ত : জনসাধারণ। জনসাধারণ মনে করবে, ওই ধনী ব্যক্তি খুব ভালো লোক। তার ধন-সম্পদ খুব হালাল। নতুবা ফকিহ কি তা গ্রহণ করতেন? তার কাছে কি আসা-যাওয়া করতেন? তৃতীয়ত : ফকিহ নিজে। কারণ ফকিহ নিজের দীনকে দুনিয়ার জন্য বিলিয়ে দিলেন। ইলমে দীনকে তুচ্ছ মনে করলেন। মানুষ এটাই মনে করবে যে, ইলমের চেয়ে ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার মূল্য বেশি। এমন না হলে তো ফকিহ ধনীর কাছে আসতেন না।

শয়তান অনেক ফকিহকে প্রলোভন দেখিয়ে বলে, বাদশাহ ও ধনিক শ্রেণির কাছে যাও। তার মনে এ ধারণা সৃষ্টি করে আসো যে, আমি বাদশাহ ও ধনীর কাছে যাই মুসলমানদের জন্য সুপারিশ করার উদ্দেশ্যে। অথচ এটা প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়। শয়তান প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ধনী ও নেতাদের কাছে নিয়ে গিয়ে তাকে দুনিয়াদার ও ক্ষমতালিপ্স হওয়ার প্রণোদনা দিতে থাকে। আবার অনেক ফকিহ শাসকশ্রেণির কাছে গিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা, সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে বলে বেড়ায়, এতে আমাদেরও অধিকার আছে। অথচ ওই সম্পদ যদি হারাম পথে অর্জিত হয়ে থাকে, তাহলে তা গ্রহণ করা কী করে বৈধ হতে পারে? আর যদি তাতে হালাল কি না—এ বিষয়ে সন্দেহ থাকে, তবে তা বর্জন করাই উত্তম। আর যদি হালালও থাকে তবে ওই পরিমাণ গ্রহণ করা জায়েয, যতটুকু দীনি খেদমত আঞ্জাম দেয়ার কারণে বায়তুল মাল থেকে গ্রহণ করতে পারে। অনেক সময় সাধারণ মানুষ এই বিষয়গুলো দেখে সরকারি সম্পদ বেপরোয়াভাবে আত্মসাৎ করতে থাকে, যা কোনোমতেই তাদের জন্য বৈধ হতে পারে না।

আবার অনেক সময় কিছু আলেমকে শাসকদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকতে দেখা যায়। আর যারা শাসকদের নিকট আসা-যাওয়া করেন তাদের গীবত ও পরচর্চা, দোষচর্চা করতে থাকেন। এতে দু'টি অসুবিধার কারণ আছে। একটি হলো গীবত ও কুৎসা, অপরটি হলো আত্মশ্লাঘা ও আত্মপ্রশংসা। যে সকল আলেম শাসকের কাছে যাওয়া-আসা করেন, তাদের নিয়ত প্রথমে ভালো থাকলেও পরে খারাপে রূপান্তরিত হয়ে যায়। শুরুতে গিয়ে মনে করেন, তাদের কাছে গিয়ে হক কথা বলব। দীনের ব্যাপারে কোনো প্রকার ছাড় দেব না। কিন্তু যখন তাদের দেয়া উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করেন, তখন আর সেই নিয়ত ও প্রতিজ্ঞা ঠিক থাকে না।

সুফিয়ান সাওরি রহ. বলতেন, শাসকরা আমাকে অপমানিত করবে—এ আশঙ্কা আমি মনে করি না বা এর জন্য আমি ভয় করি না। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, তারা আমাকে সম্মান করবে আর আমার অন্তর তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। পূর্ববর্তী আলেম ও মুফতী-মুহাদ্দিসরা বাদশাহ ও শাসকদের থেকে দূরে থাকতেন। কারণ তারা শরিয়তবিরোধী কাজ করত। তখন শাসকরা আলেমদের খেদমতে উপস্থিত হয়ে ফতোয়া ও বিভিন্ন বিচার মীমাংসার ব্যাপারে আলোচনা করত। পরে কোনো এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়, যারা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট ছিল। তারা এমন কিছু ইলম শেখে, যা বাদশাহ ও শাসকদের প্রয়োজন। অতঃপর তারা সেই ইলম নিয়ে বাদশাহর কাছে হাজির হয়, এতে তারা আর্থিক ও বৈষয়িকভাবে বেশ লাভবান হতে থাকে। শাসকরা যেহেতু ওয়াজ শুনতে ভালোবাসে, তাই তাদের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ওয়াজের সংখ্যা খুব বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে ফকিহদের সংখ্যা কমতে থাকে। কেউ কেউ মাদরাসার ওয়াকফ সম্পত্তি, যা একমাত্র ছাত্র-শিক্ষকের হক, তা ভোগ করে। অথচ এটা তার জন্য বৈধ নয়। হ্যাঁ, যদি ব্যক্তিও মাদরাসার কোনো বৈতনিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে, তবে অবশ্য তার জন্য ওই সম্পদ ভোগ করা বৈধ।

শয়তানের ফাঁদে পড়ে অনেক ফিকাহ শিক্ষানবিশ ও নামধারী ফকিহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ বিষয়ের দিকে পা বাড়িয়েছে। যেমন-সোনার আংটি পরা, রেশমি কাপড় পরিধান করা ইত্যাদি। এদের অনেকের আকিদা বিশুদ্ধ ছিল না। অন্তরে তারা কুফরী লুকিয়ে রাখত। আবার অনেকের আকিদা বিশুদ্ধ ছিল, কিন্তু নফস ও প্রবৃত্তির তাড়নায় এরূপ করেছে। আত্মশুদ্ধির মতো জ্ঞান তাদের না থাকায় বারবার হোঁচট খেয়েছে।

শয়তানের প্ররোচনায় আকৃষ্ট হয়ে অনেক ফকিহ নিজেকে অনেক বড় আলেম ও মুফতী মনে করেন। তারা মনে করেন, আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইলমই যথেষ্ট। এ ধারণার বশীভূত করে গুনাহের কাজে শয়তান তাদেরকে লিপ্ত করায়। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। জেনেশুনে গুনাহ করা আরও মারাত্মক। হাসান বসরি রহ. বলেন, ফকিহ ওই ব্যক্তি যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে।

ইবনে আকিল বলেন, আমি জনৈক খোরাসানি ফকিহের গায়ে রেশমি কাপড় এবং হাতে সোনার আংটি দেখে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী? তদুত্তরে সে বলল, এটা বাদশাহর পক্ষ থেকে উপঢৌকন আর শত্রুর অন্তরে আঘাত। আমি বললাম, কখনো নয়। এটা শত্রুর খুশির কারণ। কেননা এতে চিরশত্রু শয়তান খুশি হবে। যেহেতু এটা শরিয়ত হারাম ও নাজায়েয করে রেখেছে। শয়তানের চেয়ে বড় শত্রু আর কে হতে পারে? বাদশাহ তোমাকে যে পোশাক উপঢৌকন হিসেবে দিয়েছে, এতে সে তোমার কোনো উপকার করেনি; বরং এর মাধ্যমে তোমার ঈমানী পোশাক ছিনিয়ে নিয়েছে। অথচ উচিত ছিল, তুমি স্বীয় ইলম দ্বারা তার পরন থেকে ফাসেকীর পোশাক খুলে তাকে ঈমান ও তাকওয়ার পোশাক পরিয়ে দেওয়া। কিন্তু তুমি এর বিপরীতটাই করলে। এটা তোমার চরম দুর্ভাগ্য।

শয়তান চক্রান্তের মাধ্যমে ফকিহ, মুফতী ও আলেমদেরকে ওয়াজের মজলিসে যেতে বারণ করে। এতে তারা ওয়াজ-নসিহত শুনতে পায় না। যুক্তি হিসেবে তারা বলে বেড়ায়, ওয়ায়েজ শুধু কিসসা-কাহিনি বলে। এতে কি কোনো লাভ আছে? বাস্তবিকপক্ষে শয়তান তাদেরকে এমন বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখছে, যা দ্বারা অন্তর কোমল হতো। আর মন নরম হলে তা অনায়াসে আল্লাহর দিকে ঝুঁকবে। ওয়ায়েজরা যে নসিহত ও উপদেশের উদ্দেশ্যে কিসসা-কাহিনি বর্ণনা করেন, সেটা নাজায়েয নয়। কারণ স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেছেন, “হে রাসুল! আমি আপনাকে সর্বোত্তম কিস্সা শোনাই।” কিস্সা যদি সত্য ও উপদেশমূলক হয়, তবে এতে অসুবিধার কিছু নেই; বরং এতে উপকারই রয়েছে। তবে মিথ্যা ও বানোয়াট কিস্সা বর্ণনা করা এবং কুরআন-হাদিস ও ইসলামি কথা বাদ দিয়ে শুধু কিসসা-কাহিনির পেছনে পড়ে থাকা চরম গর্হিত ও বর্জনীয়।

টিকাঃ
১. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ওয়ায়েজ ও বক্তাদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 ওয়ায়েজ ও বক্তাদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


আগেকার জমানার ওয়ায়েজরা ছিলেন বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম ও ফক্বীহ সম্প্রদায়। উবাইদ বিন উমাইরের মজলিসে সাহাবি আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা. উপস্থিত হতেন এবং ওমর বিন আবদুল আজীজও বিভিন্ন ওয়াজের মজলিসে উপস্থিত হয়ে ওয়াজ শ্রবণ করতেন। মানুষের দীনি শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক সংশোধন ছিল এসব ওয়াজের মূল উদ্দেশ্য। তবে ক্রমান্বয়ে অজ্ঞ লোকেরাও ওয়াজ-নসিহতের কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করলে এবং এ কাজকে নিজেদের পেশা হিসাবে গ্রহণ করার ফলে এসব মজলিসে আলেম-ওলামা ও নেক লোকদের উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে সাধারণ জনগণ ও মহিলাদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। এসব বক্তারা শরিয়তের জ্ঞানার্জনে ব্যস্ত না হয়ে মূর্খ জনগণকে মুগ্ধ করার উদ্দেশ্যে গল্প বানানো ও ঘটনা বর্ণনায় নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করে।

এসব মূর্খ ওয়ায়েজ ও বক্তাদের কিছু হাল হাকিকত আমি 'কিতাবুল কিসাস ওয়াল মুযাক্বিরীন' গ্রন্থে উল্লেখ করেছি। এখানে আমরা কিছু বাছাই করা কথার আলোকপাত করব। এখনকার বক্তা ও ওয়ায়েজরা নেক কাজে উৎসাহদান ও অসৎকাজে ভীতি প্রদর্শনে নিজেদের বানানো কথাকে হাদিস বলে প্রচার করে। আর শয়তান তাদেরকে এ ব্যাপারে প্ররোচনা জোগাতে থাকে যে, তোমরা যা করছ তা তো অত্যন্ত মহৎকাজ। যেহেতু মানুষকে নেক কাজে উৎসাহদান এবং অসৎকাজে বাধা প্রদান তোমাদের মূল উদ্দেশ্য। তাদের জেনে রাখা উচিত যে, তারা যা করছে তা শরিয়তের প্রতি অন্যায় আচরণ। কেননা এ কাজ দ্বারা তারা মনে করছে, শরিয়ত অপূর্ণ, তা পূর্ণ করা প্রয়োজন। অথচ তারা ভুলে গেছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী:
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
'যে আমার ওপর মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়।”

বক্তাদের কতক এমনও আছেন, যারা ওয়াজে সুর সংযোজন করেন, যা মানুষের মন মুগ্ধ করে, হৃদয় আন্দোলিত করে। তারা বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ওয়াজ করেন। আপনি দেখবেন, তারা প্রেম-ভালোবাসা ও মহব্বতের এমন মনমুগ্ধকর কবিতা শে'র পড়ে, মানুষের হৃদয়-মন যা দ্বারা আন্দোলিত হয়। তারা ইবলিসের ধোঁকায় প্রলুব্ধ হয়ে বলেন, আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য, আল্লাহর ভালোবাসা ও মহব্বতের জোয়ার মানুষের হৃদয়রাজ্যে প্রবাহিত করা। অথচ এ বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট যে, তাদের মজলিসে ওই সকল মূর্খ জনগণই উপস্থিত হয়, প্রবৃত্তির ভালোবাসা যাদের মনে ভরপুর। ফলে বক্তা নিজেও পথভ্রষ্ট হয় এবং তাদের মজলিসে যারা আসে তারা আরও বেশি পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।

অনেক ওয়ায়েজ এমন আছেন, যারা ওয়াজ-নসিহতের সময় আবেগ ও বিনয়ের এমন ভাব প্রকাশ করেন যা তাদের অন্তরে নেই। ফলে বিনয়ভাব ও চোখের অশ্রু বর্ষণে মানুষ তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সুতরাং যার আবেগ ও ক্রন্দন আল্লাহর জন্য নয়; সে তো আখিরাত ধ্বংস করল, আর যে এ বিষয়ে সত্যবাদী তার সত্যবাদিতাও রিয়ার বেড়াজালে আটকে গেল। কিছু কিছু বক্তা আল্লাহর ভালোবাসা ও দুনিয়াবিমুখতার নিগূঢ় তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেন, আর ইবলিসও তাদেরকে প্ররোচনা দিয়ে বলে, তুমি তো এসব গুণে গুণান্বিত। কেননা এসব বিষয়ের জ্ঞানলাভের পর তদনুযায়ী আমল যদি না করতে তাহলে জানা সত্ত্বেও তুমি তার নিগূঢ় তত্ত্ব বর্ণনা করতে সক্ষম হতে না।

শয়তানের এহেন প্ররোচনার শিকার যদি কেউ হয় তাহলে মনকে এ বলে সতর্ক করবে যে, জানা বিষয় বর্ণনা করতে পারা এবং তা আমলে বাস্তবায়ন করা এক জিনিস নয়। তদুপরি একটি অর্জিত হলে যে অন্যটি অর্জিত হবে তা আবশ্যকও নয়। কেউ কেউ আবার কেয়ামতের এমন সব আলোচনা করেন শরিয়তে যার বর্ণনা পাওয়া যায় না। এসব আলোচনার প্রমাণস্বরূপ তারা বিভিন্ন প্রেমকাব্য আবৃত্তি করেন, মূর্খ লোকেরা যা দলিল বলে বিশ্বাস করে। এসব আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ জনগণ যেন তা শুনে ভীত-বিহ্বল হয় এবং চিৎকার ক্রন্দনে তার ওয়াজের মাঠ গরম রাখে।

আবার কেউ কেউ ছন্দ আকারে এমনসব বাক্য বলেন, যা সম্পূর্ণ অর্থহীন। তাদের আলোচনার অধিকাংশ বিষয়বস্তু হলো, নবী মুসা, ইউসুফ ও জোলায়খার ঘটনা বর্ণনা করা। অথচ তারা শরিয়তের অতি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ-ওয়াজিবের আলোচনা করেন না এবং মিথ্যা-পাপাচারের ভয়াবহতা বর্ণনা করে তা থেকে মানুষকে সতর্ক করেন না। যদি গল্প-ঘটনাই ওয়াজের মূল বিষয় হয়, তাহলে কখন যেনাকারী ব্যভিচার থেকে ফিরে আসবে, সুদখোর সুদগ্রহণ পরিহার করবে এবং স্ত্রী জানতে পারবে তার প্রতি রয়েছে স্বামীর কী কী অধিকার! হায় আফসোস! এরা শরিয়তকে অগ্রাহ্য করেছে, ফলে নফসের তাবেদার মূর্খসমাজে তাদের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা হক ভারী আর বাতিল হাল্কা; অর্থাৎ শরিয়তের আলোচনা বিস্বাদ লাগে, আর গল্প-ঘটনার প্রতি মানুষের থাকে আলাদা টান। এ সব শয়তানেরই প্ররোচনা।

বক্তাদের কতক এমন আছেন, যারা মানুষকে দুনিয়াবিমুখতা ও রাত্রিজাগরণে উদ্বুদ্ধ করেন, কিন্তু জনসাধারণের জন্য এসবের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন না। ফলে তাদের কেউ তওবা করে ঘরের কোণে ইবাদতে নিমগ্ন হন অথবা নির্জন পাহাড়ে গিয়ে পরকাল সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন; ফলে তাদের পরিবার হয় অভিভাবকশূন্য, তারা না পায় ক্ষুধা নিবারণের অন্ন, না পায় দেহ ঢাকার মতো প্রয়োজনীয় বস্ত্র। আবার অনেক ওয়ায়েজ আশা-প্রত্যাশার বয়ান করে মানুষকে বলেন, আপনারা আল্লাহর রহমতের আশা বেশি পরিমাণে করুন; কিন্তু এমন বিষয়ের আলোচনা করেন না, যা মানুষের দিলে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করবে এবং গুনাহ থেকে বিরত রাখবে। ফলে দুনিয়ার প্রতি মানুষের ঝোঁক বেড়ে যায় এবং দ্রুতগামী যানবাহন, উন্নতমানের পোশাক ও রঙ-বেরঙের সুস্বাদু খাবার তাদেরকে মুগ্ধ করে, তাই এসব লাভের চেষ্টায় তাদের পরকাল বরবাদ হয়। এসব বক্তাদের কথা-কাজ মানুষের অন্তরকে বিনষ্ট করে। কিছু কিছু ওয়ায়েজের মজলিসে নারী-পুরুষ সবাই সমবেত হয়। মহিলারা প্রভাবিত হয়ে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করতে শুরু করে। কিন্তু ওয়ায়েজ এতে বাধা দেন না, যাতে সবাই তার প্রতি আরও অধিকহারে মনোযোগী হয়।

পক্ষান্তরে বহু বিদগ্ধ আলেমের ওপর শয়তান চক্রান্তের ক্ষেত্রে এমন সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করে, আলেম ভাবতেও পারে না যে শয়তানের চক্রান্ত এমন হতে পারে। সে আলেমকে বলে, তোমার মতো অধম অন্যকে নসিহতের কী যোগ্যতা রাখে! নসিহত তো ওই ব্যক্তি করবে, যে মন্দকাজ থেকে পূর্ণ সতর্ক এবং সৎকাজের ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন। শয়তানের এহেন চক্রান্তে আলেমের বাকরুদ্ধ হয়, ফলে ওয়াজ-নসিহত থেকে সে নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

সাবেত বুনানি রহ. বলেন, কোনো এক মজলিসে হাসান বসরি রহ. উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে বলা হলো, আপনি কিছু উপদেশমূলক কথা বলুন। তিনি বললেন, আমি কি উপদেশদানের যোগ্য হয়েছি? যা হোক পরে তিনি কিছু উপদেশমূলক কথা বললেন। সাবেত বুনানি রহ. বলেন, তাঁর কথা আমার খুব পছন্দ হলো। হাসান বসরি রহ. বললেন, শয়তান জানত যে, তোমরা হাসান বসরি থেকে এ উপদেশ গ্রহণ করবে, যে কখনো ভালো কাজের আদেশ করেনি এবং মন্দ কাজে নিষেধ করেনি। তাই আমি তার মাধ্যমে ওয়াজ করিয়ে শয়তানের এ সুযোগটি বিনষ্ট করলাম।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১১০, সহিহ মুসলিমের মুকাদ্দামাহ: হাদিস নং ৩

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সাহিত্যিক ও ভাষাবিদদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 সাহিত্যিক ও ভাষাবিদদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


অনেক লোক নাহু, সরফ ও সাহিত্য শেখার পেছনে জীবন কাটিয়ে দেন। কিন্তু শরিয়ত মোতাবেক জীবন পরিচালনা করতে যে জ্ঞানের প্রয়োজন, যা শিক্ষা করা প্রত্যেকের ওপর ফরজে আইন, তা শেখার প্রতি এবং শিষ্টাচার ও আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য যা শিক্ষা করা তাদের জন্য উত্তম তারা তা শেখার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না। এছাড়া তারা কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা ও ইসলামি আইনশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন থেকে বিমুখ হন, অথচ এসব বিষয়ে পাণ্ডিত্যর্জন তাদের জন্য অপরিহার্য ছিল। অথচ যা শিক্ষা করা ফরজ কিংবা যা শিক্ষা করা সর্বোত্তম তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে তারা জীবনের গোটা সময় এমন বিষয়ের জ্ঞানার্জনে ব্যয় করেন, যা শিক্ষা করা মুখ্য উদ্দেশ্য নয়; বরং তা শিক্ষা এ জন্যই করা হয় যেন তার মাধ্যমে জানা আবশ্যক বিষয়ের জ্ঞানার্জন সম্ভব হয়। সুতরাং কুরআন হাদিসের কোনো বিষয়ের অর্থ বোঝার সক্ষমতা যদি কেউ লাভ করে তাহলে তার কর্তব্য হলো, তার ওপর আমল করে পরকালের উন্নতি সাধন করা। যেহেতু ভাষার জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যই হলো কোরআন-হাদিস থেকে শরিয়তের বিধি-বিধান আহরণ করে তদনুযায়ী আমল করা। অথচ এসব সাহিত্যিকদের অনেকেই এমন আছেন, শরিয়তের বিধি-বিধান ও শিষ্টাচার যাদের তেমন জানা নেই এবং আত্মার পরিশুদ্ধি ও চরিত্র সংশোধনের প্রতি যাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

তথাপি তারা অহংকারের জোয়ারে ভেসে বেড়ায়। ইবলিস তাদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল করে যে, তোমরা তো ইসলামের আলেমসমাজ, কেননা নাহু-সরফ ও সাহিত্য হচ্ছে ইসলামেরই জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং তার মাধ্যমেই জানা যায় কুরআন-হাদিসের অর্থ ও মর্ম। আমার জীবনের শপথ করে বলছি, কুরআন হাদিসের অর্থ ও মর্মোদ্ধারে ভাষাজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য; কিন্তু আরবি ভাষায় কথা বলার যোগ্যতা অর্জন এবং কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও অর্থ বোঝার জন্য তো জীবনব্যাপী সাধনার প্রয়োজন নেই; বরং সেজন্য অল্প সময় ব্যয় করাই যথেষ্ট। যে পরিমাণ ভাষাজ্ঞান না হলে কুরআন-হাদিসের মর্মোদ্ধার অসম্ভব সে পরিমাণ ভাষাজ্ঞান এবং সে জন্য প্রয়োজনমাফিক সময় ব্যয় অত্যন্ত জরুরি, আর যে ভাষাজ্ঞান প্রয়োজনের আওতামুক্ত তা অর্জনে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করার কোনো মানে হয় কি? সুতরাং যে বিষয়ের জ্ঞানলাভ অত্যাবশ্যক সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে যা অর্জন অনাবশ্যক তা অন্বেষণে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করা এমন চরম ভুল যার কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, আর কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও ইসলামি আইনশাস্ত্র অধ্যয়নের ওপর আরবি ভাষাজ্ঞানকে প্রাধান্য দেয়া এমন লোকসান যার ওপর পরিতাপের কোনো সীমা নেই। যদি সকল বিষয়ে জ্ঞানার্জনের জন্য জীবন সংকুলান হতো তাহলে বড়ই উত্তম হতো। কিন্তু জীবন খুবই অল্প সময়ের সমষ্টি। তাই এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এ শ্রেষ্ঠ বিষয়ের অন্বেষণে কাটানো বুদ্ধিমানের কাজ।

এ কারণে তারা ভুলকে অনেক সময় সঠিক মনে করে বসেন। আবুল হাসান ইবনে ফারেস বলেন, আরবের জনৈক ভাষাপণ্ডিতকে জিজ্ঞেস করা হলো- هَلْ يَجِبُ عَلَى الرَّجُلِ إِذَا أَشْهَدَ الْوَضُوْء؟
যদি কেউ 'ইশহাদ' করে তাহলে কি তার ওপর ওজু ওয়াজিব হবে? সে উত্তরে বলল, হ্যাঁ।

গ্রন্থকার বলেন, এ-জাতীয় বহু মনগড়া ফতোয়া এই ভাষাসাহিত্যিকদের থেকে প্রকাশ পেয়েছে; তবে এ ভুলটি অতিশয় মারাত্মক। তার ফতোয়ার অশুদ্ধতা যাচাইয়ের পূর্বে আমদের জেনে নেয়া উচিত যে, 'ইশহাদ' এ আরবি শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। তার একটি অর্থ: স্বাক্ষর দেয়া, আরেকটি অর্থ-মযি নির্গত হওয়া। সুতরাং কোনো শব্দ যদি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয় তাহলে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পূর্বেই তার একটি অর্থ গ্রহণ করে তদনুযায়ী ফতোয়া দেয়া চরম অন্যায়। উদাহরণস্বরূপ-ফতোয়া তলবকারী ব্যক্তি যদি বলে, কোনো মহিলার 'কুরু' চলাকালীন সময়ে তার সাথে সংগম করার কী বিধান? ভাষাবিদদের নিকট 'কুরু' শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়; এক অর্থ অনুযায়ী তা হায়েজ, অন্য অর্থ অনুযায়ী 'তুহুর' সুতরাং কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই মুফতী সাহেব যদি 'কুরু' কে 'তুহুর' অর্থে গ্রহণ করে বলেন, 'কুরু' চলাকালীন স্ত্রী সাথে সংগম করা জায়েজ, অথবা 'কুরু'কে 'হায়েজ' অর্থে গ্রহণ করে বলেন, 'কুরু' চলাকালীন স্ত্রীর সাথে সংগম করা জায়েজ নয় তাহলে তা মারাত্মক ভুল হবে। সুতরাং আরবের ভাষাসাহিত্যিক যে ফতোয়া দিয়েছেন তা দুই কারণে ভুল; প্রথমত সে 'ইশহাদ' শব্দটির অর্থসমূহ ব্যাখ্যা করেনি, দ্বিতীয়ত সে ফতোয়াদানের ক্ষেত্রে শব্দটির দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করেছে এবং প্রচলিত অর্থ পরিহার করেছে। তদুপরি ভাষাজ্ঞানের পুঁজি নিয়েই এসব ভাষাবিদরা নিজেদেরকে ফতোয়াদানে গ্রহণযোগ্য মনে করে। এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, শরিয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানস্বল্পতাই তাদেরকে এরূপ পদস্খলনে উদ্বুদ্ধ করে।

যেহেতু ভাষাসাহিত্যিকদের মূল ব্যস্ততা জাহেলি যুগের কবিতা নিয়ে, হাদিস অধ্যয়ন ও পূর্বসূরি নেককারদের জীবনেতিহাস জানা তাদের নিকট নিষ্প্রয়োজন, তাই শয়তানের প্ররোচনা ও নফসের অনুসরণ তাদেরকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। আপনি তাদের কম লোককেই দেখবেন যারা তাকওয়ার ওপর চলেন এবং খাবারের হালাল-হারামের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখেন। কেননা ভাষাসাহিত্য এমন একটি বিদ্যা যা তার অন্বেষণকারীদেরকে রাজা-বাদশাহদের দ্বারস্থ হতে উদ্বুদ্ধ করে; ফলে তারা বাধ্য হন তাদের হারাম মাল ভক্ষণ করতে। যেমন : ভাষাসাহিত্যিক আবু আলী ফারেসী দ্বারস্থ হয়েছেন বাদশাহ আদুদ দাওলার এবং লালিত-পালিত হয়েছেন তার তত্ত্বাবধানে।

শরিয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে তাদের জ্ঞানস্বল্পতার দরুন তারা কোনো বিষয়কে জায়েয মনে করেন, অথচ শরিয়তে তা নাজায়েয। যেমন বিখ্যাত নাবিদ যুজাজ আবু ইসহাক ইবরাহিম বিন সারী বলেন, আমি কাসেম বিন আবদুল্লাহকে সাহিত্য শিখাতাম। একদিন আমি তাকে বললাম, আপনি যদি আপনার বাবার স্থলাভিষিক্ত হয়ে উজিরত্ব লাভ করেন তাহলে উপহারস্বরূপ আমাকে কী দেবেন? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী পছন্দ করেন? আমি বললাম, আমি পছন্দ করি যে, আপনি আমাকে বিশ হাজার দিনার দেবেন। তিনিও আমাকে তা দেয়ার ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ হলেন এবং এটাই ছিল চূড়ান্ত আশা। কয়েক বছর অতিবাহিত না হতেই কাসেম উজিরত্ব লাভ করে এবং আমিও তার সাথে সার্বক্ষণিক সম্পর্ক বজায় রাখি; ফলে একপর্যায়ে আমি হই তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। উজিরত্ব লাভের পর তাকে আমার সাথে কৃত ওয়াদার বিষয়টি স্মরণ করাতে মনস্থ হই। কিন্তু উজিরত্ব লাভের তৃতীয় দিন তিনি আমাকে বললেন, হে আবু ইসহাক! আমি দেখেছি, আপনি তো ওয়াদার বিষয়টি আমাকে স্মরণ করাচ্ছেন না! অমি বললাম, আমি তো উজির মহোদয়কে এটা স্মরণ করিয়ে দেয়া প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না, যেহেতু এটা তার নৈতিক দায়িত্ব। কাসেম বললেন, আপনি অবশ্যই সাহায্যপ্রাপ্ত। অতঃপর বললেন, আপনাকে এ বিশ হাজার দিনার একসাথে দেয়া আমার জন্য বড় বিষয় নয়, কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, এভাবে অর্থ প্রদান করলে মানুষ আমার সমালোচনা করবে। তবে তা পর্যায়ক্রমে গ্রহণের একটি উপায় আমি আপনাকে বলছি, আপনি তা অবলম্বন করুন। আমি বললাম, আপনি যা ভালো মনে করেন। তিনি বললেন, আপনি মানুষের সামনে বসে তাদের বড় ধরনের সমস্যাগুলো চিরকুটের মাধ্যমে আমার নিকট পেশ করুন এবং তাদের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আমার সাথে আপনার আলোচনার জন্য তাদের থেকে বিনিময় গ্রহণ করুন। আপনার সাথে আমার ওয়াদাকৃত সম্পদ যতদিন আপনার অর্জিত না হবে ততদিন এ পদ্ধতি অব্যাহত রাখুন।

তার কথামতো আমি কাজ শুরু করলাম। প্রয়োজনগ্রস্ত লোকদের একটি করে চিরকুট আমি প্রতিদিন উজিরের সামনে পেশ করতাম, আর তিনি তাতে সই করতেন; বিনিময়ে আমি গ্রহণ করতাম মোটা অঙ্কের অর্থ। মাঝে মাঝে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, আমার থেকে সই নেয়ার বিনিময়ে তারা আপনাকে কত দেবে? আমি একটি পরিমাণ উল্লেখ করলে তিনি বলতেন, এ তো খুবই কম; এর বিনিময় তো আরও অনেক বেশি। সুতরাং আপনি আরও বেশি দাবি করুন। আমি লোকদের নিকট গিয়ে আরও বেশি অর্থের দাবি করলে তারা আমাকে বাড়িয়ে দিত। তিনি বললেন, একদিন বড় ধরনের একটি কাজ উদ্ধারের জন্য আমি উজিরের স্বাক্ষর নেই, বিনিময়স্বরূপ তাদের থেকে যে অর্থ আমি লাভ করি তা দ্বারা আমার বিশ হাজার দিনার পূর্ণ হয়। এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হলে আমার আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

কয়েক মাস পর কাসেম আমাকে বললেন, হে আবু ইসহাক! আপনার সাথে ওয়াদাকৃত বিশ হাজার দিনার কি আপনার অর্জিত হয়েছে? আমি উত্তরে নেতিবাচক জবাব দিলে তিনি চুপ রইলেন, ফলে আমার স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী স্বাক্ষর করানোর বিনিময়ে মানুষ থেকে অর্থ উপার্জনের ধারা অব্যাহত রইল। প্রতিমাসেই উজির মহোদয় আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, ওয়াদাকৃত বিশ হাজার দিনার কি অর্জিত হয়েছে? আমি উত্তরে বলতাম, না; যেন মাল উপার্জনের এ ধারা বন্ধ না হয়। একপর্যায়ে সম্পদের পাহাড় আমার হস্তগত হলে কাসেম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ওয়াদাকৃত বিশ হাজার দিনার অর্জিত হয়েছে? আমি এবার মিথ্যা বলতে লজ্জাবোধ করলাম, উজির মহোদয়ের অনুগ্রহে আমার তা অর্জিত হয়েছে। তিনি তখন বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি আমার থেকে বিপদ দূর করেছেন। আপনার জন্য তা অর্জিত হওয়ার ব্যাপারে মানসিকভাবে আমি বেশ চিন্তিত ছিলাম। অতঃপর তিনি দোয়াত-কলম হাতে নিয়ে আমার জন্য তিন হাজার দিনারের চেক লিখে তার কোষাধ্যক্ষের নিকট পাঠালে আমি তার থেকে দিনারগুলো গ্রহণ করি।

পরদিন সকালে স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী তার সামনে উপবেশন করলে তিনি ইশারায় বললেন, চিরকুট নিয়ে আসুন, আমি তাতে সই করে দেই। আমি বললাম, আমি আজ কারও থেকে চিরকুট গ্রহণ করিনি। কেননা আপনার সাথে আমার যে ওয়াদা ছিল তা তো পূর্ণ হয়েছে; তাই আমার জানা নেই; কিসের ভিত্তিতে আমি উজির মহোদয় থেকে সই নেব। তিনি বললেন, হায় সুবহানাল্লাহ! আপনি মনে করেন যে, আমি আপনার কাছ থেকে এ দায়িত্ব ছিনিয়ে নেব! অথচ তা আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এবং তার মাধ্যমে আপনার অবস্থান মানুষের মাঝে সুউচ্চ হয়েছে, আর ছড়িয়ে পড়েছে আপনার খ্যাতি-সুখ্যাতি দেশের চতুর্দিকে, তদুপরি সকাল-সন্ধ্যা মানুষ দ্বারস্থ হয় আপনার কাছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আপনার থেকে এ দায়িত্ব রহিত হওয়ার কারণ তো মানুষের জানা নেই, ফলে মানুষ ধারণা করবে, আমার নিকট আপনার খ্যাতি হ্রাস পাওয়া এবং আপনার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার কারণেই আপনার থেকে এ দায়িত্ব রহিত করা হয়েছে। সুতরাং আপনার পূর্ব রীতির ওপর আপনি বহাল থাকুন এবং মানুষ থেকে চিরকুট গ্রহণ করে বেহিসাব অর্থ উপার্জন করুন। তখন আমি তার হাত চুম্বন করে পরদিন সকালে মানুষের চিরকুট গ্রহণ করে উজির মহোদয় থেকে স্বাক্ষর নিয়ে অর্থ উপার্জনের পথে দিনদিন অগ্রসর হই। কাসেমের মৃত্যু পর্যন্ত আমি প্রতিদিন মানুষের প্রয়োজন সম্বলিত চিরকুট তার থেকে স্বাক্ষর করাই, বিনিময়ে অর্জন করি তাদের থেকে বিপুল সম্পদ এবং গড়ে তুলি সম্পদের বিশাল পাহাড়।

গ্রন্থকার বলেন, চিন্তা করুন! শরিয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানস্বল্পতা মানুষের সাথে কীরূপ আচরণ করে। কেননা এ বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ ও সাহিত্যিক যদি জানত যে, অর্থ উপার্জনের যে পন্থা সে অবলম্বন করেছে তা শরিয়তে বৈধ নয়, তাহলে সে গর্ব করে তা বর্ণনা করত না। কেননা জুলুমকারীর জুলুমের বিচার এবং রাষ্ট্রের ওইসব দায়িত্ব উজিরকে নিযুক্ত করা হয়েছে তা পালন করা তার ওপর ওয়াজিব, তার বিনিময়ে কোনোরূপ ঘুষ গ্রহণ শরিয়তে বৈধ নয়। সুতরাং যে তার দায়িত্বে নিযুক্ত নয়, তার জন্য ঘুষ গ্রহণ কীভাবে বৈধ হবে! এর মাধ্যমেই অন্যান্য বিদ্যার ওপর ইসলামি আইনশাস্ত্রের মর্তবা স্পষ্টরূপে বুঝে আসে।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 কবিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 কবিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কবিদের ওপর শয়তান এমন চক্রান্ত খাটাতে থাকে যে, তাকে প্রলোভন দিয়ে বলে, তোমরা কবি ও সাহিত্যিক। আল্লাহ তোমাদেরকে এমন যোগ্যতা দান করেছেন, যা অন্য কারও মধ্যে নেই। এটা তোমাদের অন্যতম বিশেষত্ব। অতএব তোমাদের ভুল ত্রুটিও আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। অতঃপর কবিরা এ ধারণা নিয়ে পরনিন্দা ও নির্লজ্জ কথাবার্তা বলার সুযোগ পেতে থাকে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজেদের কুকর্মের কথা প্রকাশ করতে থাকে। ন্যূনতম কবিদের মধ্যে এটা সচরাচর দেখা যায় যে, যদি তারা কারও প্রশংসা করে, তাহলে প্রশংসিত ব্যক্তি পুনরায় আবার তার কুৎসা বর্ণনার শিকার হতে পারেন— এমন আশঙ্কায় তাকে অপারগ হয়ে উপহারাদি দিতে হয়, যাতে কবি খুশি থাকেন। কখনো জনসমাবেশে কারও প্রশংসা শুরু করে দেয়। তখন লজ্জায় পড়ে তাকে কিছু দিতে হয়। এটা জবরদস্তি ও জোরপূর্বক অন্যের সম্পদ ভোগ করার সমতুল্য।

কতেক কবিকে দেখা যায়, তারা মুখে যা বলে, কাজে ও বাস্তবতায় ঘটে তার বিপরীত। অথচ আল্লাহ তায়ালার কাছে তাকওয়াশূন্য শুধু ভাষার চাতুর্যের কোনো মূল্য নেই। অনেক কবিকে দেখা যায়, তারা প্রায়শ তাকদির, ভাগ্য ও যুগের কুৎসা বর্ণনা করে বেড়ান, যা কখনো কখনো কুফরীতে গিয়ে ঠেকে।

তাদের কাউকে আবার মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতেও দেখা যায়। জনৈক কবি কবিতার মাধ্যমে তার অভাব-অনটনের অবস্থা প্রকাশ করেছে এভাবে:
لان سمت همتي في الفضل عالية * فإن حظي ببطن الأرض ملتصق كم يفعل الدهر بي ما لا أسر به * وكم يسيء زمان جائر حنق

'আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মনোবল যদিও সম্মানের দিক থেকে যথেষ্ট উন্নত, কিন্তু আমার ভাগ্য ভূগর্ভে নিমজ্জিত। জমানা আমার সাথে আমার চাহিদার বিপরীত আচরণ আর কতবার করতে পারবে? আর জালেম জমানা আত্মার সাথে আর কত দুর্ব্যবহার করতে পারবে?'

কবিরা ভুলে যান যে, পাপের কারণে রিযিকের দরজা সংকুচিত হয়ে আসে এবং তা হ্রাস পেয়ে থাকে। তারা কখনো চিন্তা করার সুযোগ পায় না যে, শরিয়তের নির্দেশ পালন করা অত্যাবশ্যক। তারা নিজেদের সম্বন্ধে জ্ঞানী বলে দাবি করছে, অথচ প্রমাণ দিচ্ছে চরম অজ্ঞতার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00