📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 রাফেজিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 রাফেজিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইবলিস খারেজিদের ধোঁকায় ফেললে তারা হজরত আলী রা. এর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। অনুরূপভাবে এর বিপরীতে ইবলিস আরও একটি জাতিকে ধোঁকায় নিমজ্জিত করে। যারা হজরত আলী রা.-কে ভালোবাসার ক্ষেত্রে এই পরিমাণ বাড়াবাড়ি করতে শুরু করে যা সীমার অতিরিক্ত হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কোনো রাফেযি আলী রা.-কে বলতে থাকে আল্লাহ। কারও মতে তিনি নবীর চেয়ে উত্তম। শয়তানের প্ররোচনায় কিছু রাফেযি হজরত আলী রা.-কে হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.-এর চেয়ে উত্তম বলে তাঁদের উভয়কে গালাগালি করতে থাকে। তাঁদের উভয়কে আবার কেউ কেউ কাফের বলে আখ্যায়িত করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে। রাফেযিদের মাঝে এমন বেহুদা ও অদ্ভুত মিথ্যাচারধারী বহু মতবাদ রয়েছে। আমি কতটুকু আর এদের কাণ্ডের কথা বলব! আমার উদ্দেশ্য কেবল তাদের ক্ষেত্রে ইবলিসের ধোঁকাবাজিগুলো প্রকাশ করা। সে দৃষ্টিকোণে তার কিঞ্চিৎ উল্লেখ করা যাক।

ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ নখয়ি আহমার বলত, আলীই আল্লাহ। মাদায়েনের ইসহাকিয়া নামক ভ্রান্ত গোষ্ঠীটি তার থেকে আবিষ্কার। খতিব বলেন, আবু মুহাম্মাদ হাসান ইবনে ইয়াহইয়া নাওবখতির একটি কিতাব আমার হস্তগত হয়, যা রাফেযি গাজীদের খণ্ডনে লেখা হয়েছে। খোদ লেখক শিয়া মুতাকাল্লিমদের ইমামিয়া মতবাদের অনুসারী। তিনি অতিরঞ্জনকারী রাফেযিদের বিভিন্ন মতবাদের কথা লিখতে আরম্ভ করেছেন। লেখার একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, আমাদের যুগে অতিরঞ্জনের পাগলামিতে ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ আহমার মারাত্মক বাড়াবাড়ি করে গেছেন। তার ধারণা—আলীই আল্লাহ। তিনিই সর্বদা প্রকাশমান। অতএব একবার তিনি হাসানের সুরতে আসেন, আবার হোসাইনের আকৃতিতে। তিনিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, রাফেযিদের একটি গোত্রের বিশ্বাস হচ্ছে হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. কাফের ছিলেন। কেউ কেউ বলেছে, না; বরং তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগী হয়ে গিয়েছিলেন। কারো কারো মতে আলী রা. ছাড়া সবাই বিদ্রোহ করেছিলেন। সহিহ সূত্রে আমাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছেছে যে, শিয়ারা যায়েদ ইবনে আলীর কাছে আবেদন করল, আপনি তাদের ব্যাপারে বিদ্রোহ করুন যারা হজরত আলী রা.-এর ইমামতের বিরোধিতা করেছিল। নতুবা আমরা আপনাকে ছেড়ে দেবো। যায়েদ ইবনে আলী তাদের এ আবেদন অস্বীকার করলে এ সব শিয়ারা তাঁকে ছেড়ে দেয়। তখন ‘রাফেযি’ নামে তারা পরিচিতি পায়। তাদের একটি দল মনে করে, ইমামত মুসা বিন জাফর পর্যন্ত ছিল। তারপর তার পুত্র আলীতে এসেছে, এরপর তার পুত্র মুহাম্মাদ আলীতে এসেছে, পরে তার পুত্র মুহাম্মদের ওপর, এরপর হাসান ইবনে মুহাম্মাদ আলআশকারীতে আসে, পরে তার পুত্র মুহাম্মদের ওপর—এই বারোজন ‘মাহদি’। যাদের অপেক্ষা করা হয়েছিল। দলটির ধারণা—এরা মারা যাননি; বরং গোপন রয়েছেন। শেষ যুগে ফিরে আসবেন। তখন পৃথিবী ইনসাফে ভরে যাবে।

আবু মানসুর আলআজলী বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আলী আলবাকের-এর অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের দাবিমতে, তিনি এমন খলিফা যাকে সরাসরি আকাশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তার মাথার ওপর পরম করুণাময় হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন।

রাফেযিদের একটি দলকে ‘জানাহাই’ সম্প্রদায় বলা হয়। যারা আবদুল্লাহ ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর ইবনে যিল জানাহাইনের মুরিদ। তাদের অভিমত হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার আত্মা আম্বিয়াদের পিঠে ঘোরাফেরা করত, এভাবে তা উল্লেখিত আবদুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে। এ ব্যক্তির মৃত্যু হয়নি; বরং তিনিই মাহদি—যার অপেক্ষা করা হচ্ছে।

তাদের একটি সম্প্রদায়ের নাম ‘গারাবিয়া’। যারা তার ব্যাপারে নবুয়তের অংশীদার বলে সাব্যস্ত করে থাকে। এদের একটি দলকে বলা হয় ‘মুফাওয়াযা’। যারা বলে, আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদকে সৃষ্টি করে অবশিষ্ট পৃথিবী সৃষ্টি করা তার এখতিয়ারে ছেড়ে দেন। তাদের আরও একটি গোত্রকে বলা হয় ‘মুহাম্মিয়া’। এরা হজরত জিবরীল রা.-এর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে বলে, তিনি আলী রা.-এর কাছে ওহী পাঠানোর ব্যাপারে নির্দেশিত ছিলেন, অথচ তিনি তা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে প্রেরণ করেন। তাদের কেউ কেউ বলে, আবু বকর রা. হজরত ফাতেমা রা.-কে মিরাস না দিয়ে জুলুম করেছেন।

বর্ণিত আছে, সাফাহ্ আক্কাসি একদিন যুতাআ শুরু করলে জনৈক ব্যক্তি—যে নিজেকে আলীর ওপর অন্যায়ের বংশধর বলে মনে করে, সে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন! আমার ওপর অন্যায় করা হয়েছে। আমার প্রাপ্য আমাকে ফিরিয়ে দিন। সাফাহ বললেন, তোমার ওপর কে জুলুম করেছে? সে বলল, আমি আলীর বংশধর। আবু বকর ফাতেমা রা.-কে মিরাসের অংশ দেয়নি, সুতরাং আমি মজলুম। অর্থাৎ আমাকে মিরাসের অংশ দেয়া হোক। সাফাহ বললেন, আবু বকরের পর কে এসেছিলেন? সে বলল, ওমর। সাফাহ বললেন, তিনিও জুলুম করেছেন? সে বলল, হ্যাঁ। সাফাহ বললেন, তারপর কে খলিফা নির্বাচিত হয়েছেন? সে বলল, ওসমান রা.। সাফাহ বললেন, তিনিও কি নিয়মমাফিক জুলুমের ওপর ছিলেন? সে বলল, হ্যাঁ। সাফাহ বললেন, ওসমানের পর কে খলিফা হন? বর্ণনাকারী বলেন, এখন তার হুঁশ ফিরে এসেছে। উত্তর না দিয়ে সে এদিক-সেদিক তাকিয়ে পালাবার পথ খুঁজতে থাকে।

ইবনে আকীল বলেন, এটা স্পষ্ট কথা যে, যে ব্যক্তি রাফেযি মাযহাব উদ্ভাবন করেছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল দীন ইসলামে এবং মূলত নবুয়তে মুহাম্মদিকে অপদস্থ ও কলঙ্কিত করে ধ্বংস করে দেয়া। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ সকল বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস নিয়ে এসেছিলেন, তা আমাদের চোখের আড়ালে। আমরা কেবল সালফে সালেহীন অর্থাৎ সাহাবা ও তাবেয়িদের পক্ষ থেকে সে সব কথা পেয়ে থাকি। কেননা তাঁরা খুবই নিখুঁতভাবে নবীর ওপর অর্পিত দীন ও আকিদা সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। রাফেযিরা এখানে এসেই বিশ্বাসে চিড় ধরাতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। তারা বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা চালাতে থাকে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর প্রথমে বলতে থাকে— তিনি তাঁর বংশে খেলাফতের ব্যাপারে অন্যায় করেছেন এবং নবীকন্যা ফাতেমাকে মিরাস না দিয়ে জুলুম করেছেন। সুতরাং নবুয়তের সময় যিনি সঠিক পথে ছিলেন, তাকে নবীর মৃত্যুর পর আর সঠিক পাননি। তাদের ধারণা—নবীর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ছিল। সুতরাং তারা এমনভাবে অপপ্রচার চালাতে থাকে যে, নবীর মৃত্যুর পর দীনের সবকিছু সঠিকভাবে জাতি জানতে পারছে না। তাই সাহাবিদের কথার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাদের মূল এজেন্ডা ছিল, যাতে মুসলমানদের আকিদা নষ্ট হয়ে যায়, ঈমানের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়াশয়ে মানুষ সন্দেহ-সংশয়ে পতিত হয় এবং মুজিযাপূর্ণ বর্ণনাসমূহ থেকে তারা বিমুখ হয়ে পড়ে। চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আর ধোঁকাসর্বস্ব এই সম্প্রদায়ের ফিতনা ইসলামের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব বয়ে আনে।

গ্রন্থকার বলেন, রাফেযি সম্প্রদায় হজরত আলী রা. এর সাথে হৃদ্যতায় এমন বাড়াবাড়িতে ঠেকেছে যে, তারা তার মর্যাদার বর্ণনা দিতে গিয়ে বহু রেওয়ায়েত নিজেরা তৈরি করে নিয়েছে। তাদের এমন অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণে হজরত আলী রা. নিজেই এদের তিরস্কার করেন। আমি 'কিতাবুল মাউযূয়াত' গ্রন্থে এ ধরনের অনেক বানোয়াট বর্ণনার কথা উল্লেখ করেছি।

তাদের সে বানোয়াট উক্তিসমূহের কিছু হচ্ছে এমন— 'সূর্য ডুবে যাচ্ছে আর হজরত আলী রা. এর আসরের নামায ছুটে যাবার উপক্রম। এমন সময় পুনরায় সূর্য উদিত হয়।' এই বর্ণনাটির অবস্থা এতই নাজুক যে, কোনো 'সেকা' তথা বিশ্বস্ত রাবি বা বর্ণনাকারী এটি বর্ণনা করেননি। অনুরূপভাবে অর্থের দিক দিয়েও কথাটি বাতিল বলে বিবেচিত। কেননা সূর্য ডুবে গেল তো আসরের সময় শেষ হয়ে যায়। পরে আবার সূর্য দেখা গেলে তখন নতুন সময় তৈরি হবে।

তাদের ভ্রান্ত বর্ণনার আরেকটি হচ্ছে, 'হজরত সাইয়্যিদাতুন নিসা ফাতেমা রা. এর নিজে গোসল করা। পরে মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তাঁর অসিয়ত করা যে, এই গোসলই যথেষ্ট, পুনরায় আমাকে মৃতের গোসল দেবে না।' এ বর্ণনাটি উদ্ধৃতিসূত্রেও ডাহা মিথ্যা, যা প্রকাশেই দেখা যাচ্ছে। অর্থগত দিক দিয়েও এটি রাফেযি সম্প্রদায়ের চরম অজ্ঞতার পরিচায়ক। কেননা মৃত্যু সংঘটিত হলে গোসল ওয়াজিব হয়। সুতরাং মৃত্যুর পূর্বে গোসলে কী লাভ? এছাড়া তারা এমন অসংখ্য ভুয়া ও ধৃষ্টতাপূর্ণ বর্ণনা প্রচার করে থাকে, যার না আছে কোনো সনদগত ভিত্তি, না আছে অর্থগত সামঞ্জস্য।

ফিকাহর ক্ষেত্রেও এই মাযহাবের অদ্ভুত বিদআত পরিলক্ষিত হয়; যা ‘ইজমা’ তথা উম্মতের সর্বসম্মত মতের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ইবনে আকিল র. এর পত্রে উল্লেখিত আছে, তিনি বলেন, আমি মুতাওয়াতির গ্রন্থ থেকে এটা উল্লেখ করেছি। রাফেযী ইমামিয়াদের মতে, সরাসরি জমিন ও উদ্ভিদের ক্ষেত্র ছাড়া অন্যত্র সিজদা দেয়া বৈধ নয়। টিলা দ্বারা ইস্তঞ্জা করা শুধু মলত্যাগের বেলায় বৈধ, পেশাবের বেলায় বৈধ নয়। মাথা মাসেহ করা জায়েয নেই। তাদের মতে, যদি কোনো পুরুষ কোনো মহিলার সাথে ব্যভিচার করে—যার স্বামী রয়েছে, তাহলে এই মহিলা সেই ব্যভিচারকারীর উপর চিরদিনের জন্য হারাম। তার স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দিলেও উক্ত ব্যভিচারকারী তাকে বিয়ে করতে পারবে না। এই সম্প্রদায় আহলে কিতাবদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে অবৈধ মনে করে। আরও বলে, কোনো শর্তারোপ করে তালাক দেয়া হলে, সেই শর্ত পতিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তালাক পতিত হবে না। শুধু তা-ই নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী পাওয়া না যাবে, ততক্ষণ তালাক পতিত হবে না। তাদের মতে, যে ব্যক্তি অর্ধরাত পর্যন্ত এশার নামায না পড়ে শুয়ে পড়ে তার ওপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। নিদ্রা হতে জাগ্রত হলে এই ভুলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে সকালে রোযা রাখবে। মহিলারা মাথার চুল কাটলে তার ওপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। কোনো ব্যক্তি নিজের কন্যা, স্ত্রী বা স্বামীর মৃত্যুর কাপড় ছিঁড়লে তার ওপর কসমের কাফফারা ওয়াজিব হবে। যে ব্যক্তি এমন নারীকে বিয়ে করে যার স্বামী আছে, অথচ সে তা জানে না, এমতাবস্থায় তার ওপর পাঁচ দিরহাম কাফফারা ওয়াজিব হবে। মদ্যপকে দুইবার সাজা দেয়ার পর তৃতীয়বার তাকে হত্যা করা হবে। চুরির শাস্তিস্বরূপ চোরের আঙুলের গোড়া থেকে কর্তন করা হবে এবং কব্জি অবশিষ্ট রাখা হবে। পুনরায় চুরি করলে তাঁর বাঁ পা কাটা হবে। তৃতীয়বার চুরি করলে আজীবন জেলখানায় বন্দি করে রাখা হবে।

রাফেযীরা বাইম মাছ এবং আহলে কিতাবের জবাইকৃত জন্তুকে হারাম মনে করে। জবাই করার সময় তারা কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে আরও বহু ধরনের নিয়ম-কানুনের কথা বলে থাকে—যা বর্ণনা করে আলোচনা দীর্ঘ করা অর্থহীন। এগুলো সব উম্মতের সর্বসম্মত ঐকমত্যের বিপরীত। শয়তান তাদেরকে এমনভাবে প্ররোচনা দিয়েছে যে, তারা কোনো প্রকার সনদ ব্যতিরেকে কিয়াসবিরোধী এ-সব মতবাদ নির্ণয় করেছে। রাফেযিদের ভ্রান্ত মতবাদ অসংখ্য। তারা নামায থেকে বঞ্চিত, কেননা তারা অযুর সময় পা ধৌত করে না। এরা জামাত থেকে বঞ্চিত, কারণ তারা নিষ্পাপ ইমাম সন্ধান করে। এছাড়া তারা সাহাবাদের গালমন্দ করে থাকে।

অথচ হাদিসে আছে, আবু সা'ঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ، ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ، وَلَا نَصِيفَهُ
'তোমরা আমার সাহাবিগণকে গালমন্দ করো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত পরিমাণ সোনা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ-এর সমপরিমাণ সওয়াব হবে না।”

অন্যত্র বর্ণিত আছে, হজরত আবদুর রহমান ইবনে সালেম হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, إِنَّ اللَّهَ اخْتَارَنِي، وَاخْتَارَ لِي أَصْحَابًا، فَجَعَلَهُمْ لِي وُزَرَاءَ وَأَنْصَارًا وَأَصْهَارًا، فَمَنْ سَبَّهُمْ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لَا يُقْبَلُ مِنْهُمْ صَرْفُ، وَلَا عَدْلُ
'আল্লাহ তায়ালা আমাকে নির্বাচিত করেছেন এবং আমার জন্য আমার সাহাবাদেরকে নির্বাচিত করেছেন। তাদেরকে আমার জন্য উজির, আনসার ও সৈন্য হিসেবে তৈরি করেছেন। যে ব্যক্তি তাদেরকে মন্দ বলবে, তার ওপর আল্লাহ তায়ালা, ফেরেস্তাগণ ও সমুদয় মানবজাতির অভিসম্পাত। আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তাদের ফরয নফল কোনো প্রকার ইবাদত কবুল করবেন না।”

সুয়াইদ ইবনে গাফলাহ রা. বলেন, আমি কুফায় এমন একটি দলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, যারা হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. এর সম্পর্কে কটূক্তি প্রকাশ করছে। অতঃপর আমি হজরত আলী রা. এর দরবারে গিয়ে তাঁর খেদমতে আরয করলাম, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার কিছু সৈন্যের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে দেখলাম তারা হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. এর ব্যাপারে এমন কথোপকথন করছে, যা তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। সম্ভবত তারা আপনাকেও এমন ধারণা লালন করেন বলে মনে করেছে। নতুবা প্রকাশ্যে কী করে এমন ধৃষ্টতা দেখাতে পারে? হজরত আলী রা. বললেন, أعوذ بالله أعوذ بالله "আমি আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।” আমি আল্লাহর কাছে এ জন্য পানাহ চাচ্ছি, কারণ আমার অন্তরে তাঁদের সম্পর্কে কোনো বিরূপ ধারণা নেই; বরং আমি তো তাঁদের প্রতি এমন ভালোবাসা লালন করি, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আমার ভালোবাসা রয়েছে। যে ব্যক্তি তাঁদের সম্পর্কে ভালো ও উত্তম ছাড়া মন্দ কোনো বিষয় মনে ঠাঁই দেবে, তাদের ওপর আল্লাহর লানত। তাঁরা উভয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবি, ভাই এবং উজির ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের ওপর অনুগ্রহ করুন।

এর পর তিনি অশ্রুসিক্ত নয়ন নিয়ে ওঠে দাঁড়ালেন। মসজিদে গিয়ে মিম্বরে দাঁড়ালেন এবং সেখানে বসলেন। সে সময় তিনি তাঁর সাদা দাড়ি হাতে নিয়ে (দাড়ির প্রতি) তাকিয়ে রইলেন। এমতাবস্থায় লোকজন এসে তাঁর পাশে জড়ো হলো। তিনি দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত ও উন্নত ভাষায় আল্লাহ তায়ালার হামদ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর সানা পাঠ করে খুতবা দিলেন। অতঃপর বললেন, আমার কাছে অভিযোগ এসেছে, কোনো কোনো গোত্র কুরাইশ মুহাজিরীনদের নেতা এবং মুসলমানদের নেতা হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. এর ব্যাপারে আপত্তিজনক মন্তব্য করছে। এতে আমি ভীষণ মর্মাহত। আপত্তিজনক মন্তব্য ও কুৎসা রটনাকারীদেরকে আমি শাস্তি দেবো। সাবধান হয়ে যাও! শপথ ওই মহান সত্তার—যিনি জমি থেকে শস্য উৎপন্ন করেন এবং মানুষ সৃষ্টি করেন, হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.-কে ওই ব্যক্তি ভালোবাসে যে মুত্তাকি ও পরহেযগার। অন্যদিকে তাঁদের সাথে তারাই শত্রুতা পোষণ করে যারা পাপিষ্ঠ। তাঁরা উভয়ে পরিপূর্ণ সততার সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহচর্য লাভ করেছেন। তাঁরা কখনো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মতের বিপরীতে কোনো কর্মকাণ্ড করেননি। এভাবেই তাঁরা শিষ্টের লালন, দুষ্টের দমন করতেন, ক্রোধান্বিত হতেন এবং শাস্তি প্রদান করতেন। কিন্তু কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রায়ের অতিরিক্ত কিছু করতেন না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.-কে যেরূপ ভালোবাসতেন, তেমন ভালোবাসা আর কারও প্রতি পোষণ করতেন না। তাঁদের উভয়ের প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্ট থেকেই তিনি পরকালের সফরে পাড়ি জমিয়েছেন।

এভাবে হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.ও পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, যে অবস্থায় সকল বিশ্বাসী মানুষ তাঁদের ওপর সন্তুষ্ট ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে অসুস্থ হয়ে পড়লে হজরত আবু বকর রা.-কে নামায পড়াতে নির্দেশ দিলে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত থাকাবস্থায় নয়দিন মুমিনদের নামায পড়ান। পরে আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর প্রিয় হাবীবকে উঠিয়ে নিলে, জগদ্বাসীর জন্য তিনি আবু বকর রা.-কে পছন্দ করেন। সে মতে মুমিনরা তাঁকে নিজেদের অভিভাবক ও খলিফায়ে রাসুল মনোনীত করে। তারা আবু বকরের হাতে যাকাতের পণ্য অর্পণ করে খুশিমনে তাঁর হাতে হাত রেখে বায়য়াত গ্রহণ করতে থাকে। এখানে কোনো প্রকার জবরদস্তি ও প্রভাব বিস্তারের চিহ্নও ছিল না। আবদুল মুত্তালিব বংশের মধ্যে সর্বপ্রথম আমিই হজরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর হাতে হাত রেখে বায়য়াত গ্রহণের কার্যক্রম আরম্ভ করি। অথচ আবু বকর রা. নিজ থেকে খুশিমনে খেলাফত গ্রহণ করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন আমাদের মধ্য থেকে কেউ একজন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করুক।

আবু বকর রা. এমন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর সবার চেয়ে উত্তম ও যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতেন। দয়া ও অনুগ্রহের গুণে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর সবচেয়ে বয়স্ক ছিলেন তিনি। ঈমান গ্রহণের বেলায় তিনিই ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। দয়ার্ঘ ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ইবরাহিম খলিলুল্লাহর সাথে তুলনা করতেন। হজরত আবু বকর রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতেন। এভাবেই তিনি অভীষ্ট লক্ষ্যপানে পাড়ি জমান। আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন।

এরপর হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. অভিভাবক ও খলিফা মনোনীত হন। আমি এমন ব্যক্তি, যে তাঁর খেলাফতের ব্যাপারে শুরু থেকেই সন্তুষ্ট ছিলাম। তিনিও হজরত রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর অনুপম বন্ধু আবু বকর রা. এর পদাঙ্ক অনুসরণে অটল থাকেন। প্রতি প্রতিটি বিষয়ে তিনি পূর্বসূরিদ্বয়ের বাতানো ও দেখানো পথে চলতেন, যেভাবে উটের ছানা উটের পেছনে পেছনে চলতে থাকে। নিঃসন্দেহে আল্লাহর শপথ। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর এমন শান ছিল যে, তিনি দুর্বল মুমিনদের ওপর ভীষণ দয়া ও অনুগ্রহ রাখতেন এবং অন্যায় ও অত্যাচারীদের ওপর বজ্রকঠিন ছিলেন। আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে কোনো অপবাদকারীর অপবাদকে তিনি ভয় পেতেন না। সর্বদা তিনি হকের ওপর অটল ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে সত্যের আলো বিচ্ছুরিত হতো। মানুষ ভাবত, আল্লাহর ফেরেশতার মুখ থেকে এমন হক কথা বের হচ্ছে। তিনি ইসলামধর্ম গ্রহণ করলে আল্লাহ তায়ালা ইসলামের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।

মদিনায় তাঁর হিজরতের কারণে দীনের ভিত এত দৃঢ় হয় যে, মদিনার মুনাফিকরা তার ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে এবং মুমিনের অন্তরে তাঁর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা জন্মে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এর সাথে তুলনা দেন। তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শত্রুদের ওপর ভীষণ কঠোর ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা উভয় সাহাবার ওপর রহম করুন এবং আমাদেরকে তাঁদের দেখানো পথে মানযিলে মাকসুদ তথা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার তাওফিক দিন।

এখন বলো এ দু'জনের মতো আর কাউকে কি পাবে? মনে রেখো! যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসে, সে নিশ্চয় ওই দুই মহান সাহাবিকে ভালোবাসে। আর যে ব্যক্তি তাদেরকে ভালোবাসবে না, সে নিশ্চয় আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে এবং আমিও তার ওপর অসন্তুষ্ট। আমি যদি পূর্ব হতেই তোমাদেরকে এই সংবাদ পৌঁছাতে পারতাম, তাহলে এখন যারা ওই দুই মহান সাহাবি সম্পর্কে কটূক্তি করছে, তাদেরকে শাস্তি দিতাম। এখন সাবধান হও! আগামীতে যদি এমন কোনো সংবাদ আমার কানে আসে এবং প্রমাণিত হয়, তাহলে তাকে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করব; যা অপবাদকারীদের দেয়া হয়। (অর্থাৎ নির্দোষ ও পবিত্র নারী-পুরুষের ওপর মিথ্যা অপবাদদাতার শাস্তি)। মনে রেখো, এই উম্মতের মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হচ্ছেন হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.। তারপর কে উত্তম তা আল্লাহই ভালো জানেন।

আবু সুলাইমান হামদানি বলেন, হজরত আলী রা. হতে বর্ণিত, শেষ জমানায় এমন লোকদের দেখা যাবে, যারা আমাদের অনুসারী বন্ধুত্বের কথা প্রকাশ করবে, অথচ মনে কুধারণা পোষণ করবে। তাদেরকে রাফেযা বলা হবে। তারা কখনোই আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের চেনার উপায় হচ্ছে, তারা হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করবে। তোমরা তাদেরকে যেখানেই দেখবে হত্যা করবে। কেননা এরা মুশরিক।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬৭৩, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৫৪০
২. মুসতাদরাকে হাকিম: ৩/৭৩২

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের ওপর ইবলিসের ধোঁকা

📄 বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের ওপর ইবলিসের ধোঁকা


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, বাতেনিয়া এমন একটি সম্প্রদায়, যারা ইসলামের পর্দায় নিজেদের প্রকৃত রূপ আড়ালে রেখেছে। এরা রাফেযিদের নিকটবর্তী। তাদের আকিদা-বিশ্বাস ও আমল সম্পূর্ণ ইসলামপরিপন্থী। বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের মতবাদের সারসংক্ষেপ হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তা বেকার। নবুয়ত বলতে কিছু নেই। ইবাদত অনর্থক। মৃত্যু-পরবর্তী পুনরুত্থান ও হাশর ইত্যাদি ধোঁকা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই সম্প্রদায়টি তাদের মতবাদের কথা শুরুতে কারও কাছে প্রকাশ করত না; বরং বাহ্যত আল্লাহ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হক বলত এবং দীনকে বিশুদ্ধ বলত। কিন্তু অন্তর থেকে এগুলো সব অস্বীকার করত। ইবলিস তাদেরকে তার অনুগত করতে সমর্থ হয়। তাদেরকে সম্পূর্ণ হাতের মুঠোয় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দীনবিধ্বংসী অদ্ভূত মতবাদ প্রচার করতে থাকে। বাতেনিরা আটটি দলে বিভক্ত।

১. الباطنية (বাতেনিয়া): এ নামে তাদেরকে অভিহিত করার কারণ হচ্ছে, তারা বলে থাকে, কুরআন ও হাদিসের বাতেনি (গোপন) অর্থ আছে। আর এই বাতেনি অর্থই হচ্ছে তার মজ্জা ও সারগর্ভ। অন্যদিকে প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে কুরআন-হাদিসের চর্মসদৃশ। এগুলোর বাহ্যিক আকৃতি দেখে তার মাসআলার মধ্যে অজ্ঞ লোকেরা ফেঁসে গেছে। জ্ঞানীদের কাছে কুরআন-হাদিস বিভিন্ন রহস্য ও গোপন রহস্যের ইঙ্গিতবাহী বার্তা বিদ্যমান। যার জ্ঞান-বুদ্ধি সে পর্যন্ত পৌঁছেনি সে শরিয়তের প্রকাশ্য বিধি-বিধানের জালে আটকে পড়েছে। অন্যদিকে যারা ইলমে বাতেন পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়েছ, তাদের ওপর থেকে শরিয়তের সকল প্রকার বিধি-নিষেধ রহিত হয়ে গেছে। وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِم “এবং তাদের ওপর থেকে এমন সব বোঝা নামিয়ে দেয়, যা তাদের ওপর চাপানো ছিল আর এমন সব বাঁধন থেকে তাদেরকে মুক্ত করে যাতে আবদ্ধ ছিল।"' দ্বারা এরাই উদ্দেশ্য। এই ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যখন শরিয়তের প্রকাশ্য সকল বিধি-বিধানের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন সম্ভব হবে তখন শরিয়তকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া সহজতর হবে।

২. الإسماعيلية )ইসমাইলিয়া): এই নামকরণের নেপথ্য কারণ হচ্ছে, তারা নিজেদেরকে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল ইবনে জাফরের দিকে সম্পর্কিত বলে দাবি করে। তাদের দাবি—ইমামতের পরিসমাপ্তি এই লোকের ওপরই ঘটেছে। কেননা তিনি সপ্তম পুরুষ। আর সপ্তম পুরুষে ইমামত শেষ হয়। এ কারণে আকাশের স্তর সাতটি, জমিনও সাত স্তরের, অনুরূপভাবে সপ্তাহে দিন সাতটি। সুতরাং ইমামের পরম্পরাও সাতটিতেই সীমাবদ্ধ। এমনইভাবে মনসুর আব্বাস পর্যন্ত পৌঁছেছে। আব্বাস, তারপর তার ছেলে আবদুল্লাহ, তারপর আলী ইবনে আবদুল্লাহ, তারপর মুহাম্মাদ ইবনে আলী, এরপর ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ, এরপর সাফাহ, তারপর মনসুর। অর্থাৎ মনসুরে এসে সপ্তম পরম্পরা সমাপ্ত হয়।

আবু জাফর তাবারি তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ করেন, আলী ইবনে মুহাম্মাদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাবেন্দিয়াদের মধ্যে এক ব্যক্তি তার কাছে এসে প্রত্যয় ব্যক্ত করল যে, তুমিই সেই রুহ, যা ঈসা আলাইহিস সালাম এর সম্পর্কে বলা হয়? ওই ব্যক্তিকে 'আবলাক' বলা হতো। কেননা তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে বসন্তের দাগ পরিদৃষ্ট ছিল। এ ব্যক্তি বিদায় নিলে রাবেন্দিয়ার অন্যান্য লোকদেরকে সে পথভ্রষ্ট করতে থাকে এবং বলতে থাকে, যে আত্মা ঈসা ইবনে মারইয়ামের মাঝে দেখা যেত তা আলী ইবনে আবু তালিবের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এরপর একের পর এক ইমামের মাঝে তা দেখা যেতে থাকে। এভাবে তা ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদের ওপর এসে শেষ হয়।

এ দলটি মুহাররমা নারীদেরকে বৈধ মনে করে থাকে। এ কারণে তারা একটি দলকে দাওয়াত দিলে, তাদেরকে ঘরে এনে খাবার ও মদজাতীয় পানীয় পরিবেশন করে তাদেরকে নিজের ঘরের নারীদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই সংবাদ আসাদ ইবনে আবদুল্লাহর কাছে পৌঁছলে সে তাদেরকে হত্যা করে শূলে চড়িয়ে রাখে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাদের যে- সব অনুসারী অবশিষ্ট আছে, তারা এ নিয়মই পালন করছে। তারা আবু জাফরের উপাসনা করে। তারা একটি সবুজ পাখায় হাত মেলে রাখে। যাতে তাদেরকে দেখে মানুষ মনে করে, এরা আকাশে উড়ে বেড়ায়, এখন নিচে নামছে কিন্তু পা এখনও মাটিতে পড়েনি। ইত্যবসরে সে মারা গেছে। দলটি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং 'আবু জাফর, তুমি! তুমি!' বলে চিৎকার করতে থাকে।

৩. السبعية সাবয়িয়া: এ উপাধির দু'টি কারণ। প্রথমত তাদের বিশ্বাস— ইমামতের পরম্পরা সাত সাতটি। যেমন আমরা পূর্বে আলোকপাত করেছি। সপ্তমে এসে তার পরিসমাপ্তি ঘটে। এখন চলছে শেষ বেলা। কেয়ামত দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। পরম্পরা এভাবে অসীমের পানে চলতে থাকবে। আর প্রতি সাতজন অন্তর অন্তর কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। কখনো তা শেষ হবে না। নামকরণের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, তারা মনে করে, এই ভূখণ্ডকে সাতটি নক্ষত্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যথা—বুধ, বৃহস্পতি, মঙ্গল, সূর্য, মঙ্গল, শনি ও চন্দ্র।

৪. البابكية বাবকিয়া: এটা বাতেনিয়াদের একটি উপদলের নাম। এরা অগ্নিপূজারি বাবক খুররমীর অনুসারী, যে বাতেনিয়াদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে একজন জারজ সন্তান। সে ২০১ হিজরিতে আজারবাইজানের একটি পাহাড়ি এলাকা থেকে আত্মপ্রকাশ করে। বহু লোককে সে তার অনুসারী বানিয়ে ফেলে। নিষিদ্ধ বস্তুকে সে বৈধতা দিতে থাকে। কারও সুন্দরী বোন বা স্ত্রীর খবর পেলে সে তাকে উপস্থাপন করার নির্দেশ দিত। কথা মানলে তো ভালো কথা। অন্যথায় তাকে হত্যা করে তার বোন বা স্ত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণ করত। বিশ বছর ধরে সে পাহাড়ের গুহায় অবস্থিত আস্তানা থেকে নানা অপকর্ম করতে থাকে। সে দুই লাখ পঞ্চান্ন হাজার পাঁচশত (২,৫৫,৫০০) মানুষকে হত্যা করে। বাদশা তার সাথে যুদ্ধ করে। কিন্তু তার সাথে সৈন্যরা পেরে ওঠেনি। পরে বাদশাহ মু'তাসিম আফসিয়ান সর্দারকে তার সাথে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়। আফসিয়ান তাকে তার ভাইসহ ২২৩ হিজরিতে গ্রেফতার করে বাগদাদ অভিমুখে নিয়ে যায়। তখন তার ভাই তাকে বলেছিল, হে বাবক! তুমি এমন কাজ করেছ যা অন্য কেউ করতে পারেনি। এখন তোমাকে এমন ধৈর্যধারণ করতে হবে যা আর কেউ করেনি। বাবক বললে, হ্যাঁ, তুমি আমার ধৈর্যশক্তি পর্যবেক্ষণ করবে।

বাদশা মু'তাসিম তার হাত-পা কেটে ফেলতে নির্দেশ দিলে সে রক্ত দিয়ে তার মুখ রাঙিয়ে দেয়। তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আমি চাই না আমার মুখ হলুদবর্ণ ধারণ করুক, যাতে কেউ ভাবতে পারে যে, বাবক মৃত্যুকে ভয় পেয়েছে। অতঃপর তার চার হাত-পা কর্তন করা হয়। গলা কাটা হয় এবং আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। তার ভাইয়ের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি। এভাবে মারার পরও তাদের কারও মুখ দিয়ে কোনো প্রকার শব্দ বের হয়নি।

গ্রন্থকার বলেন, বাবকিয়াদের একটি গোত্র এখনও অবশিষ্ট রয়ে গেছে। তাদের মতবাদ হচ্ছে, বছরের একটি রাত তাদের আনন্দের জন্য নির্ধারিত। এ রাতে তারা নির্দিষ্ট একটি স্থানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে সমবেত হয়ে মাঝ বরাবর বাতি জ্বালিয়ে দেয়। প্রত্যেক পুরুষ দৌড়ে এসে একজন নারী গ্রেফতার করে তার সাথে ব্যভিচার করে। এর তা'বীল তথা বানোয়াট ব্যাখ্যাস্বরূপ তারা বলে, ব্যভিচার নয়; এটি শিকার ভোগ করার মতো। কেননা শিকারকৃত বস্তু বৈধ।

৫. المحمرة মুহাম্মিরা : এদেরকে এ নামে আখ্যায়িত করার কারণ হচ্ছে, বাবকের যুগ থেকে তারা লাল রঙে রাঙানো কাপড় পরিধান করে আসছে।

৬. القرامطة কারামিতা : মুয়াখখিরীন তথা পরবর্তী ইতিহাসবিদদের মতে তাদের 'কারামিতা' নামকরনের নেপথ্যে দু'টি কারণ রয়েছে। যথা-

ক. খোরাসানের এক ব্যক্তি কুফার সাওয়াদ এলাকায় গিয়ে সেখানকার আবেদ ও যাহেদ তথা দুনিয়াবিমুখ ইবাদতকারী বনে যায়। সে মানুষজনকে আহলে বাইতের ইমামগণের দিকে ডাকতে থাকে। কারমাতিয়া নামক এক ব্যক্তি তার কাছে আসে। তাকে রাঙাচোখের কারণে কারমাতিয়া বলে সম্বোধন করা হতো। গ্রামাঞ্চলে তাকে এ নামেই ডাকা হয়। পরে ওই এলাকার সর্দার তাকে গ্রেফতার করে জেলখানা পাঠিয়ে জেলখানার তালার চাবি তার বালিশের নিচে রেখে দেয়। সর্দারের বাঁদি সদয় হয়ে চাবি নিয়ে জেলখানার তালা খুলে তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। পরে সে জেলখানার তালা বন্ধ করে চাবি যথারীতি সর্দারের বালিশের নিচে রেখে দেয়। সকালে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মানুষ অতি আবেগী হয়ে ফিতনায় পতিত হতে থাকে। উল্লেখিত ব্যক্তি সিরিয়ায় পৌঁছে যায়। সেখানকার আশ্রয়দাতাদের কাছে সে কারমাতিয়া নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। যাতে করে কুফার সাওয়াদবাসীদের কাছে এ সংবাদ সহজে পৌঁছতে পারে। ধীরে ধীরে তার নাম কারমিতা হয়, এরপর কারামিতায় রূপ লাভ করে। শেষে তার বংশধর ও নিকটাত্মীয়রা ওখানে অবস্থান করতে থাকে।

খ. হামদান কারমাত নামীয় এক ব্যক্তির দিকে সম্পর্কিত করে কারামিতা সম্প্রদায়ের নামকরণ করা হয়। শুরুতে সে বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের আহ্বানকারী ছিল। তার মতবাদ একটি দল মেনে নেয় এবং তাদেরকে কারামিতা নামে অভিহিত করা হয়। এ লোক শুরুতে বেশ দুনিয়াবিমুখ ও বৈরাগ্যের দিকে আকৃষ্ট ছিল, কিন্তু পাশাপাশি সে ছিল জাহেল তথা অজ্ঞ। বসবাস করত কুফা নগরীতে।

একবার তার পাশ দিয়ে বাতেনি সম্প্রদায়ের এক দায়ী একটি গ্রামের দিকে যাচ্ছিল, যার হাতে ছিল একটি গরু। হামদান অপরিচিত এই লোককে দেখে বলল, আপনি কোথায় যাবেন? সে তার নির্দিষ্ট গ্রামের কথা বললে হামদান বলল, আমিও তো সেই গ্রামে যাব। আপনি গরুর পিঠে আরোহণ না করে পায়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন কেন? বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের দায়ী বলল, এ ব্যাপারে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। হামদান জানতে চাইল, কে আপনাকে নির্দেশ দেয়নি? দায়ী বলল, যে আমার তোমার এবং সবার মালিক তিনি নির্দেশ দেননি। হামদান বলল, তিনি তো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। মিথ্যুক ও ধোঁকাবাজ বাতেনিয়া দায়ী জবাবে বলল, হ্যাঁ। তুমি সত্য বলেছ। হামদান বলল, যে গাঁয়ে আপনি যাচ্ছেন, সেখানে আপনার উদ্দেশ্য কী? দায়ী উত্তরে বলল, মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর দিকে এবং পথভ্রষ্টতা থেকে হেদায়াতের দিকে আহ্বান করতে যাচ্ছি। তাদেরকে লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা থেকে উদ্ধার করব। এমন সম্পদ দেবো যাতে তারা ধনী হয়ে যায়।

হামদান শুনে বলল, আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। আমাকেও এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাবেন এবং জ্ঞানদানে আমার প্রতি অনুগ্রহ করবেন। ধোঁকাবাজ দায়ী বলল, সবার কাছে রহস্যের উন্মোচন করতে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত তার ওপর আস্থা রাখা না যাবে এবং তার কাছ থেকে শপথ নেয়া না হবে। হামদান বলল, আপনি আপনার অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করুন। আমি মনেপ্রাণে তা ধারণ করব। দায়ী বলল, তুমি আমার জন্য এবং এ সময়কার ইমামের জন্য স্বীয় প্রাণের ওপর আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা ও প্রতিজ্ঞা ধারণ করো, তাহলে ইমামের যে রহস্য আমি তোমার কাছে প্রকাশ করব, তা কাউকে বলতে পারবে না। আমার রহস্যের কথাও কাউকে বলতে পারবে না। হামদার সে মতেই প্রতিজ্ঞা করল। পরে দায়ী তাকে ভ্রান্ত শাস্ত্র শিক্ষা দিতে থাকে। এভাবে তাকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলে। অবশেষে এই হামদানই একসময় ভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট পথের একজন জাহেল নেতা বনে যায় এবং বিদয়াতের নিত্যনতুন উপাদান আবিষ্কার করতে থাকে। তার অনুসারীদেরকে কারামতিয়া বা কারামিতা বলে আখ্যায়িত করা হয়।

পরে তার বংশধর ও উত্তরসূরিরা এই ভ্রান্ত আকিদাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। তাদের মধ্যে আবু সাঈদ কারমাতী নামের একজন পাষণ্ড ধোঁকাবাজ যোদ্ধা ২৮৬ হিজরিতে আত্মপ্রকাশ করে। সে বিপুল প্রতিপত্তি লাভ করতে থাকে। অসংখ্য মানুষকে সে হত্যা করেছে। বহু মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শত শত কুরআন মাজিদ পুড়িয়ে দিয়েছে। হাজীদের বহু কাফেলায় সে লুটতরাজ করেছে। নিজের অনুসারীদের জন্য নিত্যনতুন পন্থা আবিষ্কার করতে থাকে এবং অগণিত অসম্ভব ও উদ্ভট কথা ছড়িয়ে দিতে থাকে। আবু সাঈদ মারা গেলে শয়তান তার কবরকে নিয়ে আরও নানা ধরনের বিদয়াত মানুষের মনে ছড়িয়ে দিতে থাকে। লোকেরা আবু সাঈদের নাম শুনে দরুদ পাঠ করত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম শুনলে দরুদ পড়ত না। ধৃষ্টতা দেখিয়ে বলত, আমরা আবু সাঈদের রিযিক ভক্ষণ করি, সুতরাং আবুল কাসেম (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর দরুদ পড়ব কেন? আবু সাঈদের পর আবু তাহের তার স্থলাভিষিক্ত হয়। সেও পিতার মতো দুষ্কর্মে মনোযোগী হতে থাকে। এমনকি অতর্কিতে সে পবিত্র কাবায় আক্রমণ করে বসে। সেখানে যা কিছু পেয়েছে সব লুট করে নিয়েছে। হাজরে আসওয়াদ কাবার পাশ থেকে তুলে তার এলাকায় নিয়ে গিয়েছে। মানুষের মনে সে আল্লাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চেয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ)

۹. الخرمية )খুররমিয়া): খুররম অনারবি শব্দ। এর অর্থ মজাদার আনন্দ ও প্রশান্তিদায়ক বস্তু; যার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট থাকে। এ নামের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে মানুষ সকল প্রকার ভোগ-বিলাস যেভাবে চায় সেভাবে অর্জন করতে পারে। শরিয়তে যে-সকল বিষয় মানুষের জন্য নিষিদ্ধ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তারা তা অগ্রাহ্য করে বৈধতা দিতে থাকে নির্দ্বিধায়। এ জন্য বাতেনিয়াদের এই সম্প্রদায়কে খুররমিয়া নামে অভিহিত করা হয়।

৮. আত্-তালীমিয়া (তালীমিয়া): এই উপাধিতে তাদের ভূষিত করার কারণ হচ্ছে, এই সম্প্রদায়ের মৌলিক উৎস হচ্ছে, বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে কোনো কাজ করা যাবে না। যা কিছু তাদের নিষ্পাপ ইমাম বলবেন, বিনা বাক্যব্যয়ে তা মেনে নিতে হবে। তার শিক্ষার প্রতি মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে। তার তালীম ব্যতীত জ্ঞানার্জন হবে না।

টিকাঃ
১. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৭

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 বাতেনিয়া সম্প্রদায় উদ্ভাবন ও এতে অংশগ্রহণের নেপথ্যে

📄 বাতেনিয়া সম্প্রদায় উদ্ভাবন ও এতে অংশগ্রহণের নেপথ্যে


গ্রন্থকার বলেন, বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা শুরুতে দীন ও শরিয়ত থেকে বিচ্যুত হবার লক্ষ্যে অগ্নিপূজারি, সানাবিয়া ও গ্রীক দার্শনিকদের সাথে একত্র হয়ে পরামর্শ করতে থাকে। যাতে তারা এমন দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হতে পারে, যা ইসলামধর্মে থাকার কারণে তাদের ওপর পতিত হয়েছে। কেননা ইসলামধর্মের অনুসারীরা অকাট্য যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে সৃষ্টিকর্তা, রিসালাত ও আখিরাতকে অস্বীকারের ব্যাপারে এসব কুলাঙ্গারের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। এই পথভ্রষ্টরা দেখল, নবুয়ত ও শরিয়তে মুহাম্মদীর আওয়াজ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। এরা কিছুতেই প্রকৃত مسلمانوںকে কাবু করতে না পেরে নামধারী مسلمانوں মধ্য থেকে এমন একটি দল বেছে নিল, যাদের বিবেক-বুদ্ধিতে, মতামতের ক্ষেত্রে বোধশক্তিহীনতা এবং অসম্ভব বিষয়কে মেনে নেয়া ও মিথ্যা কথা গ্রহণ করার মানসিকতা বিদ্যমান। এক্ষেত্রে তারা রাফেযি মাযহাবের অনুসারীদের বেছে নিল। তারা ফন্দি আঁটতে থাকে যে, বাহ্যিকভাবে এরা রাফেযি থাকবে, যাতে সাধারণ হত্যার আওতায় পড়তে না হয়। এভাবে তারা রাফেযি সম্প্রদায়ের পদলেহন করতে থাকে। রাফেযিদের কাউকে কুরআন পড়তে দেখলে তারা বলে, প্রকাশ্য শব্দাবলির ব্যাপারে ধোঁকা খেয়ো না। এর অন্তর্নিহিত রহস্য আসল। রাফেযিরা এদের কথায় আরও পথভ্রষ্ট হতে থাকে। কারণ বাতেনিয়া মতানুসারীরা এমন একজন নেতা বানিয়েছে, যে আহলে বাইতের সদস্য বলে নিজেকে প্রচার করে বেড়ায়। রাফেযিরা দলে দলে তার দলে ভিড়তে থাকে। সব উম্মত ওই নেতার অনুসরণ করাকে তারা ওয়াজিব হিসেবে বিবেচনা করে। তারা আরও দাবি করে, নবীদের মতো তাকেও নিষ্পাপ করা হয়েছে।

এ সব বিষয় দ্বারা এই ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষের সম্পদ ও দেশের ওপর তাদের রাজত্ব কায়েম করা। সমকালীন মুসলমানদের সাথে তাদের বাপ-দাদা হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে যুদ্ধ করতে তারা ফন্দি আঁটতে থাকে। এটাই থাকে তাদের লক্ষ্যের আদি-অন্ত।

গ্রন্থকার বলেন, মানুষকে তাদের প্রতারণার জালে আটকাতে বাতেনিয়ারা বিভিন্ন হিলা-বাহানায় কোমর বেঁধে নামে। এভাবে তারা সদস্য সংগ্রহ অভিযান চালায়। যারা তাদের দলে ভিড়ে প্রথমে তাদের অভ্যাস-প্রকৃতি ভালোভাবে দেখে নেয়। যদি তার ভেতর ইবাদতের মানসিকতা ও দুনিয়াবিরাগী মানসিকতা দেখে, তাহলে তাকে আমানত রক্ষা ও সত্যবাদিতা অক্ষয়ের নিমিত্তে যৌন সংসর্গ ত্যাগ করার আহ্বান জানায়। অন্যদিকে যাকে বিবাহিত এবং যৌনতার দিকে ধাবিত দেখে, তাকে বলে ইবাদত অর্থহীন এবং তাকওয়া অসার। এর কোনো দাম নেই। এটা আহমকের কাজ। নিজেকে জাগতিক তৃপ্তিদায়ক বস্তু থেকে বিরত রাখার কোনো কারণ নেই। এভাবে যে যেমন মাযহাব লালন করে, তাকে সেই মাযহাবের অসারতা ও. অনর্থকতার যুক্তি দিতে থাকে। এ ভ্রান্ত দলে নতুন যোগদানকারী মূর্খরা ভাবতে থাকে, হায়! আমরা এতদিন অন্ধকারে ছিলাম।

নতুন সম্প্রদায়ের সন্ধান পেয়ে তারা খুশিতে উদ্বেল হয়ে যায়। নতুন যোগদানকারীরা হয়তো পাষাণ মনের অধিকারী হতো, নচেৎ প্রাক্তন ইরানী রাজা বা অগ্নিপূজারিদের বংশধর হতো। যাদের বাপ-দাদার রাজত্ব ইসলামের কারণে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। আরেক দল আগন্তুকের মনোবাসনা ছিল, কী করে একটি শহর বা প্রদেশের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়। কিন্তু যুগ ও সুযোগ তার অনুকূলে না থাকার কারণে সে সেই আকাঙ্ক্ষিত কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারছিল না। এরা বাতেনিদের সাথে স্বীয় ধন-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি দিয়ে সহায়তা করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। কেউ কেউ সাধারণ মানুষের কাছে নিজের মান-মর্যাদা বাড়াবার মনোবাসনা বাতেনিয়া সম্প্রদায়ে প্রবেশ করতে থাকে। তারা ভাবতে থাকে সময়ের পট পরিবর্তনে এদের সাথে যোগ দেয়া শ্রেয়।

রাফেযি সম্প্রদায়ের যে-সব কুলাঙ্গার সাহাবায়ে কেরামকে গালি দেয়া ইবাদত বলে মনে করে তারাও সদলবলে বাতেনিয়া সম্প্রদায় যোগদান করতে থাকে। গ্রীক দর্শনে প্রভাবিত বা সানাবিয়ারাও এ দলে ভিড় করে।

এভাবে যাদের কাছে শরিয়তের নিয়ম-নীতি কঠিন মনে হয় এবং অশ্লীলতা ও ব্যভিচারী কার্যকলাপ ভালো লাগে, তারা বাতেনিয়াদের ধোঁকার জালে আটকা পড়ে।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 কুলাঙ্গার বাতেনিয়াদের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিবরণ

📄 কুলাঙ্গার বাতেনিয়াদের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিবরণ


শায়খ আবু হামেদ তুসি বলেন, বাতেনিয়া এমন একটি দল, যারা মুখে ইসলামের দাবি করলেও তাদের বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী ও সাংঘর্ষিক। প্রকাশ্যে তারা রাফেযিদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে। এদের বিশ্বাস হচ্ছে, আদি সৃষ্টিকর্তা দু'জন। কালের বিবেচনায় তাদের অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই। তথাপি একটির অস্তিত্বের জন্য আরেকটির অস্তিত্ব আবশ্যক। তারা বলে থাকে, যে সৃষ্টিকর্তা প্রাচীন তাকে আছে বলা যাবে না আবার নেইও বলা যাবে না। উপস্থিত বলা যাবে না, অনুপস্থিতও বলা যাবে না। জ্ঞাত বলা যাবে না, অজ্ঞাতও বলা যাবে না। গুণী বলা যাবে না, গুণহীনও বলা যাবে না। এই প্রাচীন সৃষ্টিকর্তা থেকেই আরেক সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি হয়েছে। এটাই সর্বপ্রথম অস্তিত্বশীল, পরে সামগ্রিক সত্তা অস্তিত্বশীল হয়েছে।

তাদের মতে, নবী এমন একজন ব্যক্তি, যার ওপর প্রথম খোদার কাছ থেকে দ্বিতীয় খোদার মাধ্যমে পূতঃপবিত্র শক্তির সমাবেশ ঘটেছে। তারা আরও বলে, জিবরাঈল ওই আকলকে বলে, যা নবীর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। তার কোনো সত্তা নেই। এরা আরও দাবি করে বেড়ায়, প্রতি যুগেই নবীর মতো নিষ্পাপ একজন ইমাম থাকেন, যিনি সত্যের ওপর অটল থাকেন। তিনি প্রকাশ্য সবকিছুর ব্যাখ্যা জানেন। তাদের ভ্রান্ত আকিদার অন্যতম হচ্ছে, আখিরাত ও কিয়ামত বলতে কিছু নেই। বরং 'মায়াদ' তথা শেষ প্রত্যাবর্তন মানে, কোনো বস্তু তার উৎসমূলে ফিরে আসা। অনুরূপভাবে মানুষের সত্তাও তার উৎসমূলে ফিরে আসে।

শরিয়ত সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, সাধারণত সকল কিছুই 'মুবাহ' ও বৈধ। যে-সব বিষয়কে হারাম বলে সাব্যস্ত করা হয় সেগুলোও বৈধ। কিন্তু তারা সুযোগ বুঝে একথা আবার অস্বীকার করে বসে। বলে, আমাদের ভাষ্যমতে, মানুষের জন্য তার উপযুক্ত হওয়া জরুরি। কিন্তু তারা যখন বস্তুর রহস্য সম্পর্কে অবগতি লাভ করবে এবং কুরআন-হাদিসের বাতেনি তথা অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হবে, তখন তার ওপর শরিয়তের কোনো কিছুই আরোপ করা যাবে না।

এরা যেহেতু কুরআন-হাদিসের কোনো দলিল-প্রমাণ মানতে রাজি নয়, তাই যাচ্ছেতাই মতবাদ সৃজন করার স্পর্ধা তাদের বেড়ে যেতে থাকে। কিন্তু শুরুতে তারা তা অস্বীকার করেনি, কেননা তখন সাধারণ মানুষ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার আশঙ্কা ছিল। তারা বলে থাকে, 'জানাবাত'-যা দ্বারা গোসল ওয়াজিব হয়, তার মানে হচ্ছে, গ্রহণকারী তার রহস্য প্রকাশ করবে। গোসল দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুনভাবে পাপ থেকে তাওবা করে অঙ্গীকার করা। ব্যভিচারের অর্থ হচ্ছে ইলমে বাতেনের বীর্য এমন ব্যক্তির পেটে নিক্ষেপ করা যার কাছ থেকে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে। রোযার অর্থ হচ্ছে রহস্য উন্মোচন থেকে বিরত থাকা। কা'বা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার দরজা হচ্ছেন আলী রা.। তুফান দ্বারা ইলমের তুফান উদ্দেশ্য, যাদেরকে সন্দেহে পতিত হওয়ার কারণে ডোবানো হয়েছে। 'সাফীনা' তথা জাহাজ এমন মরুভূমিকে বলা হয় যেখানে হজরত নুহ আলাইহিস সালাম তাঁর আহ্বানে সাড়াদানকারীদেরকে আটকে রেখেছিলেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এর আগুন দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে নমরূদের ক্রোধের আগুন। সেখানে প্রকৃত আগুন বোঝানো হয়নি। ইসহাক আলাইহিস সালাম-কে জবাই করার মানে হচ্ছে তার কাছ থেকে নতুন অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল। মুসা আলাইহিস সালাম এর লাঠি দ্বারা তার যুক্তি- প্রমাণ বোঝানো হয়েছে। ইয়াজুয-মাজুয বলা হয় প্রকাশ্যে বিশ্বাসী ওলামায়ে কেরামকে।

স্মর্তব্য, আবু মুহাম্মাদ ছাড়া অন্যরা বর্ণনা করেছেন, বাতেনিয়ারা বলে থাকে, সৃষ্টিকর্তা যখন আত্মাসমূহ সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তিনি নিজেও সেখানে তাঁর আসল আকৃতিতে দৃশ্যমান হন। তখন এ ব্যাপারে কেউই সন্দেহ করেনি যে, ইনি আমাদের থেকে ভিন্ন কেউ। সর্বপ্রথম সালমান ফারেসী রা., মিকদাদ রা. ও আবু যর রা. তাঁকে চিনতে পারেন। সর্বপ্রথম তাকে ওমর রা. অস্বীকার করেছেন। তখন তার নাম হয় ইবলিস। (নাউযুবিল্লাহ)

এ ধরনের অসংখ্য ভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করে থাকে এই কুলাঙ্গার বাতেনিয়ারা। এখানে বিস্তারিত উল্লেখ করে মূল্যবান সময় বিনষ্টের কোনো মানে হয় না। এরা যুক্তি-প্রমাণ ছেড়ে কোনো সন্দেহেও অটল থাকতে পারেনি, যাতে করে তাদের সাথে আলোচনা করার অবকাশ মিলতে পারে। হঠাৎ যদি তাদের সাথে কোথাও সাক্ষাৎ ঘটে, তখন তাদেরকে এসব বিষয় ও বিশ্বাস কোথায় পেয়েছে মর্মে কিছু জিজ্ঞেস করলে, এটা কি কোথাও দেখে পেয়েছে? নাকি কিছু অবলোকনের দ্বারা? নাকি কোনো মাসুম ইমাম বলেছে? যদি বলে, আমরা অন্যদের দেখে পেয়েছি, তাহলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। কেননা সুস্থ বিবেকসম্পন্ন লোকেরাও এমন আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করতে পারেন না। তোমরা যদি নিজেদের মনগড়া হিসেবে এটাকে প্রকাশ্য বলে ভেবে থাকো তবে তা তোমাদের ব্যাপার। অন্যদিকে যদি বলো, অবলোকনের মাধ্যমে আমরা তা পেয়েছি, তবে তা তো তোমরা গোড়াতেই অস্বীকার করে থাকো। যদি বলো, এটা আমাদের নিষ্পাপ ইমাম বলেছেন। তাহলে বলো, কেন তোমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মত ও পথ ছেড়ে দিলে? যা মুজিযা ও ঐশী প্রমাণাদি দ্বারা সাব্যস্ত। এর বিপরীতে নিজেদের ইমামের কথা আকড়ে ধরলে কেন? যার নেই কোনো মুজিযা ও ঐশী প্রমাণ। এরপর তাদের বলা হবে, এই বাতেন ও রহস্য-যার দাবি তোমরা করে বেড়াও, এটাকে গোপন রাখা আবশ্যক নাকি প্রকাশ করা? যদি বলো, প্রকাশ করা আবশ্যক, তখন বলা হবে, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন সেগুলো গোপন রাখলেন? আর যদি বলো গোপন রাখা আবশ্যক, তখন বলা হবে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর যা গোপন রাখা আবশ্যক ছিল, তা তোমাদের জন্য প্রকাশ করা কী করে বৈধ হলো?

ইবনে আকিল রহ. বলেন, ইসলামে বাতেনিয়া ও জাহেরিয়া নামীয় উভয় সম্প্রদায় অসংখ্য ভ্রান্ত মতের আবিষ্কার করে। বাতেনিয়ারা ইসলামের লেবাস ধরে শরিয়ত ছেড়ে দিতে থাকে। নিজেদের ভ্রান্ত বাতেনী ব্যাখ্যার দাবি করে, যার কোনো দলিল নেই। এমনকি এরা শরিয়তের এমন কোনো বিষয় অবশিষ্ট রাখেনি, যার ভ্রান্ত ও মনগড়া ব্যাখ্যা তারা করেনি। এমনকি ওয়াজিব ও হারাম তথা আবশ্যক ও অবৈধ বলে তারা কিছুই আর অবশিষ্ট রাখল না।

এদিকে জাহেরিয়া গোষ্ঠী সর্বত্র কেবল প্রকাশ্য অর্থকেই গ্রহণ করতে থাকে। স্পর্শযোগ্য বিষয় দ্বারা তারা যা কিছু বুঝত তা-ই মান্য করত। উভয় দলই প্রকৃত ধর্মের বহুদূরে অবস্থান করতে থাকে। এদের কোনো ধর্মীয় গুরুর সাথে যদি কখনো আমার সাক্ষাৎ হতো, তাহলে তাদের সাথে ইলমী পন্থায় কথোপকথন না বলে কেবল তাদের বিবেক-বোধকেই তিরস্কার করতাম।

উদাহরণস্বরূপ এমন বলতাম-দেখো, তোমরা বলে বেড়াও-রাজা-বাদশাদের জন্য বিশেষ বিশেষ পন্থা ও তদবির রয়েছে যাতে তারা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়। এমন করে তাদেরকে আশার পিদিম দেখাচ্ছ। এটা তোমাদের মারাত্মক মূর্খতা। জেনে নাও! ইসলাম এমন এক আলোকিত ধর্ম যার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। এদের নাম নিয়েই তোমরা শক্তি সঞ্চয় করে থাকো। নিজেদের অজ্ঞতা ও ধৃষ্টতার বলে ইসলামকে তোমরা বিগড়ে দিতে চাচ্ছ। অথচ ইসলামকেই আল্লাহ তায়ালা পরিপূর্ণ বিজয় দান করেছেন। প্রতি বছর আরাফার ময়দানের তাদের সর্বোচ্চ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন সহস্র মিনার থেকে أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا رسول الله ধ্বনি ভেসে ওঠে।

পক্ষান্তরে তোমাদের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তোমাদের কর্মপরিধি কেবল কোনো গোত্রে নিজেদের মনগড়া কিছু মতবাদ প্রচার করে সেখানকার নেতা বনে যাওয়া। তোমাদের মৃত অন্তর বিপরীতধর্মী কিছু করতে চেষ্টা করলে তোমাদের হত্যা করে দেয়া হয় এবং কুকুরের মতো ব্যবহার করা হয়। তারপরও কী করে তোমরা বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হও? আমি তোমাদের থেকে অজ্ঞ আর কাউকে দেখি না। তাদের সাথে যদি যুক্তিপূর্ণ আলোচনার কোনো সুযোগ হতো, তাহলে এভাবেই বিতর্ক করতাম।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, পূর্বেকার বাতেনিয়াদের নানাবিধ ফাসাদের বিস্ফোরণ ঘটলে ৪৯৪ হিজরিতে সুলতান বুরকিয়ারুক বহু মানুষকে হত্যা করে। যাদের মধ্যে তিনশত বাতেনিয়া অনুসারী ছিল। তাদের সম্পত্তি লুট করে নেয়া হলে দেখা যায় সেখাতে তাদের সত্তরটি ঘরজুড়ে মুক্তোর ছড়াছড়ি। এ ব্যাপারে খলিফার কাছে লেখা হলে, তিনি বলেন, যাকেই বাতেনি মতদর্শের অনুসারী বলে সন্দেহ তবে তাকেই গ্রেফতার করবে।

এভাবে তারা গ্রেফতার হতে লাগল। মুক্তির ব্যাপারে তখন তারা কোনো সুপারিশ খুঁজে পাচ্ছিল না। কেননা সুপারিশকারীকেও একই মতাদর্শী হিসেবে সন্দেহ করা হতে পারে। সাধারণ মানুষ যাদেরকেই সন্দেহ করত তাদেরকেই ধরিয়ে দিত। তৎক্ষণাৎ তাদের হত্যা করা হতো এবং তার ঘর-বাড়ি লুট করে নেয়া হতো।

বহু যিন্দীক ও নাস্তিক—যারা মনে মনে ইসলামের সাথে শত্রুতা পোষণ করত, তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে বাতেনি সম্প্রদায়ে যোগ দিয়েছিল এবং এতে তারা প্রচুর বাড়াবাড়ি করতে থাকে। যাদেরকে সামনে পেত, তাদেরকেই অনর্থক ও অযৌক্তিকভাবে এ ভ্রান্ত মতবাদের দাওয়াত দিত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দীন ইসলামের গণ্ডি থেকে তাকে বের করে আনা। তারা ব্যভিচার, পাপাচারকে বৈধতা দিতে থাকে। তাদের একজন ছিল বাবুক খুররমী। এমন কোনো হীন ও নিকৃষ্ট কাজ নেই; যা সে করেনি। বহু মানুষকে সে হত্যা করেছে এবং কষ্ট দিয়েছে। এছাড়া কারমাতি ও যঞ্জির মতো বাতেনি নেতারা বহু গোলামকে ফুসলিয়ে রাজত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। পরে তারা বসরাসহ অন্যান্য অঞ্চলে অসংখ্য লুটতরাজ করতে থাকে। এভাবে তারা দুনিয়া-আখিরাত ধ্বংস করে। যেমন ইবনে রাবেন্দী ও মুয়াররা ছিলেন।

আবুল কাসেম আলী ইবনে হোসাইন আত্মানুখী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, ইবনে রাবেন্দী শুরুতে রাফেযি ও মুলহিদদের কর্মচারী ছিলেন। এ ব্যাপারে মানুষ তাকে তিরস্কার করলে সে বলত, আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই সুযোগে তাদের মতবাদ সম্পর্কে অবগত হওয়া। এরপর তা খণ্ডন করে বিতর্ক মুনাযারা করব।

গ্রন্থকার বলেন, যে ব্যক্তি ইবনে রাবেন্দীর অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে, সে নিশ্চয় জেনে থাকবে যে, এই লোক মস্ত বড় মুরতাদ ছিল। 'দামেগ' নামীয় একটি গ্রন্থ সে লিখেছে। সে এর মাধ্যমে ইসলামি শরিয়তকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার মহান সত্তা পরম পবিত্র। তিনি তাকে উচিত শিক্ষা দিয়েছেন। এই কুলাঙ্গার কুরআনের ওপর অভিযোগ উত্থাপন করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে এবং তা সুসাহিত্যসম্পন্ন না হওয়ার দাবি করেছে। অথচ নিশ্চিতভাবে এ কথা প্রমাণিত যে, আরবের বড় বড় পণ্ডিত ও সাহিত্যকরা কুরআন শুনে বিস্ময়াভূত হয়ে যেতেন। সেক্ষেত্রে একজন অনারব অপদার্থের আবার কী মূল্যায়ন থাকতে পারে?

এদিকে আবুল আলা আলমুয়াররা (যে রাফেযি দেলমীর বিখ্যাত কবি হিসেবে পরিচিত) তার কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ্য নাস্তিকতা দেখিয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে শত্রুতার ক্ষেত্রে সে চরম অত্যুক্তি ও ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় সে বেশ অপদস্থ ও লাঞ্ছনার শিকার হয়। কখনো নিজের ভুল বুঝতে পারে, আবার কখনো আম্বিয়া আলাইহিস সালামদেরকে অভিযুক্ত করতে থাকে। মোটকথা, সে উন্মাদের মতো আচরণ করতে থাকে এবং প্রতি মুহূর্তে খুন হওয়ার ভয়ে ভীতসন্ত্রস্তভাবে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। অবশেষে এ আশঙ্কাতেই সে কুপোকাত হয়।

এদের বংশধররা সব যুগেই তৎপর ছিল। কিন্তু তাদের ক্ষীণ শলাকা জ্বলার পূর্বে নিভে যায়। এখন তাদেরকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায় না। গোপনে কেউ কেউ বাতেনিয়া মতবাদ পোষণ করে কিংবা গ্রীক দর্শনের প্রভাবে পদচ্যুত হতে থাকে। পরিণতিতে এরা কঠিন দুর্দশায় ভুগতে থাকে। আমি এই সম্প্রদায়দ্বয়ের বিস্তারিত হাল-হাকিকত 'আলমুনতাযাম ফী তারীখিল মুলুক ওয়াল উমাম' গ্রন্থে আলোকপাত করেছি। সুতরাং এখানে সে আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করলাম না。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00