📄 খারেজিদের ওপর ইবলিসের ফাঁদ
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, খারেজি সম্প্রদায়ের সর্বপ্রথম ও সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তিটির নাম জুলখুয়াইসারা। আবু সাঈদ রা. হতে বর্ণিত, আলী রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ইয়ামেন থেকে কিছু স্বর্ণের টুকরো পাঠালেন যা মাটি মোড়ানো ছিল। তিনি তা চার ব্যক্তির মাঝে বণ্টন করে দিলেন। (১) আকরা ইবনে হাবিস (২) উআইনা ইবনে হাসান। (৩) যায়দ তায়ি, যিনি পরে বনি নাবহান গোত্রের ছিলেন। (৪) আলকামা ইবনে উলাসা। এতে কুরাইশ ও আনসারগণ অসন্তুষ্ট হলেন এবং বলতে লাগলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদবাসী নেতৃবৃন্দকে দিচ্ছেন আর আমাদেরকে দিচ্ছেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তো তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য এমন মনোরঞ্জন করছি। তখন এক ব্যক্তি সামনে এগিয়ে আসল, যার চোখ দু'টি কোটরাগত, গণ্ডদ্বয় ঝুলে পড়া; কপাল উঁচু, ঘন দাড়ি এবং মাথা মোড়ানো ছিল। সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহকে ভয় করুন। তখন তিনি বললেন, আমিই যদি নাফরমানি করি তাহলে আল্লাহর আনুগত্য করবে কে? আল্লাহ আমাকে পৃথিবীবাসীর উপর আমানতদার বানিয়েছেন আর তোমরা আমাকে আমানতদার মনে করছ না। তখন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইল। (আবু সাঈদ রা. বলেন) আমি তাকে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. বলে ধারণা করছি। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন। অতঃপর অভিযোগকারী লোকটি যখন ফিরে গেল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ ব্যক্তির বংশ হতে বা এ ব্যক্তির পরে এমন কিছুসংখ্যক লোক হবে তারা কুরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। দীন হতে তারা এমনভাবে বেরিয়ে পড়বে যেমনি ধনুক হতে তির বেরিয়ে যায়। তারা ইসলামের অনুসারীদেরকে (মুসলিমদেরকে) হত্যা করবে আর মূর্তিপূজারিদেরকে হত্যা করা হতে বাদ দেবে। আমি যদি তাদের পেতাম তাহলে তাদেরকে আদ জাতির মতো অবশ্যই হত্যা করতাম।'
গ্রন্থকার বলেন, এমন শিষ্টাচারবহির্ভূত ও দাম্ভিক আচরণকারীর নাম জুলখুয়াইসারা তামিমি। অন্য এক বর্ণনায় আছে, সে এসে বলল, ইনসাফ করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আরে তোমার ধ্বংস হোক, আমিও যদিই ইনসাফ না করি আর কে ইনসাফ করবে?’
গ্রন্থকার বলেন, দীন ইসলামে এ ব্যক্তিই প্রথম খারেজি ছিল। নিজের রায়কে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সে নিজের ধ্বংস ডেকে এনেছে। কিছুটা ধৈর্য ধারণ করলে সে বুঝে নিতে পারত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বড় রায় আর কারও হতে পারে না। এই খারেজির অনুসারীরা আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। এর ঘটনা হচ্ছে, হজরত আলী রা. ও হজরত মুয়াবিয়া রা. এর মাঝে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করলে মুয়াবিয়া রা. এর অনুসারীগণ কুরআন মাজিদ উপরে তুলে ধরে আলী রা. এর অনুসারীদেরকে আহ্বান করলেন এই শর্তে যে, যা কিছু এই কুরআনে রয়েছে এর ওপর আমরা এবং তোমরা সন্তুষ্ট হয়ে যাব। আরও বলা হলো, তোমাদের পক্ষ থেকে একজন পাঠাও, আমাদের পক্ষ থেকেও একজন পাঠাব এবং এদের উভয়ের কাছ এই অঙ্গীকার নেয়া হবে যে, তোমরা আল্লাহর কালাম অনুযায়ী আমল করবে। সবাই সমস্বরে এতে রাজি হলেন।
কথামতো সিরিয়াবাসী হজরত আমর ইবনুল আস রা.-কে পাঠালেন। আর এদিকে ইরাকবাসী হজরত আলী রা.-কে বললেন, আপনি হজরত আবু মুসা আশয়ারী রা.-কে পাঠান। হজরত আলী রা. বললেন, আবু মুসা আশয়ারী রা.-কে পাঠানো আমার রায় নয়। কারণ তিনি সবল প্রকৃতির লোক। এখানে ইবনে আব্বাস রা. উপস্থিত আছেন। তাকে কেন পাঠাচ্ছেন না? লোকেরা বলল, আমরা এটা চাই না। কেননা তিনিও আপনার মতো, আপনার নিকটাত্মীয়। শেষে তিনি হজরত আবু মুসা আশয়ারী রা.-কে পাঠালেন। ফয়সালার নির্দেশ রমযান পর্যন্ত দীর্ঘ হলো। উরওয়া ইবনে উযাইনা বললেন, তোমরা আল্লাহর নির্দেশের ব্যাপারে মানুষকে বিচারক বানালে। আল্লাহ তায়ালা তো বলেছেন, إن الحكم إلا لله "বিচার একমাত্র আল্লাহর।” (এই লোক তার অনুসারীদের নিয়ে 'খারিজ' হয়ে গেল অর্থাৎ বেরিয়ে গেল)।
হজরত আলী রা. সিফফীন প্রান্তর হতে ফিরে কুফায় গেলে খারেজিরা তার সাথে কুফায় প্রবেশ করল না; বরং তারা কুফার পার্শ্ববর্তী এলাকা হারুরায় অবস্থান নিল। এভাবে সেখানে বারো হাজার খারেজি সমবেত হলো এবং বলতে লাগল لَا حُكْم إِلَّا للَّهِ 'আল্লাহ ছাড়া কারও বিচার মানি না।' এখান থেকেই খারেজিদের উৎপত্তি। তাদের বাহিনীর আহ্বানকারী বলল, যুদ্ধের সময় শাবিস ইবনে রিবয়ী তামিমি নেতা হিসেবে আছেন। আর নামায পড়াবেন আমাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনুল কুয়া ইয়াশকারী। উল্লেখ্য, খারেজিরা বহু ইবাদত-বন্দেগি করে থাকে। কিন্তু তাদের বিশ্বাস হচ্ছে, তারা হজরত আলী রা. এর চেয়ে আরও বেশি জ্ঞানের অধিকারী। আর এটা তাদের মারাত্মক আত্মঘাতী ব্যাধিতে পরিণত হয়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, খারেজিরা বিদ্রোহ শুরু করলে তারা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সমবেত হতে থাকে। এখানে তাদের সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। সবাই ঐকমত্য পোষণ করল যে, তারা হজরত আলী রা. এর সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। তারা একজন একজন, "দু'জন দু'জন করে এসে এসে হজরত আলী রা.-এর কাছে বলতে লাগল, হে আমিরুল মুমিনীন রা.! এরা সকলে আপনার সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। হজরত আলী রা. বললেন, তাদেরকে ছেড়ে দাও। আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আমার সাথে যুদ্ধ না করে। তারা অচিরেই এমনটি করবে। অতঃপর একদিন জোহরের নামাযের প্রাক্কালে আমি তাঁর খেদমতে আরয করে বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন! আজ জোহরের নামায সামান্য শীতল হওয়া পর্যন্ত দেরি করুন। আমার ইচ্ছা, খারেজি গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করি। তিনি বললেন, আমি তো এখন তাদের থেকে তোমার ব্যাপারে অধিক ভয় করছি। আমি বললাম, জি না। আপনি আমার ওপর এমন ভয় করবেন না। আমি একজন সচ্চরিত্র ব্যক্তি। কাউকে কষ্ট দিতে চাই না। অবশেষে তিনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি তাদের কাছে পৌঁছি। তখন ছিল দুপুর বেলা। সেখানে আমি এমন লোকজনের দেখা পেলাম, যাদের থেকে অধিক ইবাদতকারী কাউকে দেখিনি। তাদের কপালে সিজদার আধিক্যের কারণে আঘাতের চিহ্ন পড়ে গিয়েছিল। তাদের হাত যেন উটের হাত। (মাটিতে সিজদা দেয়ার কারণে ধুলোয় ধূসরিত হয়ে পড়েছিল)। তাদের শরীরে ছিল অনুন্নত জামা। তাদের লুঙ্গিগুলো টাখনুর চেয়ে বহু উপরে উঠানো ছিল। রাত জেগে ইবাদতের ফলে তাদের চেহারা শুষ্ক হয়ে যায়।
আমি তাদেরকে সালাম দিলে তারা বলল, মারহাবা! ইবনে আব্বাস রা.! আপনি এমন সময়ে কী উদ্দেশ্য নিয়ে এলেন? আমি বললাম, আমি তোমাদের কাছে মুহাজির ও আনসারদের পক্ষ থেকে এসেছি এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামাতার পক্ষ থেকে এসেছি। তাঁদের ওপর কুরআন অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা তোমাদের থেকে ভালো কুরআন বোঝেন। আমার কথাবার্তা শুনে তাদের দলের একজন বলে উঠল, (সে কুরাইশের অন্তর্ভুক্ত) তুমি কুরাইশের পক্ষ থেকে মুনাযারা কোরো না। কেননা আল্লাহ তায়ালা কুরাইশদের ব্যাপারে বলেছেন, بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ “তারা ঝগড়াটে জাতি।” অতঃপর তাদের মধ্য থেকে দু-তিন ব্যক্তি বলল, না, আমরা মুবাহাসা ও বিতর্ক করব। আমি বললাম, তোমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামাতা এবং মুহাজির ও আনসারদের ওপর উত্থাপিত অভিযোগগুলো উপস্থাপন করো। অথচ তাঁদের ওপরই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁরা কুরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা তোমাদের চেয়ে বেশি বোঝেন। খারেজিরা বলল, আমাদের ৩টি প্রশ্ন আছে। আমি বললাম, ঠিক আছে, তা বলো। তারা বলল, ১. আলী আল্লাহর ব্যাপারে মানুষকে সালিশ (বিচারক) নির্ধারণ করেছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا اللَّهِ "বিচার একমাত্র আল্লাহর।”” আল্লাহর এ ঘোষণার পর মানুষ কীভাবে বিচার করতে পারে? আমি বললাম, এটা একটা গেল। তারপর? তারা বলল-২. আলী মানুষের সাথে যুদ্ধ করেছেন। অথচ তিনি বিরোধী পক্ষের লোকজনকে দাস-দাসী বানাননি এবং তাদের ধন-সম্পদ গনিমতের সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করেননি। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, যাদের সাথে যুদ্ধ করা হয়েছে, তারা যেহেতু মুসলমান, তাই তাদের সম্পদ হালাল নয় এবং তাদেরকে দাস-দাসী হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। ৩. তাদের তৃতীয় অভিযোগ- আলী সালিশী ফয়সালা লেখানোর সময় 'আমিরুল মুমিনীন' উপাধী নিজের নাম থেকে মিটিয়ে দেন। সুতরাং তিনি আমিরুল মুমিনীন না হয়ে আমিরুল কাফিরীন হয়ে গেলেন। অর্থাৎ কাফেরদের নেতা।
আমি বললাম, এগুলো ছাড়া আর কোনো অভিযোগ আছে? খারেজিরা বলল, এ অভিযোগগুলোই যথেষ্ট। আমি বললাম, তোমার প্রথম অভিযোগ হচ্ছে, আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে আলী রা. মানুষকে বিচারক সাব্যস্ত করেছে। আচ্ছা, আমি যদি তোমাদেরকে আল্লাহর কালাম থেকে এমন আয়াত তেলাওয়াত করে শোনাই, যা দ্বারা তোমাদের অভিযোগ খণ্ডন হয়ে যায়, তাহলে কি তোমরা তোমাদের কথা থেকে ফিরে এসে তাওবা করবে? তারা বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, আল্লাহ তায়ালা একচতুর্থাংশ মূল্যমানের একটি খরগোশের ব্যাপারে দুই ব্যক্তির বিচারের ওপর তার ফয়সালা সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। আমি এ আয়াত পড়লাম- لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ 'ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার কোরো না।' অর্থাৎ এহরাম অবস্থায় শিকারকে খুন করতে নিষেধ করেছেন। যদি কেউ অন্যায় করে ফেলে, যেমন- একটি খরগোশ হত্যা করল, তখন বলেছেন, তোমরা দু'জন ন্যায় বিচারক পুরুষকে পশু হত্যার স্থলে নিয়ে গিয়ে তার মূল্যের ফয়সালা করবে।
অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালা নারী এবং তার স্বামীর ব্যাপারে বলেছেন, وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِما فَابْعَثُوا حَكَما مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَما مِنْ أَهْلِهَا “স্বামীর ভাইদের মধ্য থেকে একজন পুরুষ এবং স্ত্রীর ভাইদের পক্ষ থেকে একজন পুরুষ পাঠাও। তারা উভয়ে এ ব্যাপারে বিচার করবে।”
এখন তোমাদেরকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, নিজেদের আত্মঘাতী পরিস্থিতিতে এবং রক্তারক্তি থেকে বিরত থাকতে পুরুষকে বিচারক সাব্যস্ত করা উত্তম নাকি একটি খরগোশের ব্যাপারে বা একজন নারীর ব্যাপারে পুরুষকে বিচারক সাব্যস্ত করা উত্তম? খারেজিরা বলল, হ্যাঁ।
আমি বললাম, তোমাদের দ্বিতীয় অভিযোগ- আলী রা. যুদ্ধ করেছেন অথচ বন্দি এবং গনিমত নেননি। আমি তোমাদের কাছে জানতে চাই, তোমরা কি উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়শা রা.-কে বাঁদি বানাতে চাও? আল্লাহর কসম! তোমরা যদি বলো, তিনি তোমাদের মা নন, তাহলে তোমরা ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেলে। আল্লাহর কসম! তোমরা যদি বলো, তাঁকে বাঁদি হিসেবে গ্রহণ করে তাঁকে অন্য নারীদের মতো বৈধ মনে করা হবে, তখনও তোমরা ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। তোমরা দু'টি ভ্রান্তির মাঝামাঝি পতিত হয়েছ। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
النَّبِيُّ أَولَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْواجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ
“মুমিনদের কাছে তাদের প্রাণের চেয়ে তাদের নবী অধিক প্রিয় এবং নবীর সহধর্মিণীবৃন্দ মুমিনদের মা হন।” তারপরও যদি তোমরা বলো যে, তিনি তোমাদের মা নন; তাহলে তোমরা ইসলাম থেকে বের (খারিজ) হয়ে গেলে। তারা বলল, জি হ্যাঁ। আমি বললাম, তোমাদের তৃতীয় অভিযোগ- 'আমিরুল মুমিনীন' শব্দ তার নাম থেকে মিটিয়ে দেয়া হয়েছে। তাহলে আমি তোমাদের কাছে এমন ন্যায়পরায়ণ বিচারক সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করছি, যাকে তোমরা মান্য করো। হুদাইবিয়ার সন্ধিকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের নেতা আবু সুফিয়ান সাখার ইবনে হারব ও সুহাইল ইবনে আমর প্রমুখের সাথে চুক্তিনামা লিখিয়েছিলেন এবং আলী রা.-কে বলেছেন, লেখো- هذا ما اصطلح عليه محمد رسول الله "এটি চুক্তিনামা। যা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এবং...।" মুশরিকরা বলল, আল্লাহর কসম! আমরা তো জানি না যে, তুমি আল্লাহর রাসুল। আমরা যদি তোমাকে আল্লাহর রাসুল হওয়ার ব্যাপারে মানতাম, তাহলে তোমার সাথে যুদ্ধ করতাম না। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ أَنِّي رَسُوْلُ اللَّهِ 'হে আল্লাহ! নিশ্চয় আপনি জানেন, আমি আল্লাহর রাসূল।' অতপর বললেন, হে আলী! এটা মুছে দাও। এভাবে লেখো- هذا ما اصطلح عليه محمد بن عبد الله "এটি চুক্তিনামা। যা মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে...।""
এখন তোমরা দেখো- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা. থেকে উত্তম। তিনি رسول الله শব্দটি মুছে দিয়েছিলেন। অথচ এ দ্বারা তিনি আল্লাহর রাসুল হওয়া থেকে বের হয়ে যাননি।'
ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, এই কথোপকথনের আলোকে দুই হাজার মানুষ তাওবা করে ফিরে এসেছে। আর অবশিষ্টরা নিজেদের ভ্রষ্ট পথের অনুসারী হয়ে মারা গেছে।
জুনদুব আলইজদী রা. বলেন, হজরত আলী রা.-এর সাথে আমরা খারেজিদের সাথে লড়াই করতে এসে তাদের সৈন্যবাহিনীর কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম, সেখান থেকে মধু-মক্ষিকার বাসার মতো গুনগুন শব্দে তাদের কুরআন তেলাওয়াতের শব্দ বের হচ্ছে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, আরেকটি বর্ণনায় আছে, হজরত আলী রা. সালিশী ফয়সালা বানালে খারেজিদের মধ্য থেকে যুরআ ইবনুল বারাজ আত্তায়ী এবং হারকুস ইবনে যুহাইর আস্সাদী- এরা উভয়ে হজরত আলী রা. এর কাছে এসে বলল, لا حكم إلا لله "বিচার একমাত্র আল্লাহর।” হজরত আলী রা. বললেন, হ্যাঁ, لا حكم إلا لله "বিচার একমাত্র আল্লাহর।” হারকুস বলল, আপনি আপনার গুনাহ থেকে তাওবা করুন এবং সালিশনামা থেকে ফিরে আসুন। আমাদেরকে নিয়ে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন। আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করব। এভাবে আমাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিত হব। এর বিপরীতে আপনি যদি এসব লোকের ফয়সালা ছেড়ে না আসেন এবং আল্লাহর কিতাব দ্বারা বিচার না করেন, তাহলে আমরা একমাত্র আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। অতঃপর তারা খারেজি আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব আররাসিবীর ঘরে সমবেত হলো। সে আল্লাহর হামদ ও সানা পড়ার পর বলল, যারা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে আর কুরআন মতে আমল করে, তাদের জন্য জাগতিক কারণে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ছেড়ে দেয়া কিছুতেই শোভা পায় না। এখন আমরা-তোমরা সকলে মিলে চলো রুখে দাঁড়াই। অবশেষে ফয়সালার পর হজরত আলী রা. তাদের উদ্দেশে লিখলেন- "পর সমাচার, এরা দুই ব্যক্তি যাদেরকে উভয় পক্ষের সন্তুষ্টিতে ফয়সালাকারী বানানো হয়েছিল, তাঁরা আল্লাহর কিতাবের বিপরীত করেছেন এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছেন। এখনকার অবস্থা আগের মতো বহাল।” খারেজিরা উত্তরে লিখল, আপনি স্বীয় প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য এমন করেননি; বরং আপনার নিজের পক্ষ থেকে ক্রোধান্বিত অবস্থায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন আপনি যদি নিজে নিজেকে সাক্ষী দিয়ে বলেন, আপনি কাফের হয়ে গেছেন এবং নতুনভাবে তাওবা করেন, তাহলে আমরা আমাদের এবং আপনার ব্যাপারে চিন্তা করে দেখতে পারি। অন্যথায় আমরা আপনার সাথে যুদ্ধ করার ঘোষণা দিয়ে রাখলাম।
একবার খারেজিরা রাস্তায় চলার সময় আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাব রহ. এর সাক্ষাত হলো। তারা আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করে বলল, তুমি তোমার বাবার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে যে হাদিস শুনেছ তা আমাদের বলো। আবদুল্লাহ বলল- হ্যাঁ, আমি আমার পিতার কাছে শুনেছি, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ফিতনার পূর্বাভাস দিয়েছেন, যেখানে বসে থাকা লোক দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের চেয়ে উত্তম হবে, আর দাঁড়িয়ে থাকা লোক চলন্ত লোক অপেক্ষা উত্তম হবে, আর চলন্ত লোক দৌড়ছে- এমন লোকদের চেয়ে উত্তম হবে। তুমি যদি এমন যুগ পাও, তবে তোমার জন্য বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া উত্তম হবে।
খারেজিরা বলল, এটা তোমার পিতা থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস হিসেবে তুমি শুনেছ? আবদুল্লাহ বলল, হ্যাঁ। তারপর খারেজিরা তাকে নদীর তীরে নিয়ে দাঁড় করিয়ে খুন করল। নদীতে তাঁর রক্ত জুতার ফিতার মতো প্রবাহিত হচ্ছিল।
আবদুল্লাহর স্ত্রী ছিলেন গর্ভবতী। খারেজিরা পাশবিকভাবে তার পেট কেটে ফেলে। সামনে গিয়ে একজন জিম্মি খ্রিষ্টানের বাগানে উপনীত হলে তাদের একজন সেই বাগানের নিচে পড়ে থাকা ফল খেতে থাকল। এটা দেখে আরেকজন বলল, বিনা অনুমতিতে এবং মূল্য পরিশোধ না করে অন্যের বাগানের ফল খাচ্ছ? সে তৎক্ষণাত মুখ থেকে ফলটি ছুড়ে মারল। অতঃপর তাদের একজন কোষ থেকে তরবারি বের করল। সম্মুখ দিয়ে একটি শূকরকে হেঁটে যেতে দেখলে, তাকে তরবারির আঘাতে মেরে ফেলল। এটা দেখে আরেকজন বলল, এটা দেশে ফাসাদের সৃষ্টি করবে। অর্থাৎ এটা হারাম। এ কথা শুনে সে শূকরের মালিকের কাছে গিয়ে শূকরের মূল্য পরিশোধ করে তাকে খুশি করে দিল।
আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. খারেজি সম্প্রদায়ের কাছে লোক পাঠিয়ে ঘোষণা দিলেন, আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাবের খুনীকে কেসাসের জন্য আমার কাছে পাঠাও। খারেজিরা উত্তরে বলল, আমরা সকলে মিলে তাকে খুন করেছি। আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. এভাবে তিনবার তাদেরকে এমন আহ্বান জানালে প্রত্যেকবার খারেজিরা একই উত্তর দিতে থাকে। অবশেষে আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. তার সৈন্যবাহিনীকে বললেন, এখন এই গোষ্ঠীর খবর নাও। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব খারেজিকে মেরে ফেলা হলো। (এটা নাহরাওয়ানের ঘটনা)।
লড়াই আরম্ভ হলে খারেজিরা একে অন্যকে ওয়াজ করছিল যে, স্বীয় প্রতিপালকের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও এবং চলো, জান্নাতে চলো। এরা মারা যাওয়ার পর আরও একটি দল খারেজি হতে থাকে। আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. একজন দলপতিকে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে পাঠালে আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম (খারেজি) এবং তার সাথিরা একত্র হয়। তারা তাদের যে ভাই নাহরাওয়ানে মারা গিয়েছিল তার জন্য রহমত পাঠায় এবং বলতে থাকে, দুনিয়ার প্রতি আমাদের আর কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের ভাই মারা গেছে, যিনি আল্লাহর ব্যাপারে কোনো ধরনের অপবাদকে ভয় পেতেন না। এখন আমাদেরও উচিত, আল্লাহর কাছ থেকে প্রাণের বিনিময়ে জান্নাত ক্রয় করা। আমরা এখন সেই সুযোগের অপেক্ষায় আছি। সেই পথভ্রষ্ট শাসকদেরকে অলস পেলেই আমাদের ভাইয়ের রক্তের প্রতিশোধ হিসেবে তাদেরকে আমরা খুন করে আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হিসেবে প্রশান্তি পাব।
মুহাম্মাদ ইবনে সাআদ তাঁর মাশায়েখ থেকে বর্ণনা করেন, খারেজিদের তিনজন নেতা এলাকায় থাকার ইচ্ছে পোষণ করেছিল। তাদের নাম-আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম, বারাক ইবনে আবদুল্লাহ ও আমর ইবনে বকর তামিমি। এই তিনজন মক্কায় (হজের মৌসুমে) একত্র হয়ে পরস্পর অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো, যে করেই হোক তিন ব্যক্তি অর্থাৎ হজরত আলী রা., হজরত মুয়াবিয়া রা. ও হজরত আমর ইবনুল আস রা.-কে খুন করবে। ইবনে মুলজিম বলল, আমি আলীকে খুন করার দায়িত্ব নিলাম। বারাক বলল, আমি মুয়াবিয়াকে খুন করব। আমর বলল, আমি আমর ইবনুল আসকে খুন করব। সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো, কেউ যেন তাদের অঙ্গীকার থেকে ছুটে না আসে। ইবনে মুলজিম কুফায় অবস্থান করল।
গভীর রাত হলে ইবনে মুলজিম আলী রা. এর পথে ওঁৎ পেতে থাকে। তিনি ফজরের নামায পড়ার জন্য মসজিদের দিকে অগ্রসর হলে মরদুদ ইবনে মুলজিম হজরত আলী রা.-কে তরবারি দ্বারা কপালে আঘাত করলে তা মগজে গিয়ে ঠেকে। তিনি চিৎকার দিলে সে আর পালাতে পারেনি। তাকে গ্রেফতার করা হয়। উম্মে কুলসুম (হজরত আলী রা. এর কন্যা) বললেন, হে আল্লাহর দুশমন! আমি আশা করছি, এই যখম দ্বারা হজরত আলী রা. এর কোনো ক্ষতি হবে না। ইবনে মুলজিম বলল, তাহলে তুমি কাঁদছ কেন? পরে আবার বলল, আল্লাহর কসম! আমি এই তরবারি একমাস যাবৎ বিষবিশ্রিত করে রেখেছি। এখনও যদি তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না হয়, তাহলে আল্লাহ তার অমঙ্গল করুন।
হজরত আলী ইন্তেকাল করলে ইবনে মুলজিমকে জেলখানা থেকে খুন করার জন্য বের করা হয়। আবদুল্লাহ ইবনে জাফর তার হাত-পা কেটে ফেললেন। তারপরও সে কোনো প্রতিক্রিয়া (ওহ আহ শব্দ) ব্যক্ত করছে না। কিছু বলছে না। পরে গরম কাঁটা দ্বারা তার চক্ষু সেলাই করে দেয়া হলেও কোনো কথা বলছে না এবং কেবল خَلَقَ اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ،الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ পড়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় তার চক্ষু হতে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অতঃপর তার জিহ্বা কাটার ইচ্ছে করা হলে সে ভয় পেয়ে যায়। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে সে বলল, আমি এটা চাই না যে, দুনিয়াতে আল্লাহর জিকির বিনে আমার এমন এক মুহূর্তও কাটুক। ইবনে মুলজিম ধূসর আকৃতির ব্যক্তি- যার কপালে সিজদার গভীর চিহ্ন ছিল। (তার ওপর আল্লাহর লা'নত পড়ুক)।
গ্রন্থকার বলেন, হজরত হাসান ইবনে আলী রা. হজরত মুয়াবিয়া রা. এর সাথে সমঝোতা করতে চাইলে একজন খারেজিও তাঁর সাথে বের হয় এবং পথিমধ্যে তাঁকে তির নিক্ষেপ করে, এতে হাসান রা. রানে আঘাত পান। খারেজি বলল, তুমিও তোমার পিতার মতো শিরকে লিপ্ত হচ্ছ?
মোটকথা, খারেজিরা সর্বদা ইসলামি নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে 'খারেজ' তথা বের হতে থাকত। এছাড়া এদের রয়েছে বহু মতবাদ।
নাফে' ইবনে আযরাক নামীয় খারেজি এই মতবাদ পোষণ করত যে, আমরা যতক্ষণ মুশরিকের দেশে অবস্থান করব, ততক্ষণ আমরা মুশরিক থাকব। অন্যদিকে মুশরিকের দেশ থেকে বের হলেই আমরা মুমিন হব। তারা মনে করে যারা তাদের বিরোধিতা করে, তারা মুশরিক। কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিও মুশরিক। যুদ্ধক্ষেত্রে যারা আমাদের পাশে থাকবে না তারা কাফির। এই খারেজি সম্প্রদায় মুসলিম শিশু ও নারীদের খুন করা বৈধ মনে করে এবং তাদেরকে মুশরিক বলে আখ্যায়িত করে থাকে। নাজদা বিন আমের সাকাফী এই গ্রুপেরই একজন। সে নাফে' ইবনে আযরাকের সাথে কেবল এটুকু মতভেদ করেছে যে, মুসলমানের প্রাণ ও সম্পদ হারাম। তার দাবি—তাদের সাথে একাত্মতা পোষণকারীদের মধ্যে যারা পাপিষ্ঠ তার জাহান্নামের আগুন ব্যতীত অন্য আগুন দ্বারা সাজাপ্রাপ্ত হবে। জাহান্নামে শুধু তাদের বিরোধিতাকারীরাই নিক্ষিপ্ত হবে।
ইবরাহিম আলখারেজির মতে, (অন্যান্য মুসলমান) জাতি কাফির। আমাদের জন্য তাদের সাথে বিয়ে-শাদী ও মিরাসের সম্পত্তির ভাগ নেয়া বৈধ; যেমন ইসলামের প্রাথমিক যুগে বৈধ ছিল। কোনো কোনো খারেজির মতে, কেউ যদি এতিমের সম্পদ থেকে দু'পয়সা খেয়ে ফেলে তবে তার জন্য জাহান্নামের আগুন ওয়াজিব হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা এতিমের সম্পদ ভক্ষণের ওপর জাহান্নামের অগ্নির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কিন্তু যদি তাকে খুন করে ফেলা হয় বা তার হাত-পা কেটে অথবা পেট কর্তন করে পঙ্গু করে দেয়া হয় তাহলে সে জাহান্নামে যাবে না।
গ্রন্থকার বলেন, খারেজিদের ঘটনা দীর্ঘ। বিস্ময়ে ভরা তাদের মাযহাব। আমি তা উল্লেখ করা অত্যুক্তি মনে করছি। উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল এটুকু যে, ইবলিস কী অদ্ভুতভাবে তাদের ওপর ধোঁকা আর চক্রান্তের জাল বিস্তার করেছে—তার জানান দেয়া। কী অন্যায়ভাবে তারা লড়ে যাচ্ছে। হজরত আলী রা.-এর ব্যাপারে তারা ভুলের অপবাদ দিচ্ছে। অথচ তারা মনে করছে, এরাই সঠিক পথের অনুসারী। তারা শিশুহত্যা বৈধ ভাবছে, আবার মূল্য পরিশোধ করা ছাড়া ফল খেতে সংকোচ করছে। রাত জেগে এবাদত-বন্দেগিতে কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করছে। খুনি পথভ্রষ্ট ইবনে মুলজিম তার জিহ্বা কাটার সময় ভীত হয়ে পড়ে, হায়! জিকির করার বুঝি আর সুযোগ মিলবে না! অথচ সে হজরত আলী রা.-কে খুন করা বৈধ মনে করেছিল। তারা মুসলমানের ওপর অস্ত্র চালিয়েছে। আল্লাহ এ সব কুলাঙ্গারদের খপ্পড় থেকে আমাদের নিস্তার দিন।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ভবিষ্যতে এমন-সব লোকের আগমন ঘটবে, যাদের নামাযের তুলনায় তোমাদের নামাযকে, তাদের রোযার তুলনায় তোমাদের রোযাকে এবং তাদের আমলের তুলনায় তোমাদের আমলকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালির নিচে (অর্থাৎ অন্তরে) প্রবেশ করবে না। এরা দীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনভাবে নিক্ষিপ্ত তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। আর শিকারী সেই তিরের আগা পরীক্ষা করে দেখতে পায়, তাতে কোনো চিহ্ন নেই। সে তিরের ফলার পার্শ্বদেশে নযর করে; অথচ সেখানে কিছু দেখতে পায় না। শেষে ওই ব্যক্তি কোনো কিছু পাওয়ার জন্য তিরের নিম্নভাগে সন্দেহ পোষণ করে।'
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আউফা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, “খারেজিরা জাহান্নামের কুকুর।”
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬১০; সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৬৪
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৬৯৩৩
১. সুরা আনআম: আয়াত ৫৭
২. সুরা যুখরুফ: আয়াত ৫৮
৩. সুরা আনআম: আয়াত ৫৭
১. সুরা নিসা: আয়াত ৩৫
২. সুরা আহযাব: আয়াত ৬
৩. মুসনাদে আহমাদ: ১/৩৪২
১. সহিহ বুখারি: ২৭৩১, ২৭৩২; সহিহ মুসলিম: ১৭৮৩।
২. মুসনাদে আহমাদ: ৫/১১০; তাবারানি ৩৬২৯-৩৬৩০; মুসনাদে আবি ইয়ালা: ৭২১৫; সুনানে আবি দাউদ: ৪২৫৯; সহিহ ইবনে হিব্বান: ১৮৬৯।
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬১০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৬৪
২. মিশকাত: হাদিস নং ৩৫৫৪, ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ১৭৩।
📄 খারেজিদের মতামত
গ্রন্থকার বলেন, খারেজিরা এই আকিদা পোষণ করে যে, ইমাম হওয়া এক ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট নয়। যার ভেতর ইলম ও ইবাদতের সমন্বয় ঘটবে সে ইমাম হবে, যদিও সে অনারব কৃষক হয়। খারেজিদের এই অভিমত থেকে মুতাযিলা গোষ্ঠী এই কথা আবিষ্কার করেছে যে, ভালো-মন্দের বিধান আরোপ করা বিবেক-বুদ্ধির এখতিয়ার। বিবেক যেটাকে সমর্থন দেবে সেটাই ইনসাফ। এভাবে কাদরিয়া সম্প্রদায়ের উৎপত্তি। সে-সময় সাহাবায়ে কেরাম রা. জীবিত ছিলেন। মা'বাদ আলজুহানী, গাইলান দামেস্কী ও জায়াদ ইবনে দিরহাম কাদরিয়া এই মতবাদ পোষণ করতেন। মা'বাদ আলজুহানীর বানোয়াট মতাদর্শের ওপর ওয়াসেল ইবনে আতা ও আমর ইবনে ওবাইদও অটল ছিলেন। সে সময়ই মুরজিয়া সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ঘটে। যাদের মতবাদ হচ্ছে, কাফের থাকা অবস্থায় যেমন কোনো ইবাদত কাজে আসত না, তেমনই ঈমান থাকলে গুনাহ দ্বারা কোনো ক্ষতি হয় না। এরপর মামুন আব্বাসির যুগে মুতাযিলা অনুসারী আবুল হাযিল আল্লাফ, নায্যাম, মা'মার ও জাহেয প্রমুখ লোকেরা দর্শনের বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়ন করে সেখান থেকে জাওহার, আরয, স্থান, কাল ইত্যাদি পরিভাষাকে শরিয়তের বিভিন্ন মাসআলায় মেলাতে থাকে। প্রথমে তারা কুরআন মাজিদ মাখলুক হওয়ার মাসআলা আবিষ্কার করে। সে সময় এই শাস্ত্রের নাম রাখা হয় ইলমে কালাম। এই মাসআলার পাশাপাশি আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহের মাসআলাও তারা আবিষ্কার করে। এক পক্ষ বলে, এ সব মহান আল্লাহর সত্তার ওপর বাড়তি অর্থ বহন করে। মুতাযিলারা এটাকে অস্বীকার করে বলে, তিনি তার সত্তার আলোকেই জ্ঞানী এবং স্বীয় সত্তার আলোকেই ক্ষমতাবান। আবুল হাসান আশয়ারী শুরুতে জুব্বায়ি মুতাযিলা অনুসারী ছিলেন। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে যারা আল্লাহর সিফাতের পক্ষপাতি ছিলেন তাদের দলে চলে আসেন। অতঃপর তারা কোনো কোনো সিফাত সাব্যস্তকারী তা বস্তু হওয়ার আকিদা পোষণ করতে থাকে, কেউবা প্রত্যাবর্তন, উত্তরণ ইত্যাদি অতিরিক্ত গুণের আকিদা পোষণ করতে থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন।
📄 রাফেজিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইবলিস খারেজিদের ধোঁকায় ফেললে তারা হজরত আলী রা. এর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। অনুরূপভাবে এর বিপরীতে ইবলিস আরও একটি জাতিকে ধোঁকায় নিমজ্জিত করে। যারা হজরত আলী রা.-কে ভালোবাসার ক্ষেত্রে এই পরিমাণ বাড়াবাড়ি করতে শুরু করে যা সীমার অতিরিক্ত হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কোনো রাফেযি আলী রা.-কে বলতে থাকে আল্লাহ। কারও মতে তিনি নবীর চেয়ে উত্তম। শয়তানের প্ররোচনায় কিছু রাফেযি হজরত আলী রা.-কে হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.-এর চেয়ে উত্তম বলে তাঁদের উভয়কে গালাগালি করতে থাকে। তাঁদের উভয়কে আবার কেউ কেউ কাফের বলে আখ্যায়িত করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে। রাফেযিদের মাঝে এমন বেহুদা ও অদ্ভুত মিথ্যাচারধারী বহু মতবাদ রয়েছে। আমি কতটুকু আর এদের কাণ্ডের কথা বলব! আমার উদ্দেশ্য কেবল তাদের ক্ষেত্রে ইবলিসের ধোঁকাবাজিগুলো প্রকাশ করা। সে দৃষ্টিকোণে তার কিঞ্চিৎ উল্লেখ করা যাক।
ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ নখয়ি আহমার বলত, আলীই আল্লাহ। মাদায়েনের ইসহাকিয়া নামক ভ্রান্ত গোষ্ঠীটি তার থেকে আবিষ্কার। খতিব বলেন, আবু মুহাম্মাদ হাসান ইবনে ইয়াহইয়া নাওবখতির একটি কিতাব আমার হস্তগত হয়, যা রাফেযি গাজীদের খণ্ডনে লেখা হয়েছে। খোদ লেখক শিয়া মুতাকাল্লিমদের ইমামিয়া মতবাদের অনুসারী। তিনি অতিরঞ্জনকারী রাফেযিদের বিভিন্ন মতবাদের কথা লিখতে আরম্ভ করেছেন। লেখার একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, আমাদের যুগে অতিরঞ্জনের পাগলামিতে ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ আহমার মারাত্মক বাড়াবাড়ি করে গেছেন। তার ধারণা—আলীই আল্লাহ। তিনিই সর্বদা প্রকাশমান। অতএব একবার তিনি হাসানের সুরতে আসেন, আবার হোসাইনের আকৃতিতে। তিনিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, রাফেযিদের একটি গোত্রের বিশ্বাস হচ্ছে হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. কাফের ছিলেন। কেউ কেউ বলেছে, না; বরং তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগী হয়ে গিয়েছিলেন। কারো কারো মতে আলী রা. ছাড়া সবাই বিদ্রোহ করেছিলেন। সহিহ সূত্রে আমাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছেছে যে, শিয়ারা যায়েদ ইবনে আলীর কাছে আবেদন করল, আপনি তাদের ব্যাপারে বিদ্রোহ করুন যারা হজরত আলী রা.-এর ইমামতের বিরোধিতা করেছিল। নতুবা আমরা আপনাকে ছেড়ে দেবো। যায়েদ ইবনে আলী তাদের এ আবেদন অস্বীকার করলে এ সব শিয়ারা তাঁকে ছেড়ে দেয়। তখন ‘রাফেযি’ নামে তারা পরিচিতি পায়। তাদের একটি দল মনে করে, ইমামত মুসা বিন জাফর পর্যন্ত ছিল। তারপর তার পুত্র আলীতে এসেছে, এরপর তার পুত্র মুহাম্মাদ আলীতে এসেছে, পরে তার পুত্র মুহাম্মদের ওপর, এরপর হাসান ইবনে মুহাম্মাদ আলআশকারীতে আসে, পরে তার পুত্র মুহাম্মদের ওপর—এই বারোজন ‘মাহদি’। যাদের অপেক্ষা করা হয়েছিল। দলটির ধারণা—এরা মারা যাননি; বরং গোপন রয়েছেন। শেষ যুগে ফিরে আসবেন। তখন পৃথিবী ইনসাফে ভরে যাবে।
আবু মানসুর আলআজলী বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আলী আলবাকের-এর অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের দাবিমতে, তিনি এমন খলিফা যাকে সরাসরি আকাশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তার মাথার ওপর পরম করুণাময় হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন।
রাফেযিদের একটি দলকে ‘জানাহাই’ সম্প্রদায় বলা হয়। যারা আবদুল্লাহ ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর ইবনে যিল জানাহাইনের মুরিদ। তাদের অভিমত হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার আত্মা আম্বিয়াদের পিঠে ঘোরাফেরা করত, এভাবে তা উল্লেখিত আবদুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে। এ ব্যক্তির মৃত্যু হয়নি; বরং তিনিই মাহদি—যার অপেক্ষা করা হচ্ছে।
তাদের একটি সম্প্রদায়ের নাম ‘গারাবিয়া’। যারা তার ব্যাপারে নবুয়তের অংশীদার বলে সাব্যস্ত করে থাকে। এদের একটি দলকে বলা হয় ‘মুফাওয়াযা’। যারা বলে, আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদকে সৃষ্টি করে অবশিষ্ট পৃথিবী সৃষ্টি করা তার এখতিয়ারে ছেড়ে দেন। তাদের আরও একটি গোত্রকে বলা হয় ‘মুহাম্মিয়া’। এরা হজরত জিবরীল রা.-এর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে বলে, তিনি আলী রা.-এর কাছে ওহী পাঠানোর ব্যাপারে নির্দেশিত ছিলেন, অথচ তিনি তা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে প্রেরণ করেন। তাদের কেউ কেউ বলে, আবু বকর রা. হজরত ফাতেমা রা.-কে মিরাস না দিয়ে জুলুম করেছেন।
বর্ণিত আছে, সাফাহ্ আক্কাসি একদিন যুতাআ শুরু করলে জনৈক ব্যক্তি—যে নিজেকে আলীর ওপর অন্যায়ের বংশধর বলে মনে করে, সে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন! আমার ওপর অন্যায় করা হয়েছে। আমার প্রাপ্য আমাকে ফিরিয়ে দিন। সাফাহ বললেন, তোমার ওপর কে জুলুম করেছে? সে বলল, আমি আলীর বংশধর। আবু বকর ফাতেমা রা.-কে মিরাসের অংশ দেয়নি, সুতরাং আমি মজলুম। অর্থাৎ আমাকে মিরাসের অংশ দেয়া হোক। সাফাহ বললেন, আবু বকরের পর কে এসেছিলেন? সে বলল, ওমর। সাফাহ বললেন, তিনিও জুলুম করেছেন? সে বলল, হ্যাঁ। সাফাহ বললেন, তারপর কে খলিফা নির্বাচিত হয়েছেন? সে বলল, ওসমান রা.। সাফাহ বললেন, তিনিও কি নিয়মমাফিক জুলুমের ওপর ছিলেন? সে বলল, হ্যাঁ। সাফাহ বললেন, ওসমানের পর কে খলিফা হন? বর্ণনাকারী বলেন, এখন তার হুঁশ ফিরে এসেছে। উত্তর না দিয়ে সে এদিক-সেদিক তাকিয়ে পালাবার পথ খুঁজতে থাকে।
ইবনে আকীল বলেন, এটা স্পষ্ট কথা যে, যে ব্যক্তি রাফেযি মাযহাব উদ্ভাবন করেছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল দীন ইসলামে এবং মূলত নবুয়তে মুহাম্মদিকে অপদস্থ ও কলঙ্কিত করে ধ্বংস করে দেয়া। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ সকল বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস নিয়ে এসেছিলেন, তা আমাদের চোখের আড়ালে। আমরা কেবল সালফে সালেহীন অর্থাৎ সাহাবা ও তাবেয়িদের পক্ষ থেকে সে সব কথা পেয়ে থাকি। কেননা তাঁরা খুবই নিখুঁতভাবে নবীর ওপর অর্পিত দীন ও আকিদা সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। রাফেযিরা এখানে এসেই বিশ্বাসে চিড় ধরাতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। তারা বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা চালাতে থাকে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর প্রথমে বলতে থাকে— তিনি তাঁর বংশে খেলাফতের ব্যাপারে অন্যায় করেছেন এবং নবীকন্যা ফাতেমাকে মিরাস না দিয়ে জুলুম করেছেন। সুতরাং নবুয়তের সময় যিনি সঠিক পথে ছিলেন, তাকে নবীর মৃত্যুর পর আর সঠিক পাননি। তাদের ধারণা—নবীর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ছিল। সুতরাং তারা এমনভাবে অপপ্রচার চালাতে থাকে যে, নবীর মৃত্যুর পর দীনের সবকিছু সঠিকভাবে জাতি জানতে পারছে না। তাই সাহাবিদের কথার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাদের মূল এজেন্ডা ছিল, যাতে মুসলমানদের আকিদা নষ্ট হয়ে যায়, ঈমানের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়াশয়ে মানুষ সন্দেহ-সংশয়ে পতিত হয় এবং মুজিযাপূর্ণ বর্ণনাসমূহ থেকে তারা বিমুখ হয়ে পড়ে। চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আর ধোঁকাসর্বস্ব এই সম্প্রদায়ের ফিতনা ইসলামের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব বয়ে আনে।
গ্রন্থকার বলেন, রাফেযি সম্প্রদায় হজরত আলী রা. এর সাথে হৃদ্যতায় এমন বাড়াবাড়িতে ঠেকেছে যে, তারা তার মর্যাদার বর্ণনা দিতে গিয়ে বহু রেওয়ায়েত নিজেরা তৈরি করে নিয়েছে। তাদের এমন অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণে হজরত আলী রা. নিজেই এদের তিরস্কার করেন। আমি 'কিতাবুল মাউযূয়াত' গ্রন্থে এ ধরনের অনেক বানোয়াট বর্ণনার কথা উল্লেখ করেছি।
তাদের সে বানোয়াট উক্তিসমূহের কিছু হচ্ছে এমন— 'সূর্য ডুবে যাচ্ছে আর হজরত আলী রা. এর আসরের নামায ছুটে যাবার উপক্রম। এমন সময় পুনরায় সূর্য উদিত হয়।' এই বর্ণনাটির অবস্থা এতই নাজুক যে, কোনো 'সেকা' তথা বিশ্বস্ত রাবি বা বর্ণনাকারী এটি বর্ণনা করেননি। অনুরূপভাবে অর্থের দিক দিয়েও কথাটি বাতিল বলে বিবেচিত। কেননা সূর্য ডুবে গেল তো আসরের সময় শেষ হয়ে যায়। পরে আবার সূর্য দেখা গেলে তখন নতুন সময় তৈরি হবে।
তাদের ভ্রান্ত বর্ণনার আরেকটি হচ্ছে, 'হজরত সাইয়্যিদাতুন নিসা ফাতেমা রা. এর নিজে গোসল করা। পরে মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তাঁর অসিয়ত করা যে, এই গোসলই যথেষ্ট, পুনরায় আমাকে মৃতের গোসল দেবে না।' এ বর্ণনাটি উদ্ধৃতিসূত্রেও ডাহা মিথ্যা, যা প্রকাশেই দেখা যাচ্ছে। অর্থগত দিক দিয়েও এটি রাফেযি সম্প্রদায়ের চরম অজ্ঞতার পরিচায়ক। কেননা মৃত্যু সংঘটিত হলে গোসল ওয়াজিব হয়। সুতরাং মৃত্যুর পূর্বে গোসলে কী লাভ? এছাড়া তারা এমন অসংখ্য ভুয়া ও ধৃষ্টতাপূর্ণ বর্ণনা প্রচার করে থাকে, যার না আছে কোনো সনদগত ভিত্তি, না আছে অর্থগত সামঞ্জস্য।
ফিকাহর ক্ষেত্রেও এই মাযহাবের অদ্ভুত বিদআত পরিলক্ষিত হয়; যা ‘ইজমা’ তথা উম্মতের সর্বসম্মত মতের সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইবনে আকিল র. এর পত্রে উল্লেখিত আছে, তিনি বলেন, আমি মুতাওয়াতির গ্রন্থ থেকে এটা উল্লেখ করেছি। রাফেযী ইমামিয়াদের মতে, সরাসরি জমিন ও উদ্ভিদের ক্ষেত্র ছাড়া অন্যত্র সিজদা দেয়া বৈধ নয়। টিলা দ্বারা ইস্তঞ্জা করা শুধু মলত্যাগের বেলায় বৈধ, পেশাবের বেলায় বৈধ নয়। মাথা মাসেহ করা জায়েয নেই। তাদের মতে, যদি কোনো পুরুষ কোনো মহিলার সাথে ব্যভিচার করে—যার স্বামী রয়েছে, তাহলে এই মহিলা সেই ব্যভিচারকারীর উপর চিরদিনের জন্য হারাম। তার স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দিলেও উক্ত ব্যভিচারকারী তাকে বিয়ে করতে পারবে না। এই সম্প্রদায় আহলে কিতাবদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে অবৈধ মনে করে। আরও বলে, কোনো শর্তারোপ করে তালাক দেয়া হলে, সেই শর্ত পতিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তালাক পতিত হবে না। শুধু তা-ই নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী পাওয়া না যাবে, ততক্ষণ তালাক পতিত হবে না। তাদের মতে, যে ব্যক্তি অর্ধরাত পর্যন্ত এশার নামায না পড়ে শুয়ে পড়ে তার ওপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। নিদ্রা হতে জাগ্রত হলে এই ভুলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে সকালে রোযা রাখবে। মহিলারা মাথার চুল কাটলে তার ওপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। কোনো ব্যক্তি নিজের কন্যা, স্ত্রী বা স্বামীর মৃত্যুর কাপড় ছিঁড়লে তার ওপর কসমের কাফফারা ওয়াজিব হবে। যে ব্যক্তি এমন নারীকে বিয়ে করে যার স্বামী আছে, অথচ সে তা জানে না, এমতাবস্থায় তার ওপর পাঁচ দিরহাম কাফফারা ওয়াজিব হবে। মদ্যপকে দুইবার সাজা দেয়ার পর তৃতীয়বার তাকে হত্যা করা হবে। চুরির শাস্তিস্বরূপ চোরের আঙুলের গোড়া থেকে কর্তন করা হবে এবং কব্জি অবশিষ্ট রাখা হবে। পুনরায় চুরি করলে তাঁর বাঁ পা কাটা হবে। তৃতীয়বার চুরি করলে আজীবন জেলখানায় বন্দি করে রাখা হবে।
রাফেযীরা বাইম মাছ এবং আহলে কিতাবের জবাইকৃত জন্তুকে হারাম মনে করে। জবাই করার সময় তারা কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে আরও বহু ধরনের নিয়ম-কানুনের কথা বলে থাকে—যা বর্ণনা করে আলোচনা দীর্ঘ করা অর্থহীন। এগুলো সব উম্মতের সর্বসম্মত ঐকমত্যের বিপরীত। শয়তান তাদেরকে এমনভাবে প্ররোচনা দিয়েছে যে, তারা কোনো প্রকার সনদ ব্যতিরেকে কিয়াসবিরোধী এ-সব মতবাদ নির্ণয় করেছে। রাফেযিদের ভ্রান্ত মতবাদ অসংখ্য। তারা নামায থেকে বঞ্চিত, কেননা তারা অযুর সময় পা ধৌত করে না। এরা জামাত থেকে বঞ্চিত, কারণ তারা নিষ্পাপ ইমাম সন্ধান করে। এছাড়া তারা সাহাবাদের গালমন্দ করে থাকে।
অথচ হাদিসে আছে, আবু সা'ঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ، ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ، وَلَا نَصِيفَهُ
'তোমরা আমার সাহাবিগণকে গালমন্দ করো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত পরিমাণ সোনা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ-এর সমপরিমাণ সওয়াব হবে না।”
অন্যত্র বর্ণিত আছে, হজরত আবদুর রহমান ইবনে সালেম হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, إِنَّ اللَّهَ اخْتَارَنِي، وَاخْتَارَ لِي أَصْحَابًا، فَجَعَلَهُمْ لِي وُزَرَاءَ وَأَنْصَارًا وَأَصْهَارًا، فَمَنْ سَبَّهُمْ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لَا يُقْبَلُ مِنْهُمْ صَرْفُ، وَلَا عَدْلُ
'আল্লাহ তায়ালা আমাকে নির্বাচিত করেছেন এবং আমার জন্য আমার সাহাবাদেরকে নির্বাচিত করেছেন। তাদেরকে আমার জন্য উজির, আনসার ও সৈন্য হিসেবে তৈরি করেছেন। যে ব্যক্তি তাদেরকে মন্দ বলবে, তার ওপর আল্লাহ তায়ালা, ফেরেস্তাগণ ও সমুদয় মানবজাতির অভিসম্পাত। আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তাদের ফরয নফল কোনো প্রকার ইবাদত কবুল করবেন না।”
সুয়াইদ ইবনে গাফলাহ রা. বলেন, আমি কুফায় এমন একটি দলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, যারা হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. এর সম্পর্কে কটূক্তি প্রকাশ করছে। অতঃপর আমি হজরত আলী রা. এর দরবারে গিয়ে তাঁর খেদমতে আরয করলাম, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার কিছু সৈন্যের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে দেখলাম তারা হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. এর ব্যাপারে এমন কথোপকথন করছে, যা তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। সম্ভবত তারা আপনাকেও এমন ধারণা লালন করেন বলে মনে করেছে। নতুবা প্রকাশ্যে কী করে এমন ধৃষ্টতা দেখাতে পারে? হজরত আলী রা. বললেন, أعوذ بالله أعوذ بالله "আমি আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।” আমি আল্লাহর কাছে এ জন্য পানাহ চাচ্ছি, কারণ আমার অন্তরে তাঁদের সম্পর্কে কোনো বিরূপ ধারণা নেই; বরং আমি তো তাঁদের প্রতি এমন ভালোবাসা লালন করি, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আমার ভালোবাসা রয়েছে। যে ব্যক্তি তাঁদের সম্পর্কে ভালো ও উত্তম ছাড়া মন্দ কোনো বিষয় মনে ঠাঁই দেবে, তাদের ওপর আল্লাহর লানত। তাঁরা উভয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবি, ভাই এবং উজির ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের ওপর অনুগ্রহ করুন।
এর পর তিনি অশ্রুসিক্ত নয়ন নিয়ে ওঠে দাঁড়ালেন। মসজিদে গিয়ে মিম্বরে দাঁড়ালেন এবং সেখানে বসলেন। সে সময় তিনি তাঁর সাদা দাড়ি হাতে নিয়ে (দাড়ির প্রতি) তাকিয়ে রইলেন। এমতাবস্থায় লোকজন এসে তাঁর পাশে জড়ো হলো। তিনি দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত ও উন্নত ভাষায় আল্লাহ তায়ালার হামদ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর সানা পাঠ করে খুতবা দিলেন। অতঃপর বললেন, আমার কাছে অভিযোগ এসেছে, কোনো কোনো গোত্র কুরাইশ মুহাজিরীনদের নেতা এবং মুসলমানদের নেতা হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. এর ব্যাপারে আপত্তিজনক মন্তব্য করছে। এতে আমি ভীষণ মর্মাহত। আপত্তিজনক মন্তব্য ও কুৎসা রটনাকারীদেরকে আমি শাস্তি দেবো। সাবধান হয়ে যাও! শপথ ওই মহান সত্তার—যিনি জমি থেকে শস্য উৎপন্ন করেন এবং মানুষ সৃষ্টি করেন, হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.-কে ওই ব্যক্তি ভালোবাসে যে মুত্তাকি ও পরহেযগার। অন্যদিকে তাঁদের সাথে তারাই শত্রুতা পোষণ করে যারা পাপিষ্ঠ। তাঁরা উভয়ে পরিপূর্ণ সততার সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহচর্য লাভ করেছেন। তাঁরা কখনো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মতের বিপরীতে কোনো কর্মকাণ্ড করেননি। এভাবেই তাঁরা শিষ্টের লালন, দুষ্টের দমন করতেন, ক্রোধান্বিত হতেন এবং শাস্তি প্রদান করতেন। কিন্তু কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রায়ের অতিরিক্ত কিছু করতেন না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.-কে যেরূপ ভালোবাসতেন, তেমন ভালোবাসা আর কারও প্রতি পোষণ করতেন না। তাঁদের উভয়ের প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্ট থেকেই তিনি পরকালের সফরে পাড়ি জমিয়েছেন।
এভাবে হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.ও পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, যে অবস্থায় সকল বিশ্বাসী মানুষ তাঁদের ওপর সন্তুষ্ট ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে অসুস্থ হয়ে পড়লে হজরত আবু বকর রা.-কে নামায পড়াতে নির্দেশ দিলে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত থাকাবস্থায় নয়দিন মুমিনদের নামায পড়ান। পরে আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর প্রিয় হাবীবকে উঠিয়ে নিলে, জগদ্বাসীর জন্য তিনি আবু বকর রা.-কে পছন্দ করেন। সে মতে মুমিনরা তাঁকে নিজেদের অভিভাবক ও খলিফায়ে রাসুল মনোনীত করে। তারা আবু বকরের হাতে যাকাতের পণ্য অর্পণ করে খুশিমনে তাঁর হাতে হাত রেখে বায়য়াত গ্রহণ করতে থাকে। এখানে কোনো প্রকার জবরদস্তি ও প্রভাব বিস্তারের চিহ্নও ছিল না। আবদুল মুত্তালিব বংশের মধ্যে সর্বপ্রথম আমিই হজরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর হাতে হাত রেখে বায়য়াত গ্রহণের কার্যক্রম আরম্ভ করি। অথচ আবু বকর রা. নিজ থেকে খুশিমনে খেলাফত গ্রহণ করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন আমাদের মধ্য থেকে কেউ একজন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করুক।
আবু বকর রা. এমন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর সবার চেয়ে উত্তম ও যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতেন। দয়া ও অনুগ্রহের গুণে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর সবচেয়ে বয়স্ক ছিলেন তিনি। ঈমান গ্রহণের বেলায় তিনিই ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। দয়ার্ঘ ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ইবরাহিম খলিলুল্লাহর সাথে তুলনা করতেন। হজরত আবু বকর রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতেন। এভাবেই তিনি অভীষ্ট লক্ষ্যপানে পাড়ি জমান। আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন।
এরপর হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. অভিভাবক ও খলিফা মনোনীত হন। আমি এমন ব্যক্তি, যে তাঁর খেলাফতের ব্যাপারে শুরু থেকেই সন্তুষ্ট ছিলাম। তিনিও হজরত রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর অনুপম বন্ধু আবু বকর রা. এর পদাঙ্ক অনুসরণে অটল থাকেন। প্রতি প্রতিটি বিষয়ে তিনি পূর্বসূরিদ্বয়ের বাতানো ও দেখানো পথে চলতেন, যেভাবে উটের ছানা উটের পেছনে পেছনে চলতে থাকে। নিঃসন্দেহে আল্লাহর শপথ। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর এমন শান ছিল যে, তিনি দুর্বল মুমিনদের ওপর ভীষণ দয়া ও অনুগ্রহ রাখতেন এবং অন্যায় ও অত্যাচারীদের ওপর বজ্রকঠিন ছিলেন। আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে কোনো অপবাদকারীর অপবাদকে তিনি ভয় পেতেন না। সর্বদা তিনি হকের ওপর অটল ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে সত্যের আলো বিচ্ছুরিত হতো। মানুষ ভাবত, আল্লাহর ফেরেশতার মুখ থেকে এমন হক কথা বের হচ্ছে। তিনি ইসলামধর্ম গ্রহণ করলে আল্লাহ তায়ালা ইসলামের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।
মদিনায় তাঁর হিজরতের কারণে দীনের ভিত এত দৃঢ় হয় যে, মদিনার মুনাফিকরা তার ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে এবং মুমিনের অন্তরে তাঁর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা জন্মে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এর সাথে তুলনা দেন। তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শত্রুদের ওপর ভীষণ কঠোর ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা উভয় সাহাবার ওপর রহম করুন এবং আমাদেরকে তাঁদের দেখানো পথে মানযিলে মাকসুদ তথা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার তাওফিক দিন।
এখন বলো এ দু'জনের মতো আর কাউকে কি পাবে? মনে রেখো! যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসে, সে নিশ্চয় ওই দুই মহান সাহাবিকে ভালোবাসে। আর যে ব্যক্তি তাদেরকে ভালোবাসবে না, সে নিশ্চয় আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে এবং আমিও তার ওপর অসন্তুষ্ট। আমি যদি পূর্ব হতেই তোমাদেরকে এই সংবাদ পৌঁছাতে পারতাম, তাহলে এখন যারা ওই দুই মহান সাহাবি সম্পর্কে কটূক্তি করছে, তাদেরকে শাস্তি দিতাম। এখন সাবধান হও! আগামীতে যদি এমন কোনো সংবাদ আমার কানে আসে এবং প্রমাণিত হয়, তাহলে তাকে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করব; যা অপবাদকারীদের দেয়া হয়। (অর্থাৎ নির্দোষ ও পবিত্র নারী-পুরুষের ওপর মিথ্যা অপবাদদাতার শাস্তি)। মনে রেখো, এই উম্মতের মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হচ্ছেন হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা.। তারপর কে উত্তম তা আল্লাহই ভালো জানেন।
আবু সুলাইমান হামদানি বলেন, হজরত আলী রা. হতে বর্ণিত, শেষ জমানায় এমন লোকদের দেখা যাবে, যারা আমাদের অনুসারী বন্ধুত্বের কথা প্রকাশ করবে, অথচ মনে কুধারণা পোষণ করবে। তাদেরকে রাফেযা বলা হবে। তারা কখনোই আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের চেনার উপায় হচ্ছে, তারা হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করবে। তোমরা তাদেরকে যেখানেই দেখবে হত্যা করবে। কেননা এরা মুশরিক।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬৭৩, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৫৪০
২. মুসতাদরাকে হাকিম: ৩/৭৩২
📄 বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের ওপর ইবলিসের ধোঁকা
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, বাতেনিয়া এমন একটি সম্প্রদায়, যারা ইসলামের পর্দায় নিজেদের প্রকৃত রূপ আড়ালে রেখেছে। এরা রাফেযিদের নিকটবর্তী। তাদের আকিদা-বিশ্বাস ও আমল সম্পূর্ণ ইসলামপরিপন্থী। বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের মতবাদের সারসংক্ষেপ হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তা বেকার। নবুয়ত বলতে কিছু নেই। ইবাদত অনর্থক। মৃত্যু-পরবর্তী পুনরুত্থান ও হাশর ইত্যাদি ধোঁকা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই সম্প্রদায়টি তাদের মতবাদের কথা শুরুতে কারও কাছে প্রকাশ করত না; বরং বাহ্যত আল্লাহ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হক বলত এবং দীনকে বিশুদ্ধ বলত। কিন্তু অন্তর থেকে এগুলো সব অস্বীকার করত। ইবলিস তাদেরকে তার অনুগত করতে সমর্থ হয়। তাদেরকে সম্পূর্ণ হাতের মুঠোয় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দীনবিধ্বংসী অদ্ভূত মতবাদ প্রচার করতে থাকে। বাতেনিরা আটটি দলে বিভক্ত।
১. الباطنية (বাতেনিয়া): এ নামে তাদেরকে অভিহিত করার কারণ হচ্ছে, তারা বলে থাকে, কুরআন ও হাদিসের বাতেনি (গোপন) অর্থ আছে। আর এই বাতেনি অর্থই হচ্ছে তার মজ্জা ও সারগর্ভ। অন্যদিকে প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে কুরআন-হাদিসের চর্মসদৃশ। এগুলোর বাহ্যিক আকৃতি দেখে তার মাসআলার মধ্যে অজ্ঞ লোকেরা ফেঁসে গেছে। জ্ঞানীদের কাছে কুরআন-হাদিস বিভিন্ন রহস্য ও গোপন রহস্যের ইঙ্গিতবাহী বার্তা বিদ্যমান। যার জ্ঞান-বুদ্ধি সে পর্যন্ত পৌঁছেনি সে শরিয়তের প্রকাশ্য বিধি-বিধানের জালে আটকে পড়েছে। অন্যদিকে যারা ইলমে বাতেন পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়েছ, তাদের ওপর থেকে শরিয়তের সকল প্রকার বিধি-নিষেধ রহিত হয়ে গেছে। وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِم “এবং তাদের ওপর থেকে এমন সব বোঝা নামিয়ে দেয়, যা তাদের ওপর চাপানো ছিল আর এমন সব বাঁধন থেকে তাদেরকে মুক্ত করে যাতে আবদ্ধ ছিল।"' দ্বারা এরাই উদ্দেশ্য। এই ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যখন শরিয়তের প্রকাশ্য সকল বিধি-বিধানের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন সম্ভব হবে তখন শরিয়তকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া সহজতর হবে।
২. الإسماعيلية )ইসমাইলিয়া): এই নামকরণের নেপথ্য কারণ হচ্ছে, তারা নিজেদেরকে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল ইবনে জাফরের দিকে সম্পর্কিত বলে দাবি করে। তাদের দাবি—ইমামতের পরিসমাপ্তি এই লোকের ওপরই ঘটেছে। কেননা তিনি সপ্তম পুরুষ। আর সপ্তম পুরুষে ইমামত শেষ হয়। এ কারণে আকাশের স্তর সাতটি, জমিনও সাত স্তরের, অনুরূপভাবে সপ্তাহে দিন সাতটি। সুতরাং ইমামের পরম্পরাও সাতটিতেই সীমাবদ্ধ। এমনইভাবে মনসুর আব্বাস পর্যন্ত পৌঁছেছে। আব্বাস, তারপর তার ছেলে আবদুল্লাহ, তারপর আলী ইবনে আবদুল্লাহ, তারপর মুহাম্মাদ ইবনে আলী, এরপর ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ, এরপর সাফাহ, তারপর মনসুর। অর্থাৎ মনসুরে এসে সপ্তম পরম্পরা সমাপ্ত হয়।
আবু জাফর তাবারি তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ করেন, আলী ইবনে মুহাম্মাদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাবেন্দিয়াদের মধ্যে এক ব্যক্তি তার কাছে এসে প্রত্যয় ব্যক্ত করল যে, তুমিই সেই রুহ, যা ঈসা আলাইহিস সালাম এর সম্পর্কে বলা হয়? ওই ব্যক্তিকে 'আবলাক' বলা হতো। কেননা তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে বসন্তের দাগ পরিদৃষ্ট ছিল। এ ব্যক্তি বিদায় নিলে রাবেন্দিয়ার অন্যান্য লোকদেরকে সে পথভ্রষ্ট করতে থাকে এবং বলতে থাকে, যে আত্মা ঈসা ইবনে মারইয়ামের মাঝে দেখা যেত তা আলী ইবনে আবু তালিবের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এরপর একের পর এক ইমামের মাঝে তা দেখা যেতে থাকে। এভাবে তা ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদের ওপর এসে শেষ হয়।
এ দলটি মুহাররমা নারীদেরকে বৈধ মনে করে থাকে। এ কারণে তারা একটি দলকে দাওয়াত দিলে, তাদেরকে ঘরে এনে খাবার ও মদজাতীয় পানীয় পরিবেশন করে তাদেরকে নিজের ঘরের নারীদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই সংবাদ আসাদ ইবনে আবদুল্লাহর কাছে পৌঁছলে সে তাদেরকে হত্যা করে শূলে চড়িয়ে রাখে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাদের যে- সব অনুসারী অবশিষ্ট আছে, তারা এ নিয়মই পালন করছে। তারা আবু জাফরের উপাসনা করে। তারা একটি সবুজ পাখায় হাত মেলে রাখে। যাতে তাদেরকে দেখে মানুষ মনে করে, এরা আকাশে উড়ে বেড়ায়, এখন নিচে নামছে কিন্তু পা এখনও মাটিতে পড়েনি। ইত্যবসরে সে মারা গেছে। দলটি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং 'আবু জাফর, তুমি! তুমি!' বলে চিৎকার করতে থাকে।
৩. السبعية সাবয়িয়া: এ উপাধির দু'টি কারণ। প্রথমত তাদের বিশ্বাস— ইমামতের পরম্পরা সাত সাতটি। যেমন আমরা পূর্বে আলোকপাত করেছি। সপ্তমে এসে তার পরিসমাপ্তি ঘটে। এখন চলছে শেষ বেলা। কেয়ামত দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। পরম্পরা এভাবে অসীমের পানে চলতে থাকবে। আর প্রতি সাতজন অন্তর অন্তর কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। কখনো তা শেষ হবে না। নামকরণের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, তারা মনে করে, এই ভূখণ্ডকে সাতটি নক্ষত্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যথা—বুধ, বৃহস্পতি, মঙ্গল, সূর্য, মঙ্গল, শনি ও চন্দ্র।
৪. البابكية বাবকিয়া: এটা বাতেনিয়াদের একটি উপদলের নাম। এরা অগ্নিপূজারি বাবক খুররমীর অনুসারী, যে বাতেনিয়াদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে একজন জারজ সন্তান। সে ২০১ হিজরিতে আজারবাইজানের একটি পাহাড়ি এলাকা থেকে আত্মপ্রকাশ করে। বহু লোককে সে তার অনুসারী বানিয়ে ফেলে। নিষিদ্ধ বস্তুকে সে বৈধতা দিতে থাকে। কারও সুন্দরী বোন বা স্ত্রীর খবর পেলে সে তাকে উপস্থাপন করার নির্দেশ দিত। কথা মানলে তো ভালো কথা। অন্যথায় তাকে হত্যা করে তার বোন বা স্ত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণ করত। বিশ বছর ধরে সে পাহাড়ের গুহায় অবস্থিত আস্তানা থেকে নানা অপকর্ম করতে থাকে। সে দুই লাখ পঞ্চান্ন হাজার পাঁচশত (২,৫৫,৫০০) মানুষকে হত্যা করে। বাদশা তার সাথে যুদ্ধ করে। কিন্তু তার সাথে সৈন্যরা পেরে ওঠেনি। পরে বাদশাহ মু'তাসিম আফসিয়ান সর্দারকে তার সাথে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়। আফসিয়ান তাকে তার ভাইসহ ২২৩ হিজরিতে গ্রেফতার করে বাগদাদ অভিমুখে নিয়ে যায়। তখন তার ভাই তাকে বলেছিল, হে বাবক! তুমি এমন কাজ করেছ যা অন্য কেউ করতে পারেনি। এখন তোমাকে এমন ধৈর্যধারণ করতে হবে যা আর কেউ করেনি। বাবক বললে, হ্যাঁ, তুমি আমার ধৈর্যশক্তি পর্যবেক্ষণ করবে।
বাদশা মু'তাসিম তার হাত-পা কেটে ফেলতে নির্দেশ দিলে সে রক্ত দিয়ে তার মুখ রাঙিয়ে দেয়। তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আমি চাই না আমার মুখ হলুদবর্ণ ধারণ করুক, যাতে কেউ ভাবতে পারে যে, বাবক মৃত্যুকে ভয় পেয়েছে। অতঃপর তার চার হাত-পা কর্তন করা হয়। গলা কাটা হয় এবং আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। তার ভাইয়ের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি। এভাবে মারার পরও তাদের কারও মুখ দিয়ে কোনো প্রকার শব্দ বের হয়নি।
গ্রন্থকার বলেন, বাবকিয়াদের একটি গোত্র এখনও অবশিষ্ট রয়ে গেছে। তাদের মতবাদ হচ্ছে, বছরের একটি রাত তাদের আনন্দের জন্য নির্ধারিত। এ রাতে তারা নির্দিষ্ট একটি স্থানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে সমবেত হয়ে মাঝ বরাবর বাতি জ্বালিয়ে দেয়। প্রত্যেক পুরুষ দৌড়ে এসে একজন নারী গ্রেফতার করে তার সাথে ব্যভিচার করে। এর তা'বীল তথা বানোয়াট ব্যাখ্যাস্বরূপ তারা বলে, ব্যভিচার নয়; এটি শিকার ভোগ করার মতো। কেননা শিকারকৃত বস্তু বৈধ।
৫. المحمرة মুহাম্মিরা : এদেরকে এ নামে আখ্যায়িত করার কারণ হচ্ছে, বাবকের যুগ থেকে তারা লাল রঙে রাঙানো কাপড় পরিধান করে আসছে।
৬. القرامطة কারামিতা : মুয়াখখিরীন তথা পরবর্তী ইতিহাসবিদদের মতে তাদের 'কারামিতা' নামকরনের নেপথ্যে দু'টি কারণ রয়েছে। যথা-
ক. খোরাসানের এক ব্যক্তি কুফার সাওয়াদ এলাকায় গিয়ে সেখানকার আবেদ ও যাহেদ তথা দুনিয়াবিমুখ ইবাদতকারী বনে যায়। সে মানুষজনকে আহলে বাইতের ইমামগণের দিকে ডাকতে থাকে। কারমাতিয়া নামক এক ব্যক্তি তার কাছে আসে। তাকে রাঙাচোখের কারণে কারমাতিয়া বলে সম্বোধন করা হতো। গ্রামাঞ্চলে তাকে এ নামেই ডাকা হয়। পরে ওই এলাকার সর্দার তাকে গ্রেফতার করে জেলখানা পাঠিয়ে জেলখানার তালার চাবি তার বালিশের নিচে রেখে দেয়। সর্দারের বাঁদি সদয় হয়ে চাবি নিয়ে জেলখানার তালা খুলে তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। পরে সে জেলখানার তালা বন্ধ করে চাবি যথারীতি সর্দারের বালিশের নিচে রেখে দেয়। সকালে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মানুষ অতি আবেগী হয়ে ফিতনায় পতিত হতে থাকে। উল্লেখিত ব্যক্তি সিরিয়ায় পৌঁছে যায়। সেখানকার আশ্রয়দাতাদের কাছে সে কারমাতিয়া নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। যাতে করে কুফার সাওয়াদবাসীদের কাছে এ সংবাদ সহজে পৌঁছতে পারে। ধীরে ধীরে তার নাম কারমিতা হয়, এরপর কারামিতায় রূপ লাভ করে। শেষে তার বংশধর ও নিকটাত্মীয়রা ওখানে অবস্থান করতে থাকে।
খ. হামদান কারমাত নামীয় এক ব্যক্তির দিকে সম্পর্কিত করে কারামিতা সম্প্রদায়ের নামকরণ করা হয়। শুরুতে সে বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের আহ্বানকারী ছিল। তার মতবাদ একটি দল মেনে নেয় এবং তাদেরকে কারামিতা নামে অভিহিত করা হয়। এ লোক শুরুতে বেশ দুনিয়াবিমুখ ও বৈরাগ্যের দিকে আকৃষ্ট ছিল, কিন্তু পাশাপাশি সে ছিল জাহেল তথা অজ্ঞ। বসবাস করত কুফা নগরীতে।
একবার তার পাশ দিয়ে বাতেনি সম্প্রদায়ের এক দায়ী একটি গ্রামের দিকে যাচ্ছিল, যার হাতে ছিল একটি গরু। হামদান অপরিচিত এই লোককে দেখে বলল, আপনি কোথায় যাবেন? সে তার নির্দিষ্ট গ্রামের কথা বললে হামদান বলল, আমিও তো সেই গ্রামে যাব। আপনি গরুর পিঠে আরোহণ না করে পায়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন কেন? বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের দায়ী বলল, এ ব্যাপারে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। হামদান জানতে চাইল, কে আপনাকে নির্দেশ দেয়নি? দায়ী বলল, যে আমার তোমার এবং সবার মালিক তিনি নির্দেশ দেননি। হামদান বলল, তিনি তো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। মিথ্যুক ও ধোঁকাবাজ বাতেনিয়া দায়ী জবাবে বলল, হ্যাঁ। তুমি সত্য বলেছ। হামদান বলল, যে গাঁয়ে আপনি যাচ্ছেন, সেখানে আপনার উদ্দেশ্য কী? দায়ী উত্তরে বলল, মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর দিকে এবং পথভ্রষ্টতা থেকে হেদায়াতের দিকে আহ্বান করতে যাচ্ছি। তাদেরকে লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা থেকে উদ্ধার করব। এমন সম্পদ দেবো যাতে তারা ধনী হয়ে যায়।
হামদান শুনে বলল, আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। আমাকেও এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাবেন এবং জ্ঞানদানে আমার প্রতি অনুগ্রহ করবেন। ধোঁকাবাজ দায়ী বলল, সবার কাছে রহস্যের উন্মোচন করতে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত তার ওপর আস্থা রাখা না যাবে এবং তার কাছ থেকে শপথ নেয়া না হবে। হামদান বলল, আপনি আপনার অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করুন। আমি মনেপ্রাণে তা ধারণ করব। দায়ী বলল, তুমি আমার জন্য এবং এ সময়কার ইমামের জন্য স্বীয় প্রাণের ওপর আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা ও প্রতিজ্ঞা ধারণ করো, তাহলে ইমামের যে রহস্য আমি তোমার কাছে প্রকাশ করব, তা কাউকে বলতে পারবে না। আমার রহস্যের কথাও কাউকে বলতে পারবে না। হামদার সে মতেই প্রতিজ্ঞা করল। পরে দায়ী তাকে ভ্রান্ত শাস্ত্র শিক্ষা দিতে থাকে। এভাবে তাকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলে। অবশেষে এই হামদানই একসময় ভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট পথের একজন জাহেল নেতা বনে যায় এবং বিদয়াতের নিত্যনতুন উপাদান আবিষ্কার করতে থাকে। তার অনুসারীদেরকে কারামতিয়া বা কারামিতা বলে আখ্যায়িত করা হয়।
পরে তার বংশধর ও উত্তরসূরিরা এই ভ্রান্ত আকিদাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। তাদের মধ্যে আবু সাঈদ কারমাতী নামের একজন পাষণ্ড ধোঁকাবাজ যোদ্ধা ২৮৬ হিজরিতে আত্মপ্রকাশ করে। সে বিপুল প্রতিপত্তি লাভ করতে থাকে। অসংখ্য মানুষকে সে হত্যা করেছে। বহু মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শত শত কুরআন মাজিদ পুড়িয়ে দিয়েছে। হাজীদের বহু কাফেলায় সে লুটতরাজ করেছে। নিজের অনুসারীদের জন্য নিত্যনতুন পন্থা আবিষ্কার করতে থাকে এবং অগণিত অসম্ভব ও উদ্ভট কথা ছড়িয়ে দিতে থাকে। আবু সাঈদ মারা গেলে শয়তান তার কবরকে নিয়ে আরও নানা ধরনের বিদয়াত মানুষের মনে ছড়িয়ে দিতে থাকে। লোকেরা আবু সাঈদের নাম শুনে দরুদ পাঠ করত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম শুনলে দরুদ পড়ত না। ধৃষ্টতা দেখিয়ে বলত, আমরা আবু সাঈদের রিযিক ভক্ষণ করি, সুতরাং আবুল কাসেম (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর দরুদ পড়ব কেন? আবু সাঈদের পর আবু তাহের তার স্থলাভিষিক্ত হয়। সেও পিতার মতো দুষ্কর্মে মনোযোগী হতে থাকে। এমনকি অতর্কিতে সে পবিত্র কাবায় আক্রমণ করে বসে। সেখানে যা কিছু পেয়েছে সব লুট করে নিয়েছে। হাজরে আসওয়াদ কাবার পাশ থেকে তুলে তার এলাকায় নিয়ে গিয়েছে। মানুষের মনে সে আল্লাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চেয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ)
۹. الخرمية )খুররমিয়া): খুররম অনারবি শব্দ। এর অর্থ মজাদার আনন্দ ও প্রশান্তিদায়ক বস্তু; যার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট থাকে। এ নামের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে মানুষ সকল প্রকার ভোগ-বিলাস যেভাবে চায় সেভাবে অর্জন করতে পারে। শরিয়তে যে-সকল বিষয় মানুষের জন্য নিষিদ্ধ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তারা তা অগ্রাহ্য করে বৈধতা দিতে থাকে নির্দ্বিধায়। এ জন্য বাতেনিয়াদের এই সম্প্রদায়কে খুররমিয়া নামে অভিহিত করা হয়।
৮. আত্-তালীমিয়া (তালীমিয়া): এই উপাধিতে তাদের ভূষিত করার কারণ হচ্ছে, এই সম্প্রদায়ের মৌলিক উৎস হচ্ছে, বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে কোনো কাজ করা যাবে না। যা কিছু তাদের নিষ্পাপ ইমাম বলবেন, বিনা বাক্যব্যয়ে তা মেনে নিতে হবে। তার শিক্ষার প্রতি মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে। তার তালীম ব্যতীত জ্ঞানার্জন হবে না।
টিকাঃ
১. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৭