📄 মুসলিম উম্মাহর আকিদা ও ধর্মবিশ্বাসে ইবলিসের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, এই উম্মতের আকিদায় দু'ভাবে ইবলিসের অনুপ্রবেশ ঘটে। ১. বাপ-দাদা ও পূর্বসূরিদের অনুসরণ-অনুকরণ ২. অনিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়ে মনোনিবেশ করা
শয়তান দ্বিতীয় প্রকার লোকদেরকে বিভিন্নভাবে প্ররোচনা দিতে থাকে। আর প্রথম শ্রেণির লোকদের অন্তরে এ বিষয়টি ভালোভাবে গেঁথে দেয় যে, পূর্বসূরিদের অনুসরণ-অনুকরণ করতে থাকো। কেননা এর বিপরীত যুক্তি- প্রমাণগুলো অনেক সময় সন্দেহযুক্ত ও ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকে। এতে সঠিক পথ আড়াল হয়ে যায়। সুতরাং আগেকার লোকদের অনুসরণ করাই নিরাপদ। এভাবে অনুসরণ-অনুকরণ করতে গিয়ে বহু মানুষ গোমরাহ হয়ে গেছে। সাধারণত এ কারণেই মানুষের মাঝে ধ্বংসযজ্ঞ নেমে এসেছিল। অবশ্য ইহুদি-খ্রিষ্টানরা তাদের মাতা-পিতার পাশাপাশি পাদ্রি ও পোপদের অন্ধ অনুকরণ করে চলেছে। ইসলামপূর্ব যুগ তথা জাহেলি যুগের লোকজনও এ ধরনের অনুসরণ-অনুকরণের পেছনে পড়েছিল। স্মর্তব্য, তারা যে প্রমাণের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বসূরিদের অনুসরণ-অনুকরণ করত, এর ভেতর থেকেই তাদের ধর্মের উন্মেষ ঘটেছে। কেননা যখন দলিল-প্রমাণ সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়ে এবং সঠিক পথ আড়ালে থেকে যায় তখন নিশ্চয় সেই অনুসরণ-অনুকরণ ছেড়ে দেয়া কাম্য। যাতে পথভ্রষ্ট হতে না হয়। আল্লাহ তায়ালা এসব পূর্বসূরিদের অনুসরণ-অনুকরণের পেছনে পড়া লোকের ভ্রান্ত ধারণার প্রতি আলোকপাত করে বলেন,
بَلْ قَالُوا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِمْ مُهْتَدُونَ
"কাফেররা বলল, না। আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এ পথে পেয়েছি। আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি এর চেয়ে ভালো ও উত্তম হেদায়াতের পথ পাওয়া সত্ত্বেও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যাবে? অর্থাৎ এরপরও কি তোমরা পথভ্রষ্ট থাকবে? আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّهُمْ أَلْفَوْا آبَاءَهُمْ ضَالِّينَ * فَهُمْ عَلَى آثَارِهِمْ يُهْرَعُونَ
“কাফেররা তাদের বাপ-দাদাদেরকে পথভ্রষ্ট পেয়েছে, সুতরাং তারাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে থাকবে।”
গ্রন্থকার বলেন, জেনে রাখা দরকার, অনুসরণকারী যে বিষয়ে অনুসরণ করছে তাতে পূর্ণ আস্থা রাখা যায় না। আর অনুসরণ করার ক্ষেত্রে বিবেক-বুদ্ধিরও প্রচুর ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হয়। কেননা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি এজন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে চিন্তা-গবেষণা করা হয়। আর আল্লাহ তায়ালা ব্যক্তিকে বিবেক নামক বাতি দিয়েছেন যা দ্বারা সে আলোক্তি হতে পারে, সেটা যদি সে নিভিয়ে দেয় এবং অন্ধকারে চলতে চায়, তাহলে এটা খুবই নিকৃষ্ট কাজ বলে বিবেচিত হতে বাধ্য।
আরো জেনে রাখা চাই, অধিকাংশ মাযহাবপন্থীদের মন-মানসিকতা যে ব্যক্তির প্রতি ঝুঁকেছে বা আকৃষ্ট হয়েছে, তার কথা কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়া মান্য করতে থাকে এবং তার অনুসরণ করতে থাকে। এটাই মূল পথভ্রষ্টতা। কেননা দৃষ্টি ও মনোযোগ প্রকৃতপক্ষে কথার প্রতি রাখা উচিত; কোনো ব্যক্তির ওপর নয়। হারেস ইবনে হুত হজরত আলী রা.-কে বলেছিলেন, আপনি কি মনে করেন যে, আমরা ভেবে রেখেছি হজরত তালহা রা. ও হজরত যুবাইর রা. বাতিলের ওপর ছিলেন? এ কথা শুনে হজরত আলী রা. তাকে বললেন, হে হারেস! ব্যাপারটি তোমার কাছে স্পষ্ট নয়। সত্যের পরিচয় মানুষের দ্বারা সাব্যস্ত হয় না; বরং মানুষের পরিচয় সত্যের দ্বারা চেনা যায়।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলতেন, মানুষের জ্ঞানস্বল্পতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে মানুষের অনুসরণ করতে থাকে। এ কারণে ইমাম আহমদ রহ. 'মিরাস' এর জিদ-সংক্রান্ত মাসআলায় হজরত আবু বকর রা. এর অভিমত ছেড়ে দিয়ে হজরত যায়দ ইবনে সাবিত রা. এর অভিমত গ্রহণ করেছেন। প্রশ্ন উত্থাপন করে কেউ যদি বলে, সাধারণ মানুষজন তো দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে অজ্ঞ, অতএব তারা কেন তাকলিদ বা অনুসরণ করবে না? উত্তরে বলা হবে, আকিদা ও বিশ্বাসগত দলিল-প্রমাণ একেবারে স্পষ্ট, যেমন আমরা দাহরিয়া বা নাস্তিক সম্প্রদায়ের খণ্ডন করতে গিয়ে ইঙ্গিত দিয়ে এসেছি। বিবেক-বোধসম্পন্ন কোনো ব্যক্তির কাছে এমন স্পষ্ট দলিল-প্রমাণ অস্বচ্ছ বা অস্পষ্ট হতে পারে না। বৈষয়িক মাসআলার ব্যাপারটি এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। এমন মাসআলা যেহেতু একেক সময়ে একেক আঙ্গিকে উদ্ভাবিত হয় তাই এতে সাধারণ মানুষের নিষ্কৃতি দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। ধোঁকায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সুতরাং এ সব মাসআলার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য তাকলিদ তথা বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ কোনো আলেমের অনুসরণ করা উত্তম। এছাড়া সাধারণ মানুষের এ ব্যাপারে এখতেয়ার রয়েছে যে, সে যে কোনো বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ আলেমের অনুসরণ করতে পারে।
গ্রন্থকার বলেন, মুসলিম উম্মতের আকিদায় ইবলিসের অনুপ্রবেশের দ্বিতীয় রাস্তায় যাওয়ার প্রাক্কালে প্রথম রাস্তায় সে যেভাবে আহমক ও বেকুবদের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কেবল তাকলিদ বা অনুসরণের জাল বিছিয়েছে এবং জানোয়ারের মতো তাদেরকে একজনের পিছে পিছে হাঁকিয়েছে, তার বিপরীতে যাদেরকে শয়তান দেখল যে, তাদের মন-মস্তিস্ক বেশ প্রখর, বুদ্ধি বেশ তীক্ষ্ণ, তাদেরকেও যখন যেভাবে পেরেছে কাবু করছে। কারও মনে অনুসরণের প্রতি বিরাগ-বিতৃষ্ণ হওয়ার প্ররোচনা দিয়েছে। তাদের বলেছে, ইসলামি আকিদায় চিন্তা করো। শয়তান এতে একেক গোত্রকে একেক পন্থায় পথভ্রষ্ট করে ছেড়েছে। কেউ কেউ দেখল, শরিয়তের প্রকাশ্য বিষয়ে মনোযোগ দেয়া বিরাট দুর্বলতা। ইবলিস তখন তাদেরকে হাজির করালো দার্শনিকদের কাতারে। পর্যায়ক্রমের তাদের মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হলো। এভাবে একসময় তারা ইসলাম থেকেই বেরিয়ে পড়ে। দার্শনিকদের আলোচনায় এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা গত হয়েছে।
কারো কারো মনমুকুরে শয়তান কেবল পঞ্চইন্দ্রিয়ের স্পর্শ ও অনুধাবনযোগ্য বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে প্রণোদিত করল। তাদের যদি বলা হয়, আচ্ছা, তোমরা কি নিজেদের মতবাদকে বিশুদ্ধ মনে করো? তারা হ্যাঁ-সূচক কিছু বললে বুঝতে হবে তারা মিথ্যুক ও ঝগড়াটে। কেননা আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়কে তো আমরা বিশুদ্ধ পাইনি। কেননা পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা যে-সকল বিষয় জানা ও চেনা যায়, সেখানে মানুষ বিশেষে তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। তাহলে একজনের পঞ্চইন্দ্রিয়ের স্পর্শ ও অনুধাবনযোগ্য বিষয়গুলো অন্যের ক্ষেত্রে সমানভাবে কী করে প্রযোজ্য হতে পারে? বোঝা গেল তারা তাদের মতবাদে স্থির থাকতে পারবে না।
কিছুসংখ্যক লোককে ইবলিস তাকলিদ তথা অনুসরণের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে ইলমে কালামের দিকে মনোযোগী করে। তারা দার্শনিকদের দোষ-ত্রুটির সন্ধানে নেমে পড়ে। তারা তখন মনে করতে থাকে আমরা মানুষের মনের কথাগুলো তুলে ধরছি। মুতাকাল্লিম সম্প্রদায়ের অবস্থা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। অধিকাংশের অবস্থা এতই করুণ হয়ে দাঁড়ায়, তারা একসময় সত্য দীন সম্পর্কেও দ্বিধায় পড়ে যেতে থাকে। কেউ কেউ মুলহিদ ও মুরতাদ হয়ে যায়।
স্মর্তব্য, দীন ইসলামের পূর্বেকার যে-সকল আলেম-ওলামা ইলমে কালামের ব্যাপারে নীরবতা দেখিয়ে এসেছে, তারা কোনো দুর্বলতার কারণে এমনটি করেননি; বরং তাঁরা তীক্ষ্ণ আকল ও পরিপূর্ণ দেমাগ ব্যয় করে দেখেছেন, এ দ্বারা রোগীর আরোগ্য সম্ভব নয়, না নিবারণ সম্ভব তৃষ্ণার্তের পিপাসা। সুতরাং তাঁরা নিজেরাও এ শাস্ত্র থেকে বিরত থেকেছেন এবং অন্যদেরও দূরে রেখেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, মানুষ যদি শিরক ছাড়া অবশিষ্ট সকল প্রকার পাপ কাজ করে, তাও ইলমে কালামে মনোনিবেশ করার চেয়ে অনেক ভালো। আহলে কালামপন্থীদের ব্যাপারে তিনি লাঠি দিয়ে আঘাত করা এবং তাদেরকে পাড়ায়-পাড়ায় ঘোরানো উচিত বলে মনে করেন। যারা কুরআন-হাদিস বাদ দিয়ে যুক্তি-তর্কের পেছনে পড়ে তাদের এমন শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, কালাম-শাস্ত্রের লোকেরা কখনো সফল হতে পারবে না। আর এ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অজর্নকারীরা মুরতাদ ও যিন্দীক হয়ে থাকে।
লেখক আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কী করে কালাম-শাস্ত্রের ক্ষতির কথা উল্লেখ না করে থাকতে পারি! তোমরা দেখো, মুতাযিলারা এ শাস্ত্রের কারণে বলতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা সম্মিলিত বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, বিক্ষিপ্ত বস্তুর বিস্তারিত সম্পর্কে তার জ্ঞান নেই। (নাঊযুবিল্লাহ)। জাহাম ইবনে সাফওয়ান বলেন, আল্লাহ তায়ালার জ্ঞান, ক্ষমতা ও হায়াত সবকিছু অনাদি ও সৃষ্ট। আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি রহ. জাহামের এই অভিমত বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা কিছুই নয়।
আবু আলী জুব্বায়ী, আবু হাশেম ও তার অনুসারী মুতাযিলারা বলে, অদৃশ্য একটি বস্তু। সত্তা, প্রাণ ও গুণের মধ্যে এবং সাদা, লাল ও হলুদের মধ্যে। আল্লাহ তায়ালার এই ক্ষমতা নেই যে, তিনি সত্তাকে সত্তা এবং গঠনকে গঠন বা গুণকে গুণ হিসেবে সৃষ্টি করবেন। তিনি কেবল সত্তাকে অদৃশ্য থেকে দৃশ্যালোকে উপস্থাপন করতে পারেন।
'মুকতাবিস' গ্রন্থে কাজী আবু ইয়ালা উল্লেখ করেছেন, আমাকে আল্লাফ মুতাযিলী বলেছে, জান্নাতীদের নেয়ামত আর জাহান্নামিদের সাজা তাদের শেষ কর্মফল। এটা আল্লাহ তায়ালার সিফাত হতে পারে না। তিনি এতে ব্যত্যয় ঘটানোর ক্ষমতা রাখেন না। এমতাবস্থায় তার দিকে মনোযোগী হওয়া ঠিক নয় এবং তাকে ভয় করা অনুচিত। কেননা তিনি মানুষের এমন পরিস্থিতিতে ভালো-মন্দ কোনো কিছু করবার ক্ষমতা রাখেন না। কাউকে তিনি ক্ষতি বা উপকার করতে পারেন না। তার মতে, জান্নাতবাসী সকলে চুপ থাকবে। কোনো কথা বলতে পারবে না। নড়াচড়া করতে পারবে না। কোনো ক্ষমতা থাকবে না তাদের। তাদের প্রতিপালক তাদেরকে কিছুই করতে পারবে না। কেননা সকল প্রকার নশ্বর বস্তুর শেষ পরিণতি হচ্ছে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, যার পর আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব বাকি থাকবে না।
গ্রন্থকার বলেন, 'কিতাবুল মাকালাত' এ আবুল কাসেম আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আলবলখি লেখেন, আবুল হুযাইল মুহাম্মাদ বিন হুযাইল আল্লাফ—যিনি বসরা অধিবাসী আবদুল কায়স গোত্রের গোলাম ছিলেন এবং মুতাযিলা অনুসারী ছিলেন—একাকী এ-কথা উদ্ভাবন করেন যে, জান্নাতবাসীর কার্যক্রম ফুরিয়ে গেলে শেষে তারা নিশ্চুপ হয়ে সব সময়ের জন্য মূর্তি আকারে পড়ে থাকবে। তার যদি অসীম ক্ষমতা থাকে তাহলে এমন হতে পারে না। এদিকে, অনন্তের ওপর তার ক্ষমতাবান হওয়াও অসম্ভব। এ ব্যক্তি আরও বলে, আল্লাহর ইলম কেবলই আল্লাহ।
আবু হাশেম বলেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক গুনাহ থেকে তাওবা করেছে, কিন্তু সে এক চুমুক মদ পান করেছে, এমন ব্যক্তি কাফেরের মতো চিরদিনের জন্য জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হতে থাকবে। নিযাম মুতাযিলী বলেন, আল্লাহ তায়ালা মন্দ কোনো বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। অন্যদিকে ইবলিস ভালো-মন্দ উভয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। হিশাম আলকুতী বলতেন, অসীম ও অনন্ত আল্লাহর গুণ হতে পারে না। মুতাযিলাদের কারো কারো মতে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মিথ্যা প্রকাশ হওয়া সম্ভব। কিন্তু এমন বিষয় তার থেকে প্রকাশ হয় না।
মুরজিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা বলে থাকে, মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই; বরং তারা উদ্ভিদের মতো। না তারা কিছু করতে পারে, না করার অধিকার আছে। মুরজিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন বলে থাকে, যারা কালিমা শাহাদাত মুখে উচ্চারণ করেছে, তারা যত পাপ করুক না কেন কখনো জাহান্নামে যাবে না। এ-সব লোক সহিহ হাদিস অস্বীকার করেছে, যেখানে আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকারকারীদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে মর্মে বিবরণ আছে।
ইমাম ইবনে আকিল বলেন, মনে হয় যারা মুরজিয়া মাযহাব উদ্ভাবন করেছে, তাদের মধ্যে কেউ যিন্দীক ছিল। কেননা সাধারণ বিবেচনায় যে- কোনো ব্যক্তির আযাবের আয়াত দ্বারা ভীত হওয়া ও সাওয়াবের আশাবাদী হওয়া উচিত। মুরজিয়ারা যখন দেখল, সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, কেননা মানুষে এসব শুনে ঘৃণা করে এবং তা বিবেক-বুদ্ধিরও বিপরীত। তাই তারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব দ্বারা যে ফলাফল বেরিয়েছে তা মিটিয়ে দিতে আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে। অর্থাৎ তাকে ভয় করা এবং পাপ কাজে পতিত হওয়ার সময় তাকে উপস্থিত জানা। তারা এ ক্ষেত্রে শরয়ি দৃষ্টিকোণ ও বিধি-বিধান দূষিত করার পাঁয়তারা করতে থাকে।' এভাবে তারা ইসলামের সর্বনিকৃষ্ট দলে পরিণত হয়।
গ্রন্থকার বলেন, আবু আবদুল্লাহ ইবনে কাররাম তাকলিদ শুরু করলে সে একটি নিকৃষ্ট মাযহাবের আবির্ভাব ঘটায়। সে হাদিস থেকে সবচেয়ে 'যঈফ' হাদিস দ্বারা প্রমাণসূত্র আবিষ্কার করতে থাকে। সে সৃষ্টিকর্তার তুলনাকে সম্ভব মনে করে; এমনকি মহান আল্লাহ তায়ালার সত্তায় সৃষ্টির সাদৃশ্য বৈধ বলে মনে করে বলে, শরীর ও মৌল উপাদান পুনরায় সৃষ্টির ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালার নেই। শুরুতেই কেবল তিনি সৃষ্টি করতে পারেন। সালেমিয়া সম্প্রদায়ের মতাদর্শ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন প্রত্যেক জাতি ও প্রতিটি বস্তুর সামনে তাদের আকৃতিতে দৃশ্যমান হবেন। সুতরাং মানুষ তাঁকে মানুষের আকৃতিতে দেখবে, জিনেরা জিনের আকৃতিতে দেখবে। এদের ধারণা-আল্লাহ তায়ালার এটা একটি রহস্য যে, যদি তিনি তাঁর প্রকৃত রূপ প্রকাশ করেন তাহলে এ বাহ্যিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়ে যাবে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি র. বলেন, আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে এমন ইলম হতে পানাহ চাই যা এই ধরনের ভয়ংকর ও ক্ষতিকর মাযহাবের দিকে নিয়ে যায়। মুতাকাল্লিম তথা তার্কিকরা তাদের ধারণামতে বলে বেড়ায়, যতক্ষণ সৃষ্টিকর্তাকে তার বেষ্টিত সকল নিয়ম-কানুন সহযোগে চেনা না হবে ততক্ষণ ঈমান পূর্ণতা পাবে না। এরা সম্পূর্ণ ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামগণকে ঈমানের নির্দেশ দিয়েছেন, মুতাকাল্লিমদের এ সকল আলোচনার নির্দেশ দেননি। সাহাবারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার ওপরই ছিলেন-যাঁদের মর্যাদা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ঘোষণামতে পূর্বাপর সকলের চেয়ে উঁচু। অন্যদিকে কালাম-শাস্ত্র তিরস্কারযোগ্য। যেদিকে আমরা ইঙ্গিত দিয়ে এসেছি যে, মুতাকাল্লিমরা নিজেদের মত ও পথের অনুসরণ করতে গিয়ে একসময় হীনম্মন্যতায় ভোগার কারণে দীন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন। তারা স্বচক্ষে এর অশুভ পরিণতি দেখে নেন।
ইবনুল আশআস বর্ণনা করেন, আমি আহমদ ইবনে সিনান থেকে শুনে বলছি, ওয়ালিদ ইবনে আব্বান আল কারাবিসী আমার মামা হন। তার মৃত্যুক্ষণ এলে তিনি তার পুত্রদের বলেন, তোমরা কি ইলমে কালামের ব্যাপারে আমার চেয়ে পারদর্শী কাউকে চেনো? তারা বলল, না। তোমরা কি আমাকে আপত্তিজনক কথাবার্তার কারণে অভিযুক্ত করো? তারা বলল, হ্যাঁ। পরে তিনি বললেন, হাদিসে পারদর্শী আলেমদের পথ ও মত অবলম্বন করা তোমাদের জন্য অত্যাবশ্যক। কেননা আমি তাঁদেরকে হকের অনুসারী হিসেবে দেখেছি।
আবুল মায়ালি জুয়াইনি (যিনি ইমাম গাযালির উস্তাদ) বলতেন, আফসোস! আমি আহলে ইসলাম ও তাঁদের ইলম ছেড়ে অতল সমুদ্রে পা ফেলেছি। আর সেদিকে সাঁতার কেটেছি, যেদিকে যেতে আমাকে বারণ করা হচ্ছে। এ সব এজন্য করেছি যাতে আমি সত্যের দেখা পাই এবং তাকলিদ থেকে দূরে থাকতে পারি। এখন ওসব থেকে মুখ ফিরিয়ে সত্য কালিমাকে গ্রহণ করলাম। তোমাদের উচিত বুড়ি মহিলাদের কথাকে আঁকড়ে ধরবে। আল্লাহ তায়ালা যদি তাঁর অপার অনুগ্রহে আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন তাহলে আমি বুড়োদের দীনের ওপর মরব। তাহলে আশা করা যায় মৃত্যুকালে আমার কালিমা নসিব হবে। তিনি তার শাগরেদদের বলতেন, তোমরা ইলমে কালামে মত্ত হয়ো না। কেননা আমি যদি এর এমন ভয়ংকর নিকৃষ্ট পরিণতির কথা আঁচ করতে পারতাম তাহলে কখনো এ শাস্ত্রে লিপ্ত হতাম না।
আবুল ওয়াফা ইবনে আকিল তার কিছু শাগরেদকে বলেছেন, আমি নিশ্চিতভাবে জানি সাহাবায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেছেন। অথচ জানতে পারিনি 'জাওহার' (অনু) কী, 'আরয' (প্রস্তুতা- কী? তোমরা যদি দেখো তোমাদের রায় হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. এর সাথে সাংঘর্ষিক, তাহলে তোমার এই মুতাকাল্লিমপন্থীদের রায় প্রত্যাখ্যান করো। কেননা মুতাকাল্লিমদের মতো তোমার রায় অসম্পূর্ণ।
ইবনে আকিল বলেন, আমি অধিকাংশ মুতাকাল্লিমপন্থীদের শেষ পরিণতি অবলোকন করে দেখেছি, তারা শেষ সময়ে সন্দেহ বাতিকগ্রস্ততায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। অনেকেই মুলহিদ ও নাস্তিক হয়ে যায়। তারা শরিয়তের নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে নিজেদের স্পর্শ ও অনুধাবনশক্তি দ্বারা বস্তুর হাকিকতের সন্ধানে পড়ে থাকে। অথচ তাদের আকলের সেই ক্ষমতা ও শক্তি নেই যা আল্লাহ তায়ালার রয়েছে। তাদের বলে দাও সেই শক্তি ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার নিয়ন্ত্রণে। তিনি বস্তুর যে হাকিকত জানেন মানুষকে তিনি সে বিষয়ে জানার সুযোগ দেননি।
ইবনে আকিল বলেন, শুরুতে দীর্ঘ সময় আমি কালাম-শাস্ত্রে অত্যুক্তি করেছি। শেষে কিতাবের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হয়েছি। আর বুড়ি মহিলার নিরাপদ দীন গ্রহণের যে কথা বলা হলো তা এ জন্য যে, মুতাকাল্লিম শাস্ত্রের বোদ্ধারা নিজেদের বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনার এতো প্রান্তসীমায় আরোহণ করে, যেখানে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিতে গিয়ে আকল তথা বিবেক-বুদ্ধি ও বোধশক্তি থমকে যায়। সুতরাং শরিয়তের বিধি-বিধানে বিনা বাক্যব্যয়ে মনোযোগী হবে এবং হেতুর সন্ধানে পড়বে না। বুদ্ধি যখন এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে যে, তার চেয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা হেকমত ও প্রজ্ঞা অনেক ঊর্ধ্বে, তখন সে নির্দ্বিধায় আল্লাহর নির্দেশের কাছে অবনত হতে বাধ্য। আল্লাহ তায়ালার পবিত্র সত্তা অবিনশ্বর গুণে গুণান্বিত। তিনি কারও মুখোপেক্ষী নন। তাঁর সত্তা একক। তার কোনো বাড়তি বা সহায়ক শক্তির প্রয়োজন নেই।
টিকাঃ
১. সুরা যুখরুফ: আয়াত ২২
২. সুরা সাফফাত: আয়াত ৬৯-৭০
১. কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ যখন প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় এবং তার অনুসারীরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন এমন লোকেরাও স্বার্থ হাসিলের অভিপ্রায়ে সেই ধর্মের বা মতাদর্শের অনুসারীদের সঙ্গে ভিড়ে যায় যারা সেই ধর্মে বা মতাদর্শে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে না। এই ধরনের স্বার্থবাদীরা ক্রমে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দখলের চেষ্টা করে।
📄 উম্মতে মুহাম্মদির আকিদা-বিশ্বাসে শয়তানের ধোঁকা
উম্মতের কিছু লোক কুরআন ও হাদিসের বাহ্যিক দিককে গ্রহণ করেছে এবং তাদের স্পর্শ ও অনুধাবনশক্তির নিরিখে তা মূল্যায়ন করতে থাকে। কারো কারো মতে, আল্লাহ তায়ালা একটি শরীরের নাম। এটা হিশাম ইবনুল হিকাম, আলাম ইবনে মনসুর, মুহাম্মাদ ইবনুল খলিল ও ইউনুস ইবনে আবদুর রহমানের মাযহাব। অতঃপর তাদের মধ্যে পরস্পর মতানৈক্য দেখা দেয়। কেউ বলে সেই শরীর অন্যান্য শরীরের অনুরূপ। কেউ বলল, না; বরং তা অন্যান্য শরীরের মতো নয়। তারপর আল্লাহর শরীর যদি অন্যান্য শরীরের অনুরূপ না হয় তাহলে কার শরীরের মতো? এখানেও মতানৈক্য দেখা দেয়। কারও মতে, সেটা হচ্ছে 'নূর'। কেউ বলেছে, তা সাদা রুপার মতো। এটা হিশাম ইবনুল হিকামের অভিমত। তিনি বলেন, তিনি তার আয়তনের সাতগুণ বড়। তার দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা 'তাহতুসসারা' পর্যন্ত সমুদয় বস্তুতে বেষ্টিত এবং তিনি সবকিছু দেখছেন।
আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি জাহিয থেকে, তিনি নিজাম থেকে বর্ণনা করেছেন, হিশাম ইবনুল হিকাম প্রতি বছর পাঁচটি করে মতবাদ বের করতেন। শেষে তিনি যে মতবাদে স্থির হন তা হচ্ছে, আল্লাহ তাঁর স্বীয় ব্যপ্তির সাতগুণ বড়। একদল বলে, তিনি রুপার মতো। কেউ বলেছে, তিনি একটি বলের মতো গোলাকার। যেদিক থেকেই দেখা যাক একই রকম তার আকৃতি। হিশাম বলেন, তার সত্তা সীমিত ও পরিমাপযোগ্য। এমনকি তার চেয়ে ঘোড়াকে বড় বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, তার আসল স্বরূপ ও আকৃতি সম্পর্কে তিনিই অবগত।
গ্রন্থকার বলেন, আকৃতি বলার কারণে বোঝা যাচ্ছে তাঁর পরিমাপ ও পরিমাণও আছে। যদি কেউ এমন দাবি করে তাহলে সে তো তাওহিদের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন করল। কারণ এটা জানা কথা—বস্তু সত্তা হলেই তা পরিমাপযোগ্য হয়। এর বহু সাদৃশ্য ও উপমা রয়েছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বস্তু নন। তার কোনো সাদৃশ্য ও উপমা নেই। তার গুণ ইচ্ছার সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়। সুতরাং মানতে হবে, তার শরীর নেই, জাওহার নেই—যা সীমার গণ্ডিতে আবদ্ধ। নাওবখতি রহ. বর্ণনা করেছেন, মুকাতিল ইবনে সুলাইমান, নুয়াইম ইবনে হাম্মাদ ও দাউদ আলহাওয়ারীও বলে থাকে যে, আল্লাহ তায়ালার আকার ও অঙ্গ আছে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, তোমরা দেখে আসছে, এরা কীভাবে আল্লাহ তায়ালাকে অবিনশ্বর প্রমাণ করছে এবং তা মানুষের জন্য বলছে না। রোগ-শোক ইত্যাদি যা মানুষের জন্য সম্ভব তা আল্লাহর জন্য সম্ভব মনে করছে না। অতঃপর এদের প্রত্যেকে যারা আল্লাহর শরীর থাকার দাবি করে আসছে, তাদের যদি বলা হয় তোমরা কোন্ দলিলের ভিত্তিতে শরীর নশ্বর হওয়া সাব্যস্ত করো? এর পরিণতি কী হবে? শেষে তারা বলতে বাধ্য হয়ে পড়বে, যে মাবুদের জন্য তার শরীর হওয়া সাব্যস্ত করা হচ্ছে তিনি নশ্বর; অবিনশ্বর নন। মুজাসসিমা সম্প্রদায়ের একটি অভিমত হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালাকে ছোঁয়া যায়। তাদের কথামতো তো বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালার সাথে কোলাকুলিও করা যেতে পারে! মুজাসসিমারা আরো বলে, আল্লাহর শরীর শূন্য। (যেমন আকাশ ও মাটির মাঝখানের শূন্যভূমি)। আর জগতের সকল শরীর তার মাঝে অবস্থিত। বায়ান ইবনে সামআন ইবনে ইমরান বলতেন, তার মাবুদ সম্পূর্ণ নূর এবং তিনি একজন পুরুষের আকৃতিতে রয়েছেন। তিনি চেহারা ছাড়া তার সমুদয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধ্বংস করে দিতে পারেন। তাকে খালিদ ইবনে আবদুল্লাহ খুন করে।
মুগিরা ইবনে সাআদ আলআজলী বলতেন, তার মাবুদ একজন নূরানী পুরুষ। যার মাথার ওপর রয়েছে নূরের একটি তাজ। রয়েছে তার শরীরও। তার অন্তর থেকে ঝর্ণার মতো হেকমত গড়িয়ে পড়ে।
উপরোক্ত মতটি ব্যক্ত করতেন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাসান ইবনে হাসান। যারাহ ইবনে আ'ইয়ুন কুফি বলতেন, শুরুতে আল্লাহ তায়ালার জ্ঞান, ক্ষমতা ও জীবনের গুণ ছিল না। পরে তিনি নিজের জন্য গুণগুলো সৃষ্টি করে নেন। দাউদ আলহাওয়ারী বলেন, তিনি শরীরসর্বস্ব। তার গোস্ত ও রক্ত আছে। আছে অস্থি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তার মুখ থেকে সিনা পর্যন্ত ফাঁপা আর শরীরের বাকি অংশ কঠিন।
মোটকথা, যারা আল্লাহ তায়ালাকে স্পর্শ ও অনুভূতিযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করছে, তাদের কেউ কেউ মনে করে তিনি তাঁর আরশে বসে আছেন। আর সেখান থেকে বের হলে তিনি আরশ ছেড়ে বের হন এবং নড়াচড়া করেন। তারা আল্লাহর সত্তাকে একটি পরিমাপযোগ্য সীমারেখায় আবদ্ধ বলে মনে করেছে। তারা প্রমাণস্বরূপ বলে থাকে-
يَنْزِلُ اللَّهُ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا
“আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন।” তাদের যুক্তি- অবতরণ সে-ই করতে পারে যিনি উপরে অবস্থান করছেন। তারা অবতরণকে অনুভবযোগ্য বিষয়ের সাথে তুলনা করছে, যা দ্বারা তার শরীরের বর্ণনা আবিষ্কার করা হয়েছে। এই 'মুশাব্বাহ' গোষ্ঠীটি আল্লাহ তায়ালার সিফাতকে অনুভব ও অনুধাবনযোগ্য বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করে থাকে। আমি এদের অধিকাংশ মতবাদের জবাব 'মিনহাজুল উসুল ইলা ইলমিল উসূল' গ্রন্থে উল্লেখ করেছি।
মুশাব্বাহ্ সম্প্রদায়ের কিছু লোক কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালার দিদারকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন সে সম্মুখে উপস্থিত বিশেষ একজন ব্যক্তিকে দেখছে। হাদিসের বাণী-"আল্লাহ তায়ালা মুমিন বান্দাকে নিজের দিকে ডাকবেন”-ব্যস, এটুকু শুনে তারা এটাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের এই অজ্ঞতা প্রকাশের কারণ হচ্ছে তারা আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তাদের কেউ কেউ বলে, আল্লাহ তায়ালার চেহারা আছে। আর এটাকে তারা আল্লাহর সত্তা ও সিফাত থেকে পৃথক মনে করে। প্রমাণস্বরূপ এ আয়াতটি উপস্থাপন করে- وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرامِ) ‘এবং তোমার মহীয়ান ও দয়াবান রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে'।' তারা আল্লাহ তায়ালার জন্য হাত ও আঙ্গুলও সাব্যস্ত করে। কেননা হাদিসে এসেছে-يَضِعُ السَّموات على أَصْبَع ‘আল্লাহ আকাশমণ্ডলী তাঁর আঙ্গুলে রাখবেন।” তারা আল্লাহর পা আছে বলেও দাবি করে। এভাবে অন্যান্য অঙ্গের কথাও প্রমাণ করে, যার উল্লেখ হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে। অর্থাৎ সেগুলো থেকে তারা মনগড়া মতবাদ সৃষ্টি করেছে। অথচ বিশুদ্ধ ও বাঞ্ছিত পন্থা ছিল, তারা যেন আয়াত ও হাদিসগুলো পড়ে এবং এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের অনুভব ও অনুধাবন ক্ষমতার আলোকে কোনো মতামত না দেয়। শেষে তাদেরকে কে নিষেধ করল যে, তোমরা চেহারা দ্বারা আল্লাহর সত্তা মেনে নাও। এটাকে অতিরিক্ত সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত কোরো না! এর ভিত্তিতেই অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিরা وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرامِ) অবশিষ্ট থাকবে” দ্বারা উপরোক্ত অর্থই ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ কেবল তোমার রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে। يُرِيدُونَ وَجْهَهُ অর্থাৎ তাকে চায়। আল্লাহ তায়ালার বাণী-
"قُلُوبُ العِبَادِ بَيْنَ إصبعين" তাঁর দুই আঙ্গুলে বান্দার কলব" দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আঙ্গুল দ্বারা যেহেতু কোনো বস্তুকে পাল্টে দেয়া হয়, আর যে বস্তু দুই আঙ্গুলের মাঝে থাকবে, আঙ্গুলওয়ালা যেভাবে চাইবেন সেভাবে তাকে ব্যবহার করতে পারবেন। এ জন্য এ শব্দটি উল্লেখ করেছেন। এটি তার কোনো বাড়তি সিফাত নয়।
গ্রন্থকার বলেন, আমার মতে এমন ব্যাখ্যা থেকেও চুপ থাকা উচিত। যদিও হতে পারে এ ব্যাখ্যাটিই উদ্দেশ্য। আর তার এমন সত্তা যার বিভিন্ন অংশ বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছে—এমন বলা বৈধ নয়।
জাহেরিয়াদের সবচেয়ে আশ্চর্য অবস্থার মধ্যে এটি একটি যে, সালেমিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা বলে থাকে, কবরের মধ্যে মৃত ব্যক্তি পানাহার ও বিয়ে-শাদি করে। এমন ধারণার নেপথ্যে কারণ হচ্ছে, তারা শুনেছে, নেককার ব্যক্তিদের জন্য কবরে বহু নেয়ামত রয়েছে। এ সব লোক যদি কেবল এটুকুতে বিশ্বাস করত যেটুকু হাদিসে এসেছে—
"মুমিনের রুহসমূহ পাখির ডানায় রাখা হয় এবং এরা জান্নাতের বৃক্ষ হতে আহার করে থাকে।” তাহলে তারা এই নিকৃষ্ট আকিদা হতে বাঁচতে পারত। কিন্তু এর সাথে তারা শরীরকেও মিলিয়ে ফেলেছে।
ইবনে আকিল রহ. বলেন, এই মাযহাবের মাঝে সেই ব্যাধি বিদ্যমান, যা জাহেলি জমানার লোকদের মাঝে ছিল। হাম ও সুদ্দার ব্যাপারে জাহেলি জমানার লোকজন যেমন বলত, তাদের কথাও তেমন। এ সকল লোকদের সাথে মুনাজারা ও বিতর্ক করা উচিত, যাতে জাহেলি জমানার কুসংস্কার সম্পর্কে অবগত হয়ে তা থেকে বিরত থাকার প্রয়াস পাওয়া যায়। এদের সাথে রাগ করে বিরোধিতা করা উচিত নয়। কেননা এতে তারা বিগড়ে যেতে পারে। ইবলিস এদের ওপর এমন স্থূলভাবে ফাঁদ পেতেছে যে, তারা শরিয়তসম্মত ও বিবেকসিদ্ধ আলোচনা ছেড়ে দিয়েছে। যেহেতু মৃত ব্যক্তির জন্য শান্তি বা শাস্তির ব্যবস্থার কথা এসেছে, তো বোঝা গেল কবর বা শরীরের দিকে সাব্যস্ত করে কেবল এ জন্য বয়ান করা হয়েছে, যাতে মৃত ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায়। যেন এমন বলেছেন, কবরে দাফনকৃত ব্যক্তি এবং সেই রুহ যা তার শরীরে ছিল, তা জান্নাতের নেয়ামত দ্বারা আরাম ভোগ করছে কিংবা জাহান্নামের শাস্তি দ্বারা কষ্ট ভোগ করছে।
গ্রন্থকার বলেন, যদি প্রশ্ন করা হয়, তোমরা বিশ্বাসের ব্যাপারে অনুসরণকারীদের ওপরও দোষ চাপিয়ে দিচ্ছ, আবার অপাত্রে মুতাকাল্লিমদের ওপর দোষ দিচ্ছ। এখন বলো এক্ষেত্রে ইবলিসের কুমন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার পন্থা কী? এর সহজ উত্তর হচ্ছে সেটা, যার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম অটল ছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা ঈমান এনেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা হক। তাঁর সমুদয় সিফাত, যা কুরআন ও হাদিসে এসেছে তা হক। আমরা এর কোনো অর্থ বিগড়াতে পারি না। অপাত্রে পর্যালোচনা করে এমন বিষয়ের মানুষের বোধশক্তি বহির্ভূত কোনো বিষয়ের অবতারণা করা যাবে না। হজরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর কসম! আমি কোনো মাখলুককে নিজের এবং মুয়াবিয়া রা.-এর মাঝে বিচারক সাব্যস্ত করিনি; বরং কুরআনকে বিচারক সাব্যস্ত করেছি। (আর কুরআন মাখলুক নয়)। আরও বিশ্বাস করতে হবে যে, এরপরও কুরআনকে শোনা হয়। প্রমাণ- حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّه “যদি কোনো মুশরিক আশ্রয় চায়, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহর কালাম শোনে।”” আল্লাহর কালাম আসমানী গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, فِي رَقٌّ مَّنشُورٍ 'যা সূক্ষ্ম চামড়ার ওপর লিখিত'।' জাগতিক চামড়ার সাথে এর কোনো তুলনা করা চলে না। এর কোনো উপমা উপস্থাপন অসম্ভব বলে বিশ্বাস করতে হবে। এর তাফসীরে নিজের মনগড়া কোনো মতামত দেয়া যাবে না।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এ ব্যাপারে নিষেধ করে বলতেন, তোমরা কুরআনের সাথে নিজের কথাকে মাখলুক বা গাইরে মাখলুক বলো না। এতে সালফে সালেহীনের অনুসরণ থেকে ছিটকে পড়বে। আর এখন! এমন লোকদের দেখে আশ্চর্য লাগে যারা কোনো ইমামের অনুসরণ করে আবার এ জাতীয় বদয়ী মাসআলার ব্যাপারে কথা বলে।
আমর ইবনে দিনার রহ. হতে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন নয়জন সাহাবিকে দেখেছি, যারা বলতেন, যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলে আখ্যায়িত করবে সে কাফের। ইমাম মালেক ইবনে আনাস রহ. বলেন, যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলবে, তাকে তাওবা করাতে হবে। যদি সে তাওবা করে তাহলে তো ভালো। আর যদি তাওবা না করে তবে তাকে কতল করা হবে।
জাফর ইবনে বুরকান বলেন, উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. এর কাছে জনৈক বিদয়াতি ব্যক্তি কিছু বলতে চাইলে তিনি তাকে বলেন, তোমার জন্য আকিদার ওপর এমনভাবে দৃঢ় হওয়া আবশ্যক, যেমন মকতবের বালক ও গ্রামের সাধারণ লোক হয়ে থাকে। আর সেই দিন থেকে বাকি দিনের ব্যাপারে গাফেল হয়ে যাও। উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা যখন দেখবে, কোনো দল সাধারণ মানুষের আড়ালে দীনের ব্যাপারে গোপন কোনো পরামর্শ বা কার্যক্রম চালাচ্ছে, তখন জেনে নেবে এরা কোনো ভ্রষ্ট পথের ভিত গড়ার চিন্তা-ভাবনা করছে।
সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন, আমার কাছে হজরত উমর রা. এর এই উক্তি পৌঁছেছে, তিনি তাঁর কিছু কর্মকর্তাকে লিখে পাঠিয়েছেন, আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুন্নাতের অনুসরণ করো। যে সব বিদয়াত পরবর্তী লোকেরা আবিষ্কার করেছে তা থেকে দূরে থাকো। তোমরা জেনে রাখো, যে সুন্নাতের ইলম সম্পর্কে অবগত, সে খুব ভালোভাবে জানে সুন্নাতের বিরোধিতা ও এর ভেতর বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি করার দ্বারা কী ধরনের ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার মুখে পতিত হতে হয়। পূর্ববর্তী মনীষীগণ ইলম ও মারেফত থাকা সত্ত্বেও চুপ থেকেছেন। অন্য বর্ণনায় আছে, উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. বলেছেন, পূর্ববর্তী মনীষীরা এ সব ব্যাপার খোলাসা ও ব্যাখ্যা দেয়ার ব্যাপারে অধিক যোগ্য ছিলেন। যে ব্যক্তি কোনো বিদয়াত আবিষ্কার করল, সে ওই ব্যক্তি হবে যে তার বাতানো পথ ছেড়ে অন্য পথ অবলম্বন করেছে এবং নিজেই তার পথে বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছে। সুন্নাতে অবহেলা করে অনেকে নিজের ওপর জুলুম করেছে। অন্যদিকে বহু লোক এতে বাড়াবাড়ি করে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।
সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন, তোমাদের জন্য ঘরের মহিলা এবং মকতবের বালকদের মতো আকিদা ও একিনেও অটল থাকা আবশ্যক। তারা বলে, ঈমান মুখে স্বীকার করা এবং আমল করার নাম।
গ্রন্থকার বলেন, যদি কেউ বলে, এটা তো স্বল্পবুদ্ধি ও দুর্বল লোকদের কাজ, পুরুষের কাজ নয়। উত্তরে আমরা বলব, আমরা শুরুতে এটা লিখে দিয়েছি এবং বলে দিয়েছি যে, আমলের ওপর স্থির থাকা আবশ্যক। কেননা যে সকল মুকাতাকাল্লিম সমুদ্রে সাঁতার কেটে ডুবে গেছেন, তারা কখনো এর প্রান্তসীমায় পৌঁছতে পারেননি, যা দ্বারা পিপাসার্তের তৃষ্ণা নিবারণ হয়। এ জন্য তিনি সবাইকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, তীরে অবস্থান করো। আমরা সে কথাই উল্লেখ করে এসেছি।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১১৪৫
১. সুরা আররাহমান: আয়াত ২৭
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৭৪১৪
৩. সুরা আররাহমান: আয়াত ২৭
৪. সুরা আনআম: আয়াত ৫২
৫. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৬৭৫০
৬. সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ১৪৪৯
১. সুরা তাওবাহ: আয়াত ৬
২. সুরা তৃর: আয়াত ৩
📄 খারেজিদের ওপর ইবলিসের ফাঁদ
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, খারেজি সম্প্রদায়ের সর্বপ্রথম ও সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তিটির নাম জুলখুয়াইসারা। আবু সাঈদ রা. হতে বর্ণিত, আলী রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ইয়ামেন থেকে কিছু স্বর্ণের টুকরো পাঠালেন যা মাটি মোড়ানো ছিল। তিনি তা চার ব্যক্তির মাঝে বণ্টন করে দিলেন। (১) আকরা ইবনে হাবিস (২) উআইনা ইবনে হাসান। (৩) যায়দ তায়ি, যিনি পরে বনি নাবহান গোত্রের ছিলেন। (৪) আলকামা ইবনে উলাসা। এতে কুরাইশ ও আনসারগণ অসন্তুষ্ট হলেন এবং বলতে লাগলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদবাসী নেতৃবৃন্দকে দিচ্ছেন আর আমাদেরকে দিচ্ছেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তো তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য এমন মনোরঞ্জন করছি। তখন এক ব্যক্তি সামনে এগিয়ে আসল, যার চোখ দু'টি কোটরাগত, গণ্ডদ্বয় ঝুলে পড়া; কপাল উঁচু, ঘন দাড়ি এবং মাথা মোড়ানো ছিল। সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহকে ভয় করুন। তখন তিনি বললেন, আমিই যদি নাফরমানি করি তাহলে আল্লাহর আনুগত্য করবে কে? আল্লাহ আমাকে পৃথিবীবাসীর উপর আমানতদার বানিয়েছেন আর তোমরা আমাকে আমানতদার মনে করছ না। তখন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইল। (আবু সাঈদ রা. বলেন) আমি তাকে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. বলে ধারণা করছি। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন। অতঃপর অভিযোগকারী লোকটি যখন ফিরে গেল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ ব্যক্তির বংশ হতে বা এ ব্যক্তির পরে এমন কিছুসংখ্যক লোক হবে তারা কুরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। দীন হতে তারা এমনভাবে বেরিয়ে পড়বে যেমনি ধনুক হতে তির বেরিয়ে যায়। তারা ইসলামের অনুসারীদেরকে (মুসলিমদেরকে) হত্যা করবে আর মূর্তিপূজারিদেরকে হত্যা করা হতে বাদ দেবে। আমি যদি তাদের পেতাম তাহলে তাদেরকে আদ জাতির মতো অবশ্যই হত্যা করতাম।'
গ্রন্থকার বলেন, এমন শিষ্টাচারবহির্ভূত ও দাম্ভিক আচরণকারীর নাম জুলখুয়াইসারা তামিমি। অন্য এক বর্ণনায় আছে, সে এসে বলল, ইনসাফ করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আরে তোমার ধ্বংস হোক, আমিও যদিই ইনসাফ না করি আর কে ইনসাফ করবে?’
গ্রন্থকার বলেন, দীন ইসলামে এ ব্যক্তিই প্রথম খারেজি ছিল। নিজের রায়কে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সে নিজের ধ্বংস ডেকে এনেছে। কিছুটা ধৈর্য ধারণ করলে সে বুঝে নিতে পারত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বড় রায় আর কারও হতে পারে না। এই খারেজির অনুসারীরা আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। এর ঘটনা হচ্ছে, হজরত আলী রা. ও হজরত মুয়াবিয়া রা. এর মাঝে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করলে মুয়াবিয়া রা. এর অনুসারীগণ কুরআন মাজিদ উপরে তুলে ধরে আলী রা. এর অনুসারীদেরকে আহ্বান করলেন এই শর্তে যে, যা কিছু এই কুরআনে রয়েছে এর ওপর আমরা এবং তোমরা সন্তুষ্ট হয়ে যাব। আরও বলা হলো, তোমাদের পক্ষ থেকে একজন পাঠাও, আমাদের পক্ষ থেকেও একজন পাঠাব এবং এদের উভয়ের কাছ এই অঙ্গীকার নেয়া হবে যে, তোমরা আল্লাহর কালাম অনুযায়ী আমল করবে। সবাই সমস্বরে এতে রাজি হলেন।
কথামতো সিরিয়াবাসী হজরত আমর ইবনুল আস রা.-কে পাঠালেন। আর এদিকে ইরাকবাসী হজরত আলী রা.-কে বললেন, আপনি হজরত আবু মুসা আশয়ারী রা.-কে পাঠান। হজরত আলী রা. বললেন, আবু মুসা আশয়ারী রা.-কে পাঠানো আমার রায় নয়। কারণ তিনি সবল প্রকৃতির লোক। এখানে ইবনে আব্বাস রা. উপস্থিত আছেন। তাকে কেন পাঠাচ্ছেন না? লোকেরা বলল, আমরা এটা চাই না। কেননা তিনিও আপনার মতো, আপনার নিকটাত্মীয়। শেষে তিনি হজরত আবু মুসা আশয়ারী রা.-কে পাঠালেন। ফয়সালার নির্দেশ রমযান পর্যন্ত দীর্ঘ হলো। উরওয়া ইবনে উযাইনা বললেন, তোমরা আল্লাহর নির্দেশের ব্যাপারে মানুষকে বিচারক বানালে। আল্লাহ তায়ালা তো বলেছেন, إن الحكم إلا لله "বিচার একমাত্র আল্লাহর।” (এই লোক তার অনুসারীদের নিয়ে 'খারিজ' হয়ে গেল অর্থাৎ বেরিয়ে গেল)।
হজরত আলী রা. সিফফীন প্রান্তর হতে ফিরে কুফায় গেলে খারেজিরা তার সাথে কুফায় প্রবেশ করল না; বরং তারা কুফার পার্শ্ববর্তী এলাকা হারুরায় অবস্থান নিল। এভাবে সেখানে বারো হাজার খারেজি সমবেত হলো এবং বলতে লাগল لَا حُكْم إِلَّا للَّهِ 'আল্লাহ ছাড়া কারও বিচার মানি না।' এখান থেকেই খারেজিদের উৎপত্তি। তাদের বাহিনীর আহ্বানকারী বলল, যুদ্ধের সময় শাবিস ইবনে রিবয়ী তামিমি নেতা হিসেবে আছেন। আর নামায পড়াবেন আমাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনুল কুয়া ইয়াশকারী। উল্লেখ্য, খারেজিরা বহু ইবাদত-বন্দেগি করে থাকে। কিন্তু তাদের বিশ্বাস হচ্ছে, তারা হজরত আলী রা. এর চেয়ে আরও বেশি জ্ঞানের অধিকারী। আর এটা তাদের মারাত্মক আত্মঘাতী ব্যাধিতে পরিণত হয়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, খারেজিরা বিদ্রোহ শুরু করলে তারা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সমবেত হতে থাকে। এখানে তাদের সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। সবাই ঐকমত্য পোষণ করল যে, তারা হজরত আলী রা. এর সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। তারা একজন একজন, "দু'জন দু'জন করে এসে এসে হজরত আলী রা.-এর কাছে বলতে লাগল, হে আমিরুল মুমিনীন রা.! এরা সকলে আপনার সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। হজরত আলী রা. বললেন, তাদেরকে ছেড়ে দাও। আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আমার সাথে যুদ্ধ না করে। তারা অচিরেই এমনটি করবে। অতঃপর একদিন জোহরের নামাযের প্রাক্কালে আমি তাঁর খেদমতে আরয করে বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন! আজ জোহরের নামায সামান্য শীতল হওয়া পর্যন্ত দেরি করুন। আমার ইচ্ছা, খারেজি গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করি। তিনি বললেন, আমি তো এখন তাদের থেকে তোমার ব্যাপারে অধিক ভয় করছি। আমি বললাম, জি না। আপনি আমার ওপর এমন ভয় করবেন না। আমি একজন সচ্চরিত্র ব্যক্তি। কাউকে কষ্ট দিতে চাই না। অবশেষে তিনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি তাদের কাছে পৌঁছি। তখন ছিল দুপুর বেলা। সেখানে আমি এমন লোকজনের দেখা পেলাম, যাদের থেকে অধিক ইবাদতকারী কাউকে দেখিনি। তাদের কপালে সিজদার আধিক্যের কারণে আঘাতের চিহ্ন পড়ে গিয়েছিল। তাদের হাত যেন উটের হাত। (মাটিতে সিজদা দেয়ার কারণে ধুলোয় ধূসরিত হয়ে পড়েছিল)। তাদের শরীরে ছিল অনুন্নত জামা। তাদের লুঙ্গিগুলো টাখনুর চেয়ে বহু উপরে উঠানো ছিল। রাত জেগে ইবাদতের ফলে তাদের চেহারা শুষ্ক হয়ে যায়।
আমি তাদেরকে সালাম দিলে তারা বলল, মারহাবা! ইবনে আব্বাস রা.! আপনি এমন সময়ে কী উদ্দেশ্য নিয়ে এলেন? আমি বললাম, আমি তোমাদের কাছে মুহাজির ও আনসারদের পক্ষ থেকে এসেছি এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামাতার পক্ষ থেকে এসেছি। তাঁদের ওপর কুরআন অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা তোমাদের থেকে ভালো কুরআন বোঝেন। আমার কথাবার্তা শুনে তাদের দলের একজন বলে উঠল, (সে কুরাইশের অন্তর্ভুক্ত) তুমি কুরাইশের পক্ষ থেকে মুনাযারা কোরো না। কেননা আল্লাহ তায়ালা কুরাইশদের ব্যাপারে বলেছেন, بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ “তারা ঝগড়াটে জাতি।” অতঃপর তাদের মধ্য থেকে দু-তিন ব্যক্তি বলল, না, আমরা মুবাহাসা ও বিতর্ক করব। আমি বললাম, তোমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামাতা এবং মুহাজির ও আনসারদের ওপর উত্থাপিত অভিযোগগুলো উপস্থাপন করো। অথচ তাঁদের ওপরই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁরা কুরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা তোমাদের চেয়ে বেশি বোঝেন। খারেজিরা বলল, আমাদের ৩টি প্রশ্ন আছে। আমি বললাম, ঠিক আছে, তা বলো। তারা বলল, ১. আলী আল্লাহর ব্যাপারে মানুষকে সালিশ (বিচারক) নির্ধারণ করেছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا اللَّهِ "বিচার একমাত্র আল্লাহর।”” আল্লাহর এ ঘোষণার পর মানুষ কীভাবে বিচার করতে পারে? আমি বললাম, এটা একটা গেল। তারপর? তারা বলল-২. আলী মানুষের সাথে যুদ্ধ করেছেন। অথচ তিনি বিরোধী পক্ষের লোকজনকে দাস-দাসী বানাননি এবং তাদের ধন-সম্পদ গনিমতের সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করেননি। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, যাদের সাথে যুদ্ধ করা হয়েছে, তারা যেহেতু মুসলমান, তাই তাদের সম্পদ হালাল নয় এবং তাদেরকে দাস-দাসী হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। ৩. তাদের তৃতীয় অভিযোগ- আলী সালিশী ফয়সালা লেখানোর সময় 'আমিরুল মুমিনীন' উপাধী নিজের নাম থেকে মিটিয়ে দেন। সুতরাং তিনি আমিরুল মুমিনীন না হয়ে আমিরুল কাফিরীন হয়ে গেলেন। অর্থাৎ কাফেরদের নেতা।
আমি বললাম, এগুলো ছাড়া আর কোনো অভিযোগ আছে? খারেজিরা বলল, এ অভিযোগগুলোই যথেষ্ট। আমি বললাম, তোমার প্রথম অভিযোগ হচ্ছে, আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে আলী রা. মানুষকে বিচারক সাব্যস্ত করেছে। আচ্ছা, আমি যদি তোমাদেরকে আল্লাহর কালাম থেকে এমন আয়াত তেলাওয়াত করে শোনাই, যা দ্বারা তোমাদের অভিযোগ খণ্ডন হয়ে যায়, তাহলে কি তোমরা তোমাদের কথা থেকে ফিরে এসে তাওবা করবে? তারা বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, আল্লাহ তায়ালা একচতুর্থাংশ মূল্যমানের একটি খরগোশের ব্যাপারে দুই ব্যক্তির বিচারের ওপর তার ফয়সালা সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। আমি এ আয়াত পড়লাম- لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ 'ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার কোরো না।' অর্থাৎ এহরাম অবস্থায় শিকারকে খুন করতে নিষেধ করেছেন। যদি কেউ অন্যায় করে ফেলে, যেমন- একটি খরগোশ হত্যা করল, তখন বলেছেন, তোমরা দু'জন ন্যায় বিচারক পুরুষকে পশু হত্যার স্থলে নিয়ে গিয়ে তার মূল্যের ফয়সালা করবে।
অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালা নারী এবং তার স্বামীর ব্যাপারে বলেছেন, وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِما فَابْعَثُوا حَكَما مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَما مِنْ أَهْلِهَا “স্বামীর ভাইদের মধ্য থেকে একজন পুরুষ এবং স্ত্রীর ভাইদের পক্ষ থেকে একজন পুরুষ পাঠাও। তারা উভয়ে এ ব্যাপারে বিচার করবে।”
এখন তোমাদেরকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, নিজেদের আত্মঘাতী পরিস্থিতিতে এবং রক্তারক্তি থেকে বিরত থাকতে পুরুষকে বিচারক সাব্যস্ত করা উত্তম নাকি একটি খরগোশের ব্যাপারে বা একজন নারীর ব্যাপারে পুরুষকে বিচারক সাব্যস্ত করা উত্তম? খারেজিরা বলল, হ্যাঁ।
আমি বললাম, তোমাদের দ্বিতীয় অভিযোগ- আলী রা. যুদ্ধ করেছেন অথচ বন্দি এবং গনিমত নেননি। আমি তোমাদের কাছে জানতে চাই, তোমরা কি উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়শা রা.-কে বাঁদি বানাতে চাও? আল্লাহর কসম! তোমরা যদি বলো, তিনি তোমাদের মা নন, তাহলে তোমরা ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেলে। আল্লাহর কসম! তোমরা যদি বলো, তাঁকে বাঁদি হিসেবে গ্রহণ করে তাঁকে অন্য নারীদের মতো বৈধ মনে করা হবে, তখনও তোমরা ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। তোমরা দু'টি ভ্রান্তির মাঝামাঝি পতিত হয়েছ। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
النَّبِيُّ أَولَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْواجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ
“মুমিনদের কাছে তাদের প্রাণের চেয়ে তাদের নবী অধিক প্রিয় এবং নবীর সহধর্মিণীবৃন্দ মুমিনদের মা হন।” তারপরও যদি তোমরা বলো যে, তিনি তোমাদের মা নন; তাহলে তোমরা ইসলাম থেকে বের (খারিজ) হয়ে গেলে। তারা বলল, জি হ্যাঁ। আমি বললাম, তোমাদের তৃতীয় অভিযোগ- 'আমিরুল মুমিনীন' শব্দ তার নাম থেকে মিটিয়ে দেয়া হয়েছে। তাহলে আমি তোমাদের কাছে এমন ন্যায়পরায়ণ বিচারক সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করছি, যাকে তোমরা মান্য করো। হুদাইবিয়ার সন্ধিকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের নেতা আবু সুফিয়ান সাখার ইবনে হারব ও সুহাইল ইবনে আমর প্রমুখের সাথে চুক্তিনামা লিখিয়েছিলেন এবং আলী রা.-কে বলেছেন, লেখো- هذا ما اصطلح عليه محمد رسول الله "এটি চুক্তিনামা। যা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এবং...।" মুশরিকরা বলল, আল্লাহর কসম! আমরা তো জানি না যে, তুমি আল্লাহর রাসুল। আমরা যদি তোমাকে আল্লাহর রাসুল হওয়ার ব্যাপারে মানতাম, তাহলে তোমার সাথে যুদ্ধ করতাম না। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ أَنِّي رَسُوْلُ اللَّهِ 'হে আল্লাহ! নিশ্চয় আপনি জানেন, আমি আল্লাহর রাসূল।' অতপর বললেন, হে আলী! এটা মুছে দাও। এভাবে লেখো- هذا ما اصطلح عليه محمد بن عبد الله "এটি চুক্তিনামা। যা মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে...।""
এখন তোমরা দেখো- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা. থেকে উত্তম। তিনি رسول الله শব্দটি মুছে দিয়েছিলেন। অথচ এ দ্বারা তিনি আল্লাহর রাসুল হওয়া থেকে বের হয়ে যাননি।'
ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, এই কথোপকথনের আলোকে দুই হাজার মানুষ তাওবা করে ফিরে এসেছে। আর অবশিষ্টরা নিজেদের ভ্রষ্ট পথের অনুসারী হয়ে মারা গেছে।
জুনদুব আলইজদী রা. বলেন, হজরত আলী রা.-এর সাথে আমরা খারেজিদের সাথে লড়াই করতে এসে তাদের সৈন্যবাহিনীর কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম, সেখান থেকে মধু-মক্ষিকার বাসার মতো গুনগুন শব্দে তাদের কুরআন তেলাওয়াতের শব্দ বের হচ্ছে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, আরেকটি বর্ণনায় আছে, হজরত আলী রা. সালিশী ফয়সালা বানালে খারেজিদের মধ্য থেকে যুরআ ইবনুল বারাজ আত্তায়ী এবং হারকুস ইবনে যুহাইর আস্সাদী- এরা উভয়ে হজরত আলী রা. এর কাছে এসে বলল, لا حكم إلا لله "বিচার একমাত্র আল্লাহর।” হজরত আলী রা. বললেন, হ্যাঁ, لا حكم إلا لله "বিচার একমাত্র আল্লাহর।” হারকুস বলল, আপনি আপনার গুনাহ থেকে তাওবা করুন এবং সালিশনামা থেকে ফিরে আসুন। আমাদেরকে নিয়ে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন। আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করব। এভাবে আমাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিত হব। এর বিপরীতে আপনি যদি এসব লোকের ফয়সালা ছেড়ে না আসেন এবং আল্লাহর কিতাব দ্বারা বিচার না করেন, তাহলে আমরা একমাত্র আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। অতঃপর তারা খারেজি আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব আররাসিবীর ঘরে সমবেত হলো। সে আল্লাহর হামদ ও সানা পড়ার পর বলল, যারা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে আর কুরআন মতে আমল করে, তাদের জন্য জাগতিক কারণে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ছেড়ে দেয়া কিছুতেই শোভা পায় না। এখন আমরা-তোমরা সকলে মিলে চলো রুখে দাঁড়াই। অবশেষে ফয়সালার পর হজরত আলী রা. তাদের উদ্দেশে লিখলেন- "পর সমাচার, এরা দুই ব্যক্তি যাদেরকে উভয় পক্ষের সন্তুষ্টিতে ফয়সালাকারী বানানো হয়েছিল, তাঁরা আল্লাহর কিতাবের বিপরীত করেছেন এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছেন। এখনকার অবস্থা আগের মতো বহাল।” খারেজিরা উত্তরে লিখল, আপনি স্বীয় প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য এমন করেননি; বরং আপনার নিজের পক্ষ থেকে ক্রোধান্বিত অবস্থায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন আপনি যদি নিজে নিজেকে সাক্ষী দিয়ে বলেন, আপনি কাফের হয়ে গেছেন এবং নতুনভাবে তাওবা করেন, তাহলে আমরা আমাদের এবং আপনার ব্যাপারে চিন্তা করে দেখতে পারি। অন্যথায় আমরা আপনার সাথে যুদ্ধ করার ঘোষণা দিয়ে রাখলাম।
একবার খারেজিরা রাস্তায় চলার সময় আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাব রহ. এর সাক্ষাত হলো। তারা আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করে বলল, তুমি তোমার বাবার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে যে হাদিস শুনেছ তা আমাদের বলো। আবদুল্লাহ বলল- হ্যাঁ, আমি আমার পিতার কাছে শুনেছি, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ফিতনার পূর্বাভাস দিয়েছেন, যেখানে বসে থাকা লোক দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের চেয়ে উত্তম হবে, আর দাঁড়িয়ে থাকা লোক চলন্ত লোক অপেক্ষা উত্তম হবে, আর চলন্ত লোক দৌড়ছে- এমন লোকদের চেয়ে উত্তম হবে। তুমি যদি এমন যুগ পাও, তবে তোমার জন্য বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া উত্তম হবে।
খারেজিরা বলল, এটা তোমার পিতা থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস হিসেবে তুমি শুনেছ? আবদুল্লাহ বলল, হ্যাঁ। তারপর খারেজিরা তাকে নদীর তীরে নিয়ে দাঁড় করিয়ে খুন করল। নদীতে তাঁর রক্ত জুতার ফিতার মতো প্রবাহিত হচ্ছিল।
আবদুল্লাহর স্ত্রী ছিলেন গর্ভবতী। খারেজিরা পাশবিকভাবে তার পেট কেটে ফেলে। সামনে গিয়ে একজন জিম্মি খ্রিষ্টানের বাগানে উপনীত হলে তাদের একজন সেই বাগানের নিচে পড়ে থাকা ফল খেতে থাকল। এটা দেখে আরেকজন বলল, বিনা অনুমতিতে এবং মূল্য পরিশোধ না করে অন্যের বাগানের ফল খাচ্ছ? সে তৎক্ষণাত মুখ থেকে ফলটি ছুড়ে মারল। অতঃপর তাদের একজন কোষ থেকে তরবারি বের করল। সম্মুখ দিয়ে একটি শূকরকে হেঁটে যেতে দেখলে, তাকে তরবারির আঘাতে মেরে ফেলল। এটা দেখে আরেকজন বলল, এটা দেশে ফাসাদের সৃষ্টি করবে। অর্থাৎ এটা হারাম। এ কথা শুনে সে শূকরের মালিকের কাছে গিয়ে শূকরের মূল্য পরিশোধ করে তাকে খুশি করে দিল।
আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. খারেজি সম্প্রদায়ের কাছে লোক পাঠিয়ে ঘোষণা দিলেন, আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাবের খুনীকে কেসাসের জন্য আমার কাছে পাঠাও। খারেজিরা উত্তরে বলল, আমরা সকলে মিলে তাকে খুন করেছি। আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. এভাবে তিনবার তাদেরকে এমন আহ্বান জানালে প্রত্যেকবার খারেজিরা একই উত্তর দিতে থাকে। অবশেষে আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. তার সৈন্যবাহিনীকে বললেন, এখন এই গোষ্ঠীর খবর নাও। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব খারেজিকে মেরে ফেলা হলো। (এটা নাহরাওয়ানের ঘটনা)।
লড়াই আরম্ভ হলে খারেজিরা একে অন্যকে ওয়াজ করছিল যে, স্বীয় প্রতিপালকের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও এবং চলো, জান্নাতে চলো। এরা মারা যাওয়ার পর আরও একটি দল খারেজি হতে থাকে। আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী রা. একজন দলপতিকে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে পাঠালে আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম (খারেজি) এবং তার সাথিরা একত্র হয়। তারা তাদের যে ভাই নাহরাওয়ানে মারা গিয়েছিল তার জন্য রহমত পাঠায় এবং বলতে থাকে, দুনিয়ার প্রতি আমাদের আর কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের ভাই মারা গেছে, যিনি আল্লাহর ব্যাপারে কোনো ধরনের অপবাদকে ভয় পেতেন না। এখন আমাদেরও উচিত, আল্লাহর কাছ থেকে প্রাণের বিনিময়ে জান্নাত ক্রয় করা। আমরা এখন সেই সুযোগের অপেক্ষায় আছি। সেই পথভ্রষ্ট শাসকদেরকে অলস পেলেই আমাদের ভাইয়ের রক্তের প্রতিশোধ হিসেবে তাদেরকে আমরা খুন করে আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হিসেবে প্রশান্তি পাব।
মুহাম্মাদ ইবনে সাআদ তাঁর মাশায়েখ থেকে বর্ণনা করেন, খারেজিদের তিনজন নেতা এলাকায় থাকার ইচ্ছে পোষণ করেছিল। তাদের নাম-আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম, বারাক ইবনে আবদুল্লাহ ও আমর ইবনে বকর তামিমি। এই তিনজন মক্কায় (হজের মৌসুমে) একত্র হয়ে পরস্পর অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো, যে করেই হোক তিন ব্যক্তি অর্থাৎ হজরত আলী রা., হজরত মুয়াবিয়া রা. ও হজরত আমর ইবনুল আস রা.-কে খুন করবে। ইবনে মুলজিম বলল, আমি আলীকে খুন করার দায়িত্ব নিলাম। বারাক বলল, আমি মুয়াবিয়াকে খুন করব। আমর বলল, আমি আমর ইবনুল আসকে খুন করব। সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো, কেউ যেন তাদের অঙ্গীকার থেকে ছুটে না আসে। ইবনে মুলজিম কুফায় অবস্থান করল।
গভীর রাত হলে ইবনে মুলজিম আলী রা. এর পথে ওঁৎ পেতে থাকে। তিনি ফজরের নামায পড়ার জন্য মসজিদের দিকে অগ্রসর হলে মরদুদ ইবনে মুলজিম হজরত আলী রা.-কে তরবারি দ্বারা কপালে আঘাত করলে তা মগজে গিয়ে ঠেকে। তিনি চিৎকার দিলে সে আর পালাতে পারেনি। তাকে গ্রেফতার করা হয়। উম্মে কুলসুম (হজরত আলী রা. এর কন্যা) বললেন, হে আল্লাহর দুশমন! আমি আশা করছি, এই যখম দ্বারা হজরত আলী রা. এর কোনো ক্ষতি হবে না। ইবনে মুলজিম বলল, তাহলে তুমি কাঁদছ কেন? পরে আবার বলল, আল্লাহর কসম! আমি এই তরবারি একমাস যাবৎ বিষবিশ্রিত করে রেখেছি। এখনও যদি তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না হয়, তাহলে আল্লাহ তার অমঙ্গল করুন।
হজরত আলী ইন্তেকাল করলে ইবনে মুলজিমকে জেলখানা থেকে খুন করার জন্য বের করা হয়। আবদুল্লাহ ইবনে জাফর তার হাত-পা কেটে ফেললেন। তারপরও সে কোনো প্রতিক্রিয়া (ওহ আহ শব্দ) ব্যক্ত করছে না। কিছু বলছে না। পরে গরম কাঁটা দ্বারা তার চক্ষু সেলাই করে দেয়া হলেও কোনো কথা বলছে না এবং কেবল خَلَقَ اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ،الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ পড়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় তার চক্ষু হতে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অতঃপর তার জিহ্বা কাটার ইচ্ছে করা হলে সে ভয় পেয়ে যায়। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে সে বলল, আমি এটা চাই না যে, দুনিয়াতে আল্লাহর জিকির বিনে আমার এমন এক মুহূর্তও কাটুক। ইবনে মুলজিম ধূসর আকৃতির ব্যক্তি- যার কপালে সিজদার গভীর চিহ্ন ছিল। (তার ওপর আল্লাহর লা'নত পড়ুক)।
গ্রন্থকার বলেন, হজরত হাসান ইবনে আলী রা. হজরত মুয়াবিয়া রা. এর সাথে সমঝোতা করতে চাইলে একজন খারেজিও তাঁর সাথে বের হয় এবং পথিমধ্যে তাঁকে তির নিক্ষেপ করে, এতে হাসান রা. রানে আঘাত পান। খারেজি বলল, তুমিও তোমার পিতার মতো শিরকে লিপ্ত হচ্ছ?
মোটকথা, খারেজিরা সর্বদা ইসলামি নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে 'খারেজ' তথা বের হতে থাকত। এছাড়া এদের রয়েছে বহু মতবাদ।
নাফে' ইবনে আযরাক নামীয় খারেজি এই মতবাদ পোষণ করত যে, আমরা যতক্ষণ মুশরিকের দেশে অবস্থান করব, ততক্ষণ আমরা মুশরিক থাকব। অন্যদিকে মুশরিকের দেশ থেকে বের হলেই আমরা মুমিন হব। তারা মনে করে যারা তাদের বিরোধিতা করে, তারা মুশরিক। কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিও মুশরিক। যুদ্ধক্ষেত্রে যারা আমাদের পাশে থাকবে না তারা কাফির। এই খারেজি সম্প্রদায় মুসলিম শিশু ও নারীদের খুন করা বৈধ মনে করে এবং তাদেরকে মুশরিক বলে আখ্যায়িত করে থাকে। নাজদা বিন আমের সাকাফী এই গ্রুপেরই একজন। সে নাফে' ইবনে আযরাকের সাথে কেবল এটুকু মতভেদ করেছে যে, মুসলমানের প্রাণ ও সম্পদ হারাম। তার দাবি—তাদের সাথে একাত্মতা পোষণকারীদের মধ্যে যারা পাপিষ্ঠ তার জাহান্নামের আগুন ব্যতীত অন্য আগুন দ্বারা সাজাপ্রাপ্ত হবে। জাহান্নামে শুধু তাদের বিরোধিতাকারীরাই নিক্ষিপ্ত হবে।
ইবরাহিম আলখারেজির মতে, (অন্যান্য মুসলমান) জাতি কাফির। আমাদের জন্য তাদের সাথে বিয়ে-শাদী ও মিরাসের সম্পত্তির ভাগ নেয়া বৈধ; যেমন ইসলামের প্রাথমিক যুগে বৈধ ছিল। কোনো কোনো খারেজির মতে, কেউ যদি এতিমের সম্পদ থেকে দু'পয়সা খেয়ে ফেলে তবে তার জন্য জাহান্নামের আগুন ওয়াজিব হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা এতিমের সম্পদ ভক্ষণের ওপর জাহান্নামের অগ্নির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কিন্তু যদি তাকে খুন করে ফেলা হয় বা তার হাত-পা কেটে অথবা পেট কর্তন করে পঙ্গু করে দেয়া হয় তাহলে সে জাহান্নামে যাবে না।
গ্রন্থকার বলেন, খারেজিদের ঘটনা দীর্ঘ। বিস্ময়ে ভরা তাদের মাযহাব। আমি তা উল্লেখ করা অত্যুক্তি মনে করছি। উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল এটুকু যে, ইবলিস কী অদ্ভুতভাবে তাদের ওপর ধোঁকা আর চক্রান্তের জাল বিস্তার করেছে—তার জানান দেয়া। কী অন্যায়ভাবে তারা লড়ে যাচ্ছে। হজরত আলী রা.-এর ব্যাপারে তারা ভুলের অপবাদ দিচ্ছে। অথচ তারা মনে করছে, এরাই সঠিক পথের অনুসারী। তারা শিশুহত্যা বৈধ ভাবছে, আবার মূল্য পরিশোধ করা ছাড়া ফল খেতে সংকোচ করছে। রাত জেগে এবাদত-বন্দেগিতে কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করছে। খুনি পথভ্রষ্ট ইবনে মুলজিম তার জিহ্বা কাটার সময় ভীত হয়ে পড়ে, হায়! জিকির করার বুঝি আর সুযোগ মিলবে না! অথচ সে হজরত আলী রা.-কে খুন করা বৈধ মনে করেছিল। তারা মুসলমানের ওপর অস্ত্র চালিয়েছে। আল্লাহ এ সব কুলাঙ্গারদের খপ্পড় থেকে আমাদের নিস্তার দিন।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ভবিষ্যতে এমন-সব লোকের আগমন ঘটবে, যাদের নামাযের তুলনায় তোমাদের নামাযকে, তাদের রোযার তুলনায় তোমাদের রোযাকে এবং তাদের আমলের তুলনায় তোমাদের আমলকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালির নিচে (অর্থাৎ অন্তরে) প্রবেশ করবে না। এরা দীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনভাবে নিক্ষিপ্ত তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। আর শিকারী সেই তিরের আগা পরীক্ষা করে দেখতে পায়, তাতে কোনো চিহ্ন নেই। সে তিরের ফলার পার্শ্বদেশে নযর করে; অথচ সেখানে কিছু দেখতে পায় না। শেষে ওই ব্যক্তি কোনো কিছু পাওয়ার জন্য তিরের নিম্নভাগে সন্দেহ পোষণ করে।'
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আউফা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, “খারেজিরা জাহান্নামের কুকুর।”
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬১০; সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৬৪
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৬৯৩৩
১. সুরা আনআম: আয়াত ৫৭
২. সুরা যুখরুফ: আয়াত ৫৮
৩. সুরা আনআম: আয়াত ৫৭
১. সুরা নিসা: আয়াত ৩৫
২. সুরা আহযাব: আয়াত ৬
৩. মুসনাদে আহমাদ: ১/৩৪২
১. সহিহ বুখারি: ২৭৩১, ২৭৩২; সহিহ মুসলিম: ১৭৮৩।
২. মুসনাদে আহমাদ: ৫/১১০; তাবারানি ৩৬২৯-৩৬৩০; মুসনাদে আবি ইয়ালা: ৭২১৫; সুনানে আবি দাউদ: ৪২৫৯; সহিহ ইবনে হিব্বান: ১৮৬৯।
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬১০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৬৪
২. মিশকাত: হাদিস নং ৩৫৫৪, ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ১৭৩।
📄 খারেজিদের মতামত
গ্রন্থকার বলেন, খারেজিরা এই আকিদা পোষণ করে যে, ইমাম হওয়া এক ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট নয়। যার ভেতর ইলম ও ইবাদতের সমন্বয় ঘটবে সে ইমাম হবে, যদিও সে অনারব কৃষক হয়। খারেজিদের এই অভিমত থেকে মুতাযিলা গোষ্ঠী এই কথা আবিষ্কার করেছে যে, ভালো-মন্দের বিধান আরোপ করা বিবেক-বুদ্ধির এখতিয়ার। বিবেক যেটাকে সমর্থন দেবে সেটাই ইনসাফ। এভাবে কাদরিয়া সম্প্রদায়ের উৎপত্তি। সে-সময় সাহাবায়ে কেরাম রা. জীবিত ছিলেন। মা'বাদ আলজুহানী, গাইলান দামেস্কী ও জায়াদ ইবনে দিরহাম কাদরিয়া এই মতবাদ পোষণ করতেন। মা'বাদ আলজুহানীর বানোয়াট মতাদর্শের ওপর ওয়াসেল ইবনে আতা ও আমর ইবনে ওবাইদও অটল ছিলেন। সে সময়ই মুরজিয়া সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ঘটে। যাদের মতবাদ হচ্ছে, কাফের থাকা অবস্থায় যেমন কোনো ইবাদত কাজে আসত না, তেমনই ঈমান থাকলে গুনাহ দ্বারা কোনো ক্ষতি হয় না। এরপর মামুন আব্বাসির যুগে মুতাযিলা অনুসারী আবুল হাযিল আল্লাফ, নায্যাম, মা'মার ও জাহেয প্রমুখ লোকেরা দর্শনের বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়ন করে সেখান থেকে জাওহার, আরয, স্থান, কাল ইত্যাদি পরিভাষাকে শরিয়তের বিভিন্ন মাসআলায় মেলাতে থাকে। প্রথমে তারা কুরআন মাজিদ মাখলুক হওয়ার মাসআলা আবিষ্কার করে। সে সময় এই শাস্ত্রের নাম রাখা হয় ইলমে কালাম। এই মাসআলার পাশাপাশি আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহের মাসআলাও তারা আবিষ্কার করে। এক পক্ষ বলে, এ সব মহান আল্লাহর সত্তার ওপর বাড়তি অর্থ বহন করে। মুতাযিলারা এটাকে অস্বীকার করে বলে, তিনি তার সত্তার আলোকেই জ্ঞানী এবং স্বীয় সত্তার আলোকেই ক্ষমতাবান। আবুল হাসান আশয়ারী শুরুতে জুব্বায়ি মুতাযিলা অনুসারী ছিলেন। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে যারা আল্লাহর সিফাতের পক্ষপাতি ছিলেন তাদের দলে চলে আসেন। অতঃপর তারা কোনো কোনো সিফাত সাব্যস্তকারী তা বস্তু হওয়ার আকিদা পোষণ করতে থাকে, কেউবা প্রত্যাবর্তন, উত্তরণ ইত্যাদি অতিরিক্ত গুণের আকিদা পোষণ করতে থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন।