📄 সাহারি সম্প্রদায়ের ওপর শয়তানের নেক সুরতে ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, সাবেয়িনদের উৎস হচ্ছে صبأت থেকে। এটা ওই সময়কে বলা হয়, যখন এক বস্তু আরেক বস্তুতে প্রবেশ করে। صبأت النجوم সময়কে বলা হয় যখন তারকা প্রকাশ হয়। صباً به বলা হয় যখন শিশুর দাঁত ওঠে। الصابئون ওই সকল লোকদের বলা হয় যারা এক ধর্ম থেকে আরেক ধর্মে চলে যায়। সাবেয়ি ধর্মের ব্যাপারে ব্যাপারে দশটি অভিমত রয়েছে।
১. সাবেয়ি-এমন গোত্র যারা অগ্নিপূজারি ও খ্রিষ্টানদের অন্তর্ভুক্ত। এটা সালেম বর্ণনা করেছেন সাঈদ ইবনে যুবাইর থেকে এবং লাইস ইবনে আবি সুলাইম মুজাহিদ থেকে বয়ান করেছেন।
২. তারা ইহুদি অগ্নিপূজারিদের মাঝামাঝি একটি দল। ইবনে আবি নাজীহ মুজাহিদ থেকে এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
৩. তারা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মাঝামাঝি একটি দল। কাসেম ইবনে আবি বাযাহ মুজাহিদ থেকে এ মত ব্যক্ত করেছেন।
৪. তারা খ্রিষ্টানদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তাদের ধর্মমত খ্রিষ্টানদের তুলনায় কিছুটা হালকা। এটা আবু সালেহ বলেছেন ইবনে আব্বাস রা. থেকে।
৫. তারা মুশরিকদের একটি দল। তাদের কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই। এ অভিমতটিও কাসেম মুজাহিদ থেকে উল্লেখ করেছেন।
৬. সাবেয়িরা অগ্নিপূজারিদের মতো। এটা হাসান বসরির অভিমত।
৭. এরা আহলে কিতাবের একটি সম্প্রদায়, যারা যবুর কিতাব পড়ে। এটা আবুল গালিয়ার অভিমত।
৮. এরা সাবেয়ি গোত্রের দিকে ফিরে নামায পড়ে, ফেরেশতাদের উপাসনা করে এবং যবুর কিতাব পড়ে। এটা কাতাদাহ ও মুকাতিলের অভিমত।
৯. এরা আহলে কিতাবদের একটি দল। এটা সিদ্দি'র অভিমত।
১০. এই দলটি কেবল لا اله الا الله বলে, আর কোনো কাজ করে না। না তাদের কোনো গ্রন্থ আছে, না আছে কোনো নবী-রাসুল। শুধু لا إله إلا الله ই বলে থাকে। এই অভিমতটি ব্যক্ত করেছেন ইবনে যায়েদ।
গ্রন্থকার বলেন, এ সব অভিমত হজরত ইবনে আব্বাস রা., কাসেম ও হাসান প্রমুখ তাফসিরকারকগণ হতে বর্ণিত। মুতাকাল্লিমিন তথা তার্কিক আলেমগণ বলেন, সাবেয়িদের ধর্ম বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। কারও মতে, এই পৃথিবী চিরন্তন ও অবিনশ্বর। সৃষ্টিকর্তা এ থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন। অধিকাংশ সাবেয়ির মতে, এ জগৎ অনাদি, এটা সৃষ্টি করা হয়নি। আর এসব লোক নক্ষত্রকে ফেরেশতা বলে থাকে। তারা একটি নক্ষত্রের নাম রেখেছে 'ইলাহ'। তার জন্য উপাসনালয় নির্মাণ করেছে। তাদের কারও মতে, আল্লাহর গুণাবলি 'নাফী' দ্বারা তথা নেতিবাচকভাবে বর্ণনা করা যায়, 'ইসবাত' তথা ইতিবাচক দ্বারা যায় না। এভাবে বলে, আল্লাহ মাখলুক নন, তিনি মৃত নন, তিনি দুর্বল নন। আরও বলে, আমরা এরূপ বলে থাকি যাতে তার কোনো অনুরূপ আকার বা সম্পর্ক সাব্যস্ত না হয়।
তারা নিজেদের মতো করে উপাসনার বিভিন্ন পন্থা তৈরি করে নিয়েছে। তারা প্রতিদিন তিন ওয়াক্ত নামায পড়ে। প্রথম নামায আট রাকাত, প্রত্যেক রাকাতে তিনটি করে সিজদা। আর সেটা আদায় করা হয় সূর্যোদয়ের পূর্বে। দ্বিতীয় নামায পাঁচ রাকাত, তৃতীয় নামাযও পাঁচ রাকাত। তারা এক মাসের রোযা রাখে। তার সীমা ৭ দিন। রোযা শেষে সদকা ও কোরবানী দেয়। উটের গোশত হারাম মনে করে। এমন আরও বহু কুসংস্কারে ভরপুর এ ধর্মমত। যার উল্লেখ এখানে নিষ্প্রয়োজন।
সাবেয়িদের ধারণা—ভালো আত্মা সাওয়াবের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং নূরে রূপান্তরিত হয়। অন্যদিকে খারাপ আত্মা জমিন ও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। কিছু সাবেয়ির ধারণা—এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অবিনশ্বর; তা কখনো ধ্বংস হবে না। পাপ-পুণ্যের বিনিময় তারা পুনর্জন্মের মাধ্যমে লাভ করবে। যেভাবে হিন্দুরা ধারণা করে থাকে। এমন ধর্মের অসারতা প্রমাণ করা কোনো কষ্টসাধ্য বিষয় নয়। কেননা তাদের এসব কর্মকাণ্ড দলিলবিহীন মনগড়া মতবাদ। ইবলিস সাবেয়িদেরকে এমন ফাঁদে আটকাতে সমর্থ হয় যে, তারা ঊর্ধ্বজগতের আধ্যাত্মিকতা অর্জনে পবিত্রতার আশ্রয় নেয় এবং কিছু নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে দোয়া-কালাম পড়তে থাকে। এরা গ্রহ-নক্ষত্রবিদ্যা ও যাদুবিদ্যা শিখতে অধিক মনোযোগী হয়। তাদের মতে, আল্লাহ তায়ালা এবং সৃষ্টিজগতের মাঝে কোনো একটি উসিলা বা মাধ্যম থাকতে হয়, যে ক্ষমার অনুরোধ করবে এবং ভালোর দিকে পথ দেখাবে। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, এই উসিলা কোনো মানবজাতি হতে পারবে না; বরং আধ্যাত্ম জগতের হতে হবে। সুতরাং তারা এর পেছনে দৌড়াতে থাকে। এমনকি শরীরসমেত হাশরের মাঠে সমবেত হওয়াকেও তারা অস্বীকার করে অবলীলায়।
📄 অগ্নিপূজারিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত
ইয়াহইয়া ইবনে বিশর নাহাভান্দি রহ. বলেন, অগ্নিপূজারিদের প্রথম রাজা ছিল কিউমার্স। তিনিই প্রথম এটাকে একটি ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরে এ ধর্মে একের পর এক নবুওয়তের দাবিদার বাড়তে থাকে। অগ্নিপূজারিরা বলে, আল্লাহ তায়ালা (নাউযুবিল্লাহ) একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তি। তিনি প্রকাশ পেলে তার সাথে সমুদয় আধ্যাত্মিক বস্তুও প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাদের আরও দাবি—আমরা যেমন ধর্ম আবিষ্কার করেছি, এমন ধর্ম আর কেউ আবিষ্কার করতে পারবে না। অনিবার্যভাবেই তারা নিজেদের মনগড়া অন্ধকার ধর্মের প্রচলন ঘটাতে থাকে। এভাবে তারা অগ্নিপূজারিতে পরিণত হয়।
তারা আগুনের উপাসনা ও পূজা করতে থাকে। সূর্যের দিকে ফিরে আদায় করে নামায এবং প্রমাণস্বরূপ বলে থাকে, সূর্য এ জগতের রাজা। সে দিন সৃষ্টি করে, রাত্রি দূরীভূত করে, উদ্ভিদে জাগায় প্রাণস্পন্দন, প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখে এবং তাদের শরীরে উষ্ণতার সৃষ্টি করে। তারা মৃত ব্যক্তিকে জমিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার বাহানায় তাতে সমাহিত করে না। আরও বলে, এখান থেকে উদ্ভিদ জন্মে, আমরা এটাকে নাপাক করতে পারি না। কিন্তু জমিনে যদি গরু-ছাগল ইত্যাদি পায়খানা-পেশাব করে তাহলে তা পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলে। জমিনে তারা থুতু ফেলে না। প্রাণীহত্যা ও জবাই করা নিষিদ্ধ মনে করে। বরকতের জন্য গাভীর মূত্র দিয়ে স্বীয় মুখ ধৌত করে থাকে। তারা আপন মায়ের লজ্জাস্থান নিজের জন্য বৈধ মনে করে। আরও বলে, মায়ের যৌন চাহিদা পূরণ করার জন্য পুত্রের চেয়ে অধিক হকদার। আর কে হতে পারে? স্বামী মারা গেলে পুত্র সেই নারীর জন্য অধিক উপযোগী বলে বিবেচিত হয়। যদি সেই নারীর কোনো ছেলে সন্তান না থাকে, তাহলে লটারির মাধ্যমে পুরুষ নির্বাচিত করা হয়। পুরুষের জন্য শত রমণী এমন কি হাজার রমণীকে বিয়ে করা বৈধ মনে করে। ঋতুবতী নারী গোসল করতে চাইলে মুয়াব্বিজ (অগ্নিকুণ্ডলীর পাহারাদার)-কে একটি স্বর্ণমুদ্রা দিতে হয়। সে ওই নারীকে আগুনের ঘরে নিয়ে পশুর মতো চার হাত-পায়ে দাঁড় করিয়ে আঙ্গুল দ্বারা তার লজ্জাস্থান ঘষতে থাকে। এই নিয়ম রাজা কোব্বাদের আমল থেকে চালু হয়। সে নারীদেরকে সকল পুরুষের জন্য বৈধ ঘোষণা দেয়। যে-কোনো পুরুষ যে-কোনো নারীকে ভোগ করতে পারত। রাজা কোব্বাদ নিজেই তার মেয়েদের সাথে সহবাস করেন। এতে প্রজারাও তার অনুসরণ করতে থাকে। এ ব্যাপারে কেউ অস্বীকার করলে বলা হতো, তার ঈমান অপূর্ণ রয়ে গেছে।
নাহাভান্দি রহ. লেখেন, অগ্নিপূজারিদের মতবাদ অনুসারে, জমিনের নিচের দিকে কোনো শেষ নেই। যে আকাশ দেখা যায়, তা শয়তানের চামড়াসমূহের মধ্যে একটি চামড়া। পাহাড়-পবর্ত হচ্ছে তার হাড্ডি। সাগরের পানি তার পেশাব ও রক্ত দ্বারা গঠিত।
বনু উমাইয়া থেকে ইসলামি রাজত্ব পরিবর্তিত হয়ে বনু আব্বাসে হস্তগত হলে সে-সময় এক অগ্নিপূজারি তার অনুসারী নিয়ে এই ভ্রান্ত ধর্ম প্রচার করতে থাকে। সে অনেককে পথভ্রষ্ট করে। বহু ঘটনার সৃষ্টি হয়, যার বর্ণনা অনেক দীর্ঘ। এ ব্যক্তিই শেষ ব্যক্তি, যে অগ্নিপূজার ধর্ম প্রচার করে। কোনো কোনো আলেম বলেন, অগ্নিপূজারিদের জন্য আসমানী গ্রন্থ ছিল, যা তারা তেলাওয়াত করত, পড়ত ও পড়াত। পরে তারা নতুন ধর্মমত আবিষ্কার করলে তাদের ধর্মগ্রন্থ উঠিয়ে নেয়া হয়।
মোটকথা, আশ্চর্যজনকভাবে ইবলিস অগ্নিপূজারিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে যেতে থাকে। শয়তানের চক্রান্তের একটি হচ্ছে, ভালো কাজ ও মন্দ কাজের ব্যাপারে তাদের অন্তরে এই বিষয় গেঁথে দেয়া হয় যে, ভালো বস্তুর সৃষ্টিকর্তা মন্দ বস্তু সৃষ্টি করতে পারেন না। সুতরাং তারা দু'জন খোদা তথা উপাস্য নির্ধারণ করে নিল এবং বলল, তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন নূর। তিনি বিচারক। তিনিই কেবল ভালো বস্তু সৃষ্টি করেন। আর দ্বিতীয়জন হচ্ছে শয়তান, সে অন্ধকার। সে কেবল মন্দ বস্তু ও খারাপ কাজ সৃষ্টি করে। যেমন আমরা বর্ণনা করে এসেছি সানাবিয়াদের মতবাদে। লেখক বলেন, সেখানে আমরা সে সব অভিযোগ খণ্ডন করে এসেছি।
কিছু কিছু অগ্নিপূজারির মতে, আল্লাহ তায়ালা চিরন্তন ও অবিনশ্বর। তার পক্ষ থেকে ভালো বস্তু ছাড়া আর কিছু সৃষ্টি হয় না। অন্যদিকে শয়তান হচ্ছে মাখলুক বা সৃষ্ট। তার থেকে মন্দ বস্তু ছাড়া আর কিছু বের হয় না। তার উত্তর হচ্ছে, তাদের বলা হবে, তোমরা যখন স্বীকার করছ যে, নূর (সৃষ্টিকর্তা) শয়তান (সৃষ্ট)-কে সৃষ্টি করেছে, তো তিনি মন্দের একটি পাতলা শরীর সৃষ্টি করেছেন। (এর থেকে মন্দ বস্তু আর কী হতে পারে?!)
অগ্নিপূজারিদের কেউ কেউ বলে বেড়ায়, সৃষ্টিকর্তা নূর। তিনি তার প্রতিপক্ষের চিন্তা করলেন। অতএব তিনি চিন্তা করে দেখলেন যে, আমার রাজত্বে যদি এমন কেউ সৃষ্টি হয়, যে আমার বিরোধিতা করে বসে! এই চিন্তা থেকে ইবলিসের সৃষ্টি। পরে শরিক সাব্যস্ত হরে ইবলিস কেবল নেতিবাচক বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের দাবি করে।
নাওবখতি রহ. বলেন, অগ্নিপূজারিদের কেউ কেউ বলে, সৃষ্টিকর্তা কোনো একটি বিষয়ে সন্দেহ করেছিলেন। সেই সন্দেহ থেকেই শয়তান সৃষ্টি হয়। আরও বলেছেন, অগ্নিপূজারিরা দৃঢ়ভাবে অন্তরে লালন করে যে, সৃষ্টিকর্তা এবং শয়তান দু'টিই আদি ও অবিনশ্বর। তাদের উভয়ের মাঝে সমঝোতা ছিল। পৃথিবী বিপদাপদ থেকে মুক্ত ছিল। শয়তান সেখান থেকে পৃথক ছিল। পরে ইবলিস কূটচালের মাধ্যমে আকাশ ফেড়ে নিজের সৈন্যসামন্ত নিয়ে দৌড়াতে থাকলে তার শক্তি ও ক্ষমতা দেখে আল্লাহ ভয় পেয়ে তার ফেরেশতাদের নিয়ে পালিয়ে গেলেন। ইবলিস তার পিছু নিয়ে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তিন হাজার বছর ধরে যুদ্ধ চলে। তবুও ইবলিস আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারল না এবং আল্লাহও তার সাথে সমঝোতায় সম্মত হলেন না। অবশেষে একটি শর্তে শয়তানের সাথে সন্ধি করলেন, সাত হাজার বছর পর্যন্ত ইবলিস তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে পৃথিবীতে পদচারণা করবে। আল্লাহ এতে মঙ্গল দেখে সম্মত হলেন। পৃথিবীর মানুষ মেয়াদকাল পর্যন্ত সূর্যের আলো পাবে এবং দুর্দশায় পতিত হবে। এই মেয়াদ শেষ হলে তারা আবার সুখে বসবাস করতে পারবে। ইবলিস এই শর্তারোপ করল যে, তাকে যেন নেতিবাচক সকল কর্মকাণ্ডের ওপর ক্ষমতা দেয়া হয়। শর্তমতে সে পৃথিবীকে নেতিবাচক কর্মকাণ্ড দ্বারা ছেয়ে ফেলে। অগ্নিপূজারিরা দাবি করে—আল্লাহ ও শয়তান শর্তারোপের পর দু'জন ইনসাফওয়ালাকে সাক্ষী রেখে তাদের তরবারি জমা দিল। ইনসাফওয়ালা সাক্ষী বলল, নির্দিষ্ট মেয়াদের পূর্বে কেউ শর্ত ভঙ্গ করলে তাকে এই তরবারি দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করা হবে।
তারা এ ধরনের অজস্র অবান্তর কুসংস্কার আবিষ্কার করে। যা লিখে সময় নষ্ট করা অনুচিত বলে মনে করি। এটাও বলে রাখা প্রয়োজন যে, ইবলিস কতদূর পর্যন্ত তার চক্রান্তের জাল বিস্তৃত করেছে-তার ধারণা দেয়া যদি উদ্দেশ্য না হতো তবে এই ভ্রান্ত কথাগুলো উল্লেখ করতাম না। এই অপদার্থ গোষ্ঠীর ওপর আফসোস হয়, এক মুখে তারা স্বীকার করে যে, সৃষ্টিকর্তা উত্তম ও ভালো বলেন ও করেন। তথাপি তিনি কী করে মন্দ চিন্তায় পতিত হতে পারেন যেখান থেকে শয়তানের উৎপত্তি হয়? যে সকল মন্দের গোড়া। এই ভ্রান্তদের মতানুসারে তো এটাও বলা যায় যে, শয়তান ফেরেশতাও সৃষ্টি করতে পারে। তাদেরকে আরও বলা যায় যে, শয়তান যখন তার নিজের অঙ্গীকার ভঙ্গ করল তখন সে কী করে ইনসাফওয়ালাকে সাক্ষী হিসেবে মানে? সৃষ্টিকর্তাকে পরাজিত করা কীভাবে সম্ভব? এ সকল কথা মারাত্মক ভ্রান্ত। কেবল মানুষের বিবেকের ওপর শয়তানের কূটচালের জানান দেয়ার জন্য এ সকল উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হলো।
📄 গ্রহ ও জ্যোতিষ্কপুজারিদের ওপর ইবলিসের ধোঁকা
আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি রহ. বলেন, একটি গোষ্ঠীর ধর্মমতে আকাশ অবিনশ্বর। এর কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। জালিনুস (গ্যালিলিও) একটি গোষ্ঠী থেকে বর্ণনা করেন, তাদের দাবি ছিল শুধু শনিগ্রহের আকাশ চিরন্তন ও অবিনশ্বর। তাদের অন্য একটি গোত্রের ধারণা-আকাশের পাঁচটি প্রকৃতি রয়েছে। তবে তা না উষ্ণ, না ভেজা, না শীতল, না শুষ্ক, না ভারী, না হালকা। কারও অভিমত হচ্ছে, নক্ষত্রগুলো একটি আগুনের খনি। ঘূর্ণনক্ষমতার কারণে সেগুলো পৃথিবীতে এসে ঠেকেছে। কেউ বলেছে, তারকা পাথরের মতো শরীরবিশিষ্টরূপে তৈরি। কারও মতে, মেঘ থেকে তারকার সৃষ্টি। প্রতিদিন দিনের বেলা সেগুলো নিভে যায় আর রাতের বেলা আলোকিত হয়ে ওঠে। যেমন কয়লাতে আগুন লাগার ফলে তা জ্বলে ওঠে এবং পরে আবার নিভে যায়।
এদের কারও অভিমত-চন্দ্রের শরীর আগুন ও বাতাস দিয়ে তৈরি। আরেক দলের ধারণা-গ্রহ পানি, বাতাস ও আগুন দিয়ে তৈরি। এদের বক্তব্য হচ্ছে, শনিগ্রহ আনুমানিক ত্রিশ বছরে আকাশের সীমানা অতিক্রম করে শেষ করে। আর বৃহস্পতিগ্রহ আনুমানিক বারো বছরে তা সম্পন্ন করে। মঙ্গলগ্রহের সময় লাগে দুই বছর। সূর্য, শুক্র ও বুধগ্রহের পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগে এক বছর। অন্যদিকে চন্দ্র এর জন্য সময় নেয় মাত্র এক মাস।
এদের একটি গ্রুপের বক্তব্যমতে, গ্রহের রয়েছে সাতটি স্তর। আমরা যে গ্রহটি দেখছি সেটি হচ্ছে চন্দ্র। এর উপরে বুধ, তার উপর শুক্র, তার উপর সূর্য, তারপর মঙ্গল, এরপর বৃহস্পতি এবং শনির কক্ষপথ। অধিকাংশ দার্শনিকের মতে, সূর্যের অপরাধ সবচেয়ে মারাত্মক। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে নিরানব্বই গুণ বড়।
নক্ষত্রপূজারিরা মনে করে, নক্ষত্র জীবিত এবং আকাশ প্রাণবিশিষ্ট। প্রতিটি তারকারই প্রাণ আছে। পূর্বেকার দার্শনিকেরা বলতেন, তারকা পাপ ও পুণ্যের কাজ করে থাকে। মানুষের প্রাণ ও অভ্যাসে তার প্রভাব পড়ে। তারা সবাই জীবিত এবং আপন মতে তারা তাদের কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকে।
📄 মৃত্যুর পর পুনরুত্থান অস্বীকারকারীদের ওপর শয়তানের ফাঁদ
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইবলিস বহু মানষের মনে এমন প্ররোচনা দিয়েছে যে, তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে বসেছে এবং এটাকে অসম্ভব ভেবে নিয়েছে। ইবলিস তাদেরকে দুইভাবে ধোঁকা দিয়েছে। প্রথমত মানুষের মূল উৎসের দুর্বলতা, দ্বিতীয়ত শরীরের বিক্ষিপ্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মাটি থেকে জড়ো করা অসম্ভব বলে ধারণা করা। তারা অভিযোগ তুলেছে এই বলে যে, কখনো কখনো বিভিন্ন পশুকে হিংস্র পশুরা খেয়ে ফেলে, তাহলে তাকে কীভাবে পুনরায় জীবিত করা হবে? কোরআন শরিফ তাদের উপরোক্ত দু'টি ভিত্তিহীন অভিযোগের জবাব বলেছে :
أَيَعِدُكُمْ أَنَّكُمْ إِذَا مِتُّمْ وَكُنْتُمْ تُرَاباً وَعِظَاماً أَنَّكُمْ مُخْرَجُونَ * هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ لِمَا تُوعَدُونَ
'সে কি তোমাদেরকে একথা জানায় যে, যখন তোমরা সবার পরে মাটিতে মিশে যাবে এবং হাড়গোড়ে পরিণত হবে তখন তোমাদেরকে (কবর থেকে) বের করা হবে? অসম্ভব, তোমাদের সাথে এই যে অঙ্গীকার করা হচ্ছে এটা একেবারেই অসম্ভব।" আর দ্বিতীয় সন্দেহের দিকে ইশারা করে আল্লাহ বলেন,
أَئِذَا ضَلَلْنَا فِي الْأَرْضِ أَئِنَّا لَفِي خَلْقٍ جَدِيدٍ
"আমরা যখন মাটিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলাম, তারপর কি আমাদেরকে আবার নতুনভাবে সৃষ্টি করা হবে?" এটাই ছিল জাহেলি যুগে অধিকাংশ লোকের মাযহাব, যা তাদের একটি কবিতার পঙক্তিতে ফুটে ওঠে :
يخبرنا الرسول بأن سنحيا * كيف حياة أصداء وهام
"আমাদেরকে রাসুল খবর দেয়, আমাদেরকে নাকি মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হবে। আচ্ছা, ক্ষয়ে যাওয়া নিশ্চিহ্ন বস্তু ফের কী করে জীবিত হতে পারে?” আরেক অজ্ঞ আবুল আলা আলমুয়াররার কবিতা :
حياة ثم موت ثم بعث " حديث خرافة يا أم عمرو
"জীবন আছে, এরপর মৃত্যুও আছে। তারপর আবার জীবন! হে উম্মে আমর, এটা বিবেকপরিপন্থী কথা।"
প্রথম সন্দেহের জবাব হচ্ছে, মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়ার যে উপকরণ অর্থাৎ মাটিকে তোমরা দুর্বল ও তুচ্ছজ্ঞান করছ, এটা ভুল। কেননা মানুষ তো শুরুতে ছিল কেবল এক ফোঁটা বীর্য, অতঃপর জমাট রক্ত—এভাবে বিভিন্ন পরিক্রমা শেষে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। তথাপি মানুষের যিনি উৎস—অর্থাৎ আদম আলাইহিস সালাম-কে তো মাটি দ্বারাই সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া যে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা অতি সুন্দর আকৃতিতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিশ্চয় যে-কোনো হীন ও দুর্বল উৎস থেকেও তা সৃষ্টি করতে পারেন। যেহেতু তিনি মানুষকে বীর্য দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, আর মুরগিকে ডিম থেকে সৃষ্টি করেছেন, একটি ছোট কলি বা বীজ থেকে দারুণ দারুণ বৃক্ষ-তরু-গুল্ম সৃষ্টি করছেন, তাই তার শক্তি ও ক্ষমতার দিকে তাকালে দ্বিতীয় সন্দেহের উত্তরও অনায়াসে বেরিয়ে আসে। অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা বিক্ষিপ্ত বস্তুকে সমবেত করে দেখিয়েছেন। স্বর্ণের উপাদান বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকে। তাকে সুনির্দিষ্ট একটি ডালাতে প্রক্রিয়াজাত করা হলে আর বিক্ষিপ্ত থাকে না, একত্রে সব স্বর্ণ জমাট হয়ে যায়। সুতরাং আল্লাহর ক্ষমতায় কী অন্তরায় থাকতে পারে? যেখানে তিনি চাইলেই সবকিছু হয়ে যায়। এছাড়াও যদি এটা মেনেও নেয়া হয় যে, দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করার সময় এই মৃত্তিকা ব্যতীত অন্য মৃত্তিকা দিয়ে শরীর সৃষ্টি করতে হবে। তারপরও এর কোনো প্রয়োজন পড়বে না। কেননা মানুষ রুহ বা আত্মার নাম; শরীরের নাম নয়। কেননা সে মানুষ হিসেবে ঠিকই গণ্য হয় যদিও সে এককালে মোটা হয়, একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে, আবার বৃদ্ধ হয়ে যায়। অথচ সে যে-মানুষ সে-মানুষই থাকে। যা দ্বারা মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হবে তার সবচেয়ে আশ্চর্য প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা হযরাতে আম্বিয়া আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে এমন কর্মকাণ্ডের প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যা পুনরায় জীবিত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে যথেষ্ট। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর লাঠিকে বিশালাকায় সাপে রূপান্তর, পাহাড়ের অভ্যন্তর হতে বলিষ্ঠ উটনী বের করা, ঈসা আলাইহিস সালাম-এর হাতে মৃত ব্যক্তি পুনরায় জীবিত হওয়ার ঘটনাবলি এ কথারই সাক্ষ্য দেয়।
গ্রন্থকার বলেন, আমরা দার্শনিকদের মতবাদ খণ্ডনে বিস্তারিত আলোকপাত করে এলাম। কিছু কিছু লোক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করতে পারলে তাদের সন্দেহ দূরীভূত হয়। তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে,
وَلَئِنْ رُدِدْتُ إِلَى رَبِّي لَأَجِدَنَّ خَيْراً مِنْهَا مُنْقَلَباً
"সন্দেহের বশীভূত হয়ে বলল, আমাকে কি পুনরায় আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে এখানকার চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করা হবে?” আস ইবনে ওয়ায়েল বলল, 'সেখানেও আমার জন্য সম্পদ ও সন্তান দান করা হবে।" এ কথা সে সন্দেহের বশীভূত হয়ে বলেছে। ইবলিস তাকে প্ররোচিত করলে সে বলতে থাকে, যদি মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হয় তবে সেখানেও আমরা ভালো ও সুখে থাকব। কেননা যিনি আমাদেরকে পৃথিবীতে সুখে-শান্তিতে রাখছেন, তিনি মৃত্যুর পর জীবিত হওয়ার পরও সুখে-শান্তিতে রাখবেন। গ্রন্থকার বলেন, এটা তাদের ভুল ধারণা। কেননা তারা এটা কেন বুঝছে না যে, হতে পারে পৃথিবীতে এগুলো আমাদেরকে ছাড় দেয়া বা সাজাস্বরূপ প্রদান করা হয়েছে। কখনো কখনো মানুষ সন্তান থেকে দূরে থাকতে চায়, আবার কখনো দাস-দাসীকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে।
টিকাঃ
১. সুরা মুমিনূন: আয়াত ৩৫-৩৬
২. সুরা সাজদাহ: আয়াত ১০
৩. সুরা কাহাফ: আয়াত ৩৬
৪. সুরা মারইয়াম: আয়াত ৭৭