📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ইহূদিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 ইহূদিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইবলিস ইহুদিদেরকেও বিভিন্ন প্রকার চক্রান্ত ও ধোঁকায় ফেলেছে। সেসব চক্রান্ত ও ধোঁকা থেকে কয়েকটির আলোচনা পেশ করব, যা দ্বারা বাকিগুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। মোটাদাগে বলা যায়, তারা সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টির সাথে মিলিয়ে ফেলেছে। তারা এটা বোঝে না, যদি উপমা সঠিক হতো তাহলে সৃষ্টির মাঝে যা পাওয়া যায়, তা স্রষ্টার মাঝেও পাওয়া যেত। আবু আবদুল্লাহ বিন হামেদ উল্লেখ করেছেন, ইহুদিদের ধারণা উপাস্য আল্লাহ একজন নুরানী ব্যক্তি। তিনি নুরের পালঙ্কে নুরের তাজ মাথায় দিয়ে বসে আছেন। মানুষের মতোই তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

এ ছাড়া তাদের ধারণা, ওযাইর আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র। ইহুদিরা যদি বুঝত যে, পুত্র হওয়া মানে তার ভেতর পিতার অংশ থাকা। এটা কত বড় আহমকির কথা যে, সৃষ্টিকর্তার আবার অংশবিশেষও থাকবে! অথচ আল্লাহ তায়ালা এ সব থেকে সম্পূর্ণরূপে পূতপবিত্র। এছাড়া পুত্র তো পিতার মতোই হয়। অথচ ওযাইর আলাইহিস সালাম পানাহার করতেন। অথচ আল্লাহ তো পানাহার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। স্মর্তব্য যে, ইহুদিরা বাস্তবতা সম্বন্ধে মোটেই জানত না—এমন নয়; তারা বাস্তবতা সম্মন্ধে অবগত ছিল। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও যে তারা এরূপ উক্তি করেছে তার কারণ হলো, তারা দেখতে পেল যে, হজরত ওযাইর আলাইহিস সালাম মৃত্যুর একশ বছর পর পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন এবং পূর্ণ তৌরাত মুখস্থ শুনিয়ে দিয়েছেন। তাই পরবর্তী যুগের ইহুদিরা খ্রিস্টানদের মতো দাবি করে বসল যে, তিনিও আল্লাহর পুত্র। ইহুদিদের নির্বুদ্ধিতার আরেকটি প্রমাণ হলো, আল্লাহ তায়ালা যখন নিজ অনুগ্রহে শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করে নীল নদী পার করে দিলেন তখন তারা দেখল, এক গোত্র মূর্তিপূজা করছে।
قَالُوا يَا مُوسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ
'তারা মূর্তি দেখে মুসা আলাইহিস সালাম এর কাছে আবেদন করল, হে মুসা! আপনি তাদের ন্যায় আমাদের জন্যও একটি মূর্তির ব্যবস্থা করে দিন।” হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এ কথা শুনে তাদেরকে খুব শাসালেন। এতে তারা নিবৃত রইল। কিন্তু মনে হয় তাদের অন্তরে মূর্তিপূজার আগ্রহ সুপ্ত ছিল। তাই পরবর্তীকালে সামেরী গো-ছানা তৈরি করে তার ইবাদতের জন্য আহ্বান করলে তারা তার ডাকে সাড়া দেয়। ইহুদিদের এ পথভ্রষ্টতার দু'টি কারণ ছিল-১. সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা, ২. তাদের ভেতর ইন্দ্রিয়গোচরযোগ্য উপাস্যের প্রতি আগ্রহ ছিল। এরা যে অজ্ঞ ও নির্বোধ, তার প্রমাণ মিলে তাদের আরেকটি উক্তি দ্বারা :
إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ 'আল্লাহ দরিদ্র, আর আমরা ধনী।' শুধু তাই-নয়, তারা আরও বলত-
وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ 'ইহুদিরা বলত, আল্লাহর হাত বাঁধা।" অথচ আল্লাহ এসব থেকে পবিত্র।

শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ইহুদিরা আরও বলত, কোনো শরিয়ত কখনো 'মানসূখ' তথা রহিত হতে পারে না। অথচ তারা জানত যে, হজরত আদম আলাইহিস সালাম এর যুগে মাহরাম মহিলাদের সাথে বিবাহ জায়েয ছিল। শনিবারে সমুদয় বৈধ কাজ করা জায়েয ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলো রহিত হয়ে গেছে। আসলে শয়তান ইহুদিদেরকে এমন প্ররোচনা দিয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা হাকীম। তার প্রত্যেকটি হুকুম হেকমতপূর্ণ ও প্রজ্ঞাময়। আর কোনো হেকমতকে রহিত করা জায়েয নয়। অতএব হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এর শরিয়ত রহিত হতে পারে না। অথচ আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে তার পুত্র জবাই করার নির্দেশ দিয়ে পরে আবার নিষেধ করেন।

শয়তানের ফাঁদে পড়ে ইহুদিরা আরও দাবি করত যে, وَقَالُوا لَن تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّامًا مَّعْدُودَةً
‘আমাদেরকে আগুন স্পর্শ করবে না। তবে সামান্য কয়েকদিনের জন্য।

আর সে দিনগুলো হচ্ছে গো-ছানা পূজার কাল। শয়তান ইহুদিদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণে উদ্বুদ্ধ করে। তাওরাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বর্ণনা ছিল। সেখানে শেষ নবীর প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ ছিল। কিন্তু হতভাগা এ জাতি সে বর্ণনা পরিবর্তন করে দেয়। আখেরী নবীর প্রতি তারা আর ঈমান আনে না। তাদের আলেমরা এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে আর মূর্খরা তাদের অনুসরণ করেছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, নির্দেশ পরিবর্তন করার পাশাপাশি মনগড়া ধর্ম আবিষ্কারেও তারা অগ্রগামী থেকেছে। ইহুদিরা স্বয়ং মুসা আলাইহিস সালাম এর সাথেও চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করেছে।

হজরত আবু হোরায়রা রা. বর্ণনা করেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদের মাদরাসায় গিয়ে বললেন, তোমাদের মাঝে যে সবচেয়ে বড় আলেম তাকে আমার কাছে উপস্থিত করো। তারা বলল, আমাদের মাঝে সবচেয়ে বড় আলেম হলেন আবদুল্লাহ ইবনে সুরিয়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নির্জনে নিয়ে গিয়ে বললেন, তোমাকে তোমাদের দীনের কসম দিচ্ছি, আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাঈলের প্রতি যেসব অনুগ্রহ করেছেন, আসমান থেকে খাবার হিসেবে মান্না ও সালওয়া দান করেছেন, নদী পার করিয়েছেন, মেঘ দ্বারা ছায়া দান করেছেন; এসব কিছুর বিনিময়ে তুমি সত্য করে বলো আমি রাসুল কি না? আবদুল্লাহ ইবনে সুরিয়া বলল, আল্লাহর কসম! আমি জানি আপনি রাসুল এবং আমার সম্প্রদায়ের লোকেরাও জানে। আপনার বর্ণনা তাওরাতে সুস্পষ্টরূপে বিদ্যমান। তবে এরা আপনার প্রতি হিংসা পোষণ করে। হিংসার বশীভূত হয়ে আপনাকে রাসুল হিসেবে মানছে না। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে সুরিয়াকে বললেন, তাহলে তোমার কী হলো? তুমি ঈমান আনছ না কেন? ইবনে সুরিয়া উত্তরে বলল, স্বগোত্রীয় লোকদের বিরোধিতা করাটা পছন্দ করছি না। অচিরেই এসব লোক ইসলাম গ্রহণ করবে এবং আপনার অনুগত হয়ে যাবে। তখন আমিও ইসলাম গ্রহণ করব।'

সালামা ইবনে সালাম ওয়াকাস হতে বর্ণিত, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পূর্বে বনি আবদুল আশহালের মহল্লায় আমাদের পার্শবর্তী এক ইহুদি বসবাস করত। একদিন সে তার ঘর থেকে বের হয়ে আমাদের নিকট এলো। ঘটনাটি ওই সময়কার, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হননি। যাক, ওই ইহুদি এসে আবদুল আশহালের মজলিসে দাঁড়ালো। সালামা রা. বলেন, সে সময় আমি ছোট ছিলাম। আমি একটি চাদর মুড়িয়ে ঘরের উঠানে বসেছিলাম। ইহুদি এসে মৃত্যুর পর জীবিত হওয়ার, কিয়ামত ও মিজান, জান্নাত ও জাহান্নামের কথা আলোচনা করল। তখনকার সাধারণ লোকেরা ছিল মূর্তি ও দেব-দেবীর পূজারি। তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাসী ছিল না। অতএব তারা বলল, হে অমুক! তাহলে কি মৃত্যুর পর আবার জীবিত করে, ভালো-মন্দের বিচার করে শান্তি বা শাস্তির আয়োজন করা হবে? ইহুদি বলল, হ্যাঁ। আমি কসম করে বলছি, জাহান্নামিরা সেদিন আশা করবে-ইস যদি এখান থেকে কিছু আগুন নিয়ে একটি চুলোয় রেখে সেখানে থাকতে পারতাম! তাহলে জাহান্নামের এই ভয়ংকর আগুন থেকে বাঁচতে পারতাম। এ কথা শুনে গোত্রের লোকেরা বলল, আরে! তুমি যা কিছু বলছ, তার কী প্রমাণ? ইহুদি চোখ মেলে আমার দিকে তাকাল। আমি তাদের সবার ছোট ছিলাম। ইহুদি বলল, এই ছেলে যদি পূর্ণ বয়স পায়, তাহলে সে নতুন নবী আলাইহিস সালাম এর সময়কাল পাবে। সালামা রা. বলেন, আল্লাহর কসম! বেশি দিন অতিবাহিত হয়নি, আল্লাহ তায়ালা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণ করলেন। ইহুদি তখনো আমাদের মহল্লায় উপস্থিত ছিল। আমরা তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ঈমান এনেছি। আর ওই ইহুদি শত্রুতা এবং হিংসার কারণে অস্বীকার করে বসল। আমি একবার তাকে গিয়ে বললাম, আরে বদবখত! তুমি কি সেই নও যে আমাকে এমন পয়গাম্বরের পূর্বাভাস দিয়েছিলে? সে বলল, হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম। কিন্তু সে ওই পয়গাম্বর নয়।

টিকাঃ
১. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৩৮
২. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৮১
৩. সুরা মায়িদা: আয়াত ৬৪
৪. সুরা বাকারা : আয়াত ৮০
১. [সনদ খুবই দুর্বল, এতে আলী ইবনে মুজাহিদ আছেন- যিনি 'মাতরূক' হাদিসটি বায়হাকী রহ. তাঁর 'সুনানে কুবরা'র ৮/২৪৬ ও ২৪৭ পৃষ্ঠায় সংকলন করেছেন।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 খ্রিষ্টানদের ওপর ইবলিসের চক্রান্ত

📄 খ্রিষ্টানদের ওপর ইবলিসের চক্রান্ত


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি বলেন, চক্রান্ত আর ধোঁকার নিত্যনতুন জালে ইবলিস নাসারা তথা খ্রিষ্টানদের কাবু করে রেখেছে। যেমন ইয়াকুবিয়া, মালিকিয়া ও নাসতুরিয়া। এদের সবারই ধারণা যে, আল্লাহ তায়ালা জাওহার তথা স্বনির্ভরশীল ধাতু। আর তার তিনটি উকনুম বা অংশ রয়েছে। সে তিন উকনুম হচ্ছে, পিতা, সন্তান ও রুহুল কুদস। অতঃপর তারা বলে, তিনজন মিলে একজন। এদের অনেকে মনে করে, উকনুমত্রয় হলো—গুণ ও বৈশিষ্ট্য। আর কেউ বলে, সেগুলো ব্যক্তি। কিন্তু এ অজ্ঞের দল বুঝল না যে, আল্লাহ তায়ালা যদি জাওহার বা ধাতুবিশেষ হতেন, তাহলে অন্যান্য জাওহারের ন্যায় স্থানের মুখোপেক্ষী হতেন। নড়াচড়া তার জন্য জরুরি হয়ে পড়ত। অথচ আল্লাহ এ সব থেকে পূতপবিত্র।

আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি রহ. লেখেন, খ্রিষ্টানদের দু'টি দল মালাকিয়া ও ইয়াকুবিয়ারা বলে, মারইয়াম আলাইহিস সালাম যে সন্তান জন্ম দেন, সে আল্লাহ। কারো কারো অন্তরে শয়তান এই ফাঁদ পাতে যে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। কেউ বলে মাসীহ দুটি জাওহার। একটি আদি অন্যটি অনাদি। এছাড়া ইনজিলে পরিষ্কারভাবে আমাদের নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উল্লেখ আছে। কিন্তু শয়তান সেখানেও চক্রান্তের জাল ফেলে। তাই কারো অভিমত হচ্ছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী, ঠিক আছে। কিন্তু তিনি কেবল আরবদের জন্য প্রেরিত হয়েছেন। অন্যদের জন্য নয়। ইবলিস তাদের কঠিন জালে আটকে ফেলে। তারা সত্য হতে বিমুখ হয়ে যায়। কেননা তারা যখন জানল যে, তিনি সত্য নবী, তাহলে এটাও জানার কথা যে, নবীরা কখনো মিথ্যা বলেন না। আর নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
بُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً
“আমি সারা দুনিয়ার সকলের জন্য প্রেরিত হয়েছি।” আর এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কায়সার, কিসরা এবং অন্যান্য দেশের রাজা-বাদশাদের কাছে হেদায়াতের বাণীসম্বলিত দূত ও পত্র প্রেরণ করেছেন।

টিকাঃ
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৪৩৮

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ইহূদি ও খ্রিষ্টানদের ওপর ইবলিসের চক্রান্তের আরও কিছু নমুনা

📄 ইহূদি ও খ্রিষ্টানদের ওপর ইবলিসের চক্রান্তের আরও কিছু নমুনা


ইবলিস ইহুদি ও খ্রিষ্টান উভয় ধর্মাবলম্বীদের ওপর এতো সূক্ষ্ম প্ররোচনা দিতে সক্ষম হয়েছে যে, তারা উভয় জাতি বলে, আমাদের পূর্বপুরুষদের কারণে আমরা আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পাব। কেননা আমাদের মধ্য থেকে অসংখ্য নবী ও অলী এসেছেন। তাদের এই ধারণার বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এভাবে এসেছে :
نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ
"আমরা তো আল্লাহর পুত্র এবং তার প্রিয়ভাজন।”'

অর্থাৎ আমাদের মধ্য হতে আল্লাহর পুত্র ওযাইর আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালাম এসেছেন। শয়তানের এই চক্রান্তের পর্দা এভাবে উন্মোচন করা যায়, যদি কোনো ব্যক্তির ওপর আল্লাহর দেয়া কোনো বিধান (যেমন নামায, রোযা ইত্যাদি) নির্দেশিত থাকে, আর তার পক্ষ থেকে যদি অন্য কেউ সেটা আদায় করে নেয়, তাহলে কি তার হক আদায় হবে?

আরও বোঝার ব্যাপার হচ্ছে, যদি কারও সাথে ভালোবাসা থাকার কারণে তার নিকটবর্তীরা ভালোবাসার পাত্র হিসেবে পরিগণিত হয়, তবে যাদের সাথে তার শত্রুতা আছে তাদের সাথেও তার শত্রুতা থাকা স্বাভাবিক? মোটকথা, তাদের এ দাবি অসার ও বাতিল বলে বিবেচিত হতে বাধ্য। নিশ্চয় আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যাকে বলেছেন :
لا أَعْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا
"আমি তোমার থেকে আল্লাহর আযাব হঠাতে পারব না।” (অর্থাৎ শাফায়াত তথা সুপারিশের অনুমতি তো ঈমানের ওপর নির্ভরশীল)। প্রিয়ভাজন হওয়ার মানদণ্ড হচ্ছে 'তাকওয়া'। সুতরাং যার তাকওয়া নেই তার জন্য ভালোবাসাও নেই। এছাড়া আল্লাহর ভালোবাসা মানুষের মতো মনের জোশের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এমন হলে কিছুটা অবকাশ হয়তো থাকত।

টিকাঃ
১. সুরা মায়িদা: আয়াত ১৮
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৭৫৩, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০৪

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সাহারি সম্প্রদায়ের ওপর শয়তানের নেক সুরতে ধোঁকা

📄 সাহারি সম্প্রদায়ের ওপর শয়তানের নেক সুরতে ধোঁকা


গ্রন্থকার বলেন, সাবেয়িনদের উৎস হচ্ছে صبأت থেকে। এটা ওই সময়কে বলা হয়, যখন এক বস্তু আরেক বস্তুতে প্রবেশ করে। صبأت النجوم সময়কে বলা হয় যখন তারকা প্রকাশ হয়। صباً به বলা হয় যখন শিশুর দাঁত ওঠে। الصابئون ওই সকল লোকদের বলা হয় যারা এক ধর্ম থেকে আরেক ধর্মে চলে যায়। সাবেয়ি ধর্মের ব্যাপারে ব্যাপারে দশটি অভিমত রয়েছে।

১. সাবেয়ি-এমন গোত্র যারা অগ্নিপূজারি ও খ্রিষ্টানদের অন্তর্ভুক্ত। এটা সালেম বর্ণনা করেছেন সাঈদ ইবনে যুবাইর থেকে এবং লাইস ইবনে আবি সুলাইম মুজাহিদ থেকে বয়ান করেছেন।

২. তারা ইহুদি অগ্নিপূজারিদের মাঝামাঝি একটি দল। ইবনে আবি নাজীহ মুজাহিদ থেকে এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

৩. তারা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মাঝামাঝি একটি দল। কাসেম ইবনে আবি বাযাহ মুজাহিদ থেকে এ মত ব্যক্ত করেছেন।

৪. তারা খ্রিষ্টানদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তাদের ধর্মমত খ্রিষ্টানদের তুলনায় কিছুটা হালকা। এটা আবু সালেহ বলেছেন ইবনে আব্বাস রা. থেকে।

৫. তারা মুশরিকদের একটি দল। তাদের কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই। এ অভিমতটিও কাসেম মুজাহিদ থেকে উল্লেখ করেছেন।

৬. সাবেয়িরা অগ্নিপূজারিদের মতো। এটা হাসান বসরির অভিমত।

৭. এরা আহলে কিতাবের একটি সম্প্রদায়, যারা যবুর কিতাব পড়ে। এটা আবুল গালিয়ার অভিমত।

৮. এরা সাবেয়ি গোত্রের দিকে ফিরে নামায পড়ে, ফেরেশতাদের উপাসনা করে এবং যবুর কিতাব পড়ে। এটা কাতাদাহ ও মুকাতিলের অভিমত।

৯. এরা আহলে কিতাবদের একটি দল। এটা সিদ্দি'র অভিমত।

১০. এই দলটি কেবল لا اله الا الله বলে, আর কোনো কাজ করে না। না তাদের কোনো গ্রন্থ আছে, না আছে কোনো নবী-রাসুল। শুধু لا إله إلا الله ই বলে থাকে। এই অভিমতটি ব্যক্ত করেছেন ইবনে যায়েদ।

গ্রন্থকার বলেন, এ সব অভিমত হজরত ইবনে আব্বাস রা., কাসেম ও হাসান প্রমুখ তাফসিরকারকগণ হতে বর্ণিত। মুতাকাল্লিমিন তথা তার্কিক আলেমগণ বলেন, সাবেয়িদের ধর্ম বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। কারও মতে, এই পৃথিবী চিরন্তন ও অবিনশ্বর। সৃষ্টিকর্তা এ থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন। অধিকাংশ সাবেয়ির মতে, এ জগৎ অনাদি, এটা সৃষ্টি করা হয়নি। আর এসব লোক নক্ষত্রকে ফেরেশতা বলে থাকে। তারা একটি নক্ষত্রের নাম রেখেছে 'ইলাহ'। তার জন্য উপাসনালয় নির্মাণ করেছে। তাদের কারও মতে, আল্লাহর গুণাবলি 'নাফী' দ্বারা তথা নেতিবাচকভাবে বর্ণনা করা যায়, 'ইসবাত' তথা ইতিবাচক দ্বারা যায় না। এভাবে বলে, আল্লাহ মাখলুক নন, তিনি মৃত নন, তিনি দুর্বল নন। আরও বলে, আমরা এরূপ বলে থাকি যাতে তার কোনো অনুরূপ আকার বা সম্পর্ক সাব্যস্ত না হয়।

তারা নিজেদের মতো করে উপাসনার বিভিন্ন পন্থা তৈরি করে নিয়েছে। তারা প্রতিদিন তিন ওয়াক্ত নামায পড়ে। প্রথম নামায আট রাকাত, প্রত্যেক রাকাতে তিনটি করে সিজদা। আর সেটা আদায় করা হয় সূর্যোদয়ের পূর্বে। দ্বিতীয় নামায পাঁচ রাকাত, তৃতীয় নামাযও পাঁচ রাকাত। তারা এক মাসের রোযা রাখে। তার সীমা ৭ দিন। রোযা শেষে সদকা ও কোরবানী দেয়। উটের গোশত হারাম মনে করে। এমন আরও বহু কুসংস্কারে ভরপুর এ ধর্মমত। যার উল্লেখ এখানে নিষ্প্রয়োজন।

সাবেয়িদের ধারণা—ভালো আত্মা সাওয়াবের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং নূরে রূপান্তরিত হয়। অন্যদিকে খারাপ আত্মা জমিন ও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। কিছু সাবেয়ির ধারণা—এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অবিনশ্বর; তা কখনো ধ্বংস হবে না। পাপ-পুণ্যের বিনিময় তারা পুনর্জন্মের মাধ্যমে লাভ করবে। যেভাবে হিন্দুরা ধারণা করে থাকে। এমন ধর্মের অসারতা প্রমাণ করা কোনো কষ্টসাধ্য বিষয় নয়। কেননা তাদের এসব কর্মকাণ্ড দলিলবিহীন মনগড়া মতবাদ। ইবলিস সাবেয়িদেরকে এমন ফাঁদে আটকাতে সমর্থ হয় যে, তারা ঊর্ধ্বজগতের আধ্যাত্মিকতা অর্জনে পবিত্রতার আশ্রয় নেয় এবং কিছু নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে দোয়া-কালাম পড়তে থাকে। এরা গ্রহ-নক্ষত্রবিদ্যা ও যাদুবিদ্যা শিখতে অধিক মনোযোগী হয়। তাদের মতে, আল্লাহ তায়ালা এবং সৃষ্টিজগতের মাঝে কোনো একটি উসিলা বা মাধ্যম থাকতে হয়, যে ক্ষমার অনুরোধ করবে এবং ভালোর দিকে পথ দেখাবে। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, এই উসিলা কোনো মানবজাতি হতে পারবে না; বরং আধ্যাত্ম জগতের হতে হবে। সুতরাং তারা এর পেছনে দৌড়াতে থাকে। এমনকি শরীরসমেত হাশরের মাঠে সমবেত হওয়াকেও তারা অস্বীকার করে অবলীলায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00