📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 অগ্নি, সূর্য ও চন্দ্রপুজারিদের ওপর ইবলিসের ফাঁদ

📄 অগ্নি, সূর্য ও চন্দ্রপুজারিদের ওপর ইবলিসের ফাঁদ


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি বলেন, একটি গোষ্ঠীর ওপর ইবলিস এভাবে ফাঁদ পাতল যে, তাদের মনে সে আগুনের ইবাদত তথা পূজা করার জন্য প্ররোচনা দিতে থাকল। ইন্ধন দিল, আগুন এমন এক রত্ন-পৃথিবীজুড়ে যার কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবী এর মুখাপেক্ষী। এখান থেকেই একদল সূর্যের পূজায় মগ্ন হলো। ইমাম আবু জাফর জারির তবারি রহ. উল্লেখ করেন, আদমপুত্র কাবিল যখন হাবিলকে খুন করে তার পিতার কাছ থেকে পালিয়ে ইয়ামেন চলে গেল, তখন ইবলিস তার কাছে এসে বলল, হাবিলের নজরানা কেন গৃহীত হয়েছে জানো? আগুন এসে তার নজরানা কেন ভস্মীভূত করেছে জানো? কারণ, সে অগ্নির সেবা করত এবং তার পূজা করত। এখন তুমিও আগুন এনে তার সেবা ও পূজা করো, তাহলে দেখবে সে তোমার জন্য এবং তোমার সন্তানদের জন্য শুভ পরিণাম বয়ে আনবে। কাবিল এ কথা শুনে একটি আতশখানা তৈরি করে তার পূজা-অর্চনা আরম্ভ করে দিল।

হাফিয বলেন, যারাদন্ত—যাকে অগ্নিপূজারিরা নবী বলে মনে করে, সে বলখ শহর থেকে এসে দাবি করল, সে বহতা পর্বতে থাকত। সেখানে তার ওপর অহী অবতীর্ণ হতো। এদেশ খুবই ঠাণ্ডা। ওখানকার লোকজন ঠাণ্ডা ছাড়া কিছুই চিনত না এবং স্বীকার করত যে, শুধু পাহাড়ের অধিবাসী ছাড়া অন্য কোথাও থেকে কোনো নবী পাঠানো হয়নি। যারা তাকে মেনেছে তাদের জন্য সে খুবই নোংরা ও নিকৃষ্ট বিধি-বিধান চাপিয়ে দিয়েছে। যেমন, পেশাব দ্বারা অযু করা, মায়ের সাথে সহবাস করা এবং অগ্নিপূজা করা ইত্যাদি। উপরোক্ত যারাদন্তের কথামালায় আছে, আল্লাহ একাকী ছিলেন, একাকিত্বের মেয়াদ বৃদ্ধি পেতে থাকলে তিনি চিন্তা-ভাবনা করে ইবলিসকে সৃষ্টি করেন। ইবলিস তার সম্মুখে এলে আল্লাহ তাকে খুন করতে চান, এতে সে বাধা দেয়। আল্লাহ দেখলেন, সে নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তখন নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য তার সাথে সন্ধি করে নেন। (নাউযুবিল্লাহ)

জানা কথা, অগ্নিপূজরিরা অগ্নিপূজা করার জন্য অসংখ্য আতশখানা তৈরি করে। সবার আগে আফ্রিদুন নামীয় ব্যক্তি অগ্নিপূজা করার জন্য তারসুস নামক শহরে একটি অগ্নিকুণ্ডলী স্থাপন করে, আরেকটি বোখারায় স্থাপন করে। আর ব্রাহ্মণ সিস্তানে অগ্নিকুণ্ডলী স্থাপন করে। এভাবে বহু স্থানে আগুন পূজার ব্যবস্থা করা হয়। জুডিসের কাছে এমন কিছু আগুন ছিল, সে দাবি করত এগুলো আকাশ হতে এসেছে। আর তিনি তা উৎসর্গ করেছেন।

এটা এভাবে হয়েছে যে, সে একটি সীমানা নির্ধারণ করল এবং তার মধ্যখানে একটি বোতল স্থাপন করল, এদিকে উৎসর্গের জন্তু একটি লাকড়ির ওপর টাঙালো, এটি গন্ধকমিশ্রিত ছিল। দ্বিপ্রহরে সূর্য মাথা বরাবর এলে ছাদের প্রদীপ থেকে সূর্যের রশ্মি বোতলে পড়লে গন্ধকের তীব্র তেজে লাকড়িতে আগুন ধরে যেত। জুডিস বলত, তোমরা এ আগুন নেভাবে না।

গ্রন্থকার বলেন, ইবলিস কিছু মানুষের অন্তরে চন্দ্রপূজার প্ররোচনা দিল। অন্য আরও কিছু মানুষের মনে প্রয়োগ করল তারকা-পূজার ইন্ধন। ইবনে কুতাইবা রহ. বলেন, ইসলামের পূর্বে অজ্ঞতার যুগে একটি গোষ্ঠী পূজা করত শা'রুল উযূর নামীয় তারার। এতে তারা নিমজ্জিত হলো নানাবিধ ফিতনায়। এর উত্তরণে তাদের মনে উৎসর্গের স্বাদ জাগলো।

আবু কাবাশা-যার দিকে ইঙ্গিত করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুশরিকরা সম্বোধন করত ইবনে আবি কাবাশা বলে। সে-ই প্রথম ব্যক্তি যে শু'রা নামীয় তারকা পূজা করত। তার মতে, এই তারকা আকাশের পার্শ্ব কর্তন করে। এটা ছাড়া আর কেউ আকাশের পার্শ্ব কর্তন করতে পারে না। এই ধারণায় তারা এটাকে পূজা করতে থাকে। এটা কুরাইশদের মতবাদের বিপরীত বলে সাব্যস্ত হয়। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত হয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিয়ে বলেন, ছেড়ে দাও এসব মূর্তিপূজা। কুরাইশরা তখন বলতে আরম্ভ করল, এটাও আবু কাবাশার পুত্র। অর্থাৎ আবু কাবাশা যেমন আমাদের বিরোধিতা করেছে, অনুরূপ এ-ও আমাদের বিরোধিতা করছে। বনি ইসরাইল এমন প্রেক্ষিতে হজরত মারইয়াম আলাইহিস সালামকে 'উখতে হারুন' বা হারুনের বোন বলে সম্বোধন করত। অর্থাৎ হারুনের মতো সৎচরিত্রবান ও নেককার।

স্মর্তব্য যে, শু'রা নামীয় তারকা দু'টি। একটি হচ্ছে উক্ত শু'রা উব্‌র, আর অন্যটিকে বলা হয় শু'রা গুমাইসা। এদের আবার রয়েছে প্রতিপক্ষও।

ইবলিস অন্য জাতিগুলোকে ফেরেশতাদের পূজা করতে প্ররোচনা দিতে থাকে। ফেরেশতাকে তাই তারা আল্লাহর কন্যা বলে অভিহিত করতে শুরু করে। আরেক জাতিকে গরু ও ঘোড়াকে পূজা করার ব্যাপারে প্রলুব্ধ করতে থাকে। এই গরুপূজারিদের একজন ছিল সামেরী। তা'বীর নামক গ্রন্থে আছে, ফেরাউনও পশু পূজা করত। এ-সব বেকুবদের বুঝি আকল-বুদ্ধি বলতে কিছুই থাকতে নেই!

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 প্রাক ইসলামি যুগে জাহেলদের ওপর শয়তানের কুমন্ত্রণা

📄 প্রাক ইসলামি যুগে জাহেলদের ওপর শয়তানের কুমন্ত্রণা


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইবলিস কীভাবে মানুষের ওপর মূর্তিপূজার প্রলোভন দিয়ে থাকে এতক্ষণ ধরে আমি তার বিবরণ দিয়ে এসেছি। এ-সংক্রান্তে ইবলিসের মস্ত বড় চক্রান্ত ছিল, তখনকার লোকেরা বিনা প্রমাণে, কোনো প্রকার চিন্তা-ভাবনা না করেই বাপ-দাদা তথা পূর্বপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ করত। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آَبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ
"তাদের যখন বলা হয়, আল্লাহ যে বিধান অবতীর্ণ করেছেন তা মেনে চলো, জবাবে তারা বলে, আমাদের বাপ-দাদাদের যে পথের অনুসারী পেয়েছি আমরা তো সে পথে চলব। আচ্ছা, তাদের বাপ-দাদারা যদি একটুও বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ না করে থেকে থাকে এবং সত্য-সঠিক পথের সন্ধান না পেয়ে থাকে, তাহলেও কি তারা তাদের অনুসরণ করে যেতে থাকবে?"

এভাবেই তাদের মধ্য থেকে একদলের ওপর ইবলিস এমন কুমন্ত্রণা দিল যে, তারা দাহরিয়া তথা নাস্তিকদের পন্থা বেছে নিল। সৃষ্টিকর্তা এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে বসল। বলল, কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই এবং মৃত্যুর পর কখনো জীবিত করা হবে না।

'দুনিয়ার জীবনই আসল জীবন, এরপর আমাদেরকে আর জীবিত করা হবে না।' অন্যত্র আছে—তারা বলত, 'কালের পরিক্রমায় আমরা হারিয়ে যাব।' তাদের এক দলের ওপর শয়তান প্রভাব ফেলল এভাবে যে, তারা নিজের রায়মতে সৃষ্টিকর্তাকে তো স্বীকার করেছে, কিন্তু রাসুল এবং কিয়ামতকে অস্বীকার করে বসে। আরেক দলের মাঝে শয়তান ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে স্বীকার করতে প্ররোচিত করল। একদল ঝুঁকল ইহুদি- খ্রিষ্টানদের প্রতি, আরেক দল অগ্নিপূজারিদের দিকে। এই আকিদা আরবের অধিকাংশ বনু তামীম গোত্রের মাঝে বিদ্যমান ছিল। তার পুত্র হাজেব পোষণ করত এই মতবাদ।

আরবের কিছু অধিবাসী সৃষ্টিকর্তাকে স্বীকার করে বলত, তিনি শুরুতে সৃষ্টি করেছেন এবং মৃত্যুর পর আবারও সৃষ্টি করবেন। তখন তারা সাজা ও শান্তি উভয়টাই প্রাপ্ত হবে। আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম, যায়দ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল, কাইস ইবনে সাইদা এবং আমের ইবনুয যারাব এই আকিদা পোষণ করতেন। বর্ণিত আছে, আবদুল মুত্তালিব একজন অত্যাচারী-দুনিয়াতে যে কোনো শাস্তি পায়নি-তার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আল্লাহর কসম! এই দুনিয়ার বাইরে আরেকটি জগৎ আছে, যেখানে ভালো- মন্দ উভয়ের বদলা দেয়া হবে। যুহাইর ইবনে আবি সালমাও এই দলভুক্ত ছিলেন। (এই আকিদার কথা 'সাবয়ায়ে মুয়াল্লাকা'তে বিবৃত হয়েছে। সেখানে আবৃত্তি হয়েছে-
يؤخر فيوضع في كتاب فيدخر * ليوم الحساب أو يعجل فينقم “যখন সৃষ্টিকর্তার কাছে তোমাদের মন্দ বিষয়ে বিচারের কথা জানা আছে, তা তো লুকাতে পারবে না। সুতরাং দু'টি রাস্তা উন্মুক্ত-হয়তো শাস্তি পেতে দেরি হবে, তখন আমলনামায় তা লিপিবদ্ধ হয়ে হিসাবের দিন দেখতে পাবে। নচেৎ এখন কর্মের মাধ্যমে তার প্রতিবিধান করে নাও এবং অপরাধীদের শাস্তি দাও।”

তারা ইসলামের প্রারম্ভলগ্নে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। এদের মধ্যে যায়দ আলফাওয়ারিস বিন হাসান রয়েছেন। আরও আছেন, কিলমিস ইবনে উমাইয়া আলকিনানী। এসব ব্যক্তিরা কা'বার ছায়ায় দাঁড়িয়ে লোকদের ওয়াজ শোনাতেন। হজের মৌসুম ছাড়া অন্য সময় আরবের বিভিন্ন গোত্র এদের ওয়াজ শ্রবণ না করে বাড়ি যেতেন না। একদিন তিনি বলেন, হে আরববাসী! আমার কথা শোনো এবং মান্য করো, তাহলে তোমরা সফলকাম হবে। আরববাসী সমস্বরে বলল, কী সে কথা? তিনি বললেন, তোমাদের প্রত্যেক গোত্র পৃথক পৃথক মূর্তি বানিয়ে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছ। আমি খুব ভালো করেই জানি, আল্লাহ তায়ালা ওসবে সন্তুষ্ট নন। আল্লাহ তায়ালা ওই ঠাকুরগুলোর প্রতিপালক। তিনি চান, কেবল তাঁরই উপাসনা করা হোক। এ ওয়াজ শুনে সে বছর মানুষজন ছুটে চলে গেল, তার ওয়াজ আর শুনল না।

আরবের কিছু কিছু গোত্রের বিশ্বাস ছিল, কেউ মারা গেলে তার কবরে যদি তার উট বেঁধে দিয়ে আবার ছেড়ে দেয়া হয়, তারপর সেই উটটি মারা গেলে হাশরের দিন এই সাওয়ারী সে পাবে। এমন যদি না হয়, তবে সে হেঁটে হেঁটে হাশরের মাঠে অগ্রসর হবে। আমর ইবনে যায়দ আলকালবী এমন মতবাদ পোষণ করতেন।

তাদের মধ্যে অনেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে শিরকে লিপ্ত থাকতেন। খুব কম লোক এসব মূর্তির উপাসনা ছেড়ে শুধু আল্লাহর ইবাদত করত। যেমন কায়স ইবনে সায়েদা ও যায়দ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল। জাহেলি যুগে লোকজন সর্বদা নিত্য নতুন বিদয়াত সৃষ্টি করত। এতে তারা হালাল মাস হারাম করত আর হারাম মাস হালাল করত। কেউ মারা গেলে তার স্ত্রীকে তার নিকট ভাই সম্পর্কিত ব্যক্তি ওয়ারিস হিসেবে লাভ করত। তারা বুহাইরা সংস্কৃতি চালু করে। অর্থাৎ কোনো উটনী পাঁচটি বাচ্চা প্রসব করলে, পঞ্চমবার যদি মাদী উট প্রসব করে, তখন তার কান ছেদন করে দেয়া হতো এবং মহিলাদের জন্য তার গোস্ত খাওয়া বিবেচিত হতো নিষিদ্ধ হিসেবে। অনুরূপভাবে তারা সায়েবা নামীয় এক সংস্কৃতি উদ্ভাবন করে। অর্থাৎ উট, গাভী বা ছাগলের কিছু পাল স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হতো। তাদের পিঠে কোনো সাওয়ারি আরোহণ নিষিদ্ধ থাকত এবং তাদের দুধ দোহনও করা যেত না। এভাবে তারা উসিলার রসম আবিষ্কার করে। উসিলা ওই ছাগলকে বলা হয়, যে সাতটি ছানা জন্ম দেয়। সপ্তমবার যদি দু'টি ছানা প্রসব করে যার একটি নর, অন্যটি মাদী হয়, তবে তারা এ দু'টিকে জবেহ করার উপযোগী মনে করত না এবং তারা বলত, তার দ্বারা কেবল পুরুষেরাই উপকৃত হতে পারবে, মহিলারা এ দ্বারা কোনোভাবে উপকৃত হতে পারবে না। এভাবে 'হাম' সংস্কৃতির উদ্ভাবন করে। মুশরিকরা আরও দাবি করত, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই সংস্কৃতি মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ এটি ছিল চরম মিথ্যাচার। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَكِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ
“অথচ যারা কাফির, তারা আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে।”

পরে মুশরিকরা যে সকল বাহিরা, সায়েবা, উসিলা ও হাম' নির্ধারণ করেছিল এবং তাকে যেভাবে পুরুষের জন্য বৈধ আর নারীদের জন্য অবৈধ সাব্যস্ত করেছিল, তা আল্লাহ তায়ালা রহিত করে বলেন, قُلْ الذَّكَرَيْنِ حَرَّمَ أَمِ الْأُنثَيَيْنِ "তিনি কি উভয় নর হারাম করেছেন, না উভয় মাদিকে'”

এমনিই করে ইবলিস আরবের গ্রামবাসীকে সন্তানদের খুন করতে প্রলুব্ধ করতে থাকে। তাই অনেককে দেখা যায়, যারা স্বীয় কন্যাসন্তানদের খুন করে কুকুর দিয়ে তার মাংস ভক্ষণ করিয়ে সেই কুকুরকে লালন-পালন করত। সেই অন্ধকার যুগে ইবলিস মানুষের মনমুকুরে এমন কূটচাল গেঁথে দিল যে, তারা বলল, لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا “আল্লাহ যদি চাইতেন তবে আমরা শিরক করতাম না।” অর্থাৎ তিনি যদি আমাদের শিরকের ওপর খুশি না থাকতেন, তাহলে এমন ব্যবস্থাপত্র দিতেন, যা দ্বারা আমরা আর শিরকে পতিত হতাম না। দেখুন, এই অজ্ঞরা আল্লাহর ইচ্ছার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার কী কপট স্পর্ধা দেখিয়েছে!

টিকাঃ
১. সুরা বাকারা: আয়াত ১৭০
১. সুরা মায়িদা: আয়াত ১০৩
২. সুরা আন'আম: আয়াত ১৪৪
৩. সুরা আর'আম: আয়াত ১৪৮

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 নবুওয়ত অস্বীকারকারীদের ওপর শয়তানের ফাঁদ

📄 নবুওয়ত অস্বীকারকারীদের ওপর শয়তানের ফাঁদ


ইবলিস ব্রাহ্মণ ও হিন্দুদের ওপর এমন প্ররোচনার পর্দা ঢেলে দিল যে, তারা এতে নবুওয়ত অস্বীকার করে বসল। এই ফাঁদের খপ্পরে পড়ে তারা শতধা বিভক্ত হয়ে গেল। হিন্দুদের কোনো কোনো সম্প্রদায় দাহরিয়া মতবাদের, কেউ আবার সানাভিয়ার মতো, কেউ বা ব্রাহ্মণ্যবাদের ধারক। কেউ কেউ কেবল আদম ও ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে নবী হিসেবে মানে। আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি তাঁর 'কিতাবুল আরা ওয়াদদিয়ানাত' গ্রন্থে বর্ণনা করেন, হিন্দু ব্রাহ্মণদের একটি দলের অভিমত হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তা আছেন। রাসুল এসেছেন। স্বর্গ-নরকও আছে। আরও বলে, তাদের রাসুল ছিলেন একজন ফেরেশতা, যিনি মানুষের আকৃতিতে ধরাধামে এসেছিলেন। কিন্তু তার কাছে কোনো ঐশী গ্রন্থ ছিল না। তার ছিল চারটি হাত, দশটি মাথা। তার মধ্যে একটি মাথা ছিল মানুষের মাথার মতো, আর অবশিষ্ট মাথাগুলো ছিল বাঘ, ঘোড়া, হাতি, শুয়োর ইত্যাদি জন্তুর ন্যায়। সে তাদেরকে অগ্নিপূজার নির্দেশ দেয় এবং প্রাণীহত্যায় বাধা দেয়। আবার শুধু আগুনের সম্মানে প্রাণী হত্যারও নির্দেশ দেয়। মিথ্যা ও মদ্যপান হতে নিষেধ করে। ব্যভিচার বৈধ বলে ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি তাদেরকে গাভিপূজার আদেশ করে। তাদের মধ্যে কেউ ধর্মত্যাগী হলে তার মাথা, দাড়ি, গোফ, ভ্রু ও চোখের পাপড়ি উপড়ে ফেলা হতো। পরে তাকে গাভীর কাছে নিয়ে প্রণাম করানো হতো। এমন অনেক ভ্রান্ত মতবাদে টইটম্বুর তাদের ধর্ম। এসব বর্ণনা করে বেহুদা সময় অপচয়ের কোনো মানে হয় না। আমরা এবার ইবলিস তাদের অন্তরে যে ছয়টি সন্দেহের জাল বিছিয়েছে সেগুলো বিশ্লেষণ করব :

১. প্রথম সন্দেহ হচ্ছে, তাদের কেউ একজন এ বিষয়ে জ্ঞাত হয়েছে যে, ঐশীদূতকে সবার থেকে গোপন রাখা হয়েছে। তারা বলে, مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مَّثْلُكُمْ ' এ ব্যক্তি আর কিছুই নয় কিন্তু তোমাদেরই মতো একজন মানুষ।" অর্থাৎ যে বিষয় সম্পর্কে সবাই অজ্ঞাত, তা কী করে প্রকাশ পেতে পারে? এর জবাব হচ্ছে, যদি এ সকল লোক মানবিক বিবেক-বোধ দ্বারা কথা বলে, তাহলে বলা হতো যে, তাদের জাতি থেকে এক ব্যক্তির কাছে এমন উত্তম গুণাবলি বিদ্যমান যা দ্বারা সে সবার চেয়ে অগ্রগামী হয়েছে। সুতরাং তার বিশেষ গুণের কারণে সে তার উপযুক্ত হতে পারে যে, তার ওপর অহী তথা ঐশী বার্তা আসে। প্রত্যেক মানুষ তো এর উপযোগী হয় না। সবার এটা জানা, আল্লাহ তায়ালা সব সৃষ্টিকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে বহু জাত থাকে। অনেকগুলো থেকে ঔষধ তৈরি হয়, যা দ্বারা শরীর আরোগ্য লাভ করে। তো, আল্লাহ তায়ালা যখন পাথর ও উদ্ভিদের মধ্যে এত উপকারী গুণ রেখেছেন, যা দ্বারা শরীরের কঠিন রোগ-বালাই ভালো হয়, যা প্রকৃতপক্ষে এই নশ্বর পৃথিবীতেই নিঃশেষ হয়ে যায়। তাহলে আখেরাতে এটা ঠিক রাখার জন্য তো এমন আরোগ্য বিধান আরও অধিক প্রয়োজন। সুতরাং এটা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয় যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে কিছু মানবকে সুউচ্চ প্রজ্ঞার সাথে বিশিষ্ট করবেন, যার দ্বারা সে মাখলুককে আল্লাহ তায়ালার দিকে আহ্বান করবে। আর মানুষের মাঝে অন্যায়-অনাচারের কারণে যে সকল ব্যাধির সৃষ্টি হয়েছে তার চিকিৎসা ও প্রতিবিধান বাতলে দেবেন। সুতরাং যারা নবুওয়তকে অস্বীকার করে তারা কেবল শয়তানের প্ররোচনায় পড়েই এমন করে থাকে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তায়ালা কিছু মানবকে এমন রিসালত ও অসিয়ত দ্বারা বিশিষ্ট করেছেন, যার মাধ্যমে মানুষ বিশ্বের শান্তি ও চরিত্রের শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা সেদিকে ইশারা করে বলেন, أَكَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا أَنْ أَوْحَيْنَا إِلَى رَجُلٍ مِّنْهُمْ أَنْ أَنذِرِ النَّاسَ "মানুষের জন্য এটা কি একটা আশ্চর্যের ব্যাপার হয়ে গেছে যে, আমি তাদেরই মধ্যে থেকে একজনকে নির্দেশ দিয়েছি, (গাফিলতিতে ডুবে থাকা) লোকদেরকে সজাগ করে দাও।"

২. নবুওয়ত অস্বীকারকারীরা বলে, আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাকে কেন রাসুল বানিয়ে পাঠালেন না? ফেরেশতারাই তো তাঁর অধিক নিকটবর্তী। তারা নবী হলে কোনো সন্দেহ থাকত না।

তিনভাবে এর জবাব দেয়া যায়- ক. ফেরেশতারা অতীব শক্তিশালী হওয়ার কারণে পাহাড়-পর্বতের মতো ভারী বস্তু ওলট-পালট করে দিতে পারে। এটা কোনো মুজেযার পর্যায়ে পড়ে না, যা তার সত্যতার দাবিতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে। মুজেযা সেটাই হয়, যা তার সচরাচর অভ্যাসের বিপরীত হয়। এতে তার সত্যতা সহজেই প্রমাণিত হয়।
খ. প্রত্যেক বস্তু তার নিজ জাতির দিকে অধিক ধাবিত হয়। সুতরাং মানুষের কাছে মানবজাতি থেকেই নবী হওয়া উচিত। এতে তাকে মানুষ ভয় বা ঘৃণা করবে না এবং তার কথাবার্তা বুঝবে। অতঃপর সেই জাতিভুক্ত বিশেষজনকে বিশেষ মুজেযা প্রদান করা হলে জাতি সহজেই তা স্বীকার করতে বাধ্য হবে।

গ. ফেরেশতাকে দেখার শক্তি মানুষের নেই। তাদের দেখলে মানুষ ভয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া নবীদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের সাথে প্রেরণ করতে চান। যেমন আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَجَعَلْنَاهُ رَجُلًاً “যদি ফেরেশতা পাঠাতাম তাহলেও তাকে মানুষের আকৃতিতেই পাঠাতাম।” পরে আরও বলেন, وَلَلَبَسْنَا عَلَيْهِم مَّا يَلْبِسُونَ “ “ “এবং এভাবে তাদেরকে ঠিক তেমনি সংশয়ে লিপ্ত করতাম যেমন তারা এখন লিপ্ত রয়েছে।”” অর্থাৎ যদি ফেরেশতাকে পুরুষ মানুষের আকৃতিতে পাঠানো হতো, তাহলে তারা জানতে পারত না যে, এ কী ফেরেশতা নাকি মানুষ!

৩. তৃতীয় সন্দেহস্বরূপ অস্বীকারকারীদের দাবি, নবীরা যে সকল মুজেযার দাবি করে, অদৃশ্যের যে সকল ইলমের কথা বলে এবং যে অহী বা প্রত্যাদেশ তারা প্রাপ্ত হন—আমরা তো দেখি এমন কর্মকাণ্ড জ্যোতিষী ও যাদুকরেরাও দেখিয়ে থাকে। সুতরাং কোন্ প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা বুঝে নেব যে, এটা মুজেযা; যাদু নয়। অতএব বিশুদ্ধ ও ভুয়ার মধ্যে পার্থক্যের আর কোনো প্রমাণ রইল না।

এর জবাবে আমরা বলব, আল্লাহ তা'য়ালা সন্দেহ দূর করার মতো বহু প্রমাণ বয়ান করেছেন এবং মানুষকে জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেচনার শক্তি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে সে যাদু ও মুজেযার মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করে নেবে। কোনো জাদুকরের কি মৃতকে জীবিত করার, লাঠিকে সাপ বানানোর সামর্থ্য বা কৌশল জানা আছে? রয়ে গেল জ্যোতিষীর কথা। তো, সে মাঝে মাঝে ঠিক বলে, আবার কখনো কখনো ভুল ভবিষ্যদ্বাণী দেয়। নবুওয়ত এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা এতে কোনো প্রকার ভুল বা ভ্রান্তির বিন্দু পরিমাণ অবকাশ নেই। (বিশেষ করে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিকরণের মতো ঘটনা আদৌ কোনো জাদুকর দেখাতে পারবে কি?)

৪. চতুর্থত নবুওয়ত অস্বীকারকারীরা বলে, নবীরা যা কিছু বলেন, তা আকলের বিপরীত। সুতরাং তা গ্রহণযোগ্য নয়। যদি আকলসিদ্ধ হয় তাহলে আকলই তো যথেষ্ট। এর জবাবে আমরা বলব, এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, অধিকাংশ মানুষ নিজেদের জাগতিক নেতৃত্বদানে অপারগ। তাদের জন্য একজন নির্বাহী পরিচালকের মতো জ্ঞানী লোক ও শাসনকর্তার প্রয়োজন পড়ে। সুতরাং ঐশী বিধি-বিধান এবং পরকালের ব্যাপারে কী করে অপারগ লোকেরা চিন্তা করবে? অতএব তাদের জন্য অহী বা ঐশী প্রত্যাদেশ অবশ্য জরুরি।

৫. পঞ্চম সন্দেহ হচ্ছে, শরিয়তে কিছু বিষয় এমন আছে, যেগুলোকে আমাদের মানবিক বোধ-বুদ্ধি ঘৃণা করে। যেমন, প্রাণী হত্যা। এটাকে শরিয়ত কীভাবে বৈধতা দিল?

তার উত্তরে আমরা বলতে পারি, অবশ্যই এক প্রাণী আরেক প্রাণীকে হত্যা বোধ-বুদ্ধি ও বিবেকের দৃষ্টিতে ঘৃণিত। কিন্তু যখন সৃষ্টিকর্তা এমন নির্দেশ প্রদান করেছেন, সেখানে বিবেকের অভিযোগ তোলার আর সুযোগ বা অবকাশ থাকে না।

৬. নবুওয়ত অস্বীকারকারীদের ষষ্ঠ সন্দেহ হচ্ছে, হতে পারে শরিয়তদাতা কিছু পাথর ও লাঠিতে সুনির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য রেখেছেন। আর এর মাধ্যমে এটাকে মুজিযা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

তদুত্তরে আমরা বলতে পারি, সন্দেহবাতিকদের কিছুটা লজ্জা থাকা চাই। কেননা উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতা দীর্ঘ সময় সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। তথাপি কোনো ব্যক্তি যদি সেই পাথর বা লাঠি পায় এবং তিনি তার বৈশিষ্ট্য উন্মোচিত করেন (যেমন মুসা আলাইহিস সালাম এর লাঠিতে কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল) তখন তা দেখে তখনকার লোকেরা বলত, এটা তোমার মুজেযা নয়; বরং লাঠি বা পাথরের বৈশিষ্ট্য। পরে জানা গেল, মুজিযা কেবল একটি বিষয়েই হয়নি, কয়েকভাবে হয়েছে। যেমন, পাহাড় থেকে উটনী বের হওয়া, মুসা আলাইহিস সালাম এর লাঠি সম্পূর্ণভাবে মস্তাকার সাপে রূপান্তরিত হওয়া, পাথর থেকে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হওয়া, এই পবিত্র কুরআন মাজিদ' যা আনুমানিক ছয়শত বছর অতিক্রম হওয়া সত্ত্বেও অবিকৃত অবস্থায় মানুষ কান দ্বারা তা শ্রবণ করে, অন্তর দ্বারা চিন্তা-গবেষণা করে। এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ধরা হয়েছিল যে, কুরআনের মতো একটি সুরা বা আয়াত নিয়ে আসো। তা সম্ভব হয়নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত সম্ভব হবেও না।

তাহলে কোথায় এ-সব মহাপবিত্র মুজেযা আর কোথায় জ্যোতিষী, জাদুকর!

আবুল ওয়াফা ইবনে আকিল রহ. বলেন, নাস্তিকদের একঘেয়েমির স্বরূপ এমন যে, তারা চায় যে কোনোভাবে যেন সত্যের কালিমা মুছে যায় এবং সৃষ্টির মাঝে শরিয়তের কোনো বিধান না থাকে, মানুষ যেন সে মতে আমল না করে। সে নাস্তিকদের মধ্যে দার্শনিক ইবনুর রাওয়ান্দী, কবি আবুল আলা আল মুয়াররা এবং তাদের মতো আরও অনেকে রয়েছে। তাদের হাজারো হীন চক্রান্ত সত্ত্বেও অভীষ্ট লক্ষ্যে তারা বিন্দু পরিমাণ এগোতে পারেনি।

উল্টো এসব কূপমন্ডুকদের প্রত্যাশার বিপরীতে পৃথিবীর দিকে দিকে বাড়ছে মসজিদ, বাড়ছে মুসল্লি সর্বত্র বাজছে শাশ্বত ইসলামের জয়গান। দৈনিক পাঁচবার সাধারণ মসজিদগুলোতে ইবাদতের জন্য আযান দেয়া হয়, নাস্তিকদের কানে তো দু'টি ছিদ্র ঠিকই আছে। তারা তা শুনতে পায়। মুসলমান হজের সময় নিজেদের জান, মাল, সময় কুরবানী করে দূর-দূরান্ত হতে হাজির হয় কা'বা প্রাঙ্গণে। এতে তারা নির্দ্বিধায় শত কষ্ট-ত্যাগ বরদাশত করে। তারপরও শরিয়তের নিদের্শ ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমলে ব্রতী হয়।

নাস্তিকদের ধোঁকাবাজি দেখুন! তাদের কেউ কেউ নকল আলেমদের কাছে কিছু পাপীকে লোভের ফাঁদে ফেলে মিথ্যা সনদের মাধ্যমে বানোয়াট কথাবার্তা শুনিয়ে তাদের গ্রন্থে প্রবেশ করায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবাদের যমানার ঘটনাবলিতে মিথ্যা ও বানোয়াট কথাবার্তার মিশ্রণ ঘটিয়ে আলেমদের ধোঁকা দেয়। কিছু নাস্তিক নিজ দায়িত্বে এ কাজটি আঞ্জাম দিয়ে থাকে। তারা মুজেযার মতো বিভিন্ন বস্তু আবিষ্কার করে বলে, অমুক দেশে এমন পাথর তৈরি হয়, যার মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, যা দ্বারা অত্যাশ্চার্য বস্তু বের হয়। এছাড়া বহু জ্যোতিষী দিয়ে নানাবিধ প্রোপাগান্ডা প্রচার করে।

আসওয়াদ ওয়াজ করার সময় এমন বহু ভবিষ্যদ্বাণী করত। বর্তমান যুগেও এমন বহু মানুষ দেখা যায়, যারা এমন এমন কথা বলে বেড়ায় যা কেবল উন্মাদের মস্তিষ্কেই ঠাঁই পাওয়ার যোগ্য। আবুল ওয়াফা বলেন, এরা এমন অনেক আশ্চর্য বিষয়াবলি বলে বেড়ায়, যা সাধারণ মানুষ শুনে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তারা জানে না-এ সব নাস্তিকদের কূটচাল। আগ বাড়িয়ে বলে, নবীর সময় এমন আশ্চর্য বিষয় দেখলে কি তারা অবিশ্বাস করত? "আর তোমরা যা আহার করো এবং তোমাদের ঘরে যা জমা করে রাখো তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।" এর কোনো অবকাশ কি বর্তমানে অন্তরে অবশিষ্ট আছে? আর এটা তো সাধারণ অভ্যাস, যার স্থিতি এখনও নিষিদ্ধ হয়নি। শায়খ বলেন, দেখুন! এই অজ্ঞরা কোন্ দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে? এসব লোক যা ভেবেছে তা তো প্রকাশ্য। আর যে দিকে ইঙ্গিত করেছে সেটাও উন্মুক্ত। অতঃপর তারা বলে, এসো, আমরা তোমাদেরকে এমন অনেক দেশ, ব্যক্তি, গ্রহ ও বিশেষ সূত্র বলে দেব, আর সহজেই অনুমেয়-ওই অধিকাংশ ঘটনার যে কোনো একটি তো সত্য হবে। আর যখন একটি সত্য মেনে নেয়া হবে, তখন সবগুলোই সত্য হিসেবে মেনে নেবে। কেননা সবগুলোই এক রকম। তখন নবীরা যে সকল স্বভাববিরোধী মুজেযা নিয়ে এসেছিলেন তা বাতিল বলে গণ্য হবে। এই দুষ্টু নাস্তিকেরা সুফিদের একটি দলকে কাছে টেনে নেয়, যারা বলে বেড়ায়-অমুক বুযুর্গ তার পাত্র দজলা নদীর দিকে ঝুঁকালে তার পাত্র সোনায় পরিণত হয়ে যায়। আর এটা কারামত হিসেবে সুফিদের অনিবার্য অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। জ্যোতিষীদের কাছে এটা অভ্যাসের মতো। প্রকৃতিবিদদের মতে এটা বিশেষ বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারণদের কাছে যাদু হিসেবে পরিগণিত। তাহলে ঈসা আলাইহিস সালাম এর বাক্য:
“আর তোমরা যা আহার করো এবং তোমাদের ঘরে যা জমা করে রাখো তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবো” এর প্রতিবিধান কী? এতে অভ্যাসবিরোধী কী দেখা দিল? কেননা এটা তো বরাবরই হয়ে থাকে। অভ্যাস তাকে বলে, যা গতানুগতিক সর্বদা চালু থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। অতঃপর কোনো বুদ্ধিমান দীনদার ব্যক্তি এতে ফাসাদ আছে বলে সাবধান করলে ধোঁকাবাজ সুফি বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তুমি আল্লাহর অলীদের কারামত অস্বীকার করো? এটাকে স্বাভাবিক অভ্যাস বলো? তুমি কি বিশিষ্টদের অস্বীকার করে লোহা মোমে রূপান্তর হওয়া, অগ্নি থেকে প্রাণী বের হওয়াকে স্বাভাবিক মনে করো? শেষে তারা বাস্তব ঘটনা দেখে মিথ্যা প্রতিপন্ন হলেও চুপ থাকে। তো, আসল কথা হচ্ছে সময়ের নাস্তিকেরা এতে ভীষণ বিচলিত। একদিকে মনস্তাত্ত্বিক নাস্তিকতার প্লাবন, অন্যদিকে যাদুকর ও জ্যোতিষী। এদের কথাকে দেশের শাসকবর্গ ও মন্ত্রী- উজিরেরা বিনা বাক্যব্যয়ে বিশ্বাস করে থাকে।

এ-সব মহা ফিতনা থেকে মহান আল্লাহ তায়ালা এই মিল্লাতে হানীফা তথা মধ্যপন্থী জামাতকে হেফাজত করে থাকেন। তার কালিমা সুউচ্চ রাখেন। এভাবে বাতিলরা তাঁর গজবের প্লাবনে ভেসে যায়। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আহকামে নবুওয়তের সাহায্যকারী এবং বাতিলকে ধুলোয় উড়িয়ে দেন।

টিকাঃ
৪. ॐ বা ওঁকার (অপর বানানে ওঙ্কার) বা প্রণব, সনাতন হিন্দুধর্মের পবিত্রতম ও সর্বজনীন প্রতীক। এটি হিন্দু দর্শনের সর্বোচ্চ ঈশ্বর ব্রহ্মের বাচক। এই ধর্মের প্রতিটি সম্প্রদায় ও উপসম্প্রদায়ের নিকটেই এটি পবিত্র বলে গণ্য। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, ওঁ-কার "সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক, ঈশ্বরেরও প্রতীক।"
৫. সুরা মুমিনুন: আয়াত ২৪।
১. সুরা ইউনুস: আয়াত ২
২. সুরা আন'আম: আয়াত ৯
৩. সুরা আন'আম: আয়াত ৯
১. যা চৌদ্দশত বছরের অধিক সময় অবিকৃত অবস্থায় রয়ে গেছে।
১. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৪৯
২. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৪৯

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 নবুওয়ত অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে কিছু কথা

📄 নবুওয়ত অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে কিছু কথা


হিন্দুস্তানের ব্রাহ্মণদের একটি দল আছে, যাদের মনে শয়তান এভাবে ফাঁদ এঁকেছে যে, নিজের প্রাণ পুড়িয়ে দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করো। সুতরাং কেউ মারা গেলে তার জন্য গর্ত খোঁড়া হয় আগুনে পোড়ানোর জন্য। বহু লোক এতে সমবেত হয়। ধূপ দিয়ে সুবাসিত করা হয়। ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মৃত প্রাণের সৎকার করা হয়। মনে করা সে স্বর্গের শিখরে আরোহণ করবে। তারা বলে তোমার এই ত্যাগ কবুল হোক। আমার স্থান স্বর্গে হোক। পরে সে নিজেকে নিজে গর্তে নিক্ষেপ করে এবং জ্বলে-পুড়ে কালো অঙ্গার হয়ে যায়। যদি কেউ সেই আগুনে ঝাঁপ না দিয়ে পালিয়ে যায়, তাহলে তাকে বিভিন্নভাবে তিরস্কৃত করা হয় এবং সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়। পরে সে অপারগ হয়ে জ্বলে-পুড়ে মরার জন্য তৈরি হয়।

কারো কারো জন্য একটি পাথর গরম করে তা পেটে রাখা হয়। দ্বিতীয়বার আবার এরূপ করা হয়। এভাবে গরম পাথর লাগাতেই থাকে। একসময় তার পেট ফেটে যায় এবং পেটের অস্থি-মজ্জা সব বেরিয়ে পড়ে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কেউ আগুনের এত নিকটে দাঁড়ায় যে, তার চর্বি গলে গলে পড়তে থাকে এবং এভাবে সে মারা পড়ে।

কারো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ টুকরো টুকরো করে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। মানুষ তার প্রশংসা করতে থাকে এবং তার মতো সম্মান প্রার্থনা করতে থাকে। শেষে সে অনিবার্য মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। কেউ গাভির গোবরের গর্তে কোমর বরাবর দাঁড়িয়ে থাকে। তাতে আগুন ঢেলে দেয়া হয় আর সে জ্বলে- পুড়ে মরে যায়। কিছু কিছু হিন্দু গোত্রে জল-পূজা করে এবং বলে পানির দ্বারা প্রাণ বেঁচে থাকে। সুতরাং তারা পানি সিজদা করে। কারো কারো জন্য পানির কাছে গর্ত খোঁড়া হয়। সে গর্তে পড়ে যায়। ওদিকে গর্তে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সেখান থেকে সে ওঠে পানির কাছে যেতে চায়। পরে পানি থেকে আবার গর্তে দৌড়ে যায়। এমন করতে করতে একসময়ে সে মারা যায়। লোকটি যদি পানি ও গর্তের মাঝামাঝি মারা যায়, তখন মানুষজন তার জন্য আক্ষেপ করে বলে, সে স্বর্গ হতে বঞ্চিত হলো। যদি সে পানি বা গর্তে মারা যায়, লোকেরা তার স্বর্গবাসী হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষী দেয়।

এদের কেউ কেউ ক্ষুধা-পিপাসার তীব্রতায় প্রায় বিসর্জন দেয়। অতএব শুরুতে তারা চলাফেরা করতে পারে না, তাই বসে যায়। একসময় আর বসে থাকাও সম্ভব হয় না, তখন মৃত মানুষের মতো শুয়ে থাকে। পরে তার মুখ দিয়ে আর কথা বের হয় না। পাকস্থলীর যন্ত্রণায় একসময় সে প্রচণ্ড চিৎকার করতে থাকে। চিৎকার বন্ধ হলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

তাদের এক দল জমিনের ওপর উদাসীন হয়ে আমরণ পড়ে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্ত্রীদের কাছে যায় না। সম্পূর্ণ উলঙ্গাবস্থায় কেবল একটি লেংটিজাতীয় টুকরো পরে চলাফেরা করে।

হিন্দুস্তানে উঁচু একটি পাহাড় আছে। তার নিচে এক গাছতলায় জনৈক ব্যক্তি কিতাব দেখে পড়তে থাকে—শুভ পরিণাম ওই ব্যক্তির, যে এই পাহাড়ের ওপর ওঠে নিজের পেট কেটে নিজ হাতে তার হৃৎপিণ্ড বের করতে পারবে। এদের কেউ কেউ মস্ত বড় এক পাথরখণ্ডের সাথে নিজেকে আঘাত দিতে দিতে মারা যায় আর লোকেরা তার জন্য শুভাশিস জানায়।

হিন্দুস্তানে গঙ্গা ও যমুনা নামে দু'টি নদী আছে। যে-সকল যোগী সন্ন্যাসী পাহাড়-পর্বতে অবস্থান করে, তারা ঈদের দিন বের হয়ে ওখানে যায়। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু লোক আছে, যারা এ সকল যোগী ও সাধু-সন্ন্যাসীদের কাপড় ইত্যাদি খুলে তা দু'টুকরো করে ফেলে। এক টুকরো গঙ্গায়, আরেক টুকরো যমুনায় ভাসিয়ে দেয়। তাদের ধারণা—এই দু'টি নদী সোজা গিয়ে স্বর্গে ঠেকেছে।

আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি রহ. এর সাথে দীর্ঘ কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন। যা এখানে উদ্ধৃত করা সময় অপচয়ের নামান্তর। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, হিন্দুস্তান থেকে মুসাফির ব্যক্তিরা হেকমতের বিষয়াশয় অর্জন করতেন। হিন্দুস্তানের লোকজন এমন অন্ধ জগতে বসবাস করছে যেখানে শয়তান অনায়াসে তার চক্রান্তের জাল বিস্তার করতে সক্ষম হচ্ছে, যার কিছু। নমুনা বর্ণনা করা হলো। আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি বলেন, হিন্দুদের কোনো কোনা গোত্র মনে করে জান্নাতের ৩২টি দরজা আছে, যদি কোনো জান্নাতি সবার নিচে অবস্থিত দরজায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার ছয়শত চব্বিশ বছর অবস্থান করে তবে সে উপরে উঠতে পারবে। পরবর্তী প্রতিটি দরজা এ হিসেবের দ্বিগুণ আকারে সাব্যস্ত হবে। অনুরূপভাবে জাহান্নামেরও ৩২টি দরজা আছে। সেখানে সর্বমোট ১৬ বার যামহারির ইত্যাদির মতো বিভিন্ন ধরনের সাজা ভোগ করতে হবে। আর বাকি ১৬ বার আগুনে পোড়ার মতো ভয়ংকর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00