📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 গ্রহণজালারিদের ওপর শয়তানের অভিনব ধোঁকা

📄 গ্রহণজালারিদের ওপর শয়তানের অভিনব ধোঁকা


সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের মূর্তি তৈরি করে তার পূজা-অর্চনাকারীরা বলে, ঊর্ধ্বজগতের আত্মাসমূহের প্রত্যেকটির একটি করে দেহ রয়েছে। যেভাবে আমাদের প্রত্যেকের রুহের জন্য একটি বিশেষ দেহ রয়েছে। আমরা সে-সব আত্মা পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম না বিধায় তাদের দেহের নমুনা তৈরি করে তার পূজা করি, তাকে ভোগ দান করি এবং তার জন্য উৎসর্গ করি। এর জন্য ঘর নির্মাণ করি।

ইয়াহইয়া ইবনে বিশর নাহাভান্দির বর্ণনামতে, তাদের এক সম্প্রদায় বলে, সাতটি গ্রহ-নক্ষত্র তথা—শনি, বৃহস্পতি, মঙ্গল, শুক্র, বুধ, চন্দ্র ও সূর্য—এগুলো জগতের নিয়ন্ত্রক। উক্ত সম্প্রদায় প্রত্যেকটির একটি করে মূর্তি তৈরি করে তার আকৃতির সাথে সাদृশ্যপূর্ণ একটি প্রাণী তার জন্য উৎসর্গ করে থাকে। শনি গ্রহের একটি অন্ধ মূর্তি তৈরি করে। অতঃপর তার জন্য একটি বৃদ্ধ বলদ উৎসর্গ করে। বলদকে একটি গর্তে ফেলে অগ্নিদগ্ধ করে আর বলে, হে অন্ধ মাবুদ! তুমি পবিত্র। তবে তোমার মন্দ প্রকৃতি রয়েছে, যা কখনো ভালো কাজ করে না। আমরা তোমার জন্য তোমার সাদৃশ্যপূর্ণ একটি ভোগ উৎসর্গ করলাম। তুমি এটা গ্রহণ করে আমাদেরকে স্বীয় মন্দ ও অশিষ্টকর বিষয় থেকে নিরাপদে রেখো।

একটি দুগ্ধপায়ী শিশু বৃহস্পতি গ্রহের জন্য উৎসর্গ করে। তার নিয়ম হচ্ছে, প্রথমে একজন বাঁদি ক্রয় করে। তার সাথে সপ্ত মূর্তির খাদেমরা সংগম করে। সে প্রসবের পর নবজাত শিশুকে বিশেষ পদ্ধতিতে উক্ত মূর্তির জন্য উৎসর্গ করে আর বলে, হে কল্যাণের উপাস্য! আপনি মন্দ বিষয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আপনার জন্য আপনার মতো একটি নিষ্পাপ ভোগ উৎসর্গ করলাম। আপনি আমাদের কাছ থেকে এটা গ্রহণ করে আপনার কল্যাণময় আত্মা থেকে আমাদের কিছু দান করুন।

মঙ্গলের জন্য একজন কালো বর্ণের ব্যক্তিকে উৎসর্গ করে। ওই ব্যক্তিকে তারা একটি হাউজের ভেতর প্রবেশ করায়। হাউজের ভেতর পেরেক থাকে। পেরেকে তাকে ভালো করে বাঁধা হয়। যাইতুন তেল দ্বারা হাউজটি পূর্ণ করা হয়। একজাতীয় ঔষধ এতে মেশানো হয়; যাতে তার স্নায়ুতন্ত্রগুলো শক্তিশালী হতে পারে। ভালো মানের খাবার খাইয়ে তাকে হৃষ্টপুষ্ট করা হয় এবং চর্বি বৃদ্ধি পায়। এক বছর ধরে এভাবে খাবার পর তার দেহের চর্বিগুলো পৃথক করে মাথার নিম্নাংশে একত্র করে মঙ্গলের মূর্তির কাছে উপস্থাপন করে বলে, হে মন্দ ও অনিষ্টের উপাস্য! তোমার অনুরূপ একটি ভোগ তোমার জন্য উৎসর্গ করলাম। তুমি এটা গ্রহণ করে তোমার মন্দ আত্মার অনিষ্ট থেকে আমাদেরকে রক্ষা করো।

পূর্বে উল্লেখিত যে নিষ্পাপ শিশুকে বৃহস্পতির জন্য উৎসর্গ করা হয়েছিল, তার মাকে সূর্যের জন্য উৎসর্গ করা হয়। তাকে সূর্যের প্রদক্ষিণ করানো হয়। অতঃপর সূর্যের মূর্তিকে সম্ভোধন করে বলে, হে জ্যোতিষ্ক উপাস্য! তুমি প্রশংসনীয়। তোমার অনুরূপ একটি ভোগ তোমার জন্য উৎসর্গ করেছি। তুমি আমাদের ভোগ গ্রহণ করে আমাদেরকে তোমার কল্যাণ দান করো।

এভাবে শুক্রের জন্য একজন অর্ধ বয়স্কা বোবা মহিলাকে উৎসর্গ করে। তাকে ওই মূর্তির কাছে নিয়ে বলে, হে নির্বাক উপাস্য! তোমার জন্য তোমার অবিকল একজন সুশ্রী ও নির্বাক মহিলাকে উৎসর্গ করেছি। তুমি আমাদের ভোগ গ্রহণ করো। এরপর লাকড়ি এনে মহিলার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেলে কিছু ভস্ম মূর্তির মুখে মেখে দেয় গ্রহপূজারিরা।

একজন শিক্ষিত, জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান যুবককে তারা বুধ গ্রহের জন্য উৎসর্গ করে। বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে তাকে হাজির করা হয়। তাকে এমন ঔষধ সেবন করানো হয়, যার ফলে তার জ্ঞান লোপ পেয়ে যায় এবং বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। তাকে সে মূর্তির সামনে পেশ করে বলে, হে বুদ্ধিমান উপাস্য! তোমার জন্য তোমার মতো বুদ্ধিমান যুবক ভোগ নিয়ে এসেছি। তুমি আমাদের ভোগ গ্রহণ করে নাও। এরপর ওই বুদ্ধিমান যুবককে কেটে চার টুকরো করা হয়। মূর্তির চারপাশে চারটি লাকড়ি পুঁতে এক একটি লাকড়ির মাথায় এক একটি টুকরো ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এটি পুড়ে ভস্ম হয়ে গেলে তা মূর্তির মুখে মাখিয়ে দেয়া হয়।

এভাবে চাঁদের জন্য বড়সড় চেহারাবিশিষ্ট এক লোককে উৎসর্গ করা হয়। তাকে ডেকে বলা হয়, হে উপাস্যদের ডাকপিয়ন! হে ঊর্ধ্বজগতের সর্বাপেক্ষা হালকাদেহী!

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 মূর্তিপূজারিদের ওপর শয়তানের ফাঁদ

📄 মূর্তিপূজারিদের ওপর শয়তানের ফাঁদ


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইবলিস মানুষকে তার ফাঁদে আটকানোর সময় মানুষের হৃদয়-কুঠরিতে কিছু সন্দেহ ঢেলে দেয়। তখন সে প্রবৃত্তির দাসত্ব করে থাকে। বিবেক-বুদ্ধি যে কাজে প্রলুব্ধ করে সেখান থেকে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। 'হাওয়াস' তথা পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তখন ইবলিস মানুষকে চেহারা-আকৃতি তথা মূর্তিপূজার দিকে ধাবিত করে। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি একেবারে লোপ করে দেয়। এদের কাউকে এই প্রবোধ দেয় যে, এ সকল মূর্তি তোমাদের দেবতা ও উপাস্য। আহমকেরা তা মেনে নেয়। যাদের কাছে সামান্য জ্ঞান-বুদ্ধি আছে, তারা জানে যে, এসব লোক আমাদের কথা মানবে না। তাই তারা আহমকদের আর বাধা দেয় না। তারা বলে, যদি তোমরা এ সব মূর্তি ও প্রতিমার পূজা-অর্চনা করো, তবে তা তোমাদেরকে সৃষ্টিকর্তার নিকটবর্তী করে দেবে। এদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের এসেছে :
مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى
'আমরা এদের পূজা করি না, কিন্তু এ জন্য করি, যাতে সে আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়।'

টিকাঃ
১. الحواس الخمسة : পঞ্চেন্দ্রিয়কে 'আলহাওয়াসসুল খামসা' বলা হয়। 'হাওয়াস' শব্দটি 'হাসাতুন' শব্দের বহুবচন। এর অর্থ ইন্দ্রিয়। যার দ্বারা কোনো বস্তু সম্পর্কে ধারণা লাভ করা হয় তাকে 'হাওয়াস' বলা হয়। তা দু'প্রকার : প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য। প্রকাশ্য ইন্দ্রিয় হলো পাঁচটি, যথা- চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও স্পর্শ। একইভাবে অপ্রকাশ্য ইন্দ্রিয়ও পাঁচটি, যথা- الحواس المشترك কোনো বস্তুর আকৃতি অনুধাবনের শক্তিকে 'আল-হাওয়াসুল মুশতারাক' বলা হয়। الخيال : অনুধাবনকৃত আকৃতির সংরক্ষণের স্থানকে 'খায়াল' বলা হয়। المتصرفة: সংরক্ষণ-স্থানের পরিচালনাকারী শক্তিকে 'আল-মুতাসাররিফাহ' বলা হয়। الواهمة: এমন এক শক্তি, যা ব্যক্তিগত বোধসমূহকে অনুধাবন করে। الحافظة ধারণাশক্তিকে অনুধাবনের খাজানাকে 'হাফেজা' বলা হয়। তর্ক শাস্ত্রবিদদের পরিভাষায় এ পঞ্চেন্দ্রিয়কে 'وجدانیات' বলা হয়।
২. সুরা যুমার: আয়াত ৩

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 মূর্তিপূজারি ও ওপর ইবলিসের ফাঁদের সূচনা

📄 মূর্তিপূজারি ও ওপর ইবলিসের ফাঁদের সূচনা


হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সায়েব কালবী কর্তৃক বর্ণিত, হিশাম বলেন, আমার পিতা বলেছেন: সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা করা হয় আদম আলাইহিস সালাম-এর তিরোধানের পর। শীশ এর সন্তানরা আদম আলাইহিস সালাম-কে ভারতের' 'ইয়াজ' নামক পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বরতম ও সবুজাভ সেই পর্বতের গুহায় দাফন করে, যেখানে তাঁকে বেহেশত থেকে অবতরণ করানো হয়েছিল। হিশাম বলেন, আমার পিতা আমাকে বলেছেন, তিনি আবু সালেহ থেকে এবং তিনি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন 'আদম আলাইহিস সালাম এর ছেলে শীশ এর সন্তানরা সে গুহাতে আদম আলাইহিস সালাম এর শরীরের পার্শ্বে আগমন করে এর সম্মান করত এবং তাঁর জন্য আল্লাহ তায়ালার রহমত কামনা করত। এদের এ অবস্থা দেখে কাবিলের সন্তানদের একজন বলল, হে কাবিলের সন্তানগণ! বনি শীশদের একটি তাওয়াফ করার স্থান রয়েছে যার চার পার্শ্বে তারা তাওয়াফ করে এবং এটাকে তারা সম্মান করে, অথচ তোমাদের এ ধরনের কিছু নেই। তাই সে তাদের জন্য একটি মূর্তি তৈরি করল এবং সে-ই হলো প্রথম মানুষ, যে মূর্তি তৈরি করল।'

হিশাম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, 'ওয়াদ্দ' 'সুয়া' "ইয়াগুছ' 'ইয়াউক' ও নসর' এরা সকলেই সৎ মানুষ ছিলেন। তারা সকলেই এক মাসের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তাঁদের স্বজনরা তাঁদের জন্য খুবই বেদনার্ত হয়। তাদের এ অবস্থা দেখে কাবিল গোত্রের এক ব্যক্তি বলল, আমি কি তোমাদের জন্য তাঁদের আকৃতিতে আত্মাবিহীন পাঁচটি মূর্তি তৈরি করে দেব? তারা সবাই এতে সম্মত হলে সে তাদের জন্য তাঁদের আকৃতিতে পাঁচটি মূর্তি নির্মাণ করে দিল। এর পর লোকেরা তাদের রক্তের সম্পর্কানুযায়ী এ মূর্তিগুলোর নিকটে এসে এগুলোকে নিজের ভাই, চাচা ও চাচাতো ভাই এর মতো মনে করে এগুলোকে সম্মান ও এর চার পার্শ্বে তাওয়াফ করতে থাকল। এ অবস্থার উপর এ যুগ অথবা এ প্রজন্ম অতিবাহিত হয়ে যায়। এ মূর্তি নির্মাণ করা হয় ইয়াজাজ ইবনে মাহলাইল ইবনে কাইনান ইবনে আনুশ ইবনে শিশ ইবনে আদম আলাইহিস সালাম এর যুগে। এরপর দ্বিতীয় যুগ বা প্রজন্ম আসলে তারা এ মূর্তিগুলোকে প্রথম প্রজন্মের বা যুগের চেয়ে আরও অধিক পরিমাণে সম্মান প্রদর্শন করে। এরপর আসে তৃতীয় যুগ বা প্রজন্মের লোকেরা, তারা বলল, প্রথম যুগের জনগণ আল্লাহ তায়ালার নিকট এ পাঁচটি মূর্তির শাফায়াত প্রাপ্তির আশায় এঁদের সম্মান করেছে। এ মনে করে এ মুর্তিগুলোর উপাসনা করার ফলে তারা এগুলোর মান-মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করে। এভাবে তাদের কুফরী কার্যকলাপ মারাত্মক আকার ধারণ করলে অবশেষে আল্লাহ তায়ালা ইদ্রীস আলাইহিস সালাম-কে তাদের নিকট সর্বপ্রথম নবী হিসেবে প্রেরণ করে তাদেরকে তাওহিদের প্রতি আহ্বান জানান, কিন্তু তারা তাঁকে অস্বীকার করে। ফলে আল্লাহ তায়ালা ইদ্রীস আলাইহিস সালাম-কে সমুন্নত স্থানে উঠিয়ে নেন। কালবী আবু সালেহ থেকে এবং আবু সালেহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে যে বর্ণনা করেছেন, সে অনুযায়ী বনি আদমের অবস্থা নুহ পর্যন্ত এভাবে গুরুতর থেকে গুরুতর হতে থাকে, অবশেষে আল্লাহ নুহ আলাইহিস সালাম-কে তাদের নিকট রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেন।'

এ ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো আমাদেরকে মোটামুটিভাবে এ প্রমাণ দিচ্ছে যে, তাওহিদ থেকে অংশীবাদের দিকে মানুষের পথভ্রষ্টতার সূত্রপাত হয় সৎ মানুষদের (যারা সাধারণ মানুষদের পরিভাষায় আউলিয়া) কবরসমূহে প্রারম্ভে অবস্থান গ্রহণ এবং পরবর্তীতে তাঁদেরকে স্মরণ ও আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে আগ্রহ লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের মূর্তি নির্মাণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে পরবর্তী প্রজন্মের লোকদের কাছে সেই সৎ মানুষদের মূর্তি নির্মাণের পিছনে তাদের পূর্বপুরুষদের কী উদ্দেশ্য ছিল, তা হারিয়ে যায়। এর সাথে সংযোজিত হয় আল্লাহর রুবুবিয়্যাত সম্পর্কিত ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব। সে কারণে তারা পথভ্রষ্টতার দিকে অনেক দূর এগিয়ে যায়। এভাবে তারা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে আল্লাহর উলুহিয়্যাত ও রুবুবিয়্যাতে শিরকি কর্মে নিমজ্জিত হয়েছিল।

আদম সন্তানদেরকে এভাবে পথভ্রষ্ট করার মাধ্যমে শয়তান প্রত্যেক যুগে বনি আদমকে পথভ্রষ্ট করার পদ্ধতি ও কৌশল সম্পর্কে অবগত হয়ে যায় এবং পরবর্তী প্রতিটি জাতিকে শিরকে নিমজ্জিত করার ক্ষেত্রে সে তার পরিচিত এই পদ্ধতি ও কৌশল প্রয়োগ করতে থাকে। যদিও যুগের চাহিদানুযায়ী প্রয়োজনের নিরিখে এ পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সে নিত্যনতুন পন্থা অবলম্বন করেছে। কুরআনুল কারিম আমাদের জন্য এ কথার উত্তম সাক্ষ্য যে, শয়তান এ পদ্ধতি প্রয়োগ করেই অতীতে হুদ, সালেহ, ইব্রাহীম, মুসা ও ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জাতিসমূহকে পথভ্রষ্ট করেছিল। তাদেরকে নিজ হাতে তৈরি মূর্তিসমূহের ব্যাপারে একই ধরনের ধারণা ও উপাসনায় লিপ্ত করেছিল। শয়তান এভাবে যুগের পর যুগ ধরে বনি আদমকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তার সেই পূর্ব প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করে চলেছে। তার এ প্রচেষ্টার ফলে যে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-একনিষ্ঠ তাওহিদের অনুসারী ও ঘোষণাকারী ছিলেন, একসময় সে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-এর বংশধরদেরকেও সে পথভ্রষ্টতার অতলতলে নিক্ষেপ করেছিল। মহান আল্লাহ একান্ত অনুগ্রহে শেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণ করার ফলে দীনে ইব্রাহীমের অনুসারী বলে দাবিদার অনুসারীদের মধ্যে পুনরায় তাওহিদের পতাকা উড্ডীন হয়েছিল; কিন্তু শয়তানের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে সেই তাওহিদী বিশ্বাসের মাঝেও সুদূর অতীতকাল থেকেই শয়তান পুনরায় শিরকি চিন্তা-ভাবনা ও কর্মের অনুপ্রবেশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।

ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বড় হয়ে জনগণকে তাঁর পিতা ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-এর দীনের প্রতি আহ্বান জানান। ফলে সে সময়ের অধিকাংশ লোকই তাঁর অনুসারী হয়ে গিয়ে মহান আল্লাহর উলুহিয়্যাত ও রুবুবিয়্যাতে সম্পূর্ণরূপে তাওহিদে বিশ্বাসী হয়ে যায়। যুগের আবর্তনে যখন তাদের মধ্যে কয়েক প্রজন্ম অতিক্রান্ত হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন যাবৎ ধর্ম সম্পর্কে তারা নতুন করে কোনো শিক্ষা পায়নি, তখন তারা ধর্মের অনেক বিষয়াদি ধীরে ধীরে ভুলতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের মাঝে শুধু তাওহিদী বিশ্বাস এবং ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-এর স্মৃতি-বিজড়িত কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও নিদর্শনাদি ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি। অবশেষে তারা তাওহিদী বিশ্বাস থেকেও বিচ্যুত হয়ে মূর্তিপূজা করার ফলে মুশরিকে পরিণত হয়। তাদের মাঝে প্রতিমাপূজার মাধ্যমে শিরকি কর্মকাণ্ডের সূচনা হয় কাবা শরিফের সম্মানে এর পার্শ্ব থেকে সংগৃহীত পাথরের চার পার্শ্বে তাওয়াফ করার মাধ্যমে, যা তারা মক্কা থেকে দূর-দূরান্তে হিজরত করার সময় সাথে করে নিয়ে অবতরণস্থলের এক পার্শ্বে স্থাপন করত। তাদের মাঝে ইব্রাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর ধর্মের কিছু বিষয়াদি যেমন, কাবা শরিফের সম্মান করা, এর তাওয়াফ, হজ্জ ও উমরা করা, সাফা ও মারওয়াহ পর্বতদ্বয়ে সায়ী করা, আরাফা ও মুযদালিফায় অবস্থান গ্রহণ করা, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে উট ও বকরি কুরবানী বা উৎসর্গ করা-ইত্যাদি কর্ম প্রচলিত ছিল। যদিও এ সব ক্ষেত্রে তারা নিজ থেকে কিছু বিষয়াদি সংযোজন ও বিয়োজন করেছিল, যা মূল ধর্মীয় কর্মের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

এরপর তাদের ধর্মীয় অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। তাদের মাঝে মূর্তিপূজার মাধ্যমে শিরকি কর্মকাণ্ড শুরু হয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রেসালত লাভের প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে খুযায়াহ গোত্র প্রধান ও মান্যবর ব্যক্তিত্ব আমর ইবনে লুহাই এর মাধ্যমে। ঐতিহাসিক ইবনে হিশামের বর্ণনামতে, আমর ইবনে লুহাই কোনো উপলক্ষে মক্কা থেকে সিরিয়া গমন করে সেখানকার লোকদেরকে কতিপয় মূর্তির পূজা করতে দেখে বলে, এ মূর্তিগুলো কী, যাদের আপনারা উপাসনা করছেন? উত্তরে লোকেরা বলল, এদের কাছে বৃষ্টি চাইলে এরা আমাদেরকে বৃষ্টি দান করে, সাহায্য চাইলে তারা আমাদের সাহায্য করে। এ কথা শুনে আমর ইবনে লুহাই বলল, এদের মধ্য থেকে একটি মূর্তি আমাকে দান করুন, আমি সেটিকে আরব দেশে নিয়ে যাব, ফলে আরবরা এর উপাসনা করবে। এতে লোকেরা তাকে 'হুবল' নামের একটি মূর্তি দান করে। অতঃপর সে তা নিয়ে মক্কায় আগমন করে এবং তা কাবা শরিফের নিকটতম এক স্থানে সম্মানের সাথে স্থাপন করার পর আরব জনগণকে এর উপাসনা ও সম্মান করার জন্য নির্দেশ করে।

এ আমর ইবনে লুহাই ছিল জিন-সাধক। সে তার অনুগত জিন এর পরামর্শ অনুযায়ী নুহ আলাইহিস সালাম-এর জাতির উপাস্য সেই মূর্তিগুলো জেদ্দা এলাকা থেকে মাটি খনন করে বের করে নিয়ে আসে। সেগুলোকে নুহ আলাইহিস সালাম-এর সময়কার প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও তুফান এতদঞ্চলে বহন করে নিয়ে এসেছিল। ধীরে ধীরে বন্যার পানি নেমে যাবার সময় এগুলো জেদ্দা এলাকার চরাঞ্চলে আটকা পড়েছিল এবং পরবর্তীতে তা বালুর নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। আমর ইবনে লুহাই তার অনুগত জিনের পরামর্শে এগুলোকে বের করে নিয়ে এসে হজ্জের মৌসুমে আরব জনগণকে এগুলোর উপাসনা করার প্রতি আহ্বান জানায়। লোকেরা এতে তার আনুগত্য করলে সে বিভিন্ন গোত্রের মাঝে তা বণ্টন করে দেয়। সে অনুযায়ী 'ওয়াদ' (وَدْ) নামের মূর্তিটি ছিল দাওমাতুল জানদাল এলাকার 'কালব' গোত্রের নিকট, 'সুয়া' (سواع) নামের মূর্তিটি ছিল 'হুজায়েল' গোত্রের নিকট, 'য়াগুছ' (یغوث) নামের মূর্তিটি ছিল 'মুরাদ' গোত্রের নিকট, 'ইয়াউক' (يعوق) নামের মূর্তিটি ছিল হামাদান গোত্রের নিকট, আর 'নাছর' (نسر) নামের মূর্তিটি ছিল ইয়ামনের 'হিময়ার' গোত্রের নিকট। এ পাঁচটি মূর্তির পাশাপাশি 'আরব জনপদে আরও অসংখ্য মূর্তি ছিল।

হজরত আদম আলাইহিস সালাম স্বীয় প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার প্রাক্কালে তাঁর সন্তানদেরকে সঠিক ধর্মের ওপরে একই মুসলিম জাতিভুক্ত রেখে গেছেন। তখন তাদের ধর্ম ছিল এক ও অভিন্ন এবং মহান আল্লাহই ছিলেন তাদের একক রব ও উপাস্য। তাদের মাঝে এ অবস্থা পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত বিরাজমান ছিল। কালের পরিক্রমায় যখন তাদের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষার অবনতি ঘটে, তখন তাদের চিরশত্রু শয়তান তাদের পিতা-মাতার বিরুদ্ধে যেভাবে ষড়যন্ত্র করেছিল ঠিক সেভাবেই তাদের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল এবং অবশেষে তাদেরকে মু'মিন ও মুশরিক দু'টি দলে বিভক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, 'মানুষেরা তো (ধর্মের দিক থেকে প্রারম্ভে) একই জাতিভুক্ত ছিল, অতঃপর তারা (এ ক্ষেত্রে) মতবিরোধে লিপ্ত হয়।”

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মানুষেরা দীর্ঘ এক সময় পর্যন্ত একই ধর্ম ও একই বিশ্বাসের উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে তাদের মাঝে এ বিষয়ে মতভেদের সূত্রপাত হয়। এতে কিছু লোক পূর্বের ন্যায় তাওহিদী বিশ্বাসের ওপরেই বহাল থাকে, আর কিছু লোক সে বিশ্বাসের পরিপন্থী কর্মে লিপ্ত হয়। আমরা হাদিস দ্বারা অবগত হয়েছি যে, আদম আলাইহিস সালাম থেকে নুহ আলাইহিস সালাম পর্যন্ত দশ যুগ বা প্রজন্মের সকল লোক ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। উক্ত হাদিসে বর্ণিত 'আশারাতু করুন' এর অর্থ এক হাজার বছরও হতে পারে, আবার দশ প্রজন্মের লোকও হতে পারে। তবে 'আল-ইসলাম' শব্দের দ্বারা এ যুগকে সীমাবদ্ধ করাতে প্রথম অর্থই অগ্রগণ্য বলে মনে হয়। কারণ, এতে মনে হয় যে, মানুষেরা এ সময়সীমা পর্যন্ত ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং আদম ও নুহ আলাইহিস সালাম এর মাঝে পরবর্তী আরও অনেক যুগ রয়েছে, যাতে সকল লোকেরা ইসলামের ওপর একমত ছিল না; বরং পরবর্তীতে তারা মুমিন ও কাফের এ দু'দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে তাদেরকে সংশোধনের জন্যে প্রথমে আল্লাহ তায়ালা ইদ্রীস আলাইহিস সালাম-কে তাদের নিকট নবী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। এরপর প্রথম রাসুল হিসেবে শরিয়ত দিয়ে নুহ (আলাইহিস সালাম)-কে তাদের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।

'কুরুন' 'قرون' শব্দটিকে কুরআন ও হাদিসে প্রজন্মের অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যেমন আল্লাহ বলেন, وَكُم أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِن بَعْدِ نُوحٍ ‘আর আমি অনেক প্রজন্মের মানুষদেরকে ধ্বংস করেছি নুহ এর পরে। এ আয়াতে 'قرون' শব্দ দ্বারা প্রজন্মই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অনুরূপভাবে (خير النَّاسِ قَرْنِي )‘আমার যুগের মানুষেরা সর্বোত্তম মানুষ” এ-হাদিসেও 'কুরন' )قرن( শব্দটি প্রজন্মের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে ইবনে আব্বাস রা. এর হাদিসে বর্ণিত 'কুরুন' )قرون( শব্দটি প্রজন্মের অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে 'সময়' এর অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। হাদিসের বাহ্যিক অর্থের দ্বারা যদিও এ কথা মনে হয় যে, আদম ও নুহ আলাইহিস সালাম-এর মধ্যে মোট এক হাজার বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং এ সময়ের সকল লোকেরা মুসলিম ছিল; কিন্তু এ বাহ্যিক অর্থটি ইতিহাস ও বাস্তবতার সাথে খাপ খায় না। কেননা, বাস্তবতা এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, একটি জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি হঠাৎ করে এসে যায় না; বরং তা ধীরে ধীরে হয়ে থাকে এবং আল্লাহ তায়ালাও কোনো জাতির বিভ্রান্তির প্রথম অবস্থাতেই নবী ও রাসুল প্রেরণ করেন না। এমতাবস্থায় ইবনে আব্বাস রা.-এর হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে বলতে হবে যে, মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি শুরু হয়েছে নুহ আলাইহিস সালাম-এর যুগ থেকেই এবং আল্লাহ তাঁকে তাঁর জাতির বিভ্রান্তির প্রারম্ভেই রাসুল করে পাঠিয়েছেন, যদিও তা বাস্তবতা-বহির্ভূত।

এ দিকে ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আদম আলাইহিস সালাম সন্তানদের দ্বারা মূর্তিপূজার কারণে যখন তাদের কুফরী কার্যকলাপ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের নিকট ইদ্রীস (আলাইহিস সালাম)-কে নুহ আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে নবী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি এসে তাদেরকে তাওহিদের দিকে আহ্বান জানালে তারা তাঁকে অস্বীকার করে, ফলে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে (ইদ্রীস আলাইহিস সালাম) মর্যাদাপূর্ণ স্থানে উঠিয়ে নেন। এ ইতিহাসও ইবনে আব্বাস রা. এর হাদিসের বাহ্যিক অর্থের সম্পূর্ণ বিপরীত। এ কারণে আমরা এ কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, ইবনে আব্বাস রা. এর হাদিস দ্বারা আদম ও নুহ আলাইহিস সালাম এর মধ্যকার মোট সময় নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য করা হয়নি; বরং এর উদ্দেশ্য সে সময়সীমা বর্ণনা করা যে সময়ের মধ্যে সকল লোকেরা ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যদিও তাঁদের উভয়ের মাঝে এ সময়সীমার বাইরে আরও অনেক সময় ছিল, যাতে লোকেরা ইসলাম তথা তাওহিদের উপর একমত ছিল না।

আরবের লোকেরা ছোট এবং বড় বিভিন্ন রকমের মূর্তিদেরকে আল্লাহ তায়ালার রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে সমকক্ষ বানিয়ে নিয়েছিল। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মূর্তি নিম্নরূপ-

লাত : এটি 'তায়েফ' নামক স্থানের 'সাকিফ' গোত্রের প্রসিদ্ধ এক দেবী- মূর্তির নাম। এর মাধ্যমে তারা কুরায়েশ গোত্রের উপর গর্ব করত। ইমাম ইবনে কাসির এর বর্ণনামতে এটি ছিল একটি সাদা পাথরের মূর্তি। এর মধ্যে একটি ঘরের চিত্র অঙ্কিত ছিল। কাবা ঘরের ন্যায় এটিকে তারা পর্দা দ্বারা আবৃত করে রেখেছিল। অনুরূপভাবে তারা কাবা শরিফের প্রাঙ্গণের ন্যায় এর প্রাঙ্গণকেও পবিত্র জ্ঞান করত। সাকিফ গোত্র থেকেই এর খাদেম নিয়োগ করা হতো। ইমাম ইবনে জারির এর বর্ণনামতে তারা 'আল্লাহ' শব্দের স্ত্রী-লিঙ্গ হিসেবে এর নাম 'লাত' রেখেছিল। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, সেখানে সুদূর অতীতে একটি চারকোণাবিশিষ্ট পাথরে বসে একজন ইহুদি ব্যক্তি হাজীদের জন্য 'সাতু' তৈরি করে খেতে দিত। লোকটি সেখানে মৃত্যুবরণ করলে তার সততা ও ভালো কর্মের জন্য লোকেরা এ-পাথরকে সম্মান করে এর পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করতে আরম্ভ করে। কুরায়েশ এবং সমগ্র আরব গোত্রের লোকেরাও একে পূজা ও সম্মান করত।

উয্যা: 'উয্যা' নামের এ দেবীটি মক্কার নিকটবর্তী 'নাখলাহ' নামক স্থানে স্থাপিত ছিল। এটা কুরায়েশ গোত্রের দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়মাপের দেবতা ছিল। কুরায়েশরা কাবা শরিফের হরমের ন্যায় এর জন্যও একটি হরম (পবিত্র এলাকা) নির্ধারণ করেছিল। সম্ভবত এটি ছিল কুরায়েশদের যুদ্ধের দেবী। তাদের সাথে কারও যুদ্ধ হলে তারা এ দেবীর কাছে যুদ্ধে জয় কামনা করত। সে জন্যই উহুদ যুদ্ধের সময় আবু সুফিয়ান রা. মুসলিমদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন: 'আমাদের উয্যা দেবতা আছে, তোমাদের কোনো উয্যা নেই।' মূলত এ দেবতাটি ছিল বত্নে নাখলাহ নামক স্থানের তিনটি ছোট বাবলা গাছের সমষ্টি। এ গাছগুলোতে একটি মহিলা জিন থাকত। এর উপাসকরা তা বুঝতে না পারলেও এ জিনই এর উপাসকদেরকে এ গাছের মধ্য থেকে অলৌকিকভাবে শব্দ শোনাত। মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-কে তা ধ্বংস করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তিনি পর পর তৃতীয় গাছটি কাটতে উদ্যত হলে আকস্মিকভাবে সে জিনটি ঘাড়ে হাত রেখে, দাঁত কটমট করে, এলোমেলো কেশে কুৎসিত হাবশী মহিলার আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করে। খালেদ রা. তরবারি দিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করলে তা দ্বিখণ্ডিত হয়ে হঠাৎ একটি কবুতরে রূপান্তরিত হয়ে মরে যায়। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে এসে সর্বশেষ গাছ কাটতে গিয়ে তিনি যা দেখলেন তা তাঁকে জানালেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তা শুনে বললেন,
'এ হাবশী মহিলাই মূলত 'উয্যা' ছিল, আরবদের জন্য এরপর আর কোনো উয্যা থাকবে না।” অপর এক বর্ণনামতে উয্যা নামের এ দেবীটি একটি সাদা পাথর ছিল।

মানাত : এটি প্রাচীন দেব-দেবীদের মাঝে অন্যতম একটি দেবীর নাম। সম্ভবত এটি ছিল কুরবানির দেবী। এর নামে পশুর রক্ত প্রবাহিত করা হতো। এটাকে ভাগ্যদাতা ও মৃত্যুদানকারী বলে মনে করা হতো। মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী 'কুদায়েদ' নামক স্থানে এটি স্থাপিত ছিল। হজ্জ উপলক্ষে 'ইয়াসরিব' তথা মদিনার আওস এবং খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের লোকেরা এসে এর চার পার্শ্বে তাওয়াফ করত। এতে (শয়তানের পক্ষ থেকে নিযুক্ত) একটি মহিলা জিন থাকত এবং এ জিনই এর পূজারিদেরকে নানা রকম অলৌকিক কর্মকাণ্ড করে দেখাত। মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে সা'য়ীদ ইবনে যায়দ আশহালী রা. এ মূর্তিটি ধ্বংস করতে যান। এ সময় সে জিনটি কালো বর্ণের একটি মহিলা আকৃতিতে উলঙ্গ অবস্থায় এলোমেলো কেশে আত্মপ্রকাশ করে নিজের জন্য ধ্বংসের আহ্বান করে বুক চাপড়াতে ছিল। সা'য়ীদ রা. তাকে এ অবস্থাতেই হত্যা করেন।

লাত, উয্যা ও মানাতকে নারীর নামে নামকরণ করার কারণ: লাত, উয্যা ও মানাত এগুলো তিনটি নারী দেবীর নাম। এগুলো মুশরিকদের কল্যাণ ও অকল্যাণ করতে পারে এ ধারণার ভিত্তিতে তারা এদেরকে সব সময় কল্যাণার্জন এবং অকল্যাণ দূরীকরণের জন্য আহ্বান করত। তাদের এ আহ্বান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
إِنْ يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِنْ يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَرِيدًا
'তারা তো আল্লাহকে ব্যতীত শুধু নারীদের আহ্বান করে, আসলে তারা কেবল অবাধ্য শয়তানকেই আহ্বান করে।' এখানে 'ইনাসান' বলে লাত, উয্যা, মানাত ও অন্যান্য নারী নামের সকল দেবীদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। এগুলোকে 'ইনাস' বলার পিছনে মোট তিনটি কারণ থাকতে পারে-

এক. 'ইনাসান' শব্দটি 'উনসা' শব্দের বহুবচন। এর অর্থ নারী। লাত, উয্যা ও মানাত এ তিনটিকে নারীর নামে নামকরণ করার কারণে এদেরকে 'ইনাসান' বলা হয়ে থাকতে পারে। মূলত কোনো নারীদের সাথে এদের ঐতিহাসিক কোনো সম্পর্ক থাকার কারণে নয়।

দুই. আয়েশা রা. এর মতে 'ইনাস' অর্থ 'আওসান' তথা প্রতিমাসমূহ। 'আওসান' শব্দটি 'ওয়াসান' শব্দের বহুবচন। আরবিতে বহুবচন-জাতীয় শব্দগুলো স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। যেহেতু মুশরিকরা একাধিক 'ওয়াছান' তথা প্রতিমাকে আহ্বান করত, সে জন্য এগুলোকে 'ইনাসান' বলা হয়েছে।

তিন. মুশরিকরা ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহর মেয়ে মনে করে এদের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য এদের উপাসনা করত। তারা এগুলোর নারী আকৃতির মূর্তি তৈরি করে এদের পূজা-অর্চনার জন্য কিছু নিয়ম নীতি তৈরি করেছিল, এদের গলায় অলংকার ঝুলিয়ে দিয়ে বলেছিল: এরা আল্লাহর মেয়ে যাদের আমরা উপাসনা করি। বিশিষ্ট তাবেঈ দাহহাক রহ. থেকে এ ব্যাখ্যাটি বর্ণিত হয়েছে। 'তারা এ সব মূর্তিকে আহ্বান করে মূলত অবাধ্য শয়তানকেই সাহায্যের জন্য আহ্বান করত', উক্ত আয়াতে এ কথা বলার কারণ হলো: শয়তানই মূলত তাদেরকে এ সবের আহ্বান করতে প্ররোচিত করত। উবাই ইবনে কা'ব রা. এর বর্ণনামতে এ সব মূর্তির সাথে একটি করে মহিলা জিন থাকত। আর এ জিনরাই অদৃশ্যে থেকে তাদের আহ্বানকারীদের উপকার করে দিত। ফলে মুশরিকরা এ উপকারকে এ সব মূর্তির কাজ বলেই মনে করত। তাদের ধারণামতে ফেরেস্তারা আল্লাহর মেয়ে হওয়ার কারণে তারা আল্লাহর অতীব নিকটতম ও প্রিয়ভাজন। তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া সম্ভব। সে জন্যেই তারা তাদের উপাসনা করত এবং বলত-
مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى
'তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে, এ উদ্দেশ্যেই আমরা তাদের উপাসনা করছি।” আরও বলত: 'এরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য শাফা'আতকারী।” লাত, উয্যা ও মানাত এ তিনটি দেবীকে নারীর নামে নামকরণ করার কারণ হিসেবে যে তিনটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে, এর যে কোনোটির কারণে এগুলোর উপর্যুক্ত নামকরণ হয়ে থাকতে পারে। তৃতীয় সম্ভাবনাটির কথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত না হলেও মুশরিকরা যে ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহর মেয়ে মনে করত এবং ফেরেস্তাদেরকে উদ্দেশ্য করেই যে তারা এ তিনটি দেবীকে উপর্যুক্ত নামে নামকরণ করেছিল, তা স্বয়ং কুরআন দ্বারাই প্রমাণিত। তারা যে ফেরেস্তাদেরকে নারী মনে করত সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَجَعَلُوا الْمَلَائِكَةَ الَّذِينَ هُمْ عِبَادُ الرَّحْمَنِ إِنَاثًا
'তারা ফেরেশাদেরকে, যারা আল্লাহর বান্দা, তাদেরকে নারী বলে স্থির করেছে। আবার ফেরেস্তাদেরকে যে তারা আল্লাহর মেয়ে মনে করত, সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
أَفَرَأَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّى، وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى، أَلَكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى تِلْكَ إِذَا قِسْمَةٌ ضِيزَى إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءُ سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ
'তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত, উয্যা ও তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে? পুত্র-সন্তান কি তোমাদের জন্যে আর কন্যা-সন্তান আল্লাহর জন্যে। এটা হবে খুব অন্যায় বণ্টন। এগুলো কতকগুলো নাম বৈ আর কিছুই নয়, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখেছ, এসবের কোনো প্রমাণ আল্লাহ অবতীর্ণ করেননি।'

উক্ত আয়াত দু'টির দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তারা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর মেয়ে মনে করেই তাদের উপাসনার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার উদ্দেশ্যে লাত, উয্যা ও মানাত নামের এ তিনটি দেবীকে নারীর নামে নামকরণ করেছিল।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, চিন্তা করুন—কীভাবে শয়তান তাদেরকে নিজের অনুগত করে নিয়েছে এবং তাদের বিবেক-বুদ্ধি হরণ করে নিয়েছে। যে সব বস্তু নিজ হাত দ্বারা তৈরি করেছে, তাকেই পূজা করছে। আল্লাহ তায়ালা এই বানোয়াট মূর্তিপূজারিদের নিন্দায় বলেন,
أَلَهُمْ أَرْجُلٌ يَمْشُونَ بِهَا أَمْ لَهُمْ أَيْدٍ يَبْطِشُونَ بِهَا أَمْ لَهُمْ أَعْيُنٌ يُبْصِرُونَ بِهَا أَمْ لَهُمْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا قُلِ ادْعُوا شُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ كِيدُونِ فَلَا تُنْظِرُونِ
“এ সব মূর্তির কি পা আছে যা দ্বারা সে চলতে পারে? তাদের কি হাত আছে যা দ্বারা তারা ধরতে পারে? তাদের কি চোখ আছে যা দ্বারা তারা দেখতে পায়? তাদের কি কান আছে যা দ্বারা তারা শুনতে পায়।” এতে মূর্তিপূজার প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা তো পা দিয়ে হাঁটো, হাত দিয়ে ধরো, চোখ দিয়ে দেখো আর কান দ্বারা শোনো; এরা তো এসব কর্মকাণ্ড থেকে অপারগ। এরা নিষ্প্রাণ। তোমরা প্রাণবিশিষ্ট হয়েও কী করে নিষ্প্রাণ নিঃসাড় বস্তুকে পূজা করো!? এসব মূর্তিপূজারিরা যদি সামান্য চিন্তা-ভাবনা করত, তাহলে বুঝত যে, আসল উপাস্য তো সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। তার সাথে আর কাউকে ইবাদতে শরিক করত না। সুতরাং একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই ইবাদত করা আবশ্যক। যিনি সর্বশক্তিমান ও ক্ষমতাবান। তারপরও মূর্তিপূজারিদের অন্তরে এ কথা বধ্যমূলভাবে গেঁথে আছে যে, এ সব মূর্তি আমাদের জন্য সুপারিশ করবে। এটা নিছক তাদের কল্পনাপ্রসূত মতবাদ। যার কোনো ভিত্তি নেই। আর এসব মূর্তির সাথে তার কোনো সম্পর্কও নেই।

টিকাঃ
১. বর্তমান শ্রীলংকার
১. সুরা ইউনুস: আয়াত ১৯
২. সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ১৭
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৬৩
১. [হাদিসটির সনদ খুবই দুর্বল]
১. সুরা নিসা: আয়াত ১১৭
২. সুরা যুমার: আয়াত ৩
৩. সুরা ইউনুস: আয়াত ১৮
৪. সুরা যুখরুফ: আয়াত ১৯
১. সুরা নাজম: আয়াত ১৯
২. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৯৫

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 অগ্নি, সূর্য ও চন্দ্রপুজারিদের ওপর ইবলিসের ফাঁদ

📄 অগ্নি, সূর্য ও চন্দ্রপুজারিদের ওপর ইবলিসের ফাঁদ


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি বলেন, একটি গোষ্ঠীর ওপর ইবলিস এভাবে ফাঁদ পাতল যে, তাদের মনে সে আগুনের ইবাদত তথা পূজা করার জন্য প্ররোচনা দিতে থাকল। ইন্ধন দিল, আগুন এমন এক রত্ন-পৃথিবীজুড়ে যার কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবী এর মুখাপেক্ষী। এখান থেকেই একদল সূর্যের পূজায় মগ্ন হলো। ইমাম আবু জাফর জারির তবারি রহ. উল্লেখ করেন, আদমপুত্র কাবিল যখন হাবিলকে খুন করে তার পিতার কাছ থেকে পালিয়ে ইয়ামেন চলে গেল, তখন ইবলিস তার কাছে এসে বলল, হাবিলের নজরানা কেন গৃহীত হয়েছে জানো? আগুন এসে তার নজরানা কেন ভস্মীভূত করেছে জানো? কারণ, সে অগ্নির সেবা করত এবং তার পূজা করত। এখন তুমিও আগুন এনে তার সেবা ও পূজা করো, তাহলে দেখবে সে তোমার জন্য এবং তোমার সন্তানদের জন্য শুভ পরিণাম বয়ে আনবে। কাবিল এ কথা শুনে একটি আতশখানা তৈরি করে তার পূজা-অর্চনা আরম্ভ করে দিল।

হাফিয বলেন, যারাদন্ত—যাকে অগ্নিপূজারিরা নবী বলে মনে করে, সে বলখ শহর থেকে এসে দাবি করল, সে বহতা পর্বতে থাকত। সেখানে তার ওপর অহী অবতীর্ণ হতো। এদেশ খুবই ঠাণ্ডা। ওখানকার লোকজন ঠাণ্ডা ছাড়া কিছুই চিনত না এবং স্বীকার করত যে, শুধু পাহাড়ের অধিবাসী ছাড়া অন্য কোথাও থেকে কোনো নবী পাঠানো হয়নি। যারা তাকে মেনেছে তাদের জন্য সে খুবই নোংরা ও নিকৃষ্ট বিধি-বিধান চাপিয়ে দিয়েছে। যেমন, পেশাব দ্বারা অযু করা, মায়ের সাথে সহবাস করা এবং অগ্নিপূজা করা ইত্যাদি। উপরোক্ত যারাদন্তের কথামালায় আছে, আল্লাহ একাকী ছিলেন, একাকিত্বের মেয়াদ বৃদ্ধি পেতে থাকলে তিনি চিন্তা-ভাবনা করে ইবলিসকে সৃষ্টি করেন। ইবলিস তার সম্মুখে এলে আল্লাহ তাকে খুন করতে চান, এতে সে বাধা দেয়। আল্লাহ দেখলেন, সে নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তখন নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য তার সাথে সন্ধি করে নেন। (নাউযুবিল্লাহ)

জানা কথা, অগ্নিপূজরিরা অগ্নিপূজা করার জন্য অসংখ্য আতশখানা তৈরি করে। সবার আগে আফ্রিদুন নামীয় ব্যক্তি অগ্নিপূজা করার জন্য তারসুস নামক শহরে একটি অগ্নিকুণ্ডলী স্থাপন করে, আরেকটি বোখারায় স্থাপন করে। আর ব্রাহ্মণ সিস্তানে অগ্নিকুণ্ডলী স্থাপন করে। এভাবে বহু স্থানে আগুন পূজার ব্যবস্থা করা হয়। জুডিসের কাছে এমন কিছু আগুন ছিল, সে দাবি করত এগুলো আকাশ হতে এসেছে। আর তিনি তা উৎসর্গ করেছেন।

এটা এভাবে হয়েছে যে, সে একটি সীমানা নির্ধারণ করল এবং তার মধ্যখানে একটি বোতল স্থাপন করল, এদিকে উৎসর্গের জন্তু একটি লাকড়ির ওপর টাঙালো, এটি গন্ধকমিশ্রিত ছিল। দ্বিপ্রহরে সূর্য মাথা বরাবর এলে ছাদের প্রদীপ থেকে সূর্যের রশ্মি বোতলে পড়লে গন্ধকের তীব্র তেজে লাকড়িতে আগুন ধরে যেত। জুডিস বলত, তোমরা এ আগুন নেভাবে না।

গ্রন্থকার বলেন, ইবলিস কিছু মানুষের অন্তরে চন্দ্রপূজার প্ররোচনা দিল। অন্য আরও কিছু মানুষের মনে প্রয়োগ করল তারকা-পূজার ইন্ধন। ইবনে কুতাইবা রহ. বলেন, ইসলামের পূর্বে অজ্ঞতার যুগে একটি গোষ্ঠী পূজা করত শা'রুল উযূর নামীয় তারার। এতে তারা নিমজ্জিত হলো নানাবিধ ফিতনায়। এর উত্তরণে তাদের মনে উৎসর্গের স্বাদ জাগলো।

আবু কাবাশা-যার দিকে ইঙ্গিত করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুশরিকরা সম্বোধন করত ইবনে আবি কাবাশা বলে। সে-ই প্রথম ব্যক্তি যে শু'রা নামীয় তারকা পূজা করত। তার মতে, এই তারকা আকাশের পার্শ্ব কর্তন করে। এটা ছাড়া আর কেউ আকাশের পার্শ্ব কর্তন করতে পারে না। এই ধারণায় তারা এটাকে পূজা করতে থাকে। এটা কুরাইশদের মতবাদের বিপরীত বলে সাব্যস্ত হয়। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত হয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিয়ে বলেন, ছেড়ে দাও এসব মূর্তিপূজা। কুরাইশরা তখন বলতে আরম্ভ করল, এটাও আবু কাবাশার পুত্র। অর্থাৎ আবু কাবাশা যেমন আমাদের বিরোধিতা করেছে, অনুরূপ এ-ও আমাদের বিরোধিতা করছে। বনি ইসরাইল এমন প্রেক্ষিতে হজরত মারইয়াম আলাইহিস সালামকে 'উখতে হারুন' বা হারুনের বোন বলে সম্বোধন করত। অর্থাৎ হারুনের মতো সৎচরিত্রবান ও নেককার।

স্মর্তব্য যে, শু'রা নামীয় তারকা দু'টি। একটি হচ্ছে উক্ত শু'রা উব্‌র, আর অন্যটিকে বলা হয় শু'রা গুমাইসা। এদের আবার রয়েছে প্রতিপক্ষও।

ইবলিস অন্য জাতিগুলোকে ফেরেশতাদের পূজা করতে প্ররোচনা দিতে থাকে। ফেরেশতাকে তাই তারা আল্লাহর কন্যা বলে অভিহিত করতে শুরু করে। আরেক জাতিকে গরু ও ঘোড়াকে পূজা করার ব্যাপারে প্রলুব্ধ করতে থাকে। এই গরুপূজারিদের একজন ছিল সামেরী। তা'বীর নামক গ্রন্থে আছে, ফেরাউনও পশু পূজা করত। এ-সব বেকুবদের বুঝি আকল-বুদ্ধি বলতে কিছুই থাকতে নেই!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00