📄 দ্বিত্ববাদী (সানূভিয়্যা)-দের ওপর শয়তানের ধোঁকা
দ্বিত্ববাদী বা সানুভিয়াদের মতাদর্শ হচ্ছে, তারা বলে, পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা দু'জন। ১. ভালো কাজের সৃষ্টিকর্তা, এটি নূর বা আলো, ২. মন্দ কাজের সৃষ্টিকর্তা, এটি যুলমাত বা অন্ধকার। উভয়টিই 'কাদীম' তথা অনন্ত, অনাদি ও চিরন্তন। উভয়েই সর্বদা ছিলেন এবং থাকবেন। উভয়ে শক্তিশালী, স্পর্শযোগ্য, শ্রোতা ও দ্রষ্টা। উভয়ে একে অন্যের বিপরীত।
দ্বিত্তবাদীদের কিতাব থেকে তাদের এই আকিদার কথা উল্লেখ করেছেন আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি। তিনি বলেন, তাদের ধারণা-সেই দুই সৃষ্টিকর্তা একজন অন্যজনের কাছাকাছি অবস্থান করেন। তাদের অনেকে মনে করে, নূর সর্বদা অন্ধকারের উপরে অবস্থান করে। কারো কারো ধারণা মতে, উত্তরে নূর তথা আলোর অবস্থান আর দক্ষিণে অন্ধকার। সর্বদা তারা একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে অবস্থান করে। নাওবখতি বলেন, সানুভিয়াদের মতে, উভয় খোদা পাঁচ পাঁচটি বস্তুতে বিভক্ত। তন্মধ্যে চারটি হচ্ছে দেহজাতীয় আর একটি রুহ। নূরের দেহ চতুষ্টয়-অগ্নি, আলো, বাতাস ও পানি। আর তার রুহ হচ্ছে জ্যোতি। যা শরীরে সর্বদা অবস্থান করে। অনুরূপভাবে অন্ধকারের দেহ চতুষ্টয়-দাহন, তিমির, উত্তপ্ত হওয়া ও ধূলি। আর রুহ হচ্ছে ধূম্র। তারা নূরের শরীরকে 'মালাইকা' বা ফেরেশতা বলে আখ্যায়িত করে। আর অন্ধকারের শরীরকে শয়তান নামে ডাকে। কেউ কেউ বলে, অন্ধকার থেকে শয়তান সৃষ্টি হয় আর নূর দ্বারা ফেরেশতা সৃষ্টি হয়। নূর মন্দকে টপকাতে পারে না, আবার অন্ধকারও ভালোকে টপকাতে পারে না। নাওবখতি তাদের মাযহাবের আলো-অন্ধকার সংক্রান্ত অনেক মতভেদের কথা বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, তাদের ওপর কষ্ট ও ত্যাগ আবশ্যক এবং একদিনের অধিক খোরাক জমা রাখা যাবে না।
তাদের কারো কারো মতে, মানুষের জন্য তার জীবনের এক-সপ্তমাংশ রোজা রাখা বাধ্যতামূলক। মিথা, কৃপণতা, জাদু, মূর্তিপূজা, ব্যভিচার এবং চুরি পরিত্যাগ করা ফরয। কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেয়া যাবে না। এসব ব্যাপারে তারা তাদের অপূর্ণ বুদ্ধি দিয়ে নিত্য-নতুন মতবাদ তৈরি করে।
ইয়াহইয়া ইবনে বিশর নাহাভান্দী বলেন, তাদের মধ্যে একটি গোত্র আছে যাদেরকে 'দিসানিয়া' বলা হয়। তাদের মতবাদ হচ্ছে, পৃথিবীর মূল উপাদান কঠিন ও রুক্ষ ছিল। এই অভ্যাস এককালে আল্লাহর শরীর, যাকে অগ্নি বলা হয়, তাতে অবস্থিত ছিল। আল্লাহ তায়ালা এতে কষ্ট পেয়েছেন। নির্দিষ্ট এক সময় অতিক্রম হলে তিনি পৃথক করতে গেলে তা দেহের সাথে মিশে যায়। সেই দেহ এবং মৃত্তিকা দিয়েই এই পৃথিবী গঠিত। যা কিছু ভালো তার নূর, আর যা কিছু মন্দ তা যুলমাত বা অন্ধকার। যারা এই আকিদা লালন করে, তারা মানুষকে খুন করে এবং কষ্ট দেয়।
যারা এই আকিদা পোষণ করতে বাধ্য হয়, তার নেপথ্য কারণ হচ্ছে, তারা পৃথিবীতে মন্দ ও মতপার্থক্যে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। সুতরাং বোঝা গেল একটি মূল বস্তু থেকে দু'টি বিপরীতমুখী বস্তু প্রকাশ হতে পারে না। যেমন আগুনে গরম ও ঠান্ডা একত্র হতে পারে না। আলেমগণ তাদের দ্বিত্ব মতবাদকে এভাবে খণ্ডন করেছেন যে, যদি সৃষ্টিকর্তা দু'জন হতেন তাহলে নিশ্চিত তারা একে অন্যের ওপর বিজয়ী হতেন অথবা পরাজিত হতেন। অথবা একজন বিজয়ী হতেন অন্যজন হতেন পরাজিত। এটা তো সম্ভব নয় যে, উভয়ে পরাজিত। সুতরাং একটি পন্থা খোলা আছে, তা হলো—উভয়ে বিজয়ী হওয়া। এখন ধরুন তাদের কেউ, একটি দেহকে নির্দিষ্ট কোনো নড়া-চড়ায় ফেলতে চান, অন্যজন চান চুপ রাখতে। তাহলে এদের উভয়ে যে লক্ষ্যে পৌঁছতে চাচ্ছেন, তা কি একই সময়ে একজনের ওপর কখনো সম্ভব? কেননা একজন যদি তার ইচ্ছা পূরণ করেন, তাহলে অন্যজন তো অপারগ হয়ে গেলেন।
সানাভিয়াদের মতবাদ 'ভালোর জনক নূর, মন্দের জনক যুলমাত বা অন্ধকার'—এটাকে আলেমগণ এভাবে খণ্ডন করেছেন যে, যদি কোনো মজলুম ভেগে গিয়ে অন্ধকারের কাছে আশ্রয় পায়, তাহলে এটা তো ভালো কাজ—যা মন্দের পক্ষ থেকে এসেছে। সুতরাং এই গোষ্ঠীর সাথে বিতর্কে জড়িয়ে নিজেকে প্রভাবিত বা প্রতারিত করা অনুচিত। কেননা তাদের মাযহাব নিছক একটি ধোঁকা, যার কোনো উৎস নেই।
📄 দার্শনিক ও তাদের অনুসারীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
শয়তান দার্শনিকদেরকে ধোঁকা দেয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার কারণ হচ্ছে, তারা কেবল তাদের অভিমত এবং বুদ্ধির শেকলে বন্দি। তারা নিজ খেয়ালখুশি মতো কথা বলে। নবী আলাইহিস সালাম-দের প্রতি মনোযোগী হয় না। তাদের কেউ দাহরিয়া মতাদর্শ লালন করে। যারা বলে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। দার্শনিকদের এই মতবাদ নাওবখতিসহ অন্যান্যরা তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। নাহাভান্দি বলেন, এরিস্টটল এবং তার অনুসারীদের মতে, পৃথিবী একটি গ্রহ-যা আকাশে ঘুরছে। এমন প্রত্যেক তারকার মধ্যে পৃথিবীর মতো অনেক পৃথিবী আছে। গাছ ও নদী আছে, যেমন পৃথিবীতে আছে। এই দলটি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী নয়। এদের মধ্যে অনেকের বিশ্বাস-এই পৃথিবী অনাদি ও অবিনশ্বর। তাদের মতে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সাথেই এর অস্তিত্ব লাভ হয়েছে। জালিনূস বলেন, সূর্য যদি নশ্বর হতো, তাহলে এতকাল অতিবাহিত হওয়ার পর অক্ষয় ও অপরিবর্তিত থাকত না। সূর্যের সাথে যেমন আলো সম্পৃক্ত, সৃষ্টিকর্তার সাথেও সৃষ্টি সম্পৃক্ত। একটি আরেকটির আগে বা পরে নয়। পরস্পর পরিপূরক। এই পক্ষের জবাবে বলা যায়, এতকাল সূর্যের মধ্যে পরিবর্তন আসেনি বলে যে অবিনশ্বর হবে এটা জরুরি নয়। কত মূল্যবান প্রস্তর রয়েছে, মণিমুক্তা ও হীরক রয়েছে। শত শত বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও তাতে কোনো পরিবর্তনা আসছে না। তাই বলে কি সেটা অবিনশ্বর? এমন বহু বস্তুতে মৃত্যু আসে না; বরং স্বয়ংসম্পূর্ণভাবেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। এছাড়া তোমরা কী করে জানলে যে, সূর্যের মৃত্যু বা ক্ষয় ঘটে না? কেননা দার্শনিকদের মতে সূর্য ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় একশত সত্তর গুণ বড়। সুতরাং তাতে যদি প্রতিদিন একটি পাহাড় সমান অংশ ক্ষয় হতে থাকে, তা কখনো অনুধাবনযোগ্য হিসেবে ধরা পড়বে না। অতএব প্রকাশ হলো যে, সৃষ্টি হওয়া এবং বিলুপ্ত হওয়া ওই সর্বশক্তিমানের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, যিনি অবলুপ্ত হওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
তারা দাবি করে বলে, এতে সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি কাল বা সময় থাকা জরুরি হয়ে পড়ে। তখন আমরা উত্তরে বলি, সময় বা কাল তো মাখলুক তথা সৃষ্ট বস্তু। আর সময়ের আগে কোনো সময় ছিল না। তাদেরকে আরও বলা যায়, বলো দেখি-সৃষ্টিকর্তা কি বর্তমান আকাশকে এক হাত উঁচুতে বা নিচুতে আনতে পারবেন? যদি তারা বলে যে, এটা তো সম্ভব নয়। তখন তারা একে তো সৃষ্টিকর্তাকে অপারগ ও দুর্বল সাব্যস্ত করল এবং যে বস্তু উপর-নিচ হওয়া অসম্ভব তার প্রকৃত অবস্থায় স্থির থাকা জরুরি নাকি সম্ভব? এটা কোনো কারণের ওপর নির্ভরশীল নয়।
তাদের মধ্যে যারা বলে যে, আল্লাহ তায়ালা এ পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, তারা মূলত তাদের মতাদর্শ লুকিয়ে রাখে। বিশ্ব সৃষ্ট বস্তু হওয়া তাদের মতে সম্ভব, বাস্তবতায় নয়। কেননা কারক তার কাজে ইচ্ছা পোষণকারী হয়। আর তাদের মতে পৃথিবী প্রকাশ হওয়া জরুরি, এটা আল্লাহর কাজের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের মতবাদে এটাও আছে যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অবিনশ্বর। এর যেমন শুরু নেই, শেষও নেই। কেননা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ‘ইল্লাতে কাদিমাহ’র ‘মালুল’। আর মালুল তার ইল্লতের সাথে সর্বদা বিদ্যমান থাকে। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যখন অস্তিত্বে আসা সম্ভব, তাহলে তা না আদি হবে, না মালুল হবে।
নাওবখতি তার ‘কিতাবুল আরা ওয়াদদিয়ানাত’এ উল্লেখ করেন, সক্রেটিস মনে করে, বস্তুর উৎস তিনটি। ১. কর্তা ২. মূল ধাতু বা উপাদান ও ৩. আকৃতি। তাদের মতে, আল্লাহ তায়ালা হচ্ছে আকল তথা বিবেক-বুদ্ধি, কাল হচ্ছে সৃষ্টজগৎ ও ধ্বংসের প্রথম বিষয়বস্তু, আর আকৃতি শরীর নয়; বরং গুণ। এই সম্প্রদায়ের আরেকটি মতবাদ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন কর্তা, কাল হচ্ছে কর্ম। তৃতীয় দলের মতে, আকল বস্তুকে সন্নিবেশ ও সুশৃঙ্খলরূপে সাজায়। চতুর্থ আরেক গ্রুপ বলে, আকল এটি সন্নিবেশ করে না; বরং মূলত অভ্যাসই তার কর্তা।
ইয়াহইয়া ইবনে বিশর ইবনে উমাইর নাহাভান্দি উল্লেখ করেন, দার্শনিকদের একটি মতবাদ হচ্ছে, যখন আমরা পৃথিবীকে সম্মিলিত, পৃথক পৃথক ও অটল দেখি, তাই বুঝে নিলাম যে, সেটি আদি নয়। আর নশ্বরের জন্য কোনো একজন নশ্বর সৃষ্টিকর্তা আবশ্যক। পরে আমরা দেখলাম, মানুষ পানিতে পড়ে যায়, ভালো করে সাঁতার কাটতে জানে না, তাই সেই আবিষ্কারক ও অভিজ্ঞের কাছে ফরিয়াদ করে, কিন্তু সে তার ফরিয়াদে সাড়া দেয় না। এমনই করে কেউ আগুনে পুড়ে যায়, তাই আমরা জেনে নিলাম যে, সৃষ্টিকর্তা অস্তিত্বহীন।
তিনি বলেন, আবিষ্কারকের অনস্তিত্বের ব্যাপারে এ সব লোক তিন ভাগে বিভক্ত। একদল মনে করে, সৃষ্টিকর্তা যখন এই পৃথিবী পরিপূর্ণভাবে সৃষ্টি সমাপ্ত করলেন, তা দেখে তার ভালো লাগল। সুতরাং তিনি ভয় পেলেন, কোথাও আবার বেশ-কম হয়ে গেল কি না! এতে না জানি এটি আবার ধ্বংস হয়ে যায়! এই ভয়ে নিজেকেই তিনি ধ্বংস করে দিলেন। পৃথিবী একা হয়ে গেল। আর সমুদয় বিধি-বিধান জীব-জন্তু এবং অন্যান্য বস্তুর মাঝে একীভূত হয়ে গেল। দ্বিতীয় আরেক দল মনে করে, এমন নয়; বরং সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে একজাতীয় চিৎকার আরম্ভ হলো। এ জন্য তার শক্তি হ্রাস পেতে থাকে এবং নূর কমতে থাকে। এভাবেই সেই নূর ও শক্তি এই চিৎকারের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেল। এই চিৎকারকে পৃথিবী বলে। সৃষ্টিকর্তার নূর বিগড়ে গেলে তাতে কিছু অংশ অবশিষ্ট থেকে যায়। এ সব লোকের ধারণা-পৃথিবী থেকে নূর একীভূত হয়ে তার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। অতঃপর তা পূর্বের আকৃতিতে ফিরে আসবে। যেহেতু সৃষ্টিবস্তুর কর্মকাণ্ডের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তাই তাদেরকে বিনা বিচারে ছেড়ে দেয়া হবে। এ কারণে পৃথিবীতে অন্যায় ছেয়ে গেছে। তৃতীয় সম্প্রদায়ের ধারণা-এমন নয়; বরং সৃষ্টিকর্তা যখন পৃথিবীকে সাজালেন, তখন তার অংশ পৃথিবীতে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। তাই পৃথিবীতে যে সকল শক্তি বিদ্যমান, তা সৃষ্টিকর্তারই অংশ, যা কখনো নিঃশেষ হবার নয়।
শায়খ ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, এতক্ষণ পর্যন্ত নাহাভান্দি যা কিছু বললেন, তা আমি নেযামিয়ার একটি সংস্করণ থেকে উল্লেখ করেছি-যা ২২০ বছর পূর্বে লেখা হয়েছিল।' যদি তা উল্লেখ করা দ্বারা ইবলিসের নেক সুরতে ধোঁকার উদ্দেশ্য না থাকত, তাহলে আল্লাহ তায়ালার সম্মানে তাদের কথাগুলো খণ্ডন করা উত্তম হতো। এমন অসার ও অসংগতিপূর্ণ মতবাদের কথা উল্লেখ করা উচিত নয়। কিন্তু আমি তা উল্লেখ করা দ্বারা যে উপকারিতা রয়েছে তা-ও বর্ণনা করছি।
অধিকাংশ দার্শনিক এ মতবাদ পোষণ করেন যে, আল্লাহ তায়ালার কাছে সৃষ্টিজগৎ সংক্রান্ত কোনো জ্ঞান নেই, শুধু তার অস্তিত্বের জ্ঞান আছে। অথচ এটি প্রমাণিত যে, মাখলুক তার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত এবং তার সৃষ্টিকর্তার সম্পর্কেও অবগত। ওপরের বর্ণনায় তো দেখা যাচ্ছে, তারা সৃষ্টিকর্তার চেয়ে সৃষ্টিবস্তুর সম্মান বহুগুণে বাড়িয়ে দিলেন!
গ্রন্থকার বলেন, এতটুকু কথার মাধ্যমেই তাদের মতবাদের অসারতা প্রমাণ হয়ে যায়। বেশি কথা বলার প্রয়োজন নেই। চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এ সকল আহমকদেরকে ইবলিস কতটা ধোঁকা দিয়েছে! এরা পরিপূর্ণ বিবেক-বুদ্ধি থাকার দাবি করা সত্ত্বেও! এই আকিদায় শায়খ আবু আলী সিনা তাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, কথা এমন নয়; বরং আল্লাহর নিজ অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞান আছে এবং সামগ্রিক বস্তুজগতেরও জ্ঞান আছে। কিন্তু তার বিভিন্ন অংশ-বিশেষের জ্ঞান নেই। এই মাযহাবকে মুতাযিলারা গ্রহণ করে নিয়েছে। সম্ভবত তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি অতিরিক্ত বেড়ে গেছে! আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ওই জামাতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যারা আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব থেকে অজ্ঞতা ও অসম্পূর্ণতাকে অস্বীকার করে। আমরা আল্লাহ তায়ালার ইরশাদের ওপর ঈমান এনেছি :
أَلَّا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ “আল্লাহ তায়ালার কাছে কি মাখলুকের ইলম নেই?” আল্লাহ আরও বলেন,
وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ “আল্লাহর কাছে জল-স্থল সবকিছুর জ্ঞান আছে।”
গ্রন্থকার বলেন, দার্শনিকরা মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া, রুহসমূহ শরীরে প্রতিস্থাপন করা, জান্নাত ও জাহান্নামে শারীরিকভাবে উপস্থিত হওয়াকে অস্বীকার করে থাকে। তারা বলে, এগুলো কেবল উপমামাত্র, যা সাধারণ মানুষের জন্য বর্ণনা করা হয়েছে। যাতে শাস্তি ও শান্তি আত্মিক হওয়ার ব্যাপারটি বুঝে আসে এবং মনে করে, মানুষের সত্তা মৃত্যুর পর চিরকালের জন্য জীবিত থাকে। অথবা এমন তৃপ্তিতে থাকে, যা বর্ণনার অযোগ্য। এটা ওই সত্তা, যা পাপে লিপ্ত থাকে। এই কষ্টের মাত্রা মানুষের অনুমান মতো বেশ-কম হয়ে থাকে। আবার কখনো ওই সত্তা থেকে কষ্টগুলো মুছে যায় এবং দূর হয়ে যায়। এই গোষ্ঠীর কথার জবাবে বলা যায়, মৃত্যুর পর মানবসত্তা অস্তিত্বশীল হওয়ার ব্যাপারে আমরা অস্বীকারকারী নই। আর এটাও অস্বীকার করি না যে, নফসের জন্য শান্তি ও শাস্তি বিদ্যমান। কিন্তু এটা বলো, শারীরিকভাবে হাশরের মাঠে উপস্থিত হওয়াকে কেন অস্বীকার করছ? জান্নাত ও জাহান্নামে শারীরিক তৃপ্তি ও শাস্তির কথা কী করে অস্বীকার করা হয়? যেখানে শরিয়ত আমাদেরকে এ ব্যাপারে শিক্ষা দেয়। সুতরাং আমরা শাস্তি বা শান্তি শারীরিক ও আত্মিক—উভয়টিকে স্বীকার করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু যে হাকিকতকে উপমা জগতের স্থলাভিষিক্ত করছ, এটা অপ্রমাণিত এবং জবরদস্তিমূলক মতবাদ। পরে যদি তারা বলে যে, শরীর গঠন হওয়ার পর চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার কারণে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সম্ভব।
তার উত্তরে আমরা বলব, কুদরতের সম্মুখে কোনো কথা অসম্ভব নয়। যেহেতু মানুষ তার সত্তাজুড়ে মানুষ, যদি ওই মাটি ছাড়া, যা দ্বারা সে সৃষ্টি হয়েছে, অন্য কোনো মাটি দ্বারা তাকে বানানো হয়, তাহলে তো সে মানুষের গোত্র থেকে বেরিয়ে যাবে না। যেহেতু তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ আকৃতিতে রূপান্তরিত হয় এবং দুর্বল থেকে মোটাতাজার দিকে ধাবিত হয়। যদি তারা বলে, এই শরীর ওই শরীর আর নেই, যেহেতু তাকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। এমনকি রগ ও রক্তে পরিণত হয়েছে। তখন জবাবে আমরা বলব, আল্লাহ তায়ালার কুদরত বুদ্ধি ও দৃশ্যায়নের ওপর নির্ভরশীল নয়। এছাড়া আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে খবর দিয়েছেন যে, মানুষ কবর থেকে তার শরীরসমেত হাশরের মাঠে প্রত্যাবর্তন করবে।
হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, مَا بَيْنَ النَّفْخَتَيْنِ أَرْبَعُونَ قَالُوا: يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَرْبَعُونَ يَوْمًا؟ قَالَ: أَبَيْتُ، قَالُوا: أَرْبَعُونَ شَهْرًا؟ قَالَ: أَبَيْتُ، قَالُوا: أَرْبَعُونَ سَنَةً؟ قَالَ: أَبَيْتُ، ثُمَّ يُنْزِلُ اللَّهِ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَيَنْبُتُونَ، كَمَا يَنْبُتُ الْبَقْلُ» قَالَ: «وَلَيْسَ مِنَ الْإِنْسَانِ شَيْءٍ إِلَّا يَبْلَى إِلَّا عَظْمًا وَاحِدًا، وَهُوَ عَجْبُ الذَّنَبِ، وَمِنْهُ يُرَكَّبُ الْخَلْقُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'উভয় ফুৎকারের মাঝে চল্লিশ জমানা হবে। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবু হোরায়রা, এটা চল্লিশ দিনের জমানা? তিনি উত্তরে বললেন, আমার স্মরণ নেই। তার জিজ্ঞেস করল, এটা চল্লিশ মাসের জমানা? তিনি বললেন, আমার স্মরণ নেই। তারা জিজ্ঞেস করল, এটা কি চল্লিশ বছরের জমানা? তিনি উত্তরে বললেন, আমার স্মরণ নেই। তিনি বললেন, অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তখন তোমরা এমনভাবে জেগে উঠবে, যেভাবে সবুজ ঘাস জাগে। পরে বলেছেন, মানুষের পুরো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, কেবল অবশিষ্ট থাকে একটি হাড়, আর এটি হচ্ছে মেরুদণ্ডের হাড়। এর মাধ্যমেই কেয়ামতের দিন মানুষ মিলিত হবে।”
টিকাঃ
১. এখন (২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে আনুমানিক এক হাজার বছর পূর্বে লেখা হয়েছিল। কারণ আল্লামা ইবনুল জাওযি (রহ.) ইন্তেকাল করেন ৫৯৭ হিজরী মোতাবেক ১২০১ খ্রিষ্টাব্দে।
২. সুরা মুলক: আয়াত ১৪
৩. সুরা আনয়াম: আয়াত ৫৯
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৪৯৩৫; সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৯৫৫
📄 দার্শনিকদের মতবাদ
শয়তান আমাদের মাযহাবের কিছু গোষ্ঠীর ওপর ধোঁকা দিয়ে বসেছে, তাদের ধীশক্তি, স্মরণশক্তি ও বিবেক-বুদ্ধির অন্দরে সে হানা দিয়েছে। তাদেরকে বুঝিয়েছে যে, দর্শনের অনুসরণ করা পুণ্যের কাজ। কেননা তাদের কাছ থেকে এমন কাজ ও কথা বেরোয়, যা অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। এরা সর্বদা সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, গ্যালিলিওদের অভিমত নিয়ে পড়ে থাকে। অথচ এসব জ্ঞানীদের ওপর কেবল গণিত, তর্কশাস্ত্র ও প্রকৃতিশাস্ত্র নির্ভরশীল। তারা নিজের বুদ্ধি-বিবেকের মাধ্যমে গোপন বিষয় প্রকাশ করে। কিন্তু যখন তারা সৃষ্টিকর্তার বিষয়ে কথোপকথন চালিয়েছেন, তখন হোঁচট খেয়েছেন। এ কারণে তাদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু গণিতশাস্ত্রে মতভেদ সৃষ্টি হয়নি। আমরা তাদের হোঁচট খাওয়ার বিষয়টি তাদের মতবাদের আলোচনায় আলোকপাত করেছি।
তাদের হোঁচট খাওয়ার কারণ হচ্ছে, মানবিক শক্তি সৃষ্টিকর্তার শক্তিকে কেবল সংক্ষিপ্তভাবে বুঝতে পারে। এবং এই বোঝার জন্য তাকে শরিয়তের দিকে মনোযোগী হতে হয়। 'মুতাআখিরিন' তথা পরবর্তী যুগের দার্শনিকদের জন্য উদাহরণে বলা হয়েছে যে, হাকিমগণ এবং পূর্ববর্তী দার্শনিকরা সৃষ্টিকর্তার অস্বীকারকারী ছিল। তারা শরিয়তকে দূরে নিক্ষেপ করত। এমনকি এটাকে ধোঁকা মনে করত। পরবর্তী যুগের দার্শনিকরা তাদের এই মতবাদকে সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছে। তারা দীনের শিআর ছেড়ে দিয়েছে। নামাযকে অহেতুক ও বেকার মনে করেছে। নিষিদ্ধ বস্তুকে গ্রহণ করেছে। শরয়ি বিচারকে অসার ভেবেছে। ইসলামি জীবনাচার ছেড়ে ইহুদি-নাসারাদের আকিদা-বিশ্বাস গ্রহণ করে নিয়েছে। তাদের কাছে কোনো প্রমাণই নেই, তারা শুধু এটুকু জানে যে, তাদের পূর্ববর্তীরা জ্ঞানী ছিলেন। তাদের জন্য আফসোস হয়, তারা কি এটা জানে না যে, আম্বিয়া আলাইহিস সালামও জ্ঞানী ছিলেন এবং জ্ঞানীদের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন?!
তারা তাদের জ্ঞানী মনীষীদের কাছে সৃষ্টিকর্তা অস্বীকারের ব্যাপারে যে বার্তা পেয়েছে তা শুধু অসারই নয়; বরং অসম্ভব। কেননা তাদের অধিকাংশ সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে এবং নবুওয়াতকেও অস্বীকার করে। তথাপি তারা এ বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করা বেকার ভেবেছে। তাদের মধ্যে গুটিকয়েক লোক তা অস্বীকার করে দাহরিয়ার অনুসারী হয়েছে। যাদের বুদ্ধির বিকৃতি কয়েকভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। আমরা আমাদের অনেক দার্শনিকদের দেখেছি, তারা তাদের দর্শন দিয়ে কেবল গাদ্দারি আর ঘাড়ত্যাড়া মনোভাবই লালন করেছে। এখন তারা না দর্শনের চাহিদা বুঝতে পারছে, না ইসলামের চাহিদা জানতে পারছে; বরং তাদের অনেকে এমন আছে, যারা রোযা রাখে, নামায পড়ে—তারপরও সৃষ্টিকর্তা এবং নবুওয়াত নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং হাশরের মাঠে শারীরিক উপস্থিতির ব্যাপারে অভিযোগ উত্থাপন করে। তাদেরকে দেখবে, তারা জাগতিক টানাপোড়েনের শিকার। সাধারণত তারা তাকদিরের ওপর অসন্তুষ্ট। এমনকি আমাকে কোনো কোনো দার্শনিক বলেছেন, তুমি সে বিষয়ে বিতর্ক করছ যা আকাশে আছে। সে ব্যাপারে তারা বহু কবিতা আবৃত্তি করে থাকে। তন্মধ্যে কয়েকটি পঙ্ক্তি নিম্নরূপ:
أتراها صنعة من غير صانع * أم تراها رمية من رام وقوله واحيرتا من وجود ما تقدمه * منا اختيار ولا علم فيقتبس كأنه في عماء ما يخلصنا * منه ذكاء ولا عقل ولا شرس ونحن في ظلمة ما إن لها قمر * فيها يضيء ولا شمس ولا قبس مدلهين حيارى قد تكنفنا * جهل يجهمنا في وجهه عبس فالفعل فيه بلا ريب ولا عمل * والقول فيه كلام كله هوس
'আফসোস! পৃথিবীতে আমাদের জন্য ভালো নির্ধারণ করা হয়নি, না কোনো জ্ঞান অর্জিত হচ্ছে। তাহলে অযথা জ্ঞানার্জন করে কী লাভ? আমরা কালের বাহুডোরে এমন মসিবতে আক্রান্ত, যেখান থেকে না বিবেক-বুদ্ধি আমাদের মুক্তি দিতে পারে, না কোমল স্বভাব ও আচার-ব্যবহার। আমরা এমন অন্ধকারে নিমজ্জিত, যেখানে না কখনো চন্দ্রের উদয় হয়, না সূর্যের আলো, না বিজলির ঝিলিক। নিশ্চয় কালের খেয়ায় কাজ করা নিছক বেকার এবং কোনো প্রকার কথাবার্তা বলা একদম বেহুদা।'
যেহেতু আমাদের কালে দর্শন ও বৈরাগ্যবাদ—উভয়টিই নিকটবর্তী, তাই আমাদের ধর্মের অনেক লোক তাদের আঁচলে ঠাঁই নিয়েছে। কেউ কেউ তাদের অনুসরণ করছে। এ জন্য তোমরা অধিকাংশ বেকুবদের দেখবে, যখন তারা আকিদার অধ্যায়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তখন খামোখা দর্শনের পেছনে পড়ে থাকে। আর যখন সাধনায় ব্রতী হতে চায়, তখন বৈরাগী সাজে। অবশেষে আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে ধর্মের ওপর অটল ও অবিচল রেখে শত্রুদের খপ্পর থেকে রক্ষা করেন।
📄 গ্রহণজালারিদের ওপর শয়তানের অভিনব ধোঁকা
সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের মূর্তি তৈরি করে তার পূজা-অর্চনাকারীরা বলে, ঊর্ধ্বজগতের আত্মাসমূহের প্রত্যেকটির একটি করে দেহ রয়েছে। যেভাবে আমাদের প্রত্যেকের রুহের জন্য একটি বিশেষ দেহ রয়েছে। আমরা সে-সব আত্মা পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম না বিধায় তাদের দেহের নমুনা তৈরি করে তার পূজা করি, তাকে ভোগ দান করি এবং তার জন্য উৎসর্গ করি। এর জন্য ঘর নির্মাণ করি।
ইয়াহইয়া ইবনে বিশর নাহাভান্দির বর্ণনামতে, তাদের এক সম্প্রদায় বলে, সাতটি গ্রহ-নক্ষত্র তথা—শনি, বৃহস্পতি, মঙ্গল, শুক্র, বুধ, চন্দ্র ও সূর্য—এগুলো জগতের নিয়ন্ত্রক। উক্ত সম্প্রদায় প্রত্যেকটির একটি করে মূর্তি তৈরি করে তার আকৃতির সাথে সাদृশ্যপূর্ণ একটি প্রাণী তার জন্য উৎসর্গ করে থাকে। শনি গ্রহের একটি অন্ধ মূর্তি তৈরি করে। অতঃপর তার জন্য একটি বৃদ্ধ বলদ উৎসর্গ করে। বলদকে একটি গর্তে ফেলে অগ্নিদগ্ধ করে আর বলে, হে অন্ধ মাবুদ! তুমি পবিত্র। তবে তোমার মন্দ প্রকৃতি রয়েছে, যা কখনো ভালো কাজ করে না। আমরা তোমার জন্য তোমার সাদৃশ্যপূর্ণ একটি ভোগ উৎসর্গ করলাম। তুমি এটা গ্রহণ করে আমাদেরকে স্বীয় মন্দ ও অশিষ্টকর বিষয় থেকে নিরাপদে রেখো।
একটি দুগ্ধপায়ী শিশু বৃহস্পতি গ্রহের জন্য উৎসর্গ করে। তার নিয়ম হচ্ছে, প্রথমে একজন বাঁদি ক্রয় করে। তার সাথে সপ্ত মূর্তির খাদেমরা সংগম করে। সে প্রসবের পর নবজাত শিশুকে বিশেষ পদ্ধতিতে উক্ত মূর্তির জন্য উৎসর্গ করে আর বলে, হে কল্যাণের উপাস্য! আপনি মন্দ বিষয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আপনার জন্য আপনার মতো একটি নিষ্পাপ ভোগ উৎসর্গ করলাম। আপনি আমাদের কাছ থেকে এটা গ্রহণ করে আপনার কল্যাণময় আত্মা থেকে আমাদের কিছু দান করুন।
মঙ্গলের জন্য একজন কালো বর্ণের ব্যক্তিকে উৎসর্গ করে। ওই ব্যক্তিকে তারা একটি হাউজের ভেতর প্রবেশ করায়। হাউজের ভেতর পেরেক থাকে। পেরেকে তাকে ভালো করে বাঁধা হয়। যাইতুন তেল দ্বারা হাউজটি পূর্ণ করা হয়। একজাতীয় ঔষধ এতে মেশানো হয়; যাতে তার স্নায়ুতন্ত্রগুলো শক্তিশালী হতে পারে। ভালো মানের খাবার খাইয়ে তাকে হৃষ্টপুষ্ট করা হয় এবং চর্বি বৃদ্ধি পায়। এক বছর ধরে এভাবে খাবার পর তার দেহের চর্বিগুলো পৃথক করে মাথার নিম্নাংশে একত্র করে মঙ্গলের মূর্তির কাছে উপস্থাপন করে বলে, হে মন্দ ও অনিষ্টের উপাস্য! তোমার অনুরূপ একটি ভোগ তোমার জন্য উৎসর্গ করলাম। তুমি এটা গ্রহণ করে তোমার মন্দ আত্মার অনিষ্ট থেকে আমাদেরকে রক্ষা করো।
পূর্বে উল্লেখিত যে নিষ্পাপ শিশুকে বৃহস্পতির জন্য উৎসর্গ করা হয়েছিল, তার মাকে সূর্যের জন্য উৎসর্গ করা হয়। তাকে সূর্যের প্রদক্ষিণ করানো হয়। অতঃপর সূর্যের মূর্তিকে সম্ভোধন করে বলে, হে জ্যোতিষ্ক উপাস্য! তুমি প্রশংসনীয়। তোমার অনুরূপ একটি ভোগ তোমার জন্য উৎসর্গ করেছি। তুমি আমাদের ভোগ গ্রহণ করে আমাদেরকে তোমার কল্যাণ দান করো।
এভাবে শুক্রের জন্য একজন অর্ধ বয়স্কা বোবা মহিলাকে উৎসর্গ করে। তাকে ওই মূর্তির কাছে নিয়ে বলে, হে নির্বাক উপাস্য! তোমার জন্য তোমার অবিকল একজন সুশ্রী ও নির্বাক মহিলাকে উৎসর্গ করেছি। তুমি আমাদের ভোগ গ্রহণ করো। এরপর লাকড়ি এনে মহিলার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেলে কিছু ভস্ম মূর্তির মুখে মেখে দেয় গ্রহপূজারিরা।
একজন শিক্ষিত, জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান যুবককে তারা বুধ গ্রহের জন্য উৎসর্গ করে। বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে তাকে হাজির করা হয়। তাকে এমন ঔষধ সেবন করানো হয়, যার ফলে তার জ্ঞান লোপ পেয়ে যায় এবং বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। তাকে সে মূর্তির সামনে পেশ করে বলে, হে বুদ্ধিমান উপাস্য! তোমার জন্য তোমার মতো বুদ্ধিমান যুবক ভোগ নিয়ে এসেছি। তুমি আমাদের ভোগ গ্রহণ করে নাও। এরপর ওই বুদ্ধিমান যুবককে কেটে চার টুকরো করা হয়। মূর্তির চারপাশে চারটি লাকড়ি পুঁতে এক একটি লাকড়ির মাথায় এক একটি টুকরো ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এটি পুড়ে ভস্ম হয়ে গেলে তা মূর্তির মুখে মাখিয়ে দেয়া হয়।
এভাবে চাঁদের জন্য বড়সড় চেহারাবিশিষ্ট এক লোককে উৎসর্গ করা হয়। তাকে ডেকে বলা হয়, হে উপাস্যদের ডাকপিয়ন! হে ঊর্ধ্বজগতের সর্বাপেক্ষা হালকাদেহী!