📄 দার্শনিকদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
নাওবখতি' বলেন, অজ্ঞদের দল মনে করে, বস্তুর হাকিকত বা বাস্তবতা বিশেষ একটি নয়; বরং প্রত্যেক বস্তুর বাস্তবতা প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠীর নিকট তাদের বিশ্বাসের অনুরূপ। যেমন-মধু পিত্ত প্রকৃতি রোগীদের কাছে তিক্ত স্বাদের হয় আর অন্যদের কাছে তা খুবই মিষ্টি। অনুরূপভাবে পৃথিবীকেও যারা 'কাদিম' আদি মনে করে, তাদের মতে আদি। আবার যারা 'হাদেস' অনাদি ও অবিনশ্বর মনে করে, তাদের দৃষ্টিতে অনাদি। আর বিভিন্ন প্রকার রং-কে যারা শরীরী মনে করে, তাদের মতে তা 'আরেযি' তথা পরনির্ভরশীল। অর্থাৎ বস্তুর বাস্তবতা বিভিন্ন রকম।
নাওবখতি বলেন, এরাও সুফিসতায়িদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের জবাবে বলা যায়, তোমাদের কথা সঠিক? তাহলে তারা বলবে, হ্যাঁ, আমাদের মতে সঠিক আর তোমাদের মতে ভুল। তখন আমরা বলব, তোমার এই স্বীকারোক্তি তোমাদের মাযহাব নিজেদের বিরুদ্ধেই বাতিল বলে গণ্য হলো। তোমাদের কাছে দলিল আছে। আর যে কোনো কারণে নিজের কথা বাতিল হওয়ার ওপর দলিল সাব্যস্ত করে, তাহলে তার বিপক্ষে তার মাযহাব বাতিল হিসেবে পরিগণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। দ্বিতীয় আরেকটি উত্তর তাদের ক্ষেত্রে এমনভাবে উপস্থাপন করা যায়, তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা প্রত্যক্ষদর্শনের জন্য কোনো বাস্তবতা মানো কি না? যদি বলে, প্রত্যক্ষদর্শনের বাস্তবতা বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। তাহলে তারা মূল হাকিকত তথা বাস্তবতাকে অস্বীকার করল। এখন তাদের সাথে ওইভাবেই কথা হবে যেভাবে কথা হয়েছিল পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের সাথে।
নাওবখতি বলেন, এই গোষ্ঠীর কেউ কেউ এমন আছে, যারা বলে, পৃথিবী বিবর্তনশীল। তারা আরও বলে, মানুষ একটি বস্তু দ্বিতীয়বার মনে রাখতে পারে না। কেননা বস্তু সর্বদা বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হতে থাকে। তার উত্তরে বলা যায়, তোমরা এই জ্ঞান কোথায় পেলে? অথচ তোমরা নিজেরাই ওই বাস্তবতাকে অস্বীকার করো, যার কারণে এই পৃথিবী অস্তিত্বে এসেছে। দ্বিতীয়বার আমরা যখন তোমাদের কাউকে জবাব দেবো, তখন সেই ব্যক্তি হবে না—যার সাথে আমরা কথা বলেছি।
টিকাঃ
১. তার পূর্ণ নাম: আবু মুহাম্মাদ আল হাসান ইবনে ইহাইয়া আন নাওবাখতি। তিনি একজন ইমামিয়া শিয়াপন্থী বিতার্কিক। নিজ মতবাদের ওপর লেখা তার গ্রন্থের নাম 'আল আরা ওয়াদ দিয়ানাত'।
📄 দাহরিয়াদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, ইবলিস বহু মাখলুককে এই সংশয়ে নিমজ্জিত করেছে যে, নাউযুবিল্লাহ, কোনো সৃষ্টিকর্তা ও মাবুদ নেই। আর এই বস্তুজগৎ কোনো সৃষ্টিকর্তার মাধ্যম ছাড়াই অস্তিত্বে এসেছে। এসব লোক যেহেতু সৃষ্টিকর্তাকে কোনো কিছুর মাধ্যমে পাননি এবং তার পরিচয়ের জন্য জ্ঞান-বুদ্ধি খাটাননি, তাই তারা সৃষ্টিকর্তাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে যাচ্ছে। কোনো বুদ্ধিমান লোক কি এমন নাস্তিক্যবাদী চিন্তা-চেতনা লালন করতে পারে? মানুষের চলাচল যদি এমন কোনো মাঠের পাশ দিয়ে হয়, যেখানে কোনো দালান কোঠা নেই, পরে আবার কখনো সেখান দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার সময় যদি কোনো দেয়াল বা দালানের অস্তিত্ব দেখে, তাহলে নিশ্চিত করে সে বলবে, এই দেয়াল বা দালানের কোনো নির্মাতা অবশ্যই রয়েছেন। তাহলে এই জমিনের বিছানা, ওই বিশাল আকাশ এবং এ সব আশ্চর্য বস্তুজগৎ কি এর সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রমাণ দেয় না? কোনো এক আরব কবি কত সুন্দর করে বলেছেন:
إن البعرة تدل على البعير * فهيكل علوي بهذه اللطافة ومركز سفلي بهذه الكثافة * أما يدلان على اللطيف الخبير
"উটের বাহ্য তার উট হওয়ার ওপর প্রমাণ সাব্যস্ত করে। তাহলে মহাকাশের ওই সূক্ষ্মজগৎ আর জমিনের এই সমুদয় বস্তুজগৎ কি মহান কুশলী এবং সর্বজ্ঞাত সৃষ্টিকর্তার প্রমাণ দেয় না?”
আবার মানুষ যদি তার নিজের সত্তা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে তাহলে এ ব্যাপারে সে যথেষ্ট প্রমাণ ও যুক্তি পেতে পারে। কেননা এই মানব শরীরে যে প্রজ্ঞা ও হেকমত বিদ্যমান, এখানে সবিস্তারে তা আলোকপাতের অবকাশ নেই। চিন্তা করুন, সামনের দাঁত এজন্য ধারালো করে সৃষ্টি করেছেন যাতে খাবার বা অন্যান্য বস্তু কাটা যায়। ভেতরের দাঁতগুলো প্রশস্ত করে সৃষ্টি করেছেন, যাতে খাবার পেষণ ও চূর্ণ করা যায়। জিহ্বাকে এমন নরম করেছেন যাতে খাবারকে ওলট-পালট করা যায়। আঙ্গুলে গিড়া সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে তা খোলা এবং বন্ধ করা যায়। এতে করে তার জন্য কাজ করা সহজ হয়। আবার কোনো কোনো আঙ্গুল বড় আবার কোনোটা ছোট। আবার সবগুলো আঙ্গুল মেললে বরাবর সমান হয়ে যায়। এতেও রয়েছে অপরিসীম হেকমত। কে সৃষ্টি করল এই শরীর? মানবদেহে আল্লাহ তায়ালা কিছু অদৃশ্য শক্তি রেখেছেন। তন্মধ্যে একটি হলো প্রাণ। প্রাণ বের হয়ে গেলে মানবদেহ বেকার হয়ে পড়ে। আরেকটি হলো আকল বা বিবেক; যা মানুষকে কল্যাণজনক বিষয়ের প্রতি পথ প্রদর্শন করে। প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রত্যহ বলে, أفي الله شك "আল্লাহর অস্তিত্বে কি কোনো সন্দেহ আছে?” আসলে এরা আল্লাহকে প্রকাশ্য জাগতিক উপায়ে দেখার বৃথা চেষ্টা করে পথভ্রষ্ট হয়েছে।
কিছু লোক আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এ জন্য যে, আল্লাহ তায়ালার যে অস্তিত্ব 'ইজমালি' বা মিলিতভাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে তারা তা বিস্তারিতভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। পক্ষান্তরে আমরা অনেক জিনিস এ-রূপ ইজমালি ও মোটামুটিভাবে উপলব্ধি করি; বিস্তারিত উপলব্ধি করতে পারি না। কিন্তু এর দরুন ওই জিনিসের অস্তিত্ব অস্বীকার করি না। যেমন বিবেক-বুদ্ধি আমরা ইজমালি ও মোটামুটিভাবেই উপলব্ধি করে থাকি। বিস্তারিতভাবে জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করতে পারি না। তাই বলে কি আকল বা বিবেকের অস্তিত্বকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে?
নাস্তিকেরা আমাদের উপরোক্ত যুক্তিতে প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, তোমাদের কথা অনুযায়ী যেভাবে কোনো একটি নবঘটিত বস্তুর জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন, অদ্রূপ মূলধাতুরও প্রয়োজন; যা পূর্ব হতে ছিল। যেমন টেবিল তৈরি করতে হলে যেভাবে মিস্ত্রির প্রয়োজন, তেমনই কাঠেরও প্রয়োজন— যা মূলধাতু উপাদান। টেবিলের যে আকৃতি আমাদের সামনে দেখা যাচ্ছে, তার জন্য উক্ত উপাদান অপরিহার্য। এ হিসেবে জগৎ চিরন্তন ও অবিনশ্বরই প্রমাণিত হলো।
এ প্রশ্নের জবাবে বলা হবে, আল্লাহ তায়ালা কোনো বস্তু সৃষ্টি করার ব্যাপারে কোনো ধাতু ও উপাদানের মুখাপেক্ষী নন। কোনো প্রকার ধাতু ও উপাদান ব্যতীতই তিনি সবকিছু সৃষ্টি ও আবিষ্কারে সক্ষম। কোনো আকৃতির অস্তিত্বের জন্য ধাতু ও উপাদান অপরিহার্য নয়। যেমন চরকার একটি আসল আকৃতি আছে। কিন্তু চরকা যখন ঘুরতে থাকে তখন প্রতি মুহূর্তে তার আকৃতির পরিবর্তন হতে থাকে। আর সে আকৃতির জন্য কোনো ধরনের ভিন্ন উপাদান নেই। এ ক্ষেত্রে এমন এক আকৃতি পাওয়া যায়—যা উপাদানবিহীন। কিন্তু তোমরা সৃষ্টির এমন একটি উপমা দেখাও—যা সৃষ্টিকর্তাবিহীন অস্তিত্ব লাভ করেছে।
📄 প্রকৃতিবাদীদের ওপর শয়তানের ধোঁকার বর্ণনা
গ্রন্থকার বলেন, শয়তান যখন দেখল, নাস্তিক্যবাদ তথা সৃষ্টিকর্তার অস্বীকারকারীদের মধ্যে তার কথা কম মান্য করা হয়। কেননা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, সৃষ্টিবস্তুর অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা থাকা চাই। শয়তান এবার এই ধূম্রজাল ছড়াল যে, এই সৃষ্টিবস্তু প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। মৌল চার উপাদানের মাধ্যমে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্ট।
তার উত্তর হচ্ছে, আমরা বলি, প্রকৃতির সমবেত হওয়া তো এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, প্রকৃতি বিদ্যমান। না এটা নিজেই সৃষ্টিকর্তা। তথাপি এটাও প্রমাণিত যে, প্রকৃতি সমবেত ও সংমিশ্রণ ব্যতীত অস্তিত্বেই আসতে পারে না এবং এটা খোদ প্রকৃতিরই বিপরীত। সুতরাং বোঝা গেল প্রকৃতিও আদিষ্ট ও অপারগ। তাছাড়া এটাও স্বীকৃত যে, প্রকৃতির নিজস্ব কোনো জীবন, জ্ঞান ও শক্তি নেই। সুতরাং এটা কী করে সৃষ্টিকর্তা হতে পারে? একটি সুশৃঙ্খলিত ও সুনিয়ন্ত্রিত কর্মযজ্ঞ কোনো জ্ঞানী বা বুদ্ধিসম্পন্নই করতে পারে। কোনো বস্তু নিজেই যখন জ্ঞানী নয়, তখন কী করে সে আরেক জ্ঞানীর সৃষ্টিকর্তা হতে পারে? যার নিজস্ব কোনো শক্তি নেই সে অন্যকে শক্তি বিলাবে কীভাবে? বিরুদ্ধবাদীরা যদি বলে যে, সৃষ্টিকর্তা যদি জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান হতো তাহলে এই সৃষ্টিবস্তুতে কোনো ত্রুটি থাকত না এবং কষ্টদায়ক কোনো জীবজন্তু সৃষ্টি হতো না। তাই এগুলো সব প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি। আমরা এর উত্তরে বলে থাকি, এই অভিযোগ তোমাদের ওপর পতিত হয়। মহান সৃষ্টিকর্তা যেভাবে সুনিপুণ ও সুশৃঙ্খলিতভাবে বিশ্বজগৎ ও জাগতিক বস্তু-সামগ্রী সৃষ্টি করেছেন, প্রকৃতির মাধ্যমে তা কখনো সম্ভব নয়।
আমরা দেখতে পাই, একই মৌসুমে সূর্যের প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন ফলে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কোনো শস্য বা ফলে রস আনয়ন করে আবার কোনোটিতে রস শোষণ করে। যদি প্রকৃতিই প্রকৃত কর্তা হতো তাহলে এ পার্থক্য ঘটত না। এর অবশ্যই একজন নিয়ন্তা ও কর্তা রয়েছেন। যিনি সূর্য দ্বারা ইচ্ছেমাফিক কাজ নেন। আরও লক্ষ করা যেতে পারে, যাকে সূর্যের কিরণ শুষ্ক করে সেটা থাকে আবরণমুক্ত। আর যাকে আর্দ্র ও রসালো করে সেটা থাকে আবরণযুক্ত। অথচ বাহ্যিক দৃষ্টিতে ক্রিয়া বিপরীত হওয়ার কথা ছিল।
আমরা আরও দেখতে পাই, একই পানি দ্বারা উৎপন্ন ফলমূলের কোনোটি টক হচ্ছে, আবার কোনোটি হচ্ছে মিষ্ট। এটা একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তারই কাজ, যিনি মহা প্রজ্ঞাবান, সক্ষম ও সক্রিয়। সেদিকে ইশারা করে পানি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يُسْقَى بِمَاءٍ وَاحِدٍ وَنُفَضِّلُ بَعْضَهَا عَلَى بَعْضٍ فِي الْأُكُلِ
"সবই সিঞ্চিত একই পানিতে কিন্তু স্বাদের ক্ষেত্রে আমি করে দেই তাদের কোনোটাকে বেশি ভালো এবং কোনোটাকে কম ভালো।”
টিকাঃ
১. সুরা রা'আদ: ৪
📄 দ্বিত্ববাদী (সানূভিয়্যা)-দের ওপর শয়তানের ধোঁকা
দ্বিত্ববাদী বা সানুভিয়াদের মতাদর্শ হচ্ছে, তারা বলে, পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা দু'জন। ১. ভালো কাজের সৃষ্টিকর্তা, এটি নূর বা আলো, ২. মন্দ কাজের সৃষ্টিকর্তা, এটি যুলমাত বা অন্ধকার। উভয়টিই 'কাদীম' তথা অনন্ত, অনাদি ও চিরন্তন। উভয়েই সর্বদা ছিলেন এবং থাকবেন। উভয়ে শক্তিশালী, স্পর্শযোগ্য, শ্রোতা ও দ্রষ্টা। উভয়ে একে অন্যের বিপরীত।
দ্বিত্তবাদীদের কিতাব থেকে তাদের এই আকিদার কথা উল্লেখ করেছেন আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি। তিনি বলেন, তাদের ধারণা-সেই দুই সৃষ্টিকর্তা একজন অন্যজনের কাছাকাছি অবস্থান করেন। তাদের অনেকে মনে করে, নূর সর্বদা অন্ধকারের উপরে অবস্থান করে। কারো কারো ধারণা মতে, উত্তরে নূর তথা আলোর অবস্থান আর দক্ষিণে অন্ধকার। সর্বদা তারা একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে অবস্থান করে। নাওবখতি বলেন, সানুভিয়াদের মতে, উভয় খোদা পাঁচ পাঁচটি বস্তুতে বিভক্ত। তন্মধ্যে চারটি হচ্ছে দেহজাতীয় আর একটি রুহ। নূরের দেহ চতুষ্টয়-অগ্নি, আলো, বাতাস ও পানি। আর তার রুহ হচ্ছে জ্যোতি। যা শরীরে সর্বদা অবস্থান করে। অনুরূপভাবে অন্ধকারের দেহ চতুষ্টয়-দাহন, তিমির, উত্তপ্ত হওয়া ও ধূলি। আর রুহ হচ্ছে ধূম্র। তারা নূরের শরীরকে 'মালাইকা' বা ফেরেশতা বলে আখ্যায়িত করে। আর অন্ধকারের শরীরকে শয়তান নামে ডাকে। কেউ কেউ বলে, অন্ধকার থেকে শয়তান সৃষ্টি হয় আর নূর দ্বারা ফেরেশতা সৃষ্টি হয়। নূর মন্দকে টপকাতে পারে না, আবার অন্ধকারও ভালোকে টপকাতে পারে না। নাওবখতি তাদের মাযহাবের আলো-অন্ধকার সংক্রান্ত অনেক মতভেদের কথা বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, তাদের ওপর কষ্ট ও ত্যাগ আবশ্যক এবং একদিনের অধিক খোরাক জমা রাখা যাবে না।
তাদের কারো কারো মতে, মানুষের জন্য তার জীবনের এক-সপ্তমাংশ রোজা রাখা বাধ্যতামূলক। মিথা, কৃপণতা, জাদু, মূর্তিপূজা, ব্যভিচার এবং চুরি পরিত্যাগ করা ফরয। কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেয়া যাবে না। এসব ব্যাপারে তারা তাদের অপূর্ণ বুদ্ধি দিয়ে নিত্য-নতুন মতবাদ তৈরি করে।
ইয়াহইয়া ইবনে বিশর নাহাভান্দী বলেন, তাদের মধ্যে একটি গোত্র আছে যাদেরকে 'দিসানিয়া' বলা হয়। তাদের মতবাদ হচ্ছে, পৃথিবীর মূল উপাদান কঠিন ও রুক্ষ ছিল। এই অভ্যাস এককালে আল্লাহর শরীর, যাকে অগ্নি বলা হয়, তাতে অবস্থিত ছিল। আল্লাহ তায়ালা এতে কষ্ট পেয়েছেন। নির্দিষ্ট এক সময় অতিক্রম হলে তিনি পৃথক করতে গেলে তা দেহের সাথে মিশে যায়। সেই দেহ এবং মৃত্তিকা দিয়েই এই পৃথিবী গঠিত। যা কিছু ভালো তার নূর, আর যা কিছু মন্দ তা যুলমাত বা অন্ধকার। যারা এই আকিদা লালন করে, তারা মানুষকে খুন করে এবং কষ্ট দেয়।
যারা এই আকিদা পোষণ করতে বাধ্য হয়, তার নেপথ্য কারণ হচ্ছে, তারা পৃথিবীতে মন্দ ও মতপার্থক্যে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। সুতরাং বোঝা গেল একটি মূল বস্তু থেকে দু'টি বিপরীতমুখী বস্তু প্রকাশ হতে পারে না। যেমন আগুনে গরম ও ঠান্ডা একত্র হতে পারে না। আলেমগণ তাদের দ্বিত্ব মতবাদকে এভাবে খণ্ডন করেছেন যে, যদি সৃষ্টিকর্তা দু'জন হতেন তাহলে নিশ্চিত তারা একে অন্যের ওপর বিজয়ী হতেন অথবা পরাজিত হতেন। অথবা একজন বিজয়ী হতেন অন্যজন হতেন পরাজিত। এটা তো সম্ভব নয় যে, উভয়ে পরাজিত। সুতরাং একটি পন্থা খোলা আছে, তা হলো—উভয়ে বিজয়ী হওয়া। এখন ধরুন তাদের কেউ, একটি দেহকে নির্দিষ্ট কোনো নড়া-চড়ায় ফেলতে চান, অন্যজন চান চুপ রাখতে। তাহলে এদের উভয়ে যে লক্ষ্যে পৌঁছতে চাচ্ছেন, তা কি একই সময়ে একজনের ওপর কখনো সম্ভব? কেননা একজন যদি তার ইচ্ছা পূরণ করেন, তাহলে অন্যজন তো অপারগ হয়ে গেলেন।
সানাভিয়াদের মতবাদ 'ভালোর জনক নূর, মন্দের জনক যুলমাত বা অন্ধকার'—এটাকে আলেমগণ এভাবে খণ্ডন করেছেন যে, যদি কোনো মজলুম ভেগে গিয়ে অন্ধকারের কাছে আশ্রয় পায়, তাহলে এটা তো ভালো কাজ—যা মন্দের পক্ষ থেকে এসেছে। সুতরাং এই গোষ্ঠীর সাথে বিতর্কে জড়িয়ে নিজেকে প্রভাবিত বা প্রতারিত করা অনুচিত। কেননা তাদের মাযহাব নিছক একটি ধোঁকা, যার কোনো উৎস নেই।