📄 শয়তান থেকে পানাহ চাওয়ার আলোচনা
শায়খ আবুল ফারাজ রহ. বলেন, আল্লাহ তায়ালা কুরআন তেলাওয়াতের সময় শয়তান থেকে পানাহ চাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْءَانَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
'সুতরাং যখন তুমি কুরআন পড়বে তখন আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান হতে পানাহ চাও।”
অন্যত্র জাদু আক্রান্ত হওয়ার সময় বলেছেন, قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ
'বলো, 'আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের কাছে।”
এ ধরনের দু'স্থানে যেহেতু শয়তান থেকে পানাহ চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অন্যস্থানে তো অবশ্যই পানাহ চাইতে হবে।
আবুততাইয়াহ বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনে খাম্বাশকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্য পেয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে বলুন, যে রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য শয়তান চক্রান্ত করেছিল, তখন তিনি কী করেছিলেন? তিনি উত্তরে বললেন, শয়তানের দল বিভিন্ন বন-জঙ্গল ও পাহাড়-পর্বত থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর এসে চড়াও হয়। তাদের একজনের হাতে ছিল অগ্নিশিখা। সে তা দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মোবারক জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিল। ইত্যবসরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি পড়ুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কী পড়ব? জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, বলুন,
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَذَرَأَ وَبَرَأَ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمِنْ شَرِّ مَا يَعْرُجُ فِيهَا، وَمِنْ شَرِّ فِتَنِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ طَارِقٍ إِلا طَارِقًا يَطْرُقُ بِخَيْرٍ يَا رَحْمَنُ، قَالَ: فَطُفِئَتْ نَارُهُمْ وَهَزَمَهُمُ اللَّهُ تَعَالَى
'আমি আশ্রয় চাচ্ছি আল্লাহ তায়ালার পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের মাধ্যমে, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন এবং বিস্তার করেছেন তার অনিষ্ট থেকে, আকাশ থেকে যা অবতীর্ণ হয় তার অনিষ্ট থেকে, আকাশে যা ওঠে তার অনিষ্ট থেকে। দিবা- রাত্রির অনিষ্ট থেকে এবং প্রত্যেক নিশাচরের অনিষ্ট থেকে, তবে ওই নিশাচর নয় যে কল্যাণ নিয়ে আসে হে দয়াময়।' রাবি বলেন, এই দোয়া পড়ার দ্বারা শয়তানের আগুন নিভে যায় এবং আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে পরাস্ত করে দেন।
হজরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'তোমাদের সবার কাছে শয়তান আসে এবং জিজ্ঞেস করে, তোমাকে কে সৃষ্টি করেছে? সে বলে আল্লাহ। তারপর শয়তান বলে, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? সুতরাং তোমাদের কারও মনে যখন এই ধারণার সৃষ্টি হবে, তখন বলবে, آمَنْتُ بِاللهِ وَرُسُلِهِ এটা বললে তোমার কাছ থেকে ইবলিসের এই প্ররোচনা দূরীভূত হয়ে যাবে।'
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'আদমসন্তানের ওপর শয়তানের প্রভাব রয়েছে, ফেরেশতারও প্রভাব রয়েছে। শয়তানের প্রভাব পড়লে সে মন্দ কাজে লিপ্ত হয় এবং সত্যকে অস্বীকার করে। অন্যদিকে ফেরেশতার প্রভাব পড়লে ভালো কাজের দিকে ধাবিত হয় এবং সত্যকে মান্য করে। তোমাদের মনে যখন সু-ধারণার উদয় হয়, তখন জেনে নেবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং শুকরিয়া আদায় করবে। পক্ষান্তরে মন্দ বিষয় উঁকি দিলে শয়তানের কাছ থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইবে। এরপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত পড়েন-
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ
লেখক আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, এই হাদিসটি জারির ইবনে আতা এবং আতা ইবনে মাসউদ রা. থেকে 'মাওকুফ' বর্ণনা করেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত হাসান ও হজরত হোসাইন রা. এর জন্য নিম্নোক্ত দোয়া পড়ে পানাহ চাইতেন আর বলতেন, তোমাদের পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ইসমাঈল ও ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর জন্য দোয়া পড়ে পানাহ চাইতেন,
أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
অর্থ : 'আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমার দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।”
আবু বকর আম্বারি বলেন, 'হাম্মাহ' শব্দটি 'হাওয়াম' এর বহুবচন। হাম্মাহ ওই মাখলুকদের বলা হয়, যারা মন্দ ও ক্ষতিকারক বিষয়ের ইচ্ছে পোষণ করে। 'লাম্মাহ' অর্থ কষ্টদায়ক বস্তু।
সাবেত রহ. হতে বর্ণিত, মুতরাফ বলেন, আমি চোখ মেলে দেখলাম, আদম সন্তান মহান আল্লাহ তায়ালা এবং ইবলিসের মাঝে অবস্থান করছে। আল্লাহ যদি তাকে রক্ষা করতে চান তবে হেফাজত করেন। আর আল্লাহ যদি তাকে ছেড়ে দেন তাহলে শয়তান তাকে নিয়ে নেয়।
পূর্বেকার এক মনীষীর ঘটনায় উল্লেখ আছে, তিনি তাঁর ছাত্রদের কাছে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, শয়তান যখন তোমার সামনে গুনাহের উপকরণ সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখে তখন তুমি কী করবে? ছাত্র বলল, আমি তাকে কষ্ট ও পরিশ্রমে পতিত করব। বুযুর্গ আবারও একই প্রশ্ন করলে ছাত্রও পুনরায় আগের মতো উত্তর দেয়। বুযুর্গ বললেন, এটা তোমার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হবে। অতঃপর বললেন, আচ্ছা, যদি তুমি কোথাও ছাগলের পালের নিকট দিয়ে গমন করো এবং সেই পালে একটি কুকুর তোমাকে আক্রমণ করে এবং তোমাকে সামনে অগ্রসর হতে না দেয়, তাহলে কী করবে? ছাত্র বলল, আমি যথাসম্ভব কুকুরকে প্রহার করব এবং যতদূর সম্ভব তাকে প্রতিহত করব। বুযুর্গ বললেন, এটাও তোমার জন্য কষ্টকর হবে। তোমার উচিত ওই ছাগলের পালের মালিককে ডাকা, সে তোমাকে কুকুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে।
গ্রন্থকার বলেন, জেনে রাখা দরকার—মুত্তাকি এবং দুনিয়াদারের সাথে ইবলিসের উদাহরণ হচ্ছে, যেমন এক ব্যক্তি বসে আছে এবং তার সম্মুখে কোনো খাবার নেই। কুকুর তার কাছে এলে সে যদি ধমক দেয় তবে কুকুর চলে যাবে। অন্যত্র গিয়ে যদি সে এমন ব্যক্তিকে দেখে যার সম্মুখে খাবার আছে, গোস্তও আছে; এই লোক কুকুরকে যতই ধমক দিক, কুকুর সরতে চাইবে না। প্রথমজন হচ্ছে মুত্তাকীর উদাহরণ। আর দ্বিতীয়জন হচ্ছে দুনিয়াদারের। তার থেকে শয়তান পৃথক হতে চাইবে না। কেননা সে সবার সাথে মিলেমিশে থাকে।
[আমরা আল্লাহর কাছে শয়তান হতে পানাহ চাই]
টিকাঃ
১. সুরা নাহাল: আয়াত ৯৮
২. সুরা ফালাক: আয়াত ১
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৩/৪১৯ [আলবানি রহ. হাদিসটি সহিহ বলেছেন]
৪. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৩৪-৩৩৪
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৩৭১