📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ইবলিসের ফিতনা ও ধোঁকার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি

📄 ইবলিসের ফিতনা ও ধোঁকার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি


শায়খ আল্লামা আবুল ফারাজ রহ. বলেন, মনে রাখতে হবে, ইবলিসের কাজ হচ্ছে, মানুষকে বিভিন্নভাবে সন্দেহে পতিত করে পথভ্রষ্ট করা। সর্বপ্রথম সে নিজেই এমন সন্দেহে আটকা পড়েছিল। সিজদার ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে সে সন্দেহে পতিত হয়, যা ছিল সম্পূর্ণ ভুল। যুক্তির পেছনে পড়ে সে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের জানান দেয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে অবহিত করেছেন এভাবে- خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ ‘ইবলিস বলল, আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন দিয়ে, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে। অন্যত্র বর্ণিত আছে, ‘সে বলল, দেখুন, এ ব্যক্তি, যাকে আপনি আমার উপর সম্মান দিয়েছেন, যদি আপনি আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দেন, তবে অতি সামান্য-সংখ্যক ছাড়া তার বংশধরদেরকে অবশ্যই পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব।” أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ ‘আমি তার চেয়ে উত্তম' বলে সে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে সে চিরদিনের জন্য আল্লাহর লানত ও শাস্তি খরিদ করে নেয়।

অতএব শয়তান যখন কোনো মানুষকে প্ররোচনা দেয়, তখন মানুষের উচিত, এই চিরশত্রুর ধোঁকা থেকে দূরে থাকা। কাউকে যদি সে বলে যে, আমি তোমার মঙ্গল কামনা করি। তখন তাকে উত্তর দিতে হবে, যে তুমি নিজের মঙ্গল বোঝো না সে আবার আমার মঙ্গল দিয়ে কী করবে? এছাড়া আমি আমার চিরশত্রুর ওপর কী করে ভরসা রাখতে পারি? তোমার কথায় আমি প্রভাবিত হব না। এখন শয়তান ধোঁকা দেবার আর কোনো উপায় না দেখে মানুষের 'নফসে আম্মারা' থেকে সাহায্য নেয়। নফসকে উদ্বুদ্ধ করে। কেননা সে উদ্যোগী হয়ে মানুষকে পাপকাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করে। তাই এ ক্ষেত্রে বিবেকের সাহায্য নিতে হবে। বিবেক গুনাহের পরিণতি চিন্তা করবে।

ইয়ায ইবনে হিমার বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى أَمَرَنِي أَنْ أُعَلَّمَكُمْ مَا جَهِلْتُمْ مِمَّا عَلَّمَنِي فِي يَوْمِي هَذَا، إِنَّ كُلَّ مَالٍ نَحَلْتُهُ عَبْدِي فَهُوَ لَهُ حَلَالٌ، وَإِنِّي خَلَقْتُ عِبَادِي حُنَفَاءَ كُلَّهُمْ، فَأَتَتْهُمُ الشَّيَاطِينُ فَاجْتَالَتْهُمْ عَنْ دِينِهِمْ، وَأَمَرْتُهُمْ أَنْ لَا يُشْرِكُوا بِي مَا لَمْ أُنْزِلْ بِهِ سُلْطَانًا، وَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
'হে মানুষেরা! আল্লাহ তায়ালা আমাকে সেসব কথা তোমাদেরকে বলার নির্দেশ দিয়েছেন, যা তোমরা জানো না। আল্লাহ তায়ালা আমাকে আজই বলেছেন, যে সম্পদ আমি আমার বান্দাকে দান করেছি, তা তাদের জন্য হালাল তথা বৈধ। আমার সকল বান্দাকে একটি সত্য দীনের ওপর সৃষ্টি করেছি। পরে শয়তান তাদের কাছে এসে তাদের ধর্মবিমুখ করে দিয়েছে। তখন তারা আমার সাথে সে সব বস্তুকে শরিক করে যার ব্যাপারে আমি কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করিনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা আরব-অনারব সবার দিকে দেখে মুষ্টিমেয় কিছু আহলে কিতাব ছাড়া অবশিষ্ট সকলের ওপর ভীষণ ক্রোধান্বিত হন।"

ইয়ায ইবনে হিমার থেকে অন্য একটি সূত্রে বর্ণিত আছে, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় বলেছিলেন, আল্লাহ তায়ালা আমাকে সেসব কথা তোমাদেরকে বলার নির্দেশ দিয়েছেন, যা তোমরা জানো না। এরপর তিনি পূর্বের হাদিসটি বললেন।

হজরত জাবের রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ، ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةٌ، يَجِيءُ أَحَدُهُمْ، فَيَقُولُ: فَعَلْتُ كَذَا وَكَذَا ، فَيَقُولُ: مَا صَنَعْتَ شَيْئًا، قَالَ: ثُمَّ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ، فَيَقُولُ : مَا تَرَكْتُهُ حَتَّى فَرَّقْتُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ قَالَ: فَيُدْنِيهِ مِنْهُ، أَوْ قَالَ: فَيَلْتَزِمُهُ، وَيَقُولُ: نَعَمْ: أَنْتَ
'ইবলিস পানিতে তার সিংহাসন গেড়েছে। সেখান থেকে তার বাহিনীকে দিগ্বিদিক পাঠায়। ওই সৈনিক শয়তানের অধিক নৈকট্য লাভ করে, যে বড় বড় ফিতনা চালু করতে পারে। সৈনিকেরা একে একে এসে তাদের কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি বর্ণনা দিয়ে বলে, আমি এমন এমন করেছি। উত্তরে শয়তান বলে, তোমরা তো কিছু করোনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শয়তানের সৈনিকদের মধ্য থেকে একজন এসে বলে, আমি অমুকের পরিবারে ঝগড়া ও ফাটল সৃষ্টি করে দিয়েছি। এ কথা শুনে শয়তান তাকে কাছে বসায়। অন্যত্র বর্ণিত আছে, তাকে শয়তান আলিঙ্গন করে বলে, নিশ্চয় তুমি বেশ ভালো কাজ করেছ এবং মহৎ কাজ করেছ।'

হজরত জাবের রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ إِبْلِيسَ قَدْ يَئِسَ أَنْ يَعْبُدَهُ الْمُصَلُّونَ، وَلَكِنْ فِي التَّحْرِيشِ بَيْنَهُمْ
'নামাযি ব্যক্তি তার অনুসরণ করবে-এ ব্যাপারে শয়তান নিরাশ হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের মাঝে ঝগড়া সৃষ্টি করে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে সে সক্ষম হয়ে যায়।'"

হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِنَّ الشَّيْطَانَ وَاضِعُ خَطْمَهُ عَلَى قَلْبِ ابْنِ آدَمَ، فَإِنْ ذَكَرَ اللَّهَ خَنَسَ، وَإِنْ نَسِيَ اللَّهَ الْتَقَمَ قَلْبَهُ
'শয়তান আদমসন্তানের অন্তরে তার শুঁড় গেড়ে আছে। যদি সে আল্লাহ তা'আলার জিকির করে তখন তার শুঁড় সরিয়ে নেয়, আর যদি আল্লাহকে ভুলে যায় তাহলে তার অন্তরকে গ্রাস করে ফেলে।'

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, শয়তান এমন একটি জামাতের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল যারা আল্লাহর যিকিরে মগ্ন ছিল। শয়তান তাদেরকে ফিতনায় ফেলতে চায়। কিন্তু সমবেত থাকার কারণে পারছিল না। পরে সে আরেকটি জমায়েতে উপস্থিত হয়ে দেখল, তারা দুনিয়াবি কথাবার্তা বলছে। তাদেরকে সে এমন প্ররোচনা দিতে থাকে যে, সেখানে ঝগড়া-ঝাঁটি এবং খুনের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটে গেল। আল্লাহর যিকিরকারী লোকেরা সেই ঝগড়া মীমাংসা করতে গেলে তাদের মাঝেও বিভেদ সৃষ্টি হয়ে গেল।'

হজরত কাতাদাহ রা. হতে বর্ণিত, ইবলিসের কাছে এক শয়তান আছে, যাকে 'কাবকাব' বলা হয়। তার মুখ চল্লিশ বছর ধরে লাগাম পরিহিত। কোনো বালক সেই রাস্তা দিয়ে গেলে এই শয়তানকে বলা হয়, তোমাকে চল্লিশ বছর ধরে এই ছেলের জন্য বেঁধে রেখেছি। যাও, একে ধরো এবং ফিতনায় ফেলো।

সাবেত বুনানি রহ. বলেন, আমার কাছে এই হাদিস পৌঁছেছে যে, শয়তান একবার হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম এর কাছে প্রকাশ পেলে তিনি তার গায়ে সব ধরনের অলংকার দেখতে পান। তা দেখে তিনি বললেন, হে ইবলিস! তোমার কাছে যে-সব অলংকার দেখছি, তা কীভাবে এসেছে? সে বলল, এসব হচ্ছে দুনিয়ার চাহিদা ও প্রবৃত্তি। এ দ্বারা আমি আদমসন্তানকে ঘায়েল করে থাকি। হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, এখানে কি আমার জন্যও কিছু আছে? সে বলল, আপনি পেট ভরে খেলে নামায পড়া আপনার জন্য কষ্টকর করে থাকি এবং আল্লাহর যিকিরকে আপনার জন্য ভারী করে থাকি। ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম বললেন, এছাড়া আর কিছু আছে কি? শয়তান বলল, আর কিছু নেই। ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো পেট ভরে আহার করব না। ইবলিস বলল, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো মানুষের উপকার করব না।

হজরত হারেস ইবনে কায়স রা. হতে বর্ণিত, নামায পড়ার সময় যখন তোমার কাছে শয়তান এসে বলে, তুমি রিয়া করছ, তখন নামাযকে দীর্ঘ করে দাও।

ইবনে আমের উবাইদ ইবনে রিফাআ থেকে শুনেছেন, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সনদ পৌঁছিয়ে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বনি ইসরাইলে মাঝে এক পাদ্রী ছিল। তার যুগে শয়তান এসে কোনো মেয়ের গলা টিপে অসুস্থ করে ফেলল এবং তার অভিভাবকদেরকে বলল, একে সুস্থ করতে হলে অমুক পাদ্রীর কাছে নিয়ে যাও। তার কাছে থাকলে সুস্থ হয়ে যাবে। তারা মেয়েকে নিয়ে পাদ্রীর কাছে গিয়ে বলল, মেয়েটি অসুস্থ। তাকে আপনার কাছে রাখুন। মেয়েটিকে পাদ্রীর কাছে সোপর্দ করা হলো। এদিকে শয়তান পাদ্রীর মনে এ ধারণা সৃষ্টি করে দিল যে, এখন তো তুমি লাঞ্ছিত হয়ে যাবে। তাই অভিভাবকরা তোমাকে মেরে ফেলবে। অতএব মেয়েটিকে হত্যা করে ফেলো। আর অভিভাবকরা যখন আসবে, তখন বলবে, সে মারা গেছে। পাদ্রী সে মতে কাজ করল। মেয়েটিকে হত্যা করে ফেলল। অপরদিকে শয়তান অভিভাবকদের কাছে এসে তাদের অন্তরেও এ ধারণা সৃষ্টি করে দিল যে, পাদ্রী মেয়ের সাথে অপকর্ম করে অন্তঃসত্ত্বা করে ফেলেছে। তাই অবমাননার ভয়ে তাকে মেরে ফেলেছে। অভিভাবকরা এসে মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে পাদ্রী বলল, সে মারা গেছে। তখন তারা পাদ্রীকে পাকড়াও করে। এবার শয়তান এসে পাদ্রীর অন্তরে এ ধারণা সৃষ্টি করে যে, দেখো আমিই তোমাকে এ বিপদে ফেলেছি। এখন আমার কথা মানো, তাহলে মুক্তি পাবে। আমাকে দু'টি সিজদা করো। পাদ্রী তখন শয়তানকে দু'বার সিজদা করল। এ বিষয়টিরই উল্লেখ কুরআনে কারীমের এ আয়াতে রয়েছে-
كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَانِ الْكْفُرُ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِنكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ
'(এরা) শয়তান-এর ন্যায়, সে মানুষকে বলেছিল, 'কুফরি করো', অতঃপর যখন সে কুফরি করল তখন সে বলল, আমি তোমার থেকে মুক্ত; নিশ্চয় আমি সকল সৃষ্টির রব আল্লাহকে ভয় করি।’

উপরোক্ত ঘটনাটি অন্যভাবেও আমাদের কাছে পৌঁছেছে। ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, বনি ইসরাইলে জনৈক আবেদ পাদ্রী ছিল। সে যুগে তার সমকক্ষ আর কেউ ছিল না। সে সময় এক পরিবারে তিন ভাই ও এক কুমারী বোন ছিল। তিন ভাই কোথাও যুদ্ধে যাবে। কুমারী বোনকে কার কাছে রেখে যাবে, চিন্তা করে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই তারা একমত হলো, অমুক আবেদের কাছে সোপর্দ করে যাবে। কারণ সে আবেদ ওই যুগে তাদের দৃষ্টিতে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ছিল। তিন ভাই আবেদের কাছে এসে বোনকে তার তত্ত্বাবধানে রেখে যাওয়ার আবেদন জানাল। কিন্তু পাদ্রী তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে দিল এবং তাদের কাছে এ থেকে পানাহ চাইল। তারা খুব কাকুতি-মিনতি জানালে অবশেষে আবেদ তা মঞ্জুর করে নিল এবং তাদেরকে বলল, তোমাদের বোনকে আমার গির্জার কাছে এ ঘরে রেখে যাও। তারা আপন বোনকে গির্জার সংলগ্ন ঘরে রেখে যুদ্ধে চলে গেল।

মেয়েটি আবেদের কাছে লালিত-পালিত হচ্ছে। পাদ্রী মেয়ের জন্য খাবার এনে গির্জার দরজার সামনে রেখে গির্জার ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিত। এরপর মেয়েকে ডেকে বলত, তোমার খাবার নিয়ে যাও। মেয়েটি এসে খাবার নিয়ে যেত। এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর শয়তান এসে পাদ্রীকে প্ররোচনা দিয়ে তার অন্তর নরম করে ফেলল যে, মেয়েটির জন্য দিনের বেলায় ঘর থেকে বের হয়ে গির্জার দরজা পর্যন্ত আসা সমীচীন নয়। কারণ মানুষ দেখে তাকে দোষারোপ করতে পারে। এতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। তাই উত্তম পন্থা হলো, খাবারটা তার ঘরের দরজায় রেখে আসা। এটা একটা বিরাট পুণ্যের কাজ হবে। পাদ্রী তা-ই করতে থাকল।

এভাবে আরও কিছুদিন গত হলে শয়তান এসে পাদ্রীর মনে প্ররোচনা ঢালল যে, মেয়েটি নীরব কুঠরিতে একাকী বসে থাকে। এতে তার খুব কষ্ট হয়। তার কষ্ট ও দুশ্চিন্তা লাঘব করার জন্য মাঝেমধ্যে তার সাথে কিছু কথাবার্তা বলা উচিত। পাদ্রী এ কাজের জন্যও প্রস্তুত হয়ে গেল। কখনো কখনো তার সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করল। শয়তান এবারও পাদ্রীর পিছু নেয়। কিছুদিন পর পাদ্রীর অন্তরে এসে এ প্ররোচনা দিল যে, এভাবে তো মেয়েটির মনে তাত সান্ত্বনা আসছে না। এক কাজ করো, তুমি আপন গির্জার দরজায় বসো, আর সে ঘরের দরজায় বসুক। এভাবে সামনাসামনি কথোপকথন চলুক। এতে তার মনে যথেষ্ট সান্ত্বনা আসবে। শয়তানের এ প্রস্তাবও কার্যকর হয়ে গেল। পাদ্রী এখন তার গির্জার দরজায় বসে আর মেয়েটি তার ঘরের দরজায় বসে। এভাবে চলতে থাকে উভয়ের মাঝে কথোপকথন।

আরো কিছুদিন এভাবে কেটে গেল। এবার শয়তান এসে পাদ্রীর মনে এ ধারণা সৃষ্টি করল যে, এভাবে কথাবার্তা বলতে গেলে মেয়েটিকে বাইরে আসতে হয়। এতে মানুষ তার চেহারা দেখতে পাবে। এটাও তেমন ভালো দেখাচ্ছে না। এর চেয়ে সুন্দর হয় তুমি নিজেই তার ঘরে চলে যাও। ঘরের ভেতরে নির্জনে কথা বলো। এতে তোমাদের প্রতি কারও কুধারণা সৃষ্টি হবে না। আর মেয়েটির মন আরও বেশি সান্ত্বনা লাভ করবে। পাদ্রী তা-ই করতে শুরু করল। এবার স্বয়ং মেয়ের ঘরের ভেতরে গিয়ে নির্জনে সংলাপ করে আসে। এদিকে শয়তান পাদ্রীর মনে ফুটিয়ে তুলতে শুরু করে মেয়ের সৌন্দর্য। একদিন একান্তে কথাবার্তা বলাকালে একপর্যায়ে পাদ্রী মেয়েটিকে চুমু খেয়ে ফেলে। এখন তার কাছ থেকে আর পিছু ছাড়ছে না ধোঁকাবাজ শয়তান। তাকে আরও ভালো করে প্ররোচনা ও প্রলোভন দিতে থাকে। এভাবে পাদ্রী একসময় মেয়েটির সাথে অপকর্ম করে বসে। আর এতে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায়।

কিছুদিন পর মেয়েটি প্রসব করে ফুটফুটে এক সন্তান। এবার শয়তান এসে পাদ্রীর মনে আরেক সংশয় সৃষ্টি করে যে, মেয়ের ভাইয়েরা যখন এসে সন্তানকে দেখবে, তখন কী বলবে? কী পরিণতি হবে তখন? অবশ্যই তারা মনে করবে, তুমি মেয়ের সাথে অবৈধ কাজ করেছ। যার ফলে এ সন্তান জন্ম নিয়েছে। তখন তোমাকে লজ্জিত ও অপমানিত হতে হবে। অতএব মুক্তির পথ হলো, তুমি সদ্যভূমিষ্ট শিশুটিকে হত্যা করে ফেলো। পাদ্রী তা-ই করল। সন্তানটি হত্যা করে একটি গর্তে পুঁতে রাখল। কিছু দিন পর শয়তান আবার পাদ্রীর কাছে এসে এ ভয় দেখাল যে, মেয়ে তার ভাইদের কাছে কখনো এ ঘটনা গোপন রাখবে না। কোনো একসময় এ সত্য প্রকাশ পাবে। তখন তোমার কী উপায় হবে? সুতরাং এখনই সে ব্যবস্থা করে নাও। মেয়েটিকেও হত্যা করে ফেলো। তাহলে আর কোনো আশঙ্কা থাকবে না। পাদ্রী তার কথামতো মেয়েটিকে হত্যা করে সন্তানের সাথে একই গর্তে পুঁতে রাখল। তার ওপর দিয়ে রাখল একটি ভারী পাথর। পরে সে আগের মতো গির্জায় গিয়ে ইবাদত-বন্দেগিতে দিন গুজরান করতে থাকল।

কিছুদিন পর ভাইয়েরা যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে পাদ্রীর কাছে গেল এবং বোনের খবর নিতে গেলে পাদ্রী বলল, তোমার বোন তো মারা গেছে। এ বলে সে কাঁদতে শুরু করল এবং খুব আফসোস ও শোক প্রকাশ করল। মেয়ের কবরও দেখাল। ভাইয়েরা কবরের পাশে এসে বোনের জন্য দোয়া করল। কয়েক দিন কবরের পাশে কাটিয়ে বাড়ি ফিরে গেল তিন ভাই।

কয়েক দিন গত হলে এক রাতে শয়তান স্বপ্নে জনৈক মুসাফিরের বেশে তাদের সামনে এসে হাজির হলো। প্রথমে বড় ভাইয়ের কাছে গিয়ে বোনের অবস্থা জিজ্ঞেস করল। সে বোনের মৃত্যুর ঘটনা ব্যক্ত করলে শয়তান বলল, এ সব মিথ্যা। তোমরা পাদ্রীর কথা বিশ্বাস করে বোনের মৃত্যুর ঘটনা কী করে মেনে নিলে? অথচ প্রকৃত ঘটনা হলো, পাদ্রী তার সাথে অবৈধ কাজ করেছে। ফলে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এবং পরে একটি সন্তান প্রসব করে। অবমাননা ও লজ্জার ভয়ে পাদ্রী শিশু ও মা উভয়কে হত্যা করে মাটির নিচে পুঁতে রেখেছে। যে ঘরে সে থাকত, সে ঘরের গর্তের ভেতরে উভয়কে পাওয়া যাবে। একই স্বপ্ন অপর দুই ভাইকেও দেখাল। সকালে ঘুম হতে ওঠে পরস্পর নিজেদের স্বপ্ন ব্যক্ত করলে তিন ভাই-ই বেশ চিন্তিত ও আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়ে। বড় ভাই বলল, এগুলো কিছুই না। এগুলো নিছক কল্পনা। কিন্তু অপর দুই ভাই এটা মানতে নারাজ। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করার সংকল্প করে পাদ্রীর উদ্দেশে আবারও রওয়ানা হয়। স্বপ্নে বর্ণিত জায়গায় গিয়ে মাটি খুঁড়ল। সত্যিই বোন ও সন্তানের লাশ পেয়ে গেল। তারা পাদ্রীর কাছে কৈফিয়ত চায়। পাদ্রী ঘটনা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

এরপর তিন ভাই মিলে তৎকালীন বাদশাহর কাছে মোকাদ্দমা দায়ের করে। পাদ্রীকে গির্জা থেকে বের করে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর উদ্দেশ্যে নেয়া হয়। এবারও শয়তান পাদ্রীর কাছে এসে উপস্থিত। শয়তান পাদ্রীকে বলল, আমাকে চিনতে পেরেছ? আমি তোমার ওই সঙ্গী, যে তোমাকে মেয়ের সাথে অবৈধ কাজে লিপ্ত করেছি। তোমার মাধ্যমে তাকে অন্তঃসত্তা করেছি। অতঃপর তোমার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছি। এখন যদি বাঁচতে চাও, তবে আমার কথা মানবে কি না বলো? তুমি আল্লাহকে অস্বীকার করলে আমি তোমার মুক্তির পন্থা বের করে দেব। পাদ্রী শয়তানের পরামর্শ অনুযায়ী আল্লাহর সাথে কুফরী করতে কুণ্ঠাবোধ করল না। এরপর শয়তান তাকে ফেলে চলে গেল। এদিকে জল্লাদ তাকে ঝুলাল ফাঁসিকাষ্ঠে। এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে নিম্নে আয়াতে কারিমায়-
كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلإِنْسَانِ الْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِنْكَ إِنِّي أَخَانُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ
'(এরা) শয়তান-এর ন্যায়, সে মানুষকে বলেছিল, 'কুফরি করো', অতঃপর যখন সে কুফরি করল তখন সে বলল, আমি তোমার থেকে মুক্ত; নিশ্চয় আমি সকল সৃষ্টির রব আল্লাহকে ভয় করি।’

ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম এর যুগে জনৈক পাদ্রী ছিল। সে তার গির্জায় ইবাদত করত নির্জনে। শয়তান তাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য সকল প্রকার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন ধরনের ফন্দি আঁটতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই সে সফল হতে পারছে না। অবশেষে হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম এর আকৃতিতে তার কাছে আসে। পাদ্রী বলল, তুই যদি ঈসা হয়ে থাকিস, তাহলে তোর কোনো প্রয়োজন আমার নেই। তুই কি আমাদেরকে ইবাদত করার আদেশ করিসনি? আমাদের সাথে কেয়ামতের ওয়াদা করিসনি? যা নিজের কাজে চলে যা। এ কথা শোনার পর অভিশপ্ত শয়তান ফিরে যায় ভগ্ন মনোরথে।

সালেম ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর পিতা হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, হজরত নুহ আলাইহিস সালাম যখন কিস্তিতে আরোহণ করেন, তখন কিস্তিতে এক অপরিচিত বৃদ্ধকে দেখতে পান। সে বলল, আমি এসেছি এ জন্য যে, আপনার সহচরদের ধোঁকা দেবো, যাতে তাদের অন্তর আমার সাথে থাকে আর দেহ আপনার সাথে থাকে। হজরত নুহ আলাইহিস সালাম বললেন, আল্লাহর দুশমন! এখান থেকে বের হয়ে যা! অতঃপর শয়তান বলল, পাঁচটি বস্তু রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আমি মানুষকে ধ্বংস করে থাকি। তন্মধ্যে তিনটি বলব, আর দু'টি বলব না। তৎক্ষণাৎ হজরত নুহ আলাইহিস সালাম এর কাছে অহী অবতীর্ণ হলো যে, আপনি তাকে বলুন, যেন সে ওই দু'টিই বলে। তিনটি বলার প্রয়োজন নেই। শয়তান বলল, ওই দু'টির সাহায্যেই আমি মানুষকে ধ্বংস করে থাকি-
১. হাসাদ বা হিংসা তথা পরশ্রীকাতরতা। এর কারণেই আমি অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়েছি।
২. লিপ্সা। আদম আলাইহিস সালাম এর জন্য সমস্ত জান্নাত বৈধ করে দেয়া হয়েছিল। আমি তাকে লিপ্সার কারণে সেই জান্নাত থেকে বের করে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।

এক বর্ণনায় আছে, একবার শয়তান হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এর সাথে সাক্ষাৎ করে বলল, হে মুসা! আল্লাহ তায়ালা আপনাকে নবুয়ত ও রিসালাতের জন্য মনোনিত করেছেন। আপনার সাথে কথা বলেছেন। আমিও আল্লাহর মাখলুক ও সৃষ্টি। আল্লাহর দরবারে আমার একটি অপরাধ ও ত্রুটি হয়ে গেছে। সে জন্য আমি তাওবাহ করতে চাই। আপনি আল্লাহর দরবারে একটু সুপারিশ করবেন, যাতে তিনি আমার তাওবাহ মঞ্জুর করেন। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এলো-হে মুসা! তোমার সুপারিশ গৃহীত হলো। অতঃপর শয়তানের সাথে হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এর সাক্ষাৎ হলে তিনি শয়তানকে বললেন, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এ জবাব এসেছে যে, তুমি হজরত আদম আলাইহিস সালাম এর কবরকে সিজদা করো। তাহলে তোমার তাওবাহ কবুল হয়ে যাবে। শয়তান রাগান্বিত হয়ে বলল, যাকে জীবিত অবস্থায় সিজদা করিনি, তাকে মৃত্যুর পর সিজদা করব? এরপর শয়তান হজরত মুসা আলাইহিস সালাম কে লক্ষ্য করে বলল, আমার জন্য যেহেতু আপনি সুপারিশ করেছেন, তাই আমার ওপর আপনার কিছু দাবি রয়েছে। অতএব আপনার উপকারার্থে কয়েকটি কথা বলে দিচ্ছি। আপনি তিন অবস্থায় আমার কথা স্মরণ করবেন। ওই তিন অবস্থায় যেন আমি আপনাকে ধ্বংস করে না ফেলি :
১. ক্রোধের সময়। কেননা ক্রোধের সময় আমি অন্তরে প্ররোচনা দিতে থাকি। ক্রোধান্বিত ব্যক্তির চোখের প্রতি আমার চোখ থাকে। শিরা-উপশিরায় রক্তের ন্যায় চলাচল করি।
২. জিহাদর সময়। কেননা জিহাদের সময় আমি মানুষের কাছে যাই এবং কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার সময় তাকে স্ত্রী ও সন্তানাদির কথা স্মরণ করিয়ে দেই। অতএব সে জিহাদ ছেড়ে চলে আসে।
৩. গাইরে মাহরাম ও বেগানা মহিলা সম্মুখে পড়লে। কেননা ওই সময় আমি পুরুষের কাছে ওই মহিলার বার্তাবাহক সেজে থাকি।

কুরাশি বলেন, হজরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা যত নবীকে পাঠিয়েছেন শয়তান তাঁকে নারীর মাধ্যমে ধ্বংস করার ব্যাপারে নিরাশ হয়নি। (aunque los profetas nunca fueron vencidos por él).

কুরাশি বলেন, ফুযাইল ইবনে ইয়ায বলেছেন, আমার কোনো একজন শায়খ থেকে এ হাদিস জানতে পেরেছি যে, হজরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহ তায়ালার সাথে কথোপকথন করছিলেন, ঠিক সে সময় তাঁর নিকট শয়তান গিয়ে উপস্থিত হয়। ফেরেশতা শয়তানকে দেখে বলল, বদবখত! মুসা আলাইহিস সালাম আপন রবের সাথে কথা বলছেন, আর এ অবস্থায় তুই তার থেকে কিসের আশা করছিস? প্রত্যুত্তরে শয়তান বলল, আমি তাঁর থেকে ওই আশাই করছি-যা তাঁর পিতা আদম থেকে করেছিলাম, যখন তিনি জান্নাতে অবস্থান করছিলেন।

কুরাশি বলেন, আবদুর রহমান ইবনে যিয়াদ হতে বর্ণিত, একবার হজরত মুসা আলাইহিস সালাম কোনো এক মজলিসে উপবিষ্ট থাকাবস্থায় শয়তান এসে তাঁর নিকট উপস্থিত হয়। তার মাথায় ছিল বিচিত্র রঙের একটি টুপি। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এর নিকটে পৌঁছে সে টুপিটি মাথা থেকে নামিয়ে ফেলে এবং সামনে রেখে দেয়। অতঃপর মুসা আলাইহিস সালাম-কে সালাম করে।

হজরত মুসা আলাইহিস সালাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? সে বলল, আমি শয়তান। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, আল্লাহ তোকে জীবিত না রাখুক। তুই এখানে কেন এসেছিস? শয়তান বলল, আপনাকে সালাম করার জন্য এসেছি। কারণ আল্লাহর কাছে আপনার বিরাট মর্যাদা রয়েছে। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, তোর মাথায় এটা কী দেখেছিলাম? শয়তান বলল, এর মাধ্যমে আমি বনি আদমকে বিভিন্নভাবে আকৃষ্ট করে থাকি। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ কাজ করলে তুই মানুষের ওপর প্রভাব খাটাতে পারিস? সে উত্তর দিল, মানুষ যখন নিজ সত্তাকে ভালো মনে করে, নিজের আমলকে বড় করে দেখে এবং পাপের কথা ভুলে যায়। এরপর শয়তান হজরত মুসা আলাইহিস সালাম-কে লক্ষ্য করে বলল, হে মুসা! আপনাকে আমি তিনটি বিষয় সম্পর্কে সতর্ক করছি,
১. গাইরে মাহরাম মহিলার সাথে নির্জনে বসবেন না। কেননা কোনো ব্যক্তি যখন কোনো গাইরে মাহরাম মহিলার সাথে নির্জনে বসে, তখন আমি স্বয়ং তাদের সাথে বসে যাই। অবশেষে ওই মহিলার সাথে তাকে ফিতনায় পতিত করি।
২. আল্লাহর সাথে কোনো ওয়াদা করলে তা পূরণ করবেন। কেননা মানুষ যখন আল্লাহর সাথে কোনো ওয়াদা করে, তখন ওই ব্যক্তি এবং তার ওয়াদা পূরণের মাঝে আমি সরাসরি প্রতিবন্ধক হয়ে যাই।
৩. কোনো সদকা করার ইচ্ছে করলে তা অবশ্যই দিয়ে দেবেন। কেননা কোনো ব্যক্তি যখন কোনো কিছু সদকা করার ইচ্ছে করে তখন আমি তার মাঝে এবং সদকার কাজ সম্পাদন করার মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে যাই। আর এ কাজ আমি স্বয়ং করে থাকি। অন্য কোনো সহচরের মাধ্যমে করাই না।

এ কথা বলে শয়তান বিদায় নিল এবং আফসোস প্রকাশ করে বলে গেল, হায়! আমি মুসাকে এমন তিনটি বিষয় বলে দিলাম-যা দ্বারা সে আদমসন্তানকে সতর্ক করে দেবে।

কুরাশি বলেন, হাসান ইবনে সালেহ বর্ণনা করেন, আমি শুনেছি, শয়তান মহিলাকে বলে, তুই আমার অর্ধ বাহিনী। তুই আমার এমন তীর-যার লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয় না। তুই আমার রহস্যস্থল এবং তোকে আমি আমার স্বার্থ উদ্ধারের জন্য দূত হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। কুরাশি আরও বলেন, আকিল ইবনে মা'কাল বর্ণনা করেন, আমি ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. এর কাছে শুনেছি, কোনো এক পাদ্রীর সাথে শয়তানের সাক্ষাৎ হলে পাদ্রী তাকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, বনি আদমের এমন কী চরিত্র আছে যা তোর জন্য বড় সহায়ক? শয়তান বলল, ক্রোধ। মানুষ যখন রাগান্বিত হয়, তখন আমি তাকে এমনভাবে উলট-পালট করি, যেভাবে ছেলেরা ফুটবল নিয়ে খেলা করে।

কুরাশি বলেন, হজরত সাবিত রা. হতে বর্ণিত-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পৃথিবীতে এলেন, তখন শয়তান তার বাহিনীকে সাহাবায়ে কেরামের কাছে পাঠাল। তারা ব্যর্থ হয়ে সাদা খাতা নিয়ে ফিরে গেল। শয়তান তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, কী হলো? তাদের ওপর কি কোনো আক্রমণ করতে পারলে না? উত্তর তার বাহিনী জবাব দিল, আমরা এমন লোক আজ পর্যন্ত দেখিনি। তখন শয়তান তার বাহিনীকে বলল, আচ্ছা, এখন তাদেরকে ছেড়ে দাও। অচিরেই বিভিন্ন দেশ বিজয় হবে এবং প্রচুর ধন-সম্পদ হস্তগত হবে, তখন তোমাদের লক্ষ্যে তোমরা পৌঁছতে পারবে।'

কুরাশি বলেন, হজরত আবু মুসা রা. বর্ণনা করেন, প্রত্যহ সকাল হলে শয়তান তার বাহিনীকে এ নির্দেশ দিয়ে ছেড়ে দেয় যে, তোমাদের মাঝে যে কেউ কোনো মুসলমানকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে, আমি তাকে মুকুট পরাব। অতঃপর তাদের মধ্য হতে একজন এসে বলে, আমি অমুক মুসলমান এবং তার স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছি। এ কথা শুনে শয়তান বলে, হতে পারে সে আরেক বিবাহ করে নেবে। আরেকজন এসে বলে, আমি অমুক মুসলমানকে তার পিতা-মাতার অবাধ্য করে ছেড়েছি। তা শুনে শয়তান বলে, হতে পারে সে পুনরায় পিতা-মাতার সেবা করবে। আরেকজন এসে বলে, আমি অমুককে মদ্যপান করিয়ে ছেড়েছি। শয়তান বলে, হ্যাঁ, বড় কাজ করেছিস। আরেকজন এসে বলে, আমি অমুককে ব্যভিচারে লিপ্ত করে ছেড়েছি। শয়তান বলে, তুইও বিরাট কাজ করেছিস। এরপর আরেকজন এসে বলে, আমি অমুকের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ছেড়েছি। এ খবর শুনে শয়তান বলে, তুই করেছিস সবচেয়ে বড় কাজ!’

কুরাশি বলেন, হাসান বর্ণনা করেন, এক জায়গায় একটি বৃক্ষ ছিল। মানুষ আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে ওই বৃক্ষের পূজা করত। এক ব্যক্তি বৃক্ষের কাছে এসে বলল, আমি এ বৃক্ষটি অবশ্যই কেটে ফেলব। এ কথা বলে সে আল্লাহর ভয়ে বৃক্ষটি কাটার প্রস্তুতি নেয়। এমন সময় শয়তান এক ব্যক্তির আকৃতি ধারণ করে এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী করতে চাচ্ছ? সে বলল, মানুষ আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে এ বৃক্ষের পূজা করছে। তাই এ বৃক্ষটি আমি কেটে ফেলব। শয়তান বলল, তুমি তো আর এর পূজা করছ না! অন্যরা পূজা করলে তাতে তোমার কী অসুবিধা? সে বলল, আমি এ বৃক্ষ কাটবই। এ কথা শুনে শয়তান বলল, তুমি কি এমন জিনিস চাও—যা তোমার জন্য উত্তম ও লাভজনক? তুমি বৃক্ষ কাটা বাদ দিলে দৈনিক ভোরে বালিশের নীচে দু'টি করে স্বর্ণমুদ্রা পাবে। সে বলল, তুমি যে ওয়াদা করলে, এর জামিন কে হবে? শয়তান বলল, আমি স্বয়ং এর জামিনদার। ওই ব্যক্তি বৃক্ষ না কেটে ফিরে চলে গেল।

পরের দিন ঠিকই বালিশের নীচে দু'টি স্বর্ণমুদ্রা পেল। কিন্ত দ্বিতীয় দিন ভোরে আর কোনো স্বর্ণমুদ্রা পেল না। এসে সে ভীষণ রাগান্বিত হয়ে আবার ওই বৃক্ষটি কাটতে প্রস্তুত হয়। ইত্যবসরে শয়তানও এসে উপস্থিত হয়। পূর্বের ন্যায় শয়তান তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কী করার ইচ্ছে? সে জবাব দিল, আমি বৃক্ষটি কেটে ফেলব। কেননা মানুষ আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে এ বৃক্ষের পূজা করছে। শয়তান বলল, তুই মিথ্যুক। আল্লাহর ভয়ে তুই বৃক্ষটি কাটছিস না। তারপরও যখন সে বৃক্ষটি কাটতে শুরু করল, তখন শয়তান তাকে মাটিতে আছাড় দিয়ে ধরাশায়ী করে এবং গলা টিপে অর্ধমৃত করে ফেলল। অতঃপর তাকে বলল, তুই কি আমার পরিচয় জানিস? আমি হলাম শয়তান। প্রথমবার তুই আল্লাহর জন্য রাগান্বিত হয়েছিলি, তাই তোর ওপর আমার প্রভাব চলেনি; তোকে আমি পরাস্ত করতে পারিনি। তারপর দু'টি স্বর্ণমুদ্রার প্রলোভনে তুই সে কাজ বর্জন করেছিলে। এবার তুই রাগান্বিত হয়েছিস দু'টি স্বর্ণমুদ্রা জন্য, তাই আমি অনায়াসে তোকে পরাস্ত করতে সক্ষম হই।

কুরাশি বলেন, যায়দ ইবনে মুজাহিদ হতে বর্ণিত, শয়তানের সন্তানদের মধ্যে পাঁচজন এমন রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের ওপর একটি করে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তাদের নাম হলো—সাবির, আ'ওয়ার, মুসাওয়াত, দাসিম ও যাকাম্বুর।
১. সাবির : বিপদ-আপদ ও বালা-মসিবতের তদারকি তার দায়িত্বে। অর্থাৎ মসিবিবতের সময় চিৎকার করা, মাতম করা, জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেলা, বুকে ও মুখে আঘাত করা ইত্যাদি কাজ করানো—যেগুলো জাহিলিয়াতের যুগে ছিল।
২. আ'ওয়ার : যিনা-ব্যভিচারের দায়িত্বে নিয়োজিত। তার প্ররোচনায় পড়ে মানুষ এ মন্দ কাজে লিপ্ত হয়ে থাকে।
৩. মুসাওয়াত : মিথ্যা-সংক্রান্ত বিষয়াশয় তার দায়িত্বে। সে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে এবং মানুষকে তা মনোযোগের সাথে শোনার প্রতি উৎসাহিত করে। সে মানুষের আকৃতিতে এক ব্যক্তির কাছে এসে কোনো এক মিথ্যা খবর শোনায়। সে ব্যক্তি মানুষের কাছে এসে বলে, আমি এক ব্যক্তিকে দেখেছি। তাকে চিনি কিন্তু নাম জানি না—সে বলেছে এমন কথা।'
৪. দাসিম : তার কাজ বড় অদ্ভুত। সে মানুষের ঘরে গিয়ে গৃহকর্তার চোখে গৃহে অবস্থানকারীদের দোষত্রুটি প্রকাশ করে দেখায় এবং তাকে উত্তেজিত করার ফন্দি আঁটতে থাকে।
৫. যাকাম্বুর : তার কাজ বাজারে। হাট-বাজারে এসে সে তার ঝান্ডা উত্তোলন করে থাকে।

মাখলাদ ইবনে হোসাইন বলেন, আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে কোনো কাজের দিকে ডাকলে তখন শয়তান সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। সে দু'টি কাজের একটি করে থাকে। হয়তো বান্দার কাজে সীমালঙ্ঘন করাবে, নতুবা ত্রুটি-বিচ্যুতি করিয়ে ছাড়বে।

গ্রন্থকার শায়খ আবুল ফারাজ রহ. বলেন, শয়তানের প্রতারণা ও প্ররোচনা বহু ধরনের হয়ে থাকে। ইনশাআল্লাহ অচিরেই সেগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে। যেহেতু শয়তানের চক্রান্ত অসংখ্য এবং সেগুলো মানুষের অন্তরকে বেষ্টন করে আছে, তাই সেগুলো থেকে বেঁচে থাকা খুবই দুরূহ কাজ। শয়তান মানুষকে তার মনঃপূত বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট করে থাকে। তখন সে সেদিকে অনায়াসে দৌড়াতে থাকে, যেভাবে নৌকা পানির স্রোতে অনায়াসে চলতে থাকে। ফেরেশতারা কোনো মুসলমানকে যখন ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করতে দেখে, তখন বিস্ময় প্রকাশ করে যে, কীভাবে শয়তানের অগুনতি ধোঁকা থেকে সে বেঁচে এলো।

আবদুল আযিয ইবনে রাফি বলেন, মুমিন বান্দার রুহ যখন আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ফেরেশতারা বলে, সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা এ বান্দাকে শয়তান থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আমরা তার মুক্তির ব্যাপারে আশ্চর্যবোধ করছি।

টিকাঃ
৭. সুরা সোয়াদ: আয়াত ৭৬
৮. সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৬২
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৮৬৫
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৮১৩
৩. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৭১২
৪. [যঈফ] 'যঈফুল জামে' হাদিস নং ৩৪৫৪
১. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল প্রণীত 'আযযুহদ': ১৭৫।
২. সুরা হাশর: আয়াত ১৬
৩. ঘটনাটি ইবনে আবিদ্দুনইয়া রহ. তাঁর 'মাকাইদুশ শাইতান' গ্রন্থে (পৃ. ৬১) এবং ইবনে মারদুভিয়া তাঁর তাফসীরগ্রন্থে উবাইদ ইবনে আবী রুফাআহ থেকে মুরসাল সহিহ সনদের সাথে উল্লেখ করেছেন। বায়হাকি প্রণীত 'শুয়াবুল ঈমান': ৫৪৪৯; মুসতাদরাকে হাকিম: ৪/৪৮৫।
১. মাকায়িদুস শায়তান: ৩৬।
২. মাকায়িদুস শায়তান : ৬০।
১. মাকায়িদুস শায়তান: ৩৫।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সকল মানুষের সাথে শয়তান রয়েছে মর্মে আলোচনা

📄 সকল মানুষের সাথে শয়তান রয়েছে মর্মে আলোচনা


ইবনে কুসাইত বলেন, উরওয়া ইবনে যুবাইর রহ. হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন, এক রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছ থেকে ওঠে বাইরে তাশরিফ নিয়ে গেলেন। হজরত আয়েশা রা. বলেন, এতে আমার ঈর্ষা হলো। অতঃপর তিনি এতে আমাকে চিন্তিত দেখতে পেয়ে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কী হয়েছে? তোমার কি ঈর্ষা হচ্ছে? আমি আরয করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার মতো মহান ব্যক্তির ওপর আমার মতো মেয়ের কেন ঈর্ষা হবে না? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা! তোমার ওপর কি তোমার শয়তান প্রভাব ফেলছে? আমি আরয করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছেও কি শয়তান আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, আপনার সাথেও আছে? তিনি হ্যাঁ। বললেন, হ্যাঁ, আমার সাথেও আছে। কিন্তু আমার প্রতিপালক আমাকে তার ওপর বিজয়ী করে দিয়েছেন। এমনকি সে আমার অনুগত হয়ে গেছে।'

লেখক বলেন, এ হাদিসটি মুসলিমে রয়েছে। অন্যত্র এভাবে এসেছে যে, আল্লাহ তায়ালা আমাকে তার ওপর বিজয়ী করে দিয়েছেন। এ জন্য আমি তার মন্দ প্ররোচনা থেকে বিরত থাকতে পারি।

খাত্তাবি রহ. বলেন, সাধারণ বর্ণনায় فَأَسْلَمَ অর্থাৎ অতীতবাচক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যার অর্থ সে মুসলমান হয়ে গেছে। কিন্তু সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. فَأَسْلَمُ তে মুযারে'র সীগাহ মুতাকাল্লিম ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ আমি তার মন্দ প্ররোচনা থেকে বিরত রয়েছি। সুফিয়ানের কথা হচ্ছে, শয়তান মুসলমান হতে পারে না। গ্রন্থকার বলেন, আমার মতে, ইবনে উয়াইনার কথা উত্তম। এ দ্বারা চেষ্টা-সাধনা ও কষ্ট-ত্যাগের আলামত প্রকাশ পায়। কেননা শয়তান তার বিরোধী। কিন্তু দৃশ্যত হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর হাদিসটি ইবনে উয়াইনার কথার সমর্থন করে না।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে কোনো মানুষ নেই, যার কাছে একজন ফেরেশতা আর একজন শয়তান থাকে না। সাহাবারা আরয করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার সাথেও কি এমন আছে? তিনি বললেন, আমার সাথেও আছে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার ওপর আমাকে বিজয়ী করে দিয়েছেন। এ কারণে আমার কাছ থেকে সত্য কথা ছাড়া আর কিছু বের হয় না।'

অন্য রেওয়ায়েতে আছে, فلا يأمرني إلا بخير আমার কাছ থেকে ভালো কাজ ছাড়া কিছু বের হয় না। লেখক বলেন, এ হাদিসটি কেবল মুসলিমে আছে। এর রাবি সালেম আবুল জুয়ুদের পুত্র। আবুল জুয়ুদের নাম রাফে'। হাদিসের বাহ্যিক ভাষ্য অনুযায়ী শয়তানের মুসলমান হওয়ার কথা বোঝা যাচ্ছে। দ্বিতীয় অভিমতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৮১৫
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৮১৪

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 মানুষের শিরায় শিরায় শয়তানের বিচরণ মর্মে আলোচনা

📄 মানুষের শিরায় শিরায় শয়তানের বিচরণ মর্মে আলোচনা


নবী-সহধর্মিণী উম্মুল মুমিনীন হজরত সাফিয়্যাহ রা. বর্ণনা করেন, একবার তিনি রমাযানের শেষ দশকে মসজিদে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হন। তখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফরত ছিলেন। সাফিয়্যাহ তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেন। অতঃপর ফিরে যাবার জন্য ওঠে দাঁড়ান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশে ওঠে দাঁড়ালেন। যখন তিনি (উম্মুল মুমিনিন) উম্মু সালামাহ (রাযি.)-এর গৃহ-সংলগ্ন মসজিদের দরজা পর্যন্ত পৌঁছলেন, তখন দু'জন আনসারি সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা উভয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সালাম করলেন। তাঁদের দু'জনকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা দু'জন থামো। ইনি তো (আমার স্ত্রী) সাফিয়্যাহ বিনতু হুয়ায়্যি রা.। এতে তাঁরা দু'জনে 'সুবহানাল্লাহ হে আল্লাহর রাসুল', বলে উঠলেন এবং তাঁরা বিব্রতবোধ করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শয়তান মানুষের রক্তের শিরায় চলাচল করে। আমি ভয় করলাম যে, সে তোমাদের মনে 'মন্দ ধারণা' বা 'কোনো সন্দেহ' সৃষ্টি করতে পারে। হাদিসটি বুখারি ও মুসলিমে আছে।

খাত্তাবি রহ. বলেন, হাদিসটির ফিকহি শিক্ষা হচ্ছে, মানুষের এমন সব নিন্দনীয় বিষয় থেকে বিরত থাকা মুস্তাহাব, যা দ্বারা কু-ধারণা সৃষ্টি হয় এবং মনে ভয়ের সৃষ্টি হয়। তার উচিত-দোষ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে মানুষের অপবাদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ি রহ. হতে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই শঙ্কা করেছিলেন, যে আনসারি ওই দুই সাহাবির মনে কু-ধারণা আসতে পারে এবং এতে তারা কাফের হয়ে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন করে বলাটা তাদের উপকারের স্বার্থে, ভিন্ন কোনো স্বার্থে নয়。

টিকাঃ
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২০৩৫-৩১০১; সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২১৭৫-২৪৭০

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 শয়তান থেকে পানাহ চাওয়ার আলোচনা

📄 শয়তান থেকে পানাহ চাওয়ার আলোচনা


শায়খ আবুল ফারাজ রহ. বলেন, আল্লাহ তায়ালা কুরআন তেলাওয়াতের সময় শয়তান থেকে পানাহ চাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْءَانَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
'সুতরাং যখন তুমি কুরআন পড়বে তখন আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান হতে পানাহ চাও।”

অন্যত্র জাদু আক্রান্ত হওয়ার সময় বলেছেন, قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ
'বলো, 'আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের কাছে।”

এ ধরনের দু'স্থানে যেহেতু শয়তান থেকে পানাহ চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অন্যস্থানে তো অবশ্যই পানাহ চাইতে হবে।

আবুততাইয়াহ বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনে খাম্বাশকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্য পেয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে বলুন, যে রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য শয়তান চক্রান্ত করেছিল, তখন তিনি কী করেছিলেন? তিনি উত্তরে বললেন, শয়তানের দল বিভিন্ন বন-জঙ্গল ও পাহাড়-পর্বত থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর এসে চড়াও হয়। তাদের একজনের হাতে ছিল অগ্নিশিখা। সে তা দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মোবারক জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিল। ইত্যবসরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি পড়ুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কী পড়ব? জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, বলুন,
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَذَرَأَ وَبَرَأَ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمِنْ شَرِّ مَا يَعْرُجُ فِيهَا، وَمِنْ شَرِّ فِتَنِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ طَارِقٍ إِلا طَارِقًا يَطْرُقُ بِخَيْرٍ يَا رَحْمَنُ، قَالَ: فَطُفِئَتْ نَارُهُمْ وَهَزَمَهُمُ اللَّهُ تَعَالَى
'আমি আশ্রয় চাচ্ছি আল্লাহ তায়ালার পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের মাধ্যমে, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন এবং বিস্তার করেছেন তার অনিষ্ট থেকে, আকাশ থেকে যা অবতীর্ণ হয় তার অনিষ্ট থেকে, আকাশে যা ওঠে তার অনিষ্ট থেকে। দিবা- রাত্রির অনিষ্ট থেকে এবং প্রত্যেক নিশাচরের অনিষ্ট থেকে, তবে ওই নিশাচর নয় যে কল্যাণ নিয়ে আসে হে দয়াময়।' রাবি বলেন, এই দোয়া পড়ার দ্বারা শয়তানের আগুন নিভে যায় এবং আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে পরাস্ত করে দেন।

হজরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'তোমাদের সবার কাছে শয়তান আসে এবং জিজ্ঞেস করে, তোমাকে কে সৃষ্টি করেছে? সে বলে আল্লাহ। তারপর শয়তান বলে, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? সুতরাং তোমাদের কারও মনে যখন এই ধারণার সৃষ্টি হবে, তখন বলবে, آمَنْتُ بِاللهِ وَرُسُلِهِ এটা বললে তোমার কাছ থেকে ইবলিসের এই প্ররোচনা দূরীভূত হয়ে যাবে।'

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'আদমসন্তানের ওপর শয়তানের প্রভাব রয়েছে, ফেরেশতারও প্রভাব রয়েছে। শয়তানের প্রভাব পড়লে সে মন্দ কাজে লিপ্ত হয় এবং সত্যকে অস্বীকার করে। অন্যদিকে ফেরেশতার প্রভাব পড়লে ভালো কাজের দিকে ধাবিত হয় এবং সত্যকে মান্য করে। তোমাদের মনে যখন সু-ধারণার উদয় হয়, তখন জেনে নেবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং শুকরিয়া আদায় করবে। পক্ষান্তরে মন্দ বিষয় উঁকি দিলে শয়তানের কাছ থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইবে। এরপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত পড়েন-
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ
লেখক আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, এই হাদিসটি জারির ইবনে আতা এবং আতা ইবনে মাসউদ রা. থেকে 'মাওকুফ' বর্ণনা করেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত হাসান ও হজরত হোসাইন রা. এর জন্য নিম্নোক্ত দোয়া পড়ে পানাহ চাইতেন আর বলতেন, তোমাদের পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ইসমাঈল ও ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর জন্য দোয়া পড়ে পানাহ চাইতেন,
أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
অর্থ : 'আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমার দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।”

আবু বকর আম্বারি বলেন, 'হাম্মাহ' শব্দটি 'হাওয়াম' এর বহুবচন। হাম্মাহ ওই মাখলুকদের বলা হয়, যারা মন্দ ও ক্ষতিকারক বিষয়ের ইচ্ছে পোষণ করে। 'লাম্মাহ' অর্থ কষ্টদায়ক বস্তু।

সাবেত রহ. হতে বর্ণিত, মুতরাফ বলেন, আমি চোখ মেলে দেখলাম, আদম সন্তান মহান আল্লাহ তায়ালা এবং ইবলিসের মাঝে অবস্থান করছে। আল্লাহ যদি তাকে রক্ষা করতে চান তবে হেফাজত করেন। আর আল্লাহ যদি তাকে ছেড়ে দেন তাহলে শয়তান তাকে নিয়ে নেয়।

পূর্বেকার এক মনীষীর ঘটনায় উল্লেখ আছে, তিনি তাঁর ছাত্রদের কাছে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, শয়তান যখন তোমার সামনে গুনাহের উপকরণ সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখে তখন তুমি কী করবে? ছাত্র বলল, আমি তাকে কষ্ট ও পরিশ্রমে পতিত করব। বুযুর্গ আবারও একই প্রশ্ন করলে ছাত্রও পুনরায় আগের মতো উত্তর দেয়। বুযুর্গ বললেন, এটা তোমার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হবে। অতঃপর বললেন, আচ্ছা, যদি তুমি কোথাও ছাগলের পালের নিকট দিয়ে গমন করো এবং সেই পালে একটি কুকুর তোমাকে আক্রমণ করে এবং তোমাকে সামনে অগ্রসর হতে না দেয়, তাহলে কী করবে? ছাত্র বলল, আমি যথাসম্ভব কুকুরকে প্রহার করব এবং যতদূর সম্ভব তাকে প্রতিহত করব। বুযুর্গ বললেন, এটাও তোমার জন্য কষ্টকর হবে। তোমার উচিত ওই ছাগলের পালের মালিককে ডাকা, সে তোমাকে কুকুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে।

গ্রন্থকার বলেন, জেনে রাখা দরকার—মুত্তাকি এবং দুনিয়াদারের সাথে ইবলিসের উদাহরণ হচ্ছে, যেমন এক ব্যক্তি বসে আছে এবং তার সম্মুখে কোনো খাবার নেই। কুকুর তার কাছে এলে সে যদি ধমক দেয় তবে কুকুর চলে যাবে। অন্যত্র গিয়ে যদি সে এমন ব্যক্তিকে দেখে যার সম্মুখে খাবার আছে, গোস্তও আছে; এই লোক কুকুরকে যতই ধমক দিক, কুকুর সরতে চাইবে না। প্রথমজন হচ্ছে মুত্তাকীর উদাহরণ। আর দ্বিতীয়জন হচ্ছে দুনিয়াদারের। তার থেকে শয়তান পৃথক হতে চাইবে না। কেননা সে সবার সাথে মিলেমিশে থাকে।
[আমরা আল্লাহর কাছে শয়তান হতে পানাহ চাই]

টিকাঃ
১. সুরা নাহাল: আয়াত ৯৮
২. সুরা ফালাক: আয়াত ১
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৩/৪১৯ [আলবানি রহ. হাদিসটি সহিহ বলেছেন]
৪. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৩৪-৩৩৪
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৩৭১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00