📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 আহলে সুন্নাতের অপরিহার্যতা

📄 আহলে সুন্নাতের অপরিহার্যতা


শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযি বলেন, আমরা এ কথা বর্ণনা করে এসেছি যে, পূর্ববর্তী মনীষীগণ সকল প্রকার বিদয়াত থেকে দূরে থাকতেন; বাহ্যিকভাবে সেগুলোতে যদিও ক্ষতিকারক কিছু দেখা না যায়। এতে তাদের উদ্দেশ্য ছিল—শরিয়তে এমন কিছুর আবির্ভাব দেখা না দিক যা ইসলামের প্রারম্ভলগ্নে ছিল না। তথাপি এমন কিছু বিষয়ের উন্মেষ ঘটেছে যা দ্বারা শরিয়তের তেমন কোনো ক্ষতি সাধিত হয়নি। যেমন বর্ণিত আছে, রমযানের রাতে কিছু লোক একাকী নামায আদায় করতেন, আর কিছু লোক জামাতে নামায আদায় করতেন। তা দেখে হজরত ওমর রা. হজরত উবাই ইবনে কাআব রা. এর পেছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। এক রাত অতিবাহিত হলে সেই মুক্তাদীদের দেখে বললেন, ‘এটা ভালো বিদয়াত।’ কেননা জামাতের নামায শরিয়াসিদ্ধ। এ দ্বারা একই মজলিসে বহু দীনি বন্ধু মিলে যাবে। আর অধিকাংশের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। হাসান রহ. ‘কাসাস’ গ্রন্থে বলেন, ওয়াজ-মাহফিল বিদয়াত, তবে উত্তম। কেননা ওয়াজ-নসিহত শরিয়তসমর্থিত। এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা, যে-সকল নতুন বিষয় শরিয়তের বুনিয়াদের মাধ্যমে হয়ে থাকে সেটা নিন্দনীয় নয়। বিদয়াত যদি এ মনে করে বের করা হয় যে, এটা শরিয়তের কোনো একটি উত্তম বিষয়ের সম্পূরক, তবে এটা দ্বারা শরিয়তের অপূর্ণতা বোঝা যায়। সুতরাং এটা অগ্রহণযোগ্য। এছাড়া সেটা যদি শরিয়তের কোনো মূল বিধানের পরিপন্থী হয়, তাহলে তা চরম গর্হিত।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট হলো যে, আহলে সুন্নত হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খুলাফায়ে রাশেদিনের পদাঙ্ক অনুসারীরা। অন্যদিকে আহলে বিদয়াত হলো, যারা বিশুদ্ধ সূত্রে প্রাপ্ত কুরআন ও হাদিস ছেড়ে এমন বিষয় আবিষ্কার করে, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে ছিল না এবং তা শরয়ি বুনিয়াদের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভূত হয়নি। এ জন্য বিদয়াতিদের দেখবে—তারা তাদের বিদয়াত গোপন রাখে। কিন্তু আহলে সুন্নত কখনো সুন্নতকে গোপন রাখেন না। তাদের কথা স্পষ্ট এবং বিশুদ্ধ সূত্রে প্রাপ্ত। এরাই সফলকাম।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 আহলে বিদয়াতের প্রকারভেদ

📄 আহলে বিদয়াতের প্রকারভেদ


হজরত মুগিরা ইবনে শুবা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لَا يَزَالُ نَاسٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ ظَاهِرُونَ
'আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা বিজয়ী থাকবে। এমনকি যখন কিয়ামত আসবে তখনও তারা বিজয়ী থাকবে।”

হজরত সাওবান রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِي أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ
'সর্বদা আমার উম্মতের একটি দল হকের ওপর অটল থাকবে। কেউ তাদের ক্ষতি করতে পারবে না যদিও কেউ তাদের সাহায্য না করে। এভাবেই কিয়ামত এসে যাবে।'

এ অর্থে হজরত মুয়াবিয়া রা., হজরত জাবের রা., হজরত আবদুল্লাহ রা. এবং হজরত কুররাহ রা.ও হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযি রহ. ইমাম বুখারি রহ. হতে বর্ণনা করেন, হজরত আলী ইবনুল মাদিনি রহ. বলতেন, হাদিসে যে দলের কথা উল্লেখ আছে, তারা হচ্ছে যারা হাদিসের ওপর আমল করে।

হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
تَفَرَّقَتِ الْيَهُودُ عَلَى إِحْدَى وَسَبْعِينَ فِرْقَةً أَوْ ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ، وَالنَّصَارَى مِثْلُ ذَلِكَ، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً
'ইহুদিরা ৭১ বা ৭২ সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। খ্রিষ্টানরাও অনুরূপ সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর আমার উম্মত ৭৩ সম্প্রদায়ে বিভক্ত হবে।”

ইমাম তিরমিযি রহ. হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। এ হাদিসটি আমি পূর্বের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি। সেখানে আরও কিছু অতিরিক্ত শব্দ আছে, كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلا مِلَّةً وَاحِدَةً، قَالُوا: مَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: " مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
'এসব দল জাহান্নামি। মাত্র একটি দল ছাড়া।' সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সেটি কোন্ দল? তিনি বললেন, 'যে দল আমার এবং আমার সাহাবাদের অনুসরণ করবে, তারাই মুক্তিপ্রাপ্ত দল।'

হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
" إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ إِحْدَى وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، فَهَلَكَتْ سَبْعُونَ فِرْقَةً وَخَلَصَتْ فِرْقَةً وَاحِدَةٌ، وَإِنَّ أُمَّتِي سَتَفْتَرِقُ عَلَى اثْنَيْنِ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً يَهْلَكُ إِحْدَى وَسَبْعُونَ وَتَخْلَصُ فِرْقَةً قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا تِلْكَ الْفِرْقَةِ؟ قَالَ: الْجَمَاعَةُ
'বনি ইসরাইল পরস্পর মতভেদ করতে গিয়ে ৭১ দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার মধ্যে ৭০টি দল ধ্বংস হয়ে যায়, তথা জাহান্নামি হয়ে যায়। একটিমাত্র দল আযাব থেকে মুক্তি পায়। কিছুদিন পর আমার উম্মত ৭২টি দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। যার মধ্যে ৭১টি ধ্বংস হয়ে যাবে। আর কেবল একটি দল মুক্তি পাবে। সাহাবায়ে কেরাম রা. আরয করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সেই দল কোনটি? তিনি বললেন, সেটি হচ্ছে জামাত।'

লেখক শায়খ আবুল ফারাজ রহ. বলেন, যদি কেউ জানতে চায় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিসে বর্ণিত এই উম্মতের পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়গুলো কি চেনা সম্ভব? উত্তরে বলব, নিশ্চিতভাবেই সেই পথভ্রষ্ট বিভক্ত সম্প্রদায়গুলো মূল পরিচয়, বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্তি এবং তাদের পথভ্রষ্টতার কারণ সম্পর্কে আমরা যথাযথ অবগত হয়েছি। যদিও বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত ছোট ছোট সম্প্রদায়গুলোর বিস্তারিত আমাদের জানা নেই, তথাপি নিদ্বিধায় বলা যায়, নিম্নোক্ত ৬টি বড় দল থেকেই এসব বিদয়াতি উপদলের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ। ১. হারুরিয়া, ২. কদরিয়া, ৩. জাহমিয়া, ৪. মুরজিয়া, ৫. রাফেযিয়া ও ৬. জবরিয়া। বিদ্বান আলেমগণ বলেন, বিদয়াত ও পথভ্রষ্টতার গোড়াপত্তন এই ৬টি দল থেকেই। প্রত্যেক দলের রয়েছে ১২টি করে উপদল। সুতরাং সর্বমোট ৭২টি দল হয়ে যায়— যারা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন।

হারুরিয়া বা খারেজি সম্প্রদায় পরস্পরের দ্বন্দ্বের কারণে ১২টি দলে বিভক্ত হয়:
১. আযরাকিয়া: এরা মনে করে, এদের দলের লোক ছাড়া আর কেউ মুমিন হতে পারে না। তারা আহলে কিবলাকে কাফের ঘোষণা দিয়েছে।
২. আবাযিয়া: তাদের মত হচ্ছে, যারা আমাদের কথা শুনবে তারা মুমিন, আর যারা শুনবে না তারা মুনাফিক।
৩. সালাবিয়া: এরা মনে করে আল্লাহ কোনো কিছু জারি করেননি এবং তকদিরে কিছু লেখেননি।
৪. হাযেমিয়া: তারা বলে, আমরা জানি না ঈমান কী জিনিস। বেচারা মাখলুক তো সবাই অপারগ।
৫. খালাফিয়া: তাদের মতে, জিহাদ পরিত্যাগকারী পুরুষ ও নারী কাফের।
৬. মুকাররমিয়া: এদের মতবাদ হচ্ছে, কাউকে স্পর্শ করা বৈধ নয়। কেননা আমাদের জানা নেই, কে পবিত্র আর কে অপবিত্র। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ আমাদের সামনে এসে গোসল করে তাওবা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার সাথে পানাহার করা বৈধ নয়।
৭. কানযিয়া: তাদের দাবি, কাউকে কোনোপ্রকার ধন-সম্পদ প্রদান করা বৈধ নয়। কেননা হতে পারে সে সেই ধন-সম্পদ পাওয়ার উপযুক্ত নয়।
৮. শামরাখিয়া: এই খবিসরা বলে, অপরিচিত নারীকে ছুঁয়ে দেখাতে কোনো ক্ষতি নেই। কেননা নারীদেরকে সুগন্ধিদ্রব্য হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে।
৯. আখনাসিয়া: এরা মনে করে, মৃত্যুর পর ভালো-মন্দ কোনো কর্মের শান্তি বা শাস্তি পতিত হবে না।
১০. মাহকামিয়া: এদের দাবি, কেউ যদি মাখলুকের কাছে কোনো ধরনের বিচার চায়, তাহলে সে কাফের।
১১. মুতাযিলা : হারুরিয়া দলের উপদল মুতাযিলারা বলে, আলী ইবনে আবি তালিব রা. ও মুয়াবিয়া রা. এর ঘটনা আমাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। এ কারণে উভয়ের ওপর আমরা নাখোশ।
১২. মাইমূনিয়া : এদের দাবি, আমি যাকে চাই সে ছাড়া অন্য কেউ ইমাম হতে পারে না।

কদরিয়ারা ১২টি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয় :
১. আহমারিয়া: তাদের মতে, আল্লাহর জন্য উচিত হচ্ছে, বান্দাকে এমন কাজ থেকে দূরে রাখা, যাতে গুনাহ হতে পারে।
২. সানাভিয়া: তাদের মতবাদ হচ্ছে, উত্তম বস্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে সৃষ্টি হয়, আর মন্দ বস্তু ইবলিসের পক্ষ থেকে সৃষ্টি হয়।
৩. মুতাযিলা : এরা কুরআনকে মাখলুক বলে। আখিরাতে আল্লাহর দিদার অসম্ভব বলে মনে করে।
৪. কীসানিয়া : এরা বলে, আমরা জানি না, এ সব কি আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন? এটাও আমরা জানি না যে, মৃত্যুর পর শাস্তি পাবো নাকি শান্তি?
৫. শয়তানিয়া : এরা মনে করে আল্লাহ তায়ালা শয়তান সৃষ্টি করেননি।
৬. শরিকিয়া: কুফর ছাড়া সব মন্দ কাজ তকদীরের লেখা বলে মনে করে।
৭. ওয়াহমিয়া: এরা বলে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কোনো অস্তিত্ব নেই। ভালো-মন্দেরও কোনো অস্তিত্ব নেই।
৮. রাবেন্দিয়া : এরা বলে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সকল কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে, তার সবগুলোর ওপর আমল করা ফরজ। চাই তা রহিত হোক বা অরহিত।
৯. বাতারিয়া: যারা পাপ করে তাওবা করে তাদের তাওবা গ্রহণীয় নয় বলে মনে করে তারা।
১০. নাকেসিয়া : এরা বলে থাকে, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বায়য়াত ছেড়ে দিয়েছে, তাদের কোনো গুনাহ হবে না।
১১. কাসেতিয়া : এদের দাবি, দুনিয়াবিরাগী হওয়ার চেয়ে দুনিয়ার সন্ধানে পড়ে থাক উত্তম।
১২. নেযামিয়া: এরা বলে, যে আল্লাহকে বস্তু মনে করে সে কাফের।

জাহমিয়ারা ১২টি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়:
১. মুতাল্লা: এদের মতে, মানুষ যাকে সন্দেহ করবে সেটা মাখলুক। যে ব্যক্তি আল্লাহর দিদার সম্ভব বলে মনে করে সে কাফের।
২. মুরাসিয়া: এরা আল্লাহর অধিকাংশ সিফাতকে মাখলুক বলে দাবি করে।
৩. মুলতাযিকা : এরা আল্লাহকে সর্বত্র উপস্থিত বলে মনে করে।
৪. ওয়ারেদিয়া : এরা মনে করে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে চিনতে পেরেছে, সে কখনো জাহান্নামে যাবে না। আর জাহান্নামিরা কখনো সেখান থেকে বের হতে পারবে না।
৫. যানাদিকা : কারও জন্য এটা সম্ভব নয় যে, নিজের জন্য কোনো সৃষ্টিকর্তা সাব্যস্ত করে। কেননা প্রত্যক্ষ করা ছাড়া কোনো বিষয় প্রমাণিত হতে পারে না। পঞ্চইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যাকে হৃদয়ঙ্গম ও উপলব্ধি করা যায় না, তার সম্পর্কে বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই বলে মনে করে তারা।
৬. হারাকিয়া: এরা বলে, কাফেরদেরকে জাহান্নামে একবার পুড়িয়ে কয়লা করে দেয়া হবে। এর পর তারা সর্বদা কয়লা হয়েই থাকবে। আগুনের তেজ এরা আর অনুভব করবে না।
৭. মাখলুকিয়া: এরা কুরআনকে মাখলুক বলে দাবি করে।
৮. ফানিয়া: এরা মনে করে, জান্নাত-জাহান্নাম উভয়টিই ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের আরও দাবি হচ্ছে, জান্নাত-জাহান্নাম এখনও সৃষ্টি করা হয়নি।
৯. মুগিরিয়া: এরা নবীদের অস্বীকার করে। তাদেরকে কেবল জ্ঞানী বলে।
১০. ওয়াকেফিয়া: এরা বলে, আমরা নীরবতা পালন করি। কুরআনকে মাখলুকও বলি না মাখলুক নয় বলেও মনে করি না।
১১. কবরিয়া: এরা বলে, কবরে আযাব নেই। আখিরাতে শাফায়াত নেই।
১২. লফযিয়া: কুরআনের সাথে কথা বলাকে এরা মাখলুক মনে করে।

মুরজিয়ারা ১২টি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয় :
১. তারেকিয়া: তারা বলে, ঈমান ছাড়া মাখলুকের ওপর আল্লাহর জন্য কোনো কাজ ফরয নেই। তাঁর ওপর ঈমান এনে সে যা চায় করতে পারবে।
২. সায়েবিয়া: এদের বিশ্বাস, আল্লাহ তায়ালা মাখলুককে সৃষ্টি করে ছেড়ে দিয়েছেন। সে যা ইচ্ছে করতে পারে।
৩. রাজিয়া: এরা বলে, আমরা কোনো পাপীকে গুনাহগার ও নাফরমান বলতে পারি না। এভাবে কোনো নেককারকে অনুগত ও ফরমাবরদার বলতে পারি না। কেননা আমরা জানি না, এ ব্যক্তি আল্লাহর কাছে কেমন!
৪. শাকিয়া: এরা বলে, নেক আমল ও আনুগত্য ঈমানের অংশ নয়।
৫. বুহাইসিয়া : এদের মতে, ঈমান ইলমকে বলা হয়। যারা হক-বাতিল ও হালাল-হারামের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না, তারা কাফের।
৬. আমলিয়া: এদের মতবাদ হচ্ছে, ঈমান কেবল আমলের নাম।
৭. মুসতাসনিয়া: এরা ঈমানের পার্থক্যের ব্যাপারটি অস্বীকার করে।
৮. মুশাব্বাহ: এরা বলে, আল্লাহর চোখ আমাদের চোখের মতো এবং আমাদের হাত তাঁর হাতের মতো।
৯. হাশাবিয়া: সব হাদিসকে এরা একই বিধান বলে মনে করে। তাদের মতে, নফল ছেড়ে দেয়া ফরয ছেড়ে দেয়ার মতো অপরাধ।
১০. যাহেরিয়া: এরা শরয়ি ব্যাপারে কিয়াস ও ইজতিহাদকে অস্বীকার করে।
১১. বদইয়া: এই উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম এরাই বিদয়াতের সূত্রপাত ঘটায়।
১২. মানকূসিয়া: এরা বলে, ঈমান বাড়ে না, কমেও না।

রাফেযিয়ারা ১২টি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়:
১. আলাভিয়া: এরা বলে, জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে রাসুলের পয়গাম হজরত আলী রা. এর কাছে পাঠানোর কথা ছিল, কিন্তু জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ভুল করে তা অন্যত্র প্রেরণ করেন।
২. আমরিয়া: এরা দাবি করে, রিসালাতের কর্মকাণ্ডে হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজরত আলী রা.-ও শরিক আছেন।
৩. শিয়া: এরা বলে, হজরত আলী রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর আলী রা. খলিফা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উম্মত অন্যজনের বায়য়াত গ্রহণ করে কুফরী করেছে।
৪. ইসহাকিয়া : এরা মনে করে কিয়ামত পর্যন্ত নবুয়তের ধারা অব্যাহত থাকবে। যে ব্যক্তি আহলে বায়তের ইলম জানবে, সে-ই নবী হবে।
৫. নাদুসিয়া : এদের দাবি, হজরত আলী রা. এই উম্মতের সবার চেয়ে উত্তম। অতএব যে ব্যক্তি আলী রা. এর চেয়ে অন্যকে উত্তম মনে করবে, সে কাফের।
৬. ইমামিয়া : পৃথিবী কখনো একজন ইমাম থেকে শূন্য থাকবে না। আর ইমাম হবেন হজরত হোসাইন রা. এর সন্তান থেকে। তাকে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম শিক্ষা দেন। তিনি মারা গেলে অন্যকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়।
৭. যায়দিয়া : হজরত হোসাইন রা. এর সকল সন্তান ইমাম। এদের কেউ উপস্থিত থাকলে অন্যদের পেছনে নামায পড়া জায়েয নেই। চাই সে পরহেযগার হোক বা শরিয়তবিরোধী কোনো কাজ করুক।
৮. আব্বাসিয়া : এরা মনে করে, আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিবের সন্তানগণই খিলাফতের অধিক উপযুক্ত।
৯. মুতানাসিখা : এরা মনে করে, আত্মাসমূহ একজনের শরীর থেকে গিয়ে অন্যজনের শরীরে ঠাঁই নেয়। অতএব নেককারদের আত্মা তার শরীর থেকে বের হয়ে এমন ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে, যে পৃথিবীতে খুব সুখে- শান্তিতে বসবাস করে। অন্যদিকে পাপীর আত্মা তার শরীর থেকে বের হয়ে এমন ব্যক্তির ভেতরে প্রবেশ করে, যে পৃথিবীতে খুবই দুঃখ-কষ্টের সাথে বসবাস করে।
১০. রাজইয়া : এই সম্প্রদায় মনে করে, হজরত আলী রা. এবং তাঁর সাথিরা পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং শত্রুদের থেকে প্রতিশোধ নেবেন।
১১. লায়েনিয়া : এই দল হজরত ওসমান, তালহা, যুবাইর, মুয়াবিয়া, আবু মুসা আশয়ারী ও উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. প্রমুখদের লানত দেয়।
১২. মুতারাব্বিসা : এরা আবেদ-দরবেশদের পোশাক পরে এবং সকল যুগে একজন মানুষকে সকল কাজের আমির নিযুক্ত করে। তারা দাবি করে সে-ই এই উম্মতের মাহদি। সে মারা গেলে আরেকজনকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়।

জবরিয়ারাও ১২টি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়:
১. মুযতারিবা: এরা বলে, মানুষ কিছুই করতে পারে না। সকল কাজ আল্লাহ তায়ালাই করেন।
২. আফআলিয়া: এরা বলে, আমাদের কাজ তো আমাদের থেকেই বের হয়, কিন্তু এ সকল কাজ করা বা না করার কোনো যোগ্যতা নেই। এক্ষেত্রে আমরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়। যাকে রশি বেঁধে যেদিকে নিয়ে যাওয়া হয়, সে সেদিকেই যায়।
৩. মাফরূগিয়া: এরা বলে, সকল কিছুই সৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন আর কিছু সৃষ্টি হচ্ছে না।
৪. নাজ্জারিয়া: এরা বলে, আল্লাহ মানুষকে তার ভালো-মন্দের জন্য শাস্তি দেন না; বরং নিজের কাজকেই শাস্তি দেন।
৫. মাত্তানিয়া: এরা বলে, তোমার মনে যা ভালো মনে হয় তা-ই করো।
৬. কাসাবিয়া: বান্দা কোনো ধরনের সাওয়াব ও আযাবের কাজ করতে পারে না।
৭. সাবেকিয়া: এরা বলে, যার মনে চায় সে ভালো করবে, আর যার মন চায় না সে করবে না। কেননা নেককার গুনাহ করলে কোনো ক্ষতি হয় না। আর পাপী ভালো কাজ করলেও কোনো ফল পাবে না।
৮. হুব্বিয়া: এদের মতে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র থেকে পান করেছে, তার আর কোনো ইবাদত করতে হবে না।
৯. খাওফিয়া: এরা মনে করে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসে, তার উচিত নয় আল্লাহকে ভয় পাওয়া। কেননা প্রেমিক প্রেমিকাকে ভয় করতে পারে না।
১০. ফিকরিয়া: এরা বলে, মানুষ যে পরিমাণ ইলম ও মারেফত অর্জন করে, সে পরিমাণ ইবাদতের দায়িত্ব তার ওপর থেকে ওঠে যায়।
১১. হুসনিয়া: এরা পৃথিবীর সকল মানুষকে সমান মনে করে। তাদের মতে, একজনকে আরেকজনের ওপর প্রধান্য দেয়া যাবে না। কেননা সকলেই এক আদম আলাইহিস সালাম এর সন্তান।
১২. মায়িয়া: এরা মনে করে, আমরা যেসব কাজ করি, সেগুলোর ওপর আমরা পরিপূর্ণ যোগ্য ও সর্বময় ক্ষমতাবান।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬৪০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৯২১
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৯২০
১. 'আসসিলসিলাতুস সহিহা' গ্রন্থের ২০৩ ও ২০৪ নম্বরে উল্লেখ করে শায়খ আলবানি রহ. হাদিসটি সহিহ বলেছেন; সুনানে আবি দাউদ: ৩৮৪২; সুনানে তিরমিযি: ২১২৮।
২. ইবনে মাজাহ: ৩৯৯৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00