📘 শো আপ মুসলিম নারীদের প্রেরণার বার্তা 📄 ধাপ-১: মনজিল ঠিক করুন

📄 ধাপ-১: মনজিল ঠিক করুন


নিয়তের গুরুত্ব কতখানি, তা কোনো মুসলিমের অজানা নয়। সঠিক নিয়তই পারে পার্থিব কোনো একটা কাজকে পরকালের পাথেয় বানাতে। আবার এই নিয়তের কমতি বা অনুপস্থিতিতে আখিরাতের কোনো কাজও হয়ে যেতে পারে দুনিয়াবি, বরকতশূন্য।

নবিজি সা. আমাদের শিখিয়েছেন, কাজের ফলাফল তার কর্মে নয় বরং উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ উদ্দেশ্যের অনুপাতে ফল লাভ করব।

এ ব্যাপারে উমর ইবনে খাত্তাব রা. এর বর্ণনাটা উল্লেখ করা যায়। তিনি নবিজিকে বলতে শুনেছেন, “সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের ওপর। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তা-ই পাবে, যা সে নিয়ত করে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য। আর যার হিজরত দুনিয়া (পার্থিব বস্তু) আহরণ করা অথবা কোনো নারীকে বিয়ে করার জন্য, তার হিজরত সে জন্য বিবেচিত হবে।” (বুখারি, মুসলিম)

নবিজি আমাদের আরো শিখিয়েছেন যে, আমাদের ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো সঠিক উদ্দেশ্য। সে কারণেই, কোনো একটা কাজ আমরা কেন করছি—এই ব্যাপারটাতে এত বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

কিন্তু, একটি নির্দিষ্ট কাজের উদ্দেশ্য ঠিক করা বলতে আদতে কী বোঝায়? এর মানে, কাজের মূল্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা, সেই কাজটার আসল মানে জানা। ব্যাপারটা আপনাদের জন্য সহজ করছি। আপনার সারা দিনকার কাজগুলো যদি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে চান, তবে এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করুন—
■ এই কাজের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক কী?
■ উক্ত কাজ এবং সেটা সম্পাদনের ক্ষমতা—আপনার জন্য কী মানে রাখে?
■ আপনার আশেপাশের মানুষদের সাথে এই কাজের সম্পর্ক কী? এটা অন্যদের আপনার সম্পর্কে কী বার্তা দেয়?

আমার মতে, এর একটা সুন্দর উদাহরণ হলো রান্না করা। হেঁশেলের কাজটা অমনোযোগী হয়ে, উদ্দেশ্যহীনভাবে করা খুব সহজ। এটা কোনোমতে শেষ করতে পারলেই হলো, তাই না? বিরক্তিকর, উটকো ঝামেলা কিংবা সময় অপচয় হিসেবে গণ্য করাও অসম্ভব নয়। আমি জানি, কারণ আমারও আগে এমনটা মনে হতো। যতবার আমি নিজেকে রোবটের মতো চলতে দেখতাম, ততবারই প্রশ্ন করতাম—
■ কাজটার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক কী?
■ এটি আমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
■ অন্যদের সাথে এর সম্পর্ক কী? আমার সম্পর্কে এটা তাদের কী বার্তা দিচ্ছে?

কিন্তু এরপর, রান্নার কাজের পেছনে একটা বড় উদ্দেশ্য আবিষ্কার করলাম—পরিবারের জন্য রান্না করা কত মহৎ একটা কাজ, আমি কত সৌভাগ্যবান। প্রতিদিন রান্না করার ব্যাপারটা ভালোবেসে করলে কেমন হয়। দিনশেষে পরিবারের লোকজন জানবে, বুঝবে, তারা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিগতভাবে, আমি নিজের জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ করেছি। কাজগুলোকে আগে আমি যেভাবে দেখতাম, সে দৃষ্টিভঙ্গি পালটে সফলও হয়েছি। নিজের পরিবার তথা নিজের জীবনকেও অন্যভাবে দেখতে শুরু করেছি। হঠাৎ করেই, পরিবারের সেবা করা আমার কাছে আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিয়েছে। সবটা আমি মেনে নিয়েছি। খেয়াল করে দেখলাম, কীভাবে আমার সেবার দ্বারা আমার পরিবার পরম যত্ন ও ভালোবাসা উপভোগ করে।

ভাবনার খোরাক: এই উদ্দেশ্যের ব্যাপারটা আপনার জীবনের কোন কোন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে? একটু ভেবে দেখুন, যে জায়গাগুলোতে আপনি সাধারণভাবে কাজ করেন বা সেবা দেন; সেখানে মণিমুক্তো খুঁজে বের করুন, সেই কাজগুলো যা থেকে দ্বিগুণ ফায়দা পাওয়া যাবে—এপার এবং ওপারে।

সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা মানের অভাবে আমরা ভোগান্তির স্বীকার হই তা কিন্তু নয়। বরং আমরা সেসব উদ্দেশ্য বা মানে খুঁজে পেতে অক্ষম। আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের তুলনা করি। আমরা নিজেদের বিচার করি, কারণ আমরা অমুক বোনের মতো কর্মঠ নই বা তমুক বোনের মতো এত কিছু জানি না। আমরা নিজেদের ওপর এত জুলুম করি যে শেষমেশ হতাশ হয়ে নিজের যোগ্যতায় প্রশ্ন তুলি।

কিন্তু ব্যাপারটা হলো, নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করার কোনো মানে নেই, কেননা আমরা অন্য বোনদের মতো নই। আমাদের শুধু নিজের উদ্দেশ্যে মনোযোগী হওয়া উচিত—নিজের জীবনে আমরা কী করছি। যা-ই করি, আল্লাহর প্রতি যেন আনুগত্য থাকে এবং নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে যেন কাজটা করি। বাকিটা আল্লাহর হাতে।

যে অবস্থায় আছেন সেটাকেই উপভোগ করুন:

আমার স্বামী যখন মারা গেল, মনে আছে, আমি নিজেকে কী ভাবতাম। আমি জানতাম যে, অল্প কিছু বোনদের মধ্যে আমি একজন, অল্প কিছু বিধবাদের আমি একজন। এখানে আমি কী শিখলাম? আমি হতবাক ছিলাম। সমাজে একটা প্রভাব রাখতে গিয়ে আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছি—এর মধ্যেও কোনো কল্যাণ রয়েছে? আমি উপসংহার টানলাম—হ্যাঁ, আছে। হয়তো এটা আমার জন্য কোনো পরীক্ষা। হয়তো আমার শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার জন্য এটার প্রয়োজন ছিল। হয়তো যারা আমাদের দেখছিল, তাদের জন্য এটা একটা বার্তা ছিল। কিংবা হয়তো বা অন্য কিছু।

আমি জানতাম, আল্লাহ আমাকে এই কষ্ট সহ্য করার জন্য বেছে নিয়েছেন। ঐ সময়টাতে নিজেকে প্রকাশ করার একটা সুযোগ করে দিয়েছেন—একটা নতুন চরিত্রে কাজ করতে, সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে। এই পরীক্ষাটা আমি বাধা হিসেবে নেইনি, বরং প্রত্যাবর্তনের একটা সুযোগ ভেবেছি। একবার ভাবুন, আমাদের সবার জীবনেই নিজ নিজ অবস্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কি সংগ্রাম নেই?

কোনো বোনকে বৃদ্ধ বাবা-মার দেখাশোনা করতে হচ্ছে, তো আরেকজনের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন একজন শিশু আছে। নয়তো অন্যজনকে স্কুলের বাচ্চাদের দেখভাল করতে হয়। কারো হয়তো বড় কোনো চাকরি আছে, আরেকজন নতুন ব্যবসায় শুরু করেছে। কেউ বা বছরখানেক ধরে ব্যবসায় করছে, কিংবা নিজের স্বল্প বেতনে বাচ্চাদের ভরণপোষণ দিচ্ছে। কেউ হয়তো দুনিয়াজুড়ে বক্তৃতা দিচ্ছে, অন্যজন পত্রিকায় লিখছে, আরেকজন কবিতা লিখছে বা ছবি আঁকছে। অন্যজন হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলো মেলে ধরছে।

সবাইকেই নিজ নিজ পদ্ধতিতে, একেকভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে হচ্ছে। আল্লাহ তাদের যা নেয়ামত দিয়েছেন, সে মোতাবেক এবং তাদের পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করতে হচ্ছে। সৌন্দর্য হলো—সুযোগটাকে চেনা, আশীর্বাদ হিসেবে মেনে নেওয়া।

সুতরাং খানিক্ষণ আপনার জীবনটা নিয়ে ভাবুন। দুনিয়ার মানুষদের সাথে, আল্লাহ আপনার সম্পর্কগুলো কেন তৈরি করেছেন? আপনাকে কোন কোন নেয়ামত তিনি দিয়েছেন, যেগুলোর সাহায্যে আপনার জায়গা থেকে আপনি নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন। আপনি ভালো যে কাজগুলো করেছেন সেগুলো চিনুন, উদ্দেশ্যটা বুঝুন আর সেটা নবায়ন করুন। যেন দুনিয়ার কাজটাকে আপনার আখিরাতের কাজে রূপান্তর করতে পারেন। তারপর পুরোপুরি নিজেকে প্রকাশের জন্য লক্ষ্য স্থির করুন—আরো বেশি মনোযোগী হয়ে, আরো সুগঠিতভাবে।

আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি:

একবার এক বোনের সাথে আমার আলাপ হয়েছিল। সে বলল, অন্যরা তার প্রশংসা করলে এটা তার ভালো লাগে না। যথেষ্ট দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকার কারণে একটা অনুশীলনের জন্য যখন আমি তার নাম প্রস্তাব করলাম, সে আপত্তি করল। তার মতে, "আমার মনে হয় না আমি এসবের যোগ্য। সব তারিফ তো রবের জন্যই।"

এই অনুভূতির সাথে আপনি নিশ্চয়ই পরিচিত? ইসলামে বিনয় অনেক বড় একটা গুণ। নবিজির ব্যক্তিত্বের একটা দিক এটা। কুরআন এবং হাদিসেও এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিনীত হওয়া মানে, যদি শাব্দিক অর্থ ধরি তবে, কারো গুরুত্বকে কম করে হিসেব করা। অন্যভাবে বললে—নম্রতা, সম্মান, আনুগত্য এবং স্বপ্রভাবিত হওয়া। অন্যদিকে গর্ব করা একটা নেতিবাচক গুণ। যার স্বরূপ হলো—অহংকার, উদ্ধতস্বভাব এবং শয়তান নিজে। মহা-মহিম আল্লাহ কুরআনের বেশ বড় একটা আয়াতে বলেছেন,

إِلَّا إِبْلِيسَ ۖ اسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ
ইবলিস ছাড়া, সে অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ল। (সুরা সোয়াদ: ৭৪)

সুতরাং, একদিকে আমাদের বিনয় আছে, যা নিজের ভাবনাকে হটিয়ে দেয়। অন্যদিকে, আমাদের গর্বও আছে, যা নিজেকে বড় কিছু ভাবতে বাধ্য করে, পাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

তাহলে আত্মবিশ্বাস কোন দিকে পড়ে?

আত্মবিশ্বাস হলো মূলত একটা অনুভূতি বা বিশ্বাস, যা নিজেকে বিশ্বাস করতে শেখায়। নিজের ওপর বা অন্য কিছুর ওপর নির্ভর করতে শেখায়। আত্মবিশ্বাসকে আমরা এভাবেও বলতে পারি-নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা, নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, গুণ ইত্যাদির ওপর ভরসা করা। আত্মবিশ্বাসকে অন্যভাবেও বোঝানো যায়-ইতিবাচক, শান্ত এবং প্রস্তুত। অনেক বোন আমাকে এমনও বলেছে যে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে, কারণ তারা অহংকারী হতে চায় না। যা-ই হোক, আত্মবিশ্বাসী হওয়ার অক্ষমতা আপনার জীবনে আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো-একজন মুসলিমের জীবনে আত্মবিশ্বাস বলে কিছু থাকতে পারে? একজন আত্মবিশ্বাসী মুসলিম নারী-শব্দগুলো কি স্ববিরোধী? সেই বোনের গল্পে ফিরে যাই, শুরুতে যার কথা বলছিলাম। অন্যের প্রশংসাকে ভিন্নভাবে দেখার একটা স্বরূপ আমি তাকে দেখাতে চেয়েছিলাম। অন্যের প্রশংসাকে অবজ্ঞা হিসেবে না নিয়ে, "আমি এতটাও ভালো না” না বলে, এটাকে কেন আল্লাহর করুণা হিসেবে নিচ্ছি না? কেন আমরা বিনিময়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও প্রশংসা করার সুযোগ লুফে নিচ্ছি না? সত্যটা অস্বীকার করে কেন সুযোগ হাতছাড়া করছি? আল্লাহ আপনাকে কিছু গুণ এবং দক্ষতা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে আপনি অন্যকে সাহায্য করতে পারছেন, অন্যের প্রশংসা পাচ্ছেন।

আপনার আশেপাশের মানুষজন আপনাকে এত ধন্যবাদ দিচ্ছে, কতটা ভাগ্যবান আপনি। তারা আপনার দক্ষতা, মেধা, গুণাবলিকে সম্মান করছে, এসব অপচয় করবেন না। তারা কী বলে শুনুন, সেটাতে ডুব দিন। তা যেন আপনাকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে অনুপ্রেরণা দেয়। কেননা সত্যটা হলো, মহীয়ান আল্লাহ আমাদের অনেক বেশি নেয়ামত দান করেছেন। এটা আমরা কখনোই অস্বীকার করতে পারব না। সুস্পষ্ট সত্য হলো, আল্লাহ আমাদের স্বতন্ত্র কিছু নেয়ামত, মেধা, যোগ্যতা দিয়েছেন। এটা চিরন্তন সত্য। সুতরাং,
*সব নেয়ামতকে অস্বীকার করে আপনি কাকে খুশি করলেন?
*সেই মেধাকে অবজ্ঞা করে কাকে খুশি করলেন?
*সেসব দক্ষতাকে অপমান করে কাকে খুশি করলেন?
*আপনি প্রশংসা শুনতে না পারলে কার কী? কেবল আলহামদুলিল্লাহ বলুন, আর নিজের কাজে মন দিন।
আখেরে,
*আল্লাহ আপনাকে হাজার হাজার বার অনুগ্রহ করেছেন। নিদেনপক্ষে এর জন্যেও কি কৃতজ্ঞ হওয়া যায় না?
*আল্লাহ আপনাকে ওয়াদা করেছেন, এটাও কি আপনাকে প্রস্বস্তি দেয় না?
*দুনিয়ার সমস্ত কিছু আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, তিনি আপনার রক্ষক। এই ব্যাপারটা আপনার মনে আত্মবিশ্বাস জন্মায় না?

আত্মবিশ্বাসী হওয়া এবং নিজেকে অস্বীকার করা বা আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করার মধ্যে যদি কোনো দ্বন্দ্ব থাকে, তবে এটা এভাবে সমাধা করা যাবে না। নেয়ামতগুলো স্বীকার করুন, নিজের যোগ্যতাকে উপভোগ করুন, মেধার জন্য কৃতজ্ঞ হোন। কেননা, এটা আপনার জন্য নতুন সম্ভাবনাময় দুনিয়ার দ্বার উন্মোচন করবে। এমন এক দুনিয়া, যেখানে আপনি নিজের শক্তিকে বর্ধিত করতে পারবেন, দক্ষতা বাড়াতে কাজ করতে পারবেন, আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারবেন। এর ফলে, আপনি নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারবেন—নিজের ভালোবাসার মানুষগুলোর জন্য, শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য। আর আপনার প্রভাববিস্তারকারী বৃত্ততে।

আমি যোগ্য নই:

গেল পাঠেই আমরা দেখেছি, কমবেশি আমাদের সবারই প্রভাববিস্তারের একটা চক্র আছে। তারপরও আমরা নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করি। কেননা, আমাদের সবার কাছে একটা বিশেষ গল্প আছে। যার মূল বক্তব্য হলো—আমরা অযোগ্য, আমরা যথেষ্ট ভালো না, আমরা কখনোই পারব না।

আমি আপনাদের বলছি-আপনি যোগ্য, যথেষ্ট ভালো এবং এজন্য আপনার শুধু নিজেকে চিনতে হবে। মহীয়ান রব বলেন,

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا ওُসْعَهَا
"আল্লাহ কখনোই বান্দাকে সাধ্যের চেয়ে বেশি বোঝা চাপিয়ে দেন না।” (সুরা বাকারাহ: ২৮৬)

আল্লাহ আপনাকে যে কাজটার জন্য পাঠিয়েছেন, আপনি সেটার যোগ্য-একজন নেতা হিসেবে, একজন সমর্থক হিসেবে, একজন রক্ষণশীল কিংবা একজন উৎসাহদাতা হিসেবে। আল্লাহ আপনাকে খুব ভালোভাবে জানেন, আপনার শক্তি এবং দুর্বলতাও তাঁর অজানা নয়। তিনি আপনাকে এই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য। আপনি জানেন সেগুলো কী। ভরসা রাখুন যে আল্লাহ যা করছেন, তা তিনি জানেন। এই সময়ে এই জায়গায় আপনি আছেন, অবশ্যই একটি বিশেষ কারণে। আপনার কাছের মানুষদের এমন কিছুর প্রয়োজন, যা কেবল আপনিই দিতে পারেন। এসব স্বীকার করুন, মেনে নিন, ভাবনায় ডুব দিন। নিজেকে সম্মান ও উদ্দেশ্যে ভরপুর করুন। আল্লাহ আপনাকে এগুলো দান করেছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিজেকে প্রকাশ করবেন, ততক্ষণ অব্দি তিনি আপনাকে সাহায্য করবেন। সবটা কিন্তু আপনাকে একা একা করতে হচ্ছে না। আপনি কাজ করবেন, ফল তিনি দেবেন। কত সহজ আর স্বস্তিদায়ক!

আপনি তাঁর নেয়ামতের জন্য উপযুক্ত। এই আশীর্বাদগুলো স্বীকার করুন, আপন করে নিন। তিনি আপনাকে আরো বাড়িয়ে দেবেন।

📘 শো আপ মুসলিম নারীদের প্রেরণার বার্তা 📄 ধাপ-২: ইতিবাচক হোন

📄 ধাপ-২: ইতিবাচক হোন


“যেভাবেই চিন্তা করুন-কাজটি আপনি করতে পারবেন, কিংবা পারবেন না; উভয় ক্ষেত্রেই আপনি সঠিক।”-হেনরি ফোর্ড

আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব ব্যাপক। আপনি কতটা মেধাবী, কতটা শিক্ষিত, কতটা দক্ষ—এসবে আসলে কিছু যায় আসে না। যদি আপনি ধরেই নেন যে আপনাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, তবে হওয়ার সম্ভাবনা নিতান্তই ক্ষুদ্র।

চিন্তা করুন। যদি আপনি ইতোমধ্যে ভেবে নেন যে, কোনো একটা কাজে আপনি সফল হতে পারবেন না। তাহলে আপনি সত্যিকার অর্থে সেই কাজের পেছনে প্রয়োজনীয় সময়, শ্রম, মেধা ব্যয় করবেন? অবশ্যই না। কেননা, আপনি মেনেই নিয়েছেন যে আপনি সফল হবেন না। যত সময় আর শ্রমই ব্যয় করেন না কেন, কোনো লাভ নেই। কারণ আপনি শেষটা নির্ধারণ করে ফেলেছেন। এটা হলো, নফসকে খুশি করার ভবিষ্যদ্বাণী।

সে জন্যই, একটা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা ভীষণ জরুরি, যদি আপনি নিজেকে দেখাতে চান। এটা আপনার জন্য জ্বালানিস্বরূপ। 'আমি পারব' এমন দৃষ্টিভঙ্গি খুবই শক্তিশালী। জীবনে, প্রতিটা কাজের শুরুতে এটা আপনাকে আত্মবিশ্বাস জোগাবে। যখন পা পিছলে পড়বেন, এটা আপনাকে শক্তি দেবে। যদি আপনি ধরেই নেন যে আপনি সফল হবেন, তার মানে আপনি সফলতা পেয়ে গেছেন। শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও আপনি নিজেকে টেনে সামনে নিয়ে যেতে পারবেন।

তাহলে, আমরা কীভাবে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে পারি? প্রথমেই মনে রাখবেন, ইসলাম ইতিবাচকতাকে প্রাধান্য দেয়। আল্লাহর সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা। তাঁকে ভরসা করা যে, তিনি যা করছেন সবটা আপনার ভালোর জন্যই।

এ সম্পর্কে নবিজি সা. বলেন, “সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেছেন, 'আমি তেমন, যেমনটা বান্দা আমাকে মনে করে। যখন সে আমাকে স্মরণ করে, তখন আমি তার সঙ্গে থাকি। যদি সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। যদি সে কোনো মাহফিলে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমি তার চেয়ে উত্তম মাহফিলে (নিষ্পাপ ফেরেশতাদের মাহফিলে) তাকে স্মরণ করি। সে যদি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত (দুই বিঘত) অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে একহাত অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে একগজ (দুই হাত) অগ্রসর হই। সে যদি আমার দিকে হেঁটে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।” (বুখারি, মুসলিম)

"আমি তেমনই, যেমনটা বান্দা আমাকে মনে করে।” মিনিটখানেকের জন্য এই বাক্যটা নিয়ে ভাবুন। যদি আপনি ধরেই নেন যে—আল্লাহ আপনাকে শাস্তি দিচ্ছেন, তিনি চান আপনি কষ্ট পান, আপনাকে নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করছেন। তবে জীবনে দুঃখ, দুর্দশা আর হতাশা দেখে অবাক হবেন না। উলটোদিকে, যদি আপনি মানেন যে—আল্লাহ অনেক দয়ালু, তিনি আপনাকে অনেক নেয়ামত দিয়েছেন, তিনি সবসময় আপনার ভালো চান। তাহলে জীবনে সমৃদ্ধি আর আনন্দ দেখে অবাক হবেন না।

দুটোই সম্ভব। এবার প্রশ্ন হলো, যাদেরকে দরিদ্রতা, দুঃখ, কষ্ট, রোগ, শোক দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তারপরও তারা হাসিখুশি, কৃতজ্ঞ—তাদের সম্পর্কে কী বলবেন? তাদের পরিস্থিতি নিয়ে আসলে কিছু করার নেই, পুরোটাই তাদের সিদ্ধান্ত। যা পায়নি তা নিয়ে হা-হুতাশ না করে, বরং যা পেয়েছে তা নিয়ে খুশি থাকাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বিপরীতভাবে, তাদের ব্যাপারে কী—যাদের অনেক ধনসম্পদ, ভালোবাসা, যশখ্যাতি সব আছে, তারপরও তারা হতাশ, আত্মহত্যা করতে চায়? আবারও বলব, পরিস্থিতি বিবেচনা না করতে। মনোভাবটাই আসল। আল্লাহ সম্পর্কে সুধারণা রাখা অনেক শক্তিশালী একটা মনোভাব। এটা তিনি আমাদের দান করেছেন। সেটাকে কাজে লাগান।

ভাবনার খোরাক: নিজেকে জিগ্যেস করুন-আল্লাহ সম্পর্কে আপনি কেমন ধারণা রাখেন? আপনি কি বিশ্বাস করেন যে-আল্লাহ আপনাকে প্রচুর নেয়ামত দিয়েছেন এবং তিনি চাইলে আপনাকে আরো দিতে পারেন, আপনার সব স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন? না কি আপনার আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছেগুলো আল্লাহকে বলতে লজ্জা পান? বেশি বেশি চাইলে আপনি অকৃতজ্ঞ হয়ে যাবেন বলে মনে হয়?

আবারও বলছি, ইতিবাচক মনোভাবের শক্তি কতটা তা হয়তো নিচের আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট হবে,

لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
"যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব।” (সুরা ইবরাহিম: ৭)

কৃতজ্ঞতার মূল হলো ইতিবাচক মনোভাব-জীবন সম্পর্কে, জীবনের সকল জটিলতা সম্পর্কে অধিক ইতিবাচক হওয়া। নেয়ামতগুলো চেনা এবং স্বীকার করে নেওয়া, ইতিবাচকতা ও কৃতজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দুটো যেন জমজ বোন! সুতরাং যদি আপনি আত্মপ্রকাশ করতে চান, তবে মনে একটা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা খুব জরুরি।

আপনি এখানে আছেন, এর কোনো না কোনো একটা কারণ অবশ্যই আছে। আপনাকে এখানে পাঠানো হয়েছে, এই জায়গায়, এই সময়ে; যেন আপনি আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন। নিজের জীবনে একটা পরিবর্তন আনতে পারেন। তাই সেসব অর্জন করুন। একটা ইতিবাচক ও কৃতজ্ঞতার মনোভাব রাখুন, যা আপনার পাথেয় হবে।

নিজের গল্পটা কীভাবে বলবেন:

আমি আপনাদের দুজন নারীর গল্প বলতে চাই, যারা বহুকাল আগে জীবিত ছিলেন। প্রথমজন, একটা সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ভালো শিক্ষাদীক্ষা পান। সুন্দর একটা বিয়েও হয়। কিন্তু শেষে তিনি বিধবা হন। পুনরায় বিয়ে করেন। এবার তালাক পান। তার মানে, তিনি এখন এমন একজন নারী, যে একবার বিধবা হয়েছেন, পরেরবার তালাকপ্রাপ্তা। তৃতীয়বার যার সাথে তাঁর বিয়ে হলো, সে ছিল তাঁর চেয়ে বয়সে ছোটো। যার নেই কোনো খ্যাতি, আর না আছে সহায়সম্বল। অতি শিগগিরই লোকটা তাঁর জীবনে দুঃখ-কষ্টের কারণ হলো। নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি হারালেন। আপন লোকেরা শহর থেকে তাড়িয়ে দিল, একঘরে করল, জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। অতঃপর মহিলাটি মারা গেলেন। রইল তাঁর সেই স্বামী এবং সন্তানেরা।

দ্বিতীয় নারীর জন্মও একটা সম্ভ্রান্ত পরিবারে। কিন্তু তাঁর বিয়ে হলো একদম অল্প বয়সে, অনেক বেশি বয়সি একটা লোকের সাথে। স্বামীর শুধু যে বয়স বেশি ছিল তা-ই নয়, একাধিক স্ত্রীও ছিল। জীবনের বেশিরভাগটাই তাঁর কেটেছে দারিদ্র্যে। প্রায় সময়ই খাবার বলতে খেজুর আর পানির পরিবর্তে আর কিছুই ছিল না। না ছিল গর্ব করার মতো এমন কোনো দুনিয়াবি পদমর্যাদা। তিনি অজস্র দুঃখ-কষ্ট আর অপবাদ সহ্য করেছেন। যখন তাঁর স্বামী মারা গেল, তখন তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। শেষ বয়সে দেখাশোনার জন্য কোনো ছেলে কিংবা মেয়েই ছিল না।

এই দুই নারীকে আপনি চিনতে পেরেছেন? আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। প্রথমজন, আমাদের মা খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা., আর দ্বিতীয়জন, মা আয়িশাহ বিনতে আবু বকর রা.। মানলাম আপনি নারীদ্বয়কে চিনতে পেরেছেন, কিন্তু বর্ণনার ধাঁচটা ধরতে পেরেছেন? খাজিদা রা.-কে একজন বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা কিংবা তিরস্কারের বিষয় হিসেবে কখনো দেখেছেন? আয়িশাহ রা.-কে একজন বন্ধ্যা নারী, উপহাসের পাত্রী হিসেবে কখনো দেখেছেন?

আমরা তাদের সম্পর্কে এমনটা কখনোই কল্পনা করতে পারি না। কারণ, একজন মজলুমের দিক থেকে আমরা কখনোই তাদের গল্পটা বলি না। সবসময়ই আমরা তাদের মডেল হিসেবে দেখি। হ্যাঁ, খাদিজা রা. বিধবা ছিলেন, তালাকপ্রাপ্তা ছিলেন, কিন্তু তিনি একজন বিশ্বস্ত স্ত্রী, একজন সফল নারী ব্যবসায়ী, নবিজির শক্তি এবং মুসলিম উম্মতের প্রাণপাখি ছিলেন। এটাই তাঁর কীর্তি। হ্যাঁ, আয়িশাহ রা.-এর খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে, সন্তানহীন বিধবা হন। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন প্রাণপ্রিয় স্ত্রী, একটি সাহসী আত্মা, একজন প্রজ্ঞাবতী নারী, হাদিস এবং ফিকহের শিক্ষিকা। এটাই তাঁর কীর্তি।

সবটাই ঐতিহাসিক সত্য। আমরা তাদের কষ্টের জন্য আফসোস করব, না কি তাদের সাহসিকতার জন্য প্রশংসা করব—পুরোটাই আমাদের হাতে। দুটো ব্যাখ্যাই সহজলভ্য। এই ব্যাপারটা প্রতিটা মানুষের জন্যই খাটে, যারা প্রচণ্ড সংগ্রাম ও দুঃখ-কষ্ট থাকা সত্ত্বেও নিজেদের প্রকাশ করেছে।

একজন একাকী মায়ের কথা ভাবুন, হাজার দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও যে নিজের সন্তানদের প্রচণ্ড ভালোবাসে, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। সেই বোনটার কথা ভাবুন, যে অনেক বছর ধরে বিয়ের জন্য চেষ্টা করছে। এত সংগ্রামের পরও হতাশ না হয়ে বরং বিশ্বাস অটুট রেখেছে। সেই বোনটাকে কল্পনা করুন, যে একটা যন্ত্রণাদায়ক বিয়ে থেকে মুক্তি পেয়েছে। নতুন করে ফের সবটা শুরু করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে। সেই স্মরণার্থী বোনটার কথা ভাবুন, যে বাড়ি-ঘর, স্বামী, দেশ সবটা হারানোর পরও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।

যদি তাদের পরিস্থিতি বিবেচনা করি, আমরা খুব সহজেই তাদের মজলুম তথা ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত করব, তাদের প্রতি আমাদের দয়া হবে। কিন্তু আমরা যদি তাদের কাজের দিকে দৃষ্টি দেই—কীভাবে তারা এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের সামলে নিয়েছে, তবে দেখব তারা আসলে প্রত্যেকে নিজ নিজ গল্পের নায়িকা।

যে গল্পগুলো আমরা নিজেদের বলি:

প্রতিটা গল্পের কমপক্ষে দুটো দিক থাকে। আগের অংশেই আমি সেটা উল্লেখ করেছি। এমনকি সবচেয়ে বেদনাদায়ক গল্পটাও দুইভাবে বলা যায়—একজন ভুক্তভোগীর গল্প, নয়তো একজন নায়কের গল্প।

এবার বলুন, নিজের সংগ্রামের গল্পগুলোকে কতবার আপনি সমস্যা, কষ্ট হিসেবে বর্ণনা করেছেন? বিপরীতে, কতবার সেগুলোকে শক্তি এবং সহনশীলতার উদাহরণ হিসেবে কল্পনা করেছেন? কতবার অন্যের সম্মান এবং ধৈর্য না দেখে বরং তাদের ভুল পদক্ষেপে মনোযোগী হয়েছেন? এবং কতবার আপনি ছোটো ছোটো পরীক্ষাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা হিসেবে না নিয়ে সেগুলোকে সংগ্রামের চোখে দেখেছেন?

আপনি যদি আমাদের অনেকের মতো হন, তবে বলব, বহুবার আপনি নিজেকে নিপীড়িত হিসেবে কল্পনা করেছেন। হয়তো নিজেকে মজলুম ভেবে ভেবেই আপনি বড় হয়েছেন। মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গীরাই মজলুম হিসেবে কল্পনা করতে আমাদের উৎসাহ দেয়। কেননা, কষ্টের সময়ে সহানুভূতি পাওয়া খুব সহজ। কিন্তু নিজেকে মজলুম ভাবার একটা খারাপ দিক আছে। এটা আমাদের দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষমতাহীন করে দেয়। ভুক্তভোগীর ব্যাপারটাই এমন—আপনার আর কিছু করার নেই, কোনো সমর্থন নেই, যতটা খারাপ হওয়ার তা হয়ে গেছে, আপনার কাছে আর কোনো বিকল্প নেই, আপনার কোনো দায়িত্ব নেই, আপনি ক্ষমতাহীন।

যখন আমরা বারবার নিজেদের বলব যে আমাদের আর কিছু করার নেই, আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই, তখন কী হবে জানেন? আমরা ঠিক সেরকম আচরণই করব। আমরা হতাশার সাথে লড়াই করা বন্ধ করে দেব, নিজেদের শান্ত করার কথা বাদ দেব। আমরা সেই জিনিসগুলো তালাশ করা ছেড়ে দেব, যা আমাদের সন্দেহ ও কষ্ট থেকে মুক্তি দেবে। যেমন নামাজ, দুআ এবং অন্যকে সাহায্য করা।

ব্যাপারটা ঠিক একজন ডুবন্ত নারীর মতো যে ধরেই নিয়েছে তার মৃত্যুটা এভাবেই হবে। সেজন্য সে হাল ছেড়ে দেয়, সাঁতার কাটা বন্ধ করে দেয়। যদি সে আশার আলো খুঁজত, তবে কি বেঁচে যেত? হয়তো। সত্যটা হলো, আমরা কোনোদিনও জানতে পারব না। নিজের মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস অটুট রেখে, তালাকপ্রাপ্ত একটা জীবন পার করতে পারবেন আপনি? হয়তো। আপনি চেষ্টা না করলে আমরা কোনোদিনও জানতে পারব না। সন্তান হারানোর পরও বিশ্বাস এবং ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন আপনি? হয়তো। আপনি চেষ্টা না করলে আমরা কোনোদিনও জানতে পারব না। চাকরি হারানোকে নতুন ও ভালো কিছুর প্রাপ্তি হিসেবে দেখতে পারবেন আপনি, যা আপনার স্বপ্নের জীবনের মতো? হয়তো। যদি আপনি চেষ্টা না করেন, তবে আমরা কখনোই জানতে পারব না।

যখনই আপনি কিছু হারানোর কথা ভাবেন, যেকোনো কিছু—এটা ভাববেন, সেই ক্ষতির বিনিময়ে আপনি কী পেলেন? এটা আপনার ইমান বৃদ্ধি করেছে? আপনার মধ্যে স্বীকৃতি, স্পষ্টতা, বিনয়, শক্তি, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা বাড়িয়েছে? একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গির দ্বার উন্মোচন করেছে? না কি একটা নতুন জীবনের সূচনা করেছে? আল্লাহ আমাদের বলেছেন যে, আমাদের সহ্যের অতিরিক্ত বোঝা তিনি কখনোই আমাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না। এই ওয়াদাটা, আমাদের প্রত্যেকের জীবনের ওপর আলাদাভাবে যেমন প্রয়োগ হয়, তেমনি সমষ্টিগতভাবেও। আল্লাহ আমাদের অবস্থান, আমাদের চেয়েও ভালো জানেন। তিনি কেবল আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন।

সুতরাং এটা ভাবুন: যদি আল্লাহ আপনাকে কোনো পরীক্ষায় ফেলেন, তার মানে আপনি সেটা পাস করতে পারবেন। এটা আল্লাহর আরো কাছে যাওয়ার, নিজেকে চেনার, জীবনের প্রতিটা নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হওয়ার একটা সুযোগ। এটাকে নষ্ট করবেন না। পাশাপাশি এটাও ভুলে যাবেন না যে, আমরা সবাই তিনটা পরিস্থিতিতে থাকতে পারি-হয় আমাদের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, নয়তো পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, কিংবা ভবিষ্যতে নেওয়া হবে।

সুতরাং, পরীক্ষার সেই ঘন অন্ধকারে থেকে-সেটা যা-ই হোক না কেন-যখন নিজেকে অসহায় মনে হবে, একাকী লাগবে এবং পুনরায় হতাশা গ্রাস করবে, তখন আল্লাহর ওয়াদাটা নিজের অন্তরে গেঁথে নিবেন।

فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُসْرًا
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।” (সুরা ইনশিরাহ: ৫-৬)

মেঘ কেটে যাবে। শীঘ্রই ভোর হবে। সুখের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। আপনি শুধু সেই ভোরের অপেক্ষায় থাকুন। আপনাকে বেছে নিতে হবে, নিজের জীবনের গল্পটা আপনি কীভাবে বলবেন। নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে দেখাবেন, না কি এমন নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করবেন-যে প্রতিটা সংগ্রাম মোকাবিলা করেছে, প্রতিবার পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, যে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে, যে কখনো আশা ছাড়েনি, বিশ্বাস হারায়নি এবং গল্পটা বলার জন্য এখন অব্দি বেঁচে আছে।

ভাবনার খোরাক: নিজের জীবন নিয়ে এখন কোন গল্পটা আপনি বলছেন? সেই গল্পটাই পুনরায় বললে কীভাবে আপনাকে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করবে?

বিশ্বাসের সীমাবদ্ধতা:

প্রায়শই, আমরা নিজের জীবনের যে গল্পটা বলি, সেটা নির্ভর করে, দীর্ঘকাল ধরে লালন করা কিছু বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর। সেই বিশ্বাসগুলো এত পুরোনো আর এত বেশি প্রমাণিত যে, আমরা সেসবকে সত্য বলে মেনে নিতে শুরু করেছি; চিরন্তন সত্য, একেবারে পাথরে খোদাই করার মতো।
"আমি সবসময় হাল ছেড়ে দেই..."
"আমি মোটেও চালাক নই..."
"আমি একজন খারাপ মা..."
“আমরা একসাথে কখনোই সুখী হব না..."
"আমার হাতে একদম সময় নেই..."
“আমি কখনোই কিছু অর্জন করতে পারব না..."

বিশ্বাসের সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায়-এমন কিছু, যা সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়। যা-ই হোক, এখানে আমরা যে বিশ্বাসের কথা বলছি, সেটা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস বা ইসলামের নীতিমালা নয়। বরং আমরা সেই বিশ্বাস নিয়ে কথা বলছি যা প্রকাশ করে-আমরা কী, আমরা কী না, আমাদের কী হওয়া উচিত, কী হওয়া উচিত না। বিশ্বাসের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমি প্রথম জেনেছি আমার একজন ভালো বান্ধবী লাইঙ্কা স্যানির থেকে, যে NLP-এর একজন প্রশিক্ষক। সীমাবদ্ধ বিশ্বাসের চারটা বৈশিষ্ট্য সে উল্লেখ করেছে- ১. পরিচয়, ২. কারণ, ৩. অর্থ এবং ৪. সম্ভাবনা ও বিচার।

এবার এগুলো বাস্তব জীবনে কেমন দেখায় তা উদাহরণ দিয়ে বলি। যেমন, "আমি একজন খারাপ মা”—এটা আপনার পরিচয় সংক্রান্ত সীমাবদ্ধ বিশ্বাসের একটা উদাহরণ। সীমাবদ্ধ বিশ্বাসের কারণটা আরো স্পষ্ট হয়, যখন আমরা এমনতর কথা বলি, “আমি একজন খারাপ মা। কারণ আমার মা দূরে থেকেছেন, আমাকে কখনো ভালোবাসেনি।” সীমাবদ্ধ বিশ্বাসের অর্থের দিকটা যদি খেয়াল করি, তবে আমরা একটা জিনিসের যে অর্থ বের করি সেটা। যেমন, "সে সবসময় দেরি করে আসে, কারণ সে আমার পরোয়া করে না।" সর্বশেষ, সীমাবদ্ধ বিশ্বাসের সবচেয়ে খারাপ দিকটি বোধহয় এটা-“আমি কখনো এটা করতে পারব না”, “আমার সেটা অনুভব করা উচিত নয়” কিংবা “আমার এটা মেনে নেওয়া উচিত”।

ভাবনার খোরাক: আচ্ছা আপনি এমন কোনো বিশ্বাস খুঁজে বের করতে পারবেন, যা এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে মিলে? সেই বিশ্বাসগুলো কীভাবে আপনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে?

আমরা অধিকাংশি নিজের জীবনটাকে কিছু সীমাবদ্ধ বিশ্বাসের আদলে তৈরি করে নিয়েছি। আমি সবসময় শুনি, বোনেরা আমাকে বলে-তারা জীবনে খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারল না কেন। সেই ছোটোবেলা থেকে তারা মানুষের সমালোচনা আর অবজ্ঞা শুনে আসছে। এতদিন যদিও তারা সেটা নিজেদের মধ্যে গোপন রেখেছিল, কিন্তু কথায় কথায় তা বেরিয়ে আসে। আমি শুনি নিজের প্রতি বিশ্বাস হারানোর কথা, আমি শুনি নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা, আমি শুনি বাধা এবং প্রতিবন্ধকতার কথা। বেশিরভাগই হলো, সীমাবদ্ধ বিশ্বাসের ফল, যা এতদিন তারা নিজেদের ভেতর গোপন রেখেছিল। তাদের নিজ নিজ জীবনের গল্পটা বলার সময় এসব প্রকাশ পায়।

মস্তিষ্কের একটা মজার ব্যাপার হলো, আমাদের অনেকের মতোই, সে সবসময় সঠিক হতে চায়। সুতরাং এককালে আপনি হয়তো এই গল্পটা কয়েকবার বলেছেন। ব্যস, মস্তিষ্ক এটাকে আপন করে নিয়েছে, এরপর এমন আচরণ করা শুরু করেছে যা গল্পটাকে বিশ্বস্ত করে তুলেছে। এটাকে বলে কনফারমেশন বায়াস। নতুন নতুন প্রমাণের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, তার মধ্যে বিদ্যমান বিশ্বাসগুলোকে আরো বেশি বিশ্বস্ত করে তুলেছে। এই বিশ্বাসগুলো আপনার জন্য কতটা ক্ষতিকর তা একবারও কল্পনা করতে পারেন?

ধরুন, কেউ বিশ্বাস করে যে, সে একজন খারাপ মা। কনফারমেশন বায়াসের বদৌলতে, সে তার দুর্বল মানসিকতা দিয়ে আশেপাশের সব কিছুকে ব্যাখ্যা করা শুরু করবে। তার ছেলের পটি ট্রেইনিং ঠিকমতো হচ্ছে না? কারণ, সে একজন খারাপ মা। তার মেয়ে ঠিকমতো রিডিং পড়তে পারছে না, যেখানে ক্লাসের বাকিরা তরতর করে পড়ে যাচ্ছে? এর কারণ, সে একজন বাজে মা। এমন পরিস্থিতিতে, বিপরীতে যত প্রমাণই থাকুক না কেন, মস্তিষ্ক সবটা বাদ দিয়ে, ইতোমধ্যে যা বিশ্বাস করেছে, তাতেই সমর্থন দেবে। একই কাজ হয় আমাদের বেলাতেও; যখন নিজের, জীবনসঙ্গীর, সন্তানের, পিতামাতার, বন্ধু বা সহকর্মীর কথাগুলো বলতে চাই।

ভাবনার খোরাক: কিছুটা সময় নিয়ে নিজের সীমাবদ্ধ বিশ্বাসের প্রতি মনোনিবেশ করুন। সেটা হতে পারে আপনার নিজের সম্পর্কে, কিংবা অন্যের সম্পর্কে। কনফারমেশন বায়াসের ভূমিকাও খুঁজে বের করুন। নিজের এবং অন্যকে নিয়ে কিছু অনুমান করার আগে ভাবুন। বিশেষ করে, যদি সেসব অনুমান কোনো কাজেই না আসে।

প্রায়ই, আমরা যা বিশ্বাস করি, ধারণা করি-সেসব আমাদের কোনো কাজে আসে না। উলটো আমাদের সীমাবদ্ধ করে ফেলে, দুনিয়ায় আমাদের বিচরণকে প্রভাবিত করে। কারণ এগুলো বহুল পরিচিত এবং সংখ্যায়ও অনেক বেশি। আমরা নিজেকে এসবের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখি, কারণ আমরা সবসময় এমনটাই জেনে এসেছি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণভাবে এসবের সাথে আমাদের লেগে থাকার কারণটা হলো-এসবকে আমরা সত্য বলে মেনে নিয়েছি। ঠিক এই জায়গাতেই আমরা আছড়ে পড়ি।

জেনে রাখুন: যেসব ভ্রান্ত বিশ্বাস আপনার ক্ষেত্রে কোনো কাজই করছে না, সেসব পালটে নতুন উপকারী বিশ্বাস গ্রহণে আপনি স্বাধীন। নিজেকে নতুন করে জাগানো এবং নতুন জীবনের গল্প বলার ক্ষেত্রেও আপনি স্বাধীন। সবটাই আপনার ভেতরের শক্তি, যা আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন। মনে রাখবেন, সবটাই সম্ভব। যদি কোনো বিশ্বাস আপনার জন্য কাজ না করে, আপনাকে পেছন থেকে টেনে ধরে, তবে সেটা স্বীকার করুন। এরপর সেই বিশ্বাসটা পরিবর্তন করতে নতুন কোনো বিশ্বাসের ওপর কাজ করুন। এমন কিছু যা ইতিবাচক, আরো বেশি উপকারী-নিজেকে সঠিকভাবে, বিনীতভাবে প্রকাশের জন্য উপযোগী।

ভাবনার খোরাক: আপনার সেই দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস কোনগুলো, যা আপনার সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে? এখন সেগুলো বদলাতে আপনি কী করবেন?

একবার লাইঙ্কা তার ওয়ার্কশপে পরিবর্তনের একটা অনুশীলনের কথা বলেছিল, যা আপনাদের হয়তো উপকারে আসতে পারে। আপনার সীমাবদ্ধ বিশ্বাসগুলো অতীতের ক্রিয়া ব্যবহার করে লিখুন। এমনভাবে, যেন আপনি সেগুলো আগে বিশ্বাস করতেন, এখন আর করেন না। সেসব কাটিয়ে উঠেছেন, আপনি বড় হয়েছেন, সেগুলোকে আপনি আর সত্য বলে মানেন না। যেমন,
"আমি ভাবতাম, আমি একজন বাজে মা..."
"আমি ভাবতাম, আমরা একসাথে সুখী হতে পারব না..."
"আমি ভাবতাম, হিফজ করার জন্য যথেষ্ট সময় আমার হাতে নেই..."
"আমি ভাবতাম, আমি কোনো কিছুই অর্জন করতে পারব না..."

এখন আপনার কেমন লাগছে? একটু বেশি হালকা আর স্বাধীন মনে হচ্ছে না? আপনাকে যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে। হয় সেই বিশ্বাসগুলো নিয়ে থাকবেন, যেগুলো আপনার কণ্ঠরোধ করে রেখেছে। নয়তো সেগুলোকে পরিবর্তন করে এমন কিছু বিশ্বাস লালন করতে হবে, যা আপনার জন্য উপকারী এবং যা আপনাকে সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষে পরিণত করবে। একবার ভাবুন, আপনার জীবনটা কীভাবে পরিবর্তন হয়ে যাবে, যখন কোনো একটা সীমাবদ্ধ বিশ্বাসকে পরিবর্তন করে শক্তিশালী কোনো বিশ্বাসে সেটাকে পালটে দেবেন। এরপর এমনভাবে জীবনযাপন করবেন যেন এটাই সত্য। স্রেফ একবারটি ভেবেই দেখুন না।

📘 শো আপ মুসলিম নারীদের প্রেরণার বার্তা 📄 ধাপ-৩: শোকরগুজার হোন

📄 ধাপ-৩: শোকরগুজার হোন


اَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّلِحِينَ
“আর তোমার অনুগ্রহে, তুমি আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো।” (সুরা নামল: ১৯)

যদি ইতিবাচকতা আত্মপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়, তাহলে আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আছে, যা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা দরকার। সেটা হলো কৃতজ্ঞতা। আমি বিশ্বাস করি, প্রাণপ্রিয় স্বামীর মৃত্যুর পর আমি যে সিজদাহতে পড়ে গেলাম, তার একমাত্র কারণ ছিল কৃতজ্ঞতা। অনেকেই এই কাজটাতে প্রশ্ন তুলেছে। কেউ কেউ ভেবেছে, আমি পাগল হয়ে গিয়েছি। কিন্তু আমি জানি, সেই সিজদাহটা কোথা থেকে এসেছে। এটা এসেছে গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে। কারণ, আমি আশীর্বাদস্বরূপ কিছু বছর পেয়েছি, একসাথে সুন্দর কিছু মুহূর্ত কাটানোর জন্য। সিজদাহটা এই স্বীকারোক্তি থেকে এসেছে যে, ঐ মানুষটার কাছে আমি ঋণী। আমি তাকে চিনেছি, তার সন্তানদের পেটে ধরেছি, তার সাথে হেসেছি, কেঁদেছি—সবটার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।

স্বামীহীন কাটানো প্রথম ঈদে, আমি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই কবিতাটা লিখেছিলাম। খানিকটা দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে।

যখনই সে বলে তার প্রিয়তমের কথা
নয়নমণি যেন ফিরে পায় উজ্জ্বলতা
এখনও, তার কণ্ঠস্বরে বয়ে যায় শীতলতা
এখনও, হৃদয়কূলে আঘাত হানে স্মৃতির পাতা
এখনও।
যখনই সে বলে তার প্রিয়জনের কথা,
ভারী হয়ে ওঠে যেন হৃদয়ের ব্যথা!
অল্পেও পাওয়া যায় সুখের দেখা,
তার স্মরণেও মুছে যায় ক্ষতের রেখা।
জানার মাঝেও প্রশান্তি আছে এই কথাটি,
এক জীবনে তারই ছিল সেই পুরুষটি।
অদ্ভুত সেই অনুভূতি, অসম্ভব সুন্দর ছিলেন তিনি।
তাই তো এপ্রিলের সূর্যরশ্মির ন্যায়,
হাসতে হাসতে তার চোখ হতে অশ্রু গড়ায়।
মুখে হাসি ফোটাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে
আরেকটু বেঁচে থাকতে, এখনও।

কৃতজ্ঞতাই সেই জিনিস, যা স্বামীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে আমাকে সাহায্য করেছে। এর ক্ষমতা এত ব্যাপক। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা, জীবনে ইতিবাচক হতে বাধ্য করে। ছোটো ছোটো আশীর্বাদ, বরকত-যা আমরা নিজেদের প্রাপ্য হিসেবে ধরে নিয়েছি, সেসবের শুকরিয়া আদায় করতে সাহায্য করে। এটাকে অভ্যাস বানানোর ফায়দা অনেক। যেমন, দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে, নেতিবাচকতাকে হারাতে, আশাবাদী মনোভাব পোষণ করতে, জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে সহায়তা করে।

জগদ্বিখ্যাত উদ্যোক্তা এবং বক্তা, লিসা নিকোলস, তার বই অ্যাবানড্যান্স নাউ-তে বলেছেন, “যদি আপনি চান যে আপনার জীবনে মহৎ জিনিসগুলো আসুক। তবে প্রথমেই, জীবনে ইতোমধ্যে যেসব মহৎ জিনিস আপনি পেয়েছেন, সেসব আপন করে নিন। সবার আগে সেসবের প্রতি আপনার শক্তি ও মনোযোগ দিতে হবে।”

যেসব ভালো জিনিস আমাদের জীবনে আছে, সেসবে নিজেদের শক্তি ও মনোযোগ দেওয়ার ফলে আমরা নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারব। আমি আমার সন্তানদের কথা ভাবি-তাদের প্রতি কতটা শক্তি আর মনোযোগ আমি দিয়েছি? আল্লাহ তাদের পৃথিবীতে পাঠানোর জন্য, তারা যেমন আছে তেমন থাকার জন্য, সন্তান নামক আমানত আমাকে প্রদান করার জন্য-কতটা কৃতজ্ঞ হয়েছি? মা হওয়ার বিরক্তি ও মানসিক যাতনার পরিবর্তে কৃতজ্ঞ হলে-সন্তান লালন-পালনের ব্যাপারটায় কতটা পরিবর্তন আসবে? দৃষ্টিভঙ্গির এমন পরিবর্তন, আমাকে কতটা পরিবর্তন করবে? তাদেরই বা কতটা করবে? জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের এই প্রশ্নগুলো করতে পারি। সেটা হতে পারে নিজেকে নিয়ে, জীবনসঙ্গী সম্পর্কে, সন্তানদের নিয়ে, পিতামাতার ব্যাপারে, বড় পরিবার নিয়ে কিংবা বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে। এই কৃতজ্ঞতার প্রভাবটা আমরা আমাদের কর্মজীবন, জীবনের লক্ষ্য, আমাদের সকল পরিস্থিতিতেও কাজে লাগাতে পারি।

আবারো আমি আপনাকে আল্লাহর কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দিতে চাই-"যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি আরো বাড়িয়ে দেব।” আমরা কতটা শুকরিয়া আদায় করি, আর আল্লাহ আমাদের কতটা দান করেন-দুটোর মাঝে একটা মধুর সম্পর্ক আছে। মুসলিম হিসেবে আমরা জানি-শুকরিয়া আদায় করার জন্য যা যা করা দরকার, সবটাই আমাদের করা উচিত। যেমন, একটা কৃতজ্ঞতার রোজনামচা রাখতে পারি, স্টিকিনোট দেওয়ালে লাগিয়ে অথবা মোবাইলে রিমাইন্ডার সেট করতে পারি। সকাল এবং সন্ধ্যার আমলগুলোও করতে পারি-যেখানে আমরা নিয়মিতভাবে প্রতিদিনকার নেয়ামতগুলো জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি।

ভাবনার খোরাক: কীভাবে আপনি নিজ জীবনে আরো বেশি কৃতজ্ঞ হতে পারেন? জীবনে কৃতজ্ঞতা ও ইতিবাচকতা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন কোন কাজগুলো করতে পারেন?

জীবনের পাঠ:
জেনে রেখো তুমি, জীবনের পাঠ শিখতে পারবে কেবল,
জীবনযাপনের মাধ্যমে, ভালোবাসার মাধ্যমে, শ্রবণের মাধ্যমে।
ব্যর্থতায় হোঁচট খেলে, ভগ্নহৃদয়ের টুকরোগুলো কুড়ানোর মাধ্যমে।
ভগ্নাংশসমূহকে একত্র করো। এগুলো তো তোমারই জীবনের অংশ!
ধুলো মুছে সব পরিষ্কার করো, ঘষেমেজে করো উজ্জ্বল!
অতঃপর, নিজের সাথে জুড়ে গড়ো এক নতুন অস্তিত্ব।
পুরো যাত্রাজুড়ে আমাদের কেবল আছে,
ধুলোয় ধূসরিত দুটো পা, একটি মুক্ত হৃদয় আর তীক্ষ্ম চক্ষুজোড়া,
নিজ নিজ গন্তব্য দেখার জন্য।

📘 শো আপ মুসলিম নারীদের প্রেরণার বার্তা 📄 ধাপ-৪: হিম্মত রাখুন

📄 ধাপ-৪: হিম্মত রাখুন


"সাহসের শুরুটা হয় - নিজেকে প্রকাশ করা এবং অন্যের সামনে নিজেকে উপস্থাপনের মাধ্যমে।” - ব্রেন ব্রাউন

মাঝে মাঝে আমরা ভাবি, সাহসী হতে হলে আমাদের ভয়হীন হতে হবে। কিন্তু সাহস হলো, আপনি যে কাজটা ভয় পান, সেটাই এক হাতে আশা নিয়ে, আরেক হাতে ভয় নিয়ে করা। আপনার ভয়কে আপনি সাথে নিয়েই চলেন। ভয় থাকা সত্ত্বেও আপনি সেই কাজটাই করেন। সাহসের এই ধারণাটা মূলত ব্যাপকভাবে স্বাধীন। সাহসী হতে হলে, নিজেকে প্রকাশ করার আগে আপনার সমস্ত ভয়কে জয় করার প্রয়োজন নেই। আপনি সেসব ভয়ভীতিকে সাথে নিয়েই চলবেন এবং নিজেকে প্রকাশ করবেন।

আবারো তাওয়াক্কুলের কথা বলা যাক, মানে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। আমরা ভয় পেতে পারি, অনিশ্চয়তা ভর করতে পারে, সব প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকতে পারে-কিন্তু আমরা জানি আমাদের একজন রব আছেন, যিনি সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী, সবকিছু জানেন, সবটা দেখেন, যেকোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখেন। পাশাপাশি তিনি আমাদের ডাকের অপেক্ষায় আছেন, আমাদের দুআ কবুলের জন্য সদা প্রস্তুত। তিনি আমাদের সান্ত্বনা দেবেন, সমস্যা দূর করবেন কিংবা ধৈর্য ধরার ক্ষমতা দেবেন। যদি আমরা সত্যিই এই ব্যাপারটাকে ভাবনার খোরাক করতে পারি-কোনো একটা উপায় বের হবেই, তবে তা হবে সীমাহীন সাহসীকতার ভান্ডার। সারা জাহানের মালিক আপনার সাথে আছেন, তবে আর ভয় কীসের?

সালাতুল ইস্তিখারার ব্যাপারটাই দেখুন। যে কোনো বিষয়ে আল্লাহর মর্জি জানার জন্য আমরা যা বলি-
“প্রভু হে, আমি আপনার কাছে কল্যাণ চাই, আপনার ইলমের সাহায্যে। আপনার কাছে শক্তি কামনা করি, আপনার কুদরতের সাহায্যে। আপনার কাছে অনুগ্রহ চাই, আপনার মহা অনুগ্রহ থেকে। আপনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, আমার কোনো ক্ষমতা নেই। আপনি সর্বজ্ঞ, আমি কিছুই জানি না। আপনিই সকল গোপন বিষয় পূর্ণ অবগত। প্রভু হে, আপনার ইলমে এ কাজ আমার দ্বীন, আমার জীবনজীবিকা ও কর্মফলের দিক থেকে (অথবা দুনিয়া ও পরকালের দিক থেকে মন্দ হয়) তবে তা আমাকে করার শক্তি দান করুন। পক্ষান্তরে আপনার ইলমে এ কাজ যদি আমার দ্বীন, আমার জীবনজীবিকা ও কর্মফলের দিক থেকে, তবে আমার ধ্যান-কল্পনা এ কাজ থেকে ফিরিয়ে নিন। তার খেয়াল আমার অন্তর থেকে হটিয়ে দিন। আর আমার জন্যে যেখানেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে এর ফয়সালা করে দিন এবং আমাকে এরই পর সন্তুষ্ট করে দিন।” (বুখারি)

একটু থেমে ভাবুন। আমরা তাঁর কাছে কল্যাণ চাইছি—তাঁর শক্তি, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার ওসিলা দিয়ে। আমরা আমাদের কাজের বরকত চাচ্ছি, কাজটা সহজ হওয়ার কামনা করছি। আবার কাজটা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক না হলে, এর থেকে পানাহ চাইছি। পরিবর্তে মঙ্গলজনক কিছু আশা করছি। সুবহানাল্লাহ। সবকিছুই তো চাওয়া হয়ে গেল। এবার আর ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আল্লাহর ওপর ভরসা করুন এবং কাজে লেগে পড়ুন। লিসা নিকোলস যেমনটা বলেছে, “কাজে নামার আগে ভয়কে দেবেন না আপনাকে থামাতে। বরং ভয়ের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়ুন।”

আপনাদের একটা সত্য কথা বলি। সারাটা জীবন ধরেই আমি ভয় পেয়ে চলেছি।
■ নিজের বাসা জিম্বাবুয়ে ছেড়ে, একা একা লন্ডনে পড়াশোনা করতে যেতে আমি ভয় পেয়েছিলাম।
■ জীবন এবং বিশ্বাস সম্পর্কে জানার জন্য সেনেগাল যেতে ভয় পেয়েছিলাম।
■ আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি—এই কথাটা বাবাকে বলতে ভয় পেয়েছিলাম।
■ ফ্রম মাই সিস্টার্স লিপস বইতে নিজের জীবনের গল্পটা বলতে ভয় পেয়েছিলাম।
■ ব্রিটিশ টিভিতে প্রথম নিকাবি হিসেবে বক্তৃতা দিতে ভয় পেয়েছিলাম। লরেন ক্যালি এবং ম্যালানি ফিলিপস-এর মতো ব্যক্তিদের মুখোমুখি হতেও ভয় পেয়েছিলাম।
■ বাচ্চাদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে বাসায় পড়ানোর ব্যাপারেও ভয় পেয়েছিলাম।
■ স্বামীর ব্যবসায়ের হাল ধরা, তার কীর্তিকে বহাল তবিয়তে রাখতেও ভয় পেয়েছিলাম।
■ নতুন কোনো দেশে, নতুনভাবে জীবন শুরু করতেও ভয় পেয়েছিলাম।
■ একটা মৃতপ্রায় ব্যবসায় বন্ধ করে দিতেও ভয় পেয়েছিলাম।
■ একটা নতুন ব্যবসায় শুরু করতেও ভয় পেয়েছিলাম।
■ আমি আবার বিয়ে করছি-প্রাক্তন শ্বশুর-শাশুড়িকে এই কথাটা বলতেও ভয় পেয়েছিলাম।
■ আমি আরেকটা বিয়ে করতে চাই না-স্বামীকে এই কথাটা বলতেও ভয় পেয়েছিলাম।
কিন্তু এর সব কয়টাই আমি করেছি।

কেননা, থেমে থাকা, থমকে দাঁড়ানোর জন্য ভয়ভীতি কোনো কারণ নয়। বরং ভয় এমন এক জিনিস, যা নিজেকে ধাক্কা দিতে সাহায্য করে। কারণ, ভয়ের উলটো পিঠে আছে-শক্তি, প্রজ্ঞা এবং উন্নতি। আর আমার জীবনে আমি সবসময় এটাকে সত্য হতে দেখেছি। নিঃসন্দেহে, দুর্বল এবং সবলের তফাত হলো-প্রথমজন পরাজয়কে ভয় পায়। আর দ্বিতীয়জন মনে করে, পরাজয় হলো শেখার একটা প্রক্রিয়া। এখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। হয়তো এটা আপনার জন্য নতুন শিক্ষা। তাছাড়া, যদি আমরা বিশ্বাস করি যে, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা দুটোই আল্লাহর হাতে-তবে আমরা ভয় পাব কেন?

ভাবনার খোরাক: কোন ভয়টা আপনাকে আত্মপ্রকাশ করতে বাধা দিচ্ছে? কখনো আপনি ভয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন? সেখান থেকে কী শিখেছেন?

ভয়কে জয়:
“যদি জানতেন, যে জিনিসগুলোকে আপনি ভয় পেয়েছিলেন, সেগুলো আদতে বিশ্বাস বাড়ানোর একটা সুযোগ ছিল-তবে আপনি কী করতেন?” -লিসা নিকোলস

সচরাচর আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাই। আমি যে কাজটা করার কথা ভাবছি, সেটা হয়তো ব্যর্থতা বয়ে আনবে, আমি হতাশ হব, নয়তো কিছু একটা হারাব। কিন্তু সত্যটা হলো, আমরা ভবিষ্যৎ জানি না। কেননা, ভবিষ্যৎ দেখা যায় না। অথচ ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে করে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। ভবিষ্যৎ নিয়ে করা নেতিবাচক কল্পনাগুলো মস্তিষ্ক সত্য বলে মেনে নেয়। যতক্ষণ অব্দি সেসব অনিবার্য সত্যি না হচ্ছে, ততক্ষণ অব্দি আমরা তাতে জল ঢালতে থাকি। কিন্তু সত্যটা হলো, আমরা কল্পনায় একটা জগৎ তৈরি করছি আর এমন আচরণ করছি যেন সেই কল্পনাটাই সত্য। আসলে কিন্তু এমনটা নয়। এটা নিছকই আমাদের কল্পনা।

এই মুহূর্তে আপনি কোন সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার কথা ভাবছেন, যা আপনাকে আপনার কমফোর্ট জোন থেকে বের করে দেবে? বাহিরে কাজ করা বা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আনার মতো সহজ এগুলো? আপনি কুরআন হিফজ করার কথা ভাবছেন? না কি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন? সন্তানদের বাড়িতে পড়াবেন? না কি ইউরোপে পাড়ি জমাবেন? কোনো ব্যবসায় বা দাতব্য কিছু চালু করবেন? না কি ইঁদুর দৌড় খেলা বন্ধ করবেন? কিংবা দেশ ছাড়তে চান?

mজার কথাটা হলো, আমাদের অনেকের জন্যই এমনটা স্বাভাবিক যে আমরা যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ে খারাপটা চিন্তা করি। বিখ্যাত পডকাস্টার এবং দ্য ফোর- আওয়ার ওয়ার্কউইক-এর লেখক, টিমোথি ফেরিস আদতে এটাকে সমর্থন করে। তার মতে, আপনার মস্তিষ্ক এসব গোলকধাঁধায় পড়ে যায়, ধীরে ধীরে অধিক নিকটবর্তী হয় আর একসময় আপনার ভয়ের সাথে বসবাস করা শুরু করে। উদাহরণ হিসেবে একটি শীতের দিনের কথা ভাবুন। আমরা চিন্তা করি—পরিস্থিতি কতটা খারাপ হবে? আর কী হওয়ার বাকি আছে? কাজ করলে আপনি কী পেতেন? কাজ বন্ধ রাখার কারণে আপনার কী ক্ষতি হলো?

ভয়কে পুনর্গঠন করার ব্যাপারটা কী?
বেস্টসেলিং লেখক, স্টিভেন প্রেসফিল্ড, ভয়ের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজ করার মাধ্যমে প্রতিহত করার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “ভয় পাওয়া ভালো। সংশয়ের মতো ভয় পাওয়াও একটা নিদর্শন। ভয় আমাদের বলে—আমাদের কী করতে হবে। আমাদের নীতিটা মনে রাখবেন—কোনো কাজ করতে আমরা যত বেশি ভয় পাব, কাজটা করার সম্ভাবনা আমাদের তত বেড়ে যাবে।”

লিসা নিকোলসের মতে, “ভয় আপনার দুশমন নয়। বরং আপনার বন্ধু।” আমি তার সাথে একমত। এক বিশেষ ধরনের ভয় আছে, যা—
■ আপনাকে আত্মতৃপ্তি হতে দূরে রাখবে।
■ অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করার তাগিদে বেশ রাত অব্দি আপনাকে জাগিয়ে রাখবে।
■ স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ভোর ৪.৩০-এ আপনাকে জাগিয়ে দিবে।
■ আপনার কপালটা জায়নামাজে ঠেকাতে দেবে, আল্লাহর কাছে নিজ সন্তানের হিদায়ত চেয়ে দুআ করতে সাহায্য করবে।
■ আপনাকে পুনরায় নিজের বৈবাহিক সম্পর্কটা ঠিক করতে সহায়তা করবে।
■ বাবা-মায়ের থেকে ক্ষমা চাইতে নিজেকে উদ্বুদ্ধ করবে।

ভয়, বিশেষ করে কিছু হারানোর ভয়—একটা শক্তিশালী অনুপ্রেরক হতে পারে। আপনাকে বেছে নিতে হবে—ভয়কে কীভাবে আপনি সংজ্ঞায়িত করবেন?

সিইও হিসেবে আত্মপ্রকাশ:

দীর্ঘ সময় ধরে, “ব্যবসায়ের মালিক” শব্দটার সাথে বিরোধিতা করেছি আমি। আমার কখনোই মনে হয়নি যে শব্দটা আমার সাথে যায়। যদিও প্রায় দশ বছর যাবৎ সিস্টার্স ম্যাগাজিন আমি পরিচালনা করেছি। আমি শুধু বুঝতাম—আমার মাথাভর্তি আইডিয়া আছে, আমি সৃজনশীলা, একজন স্বপ্নচারিণী। ব্যবসায় পরিকল্পনায় কী আসলো আর কী গেল, মিটিং, লাভ-লোকসান—এসব নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। সত্যি বলতে, এসব দায়িত্ব আমি নিতেই চাইতাম না। হাস্যকর না? প্রায় সময়ই যে কারণটা আমাদের আত্মপ্রকাশ করতে বাধা দেয়, তা হলো—দায়িত্ব। আর আমি সেই দায়িত্বটাই নিতে রাজি ছিলাম না।

লম্বা একটা সময় ধরে, এই জিনিসটা আমার ওপর বেশ ভালো কাজ করেছে। আমি সেই মানুষগুলোকে ব্যবসায়ের অংশীদার হিসেবে নিয়েছি, যারা ব্যবসায়িক কাজগুলো করত সীমাহীন আনন্দের সাথে। আমি কেবল সৃষ্টিশীল কাজকর্ম দেখতাম। এভাবে সুলাইমানের (আল্লাহ তার ওপর রহম করুন) মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলেছিল। মৃত্যুর আগ অব্দি, আমার স্বামী মিশরে একটি মার্কেটিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করছিল। তার একটা কল সেন্টারও ছিল, যার গ্রাহক ছিল বহু নামিদামি ব্যক্তি। এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটা ভবন ছিল কায়রোতে, যেখানে ৩শ' এর অধিক লোক কাজ করত।

কিন্তু আচানক, ব্যবসায়ের কোনো অক্ষরজ্ঞান ছাড়াই আমি সেটার মালিক হয়ে গেলাম। সেদিন কোন জিনিসটা আমাকে কোম্পানির পরিচালক হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছিল, আমি আজও জানি না। তার মৃত্যুর ছয় দিন পর কোম্পানি জানল যে, একটা শেষ চেষ্টা না করে আমরা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করছি না। এটা শেষ নয়; আমরা উন্নতি করব, আরো বড় হব। ইদ্দতের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে আমি প্রায় প্রতিদিনই অফিসে যেতাম। ম্যানেজারের সাথে মিটিং, আয়ের রিপোর্ট দেখা, কর্মীদের ব্যাপারে খেয়াল রাখা সবটাই করছিলাম। বিশেষভাবে এমন একটা পরিবারকে সাহায্য করছিলাম যারা সবেমাত্র শোক কাটিয়ে উঠেছে। সেই মানুষগুলোকে দেখলে আমার কষ্ট হতো—যারা আমার মরহুম স্বামীকে মেন্টর এবং বাবার মতো দেখত। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের শোক কাটিয়ে উঠতে খুব পরিশ্রম করেছিল। সেই মানুষটা এদেরকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছিল, চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করেছিল, কল্পনার পালে হাওয়া দিয়েছিল, স্বপ্নের খোরাক জুগিয়েছিল। সে তুলনায়, আমি খুবই বাজে বিকল্প ছিলাম। কিন্তু তার রাহে চলতে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সে যা করতে চেয়েছিল, আমার মতে আমি তার সবটাই করেছি। অথবা, এটাই সর্বোচ্চ যা আমি করতে পারতাম।

আজ তোমার ল্যাপটপ খুলেছিলাম প্রথমবারের মতো
তোমার ছেলে পাসওয়ার্ড জানতো, আমি একদমই না।
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলাম।
তোমার জীবন কত ব্যস্ততাপূর্ণ ছিল!
তোমার মস্তিষ্ক কতটা সচল ছিল!
চিন্তায় পরিপূর্ণ, ফোনের নাড়িনক্ষত্র এবং খদ্দরের চিঠিপত্র।
তোমার দিনগুলো তো এমনই ছিল,
আমার থেকে ভীষণ আলাদা, দুজন ছিলাম দুজগতের বাসিন্দা।
আমি আমার কাজে ব্যস্ত, সন্তানদের দেখাশোনা, গৃহস্থালি পরিচালনা,
লেখালিখি করা, বন্ধুদের সাথে আলাপচারিতা। আর তুমি তোমার কাজে।
এখন আমি বাধ্য! তোমার জগতে বাস করতে,
তোমার আবরণ পরতে, তোমার পথে চলতে।
কিন্তু রাস্তা বেশ দীর্ঘ আমার জন্যে। অবশ্যই। আমি অভ্যস্ত নই সেই পথে।
কিন্তু দেখো, আমি ঠিক পারব সামলে নিতে, পরম করুণাময়ের রহমতে।
শুধু কিছু সময়ের জন্য অদলবদল করতে হবে, যতক্ষণ না আমার পা'দুটো দৃঢ় হবে,
যতক্ষণ না তারা নিজেদের গতি পাবে, যতক্ষণ না আমি হাঁটব, দৌড়াব
অতঃপর ছুটে চলব প্রবল বেগে। যদবধি না জেতার জন্য প্রস্তুত হব এই যুদ্ধে।

কিন্তু এটা কঠিন ছিল। ভেতরে ভেতরে নতুন এই দায়িত্বটা নিয়ে আমি কিছুটা অসন্তুষ্ট ছিলাম। কেননা, সপ্তাহজুড়ে আমাকে সন্তানদের থেকে দূরে থাকতে হতো। কায়রোর প্রাণকেন্দ্রে, জ্যামের মধ্যে, এটা এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র ছিল-যা আমার নিজের সৃষ্টি নয়। আর যার কোনো তলানিও আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। নিজের যাত্রার ব্যাপারেও আমি ছিলাম অজ্ঞাত। কোনো নির্দেশনা নেই, স্বপ্নহীন, মনে ব্যর্থতার ভয়। পাশাপাশি এও ভাবতাম-আমার স্বামীর কীর্তির ব্যাপার কী? কর্মীদের এবং আমার নিজের ব্যাপারটাই কী? কোনো এক ডিসেম্বরে, ব্যবসায় জগতের দুই নেতার কথা শুনে আমার হাবভাব বদলে গেল।

প্রথমজন, ব্রেনডন বারচার্ড। আমি দীর্ঘদিন ব্রেনডন এর ছাত্রী ছিলাম। তার কিছু কোর্স করেছি আমি, কয়েকটা ভিডিয়োও দেখেছি। কিন্তু একদিন সে আমাকে এমন একটা মেইল পাঠায়, যা আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। মেইলের মূল বক্তব্য ছিল—নিজের জীবনের সিইও হওয়া, উপাধিটাকে স্বীকার করা, দায়িত্বগুলো মেনে নেওয়া, নেতার মতো আত্মপ্রকাশ করা। ভুক্তভোগী না হয়ে বরং রাজার মতো—বাস করা, চিন্তা করা, কাজ করা।

পরের গল্পটা সংক্ষেপে বলি। একদিন সেথ গডিনের লিঞ্চপিন বইটা হাতে তুলে নিলাম। সেসময় ব্যবসায় সংক্রান্ত বই খুব বেশি পড়া হয়নি। সত্যি বলতে, ঐ বইটা আমি কেন বেছে নিয়েছিলাম নিজেও জানি না। তবে আমি শুকরিয়া জানাই যে, আমি বইটা হাতে তুলে নিয়েছিলাম। কেননা তারপরই আমার জীবনে বিশাল পরিবর্তন আসে। সেই বইতে, সেথ গডিন কোনো কাজে ব্যক্তির সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি ও ভিন্ন চরিত্র আনার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। তার মূল কথা ছিল—'আপনি খাবার পরিবেশক বা বিক্রয়কর্মী যা-ই হোন না কেন, কাজে নিজের আসল সত্তাকে আনুন। কাজটা এমনভাবে করুন যা আপনাকে বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে অপরিহার্য করে তোলে।' সেথ আমাকে লিঞ্চপিন হওয়ার চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল—ঘূর্ণির চাকা না হয়ে, বরং নিজ কোম্পানিতে অপরিবর্তনীয় ব্যক্তি হয়ে উঠতে বলেছিল। সেথ আমাকে আরো চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল—সম্পূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করতে। নিজের ব্যবসায় এবং ব্যবসায়ের সাথে সম্পর্কীত প্রতিটা মানুষের কল্যাণে, নিজের আসল সত্তাকে বাহিরে নিয়ে আসতে। এটাই আসলে গোটা খেলার দান পরিবর্তন করে দিল।

সেইদিনের পর থেকে, ব্যবসায়টাকে আমি নিজের ব্যবসায় বলে ভাবতে লাগলাম। কোম্পানির পরিচালনা সম্পর্কে আমি প্রশ্ন করলাম—কেমন সংস্কৃতি আমি গড়তে চাই, কোন ধরনের অভিজ্ঞতা আমি আমার কর্মীদের থেকে আশা করি। আমি সেই সব প্রজেক্ট চালু করলাম, যা আমার লক্ষ্যের সাথে মিলে। কর্মীদের আচরণ ও বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির জন্য আমি অর্থ ব্যয় করলাম। আমি এমন একটা ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে চাইলাম, যেখানে আমার আদর্শ ও কীর্তি প্রতিফলিত হবে। আমি নিজেকে প্রকাশ করেছি। কোম্পানির জন্মদাতার বিকল্প হিসেবে নয়। বরং বর্তমান মালিক হিসেবে; যে কোম্পানির ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বশীল। নতুন চরিত্রে আত্মপ্রকাশের সিদ্ধান্ত, নতুন প্রতিকূলতাগুলো, সুযোগগুলো, দায়িত্বগুলো—আমার হতাশা কমিয়েছে। জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আমি আর দৌড়ে পালাচ্ছি না, নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছি না। আমার জন্য যে শিক্ষা অপেক্ষা করছে, সেটা মেনে নিতে আমি প্রস্তুত। এসব সত্ত্বেও, আমার বিশ্বাস—স্বামীর মৃত্যুর পর এটাই আমার সবচেয়ে ভালো কাজ।

আপনিও পারবেন:
আল্লাহর ওয়াদা সত্য—আপনার সহ্যের অতিরিক্ত বোঝা তিনি চাপিয়ে দেবেন না। যদি তিনি আপনাকে কোনো সমস্যায় ফেলেন, তবে তিনিই আবার আপনাকে সেখান থেকে বের করে আনবেন। আমি জানতাম, আল্লাহ আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন, তার পেছনে কারণ আছে। এবং এটাও জানতাম, আমার চেষ্টার ফলাফল তার হাতেই। আমি কেবল এটা বলার হিম্মত চেয়েছি—প্রতিকূলতাগুলো আমি মেনে নিলাম ও নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করলাম।

মিশরে, একটা কোম্পানি চালানোর অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। নিজের আরামের জায়গা থেকে বেরিয়ে আসা, যা আগে কখনো করিনি; শ'খানেকের ওপর কর্মী, যাদের কাউকে আমি চিনি না; হিসাবরক্ষক; উকিল; ট্যাক্সের মামলা; কর্মী নিয়োগ দেওয়া; ছাঁটাই করা—সবটাই আমার জন্য নতুন ছিল। আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ সেটা। পেছনের দিকে তাকিয়ে বলতে হচ্ছে—খুব সম্ভবত এটাই আমার জীবনের সর্বোচ্চ পরিবর্তনের কাজ। এই অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ, আমি এমনভাবে পরিপক্ব হয়েছি, যেমনটা কোনোদিন আশাও করিনি। এমন সব দক্ষতা অর্জন করেছি, যা কোনোদিন ভাবিওনি যে এসব আমার কাজে লাগতে পারে। এমন এক শক্তির দেখা পেয়েছি, আমি জানতামই না, যা কি না খোদ আমার মধ্যেই বিদ্যমান আছে। সবটাই আল্লাহর করুণা।

সংগ্রাম এবং পরীক্ষার সবচেয়ে পাগলাটে দিকটা হলো—এগুলো আমাদের উন্নয়ন ও বড় হওয়ার নেপথ্যের কারণ। সামনে বিদ্যমান আগুনের কাছে আমাদের চরিত্রগুলো যেন নকল, কৃত্রিমতায় ঠাঁসা।
■ সেই সময়টা, যখন পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে, সাধারণ মানের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি ভর্তি হলেন। আর দেখলেন, আপনি সেখানে এত উন্নতি করেছেন যা কেউ কখনো আশা করেনি।
■ সেই সময়টা, যখন আপনি কাউকে ভালোবেসে ফেলেছেন, কিন্তু সেই মানুষটা আপনাকে হারাম সম্পর্কের প্রস্তাব দিল। অতঃপর আপনি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন, আর আল্লাহর সাথে সম্পর্কটা আরো ভালো করলেন।
■ সেই সময়টা, যখন আপনি খুব অসুস্থ ছিলেন। মানুষজন ভেবেছিল আপনি বুঝি মরেই গেছেন। কিন্তু আপনি সুস্থ হলেন। কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়ে ফিরে আসলেন।
■ সেই সময়টা, যখন আপনি কোনো ব্যবসায়তে আপনার মূল্যবান সময়, অর্থ, শ্রম ব্যয় করলেন, কিন্তু সেটা কাজ করল না। এরপর আপনি নতুন আরেকটা ব্যবসায় শুরু করলেন। আর বুঝে গেলেন আপনার জন্য কোন ব্যবসায়টা সঠিক। আপনার বুদ্ধিমত্তা যে মিথ্যা বলছিল সেটা বুঝতেও আপনার আর বাকি নেই।

এর ক্রমধারাটা এরকম; ব্যর্থ পরিকল্পনা -> নতুন দায়িত্ব -> অবস্থার পরিবর্তন

ভাবনার খোরাক: নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা করুন। কতবার আপনি পরীক্ষায় পড়েছেন? ফলাফলস্বরূপ নিজেকে আরো শক্তিশালী হতে দেখেছেন?

প্রায়ই আমরা এই চ্যালেঞ্জগুলো প্রতিহত করি। এগুলোকে আমরা ভয় পাই। এসব পরিহার করতে আপ্রাণ চেষ্টা করি। যখন পরিহার করতে পারি না, তখন সেগুলোকে তাড়িয়ে দেই। আমরা পালিয়ে বাঁচতে চাই, নিজেদের লুকিয়ে রাখি। আমি জানি, কেননা আমিও এসব করেছি। নিজের কমফোর্ট জোন থেকে আমি বের হতে চাইনি। তাহলে কোন জিনিসটা আমাকে সামনে টেনে নিয়ে আসল?

কমফোর্ট জোন ও নফস:
"গিরগিটি মস্তিষ্ক হলো সব কিছুর মূল"-সেথ গডিন

কমফোর্ট জোন এমন একটা অবস্থান-যেখানে সব কিছু পরিচিত, হাতের নাগালে এবং নিরাপদ। এখানে কোনো অদ্ভুত কাজ নেই, কোনো কঠিন পরীক্ষা নেই, আর না আছে কোনো হুমকি। কমফোর্ট জোন হলো সেটা-যেখানে আমরা অধিকাংশি থাকতে চাই, নিজেদের কম্বলে মুড়িয়ে নিই, চকলেট খেতে খেতে নেটফ্লিক্স দেখি। এই জায়গাটাতেই আমরা অনেকে দুর্বল কিংবা স্থির হয়ে পড়ে থাকি, নয়তো দূরে সটকে পড়ি। কেননা, কমফোর্ট জোন আমাদের ঘুম পাড়ানি গান শোনায়-যতক্ষণ আমরা এভাবে থাকব, ততক্ষণ সব ঠিক থাকবে; সহজ ও নিরাপদ।

আমি প্রায়ই ভেবে অবাক হতাম-কেন আমাদের অনেকে প্রতিকূলতা ও পরিবর্তন-গুলোকে আলিঙ্গন করে নেয়। লক্ষ্য, পরিকল্পনা এবং স্বপ্নের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। তবে আমরা কেন ঝুঁকি ও সম্ভাব্য ব্যর্থতার ভয়ে চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া হতে বিরত থাকি। কেন অধিকাংশ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ভালোবাসে আর বাকিরা সতর্কতার সাথে এড়িয়ে যায়? কেন অনেকে নিজেদের সবটা দিয়ে কাজে লেগে পড়ি, আর বাকিরা যা আছে তা নিয়ে সুখী হই? আপাতদৃষ্টিতে, আমাদের সবার মধ্যেই এই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই বিদ্যমান। সেই 'গিরগিটি মস্তিষ্ক' কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কেরই একটা অংশ, যার মাথাব্যথা কেবল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। এটা মূলত ভয় এবং অনাগ্রহের দ্বারা অনুপ্রাণিত।

ডা. যোসেফ ট্রোঙ্কেল এর মতে (সাইকোলজি টুডে থেকে), "লড়াই, ওড়া, খাওয়ানো, ভয়, চুপসে যাওয়া ইত্যাদি হলো এর কার্যকলাপ।” এক কথায় বললে, আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো। তাহলে, গিরগিটি মস্তিষ্কের আরেক নাম আমরা বলতে পারি-নফস; ওরফে অহমিকা। এটা আমাদের ভেতরকার সেই স্বার্থপর দিক-যা, যেকোনো মূল্যে আরামে থাকতে চায়, অতিরিক্ত কাজ করতে চায় না এবং আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য যা করা দরকার সব করে।

আপনার নফসকে পরখ করুন:

নফস হলো সকল প্রতিবন্ধকতার মূল। সেটা হোক আপনার পরিবর্তন, বেড়ে ওঠা কিংবা চেষ্টা করা। কেননা, পরিবর্তন বা বড় হওয়ার ব্যাপারটা সবসময় সুখকর হয় না। তার জন্য কষ্ট করতে হয়, কাজ করতে হয়। আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গিয়ে সহজ কাজের বদলে কঠিন কাজটা বেছে নিতে হয়। যত কষ্টই হোক না কেন, নিজের নফসকে পরখ করা, তাকে সঠিক কাজটা করতে বাধ্য করা-জিহাদের নামান্তর।

আত্মপ্রকাশের মানে, বাছাই করা—উদাসীনতা না কি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ? আশা না কি আকাঙ্ক্ষা? বেড়ে ওঠা না কি স্থির থাকা? আমাদেরকে অবশ্যই নিজের নফসকে জব্দ করতে হবে, ভয়কে জয় করতে হবে। কেননা, বেড়ে ওঠা, পরিবর্তন, আনন্দ, বেদনাময় যে জীবন—এর শুরুটা আপনার কমফোর্ট জোনের শেষপ্রান্তে। যতদিন আপনি নিজের আরামের জায়গায় থাকবেন, ততক্ষণ কখনোই সম্পূর্ণভাবে নিজেকে দেখাতে পারবেন না। এতে করে নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় হিম্মত ও ভেতরকার শক্তি অধরাই থাকবে।

কিন্তু আমি কীভাবে জানি? কারণ, যখন আমরা সবসময় সুরক্ষিত থাকতে চাই, বরাবরই ঝুঁকি এড়িয়ে চলি—তখন নিজের চেনা জায়গাটার বাহিরে যাওয়া আর সম্ভব হয় না। নিজেদের জন্য যে সীমানা মেপে রেখেছি, সেটার বাহিরেও যেতে পারি না। স্রোতে ভেসে থাকতে চাই না। এর মানে হলো, আমরা কোনোদিনও নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পারব না, কখনোই আরো একটু ভালো করতে পারব না। গত বছরের তুলনায়, নিজের বুদ্ধিমত্তাকে একটু বেশি বিকশিত করতে পারব না। মনে রাখবেন, প্রতিযোগিতাটা সবসময় নিজের সাথে; অন্য কারো সাথে নয়।

সুতরাং, যদি আপনি সাহস রাখার দাবি করেন, তাওয়াক্কুল রাখেন, কেবল আল্লাহর ওপর নির্ভর করেন—তবে আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি কাজ করুন, ফলাফল তিনি দেবেন—নিশ্চিত থাকুন। হেরে গেলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। হয়তো এটা অমূল্য একটা শিক্ষা, যা আপনাকে আরো দক্ষ করে তুলবে। অতঃপর আপনি বুঝবেন, কোন কাজটা আপনার জন্য, আর কোনটা নয়।

ভাবনার খোরাক: বর্তমানে আপনি কি নিজের কমফোর্ট জোনে আছেন? কোন ভয়টা আপনাকে আটকে রেখেছে—নিজেকে বাহির করতে, অন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে? এর মধ্যে কতগুলো ভয় সরাসরি আপনার নফসের সাথে সম্পর্কিত?

ফন্ট সাইজ
15px
17px