📄 ৩.২: স্বামীর জন্য নিজেকে প্রকাশ
একজন স্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করার মানে কী?
আবার বলছি, এর মানে হলো—উপস্থিত থাকা, মনোযোগী হওয়া। নিজের বৈবাহিক বন্ধনের ক্ষেত্রে বিনয়ী হওয়া, সততা বজায় রাখা। আমাদের অনেকের জন্য হয়তো কাজটা কঠিন। কেননা, আমাদের সবসময় বলা হয়েছে—ভালো স্ত্রী হওয়ার একটাই উপায়, যদি না আমরা আগে কষ্ট পেয়ে থাকি। ভালো স্ত্রী হওয়ার অভিনয় করা, সব দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করা, ভালো ভালো কথা বলা, কষ্ট পাওয়া হতে নিজেকে দূরে রাখা—আরো সহজ। এভাবেই, আমরা অন্যের বিচার আর সমালোচনা থেকে মুক্ত থাকি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সত্যিকার অর্থেই সম্পর্কটাতে সুখী? আমরা কি নিজের মতো আছি? এসব করার হিম্মত আমাদের আছে?
"তারা তোমাদের জন্য এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণের মতন।" (সুরা বাকারাহ: ১৮৭)
এই আয়াতটা সামনে আসলে আমাদের মনে পড়ে-পোশাক হলো সেই বস্তু যা আমাদের সুরক্ষা দেয়, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, মনে ভালোবাসা জন্মায়। স্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করার মানে-সবগুলো কাজ আন্তরিকতা ও সততার সাথে করা, একরাশ সন্তুষ্টি আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে করা।
যখনই আমরা বউ হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করব, যাদের পোশাকের সাথে তুলনা করা হয়েছে-আমরা নিজেকে মানিয়ে নিতে, পরিবর্তন করতে চেষ্টা করব। স্বামীর সাথে তাল মেলাতে আমাদেরও তার সাথে বড় হতে হবে, কিংবা প্রয়োজনে ছোটো হয়ে যেতে হবে।
পোশাকের কথাই ধরুন। গরমকালে আমাদের হালকা পোশাক পরতে হয়। শীতকালে আবার ভারী পোশাক পরি। কখনো আমাদের সরল এবং ঘরকুনো হয় থাকতে হয়। কখনো বা নিজ নিজ পরিস্থিতি এবং মনের অবস্থার ওপর নির্ভর করে হতে হয় অতিরঞ্জিত।
এভাবেই আমরা স্বামীর সাথে মানিয়ে নিতে পারব। যখন তার মাথায় কোনো খারাপ চিন্তা আসবে, আমরা তখন ভালো কথা বলব। যখন সে ডান মস্তিষ্কে আটকে থাকবে, তখন আমরা তার বাম মস্তিষ্ক হয়ে কাজ করব। যখন সে অসুস্থ হবে, তখন আমরা তার ঢাল হয়ে দাঁড়াব। যখন তার ঘুমানো প্রয়োজন, তখন আমরা তার বালিশ হয়ে যাব। তার কাছে নিজেকে নমনীয় ও আশ্বাসের জায়গা হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। কখনো নিজে দুর্বল হয়ে তার থেকে শক্তি নিতে হবে, কখনো তার থেকে উপযোগিতা নিতে হবে, কখনো বা নিজে যেচে পড়ে গিয়ে তার সাহায্য চাইতে হবে।
মোটকথা, আপনার বৈবাহিক জীবনে আত্মপ্রকাশ করা মানে-সম্পর্কটাতে সৎ থাকা। নিজের আসল সত্তাকে বের করা। উভয়ের জীবন গঠনে কর্মঠ ও মনোযোগী হওয়া।
📄 ৩.৩: সন্তানদের জন্য নিজেকে প্রকাশ
মাতৃত্বকে, দায়িত্ব এবং কাজের অনন্তকাল ধরে চলমান একটা রুটিন হিসেবে দেখা হয়। সময়, মনোযোগ আর শক্তির চাহিদার কারণে, দিনশেষে আমরা নিঃশেষ হয়ে যাই। সারাদিন ধরে ঘুমন্ত ব্যক্তির মতো চলতে বাধ্য হই। মনে দানা বাঁধে হতাশা এবং বিরক্তি। আমরা একটা নির্দিষ্ট গতিতে চলি ঠিকই, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে আমরা অচল। জীবনে আর কোনো আনন্দ, উচ্ছ্বাস, প্রত্যাশার জায়গা থাকে না। আমাদের সন্তানরাও সেটা বোঝে। তারা খেয়াল করে—মা সুখে নেই, সেজন্য তিনি সন্তানদের সময় না দিয়ে মোবাইলে ব্যস্ত। সেজন্যই তো তিনি ঘুমানোর সময় অমনোযোগী থাকেন, কথা বলার সময় সন্তানদের চোখের দিকে তাকান না।
আমি আপনাকে এখন লজ্জিত হতে বলছি না, আমি যেটা বলছি—মা হিসেবে নিজেকে প্রকাশ না করে আপনি বরং ভুল করছেন। দুনিয়া এবং আখিরাত দুটোই হারাচ্ছেন। সন্তানদের জন্য নিজেকে প্রকাশ করার পেছনে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য রাখতে হবে, ব্যাপারটাতে পূর্ণ মনোযোগী হতে হবে। শারীরিক এবং মানসিকভাবে কর্মঠ হওয়া জরুরি। মা হিসেবে আমাদের একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে—বংশ বৃদ্ধি করতে হবে, নিজেদের আচরণ উন্নত করতে হবে, দায়িত্ব বুঝে নিতে হবে, আমাদের আচরণে ও প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে।
মা হওয়া মানে—নিজের কাজগুলোকে কর্তব্য হিসেবে না নিয়ে বরং নিজেদের করণীয় হিসেবে দেখতে হবে।
📄 ৩.৪: পরিবারের জন্য নিজেকে প্রকাশ
একই জিনিস পরিবারের বেলাতেও খাটে—সম্পর্কগুলোর উদ্দেশ্য কী? নিজের কাজের দায়ভার নিচ্ছি তো? দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে সেসব দূর করছি? পরিবারের ঠিকঠাক খেয়াল রাখছি, যেভাবে তারা আমার খেয়াল রাখছে? না কি আমরা রোবটের মতো আচরণ করছি? দায়সারাভাবে কাজ করে আসল 'আমি'কে লুকাচ্ছি? সময় এসেছে এসব নিয়ে একফালি ভেবে দেখার।
📄 ৩.৫: স্বপ্নগুলোর জন্য নিজেকে প্রকাশ
আপনাদের মধ্যে এমন ক'জন আছেন, যারা স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিয়েছেন? পরিকল্পিত ভাবনাগুলোকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছেন? লক্ষ্যগুলো হাত ফসকে বেরিয়ে যেতে দিয়েছেন?
আমি এমন অনেক বোনের খবর জানি, যাদের হৃদমাজারে ছিল বিবিধ স্বপ্নের আবাস। তন্মধ্যে কেউ কুরআন হিফজ করতে চেয়েছেন তো কেউ সন্তানের হোমস্কুলিং-এর স্বপ্ন দেখেছেন। পক্ষান্তরে কেউ একটা ব্যবসায় শুরু করতে চেয়েছেন, তো কেউ আবার হতে চেয়েছেন প্রচণ্ড ভ্রমণপিয়াসি। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন কিংবা একটা বই লিখা অথবা দাতব্য সংস্থা স্থাপন-এই ফর্দের যেন অন্ত নেই।
কিন্তু, নিজের স্বপ্নগুলোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচা আদতে এতটা সহজ নয়। বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং চারপাশের মানুষগুলো বারবার আপনাকে এটা স্মরণ করিয়ে দিবে যে, আপনার স্বপ্নগুলো নিতান্তই অবাস্তব, নিরেট আকাশকুসুম ভাবনা। আর সেই স্বপ্নগুলো সাধন করা যে একেবারেই অসম্ভব, এটাই আপনাকে তারা পইপই করে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইবে। তাই নিজের স্বপ্নগুলোর জন্য বাঁচতে হলে, সর্বপ্রথম তাদের যথার্থতা আপনাকে মেনে নিতে হবে।
নিজের স্বপ্নগুলোর জন্য আপনি বাঁচবেন কেননা আপনার সেই স্বপ্নগুলো মহা মূল্যবান। আশারাজি পূরণ করতে ব্যয়িত আপনার মূল্যবান সময় কিংবা শ্রম, কোনোটাই বৃথা যাচ্ছে না। আরো একটুখানি ভালো কিছু করা কিংবা অধিক অর্জনের সক্ষমতা অথবা আরো বেশি উন্নতি করার এই যে অদম্য ইচ্ছে-এই ব্যাপারগুলোকে সম্মান করুন। মোদ্দাকথা, খোদ নিজেকে সম্মান দিতে শিখুন।
তাই সময় এসেছে নিজের স্বপ্নগুলোর জন্য বাঁচার নিমিত্তে এখনই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হোন। আর সে-মতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন, যেন সেই চিরসবুজ স্বপ্নগুলো অনায়েসে বাস্তবায়িত হয়।
ভাবনার খোরাক: আপনি অন্তরে কোন স্বপ্নের লালন করছেন? ভবিষ্যতে তা নিয়ে কী ভাবছেন? কোন পরিকল্পনাটা সত্যি হওয়ার জন্য মনে মনে সেটার আশা করছেন?