📄 অধ্যায়-২: আত্মপ্রকাশ মানে কী?
মাঝে মাঝে, কোনো বিষয়কে তার ঠিক উলটোটা দিয়ে সহজেই বোঝানো যায়। এখানে আত্মপ্রকাশের বিপরীত হলো-মুখোশ পরে থাকা, হরেক চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করা। যেমন ধরুন,
■ এমন একজন সেজে থাকা, যেটা আদতে আপনি না।
■ আপন মানুষগুলোর সামনে নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ না করা।
■ বিরক্তি সহকারে জীবনের দায়-দায়িত্বগুলো পালন করা।
■ নিজেকে নিপীড়িত মনে করা।
■ একটা আলাদা মুখোশ পরে থাকা।
■ মোটের ওপর, নিজের আসল সত্তাকে লুকিয়ে রাখা।
কেন আমরা এভাবে নিজেকে আড়াল করে রাখি, তার বেশ কিছু কারণ আছে। আমরা অন্যের মন্তব্যকে ভয় পাই, সমালোচনা বা নিন্দা মেনে নিতে পারি না। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা হারতে ভয় পাই। এই ভয়টাই আমাদের নিজের আসল সত্তাকে বাহিরে আনতে দেয় না। জীবনে আশাবাদী হতে ও হিম্মতের সাথে নিজেকে প্রমাণ করতে পদে পদে বাধা দেয়।
আত্মপ্রকাশের ব্যাপারটা অবশ্য ভিন্ন। আত্মপ্রকাশ করা মানে শারীরিক ও মানসিক-ভাবে নিজের অবস্থান জানান দেওয়া, কাজের দায়িত্ব নেওয়া, মালিকানা গ্রহণ করা। আপনি যে-ই চরিত্রেই থাকেন না কেন, সমস্ত কমতির ঊর্ধ্বে গিয়ে আপনার আসল সত্তাকে চেনানো। নিজের জীবন এবং উদ্দেশ্যের সাথে ওয়াদাবদ্ধ থাকা। আপনাকে যে কারণে সৃষ্টি করা হয়েছে, সেটা সঠিকভাবে পালন করা। শো-আপ তথা আত্মপ্রকাশ বলতে আমি বুঝি-একটা পদক্ষেপ, একটা মনোভাব। মোদ্দাকথা, আপন জীবন গল্পের নায়ক হওয়া।
আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে, যারা একটা মধ্যমমানের জীবনযাপন করে। তারা জীবনের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে হিমশিম খায়, কিছু অর্জন করতে পারে না, চারপাশে কোনো প্রভাব ফেলতেও হয় ব্যর্থ। এর বড় একটা কারণ হলো— বেশিরভাগ মানুষ কঠিন কাজটার তুলনায় সহজ কাজটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। দায়িত্ব নেওয়ার বদলে বাহানা বানাতে ওস্তাদ। হিরো হওয়ার বদলে আজীবন মজলুম হয়েই থাকতে ভালোবাসে।
আমরা অধিকাংশি ঘুমের ঘোরে জীবনটা কাটিয়ে দেই। এটা বুঝি যে, জীবনে আমাদের আরো কিছু করার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই অনুপ্রেরণা বা জ্ঞান আমাদের মধ্যে থাকে না যে, আমরা আর কী কী করতে পারি। কিংবা আমরা এটা বলে নিজেদের বুঝ দেই—একদিন সবটা পরিবর্তন করে ফেলব, একদিন আমরা বাহিরে পা রাখব, একদিন কাজগুলো ভিন্নভাবে করব। আফসোসের বিষয় হলো, ঐ ‘একদিন’-টা স্রেফ আমাদের একটা কল্পনা। এটা এমন এক খোয়াব যা অজানা ভবিষ্যতের এক কাল্পনিক সময়সীমা। আমরা বলি—একদিন আমরা এটা করব, ওটা করব। অনেকটা এরকম বলা—আমি জানি আমার এটা করার যোগ্যতা আছে। কিন্তু আমি করব না। কারণ, এতে আমার কিছু যায়-আসে না।
সত্যিই আপনার কিছু যায়-আসে না? কিন্তু এটা তো আপনার জীবন। আর জীবন তো একটাই। এটাকে আপনি সফল করবেন না কি বিফল—পুরোটাই আপনার মর্জি। আপনার নষ্ট করা প্রতিটা ঘণ্টা, অপচয় করা প্রতিটা দিন, উদ্দেশ্যহীনভাবে কাটানো প্রতিটা সপ্তাহ, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটানো প্রতিটা মাস—আপনার জন্য বরাদ্দকৃত সময়েরই অংশ। এই সময়টা আপনি কীভাবে ব্যয় করতে চান? জীবনের শেষ দিনগুলোতে কেমন গল্প অন্যদের শোনাতে চান? নিজের জন্য কী কীর্তিগাথা রেখে যাচ্ছেন?
আপনাদের মধ্যে অপরাধবোধ জাগানোর জন্য কথাগুলো বলছি না। আমি জানি, অলসতার প্রতি আমাদের কেমন আকর্ষণ, তালবাহানার শক্তি কতখানি। কিন্তু আমি নিজের ও আপনাদের ক্ষেত্রে এসব মেনে নিতে নারাজ। আজ যদি আপনি খানিকটা পরিবর্তন না করেন, তবে সামনের সপ্তাহটা এ সপ্তাহের মতোই হবে। পরবর্তী বছরটাও এ বছরের মতোই কাটবে অনাড়ম্বরভাবে, হেলায়-ফেলায়। প্রিয় বোন আমার, একটু বুঝুন—আজ যদি আপনি নিজেকে প্রকাশ করার কোনো সিদ্ধান্ত না নেন, তবে হয়তো আর কখনোই নিতে পারবেন না। তাই এটার মুখোমুখি হোন।
কাজটা একদমই সহজ নয়, তাই না? যেখানে অধিকাংশ মানুষ অটো- পাইলট মোডে চলছে, সারাটা জীবন ঘুমিয়ে কাটাচ্ছে, সেখানে তো আরোই না। জানেন, এখানে ঘুমিয়ে কাটানো বলতে আমি আসলে কী বোঝাতে চাচ্ছি? এর মানে, সারাটা জীবন আমরা রোবটের মতো একটা গৎবাঁধা রুটিনেই কাটিয়ে দিচ্ছি। কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই জীবন শেষ করছি। ব্যাপারটা আমাদের জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রে হতে পারে—আত্মিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক কিংবা পেশাগত। প্রতিটা ক্ষেত্রেই মানুষ ঘুমিয়ে কাটায়।
এর মূল্য কিন্তু অনেক বেশি। আমি যখন আমাদের অধিকাংশের কথা ভাবি যারা অটো-পাইলটের জীবনযাপন করছে, ধূ ধূ মরুভূমির মতো আমি শুধু অপচয়ই দেখি—সম্ভাবনার অপচয়, সুযোগের অপচয়, জীবনের অপচয়। আমরা আর কতজন এভাবে বোবা আর বধির হয়ে দিন পার করব? আশেপাশের কাজগুলো কিংবা সম্পর্কগুলোর সাথে পুরোপুরি যুক্ত না হয়ে, জীবনযাপন করব? দুনিয়াকে বলে বেড়াচ্ছি—আমরা ভালো আছি, সব কিছু ঠিকঠাক মতো চলছে। অথচ ভেতরে ভেতরে আমরা প্রতিনিয়ত শেষ হয়ে যাচ্ছি। কতজন এভাবে নিজের চাহিদাকে কুরবান করে অন্যদের সাহায্য করব? নিজের ইচ্ছের ওপরে অন্যের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেব? অথচ আমরা নিজেদের স্বপ্নগুলো বুকের গহিনে কবর দিয়েছি, যেগুলো কখনো বলা হয়নি, কারো কাছে প্রকাশ করা হয়নি। আমরা কতজন নিজেদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ত্যাগ করেছি শুধু এই কারণে যে, আমরা ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়ানো, নিজেদের টেনে তোলার শক্তিটুকু আর নেই, তাই না?
হ্যাঁ, আমি জানি তাকদির আমাদের নিয়তি ঠিক করে। সুতরাং, আমাদের এই প্রশ্নটা করা উচিত নয়—যদি এমন হতো? কিন্তু আমি আপনাকে জিগ্যেস করতে চাই—আপনি জানেন আল্লাহ আপনার তাকদিরে কী লিখে রেখেছেন? আপনি কখনো নিজের ভবিষ্যৎ দেখেছেন? আল্লাহ আপনাকে একটা হতাশায়-ভরা জীবন দিয়েছেন—এটা বলার পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ আছে আপনার কাছে? তিনি আপনার জন্য সুখের, স্বাচ্ছন্দ্যের, তৃপ্তির একটি জীবন রেখেছেন—এটা অবিশ্বাস করার মতো কোনো বিশেষ কারণ আছে আপনার কাছে? বলুন, আছে?
তারপরও আমরা অধিকাংশি ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বলি, আল্লাহ আমার তাকদিরে এমনটাই লিখে রেখেছেন। কিন্তু জেনে রাখুন, প্রায় সময়ই এই কথাটা আমরা অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করি। সত্যটা আড়াল করার জন্যই আমরা কোনো কিছুতেই মাথা ঘামাতে চাই না। ঘুম থেকে জেগে এই সত্যটার মুখোমুখি হওয়ার- আমাদের কিছু করার আছে, অনেক কাজ করা বাকি, আমাদের মধ্যে যা আছে, তা দিয়েই ভালো কিছু করতে পারি-এটা আমাদের জন্য কষ্টকর। তারচেয়ে বরং ঘুমিয়ে, নিস্তেজভাবে জীবন কাটিয়ে দেওয়াই আমাদের কাছে আনন্দের।
কিন্তু কাহিনি কী জানেন, তাকদিরকে নিজের অসন্তুষ্টির অজুহাত হিসেবে দেখানোর চেয়েও বেশি কিছু আপনি করতে পারেন। যদি জীবনে আরো বেশি কিছু পেতে চান তবে আপনাকে আরো বেশি কাজ করতে হবে। জীবনটা অনেকটা এমন-যেমন কর্ম তেমন ফল। মহা-মহিম আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সুরা রাদ: ১১)
আয়াতটা এবার আপনাকে ভাবাচ্ছে, তাই না? যদি আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই, উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে চাই, ব্যাপারগুলোকে আরো ভালো করতে চাই-তাহলে আমাদের চলতে হবে, কাজ করতে হবে। এরপর না আমরা বিশ্বাস আর ভরসার মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা করতে পারি। যেমনটা হ্যাল এলরড তার চমৎকার বই দ্য মিরাকল মর্নিং-এ বলেছেন, "আপনাকে সেই মানুষটাই হতে হবে, যে মানুষটা আপনার হওয়া প্রয়োজন। যদি জীবনে কিছু পেতে চান, তবে সেই কাজগুলোই করুন, যা আপনার করা দরকার।”
সুতরাং, আমরা যদি সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ্যের একটা জীবন পেতে চাই, তবে আমাদেরকে অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে হবে। অধিকাংশ মানুষ যে কাজগুলো করছে, তার চেয়ে ভিন্ন কিছু, ভিন্নভাবে করতে হবে। যেমন, যদি আপনি বিশ্বাস বাড়াতে চান, জীবনে আরো বরকত আনতে চান, কিংবা অধিক ভালোবাসা, সুখ, অর্থপূরণ মুহূর্ত পেতে চান, অথবা কাজে পূর্ণ উদ্যমী হতে চান—তবে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাজ করার জায়গায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে। আপনার চালচলন, হাবভাবেও বিস্তর বদল আনা জরুরি।
মাঝে মাঝে আপনার খানিকটা অস্বস্তিবোধ হতে পারে। এমন মনে হতে পারে, আপনি স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাচ্ছেন। প্রায় সময়ই হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু মনে রাখবেন, “আত্মপ্রকাশের সিদ্ধান্ত একটা যাত্রার সূচনা। নিজেকে স্বীকার করা এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণের একটা সুন্দর যাত্রা। একটু অস্বস্তি লাগা স্বাভাবিক, তাই না? কিন্তু এখনই তো সময়। এখন না হলে আবার কখন? আপনি না হলে আর কে?” আজই সিদ্ধান্ত নিন-এই মধ্যমমানের জীবন থেকে আপনি বেরিয়ে আসবেন। এখনই কাজে নেমে পড়ুন। আর পেছনে পড়ে থাকা নয়, আর হেরে যাওয়া নয়, বরং আত্মপ্রকাশের সময় এখন。
আত্মপ্রকাশ: নবিজির একটি সুন্নাহ
আত্মপ্রকাশকে যদি আমরা এভাবে সংজ্ঞায়িত করি-নিজের দায়িত্বটা বুঝে নেওয়া, আপন কাজের জন্য দায়বদ্ধ হওয়া, অনেক কমতি থাকা সত্ত্বেও নিজেকে মেনে নেওয়া-তবে দেখব ইসলামের ইতিহাসে এর ভুঁড়ি ভুঁড়ি নজির আছে। গোটা সীরাত গ্রন্থেই এমন হাজারখানেক উদাহরণ আছে, যেখানে আমরা দেখি সহস্র প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নারী, পুরুষ, শিশুরা কীভাবে নিজেদের প্রকাশ করেছেন। যদিও অনেকের জীবনেই এমন কিছু স্বর্ণালি মুহূর্ত আছে, কিন্তু আমি শুধু শেষ নবি ও রাসুল সম্পর্কে বলতে চাচ্ছি।
নবিজির জীবনীর যে দিকটা আমার সবচেয়ে পছন্দের তা হলো, এটা খুব অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর গোটা জীবনজুড়ে এত এত পরীক্ষা আল্লাহ নিয়েছেন যে, খুব সহজেই তাঁকে মজলুম হিসেবে দেখানো যেত। আর এর যৌক্তিক কারণও ছিল যথেষ্ট। তাঁর জীবনের কিছু মর্মান্তিক ঘটনা দেখুন-এতিম হলেন; বয়সে বড় একজন নারীকে বিয়ে করলেন-যিনি একবার তালাকপ্রাপ্তা, অন্যবার বিধবা; নিজ বিশ্বাসের কারণে অপমানিত ও নির্যাতিত হয়েছেন; শহর থেকে বের করে নির্বাসনে দেওয়া হলো; আপন মানুষদের মৃত্যু দেখলেন-বাদ যায়নি নিজের সন্তানেরাও, এমনকি বংশের নাম রাখার মতো কোনো পুত্রও জীবিত ছিল না; ছিলেন দরিদ্র; ছিল গোটা উম্মতের ভার যার কাঁধে।
অথচ দেখুন, নবিজির জীবনটা আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে কতটা অনুপ্রেরণাদায়ক— নিজের মনকে অনুসরণ করা; সঠিক কাজটা করা, যদিও তার ফল ভোগ করতে হয়; ভয় এবং সন্দেহকে দূর করে মন খুলে অন্যকে ভালোবাসা এবং দয়া দেখানো; বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও বিনয়ী হওয়া। শত প্রতিকূলতার পরও নবিজি সা. আত্মপ্রকাশ করেছেন। কেবল নিজের জীবনের নয় বরং গোটা মুসলিম উম্মতের নায়ক হয়েছেন। আজ আমি যা আছি, তা কখনোই হতে পারতাম না; আজ আমি যা বিশ্বাস করি, তা কখনোই করতাম না; আজ আমি যা জানি, তা কখনোই জানতাম না—যদি তিনি এই যাত্রাটা শুরু না করতেন, নিজের অবস্থান জানান না দিতেন, যা করার দরকার ছিল তা না করতেন।
আমি আরো একজন নারীর গল্প আপনাদের বলতে চাই। যার নবি-পরিবারের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না। সে ছিল না কোনো ক্ষমতাবান নারী। কিন্তু তার গল্পটা খুবই সাহসিকতাপূর্ণ এবং সততারও। তার আত্মপ্রকাশের ঘটনাটা এখনও রক্ষিত আছে, যা হয়ে গেছে ইসলামের অনুশাসনের একটা অংশ।
গল্পটা একটা মেয়ের, যে দুধের ব্যবসায় তার মাকে সাহায্য করছিল। লোভে পড়ে মা তাকে বলল, দুধে একটু জল মেশাতে। যেন পরিমাণে বেশি হয়, লাভও বেশি পাওয়া যায়। মেয়েটা সাথে সাথে তা নাকচ করে দিল। সাথে খলিফা উমর ইবনে খাত্তাবের নিষেধাজ্ঞার কথাও মনে করিয়ে দিল। মা কন্যাকে তিরস্কার করে বলল, “খলিফা এখন কোথায়? তিনি তো আমাদের দেখছেন না।” কন্যার সোজাসাপটা জবাব, “খলিফা না দেখুক। আল্লাহ তো দেখছেন!”
জানেন, এই গল্পটা আমি এখানে কেন বললাম? যদি আমরা পরবর্তী প্রজন্মের ভালোর জন্য নিজেকে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিই, কিংবা চুপচাপ ঘরের এক কোণে পড়ে রই—এটা প্রভাব ফেলে। একটা পরিবর্তন আনে, আর সবটা হিসাব করা হয়।
📄 যাত্রা অন্তিমে
বইয়ের শুরুতেই আমি বলেছি, আত্মপ্রকাশ নবিজি সা.-এর একটি সুন্নাহ। এবার আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন, আমি যা যা বলেছি তার সব কয়টা বৈশিষ্ট্য নবিজির মধ্যে ছিল—লক্ষ্যের প্রতি আন্তরিকতা, ইতিবাচকতা, সন্তুষ্টি, সাহসিকতা, সততা।
এখন আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আপনাকে কী করতে হবে? আপনাকে উঠে দাঁড়াতে হবে এবং আল্লাহ আপনার জয়ের জন্য যা যা চ্যালেঞ্জ রেখেছেন সেসব মোকাবিলা করতে হবে। এটা মনে রাখবেন, আল্লাহ সবসময় সাথে আছেন। আপনাকে আপনার গল্পের নায়ক হিসেবেই দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে।
আমাদের সবার জীবনেই উত্থানপতন আছে। হিরোরাও ব্যতিক্রম নয়। ইসলামের চারজন মহৎ নারীর কথাই ভাবুন—খাদিজা, আয়িশাহ, আসমা, ফাতিমা। কারো জীবনটাই সুখকর ছিল না। কেউই সবকিছু চাওয়ামাত্র পাননি। বরং, প্রতিনিয়ত তাঁদের পরীক্ষা করা হয়েছে।
• তালাকপ্রাপ্তা • বিধবা • বন্ধ্যত্ব • দরিদ্রা • অন্যায় • হারানো
তারপরও, আমরা তাদের মজলুম হিসেবে জানি না, বরং আমরা তাদের আদর্শ হিসেবে মনে রাখি। আপনিও তার ব্যতিক্রম নন। তাই নিজেকে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিন। সে-ই নায়কটা হোন, যার জন্য আপনার জন্ম হয়েছে।
একটি শেষ স্বপ্ন দেখুন:
কল্পনা করুন, আপনার চারপাশে ঘিরে বসেছে সন্তান, নাতিপুতিরা। আপনি তাদের নিজের জীবনের গল্প বলছেন... কোন গল্পটা বলবেন তাদের?
■ জীবনের বাধাবিপত্তিগুলো পার হয়ে কী শিখলেন, সেটা বলবেন?
■ আল্লাহর ওপর নির্ভর করে কীভাবে প্রতিকূলতাকে কাটালেন, সেটা বলবেন?
■ যখন ইমান নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল, তখনও আপনি বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ আপনার ভালো চান—সেই গল্পটা বলবেন?
■ প্রচণ্ড কঠিন মুহূর্তেও আপনার অন্তরের ভেতর ভরসা ছিল—আল্লাহ আপনাকে ভেঙেচুরে দেবার জন্য এই পরীক্ষায় ফেলেননি, সেটা বলবেন?
এই জীবনটা আপনাকে এমনি এমনি শেষ করে দেওয়ার জন্য তৈরি না। বরং আপনাকে নতুন করে তৈরি করতে, আরো বেশি সুন্দর, আরো বেশি প্রাণবন্ত করতে সৃষ্ট। আপনাকে এমন এক নায়ক বানাতে, যা আপনি কোনোদিন কল্পনাও করেননি। আপনি তাদের দেখাবেন, কীভাবে নিজের জীবনের নায়ক হতে হয়?
■ পড়ে গেলে আবার কীভাবে উঠে দাঁড়াতে হয়?
■ কীভাবে আল্লাহকে ডাকতে হয়?
■ কীভাবে ভরসা করতে হয়?
■ কীভাবে নিজেকে বিশ্বাস করা যায়?
■ কীভাবে হিরো হওয়া যায়?
আমি জানি, আপনি করবেন ইন শা আল্লাহ। আদর্শ মুসলিমাহ হওয়ার এই যাত্রায়, মহীয়ান আল্লাহ আপনার সহায় হোন। যে অবদান সমাজে রাখার জন্য আপনার জন্ম হয়েছে, সেটা পূর্ণ করার তাওফিক দিন। আমিন।