📄 অধ্যায়-১: সব হারিয়ে আমি
দাম্পত্য জীবনের চৌদ্দ বছর প্রায় শেষ। স্বামী-স্ত্রী সিদ্ধান্ত নিলাম—বাচ্চাদের নিয়ে উমরাহ করতে যাব। ভেবেছিলাম এটাও হয়তো একসাথে কাটানো আরেকটা সুন্দর মুহূর্ত হবে। সবাই মিলে খুব মজা করব, আবার ইবাদতও হবে। কিন্তু তা হয়নি। এখনও আমার মনে হয়, সেটা ছিল মূলত আমার জীবনে পতনের সূচনা।
সুলাইমান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। বড় ছেলেটা আর তার বাবার মধ্যে খানিকটা মনোমালিন্যও শুরু হয়েছে ততদিনে। পিতা-পুত্রের সম্পর্কটা রীতিমতো ভেঙে গিয়েছিল, ঠিক করার কোনো সম্ভাবনাই দেখছিলাম না। আমি দেখলাম, এই ব্যাপারটা সুলাইমানের ওপর বেশ ভারী হয়ে পড়ছিল। কাজের চাপও ছিল খুব। এতটা অসুস্থ, বিচলিত আমি তাকে আগে কখনো দেখিনি।
একদিন সন্ধ্যেবেলা, এক বান্ধবীর সাথে বাহিরে খেতে গেলাম। সুলাইমান আর বাচ্চারা বাড়িতেই ছিল। আমার ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে ছোটো মেয়েটাকে ঘুম পাড়াতে লাগলাম, ওর বয়স তখন দুই। সাথে নিজেই কখন ঘুমিয়ে গেলাম, টেরও পাইনি। পরদিন সকালবেলা। বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙল। ওরা কেঁদে কেঁদে বলছিল—বাবা ঘুম থেকে উঠছে না।
আমি দৌড়ে শোবার ঘরে গেলাম। গিয়ে দেখি সুলাইমান একপাশে কাত হয়ে শুয়ে আছে। চোখ দুটো অর্ধেক খোলা। ঠোঁট বেয়ে অদ্ভুত একধরনের তরল গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক কী পরিমাণ ভয় পেয়েছিলাম সেদিন, সেটা বলে বোঝাতে পারব না। শুধু বলব, সেদিন রাতে জানতে পেরেছিলাম সুলাইমান স্ট্রোক করেছে। মস্তিষ্ক এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, এখন সে কোমায় আছে। ডাক্তাররা খুব একটা আশা দিলেন না। তাদের মতে, সুলাইমান আর নেই। শরীরটাই শুধু আছে।
সেই দিনটার কথা মনে পড়লে আমার এখনও কান্না পায়। শাশুড়িকে কল দিয়ে বলতে হবে—আপনার ছোটো ছেলে কোমায় আছে। জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর মুহূর্ত ছিল সেটা, বড়ই হৃদয়বিদারক। পরের দুই সপ্তাহ আমরা রাতদিন সুলাইমানের সেবা করেছি। কিন্তু, তার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। তারপরও আমি প্রতিদিন তার পাশে বসতাম, কথা বলতাম, তিলাওয়াত করতাম, দুআ করতাম। পরিদর্শনের সময়টাতে যেন মানুষের ঢল নামত। অনলাইন-অফলাইন, দুই জায়গা থেকেই মানুষের এত ভালোবাসা, এত যত্ন, এত সমর্থন পেয়েছিলাম, যা বর্ণনা করা মুশকিল। যারা সেই খারাপ সময়টাতে আমাদের জন্য দুআ করেছেন, হাসপাতালে আমাদের দেখতে এসেছেন, আমাদের জন্য রান্না করে পাঠিয়েছেন, প্রতিটা মুহূর্তে আমাদের পাশে ছিলেন—তাদের সবার জন্য আমি প্রতিদিন দুআ করি।
এক বোন তো আমার সন্তানদের তার বাড়িতে নিয়ে রেখেছিল, যেন তাদের পড়ালেখার ক্ষতি না হয়। আরেক বোন, যাকে আমি ঠিকমতো জানতামও না, সে তার ফ্ল্যাটে আমাকে সপ্তাহখানেক থাকতে দিয়েছিল। কেননা তার বাসাটা হাসপাতালের কাছেই ছিল। ভাই-বোন, পরিবারের সদস্যরা, সহকর্মীরা, কর্মচারীরা বিদেশ থেকে কায়রোতে চলে এসেছিল আমাদের সাহায্য করতে। এ সবকিছুর জন্য আমি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকব।
সেসময় আমি লিখেছিলাম:
শব্দেরা পানির মতো: কখনো কখনো অবিরাম বয়ে চলে, পাথরের গা বেয়ে অবিরত।
কখনো কখনো ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে, বহু বাধা পেরিয়ে, বিন্দু বিন্দু করে যদবধি ফিরে না পায় নতুন স্রোত!
অতঃপর
শব্দেরা রূপ নেয় জলপ্রপাতে ছুটে চলে প্রবল বেগে একরাশ মুগ্ধতা জমিয়ে ধরণির বুকে মিশে শব্দের তালে তালে অশ্রুধারায় ভেসে।
অতি প্রবল সেই স্রোতধারা ঠিক যেন ঝরনাধারা
আমার অধীরতা ভাসিয়ে নিতে
জমানো নীলব্যথা ভুলিয়ে দিতে
পবিত্র করতে নির্মল করতে
আমায় পুনরায় পরিশুদ্ধ করতে।
মনোহারী শব্দেরা ভেসে আসে
যদবধি মিনিটের কাঁটা ঘণ্টায় পৌঁছে
এবং আমার হাত আবদ্ধ তোমার হাতে।
বাকারা আছে সুরক্ষা দানে, কাহাফ আজ শুক্রবার দিনে
দুটো সপ্তাহ গেল ফুরিয়ে, মনে পড়ে তোমায় অনুক্ষণে।
দুই সপ্তাহ পর, আমি বাড়ি ফিরে গেলাম। গিয়েই ছেলের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। কেননা, নিজের ঘরে গেলেই আমার সুলাইমানের কথা মনে পড়ত। সেদিন ফজরের আগে একটা কল আসলো। অনেক চেষ্টা করেও আমি নাম্বারটা চিনতে পারলাম না। কলটা রিসিভ করতেই পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। ডাক্তার কল করেছেন। জীবনের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তটার জন্য আমি নিজেকে আগেই তৈরি করে রেখেছিলাম।
অবশেষে সেই খারাপ মুহূর্তটা আসলো। আমার প্রাণপ্রিয় স্বামীর হৃদপিণ্ড কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা প্রায় মিনিট ত্রিশ যাবৎ সিপিআর দিয়ে চেষ্টা করেছে। কিন্তু যা হওয়ার হয়ে গেছে। কণ্ঠটা খাদে নামিয়ে কোনো মতে জবাব দিলাম- জাযাকাল্লাহু খাইরান। এরপর এক লাফে বিছানা থেকে নেমে সিজদাহতে লুটিয়ে পড়লাম। আলহামদুলিল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর!
এই মুহূর্তটা নিয়ে আমি সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম। পাশাপাশি এটার জন্য দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুতও করছিলাম। সেই দিন থেকে, যেদিন ঐ বোনটার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। একবার হাসপাতালে এক বোন এসেছিল আমাদের দেখতে। সেদিন সে আমাকে একটা গল্প বলল। গল্পটা এক দম্পতিকে ঘিরে, যাদের সন্তানটা প্রচণ্ড অসুস্থ ছিল। যতবার তারা হাসপাতালে আসত, ততবারই ডাক্তারকে নতুন নতুন কারণ বলতে হতো—কেন তাদের সন্তানটা এখনও সুস্থ হচ্ছে না। আর প্রত্যেকবারই স্বামীটা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলত—'ভুলে যেও না।' বেশ কিছুদিন ধরে এমনটা চলল। ডাক্তার খারাপ কিছুর সম্ভাবনা করত, স্বামীটা স্ত্রীকে ভুলে না যাওয়ার কথা বলত। অতঃপর একদিন সেই সংবাদটা আসলো। যেটা শুনে যেকোনো বাবা-মায়ের হৃদয় খানখান হয়ে যাওয়ার কথা—তাদের সন্তান আর বেঁচে নেই। এ খবর শুনে লোকটা তার স্ত্রীর দিলে তাকিয়ে বলল—এখনি... এরপর দুজনেই সিজদাহয় গিয়ে রবের শুকরিয়া আদায় করল।
এটা দেখে, হাসপাতালের কর্মীরা বেশ অবাক হলো। কেউ কেউ তো ভয়ও পেয়েছিল রীতিমতো। এমন একটা সংবাদ শুনে মানুষজন চিৎকার করে, কাঁদে, শোক পালন করে। অথচ তারা সিজদাহ দিয়ে সেটা উৎযাপন করছে? হাসপাতালের কর্মীরা সেই দম্পতিকে জিগ্যেস করল—এমনটা কেন করলেন? এরপর দুজনে সবটা খুলে বলল। তাদের সন্তানের জীবনের জন্য তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছে। মেয়েটা তাদের জীবনে সুখ বয়ে এনেছিল, তাদের সাথে ভালোবাসা ভাগ করেছিল। এত বছর ধরে তাকে ভালোবাসার, আদর করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য—আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত না?
ঘটনাটা শোনার পর, আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম, এমন কিছু শুনলে আমি কী করব। আর সেটাই এখন আমি করেছি। যে ব্যক্তির সাথে আপনি পনের বছর সংসার করেছেন, যিনি আপনার পাঁচ সন্তানের বাবা, যিনি আপনাকে সুরক্ষা দিয়েছেন, আপনার মধ্যে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে, যিনি আপনার সবচেয়ে ভালো বন্ধু—আচানক তিনি আর এই দুনিয়াতে নেই! এটা যে কত বড় ক্ষতি, সেটা আমি আপনাদের বলে বোঝাতে পারব না। পুরো দুনিয়ার ভিত যেন নড়বড়ে হয়ে গেল, সবটা কেমন চোখের পলকেই পালটে গেল। দুনিয়াতে আপনার অবস্থান, পরিচয়, দায়িত্ব, ভবিষ্যৎ সবটা যেন প্রশ্নবিদ্ধ। আবার শোক পালনের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আপনাকে ইদ্দতও পালন করতে হবে—যেটা পরীক্ষার মধ্যে আরেকটা পরীক্ষা।
■ আল্লাহ আমার কাছে কী চান?
■ কেন তিনি আমাকে এই পরীক্ষায় ফেললেন?
■ আমি এখন কী করব?
খেয়াল করে দেখুন, মাঝে মাঝে পরীক্ষাগুলো আসে অকস্মাৎ, ঝোড়ো বাতাসের মতো। প্রথমে আপনি ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে যান। এরপর সেটা মেনে নেন, কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করেন। নতুন বাস্তবতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে থাকেন। কিন্তু প্রথম ধাক্কাটার পর, আরো কিছু ধাক্কা আসা এখনও বাকি। এরপরের পরীক্ষা-গুলো নদীর ঢেউয়ের মতো ক্রমান্বয়ে আসতেই থাকে। প্রথমদিকের পরীক্ষাগুলো হয় ছোটো ছোটো, সহনীয় পর্যায়ের। যা ধীরে ধীরে পরিণত হয় অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পাহাড়ে। পরীক্ষার হাত প্রসারিত হতে থাকে। অতঃপর একসময় থাবা বসিয়ে দেয় আপনার দিনরাতে। কয়েক সপ্তাহ ধরে কিংবা মাস নাগাদ চলতেই থাকে এসব। আপনি জানেন না এগুলো কখন শেষ হবে, কবে তাদের খপ্পর থেকে মুক্তি পাবেন। তখন আপনি অনুধাবন করেন-প্রথম ধাক্কাটার জন্য আপনি তৈরি থাকলেও, পরেরগুলোর জন্য মোটেও প্রস্তুত নন। এমনটাই হয়, যখন আপনি জীবনসঙ্গীকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন।
ইদ্দতের সময়টাও পীড়াদায়ক। বলে রাখা ভালো, ইদ্দত হলো-কোনো বিধবার, তার স্বামীর মৃত্যুতে শোক পালনের একটি নির্দিষ্ট সময়। একদিকে, আপনাকে বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে হবে, তাদের ভরণপোষণের ফিকির করতে হবে। এসব দায়িত্ব, চিন্তা ও চাহিদাগুলো বাস্তবসম্মত। এগুলো অবশ্যই আপনার চার মাস দশ দিন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। এই জায়গাটাতেই আপনি বাধ্য হন-পরিকল্পনা করতে, সামনে এগোতে, দুনিয়ার মুখোমুখি হতে। স্কুল চালানো, ঘুমের আগে বাচ্চাদের গল্প বলা কিংবা সময়ের আগে কাজ শেষ করার মতো ব্যাপারগুলো, মনের ব্যথা ভুলতে খুব কাজে দেয়।
অন্যদিকে, ইদ্দতের ব্যাপারটা আপনাকে এসব করতে বাধা দেয়। আপনি এখনই দুনিয়ার মুখোমুখি হতে পারবেন না। অবশ্যই আপনাকে থামতে হবে, চিন্তা করতে হবে। আপনি একজন বিধবা, এই সত্যটা মেনে নিতে হবে। কষ্ট, একাকিত্ব, রাগ, ভয়, শূন্যতা সবটা কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন। আপনাকে এসবের মোকাবিলা করতে হবে, নাহয় এগুলো আপনাকে ভেঙেচুরে দিবে। বারবার স্বামীর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো মনে করিয়ে দিবে-শেষবারের মতো ক্ষমা চাওয়া, একটা শেষ ওয়াদা, একটা শেষ চুমো। আপনাকে মানতে হবে যে সবটা আল্লাহর পরিকল্পনা। যেহেতু এটা আল্লাহর ইচ্ছে, তার মানে এর মধ্যে আপনার জন্য কল্যাণকর কিছু রয়েছে। সেটা কী? তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়ার, অন্তরটা পরিশুদ্ধ করার, অভ্যাস পরিবর্তন করার একটা সুযোগ আপনি পাচ্ছেন। ইদ্দত শেষে আপনার নতুন জীবনের সূচনা হবে, যেমনটা গুটি থেকে বের হওয়ার পর একটা প্রজাপতির হয়-নবজন্ম, নতুন বেশ, অপূর্ব সৌন্দর্য।
এটা ঠিক, আমি প্রচুর কেঁদেছি। আমার ওজন কমে গিয়েছিল, গায়েব হয়েছিল রাতের ঘুমও। কিন্তু কোনো একটা কারণে আমার মনে হতো—আমি তো বেঁচে আছি। আমি এখনও দুপায়ে দাঁড়ানো। অবশ্যই এটার কোনো না কোনো কারণ আছে। একটা স্বর্গীয় কারণ। মানুষজন প্রায়ই আমাকে জিগ্যেস করে—তুমি কীভাবে নিজেকে সামলে নিলে? শোক কাটিয়ে উঠলে? এর ব্যাখ্যায় আমি বলি: আমার জীবনে আমাকে একাই চলতে হবে। আল্লাহ আমাকে স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্টি করেছেন। আমার যোগ্যতা, গুণগুলো যেমন স্বতন্ত্র; পরীক্ষা এবং কাজগুলোও ভিন্ন। আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি, অবশ্যই এর পেছনে কোনো কারণ আছে। আমার অনেক কাজ করা বাকি, সমাজে অবদান রাখা বাকি। আর বাকি কিছু কীর্তি রেখে যাওয়া। এই দুনিয়াতে আমার প্রয়োজনীয়তা আছে।
এসব করার জন্য আমার কাছে একটাই উপায় আছে—শো-আপ; নিজের অবস্থান জানান দেওয়া। আত্মপ্রকাশ করতে হবে সহনশীলতার সাথে, প্রকৃতরূপে, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে। সুতরাং, আমরা যারা বিভিন্ন বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছি বা জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছি—তারা এটাকে নিজেদের পরীক্ষা হিসেবে নিতে পারি। আমাদের মধ্যে কেউ হয়তো বিধবা, কেউ তালাকপ্রাপ্তা, কেউ আবার একাকী মা, কর্মহীন কিংবা সন্তানহীন। আমাদের জীবনটাকে আমরা আবার নতুন করে শুরু করেছি, যা আমাদের একটা নতুন পরিচয় বহন করছে—আমরা মজলুম বা নিপীড়িত।
এই বইটা থেকে আপনি অন্য কোনো বার্তা না নিলেও একটা বার্তা অবশ্যই নিতে পারেন—আপনাকে ঠিক করতে হবে, নিজের জীবনের গল্পটা আপনি কীভাবে বলবেন। দুনিয়ার প্রত্যেকটা মানুষ তিনটি অবস্থানে থাকতে পারে—হয় তার পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, নয়তো পরীক্ষা নেওয়া হয়ে গেছে কিংবা সামনে নেওয়া হবে। এটাই দুনিয়ার নিয়ম এবং আল্লাহর সুন্নাহ। অতএব, যেহেতু আপনি জেনেছেন সবার পরীক্ষার ধরনই আলাদা, সুতরাং আপনি বেছে নিতে পারেন—আজীবন মজলুম হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেবেন না কি নিজেই নিজের গল্পের নায়ক হবেন।
মনে রাখবেন, গল্পের নায়কের জন্য সবটা কখনো সহজ হয় না। তাকে একটার পর একটা সংগ্রাম করে নিজের আত্মোপলব্ধি বাড়াতে হয়, ব্যক্তিত্বকে উন্নত করতে হয় এবং শেষে একটা সুন্দর সমাপ্তি থাকতে হয়। প্রতিটা সংগ্রাম তাকে করে তোলে আরো শক্তিশালী। প্রত্যেকটা পরীক্ষা তার বিশ্বাসকে বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। প্রতিটা ক্ষতির পর সে হয় আরো জ্ঞানী, লাভ করে চিন্তার গভীরতা। এ কারণেই জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সে একটা উত্তম মানুষে পরিণত হয়। আগুনে পুড়ে পুড়ে সে হয় খাঁটি সোনা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কীভাবে নিজেদের জীবনের নায়ক হব? আমাদের বুঝতে হবে, দুনিয়ার বুকে জীবন একটাই। এই এক জীবনে, জীবনের উদ্দেশ্য পুরা করতে হবে, সমাজে পরিবর্তন আনতে হবে, মহৎ কিছু করে যেতে হবে। এজন্য একটাই মওকা, নিজেকে প্রকাশ করা। আর এগুলো হতে পারে;
■ আল্লাহর জন্য আত্মপ্রকাশ করা।
■ পরিবারের জন্য আত্মপ্রকাশ করা।
■ বন্ধুবান্ধবের জন্য আত্মপ্রকাশ করা।
■ সমাজের জন্য আত্মপ্রকাশ করা।
■ নিজের জন্য আত্মপ্রকাশ করা。
কিন্তু এখনই কেন? এখনই কেন আমি আপনাদের শো আপ-এর দিকে আহবান করছি, তার তিনটা কারণ আছে।
এক. আপনাকে স্বতন্ত্র কিছু গুণ ও যোগ্যতা দিয়ে, বিশেষ একটি উদ্দেশ্যে এই দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং, ভয় এবং অজুহাত নামক মুখোশের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখার কোনো মানেই হয় না।
দুই. আপনি জানেন না কয়দিন বাঁচবেন। তাই সেই ‘বিশেষ’ দিন আসা অব্দি নিজের জন্য এবং আশেপাশের মানুষগুলোর জন্য আত্মপ্রকাশ করা থেকে বিরত রাখার কোনো অর্থই হয় না।
তিন. আত্মপ্রকাশের জন্য আপনি কেবল একটাই সুযোগ পাবেন। এমন অনেকেই আছেন, যারা প্রশান্তি এবং পরিতৃপ্তির একটা জীবন উপভোগ করতে পারে না স্রেফ আত্মপ্রকাশ না করার কারণে। আর সেই অভাগীদের মতো আপনি হবেন না。
📄 অধ্যায়-২: আত্মপ্রকাশ মানে কী?
মাঝে মাঝে, কোনো বিষয়কে তার ঠিক উলটোটা দিয়ে সহজেই বোঝানো যায়। এখানে আত্মপ্রকাশের বিপরীত হলো-মুখোশ পরে থাকা, হরেক চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করা। যেমন ধরুন,
■ এমন একজন সেজে থাকা, যেটা আদতে আপনি না।
■ আপন মানুষগুলোর সামনে নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ না করা।
■ বিরক্তি সহকারে জীবনের দায়-দায়িত্বগুলো পালন করা।
■ নিজেকে নিপীড়িত মনে করা।
■ একটা আলাদা মুখোশ পরে থাকা।
■ মোটের ওপর, নিজের আসল সত্তাকে লুকিয়ে রাখা।
কেন আমরা এভাবে নিজেকে আড়াল করে রাখি, তার বেশ কিছু কারণ আছে। আমরা অন্যের মন্তব্যকে ভয় পাই, সমালোচনা বা নিন্দা মেনে নিতে পারি না। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা হারতে ভয় পাই। এই ভয়টাই আমাদের নিজের আসল সত্তাকে বাহিরে আনতে দেয় না। জীবনে আশাবাদী হতে ও হিম্মতের সাথে নিজেকে প্রমাণ করতে পদে পদে বাধা দেয়।
আত্মপ্রকাশের ব্যাপারটা অবশ্য ভিন্ন। আত্মপ্রকাশ করা মানে শারীরিক ও মানসিক-ভাবে নিজের অবস্থান জানান দেওয়া, কাজের দায়িত্ব নেওয়া, মালিকানা গ্রহণ করা। আপনি যে-ই চরিত্রেই থাকেন না কেন, সমস্ত কমতির ঊর্ধ্বে গিয়ে আপনার আসল সত্তাকে চেনানো। নিজের জীবন এবং উদ্দেশ্যের সাথে ওয়াদাবদ্ধ থাকা। আপনাকে যে কারণে সৃষ্টি করা হয়েছে, সেটা সঠিকভাবে পালন করা। শো-আপ তথা আত্মপ্রকাশ বলতে আমি বুঝি-একটা পদক্ষেপ, একটা মনোভাব। মোদ্দাকথা, আপন জীবন গল্পের নায়ক হওয়া।
আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে, যারা একটা মধ্যমমানের জীবনযাপন করে। তারা জীবনের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে হিমশিম খায়, কিছু অর্জন করতে পারে না, চারপাশে কোনো প্রভাব ফেলতেও হয় ব্যর্থ। এর বড় একটা কারণ হলো— বেশিরভাগ মানুষ কঠিন কাজটার তুলনায় সহজ কাজটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। দায়িত্ব নেওয়ার বদলে বাহানা বানাতে ওস্তাদ। হিরো হওয়ার বদলে আজীবন মজলুম হয়েই থাকতে ভালোবাসে।
আমরা অধিকাংশি ঘুমের ঘোরে জীবনটা কাটিয়ে দেই। এটা বুঝি যে, জীবনে আমাদের আরো কিছু করার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই অনুপ্রেরণা বা জ্ঞান আমাদের মধ্যে থাকে না যে, আমরা আর কী কী করতে পারি। কিংবা আমরা এটা বলে নিজেদের বুঝ দেই—একদিন সবটা পরিবর্তন করে ফেলব, একদিন আমরা বাহিরে পা রাখব, একদিন কাজগুলো ভিন্নভাবে করব। আফসোসের বিষয় হলো, ঐ ‘একদিন’-টা স্রেফ আমাদের একটা কল্পনা। এটা এমন এক খোয়াব যা অজানা ভবিষ্যতের এক কাল্পনিক সময়সীমা। আমরা বলি—একদিন আমরা এটা করব, ওটা করব। অনেকটা এরকম বলা—আমি জানি আমার এটা করার যোগ্যতা আছে। কিন্তু আমি করব না। কারণ, এতে আমার কিছু যায়-আসে না।
সত্যিই আপনার কিছু যায়-আসে না? কিন্তু এটা তো আপনার জীবন। আর জীবন তো একটাই। এটাকে আপনি সফল করবেন না কি বিফল—পুরোটাই আপনার মর্জি। আপনার নষ্ট করা প্রতিটা ঘণ্টা, অপচয় করা প্রতিটা দিন, উদ্দেশ্যহীনভাবে কাটানো প্রতিটা সপ্তাহ, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটানো প্রতিটা মাস—আপনার জন্য বরাদ্দকৃত সময়েরই অংশ। এই সময়টা আপনি কীভাবে ব্যয় করতে চান? জীবনের শেষ দিনগুলোতে কেমন গল্প অন্যদের শোনাতে চান? নিজের জন্য কী কীর্তিগাথা রেখে যাচ্ছেন?
আপনাদের মধ্যে অপরাধবোধ জাগানোর জন্য কথাগুলো বলছি না। আমি জানি, অলসতার প্রতি আমাদের কেমন আকর্ষণ, তালবাহানার শক্তি কতখানি। কিন্তু আমি নিজের ও আপনাদের ক্ষেত্রে এসব মেনে নিতে নারাজ। আজ যদি আপনি খানিকটা পরিবর্তন না করেন, তবে সামনের সপ্তাহটা এ সপ্তাহের মতোই হবে। পরবর্তী বছরটাও এ বছরের মতোই কাটবে অনাড়ম্বরভাবে, হেলায়-ফেলায়। প্রিয় বোন আমার, একটু বুঝুন—আজ যদি আপনি নিজেকে প্রকাশ করার কোনো সিদ্ধান্ত না নেন, তবে হয়তো আর কখনোই নিতে পারবেন না। তাই এটার মুখোমুখি হোন।
কাজটা একদমই সহজ নয়, তাই না? যেখানে অধিকাংশ মানুষ অটো- পাইলট মোডে চলছে, সারাটা জীবন ঘুমিয়ে কাটাচ্ছে, সেখানে তো আরোই না। জানেন, এখানে ঘুমিয়ে কাটানো বলতে আমি আসলে কী বোঝাতে চাচ্ছি? এর মানে, সারাটা জীবন আমরা রোবটের মতো একটা গৎবাঁধা রুটিনেই কাটিয়ে দিচ্ছি। কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই জীবন শেষ করছি। ব্যাপারটা আমাদের জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রে হতে পারে—আত্মিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক কিংবা পেশাগত। প্রতিটা ক্ষেত্রেই মানুষ ঘুমিয়ে কাটায়।
এর মূল্য কিন্তু অনেক বেশি। আমি যখন আমাদের অধিকাংশের কথা ভাবি যারা অটো-পাইলটের জীবনযাপন করছে, ধূ ধূ মরুভূমির মতো আমি শুধু অপচয়ই দেখি—সম্ভাবনার অপচয়, সুযোগের অপচয়, জীবনের অপচয়। আমরা আর কতজন এভাবে বোবা আর বধির হয়ে দিন পার করব? আশেপাশের কাজগুলো কিংবা সম্পর্কগুলোর সাথে পুরোপুরি যুক্ত না হয়ে, জীবনযাপন করব? দুনিয়াকে বলে বেড়াচ্ছি—আমরা ভালো আছি, সব কিছু ঠিকঠাক মতো চলছে। অথচ ভেতরে ভেতরে আমরা প্রতিনিয়ত শেষ হয়ে যাচ্ছি। কতজন এভাবে নিজের চাহিদাকে কুরবান করে অন্যদের সাহায্য করব? নিজের ইচ্ছের ওপরে অন্যের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেব? অথচ আমরা নিজেদের স্বপ্নগুলো বুকের গহিনে কবর দিয়েছি, যেগুলো কখনো বলা হয়নি, কারো কাছে প্রকাশ করা হয়নি। আমরা কতজন নিজেদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ত্যাগ করেছি শুধু এই কারণে যে, আমরা ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়ানো, নিজেদের টেনে তোলার শক্তিটুকু আর নেই, তাই না?
হ্যাঁ, আমি জানি তাকদির আমাদের নিয়তি ঠিক করে। সুতরাং, আমাদের এই প্রশ্নটা করা উচিত নয়—যদি এমন হতো? কিন্তু আমি আপনাকে জিগ্যেস করতে চাই—আপনি জানেন আল্লাহ আপনার তাকদিরে কী লিখে রেখেছেন? আপনি কখনো নিজের ভবিষ্যৎ দেখেছেন? আল্লাহ আপনাকে একটা হতাশায়-ভরা জীবন দিয়েছেন—এটা বলার পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ আছে আপনার কাছে? তিনি আপনার জন্য সুখের, স্বাচ্ছন্দ্যের, তৃপ্তির একটি জীবন রেখেছেন—এটা অবিশ্বাস করার মতো কোনো বিশেষ কারণ আছে আপনার কাছে? বলুন, আছে?
তারপরও আমরা অধিকাংশি ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বলি, আল্লাহ আমার তাকদিরে এমনটাই লিখে রেখেছেন। কিন্তু জেনে রাখুন, প্রায় সময়ই এই কথাটা আমরা অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করি। সত্যটা আড়াল করার জন্যই আমরা কোনো কিছুতেই মাথা ঘামাতে চাই না। ঘুম থেকে জেগে এই সত্যটার মুখোমুখি হওয়ার- আমাদের কিছু করার আছে, অনেক কাজ করা বাকি, আমাদের মধ্যে যা আছে, তা দিয়েই ভালো কিছু করতে পারি-এটা আমাদের জন্য কষ্টকর। তারচেয়ে বরং ঘুমিয়ে, নিস্তেজভাবে জীবন কাটিয়ে দেওয়াই আমাদের কাছে আনন্দের।
কিন্তু কাহিনি কী জানেন, তাকদিরকে নিজের অসন্তুষ্টির অজুহাত হিসেবে দেখানোর চেয়েও বেশি কিছু আপনি করতে পারেন। যদি জীবনে আরো বেশি কিছু পেতে চান তবে আপনাকে আরো বেশি কাজ করতে হবে। জীবনটা অনেকটা এমন-যেমন কর্ম তেমন ফল। মহা-মহিম আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সুরা রাদ: ১১)
আয়াতটা এবার আপনাকে ভাবাচ্ছে, তাই না? যদি আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই, উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে চাই, ব্যাপারগুলোকে আরো ভালো করতে চাই-তাহলে আমাদের চলতে হবে, কাজ করতে হবে। এরপর না আমরা বিশ্বাস আর ভরসার মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা করতে পারি। যেমনটা হ্যাল এলরড তার চমৎকার বই দ্য মিরাকল মর্নিং-এ বলেছেন, "আপনাকে সেই মানুষটাই হতে হবে, যে মানুষটা আপনার হওয়া প্রয়োজন। যদি জীবনে কিছু পেতে চান, তবে সেই কাজগুলোই করুন, যা আপনার করা দরকার।”
সুতরাং, আমরা যদি সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ্যের একটা জীবন পেতে চাই, তবে আমাদেরকে অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে হবে। অধিকাংশ মানুষ যে কাজগুলো করছে, তার চেয়ে ভিন্ন কিছু, ভিন্নভাবে করতে হবে। যেমন, যদি আপনি বিশ্বাস বাড়াতে চান, জীবনে আরো বরকত আনতে চান, কিংবা অধিক ভালোবাসা, সুখ, অর্থপূরণ মুহূর্ত পেতে চান, অথবা কাজে পূর্ণ উদ্যমী হতে চান—তবে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাজ করার জায়গায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে। আপনার চালচলন, হাবভাবেও বিস্তর বদল আনা জরুরি।
মাঝে মাঝে আপনার খানিকটা অস্বস্তিবোধ হতে পারে। এমন মনে হতে পারে, আপনি স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাচ্ছেন। প্রায় সময়ই হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু মনে রাখবেন, “আত্মপ্রকাশের সিদ্ধান্ত একটা যাত্রার সূচনা। নিজেকে স্বীকার করা এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণের একটা সুন্দর যাত্রা। একটু অস্বস্তি লাগা স্বাভাবিক, তাই না? কিন্তু এখনই তো সময়। এখন না হলে আবার কখন? আপনি না হলে আর কে?” আজই সিদ্ধান্ত নিন-এই মধ্যমমানের জীবন থেকে আপনি বেরিয়ে আসবেন। এখনই কাজে নেমে পড়ুন। আর পেছনে পড়ে থাকা নয়, আর হেরে যাওয়া নয়, বরং আত্মপ্রকাশের সময় এখন。
আত্মপ্রকাশ: নবিজির একটি সুন্নাহ
আত্মপ্রকাশকে যদি আমরা এভাবে সংজ্ঞায়িত করি-নিজের দায়িত্বটা বুঝে নেওয়া, আপন কাজের জন্য দায়বদ্ধ হওয়া, অনেক কমতি থাকা সত্ত্বেও নিজেকে মেনে নেওয়া-তবে দেখব ইসলামের ইতিহাসে এর ভুঁড়ি ভুঁড়ি নজির আছে। গোটা সীরাত গ্রন্থেই এমন হাজারখানেক উদাহরণ আছে, যেখানে আমরা দেখি সহস্র প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নারী, পুরুষ, শিশুরা কীভাবে নিজেদের প্রকাশ করেছেন। যদিও অনেকের জীবনেই এমন কিছু স্বর্ণালি মুহূর্ত আছে, কিন্তু আমি শুধু শেষ নবি ও রাসুল সম্পর্কে বলতে চাচ্ছি।
নবিজির জীবনীর যে দিকটা আমার সবচেয়ে পছন্দের তা হলো, এটা খুব অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর গোটা জীবনজুড়ে এত এত পরীক্ষা আল্লাহ নিয়েছেন যে, খুব সহজেই তাঁকে মজলুম হিসেবে দেখানো যেত। আর এর যৌক্তিক কারণও ছিল যথেষ্ট। তাঁর জীবনের কিছু মর্মান্তিক ঘটনা দেখুন-এতিম হলেন; বয়সে বড় একজন নারীকে বিয়ে করলেন-যিনি একবার তালাকপ্রাপ্তা, অন্যবার বিধবা; নিজ বিশ্বাসের কারণে অপমানিত ও নির্যাতিত হয়েছেন; শহর থেকে বের করে নির্বাসনে দেওয়া হলো; আপন মানুষদের মৃত্যু দেখলেন-বাদ যায়নি নিজের সন্তানেরাও, এমনকি বংশের নাম রাখার মতো কোনো পুত্রও জীবিত ছিল না; ছিলেন দরিদ্র; ছিল গোটা উম্মতের ভার যার কাঁধে।
অথচ দেখুন, নবিজির জীবনটা আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে কতটা অনুপ্রেরণাদায়ক— নিজের মনকে অনুসরণ করা; সঠিক কাজটা করা, যদিও তার ফল ভোগ করতে হয়; ভয় এবং সন্দেহকে দূর করে মন খুলে অন্যকে ভালোবাসা এবং দয়া দেখানো; বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও বিনয়ী হওয়া। শত প্রতিকূলতার পরও নবিজি সা. আত্মপ্রকাশ করেছেন। কেবল নিজের জীবনের নয় বরং গোটা মুসলিম উম্মতের নায়ক হয়েছেন। আজ আমি যা আছি, তা কখনোই হতে পারতাম না; আজ আমি যা বিশ্বাস করি, তা কখনোই করতাম না; আজ আমি যা জানি, তা কখনোই জানতাম না—যদি তিনি এই যাত্রাটা শুরু না করতেন, নিজের অবস্থান জানান না দিতেন, যা করার দরকার ছিল তা না করতেন।
আমি আরো একজন নারীর গল্প আপনাদের বলতে চাই। যার নবি-পরিবারের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না। সে ছিল না কোনো ক্ষমতাবান নারী। কিন্তু তার গল্পটা খুবই সাহসিকতাপূর্ণ এবং সততারও। তার আত্মপ্রকাশের ঘটনাটা এখনও রক্ষিত আছে, যা হয়ে গেছে ইসলামের অনুশাসনের একটা অংশ।
গল্পটা একটা মেয়ের, যে দুধের ব্যবসায় তার মাকে সাহায্য করছিল। লোভে পড়ে মা তাকে বলল, দুধে একটু জল মেশাতে। যেন পরিমাণে বেশি হয়, লাভও বেশি পাওয়া যায়। মেয়েটা সাথে সাথে তা নাকচ করে দিল। সাথে খলিফা উমর ইবনে খাত্তাবের নিষেধাজ্ঞার কথাও মনে করিয়ে দিল। মা কন্যাকে তিরস্কার করে বলল, “খলিফা এখন কোথায়? তিনি তো আমাদের দেখছেন না।” কন্যার সোজাসাপটা জবাব, “খলিফা না দেখুক। আল্লাহ তো দেখছেন!”
জানেন, এই গল্পটা আমি এখানে কেন বললাম? যদি আমরা পরবর্তী প্রজন্মের ভালোর জন্য নিজেকে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিই, কিংবা চুপচাপ ঘরের এক কোণে পড়ে রই—এটা প্রভাব ফেলে। একটা পরিবর্তন আনে, আর সবটা হিসাব করা হয়।
📄 যাত্রা অন্তিমে
বইয়ের শুরুতেই আমি বলেছি, আত্মপ্রকাশ নবিজি সা.-এর একটি সুন্নাহ। এবার আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন, আমি যা যা বলেছি তার সব কয়টা বৈশিষ্ট্য নবিজির মধ্যে ছিল—লক্ষ্যের প্রতি আন্তরিকতা, ইতিবাচকতা, সন্তুষ্টি, সাহসিকতা, সততা।
এখন আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আপনাকে কী করতে হবে? আপনাকে উঠে দাঁড়াতে হবে এবং আল্লাহ আপনার জয়ের জন্য যা যা চ্যালেঞ্জ রেখেছেন সেসব মোকাবিলা করতে হবে। এটা মনে রাখবেন, আল্লাহ সবসময় সাথে আছেন। আপনাকে আপনার গল্পের নায়ক হিসেবেই দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে।
আমাদের সবার জীবনেই উত্থানপতন আছে। হিরোরাও ব্যতিক্রম নয়। ইসলামের চারজন মহৎ নারীর কথাই ভাবুন—খাদিজা, আয়িশাহ, আসমা, ফাতিমা। কারো জীবনটাই সুখকর ছিল না। কেউই সবকিছু চাওয়ামাত্র পাননি। বরং, প্রতিনিয়ত তাঁদের পরীক্ষা করা হয়েছে।
• তালাকপ্রাপ্তা • বিধবা • বন্ধ্যত্ব • দরিদ্রা • অন্যায় • হারানো
তারপরও, আমরা তাদের মজলুম হিসেবে জানি না, বরং আমরা তাদের আদর্শ হিসেবে মনে রাখি। আপনিও তার ব্যতিক্রম নন। তাই নিজেকে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিন। সে-ই নায়কটা হোন, যার জন্য আপনার জন্ম হয়েছে।
একটি শেষ স্বপ্ন দেখুন:
কল্পনা করুন, আপনার চারপাশে ঘিরে বসেছে সন্তান, নাতিপুতিরা। আপনি তাদের নিজের জীবনের গল্প বলছেন... কোন গল্পটা বলবেন তাদের?
■ জীবনের বাধাবিপত্তিগুলো পার হয়ে কী শিখলেন, সেটা বলবেন?
■ আল্লাহর ওপর নির্ভর করে কীভাবে প্রতিকূলতাকে কাটালেন, সেটা বলবেন?
■ যখন ইমান নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল, তখনও আপনি বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ আপনার ভালো চান—সেই গল্পটা বলবেন?
■ প্রচণ্ড কঠিন মুহূর্তেও আপনার অন্তরের ভেতর ভরসা ছিল—আল্লাহ আপনাকে ভেঙেচুরে দেবার জন্য এই পরীক্ষায় ফেলেননি, সেটা বলবেন?
এই জীবনটা আপনাকে এমনি এমনি শেষ করে দেওয়ার জন্য তৈরি না। বরং আপনাকে নতুন করে তৈরি করতে, আরো বেশি সুন্দর, আরো বেশি প্রাণবন্ত করতে সৃষ্ট। আপনাকে এমন এক নায়ক বানাতে, যা আপনি কোনোদিন কল্পনাও করেননি। আপনি তাদের দেখাবেন, কীভাবে নিজের জীবনের নায়ক হতে হয়?
■ পড়ে গেলে আবার কীভাবে উঠে দাঁড়াতে হয়?
■ কীভাবে আল্লাহকে ডাকতে হয়?
■ কীভাবে ভরসা করতে হয়?
■ কীভাবে নিজেকে বিশ্বাস করা যায়?
■ কীভাবে হিরো হওয়া যায়?
আমি জানি, আপনি করবেন ইন শা আল্লাহ। আদর্শ মুসলিমাহ হওয়ার এই যাত্রায়, মহীয়ান আল্লাহ আপনার সহায় হোন। যে অবদান সমাজে রাখার জন্য আপনার জন্ম হয়েছে, সেটা পূর্ণ করার তাওফিক দিন। আমিন।