📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 দেশ পরিচালনায় পরামর্শ ভিত্তিক ব্যবস্থা

📄 দেশ পরিচালনায় পরামর্শ ভিত্তিক ব্যবস্থা


আমীর, ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও শাসনকর্তার জন্য পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরী। আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সা)-কে হুকুম দিয়েছেন, وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأمْرِ “তাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পরামর্শ করো।” যারা পরামর্শ গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেন:
وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ - "ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গের পরস্পর পরামর্শ করা অপরিহার্য।" স্বীয় রাসূল (সা)-কে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:
فَاعْفُ عَنْهُمْ - وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ - إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ - (سورة ال عمران : ١৫৯) "তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর, তাদের জন্য মাগফেরাতের দু'আ কর এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর, আর কোন বিষয়ে তোমার 'মত' যদি সুদৃঢ় হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহর উপর নির্ভর করবে। আল্লাহর উপর নির্ভরকারীদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: لَمْ يَكُنْ أَحَدٌ أَكْثَرَ مُشَاوَرَةً لَأَصْحَابِهِ عَنْ رَّسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - (الحديث)
"স্বীয় সাহাবীগণের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাইতে অধিক পরামর্শ গ্রহণকারী দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না।"
বলা হয়েছে, সাহাবা কিরাম এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই রাসূলুল্লাহ (সা)-কে পরামর্শ গ্রহণের হুকুম দেয়া হয়েছে। তদুপরি এটাও উদ্দেশ্য ছিল যে, পরবর্তী কালে যেন রাসূলুল্লাহ সা)-এর অনুসরণে পরামর্শ গ্রহণের ব্যাপার একটি নীতিতে পরিণত হয়। ওহীর মাধ্যমে যে বিষয়টির মীমাংসা হয়নি, যেমন, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং খুঁটিনাটি বিষয়, সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানুষের মতামত নেয়া জরুরী। স্বয়ং নবী করীম (সা) যে ক্ষেত্রে পরামর্শ নিতেন, সে ক্ষেত্রে অন্যান্যরাতো আরো অধিক পরিমাণে পরামর্শের মুখাপেক্ষী। খোদ আল্লাহ (মানব সৃষ্টির প্রাক্কালে ফেরেশতাদের মতামত গ্রহণের ঘটনা দ্বারা বান্দাদেরও অনুরূপ করার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। যদিও তাঁর পরামর্শের দরকার হয় না) আল্লাহ পরামর্শ গ্রহণকারীদের প্রশংসা করেছেন। কাজেই ইরশাদ হচ্ছে:
وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى - لِلَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ - وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ - وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلُّوةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ - (سورة شورى : ٣٨-٣٦)
"আল্লাহর নিকট যা আছে তা অতি উত্তম ও স্থায়ী। ঐ সমস্ত মুমিন-মুসলমান আর যারা তাদের পালনকর্তার উপর নির্ভর করে, সেই উত্তম ও স্থায়ী উপভোগ্য বস্তু তাদেরই জন্য। আর যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কার্য হতে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধাবিষ্ট হয়েও অপরকে ক্ষমা করে দেয়, আর যারা তাদের পালনকর্তার আহ্বানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে এবং নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে কর্ম সম্পাদন করে এবং আমার প্রদত্ত জীবনোপকরণ থেকে তারা ব্যয় করে (তারাও ঐ উত্তম ও স্থায়ী উপভোগ্য বস্তুর অধিকারী)।" (সূরা শূরা: ৩৬-৩৮)
'উলিল আমর' তথা ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষ বা নেতা। পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে এবং কুরআন, হাদীস ও ইজমা দ্বারা কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হলে, তখন এর বিপরীতে কারো অনুসরণ করা নিষেধ। গৃহীত সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ও সে মুতাবিক কাজ করা 'উলিল আমর' এর জন্যেও ফরয হয়ে দাঁড়ায়। দ্বীন ও দুনিয়ার ছোট বড় সকল সমস্যা সম্পর্কেই একই নীতি। এ ক্ষেত্রে অন্য কারো অনুসরণ জায়েয নয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্র নির্দেশ হলো:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ - (سورة النساء : ٥٩)
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য করো আর তোমাদের মধ্যে যারা সামগ্রিক দায়িত্বসম্পন্ন সেসব নেতা-কর্তৃপক্ষের আনুগত্য কর।” (সূরা নিসা: ৫৯)
কিন্তু সৃষ্ট কোনো সমস্যা সম্পর্কে যদি मुसलमानों পরস্পরের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, তবে এহেন পরিস্থিতিতে জনগণের কাছ থেকে পরামর্শ আহ্বান করা বিশেষ জরুরী। সুতরাং যে রায় ও যে পরামর্শ কুরআন-হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যশীল ও নিকটবর্তী, তার উপরই আমল করবে। আল্লাহ পাকের হুকুম হচ্ছে:
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ - إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً - (سورة النساء : ٥٩)
"কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে সে বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূলের শরণাপন্ন হও। যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও। এটাই ভাল এবং পরিণতির দিক থেকেও উত্তম।” (সূরা নিসা : ৫৯)
“উলিল আমর” তথা ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব দুই প্রকার। (১) শাসকবর্গ, (২) আলিমগণ। এঁরা যদি সৎকর্মশীল হন, তবে জনগণও সৎকর্মশীল হয়ে যাবে। কাজেই এ দু'শ্রেণীরই দায়িত্ব হলো- যাবতীয় কাজ ও কথায় যাচাই করা- অনুসন্ধান করা। কুরআন-হাদীসের আলোকে সমস্যার সুস্পষ্ট সমাধান পাওয়া গেলে তার উপর আমল করা ওয়াজিব। কঠিন কোন সমস্যা দেখা দিলে গভীর দৃষ্টিতে, অভিনিবেশ সহকারে উদ্ভূত সমস্যার চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে যে, সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসূল (সা)-এর অনুসরণ কি প্রকারে সম্ভব? কুরআন-সুন্নাহর ইঙ্গিত কোন্ দিকে, সেটা লক্ষ্য করতে হবে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিচার-বিবেচনার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। সময়ের স্বল্পতা, যাচাইকারীর দুর্বলতা, বিপরীতমুখী দলীল-প্রমাণ কিংবা অন্য কোন কারণে ত্বরিত সমাধান সম্ভব না হলে তবে এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাবানদের কর্তব্য হলো- এমন ব্যক্তির অনুসরণ করা, যার প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও দীনদারী সর্বজন স্বীকৃত। এটাই হলো বিশুদ্ধ সমাধান।
এও বলা হয়েছে যে, কারো 'তাকলীদ' বা অনুসরণ জায়েয নয়"। উক্ত তিন পন্থাই ইমাম আহমদ প্রমুখের মযহাবে বর্ণিত রয়েছে। আর বিচারপতি ও ক্ষমতাসীনদের যে সকল গুণাবলী ও চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য, সেগুলো আছে কিনা তাও লক্ষ্য করতে হবে। নামায-জিহাদ ইত্যাদি সকল ইবাদতে একই হুকুম যে, শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী আমল ও কাজ-কর্ম করতে হবে। যদি সংশ্লিষ্টদের শক্তিতে না কুলায় এবং অপারগ হয়, তাহলে শক্তির বাইরে কাউকে হুকুম দেয়া আল্লাহর নীতি নয়।
এই একই মূলনীতির উপর তাহারাত-পাক-পবিত্রতার বিষয়াদিও প্রতিষ্ঠিত।
যথা- প্রথমত পানি দ্বারা পবিত্রতা হাসিল করাই বিধান। কিন্তু পানি দুষ্প্রাপ্য হলে কিংবা ব্যবহারে ক্ষতির আশংকা থাকলে- যেমন, শীত অতি প্রচণ্ড ও তীব্র অথবা পানি ব্যবহার করাতে জখম বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা থাকলে, এমতাবস্থায় তায়াম্মুম দ্বারা পবিত্রতা হাসিলের বিধান রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই নবী করীম (সা) ইমরান ইবনে হুসাইন (রা)-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন: صَلِّ قَائِمًا فَإِنْ لَّمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا فَإِنْ لَّمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَىٰ جنب - (الحديث)
"নামায দাঁড়িয়ে পড়, যদি সম্ভব না হয় বসে বসে পড়। যদি বসারও সামর্থ্য না থাকে, তবে শুয়ে শুয়ে পড়।"
এমনিভাবে আল্লাহ পাক নামায যথাসময়ে আদায় করার হুকুম দিয়েছেন- যেভাবে সে অবস্থায় সম্ভব হয়। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে:
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلُوةِ الْوُسْطَىٰ وَقُوْمُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ. فَإِنْ خِفْتُمْ فَرِجَالًا أَوْ رُكْبَانًا - فَإِذَا أَمِنْتُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَمَا عَلَّمَكُمْ مَّا لَمْ تَكُōnُوا تَعْلَمُوْنَ - (سورة البقرة : ۲۳۹-۲۳۸)
"তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষত মধ্যবর্তী সালাতের এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা বিনীতভাবে দাঁড়াবে। যদি তোমরা দুশমনের আশংকা কর পদচারী অথবা আরোহী যে অবস্থায় হউক না কেন নামায পড়; আর যখন তোমরা নিরাপদ বোধ কর তবে আল্লাহকে স্মরণ করবে যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমরা জানতে না।" (সূরা বাকারা: ২৩৮-২৩৯)
মহান আল্লাহ নামাযকে নিরাপদ, ভীত, সুস্থ, রুগ্ন, ধনী, গরীব, মুকীম ও মুসাফির সকলের উপর ফরয করেছেন, যা কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। অনুরূপভাবে পাক-পবিত্রতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সতর ঢাকা ও কেবলামুখী হওয়া ইত্যাদি নামাযের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি এসব শর্ত পূরণে অক্ষম, তাকে এ থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন। এমনকি যদি কারো নৌকা ডুবে যায়, চোর-ডাকাতরা তার মালামাল লুটে নেয়, তার পরিধেয় বস্ত্রাদি খুলে নেয় তবে এমতাবস্থায় সে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিবস্ত্র হয়েই নামায আদায় করবে। এ অবস্থায় ইমাম সকলের মাঝখানে এমনভাবে দাঁড়াবে, যেন কারো সতর দৃষ্টিতে না পড়ে। যদি কারো কেবলা জানা না থাকে, তবে জ্ঞাত হওয়ার জন্য সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করবে আর চূড়ান্ত প্রচেষ্টার পরই নামায আদায় করবে। কোন একটা দিক, নির্দিষ্ট করার মত কোন প্রমাণ যদি সে না পায়, তবে যেভাবে সম্ভব যেদিকে সম্ভব মুখ করে নামায আদায় করবে, যেমনিভাবে নবী করীম (সা)-এর সময়কালে নামায পড়া হয়েছিল।
জিহাদ, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সকল ধর্মীয় বিষয়ের এ একই অবস্থা। এ পরিপ্রেক্ষিতই মূলনীতি ঘোষণা করে কুরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ - (سورة التغابن : ١٦)
“(হে মুসলমানগণ) সাধ্যমত তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।” (সূরা তাগাবুন: ১৬) আর মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন :
إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ .
"আমি যখন তোমাদের প্রতি কোন কাজের হুকুম করি তখন সাধ্যানুযায়ী তোমরা তার উপর আমল কর।"
তদ্রূপ ‘খবীছ’ তথা অপবিত্র, অখাদ্য ও দোষযুক্ত খাদ্য ও পানীয় পানাহারকে মহান আল্লাহ একদিকে তো হারাম ঘোষণা করেছেন, অপরদিকে তার পাশাপাশি এও বলেছেন :
فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ . (سورة البقرة : ١٧٣)
“যে অনন্যোপায় অথচ অন্যায়কারী বা সীমালংঘনকারী নয় (সে জীবন রক্ষা পরিমাণ মৃত জন্তুর গোশত খেলেও) তার কোন পাপ হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।” (সূরা বাকারা : ১৭৩)
তিনি আরো বলেছেন :
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَج - (سورة الحج : ۷۸)
"তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনে কঠিন কোন বিধান দেননি।" (সূরা হজ : ৭৮) অন্যত্র বলেছেন:
مَا يُرِيدُ اللهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ حَرَجٍ - (سورة المائده : ٦) “আল্লাহ তোমাদেরকে কষ্ট দিতে চান না।” (সূরা মায়িদা: ৬)
সুতরাং মহান আল্লাহ তাই ফরয করেছেন যা মানুষের সাধ্যের আওতাভুক্ত। পক্ষান্তরে যা ক্ষমতা ও সামর্থ্যের বাইরে তা ওয়াজিব নয়। তাই অনন্যোপায় অবস্থায় যা ব্যতীত গত্যন্তর নেই, সেগুলো হারাম করেননি। সুতরাং গুনাহ্ পর্যায়ে পড়ে না বান্দা যদি নিরূপায় হয়ে এমন সীমিত আকারে হারাম বস্তু ব্যবহার বা কাজ করে, তবে তার কোন গুনাহ হবে না।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ক্ষমতা গ্রহণ ও শাসন পরিচালনা মহাদিনী কাজ

📄 ক্ষমতা গ্রহণ ও শাসন পরিচালনা মহাদিনী কাজ


ক্ষমতা গ্রহণ, হুকুমত ও শাসন পরিচালনা দ্বীনের বৃহত্তম স্তম্ভ এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বরং দীনের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব এরি সাথে সংশ্লিষ্ট।
এ পর্যায়ে নবী করীম (সা)-এর ইরশাদ হলো: إِذَا خَرَجَ ثَلُثَةٌ فِي سَفَرٍ فَلْيُؤَمِّرُوا أَحَدَهُمْ - (ابو داود)
"তিন ব্যক্তি সফরে বের হলে, তারা একজনকে নেতা (ইমাম) নির্বাচন করে নিবে।” (আবু দাউদ)
ক্ষমতা গ্রহণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনা দীনের বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, বরং দীনের অস্তিত্ব ও স্থিতি এরি সাথে সংশ্লিষ্ট। কেননা মানুষের জাতীয় ও সমষ্টিগত কল্যাণ ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ব্যতীত সম্ভব নয়। কারো কারো প্রয়োজন ও চাহিদাতো এমন যে, এর সমাধান দল বা জামা'আত ছাড়া সম্ভবই নয়। যেহেতু জামা'আত ওয়াজিব ও অপরিহার্য, কাজেই জামা'আতের জন্য আমীর বা নেতা থাকাও ওয়াজিব।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) এর সূত্রে স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: لَا يَحِلُّ لِثَاثَةٍ يَكُوْنُوْنَ بِفَلَاةٍ مِّنَ الْأَرْضِ إِلَّا أَمَّرُوا عَلَيْهِمْ أَحَدُهُمْ - (مسند احمد)
"তিন ব্যক্তি যদি কোন মরুপ্রান্তরে সফর করে, তবে তাদের মধ্য হতে একজনকে নিজেদের আমীর বানিয়ে নেয়া একান্ত প্রয়োজন।" (মুসনাদে আহমদ)
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, দল যতই ক্ষুদ্র হোক, তারা একান্ত অস্থায়ী কিংবা সফররত যে কোন অবস্থাতে থাকুক, তাদের মধ্য হতে একজনকে আমীর নিযুক্ত করে নেয়া ওয়াজিব। এটা এজন্য যে, অন্যান্য সকল দলের পক্ষে যেন সতর্ক বাণীরূপে গণ্য হয় যে, ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মাত্র তিন ব্যক্তি জমায়েত হলেও যে ক্ষেত্রে নিজেদের আমীর বা নেতা নির্বাচন করা ওয়াজিব, সে ক্ষেত্রে অন্যান্য জামা'আতের উপর এ হুকুম কার্যকরী করা আরো অধিক প্রয়োজন। কেননা আল্লাহ পাক اَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ (সৎ কাজের আদেশ) এবং نَهِي عَنِ الْمُنْكَرِ (অসৎ কাজের নিষেধ)-কে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আর আমীর ছাড়া অন্যদের পক্ষে এ দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করা সম্ভব নয়।
অনুরূপভাবে জিহাদ, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, হজ্জ পালন করা, জুমু'আ ও দুই ঈদের নামায কায়েম করা, আর্ত-নির্যাতিতের সাহায্য, হদ কার্যকরী করা ইত্যাদি ফরয-ওয়াজিবসমূহ শক্তি, ক্ষমতা ও নেতার নেতৃত্ব ছাড়া বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। এ সম্পর্কেই রিওয়ায়েত করা হয়েছে:
أَنَّ السّلْطَانَ ظِلُّ اللَّهِ فِي الْأَرْضِ -
"নিশ্চয়ই (ন্যায়পরায়ণ) সুলতান বা শাসনকর্তা যমীনের বুকে আল্লাহর ছায়া স্বরূপ।”
উপরন্তু আরো বলা হয়েছে যে, জালিম অত্যাচারী সুলতান বা শাসনকর্তার ষাট বছরব্যাপী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা, একরাত শাসকবিহীন থাকার তুলনায় উত্তম। বাস্তব অভিজ্ঞতাও একথার ইঙ্গিত দেয় যে, শাসকবিহীন জীবন-যাপনের চাইতে অত্যাচারী জালিম বাদশাহ বিদ্যমান থাকা অধিক বাঞ্ছনীয়। এরি পরিপ্রেক্ষিতে ফযল ইবনে ইয়ায, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ সলফে সালেহীন এ ধরনের উক্তি করেছেন:
لَوْ كَانَ لَنَا دَعْوَةٌ مُجَابَةٌ لَدَعَوْنَا بِهَا لِلسُّلْطَانِ - (مسند احمد)
"আমাদের দু'আ যদি অবধারিত কবূল হতো, তবে আমরা সুলতানের জন্য দু'আ করতাম।"
নবী করীম (সা) বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلَاثًا أَنْ تَعْبُدُوهُ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا - وَأَنْ تَنَاصَحُوا مَنْ وَلاهُ اللَّهُ أَمْرَكُمْ - (مسلم)
"তিন জিনিসে আল্লাহ পাক তোমাদের উপর সন্তুষ্ট। একঃ একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে, কাউকে তাঁর সাথে শরীক করবে না। দুই আল্লাহর রশিকে সম্মিলিতভাবে ধারণ করবে, বিচ্ছিন্ন হবে না। তিনঃ যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের শাসক নিযুক্ত করেন তাকে উপদেশ দেবে ও তোমরা তার মঙ্গল কামনা করবে।” (মুসলিম)
তিনি আরো বলেছেন: ثَلَاثُ لَا يَغُلُّ عَلَيْهِنَّ قَلْبُ مُسْلِمٍ - إِخْلَاصِ الْعَمَلِ لِلَّهِ وَمُنَاصَحَةُ وَلَاةِ الْأَمْرِ وَلُزُوْمُ جَمَاعَةِ الْمُسْلِمِينَ فَإِنْ دَعَوْتَهُمْ تُحِيطُ مِنْ ورَائِهِمْ - (أهل السنن)
“তিন বিষয়ে মুসলমানের অন্তর কৃপণতা প্রদর্শন করতে পারে না। (১) স্বীয় কাজ কর্ম আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরম নিষ্ঠার সাথে সম্পাদন করায়, (২) দেশের শাসকদের প্রতি হিতোপদেশ প্রদান করার বেলায় এবং (৩) مسلمانوں জামা'আতকে আঁকড়িয়ে ধরার ক্ষেত্রে। কেননা তাদের দু'আ পশ্চাৎদিক থেকে তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখে।” (আহলে সুনান)
সহীহ বুখারীতে নবী করীম (সা)-এর হাদীস বর্ণিত হয়েছে: الدِّينُ النَّصِيحَةُ - الدِّينُ النَّصِيحَةُ - الدِّينُ النَّصِيحَةُ -
“দীন হিতোপদেশের নাম, দীন হিতোপদেশের নাম, দীন হিতোপদেশের নাম।” (বুখারী)
সাহাবীগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা), নসীহত কার জন্যে? তিনি বললেন, “আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য এবং তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে মুসলিম জনগণ, তাদের ইমাম তথা নেতৃবৃন্দকে।”
সুতরাং مسلمانوں উচিত দীন ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে ইসলামী নেতৃত্ব সৃষ্টি করা ও ইসলামী শাসন কায়েম করা, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সম্ভব হয়। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)-এর আনুগত্য করা সর্বোত্তম ইবাদত। কিন্তু সময় সময় এর মধ্যে ফিতনা-ফাসাদ ও বিশৃংখলা দেখা দেয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রছায়ায় ধন-সম্পদ লাভের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে আর এটাকে কাঙ্ক্ষিত সম্পদ অর্জনের মাধ্যম বানিয়ে নেয়। যার ফলে নিজের দীন ও আখিরাত বিনাশ করে خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ এর পাত্রে পরিণত হয়। যেমন, কাব ইবনে মালিক (রা) মহানবী (সা)-এর হাদীস বর্ণনা করছেন। হুযূর (সা) বলেন:
مَاذِنْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلاً فِي غَنَمِ بِأَفْسَدَلَهَا مِنْ حِرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ - (قال الترمذي حديث حسن صحيح)
"এমন দুটি ক্ষুধার্ত বাঘকে বকরীর পালে যেন ছেড়ে দেয়া হয়েছে যারা বকরীগুলোর নিধন কাজে ব্যাপৃত রয়েছে। একটি হল- মানুষের সম্পদের মোহ ও লোভ, দ্বিতীয় হল- দীনের ক্ষেত্রে মান-মর্যাদাবোধ।” (তিরমিযী এটাকে হাদীসুন হাসানুন বলেছেন)
এ ব্যাপারে মহানবী (সা) সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সম্পদ ও ক্ষমতার মোহ দুটি এমন জিনিস যা দীন-ধর্মকে বিনাশ করে দেয়। আর বাস্তব ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায় যে, অধিকাংশ ফিতনা-ফাসাদ এ দুটি ক্ষুধার্ত বাঘের কারণেই সংঘটিত হয়ে থাকে। ক্ষুধার্ত এ বাঘ দুটিই প্রকৃতপক্ষে মানব পালকে ছিন্ন-ভিন্ন ও লুণ্ঠন করে ছাড়ে।
মহান আল্লাহ এমন ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, যার আমলনামা বাম হাতে অর্পণ করা হবে। আর এটা দেখে সে বলে উঠবে:
مَا أَغْنَى عَنِّى مَالِيَهُ - هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهُ - (سورة الحاقة : ۲۹-۲۸)
"আমার ধন-সম্পদ আমার কোনই কাজে আসে নাই। আমার ক্ষমতাও অপসৃত হয়েছে।" (সূরা আল হাক্কা: ২৮-২৯)
রাজত্ব ও ক্ষমতালোভীদের পরিণাম ফিরাউনের ন্যায় এবং সম্পদ জমাকারীর অবস্থা কারূনের ন্যায় হয়ে থাকে।
মহান আল্লাহ কুরআন হাকিমে ফিরাউন ও কারুনের অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে ইরশাদ করেছেন:
أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ كَانُوا مِنْ قَبْلِهِمْ - كَانُواهُمْ أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَأَثَارًا فِي الْأَرْضِ فَأَخَذَ هُمُ اللَّهُ بِذُنُوبِهِمْ وَمَا كَانَ لَهُمْ مِّنَ اللَّهِ مِنْ وَاقٍ - (سورة المؤمن : ۲۱)
“এরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? তাহলে দেখতে পেত যে, এদের পূর্ববর্তীগণের পরিণাম কি হয়েছিল। পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা শক্তিতে ও কীর্তিতে প্রবল পরাক্রমশালী। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিলেন তাদের অপরাধের জন্য এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে তাদেরকে রক্ষা করার কেউ ছিল না।” (সূরা মু’মিন : ২১)
আল্লাহ আরো বলেন :
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا - وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ - (سورة القصص : ٨٣)
“ইহা আখিরাতের সেই আবাস যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য, যারা পৃথিবীতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। আর শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকীদের জন্য।” (সূরা কাসাস : ৮৩)
মানুষ সাধারণত চার প্রকারের হয়ে থাকে।
(১) সেসব লোক যারা উচ্চ মর্যাদা, নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব ও সরদারীর অভিলাষী। আল্লাহর যমীনে এরা বিশৃংখলা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে থাকে। উচ্চ মর্যাদা ও নেতৃত্ব লাভের জন্য এরা কপটতা-শঠতা, ধোঁকাবাজি ইত্যাদি বৈধ বলে ধারণা করে। অথচ এটা কঠিন ও জঘন্যতম অপরাধ। এ জাতীয় রাজা-বাদশাহ, রাষ্ট্রপতি ও দুষ্কৃতিকারী নেতৃবৃন্দ ফিরাউন ও ফিরাউনচক্রের দলভুক্ত। আল্লাহ্র সৃষ্টি জগতের এরা নিকৃষ্টতম জীব। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْى نِسَاءَهُمْ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ. (سورة القصص : ٤)
“নিশ্চয়ই ফিরাউন নিজ দেশে পরাক্রমশালী হয়েছিল এবং তথাকার অধিবাসীগণকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে তাদের একটি শ্রেণীকে সে হীনবল করেছিল; ওদের পুত্রগণকে সে হত্যা করতো এবং নারীগণকে জীবিত রাখতো। সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী।” (সূরা কাসাস : ৪)
ইবনে আব্বাস (রা)-এর রিওয়ায়েত ক্রমে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِّنْ كِبْرٍ - وَلَا يَدْخُلُ النَّارَ مَنْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ إِيْمَانِ - (মুসলিম)
"যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার বিদ্যমান, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং সে ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না যার অন্তরে বিন্দু পরিণাম ঈমান বর্তমান থাকে।” (মুসলিম)
কেউ একজন প্রশ্ন করলো, “হে রাসূলুল্লাহ (সা)! এটা আমার বড় পছন্দ লাগে যে, আমার পোশাক-পরিচ্ছদ ও জামা-জুতা সুন্দর দেখাক। তবে ইটাও কি অহংকার ও গর্বের অন্তর্ভুক্ত।” জবাবে তিনি বললেন:
لَا إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ - اَلْكِبْرُ بَطْرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ - (মুসলিম)
“না- এটা গর্ব ও অহংকার নয়। বরং আল্লাহ তা'আলা সুন্দর, সৌন্দর্যকে তিনি ভালবাসেন। অহংকার হলো, সত্যকে অস্বীকার ও পদদলিত করা এবং মানুষকে নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত মনে করা। এ হলো সে সকল লোকদের অবস্থা, যারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব, মান-মর্যাদার প্রত্যাশী এবং সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী।”
(২) ঐ সকল লোক যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এবং বিশৃংখলার হোতা বটে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উচ্চমর্যাদা, নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। যেমন- চোর-ডাকাত, গুণ্ডা-বদমাশ ইত্যাদি। এ জাতীয় অপরাধীগণ সাধারণত সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী ও নিম্ন শ্রেণীর লোক হয়ে থাকে।
(৩) যে সকল লোক মান-মর্যাদা, ইয্যত-সম্মান কামনা করে কিন্তু তারা সমাজে বিশৃংখলা ও বিপর্যয় সৃষ্টিতে আগ্রহী নয়। এরা দীনদার শ্রেণীভুক্ত, যাদের নিকট দীন রয়েছে। আর এ দীনের দ্বারাই তারা মানুষের মধ্যে মান-সম্মান কামনা করে।
(৪) এ পর্যায়ে রয়েছে সে সকল লোক প্রকৃতপক্ষেই যারা জান্নাতের অধিকারী, তারা আল্লাহভক্ত ও হকপন্থী লোক। তারা মান-মর্যাদার অভিলাষী নয়। অধিকন্তু যমীনের বুকে তারা ফাসাদ সৃষ্টিকারীও নয়; তাসত্ত্বেও তারা উচ্চমর্যাদার অধিকারী। যেমন কুরআন করীমে ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ - (سورة ال عمران : ۱۳۹)
“তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না তোমরাই বিজয়ী থাকবে যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরা আলে ইমরান: ১৩৯)
তাতে আরো বলা হয়েছে: فَلَا تَهِنُوا وَتَدْعُوا إِلَى السَّلْمِ وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ - وَاللَّهُ مَعَكُمْ وَلَنْ يُتِرَكُمْ أَعْمَالَكُمْ - (سورة محمد : ٣٥) “তোমরা বলহীন হয়ো না এবং সন্ধির প্রস্তাব করো না, তোমরাই বিজয়ী থাকবে; আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন, তিনি তোমাদের কর্মফল কখনো বিনষ্ট করবেন না।” (সূরা মুহাম্মদ: ৩৫)
আল্লাহ আরো বলেছেন: وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُوْلِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ - (سورة المنافقون : ٨) “মান-মর্যাদা শক্তিতো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদেরই জন্য।” (সূরা মুনাফিকূন: ৮)
মোটকথা, ক্ষমতাগর্বী ও অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী এমনও রয়েছে, যারা সব চাইতে বেশী ঘৃণিত, লাঞ্ছিত ও পদদলিত, হীনতার চরমে নিপতিত। পক্ষান্তরে অনেক উচ্চমর্যাদাশীল ব্যক্তিও রয়েছে, যারা ফিতনা-ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি করা থেকে দূরে থাকা সত্ত্বেও মর্যাদার শৈলচূড়ায় বিরাজমান। এটা এ কারণে যে, আল্লাহর সৃষ্টিকূলের উপর আধিপত্য বিস্তারের ধারণা পোষণ করাটা তাদের উপর জুলুমেরই নামান্তর। কেননা, গোটা মানব জাতি একই শ্রেণী একই গোত্রভুক্ত। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি সমগোত্রীয়দের উপর আধিপত্য লাভের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শক্তি ও কৌশল প্রয়োগে আত্মনিয়োগ করে, যাতে অন্যান্যরা তার অধিকার বলয়ে চলে আসে, এটা চরম অত্যাচার। কাজেই এ জাতীয় লোকদের প্রতি সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ ও ক্ষোভের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। পক্ষান্তরে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির পক্ষে আপন ভাইয়ের উপর আধিপত্য বিস্তার করা, তাকে মানবেতর জীবন-যাপনে বাধ্য করার কল্পনাও অচিন্তনীয়। অবশ্য অত্যাচারী জালিম ব্যক্তি চায় যে, সকলের উপর তার প্রাধান্য ও সরদারী কায়েম থাকুক। তাদের নিকটও বিবেক বুদ্ধি রয়েছে। তারা এটা লক্ষ্য করে যে, একজনকে তাদের অন্যের উপর মর্যাদা দেয়া হয়েছে। যেমন- فَضَّلْنَا بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ আয়াতাংশে বর্ণিত হয়েছে।
ইতিপূর্বে আরো বলা হয়েছে যে, আকার-আকৃতি বিশিষ্ট মানব দেহের সংশোধন তার সেরা অংগে মস্তক ছাড়া সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাকের ইরশাদ হলো:
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا أَتَاكُمْ - (سورة الانعام : ١٦٥)
"তিনিই তোমাদেরকে দুনিয়ায় প্রতিনিধি করেছেন এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন, সে সম্পর্কে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কতককে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছেন।" (সূরা আন'আম: ১৬৫)
আল্লাহ আরো বলেছেন:
نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَّعِيْشَتَهُمْ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَت لِّيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيًّا . (سورة الزخرف : (۳۲)
"তাদের পার্থিব জীবনে আমিই তাদের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করি এবং একজনকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করি, যাতে একে অন্যের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে।" (সূরা যুখরুফ: ৩২)
রাষ্ট্র ও ধন-সম্পদ সার্বিকভাবে আল্লাহর পথে নিয়োজিত রাখা এবং যথাযথরূপে দ্বীনের কাজে ব্যয় করার জন্য ইসলামী শরীয়ত জোর নির্দেশ দিয়েছে। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যও তাই যে, এর দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা, দ্বিতীয়ত আল্লাহর দীন যেন কায়েম ও মজবুত হয়। সুতরাং আল্লাহর পথে যখন ধন-সম্পদ ব্যয় করা হবে, ফলশ্রুতিতে দ্বীন-দুনিয়া উভয় জাহানের কল্যাণ সাধিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী। পক্ষান্তরে আমীর, সুলতান তথা শাসক যদি ইসলাম থেকে দূরে সরে থাকে, তাহলে জনগণের নৈতিক, চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক সকল দিক নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।
আল্লাহ পাকের অনুগত বান্দাদের এবং গুনাহগার ও অবাধ্যদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করা যায় তাদের উদ্দেশ্য ও সৎকাজ দ্বারা। এ প্রসঙ্গে বুখারী-মুসলিমের হাদীসে হুযুর (সা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَلَا إِلَى أَمْوَالِكُمْ وَإِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَإِلَى أَعْمَالِكُمْ - (بخاری و مسلم)
"আল্লাহ তা'আলা তোমাদের আকৃতি চেহারা ও তোমাদের মালের প্রতি তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর, তোমাদের আমলের প্রতিই লক্ষ্য করে থাকেন।" (বুখারী ও মুসলিম)
অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি, শাসক, আমীর ও রঈস এখন দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন। অর্থবিত্ত, কুলগৌরব, বুযুর্গী ইত্যাদিকে পার্থিব স্বার্থে ও দুনিয়াবী গরজে ব্যবহার করা হয়। তারা ঈমানের মূল ভাবধারা এবং পরিপূর্ণ দীন থেকে সরাসরি বঞ্চিত।
অবশ্য তাদের কারো কারো মধ্যে দীনী চেতনাবোধ প্রবল বটে, কিন্তু যদ্বারা এর পরিপূর্ণতা হাসিল হয়, তা থেকে এরা অনবহিত। ফলে তারা এ বিষয়গুলো পরিহার করে বসেছে। অপরপক্ষে তাদের কেউ হয়তো এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা এ থেকে বিমুখ হয়ে আছেন। আর তা এ জন্যে যে, রাষ্ট্র পরিচালনা, নেতৃত্ব, সরদারী ইত্যাদিকে তারা ইসলাম বিরোধী কার্য-কলাপ বলে ধারণা করে নিয়েছেন। বস্তুতঃ তাদের বিশ্বাস হলো যে, এসব দীন ইসলামের পরিপন্থী কাজ। তাদের মতে দীন হলো অপমান ও লাঞ্ছনার নামান্তর। ইয্যত, সম্মান ও মর্যাদার উচ্চাসন থেকে এরা মূলত বঞ্চিত ও মাহরুম।
ইহুদী, নাসারা ধর্মাবলম্বীদের অবস্থাও একই এবং প্রায় অভিন্ন। নিজেদের ধর্মকে তারা অসম্পূর্ণ মনে করে নিজেদেরকে অক্ষম অপরাধী ধারণা করে। তদুপরি দীন প্রতিষ্ঠার কাজে নানাবিধ আপদ-বিপদ লক্ষ্য করে হীনবল হয়ে যায়। দীনকে অপমানকর মনে করে তা পরিত্যাগ করে বসে। ফলে দীনের পরিসীমা সংকোচিত হতে থাকে এবং এমনিভাবে দীন ধর্ম দ্বারা তাদের নিজেদের অথবা অপরের কোন কল্যাণ সাধিত হবার নয়, তাই মূল ধর্মকেই তারা বর্জন করে। এমনি দুটি দীন দুটি পথ একদা ছিল। একদল দেখলো তাদের নিজেদের দীনকে অসম্পূর্ণ উদ্দেশ্যে, তদুপরি দীন প্রতিষ্ঠায় শত বাধা বিঘ্ন দেখে তারা ভীত হয়ে যায়। ফলে দ্বীনী পথ সুকঠিন হয়ে পড়ে। দীনকে অপমানের বস্তু মনে করে তারা দীন পরিত্যাগ করে। তদুপরি দীন প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতা, ধন-সম্পদ ও রণ-কৌশল সম্পর্কিত জ্ঞান অপরিহার্য। তাদের দীন-ধর্ম তাদের চাহিদা পূরণ করতে কার্যত অক্ষম; তাই ঘৃণাভরে মূল ধর্মই ত্যাগ করে এথেকে তারা সরে দাঁড়ায়।
অপর পক্ষীয়রা রাষ্ট্র; অর্থবিত্ত, সামরিক উপায়-উপকরণ সংগ্রহ এবং প্রয়োজনে যুদ্ধ-বিগ্রহের দিক নির্দেশনা নিজেদের ধর্মীয় ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান দেখতে পায়; কিন্তু দীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়া তাদের উদ্দেশ্য বহির্ভূত বিধায় আসল ধর্মকেই তারা বিসর্জন দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। পক্ষ দুটি হল مَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ (অভিশপ্ত) ইহুদী ও صَالِّيْن (পথভ্রষ্ট) নাসারা। ইহুদীরা তো (দ্বীনী রাজত্ব, শাসন, সরদারী সব পরিত্যাগ করেছে, খৃষ্টান নাসারাগণ মূল ধর্মই ছেড়ে দিয়েছে।
সুতরাং সিরাতে মুস্তাকীম (সরল-সহজ পথ) তাদেরই গমন পথ যাদের উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত-করুণা নাযিল হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে: صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّيْنَ وَالصِّدِّقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ -
“এটা সে সকল লোকদের পথ যাদের উপর আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন। যেমন, নবী (আ), সিদ্দিকীন, শহীদ এবং সৎকর্মপরায়ণ মানুষ।”
হযরত মুহাম্মদ (সা), তাঁর পর খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কিরাম এবং পরবর্তী কালে তাঁদের অনুগামীদের এই একই পথ, একই তরীকা ছিল।
এ প্রসঙ্গে কুরআনের শাশ্বত বাণী হলো: وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا - ذَالِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ - (سورة التوبة : ١٠٠)
"মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা সর্বপ্রথম ঈমানের দাবী অনুযায়ী অগ্রসর হয়েছিল তারা এবং যারা সততার সাথে তাদের অনুসরণ করছিল, আল্লাহ তাদের প্রতি সুপ্রসন্ন হলেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলো। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত, যেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। এটা মহা সাফল্য।" (সূরা তওবা: ১০০)
সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষে দীন প্রতিষ্ঠার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করা ফরযে আইন বা অবশ্য কর্তব্য। যার উপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও শাসনভার ন্যস্ত, তার দায়িত্ব ও কর্তব্য এ ব্যাপারে সর্বাধিক। এ দ্বারা সে আল্লাহর আনুগত্য, ইকামতে দীন ও مسلمانوں কল্যাণ সাধনের কাজ আঞ্জাম দিবে আর রাষ্ট্র ক্ষমতা লাভের পশ্চাতেও এই একক উদ্দেশ্য। কাজেই এ জন্য রাষ্ট্র ও শাসন ক্ষমতার হিফাযত জরুরী। সাধ্যমত হারাম জিনিস থেকে শাসক নিজে বেঁচে থাকবে এবং অপরকেও রক্ষা করতে তৎপর থাকবে। তার ক্ষমতার বাইরে কোন কিছুর জন্য তাকে জিজ্ঞেস করা হবে না।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অসৎ লোকদেরকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা উচিত নয়। অবশ্য যে ব্যক্তি নেতৃত্ব ও সরদারীর মাধ্যমে দীন প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর পথে জিহাদ করার দায়িত্ব পালনে অপারগ, সে ততটুকু খিদমতই আঞ্জাম দিবে যতটুকু করতে সে সক্ষম। আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে জাতীয় কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে, উম্মতে মুহাম্মদীর পরস্পরের মহব্বত ও মঙ্গলের জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করবে। অধিকন্তু সাধ্যমত কল্যাণ সাধনে ব্যাপৃত থাকবে। কেননা আল্লাহ পাক ক্ষমতার বাইরে কারো উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না বা হুকুম করেন না। আল্লাহর কিতাব কুরআনের পথ নিদের্শনায়ই দীনের প্রতিষ্ঠা সম্ভব। কেননা ইহা পথ প্রদর্শক। আর এ ব্যাপারে হাদীসে রাসূলের কার্যকরী ভূমিকা রয়েছে। এ দুটিকে পথ নির্দেশক বানিয়ে আল্লাহর সাহায্য অর্জন করা যেতে পারে। স্বয়ং আল্লাহও এ বিষয়ে কুরআনে হুকুম আহকাম বর্ণনা করেছেন।
সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয হলো কুরআনে হাকীম ও হাদীসে রাসূল (সা)-কে সব কিছুর উপর প্রাধান্য দেয়া। অতঃপর একমাত্র আল্লাহরই নিকট সাহায্য ও মঙ্গল কামনা করতে থাকবে। স্মরণযোগ্য যে, দুনিয়া এজন্যই যে একে দীনের খিদমতে ব্যয় করা হবে। যেরূপ হযরত মু'আয ইবনে জাবাল (রা) বলেছেন:
يَا ابْنَ آدَمَ اَنْتَ مُحْتَاجٌ إِلَى نَصِيْبِكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَنْتَ إِلَى نَصِيْبِكَ مِنَ الْآخِرَةِ - مِنَ الْآخِرَةِ أَحْوَجُ فَإِنْ بَدَأْتَ بِنَصِيْبِكَ مِنَ الْآخِرَةِ وَبِنَصِيْبِكَ مِنَ الدُّنْيَا نَنْتَظِمُهَا انْتِظَامًا وَإِنْ بَدَأْتَ بِنَصِيْبِكَ مِنَ الدُّنْيَا فَاتَتْ نَصِيبُكَ مِنَ الْآخِرَةِ وَأَنْتَ مِنَ الدُّنْيَا علَى خَطَرٍ - (قول صحابه)
"হে বনী আদম! তুমি তোমার দুনিয়ার ও সম্পদের মুখাপেক্ষী, তদ্রূপ আখিরাতেও তোমার সঞ্চয়ের তুমি মুহতাজ কিন্তু আখিরাতের সঞ্চয়ের তুমি অধিক মুখাপেক্ষী। কাজেই তুমি তোমার আখিরাতের অংশ নিয়েই কাজ শুরু কর। আর সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার ভাগের জন্য কিছু চেষ্টা করো। কিন্তু যদি তুমি দুনিয়ার সম্পদের চেষ্টায় প্রথম মনোযোগ দাও, তবে তোমার আখিরাতের সম্পদ হারিয়ে বসবে, আর দুনিয়া তোমার জন্য বিপদজনক হয়ে দাঁড়াবে।"
তিরমিযী কর্তৃক রিওয়ায়েত কৃত নবী করীম (সা)-এর হাদীস তাঁর উক্তির সমর্থন করে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন:
مَنْ أَصْبَحَ وَالْآخِرَةُ أَكْبَرُ هَمِّهِ جَمَعَ اللَّهُ لَهُ شَمْلَهُ وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَآتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَغِمَةً - وَمَنْ أَصْبَحَ وَالدُّنْيَا أَكْبَرُ هَمه فَرَّقَ اللهُ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا كَتَبَ لَهُ - (ترمذی)
“যে ব্যক্তির এমতাবস্থায় ভোর শুরু হয যে, আখিরাতের চিন্তাই হয় তার মূখ্য বিষয়, আল্লাহ পাক তার অবস্থা সুসংহত করে দেবেন এবং তার অন্তরে প্রাচুর্যের প্রশান্তি সৃষ্টি করে দেবেন, আর দুনিয়া তার নিকট লাঞ্ছিতাবস্থায় হাযির হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় সকাল করে যে, দুনিয়াই হয় তার মূখ্য উদ্দেশ্য, আল্লাহ তার মালামাল বিচ্ছিন্ন করে দেবেন। আর দারিদ্র্য তার চোখের সামনে উপস্থিত হবে। বস্তুত দুনিয়াতে সে পরিমাণই পাবে, আল্লাহ পাক তার জন্য যে পরিমাণ লিখে রেখেছেন।"
প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসের মূল ভাবধারা কুরআনে হাকীমেও নিহিত বিদ্যমান যেমন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلا لِيَعْبُدُونِ - مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونَ - إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِيْنِ - (سورة الذاريت : ٥٨-٥٦)
"আমার দাসত্ব ও নিরঙ্কুশ আনুগত্যের জন্যই আমি সৃষ্টি করেছি মানুষ এবং জিনকে। তাদের নিকট থেকে আমি রিযক চাই না আর এও কামনা করি না যে, তারা আমার আহার্য যোগাবে। একমাত্র আল্লাহই রিস্ক দান করেন এবং তিনি প্রবল পরাক্রমশালী সত্তা।” (সূরা আজ জারিয়াত: ৫৬-৫৮)

টিকাঃ
১. টীকা: আমীর ও শাসক ব্যতীত জনগণ কোন অবস্থাতেই জীবন-যাপন করতে পারে না। যেহেতু এমতাবস্থায় একে অন্যের প্রতি জোর-জুলুম ও অন্যায়-অত্যাচার করবে। (পরের পৃষ্ঠা দেখুন) (পূর্বের পৃষ্ঠার পর) ফলে নিজেরা ধ্বংস হয়ে যাবে। কেননা অন্যায় উৎপীড়ন থেকে প্রতিরোধকারী ও রক্ষাকারী কেউ থাকবে না। দুর্নীতিপরায়ণ লোকেরা অবাধে নির্ভয়ে অত্যাচার চালিয়ে যাবে, একে অপরের মালামাল লুণ্ঠন করবে। অতঃপর তাদের মধ্যেও অরাজকতা ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। এভাবে তারা নিজেরাও ধ্বংস হবে আর অন্যদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিয়ে ছাড়বে। সুতরাং এ কারণেই সুলতান তথা শাসক বর্তমান থাকা অতীব জরুরী, যদিও সে জালিম হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতেই বলা হয়েছে, “ষাট বছর পর্যন্ত জালিম শাসকের অধীনে শাসিত হওয়া, শাসন কর্তাবিহীন এক রাত কাটানোর চাইতে উত্তম।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00