📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 বিভিন্ন ধরনের মানহানির কিসাস

📄 বিভিন্ন ধরনের মানহানির কিসাস


মান-সম্মানের কিসাসও বৈধ, গালি দেয়া অপরাধ। এরও বিধিসম্মত কিসাস রয়েছে। কেউ কারো বাপ-দাদা, বংশ ও গোত্রের নামে অশালীন উক্তি এবং বক্তব্য প্রকাশ করলে, বিনিময়ে তারপক্ষে প্রতিপক্ষের বাপ-দাদা, বংশ ও গোত্রের নামে অনুরূপ উক্তি করা জায়েয নয়। কেননা তারা তো তার প্রতি কোন অন্যায় করেনি।
কারো মান-সম্মান ইয্যত-আবরুর প্রতিশোধ গ্রহণ করাটাও শরীয়তসম্মত বিষয়। তা এভাবে, যেমন এক ব্যক্তি কারো উপর অভিসম্পাত বাক্য বর্ষণ করলো অথবা বদ-দু'আ করলো, এর প্রতিশোধস্বরূপ প্রথম ব্যক্তির প্রতি অনুরূপ বাক্যবাণ প্রয়োগ করা দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য বৈধ। কেউ যদি সত্যিকার গালি দেয়, যার মধ্যে মিথ্যার কোন মিশ্রণ নেই, তবে প্রতি উত্তরে সেও গালি দিতে পারে। তবে ক্ষমা করে দেয়াই উত্তম। মহান আল্লাহ বলেন:
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا - فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ - وَلَمَنِ انْتَصَرَ بَعْدَ ظُلْمِهِ فَأُولَئِكَ مَا عَلَيْهِمْ مِّنْ سَبِيلٍ -
"মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দই আর যে ক্ষমা করে দেয় এবং বিরোধ নিষ্পত্তি করে নেয়, তার প্রতিদান আল্লাহর নিকট রয়েছে। আল্লাহ অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না। আর অত্যাচারিত হবার পর যারা প্রতিশোধ গ্রহণ করে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না। (সূরা শূরা: ৪০-৪১) মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন:
الْمُسْتِبَانِ مَا قَالَا فَعَلَى الْبَادِى مِنْهُمَا مَالَمْ يَعْتَدُ الْمَظْلُوْمَ -
"সামনা সামনি যে বলবে তার উপর তাই হবে, কিন্তু সূচনাকারীর উপর কিছু বেশী হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে মজলুমের উপর জুলুম করবে।"
বস্তুত এটাকেই انتصار তথা প্রতিশোধ গ্রহণ বলা হয়। দ্বিতীয়তঃ গালি-গালাজ যদি এমন হয়, যার মধ্যে মিথ্যার কোন লেশ নেই, সেটিও প্রতিশোধ গ্রহণের যোগ্য। যেমন, সে ব্যক্তির নৈতিক চরিত্রে যে দোষ-ত্রুটি রয়েছে সেগুলো প্রকাশ করে দেয়া, অথবা কুকুর, গাধা ইত্যাদি বলা। কিন্তু কেউ যদি কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও মনগড়া দোষারোপ করে তবে, এর প্রতিশোধকল্পে তারও অনুরূপ বানোয়াট কথা ও মিথ্যা দোষারোপ করা জায়েয নয়। কেউ যদি অকারণে কাফির, ফাসিক বলে তবে, একে অনুরূপ কাফির, ফাসিক বলা তার জন্য জায়েয নয়। কেউ যদি কারো বাপ, দাদা, বংশ, গোত্র কিংবা স্বীয় শহরবাসীদের উপর অভিশাপ দেয়, তবে জবাবে তার পক্ষে অনুরূপ বাক্য প্রয়োগ করা বৈধ নয়। এটা অন্যায় ও জুলুম। কেননা, তারাতো তাকে কিছু করেনি। বরং তার উপর অন্যায় অত্যাচার যা কিছু করা হয়েছে সেটা করেছে উপস্থিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর বাণী হলো:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِيْنَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا - اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ للتَّقْوى - (مائده : ۸)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানে তোমরা অবিচল থাকবে, কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ তথা তোমাদের প্রতিশোধ-স্পৃহা যেন এমন মাত্রার না হয় যে, তাতে তোমরা অবিচার করে বসো, বরং তোমরা সুবিচার করো। এটা তাকওয়া অর্থাৎ খোদাভীতির নিকটতর। (সূরা মায়িদা: ৮)
অতএব কারো মানহানি করা, ইয্যত-সম্মান হানির দ্বারা অত্যাচার করা হারাম। বস্তুত এটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অধিকার। কাজেই যদি এ জাতীয় কষ্ট দেয়া হয়, যার প্রতিশোধ নেওয়া সম্ভব- যেমন এক ব্যক্তি অন্য একজনের প্রতি বদ-দু'আ করল, তবে মজলুম ব্যক্তি অতিরঞ্জিত ও বাড়াবাড়ি না করে প্রথম ব্যক্তির উপর সমপরিমাণ বদ-দু'আ করতে পারে। কিন্তু এর সাথে যদি আল্লাহর হক জড়িত থাকে, যেমন সে মিথ্যা বললো, তবে এর জবাবে মিথ্যা বলা তার জন্য জায়েয নয়।
অনুরূপভাবে অধিকাংশ ইসলামী আইনবিদগণ বলেন: কেউ যদি কোন ব্যক্তিকে পুড়িয়ে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করে, অথবা পানিতে ডুবিয়ে মারে, গলাটিপে হত্যা করে কিংবা অন্য কোন পন্থায় প্রাণ নাশ করে, তবে তার প্রতিশোধ গ্রহণার্থে (আদালত কর্তৃক) অনুরূপ পন্থাই অবলম্বন করা যেতে পারে যা সে করেছিল।
অবশ্য লক্ষ্য রাখতে হবে প্রতিশোধমূলক শাস্তিটি যেন হারাম না হয়। যেমন কেউ একজনকে মদ পান করিয়ে দিল, বিনিময়ে সেও তাকে মদ্য পান করিয়ে দিল। অথবা পুংমৈথুন করেছিল, এর বদলে তার সাথেও তার 'লাওয়ালাত' তথা পুংমৈথুন করা।"
কোন কোন ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের মত হলো: পুড়িয়ে মারা, পানিতে ডুবিয়ে মারা এবং গলাটিপে হত্যা করার শাস্তিস্বরূপ তরবারির আঘাতে তার শিরোচ্ছেদের দণ্ড হতে হবে। কিন্তু ইতিপূর্বে এ সম্পর্কিত উল্লেখিত মন্তব্যই কুরআন হাদীসের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যশীল।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 যিনা-ব্যভিচারের অপবাদ দানকারীর শাস্তি প্রসঙ্গে

📄 যিনা-ব্যভিচারের অপবাদ দানকারীর শাস্তি প্রসঙ্গে


মিথ্যা দোষারোপের কোন কিসাস নেই, অবশ্য এর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিবাহিত, আযাদ নিষ্পাপ مسلمانوں প্রতি ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ প্রদানকারীর উপর 'হদ্দে কযফ' জারি হবে না। খোলাখুলি পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তির প্রতি যিনা তথা ব্যভিচারের قاذف অপবাদ দানকারীর উপর حد قذف কফের হদ জারি হবে না, বানোয়াট কথা, মিথ্যা দোষারোপের বিরুদ্ধে কিসাসের বিধান নেই বরং শাস্তির বিধান রয়েছে। মিথ্যা দোষারোপের মধ্যে 'হদ্দে কযফ'ও অন্তর্ভুক্ত যা কুরআন হাদীস ও ইজমার দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহর বাণী হলো-
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا - وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ - إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَالِكَ وَأَصْلَحُوا - فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ - (سورة النور : ٤-٥)
"যারা সতী নারীগণের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, আর এর সপক্ষে চার জন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই সত্য ত্যাগী। তবে এরপর তারা যদি তওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে (সেটার ভিন্ন হুকুম।) আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা নূর: ৪-৫)
কোন সৎ লোকের উপর যদি যিনা কিংবা লাওয়াতাতের (পুংমৈথুন) অপবাদ আরোপ করা হয়, তবে এর উপর 'হদ্দে কযফ' (ব্যভিচারের অপবাদের শাস্তি) ওয়াজিব হবে। তখন তাকে আশিটি বেত্রদণ্ড দেবে। এছাড়া যদি অন্য কিছুর অপবাদ দেয়া হয় তবে তার উপর 'তাযীর' অর্থাৎ শাসনধর্মী শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে।
একান্তভাবে مَقْذُوفُ অপবাদ প্রদত্ত ব্যক্তি এই হদের অধিকারী। কাজেই এ হদ তখনই জারী হবে, যখন সে হদ জারী করবার আবেদন করবে। এটা বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত ঐকবদ্ধ রায়। অপবাদ প্রাপ্ত ব্যক্তি যদি ক্ষমা করে দেয়, তবে হদ মাফ করা যাবে। এ ব্যাপারেও আলিমগণের নিরংকুশ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কেননা এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির হক প্রবল। যেমন মালের কিসাস ইত্যাদি ব্যক্তির হক। আবার কেউ কেউ বলেন, হদ মাফ হবে না। যেহেতু এতে আল্লাহর হকও জড়িত রয়েছে। কাজেই অন্যান্য হদের ন্যায় এটিও মাফ হবে না।
'হদ্দে কযফ' তখনি কার্যকর হবে, 'মাকযূফ' (যার বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া হয়েছে সে) যদি বিবাহিত, মুসলমান, মুক্ত এবং নিষ্কলঙ্ক হয়। সুতরাং বিভিন্ন অপবাদ ও পাপাচারে কলংকিত ব্যক্তির প্রতি অপবাদ দিলে হদ্দ জারী হবে না। অনুরূপভাবে কাফির ও গোলামের উপর মিথ্যা অপবাদ খাড়া করলেও হদ জারী হবে না। অবশ্য তাদের উপর 'তাযীর' কার্যকর করতে হবে। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর ব্যভিচারের অভিযোগ প্রকাশ করা জায়েয- যদি স্ত্রী ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং যদিও যিনার কারণে গর্ভবতী না হয়। কিন্তু যিনার দ্বারা যদি স্ত্রী অন্তসত্তা হয়ে পড়ে আর সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে যায়, তবে স্ত্রীকে ব্যভিচারে অভিযুক্ত করা ফরয। আর "আমার নয়” বলে সন্তান অস্বীকার করে দেবে, যেন পরের জিনিস নিজের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে না পাড়ে।
স্বামী যদি স্ত্রীর উপর যিনার অপবাদ দায়ের করে, তবে স্ত্রী হয়তো যিনার কথা স্বীকার করবে নতুবা 'লি'আন' করবে, যা কুরআন হাদীসে বর্ণিত রয়েছে। কাযফ অর্থাৎ, অপবাদ দানকারী যদি গোলাম হয় তবে, তার উপর অর্ধেক হদ জারী হবে। যিনা-ব্যভিচার ও মদ্য পানের সাজার বেলায়ও এ একই হুকুম জারী হবে যে, তাকে অর্ধেক সাজা দিতে হবে। তাই গোলাম-বাঁদী সম্পর্কে কুরআনের ইরশাদ হলো:
فَإِنْ آتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ - "বিবাহিতা হবার পর যদি তারা ব্যভিচার করে তবে তাদের (গোলাম-বাঁদীদের) শাস্তি হবে স্বাধীন নারীর অর্ধেক।" (সূরা নিসা: ২৫)
কিন্তু যে হদ্দের সাজায় কতল করা অথবা হাত কাটা ওয়াজিব, সে ক্ষেত্রে সাজা অর্ধেক হবে না; বরং পূর্ণ সাজা কার্যকর করতে হবে- অর্থাৎ প্রাণদণ্ড পরিপূর্ণরূপে কার্যকর করতে হবে এবং হাতও যতটুকু কাটা দরকার ততটুকুই কাটতে হবে, এ ক্ষেত্রে সাজা আধাআধি করা যাবে না।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও অধিকার

📄 স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও অধিকার


স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গমাধিকার, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, মোহর, খোরপোষ ও সাংসারিক বিষয়াদির পারস্পরিক হক এই পরিচ্ছেদেরই বিষয় বস্তু।
দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পাস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং একে অপরের হক বা অধিকার যথাযথ আদায়কল্পে আল্লাহর হুকুমের উপর আমল করা উভয়ের উপর ওয়াজিব। মহান আল্লাহর বাণী হচ্ছে:
فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفِ أَوْ تَصْرِيحٌ بِإِحْسَان - (سورة البقرة : ٢٢٩)
"অতঃপর স্ত্রীকে হয় বিধিমত (নিজ সান্নিধ্যে) রেখে দেবে অথবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দেবে।” (সূরা বাকারা: ২২৯)
স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের উপর ফরয হলো- দাম্পত্য জীবনে খুশীমনে, প্রফুল্লচিত্তে একে অপরের অধিকার যথাযথ আদায়ে যত্নবান হওয়া। স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর হক রয়েছে। স্বামীর জীবদ্দশায় তা হলো, মোহর ও খোরপোষ। দৈহিক অধিকার হলো, স্বামী বৈধ ও বিশুদ্ধ পন্থায় স্ত্রীর যৌন চাহিদা মিটাবে, তাকে যথাযথ ব্যবহার করবে। এ ব্যাপারে স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে 'ঈলা' তথা- "মিল করবে না” বলে কসম খায় তাহলে ঐ অবস্থায় সর্বস্তরের আলিমগণের সর্বসম্মত ঐকমত্যে স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার পাবে। স্বামী যদি কর্তিত পুরুষাঙ্গ বিশিষ্ট অথবা নপুংসক হয় এবং সঙ্গমে অক্ষম হয়, তবুও স্ত্রীর সাথে সঙ্গম একই বিছানায় অবস্থান করা তার উপর ওয়াজিব। কেউ কেউ বলেছেন, এর কারণ যদি জন্মগত হয় তবে, তার উপর সঙ্গম করা ওয়াজিব নয়। কিন্তু বিশুদ্ধ মত এটাই যে, সঙ্গম করা ওয়াজিব। কুরআন হাদীস ও শরীয়তের মৌল নীতি (اصول شریعت) এ মতেরই সমর্থনকারী। নবী করীম (সা) আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা)-কে দেখলেন, তিনি বেশী পরিমাণে রোযা রাখেন এবং নামাযে অধিক সময় ব্যয় করেন, তখন হুযুর (সা) বলেন যে, إِنْ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقَّ “তোমার উপর তোমার স্ত্রীরও হক রয়েছে।"
সুতরাং সঙ্গম করা ওয়াজিব। কিন্তু কতদিন অন্তর এ সঙ্গম করতে হবে? এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, অন্তত চার মাস অন্তর একবার সঙ্গম করা ওয়াজিব। কেউ বলেছেন, না- বরং স্বামীর শক্তি এবং স্ত্রীর চাহিদা অনুপাতে ওয়াজিব, যেভাবে ওয়াজিব হয় খোরপোষ। বস্তুত এটাই হলো সঙ্গত মীমাংসা। পক্ষান্তরে স্ত্রীর উপরও স্বামীর অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ, যখন ইচ্ছা সে স্ত্রী ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু শর্ত হলো, স্ত্রীর যেন কোন ক্ষতি না হয় কিংবা অন্য কোন ওয়াজিব হক আদায় করতে অক্ষম না হয়। স্বামীকে তার মনে তৃপ্তিদায়ক মিলনের সুযোগ দেয়া স্ত্রীর কর্তব্য। অধিকন্তু স্বামীর অনুমতি কিংবা শরীয়তের অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর স্বামীগৃহ ত্যাগ করা নিষিদ্ধ।
সাংসারিক কাজ-কর্মের ব্যাপারে ফকীহদের মতভেদ রয়েছে। যেমন বিছানা বিছানো, ঘরদোর ঝাড়ু দেয়া, ঘরবাড়ী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, ভাত-তরকারী ও রান্না-বান্না করা ইত্যাদির ব্যাপারে ইসলামী আইনবিদদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কারও মতে স্ত্রীর উপর এসব কাজ করা ওয়াজিব। আবার কারও মতে ওয়াজিব নয়। অপর এক শ্রেণী বলেন, মধ্যম ধরনের সেবা করাটাই স্ত্রীর উপর ওয়াজিব।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ধন-সম্পদের মীমাংসায় ন্যায়দণ্ড বজায় রাখা

📄 ধন-সম্পদের মীমাংসায় ন্যায়দণ্ড বজায় রাখা


ধন-সম্পদের মীমাংসা ন্যায়ের ভিত্তিতে করতে হবে, আচার-ব্যবহারে ন্যায়-নীতি অবলম্বন সুখ-শান্তির মূলমন্ত্র এবং দুনিয়া ও আখিরাত এ দ্বারাই পরিশুদ্ধ হয়।
আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা)-এর নির্দেশ অনুসারে ধন-সম্পদের মীমাংসা ন্যায়-নীতির ভিত্তিতেই করতে হবে। যেমন, ওয়ারিশদের মধ্যে সুন্নাহর আলোকে মীরাস বণ্টন করা কর্তব্য। অবশ্য যদিও এর কোন কোন মাসআলাতে মতভেদ রয়েছে। এমনিভাবে লেনদেন, আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে যথা- ক্রয়-বিক্রয়, ইজারা, উকিল নিযুক্তি, শরীকী কারবার, হেবা, ওয়াক্ফ্ফ, ওয়াসীয়ত ইত্যাদিতে ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত ফয়সালা করা ওয়াজিব। আর যে সকল লেনদেনে ক্রয়-বিক্রয় এবং হস্তগত করা শর্ত, সেসব ক্ষেত্রে ন্যায়-ইনসাফ কায়েম করা ওয়াজিব। কেননা ইনসাফের উপর জগতের স্থিতি নির্ভরশীল। এর অবর্তমানে ইহজগত ও পরজগতের স্বচ্ছতা- পরিশুদ্ধতা আসতেই পারে না। এ সকল ক্ষেত্রে ন্যায় ইনসাফের প্রয়োজনীয়তা বিবেকবান মাত্রই বুঝতে সক্ষম। যেমন, ক্রয় করা বস্তুর মূল্য সঙ্গে সঙ্গে আদায় করা খরিদদারের উপর ওয়াজিব। অপর পক্ষে বিক্রেতার ওয়াজিব হলো বিক্রিত মাল ক্রেতার হাতে সোপর্দ করে দেয়া। আর ওযনে কম-বেশী করা সম্পূর্ণ হারাম। কেনা-বেচার ক্ষেত্রে সত্য বলা, সঠিক বিবরণ দেয়া ওয়াজিব। পক্ষান্তরে মিথ্যা বলা, খিয়ানত করা, বিশ্বাস ভঙ্গ করা, ভেজাল দেয়া ও ধোঁকা দেয়া হারাম। ঋণ আদায় করা, ঋণদাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ও তার প্রশংসা করা ওয়াজিব।
যে সমস্ত আচার-আচরণ, ব্যবহার কুরআন হাদীস দ্বারা নিষিদ্ধ, সাধারণত সেগুলোতে ন্যায়-নীতি বা ইনসাফ কার্যকর হয় না, নিষিদ্ধ কর্মে কম-বেশী জুলুম ও অন্যায় হয়ে থাকে। যেমন- অন্যায় আয়-উপার্জন করা। যথা, সুদ, জুয়াখেলা। এগুলো নবী করীম (সা) কর্তৃক নিষিদ্ধ। সুতরাং সকল প্রকার জুয়া ও সুদ হারাম। অধিকন্তু ধোঁকা ও শঠতার মাধ্যমে বেচা-কেনা হারাম। উড়ন্তু পাখী (না ধরেই) বিক্রি করা, পানির নীচের মাছ না ধরেই বিক্রি করা, মেয়াদ ঠিক না করে বিক্রি করা, আন্দাজ-অনুমান কোন জিনিস বিক্রি করা, খাঁটি বলে ভেজাল মাল ও নষ্ট মাল বিক্রি করা, খাওয়ার যোগ্য হওয়ার পূর্বেই ফল বিক্রি করা, নাজায়েয পন্থায় শরীকী কারবার করা, যেসব লেন-দেনের ফলে মুসলমানদের মধ্যে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়, আর যাতে কোন না কোন প্রকারের ক্ষতিকর বিষয় বর্তমান থাকে, সন্দেহজনক বেচা-কেনা, আর সেসব বেচা-কেনা, যেগুলো কিছু লোক বৈধ ও ন্যায়ানুগ মনে করে আর কিছু লোক অন্যায় ও জুলুম মনে করে, এসব বেচা-কেনা ফাসেদ। রাষ্ট্রীয়ভাবে এগুলো বাতিল হওয়া ওয়াজিব ও জরুরী। তাই এগুলো থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য। আল্লাহ বলেন:
أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ - فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ - إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَالِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً - (سورة النساء : ٥٩)
"যদি তোমরা আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস কর, তবে তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূল এবং তোমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তাদের আনুগত্য কর, কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে সে বিষয়ে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নীতি আদর্শের শরণাপন্ন হও। এটাই উত্তম এবং ব্যাখ্যায় সুন্দরতর।" (সূরা নিসা: ৫৯)
এ ক্ষেত্রে মূল নীতি হলো যেসব লেনদেন কাজ-কারবার কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী হারাম সেগুলো হারাম। আর যে ইবাদত শরীয়তসম্মত ও কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সেটি ইবাদত। মহান আল্লাহ সেসব লোকের নিন্দা করেছেন, যারা এমন জিনিস নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিল, যা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ হারাম করেননি। পক্ষান্তরে তারা এমন সব বস্তু নিজেদের জন্য জায়েয ও বৈধ করে নিয়েছিল, যেগুলো জায়েয হওয়ার শরীয়তসম্মত কোন দলীল প্রমাণ ছিল না।
اللَّهُمَّ وَفِّقْنَا لأَنْ نَجْعَلَ الْحَلالَ مَا حَلَلْتَهُ - وَالْحَرَامَ مَا حَرَّمْتَهُ - وَالدِّيْنَ مَا شَرَّعْتَهُ -
"হে আল্লাহ! আপনি যেই বস্তু হালাল করেছেন, সেইটি হালাল হিসাবে গণ্য করার সামর্থ্য আমাদের দান করুন। তেমনি আপনি যা হারাম করেছেন, সেইটি হারাম হিসাবে গণ্য করার তওফীক আমাদের প্রদান করুন।"
আর তওফীক দিন খোদা সেই বিধি ব্যবস্থা মেনে চলার, যা তুমি বিধিবদ্ধ করে দিয়েছ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00