📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ফরয-ওয়াজিবের উপর আমল ও হারাম থেকে রক্ষার জন্যেই শাস্তি

📄 ফরয-ওয়াজিবের উপর আমল ও হারাম থেকে রক্ষার জন্যেই শাস্তি


ফরয-ওয়াজিবের উপর আমল করার এবং হারাম বিষয় থেকে রক্ষার জন্যই শাস্তি দণ্ড নির্ধারিত করা হয়েছে। কাজেই এমন আকর্ষণীয় জিনিস তুলে ধরা চাই যা জনগণকে কল্যাণ ও আনুগত্যের দিকে উৎসাহিত করে। অপরদিকে মন্দের প্রতি উৎসাহ দানকারী বিষয় বস্তু থেকে জনগণকে বিরত রাখা প্রয়োজন।
হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং ওয়াজিবের উপর আমল করার জন্যই শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যের সহায়ক প্রতিটি বস্তুই শরীয়তসম্মত করা হয়েছে। সুতরাং এমন পন্থা অবলম্বন করা উচিত, যদ্বারা কল্যাণকর পথ ও আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধি পায় এবং এর সহায়ক ও সাহায্যকারী বলে প্রমাণিত হয়। জনগণকে কল্যাণ ও আনুগত্যের দিকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সম্ভাব্য সকল পন্থা অবলম্বন করাই বাঞ্ছনীয়। যথা, স্বীয় সন্তান ও পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করা আর রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও শাসনকর্তার পক্ষে জনগণের জন্য ব্যয় করা প্রয়োজন। কিন্তু তা এমন ধারায় ব্যয় করা চাই যাতে তাদের চেতনাবোধ উৎসাহিত ও উজ্জীবিত হয়। টাকা পয়সা ধন-সম্পদ কিংবা প্রশংসা দ্বারাই হোক অথবা বিকল্প কোন পন্থায় হোক। এ কারণেই উট-ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা, তীর-বর্শা চালানো ইত্যাদিতে শক্তি ব্যয় ও শরীর অনুশীলন করাকে শরীয়তসম্মত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মহানবী (সা) নিজে এবং খোলাফায়ে রাশেদীন ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন। এমনকি বায়তুল মালের ঘোড়া পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় আনা হতো। মুয়াল্লাফাতুল কুলুবের অবস্থায়ও অনুরূপ যে, তাদের সাথেও নম্র ব্যবহার ও শিষ্টাচার প্রদর্শন করা উচিত। এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে: এক ব্যক্তি পার্থিব লাভের উদ্দেশ্যেই সকালবেলা ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু সন্ধ্যাবেলা সে এমন নিষ্ঠাবান ও খাঁটি মুসলমানে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে যে, দুনিয়ার সকল বস্তু, সকল মানুষের তুলনায় একমাত্র ইসলাম তার প্রাণপ্রিয় বস্তুতে পরিণত হয়।
দুষ্কর্ম ও গুনাহর বেলায়ও অবস্থা একই। কাজেই সমাজে পাপ অপরাধ প্রবণতা ও অন্যায়ের শিকড় নির্মূল করে ফেলা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের উচিত। অন্যায় অপরাধের সকল রাস্তা, যাবতীয় ছিদ্র বন্ধ করে দেয়া একান্ত কর্তব্য। গুনাহ পাপের পথে উৎসাহ দানকারী সকল কার্যকলাপ পূর্ণ শক্তিতে রোধ করার সংগ্রাম চালু রাখা ততক্ষণ পর্যন্ত জরুরী যতক্ষণ না এর বিপরীত নিশ্চুপ বসে থাকা ও নীরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণের বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ পরিলক্ষিত হয়। মহানবী (সা) এর বাণী থেকেই এর দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায়। তিনি বলেছেন-
لَا يَخْلُونَ الرَّجُلُ بِإِمْرَأَةِ فَإِنَّ ثَالِثَهَا الشَّيْطَنُ -
"কোন পর পুরুষ কোনো পর স্ত্রীলোকের সাথে নির্জন সান্নিধ্যে একত্রিত হবে না। কেননা শয়তান তাদের সঙ্গী হিসেবে তৃতীয় জন হয়ে যায়।”
তিনি আরো বলেন,
لا يَحِلُّ لِإِمْرَأَةٍ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيْرَةَ يَوْمَيْنِ إِلَّا مَعَهَا زَوْجَ أَوْ ذُو حَرَمٍ -
“যে নারী আল্লাহ এবং আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে, স্বামী কিংবা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ জায়েয নেই) ব্যতীত তার পক্ষে দু'দিনের দূরবর্তী স্থানে সফর করা জায়েয নেই।"
নবী করীম (সা) পরনারীর সাথে সাক্ষাৎ করা এবং তার সাথে একাকী সফর করা থেকে এ কারণেই নিষেধ করেছেন যেন, (সমাজ থেকে) অন্যায়, অপরাধ ও পাপাচারের মূলোৎপাটিত হয়ে যায়।
ইমাম শা'বী থেকে বণিত আছে- 'আবদুল কায়স' গোত্রীয় প্রতিনিধি দল হুযূর (সা) এর দরবারে উপস্থিত হয়। একটি সুশ্রী সুদর্শন যুবকও তাদের দলে শামিল ছিল। তাকে দেখার পর তিনি যুবকটিকে তাঁর পেছনে বসার হুকুম দিলেন এবং বললেন: এ দৃষ্টিই ছিল হযরত দাউদ (আ) এর ভুলের কারণ।
ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) একবার জনৈকা মহিলার কবিতা আবৃত্তি শুনলেন, যার একটি শ্লোক ছিল-
هَلْ مِنْ سَبِيلِ إِلَى خَمْرٍ فَأَشْرَبَهَا - هَلْ مِنْ سَبِيلِ إِلَى نَصْرِ بْنِ حَجَّاج ؟
"পান করার মত সুরা লাভের কোন উপায় কি আছে গো...? নসর ইবনে হাজ্জাজের সাক্ষাৎ লাভের কোন উপায় কি আমার হবে গো...?"
হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) নসর ইবনে হাজ্জাজকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠালেন- সে একজন সুন্দর সুঠাম, অমলকান্তি যুবাপুরুষ। হযরত ওমর (রা) তার মাথা মুণ্ডন করেছিলেন। কিন্তু এতে তার চেহারায় উজ্জ্বল ও কমনীয়তা আরো বেড়ে গেল। অবশেষে তিনি তাকে দেশ ত্যাগের হুকুম দিলেন, যেন মদীনার রমণীকুল ফিতনায় পতিত না হয়।
অন্যত্র হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, কোন এক লোক সম্পর্কে তিনি জানতে পারলেন যে, তার সান্নিধ্যে বালকেরা উঠাবসা করে থাকে। ছেলেদেরকে তিনি তার নিকট বসতে এবং যাতায়াত করতে নিষেধ করে দিলেন।
হযরত ওমর (রা) এমন লোকের সান্নিধ্য ও সংসর্গে গমনকরতে নিষেধ করতেন যার ফলে নারী-পুরুষের ফিতনায় পতিত হওয়ার আশংকা হতো কিংবা এর কারণ ঘটত। এমন সব বালকের অভিভাবকের কর্তব্য হলো, বিনা দরকারে তাদেরকে বাইরে যেতে না দেয়া, সেজে গুজে থাকতে ও সুগন্ধি লাগাতে নিষেধ করা, সাধারণ গোসল খানায় যেতে না দেয়া, একান্ত যদি যেতেই হয়, তবে শরীরের কাপড় যেন না খোলে এবং গান বাদ্যের আসরে শরীক হওয়া থেকে তাদের বিরত রাখে। এসব ব্যাপারে তাদেরকে কঠোর শাসন ও তদারকীতে রাখা বিশেষ প্রয়োজন।
এভাবে যে ব্যক্তি সম্পর্কে প্রকাশ্য অভিযোগ পাওয়া যায় যে, সে আকাম কুকাম ও পাপাচারে অগ্রণী, তাকে সুন্দর সুশ্রী গোলামের অধিকারী বা মালিক হতে বিরত রাখতে হবে আর এ ধরনের গোলাম থেকে তাকে পৃথক করে দিতে হবে। কেননা, ফকীহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, প্রসিদ্ধ ও প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। আর তার সাক্ষ্য সম্পর্কে প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ করার বৈধ অধিকার রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সম্মুখ দিয়ে এক ব্যক্তির জানাযা গমন করলে উপস্থিত লোকেরা তার প্রশংসা বাক্য উচ্চারণ করলো। তিনি বললেন : وَجَبَتْ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।” অতঃপর অপর একটি জানাযায় গমন করলে লোকেরা মন্তব্য করল- “এ ছিল অতিশয় মন্দ লোক।” তিনি বললেন : وَجَبَتْ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে রাসূলুল্লাহ। উভয়ের সম্পর্কে আপনি বললেন- وَجَبَتْ - এর কারণ কি এবং কি জিনিস ওয়াজিব হলো। তিনি ইরশাদ করলেন-
هُذِهِ الْجَنَازَةُ اثْنَيْتُمْ عَلَيْهَا خَيْرًا فَقُلْتُ وَجَبَتْ لَهَا الْجَنَّةُ. وَهُذِهِ الْجَنَازَةُ اثْنَيْتُمْ عَلَيْهَا شَرًا وَجَبَتْ لَهَا النَّارُ - أَنْتُمْ شُهَدَاءُ لِلَّهِ فِي الْأَرْضِ -
"প্রথম জানাযাটির তোমরা প্রশংসা করেছ, তাই আমি বলেছি তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় জানাযাটি সম্পর্কে তোমরা নিন্দাবাদ করেছ, কাজেই আমি বলেছি তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেছে। কেননা যমীনের বুকে তোমরা আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ।”
নবী করীম (সা) এর যমানায় জনৈকা দূরাচারী নারী প্রকাশ্যে পাপাচার করে বেড়াতো, তার সম্পর্কে তিনি বলতেন- لَوْ كُنْتُ رَاحِمًا أَحَدًا بِغَيْرِ بَيِّنَةٍ لَرَجَمْتُ هُذِهِ -
"সাক্ষী ছাড়াই কাউকে যদি আমি 'রজম' (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করতাম, তবে এ নারীটিকে আমি অবশ্যই রজম করতাম।” এর কারণ হলো, শরীয়তে সাক্ষী কিংবা স্বীকারোক্তি ব্যতীত 'হদ' কায়েম করার বিধান নাই। কিন্তু এমন চরিত্রের লোকের সাক্ষী ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে চাক্ষুষ দর্শনের কোন প্রয়োজন নাই বরং এর জন্য সাধারণ জনশ্রুতিই যথেষ্ট। আর জনশ্রুতি যদি অপেক্ষাকৃত কম হয় তবে, তার সঙ্গী-সাথী ও বন্ধু-বান্ধবের প্রতি লক্ষ্য করে প্রমাণ দাঁড় করাতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন- اعْتَبِرُوا النَّاسَ بِأَخْدَانِهِمْ -
"মানুষকে তার বন্ধু গুণে বিচার কর।"
অর্থাৎ দেখতে হবে যেই চরিত্রের লোকদের সাথে তার মেলামেশা উঠা-বসা, সে চরিত্র মানেই তার মূল্যায়ন করতে হবে। কোন্ চরিত্রের লোকেরা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু? মন্দা চরিত্রের হলে এ থেকে বেঁচে থাকা প্রয়োজন, যেমন শত্রু থেকে আত্মরক্ষা করা দরকার। এ প্রসঙ্গে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেছেন- احْتُرِسُوا النَّاسَ بِسُوْءِ الظَّنِّ -
"মানুষের কু-ধারণা থেকে তোমরা বেঁচে থাক।"
এটা হযরত উমর (রা)-এর নির্দেশ। তবে কু-ধারণার ভিত্তিতে কোন প্রকার সাজা দণ্ড প্রদান জায়েয নেই।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 অশ্লীলতা, হত্যাকাণ্ড, নিকটাত্মীয়, দুর্বল, পর সম্পদ জবর দখল থেকে দূরে থাকা

📄 অশ্লীলতা, হত্যাকাণ্ড, নিকটাত্মীয়, দুর্বল, পর সম্পদ জবর দখল থেকে দূরে থাকা


এ অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় হলো, হদ ও অধিকার, বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, কিয়ামতের দিন সর্বাগ্রে অন্যায় হত্যার বিচার হবে, 'কিসাস' বা হত্যার প্রতিশোধ নেয়াতে নব জীবনের অবকাশ বিদ্যমান রয়েছে। অধিকন্তু কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির হত্যার কিংবা অধিকারের বিনিময়ে কারো প্রাণদণ্ড বিধান করা ইত্যাদি।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী হলো- قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا - وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِّنْ إِمْلَاقٍ - نَحْنُ - نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ - وَلَا تَقْرَبُو الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ - وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذَالِكُمْ وَصَبُّكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ - وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ - وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ - لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا - ذَالِكُمْ وَصَكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ - وَإِنْ هُذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ - ذَالِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ - (سورة الانعام : ١٥١-١٥٣)
"মানুষকে আপনি বলুন, তোমরা এদিকে আসো। আমি তোমাদেরকে সে জিনিস পড়ে শুনাই যা তোমাদের পরওয়ারদিগার তোমাদের উপর হারাম করেছেন। তাহলো এই যে, তাঁর সাথে কোন কিছুকেই শরীক করবে না, মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের ভয়ে নিজেদের সন্তান হত্যা করো না, (কেননা) আমিই তোমাদের আহার যোগাই এবং তাদেরও, আর গোপন কিংবা প্রকাশ্য নির্লজ্জ কার্যকলাপের ধারে কাছেও যাবে না। আল্লাহ যাকে হারাম করেছেন এমন প্রাণ সংহার করবে না, অবশ্য ন্যায় পন্থায় (রাষ্ট্রীয় বিচার পদ্ধতিতে) হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। এ হলো সেসব কথা যা আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন, যেন তোমরা উপলব্ধি করতে পার। অধিকন্তু ইয়াতীমের মালের নিকটেও তোমরা যাবে না। তবে হাঁ কল্যাণকর পন্থায় (যেতে পার), যতদিন না সে যৌবনে পদার্পণ করে আর ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তিতে তোমরা সঠিক ও পরিপূর্ণরূপে ওজন করবে এবং মাপ দেবে, সাধ্যের বাইরে আমি কারো ওপর (দায়িত্বের বোঝা) অর্পণ করি না। যখন তোমরা কথা বল, তখন ন্যায় কথা বলবে, যদিও নিকটাত্মীয়ই হোক এবং আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা অঙ্গিকার পূর্ণ কর। এ হলো সেসব বিষয় আল্লাহ তা'আলা যেগুলোর হুকুম দিয়েছেন, যেন তোমরা এসব থেকে উপদেশ গ্রহণ কর। বস্তুতঃ এটাই হলো আমার সরল-সোজা পথ। কাজেই তোমরা এরি অনুসরণ কর, অন্যায় পথসমূহের অনুসরণ করবে না। অন্যথায় (এ অনুসরণ) তাঁর রাস্তা থেকে তোমাদেরকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে। এ হলো সেকথা আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যার নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাও।” (সূরা আন'আম : ১৫১-১৫৩)
মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَأَ ..... إِلَى قَوْلِهِ - وَمَنْ يُقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاءُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا - (سورة النساء : ٩٢-٩٣)
"কোন মুসলমান অপর কোন মুসলমানকে হত্যা করা জায়েয নয়, কিন্তু তবে ভুলবশতঃ হলে সেটা স্বতন্ত্র। ..... আর যে ব্যক্তি জ্ঞাতসারে কোন মুসলমানকে হত্যা করবে, তার প্রতিফল হল জাহান্নام। যেখানে সে অনাদি-অনন্তকাল বাস করবে, আল্লাহ তা'আলার গযব এবং অভিশাপ তার উপর পতিত হবে। তদুপরি আল্লাহ তা'আলা তার জন্য বড় কঠিন আযাব তৈরী করে রেখেছেন।" (সূরা নিসা: ৯২-৯৩)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
مِنْ أَجْلِ ذَالِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا - وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا - (سورة المائده : ٣٢)
"এ কারণেই বনী ইসরাঈলকে আমি এ মর্মে নির্দেশ দিয়েছি, যে ব্যক্তি খুনের বদলে কিংবা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির শাস্তিস্বরূপ নয়, বরং অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে, সে যেন গোটা মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করলো। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করলো, বস্তুতঃ সে যেন গোটা মানব জাতির জীবন বাঁচিয়ে দিল।" (সূরা মায়েদা :৩২)
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন-
أَوَّلُ مَا قَضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي الدِّمَاءِ - (بخاری - مسلم ) .
"কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম অন্যায় হত্যার বিচার করা হবে।” প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য হত্যা তিন প্রকার-
(১) কতলে আমাদ (ইচ্ছাকৃত হত্যা); যাতে ভুল-ভ্রান্তি কিংবা ভুল সাদৃশ্য হওয়ার সম্ভাবনার কোন অবকাশ নেই। যার ব্যাখ্যা হলো, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সাধারণতঃ যেভাবে হত্যা করা হয়ে থাকে যেমন তরবারী, খঞ্জর, ছুরি, হাতুড়ি, বেলচা, কোদাল, কুড়াল, ঢাল ইত্যাদির আঘাতে কিংবা গুলি ছুড়ে কাউকে হত্যা করা, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে কিংবা পানিতে ডুবিয়ে মারা অথবা কোনও উঁচু স্থান হতে নীচে ফেলে হত্যা করা, গলাটিপে, অণ্ডকোষে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে অথবা মুখচেপে হত্যা করা কিংবা বিষপ্রয়োগে কারো প্রাণ হরণ করা। সুতরাং এ জাতীয় খুনের বদলে হদ জারী করতে হবে অর্থাৎ, হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করতে হবে। কিন্তু নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণ এ ক্ষেত্রে তিনটির যে কোন এক পন্থা অবলম্বনের পূর্ণ অধিকার পাবে- (১) চাই তাকে হত্যা করুক কিংবা (২) ক্ষমা করে দিক, অথবা (৩) দিয়‍্যাত তথা রক্তমূল্য গ্রহণ করতঃ ছেড়ে দিক। কিন্তু নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণের পক্ষে হত্যাকারী ব্যতিরেকে অপর কাউকে হত্যা করা জায়েয নয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহর বাণী-
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ - وَمَنْ قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ سُلْطَانًا فَلَا يُسْرِفْ فِي الْقَتْلِ - إِنَّهَ كَانَ مَنْصُورًا - (سورة بني اسرائيل : (۳۳)
"আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন বৈধ কারণ ব্যতীত তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করো না। আর যে ব্যক্তি মজলুম ও অন্যায় পথে নিহত হয়, আমি তার ওয়ারিশকে অধিকার দিয়েছি। কাজেই (প্রতিশোধমূলক) হত্যার বেলায় সে যেন অন্যায় বাড়াবাড়ি না করে। কেননা (প্রাপ্য প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে) তারই জিত, সে-ই সাহায্য প্রাপ্ত।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৩)
অত্র আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে, কেবল মাত্র হত্যাকারী। ভিন্ন ধরনের কোন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দান বৈধ নয়। হযরত আবূ শূরায়হ আল খুযাঈ (রা) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলেছেন-
مَنْ أُصِيْبَ بِدَمٍ أَوْ خَبْلٍ فَهُوَ بِالْخِيَارِ بَيْنَ إِحْدَى ثَلَاثَ فَإِنْ أَرَادَ الرَّابِعَةَ فَخُذُوْا عَلٰى يَدَيْهِ أَنْ يَقْتُلَ أَوْ يَعْفُو أَوْ يَأْخُذَ الدِّيَّةَ فَمَنْ فَعَلَ شَيْئًا مِّنْ ذَالِكَ فَعَادٍ فَإِنَّ لَهُ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيْهَا أَبَدًا -
(اهل السنن وقال الترمذى حديث حسن صحيح) "যদি কোন ব্যক্তি খুন হয় অথবা আশংকাজনক অবস্থায় তাকে পাওয়া যায় এবং পরে সে মারা যায়, এমতাবস্থায় উপায় মাত্র তিনটি, (১) হত্যাকারীর প্রাণদণ্ড দান, (২) তাকে ক্ষমা করে দেয়া, (৩) রক্তমূল্য গ্রহণ করতঃ তাকে ছেড়ে দেয়া। এ তিন পন্থা ছাড়া কেউ যদি চতুর্থ কোন পথ অবলম্বন করে, তবে তার এহেন কাজ অত্যাচারের শামিল, তাই তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, যেখানে সে চিরকাল বাস করবে।” (আহলে সুনান তিরমিযী)
ক্ষমা করা অথবা রক্তমূল্য গ্রহণ করার পর হত্যাকারীকে হত্যা দণ্ড দান অতি কঠিন গুনাহ। এমনকি প্রথম কতল করার চাইতেও জঘন্যতম অপরাধ। এ পর্যায়ে কোন কোন আলিম এও বলেছেন যে, 'হদে'র বিধান অনুসারে তাকে হত্যা করে ফেলতে হবে। কেননা নিহিত ব্যক্তির ওয়ারিশগণের কোন অধিকার নাই রক্ত মূল্য গ্রহণ করার পর তাকে হত্যা করার।"
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী হচ্ছে-
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلٰى - اَلْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَى بِالأنْثَى فَمَنْ عُفِىَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوْفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ - ذَالِكَ تَخْفِيفٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدٰى بَعْدَ ذَالِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ - وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَّاُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ - (سورة البقرة : ۱۷۹-۱۷۸)
“তোমাদের মধ্য হতে নিহত ব্যক্তির প্রাণের বদলে প্রাণদণ্ডের এমন বিধান দেয়া হয়েছে যে, আযাদ ব্যক্তির পরিবর্তে আযাদ, গোলামের বদলে গোলাম আর নারীর বদলে নারীর। অতঃপর নিহতের ভাইয়ের পক্ষ থেকে সে ব্যক্তির কেসাসের কোন অংশ ক্ষমা করে দেয়া হলে, শরীয়তের বিধান মোতাবেক তার নিকট ভদ্রভাবে তাগাদা করা চাই। অপরপক্ষে হত্যাকারী কর্তৃক নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশদের সাথে উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে তা সঠিকভাবে আদায় করে দেয়া উচিত। এটা তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ হতে তোমাদের জন্য অতি সহজ পন্থা এবং বিশেষ দয়াস্বরূপ, এরপরও যদি কেউ সীমা অতিক্রম করে, তার জন্য রয়েছে ভীষণ কষ্টদায়ক আযাবের ব্যবস্থা। আর হে জ্ঞানীজন! কেসাসের মধ্যে রয়েছে “তোমাদের জীবনের নিরাপত্তা”, যেন তোমরা (হত্যাকাণ্ড) থেকে বেঁচে থাক।” (সূরা বাকারা : ১৭৮-১৭৯)
এর বিশ্লেষণে আলিমগণ বলেন, নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশদের অন্তর থাকে ক্রোধ ও প্রতিশোধ স্পৃহায় পরিপূর্ণ। সম্ভব হলে তারা হত্যাকারী ও তার ওয়ারিশদের পর্যন্ত নিধন করতে উদ্যত-উন্মত্ত হয়ে যায়। কাজেই কোন কোন সময় অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, তারা কেবল হত্যাকারীকে খুন করেই নিবৃত্ত থাকে না, বরং ঘাতকের সাথে সাথে তার আত্মীয়-স্বজন এমনকি গোত্রপতি সর্দারদের পর্যন্ত হত্যা করে বসে। এটা অত্যন্ত ভয়াবহ অবস্থা। কেননা হত্যাকারী প্রথম জুলুম করেছিল বটে কিন্তু নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণ খুনের বদলা নিতে গিয়ে এমন সব মাত্রাহীন জুলুম অত্যাচার করে বসে, যা প্রকৃত হত্যাকারীও করে নাই। অধিকন্তু তারা এমন সব কর্মকাণ্ড করে বসে, যা কিনা শরীয়ত বহির্ভূত এবং জাহেলী যুগে পল্লীবাসী কি নগরবাসী সকলেই সমবেতভাবে সে কার্জে শরীক হয়ে পড়তো, আর বংশানুক্রমে তা চলতে থাকতো। নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণ হত্যাকারীর ওয়ারিশদিগকে হত্যা করার চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োগ করতো। এদেরকে আবার বিপক্ষ দল হত্যা করে চলতো। এক পর্যায়ে উভয়পক্ষ নিজ নিজ মিত্র সংগ্রহ করতঃ দলবদ্ধ হয়ে মারামারি কাটাকাটি ও হানাহানির এক প্রাণান্তকর পরিবেশে স্থায়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতো ও দীর্ঘকাল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ জিইয়ে রাখত।
এমনভাবে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার আবরণে গোত্রে গোত্রে হিংসা-প্রতিহিংসার অনির্বাণ শিখা আর শত্রুতার অনলপ্রবাহ অব্যাহত গতিতে বয়ে চলতো। এর মূল কারণ এটাই ছিল যে, তারা ন্যায়-ইনসাফের পথ পরিহার করে “কেসাস” তথা “খুনের বদলে খুন” এ নীতিতে বিশ্বাসী ছিল না এবং এটাকে তারা যথেষ্ট মনে করতো না। ফলে হত্যার আইনগত প্রতিশোধে শরীয়তসম্মত পথে না গিয়ে, তারা ঘটনাকে ব্যাপক গণহত্যার রূপ দিয়ে বসত। অথচ মহান আল্লাহ আমাদের ওপর কেসাস ফরয করে দিয়েছেন, যার উদ্দেশ্য ছিল অন্যায় হত্যার ইনসাফভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজ থেকে অন্যায় অত্যাচার নির্মূল করা।
প্রসঙ্গতঃ এটাও ব্যক্ত করা হয়েছে যে, “কেসাসের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জীবন।” কেননা কেসাসের ফলে হত্যাকারীর ওয়ারিশ অভিভাবকদের রক্তপাত বন্ধ হয়, প্রাণে বেঁচে যায়, ফিৎনা ফাসাদ দূরীভূত হয়। অধিকন্তু কোন ব্যক্তি যদি কাউকে হত্যা করার গোপন ইচ্ছা পোষণ করেও থাকে কিন্তু সে যখন জানতে পারে যে, পরবর্তীকালে তার সাধের প্রাণটাও রক্ষা পাবার নয় এবং কেসাসস্বরূপ নিজেরও মৃত্যু ঘটবে তখন এহেন মারাত্মক ও প্রাণের ঝুঁকি নিতে অবশ্যই সে বিরত থাকবে।
আলী ইবনে আবু তালিব (রা) এবং আমর ইবনে শুয়াইব (র) থেকে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) বলেছেন- الْمُؤْمِنُونَ تَتَكَافَأُ دِمَاءَهُمْ وَهُمْ يَدٌ عَلَى مَنْ سَوَاهُمْ وَيَسْعَى بِذِمَّتِهِمْ أَدْنَاهُمْ أَلَا لَا يُقْتَلُ مُسْلِمٌ بِكَافِرٍ وَلَا ذُو عَهْدٍ فِي عَهْدِهِ - (احمد - ابو داود وغيرهما من اهل السنن)
"সকল মুসলমানের রক্ত সমান, এ ব্যাপারে সবাই একমত, যিম্মীদের সাথে সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের সকলেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। সাবধান! স্বীয় অঙ্গীকারে স্থির থাকা পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ কোন ব্যক্তিকে এবং কাফিরের মুকাবিলায় কোন মুসলমানকে যেন হত্যা করা না হয়।” (আহমদ, আবু দাউদ)
এ সম্পর্কে মহানবী (সা) ঘোষণা করেছেন: ছোট বড় আশরাফ আতরাফ নির্বিশেষে সকল মুসলমানের রক্ত সমপর্যায়ের। আরবীকে অনারব আজমীর উপর, কুরায়শী হাশিমীকে গায়র কুরায়শী হাশিমীর উপর, আযাদ ব্যক্তিকে' আযাদকৃত গোলামের উপর, আলিমকে মূর্খের উপর এবং রাজাকে প্রজার উপর তিনি কোন প্রাধান্য দান করেন নাই। এটা সকল মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ রায় এবং সর্ববাদীসম্মত সিদ্ধান্ত। কিন্তু জাহেলী ধ্যান ধারণার বাহক এবং ইহুদী শাসকগোষ্ঠী এর বিপরীত পন্থা ও ভ্রান্ত নীতির ছত্রছায়ায় স্বার্থবাদী হুকুম জারি করার ফলে সারা আরব জাহান পরস্পর হানাহানি মারামারিতে মেতে উঠে।
মদীনার পার্শ্ববর্তী জনপদে 'বনু নাযীর' ও 'বনু কুরাইযা' ইহুদীদের দুইটি গোত্রের আবাস ছিল। বনু কুরাইযার মুকাবিলায় বনু নাযীর গোত্রের অধিক পরিমাণে খুন হয়েছিল, যে কারণে তারা নবী করীম (সা)-কে বিচারক সাব্যস্ত করেছিল। হদ্দে যিনার হুকুমের মধ্যে ইহুদীরা এ পর্যন্ত পরিবর্তন এনেছিল যে, রজমের পরিবর্তে তারা অপরাধীর গায়ে লোহার দাগ দিত। এরপর ইহুদীরা मुसलमानों নিকট এসে বলতে থাকে, তোমাদের নবী যদি এ হুকুম প্রদান করেন, তবে এটা আমাদের জন্য দলীলস্বরূপ। অন্যথায় একথাই প্রমাণিত হবে যে, তোমরা তাওরাতের হুকুম বর্জন করেছ। এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন-
يَـٰٓأَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنْكَ الَّذِيْنَ يُسَارِعُوْنَ فِى الْكُفْرِ مِنَ الَّذِيْنَ قَالُوْا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِنْ قُلُوْبُهُمْ ... الى قوله -
فَإِنْ جَآءُكَ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ أَوْ أَعْرِضْ عَنْهُمْ وَإِنْ تُعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَنْ يَّضُرُّوْكَ شَيْئًا - وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ - إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ..... الى قوله -
فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِيْ وَلَا تَشْتَرُوْا بِآيَاتِيْ ثَمَنًا قَلِيْلًا . وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْنَ - وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوْحَ قِصَاصٌ - (سورة المائدة : ٤٥ - ٤١)
“হে রাসূল! লোকদের কুফরী তৎপরতা যেন আপনাকে চিন্তিত ও মনঃক্ষুণ্ণ না করে, যারা শুধু মুখে বলে আমরা ঈমান এনেছি, অথচ তাদের অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করেনি...।
কাজেই হে পয়গম্বর! মীমাংসার জন্য যদি তারা আপনার নিকট উপস্থিত হয়, তবে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেয়া না দেয়া আপনার ইচ্ছাধীন, কিন্তু যদি তাদের ব্যাপারে মুখ ফিরিয়ে নেন বা বিরত থাকেন, তবে তারা আপনার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি আপনাকে ফায়সালা করতেই হয়, তবে ন্যায়ের ভিত্তিতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিন, কেননা নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ন্যায় ও ইনসাফকারীকে পছন্দ করেন...।
তোমরা মানুষকে ভয় করবে না, ভয় করবে তো আমাকে করবে, আর আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করো না। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব (এর বিধান মোতাবেক) হুকুম ফয়সালা করবে না, এরাই হলো কাফির। আর তাওরাতে আমি ইহুদীগণকে লিখিত হুকুম দিয়েছিলাম যে, জানের বদলে জান, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং জখমের বদলে একই পরিমাণ জখমের বিধান করতে হবে।” (সূরা মায়িদা : ৪৫-৪৫)
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, সকল প্রাণ একই পর্যায়ভুক্ত, একের উপর অপরের প্রাধান্যের অবকাশ নেই। অথচ ইহুদীরা লেনদেন, আচার-আচরণে এ ধরনের ভেদ নীতির প্রকাশ ঘটিয়ে চলতো।
الى قوله - وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ - لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا الى قوله - أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُوْنَ - وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ - (سورة المائدة : ٥٠-٤٨)
"হে নবী! আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যা এর পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবসমূহের স্বীকৃতি দান করে এবং সেগুলোর হিফাযতকারীও। কাজেই মহান আল্লাহ তোমার উপর যা কিছু নাযির করেছেন এর ভিত্তিতেই তাদেরকে তুমি হুকুম দান কর, কিন্তু তোমার প্রতি নাযিলকৃত সত্য বর্জন করতঃ তাদের কুপ্রবৃত্তি ও খাহেশের আনুগত্য করো না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি বিশেষ পন্থা ও শরীয়ত নির্দিষ্ট করে দিয়েছি...
এখনও কি তারা জাহেলী যুগের হুকুম কামনা করে? (আল্লাহর উপর) বিশ্বাস স্থাপনকারীগণের জন্য আল্লাহর চাইতে উত্তম হুকুমদাতা কে হতে পারে?" (সূরা আল মায়েদা : ৪৮-৫০)
আলোচ্য আয়াতে মহান আল্লাহ ফয়সালা করে দিয়েছেন যে, উঁচু-নীচু নির্বিশেষে সকল মুসলমানের জান-প্রাণ, রক্ত একই মানের সমান পর্যায়ের, অথচ জাহেলী যুগের অধিকাংশ হত্যা-খুন-জখম ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হতো প্রবৃত্তির চাহিদা ও খেয়াল খুশি মতো। ফলে নগর-বন্দর, নিভৃত পল্লীসহ সকল জনপদ এর বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যেত। আপাত দৃষ্টিতে এর কারণ যাই থাকুক কিন্তু মূলত অন্তরের আল্লাহদ্রোহী প্রবণতা এবং বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি, আদল-ইনসাফের কার্যকর ভূমিকা না থাকাই ছিল এর জন্য এককভাবে দায়ী। গোত্রে গোত্রে একে অপরের উপর প্রাধান্য শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভুত্ব কায়েমের প্রতিযোগিতা চলতো অব্যাহত গতিতে- চাই সেটা হত্যা ও খুনের ব্যাপারে হোক কি ধন-সম্পদের বেলায়- একে অপরের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করাকে সম্মান ও গৌরবের বিষয় মনে করা হতো। ন্যায় নীতির কার্যকারিতা জলাঞ্জলি দিয়ে দু'দলের কেউ ধৈর্য, উদারতা ও মহানুভবতার ধার ধারতো না। পক্ষ প্রতিপক্ষ সকলেই একে অন্যের প্রতি অন্যায়-উৎপীড়ন ও জুলুম-নির্যাতন করতো। এক পক্ষ যা করতো প্রতিপক্ষও তার চাইতে কোন অংশে কম করতো না। এই ছিল তৎকালীন সামাজিক ন্যায় বিচারের বাস্তব চিত্র। সুতরাং এমনি এক অস্বস্তিকর ও অরাজক পরিবেশে পবিত্র কুরআন আদল ইনসাফ ও ন্যায়নীতি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে এবং সমকালীন সমাজে প্রচলিত সকল প্রকার জাহেলী আইন-কানুন, হুকুম-আহকাম বাতিল ঘোষনা করেছে। কোন মুজাদ্দিদ কোন সংস্কারক সমাজ সংস্কারের ভূমিকা ও বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে ময়দানে আসলে সূচনাতে আদল-ইনসাফ ও ন্যায়নীতি অবলম্বন করেই তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে। এমনি ধারা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের ফয়সালা হলো-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا - فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى - فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِئَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ - فَإِنْ فَانَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ - إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ - (سورة الحجرات : ۱۰-۹)
"আর মুসলমানদের দু'টি দল যদি পরস্পরে যুদ্ধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দাও। অতঃপর একদল যদি অপর দলের উপর জুলুম অত্যাচার চালায়, তবে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করো যতক্ষণ না তারা আল্লাহর হুকুমের প্রতি ফিরে আসে। অতঃপর যখন তারা প্রত্যাবর্তন করে, তখন সাম্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে উভয়পক্ষে সন্ধি করিয়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ও ইনসাফকারীকে পছন্দ করে থাকেন। মুসলমানগণ তো পরস্পর ভাই ভাই, কাজেই ভাইদের মধ্যে তোমরা আপোষের মিলমিশ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য স্থাপন করে দিও।” (সূরা হুজরাত : ৯-১০)
খুনের বদলার ব্যাপারে সব চাইতে উত্তম পন্থা হলো প্রথমতঃ নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। কেননা কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে: وَالْجُرُوحَ قِصَاصُ - فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ -
"জখমের প্রতিশোধ অনুরূপ জখমই। অতঃপর যে মজলুম ব্যক্তি নিজের উপর কৃত জুলুমের প্রতিশোধ ক্ষমা করে দেয়, তাহলে এটা তার স্বীয় গুনাহর কাফ্ফারা হয়ে যাবে।” (সূরা মায়িদা: ৪৫)
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণি আছে তিনি বলেছেন: مَا رُفِعَ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمْرٌ فِيهِ الْقِصَاصُ إِلَّا فِيْهِ بِالْعَفْو - (ابو داود وغيره)
"কেসাসযোগ্য কোন ঘটনা বা মুকাদ্দমা নবী করীম (সা) এর খিদমতে পেশ করা হলে, তিনি ক্ষমার নির্দেশ দান করতেন।” (আবু দাউদ) সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা) এর রেওয়ায়েত সূত্রে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন: مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِّنْ مَّالٍ وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْو إِلَّا عِزَا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ -
"সাদকার দ্বারা সম্পদের মধ্যে স্বল্পতা আসে না, আর যে ব্যক্তি অপরকে ক্ষমা করে দেয় আল্লাহ অবশ্যই তার মান-সম্মান বাড়িয়ে দেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নম্রতা প্রকাশ করে, আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন।” (মুসলিম)
ইসলামের সাম্যবাদী নীতি সম্পর্কেই আলোচনা হয়েছে, আলোচনায় পরিষ্কার হয়েছে যে, মুসলমান সকলে একই শ্রেণীভুক্ত এবং সাম্যের অধিকারী কিন্তু সমপর্যায়ের ক্ষেত্রে যিম্মী কাফির ও মুসলমান একই স্তরের হতে পারে না, বরং এখানে বিশ্বাসগত পার্থক্য বিদ্যমান। সকল আলিম এ ব্যাপারে একমত। তদ্রূপ কোন যিম্মী কাফির ভ্রমণ কিংবা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মুসলিম অধ্যুষিত শহরে আগমন করলে, সকলের ঐকমত্যে সেও মুসলমানের সমপর্যায়ের হবে না, আর সে মুসলমানের সম-অধিকারের যোগ্য পাত্রও বিবেচিত হবে না।
অবশ্য কোন কোন আলিম মন্তব্য করেছেন যে, যিম্মীর বেলায়ও 'কুফু' তথা ইসলামী সাম্য প্রযোজ্য হবে এবং সে একজন মুসলিম নাগরিকের ন্যায় যাবতীয় সুযোগ সুবিধা ভোগের অধিকার লাভ করবে।
দ্বিতীয় প্রকার, খুন হল "কতলে খাতা” (ভুলক্রমে হত্যা করা), যা شِبْهُ عَمَدَ তথা 'ইচ্ছাকৃত হত্যার' প্রায় অনুরূপ। এ সম্পর্কে মহানবী (সা)-এর ইরশাদ হলো:
أَلَا إِنَّ فِي قَتْلِ الْخَطَاءِ شِبْهُ الْعَمَدِ مَا كَانَ فِي السَّوْطِ وَالْعَصَاءِ مِئَةٌ مِنَ الْإِبِلِ مِنْهَا أَرْبَعُونَ خِلْقَةً فِي بُطُونِهَا أَوْلَادُهَا.
"তোমরা সাবধান! কোড়া কিংবা লাঠির আঘাতে ইচ্ছাকৃত হত্যা অনুরূপ "কতলে খাতার" দণ্ডস্বরূপ একশো উট দিতে হবে। যার মধ্যে চল্লিশটি উটনী হবে (গর্ভধারী) গাভীন।”
বস্তুতঃ একে "শিবে আমাদ" বলা হয়েছে যে, কোড়া কিংবা লাঠি দ্বারা প্রহারকারী জুলুম অবশ্যই করেছে। কেননা আঘাতের বেলায় সে মাত্রার এবং সীমার ভেতর সংযত থাকতে পারেনি। কিন্তু এটাও সত্যও কথা যে, এ ধরনের 'প্রহারে সব সময়ই যে মৃত্যু ঘটবে তা নয়, বরং প্রায়শ এর ব্যতিক্রমও পরিলক্ষিত হয়।
তৃতীয় প্রকারের খুন হলো- "কতলে খাতা” তথা ভুলক্রমে হত্যা করা। যেমন কোন ব্যক্তি শিকারে গুলি বা তীর ছুড়লো কিন্তু তা লেগে গেল কোন মানুষের গায়ে। অথচ এর পিছনে তার আদৌ কোন ইচ্ছা বা পরিকল্পনা ছিল না। যার ফলে এহেন কল্পনাতীত ঘটনাটি ঘটে গেল। তাই এর বিনিময়ে 'হদ' তথা প্রাণদণ্ডের হুকুম জারী হবে না; বরং এরূপ ক্ষেত্রে কাফফারা দিয়াত এবং রক্তমূল্য দেয়াই শরীয়তের বিধান। এ সম্পর্কিত বহু মাসআলা মনীষীগণের সংকলিত বা রচিত গ্রন্থরাজীতে লিখিত রয়েছে।

টিকাঃ
১. টীকা: কেসাসের ফলে হত্যাকারী অধিক হত্যাকাণ্ড করার সুযোগ পায় না।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 জখমের কিসাস ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কিসাস

📄 জখমের কিসাস ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কিসাস


জখমের কিসাস, হাত-পায়ের বিনিময়ে হাত-পা কাটতে হবে, দাঁত ভাঙ্গলে দাঁত ভাঙ্গতে হবে, কারো মাথা কেটে দিলে পরিবর্তে মাথা কাটতে হবে।
জখমের কিসাস বা বদলা লওয়া ওয়াজিব। কুরআন, হাদীস ও ইজমা দ্বারা এটা প্রমাণিত। কিন্তু শর্ত হলো সমতা রক্ষা করার সীমানার ভেতরে থাকতে হবে।
কেউ যদি অপর কারো হাত কব্জা থেকে ভেঙ্গে দেয়, তাহলে বদলাস্বরূপ আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির পক্ষে কব্জা থেকে তার হাত ভেঙ্গে দেয়া জায়েয। যদি কারো দাঁত ভাঙ্গা হয় তবে এর প্রতিশোধে প্রতিপক্ষের দাঁত ভেঙ্গে দেয়া জায়েয। মস্তক এবং মুখমণ্ডল যদি এমনভাবে জখম করে দেয়া হয় যে, ভেতরের হাড় পর্যন্ত দৃষ্ট হয় তবে আঘাতকারীর মুখমণ্ডল ও মাথা সমপরিমাণ হারে জখম করে দেয়া জায়েয। (অবশ্য এসব কিছু বিচার বিভাগের মাধ্যমে হতে হবে।)
বস্তুতঃ জখম যদি এমন পর্যায়ের হয় যে, প্রতিশোধমূলক প্রত্যাঘাতের মাধ্যমে সমতা বিধান করা সম্ভব নয়, যেমন- ভেতরের হাড় ভেঙ্গে ফেলেছে অথবা জখম এ পর্যায়ের যে, ভেতরের হাড় দৃষ্টিগোচর হয় না, এমতাবস্থায় কিসাস গ্রহণ করা যাবে না বরং জখমের আনুপাতিক জরিমানা আদায় করতে হবে।
কিসাস বা প্রতিশোধের ধরন হলো এই যে, হাত দ্বারা আঘাত করবে অথবা লাঠি দ্বারা প্রহার করবে। যেমন, চড়মারা কিংবা কিল-ঘুষি অথবা লাঠি দ্বারা আঘাত করা হবে। আলিমগণের এক অংশের মতে আলোচ্য পরিস্থিতিতে কিসাসের হুকুম প্রযোজ্য হবে না; বরং তাযীর অর্থাৎ শাসন ও শিক্ষামূলক শাস্তি বিধান করতে হবে। যেহেতু এ ক্ষেত্রে আনুপাতিক সমতা বিধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু খুলাফায়ে রাশেদীন এবং অন্যান্য সাহাবীগণের উক্তিতে এ ক্ষেত্রে কিসাসের উল্লেখ শরীয়তসম্মতরূপে লক্ষ্য করা যায়।
ইমাম আহমদ (র) সহ অন্যান্য ইমামগণ এ মতই ব্যক্ত করেছেন এবং নবী করীম (সা)-এর হাদীসও এ ধরনের অর্থব্যঞ্জক। আবূ ফেরাস (র) বলেন: এ সম্পর্কে হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা) একবার হাদীসের উদ্ধৃতি সম্বলিত ভাষণ পেশ করেন, যার ভাষ্য ছিল:
أَلَا إِنِّى وَاللَّهِ مَا أُرْسِلُ عُمَّالِى إِلَيْكُمْ لِيَضْرِبُوا اثَارَكُمْ وَلَا يَأْخُذُوا أَمْوَالَكُمْ وَلَكِنْ أُرْسِلُهُمْ إِلَيْكُمْ لِيُعَلِّمُوكُمْ دِينَكُمْ وَسُنَنَكُمْ فَمَنْ فَعَلَ بِهِ سِوى ذَالِكَ فَلْيَرْفَعَهُ إِلَيَّ - فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ اذا لأُقَصَّنْهُ - حديث عمر (رض)
“সাবধান! তোমরা স্মরণ রেখো, আল্লাহর কসম, শাসনকর্তাগণকে আমি তোমাদের প্রতি এজন্য প্রেরণ করি না যে, তারা তোমাদেরকে প্রহার করে যাবে অথবা তোমাদের ধন-সম্পদ হস্তগত করার উদ্দেশ্যও তাদের প্রেরণ করি না, বরং তোমাদেরকে দ্বীন ও মহানবীর শিক্ষা আদর্শ সম্পর্কে শিক্ষা দানকল্পেই পাঠিয়ে থাকি। সুতরাং তাদের কেউ যদি এর ব্যতিক্রম কোন কাজ করে বসে, তাকে যেন আমার নিকট উপস্থিত করা হয়। সেই সত্তার কসম- আমার প্রাণ যার ক্ষমতার অধীন- ঐসব লোকদের (অত্যাচারী সরকারী কর্মকর্তার) কাছ থেকে আমি ‘কিসাস’ বা প্রতিশোধ নেবই নেব।”
অতঃপর হযরত আমর ইবনুল আস (রা) দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন: হে আমীরুল মু’মিনীন! কোন আমীর বা গভর্ণর যদি मुसलमानों রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং জনগণের চরিত্র গঠন ও নৈতিক শিক্ষাদানে নিয়োজিত থাকে, তার থেকেও কি আপনি কিসাস গ্রহণ করবেন? হযরত উমর (রা) জবাব দিলেন: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! (অনুরূপ অন্যায় করলে) তার থেকেও আমি কিসাস নেব। আর কেবল আমিই কিসাস গ্রহণ করি না- খোদ্ নবী করীম (সা) নিজ প্রাণ ও আপন সত্তা থেকেও কিসাস বা প্রতিশোধ নিতেন। হুশিয়ার! مسلمانوںকে তোমরা মারধর করবে না, তাদেরকে অপমান করবে না, তাদের হক বা অধিকার দাবিয়ে রাখবে না। কেননা এসবের পরিণতিতে তাদের মধ্যে কুফরী প্রবণতা দেখা দেয়া বিচিত্র নয়।” (মুসনাদে আহমদ)
আলোচ্য বর্ণনার সার সংক্ষেপ এটাই যে, হাকিম, বিচারপতি, (আঞ্চলিক) শাসনকর্তা ও গভর্ণরগণ অন্যায়ভাবে কাউকে প্রহার করবে না- দণ্ড দেবে না। যদি বৈধ কারণে জনসাধারণের কাউকে প্রহার করা হয় এবং শরীয়তের বিধান অনুযায়ী প্রহার বা আঘাত করা হয় তবে ‘ইজমা’ তথা সর্বসম্মতিক্রমে (উল্লেখিত কর্মকর্তাদের) কিসাসের বিধান জারী হবে না। এ জন্যে যে, বৈধ ও শরীয়তসম্মত প্রহার, আঘাত ও জখম হয়তো ওয়াজবি হবে, না হয় মুস্তাহাব তথা পছন্দনীয় বৈধ হবে। আর এ তিনের কোনটিতেই কিসাস বর্তায় না।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 বিভিন্ন ধরনের মানহানির কিসাস

📄 বিভিন্ন ধরনের মানহানির কিসাস


মান-সম্মানের কিসাসও বৈধ, গালি দেয়া অপরাধ। এরও বিধিসম্মত কিসাস রয়েছে। কেউ কারো বাপ-দাদা, বংশ ও গোত্রের নামে অশালীন উক্তি এবং বক্তব্য প্রকাশ করলে, বিনিময়ে তারপক্ষে প্রতিপক্ষের বাপ-দাদা, বংশ ও গোত্রের নামে অনুরূপ উক্তি করা জায়েয নয়। কেননা তারা তো তার প্রতি কোন অন্যায় করেনি।
কারো মান-সম্মান ইয্যত-আবরুর প্রতিশোধ গ্রহণ করাটাও শরীয়তসম্মত বিষয়। তা এভাবে, যেমন এক ব্যক্তি কারো উপর অভিসম্পাত বাক্য বর্ষণ করলো অথবা বদ-দু'আ করলো, এর প্রতিশোধস্বরূপ প্রথম ব্যক্তির প্রতি অনুরূপ বাক্যবাণ প্রয়োগ করা দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য বৈধ। কেউ যদি সত্যিকার গালি দেয়, যার মধ্যে মিথ্যার কোন মিশ্রণ নেই, তবে প্রতি উত্তরে সেও গালি দিতে পারে। তবে ক্ষমা করে দেয়াই উত্তম। মহান আল্লাহ বলেন:
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا - فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ - وَلَمَنِ انْتَصَرَ بَعْدَ ظُلْمِهِ فَأُولَئِكَ مَا عَلَيْهِمْ مِّنْ سَبِيلٍ -
"মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দই আর যে ক্ষমা করে দেয় এবং বিরোধ নিষ্পত্তি করে নেয়, তার প্রতিদান আল্লাহর নিকট রয়েছে। আল্লাহ অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না। আর অত্যাচারিত হবার পর যারা প্রতিশোধ গ্রহণ করে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না। (সূরা শূরা: ৪০-৪১) মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন:
الْمُسْتِبَانِ مَا قَالَا فَعَلَى الْبَادِى مِنْهُمَا مَالَمْ يَعْتَدُ الْمَظْلُوْمَ -
"সামনা সামনি যে বলবে তার উপর তাই হবে, কিন্তু সূচনাকারীর উপর কিছু বেশী হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে মজলুমের উপর জুলুম করবে।"
বস্তুত এটাকেই انتصار তথা প্রতিশোধ গ্রহণ বলা হয়। দ্বিতীয়তঃ গালি-গালাজ যদি এমন হয়, যার মধ্যে মিথ্যার কোন লেশ নেই, সেটিও প্রতিশোধ গ্রহণের যোগ্য। যেমন, সে ব্যক্তির নৈতিক চরিত্রে যে দোষ-ত্রুটি রয়েছে সেগুলো প্রকাশ করে দেয়া, অথবা কুকুর, গাধা ইত্যাদি বলা। কিন্তু কেউ যদি কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও মনগড়া দোষারোপ করে তবে, এর প্রতিশোধকল্পে তারও অনুরূপ বানোয়াট কথা ও মিথ্যা দোষারোপ করা জায়েয নয়। কেউ যদি অকারণে কাফির, ফাসিক বলে তবে, একে অনুরূপ কাফির, ফাসিক বলা তার জন্য জায়েয নয়। কেউ যদি কারো বাপ, দাদা, বংশ, গোত্র কিংবা স্বীয় শহরবাসীদের উপর অভিশাপ দেয়, তবে জবাবে তার পক্ষে অনুরূপ বাক্য প্রয়োগ করা বৈধ নয়। এটা অন্যায় ও জুলুম। কেননা, তারাতো তাকে কিছু করেনি। বরং তার উপর অন্যায় অত্যাচার যা কিছু করা হয়েছে সেটা করেছে উপস্থিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর বাণী হলো:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِيْنَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا - اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ للتَّقْوى - (مائده : ۸)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানে তোমরা অবিচল থাকবে, কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ তথা তোমাদের প্রতিশোধ-স্পৃহা যেন এমন মাত্রার না হয় যে, তাতে তোমরা অবিচার করে বসো, বরং তোমরা সুবিচার করো। এটা তাকওয়া অর্থাৎ খোদাভীতির নিকটতর। (সূরা মায়িদা: ৮)
অতএব কারো মানহানি করা, ইয্যত-সম্মান হানির দ্বারা অত্যাচার করা হারাম। বস্তুত এটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অধিকার। কাজেই যদি এ জাতীয় কষ্ট দেয়া হয়, যার প্রতিশোধ নেওয়া সম্ভব- যেমন এক ব্যক্তি অন্য একজনের প্রতি বদ-দু'আ করল, তবে মজলুম ব্যক্তি অতিরঞ্জিত ও বাড়াবাড়ি না করে প্রথম ব্যক্তির উপর সমপরিমাণ বদ-দু'আ করতে পারে। কিন্তু এর সাথে যদি আল্লাহর হক জড়িত থাকে, যেমন সে মিথ্যা বললো, তবে এর জবাবে মিথ্যা বলা তার জন্য জায়েয নয়।
অনুরূপভাবে অধিকাংশ ইসলামী আইনবিদগণ বলেন: কেউ যদি কোন ব্যক্তিকে পুড়িয়ে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করে, অথবা পানিতে ডুবিয়ে মারে, গলাটিপে হত্যা করে কিংবা অন্য কোন পন্থায় প্রাণ নাশ করে, তবে তার প্রতিশোধ গ্রহণার্থে (আদালত কর্তৃক) অনুরূপ পন্থাই অবলম্বন করা যেতে পারে যা সে করেছিল।
অবশ্য লক্ষ্য রাখতে হবে প্রতিশোধমূলক শাস্তিটি যেন হারাম না হয়। যেমন কেউ একজনকে মদ পান করিয়ে দিল, বিনিময়ে সেও তাকে মদ্য পান করিয়ে দিল। অথবা পুংমৈথুন করেছিল, এর বদলে তার সাথেও তার 'লাওয়ালাত' তথা পুংমৈথুন করা।"
কোন কোন ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের মত হলো: পুড়িয়ে মারা, পানিতে ডুবিয়ে মারা এবং গলাটিপে হত্যা করার শাস্তিস্বরূপ তরবারির আঘাতে তার শিরোচ্ছেদের দণ্ড হতে হবে। কিন্তু ইতিপূর্বে এ সম্পর্কিত উল্লেখিত মন্তব্যই কুরআন হাদীসের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যশীল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00