📄 শাস্তি ও শাস্তি প্রাপ্তদের শ্রেণী বিভাগ
আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের (সা) নাফরমানীর পরিপ্রেক্ষিতে প্রদত্ত সাজাও দুই প্রকার। (১) এক, দুই কিংবা ততোধিক ব্যক্তির উপর এই সাজা প্রয়োগ করা হয়। ইতিপূর্বে যার বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। (২) এই সাজা যা একটি শক্তিশালী দল বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়। মৃত্যুদণ্ড ছাড়া যাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বাধীন 'জিহাদ' অর্থাৎ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দুশমনদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ এর আওতায়।
দীনের তাবলীগ ও প্রচার ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও যারা ইসলাম তো কবুল করেই না বরং ইসলামের বিরুদ্ধে আগ্রাসী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, তাদের মুকাবিলায় জিহাদ করা ওয়াজিব হয়ে পড়ে। যতক্ষণ পর্যন্ত দীনের বিরুদ্ধে ফিৎনা ফাসাদ নির্মূল না হবে এবং আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত ও বিজয়ী না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শত প্রতিকূলতার মাঝেও এ জিহাদ' অব্যাহত রাখতে হবে।
ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় মহানবী (সা)-এর প্রতি কেবল ইসলামী দাওয়াত পৌঁছানোরই আদেশ ছিল। তখনও জিহাদের অনুমতি দেয়া হয়নি। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে যখন তিনি মদীনার দিকে হিজরত করলেন এবং সেখানেও ইসলামের দুশমনরা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেল, তখনই আল্লাহ তায়ালা মহানবী (সা) ও সাহাবীগণকে আত্মরক্ষামূলক পরিস্থিতিতে জিহাদের অনুমতি দান করেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী হলো-
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتِلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ - الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٍّ - إِلَّا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهَ - وَلَوْلا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسِ بَعْضُهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ - إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ - الَّذِينَ إِنْ مُكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلوةَ وَأتُوا الزَّكَوٰةَ وَآمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ - وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ. (سورة الحج : ٤١-٣٩)
“যেসব মুসলমানের সাথে কাফিররা যুদ্ধ করে, এখন তাদেরকেও কাফিরদের সাথে আত্মরক্ষাকল্পে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হলো। এ জন্য যে, তাদের উপর নিপীড়ন চলছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম ও শক্তিশালী। এরা সেসব নির্যাতিত ও মযলূম, যাদেরকে অন্যায়ভাবে দেশ থেকে শুধু এ অপরাধে বহিষ্কার করা হয়েছে যে, তাদের ঘোষণা হলো, "একমাত্র আল্লাহই আমাদের প্রভু- পরওয়ারদিগার। আর আল্লাহ যদি মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা দমন করার ব্যবস্থা না করতেন তাহলে (খৃষ্টানদের) গীর্জাসমূহ, (ইহুদীদের) উপাসনালয়সমূহ এবং (মুসলমানদের) মসজিদসমূহ যেগুলোতে অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করা হয়, কবেই এগুলো বিনাশ করে দেয়া হতো। আর যেসব লোক আল্লাহর (দীনের) সাহায্য করবে, আল্লাহও নিশ্চয়ই তাদের সাহায্য করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অধিক শক্তিধর এবং পরাক্রমশালী।
(মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত) আমি যদি তাদেরকে কোনো ভূখণ্ডে শাসন কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত করি তখন তারা সমাজে নামায কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে। আর সকল কাজের ফলাফল দানের অধিকার একমাত্র আল্লাহর এখতিয়ারে নিহিত।” (সূরা হজ্জ : ৩৯-৪১) এরপর মুসলমানদের উপর জিহাদ ফরয ঘোষণা করে আয়াত নাযিল হয়-
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ - وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ - وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (سورة البقرة : ٢١٦)
“(হে মুসলমানগণ!) তোমাদের উপর জিহাদ ফরয করা হলো, যদিও সেটা তোমাদের নিকট অপ্রিয়। আর (জেনে রেখো,) কোন জিনিস হয়তো তোমাদের অপ্রিয় অথচ পরিণামে সেটাই তোমাদের জন্য মঙ্গলকর, পক্ষান্তরে কোন বস্তু হয়তো তোমাদের অতিপ্রিয়' কিন্তু মূলত: সেটা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। বস্তুতঃ আল্লাহ্ই পরিণাম সম্পর্কে জানেন তোমরা সেটা জান না।" (সূরা বাকারা: ২১৬)
অতঃপর মাদানী সূরাগুলোর মধ্যে জিহাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করা হয়েছে আর জিহাদ ফরয করা হয় আর নিন্দা করা হয়েছে জিহাদ বর্জনকারীদের। অধিকন্তু জিহাদ তরককারীকে মনের রোগী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ ঘোষণা করেন-
قُلْ إِنْ كَانَ أَبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ نِ اقْتَرَفْتَمُوهَا وَتِجَارَةً تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ - وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ. (سورة التوبة : ٢٤)
“হে নবী! আপনি مسلمانوںকে বলুন যে, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্র, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন তোমাদের উপার্জিত ধন-সম্পদ খোয়াবার, ব্যবসা-বাণিজ্যের বাজার যা মন্দা হয়ে যাওয়ার শংকাবোধ করো আর নিজেদের যেসব বাসগৃহে বসবাস করতে তোমরা ভালবাস- এই প্রত্যেকটি বস্তু যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করার চাইতে অধিক প্রিয় অনুভূত হয়, তবে তোমরা অপেক্ষায় থাকো, আল্লাহর যা কিছু করার তিনি তাই বাস্তবায়িত করবেন। আর আল্লাহ তাঁর হুকুম অমান্যকারী লোকদের সঠিক পথে পরিচালিত করেন না।" (সূরা তাওবা: ২৪)
আল্লাহ আরো বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ. (سورة الحجرات : ١٥)
"খাঁটি মুমিনতো একমাত্র তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে, অতঃপর নির্দ্বিধায় আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে জিহাদ' করবে, বস্তুতঃ তারাই সত্যবাদী, খাঁটি মুসলমান।" (সূরা হুজুরাত : ১৫)
তিনি আরো বলেন-
فَإِذَا أُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ مُحْكَمَةٌ وَذُكِرَ فِيهَا الْقِتَالُ رَأَيْتَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ نَظَرَ الْمَغْشِي عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَأَوْلَى لَهُمْ . طَاعَةً وَقَوْلٌ مَّعْرُوفٌ - فَإِذَا عَزَمَ الْأَمْرُ فَلَوْ صَدَقُوا اللهَ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ - فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ. (سورة محمد : ۲۲-۲۰)
“অতঃপর যদি দ্ব্যর্থহীন কোনো সূরা অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যুদ্ধের কোনো নির্দেশ থাকে, তখন হে নবী! অন্তরে নিফাকের রোগগ্রস্ত লোকদেরকে আপনি দেখতে পাবেন যে, তারা আপনার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকায় যেন, কারো উপর মৃত্যুকালীন ভীতি নেমে এসেছে। তাদের জন্য বড়ই আফসোস! তাদের মুখেতো আনুগত্যের স্বীকারোক্তি ও ভাল ভাল কথা ধ্বনিত হয়। কিন্তু যখন চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়া হলো, তখন তারা যদি আল্লাহর নিকট তাদের ওয়াদার ব্যাপারে সত্যবাদী হতো তাহলে এদের জন্য মঙ্গলজনক হতো। সুতরাং যদি তোমরা বিমুখ হয়ে যাও তবে কি তাহলে তোমরা যমীনের বুকে ফাসাদ সৃষ্টি করার নিকটবর্তী অথবা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী হয়ে যাবে?” (সূরা মুহাম্মদ: ২০-২২)
কুরআন পাকে এ জাতীয় বহু আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। এমনিভাবে জিহাদ ও মুজাহিদীনদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং গুরুত্ব সূরা আস্ সাফ এর মধ্যে বর্ণনা করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيكُمْ مِّنْ عَذَابٍ الِيْمَ - تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَالِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ - يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتٍ عَدْنٍ - ذَالِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ - وَأُخْرَى تُحِبُّوْنَهَا نَصْرٌ مِنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ - وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ (سورة صف : ۱۳-۱۰)
“হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেবো, যা তোমাদেরকে আখিরাতের কষ্টদায়ক 'আযাব থেকে মুক্তি দান করবে? তা এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং জান-মালের দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করা। এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গল ও কল্যাণকর, যদি তোমরা প্রজ্ঞা ও বিবেকবান হয়ে থাক। (এসব কাজ করলেই) আল্লাহ তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন আর তোমাদেরকে 'আদন' জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত, তদুপরি স্থায়ী জান্নাতের নয়নাভিরাম বাসগৃহে তোমাদের (প্রবেশ করাবেন), এটাই হল পরম সাফল্য। অধিকন্তু তোমাদের প্রাণপ্রিয় অপর একটি নিয়ামতও (দেয়া হবে সেটা হলো), আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয়। (হে নবী!) মুমিনদেরকে আপনি এর সংবাদ শুনিয়ে দিন।” (সূরা সাফ: ১০-১৩)
আল কুরআনে আরো ইরশাদ হয়েছে: أجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجُ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - لَا يَسْتَوْنَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ - الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللهِ - وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ - يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانِ وَجَنَّت لَهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ - خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا - إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ (سورة توبة : ১৯-২২)
"তোমরা কি হাজীদেরকে পানি পান করানো এবং মসজিদে হারাম তথা কাবা শরীফ আবাদ রাখাকে সে ব্যক্তির সমতুল্য মনে করেছ, যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ও কিয়ামত দিবসে উপর ঈমান এনেছে, আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে? এরা আল্লাহর নিকট আদৌ সমমানের হতে পারেনা। আর আল্লাহ কখনো জালিমদেরকে হিদায়েত দান করেন না। যারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং নিজের জান-মালের দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, আল্লাহর নিকট তারা অতি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। অধিকন্তু এরাই পরিপূর্ণ সফলকাম। তাদের পালনকর্তা তাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে দয়া, সন্তুষ্টি এবং এমন উদ্যানসমূহের সুসংবাদ দান করেছেন, যেখানে তাদের জন্য চিরস্থায়ী নিয়ামত বিদ্যমান থাকবে, আর সেখানে তারা অনন্তকাল বসবাস করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট রয়েছে বিরাট প্রতিদান।" (সূরা তাওবা: ১৯-২২)
মহান আল্লাহ্ আরও ইরশাদ করেছেন- يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدُّ مِنْكُمْ عَنْ دِيْنِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّوْنَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ - يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ - ذَالِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ - وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (سورة المائدة : ٥٤)
"হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি নিজের দীন থেকে ফিরে যায়, তবে আল্লাহ্ অতি শীঘ্রই এমন এক জাতি সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন। পক্ষান্তরে তারাও আল্লাহকে ভালবাসবেন। মুসলমানদের সাথে তাদের ব্যবহার হবে কোমল, কাফিরদের সাথে কঠোর, আল্লাহর পথে তারা জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দাবাদের ভয়ে তারা ভীত হবে না। এটা হচ্ছে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন, আর আল্লাহ্ সীমাহীন উপায় উপাদানের মালিক এবং তিনি মহাজ্ঞানী।" (সূরা মায়েদা: ৫৪) এ সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন-
ذَالِكَ بِأَنَّهُمْ لَا يُصِيبُهُمْ ظَمَاء وَلَا نَصَبٌ وَلَا مَخْمَصَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَطَئُوْنَ مَوْطَأَ يُغِيظُ الْكُفَّارَ وَلَا يَنَالُوْنَ مِنْ عَدُوٍّ نَيْلاً الا كُتِبَ لَهُمْ بِهِ عَمَلٌ صَالِحٌ - إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ. وَلَا يُنْفِقُونَ نَفَقَةً صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً وَلَا يَقْطَعُونَ وَادِيًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ لِيَجْزِيَهُمُ اللَّهُ أَحْسَنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (سورة التوبة : ۱۲۱-۱۲۰)
"এটা এজন্য যে, আল্লাহর পথে তাদের (জিহাদকারীদের) পিপাসা, পরিশ্রম, ক্ষুধার কষ্ট পৌঁছেছে, কাফিরদের ক্রোধ উদ্রেক করে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং শত্রু পক্ষের নিকট থেকে কিছু প্রাপ্য হওয়া উহাদের সৎ কর্মরূপে গণ্য হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ নিষ্ঠাবান সৎ লোকদের সৎ কর্মের প্রতিদান নষ্ট করেন না। আর তারা ছোট বড় যা কিছু আল্লাহর পথে ব্যয় করে এবং (যুদ্ধকালীন) যেসব ময়দান উপত্যকা অতিক্রম করে, এসবই তাদের নামে লিখা হয়। এদ্বারা আল্লাহ তাদের কৃত কাজের উত্তমতর বিনিময় দান করবেন।” (সূরা তাওবা : ১২০-১২১)
অতঃপর এ সকল সামাজিক কার্যকলাপের ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা উল্লেখ করে জিহাদের হুকুম দেয়া হয়েছে। কুরআন-হাদীসের বহু স্থানে জিহাদের উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকন্তু এ পর্যায়ে এও বলা হয়েছে- জিহাদ সর্বোত্তম কর্ম। এরি ভিত্তিতে আলিমগণের সর্বসম্মত ফতওয়া হাজ্জ, উমরা এবং নফল রোযার চাইতেও জিহাদ উত্তম। কুরআন-হাদীসেও এর প্রমাণ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-
رَأْسُ الْأَمْرِ الْإِسْلَامُ وَعَمُوْدُهُ الصَّلوةُ وَذَرْوَةُ سَنَامِهِ الْجِهَادُ -
“ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ, নামায তার খুঁটি আর জিহাদ ইসলামের সর্বোৎকৃষ্ট আমল।” তিনি আরো বলেন-
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَماةُ دَرَجَةً مَا بَيْنَ الدَّرَجَةِ وَالدَّرَجَةِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَعَدَّهَا اللَّهُ لِلْمُجَاهِدِيْنَ فِي سَبِيلِهِ -(متفق عليه)
"জান্নাতে একশ'টি স্তর রয়েছে, দুই স্তরের মাঝখানে আকাশ-পাতাল পরিমাণ ব্যবধান। আর এ স্তরগুলো আল্লাহ তায়ালা আল্লাহর পথে জিহাদকারীগণের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।” (বুখারী, মুসলিম) তিনি আরো বলেন-
رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ خَيْرٌ مِّنْ صِيَامٍ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ وَإِنْ مَاتَ أَجْرِيَ عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُهُ وَأَجْرِى عَلَيْهِ رِزْقُهُ وَآمَنَ الْفَتَانَ - (رواه مسلم)
"আল্লাহর পথে একদিন, এক রাত্রি অবস্থান এক মাস রোযা (নফল) রাখা এবং এক মাস ব্যাপী রাত্রি জাগা অপেক্ষা উত্তম। এমতাবস্থায় যদি সে মারা যায়, তবে সে নিজ আমলের প্রতিদান পেতে থাকবে, তার রিযিক জারি করে দেয়া হবে এবং ফিৎনা-ফাসাদ থেকে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।” (মুসলিম)
এ সম্পর্কে মহানবী (সা) আরো বলেছেন- لَا تَمَسُّهَا النَّارُ عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرِسُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ -
"যে চোখ আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে এবং যে চোখ আল্লাহর পথে সীমান্ত প্রহরায় সদা নিয়োজিত থাকে, জাহান্নামের আগুন তাকে কখনো স্পর্শ করবে না।" (ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীসটি 'হাসান')
মুসনাদ আহমদে বর্ণিত হয়েছে- حَرْسُ لَيْلَةٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَفْضَلُ مِنْ أَلْفِ لَيْلَةٍ يُقَامُ لَيْلُهَا وَيُصَامُ نَهَارُهَا - (مسند احمد)
"আল্লাহর রাস্তায় এক রাত পাহারার কাজে থাকা, ইবাদতে এক হাজার রাত জাগরণ এবং সহস্র রোযার চাইতেও উত্তম।"
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- إِنَّ رَجُلًا قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَخْبِرْنِي بِشَيْءٍ يَعْدِلُ الْجِهَادَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - قَالَ تَسْتَطِيعُهُ - قَالَ أَخْبِرْنِي - قَالَ هَلْ تَسْتَطِيعُ إِذَا خَرَجَ الْمُجَاهِدُ أَنْ تَصُومَ لَا تَقْطُرَ وَتَقُوْمَ لَا تَفْتُرَ - قَالَ لَا - قَالَ فَذَالِكَ الَّذِي يَعْدِلُ الْجِهَادَ. (بخارى ومسلم)
"জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল- “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন জিনিস বলে দিন যা আল্লাহর পথে জিহাদ করর সমতুল্য হয়,” তিনি বললেন: তুমি সক্ষম হবে না। সে বলল: 'তবু, আপনি বলুন'। তিনি বললেন: তোমার পক্ষে কি এটা সম্ভব হবে যে, মুজাহিদ যখন জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, তখন থেকে তুমি রোযা রাখা শুরু করবে, অতঃপর ইফতার করবে না আর রাত্রি বেলা তাহাজ্জুদ শুরু করবে কিন্তু বিরত হবে না? সে বলল: 'না'। তিনি বললেন: এ ইবাদতই জিহাদের সমতুল্য হতে পারে।"
এ সম্পর্কে সুনানের রেওয়ায়েত রয়েছে। যেমন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ سِيَاحَةً وَسِيَاحَةُ أُمَّتِي الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ -
"प्रत्येक उम्मতই भ्रमण করে থাকে, আমার उम्मতের भ्रमण হল (প্রয়োজনে) আল্লাহর পথে জিহাদ অভিযানে বের হওয়া।"
জিহাদের আলোচনা অতি দীর্ঘ ও ব্যাপক আকার করা হয়েছে। জিহাদের তাৎপর্য, জিহাদের আমল, জিহাদের প্রতিদান ও সাওয়াব এবং এর ফল, ফযীলত ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে এত অধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, অন্য কোন বিষয় ও আমল সম্পর্কে সে পরিমাণ হাদীস বর্ণিত হয়নি। চিন্তা করলে বিষয়টি স্পষ্ট। কারণ, জিহাদের উপকারিতা ও সুফল দীন দুনিয়ায় স্বয়ং মুজাহিদ এবং অন্যান্য সকলের জন্য ব্যাপক। প্রকাশ্য ও গোপন, যাহেরী ও বাতেনী যাবতীয় ইবাদত বন্দেগী এর আওতাভুক্ত। কেননা (ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় এবং ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার প্রশ্নে) আল্লাহর মহব্বত, ইখলাস এবং তাওয়াক্কুল এসবই আল্লাহর পথে জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। নিজের জান-মাল আল্লাহর নিকট সমর্পণ করে দেয়া, ধৈর্য, পরহেযগারী, আল্লাহর যিকির এবং যাবতীয় নেক আমলই এর মধ্যে শামিল রয়েছে। জিহাদ ব্যতীত এমন কোন আমল পরিলক্ষিত হয় না, যার মধ্যে এসব আমলের একত্রে সমাবেশ ঘটেছে।
যে ব্যক্তি, যে জাতি জিহাদে আত্মনিয়োগ করে, দু'ধরনের কল্যাণ দ্বারা তারা লাভবান হয়। (১) আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়। (২) অথবা শহীদ সাজে সজ্জিত হয়ে বেহেশতে প্রবেশ। মানুষের জন্য জীবন মরণের সমস্যাটি বড় জটিল। জিহাদের মধ্যে দীন দুনিয়ার সৌভাগ্য নিহিত। কাজেই এর মাধ্যমে এ কঠিন সমস্যাটির অতি সহজ সমাধান রয়েছে। পক্ষান্তরে জিহাদ বর্জন করার পরিণতিতে দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হতে হয় কিংবা তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোন কোন লোক কঠোর সাধনা এবং দ্বীন-দুনিয়ার কামিয়াবীর উদ্দেশ্যে কষ্টসাধ্য আমলের আশ্রয় নেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাতে লাভ অতি সামান্যই হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, জিহাদ এমন একটি আমল বা কাজ, যা অন্য সব কষ্টকর আমলের তুলনায় অধিকতর ফলদায়ক। সময় সময় লক্ষ্য করা যায় যে, মানুষ নিজের আত্মিক সংশোধন এবং আধ্যাত্মিক উন্নতিকল্পে জান হাতে নিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে কঠোর সাধনায় লিপ্ত হয়। কিন্তু বাস্তব প্রয়োজনের তাগিদে শহীদের মৃত্যুই অপর সকল প্রকার মৃত্যুর চেয়ে সহজ ও উত্তম।
জিহাদকে শরীয়ত সিদ্ধ করাই হলো যুদ্ধ ও সংঘর্ষের মূল উদ্দেশ্য আর জিহাদের মূল কথা হল দ্বীন (তথা মানুষের পুরো জীবনের সকল কর্মকাণ্ড ও চিন্তা-মনন) একমাত্র আল্লাহর বিধান মাফিক হয়ে যাওয়া। কালিমাতুল্লাহ সর্বক্ষেত্রে সার্বিকভাবে প্রাধান্য লাভ করা। সুতরাং যারা জিহাদের বিরোধিতা করে, নিষেধ করে, প্রতিরোধ সৃষ্টি করে কিংবা এর বিপক্ষে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, গোটা উম্মতের ঐক্যমত (ইজমা-এ-উম্মাহ্)-অনুসারে সরকারী কর্তৃত্বাধীন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং তাদের নির্মূল করাটাই হলো সকলের রায়। কিন্তু যারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে না, মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে জড়িত হয় না, যেমন নারী, শিশু, ধর্মীয় নেতা, বৃদ্ধ, অতিবৃদ্ধ, অন্ধ, খঞ্জ, পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, লেংড়া প্রমুখ জমহুর ইসলামী বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত অভিমত হলো, রনাঙ্গনে তাদের হত্যা করা যাবে না। হত্যাযোগ্য কেবল সে সকল ব্যক্তি, যারা কথায় ও কাজে मुसलमानों বিরুদ্ধে সংঘর্ষ ও যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অবশ্য কেউ কেউ তার বিপরীত মত ব্যক্ত করেছে। তাদের এ মতের সপক্ষে দলীল হলো, যেহেতু বিদ্রোহীরা কাফির, কাজেই তাদেরকে যুদ্ধের মাধ্যমে দমন ও প্রয়োজনে ইসলামী আদালতের বিচারে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। আর নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করবে।
প্রথমোক্ত মতই সঠিক ও বিশুদ্ধ। কেননা মূলতঃ জিহাদ এটাই। এ পরিপেক্ষিতেই নির্দেশ এসেছে যে, আমরা যখন দীনের দাওয়াত পেশ করি, ইসলাম প্রচার করি এবং সত্য দ্বীনের প্রচার-প্রসার দ্বারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে থাকি, তখন তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, আমাদেরকে বারণ করে এবং তাবলীগ ও প্রচার কার্যে বাধা সৃষ্টি করে।
সুতরাং মহান আল্লাহর বাণী হলো:
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُّوا - إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ.
“(হে মুসলমানগণ! ন্যায় সত্য প্রতিষ্ঠায়) যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর রাস্তায় তাদের সাথে যুদ্ধ কর। কিন্তু ইসলামী সমরনীতি লঙ্ঘন করে বাড়াবাড়ি ও সীমা অতিক্রম করো না। আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে আদৌ পছন্দ করেন না।"
'সুনানে' বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা) এক স্থানে কতিপয় লোকের ভীড় দেখতে পান। সেখানে একটি নারীর মৃতদেহ পড়েছিল। এমতাবস্থায় তিনি বললেন:
مَا كَانَتْ هَذِهِ لِتُقَاتِلَ “এ মহিলাটিতো কাউকে হত্যা করার মত ছিল না।” অপর এক ঘটনায় মহানবী (সা) এক ব্যক্তিকে বললেন-
- الْحَقْ خَالِدًا فَقُلْ لَهُ لَا تَقْتُلُوا ذُرِّيَّةً وَلَا عَسِيفًا "যাও খালেদের সাথে গিয়ে দেখা করে তাকে বলো- ছোট শিশু, মজদুর ও গোলামদেরকে যেন হত্যা না করে।"
একই সুনান গ্রন্থে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সা) বলেছেন- لَا تَقْتُلُوا شَيْخًا فَانِيًّا وَلَا طِفْلاً صَغِيرًا وَلَا امْرَأَةً - "অতিবৃদ্ধ, ছোট শিশু এবং নারীদেরকে হত্যা করো না।"
যুলুমের অবসানে সৃষ্টজগতের কল্যাণার্থেই জিহাদ বৈধ করা হয়েছে। ইসলামে (ন্যায়-নীতি শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাধা দানকারীদের) মৃত্যুদণ্ড দানের নির্দেশের পশ্চাতে মানব তথা সৃষ্টজগতের সার্বিক কল্যাণই উদ্দেশ্য। কেননা আল্লাহ বলেন-
الْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ - "ফিৎনা, দাঙ্গাহাঙ্গামা হত্যা অপেক্ষা জঘন্যতম অপরাধ।” অবশ্য হত্যা করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কিন্তু কুফরী এবং কাফিরের সৃষ্ট ফিৎনা-ফাসাদ তার চাইতেও বড় অপরাধ। কাজেই, দীনের প্রচার এবং ইসলামের ন্যায় বিধান প্রতিষ্ঠার কাজে যে ব্যক্তি বাধা দেয় না, প্রতিরোধ সৃষ্টি করে না, তার কুফরী কেবল তার নিজের জন্যই ক্ষতিকর, مسلمانوں বেলায় নয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফকীহগণ বলেছেন, কুরআন ও হাদীস বিরোধী কোন বিদআত সৃষ্টি করা, এর প্রতি মানুষকে আহ্বান করা, সেই বিদআতের প্রচার-প্রসার দান, দ্বীনের প্রত্যক্ষ অপমান ও প্রকাশ্য বিরোধিতারই নামান্তর। কাজেই বিদআতের উদ্ভাবক ও প্রচারক উভয়কেই সাজা দিতে হবে। তবে কেউ যদি সক্রিয় না হয়ে এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ বা নীরব থাকে, তাদের সাজা দেয়া যাবে না।
হাদীসে বর্ণিত রয়েছে- إِنَّ الْخَطِيئَةَ إِذَا أُخْفِيَتْ لَمْ تُضَرَّ إِلَّا صَاحِبَهَا وَلَكِنْ إِذَا أُظْهِرَتْ فَلَمْ تُنْكَرْ ضَرَّتِ الْعَامَّةَ - "গুনাহ যদি গোপনে করা হয়, তবে কেবল সংশ্লিষ্ট গুনাহগারই ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে, কিন্তু যখন প্রকাশ্যে গুনাহ করা হয়, আর তাতে বাধা দেয়া না হয়, তবে তা ব্যাপকহারে জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে।"
এ জন্যই শরীয়ত কাফিরদের সাথে জিহাদ করাকে ওয়াজিব করেছে। কিন্তু অক্ষম ও অসহায় লোকদের সাথে জিহাদ করা ওয়াজিব করা হয়নি। বরং কেউ যদি مسلمانوں বিরুদ্ধে গোপনে যুদ্ধ অথবা এ সংক্রান্ত ব্যাপারে পরামর্শ দেয়, নৌযান কিংবা জাহাজের নৌ পথ দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধের অন্য কোন কাজ করে, مسلمانوںকে ভুল পথ দেখায় অথবা কোন কৌশল বাৎলে দেয়, এরূপ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কঠোর ব্যবস্থার বদলে নরম পন্থা অবলম্বন করা ইসলামী রাষ্ট্রের নেতা তথা ইমাম, ওয়ালী অথবা শাসন কর্তার জন্য অপরিহার্য। জ্ঞান বুদ্ধির মাধ্যমে এ থেকে বেঁচে থাকার পথ গ্রহণ করবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষ নেতাকে এ কাজ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেবে। মোট কথা অপরাধের ধরন প্রকৃতির প্রেক্ষিতে সংশোধন অযোগ্য অবস্থাতে প্রয়োজনে কোর্ট তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করবে। অথবা দয়াপরবশ হয়ে ছেড়ে দেবে, কিংবা জামিনে মুক্তি দান করবে কিংবা যা ভাল মনে করবে তাই করবে। এটাই অধিকাংশ ফকীহ বা ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের অভিমত, কুরআন, হাদীস দ্বারাও এটি প্রমাণিত।
অবশ্য কোন কোন ফকীহ ইহসান বা দয়া কিংবা ফিদিয়া নিয়ে ছেড়ে দেয়াকে মনসূখ ও বাতিল বলে থাকেন। কিতাবী ও মজুসী (অগ্নিউপাসক) সম্পর্কে শরীয়তের বিধান হল, তারা পরিপূর্ণভাবে ইসলাম গ্রহণ না করা অথবা জিযিয়া না দেয়া পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। উক্ত দু'জাতি ব্যতীত অন্যসব লোকের নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা সম্পর্কে ফকীহগণের মতভেদ রয়েছে। কিন্তু সাধারণ ফকীহগণ অন্যদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করার পক্ষপাতি নন।
ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত যে দল বা সম্প্রদায় যাদেরকে মুসলমান বলা হয়, শরীয়তের জাহেরী এবং মুতাওয়াতির (অব্যাহত) হুকুম পালনে তারা অপরকে নিষেধ করে কিংবা নিজে অমান্য করে, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ওয়াজিব। এটা मुसलमानों সর্বসম্মত অভিমত। অধিকন্তু দ্বীন পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিরোধকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ অব্যাহত রাখা ফরয। উদাহরণতঃ যেমন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এবং সকল সাহাবী যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। যদিও প্রথমাবস্থায় কেউ কেউ দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু পরবর্তীকালে তারাও একমত হয়ে যান। হযরত উমর (রা) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর সামনে উক্তি করে বসেন-
كَيْفَ تُقَاتِلُ النَّاسِ وَقَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهَ وَأَنْ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ فَإِذَا قَالُوْهَا فَقَدْ عَصَمُوا مِنِّي دِمَائَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ -
"আপনি মানুষের সাথে কিভাবে জিহাদ করবেন? অথচ মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন: প্রতিপক্ষ মানুষের সাথে আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যতক্ষণ তারা সাক্ষ্য না দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল। তারা যখন এ সাক্ষ্য প্রদান করবে, তখনই তাদের জান-মাল নিরাপদ হয়ে যাবে। অবশ্য কারো কোন হক পাওনা থাকলে সেটার বিচার স্বতন্ত্র আর তাদের হিসাব আল্লাহর হাতে ন্যস্ত।" হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এই যুক্তির জবাবে বললেন-
فَإِنَّ الزَّكُوةَ مِنْ حَقَّهَا وَاللَّهِ لَوْ مَنَعُوْنِي عِقَالًا كَانُوا يُؤَدُّونَهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهَا -
"যাকাত সে তো কালিমারই হক। আল্লাহর কসম! তারা যদি সে টুকরাটিও সরকারকে দিতে অস্বীকার করে, যা তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সমীপে প্রদান করতো, তবু তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ কাজ অব্যাহত থাকবে।"
পরবর্তীকালে হযরত উমার (রা) বলতেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা যুদ্ধের ব্যাপারে হযরত আবু বকর (রা)-এর অন্তর খুলে দিয়েছিলেন। এখন আমি উত্তমরূপে উপলব্ধি করছি যে, তিনি ছিলেন সত্যের উপর।
মহানবী (সা) থেকে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তিনি চরমপন্থী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জিহাদের হুকুম দিয়েছেন। সুতরাং বুখারী ও মুসলিমে আলী ইবনে আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা) বলেছেন-
سَيَخْرُجُ قَوْمٌ فِي أُخِرِ الزَّمَانِ أَحْدَثُ الْأَنْسَانِ - سُفَهَاءُ الْأَحْلَامِ - يَقُولُونَ مِنْ خَيْرٍ قَوْلِ الْبَرِيَّةِ لَا يُجَاوِزُ إِيْمَانُهُمْ حَنَاجِرَهُمْ يُمَرِّقُونَ مِنَ الدِّينِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ فَأَيْنَمَا لَقِيتُمُوهُمْ قَاتِلُوهُمْ فَإِنَّ فِي قَتْلِهِمْ أَجْرًا لِّمَنْ قَاتَلَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ - (بخاري - مسلم)
“শেষ যামানায় এক দল লোক বাহির হবে যারা হবে, বয়সে যুবক এবং স্বপ্নবিলাসী নির্বোধ। তারা সৃষ্টি জগতের উত্তম ব্যক্তির কথা বর্ণনা করবে বটে কিন্তু ঈমান তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না, ভিতরে প্রবেশ করবে না। ধনুক থেকে তীর যেমন ছুটে বের হয়ে যায়, দ্বীনও তাদের কাছ থেকে তেমনি দ্রুত বেরিয়ে যাবে। সুতরাং (ক্ষণভঙ্গুর ঈমানের ঐ সকল লোক যখন ইসলাম ও मुसलमानों অস্তিত্ব বিনাশে সশস্ত্র হামলায় এগিয়ে আসবে,) তাদের সাথে যেখানেই মুখোমুখী সংঘাতের ঘটনা ঘটবে সেখানেই সংঘবদ্ধভাবে লড়াই করবে এবং রণাঙ্গনের যেখানে পাবে মৃত্যুর ঘাটে পৌছিয়ে দেবে। যে ব্যক্তি তাদেরকে হত্যা করবে কিয়ামতের দিন সে সাওয়াবের অধিকারী হবে।”
সহীহ মুসলিমে হযরত আলী (রা) এর বর্ণনায় অপর হাদীসে আছে, তিনি বলেন- আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি-
يَخْرُجُ قَوْمٌ مِّنْ أُمَّتِي يَقْرَؤُونَ الْقُرْآنَ لَيْسَ قَرَانَتُكُمْ إِلَى قَرَاءَتِهِمْ بِشَيْءٍ وَلَا صِيَامُكُمْ إِلَى صِيَامِهِمْ بِشَيْءٍ - يَقْرَؤُنَ الْقُرْآنَ يَحْسَبُوْنَهُ أَنَّهُ لَهُمْ وَهُوَ عَلَيْهِمْ لَا تُجَاوِزُ قَرَاءَتْهُمْ تَرَاقِيهِمْ يُمَرِّقُونَ مِنَ الْإِسْلامِ كَمَا يَمْرِقُ السَّهْمُ مِنَ الرمية. (মুসলিম)
"আমার উম্মতের মধ্য থেকে এমন একদল লোক সৃষ্টি হবে, তারা কুরআন পাঠ করবে, তাদের কিরাআতের তুলনায় তোমাদের কিরাআত কিছুই নয়, তেমনি তাদের রোযার সাথেও তোমাদের রোযার কোন তুলনা চলে না। তারা কুরআন পাঠ করবে আর ধারণা করবে যে, কুরআন তাদের সপক্ষে দলীলস্বরূপ, অথচ প্রকৃতপক্ষে কুরআন তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। তাদের কুরআন পাঠ কণ্ঠনালীর ভিতরে প্রবেশ করবে না। ইসলামের গণ্ডি থেকে তারা এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমন ধনুক থেকে তীর বের হয়ে যায়।"
অতএব যে সেনাদলের নিকট মহানবী (সা) প্রদত্ত এ সিদ্ধান্ত পৌঁছবে, তারা অবশ্যই এর তাৎপর্য উপলব্ধি করে সে অনুযায়ী আমল করবে।
আবু সাঈদ (রা) উপরোক্ত হাদীসের সাথে অতিরিক্ত আরেক রেওয়ায়েত যুক্ত করে বর্ণনা করেছেন-
يَقْتُلُوْنَ أَهْلَ الْإِيْمَانِ - وَيَدْعُوْنَ أَهْلَ الْأَوْثَانِ لَئِنْ أَدْرَكْتُهُمْ لاقْتُلَنَّهُمْ قَتْلَ عَادٍ - (বুখারী)
"তারা مسلمانوں কতল করবে এবং (একাজে শরীক হতে) মূর্তিপূজকদেরও আহ্বান করবে। আমি তাদের সাক্ষাৎ পেলে (অভিশপ্ত) আদ সম্প্রদায়ের ন্যায় আমি তাদের কতল করতাম।” (বুখারী, মুসলিম)
মুসলিমের অপর এক রেওয়ায়েতে আছে,
تَكُونُ أُمَّتِي فَرِيقَتَيْنِ فَتَخْرُجُ مِنْ بَيْنِهِمَا مَارِقَةً يَلِي قَتْلَهُمْ أَوْلَى الطَّائِفَتَيْنِ بِالْحَقِّ.
"আমার উম্মত দুই দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। উভয় দলের মধ্য থেকে ধর্মত্যাগী এক দল প্রস্তুত হবে, তখন সত্য পন্থীরা তাদের নির্মূল করে ফেলবে।"
এরা হল সেই লোক, ইরাকী এবং সিরীয়দের মধ্যে কোন্দল ও বিভেদ সৃষ্টি করার কারণে হযরত আলী (রা) যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সাহাবীগণ তাদেরকে 'হারুরিয়া' নামে চিহ্নিত করেছিলেন।
নবী করীম (সা) এ উভয় দলকে নিজ উম্মত থেকে খারিজ এবং হযরত আলী (রা)-এর সঙ্গীগণকে হকের উপর কায়েম সত্যপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন। উক্ত মারقين ধর্মত্যাগীদের ছাড়া হুযুর (সা) এসময় (বাহ্যিক কালিমা পড়ুয়া) অন্য কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উৎসাহ প্রদান করেননি। বরং যুদ্ধ ও জিহাদ করার হুকুম তাদের বিরুদ্ধেই দান করেছিলেন- যারা ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে ইসলামী জামাআত ছেড়ে দিয়েছিল এবং मुसलमानों জান-মাল নিজেদের জন্য হালাল ও বৈধ করে নিয়েছিল।
কাজেই কুরআন হাদীস এবং "ইজমায়ে উম্মতে"র দ্বারা প্রমাণিত যে, ইসলামী শরীয়তের সীমার বাইরে চলে যাওয়া ঐ সকল মুসলমান, যদিও তারা মুখে কালিমা শাহাদাত لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدُ رَّسُوْلُ اللَّهِ এর স্বীকারোক্তি ঘোষণা দিক, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বৈধ।
ফকীহগণ বলেন: কোন একটি বিরাট সংঘবদ্ধ দল যদি সুন্নাতে মুয়াক্কাদার বিরোধিতা ও তা অস্বীকার করে এবং পরিত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়, যেমন ফজরের সুন্নাত অস্বীকার করে তবে, উভয় মতানুযায়ী রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। আর যদি ওয়াজিব এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হারামকে অস্বীকার করে তবে, সর্বসম্মত মত হলো তাদের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ঐ সংঘবদ্ধ দল নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইসলামের বিধানগুলো যথারীতি পালন করে এবং মুহাররামাত যেমন আপন ভগ্নিকে বিয়ে করা, অপবিত্র জিনিস খাওয়া ও مسلمانوںকে এসবের হুকুম করা থেকে বিরত না থাকে। এমন সব লোকদের বিরুদ্ধে সরকারীভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া ওয়াজিব। অবশ্য এ নিয়ে ওয়াজিব তখনই হবে যখন নবী করীম (সা) এর দাওয়াত ও বাণী তাদের নিকট যথাযথ পৌঁছে যায়।
কিন্তু তারা যদি मुसलमानों বিরুদ্ধে প্রথমে নিজেরা যুদ্ধ শুরু করে তখন তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং বীর বিক্রমে তাদের মুকাবিলা করা সাধারণভাবে প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয। আর মুকাবিলা এমনভাবে করতে হবে তারা যেভাবে مسلمانوں উপর আক্রমণ করে এবং যেভাবে জুলুমকারীদের বিরুদ্ধে মুকাবিলা করতে হয়। যথা, অত্যাচারী ডাকাত দলের বিরুদ্ধে। বরং 'তাদের চাইতেও ফরয হল সেসব লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, যারা যাকাত আদায় করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং শরীয়তের হুকুমের বিরোধিতা করে ও খারেজীদের ন্যায় ফিৎনার সৃষ্টি করে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের প্রশ্নে, আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করাটাই হল উত্তম এবং এটা 'ফরযে কিফায়া'। কতিপয় মুসলমান জিহাদে অংশগ্রহণ করলে সকলের পক্ষ থেকে জিহাদের ফরয আদায় হয়ে যাবে। তবে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের ফযীলত ও মর্যাদা অধিক। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضُّرَرِ .... الخ
"যে সকল মুসলমান বিনা ওযরে বা কারণ ব্যতীত জিহাদে শরীক হওয়া থেকে বিরত থাকে, তারা কখনো (মর্যদায় স্বত:স্ফূর্ত অংশ-গ্রহণকারীদের) সমান হতে পারে না।” (সূরা নিসা: ৯৫)
শত্রু যদি مسلمانوں বিরুদ্ধে আকস্মিক আক্রমণ করে বসে, এমতাবস্থায় প্রতিটি মুসলমানের উপর সাধারণভাবে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ফরয। এ আক্রমণ প্রতিহত করা আক্রান্ত مسلمانوں উপর ফরয হওয়ার কারণ হলো বিপন্ন مسلمانوں সাহায্যে এগিয়ে আসা ফরয। যেমন আল্লাহ বলেন-
وَإِنْ يَنْصُرُوكُمْ فِي الدِّيْنِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ إِلَّا عَلَى قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقَ -
“দীনের ব্যাপারে যদি তারা তোমাদের সাহায্য কামনা করে তবে তোমাদের জন্য তাদের সাহায্য করা অবশ্য কর্তব্য। তবে সে কাওম বা গোত্রের বিরুদ্ধে নয়, যাদের সাথে তোমাদের পারস্পরিক চুক্তি রয়েছে।”
একই প্রসঙ্গে নবী করীম (সা) বলেন, الْمُسْلِمُ يَنْصُرُ الْمُسْلِمَ “এক মুসলমান অপর মুসলমানকে সাহায্য করবে।"
বস্তুতঃ مسلمانوں সাহায্য করতেই হবে, এতে পারিশ্রমিক কিংবা ভাতাস্বরূপ কিছু পাওয়া যাক আর না যাক। অবশ্য সরকারীভাবে বেতন দেয়াটা উত্তম। এক্ষেত্রে ইসলামী সরকারকে সকল মুসলমানের নিজ সামর্থ্যানুযায়ী জান-মাল দ্বারা সাহায্য করা কর্তব্য। আর এ সাহায্য তাদের উপর ফরয। যার যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, কম হোক কিংবা বেশী, পদব্রজে যেতে হোক অথবা সওয়ার হয়ে, সর্বাবস্থায় সাহায্য সহায়তা দান করা ফরয। যেমন, খন্দক যুদ্ধের সময় কাফিররা আক্রমণ করার পর প্রত্যেক মুসলমানের উপর নিজ নিজ অবস্থানুযায়ী জিহাদ ফরয হয়ে গিয়েছিল।
কোন মুসলমানের জন্যই এ যুদ্ধ যাত্রা থেকে অব্যাহতি লাভের আদৌ কোন অনুমতি ছিল না। যেমনটি ছিল না ইসলামের প্রাথমিক যুগে। আল্লাহ তা'আলা এ পরিস্থিতিতে मुसलमानों দু'দলে বিভক্ত করে বর্ণনা করেছেন। (১) কায়ে'দ তথা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি এমন লোক (২) আর খারেজ তথা জিহাদে যোগদানকারী বেযুদ্ধা ও যোদ্ধা। এ পরিস্থিতিতেও যুদ্ধে না যাবার অনুমতি প্রার্থনা করে যারা নবী করীম (সা) এর নিকট আবেদন করেছিল, তাদের ব্যাপারে তিরস্কারমূলক আয়াত নাযিল করে আল্লাহ বলেন-
يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِنْ يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا
"রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট তাদের একজন এই বলে বাড়ী ফিরার অনুমতি চেয়েছিল যে, আমাদের ঘর-বাড়ী অরক্ষিত অথচ বাস্তবে সেগুলো অরক্ষিত ছিল না। পলায়ন করাই আসলে তাদের উদ্দেশ্য ছিল।"
এ যুদ্ধ ছিল নিজেদের দীন, ইজ্জত-আব্রু, জান-মাল ইত্যাদির নিরাপত্তার জন্য একান্ত আত্মরক্ষামূলক। বাধ্য হয়েই এ যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়। পক্ষান্তরে পূর্বে উল্লেখিত যুদ্ধ ছিল ইসলামের সম্প্রসারণ এবং দীনের প্রাধান্য সৃষ্টির লক্ষ্যে; শত্রুদের উপর নিজেদের প্রভাব সৃষ্টি করা তাদের ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখা এবং দুশমন যেন কখনো মাথা তুলতে না পারে সে জন্য। তবুক যুদ্ধ তারই বাস্তব প্রমাণ।
কাজেই এ আক্রমণমূলক ব্যবস্থা হলো সেই শক্তিশালী বিদ্রোহী দলের বিরুদ্ধে।
টিকাঃ
১. টীকা: জিহাদ অর্থ আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো। প্রতি রক্ষার প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ এর প্রান্তিক অবস্থা মাত্র।
১. টীকা: জিহাদের শাব্দিক অর্থ লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করা। ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহ্র দ্বীন ইসলামী নীতি আদর্শকে ব্যক্তি ও সমষ্টি জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করা, চরমভাবে এ পথে কেউ বাধা দিলে আত্মরক্ষাকল্পে প্রতিরোধ যুদ্ধ করা এর প্রান্তিক অর্থ। -অনুবাদক
📄 ফরয-ওয়াজিবের উপর আমল ও হারাম থেকে রক্ষার জন্যেই শাস্তি
ফরয-ওয়াজিবের উপর আমল করার এবং হারাম বিষয় থেকে রক্ষার জন্যই শাস্তি দণ্ড নির্ধারিত করা হয়েছে। কাজেই এমন আকর্ষণীয় জিনিস তুলে ধরা চাই যা জনগণকে কল্যাণ ও আনুগত্যের দিকে উৎসাহিত করে। অপরদিকে মন্দের প্রতি উৎসাহ দানকারী বিষয় বস্তু থেকে জনগণকে বিরত রাখা প্রয়োজন।
হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং ওয়াজিবের উপর আমল করার জন্যই শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যের সহায়ক প্রতিটি বস্তুই শরীয়তসম্মত করা হয়েছে। সুতরাং এমন পন্থা অবলম্বন করা উচিত, যদ্বারা কল্যাণকর পথ ও আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধি পায় এবং এর সহায়ক ও সাহায্যকারী বলে প্রমাণিত হয়। জনগণকে কল্যাণ ও আনুগত্যের দিকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সম্ভাব্য সকল পন্থা অবলম্বন করাই বাঞ্ছনীয়। যথা, স্বীয় সন্তান ও পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করা আর রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও শাসনকর্তার পক্ষে জনগণের জন্য ব্যয় করা প্রয়োজন। কিন্তু তা এমন ধারায় ব্যয় করা চাই যাতে তাদের চেতনাবোধ উৎসাহিত ও উজ্জীবিত হয়। টাকা পয়সা ধন-সম্পদ কিংবা প্রশংসা দ্বারাই হোক অথবা বিকল্প কোন পন্থায় হোক। এ কারণেই উট-ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা, তীর-বর্শা চালানো ইত্যাদিতে শক্তি ব্যয় ও শরীর অনুশীলন করাকে শরীয়তসম্মত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মহানবী (সা) নিজে এবং খোলাফায়ে রাশেদীন ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন। এমনকি বায়তুল মালের ঘোড়া পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় আনা হতো। মুয়াল্লাফাতুল কুলুবের অবস্থায়ও অনুরূপ যে, তাদের সাথেও নম্র ব্যবহার ও শিষ্টাচার প্রদর্শন করা উচিত। এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে: এক ব্যক্তি পার্থিব লাভের উদ্দেশ্যেই সকালবেলা ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু সন্ধ্যাবেলা সে এমন নিষ্ঠাবান ও খাঁটি মুসলমানে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে যে, দুনিয়ার সকল বস্তু, সকল মানুষের তুলনায় একমাত্র ইসলাম তার প্রাণপ্রিয় বস্তুতে পরিণত হয়।
দুষ্কর্ম ও গুনাহর বেলায়ও অবস্থা একই। কাজেই সমাজে পাপ অপরাধ প্রবণতা ও অন্যায়ের শিকড় নির্মূল করে ফেলা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের উচিত। অন্যায় অপরাধের সকল রাস্তা, যাবতীয় ছিদ্র বন্ধ করে দেয়া একান্ত কর্তব্য। গুনাহ পাপের পথে উৎসাহ দানকারী সকল কার্যকলাপ পূর্ণ শক্তিতে রোধ করার সংগ্রাম চালু রাখা ততক্ষণ পর্যন্ত জরুরী যতক্ষণ না এর বিপরীত নিশ্চুপ বসে থাকা ও নীরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণের বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ পরিলক্ষিত হয়। মহানবী (সা) এর বাণী থেকেই এর দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায়। তিনি বলেছেন-
لَا يَخْلُونَ الرَّجُلُ بِإِمْرَأَةِ فَإِنَّ ثَالِثَهَا الشَّيْطَنُ -
"কোন পর পুরুষ কোনো পর স্ত্রীলোকের সাথে নির্জন সান্নিধ্যে একত্রিত হবে না। কেননা শয়তান তাদের সঙ্গী হিসেবে তৃতীয় জন হয়ে যায়।”
তিনি আরো বলেন,
لا يَحِلُّ لِإِمْرَأَةٍ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيْرَةَ يَوْمَيْنِ إِلَّا مَعَهَا زَوْجَ أَوْ ذُو حَرَمٍ -
“যে নারী আল্লাহ এবং আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে, স্বামী কিংবা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ জায়েয নেই) ব্যতীত তার পক্ষে দু'দিনের দূরবর্তী স্থানে সফর করা জায়েয নেই।"
নবী করীম (সা) পরনারীর সাথে সাক্ষাৎ করা এবং তার সাথে একাকী সফর করা থেকে এ কারণেই নিষেধ করেছেন যেন, (সমাজ থেকে) অন্যায়, অপরাধ ও পাপাচারের মূলোৎপাটিত হয়ে যায়।
ইমাম শা'বী থেকে বণিত আছে- 'আবদুল কায়স' গোত্রীয় প্রতিনিধি দল হুযূর (সা) এর দরবারে উপস্থিত হয়। একটি সুশ্রী সুদর্শন যুবকও তাদের দলে শামিল ছিল। তাকে দেখার পর তিনি যুবকটিকে তাঁর পেছনে বসার হুকুম দিলেন এবং বললেন: এ দৃষ্টিই ছিল হযরত দাউদ (আ) এর ভুলের কারণ।
ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) একবার জনৈকা মহিলার কবিতা আবৃত্তি শুনলেন, যার একটি শ্লোক ছিল-
هَلْ مِنْ سَبِيلِ إِلَى خَمْرٍ فَأَشْرَبَهَا - هَلْ مِنْ سَبِيلِ إِلَى نَصْرِ بْنِ حَجَّاج ؟
"পান করার মত সুরা লাভের কোন উপায় কি আছে গো...? নসর ইবনে হাজ্জাজের সাক্ষাৎ লাভের কোন উপায় কি আমার হবে গো...?"
হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) নসর ইবনে হাজ্জাজকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠালেন- সে একজন সুন্দর সুঠাম, অমলকান্তি যুবাপুরুষ। হযরত ওমর (রা) তার মাথা মুণ্ডন করেছিলেন। কিন্তু এতে তার চেহারায় উজ্জ্বল ও কমনীয়তা আরো বেড়ে গেল। অবশেষে তিনি তাকে দেশ ত্যাগের হুকুম দিলেন, যেন মদীনার রমণীকুল ফিতনায় পতিত না হয়।
অন্যত্র হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, কোন এক লোক সম্পর্কে তিনি জানতে পারলেন যে, তার সান্নিধ্যে বালকেরা উঠাবসা করে থাকে। ছেলেদেরকে তিনি তার নিকট বসতে এবং যাতায়াত করতে নিষেধ করে দিলেন।
হযরত ওমর (রা) এমন লোকের সান্নিধ্য ও সংসর্গে গমনকরতে নিষেধ করতেন যার ফলে নারী-পুরুষের ফিতনায় পতিত হওয়ার আশংকা হতো কিংবা এর কারণ ঘটত। এমন সব বালকের অভিভাবকের কর্তব্য হলো, বিনা দরকারে তাদেরকে বাইরে যেতে না দেয়া, সেজে গুজে থাকতে ও সুগন্ধি লাগাতে নিষেধ করা, সাধারণ গোসল খানায় যেতে না দেয়া, একান্ত যদি যেতেই হয়, তবে শরীরের কাপড় যেন না খোলে এবং গান বাদ্যের আসরে শরীক হওয়া থেকে তাদের বিরত রাখে। এসব ব্যাপারে তাদেরকে কঠোর শাসন ও তদারকীতে রাখা বিশেষ প্রয়োজন।
এভাবে যে ব্যক্তি সম্পর্কে প্রকাশ্য অভিযোগ পাওয়া যায় যে, সে আকাম কুকাম ও পাপাচারে অগ্রণী, তাকে সুন্দর সুশ্রী গোলামের অধিকারী বা মালিক হতে বিরত রাখতে হবে আর এ ধরনের গোলাম থেকে তাকে পৃথক করে দিতে হবে। কেননা, ফকীহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, প্রসিদ্ধ ও প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। আর তার সাক্ষ্য সম্পর্কে প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ করার বৈধ অধিকার রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সম্মুখ দিয়ে এক ব্যক্তির জানাযা গমন করলে উপস্থিত লোকেরা তার প্রশংসা বাক্য উচ্চারণ করলো। তিনি বললেন : وَجَبَتْ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।” অতঃপর অপর একটি জানাযায় গমন করলে লোকেরা মন্তব্য করল- “এ ছিল অতিশয় মন্দ লোক।” তিনি বললেন : وَجَبَتْ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে রাসূলুল্লাহ। উভয়ের সম্পর্কে আপনি বললেন- وَجَبَتْ - এর কারণ কি এবং কি জিনিস ওয়াজিব হলো। তিনি ইরশাদ করলেন-
هُذِهِ الْجَنَازَةُ اثْنَيْتُمْ عَلَيْهَا خَيْرًا فَقُلْتُ وَجَبَتْ لَهَا الْجَنَّةُ. وَهُذِهِ الْجَنَازَةُ اثْنَيْتُمْ عَلَيْهَا شَرًا وَجَبَتْ لَهَا النَّارُ - أَنْتُمْ شُهَدَاءُ لِلَّهِ فِي الْأَرْضِ -
"প্রথম জানাযাটির তোমরা প্রশংসা করেছ, তাই আমি বলেছি তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় জানাযাটি সম্পর্কে তোমরা নিন্দাবাদ করেছ, কাজেই আমি বলেছি তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেছে। কেননা যমীনের বুকে তোমরা আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ।”
নবী করীম (সা) এর যমানায় জনৈকা দূরাচারী নারী প্রকাশ্যে পাপাচার করে বেড়াতো, তার সম্পর্কে তিনি বলতেন- لَوْ كُنْتُ رَاحِمًا أَحَدًا بِغَيْرِ بَيِّنَةٍ لَرَجَمْتُ هُذِهِ -
"সাক্ষী ছাড়াই কাউকে যদি আমি 'রজম' (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করতাম, তবে এ নারীটিকে আমি অবশ্যই রজম করতাম।” এর কারণ হলো, শরীয়তে সাক্ষী কিংবা স্বীকারোক্তি ব্যতীত 'হদ' কায়েম করার বিধান নাই। কিন্তু এমন চরিত্রের লোকের সাক্ষী ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে চাক্ষুষ দর্শনের কোন প্রয়োজন নাই বরং এর জন্য সাধারণ জনশ্রুতিই যথেষ্ট। আর জনশ্রুতি যদি অপেক্ষাকৃত কম হয় তবে, তার সঙ্গী-সাথী ও বন্ধু-বান্ধবের প্রতি লক্ষ্য করে প্রমাণ দাঁড় করাতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন- اعْتَبِرُوا النَّاسَ بِأَخْدَانِهِمْ -
"মানুষকে তার বন্ধু গুণে বিচার কর।"
অর্থাৎ দেখতে হবে যেই চরিত্রের লোকদের সাথে তার মেলামেশা উঠা-বসা, সে চরিত্র মানেই তার মূল্যায়ন করতে হবে। কোন্ চরিত্রের লোকেরা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু? মন্দা চরিত্রের হলে এ থেকে বেঁচে থাকা প্রয়োজন, যেমন শত্রু থেকে আত্মরক্ষা করা দরকার। এ প্রসঙ্গে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেছেন- احْتُرِسُوا النَّاسَ بِسُوْءِ الظَّنِّ -
"মানুষের কু-ধারণা থেকে তোমরা বেঁচে থাক।"
এটা হযরত উমর (রা)-এর নির্দেশ। তবে কু-ধারণার ভিত্তিতে কোন প্রকার সাজা দণ্ড প্রদান জায়েয নেই।
📄 অশ্লীলতা, হত্যাকাণ্ড, নিকটাত্মীয়, দুর্বল, পর সম্পদ জবর দখল থেকে দূরে থাকা
এ অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় হলো, হদ ও অধিকার, বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, কিয়ামতের দিন সর্বাগ্রে অন্যায় হত্যার বিচার হবে, 'কিসাস' বা হত্যার প্রতিশোধ নেয়াতে নব জীবনের অবকাশ বিদ্যমান রয়েছে। অধিকন্তু কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির হত্যার কিংবা অধিকারের বিনিময়ে কারো প্রাণদণ্ড বিধান করা ইত্যাদি।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী হলো- قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا - وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِّنْ إِمْلَاقٍ - نَحْنُ - نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ - وَلَا تَقْرَبُو الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ - وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذَالِكُمْ وَصَبُّكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ - وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ - وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ - لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا - ذَالِكُمْ وَصَكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ - وَإِنْ هُذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ - ذَالِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ - (سورة الانعام : ١٥١-١٥٣)
"মানুষকে আপনি বলুন, তোমরা এদিকে আসো। আমি তোমাদেরকে সে জিনিস পড়ে শুনাই যা তোমাদের পরওয়ারদিগার তোমাদের উপর হারাম করেছেন। তাহলো এই যে, তাঁর সাথে কোন কিছুকেই শরীক করবে না, মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের ভয়ে নিজেদের সন্তান হত্যা করো না, (কেননা) আমিই তোমাদের আহার যোগাই এবং তাদেরও, আর গোপন কিংবা প্রকাশ্য নির্লজ্জ কার্যকলাপের ধারে কাছেও যাবে না। আল্লাহ যাকে হারাম করেছেন এমন প্রাণ সংহার করবে না, অবশ্য ন্যায় পন্থায় (রাষ্ট্রীয় বিচার পদ্ধতিতে) হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। এ হলো সেসব কথা যা আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন, যেন তোমরা উপলব্ধি করতে পার। অধিকন্তু ইয়াতীমের মালের নিকটেও তোমরা যাবে না। তবে হাঁ কল্যাণকর পন্থায় (যেতে পার), যতদিন না সে যৌবনে পদার্পণ করে আর ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তিতে তোমরা সঠিক ও পরিপূর্ণরূপে ওজন করবে এবং মাপ দেবে, সাধ্যের বাইরে আমি কারো ওপর (দায়িত্বের বোঝা) অর্পণ করি না। যখন তোমরা কথা বল, তখন ন্যায় কথা বলবে, যদিও নিকটাত্মীয়ই হোক এবং আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা অঙ্গিকার পূর্ণ কর। এ হলো সেসব বিষয় আল্লাহ তা'আলা যেগুলোর হুকুম দিয়েছেন, যেন তোমরা এসব থেকে উপদেশ গ্রহণ কর। বস্তুতঃ এটাই হলো আমার সরল-সোজা পথ। কাজেই তোমরা এরি অনুসরণ কর, অন্যায় পথসমূহের অনুসরণ করবে না। অন্যথায় (এ অনুসরণ) তাঁর রাস্তা থেকে তোমাদেরকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে। এ হলো সেকথা আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যার নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাও।” (সূরা আন'আম : ১৫১-১৫৩)
মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَأَ ..... إِلَى قَوْلِهِ - وَمَنْ يُقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاءُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا - (سورة النساء : ٩٢-٩٣)
"কোন মুসলমান অপর কোন মুসলমানকে হত্যা করা জায়েয নয়, কিন্তু তবে ভুলবশতঃ হলে সেটা স্বতন্ত্র। ..... আর যে ব্যক্তি জ্ঞাতসারে কোন মুসলমানকে হত্যা করবে, তার প্রতিফল হল জাহান্নام। যেখানে সে অনাদি-অনন্তকাল বাস করবে, আল্লাহ তা'আলার গযব এবং অভিশাপ তার উপর পতিত হবে। তদুপরি আল্লাহ তা'আলা তার জন্য বড় কঠিন আযাব তৈরী করে রেখেছেন।" (সূরা নিসা: ৯২-৯৩)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
مِنْ أَجْلِ ذَالِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا - وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا - (سورة المائده : ٣٢)
"এ কারণেই বনী ইসরাঈলকে আমি এ মর্মে নির্দেশ দিয়েছি, যে ব্যক্তি খুনের বদলে কিংবা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির শাস্তিস্বরূপ নয়, বরং অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে, সে যেন গোটা মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করলো। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করলো, বস্তুতঃ সে যেন গোটা মানব জাতির জীবন বাঁচিয়ে দিল।" (সূরা মায়েদা :৩২)
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন-
أَوَّلُ مَا قَضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي الدِّمَاءِ - (بخاری - مسلم ) .
"কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম অন্যায় হত্যার বিচার করা হবে।” প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য হত্যা তিন প্রকার-
(১) কতলে আমাদ (ইচ্ছাকৃত হত্যা); যাতে ভুল-ভ্রান্তি কিংবা ভুল সাদৃশ্য হওয়ার সম্ভাবনার কোন অবকাশ নেই। যার ব্যাখ্যা হলো, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সাধারণতঃ যেভাবে হত্যা করা হয়ে থাকে যেমন তরবারী, খঞ্জর, ছুরি, হাতুড়ি, বেলচা, কোদাল, কুড়াল, ঢাল ইত্যাদির আঘাতে কিংবা গুলি ছুড়ে কাউকে হত্যা করা, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে কিংবা পানিতে ডুবিয়ে মারা অথবা কোনও উঁচু স্থান হতে নীচে ফেলে হত্যা করা, গলাটিপে, অণ্ডকোষে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে অথবা মুখচেপে হত্যা করা কিংবা বিষপ্রয়োগে কারো প্রাণ হরণ করা। সুতরাং এ জাতীয় খুনের বদলে হদ জারী করতে হবে অর্থাৎ, হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করতে হবে। কিন্তু নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণ এ ক্ষেত্রে তিনটির যে কোন এক পন্থা অবলম্বনের পূর্ণ অধিকার পাবে- (১) চাই তাকে হত্যা করুক কিংবা (২) ক্ষমা করে দিক, অথবা (৩) দিয়্যাত তথা রক্তমূল্য গ্রহণ করতঃ ছেড়ে দিক। কিন্তু নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণের পক্ষে হত্যাকারী ব্যতিরেকে অপর কাউকে হত্যা করা জায়েয নয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহর বাণী-
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ - وَمَنْ قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ سُلْطَانًا فَلَا يُسْرِفْ فِي الْقَتْلِ - إِنَّهَ كَانَ مَنْصُورًا - (سورة بني اسرائيل : (۳۳)
"আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন বৈধ কারণ ব্যতীত তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করো না। আর যে ব্যক্তি মজলুম ও অন্যায় পথে নিহত হয়, আমি তার ওয়ারিশকে অধিকার দিয়েছি। কাজেই (প্রতিশোধমূলক) হত্যার বেলায় সে যেন অন্যায় বাড়াবাড়ি না করে। কেননা (প্রাপ্য প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে) তারই জিত, সে-ই সাহায্য প্রাপ্ত।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৩)
অত্র আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে, কেবল মাত্র হত্যাকারী। ভিন্ন ধরনের কোন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দান বৈধ নয়। হযরত আবূ শূরায়হ আল খুযাঈ (রা) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলেছেন-
مَنْ أُصِيْبَ بِدَمٍ أَوْ خَبْلٍ فَهُوَ بِالْخِيَارِ بَيْنَ إِحْدَى ثَلَاثَ فَإِنْ أَرَادَ الرَّابِعَةَ فَخُذُوْا عَلٰى يَدَيْهِ أَنْ يَقْتُلَ أَوْ يَعْفُو أَوْ يَأْخُذَ الدِّيَّةَ فَمَنْ فَعَلَ شَيْئًا مِّنْ ذَالِكَ فَعَادٍ فَإِنَّ لَهُ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيْهَا أَبَدًا -
(اهل السنن وقال الترمذى حديث حسن صحيح) "যদি কোন ব্যক্তি খুন হয় অথবা আশংকাজনক অবস্থায় তাকে পাওয়া যায় এবং পরে সে মারা যায়, এমতাবস্থায় উপায় মাত্র তিনটি, (১) হত্যাকারীর প্রাণদণ্ড দান, (২) তাকে ক্ষমা করে দেয়া, (৩) রক্তমূল্য গ্রহণ করতঃ তাকে ছেড়ে দেয়া। এ তিন পন্থা ছাড়া কেউ যদি চতুর্থ কোন পথ অবলম্বন করে, তবে তার এহেন কাজ অত্যাচারের শামিল, তাই তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, যেখানে সে চিরকাল বাস করবে।” (আহলে সুনান তিরমিযী)
ক্ষমা করা অথবা রক্তমূল্য গ্রহণ করার পর হত্যাকারীকে হত্যা দণ্ড দান অতি কঠিন গুনাহ। এমনকি প্রথম কতল করার চাইতেও জঘন্যতম অপরাধ। এ পর্যায়ে কোন কোন আলিম এও বলেছেন যে, 'হদে'র বিধান অনুসারে তাকে হত্যা করে ফেলতে হবে। কেননা নিহিত ব্যক্তির ওয়ারিশগণের কোন অধিকার নাই রক্ত মূল্য গ্রহণ করার পর তাকে হত্যা করার।"
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী হচ্ছে-
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلٰى - اَلْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَى بِالأنْثَى فَمَنْ عُفِىَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوْفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ - ذَالِكَ تَخْفِيفٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدٰى بَعْدَ ذَالِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ - وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَّاُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ - (سورة البقرة : ۱۷۹-۱۷۸)
“তোমাদের মধ্য হতে নিহত ব্যক্তির প্রাণের বদলে প্রাণদণ্ডের এমন বিধান দেয়া হয়েছে যে, আযাদ ব্যক্তির পরিবর্তে আযাদ, গোলামের বদলে গোলাম আর নারীর বদলে নারীর। অতঃপর নিহতের ভাইয়ের পক্ষ থেকে সে ব্যক্তির কেসাসের কোন অংশ ক্ষমা করে দেয়া হলে, শরীয়তের বিধান মোতাবেক তার নিকট ভদ্রভাবে তাগাদা করা চাই। অপরপক্ষে হত্যাকারী কর্তৃক নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশদের সাথে উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে তা সঠিকভাবে আদায় করে দেয়া উচিত। এটা তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ হতে তোমাদের জন্য অতি সহজ পন্থা এবং বিশেষ দয়াস্বরূপ, এরপরও যদি কেউ সীমা অতিক্রম করে, তার জন্য রয়েছে ভীষণ কষ্টদায়ক আযাবের ব্যবস্থা। আর হে জ্ঞানীজন! কেসাসের মধ্যে রয়েছে “তোমাদের জীবনের নিরাপত্তা”, যেন তোমরা (হত্যাকাণ্ড) থেকে বেঁচে থাক।” (সূরা বাকারা : ১৭৮-১৭৯)
এর বিশ্লেষণে আলিমগণ বলেন, নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশদের অন্তর থাকে ক্রোধ ও প্রতিশোধ স্পৃহায় পরিপূর্ণ। সম্ভব হলে তারা হত্যাকারী ও তার ওয়ারিশদের পর্যন্ত নিধন করতে উদ্যত-উন্মত্ত হয়ে যায়। কাজেই কোন কোন সময় অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, তারা কেবল হত্যাকারীকে খুন করেই নিবৃত্ত থাকে না, বরং ঘাতকের সাথে সাথে তার আত্মীয়-স্বজন এমনকি গোত্রপতি সর্দারদের পর্যন্ত হত্যা করে বসে। এটা অত্যন্ত ভয়াবহ অবস্থা। কেননা হত্যাকারী প্রথম জুলুম করেছিল বটে কিন্তু নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণ খুনের বদলা নিতে গিয়ে এমন সব মাত্রাহীন জুলুম অত্যাচার করে বসে, যা প্রকৃত হত্যাকারীও করে নাই। অধিকন্তু তারা এমন সব কর্মকাণ্ড করে বসে, যা কিনা শরীয়ত বহির্ভূত এবং জাহেলী যুগে পল্লীবাসী কি নগরবাসী সকলেই সমবেতভাবে সে কার্জে শরীক হয়ে পড়তো, আর বংশানুক্রমে তা চলতে থাকতো। নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণ হত্যাকারীর ওয়ারিশদিগকে হত্যা করার চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োগ করতো। এদেরকে আবার বিপক্ষ দল হত্যা করে চলতো। এক পর্যায়ে উভয়পক্ষ নিজ নিজ মিত্র সংগ্রহ করতঃ দলবদ্ধ হয়ে মারামারি কাটাকাটি ও হানাহানির এক প্রাণান্তকর পরিবেশে স্থায়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতো ও দীর্ঘকাল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ জিইয়ে রাখত।
এমনভাবে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার আবরণে গোত্রে গোত্রে হিংসা-প্রতিহিংসার অনির্বাণ শিখা আর শত্রুতার অনলপ্রবাহ অব্যাহত গতিতে বয়ে চলতো। এর মূল কারণ এটাই ছিল যে, তারা ন্যায়-ইনসাফের পথ পরিহার করে “কেসাস” তথা “খুনের বদলে খুন” এ নীতিতে বিশ্বাসী ছিল না এবং এটাকে তারা যথেষ্ট মনে করতো না। ফলে হত্যার আইনগত প্রতিশোধে শরীয়তসম্মত পথে না গিয়ে, তারা ঘটনাকে ব্যাপক গণহত্যার রূপ দিয়ে বসত। অথচ মহান আল্লাহ আমাদের ওপর কেসাস ফরয করে দিয়েছেন, যার উদ্দেশ্য ছিল অন্যায় হত্যার ইনসাফভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজ থেকে অন্যায় অত্যাচার নির্মূল করা।
প্রসঙ্গতঃ এটাও ব্যক্ত করা হয়েছে যে, “কেসাসের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জীবন।” কেননা কেসাসের ফলে হত্যাকারীর ওয়ারিশ অভিভাবকদের রক্তপাত বন্ধ হয়, প্রাণে বেঁচে যায়, ফিৎনা ফাসাদ দূরীভূত হয়। অধিকন্তু কোন ব্যক্তি যদি কাউকে হত্যা করার গোপন ইচ্ছা পোষণ করেও থাকে কিন্তু সে যখন জানতে পারে যে, পরবর্তীকালে তার সাধের প্রাণটাও রক্ষা পাবার নয় এবং কেসাসস্বরূপ নিজেরও মৃত্যু ঘটবে তখন এহেন মারাত্মক ও প্রাণের ঝুঁকি নিতে অবশ্যই সে বিরত থাকবে।
আলী ইবনে আবু তালিব (রা) এবং আমর ইবনে শুয়াইব (র) থেকে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) বলেছেন- الْمُؤْمِنُونَ تَتَكَافَأُ دِمَاءَهُمْ وَهُمْ يَدٌ عَلَى مَنْ سَوَاهُمْ وَيَسْعَى بِذِمَّتِهِمْ أَدْنَاهُمْ أَلَا لَا يُقْتَلُ مُسْلِمٌ بِكَافِرٍ وَلَا ذُو عَهْدٍ فِي عَهْدِهِ - (احمد - ابو داود وغيرهما من اهل السنن)
"সকল মুসলমানের রক্ত সমান, এ ব্যাপারে সবাই একমত, যিম্মীদের সাথে সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের সকলেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। সাবধান! স্বীয় অঙ্গীকারে স্থির থাকা পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ কোন ব্যক্তিকে এবং কাফিরের মুকাবিলায় কোন মুসলমানকে যেন হত্যা করা না হয়।” (আহমদ, আবু দাউদ)
এ সম্পর্কে মহানবী (সা) ঘোষণা করেছেন: ছোট বড় আশরাফ আতরাফ নির্বিশেষে সকল মুসলমানের রক্ত সমপর্যায়ের। আরবীকে অনারব আজমীর উপর, কুরায়শী হাশিমীকে গায়র কুরায়শী হাশিমীর উপর, আযাদ ব্যক্তিকে' আযাদকৃত গোলামের উপর, আলিমকে মূর্খের উপর এবং রাজাকে প্রজার উপর তিনি কোন প্রাধান্য দান করেন নাই। এটা সকল মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ রায় এবং সর্ববাদীসম্মত সিদ্ধান্ত। কিন্তু জাহেলী ধ্যান ধারণার বাহক এবং ইহুদী শাসকগোষ্ঠী এর বিপরীত পন্থা ও ভ্রান্ত নীতির ছত্রছায়ায় স্বার্থবাদী হুকুম জারি করার ফলে সারা আরব জাহান পরস্পর হানাহানি মারামারিতে মেতে উঠে।
মদীনার পার্শ্ববর্তী জনপদে 'বনু নাযীর' ও 'বনু কুরাইযা' ইহুদীদের দুইটি গোত্রের আবাস ছিল। বনু কুরাইযার মুকাবিলায় বনু নাযীর গোত্রের অধিক পরিমাণে খুন হয়েছিল, যে কারণে তারা নবী করীম (সা)-কে বিচারক সাব্যস্ত করেছিল। হদ্দে যিনার হুকুমের মধ্যে ইহুদীরা এ পর্যন্ত পরিবর্তন এনেছিল যে, রজমের পরিবর্তে তারা অপরাধীর গায়ে লোহার দাগ দিত। এরপর ইহুদীরা मुसलमानों নিকট এসে বলতে থাকে, তোমাদের নবী যদি এ হুকুম প্রদান করেন, তবে এটা আমাদের জন্য দলীলস্বরূপ। অন্যথায় একথাই প্রমাণিত হবে যে, তোমরা তাওরাতের হুকুম বর্জন করেছ। এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন-
يَـٰٓأَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنْكَ الَّذِيْنَ يُسَارِعُوْنَ فِى الْكُفْرِ مِنَ الَّذِيْنَ قَالُوْا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِنْ قُلُوْبُهُمْ ... الى قوله -
فَإِنْ جَآءُكَ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ أَوْ أَعْرِضْ عَنْهُمْ وَإِنْ تُعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَنْ يَّضُرُّوْكَ شَيْئًا - وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ - إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ..... الى قوله -
فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِيْ وَلَا تَشْتَرُوْا بِآيَاتِيْ ثَمَنًا قَلِيْلًا . وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْنَ - وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوْحَ قِصَاصٌ - (سورة المائدة : ٤٥ - ٤١)
“হে রাসূল! লোকদের কুফরী তৎপরতা যেন আপনাকে চিন্তিত ও মনঃক্ষুণ্ণ না করে, যারা শুধু মুখে বলে আমরা ঈমান এনেছি, অথচ তাদের অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করেনি...।
কাজেই হে পয়গম্বর! মীমাংসার জন্য যদি তারা আপনার নিকট উপস্থিত হয়, তবে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেয়া না দেয়া আপনার ইচ্ছাধীন, কিন্তু যদি তাদের ব্যাপারে মুখ ফিরিয়ে নেন বা বিরত থাকেন, তবে তারা আপনার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি আপনাকে ফায়সালা করতেই হয়, তবে ন্যায়ের ভিত্তিতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিন, কেননা নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ন্যায় ও ইনসাফকারীকে পছন্দ করেন...।
তোমরা মানুষকে ভয় করবে না, ভয় করবে তো আমাকে করবে, আর আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করো না। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব (এর বিধান মোতাবেক) হুকুম ফয়সালা করবে না, এরাই হলো কাফির। আর তাওরাতে আমি ইহুদীগণকে লিখিত হুকুম দিয়েছিলাম যে, জানের বদলে জান, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং জখমের বদলে একই পরিমাণ জখমের বিধান করতে হবে।” (সূরা মায়িদা : ৪৫-৪৫)
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, সকল প্রাণ একই পর্যায়ভুক্ত, একের উপর অপরের প্রাধান্যের অবকাশ নেই। অথচ ইহুদীরা লেনদেন, আচার-আচরণে এ ধরনের ভেদ নীতির প্রকাশ ঘটিয়ে চলতো।
الى قوله - وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ - لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا الى قوله - أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُوْنَ - وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ - (سورة المائدة : ٥٠-٤٨)
"হে নবী! আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যা এর পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবসমূহের স্বীকৃতি দান করে এবং সেগুলোর হিফাযতকারীও। কাজেই মহান আল্লাহ তোমার উপর যা কিছু নাযির করেছেন এর ভিত্তিতেই তাদেরকে তুমি হুকুম দান কর, কিন্তু তোমার প্রতি নাযিলকৃত সত্য বর্জন করতঃ তাদের কুপ্রবৃত্তি ও খাহেশের আনুগত্য করো না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি বিশেষ পন্থা ও শরীয়ত নির্দিষ্ট করে দিয়েছি...
এখনও কি তারা জাহেলী যুগের হুকুম কামনা করে? (আল্লাহর উপর) বিশ্বাস স্থাপনকারীগণের জন্য আল্লাহর চাইতে উত্তম হুকুমদাতা কে হতে পারে?" (সূরা আল মায়েদা : ৪৮-৫০)
আলোচ্য আয়াতে মহান আল্লাহ ফয়সালা করে দিয়েছেন যে, উঁচু-নীচু নির্বিশেষে সকল মুসলমানের জান-প্রাণ, রক্ত একই মানের সমান পর্যায়ের, অথচ জাহেলী যুগের অধিকাংশ হত্যা-খুন-জখম ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হতো প্রবৃত্তির চাহিদা ও খেয়াল খুশি মতো। ফলে নগর-বন্দর, নিভৃত পল্লীসহ সকল জনপদ এর বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যেত। আপাত দৃষ্টিতে এর কারণ যাই থাকুক কিন্তু মূলত অন্তরের আল্লাহদ্রোহী প্রবণতা এবং বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি, আদল-ইনসাফের কার্যকর ভূমিকা না থাকাই ছিল এর জন্য এককভাবে দায়ী। গোত্রে গোত্রে একে অপরের উপর প্রাধান্য শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভুত্ব কায়েমের প্রতিযোগিতা চলতো অব্যাহত গতিতে- চাই সেটা হত্যা ও খুনের ব্যাপারে হোক কি ধন-সম্পদের বেলায়- একে অপরের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করাকে সম্মান ও গৌরবের বিষয় মনে করা হতো। ন্যায় নীতির কার্যকারিতা জলাঞ্জলি দিয়ে দু'দলের কেউ ধৈর্য, উদারতা ও মহানুভবতার ধার ধারতো না। পক্ষ প্রতিপক্ষ সকলেই একে অন্যের প্রতি অন্যায়-উৎপীড়ন ও জুলুম-নির্যাতন করতো। এক পক্ষ যা করতো প্রতিপক্ষও তার চাইতে কোন অংশে কম করতো না। এই ছিল তৎকালীন সামাজিক ন্যায় বিচারের বাস্তব চিত্র। সুতরাং এমনি এক অস্বস্তিকর ও অরাজক পরিবেশে পবিত্র কুরআন আদল ইনসাফ ও ন্যায়নীতি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে এবং সমকালীন সমাজে প্রচলিত সকল প্রকার জাহেলী আইন-কানুন, হুকুম-আহকাম বাতিল ঘোষনা করেছে। কোন মুজাদ্দিদ কোন সংস্কারক সমাজ সংস্কারের ভূমিকা ও বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে ময়দানে আসলে সূচনাতে আদল-ইনসাফ ও ন্যায়নীতি অবলম্বন করেই তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে। এমনি ধারা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের ফয়সালা হলো-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا - فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى - فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِئَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ - فَإِنْ فَانَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ - إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ - (سورة الحجرات : ۱۰-۹)
"আর মুসলমানদের দু'টি দল যদি পরস্পরে যুদ্ধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দাও। অতঃপর একদল যদি অপর দলের উপর জুলুম অত্যাচার চালায়, তবে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করো যতক্ষণ না তারা আল্লাহর হুকুমের প্রতি ফিরে আসে। অতঃপর যখন তারা প্রত্যাবর্তন করে, তখন সাম্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে উভয়পক্ষে সন্ধি করিয়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ও ইনসাফকারীকে পছন্দ করে থাকেন। মুসলমানগণ তো পরস্পর ভাই ভাই, কাজেই ভাইদের মধ্যে তোমরা আপোষের মিলমিশ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য স্থাপন করে দিও।” (সূরা হুজরাত : ৯-১০)
খুনের বদলার ব্যাপারে সব চাইতে উত্তম পন্থা হলো প্রথমতঃ নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। কেননা কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে: وَالْجُرُوحَ قِصَاصُ - فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ -
"জখমের প্রতিশোধ অনুরূপ জখমই। অতঃপর যে মজলুম ব্যক্তি নিজের উপর কৃত জুলুমের প্রতিশোধ ক্ষমা করে দেয়, তাহলে এটা তার স্বীয় গুনাহর কাফ্ফারা হয়ে যাবে।” (সূরা মায়িদা: ৪৫)
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণি আছে তিনি বলেছেন: مَا رُفِعَ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمْرٌ فِيهِ الْقِصَاصُ إِلَّا فِيْهِ بِالْعَفْو - (ابو داود وغيره)
"কেসাসযোগ্য কোন ঘটনা বা মুকাদ্দমা নবী করীম (সা) এর খিদমতে পেশ করা হলে, তিনি ক্ষমার নির্দেশ দান করতেন।” (আবু দাউদ) সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা) এর রেওয়ায়েত সূত্রে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন: مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِّنْ مَّالٍ وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْو إِلَّا عِزَا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ -
"সাদকার দ্বারা সম্পদের মধ্যে স্বল্পতা আসে না, আর যে ব্যক্তি অপরকে ক্ষমা করে দেয় আল্লাহ অবশ্যই তার মান-সম্মান বাড়িয়ে দেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নম্রতা প্রকাশ করে, আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন।” (মুসলিম)
ইসলামের সাম্যবাদী নীতি সম্পর্কেই আলোচনা হয়েছে, আলোচনায় পরিষ্কার হয়েছে যে, মুসলমান সকলে একই শ্রেণীভুক্ত এবং সাম্যের অধিকারী কিন্তু সমপর্যায়ের ক্ষেত্রে যিম্মী কাফির ও মুসলমান একই স্তরের হতে পারে না, বরং এখানে বিশ্বাসগত পার্থক্য বিদ্যমান। সকল আলিম এ ব্যাপারে একমত। তদ্রূপ কোন যিম্মী কাফির ভ্রমণ কিংবা ব্যবসার উদ্দেশ্যে মুসলিম অধ্যুষিত শহরে আগমন করলে, সকলের ঐকমত্যে সেও মুসলমানের সমপর্যায়ের হবে না, আর সে মুসলমানের সম-অধিকারের যোগ্য পাত্রও বিবেচিত হবে না।
অবশ্য কোন কোন আলিম মন্তব্য করেছেন যে, যিম্মীর বেলায়ও 'কুফু' তথা ইসলামী সাম্য প্রযোজ্য হবে এবং সে একজন মুসলিম নাগরিকের ন্যায় যাবতীয় সুযোগ সুবিধা ভোগের অধিকার লাভ করবে।
দ্বিতীয় প্রকার, খুন হল "কতলে খাতা” (ভুলক্রমে হত্যা করা), যা شِبْهُ عَمَدَ তথা 'ইচ্ছাকৃত হত্যার' প্রায় অনুরূপ। এ সম্পর্কে মহানবী (সা)-এর ইরশাদ হলো:
أَلَا إِنَّ فِي قَتْلِ الْخَطَاءِ شِبْهُ الْعَمَدِ مَا كَانَ فِي السَّوْطِ وَالْعَصَاءِ مِئَةٌ مِنَ الْإِبِلِ مِنْهَا أَرْبَعُونَ خِلْقَةً فِي بُطُونِهَا أَوْلَادُهَا.
"তোমরা সাবধান! কোড়া কিংবা লাঠির আঘাতে ইচ্ছাকৃত হত্যা অনুরূপ "কতলে খাতার" দণ্ডস্বরূপ একশো উট দিতে হবে। যার মধ্যে চল্লিশটি উটনী হবে (গর্ভধারী) গাভীন।”
বস্তুতঃ একে "শিবে আমাদ" বলা হয়েছে যে, কোড়া কিংবা লাঠি দ্বারা প্রহারকারী জুলুম অবশ্যই করেছে। কেননা আঘাতের বেলায় সে মাত্রার এবং সীমার ভেতর সংযত থাকতে পারেনি। কিন্তু এটাও সত্যও কথা যে, এ ধরনের 'প্রহারে সব সময়ই যে মৃত্যু ঘটবে তা নয়, বরং প্রায়শ এর ব্যতিক্রমও পরিলক্ষিত হয়।
তৃতীয় প্রকারের খুন হলো- "কতলে খাতা” তথা ভুলক্রমে হত্যা করা। যেমন কোন ব্যক্তি শিকারে গুলি বা তীর ছুড়লো কিন্তু তা লেগে গেল কোন মানুষের গায়ে। অথচ এর পিছনে তার আদৌ কোন ইচ্ছা বা পরিকল্পনা ছিল না। যার ফলে এহেন কল্পনাতীত ঘটনাটি ঘটে গেল। তাই এর বিনিময়ে 'হদ' তথা প্রাণদণ্ডের হুকুম জারী হবে না; বরং এরূপ ক্ষেত্রে কাফফারা দিয়াত এবং রক্তমূল্য দেয়াই শরীয়তের বিধান। এ সম্পর্কিত বহু মাসআলা মনীষীগণের সংকলিত বা রচিত গ্রন্থরাজীতে লিখিত রয়েছে।
টিকাঃ
১. টীকা: কেসাসের ফলে হত্যাকারী অধিক হত্যাকাণ্ড করার সুযোগ পায় না।
📄 জখমের কিসাস ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কিসাস
জখমের কিসাস, হাত-পায়ের বিনিময়ে হাত-পা কাটতে হবে, দাঁত ভাঙ্গলে দাঁত ভাঙ্গতে হবে, কারো মাথা কেটে দিলে পরিবর্তে মাথা কাটতে হবে।
জখমের কিসাস বা বদলা লওয়া ওয়াজিব। কুরআন, হাদীস ও ইজমা দ্বারা এটা প্রমাণিত। কিন্তু শর্ত হলো সমতা রক্ষা করার সীমানার ভেতরে থাকতে হবে।
কেউ যদি অপর কারো হাত কব্জা থেকে ভেঙ্গে দেয়, তাহলে বদলাস্বরূপ আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির পক্ষে কব্জা থেকে তার হাত ভেঙ্গে দেয়া জায়েয। যদি কারো দাঁত ভাঙ্গা হয় তবে এর প্রতিশোধে প্রতিপক্ষের দাঁত ভেঙ্গে দেয়া জায়েয। মস্তক এবং মুখমণ্ডল যদি এমনভাবে জখম করে দেয়া হয় যে, ভেতরের হাড় পর্যন্ত দৃষ্ট হয় তবে আঘাতকারীর মুখমণ্ডল ও মাথা সমপরিমাণ হারে জখম করে দেয়া জায়েয। (অবশ্য এসব কিছু বিচার বিভাগের মাধ্যমে হতে হবে।)
বস্তুতঃ জখম যদি এমন পর্যায়ের হয় যে, প্রতিশোধমূলক প্রত্যাঘাতের মাধ্যমে সমতা বিধান করা সম্ভব নয়, যেমন- ভেতরের হাড় ভেঙ্গে ফেলেছে অথবা জখম এ পর্যায়ের যে, ভেতরের হাড় দৃষ্টিগোচর হয় না, এমতাবস্থায় কিসাস গ্রহণ করা যাবে না বরং জখমের আনুপাতিক জরিমানা আদায় করতে হবে।
কিসাস বা প্রতিশোধের ধরন হলো এই যে, হাত দ্বারা আঘাত করবে অথবা লাঠি দ্বারা প্রহার করবে। যেমন, চড়মারা কিংবা কিল-ঘুষি অথবা লাঠি দ্বারা আঘাত করা হবে। আলিমগণের এক অংশের মতে আলোচ্য পরিস্থিতিতে কিসাসের হুকুম প্রযোজ্য হবে না; বরং তাযীর অর্থাৎ শাসন ও শিক্ষামূলক শাস্তি বিধান করতে হবে। যেহেতু এ ক্ষেত্রে আনুপাতিক সমতা বিধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু খুলাফায়ে রাশেদীন এবং অন্যান্য সাহাবীগণের উক্তিতে এ ক্ষেত্রে কিসাসের উল্লেখ শরীয়তসম্মতরূপে লক্ষ্য করা যায়।
ইমাম আহমদ (র) সহ অন্যান্য ইমামগণ এ মতই ব্যক্ত করেছেন এবং নবী করীম (সা)-এর হাদীসও এ ধরনের অর্থব্যঞ্জক। আবূ ফেরাস (র) বলেন: এ সম্পর্কে হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা) একবার হাদীসের উদ্ধৃতি সম্বলিত ভাষণ পেশ করেন, যার ভাষ্য ছিল:
أَلَا إِنِّى وَاللَّهِ مَا أُرْسِلُ عُمَّالِى إِلَيْكُمْ لِيَضْرِبُوا اثَارَكُمْ وَلَا يَأْخُذُوا أَمْوَالَكُمْ وَلَكِنْ أُرْسِلُهُمْ إِلَيْكُمْ لِيُعَلِّمُوكُمْ دِينَكُمْ وَسُنَنَكُمْ فَمَنْ فَعَلَ بِهِ سِوى ذَالِكَ فَلْيَرْفَعَهُ إِلَيَّ - فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ اذا لأُقَصَّنْهُ - حديث عمر (رض)
“সাবধান! তোমরা স্মরণ রেখো, আল্লাহর কসম, শাসনকর্তাগণকে আমি তোমাদের প্রতি এজন্য প্রেরণ করি না যে, তারা তোমাদেরকে প্রহার করে যাবে অথবা তোমাদের ধন-সম্পদ হস্তগত করার উদ্দেশ্যও তাদের প্রেরণ করি না, বরং তোমাদেরকে দ্বীন ও মহানবীর শিক্ষা আদর্শ সম্পর্কে শিক্ষা দানকল্পেই পাঠিয়ে থাকি। সুতরাং তাদের কেউ যদি এর ব্যতিক্রম কোন কাজ করে বসে, তাকে যেন আমার নিকট উপস্থিত করা হয়। সেই সত্তার কসম- আমার প্রাণ যার ক্ষমতার অধীন- ঐসব লোকদের (অত্যাচারী সরকারী কর্মকর্তার) কাছ থেকে আমি ‘কিসাস’ বা প্রতিশোধ নেবই নেব।”
অতঃপর হযরত আমর ইবনুল আস (রা) দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন: হে আমীরুল মু’মিনীন! কোন আমীর বা গভর্ণর যদি मुसलमानों রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং জনগণের চরিত্র গঠন ও নৈতিক শিক্ষাদানে নিয়োজিত থাকে, তার থেকেও কি আপনি কিসাস গ্রহণ করবেন? হযরত উমর (রা) জবাব দিলেন: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! (অনুরূপ অন্যায় করলে) তার থেকেও আমি কিসাস নেব। আর কেবল আমিই কিসাস গ্রহণ করি না- খোদ্ নবী করীম (সা) নিজ প্রাণ ও আপন সত্তা থেকেও কিসাস বা প্রতিশোধ নিতেন। হুশিয়ার! مسلمانوںকে তোমরা মারধর করবে না, তাদেরকে অপমান করবে না, তাদের হক বা অধিকার দাবিয়ে রাখবে না। কেননা এসবের পরিণতিতে তাদের মধ্যে কুফরী প্রবণতা দেখা দেয়া বিচিত্র নয়।” (মুসনাদে আহমদ)
আলোচ্য বর্ণনার সার সংক্ষেপ এটাই যে, হাকিম, বিচারপতি, (আঞ্চলিক) শাসনকর্তা ও গভর্ণরগণ অন্যায়ভাবে কাউকে প্রহার করবে না- দণ্ড দেবে না। যদি বৈধ কারণে জনসাধারণের কাউকে প্রহার করা হয় এবং শরীয়তের বিধান অনুযায়ী প্রহার বা আঘাত করা হয় তবে ‘ইজমা’ তথা সর্বসম্মতিক্রমে (উল্লেখিত কর্মকর্তাদের) কিসাসের বিধান জারী হবে না। এ জন্যে যে, বৈধ ও শরীয়তসম্মত প্রহার, আঘাত ও জখম হয়তো ওয়াজবি হবে, না হয় মুস্তাহাব তথা পছন্দনীয় বৈধ হবে। আর এ তিনের কোনটিতেই কিসাস বর্তায় না।