📄 যেসব অপরাধের সাজা অনির্ধারিত এবং শাসক ও বিচারকের ইচ্ছাধীন
যে সকল গুনাহ বা অপরাধের সাজা অনির্দিষ্ট অধিকন্তু কাফ্ফারারও কোন উল্লেখ নেই, সেগুলোর দণ্ড বা সাজা, শিক্ষামূলক শাস্তি বিচারক কিংবা শাসনকর্তার রায়ের উপর নির্ভরশীল। স্থান কাল পাত্র ভেদে এবং ক্ষেত্র বিশেষে এর যথাযোগ্য দণ্ড বিধানে তাদেরই ভূমিকা প্রসঙ্গে এই পরিচ্ছেদের আলোচনা。
যে সকল অপরাধের নির্দিষ্ট শাস্তি কিংবা কাফফারার কোন উল্লেখ নেই যেমন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক কিংবা পরনারীকে চুমো খাওয়া, একমাত্র সহবাস ছাড়া মিলন পূর্ব আনুষঙ্গিক ক্রিয়া কলাপে লিপ্ত হওয়া; হারামবস্তু যথা প্রবাহিত রক্ত, মৃতজন্তুর গোশত ইত্যাদি খাওয়া, যিনা ব্যতীত মিথ্যা অপবাদ, অরক্ষিত বস্তু চুরি করা, 'নিসাব'' অপেক্ষা কম বস্তু চুরি করা, আমানতের খেয়ানত (বিশ্বাস ভঙ্গ) করা, যেমনটি করে থাকে বায়তুল মালের কোষাধ্যক্ষ এবং মুতাওয়াল্লী, ওয়াকফ সম্পত্তির মুতাওয়াল্লী কিংবা পিতৃহীন ইয়াতীমের অভিভাবকরা অথবা যৌথ ব্যবসায়ের অংশীদাররা। দৃষ্টান্তস্বরূপ যেমন- বিশ্বাস ভঙ্গ, আচার-ব্যবহার এবং আদান-প্রদানে প্রতারণা করা, খাদ্যবস্তু, ভোগ্যপণ্য কিংবা কাপড়ে প্রবঞ্চনা করা, মাপে কম বেশ করা, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানে উৎসাহ দেয়া, ঘুষ খাওয়া, আল্লাহ্হ্ হুকুমের বিপরীত হুকুম দেয়া, প্রজা কিংবা জনসাধারণের উপর অন্যায়-অত্যাচার অবিচার উৎপীড়ন করা, জাহেলী যুগের বাক্য উচ্চারণ কিংবা জাহেলী যুগের দাবী উঠানো, শরীয়তের নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি। এ জাতীয় অপরাধীদের সাজা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও চরিত্র গঠন, সংশোধনমূলক শিক্ষণীয় দণ্ড বিধান করা, এই সবগুলো বিষয় বিচারক কিংবা শাসনকর্তার ইখতিয়ারভুক্ত। এসব ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অধিক কি অনধিক ইত্যাদি পরিস্থিতি যাচাই করে তাঁরা শাস্তি বিধান করবেন। অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেলে কিংবা স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে, শাস্তির পরিমাণ অধিক ও কঠোর হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু অপরাধমূলক ঘটনাবলীর পরিমাণ ও মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থার আওতায় থাকলে, শাস্তিও সে অনুপাতে হালকা বা লঘু হওয়া উচিত। মোটকথা, জনগণ ব্যাপকহারে অপরাধমূলক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে থাকলে এবং অভ্যস্ত হয়ে পড়লে শাস্তিও কঠোর এবং গুরুদণ্ড হওয়া বাঞ্ছনীয়। পক্ষান্তরে ছোটখাট ও স্বল্প মাত্রার অপরাধে লঘুদণ্ডই বিধেয়।
বড় ছোট অপরাধের আনুপাতিক হারে সাজা নির্ধারিত হওয়া উচিত। যেমন, ঘটনাক্রমে একজন মহিলা কিংবা একটি বালককে অসৎ উদ্দেশ্যে উত্যক্তকারী অপরাধীর দণ্ড ঐ ব্যক্তির তুলনায় কম হওয়া উচিত, যে ব্যক্তি সদাসর্বদা নারী ও বালকদের অসৎ কাজে প্ররোচিত ও উত্যক্ত করে থাকে। এখন 'তাযীর' তথা শিক্ষা, শাসন ও দৃষ্টান্তমূলক সাজার পরিমাণ কি হবে? নির্দিষ্টভাবে তার কোন উল্লেখ নেই। তাযীরের মূল উদ্দেশ্য হলো কষ্ট ও পীড়া দেয়া। এখন কথা বা কাজের দ্বারা, বাক্যালাপ বন্ধ করে কিংবা তার সাথে পূর্বে যে ধরনের আচার-আচরণ করা হতো, সে ধরনের আচার ব্যবহার বন্ধ করে দিয়ে হোক কিংবা আদেশ-উপদেশের মাধ্যমে অথবা ভীতি প্রদর্শন এবং সাবধান ও হুশিয়ারী উচ্চারণের দ্বারা তাযীর সম্পন্ন করবে। মোটকথা, তাকে এমন কষ্ট দেয়া যার ফলে তাযীর বা শাসনের কাজ হয়ে যায়। অধিকন্তু কোন কোন সময় সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং সালাম কালাম কথা বার্তা বন্ধ করার দ্বারাও এ উদ্দেশ্য সাধন হতে পারে।
বস্তুত এর উদ্দেশ্য হল, অনুরূপ কার্যকলাপ থেকে তওবা না করা পর্যন্ত তাকে তাযীর করা উচিত। যেমন মহানবী (সা) জিহাদে শরীক না হওয়ার কারণে তিনজন সাহাবীর সাথে সালাম কালাম এবং কথা বার্তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আর তত্ত্বাবধায়ক, হাকিম কিংবা শাসনকর্তার দ্বারা যদি এমন কোন অপরাধ সংগঠিত হয়, যার উপর কোন হদ্দ নির্ধারিত নেই, তবে খলীফা তথা সরকার প্রধান কর্তৃক তাকে পদচ্যুত করে দিতে হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবীগণ (রা) করেছিলেন। ক্ষেত্র বিশেষে আবার সাময়িক খিদমত থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়ে তাযীর করা উচিত। কেউ হয়ত মুসলমানদের সামরিক ও দেশরক্ষা বাহিনীতে কার্যরত ছিল যে, সে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, সামনা-সামনি তরবারী চলছে, এমতাবস্থায় মুসলিম সেনাবাহিনীর কেউ পলায়ন করল অথচ যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা কবীরা গুনাহ।' সুতরাং এ পরিস্থিতিতে তার বেতন-ভাতা, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়াটাও এক প্রকার তা'যীর বা শাসন।
এমনিভাবে আমীর, বিচারক কিংবা শাসনকর্তা যদি এমন কোন কাজে লিপ্ত হয়, সামজে যা ঘৃণিত ও অপছন্দনীয় হিসাবে চিহ্নিত, তাহলে এমতাবস্থায় তাকে পদচ্যুত কিংবা ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে।' তার জন্যে এটাই তাযীর' হিসাবে পরিগণিত হবে।
এমনিতর কখনো অপরাধীকে জেলখানায় বন্দী করে তাযীর করতে হবে। ক্ষেত্র ও পাত্রভেদে অপরাধীর' মুখে চুন কালী মাখিয়ে' উল্টোমুখী গাধায় সওয়ার করে' বাজারে-বন্দরে, তথা লোকালয়ে ঘুরিয়ে তাকে জনসমক্ষে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে তাযীর করতে হবে। যেমন হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, মিথ্যা সাক্ষ্য দানকারীকে তিনি এ ধরনের তাযীর করেছিলেন। মিথ্যাবাদী মিথ্যা কথার দ্বারা নিজের মুখে সে নিজেই কালি মেখেছে। কাজেই কর্মফলস্বরূপ তার মুখমণ্ডল কাল করে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ সরল সোজা কথাকে যেহেতু সে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে, সেহেতু তাকেও গাধার পিঠে উল্টোমুখী সওয়ার করে সাজা দেয়া হয়েছে।
তাযীরের ক্ষেত্রে অনুর্ধ্ব দশটি দণ্ড দিতে হবে এর অধিক নয়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের মতে তাযীর এ পরিমাণ হওয়া উচিত, যাতে হদ্দের সীমা পর্যন্ত না পৌছে। অতঃপর তাযীর সম্পর্কেও তাদের মধ্যে দু'ধরনের মত পরিলক্ষিত হয়। কারো কারো মতে সীমা পর্যন্ত পৌঁছানো চাই। আযাদ ব্যক্তির হদ্দ হচ্ছে ন্যূনতম চল্লিশ কোড়া কিংবা আশি কোড়া। কাজেই তাযীরে উক্ত সংখ্যক কোড়া লাগানো ঠিক নয়। বস্তুত গোলামের তাযীর গোলামের নিম্নতম পরিমাণের সমান না হওয়া সংগত। যেমন, গোলামের হদ্দের পরিমাণ বিশ কিংবা চল্লিশ কোড়া। কাজেই তাযীর এর সমসংখ্যক হওয়া উচিত নয়।
পক্ষান্তরে কেউ বলেছেন, অপরাধী ব্যক্তি স্বাধীন হোক বা গোলাম, তাযীর গোলামের হদ্দের পরিমাণ হওয়া সমীচীন নয়। এ ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষ বলেন- স্বাধীনদের তথা তাযীর তাদের হদ্দের সমপরিমাণ হওয়া উচিত। যে প্রকার এবং যে জাতীয় তাযীর করা হবে, তা যেন হদ্দের চেয়ে মাত্রাধিক না হয়ে যায়। যেমন, কোন চোর যদি অরক্ষিত কোন স্থানের মাল চুরি করে তবে শাস্তিস্বরূপ তার হাত কাটা হবে না, অন্যভাবে তাযীর করতে হবে। সে তাযীর যদিও 'হদ্দে কযফ' পর্যন্ত পৌঁছে যায়। প্রয়োজন হলে তাকে 'হদ্দে কযফে'র চেয়ে অধিক পরিমাণে বেত্রদণ্ড দিতে হবে। যেমন, কোন ব্যক্তি যিনা তো করেনি কিন্তু তার আনুষঙ্গিক কাজগুলো করেছে, চুমো খেয়েছে, তাকে নিয়ে শয্যায় শুয়েছে অথবা যিনার এ জাতীয় অন্য কোন আনুষঙ্গিক ক্রিয়াকাণ্ড করেছে। সুতরাং এর তাযীর একশ কোড়া হতে পারবে না। অবশ্য কযফের চেয়ে অধিক হওয়াও বাঞ্ছনীয়। যেমন, বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর (রা)-এর যামানায় এক ব্যক্তি নকশী করা একটি আংটি তৈরী করেছিল। বাইতুল মাল থেকে কিছু মাল চুরি করে সে তাতে লাগিয়েছিল। এটা প্রমাণিত হওয়ার পর হযরত ওমর (রা) প্রথম দিন তাকে একশ কোড়া লাগান, দ্বিতীয় দিন একধম এবং তৃতীয় দিনও তাকে একশত কোড়া লাগানো হয়।
খোলাফায়ে রাশেদীন থেকে বর্ণিত আছে- একদা রাত্রিকালে কোনও এক ব্যক্তিকে জনৈকা পরনারীসহ একই লেপের নীচে শয্যাশায়ী অবস্থায় পাওয়া যায়। অতঃপর এর দণ্ডস্বরূপ উভয়কে একশ করে কোড়া লাগানো হয়েছিল।
হযরত নবী করীম (সা) থেকে বর্ণিত- কোন ব্যক্তি আপন স্ত্রীর বাঁদীর সাথে যদি সহবাস করে, তবে তাকে রজম বা প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। এটা ইমাম আহমদ (রহ)-এর অভিমত। আর প্রথমের দুটি ধারা ইমাম শাফিঈ (রহ)-এর মযহাব অনুযায়ী। ইমাম মালিক (রহ) এবং অন্যান্য থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, কোন কোন অপরাধ এমনও রয়েছে, যার সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন 'হদ্দ'-এর উল্লেখ নেই। কিন্তু তার তাযীর বা সাজা প্রাণদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। ইমাম আহমদ (রহ)-এর কোন কোন শাগরিদও এ মতের অনুসারী। যেমন, কোন মুসলমান যদি কাফির ও দুশমনের পক্ষে গুপ্তচর বৃত্তিতে লিপ্ত হয়, যার ফলে مسلمانوں জান মালের ক্ষতির আশংকা দেখা যায়, এমতাবস্থায় ইমাম আহমদ (রহ) কোন মত ব্যক্ত না করে নীরবতা অবলম্বন করেন, কিন্তু ইমাম মালিক (রহ) এবং ইবনে 'উকায়লীর ন্যায় কোন কোন হাম্বলী ইমামের মতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা (রহ), ইমাম শাফিঈ (রহ) এবং আবুয়ালীর ন্যায় অপর কোন হাম্বলী ইমামের মতানুসারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দান সমীচীন নয়।
কোন ব্যক্তি যদি কুরআন হাদীসের পরিপন্থী কোন বিদ'আত ও শরীয়ত বিরোধী প্রথা চালু করে কিংবা এর প্রতি মানুষকে আহ্বান জানায় ও তার অনুকূলে প্রচারণা চালায় তবে তাকে আদালত মৃত্যু দিতে পারবে। ইমাম মালিক (রহ)-র বহু শিষ্য-শাগরিদও এ মতের সমর্থনকারী। পক্ষান্তরে ইমাম মালিক (রহ) ও অন্য ইমামগণ 'কাদরিয়্যাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দানের হুকুম দিয়েছেন। তাঁদের এ হুকুম কাদরিয়্যাদের 'মুরতাদ' (ইসলাম ত্যাগী) হওয়ার ভিত্তিতে নয়, বরং এদের দ্বারা 'ফাসাদ ফিল আরদ' অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করার কারণে দেয়া হয়েছে।
এমনিভাবে কেউ কেউ যাদুকরদেরও মৃত্যুদণ্ড দানে মত ব্যক্ত করেছেন। আর অধিকাংশ আলিমও একই মত পোষণ করেন। এ পর্যায়ে হযরত 'জুন্দুব' (রা) থেকে মওকূফ' ও 'মরফু' উভয় সূত্রে রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে।
حَدُّ السَّاحِرِ ضَرْبُهُ بِالسَّيْفِ .
“যাদুকরের হদ্দ বা সাজা হল তরবারীর আঘাতে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা।” (তিরমিযী)
হযরত ওমর (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত হাফসা (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা) এবং অন্যান্য সাহাবীগণের মতে যাদুকরের সাজা হলো তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া। অবশ্য এর কারণ সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন আলিমের মতে যাদুকর সেও কাফির হয়ে যাওয়ার কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। আর কেউ বলেছেন, যাদুকর ঠিকই হত্যার যোগ্য তবে, তা ফাসাদ ফিল আরদ' فَسَادُ فِي الْأَرْضِ সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টির কারণে। কিন্তু জমহূর উলামা তথা অধিকাংশ আলিম এর মতে, শরীয়তী হদ্দের ভিত্তিতেই সে হত্যা যোগ্য অপরাধী।
এমনিভাবে যে সকল অপরাধের শাস্তিতে প্রাণদণ্ড প্রদান ওয়াজিব হয়ে পড়ে, সে জাতীয় অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে 'তাযীরস্বরূপ ইমাম আবূ হানীফা (রহ) প্রাণদণ্ডের অনুকূলে মত ব্যক্ত করেন। যেমন, কোন ব্যক্তি যদি বারংবার 'লাওয়াতাত' বা পুং মৈথুন করতে থাকে অথবা কেউ মানুষকে ধোকা দিয়ে, প্রবঞ্চনার আশ্রয়ে অর্থ কড়ি হাতিয়ে নেয়, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দান ওয়াজিব।
এমনিভাবে কারো সম্পর্কে যদি এটা প্রমাণিত হয় যে, হত্যা করা ব্যতীত তার অনিষ্টকারী কার্যকলাপ এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় নেই, এমতাবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।
ইমাম মুসলিম তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ সহীহ মুসলিমে হযরত 'আরফাজা আল আশজাঈ' (রহ)-র রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে শুনেছি: مَنْ أَتَاكُمْ - وَأَمْرُكُمْ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ فِي جَمَاعَتِكُمْ فَاقْتُلُوهُ - (مسلم)
“যে ব্যক্তি তোমাদের সমাজে বিভে-বিশৃংখলা এবং অনৈক্য সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করে, তবে সে মৃত্যুদণ্ড পাবার যোগ্য।”
অপর এক হাদীসে রয়েছে: سَيَكُونُ هُنَاتَ وَهُنَاتَ فَمَنْ أَرَادَ أَنْ يُفَرِّقَ أَمْرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ وَهِيَ جَمِيعٌ فَاضْرِبُوهُ بِالسَّيْفِ كَائِنَا مَنْ كَانَ -
“একের পর এক ফিৎনা সৃষ্টি হতে থাকবে তখন, যদি কোন ব্যক্তি এ জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির দুরভিসন্ধি করে আর তোমাদের ঐক্য-সংহতি নষ্ট করার প্রয়াস চালায়, সে যেই হোক না কেন (তার বিচার করে) তরবারীর আঘাতে তাকে প্রাণদণ্ড দিতে হবে।"
শরাব পানের ব্যাপারেও অনুরূপ কথাই বলা হয়েছে যে, কয়েক বারের তাযীর সত্ত্বেও যদি নিবৃত না হয়, তখন চতুর্থবার তাকে প্রাণদণ্ড দিতে হবে। এ মতের সমর্থনে মুসনাদ গ্রন্থে ইমাম আহমদ কর্তৃক দাইলাম আল হিময়ারী (রা)-কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, হযরত দাইলাম (রা) প্রশ্ন করেন, হে রাসূলুল্লাহ! আমি এমন এলাকা থেকে আগমন করেছি, যেখানে মদের সাহায্যে বড় বড় কার্য সমাধা করা হয়। এর দ্বারা চিকিৎসা করা হয়। আমরা গম থেকে শরাব প্রস্তুত করি, মদ দ্বারা আমরা উল্লেখযোগ্য শক্তি লাভ করি। এ ব্যবসাতে আমরা বেশ সাফল্যও লাভ করে থাকি। অধিকন্তু আমাদের অঞ্চলে তীব্র শীত পড়ে থাকে। এর দ্বারা শরীর গরম রাখা হয়। হুযূর (সা) বলেন-
"তাতে নেশা ধরে?” আমি বললাম হাঁ। তিনি বললেন- "এ থেকে বেঁচে থেকো”। আমি পুনরায় আরয করলাম- “হুযূর! মানুষ এটা কিছুতেই বর্জন করবে না।”
এবার নবীজি ইরশাদ ফরমান- فَإِنْ لَّمْ يَّتْرُكُوهُ فَاقْتُلُوهُ - “যদি তারা তা বর্জন না করে, তবে তাদের (এ সমাজ বিরোধী খোদাদ্রোহীদের) মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।”
বস্তুতঃ এ নির্দেশের মূল কারণ হল, এ দ্বারা সমাজে ফিৎনা-ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। (মানবদেহের ক্ষতিসহ অন্যান্য ক্ষতিতো আছেই।) দ্বিতীয়ত, এটা হচ্ছে ক্ষতিকর আক্রমণকারীর অনুরূপ। তাই আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে হিংস্র আক্রমণকারীকে হত্যা যেমন বৈধ ও জরুরী, তদ্রূপ মাদক দ্রব্যের ব্যাপক ক্ষতির প্রেক্ষিতে এর হুকুমও একই পর্যায়ের। সাজা দুই প্রকার: এ ব্যাপারে সবাই একমত। (১) অতীত অপরাধ কর্মের সাজা, যা সে ইহজগতেই ভোগ করে যায় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে মুক্তি লাভ করে। যেমন, শরাবখোর ও মিথ্যা অপবাদ দানকারীকে কোড়া লাগানো। বিদ্রোহী এবং চোরের হাত কাটা ইত্যাদি। (২) নিজের উপর ওয়াজিব হক আদায় না করা। অনবরত গুনাহ করতে থাকা। এমন অপরাধীকে শাস্তি দানের উদ্দেশ্য হল- তার নিকট যা প্রাপ্য তা আদায় করা আর ভবিষ্যতে সে যাতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, সে ব্যাপারে তাকে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণে বাধ্য করা। যেমন ইসলাম ত্যাগকারী মুরতাদ। প্রথমতঃ তওবা এবং ইসলাম গ্রহণের জন্য তাকে আহ্বান জানাতে হবে। ডাকে সাড়া দিয়ে তওবার মাধ্যমে সে যদি মুসলমান হয়ে যায়, তবে তো উত্তম, অন্যথায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। আর যেমন নামায, রোযা বর্জনকারী এবং যে ব্যক্তি পরের হক আদায় করে না কিংবা নষ্ট করে, এসব ক্ষেত্রে হক ও ওয়াজিবসমূহ আদায় করার জন্য তাকে সুযোগ দিবে। আর ব্যতিক্রম অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সুতরাং দ্বিতীয় প্রকারের অপরাধে প্রথম প্রকারের চেয়ে কঠোর হস্তে তাযীর করতে হবে। তাই নামায, রোযা বর্জনকারীকে তার উপর আবর্তিত ওয়াজিবগুলো আদায় না করা পর্যন্ত, বার বার প্রহার কার্য করে তাকে শাসন করতে হবে।
আর এ বিষয়ে বুখারী ও মুসলিমের হাদীস নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো। মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন- لَا يُجْلَدُ فَوْقَ عَشْرَةِ أَسْوَاطِ إِلَّا فِي حَدٌ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ -
"আল্লাহর নির্ধারিত হদ্দ ব্যতীত দশটির অতিরিক্ত কোড়া লাগানো যাবে না।" এর ব্যাখ্যায় আলিমগণের একাংশের অভিমত হলো, উক্ত হাদীসের মর্ম হলো আল্লাহর নির্ধারিত হদ্দসমূহ আল্লাহর হকের জন্য হারাম করা হয়েছে। কেননা কুরআন হাদীসে উল্লেখিত হদ্দের অর্থ হলো হালাল-হারামের মধ্যবর্তী সীমারেখা। অর্থাৎ হালালের শেষ সীমা এবং হারামের প্রথম সীমার মধ্যখানে অবস্থিত সীমারেখা। হালালের শেষ সীমা সম্পর্কে আল্লাহ ফরমান-
تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا -
"এ হলো আল্লাহ্ নির্ধারিত সীমারেখা। তাই তোমরা এগুলো অতিক্রম করবে না।” পক্ষান্তরে হারামের প্রারম্ভিক সীমা সম্পর্কে আল্লাহর বাণী হলো-
تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا -
"এগুলো হলো আল্লাহ্ ঘোষিত সীমা চিহ্ন। সুতরাং এর নিকটেও তোমরা যাবে না।"
এখন কথা হল, উক্ত সাজাকে হদ্দ কেন বলা হয়? এর উত্তরে বলা যায় যে, এটা একটা নতুন পরিভাষা। এর তাৎপর্য ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।
উল্লেখিত হাদীসের উদ্দেশ্য হল- কেউ নিজের প্রাপ্য আদায় করার জন্য- সমস্যাটা যদি আঘাত ও মারপিটের ঘটনা পর্যন্ত গড়ায়, তা হলে দশটির অধিক আঘাত করা তার জন্য বৈধ নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, যেমন কারো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়ে গেল, ফলে কোন এক পক্ষ থেকে অন্যায়-বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হলো, এহেন পরিস্থিতিতে মজলুমের অধিকার আদায়কল্পে অন্যায়কারীকে দণ্ডিত করা জরুরী। তবে বেত্রদণ্ডের ক্ষেত্রে দশের অধিক নয়।
টিকাঃ
১. টীকা: নিসাব বলা হয় ঐ পরিমাণ অর্থ-সম্পদ কেউ যার মালিক হলে, তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হয়।
১. টীকা: উক্ত তিনজন সাহাবী হলেন- হযরত কা'ব ইবনে মালিক, হেলাল ইবনে উমাইয়্যা এবং মুরারাহ ইবনে রবী (রা)। এ তিন জনের তওবা কবুল হওয়া সম্পর্কে কুরআনে করীমে ইরশাদ হচ্ছে- وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلْفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ - ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوْبُوا - إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمِ (سورة توبة : (۱۱৮) "আর ঐ তিন জন যাদের ব্যাপারে ফয়সালা আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় মূলতবী রাখা হয়েছিল তাদেরও অবস্থা এই যে, আল্লাহর যমীন বিশাল-বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের উপর তা সংকীর্ণ ও সংকুচিত হয়ে যায় এবং নিজেদের জীবনের প্রতিও তারা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। অধিকন্তু তাদের বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি হয় যে, আল্লাহর পাকড়াও থেকে মুক্তির ব্যাপারে তিনি ছাড়া তাদের দ্বিতীয় কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন যেন তারা তওবায় অটল থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় তওবা গ্রহণকারী এবং পরম দয়ালু।" (সূরা তাওবা : ১১৮) মহানবী (সা) এ তিনজন সাহাবীর সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করে কার্যতঃ তাদেরকে বয়কট করার জন্য সকলের প্রতি নির্দেশ দেন। তাদের সাথে সালাম কালাম, কথা বার্তা বন্ধ করে দেন। এমনকি পরিবারস্থ লোকজন পর্যন্ত তাদের সাথে চলা-ফেরা আলাপ-আলোচনা বন্ধ করে দেয়। ফলে তাদের অবস্থা দাঁড়ায় এই, যা উল্লেখিত আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারটা ঘটেছিল হিজরী দশম সালে সংঘটিত 'তবুক যুদ্ধের সময়। তবুক যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্য কঠিন পরীক্ষার বিষয়। কেননা একদিকে প্রচণ্ড গরমের মৌসুম, সফর ছিল অতি দূর দূরান্তের। সহায় সম্বল বলতে কিছুই ছিল না। তদুপরি মদীনাবাসীদের গোটা বছরের খাদ্যের ব্যবস্থা খেজুর কাটার পুরা মৌসুম। ফলে সবাই চিন্তিত ছিল যে, এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ যাত্রা কিভাবে সম্ভব? সুতরাং এ যুদ্ধে মদীনাবাসীরা পাঁচ দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। (১) মহানবী (সা) মুহাজির এবং অনাসারগণ। যে কোন পরিস্থিতিতে তাঁরা যুদ্ধ যাত্রার দৃঢ় সংকল্পে সর্বোতভাবে প্রস্তুত হয়ে যান। (২) মুহাজির ও আনসারদের সে সকল লোক, প্রথমতঃ যুদ্ধ যাত্রায় দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। কিন্তু পরিশেষে যুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে তাঁরা প্রস্তুত হয়ে যান এবং রওনা দেন। (৩) এ দলে মাত্র তিনজন ছিলেন। অবহেলা ও অলসতার দরুন যারা যুদ্ধ যাত্রা থেকে বিরত থাকেন। নবী করীম (সা) যুদ্ধ থেকে মদীনা প্রত্যাবর্তনের পর এরাও হুযূর (সা)-এর খিদমতে হাজির হন। তাদেরকে জিহাদে শরীক না হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে তারা সত্য সত্য ঘটনাই ব্যক্ত করেন যে, আমাদেরই অপরাধ, বিনা কারণে আমরা জিহাদে গমন করা থেকে বিরত ছিলাম। আদালতে নববী থেকে এ তিনজনের সাথে সামাজিক বয়কটের নির্দেশ আসে। হুযূর (সা) তাদেরকে বলেন, ওহীর অপেক্ষা করতে থাক। আল্লাহর পক্ষ থেকে যা হুকুম হবে, তার উপরই আমল করা হবে। (৪) চতুর্থ দল ছিল মুনাফিকদের। সূরা 'তওবায়' তাদের কঠোর ভাষায় তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। (৫) ঐ সকল লোক, যারা কোন ওযর বা অক্ষমতার কারণে ঐ যুদ্ধে শরীক হতে পারেননি। এ আয়াতে আল্লাহর ফযল ও করুণার উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী আল্লাহর ফযল, রহমত ও করুণার অংশ দেয়া হয়েছে। নবী করীম (সা) মুহাজির ও আনসারদের উপর আল্লাহ তা'আলার দান-'ফযল' এই হয়েছে যে, যুদ্ধ যাত্রা সম্পর্কে আদৌ তাঁরা দ্বিধান্বিত হন নাই। বরং তাঁরা ছিলেন দৃঢ় সংকল্প এবং অটুট অনড় ইচ্ছার অধিকারী। আর যারা ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত, তাঁদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ হয়েছে এই যে, শেষ পর্যন্ত তাঁরা পয়গম্বর (সা)-এর সঙ্গীরূপে যুদ্ধে গমন করেন। অধিকন্তু কা'ব (রা), হেলাল (রা) এবং মুররাহ (রা) এ তিন জনের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ হলো যে, তাঁরা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাদের তওবা কবুল করেন। মোটকথা, সামাজিক বয়কটের ফলে অপরাধী যদি শিক্ষা গ্রহণ করে এবং অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে তবে, এটাও (আদালতে) কার্যকর বলে বিবেচিত হতে পারে। অতএব সার কথা হল- যে সমস্ত অপরাধের হদ্দ বা সাজা নির্ধারিত নেই অথচ তাকে তাযীর করা উদ্দেশ্য, এ ক্ষেত্রে ইমাম, শাসনকর্তা বা বিচারপতির কর্তব্য হলো অপরাধীর অবস্থানুযায়ী তাযীর করা বা সাজা দেয়া এবং তাকে অপরাধ থেকে নিবৃত রাখা।
টীকা-১: হযরত 'জুন্দুব' (রা)-র ঘটনা আবুল ফারাজ ইসফাহানী রচিত আল আগানী গ্রন্থে সনদসহ (রেওয়ায়েত সূত্র) বর্ণনা করা হয়েছে। ঘটনার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে- ওলীদ ইবনে ওকবার দরবারে একবার কোন এক যাদুকর উপস্থিত হয়। যাদুমন্ত্র বলে সে গাভীর উদরে অনায়াসে প্রবেশ করত এবং বেরিয়ে আসত। ঘটনাক্রমে হযরত জুন্দুব (রা) সেখানে উপস্থিত হয়ে ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন। সবার অলক্ষ্যে উঠে গিয়ে ঘর থেকে তিনি তরবারী হাতে ফিরে আসেন। খেলার এক পর্যায়ে যাদুকর গাভীর পেটে ঢুকতেই তিনি তরবারীর এক প্রচণ্ড আঘাতে যাদুকরসহ গাভীটি দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেন। আর মুখে তিলাওয়াত করতে থাকেন- افَتَأْتُونَ السَّحْرَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ - "তোমরা কি জেনে শুনে যাদু চর্চায় এসেছ?” (সূরা আম্বিয়া: ৩) পরিস্থিতির নাজুকতা অনুধাবন করে উপস্থিত সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ইরাক শাসক ওলীদের নির্দেশে জুন্দুবকে গ্রেফতার করে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। আর বিস্তারিত ঘটনা লিপিবদ্ধ করে খলীফা উসমান (রা)-র নিকট পত্র প্রেরণ করা হয়। ঘটনাক্রমে সে কারাগারে ছিল খৃষ্টান দারোগা। হযরত জুন্দুব (রা) গভীর রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ছেন এবং দিনের বেলা রোযা রাখছেন। এ অবস্থা দেখে খৃষ্টান কারারক্ষী মনে মনে বলতে থাকে- “আল্লাহর কসম! যে জাতির অপরাধ-প্রবণ ও প্রতারক দুষ্ট লোকদের অবস্থা এই, সে জাতি সে ধর্ম অবশ্যই সত্য ও নির্মল।" অন্য একজনের উপর কারাগারের দায়িত্ব অর্পণ করে সে নিজে 'কুফা' চলে যায়। এখানে লোকদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে এবং স্থানীয় লোকদের নিকট এখনকার সবচেয়ে সৎ ও পুণ্যবান ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে থাকে। তারা জবাব দিল সে ব্যক্তি হচ্ছে 'আশআছ বিন কায়স।' সে তাঁর বাড়ীতে অতিথি হলো। আর লক্ষ্য করল যে, তিনি রাতে ঘুমান এবং সকালে আহার করেন। অতঃপর কুফবাসীদেরকে পুনরায় জিজ্ঞেস করল 'এখানে সব চেয়ে উত্তম ব্যক্তি কে?' উত্তরে তারা বলল- জারীর ইবনে আবদুল্লাহ'। উক্ত খৃষ্টান তাঁকেও হযরত 'আশআছ ইবন কায়স-এর অনুরূপ দেখতে পেল। অতঃপর কেবলামুখী হয়ে সে ঘোষণা করতে থাকে- رَبِّي رَبُّ جُنْدُبٍ وَدِيْنِي دِينُ جُنْدُبٍ - 'জুন্দুবের যিনি প্রভু- আমারও তিনি প্রভু-পালনকর্তা আর জুন্দুবের দ্বীনই আমার দ্বীন।' এ মন্তব্য করার পরক্ষণেই তিনি কালিমা তাইয়্যেবা পাঠ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। 'সুনানে কুবরাতে ইমাম 'বায়হাকী' সামান্য পরিবর্তনসহ ঘটনাটি এভাবে উল্লেখ করেন: ওলীদ ইবন উকবা তখন ইরাকের শাসনকর্তা। তাঁর নিকট একজন যাদুকর উপস্থিত হয়ে নিজের মন্ত্রবলে সে খেলা দেখাতে শুরু করে। সে এক ব্যক্তির গর্দান উড়িয়ে দেয়। অতঃপর নিহত ব্যক্তির নাম করে সজোরে চিৎকার দেয়। এতে নিজে নিজেই তার ছিন্ন মস্তক এসে দেহের সাথে জোড়া লেগে যায় এবং সজীব হয়ে উঠে। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনতা বিস্মিত ও আশ্চর্য কণ্ঠে বলে উঠে سُبْحَانَ اللَّهَ يُحْي الْمَوْتَ "সুবহানাল্লাহ! এ তো মৃতকে জীবন দান করে দেখছি।” এহেন অবস্থা দেখে এর পরবর্তী দিন মুহাজিরদের মধ্য থেকে এক জন তরবারী হাতে ঘটনাস্থলে হাজির হন। যাদুকর পূর্ব দিনের ন্যায় যথারীতি তার ভেল্কীবাজী শুরু করলে তিনি জনতার মধ্য থেকে এগিয়ে আসেন এবং তরবারীর একই আঘাতে দেহ থেকে তার মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। আর মন্তব্য করতে থাকেন- "সে যদি সত্য সত্যই মৃতের জীবন দানে সক্ষম হয়ে থাকে, তবে নিজে নিজেই জীবিত হয়ে উঠুক।" ওলীদ তখন দীনার নামক কারারক্ষীর প্রতি তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করার হুকুম দেন। মোটকথা, যাদু বিদ্যা ইসলাম বিরোধী কাজ। কেননা এদ্বারা মানুষ ধোকায় পড়ে যায়। সুতরাং সত্য ও দ্বীনের মাপকাঠি একমাত্র আল্লাহর কিতাব এবং সুন্নতে রাসূল (সা), যা কিছু এ দুয়ের সাথে মিল খাবে তা সত্য। পক্ষান্তরে এর বিপরীত সব কিছুই গোমরাহী বলে প্রতিপন্ন হবে। এ কারণেই ইসলামী আইন বিশেষক আলিমগণ যাদুকরের প্রাণদণ্ডের অনুকূলে মত দিয়েছেন। এখানে কারাগারে প্রেরণের ঘটনাটি আইন হাতে তুলে নেয়ার।
📄 যে ধরনের কোড়া দ্বারা অপরাধীকে শাস্তি দেবে এবং যেসব অঙ্গে কোড়া মারা যাবে না
শরীয়তের বিচারে অপরাধিকে যে কোড়া লাগানোর নির্দেশ রয়েছে, তা মধ্যম মানের হতে হবে। কেননা মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন, خَيْرُ الْأَمُوْرِ أَوْسَطُهَا “অর্থাৎ মধ্যমপন্থা অবলম্বন করাই উত্তম।”
হযরত আলী (রা) বলেন- আঘাত খুব শক্তও হানা যাবে না, আবার একেবারে লঘুও নয়। বেতটি অতি বড়ও নয় আবার একেবারে ছোটও হওয়া উচিত নয়। কাষ্ঠখণ্ডের দ্বারা প্রহার করা যাবে না, কাঁটাযুক্ত জিনিস দিয়েও না। এ ক্ষেত্রে দোররা যথেষ্ট নয়, বরং দোররা ব্যবহার করতে হবে তা'যীর তথা শিক্ষামূলক শাস্তিতে। 'হদ্দে শরীয়া'র ক্ষেত্রে কোড়া দ্বারাই দণ্ড দিতে হবে।।
হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) কাউকে আদব শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে দোররা ব্যবহার করতেন। কিন্তু 'হদ্দে শারঈ' কার্যকর করার কালে কোড়া আনিয়ে নিতেন। কোড়া মারার সময় অপরাধীর পরিধেয় সকল বস্ত্র খুলে নেয়া যাবে না, বরং সে পরিমাণ বস্ত্রই খোলা যাবে, যা প্রহারের তীব্রতা রোধ করে। লক্ষ্য রাখতে হবে, প্রহারের ক্রিয়া যেন রগ কিংবা অস্ত্রে না পৌঁছে। বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বাঁধা যাবে না। অপরাধীর মুখমণ্ডলেও আঘাত করা যাবে না। আসল উদ্দেশ্য হল, তাকে শিক্ষা দেয়া, তার প্রাণ সংহার করা নয়। প্রহার এ পরিমাণ করতে হবে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেন টের পায়, ব্যথায় জর্জরিত হয়। উদাহরণতঃ পিঠ, কাঁধ এবং রানের উপর প্রহার করতে হবে।
📄 শাস্তি ও শাস্তি প্রাপ্তদের শ্রেণী বিভাগ
আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের (সা) নাফরমানীর পরিপ্রেক্ষিতে প্রদত্ত সাজাও দুই প্রকার। (১) এক, দুই কিংবা ততোধিক ব্যক্তির উপর এই সাজা প্রয়োগ করা হয়। ইতিপূর্বে যার বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। (২) এই সাজা যা একটি শক্তিশালী দল বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়। মৃত্যুদণ্ড ছাড়া যাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বাধীন 'জিহাদ' অর্থাৎ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দুশমনদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ এর আওতায়।
দীনের তাবলীগ ও প্রচার ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও যারা ইসলাম তো কবুল করেই না বরং ইসলামের বিরুদ্ধে আগ্রাসী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, তাদের মুকাবিলায় জিহাদ করা ওয়াজিব হয়ে পড়ে। যতক্ষণ পর্যন্ত দীনের বিরুদ্ধে ফিৎনা ফাসাদ নির্মূল না হবে এবং আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত ও বিজয়ী না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শত প্রতিকূলতার মাঝেও এ জিহাদ' অব্যাহত রাখতে হবে।
ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় মহানবী (সা)-এর প্রতি কেবল ইসলামী দাওয়াত পৌঁছানোরই আদেশ ছিল। তখনও জিহাদের অনুমতি দেয়া হয়নি। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে যখন তিনি মদীনার দিকে হিজরত করলেন এবং সেখানেও ইসলামের দুশমনরা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেল, তখনই আল্লাহ তায়ালা মহানবী (সা) ও সাহাবীগণকে আত্মরক্ষামূলক পরিস্থিতিতে জিহাদের অনুমতি দান করেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী হলো-
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتِلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ - الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٍّ - إِلَّا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهَ - وَلَوْلا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسِ بَعْضُهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ - إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ - الَّذِينَ إِنْ مُكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلوةَ وَأتُوا الزَّكَوٰةَ وَآمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ - وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ. (سورة الحج : ٤١-٣٩)
“যেসব মুসলমানের সাথে কাফিররা যুদ্ধ করে, এখন তাদেরকেও কাফিরদের সাথে আত্মরক্ষাকল্পে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হলো। এ জন্য যে, তাদের উপর নিপীড়ন চলছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম ও শক্তিশালী। এরা সেসব নির্যাতিত ও মযলূম, যাদেরকে অন্যায়ভাবে দেশ থেকে শুধু এ অপরাধে বহিষ্কার করা হয়েছে যে, তাদের ঘোষণা হলো, "একমাত্র আল্লাহই আমাদের প্রভু- পরওয়ারদিগার। আর আল্লাহ যদি মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা দমন করার ব্যবস্থা না করতেন তাহলে (খৃষ্টানদের) গীর্জাসমূহ, (ইহুদীদের) উপাসনালয়সমূহ এবং (মুসলমানদের) মসজিদসমূহ যেগুলোতে অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করা হয়, কবেই এগুলো বিনাশ করে দেয়া হতো। আর যেসব লোক আল্লাহর (দীনের) সাহায্য করবে, আল্লাহও নিশ্চয়ই তাদের সাহায্য করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অধিক শক্তিধর এবং পরাক্রমশালী।
(মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত) আমি যদি তাদেরকে কোনো ভূখণ্ডে শাসন কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত করি তখন তারা সমাজে নামায কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে। আর সকল কাজের ফলাফল দানের অধিকার একমাত্র আল্লাহর এখতিয়ারে নিহিত।” (সূরা হজ্জ : ৩৯-৪১) এরপর মুসলমানদের উপর জিহাদ ফরয ঘোষণা করে আয়াত নাযিল হয়-
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ - وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ - وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (سورة البقرة : ٢١٦)
“(হে মুসলমানগণ!) তোমাদের উপর জিহাদ ফরয করা হলো, যদিও সেটা তোমাদের নিকট অপ্রিয়। আর (জেনে রেখো,) কোন জিনিস হয়তো তোমাদের অপ্রিয় অথচ পরিণামে সেটাই তোমাদের জন্য মঙ্গলকর, পক্ষান্তরে কোন বস্তু হয়তো তোমাদের অতিপ্রিয়' কিন্তু মূলত: সেটা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। বস্তুতঃ আল্লাহ্ই পরিণাম সম্পর্কে জানেন তোমরা সেটা জান না।" (সূরা বাকারা: ২১৬)
অতঃপর মাদানী সূরাগুলোর মধ্যে জিহাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করা হয়েছে আর জিহাদ ফরয করা হয় আর নিন্দা করা হয়েছে জিহাদ বর্জনকারীদের। অধিকন্তু জিহাদ তরককারীকে মনের রোগী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ ঘোষণা করেন-
قُلْ إِنْ كَانَ أَبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ نِ اقْتَرَفْتَمُوهَا وَتِجَارَةً تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ - وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ. (سورة التوبة : ٢٤)
“হে নবী! আপনি مسلمانوںকে বলুন যে, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্র, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন তোমাদের উপার্জিত ধন-সম্পদ খোয়াবার, ব্যবসা-বাণিজ্যের বাজার যা মন্দা হয়ে যাওয়ার শংকাবোধ করো আর নিজেদের যেসব বাসগৃহে বসবাস করতে তোমরা ভালবাস- এই প্রত্যেকটি বস্তু যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করার চাইতে অধিক প্রিয় অনুভূত হয়, তবে তোমরা অপেক্ষায় থাকো, আল্লাহর যা কিছু করার তিনি তাই বাস্তবায়িত করবেন। আর আল্লাহ তাঁর হুকুম অমান্যকারী লোকদের সঠিক পথে পরিচালিত করেন না।" (সূরা তাওবা: ২৪)
আল্লাহ আরো বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ. (سورة الحجرات : ١٥)
"খাঁটি মুমিনতো একমাত্র তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে, অতঃপর নির্দ্বিধায় আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে জিহাদ' করবে, বস্তুতঃ তারাই সত্যবাদী, খাঁটি মুসলমান।" (সূরা হুজুরাত : ১৫)
তিনি আরো বলেন-
فَإِذَا أُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ مُحْكَمَةٌ وَذُكِرَ فِيهَا الْقِتَالُ رَأَيْتَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ نَظَرَ الْمَغْشِي عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَأَوْلَى لَهُمْ . طَاعَةً وَقَوْلٌ مَّعْرُوفٌ - فَإِذَا عَزَمَ الْأَمْرُ فَلَوْ صَدَقُوا اللهَ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ - فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ. (سورة محمد : ۲۲-۲۰)
“অতঃপর যদি দ্ব্যর্থহীন কোনো সূরা অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যুদ্ধের কোনো নির্দেশ থাকে, তখন হে নবী! অন্তরে নিফাকের রোগগ্রস্ত লোকদেরকে আপনি দেখতে পাবেন যে, তারা আপনার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকায় যেন, কারো উপর মৃত্যুকালীন ভীতি নেমে এসেছে। তাদের জন্য বড়ই আফসোস! তাদের মুখেতো আনুগত্যের স্বীকারোক্তি ও ভাল ভাল কথা ধ্বনিত হয়। কিন্তু যখন চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়া হলো, তখন তারা যদি আল্লাহর নিকট তাদের ওয়াদার ব্যাপারে সত্যবাদী হতো তাহলে এদের জন্য মঙ্গলজনক হতো। সুতরাং যদি তোমরা বিমুখ হয়ে যাও তবে কি তাহলে তোমরা যমীনের বুকে ফাসাদ সৃষ্টি করার নিকটবর্তী অথবা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী হয়ে যাবে?” (সূরা মুহাম্মদ: ২০-২২)
কুরআন পাকে এ জাতীয় বহু আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। এমনিভাবে জিহাদ ও মুজাহিদীনদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং গুরুত্ব সূরা আস্ সাফ এর মধ্যে বর্ণনা করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيكُمْ مِّنْ عَذَابٍ الِيْمَ - تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَالِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ - يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتٍ عَدْنٍ - ذَالِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ - وَأُخْرَى تُحِبُّوْنَهَا نَصْرٌ مِنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ - وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ (سورة صف : ۱۳-۱۰)
“হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেবো, যা তোমাদেরকে আখিরাতের কষ্টদায়ক 'আযাব থেকে মুক্তি দান করবে? তা এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং জান-মালের দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করা। এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গল ও কল্যাণকর, যদি তোমরা প্রজ্ঞা ও বিবেকবান হয়ে থাক। (এসব কাজ করলেই) আল্লাহ তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন আর তোমাদেরকে 'আদন' জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত, তদুপরি স্থায়ী জান্নাতের নয়নাভিরাম বাসগৃহে তোমাদের (প্রবেশ করাবেন), এটাই হল পরম সাফল্য। অধিকন্তু তোমাদের প্রাণপ্রিয় অপর একটি নিয়ামতও (দেয়া হবে সেটা হলো), আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয়। (হে নবী!) মুমিনদেরকে আপনি এর সংবাদ শুনিয়ে দিন।” (সূরা সাফ: ১০-১৩)
আল কুরআনে আরো ইরশাদ হয়েছে: أجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجُ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - لَا يَسْتَوْنَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ - الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللهِ - وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ - يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانِ وَجَنَّت لَهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ - خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا - إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ (سورة توبة : ১৯-২২)
"তোমরা কি হাজীদেরকে পানি পান করানো এবং মসজিদে হারাম তথা কাবা শরীফ আবাদ রাখাকে সে ব্যক্তির সমতুল্য মনে করেছ, যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ও কিয়ামত দিবসে উপর ঈমান এনেছে, আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে? এরা আল্লাহর নিকট আদৌ সমমানের হতে পারেনা। আর আল্লাহ কখনো জালিমদেরকে হিদায়েত দান করেন না। যারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং নিজের জান-মালের দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, আল্লাহর নিকট তারা অতি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। অধিকন্তু এরাই পরিপূর্ণ সফলকাম। তাদের পালনকর্তা তাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে দয়া, সন্তুষ্টি এবং এমন উদ্যানসমূহের সুসংবাদ দান করেছেন, যেখানে তাদের জন্য চিরস্থায়ী নিয়ামত বিদ্যমান থাকবে, আর সেখানে তারা অনন্তকাল বসবাস করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট রয়েছে বিরাট প্রতিদান।" (সূরা তাওবা: ১৯-২২)
মহান আল্লাহ্ আরও ইরশাদ করেছেন- يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدُّ مِنْكُمْ عَنْ دِيْنِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّوْنَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ - يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ - ذَالِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ - وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (سورة المائدة : ٥٤)
"হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি নিজের দীন থেকে ফিরে যায়, তবে আল্লাহ্ অতি শীঘ্রই এমন এক জাতি সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন। পক্ষান্তরে তারাও আল্লাহকে ভালবাসবেন। মুসলমানদের সাথে তাদের ব্যবহার হবে কোমল, কাফিরদের সাথে কঠোর, আল্লাহর পথে তারা জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দাবাদের ভয়ে তারা ভীত হবে না। এটা হচ্ছে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন, আর আল্লাহ্ সীমাহীন উপায় উপাদানের মালিক এবং তিনি মহাজ্ঞানী।" (সূরা মায়েদা: ৫৪) এ সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন-
ذَالِكَ بِأَنَّهُمْ لَا يُصِيبُهُمْ ظَمَاء وَلَا نَصَبٌ وَلَا مَخْمَصَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَطَئُوْنَ مَوْطَأَ يُغِيظُ الْكُفَّارَ وَلَا يَنَالُوْنَ مِنْ عَدُوٍّ نَيْلاً الا كُتِبَ لَهُمْ بِهِ عَمَلٌ صَالِحٌ - إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ. وَلَا يُنْفِقُونَ نَفَقَةً صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً وَلَا يَقْطَعُونَ وَادِيًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ لِيَجْزِيَهُمُ اللَّهُ أَحْسَنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (سورة التوبة : ۱۲۱-۱۲۰)
"এটা এজন্য যে, আল্লাহর পথে তাদের (জিহাদকারীদের) পিপাসা, পরিশ্রম, ক্ষুধার কষ্ট পৌঁছেছে, কাফিরদের ক্রোধ উদ্রেক করে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং শত্রু পক্ষের নিকট থেকে কিছু প্রাপ্য হওয়া উহাদের সৎ কর্মরূপে গণ্য হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ নিষ্ঠাবান সৎ লোকদের সৎ কর্মের প্রতিদান নষ্ট করেন না। আর তারা ছোট বড় যা কিছু আল্লাহর পথে ব্যয় করে এবং (যুদ্ধকালীন) যেসব ময়দান উপত্যকা অতিক্রম করে, এসবই তাদের নামে লিখা হয়। এদ্বারা আল্লাহ তাদের কৃত কাজের উত্তমতর বিনিময় দান করবেন।” (সূরা তাওবা : ১২০-১২১)
অতঃপর এ সকল সামাজিক কার্যকলাপের ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা উল্লেখ করে জিহাদের হুকুম দেয়া হয়েছে। কুরআন-হাদীসের বহু স্থানে জিহাদের উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকন্তু এ পর্যায়ে এও বলা হয়েছে- জিহাদ সর্বোত্তম কর্ম। এরি ভিত্তিতে আলিমগণের সর্বসম্মত ফতওয়া হাজ্জ, উমরা এবং নফল রোযার চাইতেও জিহাদ উত্তম। কুরআন-হাদীসেও এর প্রমাণ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-
رَأْسُ الْأَمْرِ الْإِسْلَامُ وَعَمُوْدُهُ الصَّلوةُ وَذَرْوَةُ سَنَامِهِ الْجِهَادُ -
“ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ, নামায তার খুঁটি আর জিহাদ ইসলামের সর্বোৎকৃষ্ট আমল।” তিনি আরো বলেন-
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَماةُ دَرَجَةً مَا بَيْنَ الدَّرَجَةِ وَالدَّرَجَةِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَعَدَّهَا اللَّهُ لِلْمُجَاهِدِيْنَ فِي سَبِيلِهِ -(متفق عليه)
"জান্নাতে একশ'টি স্তর রয়েছে, দুই স্তরের মাঝখানে আকাশ-পাতাল পরিমাণ ব্যবধান। আর এ স্তরগুলো আল্লাহ তায়ালা আল্লাহর পথে জিহাদকারীগণের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।” (বুখারী, মুসলিম) তিনি আরো বলেন-
رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ خَيْرٌ مِّنْ صِيَامٍ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ وَإِنْ مَاتَ أَجْرِيَ عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُهُ وَأَجْرِى عَلَيْهِ رِزْقُهُ وَآمَنَ الْفَتَانَ - (رواه مسلم)
"আল্লাহর পথে একদিন, এক রাত্রি অবস্থান এক মাস রোযা (নফল) রাখা এবং এক মাস ব্যাপী রাত্রি জাগা অপেক্ষা উত্তম। এমতাবস্থায় যদি সে মারা যায়, তবে সে নিজ আমলের প্রতিদান পেতে থাকবে, তার রিযিক জারি করে দেয়া হবে এবং ফিৎনা-ফাসাদ থেকে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।” (মুসলিম)
এ সম্পর্কে মহানবী (সা) আরো বলেছেন- لَا تَمَسُّهَا النَّارُ عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرِسُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ -
"যে চোখ আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে এবং যে চোখ আল্লাহর পথে সীমান্ত প্রহরায় সদা নিয়োজিত থাকে, জাহান্নামের আগুন তাকে কখনো স্পর্শ করবে না।" (ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীসটি 'হাসান')
মুসনাদ আহমদে বর্ণিত হয়েছে- حَرْسُ لَيْلَةٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَفْضَلُ مِنْ أَلْفِ لَيْلَةٍ يُقَامُ لَيْلُهَا وَيُصَامُ نَهَارُهَا - (مسند احمد)
"আল্লাহর রাস্তায় এক রাত পাহারার কাজে থাকা, ইবাদতে এক হাজার রাত জাগরণ এবং সহস্র রোযার চাইতেও উত্তম।"
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- إِنَّ رَجُلًا قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَخْبِرْنِي بِشَيْءٍ يَعْدِلُ الْجِهَادَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - قَالَ تَسْتَطِيعُهُ - قَالَ أَخْبِرْنِي - قَالَ هَلْ تَسْتَطِيعُ إِذَا خَرَجَ الْمُجَاهِدُ أَنْ تَصُومَ لَا تَقْطُرَ وَتَقُوْمَ لَا تَفْتُرَ - قَالَ لَا - قَالَ فَذَالِكَ الَّذِي يَعْدِلُ الْجِهَادَ. (بخارى ومسلم)
"জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল- “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন জিনিস বলে দিন যা আল্লাহর পথে জিহাদ করর সমতুল্য হয়,” তিনি বললেন: তুমি সক্ষম হবে না। সে বলল: 'তবু, আপনি বলুন'। তিনি বললেন: তোমার পক্ষে কি এটা সম্ভব হবে যে, মুজাহিদ যখন জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, তখন থেকে তুমি রোযা রাখা শুরু করবে, অতঃপর ইফতার করবে না আর রাত্রি বেলা তাহাজ্জুদ শুরু করবে কিন্তু বিরত হবে না? সে বলল: 'না'। তিনি বললেন: এ ইবাদতই জিহাদের সমতুল্য হতে পারে।"
এ সম্পর্কে সুনানের রেওয়ায়েত রয়েছে। যেমন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ سِيَاحَةً وَسِيَاحَةُ أُمَّتِي الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ -
"प्रत्येक उम्मতই भ्रमण করে থাকে, আমার उम्मতের भ्रमण হল (প্রয়োজনে) আল্লাহর পথে জিহাদ অভিযানে বের হওয়া।"
জিহাদের আলোচনা অতি দীর্ঘ ও ব্যাপক আকার করা হয়েছে। জিহাদের তাৎপর্য, জিহাদের আমল, জিহাদের প্রতিদান ও সাওয়াব এবং এর ফল, ফযীলত ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে এত অধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, অন্য কোন বিষয় ও আমল সম্পর্কে সে পরিমাণ হাদীস বর্ণিত হয়নি। চিন্তা করলে বিষয়টি স্পষ্ট। কারণ, জিহাদের উপকারিতা ও সুফল দীন দুনিয়ায় স্বয়ং মুজাহিদ এবং অন্যান্য সকলের জন্য ব্যাপক। প্রকাশ্য ও গোপন, যাহেরী ও বাতেনী যাবতীয় ইবাদত বন্দেগী এর আওতাভুক্ত। কেননা (ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় এবং ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার প্রশ্নে) আল্লাহর মহব্বত, ইখলাস এবং তাওয়াক্কুল এসবই আল্লাহর পথে জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। নিজের জান-মাল আল্লাহর নিকট সমর্পণ করে দেয়া, ধৈর্য, পরহেযগারী, আল্লাহর যিকির এবং যাবতীয় নেক আমলই এর মধ্যে শামিল রয়েছে। জিহাদ ব্যতীত এমন কোন আমল পরিলক্ষিত হয় না, যার মধ্যে এসব আমলের একত্রে সমাবেশ ঘটেছে।
যে ব্যক্তি, যে জাতি জিহাদে আত্মনিয়োগ করে, দু'ধরনের কল্যাণ দ্বারা তারা লাভবান হয়। (১) আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়। (২) অথবা শহীদ সাজে সজ্জিত হয়ে বেহেশতে প্রবেশ। মানুষের জন্য জীবন মরণের সমস্যাটি বড় জটিল। জিহাদের মধ্যে দীন দুনিয়ার সৌভাগ্য নিহিত। কাজেই এর মাধ্যমে এ কঠিন সমস্যাটির অতি সহজ সমাধান রয়েছে। পক্ষান্তরে জিহাদ বর্জন করার পরিণতিতে দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হতে হয় কিংবা তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোন কোন লোক কঠোর সাধনা এবং দ্বীন-দুনিয়ার কামিয়াবীর উদ্দেশ্যে কষ্টসাধ্য আমলের আশ্রয় নেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাতে লাভ অতি সামান্যই হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, জিহাদ এমন একটি আমল বা কাজ, যা অন্য সব কষ্টকর আমলের তুলনায় অধিকতর ফলদায়ক। সময় সময় লক্ষ্য করা যায় যে, মানুষ নিজের আত্মিক সংশোধন এবং আধ্যাত্মিক উন্নতিকল্পে জান হাতে নিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে কঠোর সাধনায় লিপ্ত হয়। কিন্তু বাস্তব প্রয়োজনের তাগিদে শহীদের মৃত্যুই অপর সকল প্রকার মৃত্যুর চেয়ে সহজ ও উত্তম।
জিহাদকে শরীয়ত সিদ্ধ করাই হলো যুদ্ধ ও সংঘর্ষের মূল উদ্দেশ্য আর জিহাদের মূল কথা হল দ্বীন (তথা মানুষের পুরো জীবনের সকল কর্মকাণ্ড ও চিন্তা-মনন) একমাত্র আল্লাহর বিধান মাফিক হয়ে যাওয়া। কালিমাতুল্লাহ সর্বক্ষেত্রে সার্বিকভাবে প্রাধান্য লাভ করা। সুতরাং যারা জিহাদের বিরোধিতা করে, নিষেধ করে, প্রতিরোধ সৃষ্টি করে কিংবা এর বিপক্ষে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, গোটা উম্মতের ঐক্যমত (ইজমা-এ-উম্মাহ্)-অনুসারে সরকারী কর্তৃত্বাধীন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং তাদের নির্মূল করাটাই হলো সকলের রায়। কিন্তু যারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে না, মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে জড়িত হয় না, যেমন নারী, শিশু, ধর্মীয় নেতা, বৃদ্ধ, অতিবৃদ্ধ, অন্ধ, খঞ্জ, পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, লেংড়া প্রমুখ জমহুর ইসলামী বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত অভিমত হলো, রনাঙ্গনে তাদের হত্যা করা যাবে না। হত্যাযোগ্য কেবল সে সকল ব্যক্তি, যারা কথায় ও কাজে मुसलमानों বিরুদ্ধে সংঘর্ষ ও যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অবশ্য কেউ কেউ তার বিপরীত মত ব্যক্ত করেছে। তাদের এ মতের সপক্ষে দলীল হলো, যেহেতু বিদ্রোহীরা কাফির, কাজেই তাদেরকে যুদ্ধের মাধ্যমে দমন ও প্রয়োজনে ইসলামী আদালতের বিচারে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। আর নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করবে।
প্রথমোক্ত মতই সঠিক ও বিশুদ্ধ। কেননা মূলতঃ জিহাদ এটাই। এ পরিপেক্ষিতেই নির্দেশ এসেছে যে, আমরা যখন দীনের দাওয়াত পেশ করি, ইসলাম প্রচার করি এবং সত্য দ্বীনের প্রচার-প্রসার দ্বারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে থাকি, তখন তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, আমাদেরকে বারণ করে এবং তাবলীগ ও প্রচার কার্যে বাধা সৃষ্টি করে।
সুতরাং মহান আল্লাহর বাণী হলো:
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُّوا - إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ.
“(হে মুসলমানগণ! ন্যায় সত্য প্রতিষ্ঠায়) যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর রাস্তায় তাদের সাথে যুদ্ধ কর। কিন্তু ইসলামী সমরনীতি লঙ্ঘন করে বাড়াবাড়ি ও সীমা অতিক্রম করো না। আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে আদৌ পছন্দ করেন না।"
'সুনানে' বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা) এক স্থানে কতিপয় লোকের ভীড় দেখতে পান। সেখানে একটি নারীর মৃতদেহ পড়েছিল। এমতাবস্থায় তিনি বললেন:
مَا كَانَتْ هَذِهِ لِتُقَاتِلَ “এ মহিলাটিতো কাউকে হত্যা করার মত ছিল না।” অপর এক ঘটনায় মহানবী (সা) এক ব্যক্তিকে বললেন-
- الْحَقْ خَالِدًا فَقُلْ لَهُ لَا تَقْتُلُوا ذُرِّيَّةً وَلَا عَسِيفًا "যাও খালেদের সাথে গিয়ে দেখা করে তাকে বলো- ছোট শিশু, মজদুর ও গোলামদেরকে যেন হত্যা না করে।"
একই সুনান গ্রন্থে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সা) বলেছেন- لَا تَقْتُلُوا شَيْخًا فَانِيًّا وَلَا طِفْلاً صَغِيرًا وَلَا امْرَأَةً - "অতিবৃদ্ধ, ছোট শিশু এবং নারীদেরকে হত্যা করো না।"
যুলুমের অবসানে সৃষ্টজগতের কল্যাণার্থেই জিহাদ বৈধ করা হয়েছে। ইসলামে (ন্যায়-নীতি শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাধা দানকারীদের) মৃত্যুদণ্ড দানের নির্দেশের পশ্চাতে মানব তথা সৃষ্টজগতের সার্বিক কল্যাণই উদ্দেশ্য। কেননা আল্লাহ বলেন-
الْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ - "ফিৎনা, দাঙ্গাহাঙ্গামা হত্যা অপেক্ষা জঘন্যতম অপরাধ।” অবশ্য হত্যা করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কিন্তু কুফরী এবং কাফিরের সৃষ্ট ফিৎনা-ফাসাদ তার চাইতেও বড় অপরাধ। কাজেই, দীনের প্রচার এবং ইসলামের ন্যায় বিধান প্রতিষ্ঠার কাজে যে ব্যক্তি বাধা দেয় না, প্রতিরোধ সৃষ্টি করে না, তার কুফরী কেবল তার নিজের জন্যই ক্ষতিকর, مسلمانوں বেলায় নয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফকীহগণ বলেছেন, কুরআন ও হাদীস বিরোধী কোন বিদআত সৃষ্টি করা, এর প্রতি মানুষকে আহ্বান করা, সেই বিদআতের প্রচার-প্রসার দান, দ্বীনের প্রত্যক্ষ অপমান ও প্রকাশ্য বিরোধিতারই নামান্তর। কাজেই বিদআতের উদ্ভাবক ও প্রচারক উভয়কেই সাজা দিতে হবে। তবে কেউ যদি সক্রিয় না হয়ে এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ বা নীরব থাকে, তাদের সাজা দেয়া যাবে না।
হাদীসে বর্ণিত রয়েছে- إِنَّ الْخَطِيئَةَ إِذَا أُخْفِيَتْ لَمْ تُضَرَّ إِلَّا صَاحِبَهَا وَلَكِنْ إِذَا أُظْهِرَتْ فَلَمْ تُنْكَرْ ضَرَّتِ الْعَامَّةَ - "গুনাহ যদি গোপনে করা হয়, তবে কেবল সংশ্লিষ্ট গুনাহগারই ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে, কিন্তু যখন প্রকাশ্যে গুনাহ করা হয়, আর তাতে বাধা দেয়া না হয়, তবে তা ব্যাপকহারে জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে।"
এ জন্যই শরীয়ত কাফিরদের সাথে জিহাদ করাকে ওয়াজিব করেছে। কিন্তু অক্ষম ও অসহায় লোকদের সাথে জিহাদ করা ওয়াজিব করা হয়নি। বরং কেউ যদি مسلمانوں বিরুদ্ধে গোপনে যুদ্ধ অথবা এ সংক্রান্ত ব্যাপারে পরামর্শ দেয়, নৌযান কিংবা জাহাজের নৌ পথ দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধের অন্য কোন কাজ করে, مسلمانوںকে ভুল পথ দেখায় অথবা কোন কৌশল বাৎলে দেয়, এরূপ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কঠোর ব্যবস্থার বদলে নরম পন্থা অবলম্বন করা ইসলামী রাষ্ট্রের নেতা তথা ইমাম, ওয়ালী অথবা শাসন কর্তার জন্য অপরিহার্য। জ্ঞান বুদ্ধির মাধ্যমে এ থেকে বেঁচে থাকার পথ গ্রহণ করবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষ নেতাকে এ কাজ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেবে। মোট কথা অপরাধের ধরন প্রকৃতির প্রেক্ষিতে সংশোধন অযোগ্য অবস্থাতে প্রয়োজনে কোর্ট তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করবে। অথবা দয়াপরবশ হয়ে ছেড়ে দেবে, কিংবা জামিনে মুক্তি দান করবে কিংবা যা ভাল মনে করবে তাই করবে। এটাই অধিকাংশ ফকীহ বা ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের অভিমত, কুরআন, হাদীস দ্বারাও এটি প্রমাণিত।
অবশ্য কোন কোন ফকীহ ইহসান বা দয়া কিংবা ফিদিয়া নিয়ে ছেড়ে দেয়াকে মনসূখ ও বাতিল বলে থাকেন। কিতাবী ও মজুসী (অগ্নিউপাসক) সম্পর্কে শরীয়তের বিধান হল, তারা পরিপূর্ণভাবে ইসলাম গ্রহণ না করা অথবা জিযিয়া না দেয়া পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। উক্ত দু'জাতি ব্যতীত অন্যসব লোকের নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা সম্পর্কে ফকীহগণের মতভেদ রয়েছে। কিন্তু সাধারণ ফকীহগণ অন্যদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করার পক্ষপাতি নন।
ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত যে দল বা সম্প্রদায় যাদেরকে মুসলমান বলা হয়, শরীয়তের জাহেরী এবং মুতাওয়াতির (অব্যাহত) হুকুম পালনে তারা অপরকে নিষেধ করে কিংবা নিজে অমান্য করে, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ওয়াজিব। এটা मुसलमानों সর্বসম্মত অভিমত। অধিকন্তু দ্বীন পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিরোধকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ অব্যাহত রাখা ফরয। উদাহরণতঃ যেমন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এবং সকল সাহাবী যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। যদিও প্রথমাবস্থায় কেউ কেউ দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু পরবর্তীকালে তারাও একমত হয়ে যান। হযরত উমর (রা) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর সামনে উক্তি করে বসেন-
كَيْفَ تُقَاتِلُ النَّاسِ وَقَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهَ وَأَنْ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ فَإِذَا قَالُوْهَا فَقَدْ عَصَمُوا مِنِّي دِمَائَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ -
"আপনি মানুষের সাথে কিভাবে জিহাদ করবেন? অথচ মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন: প্রতিপক্ষ মানুষের সাথে আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যতক্ষণ তারা সাক্ষ্য না দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল। তারা যখন এ সাক্ষ্য প্রদান করবে, তখনই তাদের জান-মাল নিরাপদ হয়ে যাবে। অবশ্য কারো কোন হক পাওনা থাকলে সেটার বিচার স্বতন্ত্র আর তাদের হিসাব আল্লাহর হাতে ন্যস্ত।" হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এই যুক্তির জবাবে বললেন-
فَإِنَّ الزَّكُوةَ مِنْ حَقَّهَا وَاللَّهِ لَوْ مَنَعُوْنِي عِقَالًا كَانُوا يُؤَدُّونَهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهَا -
"যাকাত সে তো কালিমারই হক। আল্লাহর কসম! তারা যদি সে টুকরাটিও সরকারকে দিতে অস্বীকার করে, যা তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সমীপে প্রদান করতো, তবু তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ কাজ অব্যাহত থাকবে।"
পরবর্তীকালে হযরত উমার (রা) বলতেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা যুদ্ধের ব্যাপারে হযরত আবু বকর (রা)-এর অন্তর খুলে দিয়েছিলেন। এখন আমি উত্তমরূপে উপলব্ধি করছি যে, তিনি ছিলেন সত্যের উপর।
মহানবী (সা) থেকে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তিনি চরমপন্থী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জিহাদের হুকুম দিয়েছেন। সুতরাং বুখারী ও মুসলিমে আলী ইবনে আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা) বলেছেন-
سَيَخْرُجُ قَوْمٌ فِي أُخِرِ الزَّمَانِ أَحْدَثُ الْأَنْسَانِ - سُفَهَاءُ الْأَحْلَامِ - يَقُولُونَ مِنْ خَيْرٍ قَوْلِ الْبَرِيَّةِ لَا يُجَاوِزُ إِيْمَانُهُمْ حَنَاجِرَهُمْ يُمَرِّقُونَ مِنَ الدِّينِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ فَأَيْنَمَا لَقِيتُمُوهُمْ قَاتِلُوهُمْ فَإِنَّ فِي قَتْلِهِمْ أَجْرًا لِّمَنْ قَاتَلَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ - (بخاري - مسلم)
“শেষ যামানায় এক দল লোক বাহির হবে যারা হবে, বয়সে যুবক এবং স্বপ্নবিলাসী নির্বোধ। তারা সৃষ্টি জগতের উত্তম ব্যক্তির কথা বর্ণনা করবে বটে কিন্তু ঈমান তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না, ভিতরে প্রবেশ করবে না। ধনুক থেকে তীর যেমন ছুটে বের হয়ে যায়, দ্বীনও তাদের কাছ থেকে তেমনি দ্রুত বেরিয়ে যাবে। সুতরাং (ক্ষণভঙ্গুর ঈমানের ঐ সকল লোক যখন ইসলাম ও मुसलमानों অস্তিত্ব বিনাশে সশস্ত্র হামলায় এগিয়ে আসবে,) তাদের সাথে যেখানেই মুখোমুখী সংঘাতের ঘটনা ঘটবে সেখানেই সংঘবদ্ধভাবে লড়াই করবে এবং রণাঙ্গনের যেখানে পাবে মৃত্যুর ঘাটে পৌছিয়ে দেবে। যে ব্যক্তি তাদেরকে হত্যা করবে কিয়ামতের দিন সে সাওয়াবের অধিকারী হবে।”
সহীহ মুসলিমে হযরত আলী (রা) এর বর্ণনায় অপর হাদীসে আছে, তিনি বলেন- আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি-
يَخْرُجُ قَوْمٌ مِّنْ أُمَّتِي يَقْرَؤُونَ الْقُرْآنَ لَيْسَ قَرَانَتُكُمْ إِلَى قَرَاءَتِهِمْ بِشَيْءٍ وَلَا صِيَامُكُمْ إِلَى صِيَامِهِمْ بِشَيْءٍ - يَقْرَؤُنَ الْقُرْآنَ يَحْسَبُوْنَهُ أَنَّهُ لَهُمْ وَهُوَ عَلَيْهِمْ لَا تُجَاوِزُ قَرَاءَتْهُمْ تَرَاقِيهِمْ يُمَرِّقُونَ مِنَ الْإِسْلامِ كَمَا يَمْرِقُ السَّهْمُ مِنَ الرمية. (মুসলিম)
"আমার উম্মতের মধ্য থেকে এমন একদল লোক সৃষ্টি হবে, তারা কুরআন পাঠ করবে, তাদের কিরাআতের তুলনায় তোমাদের কিরাআত কিছুই নয়, তেমনি তাদের রোযার সাথেও তোমাদের রোযার কোন তুলনা চলে না। তারা কুরআন পাঠ করবে আর ধারণা করবে যে, কুরআন তাদের সপক্ষে দলীলস্বরূপ, অথচ প্রকৃতপক্ষে কুরআন তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। তাদের কুরআন পাঠ কণ্ঠনালীর ভিতরে প্রবেশ করবে না। ইসলামের গণ্ডি থেকে তারা এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমন ধনুক থেকে তীর বের হয়ে যায়।"
অতএব যে সেনাদলের নিকট মহানবী (সা) প্রদত্ত এ সিদ্ধান্ত পৌঁছবে, তারা অবশ্যই এর তাৎপর্য উপলব্ধি করে সে অনুযায়ী আমল করবে।
আবু সাঈদ (রা) উপরোক্ত হাদীসের সাথে অতিরিক্ত আরেক রেওয়ায়েত যুক্ত করে বর্ণনা করেছেন-
يَقْتُلُوْنَ أَهْلَ الْإِيْمَانِ - وَيَدْعُوْنَ أَهْلَ الْأَوْثَانِ لَئِنْ أَدْرَكْتُهُمْ لاقْتُلَنَّهُمْ قَتْلَ عَادٍ - (বুখারী)
"তারা مسلمانوں কতল করবে এবং (একাজে শরীক হতে) মূর্তিপূজকদেরও আহ্বান করবে। আমি তাদের সাক্ষাৎ পেলে (অভিশপ্ত) আদ সম্প্রদায়ের ন্যায় আমি তাদের কতল করতাম।” (বুখারী, মুসলিম)
মুসলিমের অপর এক রেওয়ায়েতে আছে,
تَكُونُ أُمَّتِي فَرِيقَتَيْنِ فَتَخْرُجُ مِنْ بَيْنِهِمَا مَارِقَةً يَلِي قَتْلَهُمْ أَوْلَى الطَّائِفَتَيْنِ بِالْحَقِّ.
"আমার উম্মত দুই দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। উভয় দলের মধ্য থেকে ধর্মত্যাগী এক দল প্রস্তুত হবে, তখন সত্য পন্থীরা তাদের নির্মূল করে ফেলবে।"
এরা হল সেই লোক, ইরাকী এবং সিরীয়দের মধ্যে কোন্দল ও বিভেদ সৃষ্টি করার কারণে হযরত আলী (রা) যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সাহাবীগণ তাদেরকে 'হারুরিয়া' নামে চিহ্নিত করেছিলেন।
নবী করীম (সা) এ উভয় দলকে নিজ উম্মত থেকে খারিজ এবং হযরত আলী (রা)-এর সঙ্গীগণকে হকের উপর কায়েম সত্যপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন। উক্ত মারقين ধর্মত্যাগীদের ছাড়া হুযুর (সা) এসময় (বাহ্যিক কালিমা পড়ুয়া) অন্য কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উৎসাহ প্রদান করেননি। বরং যুদ্ধ ও জিহাদ করার হুকুম তাদের বিরুদ্ধেই দান করেছিলেন- যারা ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে ইসলামী জামাআত ছেড়ে দিয়েছিল এবং मुसलमानों জান-মাল নিজেদের জন্য হালাল ও বৈধ করে নিয়েছিল।
কাজেই কুরআন হাদীস এবং "ইজমায়ে উম্মতে"র দ্বারা প্রমাণিত যে, ইসলামী শরীয়তের সীমার বাইরে চলে যাওয়া ঐ সকল মুসলমান, যদিও তারা মুখে কালিমা শাহাদাত لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدُ رَّسُوْلُ اللَّهِ এর স্বীকারোক্তি ঘোষণা দিক, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বৈধ।
ফকীহগণ বলেন: কোন একটি বিরাট সংঘবদ্ধ দল যদি সুন্নাতে মুয়াক্কাদার বিরোধিতা ও তা অস্বীকার করে এবং পরিত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়, যেমন ফজরের সুন্নাত অস্বীকার করে তবে, উভয় মতানুযায়ী রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। আর যদি ওয়াজিব এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হারামকে অস্বীকার করে তবে, সর্বসম্মত মত হলো তাদের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ঐ সংঘবদ্ধ দল নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইসলামের বিধানগুলো যথারীতি পালন করে এবং মুহাররামাত যেমন আপন ভগ্নিকে বিয়ে করা, অপবিত্র জিনিস খাওয়া ও مسلمانوںকে এসবের হুকুম করা থেকে বিরত না থাকে। এমন সব লোকদের বিরুদ্ধে সরকারীভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া ওয়াজিব। অবশ্য এ নিয়ে ওয়াজিব তখনই হবে যখন নবী করীম (সা) এর দাওয়াত ও বাণী তাদের নিকট যথাযথ পৌঁছে যায়।
কিন্তু তারা যদি मुसलमानों বিরুদ্ধে প্রথমে নিজেরা যুদ্ধ শুরু করে তখন তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং বীর বিক্রমে তাদের মুকাবিলা করা সাধারণভাবে প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয। আর মুকাবিলা এমনভাবে করতে হবে তারা যেভাবে مسلمانوں উপর আক্রমণ করে এবং যেভাবে জুলুমকারীদের বিরুদ্ধে মুকাবিলা করতে হয়। যথা, অত্যাচারী ডাকাত দলের বিরুদ্ধে। বরং 'তাদের চাইতেও ফরয হল সেসব লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, যারা যাকাত আদায় করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং শরীয়তের হুকুমের বিরোধিতা করে ও খারেজীদের ন্যায় ফিৎনার সৃষ্টি করে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের প্রশ্নে, আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করাটাই হল উত্তম এবং এটা 'ফরযে কিফায়া'। কতিপয় মুসলমান জিহাদে অংশগ্রহণ করলে সকলের পক্ষ থেকে জিহাদের ফরয আদায় হয়ে যাবে। তবে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের ফযীলত ও মর্যাদা অধিক। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضُّرَرِ .... الخ
"যে সকল মুসলমান বিনা ওযরে বা কারণ ব্যতীত জিহাদে শরীক হওয়া থেকে বিরত থাকে, তারা কখনো (মর্যদায় স্বত:স্ফূর্ত অংশ-গ্রহণকারীদের) সমান হতে পারে না।” (সূরা নিসা: ৯৫)
শত্রু যদি مسلمانوں বিরুদ্ধে আকস্মিক আক্রমণ করে বসে, এমতাবস্থায় প্রতিটি মুসলমানের উপর সাধারণভাবে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ফরয। এ আক্রমণ প্রতিহত করা আক্রান্ত مسلمانوں উপর ফরয হওয়ার কারণ হলো বিপন্ন مسلمانوں সাহায্যে এগিয়ে আসা ফরয। যেমন আল্লাহ বলেন-
وَإِنْ يَنْصُرُوكُمْ فِي الدِّيْنِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ إِلَّا عَلَى قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقَ -
“দীনের ব্যাপারে যদি তারা তোমাদের সাহায্য কামনা করে তবে তোমাদের জন্য তাদের সাহায্য করা অবশ্য কর্তব্য। তবে সে কাওম বা গোত্রের বিরুদ্ধে নয়, যাদের সাথে তোমাদের পারস্পরিক চুক্তি রয়েছে।”
একই প্রসঙ্গে নবী করীম (সা) বলেন, الْمُسْلِمُ يَنْصُرُ الْمُسْلِمَ “এক মুসলমান অপর মুসলমানকে সাহায্য করবে।"
বস্তুতঃ مسلمانوں সাহায্য করতেই হবে, এতে পারিশ্রমিক কিংবা ভাতাস্বরূপ কিছু পাওয়া যাক আর না যাক। অবশ্য সরকারীভাবে বেতন দেয়াটা উত্তম। এক্ষেত্রে ইসলামী সরকারকে সকল মুসলমানের নিজ সামর্থ্যানুযায়ী জান-মাল দ্বারা সাহায্য করা কর্তব্য। আর এ সাহায্য তাদের উপর ফরয। যার যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, কম হোক কিংবা বেশী, পদব্রজে যেতে হোক অথবা সওয়ার হয়ে, সর্বাবস্থায় সাহায্য সহায়তা দান করা ফরয। যেমন, খন্দক যুদ্ধের সময় কাফিররা আক্রমণ করার পর প্রত্যেক মুসলমানের উপর নিজ নিজ অবস্থানুযায়ী জিহাদ ফরয হয়ে গিয়েছিল।
কোন মুসলমানের জন্যই এ যুদ্ধ যাত্রা থেকে অব্যাহতি লাভের আদৌ কোন অনুমতি ছিল না। যেমনটি ছিল না ইসলামের প্রাথমিক যুগে। আল্লাহ তা'আলা এ পরিস্থিতিতে मुसलमानों দু'দলে বিভক্ত করে বর্ণনা করেছেন। (১) কায়ে'দ তথা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি এমন লোক (২) আর খারেজ তথা জিহাদে যোগদানকারী বেযুদ্ধা ও যোদ্ধা। এ পরিস্থিতিতেও যুদ্ধে না যাবার অনুমতি প্রার্থনা করে যারা নবী করীম (সা) এর নিকট আবেদন করেছিল, তাদের ব্যাপারে তিরস্কারমূলক আয়াত নাযিল করে আল্লাহ বলেন-
يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِنْ يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا
"রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট তাদের একজন এই বলে বাড়ী ফিরার অনুমতি চেয়েছিল যে, আমাদের ঘর-বাড়ী অরক্ষিত অথচ বাস্তবে সেগুলো অরক্ষিত ছিল না। পলায়ন করাই আসলে তাদের উদ্দেশ্য ছিল।"
এ যুদ্ধ ছিল নিজেদের দীন, ইজ্জত-আব্রু, জান-মাল ইত্যাদির নিরাপত্তার জন্য একান্ত আত্মরক্ষামূলক। বাধ্য হয়েই এ যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়। পক্ষান্তরে পূর্বে উল্লেখিত যুদ্ধ ছিল ইসলামের সম্প্রসারণ এবং দীনের প্রাধান্য সৃষ্টির লক্ষ্যে; শত্রুদের উপর নিজেদের প্রভাব সৃষ্টি করা তাদের ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখা এবং দুশমন যেন কখনো মাথা তুলতে না পারে সে জন্য। তবুক যুদ্ধ তারই বাস্তব প্রমাণ।
কাজেই এ আক্রমণমূলক ব্যবস্থা হলো সেই শক্তিশালী বিদ্রোহী দলের বিরুদ্ধে।
টিকাঃ
১. টীকা: জিহাদ অর্থ আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো। প্রতি রক্ষার প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ এর প্রান্তিক অবস্থা মাত্র।
১. টীকা: জিহাদের শাব্দিক অর্থ লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করা। ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহ্র দ্বীন ইসলামী নীতি আদর্শকে ব্যক্তি ও সমষ্টি জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করা, চরমভাবে এ পথে কেউ বাধা দিলে আত্মরক্ষাকল্পে প্রতিরোধ যুদ্ধ করা এর প্রান্তিক অর্থ। -অনুবাদক
📄 ফরয-ওয়াজিবের উপর আমল ও হারাম থেকে রক্ষার জন্যেই শাস্তি
ফরয-ওয়াজিবের উপর আমল করার এবং হারাম বিষয় থেকে রক্ষার জন্যই শাস্তি দণ্ড নির্ধারিত করা হয়েছে। কাজেই এমন আকর্ষণীয় জিনিস তুলে ধরা চাই যা জনগণকে কল্যাণ ও আনুগত্যের দিকে উৎসাহিত করে। অপরদিকে মন্দের প্রতি উৎসাহ দানকারী বিষয় বস্তু থেকে জনগণকে বিরত রাখা প্রয়োজন।
হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং ওয়াজিবের উপর আমল করার জন্যই শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যের সহায়ক প্রতিটি বস্তুই শরীয়তসম্মত করা হয়েছে। সুতরাং এমন পন্থা অবলম্বন করা উচিত, যদ্বারা কল্যাণকর পথ ও আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধি পায় এবং এর সহায়ক ও সাহায্যকারী বলে প্রমাণিত হয়। জনগণকে কল্যাণ ও আনুগত্যের দিকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সম্ভাব্য সকল পন্থা অবলম্বন করাই বাঞ্ছনীয়। যথা, স্বীয় সন্তান ও পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করা আর রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও শাসনকর্তার পক্ষে জনগণের জন্য ব্যয় করা প্রয়োজন। কিন্তু তা এমন ধারায় ব্যয় করা চাই যাতে তাদের চেতনাবোধ উৎসাহিত ও উজ্জীবিত হয়। টাকা পয়সা ধন-সম্পদ কিংবা প্রশংসা দ্বারাই হোক অথবা বিকল্প কোন পন্থায় হোক। এ কারণেই উট-ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা, তীর-বর্শা চালানো ইত্যাদিতে শক্তি ব্যয় ও শরীর অনুশীলন করাকে শরীয়তসম্মত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মহানবী (সা) নিজে এবং খোলাফায়ে রাশেদীন ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন। এমনকি বায়তুল মালের ঘোড়া পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় আনা হতো। মুয়াল্লাফাতুল কুলুবের অবস্থায়ও অনুরূপ যে, তাদের সাথেও নম্র ব্যবহার ও শিষ্টাচার প্রদর্শন করা উচিত। এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে: এক ব্যক্তি পার্থিব লাভের উদ্দেশ্যেই সকালবেলা ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু সন্ধ্যাবেলা সে এমন নিষ্ঠাবান ও খাঁটি মুসলমানে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে যে, দুনিয়ার সকল বস্তু, সকল মানুষের তুলনায় একমাত্র ইসলাম তার প্রাণপ্রিয় বস্তুতে পরিণত হয়।
দুষ্কর্ম ও গুনাহর বেলায়ও অবস্থা একই। কাজেই সমাজে পাপ অপরাধ প্রবণতা ও অন্যায়ের শিকড় নির্মূল করে ফেলা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের উচিত। অন্যায় অপরাধের সকল রাস্তা, যাবতীয় ছিদ্র বন্ধ করে দেয়া একান্ত কর্তব্য। গুনাহ পাপের পথে উৎসাহ দানকারী সকল কার্যকলাপ পূর্ণ শক্তিতে রোধ করার সংগ্রাম চালু রাখা ততক্ষণ পর্যন্ত জরুরী যতক্ষণ না এর বিপরীত নিশ্চুপ বসে থাকা ও নীরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণের বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ পরিলক্ষিত হয়। মহানবী (সা) এর বাণী থেকেই এর দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায়। তিনি বলেছেন-
لَا يَخْلُونَ الرَّجُلُ بِإِمْرَأَةِ فَإِنَّ ثَالِثَهَا الشَّيْطَنُ -
"কোন পর পুরুষ কোনো পর স্ত্রীলোকের সাথে নির্জন সান্নিধ্যে একত্রিত হবে না। কেননা শয়তান তাদের সঙ্গী হিসেবে তৃতীয় জন হয়ে যায়।”
তিনি আরো বলেন,
لا يَحِلُّ لِإِمْرَأَةٍ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيْرَةَ يَوْمَيْنِ إِلَّا مَعَهَا زَوْجَ أَوْ ذُو حَرَمٍ -
“যে নারী আল্লাহ এবং আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে, স্বামী কিংবা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ জায়েয নেই) ব্যতীত তার পক্ষে দু'দিনের দূরবর্তী স্থানে সফর করা জায়েয নেই।"
নবী করীম (সা) পরনারীর সাথে সাক্ষাৎ করা এবং তার সাথে একাকী সফর করা থেকে এ কারণেই নিষেধ করেছেন যেন, (সমাজ থেকে) অন্যায়, অপরাধ ও পাপাচারের মূলোৎপাটিত হয়ে যায়।
ইমাম শা'বী থেকে বণিত আছে- 'আবদুল কায়স' গোত্রীয় প্রতিনিধি দল হুযূর (সা) এর দরবারে উপস্থিত হয়। একটি সুশ্রী সুদর্শন যুবকও তাদের দলে শামিল ছিল। তাকে দেখার পর তিনি যুবকটিকে তাঁর পেছনে বসার হুকুম দিলেন এবং বললেন: এ দৃষ্টিই ছিল হযরত দাউদ (আ) এর ভুলের কারণ।
ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) একবার জনৈকা মহিলার কবিতা আবৃত্তি শুনলেন, যার একটি শ্লোক ছিল-
هَلْ مِنْ سَبِيلِ إِلَى خَمْرٍ فَأَشْرَبَهَا - هَلْ مِنْ سَبِيلِ إِلَى نَصْرِ بْنِ حَجَّاج ؟
"পান করার মত সুরা লাভের কোন উপায় কি আছে গো...? নসর ইবনে হাজ্জাজের সাক্ষাৎ লাভের কোন উপায় কি আমার হবে গো...?"
হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) নসর ইবনে হাজ্জাজকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠালেন- সে একজন সুন্দর সুঠাম, অমলকান্তি যুবাপুরুষ। হযরত ওমর (রা) তার মাথা মুণ্ডন করেছিলেন। কিন্তু এতে তার চেহারায় উজ্জ্বল ও কমনীয়তা আরো বেড়ে গেল। অবশেষে তিনি তাকে দেশ ত্যাগের হুকুম দিলেন, যেন মদীনার রমণীকুল ফিতনায় পতিত না হয়।
অন্যত্র হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, কোন এক লোক সম্পর্কে তিনি জানতে পারলেন যে, তার সান্নিধ্যে বালকেরা উঠাবসা করে থাকে। ছেলেদেরকে তিনি তার নিকট বসতে এবং যাতায়াত করতে নিষেধ করে দিলেন।
হযরত ওমর (রা) এমন লোকের সান্নিধ্য ও সংসর্গে গমনকরতে নিষেধ করতেন যার ফলে নারী-পুরুষের ফিতনায় পতিত হওয়ার আশংকা হতো কিংবা এর কারণ ঘটত। এমন সব বালকের অভিভাবকের কর্তব্য হলো, বিনা দরকারে তাদেরকে বাইরে যেতে না দেয়া, সেজে গুজে থাকতে ও সুগন্ধি লাগাতে নিষেধ করা, সাধারণ গোসল খানায় যেতে না দেয়া, একান্ত যদি যেতেই হয়, তবে শরীরের কাপড় যেন না খোলে এবং গান বাদ্যের আসরে শরীক হওয়া থেকে তাদের বিরত রাখে। এসব ব্যাপারে তাদেরকে কঠোর শাসন ও তদারকীতে রাখা বিশেষ প্রয়োজন।
এভাবে যে ব্যক্তি সম্পর্কে প্রকাশ্য অভিযোগ পাওয়া যায় যে, সে আকাম কুকাম ও পাপাচারে অগ্রণী, তাকে সুন্দর সুশ্রী গোলামের অধিকারী বা মালিক হতে বিরত রাখতে হবে আর এ ধরনের গোলাম থেকে তাকে পৃথক করে দিতে হবে। কেননা, ফকীহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, প্রসিদ্ধ ও প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। আর তার সাক্ষ্য সম্পর্কে প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ করার বৈধ অধিকার রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সম্মুখ দিয়ে এক ব্যক্তির জানাযা গমন করলে উপস্থিত লোকেরা তার প্রশংসা বাক্য উচ্চারণ করলো। তিনি বললেন : وَجَبَتْ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।” অতঃপর অপর একটি জানাযায় গমন করলে লোকেরা মন্তব্য করল- “এ ছিল অতিশয় মন্দ লোক।” তিনি বললেন : وَجَبَتْ “ওয়াজিব হয়ে গেছে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে রাসূলুল্লাহ। উভয়ের সম্পর্কে আপনি বললেন- وَجَبَتْ - এর কারণ কি এবং কি জিনিস ওয়াজিব হলো। তিনি ইরশাদ করলেন-
هُذِهِ الْجَنَازَةُ اثْنَيْتُمْ عَلَيْهَا خَيْرًا فَقُلْتُ وَجَبَتْ لَهَا الْجَنَّةُ. وَهُذِهِ الْجَنَازَةُ اثْنَيْتُمْ عَلَيْهَا شَرًا وَجَبَتْ لَهَا النَّارُ - أَنْتُمْ شُهَدَاءُ لِلَّهِ فِي الْأَرْضِ -
"প্রথম জানাযাটির তোমরা প্রশংসা করেছ, তাই আমি বলেছি তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় জানাযাটি সম্পর্কে তোমরা নিন্দাবাদ করেছ, কাজেই আমি বলেছি তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেছে। কেননা যমীনের বুকে তোমরা আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ।”
নবী করীম (সা) এর যমানায় জনৈকা দূরাচারী নারী প্রকাশ্যে পাপাচার করে বেড়াতো, তার সম্পর্কে তিনি বলতেন- لَوْ كُنْتُ رَاحِمًا أَحَدًا بِغَيْرِ بَيِّنَةٍ لَرَجَمْتُ هُذِهِ -
"সাক্ষী ছাড়াই কাউকে যদি আমি 'রজম' (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করতাম, তবে এ নারীটিকে আমি অবশ্যই রজম করতাম।” এর কারণ হলো, শরীয়তে সাক্ষী কিংবা স্বীকারোক্তি ব্যতীত 'হদ' কায়েম করার বিধান নাই। কিন্তু এমন চরিত্রের লোকের সাক্ষী ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে চাক্ষুষ দর্শনের কোন প্রয়োজন নাই বরং এর জন্য সাধারণ জনশ্রুতিই যথেষ্ট। আর জনশ্রুতি যদি অপেক্ষাকৃত কম হয় তবে, তার সঙ্গী-সাথী ও বন্ধু-বান্ধবের প্রতি লক্ষ্য করে প্রমাণ দাঁড় করাতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন- اعْتَبِرُوا النَّاسَ بِأَخْدَانِهِمْ -
"মানুষকে তার বন্ধু গুণে বিচার কর।"
অর্থাৎ দেখতে হবে যেই চরিত্রের লোকদের সাথে তার মেলামেশা উঠা-বসা, সে চরিত্র মানেই তার মূল্যায়ন করতে হবে। কোন্ চরিত্রের লোকেরা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু? মন্দা চরিত্রের হলে এ থেকে বেঁচে থাকা প্রয়োজন, যেমন শত্রু থেকে আত্মরক্ষা করা দরকার। এ প্রসঙ্গে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেছেন- احْتُرِسُوا النَّاسَ بِسُوْءِ الظَّنِّ -
"মানুষের কু-ধারণা থেকে তোমরা বেঁচে থাক।"
এটা হযরত উমর (রা)-এর নির্দেশ। তবে কু-ধারণার ভিত্তিতে কোন প্রকার সাজা দণ্ড প্রদান জায়েয নেই।