📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 মদ্যপায়ীদের সাজা

📄 মদ্যপায়ীদের সাজা


মদ্যপানের সাজা নবী করীম (সা)-এর হাদীস এবং ইসলামী আইনজ্ঞদের 'ইজমা' (ঐক্যমত্য)-এর ভিত্তিতে প্রমাণিত। যে ব্যক্তি শরাব পান করবে, তাকে বেত্রাঘাত করতে হবে। পুনরায় পান করলে দ্বিতীয়বার তাকে কোড়া লাগাতে হবে। নবী করীম (সা) থেকে বর্ণিত যে, মদ্যপায়ীকে তিনি বারংবার বেত্রাঘাত করেছেন। অধিকন্তু খোলাফায়ে রাশেদীন, ইজমা এবং অধিকাংশ উলামার অভিমতও এটাই।
মদ্যপানের শাস্তি: মদ্যপানের সাজা নবী করীম (সা)-এর সুন্নত এবং مسلمانوں 'ইজমা' (ঐক্যমত) দ্বারা প্রমাণিত।
এ পর্যায়ে হাদীস বিশারদ এবং রেওয়ায়েতকারীগণ বিভিন্ন সূত্রে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। নবী করীম (সা) বলেন-
مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فَاجْلِدُوهُ - ثُمَّ إِنْ شَرِبَ فَاجْلِدُوهُ ثُمَّ إِنْ شَرِبَ فَاجْلِدُوهُ ثُمَّ إِنْ شَرِبَ الرَّابِعَةَ فَاقْتُلُوهُ -
"যে ব্যক্তি শরাব পান করবে তাকে কোড়া লাগাও, দ্বিতীয় বার পান করলে পুনরায় বেত্রাঘাত কর, আবার পান করলে আবারও কোড়া লাগাও, অতঃপর চতুর্থবার পান করলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দাও।"
অধিকন্তু নবী করীম (সা) মদ্যপানের অপরাধে একাধিকবার বেত্রদণ্ড প্রদান করেছেন। তদুপরি পরবর্তীকালে খোলাফায়ে রাশেদীন এবং মুসলমানগণ একই অপরাধে বেত্রাঘাতের শাস্তি প্রদান করেছেন। সুতরাং এরই ভিত্তিতে মদ্যপানের অপরাধে হত্যার সাজা রহিত হয়ে গেছে বলে আলিমগণ অভিমত ব্যক্ত করে থাকেন। কিন্তু কারো কারো মতে এ সাজা 'মুহকাম' তথা স্থায়ী বিধান। পক্ষান্তরে কারো কারো মতে হত্যার মাধ্যমে দণ্ড দান করা ছিল একান্ত 'তা'যীর' অর্থাৎ শাসনজনিত সমাধান। সুতরাং প্রয়োজনবোধে ইমাম, রাষ্ট্রপতি কিংবা বিচারপতি এ দণ্ড বিধানেরও অধিকারী।
মহানবী (সা) থেকে প্রমাণ রয়েছে যে, তিনি শরাব পানের অপরাধে চল্লিশটি বেত্রাঘাত এবং জুতার দ্বারা প্রহার করেছেন। অনুরূপ সিদ্দীকে আকবর (রা) এ অপরাধে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন। অপরপক্ষে হযরত উমর (রা) আপন খেলাফতকালে কোড়া মেরেছেন। কিন্তু হযরত আলী (রা) কখনো চল্লিশ (অবস্থাভেদে) আবার কখনো আশি কোড়ার হুকুম দিয়েছেন। কোন কোন আলিম বলেছেন, চল্লিশটি বেত্রাঘাত করা ওয়াজিব। কিন্তু মানুষ যদি মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং চল্লিশ বেত্রাঘাতে সাবধান না হয়, তবে, এর অধিক বেত্র দণ্ড ইমাম কিংবা বিচারপতির রায়ের উপর নির্ভরশীল। অথবা অনুরূপ অন্য কোন কারণ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় চল্লিশের অধিক আশি ঘা বেত মারবে। আর যদি পানকারীদের সংখ্যা অল্প হয় অথবা ঘটনাক্রমে কেউ কখনো কদাচিৎ পান করে ফেলেছে তবে, এক্ষেত্রে চল্লিশ কোড়াই যথেষ্ট। বস্তুতঃ এ মতই অধিকতর বাস্তবমুখী ও যুক্তিসঙ্গত। ইমাম শাফি’ঈও (রহ) এ মতের সমর্থক। এক রেওয়ায়েত অনুযায়ী ইমাম আহমদও (রহ) এ মতই পোষণ করেন।
হযরত উমার (রা)-এর খেলাফতকালে মদ্যপানের অভিযোগ অধিকতর পরিমাণে আসতে থাকায় তিনি এর শাস্তির মাত্রাও বাড়িয়েছেন। এ জন্যে কাউকে দেশান্তরিত করেছেন আর কারো মাথা মুড়িয়ে অপমান করেছেন। সুতরাং এগুলো ছিল তাঁর শাসনমূলক অতিরিক্ত সাজা। শরাবীকে চল্লিশটি করে দু'বার বেত্রাঘাত করার পরও যদি 'তা'যীর' (অতিরিক্ত সাজা) করার প্রয়োজন পড়ে তবে তার খোরাক বন্ধ করে দিয়ে তাকে দেশান্তরিত করাই উত্তম।
কোন কোন নায়েব বা প্রতিনিধি মদের প্রশংসায় কবিতা, ছন্দ রচনা করেছেন- এ মর্মে সংবাদ পাওয়ার পর হযরত উমর (রা) তাকে পদচ্যুত করেছেন।
নবী করীম (সা) যে মদ 'হারাম' ঘোষণা করেছেন এবং সে মদ পান করলে কোড়া লাগিয়েছেন তা হলো যদ্দ্বারা নেশা হয় আর আক্ল-বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায়, এর উপাদান যাই থাকুক এবং যে কোন জিনিস দ্বারাই তা প্রস্তুত করা হোক না কেন। যেমন আঙ্গুর, খেজুর, আঞ্জীর ইত্যাদি। অথবা তরকারী বা সবজি থেকে। যথা, গম, যব ইত্যাদি। কিংবা মধু ইত্যাদি জাতীয় তরল পদার্থ থেকে তৈরী করা হোক। কিংবা পশুর দুগ্ধ দ্বারা তৈরী করা হোক।
সকল প্রকার মদ নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। অধিকন্তু রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর শরাব হারামকারী কুরআনের আয়াত যখন নাযিল হয়, তখন মদীনা শরীফে আঙ্গুরের নাম গন্ধও বর্তমান ছিল না।
সিরিয়া কিংবা অন্যান্য দেশ থেকে আঙ্গুর আমদানী করা হতো। তৎকালীন আরবে সাধারণত: খেজুর কিংবা খেজুর ভিজানো পানি থেকে শরাব প্রস্তুত করা হত। কিন্তু এ সম্পর্কে নবী করীম (সা)-এর সহীহ হাদীস খোলাফায়ে রাশেদীন এবং সাহাবা কিরামগণ থেকে যা প্রমাণিত রয়েছে, তাহলো নিশা জাতীয় প্রত্যেক জিনিসই হারাম। মহানবী (সা) নেশা জাতীয় এমন প্রতিটি বস্তু হারাম ঘোষণা করেছেন, যা সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির বিলুপ্তি ঘটায় এবং জ্ঞান বা চিন্তা শক্তি বিনষ্ট করে দেয়। বস্তুতঃ সাহাবায়ে কিরাম স্বভাবতঃ সুমিষ্ট 'নবীযে তমর' (খেজুর ভিজানো পানি) পান করতেন যার প্রস্তুত প্রণালী ছিল খেজুর কিংবা অযুর পানিতে ভিজিয়ে রাখা হত এবং নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রয়োজন মত তা পান করতেন। কেননা হিজাযের পানি সাধারণতঃ লবনাক্ত এবং সুপেয় পানি এখানকার জনজীবনে ছিল এক দুর্লভ বস্তু। কিন্তু নবীয পান করা ততক্ষণ পর্যন্তই জায়েয, যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে নিশা বা মাদকতার আমেজ না ঘটে। সকল মুসলিম মনীষী এবং গোটা মুসলিম উম্মাহর এটাই সর্ববাদীসম্মত অভিমত। কেননা তাতে নিশা হয় না। আঙ্গুরের শিরা যেমন নিশা ধরার পূর্ব পর্যন্ত পান করা জায়েয। নবী করীম (সা) কাষ্ঠ নির্মিত পাত্র অথবা কালাই করা ধাতব ভাণ্ডে নবীয তৈরী করতে নিষেধ করেছেন। বরং তিনি এমন কাঁচা পাত্রে নবীয তৈরী করার হুকুম দিয়েছেন যার মুখ আটকিয়ে রাখা যায়। এর অন্তর্নিহিত কারণ হল, নিশাদার হলে পর এসব কাঁচা পাত্র ফেটে যায়। যার ফলে সহজেই বুঝা যায় যে, রক্ষিত নবীয নিশাদার হল কি না। পক্ষান্তরে কালাই করা ধাতব পাত্রে নবীযে নিশা আসার পর ফাটে না কিংবা বাহ্য দৃষ্টিতে তাতে কোনরূপ চিহ্নও ফুটে উঠে না।
সুতরাং পানকারীর ধোকায় পড়া কিংবা ভুল করার কোন আশংকা বিদ্যমান থাকে না। অবশ্য অপর এক রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মহানবী (সা) পরবর্তীকালে কালাইকৃত ধাতব পাত্রে নবীয তৈরীর অনুমতি দান করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ফরমান-
نَهَيْتُكُمْ عَنِ الْانْتِبَاذِ فِي الْأَوْعِيَةِ فَانْتَبِذُوا وَلَا تَشْرِبُوا الْمُسْكِرَ.
"আমি তোমাদেরকে কালাইকৃত ধাতবপাত্রে নবীয তৈরী করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু (এখন) তোমরা তাতে তৈরী কর, অবশ্য নেশাদার হয়ে গেলে তোমরা তা পান করো না।"
এ সম্পর্কে সাহাবী এবং পরবর্তী যুগের আলিমগণের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। পূর্ববর্তী হুকুম বাতিল হওয়ার সম্পর্কে যারা অবহিত ছিলেন না কিংবা যাদের নিকট এ জাতীয় পাত্রে নবীয তৈরী করা প্রমাণিত নয়, তাঁদের মত হল এ জাতীয় পাত্রে নবীয তৈরী করা নিষিদ্ধ।
অপরপক্ষে যারা মনে করতেন, পূর্ব হুকুম বাতিল হয়ে গেছে, তারা এসব পাত্রে নবীয তৈরী করার অনুমতি দিতেন।
অপরদিকে ফকীহগণের এক দল যখন জানতে পারলেন যে, কোন কোন সাহাবী নবীয পান করতেন- তখন তাঁরা মনে করলেন যে, নেশাযুক্ত নবীয পান করতেন। কাজেই তাঁরা বিভিন্ন প্রকারের শরবত বা পানীয় পান করার অনুমতি দান করেন। কিন্তু তা যেন আঙ্গুর ও খেজুর ইত্যাদি দ্বারা প্রস্তুত না হয়। পক্ষান্তরে নেশাযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত নবীযে তমর' ও কিসমিসের শিরা বা রস পান করার অনুমতি দান করেন।
কিন্তু বিশুদ্ধ ও সঠিক পন্থা এটাই- যা গোটা মুসলিম উম্মাহ্ তথা জমহুরের সর্ববাদী সম্মত মত, আর তা হলো নেশাদার জ্ঞান লোপকারী প্রত্যেক জিনিসই 'খমর' তথা মদ হিসেবে গণ্য। আর তা পানকারীর উপর হদ্দ জারী করতে হবে, চাই এক কৌটাই পান করুক কিংবা ঔষধ হিসাবেই পান করে থাকুক। কেননা নবী করীম (সা) 'খমর' ব্যতীত অন্য কোন ঔষধ যদি না পাওয়া যায় তবে? প্রশ্নের জবাবে ইরশাদ ফরমান-
إِنَّهَا دَاءً وَلَيْسَتْ بِدَوَاءِ وَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَجْعَلْ شِفَاءَ أُمَّتِي فِيْمَا حَرَّمَ عَلَيْهَا
“এটাতো রোগ- ঔষধ নয় এবং নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ আমার উম্মতের রোগ মুক্তি হারাম বস্তুতে নিহিত রাখেননি।”
মদ্যপানের সাক্ষী পাওয়া গেলে অথবা মদ্যপায়ী নিজে স্বীকার করলে শরাব-খোরের উপর হদ্দ জারী করা ওয়াজিব। কিন্তু মুখ থেকে মদ বা শরাবের দুর্গন্ধ বের হয় কিংবা মানুষ তাকে বমি করতে দেখেছে অথবা মদ্যপানের অন্য কোন নিদর্শন তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়, তাহলে এমতাবস্থায় বলা হয়েছে যে, তার উপর হদ্দ জারী করা যাবে না। কেননা, এটা নেশাবিহীন শরাব অথবা সে অজ্ঞাতসারে পান করেছে কিংবা বলপূর্বক তাকে পান করানো হয়েছে ইত্যাদি সম্ভাবনা এসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান রয়েছে। বরং শরাব নেশাযুক্ত হলে তাকে কোড়া লাগাতে হবে। খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবা কিরাম বা হযরত উসমান, হযরত আলী এবং হযরত ইবনে মাসউদ (রা) প্রমুখ এ মতের সমর্থনকারী। সুন্নতে নববীও এরই প্রতি ইঙ্গিত বহন করে, মানুষের বাস্তব আমলও অনুরূপ। অধিকন্তু ইমাম মালিক, ইমাম আহমদ (রহ)-এর মযহাবও এটাই এবং তাঁরা এর বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দান করেছেন।
আঙ্গুর এবং খেজুর পাক করে যে শরাব তৈরী করা হয় সেটাও হারাম আর এর পানকারীকে বেত্রদণ্ড দিতে হবে। এটা খমর বা মদের চেয়েও অধিক নিকৃষ্টতর। কেননা, এ দ্বারা জ্ঞান ও মন-মেযাজ উভয়ই নষ্ট হয়। এমনকি এর প্রভাবে সুস্থ মানুষ ক্লৈবত্বের শিকার হয় এবং চরিত্রে সৃষ্টি হয় দায়ছী স্বভাব। দ্বিতীয়তঃ শরাব বা মদ অধিক অনিষ্টকারী ও খবীস এ জন্যে যে, এর ফলে লোক সমাজে কলহ বিবাদ, মারামারী হানাহানির ন্যায় মারাত্মক সামাজিক তিক্ততার সৃষ্টি হয় এবং চারিত্রিক ঘৃণ্য ব্যাধি জন্ম নেয়। অধিকন্তু এটা যেমন বান্দাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে, তদ্রূপ নামায থেকে ঐ ব্যক্তিকে দূরে সরিয়ে নেয়।
পরবর্তী যুগের কোন কোন ফকীহ মদ্যপানের অপরাধে হদ্দ জারী করা থেকে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। তাঁদের মতে হদ্দের চেয়ে নিম্নতর সাজা অর্থাৎ তা'যীর করতে হবে। কেননা এর দ্বারা জ্ঞান ও চরিত্রে বিকৃতির সম্ভাবনা বিদ্যমান, যা ভাং পানের সমতুল্য। অপরদিকে মুতাকাদ্দিমীন (প্রাথমিক যুগের) ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত ওলামাগণ থেকে এ সম্পর্কিত কোন সিদ্ধান্ত বা মীমাংসার প্রমাণ পাওয়া যায় না। অথচ এ ঘাস-পাতা এরূপ নয় বরং মানুষ মনের আনন্দে এগুলো খেয়ে থাকে এবং এমন আগ্রহ নিয়ে থাকে যে, পরিমাণে আরও বেশী বলে আরও খাবে যেমনটি শরাব ও খমরের বেলায় করে থাকে। এতে অধিকাংশ সময় আল্লাহর স্মরণে অনাসক্তি ইত্যাদি ত্রুটি এসে যায়। আর পরিমাণে বেশী হলে নামাযেও ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দেয়। অধিকন্তু দায়ছী, ক্লৈবত্ব' সৃষ্টি হয় এবং জ্ঞান-বুদ্ধি ও-মন-মগজ বিনষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু এটা যদি গাঢ় ও কঠিন হয়, আনুষঙ্গিক খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং মদের প্রকারভুক্ত না হয়, এমতাবস্থায় এর নাপাক বা অপবিত্র হওয়ার ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে তিন ধরনের অভিমত লক্ষ্য করা যায়।
(১) ইমাম আহমদ (রহ) ও অন্যান্যের মযহাব অনুযায়ী মদের ন্যায় এটিও নাপাক। এ মতই বিশুদ্ধ এবং নির্ভরযোগ্য।
(২) কারো কারো মতে জামেদ তথা কঠিন হওয়ার কারণে এটা নাপাক নয়।
(৩) কেউ কেউ কঠিন ও তরলের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা করেছেন। মোটকথা, এটাও আল্লাহ ও নবী করীম (সা) কর্তৃক হারাম কৃত জিনিসের শামিল।
কেননা, শাব্দিক ও আর্থিক উভয় দিক থেকেই এটা মদ, শরাব, খমর ও নেশাযুক্ত বস্তু।
হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি মহানবী (সা)-এর খিদমতে আরয করেন, হে রাসূলুল্লাহ! আমাদের ইয়ামানে প্রস্তুত 'তুবা' ও 'মীযার' নামীয় দু'ধরনের মদ সম্পর্কে ফায়সালা দান করুন। 'তুবা' মধু থেকে তৈরী করা হয়। এগুলোর মধ্যে তেজী ভাব এলে এগুলো নেশার পর্যায়ে পৌঁছে, তখন এসবের হুকুম কি? মহানবী (সা) অল্প কথায় অধিক অর্থবোধক বাক্যের অধিকারী ছিলেন। সুতরাং উত্তরে তিনি বলেন-
كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ - (رواه في الصحيحين) “প্রত্যেক নেশাদার বস্তুই হারাম।” (বুখারী ও মুসলিম)
হযরত নু'মান ইবনে বশীর (রা) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা) বলেছেন-
إِنَّ مِنَ الْحِنْطَةِ خَمْرًا وَمِنَ الشَّعِيرِ خَمْرًا وَمِنَ النَّبِيْبِ خَمْرًا وَمِنَ النَّمْرِ خَمْرًا وَمِنَ الْعَسَلِ وَأَنَا أَنْهَى عَنْ كُلِّ مُسْکر. (رواه ابو داود وغيره)
গম থেকে এক প্রকার শরাব প্রস্তুত করা হয়। আর যব, কিসমিস, খেজুর এবং মধু থেকেও প্রস্তুত করা হয়। আমি নেশা ও মাদকতা সৃষ্টিকারী প্রত্যেক বস্তু হারাম ঘোষণা করছি। (আবু দাউদ)
কিন্তু উক্ত রেওয়ায়েত বুখারী ও মুসলিমে হযরত উমর (রা)-র উক্তিরূপে চিহ্নিত। আর নবী (সা) করীম (সা)-এর মিম্বরে দাঁড়িয়ে তিনি মন্তব্য করেন-
الْخَمْرُ مَا خَامَرَ الْعَقْلَ - "খমর সেটাই- যা জ্ঞান লোপ করে দেয়।" অপর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত.....
كُلُّ مُسْكَرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ - “নেশা সৃষ্টিকারী প্রতিটি বস্তুই খমর আর সর্বপ্রকার খমর হারাম।” ইমাম মুসলিম তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থ সহীহ মুসলিমে দুটি রেওয়ায়েতই বর্ণনা করেছেন।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন- كُلُّ مُسْكَرٍ حَرَامٌ وَمَا أَسْكَرَ الْفَرْقُ مِنْهُ فَمِلْءُ الْكَفَّ مِنْهُ حَرَامٌ. “নেশা সৃষ্টিকারী প্রত্যেক বস্তুই হারাম। আর যে বস্তু এক মটকা পরিমাপ পান করলে নেশা ধরে, তার এক আঁজলা পরিমাণও হারাম।” হাদীস বিশারদগণ বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (সা) বলেছেন- مَا أَسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيْلُهُ حَرَامٌ - “যে জিনিস অধিক পান করলে নেশা ধরে, তার কিঞ্চিৎ পরিমাণও হারাম।” হাদীসবিদগণ রেওয়ায়েতটি বিশুদ্ধ বলে স্বীকার করেছেন।
হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত- কোন ব্যক্তি মহানবী (সা)-কে প্রশ্ন করল: “আমাদের অঞ্চলে মীযর নামে এক প্রকার বীজ থেকে শরাব তৈরী করা হয়। এ সম্পর্কে আপনার হুকুম কি?” জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন- أَسْكَرْ هُوَ ؟ “উহা কি নেশা সৃষ্টি করে?” লোকটি বললেন: জি-হাঁ।
হুযুর (সা) ইরশাদ করলেন- كُلُّ مُسْكَرٍ حَرَامٌ عَلَى اللَّهِ عَهْدًا لِمَنْ شَرِبَ الْمُسْكَرَ أَنْ يَسْقِيَهُ مِنْ طَيِّنَةِ الْخَبَالِ -
“নেশা সৃষ্টিকারী প্রত্যেক বস্তু হারাম। আর যে ব্যক্তি নেশা সৃষ্টিকারী পানীয় পান করবে- আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে ‘তীনাতুল খাবাল’ পান করাবার হুমকি রয়েছে।” সাহাবীগণ আরয করলেন-
يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا طَيِّنَةُ الْخَبَالِ؟
“হে রাসূলুল্লাহ! ‘তীনাতুল খাবাল’ কি জিনিস?” হুযূর (সা) ইরশাদ করেন-
عَرْقُ أَهْلِ النَّارِ - (مسلم) দোযখীদের (দেহ থেকে নির্গত) ঘর্ম, অর্থাৎ তরল দুর্গন্ধময় পদার্থ।” (সহীহ মুসলিম)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা) বলেছেন-
كُلُّ مُسْكَرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ مُسْكَرٍ حَرَامٌ - (ابو داؤد)
“নেশা সৃষ্টিকারী জিনিস মাত্রই খমর আর প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারীই হারাম।” (আবু দাউদ)
মোটকথা, এ সম্পর্কিত অগণিত হাদীস বর্ণিত রয়েছে। হুযূর আকরাম (সা)-এর কথা যেহেতু ‘জাওয়ামিউল কালিম’ (ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য), তাই সব কিছুকে সংরক্ষিত আকারে প্রকাশ করাই তাঁর বৈশিষ্ট্য। তাঁর উক্তি হলো, জ্ঞান বুদ্ধি লোপকারী এবং নেশা সৃষ্টিকারী প্রতিটি বস্তু হারাম। চাই সে খাদ্য হোক কিংবা পানীয়। তাই, শরাব বা খমর নেশা সৃষ্টি করে বলেই হারাম। মুতাকাদ্দিমীন এর কোনো গুণাগুণ সম্পর্কে আলোচনা করেননি। কেননা হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দী কিংবা তার নিকটবর্তী কোনও এক সময় এর উৎপাদন শুরু হয়। যেমনি ভাবে বহু প্রকার মদ নবী করীম (সা)-এর পরবর্তী যুগে তৈরি হতো। কিন্তু তা সবই সেই অভিন্ন কারণ ও ‘ব্যাপক কার্যবোধক’ মহান বাক্যের আওতায় এসে যায়, যেগুলো কুরআন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
* টীকা: হযরত আবু শাহজান সকফী (রহ) এক কালে মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিলেন। হযরত উমর (রা) শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তাঁকে বেত্রাঘাত করেন; কিন্তু তিনি বিরত হননি। পুনরায় পান করেন; হযরত ফারুক আযম (রা)ও একই নিয়মে তাঁর উপর দ্বিতীয়বার শাস্তি প্রয়োগ করেন। কিন্তু তাতেও কোন কাজ হল না; বার বার অভ্যাস মত তিনি শরাব পান করতে থাকেন আর কোড়ার আঘাত সইতে থাকেন। অবশেষে হযরত উমর (রা) তাঁকে কয়েদ এবং দেশান্তর করে রাখার নির্দেশ দান করেন। এ পর্যায়ে তাঁকে হযরত সা'আদ (রা)-এর নিকট সোপর্দ করেন যে, যেখানেই তুমি থাকবে অথবা যাবে তাকে সঙ্গে রাখবে। তদুপরি বেড়ি লাগিয়ে তাকে পৃথকভাবে বসিয়ে রাখবে। হযরত সা'আদ (রা) আবু শাহজানকে নিজের সঙ্গে নিয়ে তার পায়ে বেড়ি লাগিয়ে দিলেন। এখন যেখানেই তিনি যান তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। এমনিভাবে এক পর্যায়ে বিভিন্ন মনযিল অতিক্রম করে তিনি সুদূর ইরানের কাদেসিয়ার রণক্ষেত্রে উপনীত হন। কাদেসিয়ার এ ভয়াবহ সময় হযরত সা'আদ (রা) ছিলেন মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি। এ ঘোরতর লড়াইয়ে শত্রুপক্ষ প্রাধান্য বিস্তার করে মুসলিম বাহিনীর উপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে মুসলিম সেনাদল তিনশ ষাট মাইল পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এ পশ্চাদপসরণের আড়ালে নতুন প্রেরণায় বলীয়ান হয়ে ইসলামী বাহিনী চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সেনাপতি হযরত সা'আদ (রা) ইতিপূর্বে সামান্য জখম হওয়ার কারণে মূল রণাক্ষনে উপস্থিত থাকতে পারেননি। অবশ্য একটি ভবনের ছাদে বসে তিনি যুদ্ধের গতিবিধি লক্ষ্য করতে থাকেন। এরি মধ্যে এক পর্যায়ে লড়াই প্রচণ্ড রূপ ধারণ করে। শত্রুপক্ষের প্রচণ্ড আক্রমণের মুকাবিলায় টিকতে না পেরে মুসলমানগণের পশ্চাদপসরণ লক্ষ্য করে পরিতাপের সুরে তিনি বার বার- لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ "শক্তি সঞ্চালনী এ দু'আটি উচ্চারণ করতে থাকেন।" ঘটনাক্রমে হযরত আবূ মাহজান (রা) এ সংকটজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন। কেননা হযরত সা'আদ (রা) যে বাড়ীতে বাস করছিলেন তার নীচ তলায় শিকল বেঁধে তাঁকে আটক রাখা হয়েছিল। मुसलमानों এ শোচনীয় অবস্থা দৃষ্টে তিনি অধীর আবেগে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে সে কবিতাটি বারংবার আবৃত্তি করতে থাকেন। তাহলো- كَفَى حُزْنًا أَنْ تَطْرُدَ الْخَيْلُ بِالْقَنَا - وَاتْرُكْ مَشْدُودًا عَلَى وَثَاقِيَا "আজ আমার অন্তহীন দুঃখ-বেদনা এবং সীমাহীন জ্বালা-যন্ত্রণার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, দুশমনের মুকাবিলায় রণক্ষেত্রে অন্যরা ঘোড়া দৌড়াচ্ছে আর আমি শিকল বাঁধা পায়ে হাহুতাশ করে মরছি।" এমনি ছড়া ছন্দ আবৃত্তির আড়ালে তিনি চোখের পানি ফেলতে থাকেন। কিন্তু কি করবেন কোন উপায় নাই। মর্ম জ্বালায় টিকতে না পেরে অবশেষে হযরত সা'আদ (রা)-এর স্ত্রীর নিকট আবেদন করলেন- হে পুণ্যবতী মহিলা! হে হাফসা তনয়া। আল্লাহর নামে আমায় মুক্ত করে দিন আর পায়ের শিকল খুলে দিন। কেননা মুলসমানরা লড়ে যাচ্ছে অথচ আমি জিহাদের ফজীলত ও এর পুণ্য সুফল থেকে বঞ্চিত। মুসলমামনদের উপর কঠিন সংকট আপতিত আর আমি শৃংখলাবদ্ধ অবস্থায় সময় কাটাচ্ছি। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি- যুদ্ধের মদয়ান থেকে যদি নিরাপদে ফিরে আসতে পারি তবে পুনরায় নিজ হাতে আপন পায়ের শিকল জড়িয়ে নেব। আর বর্তমানের ন্যায় এমনিভাবে আমাকে শিকল পরিয়ে দেবেন। অতঃপর হযরত সা'আদ (রা)-এর স্ত্রী স্বামীর অসন্তুষ্টির পরোয়া না করে আবু মাহ্জানের পায়ের বেড়ী খুলে দেন। সদ্যমুক্ত আবূ মাহ্জান আবেদন করলেন- হে পুণ্যবতী নারী! সওয়ারীর উদ্দেশ্যে আমার জন্য একটি ঘোড়ার বন্দোবস্ত করে দিন। সুতরাং হযরত সা'আদ-পত্নী স্বামীর বিনা অনুমতিতেই হযরত সা'আদ (রা)-এর 'আবলক (শ্বেত-কৃষ্ণ) ঘোড়া' লৌহ বর্ম, বর্শা এবং তাঁর তরবারী এনে হযরত আবূ মাহ্জ্জান (রা)-এর হাতে সোপর্দ করে দিলেন। হযরত আবূ মাহ্জান (রা) তৎক্ষণাৎ অশ্বে আরোহণ করে অশ্ব ছুটিয়ে চোখের পলকে রণাঙ্গনে পৌঁছে গেলেন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হযরত আবু মাহজান বীর বিক্রয়ে শত্রু পক্ষের রক্ষাবুহ্য ছিন্ন করে প্রচণ্ড আক্রমণে তাদের কচু কাটা করতে শুরু করলেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ, অপ্রতিরোধ্য আঘাতের ফলে শত্রু বাহিনী ছত্র ভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং শোচনীয় পরাজয়ের মুখ তাদের দেখতে হয়। এতক্ষণে উপস্থিত সকলে পরস্পর বলাবলি করতে থাকে- मुसलमानों সাহায্যে আল্লাহ তায়ালা আকাশ থেকে ফিরিশতা নাযিল করেছেন এবং তিনি অলৌকিক কার্য করে যাচ্ছেন। এদিকে সেনাপতি হযরত সা'আদ (রা)ও এক অসাধারণ যুদ্ধের বীরত্ব পূর্ণ খেলা প্রত্যক্ষ করে বলতে থাকেন- الصَّبْرُ الصَّبْرُ بِلِقَاءِ وَالظُّفْرُ ظَفْرِ أَبِي مَحْجَنُ وَأَبُو مَحْجَنٌ فِي الْقَيْدِ . "অশ্বের তীব্রগতি এবং বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া দৃষ্টে মনে হয় এটি আমারই আবলাক ঘোড়া আর সাফল্য ও বিজয়ের প্রতি লক্ষ্য করলে মনে হয় এ যেন আবূ মাহ্জানেরই বিজয়। অথচ আবূ মাজান শৃংখলাবদ্ধ অবস্থা এবং বন্দীদশায় দিন গুনছে।" পরিশেষে এ যুদ্ধে مسلمانوں অভাবনীয় বিজয় লাভ হয়। পক্ষান্তরে শত্রু পক্ষের শোচনীয় পরাজয় ঘটে- যা ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এদিকে আবূ মাহজান (রা) রণক্ষেত্র থেকে প্রত্যাবর্তন করে কথানুযায়ী পায়ে শিকল বেঁধে যথাস্থানে বসে পড়েন। কিন্তু হযরত আবূ মাহ্‌জানের কৃতিত্ব এবং ঐতিহাসিক ঘটনা গোপন থাকার বিষয় নয়। হযরত সা'আদ (রা) এতক্ষণে বাড়ীর ছাদ থেকে নীচে নেমে আপন স্ত্রী বিনতে হাফসাকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন- মুসলমানগণ নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে ছিল কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা আকাশ থেকে ফিরিশতা নাযিল করায় তাদের যে পরাজয়' বিজয়ে রূপ লাভ করে। কিন্তু তার ঘোড়াটি ছিল আমারই ঘোড়ার ন্যায়। আর বর্শা, বর্মও ছিল আমার অশ্বগুলোরই অনুরূপ। ময়দানে নেমেই সে এমনভাবে শত্রু নিধন করে যার ফলে শত্রু বাহিনীতে মাতম শুরু হয় এবং তারা ছত্র ভঙ্গ হয়ে পড়ে। অতঃপর সে ফিরিশতা কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। হযরত সা'আদ (রা)-র স্ত্রী বিনম্র বদনে আবেদন করলেন- আপনি কি চিনতে পারছেন সে কে ছিল? ইনি সেই বীর পুরুষ যাকে আবু মাহজান বলা হয় আর সে শৃংखলাবস্থায় আপনার ঘরে দিন গুনছে। मुसलमानों পরাজয় সংবাদ শুনে কসম খেয়ে আমাকে বলতে থাকে- "আমায় মুক্ত করে জিহাদের ময়দানে যুদ্ধ করতে দিন। জীবিত থাকলে ফিরে এসে আপন পায়ে নিজ হাতে শিকল পরে নেব। তার কথায় আস্থা রেখে আমি তার বন্ধন খুলে দেই। অতঃপর সে আপনার ঘোড়াটি প্রার্থনা করলে আমি তাকে আপনার ঘোড়া প্রদান করি। আর আপনার তরবারী বর্শা, বল্লম ইত্যাদি অস্ত্র শস্ত্রের আবেদন করলেন, সেই সবই আমি তার হাতে অর্পণ করি। যাবতীয় অস্ত্র হাতিয়ার সহ সে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে জিহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অতঃপর مسلمانوں জয় লাভের পর ফিরে এসে সে নিজ পায়ে শিকল বেঁধে যথাস্থানে বসে যায়। সেনাপতি হযরত সা'আদ (রা) আবূ মাহজান (রা)-র সাহসিকতা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের বাস্তব ঘটনা শুনে চিৎকার দিয়ে উঠেন। ক্রন্দনরত অবস্থায় বলতে থাকেন- আবূ মাহ্‌জানের ন্যায় বীর বাহু খলীফার নির্দেশে সর্বক্ষণ শিকল বেঁধে আটক পড়ে থাকবে এটা কেমন কথা? তৎক্ষণাৎ তিনি হযরত আবূ মাহ্জ্জান (রা) সকল বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা)-র খিদমতে পত্র প্রেরণ করেন। হযরত উমর (রা) পত্র পাঠে বিস্তারিত বিষয় অবহিত হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে হযরত আবূ মাহ্জ্জান (রা)-র নামে চিঠি লিখেন- بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ عُمَرَ إِلَى أَبِي مَحْجَنُ اللَّهِ اللَّهِ يَا أَبَا مَحْجَنْ "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর বান্দা উমরের পক্ষ হতে আবু মাহ্জ্জান বরাবরে। আল্লাহ (তোমায় আরও তাওফীক দিন) হে আবূ মাহ্জ্জান!" সেনাপতি হযরত সা'আদ (রা) অবাক হয়ে বলতে থাকেনঃ আল্লাহর কসম! এমন ব্যক্তিকে কখনো আমি প্রহার করবো না। দ্বিতীয়তঃ আর কখনো শিকল বেঁধে রাখাটাও সমীচীন নয়। তোমরা লক্ষ্য করে থাকবে, মুসলমানরা কি দারুণ সংকটে পরিবেষ্টিত ছিল, ইসলাম ও কুফরের মধ্যে ছিল এক আপোষহীন সংগ্রাম। এমনি কঠিন পরীক্ষার চরম মুহূর্তে আবূ মাহ্জানের আত্মত্যাগ নিষ্ঠাপূর্ণ কৃতিত্ব ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। এমনি সপ্রশংসা উক্তির পর পরই হযরত আবূ মাহ্জ্জানন (রা) বলে উঠেন- আল্লাহর কসম! জীবনে আর কখনো শরাব পানের নামও নেব না, এখন থেকে জীবনের তাওবা করছি। বাকি জীবনের জন্য, আমি মদ বা শরাব স্পর্শ না করার প্রতিজ্ঞা এবং তওবা করছি। পরবর্তী কালে আল্লাহ তায়ালা হযরত আবু মাজান (রা)-কে আপন তাওবায় আমরণ সুদৃঢ় অটল থাকার তৌফিক দান করেছিলেন।।
টীকা-১: মানব দেহের জন্যে চরম ক্ষতিকারক মাদকদ্রব্য এদেশ সহ কত দেশের কত পরিবারের মেধাবী সুস্থ সন্তানদের জীবন বিনষ্ট করেছে, বাংলাদেশের সমাজ জীবনে এবং বিভিন্ন পরিবারে এর ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক দৃষ্টান্ত থেকে অনুমেয়।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 অপবাদের শাস্তি

📄 অপবাদের শাস্তি


অপবাদ দেয়ার (কাযাফ) শাস্তি, চরিত্রবান ব্যক্তির উপর যিনার মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা এবং দোষারোপকারীকে বেত্রাঘাতের সাজা প্রদান-
যে সকল হদ্দ বা সাজা সম্পর্কে কুরআন হাদীসের প্রমাণাদি বিদ্যমান, অধিকন্তু যার উপর মুসলিম উম্মাহর 'ইজমা' তথা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, 'হদ্দে কযফ'ও সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত। কোনও চরিত্রবান ব্যক্তির (মুহসিন)- উপর কোন লোক যিনা কিংবা লাওয়াতাত (সমকামিতা)-এর মিথ্যা অভিযোগ আনলে, উক্ত দোষারোপকারী লোকটিকে বিচারক কর্তৃক আশিটি বেত্রদণ্ড প্রদান ওয়াজিব হয়ে যায়। এক্ষেত্রে 'মুহসিন' অর্থ মুক্ত স্বাধীন এবং নির্মল নিষ্কলংক চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি। পক্ষান্তরে যিনার শাস্তির ক্ষেত্রে উল্লেখিত 'মুহসিন' শব্দের তাৎপর্য হল, শরীয়ত পদ্ধতিতে বৈধ বিবাহের ভিত্তিতে আপন স্ত্রীর সাথে সহবাসকারী ব্যক্তি। (ইতিপূর্বে যার আলোচনা হয়েছে।)

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 যেসব অপরাধের সাজা অনির্ধারিত এবং শাসক ও বিচারকের ইচ্ছাধীন

📄 যেসব অপরাধের সাজা অনির্ধারিত এবং শাসক ও বিচারকের ইচ্ছাধীন


যে সকল গুনাহ বা অপরাধের সাজা অনির্দিষ্ট অধিকন্তু কাফ্ফারারও কোন উল্লেখ নেই, সেগুলোর দণ্ড বা সাজা, শিক্ষামূলক শাস্তি বিচারক কিংবা শাসনকর্তার রায়ের উপর নির্ভরশীল। স্থান কাল পাত্র ভেদে এবং ক্ষেত্র বিশেষে এর যথাযোগ্য দণ্ড বিধানে তাদেরই ভূমিকা প্রসঙ্গে এই পরিচ্ছেদের আলোচনা。
যে সকল অপরাধের নির্দিষ্ট শাস্তি কিংবা কাফফারার কোন উল্লেখ নেই যেমন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক কিংবা পরনারীকে চুমো খাওয়া, একমাত্র সহবাস ছাড়া মিলন পূর্ব আনুষঙ্গিক ক্রিয়া কলাপে লিপ্ত হওয়া; হারামবস্তু যথা প্রবাহিত রক্ত, মৃতজন্তুর গোশত ইত্যাদি খাওয়া, যিনা ব্যতীত মিথ্যা অপবাদ, অরক্ষিত বস্তু চুরি করা, 'নিসাব'' অপেক্ষা কম বস্তু চুরি করা, আমানতের খেয়ানত (বিশ্বাস ভঙ্গ) করা, যেমনটি করে থাকে বায়তুল মালের কোষাধ্যক্ষ এবং মুতাওয়াল্লী, ওয়াকফ সম্পত্তির মুতাওয়াল্লী কিংবা পিতৃহীন ইয়াতীমের অভিভাবকরা অথবা যৌথ ব্যবসায়ের অংশীদাররা। দৃষ্টান্তস্বরূপ যেমন- বিশ্বাস ভঙ্গ, আচার-ব্যবহার এবং আদান-প্রদানে প্রতারণা করা, খাদ্যবস্তু, ভোগ্যপণ্য কিংবা কাপড়ে প্রবঞ্চনা করা, মাপে কম বেশ করা, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানে উৎসাহ দেয়া, ঘুষ খাওয়া, আল্লাহ্হ্ হুকুমের বিপরীত হুকুম দেয়া, প্রজা কিংবা জনসাধারণের উপর অন্যায়-অত্যাচার অবিচার উৎপীড়ন করা, জাহেলী যুগের বাক্য উচ্চারণ কিংবা জাহেলী যুগের দাবী উঠানো, শরীয়তের নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি। এ জাতীয় অপরাধীদের সাজা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও চরিত্র গঠন, সংশোধনমূলক শিক্ষণীয় দণ্ড বিধান করা, এই সবগুলো বিষয় বিচারক কিংবা শাসনকর্তার ইখতিয়ারভুক্ত। এসব ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অধিক কি অনধিক ইত্যাদি পরিস্থিতি যাচাই করে তাঁরা শাস্তি বিধান করবেন। অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেলে কিংবা স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে, শাস্তির পরিমাণ অধিক ও কঠোর হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু অপরাধমূলক ঘটনাবলীর পরিমাণ ও মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থার আওতায় থাকলে, শাস্তিও সে অনুপাতে হালকা বা লঘু হওয়া উচিত। মোটকথা, জনগণ ব্যাপকহারে অপরাধমূলক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে থাকলে এবং অভ্যস্ত হয়ে পড়লে শাস্তিও কঠোর এবং গুরুদণ্ড হওয়া বাঞ্ছনীয়। পক্ষান্তরে ছোটখাট ও স্বল্প মাত্রার অপরাধে লঘুদণ্ডই বিধেয়।
বড় ছোট অপরাধের আনুপাতিক হারে সাজা নির্ধারিত হওয়া উচিত। যেমন, ঘটনাক্রমে একজন মহিলা কিংবা একটি বালককে অসৎ উদ্দেশ্যে উত্যক্তকারী অপরাধীর দণ্ড ঐ ব্যক্তির তুলনায় কম হওয়া উচিত, যে ব্যক্তি সদাসর্বদা নারী ও বালকদের অসৎ কাজে প্ররোচিত ও উত্যক্ত করে থাকে। এখন 'তাযীর' তথা শিক্ষা, শাসন ও দৃষ্টান্তমূলক সাজার পরিমাণ কি হবে? নির্দিষ্টভাবে তার কোন উল্লেখ নেই। তাযীরের মূল উদ্দেশ্য হলো কষ্ট ও পীড়া দেয়া। এখন কথা বা কাজের দ্বারা, বাক্যালাপ বন্ধ করে কিংবা তার সাথে পূর্বে যে ধরনের আচার-আচরণ করা হতো, সে ধরনের আচার ব্যবহার বন্ধ করে দিয়ে হোক কিংবা আদেশ-উপদেশের মাধ্যমে অথবা ভীতি প্রদর্শন এবং সাবধান ও হুশিয়ারী উচ্চারণের দ্বারা তাযীর সম্পন্ন করবে। মোটকথা, তাকে এমন কষ্ট দেয়া যার ফলে তাযীর বা শাসনের কাজ হয়ে যায়। অধিকন্তু কোন কোন সময় সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং সালাম কালাম কথা বার্তা বন্ধ করার দ্বারাও এ উদ্দেশ্য সাধন হতে পারে।
বস্তুত এর উদ্দেশ্য হল, অনুরূপ কার্যকলাপ থেকে তওবা না করা পর্যন্ত তাকে তাযীর করা উচিত। যেমন মহানবী (সা) জিহাদে শরীক না হওয়ার কারণে তিনজন সাহাবীর সাথে সালাম কালাম এবং কথা বার্তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আর তত্ত্বাবধায়ক, হাকিম কিংবা শাসনকর্তার দ্বারা যদি এমন কোন অপরাধ সংগঠিত হয়, যার উপর কোন হদ্দ নির্ধারিত নেই, তবে খলীফা তথা সরকার প্রধান কর্তৃক তাকে পদচ্যুত করে দিতে হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবীগণ (রা) করেছিলেন। ক্ষেত্র বিশেষে আবার সাময়িক খিদমত থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়ে তাযীর করা উচিত। কেউ হয়ত মুসলমানদের সামরিক ও দেশরক্ষা বাহিনীতে কার্যরত ছিল যে, সে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, সামনা-সামনি তরবারী চলছে, এমতাবস্থায় মুসলিম সেনাবাহিনীর কেউ পলায়ন করল অথচ যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা কবীরা গুনাহ।' সুতরাং এ পরিস্থিতিতে তার বেতন-ভাতা, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়াটাও এক প্রকার তা'যীর বা শাসন।
এমনিভাবে আমীর, বিচারক কিংবা শাসনকর্তা যদি এমন কোন কাজে লিপ্ত হয়, সামজে যা ঘৃণিত ও অপছন্দনীয় হিসাবে চিহ্নিত, তাহলে এমতাবস্থায় তাকে পদচ্যুত কিংবা ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে।' তার জন্যে এটাই তাযীর' হিসাবে পরিগণিত হবে।
এমনিতর কখনো অপরাধীকে জেলখানায় বন্দী করে তাযীর করতে হবে। ক্ষেত্র ও পাত্রভেদে অপরাধীর' মুখে চুন কালী মাখিয়ে' উল্টোমুখী গাধায় সওয়ার করে' বাজারে-বন্দরে, তথা লোকালয়ে ঘুরিয়ে তাকে জনসমক্ষে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে তাযীর করতে হবে। যেমন হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, মিথ্যা সাক্ষ্য দানকারীকে তিনি এ ধরনের তাযীর করেছিলেন। মিথ্যাবাদী মিথ্যা কথার দ্বারা নিজের মুখে সে নিজেই কালি মেখেছে। কাজেই কর্মফলস্বরূপ তার মুখমণ্ডল কাল করে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ সরল সোজা কথাকে যেহেতু সে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে, সেহেতু তাকেও গাধার পিঠে উল্টোমুখী সওয়ার করে সাজা দেয়া হয়েছে।
তাযীরের ক্ষেত্রে অনুর্ধ্ব দশটি দণ্ড দিতে হবে এর অধিক নয়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের মতে তাযীর এ পরিমাণ হওয়া উচিত, যাতে হদ্দের সীমা পর্যন্ত না পৌছে। অতঃপর তাযীর সম্পর্কেও তাদের মধ্যে দু'ধরনের মত পরিলক্ষিত হয়। কারো কারো মতে সীমা পর্যন্ত পৌঁছানো চাই। আযাদ ব্যক্তির হদ্দ হচ্ছে ন্যূনতম চল্লিশ কোড়া কিংবা আশি কোড়া। কাজেই তাযীরে উক্ত সংখ্যক কোড়া লাগানো ঠিক নয়। বস্তুত গোলামের তাযীর গোলামের নিম্নতম পরিমাণের সমান না হওয়া সংগত। যেমন, গোলামের হদ্দের পরিমাণ বিশ কিংবা চল্লিশ কোড়া। কাজেই তাযীর এর সমসংখ্যক হওয়া উচিত নয়।
পক্ষান্তরে কেউ বলেছেন, অপরাধী ব্যক্তি স্বাধীন হোক বা গোলাম, তাযীর গোলামের হদ্দের পরিমাণ হওয়া সমীচীন নয়। এ ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষ বলেন- স্বাধীনদের তথা তাযীর তাদের হদ্দের সমপরিমাণ হওয়া উচিত। যে প্রকার এবং যে জাতীয় তাযীর করা হবে, তা যেন হদ্দের চেয়ে মাত্রাধিক না হয়ে যায়। যেমন, কোন চোর যদি অরক্ষিত কোন স্থানের মাল চুরি করে তবে শাস্তিস্বরূপ তার হাত কাটা হবে না, অন্যভাবে তাযীর করতে হবে। সে তাযীর যদিও 'হদ্দে কযফ' পর্যন্ত পৌঁছে যায়। প্রয়োজন হলে তাকে 'হদ্দে কযফে'র চেয়ে অধিক পরিমাণে বেত্রদণ্ড দিতে হবে। যেমন, কোন ব্যক্তি যিনা তো করেনি কিন্তু তার আনুষঙ্গিক কাজগুলো করেছে, চুমো খেয়েছে, তাকে নিয়ে শয্যায় শুয়েছে অথবা যিনার এ জাতীয় অন্য কোন আনুষঙ্গিক ক্রিয়াকাণ্ড করেছে। সুতরাং এর তাযীর একশ কোড়া হতে পারবে না। অবশ্য কযফের চেয়ে অধিক হওয়াও বাঞ্ছনীয়। যেমন, বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর (রা)-এর যামানায় এক ব্যক্তি নকশী করা একটি আংটি তৈরী করেছিল। বাইতুল মাল থেকে কিছু মাল চুরি করে সে তাতে লাগিয়েছিল। এটা প্রমাণিত হওয়ার পর হযরত ওমর (রা) প্রথম দিন তাকে একশ কোড়া লাগান, দ্বিতীয় দিন একধম এবং তৃতীয় দিনও তাকে একশত কোড়া লাগানো হয়।
খোলাফায়ে রাশেদীন থেকে বর্ণিত আছে- একদা রাত্রিকালে কোনও এক ব্যক্তিকে জনৈকা পরনারীসহ একই লেপের নীচে শয্যাশায়ী অবস্থায় পাওয়া যায়। অতঃপর এর দণ্ডস্বরূপ উভয়কে একশ করে কোড়া লাগানো হয়েছিল।
হযরত নবী করীম (সা) থেকে বর্ণিত- কোন ব্যক্তি আপন স্ত্রীর বাঁদীর সাথে যদি সহবাস করে, তবে তাকে রজম বা প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। এটা ইমাম আহমদ (রহ)-এর অভিমত। আর প্রথমের দুটি ধারা ইমাম শাফিঈ (রহ)-এর মযহাব অনুযায়ী। ইমাম মালিক (রহ) এবং অন্যান্য থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, কোন কোন অপরাধ এমনও রয়েছে, যার সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন 'হদ্দ'-এর উল্লেখ নেই। কিন্তু তার তাযীর বা সাজা প্রাণদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। ইমাম আহমদ (রহ)-এর কোন কোন শাগরিদও এ মতের অনুসারী। যেমন, কোন মুসলমান যদি কাফির ও দুশমনের পক্ষে গুপ্তচর বৃত্তিতে লিপ্ত হয়, যার ফলে مسلمانوں জান মালের ক্ষতির আশংকা দেখা যায়, এমতাবস্থায় ইমাম আহমদ (রহ) কোন মত ব্যক্ত না করে নীরবতা অবলম্বন করেন, কিন্তু ইমাম মালিক (রহ) এবং ইবনে 'উকায়লীর ন্যায় কোন কোন হাম্বলী ইমামের মতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা (রহ), ইমাম শাফিঈ (রহ) এবং আবুয়ালীর ন্যায় অপর কোন হাম্বলী ইমামের মতানুসারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দান সমীচীন নয়।
কোন ব্যক্তি যদি কুরআন হাদীসের পরিপন্থী কোন বিদ'আত ও শরীয়ত বিরোধী প্রথা চালু করে কিংবা এর প্রতি মানুষকে আহ্বান জানায় ও তার অনুকূলে প্রচারণা চালায় তবে তাকে আদালত মৃত্যু দিতে পারবে। ইমাম মালিক (রহ)-র বহু শিষ্য-শাগরিদও এ মতের সমর্থনকারী। পক্ষান্তরে ইমাম মালিক (রহ) ও অন্য ইমামগণ 'কাদরিয়্যাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দানের হুকুম দিয়েছেন। তাঁদের এ হুকুম কাদরিয়্যাদের 'মুরতাদ' (ইসলাম ত্যাগী) হওয়ার ভিত্তিতে নয়, বরং এদের দ্বারা 'ফাসাদ ফিল আরদ' অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করার কারণে দেয়া হয়েছে।
এমনিভাবে কেউ কেউ যাদুকরদেরও মৃত্যুদণ্ড দানে মত ব্যক্ত করেছেন। আর অধিকাংশ আলিমও একই মত পোষণ করেন। এ পর্যায়ে হযরত 'জুন্দুব' (রা) থেকে মওকূফ' ও 'মরফু' উভয় সূত্রে রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে।
حَدُّ السَّاحِرِ ضَرْبُهُ بِالسَّيْفِ .
“যাদুকরের হদ্দ বা সাজা হল তরবারীর আঘাতে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা।” (তিরমিযী)
হযরত ওমর (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত হাফসা (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা) এবং অন্যান্য সাহাবীগণের মতে যাদুকরের সাজা হলো তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া। অবশ্য এর কারণ সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন আলিমের মতে যাদুকর সেও কাফির হয়ে যাওয়ার কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। আর কেউ বলেছেন, যাদুকর ঠিকই হত্যার যোগ্য তবে, তা ফাসাদ ফিল আরদ' فَسَادُ فِي الْأَرْضِ সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টির কারণে। কিন্তু জমহূর উলামা তথা অধিকাংশ আলিম এর মতে, শরীয়তী হদ্দের ভিত্তিতেই সে হত্যা যোগ্য অপরাধী।
এমনিভাবে যে সকল অপরাধের শাস্তিতে প্রাণদণ্ড প্রদান ওয়াজিব হয়ে পড়ে, সে জাতীয় অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে 'তাযীরস্বরূপ ইমাম আবূ হানীফা (রহ) প্রাণদণ্ডের অনুকূলে মত ব্যক্ত করেন। যেমন, কোন ব্যক্তি যদি বারংবার 'লাওয়াতাত' বা পুং মৈথুন করতে থাকে অথবা কেউ মানুষকে ধোকা দিয়ে, প্রবঞ্চনার আশ্রয়ে অর্থ কড়ি হাতিয়ে নেয়, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দান ওয়াজিব।
এমনিভাবে কারো সম্পর্কে যদি এটা প্রমাণিত হয় যে, হত্যা করা ব্যতীত তার অনিষ্টকারী কার্যকলাপ এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় নেই, এমতাবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।
ইমাম মুসলিম তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ সহীহ মুসলিমে হযরত 'আরফাজা আল আশজাঈ' (রহ)-র রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে শুনেছি: مَنْ أَتَاكُمْ - وَأَمْرُكُمْ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ فِي جَمَاعَتِكُمْ فَاقْتُلُوهُ - (مسلم)
“যে ব্যক্তি তোমাদের সমাজে বিভে-বিশৃংখলা এবং অনৈক্য সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করে, তবে সে মৃত্যুদণ্ড পাবার যোগ্য।”
অপর এক হাদীসে রয়েছে: سَيَكُونُ هُنَاتَ وَهُنَاتَ فَمَنْ أَرَادَ أَنْ يُفَرِّقَ أَمْرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ وَهِيَ جَمِيعٌ فَاضْرِبُوهُ بِالسَّيْفِ كَائِنَا مَنْ كَانَ -
“একের পর এক ফিৎনা সৃষ্টি হতে থাকবে তখন, যদি কোন ব্যক্তি এ জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির দুরভিসন্ধি করে আর তোমাদের ঐক্য-সংহতি নষ্ট করার প্রয়াস চালায়, সে যেই হোক না কেন (তার বিচার করে) তরবারীর আঘাতে তাকে প্রাণদণ্ড দিতে হবে।"
শরাব পানের ব্যাপারেও অনুরূপ কথাই বলা হয়েছে যে, কয়েক বারের তাযীর সত্ত্বেও যদি নিবৃত না হয়, তখন চতুর্থবার তাকে প্রাণদণ্ড দিতে হবে। এ মতের সমর্থনে মুসনাদ গ্রন্থে ইমাম আহমদ কর্তৃক দাইলাম আল হিময়ারী (রা)-কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, হযরত দাইলাম (রা) প্রশ্ন করেন, হে রাসূলুল্লাহ! আমি এমন এলাকা থেকে আগমন করেছি, যেখানে মদের সাহায্যে বড় বড় কার্য সমাধা করা হয়। এর দ্বারা চিকিৎসা করা হয়। আমরা গম থেকে শরাব প্রস্তুত করি, মদ দ্বারা আমরা উল্লেখযোগ্য শক্তি লাভ করি। এ ব্যবসাতে আমরা বেশ সাফল্যও লাভ করে থাকি। অধিকন্তু আমাদের অঞ্চলে তীব্র শীত পড়ে থাকে। এর দ্বারা শরীর গরম রাখা হয়। হুযূর (সা) বলেন-
"তাতে নেশা ধরে?” আমি বললাম হাঁ। তিনি বললেন- "এ থেকে বেঁচে থেকো”। আমি পুনরায় আরয করলাম- “হুযূর! মানুষ এটা কিছুতেই বর্জন করবে না।”
এবার নবীজি ইরশাদ ফরমান- فَإِنْ لَّمْ يَّتْرُكُوهُ فَاقْتُلُوهُ - “যদি তারা তা বর্জন না করে, তবে তাদের (এ সমাজ বিরোধী খোদাদ্রোহীদের) মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।”
বস্তুতঃ এ নির্দেশের মূল কারণ হল, এ দ্বারা সমাজে ফিৎনা-ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। (মানবদেহের ক্ষতিসহ অন্যান্য ক্ষতিতো আছেই।) দ্বিতীয়ত, এটা হচ্ছে ক্ষতিকর আক্রমণকারীর অনুরূপ। তাই আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে হিংস্র আক্রমণকারীকে হত্যা যেমন বৈধ ও জরুরী, তদ্রূপ মাদক দ্রব্যের ব্যাপক ক্ষতির প্রেক্ষিতে এর হুকুমও একই পর্যায়ের। সাজা দুই প্রকার: এ ব্যাপারে সবাই একমত। (১) অতীত অপরাধ কর্মের সাজা, যা সে ইহজগতেই ভোগ করে যায় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে মুক্তি লাভ করে। যেমন, শরাবখোর ও মিথ্যা অপবাদ দানকারীকে কোড়া লাগানো। বিদ্রোহী এবং চোরের হাত কাটা ইত্যাদি। (২) নিজের উপর ওয়াজিব হক আদায় না করা। অনবরত গুনাহ করতে থাকা। এমন অপরাধীকে শাস্তি দানের উদ্দেশ্য হল- তার নিকট যা প্রাপ্য তা আদায় করা আর ভবিষ্যতে সে যাতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, সে ব্যাপারে তাকে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণে বাধ্য করা। যেমন ইসলাম ত্যাগকারী মুরতাদ। প্রথমতঃ তওবা এবং ইসলাম গ্রহণের জন্য তাকে আহ্বান জানাতে হবে। ডাকে সাড়া দিয়ে তওবার মাধ্যমে সে যদি মুসলমান হয়ে যায়, তবে তো উত্তম, অন্যথায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। আর যেমন নামায, রোযা বর্জনকারী এবং যে ব্যক্তি পরের হক আদায় করে না কিংবা নষ্ট করে, এসব ক্ষেত্রে হক ও ওয়াজিবসমূহ আদায় করার জন্য তাকে সুযোগ দিবে। আর ব্যতিক্রম অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সুতরাং দ্বিতীয় প্রকারের অপরাধে প্রথম প্রকারের চেয়ে কঠোর হস্তে তাযীর করতে হবে। তাই নামায, রোযা বর্জনকারীকে তার উপর আবর্তিত ওয়াজিবগুলো আদায় না করা পর্যন্ত, বার বার প্রহার কার্য করে তাকে শাসন করতে হবে।
আর এ বিষয়ে বুখারী ও মুসলিমের হাদীস নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো। মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন- لَا يُجْلَدُ فَوْقَ عَشْرَةِ أَسْوَاطِ إِلَّا فِي حَدٌ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ -
"আল্লাহর নির্ধারিত হদ্দ ব্যতীত দশটির অতিরিক্ত কোড়া লাগানো যাবে না।" এর ব্যাখ্যায় আলিমগণের একাংশের অভিমত হলো, উক্ত হাদীসের মর্ম হলো আল্লাহর নির্ধারিত হদ্দসমূহ আল্লাহর হকের জন্য হারাম করা হয়েছে। কেননা কুরআন হাদীসে উল্লেখিত হদ্দের অর্থ হলো হালাল-হারামের মধ্যবর্তী সীমারেখা। অর্থাৎ হালালের শেষ সীমা এবং হারামের প্রথম সীমার মধ্যখানে অবস্থিত সীমারেখা। হালালের শেষ সীমা সম্পর্কে আল্লাহ ফরমান-
تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا -
"এ হলো আল্লাহ্ নির্ধারিত সীমারেখা। তাই তোমরা এগুলো অতিক্রম করবে না।” পক্ষান্তরে হারামের প্রারম্ভিক সীমা সম্পর্কে আল্লাহর বাণী হলো-
تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا -
"এগুলো হলো আল্লাহ্ ঘোষিত সীমা চিহ্ন। সুতরাং এর নিকটেও তোমরা যাবে না।"
এখন কথা হল, উক্ত সাজাকে হদ্দ কেন বলা হয়? এর উত্তরে বলা যায় যে, এটা একটা নতুন পরিভাষা। এর তাৎপর্য ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।
উল্লেখিত হাদীসের উদ্দেশ্য হল- কেউ নিজের প্রাপ্য আদায় করার জন্য- সমস্যাটা যদি আঘাত ও মারপিটের ঘটনা পর্যন্ত গড়ায়, তা হলে দশটির অধিক আঘাত করা তার জন্য বৈধ নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, যেমন কারো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়ে গেল, ফলে কোন এক পক্ষ থেকে অন্যায়-বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হলো, এহেন পরিস্থিতিতে মজলুমের অধিকার আদায়কল্পে অন্যায়কারীকে দণ্ডিত করা জরুরী। তবে বেত্রদণ্ডের ক্ষেত্রে দশের অধিক নয়।

টিকাঃ
১. টীকা: নিসাব বলা হয় ঐ পরিমাণ অর্থ-সম্পদ কেউ যার মালিক হলে, তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হয়।
১. টীকা: উক্ত তিনজন সাহাবী হলেন- হযরত কা'ব ইবনে মালিক, হেলাল ইবনে উমাইয়্যা এবং মুরারাহ ইবনে রবী (রা)। এ তিন জনের তওবা কবুল হওয়া সম্পর্কে কুরআনে করীমে ইরশাদ হচ্ছে- وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلْفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ - ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوْبُوا - إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمِ (سورة توبة : (۱۱৮) "আর ঐ তিন জন যাদের ব্যাপারে ফয়সালা আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় মূলতবী রাখা হয়েছিল তাদেরও অবস্থা এই যে, আল্লাহর যমীন বিশাল-বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের উপর তা সংকীর্ণ ও সংকুচিত হয়ে যায় এবং নিজেদের জীবনের প্রতিও তারা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। অধিকন্তু তাদের বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি হয় যে, আল্লাহর পাকড়াও থেকে মুক্তির ব্যাপারে তিনি ছাড়া তাদের দ্বিতীয় কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন যেন তারা তওবায় অটল থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় তওবা গ্রহণকারী এবং পরম দয়ালু।" (সূরা তাওবা : ১১৮) মহানবী (সা) এ তিনজন সাহাবীর সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করে কার্যতঃ তাদেরকে বয়কট করার জন্য সকলের প্রতি নির্দেশ দেন। তাদের সাথে সালাম কালাম, কথা বার্তা বন্ধ করে দেন। এমনকি পরিবারস্থ লোকজন পর্যন্ত তাদের সাথে চলা-ফেরা আলাপ-আলোচনা বন্ধ করে দেয়। ফলে তাদের অবস্থা দাঁড়ায় এই, যা উল্লেখিত আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারটা ঘটেছিল হিজরী দশম সালে সংঘটিত 'তবুক যুদ্ধের সময়। তবুক যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্য কঠিন পরীক্ষার বিষয়। কেননা একদিকে প্রচণ্ড গরমের মৌসুম, সফর ছিল অতি দূর দূরান্তের। সহায় সম্বল বলতে কিছুই ছিল না। তদুপরি মদীনাবাসীদের গোটা বছরের খাদ্যের ব্যবস্থা খেজুর কাটার পুরা মৌসুম। ফলে সবাই চিন্তিত ছিল যে, এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ যাত্রা কিভাবে সম্ভব? সুতরাং এ যুদ্ধে মদীনাবাসীরা পাঁচ দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। (১) মহানবী (সা) মুহাজির এবং অনাসারগণ। যে কোন পরিস্থিতিতে তাঁরা যুদ্ধ যাত্রার দৃঢ় সংকল্পে সর্বোতভাবে প্রস্তুত হয়ে যান। (২) মুহাজির ও আনসারদের সে সকল লোক, প্রথমতঃ যুদ্ধ যাত্রায় দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। কিন্তু পরিশেষে যুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে তাঁরা প্রস্তুত হয়ে যান এবং রওনা দেন। (৩) এ দলে মাত্র তিনজন ছিলেন। অবহেলা ও অলসতার দরুন যারা যুদ্ধ যাত্রা থেকে বিরত থাকেন। নবী করীম (সা) যুদ্ধ থেকে মদীনা প্রত্যাবর্তনের পর এরাও হুযূর (সা)-এর খিদমতে হাজির হন। তাদেরকে জিহাদে শরীক না হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে তারা সত্য সত্য ঘটনাই ব্যক্ত করেন যে, আমাদেরই অপরাধ, বিনা কারণে আমরা জিহাদে গমন করা থেকে বিরত ছিলাম। আদালতে নববী থেকে এ তিনজনের সাথে সামাজিক বয়কটের নির্দেশ আসে। হুযূর (সা) তাদেরকে বলেন, ওহীর অপেক্ষা করতে থাক। আল্লাহর পক্ষ থেকে যা হুকুম হবে, তার উপরই আমল করা হবে। (৪) চতুর্থ দল ছিল মুনাফিকদের। সূরা 'তওবায়' তাদের কঠোর ভাষায় তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। (৫) ঐ সকল লোক, যারা কোন ওযর বা অক্ষমতার কারণে ঐ যুদ্ধে শরীক হতে পারেননি। এ আয়াতে আল্লাহর ফযল ও করুণার উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী আল্লাহর ফযল, রহমত ও করুণার অংশ দেয়া হয়েছে। নবী করীম (সা) মুহাজির ও আনসারদের উপর আল্লাহ তা'আলার দান-'ফযল' এই হয়েছে যে, যুদ্ধ যাত্রা সম্পর্কে আদৌ তাঁরা দ্বিধান্বিত হন নাই। বরং তাঁরা ছিলেন দৃঢ় সংকল্প এবং অটুট অনড় ইচ্ছার অধিকারী। আর যারা ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত, তাঁদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ হয়েছে এই যে, শেষ পর্যন্ত তাঁরা পয়গম্বর (সা)-এর সঙ্গীরূপে যুদ্ধে গমন করেন। অধিকন্তু কা'ব (রা), হেলাল (রা) এবং মুররাহ (রা) এ তিন জনের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ হলো যে, তাঁরা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাদের তওবা কবুল করেন। মোটকথা, সামাজিক বয়কটের ফলে অপরাধী যদি শিক্ষা গ্রহণ করে এবং অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে তবে, এটাও (আদালতে) কার্যকর বলে বিবেচিত হতে পারে। অতএব সার কথা হল- যে সমস্ত অপরাধের হদ্দ বা সাজা নির্ধারিত নেই অথচ তাকে তাযীর করা উদ্দেশ্য, এ ক্ষেত্রে ইমাম, শাসনকর্তা বা বিচারপতির কর্তব্য হলো অপরাধীর অবস্থানুযায়ী তাযীর করা বা সাজা দেয়া এবং তাকে অপরাধ থেকে নিবৃত রাখা।
টীকা-১: হযরত 'জুন্দুব' (রা)-র ঘটনা আবুল ফারাজ ইসফাহানী রচিত আল আগানী গ্রন্থে সনদসহ (রেওয়ায়েত সূত্র) বর্ণনা করা হয়েছে। ঘটনার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে- ওলীদ ইবনে ওকবার দরবারে একবার কোন এক যাদুকর উপস্থিত হয়। যাদুমন্ত্র বলে সে গাভীর উদরে অনায়াসে প্রবেশ করত এবং বেরিয়ে আসত। ঘটনাক্রমে হযরত জুন্দুব (রা) সেখানে উপস্থিত হয়ে ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন। সবার অলক্ষ্যে উঠে গিয়ে ঘর থেকে তিনি তরবারী হাতে ফিরে আসেন। খেলার এক পর্যায়ে যাদুকর গাভীর পেটে ঢুকতেই তিনি তরবারীর এক প্রচণ্ড আঘাতে যাদুকরসহ গাভীটি দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেন। আর মুখে তিলাওয়াত করতে থাকেন- افَتَأْتُونَ السَّحْرَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ - "তোমরা কি জেনে শুনে যাদু চর্চায় এসেছ?” (সূরা আম্বিয়া: ৩) পরিস্থিতির নাজুকতা অনুধাবন করে উপস্থিত সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ইরাক শাসক ওলীদের নির্দেশে জুন্দুবকে গ্রেফতার করে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। আর বিস্তারিত ঘটনা লিপিবদ্ধ করে খলীফা উসমান (রা)-র নিকট পত্র প্রেরণ করা হয়। ঘটনাক্রমে সে কারাগারে ছিল খৃষ্টান দারোগা। হযরত জুন্দুব (রা) গভীর রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ছেন এবং দিনের বেলা রোযা রাখছেন। এ অবস্থা দেখে খৃষ্টান কারারক্ষী মনে মনে বলতে থাকে- “আল্লাহর কসম! যে জাতির অপরাধ-প্রবণ ও প্রতারক দুষ্ট লোকদের অবস্থা এই, সে জাতি সে ধর্ম অবশ্যই সত্য ও নির্মল।" অন্য একজনের উপর কারাগারের দায়িত্ব অর্পণ করে সে নিজে 'কুফা' চলে যায়। এখানে লোকদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে এবং স্থানীয় লোকদের নিকট এখনকার সবচেয়ে সৎ ও পুণ্যবান ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে থাকে। তারা জবাব দিল সে ব্যক্তি হচ্ছে 'আশআছ বিন কায়স।' সে তাঁর বাড়ীতে অতিথি হলো। আর লক্ষ্য করল যে, তিনি রাতে ঘুমান এবং সকালে আহার করেন। অতঃপর কুফবাসীদেরকে পুনরায় জিজ্ঞেস করল 'এখানে সব চেয়ে উত্তম ব্যক্তি কে?' উত্তরে তারা বলল- জারীর ইবনে আবদুল্লাহ'। উক্ত খৃষ্টান তাঁকেও হযরত 'আশআছ ইবন কায়স-এর অনুরূপ দেখতে পেল। অতঃপর কেবলামুখী হয়ে সে ঘোষণা করতে থাকে- رَبِّي رَبُّ جُنْدُبٍ وَدِيْنِي دِينُ جُنْدُبٍ - 'জুন্দুবের যিনি প্রভু- আমারও তিনি প্রভু-পালনকর্তা আর জুন্দুবের দ্বীনই আমার দ্বীন।' এ মন্তব্য করার পরক্ষণেই তিনি কালিমা তাইয়্যেবা পাঠ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। 'সুনানে কুবরাতে ইমাম 'বায়হাকী' সামান্য পরিবর্তনসহ ঘটনাটি এভাবে উল্লেখ করেন: ওলীদ ইবন উকবা তখন ইরাকের শাসনকর্তা। তাঁর নিকট একজন যাদুকর উপস্থিত হয়ে নিজের মন্ত্রবলে সে খেলা দেখাতে শুরু করে। সে এক ব্যক্তির গর্দান উড়িয়ে দেয়। অতঃপর নিহত ব্যক্তির নাম করে সজোরে চিৎকার দেয়। এতে নিজে নিজেই তার ছিন্ন মস্তক এসে দেহের সাথে জোড়া লেগে যায় এবং সজীব হয়ে উঠে। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনতা বিস্মিত ও আশ্চর্য কণ্ঠে বলে উঠে سُبْحَانَ اللَّهَ يُحْي الْمَوْتَ "সুবহানাল্লাহ! এ তো মৃতকে জীবন দান করে দেখছি।” এহেন অবস্থা দেখে এর পরবর্তী দিন মুহাজিরদের মধ্য থেকে এক জন তরবারী হাতে ঘটনাস্থলে হাজির হন। যাদুকর পূর্ব দিনের ন্যায় যথারীতি তার ভেল্কীবাজী শুরু করলে তিনি জনতার মধ্য থেকে এগিয়ে আসেন এবং তরবারীর একই আঘাতে দেহ থেকে তার মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। আর মন্তব্য করতে থাকেন- "সে যদি সত্য সত্যই মৃতের জীবন দানে সক্ষম হয়ে থাকে, তবে নিজে নিজেই জীবিত হয়ে উঠুক।" ওলীদ তখন দীনার নামক কারারক্ষীর প্রতি তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করার হুকুম দেন। মোটকথা, যাদু বিদ্যা ইসলাম বিরোধী কাজ। কেননা এদ্বারা মানুষ ধোকায় পড়ে যায়। সুতরাং সত্য ও দ্বীনের মাপকাঠি একমাত্র আল্লাহর কিতাব এবং সুন্নতে রাসূল (সা), যা কিছু এ দুয়ের সাথে মিল খাবে তা সত্য। পক্ষান্তরে এর বিপরীত সব কিছুই গোমরাহী বলে প্রতিপন্ন হবে। এ কারণেই ইসলামী আইন বিশেষক আলিমগণ যাদুকরের প্রাণদণ্ডের অনুকূলে মত দিয়েছেন। এখানে কারাগারে প্রেরণের ঘটনাটি আইন হাতে তুলে নেয়ার।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 যে ধরনের কোড়া দ্বারা অপরাধীকে শাস্তি দেবে এবং যেসব অঙ্গে কোড়া মারা যাবে না

📄 যে ধরনের কোড়া দ্বারা অপরাধীকে শাস্তি দেবে এবং যেসব অঙ্গে কোড়া মারা যাবে না


শরীয়তের বিচারে অপরাধিকে যে কোড়া লাগানোর নির্দেশ রয়েছে, তা মধ্যম মানের হতে হবে। কেননা মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন, خَيْرُ الْأَمُوْرِ أَوْسَطُهَا “অর্থাৎ মধ্যমপন্থা অবলম্বন করাই উত্তম।”
হযরত আলী (রা) বলেন- আঘাত খুব শক্তও হানা যাবে না, আবার একেবারে লঘুও নয়। বেতটি অতি বড়ও নয় আবার একেবারে ছোটও হওয়া উচিত নয়। কাষ্ঠখণ্ডের দ্বারা প্রহার করা যাবে না, কাঁটাযুক্ত জিনিস দিয়েও না। এ ক্ষেত্রে দোররা যথেষ্ট নয়, বরং দোররা ব্যবহার করতে হবে তা'যীর তথা শিক্ষামূলক শাস্তিতে। 'হদ্দে শরীয়া'র ক্ষেত্রে কোড়া দ্বারাই দণ্ড দিতে হবে।।
হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) কাউকে আদব শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে দোররা ব্যবহার করতেন। কিন্তু 'হদ্দে শারঈ' কার্যকর করার কালে কোড়া আনিয়ে নিতেন। কোড়া মারার সময় অপরাধীর পরিধেয় সকল বস্ত্র খুলে নেয়া যাবে না, বরং সে পরিমাণ বস্ত্রই খোলা যাবে, যা প্রহারের তীব্রতা রোধ করে। লক্ষ্য রাখতে হবে, প্রহারের ক্রিয়া যেন রগ কিংবা অস্ত্রে না পৌঁছে। বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বাঁধা যাবে না। অপরাধীর মুখমণ্ডলেও আঘাত করা যাবে না। আসল উদ্দেশ্য হল, তাকে শিক্ষা দেয়া, তার প্রাণ সংহার করা নয়। প্রহার এ পরিমাণ করতে হবে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেন টের পায়, ব্যথায় জর্জরিত হয়। উদাহরণতঃ পিঠ, কাঁধ এবং রানের উপর প্রহার করতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00