📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ডাকাত-ছিনতাইকারীদের সাজা এবং যুদ্ধকালীন সময় সামরিক বাহিনীর যেসব কাজ নিষিদ্ধ

📄 ডাকাত-ছিনতাইকারীদের সাজা এবং যুদ্ধকালীন সময় সামরিক বাহিনীর যেসব কাজ নিষিদ্ধ


ডাকাত-ছিনতাইকারী ও লুণ্ঠনকারীদের সাজা। কাউকে জিহাদে প্রেরণকালে নবী করীম (সা) নসীহত করতেন : দুশমনের সাথে লড়াই করবে। কিন্তু সীমা অতিক্রম করবে না। নিজের ওয়াদা ও অঙ্গীকার পূর্ণ করবে, শত্রু পক্ষের কারও কান, নাক কেটে 'মুছলা' করবে না। ছোট শিশুদের হত্যা করবে না, নিজ হাতিয়ারসহ যে ব্যক্তি স্বগৃহে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকে, এমন লোকদেরকে হত্যা করবে না। যদি কাফিররা مسلمانوں 'মুছলা' করে তবে مسلمانوں জন্যেও আগ্রাসীদের সাথে অনুরূপ করার অনুমতি রয়েছে কিন্তু না করাই উত্তম।
ডাকাত, পথিক প্রবাসীদের মালামাল লুণ্ঠন ও ছিনতাইকারী চাই সে পল্লীবাসী গ্রাম্য হোক চাই শহুরে, কৃষক কিংবা চরিত্রহীন সিপাহী, শহুরে যুবক হোক অথবা অন্য কেউ- এদের শাস্তি সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্য হলো-
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا - أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خلافِ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ - ذَالِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ. (سورة مائدة : (٣٣)
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক সন্ত্রাসী কার্য করে বেড়ায়, ইসলামী আদালতে তাদের শাস্তি হলো, তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেবে অথবা শূলে চড়ানো হবে, কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত পা কেটে ফেলা হবে অথবা দেশান্তরিত করা হবে। এটা হল তাদের দুনিয়ার লাঞ্ছনা আর পরকালে রয়েছে তাদের জন্য ভয়াবহ শাস্তি।” (সূরা মায়েদা : ৩৩)
ডাকাত ও লুটেরা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) প্রমুখ বলেন: ইমাম শাফিঈ (রহ) তাঁর সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন-
إِذَا قَتَلُوا وَأَخَذُوا الْمَالَ قُتَّلُوا وَصُلِّبُوا - وَإِذَا قَتَّلُوا وَلَمْ يَأْخُذُوا الْمَالَ قُتَّلُوا وَلَمْ يُصَلِّبُوا - وَإِذَا أَخَذُوا الْمَالَ وَلَمْ يُقَتَّلُوا قُطِّعَتْ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ وَإِذَا أَخَافُوا السُّبُلَ وَلَمْ يَأْخُذُوا الْمَالَ نُفُوا مِنَ الْأَرْضِ.
"তারা যদি হত্যাসহ মালামাল লুট করে, তবে শাস্তিস্বরূপ তাদের মৃত্যুদণ্ড দেবে এবং শূলে চড়ানো হবে। আর যদি শুধু হত্যাই করে মালামাল লুট না করে, তাহলে মৃত্যুদণ্ড দেবে, শূলে চড়াতে হবে না। কিন্তু যদি শুধু মালপত্রই নিয়ে যায়, হত্যা করে নাই এমতাবস্থায় বিপরীতভাবে তাদের হাত পা কাটতে হবে। আর যদি মালামাল না নিয়ে কেবল ভীতিপ্রদর্শন করে, তবে তাদেরকে দেশান্তরিত করতে হবে।"
ইমাম শাফিঈ (রহ) ইমাম আহমদ (রহ) সহ অধিকাংশ ইসলামী আইনবিদের রায় এটাই। অধিকন্তু এ মতটি ইমাম আবু হানীফা (রহ)-এর অভিমতের প্রায় কাছাকাছি।
এদের মধ্যে কোন কোন লোক এমনও হবে যাদের ব্যাপারে প্রধান বিচারক ও আমীরকে ইজতিহাদ করতে হবে এবং বিশেষ বিবেচনা করতে হবে। হত্যা করা বা না করা উভয় অবস্থায় কল্যাণকর দিক সামনে রাখতে হবে। (অপরাধের চরিত্র ও পরিস্থিতি বুঝে) মৃত্যুদণ্ড বা অন্য দণ্ড প্রদান করবে।
আর যদিও তারা টাকা কড়ি নেয় নাই, কিন্তু শক্তিশালী ও সাহসী, ইচ্ছা করলে ছিনিয়ে নেয়ার শক্তি তাদের ছিল, এদেরও একই হুকুম। কারো মতে তারা যদি সম্পদ লুট করে তবে তাদের হাত কাটার দণ্ড দেবে শূলে চড়াতে হবে না। অধিকাংশ আলিম প্রথম মত সমর্থনকারী।
কোন ব্যক্তি যদি ডাকাতি করে, সেই সাথে হত্যাও করে এমতাবস্থায় ইমাম, আমীর, বিচারপতি বা হাকিম তার উপর হদ্দ জারী করবেন, মৃত্যুদণ্ড দিবেন। এমন লোককে ক্ষমা করা কোন অবস্থাতেই জায়েয নয়। ইবনুল মুনযিরের মতে, এর উপর 'ইজমা' তথা সর্বসম্মত ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণের মতামতের উপর এটা নির্ভরশীল নয়।
পক্ষান্তরে কোন ব্যক্তি যদি পারস্পরিক শত্রুতা, দুশমনী অথবা অন্য কোন কারণে কাউকে হত্যা করে, এ ক্ষেত্রে তাকে প্রাণদণ্ড দান, ক্ষমা করা কিংবা রক্তমূল্য গ্রহণের অধিকার নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণের রয়েছে। কেননা বিশেষ উদ্দেশ্যে বিশেষ কারণে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
ফকীহ তথা ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞগণের ঐকমত্য হলো, ডাকাতদের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। কেননা, এরা মালামাল লুণ্ঠন ও ছিনতাই করেছে। আর চোরের ন্যায় তারাও সমাজের জন্যে ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। তাই হদ্দের ভিত্তিতে তাদেরকে প্রাণদণ্ড দিতে হবে।
নিহত ব্যক্তি যদি হত্যকারীর ‘কুফু’ তথা সমপর্যায়ের না হয় যেমন হত্যাকারী ‘আযাদ’ কিন্তু নিহত ব্যক্তি ভৃত্য বা দাস, হত্যাকারী মুসলমান আর নিহত ব্যক্তি অমুসলিম যিম্মী- অথবা মুসতামান (রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রাপ্ত), এমতাবস্থায় ঘাতক হওয়ার কারণে ‘প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ’-নীতির ভিত্তিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দান অনিবার্য কিনা এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে প্রাণদণ্ড দানের পক্ষেই শক্তিশালী মত পরিলক্ষিত হয়। কেননা ব্যাপক বিপর্যয়ের আশংকায় হদ্দের ভিত্তিতে এহেন অপরাধীকে প্রাণদণ্ড দানই সমাজের জন্যে কল্যাণকর। যেমন মালামাল লুণ্ঠন বা ছিনতাইর কারণে হাত কাটা হয় এবং অপরের অধিকার বিনষ্ট করার দায়ে কারাদণ্ড দেয়া হয়।
প্রতিপক্ষ লড়াইকারী সংঘবদ্ধ দলটি যদি হারমাদ ও চোর চোট্টা ধরনের হয় আর তাদের মধ্য হতে মাত্র একজন হত্যাকাণ্ড ঘটায়, অবশিষ্টরা হয় তার সহযোগী, এমতাবস্থায় বলা হয়েছে, কেবল হত্যাকারীকেই প্রাণদণ্ড দিতে হবে। ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ অধিকাংশের মতে সংখ্যায় তারা যত বেশী হোক না কেন, তাদের সবাইকে হত্যা করতে হবে। খুলাফায়ে রাশেদীনের পক্ষ থেকেও একই মত বর্ণিত হয়েছে। হযরত উমর (রা) শত্রুপক্ষের সহযোগী পর্যবেক্ষণকারীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ছিলেন। সে একটি উচ্চস্থানে বসে মুসলমানদের গতিবিধি লক্ষ্য করত এবং কাফিরদের নিকট তথ্য সরবরাহে লিপ্ত ছিল। কারণ, এ ধরনের লোকদের দেয়া তথ্য এবং সাহায্য পেয়েই হত্যাকারী হত্যাকাণ্ডে সফল হয়ে থাকে। কাজেই সওয়াব ও শাস্তির বেলায় এরা সম-অংশীদার। যেমন, মুজাহিদগণ সওয়াব ও গনীমতের মালে সবাই সমান অংশীদার হয়ে থাকে। মহানবী (সা) বলেছেন-
الْمُسْلِمُونَ تَتَكَافَأُ دِمَاتُهُمْ وَيَسْعَى بِذِمَّتِهِمْ أَدْنَاهُمْ وَهُمْ عَلَى يَدٍ عَلَى سَوَاهُمْ وَيُرَدُّ مُتَسَرِيْهُمْ عَلَى قَاعِدَتِهِمْ -
“মুসলমানের রক্ত সব সমমানের, তাদের একজন নগণ্য ব্যক্তির দায় দায়িত্বও পূর্ণ করা হবে। প্রতিপক্ষের তুলনায় এরা একক বাহুতুল্য। আর মুসলমানগণ কর্তৃক প্রেরিত ক্ষুদ্র বাহিনী যুদ্ধ জয়ের পর গনীমতের মাল প্রেরণ করলে তাতে প্রেরণকারী পশ্চাদবর্তী লোকরাও সম-অংশীদার হয়।”
এর সারমর্ম হলো, বিরাট মুসলিম বাহিনী কর্তৃক মুষ্ঠিমেয় সৈন্যের ক্ষুদ্র বাহিনী যদি কোথাও প্রেরিত হয়, তবে যুদ্ধ জয়ের পর তাদের অর্জিত গনীমতের মাল প্রেরণকারী পশ্চাদবর্তী গোটা বাহিনীসহ সবাই সমভাবে অংশীদার হবে। কেননা তাদের বলে এবং সহযোগিতায়ই এদের পক্ষে জয়লাভ করা সম্ভব হয়েছে। অবশ্য ক্ষুদ্র বাহিনীভুক্ত সৈন্যদেরকে হারাহারি অংশের বাইরে অতিরিক্ত কিছু দান করাটা স্বতন্ত্র কথা। মহানবী (সা)ও "সারিয়‍্যা” যুদ্ধে (যে যুদ্ধে হযরত সা. স্বয়ং শরীক হননি) তথা ক্ষুদ্র বাহিনীকে অতিরিক্ত দান করেছেন। প্রথমতঃ তিনি 'খুমুস” (এক পঞ্চমাংশ)-এর পরে এক চতুর্থাংশ দিয়েছেন। অতঃপর লোকেরা দেশে ফিরে এলাকা থেকে 'সারিয়‍্যা' প্রেরণ করলে, খুমুসের স্থানে তাদেরকে ছুলুছ অর্থাৎ এক তৃতীয়াংশ দিয়েছিলেন।
অনুরূপভাবে সেনাবাহিনী যদি গনীমতের মাল হাসিল করে, তবে সারিয়‍্যাকেও তাতে শামিল করে নেয়া উচিত! কেননা সারিয়‍্যাও مسلمانوںই সেনাদল। বিশেষ প্রয়োজনে তাদেরকে পাঠানো হয়েছিল। বদর যুদ্ধে যেমন হযরত তালহা (রা) ও হযরত যুবায়ের (রা) কে দেয়া হয়েছিল। কারণ, জাতির কল্য্যাণে এবং সামরিক প্রয়োজনেই তাঁরা প্রেরিত হয়েছিলেন। কাজেই সাহায্যকারী হিসাবে অন্যান্যদের ন্যায় তারাও সমভাবে এর সুফল ভোগ করার অধিকারী।
বাতিল ও মিথ্যা যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের অবস্থাও একই, যেমন আঞ্চলিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, গোত্রীয় দলাদলি এবং জাহিলী যুগের মূর্খতাসুলভ বিষয়কেন্দ্রিক পরস্পর যুদ্ধে অনেকে লিপ্ত হয়ে পড়তো। যেমন 'কয়েস' এবং 'য়ামনী' গোত্র দু'টি অন্যায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। আর এতে তারা উভয়ই ছিল বাতিলপন্থী। মহানবী (সা) বলেছেন- إِذَا الْتَقَى بِسَيْفِهَمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ كِلاهُمَا فِي النَّارِ - “তলোয়ার নিয়ে দুই মুসলমান যদি পরস্পর খুনাখুনিতে লিপ্ত হয় এমতাবস্থায় হত্যাকারী ও নিহত উভয়েই জাহান্নামী হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
এতে উভয়পক্ষই একে অপরকে মনে প্রাণে ধ্বংস করতে প্রয়াস চালিয়েছে। হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি যদিও জানত না যে, কে মারবে কে মরবে। উভয়পক্ষই সাধ্য অনুযায়ী আত্মরক্ষায় সচেষ্ট ছিল; কিন্তু এরি মধ্যে একজন নিহত হয়ে যায়।
কিন্তু যদি হত্যা না করে শুধু ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে, যা (জাহিলী যুগের) আরবদের অধিকাংশের অভ্যাস ছিল, তাহলে প্রত্যেকের ডান হাত বাম পা কেটে দিতে হবে। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমদ প্রমুখসহ অধিকাংশ ইমাম এ মতের সমর্থনকারী। আর এর পক্ষে কুরআনেরও সমর্থন। রয়েছে। যেমন ইরশাদ হচ্ছে- أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ “অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত পা কেটে দিতে হবে।" (সূরা মায়েদা: ৩৩)
কারণ, হাতের সাহায্যে সে লুণ্ঠন কার্য সম্পন্ন করতো, পায়ের সাহায্যে সে পথে অগ্রসর হতো, তাই (সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও এই অপরাধ প্রবণতা সম্পূর্ণ নির্মূল করার স্বার্থে) এ দুটো অঙ্গ কাটার দণ্ড দিতে হবে। অতঃপর রক্ত বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ফুটন্ত যাইতুনের তেল বা অন্য উপায়ে দাগ দিতে হবে। যাতে প্রাণে মারা না যায়। চোরের হাতও সে একই নিয়মে কাটতে হবে।
এভাবে হাত পা কাটার মধ্যে প্রাণদণ্ড অপেক্ষা সর্বাধিক ভীতিপ্রদ শাস্তি ও শাসন নিহিত রয়েছে। কেননা সমাজে চলা ফেরার সময় তার প্রতি দৃষ্টি পড়তেই পরস্পরের মধ্যে চর্চা হয়ে থাকে যে, এটা অমুক অপরাধের পরিণতি। তাতে জনমনে ভীতির সঞ্চার হয়। কুরআনে বলা হয়েছে- وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَوة- يَا أُولَى الْأَلْبَابِ “হে জ্ঞানবানরা! 'কিসাস' তথা জার্নের বদলা জান, হাতের বদলা হাত এভাবে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বদলা অনুরূপ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বদলার শাস্তির মধ্যে রয়েছে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। এছাড়া প্রাণদণ্ডের পরিণতি অল্প দিনেই মানুষ ভুলে যেতে পারে। এজন্য কোন কোন লোক হাত পা কাটা পড়ার পরিবর্তে নিহত হওয়া বা মরে যাওয়াকেই অধিক পছন্দ করে থাকে। কাজেই বলা যায়, চোরের এ সাজা সত্যি বড় কার্যকর ও বড় শিক্ষণীয়।
অস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিরা অস্ত্র উন্মুক্ত করেছিল কিন্তু কাউকে আঘাত করেনি, সম্পদ লুণ্ঠন করেনি, বরং তলোয়ার কোষবদ্ধ করে ফেলে অথবা পালিয়ে যায় কিংবা লুটপাট ও সংঘর্ষ এড়িয়ে যায়। এমতাবস্থায় এদেরকে দেশান্তরিত করতে হবে। নির্বাসনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তারা যেন কোন শহর বন্দর নগরের উপকণ্ঠে কিংবা কোন বস্তীতে দলবদ্ধভাবে একত্রিক হতে না পারে। আবার নির্বাসনের অর্থ কারো কারো মতে তাদেরকে কারারুদ্ধ করে রাখা। এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে কেউ বলেছেন, ইমাম আমীর বা হাকিম তথা রাষ্ট্রীয় ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষই তা ঠিক করবেন, নির্বাসন, কারারুদ্ধ অথবা অন্য কোন্ পন্থা সঠিক হবে, যেটা জাতির জন্য কল্যাণকর। দেশান্তর বা নির্বাসনের এটাই অর্থ।
শরীয়তের আইনে প্রমাণিত অপরাধীর প্রাণদণ্ড কার্যকর করার নিয়ম হলো তরবারি কিংবা অন্য কোন ধারালো অস্ত্র দ্বারা অপরাধীর প্রাণদণ্ড দান, যা সহজ পন্থা। মানুষের প্রাণদণ্ড এবং জীব জন্তু বধ করার খোদাই বিধান এটাই। সুতরাং মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذِّبْحَةَ وَلْيَحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفَرَتَهُ وَلْيُرَحْ ذَبِيحَتَةُ - (مسلم)
"আল্লাহ সকল জীবের প্রতি অনুগ্রহ ও দয়া করা 'ফরয' করেছেন। (রাষ্ট্রীয় বিচারে) তোমরা (প্রমাণিত অপরাধী) কে মৃত্যুদণ্ড দানে উত্তম পন্থায় তা কর, কোন প্রাণী জবাই করতে উত্তম নিয়মে জবাই কর। নিজেদের ছুরি চাকু শাণিত করে নিবে যাতে জবাইকৃত জীব দ্রুত শান্ত হয়।” (মুসলিম)
তিনি আরো বলেছেন- - إِن أَعْفَ النَّاسِ قَتْلَةَ أَهْلِ الإِيْمَان "ঈমানদারগণই অপরাধীর প্রাণদণ্ড দানে অধিকতর শান্তিদায়ক।” (নিষ্ঠুরতামুক্ত) শূলে চড়ানোর নিয়ম হল উচ্চস্থানে লটকাতে হবে। যেন মানুষ প্রকাশ্যে দেখতে পায় এবং ব্যাপক হারে প্রচার হয়। 'জমহুর' (সর্বস্তরের) ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর তাকে এভাবেই লটকাতে হবে। কারও কারও মতে অপরাধীকে শূলে চড়িয়ে প্রাণদণ্ড কার্যকর করতে হবে।
কোন কোন আইনজ্ঞ আলিম তরবারি ছাড়া আরও অন্য উপায়েও প্রাণদণ্ড কার্যকর করা জায়েয মনে করেন। হত্যাকৃত ব্যক্তির নাক কান কেটে 'মুছলা' করা আদৌ জায়েয নহে। অবশ্য مسلمانوں সাথে তারা অনুরূপ আচরণ করলে, তারাও তাই করত। তবে এরূপ না করাটাই উত্তম মনে করা হতো। যেমন, মহান আল্লাহ ঈমানদারদের বলেন,
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُمْ بِهِ وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ - لِلصَّابِرِينَ - وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلا بِالله - (سورة نحل : ١٢٧-١٢٦)
"শত্রুদের সাথে কঠোরতার প্রয়োজন হলে সে পরিমাণ কঠোরতাই কর, যে পরিমাণ তোমাদের সাথে করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্য্য ধর, তবে ধৈর্য্যশীলদের জন্য সেটাই উত্তম। আর হে নবী! আপনি সবর করুন, অবশ্য আল্লাহর তৌফিক ব্যতীত সবর করা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়।" (সূরা নহল: ১২৬-১২৭)
বর্ণিত আছে, হযরত হামযা (রা) এবং উহুদের শহীদগণের সাথে কাফিরদের এহেন নৃশংস আচরণের প্রেক্ষিতেই উক্ত আয়াত নাযিল হয়। তাঁদের সাথে কৃত 'মুছলা'র দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ (সা) মর্মাহত হয়ে ইরশাদ করেন-
لَئِنْ أَظْفَرَ نِي اللَّهُ بِهِمْ لَأَمْثَلَنَّ بِضِعْفَى مَا مَثَلُوا بِنَا -
"আল্লাহ যদি আমাকে জয়ী করেন তবে তারা আমাদের সাথে যে আচরণ করেছে এর দ্বিগুণ আমি 'মুছলা করে ছাড়াবো।” অতঃপর যদিও ইতিপূর্বে মক্কায় উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়, তবুও পুনরায় এ আয়াতটি নাযিল হয়।
وَيَسْتَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ - قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي "হে নবী! আপনাকে রূহ-এর রহস্য সম্পর্কে তারা জিজ্ঞেস করছে। আপনি বলে দিন- এটি আমার প্রতিপালকের একটি নির্দেশ।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮৫) যেমন নিম্নের আয়াতটি দু'বার নাযিল হয়েছিল বলে রেওয়ায়াত আছে-
وَأَقِمِ الصَّلَوةَ طَرَفَى النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ. (سورة هود : ١١٤) “হে রাসূল! সকাল সন্ধ্যা দিনের উভয়াংশে এবং রাতের প্রথমাংশে নামায আদায় করুন। সৎ কাজ অবশ্যই গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয়।" (সূরা হুদ: ১১৪) তদ্রূপ সূরা নাহলের আয়াতটি প্রথমে মক্কায় এবং পুনরায় মদীনায় নাযিল হয়। অর্থাৎ দু'বার নাযিল হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে জুলুম থেকে বিরত থাকার জন্যে রাসূলুল্লাহর নির্দেশাবলী এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর হুযুর (সা) বলেন, بل نصبر "আমরা বরং সবরই করবো।” হযরত বরূদা ইবনুল হাসীব (রা)-এর সূত্রে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন: মহানবী (সা) যখনই কোন ব্যক্তিকে 'সারিয়‍্যা' তথা ছোট বানিহী কিংবা বিরাট বাহিনীর আমীর (নেতা) নিযুক্ত করে প্রেরণ করতেন, তখন তাঁকে ও সঙ্গীদেরকে বিশেষ নসীহত এবং খোদাভীতির হেদায়েত দানের পর বলতেন-
اغْزُوا بِسْمِ اللَّهِ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ - قَاتِلُوا مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ لَاتَغْلُوا وَلَا تَعْذَرُوا وَلَا تَمْثَلُوا وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيْدًا. "আল্লাহর নাম নিয়ে জিহাদ কর, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর, যারা আল্লাহ্র সাথে কুফরীবশতঃ ন্যায়-সত্য পথের যাত্রীদের প্রতিরোধ করে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর। তবে সীমা অতিক্রম করবে না, বিশ্বাসঘাতকতা ও 'মুছলা' করবে না। আর শিশুদের হত্যা করবে না।” (মুসলিম)
ধন সম্পদ লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে কাফিররা যদি মুসলিম জনপদ অভিমুখে অস্ত্র সজ্জিত অবস্থায় এগিয়ে আসে তখন তাদেরকে 'মুহারিব' তথা যুদ্ধ ঘোষণাকারী আগ্রাসী বলা হবে কিনা? এ সম্পর্কে দ্বিমত রয়েছে। কারো কারো মতে তাদেরকে 'মুহারিব' আগ্রাসী বলা যাবে না, বরং তারা সমাজ বিরোধী ডাকাত, গুণ্ডা পর্যায়ের লোক। যাদের বিরুদ্ধে সাহায্য চাওয়া হলে নগর-জনপদবাসীরা এমনিতেই দৌড়ে আসে। অধিকাংশের মতে বিরাট জনপদ আর জনশূন্য মরু ময়দানের একই হুকুম। ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমদের অধিকাংশ শিষ্য এবং ইমাম আবু হানীফার কোন কোন শিষ্য-শাগরিদ এ মতের সমর্থক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জনশূন্য মাঠ-ময়দানে ডাকাতি লুটপাট করার তুলনায় শহরে বন্দরে এ জাতীয় দুষ্কৃতির কঠোর সাজা হওয়া বাঞ্ছনীয়। এজন্য যে, শহরে জনপদ অধিকতর নিরাপদ হয়ে থাকে। পরস্পর একে অপরের সাহায্যে দ্রুত এগিয় আসা সহজ। কাজেই এরূপ স্থলে ডাকাতি লুটপাটের পদক্ষেপ নেয়া শক্তিশালী দলের পক্ষেই সম্ভব। আর শক্তি সাহস আছে বলেই এরা নাগরিকদের বাসগৃহে প্রবেশ করে জোরপূর্বক তাদের ধন-সম্পদ, মালামাল হাতিয়ে নেয়ার দুঃসাহসী প্রয়াস চালায়। পক্ষান্তরে, পথিক মুসাফিরদের সঙ্গে মালামাল অল্পই থাকে। কাজেই সামান্য শক্তিতে এদের প্রতি আঘাত হানা সহজ। এদের সম্পর্কে এ মতই বিশুদ্ধ ও যুক্তিযুক্ত।
এরা যদি লাঠি-সোটা, পাথর দ্বারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তবে এদেরকেও 'মুহারিব' বলা হবে। এ ব্যাপারে ফকীহদের এ অভিমত বর্ণিত আছে-
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُمْ بِهِ - وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِالله - (سورة نحل : ١٢٦-١٢٧)
“হে মুসলমানগণ! শত্রুদের সাথে কঠোরতার প্রয়োজন হলে, সে পরিমাণ কঠোরতাই অবলম্বন কর, যা তোমাদের সাথে করা হয়েছে, কিন্তু যদি তোমরা ধৈর্য ধর, তবে ধৈর্যশীলদের জন্য সেটাই উত্তম। আর হে নবী! আপনি সবর করুন, কিন্তু আল্লাহ্ তৌফিক ব্যতীত সবর করা আপনার পক্ষে সম্ভবই নয়। (সূরা নাহল : ১২৬-১২৭) তখন তিনি বলেন- بَلْ نَصْبِرُ "অবশ্যই আমরা ধৈর্য ধারণ করবো।"
একমাত্র নৈতিক চরিত্রের ভিত্তিতেই তিনি ৪/৫ বছরের মধ্যে গোটা আরব উপদ্বীপে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করতে সক্ষম হন। কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত হদ্দের বেলায় তিনি কারো রেয়াত করেননি। তিনি আক্ষরিক অর্থেই আচার ব্যবহারে, বলিষ্ঠ নীতি, সাহসিকতা, দূরদর্শিতা, উদার ও মহৎ প্রাণের পরিচয় দেন। উপরন্তু তিনি অনুগ্রহ ও করুণার বর্ষণে হিংসা-দ্বেষ, বিদ্রোহ ও যাবতীয় অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিশোধ নিয়েছেন। অত্যাচারের মাত্রা যতই বেড়েছে প্রতিদানে তাঁর অনুগ্রহের হাত অধিক সম্প্রসারিত হয়েছে। কুরআনের উদ্দেশ্য ও মর্ম তিনি বাস্তবায়িত করেছেন পূর্ণ মাত্রায়, পরম নিষ্ঠার সাথে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيُّ حَمِيمٌ - وَمَا يُلَقَّهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّهَا إِلَّا ذُوْ حظ عظيم (سورة حم السجدة : ٣٤-٣٥)
“হে নবী! সৎ-অসৎ ভাল-মন্দ সমান হতে পারে না, উত্তম পন্থায় মন্দের প্রতিকার কর। যদি এরূপ কর তবে, পরম শত্রুও তোমার প্রাণের বন্ধুতে পরিণত হবে। আর ধৈর্যশীলদেরকেই কেবল উত্তমাচরণের সুযোগ দেয়া হয় আর সুযোগ দেয়া হয় সেসব লোককে যারা মহা ভাগ্যবান।" (সূরা হা-মীম আস সাজদা: ৩৪-৩৫)
لا محاربة الا بالحدود "সংঘর্ষ কেবল ধারালো অস্ত্র দ্বারাই হতে পারে।” কেউ কেউ এর উপর আলিমগণের ‘ইজমা’ (সর্বসম্মত ঐকমত্য) বর্ণনা করেছেন যে, ধারালো এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা সংঘটিত সংঘর্ষকে ‘মুহারাবা’ বলা হয়। অতঃপর এ সম্পর্কে মতভেদ থাকুক, চাই না থাকুক বিশুদ্ধ মত সেটিই, যার উপর মুসলমানদের ইজমা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত। আর তা হলো, যে ব্যক্তি ধন সম্পদ লুণ্ঠন করার উদ্দেশ্যে হত্যা ও লুটপাটের আশ্রয় নেয়, এমতাবস্থায় যেভাবেই ঐ ব্যক্তি সংঘর্ষ বাধাক না কেন, সে ‘মুহারিব’, ডাকাত, লুণ্ঠনকারী ইত্যাদি অভিধায় আখ্যায়িত হওয়ারযোগ্য। যেমন, مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কাফিরকে ‘হরবী’ বলা হয়। এখন সে যেভাবেই যুদ্ধ করুক, তরবারী, বর্শা, পাথর ইত্যাদি যাই সে ব্যবহার করুক না কেন, ‘হরবী’ নামেই তাকে অভিহিত করা হবে আর প্রতিপক্ষ مسلمانوں বলা হবে ‘আল্লাহ্র পথের মুজাহিদ’।
আরো ইরশাদ হয়েছে-
أُولَئِكَ يُؤْتُونَ أَجْرَهُمْ مَّرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَؤُنَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ (سورة القصص : ٥٤)
"এরাই সে লোক, সবরের প্রতিদানে যাদেরকে দ্বিগুন সওয়াব দেয়া হবে, (তাওরাত, কুরআনে ঈমান আনার কারণে) আর যারা সত্যের দ্বারা অসত্যের প্রতিরোধ করে থাকে এবং আমার দেয়া ধন-সম্পদ আমারই পথে ব্যয় করে।" (সূরা কাসাস : ৫৪)
মহানবী (সা) এর জীবনাদর্শ প্রণিধানযোগ্য যে, নিজ গোত্র আপনজনেরা তাঁর উপর নানাবিধ নির্যাতন চালাচ্ছে, কষ্ট দিচ্ছে, অন্যায় আক্রমণে পবিত্র দেহ মোবারক রক্তাক্ত করে ফেলেছে কিন্তু ঐ অবস্থায় তাঁর বরকতময় যবান থেকে বদদু'আর পরিবর্তে নেক দু'আ বেরিয়ে আসছে। অকথ্য নির্যাতনের পর তাঁর মুখ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে-
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ -
“হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন। কেননা তারা বুঝে না।"
বস্তুতঃ এহেন ভাষায়ই নবীর মুখ থেকে নিঃসৃত হওয়ারযোগ্য। তাই বিবেকবানদের জন্য এতে চিন্তার খোরাক রয়েছে। 'ইহসান' তথা মহানুভবতা ও অনুগ্রহের চারটি স্তর রয়েছে যা দ্বারা কওমের অন্যায় অত্যাচারের মুকাবিলা করা যায়। (১) ক্ষমা ও মার্জনা, (২) তাদের জন্য ইসতিগফার তথা তাদের অপরাধ মার্জনার জন্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা, (৩) কওমের অন্যায় অত্যাচারের কারণে আল্লাহর নিকট তাঁর ফরিয়াদ- তারা বুঝতে পারেনি বলেই তাদের এই আচরণ, অন্যথায় তারা এরূপ করত না, (৪) কওমের প্রতি তিনি এতই সদয় যে, এই বলে আল্লাহ্র অনুগ্রহ আকর্ষণ করেছেন যে, হে আল্লাহ! এরা আমারই গোত্রীয় স্বজন। কোন ব্যক্তি যেরূপ স্বীয়পুত্র গোলাম কিংবা কোন বন্ধুর পক্ষে বলে থাকে- এ আমার পুত্র, গোলাম অথবা বন্ধু, এর একাজটি করে দিন, আবেদন গ্রহণ করুন। চিন্তার বিষয়, কারো প্রিয়পাত্র যদি তার আপন জনের জন্য এমনি ভাষায় ফরিয়াদ জানায়, তাহলে ওদের ওপর তার কি পরিমাণ প্রভাব পড়বে? এই হল নবীর উন্নত চরিত্র মু'জিযা, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের নমুনা যা বিশ্বকে অভিভূত ও আলোড়িত করেছে। সকলকে তিনি আপন গুণে মুগ্ধ করেছেন।

টিকাঃ
১. এই ছিল মহানবীর ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ সমৃদ্ধ সমরনীতি ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যার ফলে আরব জাহানসহ অর্ধ শতাব্দীর মত সময়ের এ ক্ষুদ্র পরিসরে অর্ধেক বিশ্ব ইসলামের ছায়াতলে এসে যায়, সর্বত্র ইসলামের পতাকা উড়তে থাকে। তৎকালীন আরবে গোত্রবাদ, স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা ইত্যাদি কুসংস্কার প্রথা এত প্রবল ছিল, যা বিশ্বের অন্য কোথাও দৃষ্টিগোচর হত না। প্রত্যেক গোত্রের দেবতা ছিল স্বতন্ত্র। গোত্রপ্রীতির মুকাবিলায় ন্যায়-নীতি এমনকি মানবতা পর্যন্ত ছিল উপেক্ষিত। স্বগোত্রীয়ের অন্যায় অপরাধ যত মারাত্মকই হোক অন্য গোত্রের মুকাবিলায় কোন অপরাধ হিসেবে গণ্য হত না বা এর কোন শাস্তি কিংবা প্রতিকারও ছিল না। যার ফলে তৎকালীন বৃহৎ শক্তি পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের পক্ষে এখানে স্থায়ী প্রভুত্ব কায়েম করা সম্ভব হয়নি। অপরপক্ষে দেশীয় বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে ঐক্য সূত্রে আবদ্ধ করে কোন একক শক্তির অধীনে রাষ্ট্র গঠন করাও কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। বস্তুত গোত্রবাদের বদ্ধমূল ভ্রান্ত ধারণাই ছিল আরবদের ঐক্যের মূল অন্তরায়। সেই ভয়াবহ গোত্রবাদের একটি চিত্রই পবিত্র কুরআন মহানবী (সা) কে সম্বোধনের মধ্যদিয়ে তুলে ধরেছে। لَوْ أَنْفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مَا أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ - إِنَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (سورة انفال)
ইরশাদ হচ্ছে- "সারা বিশ্বের সকল ধনভাণ্ডার ব্যয় করলেও আপনি তাদের অন্তরে ঐক্য ও সম্প্রীতির ভাব সৃষ্টি করতে পারবেন না, কিন্তু একমাত্র আল্লাহই তাদের হৃদয়ে সৌহার্দানুরাগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই তিনি প্রবল পরাক্রমশালী এবং প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আনফাল)
প্রকৃতপক্ষে সমকালীন বিশ্বে গোত্রবাদী ধ্যান-ধারণা একমাত্র আরব ভূখণ্ডেই আক্ষরিক অর্থে কার্যকর ছিল, যার ফলে এ অঞ্চল কখনো পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যে বিলীন হয়নি। আর হলেও তা ছিল সাময়িক ব্যাপার। তাই কোন বৃহৎ শক্তি এতদঞ্চলে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়নি। অপরপক্ষে তারা নিজেরাও কোন স্বাধীন শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারেনি। মহানবী (সা) বাল্যকাল থেকেই জনগণের মধ্যে 'আল আমীন' বিশেষণে খ্যাতিমান ছিলেন। এটা ছিল তাঁকে দেয়া জনগণের সর্বসম্মত উপাধি। সকলের প্রতিই ছিল তাঁর অভিন্ন আচরণ। মদীনায় হিজরতের পর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর উপর খিলাফতের দায়িত্ব অর্পিত হয়। মাত্র ৪/৫ বছরের ব্যবধানে পরস্পর বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে তিনি ঐক্যের প্রীতিডোরে আবদ্ধ করতে সক্ষম হন এবং তাঁর মহান নেতৃত্বে জাহিলী যুগের গোত্রবাদের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে গোটা সমাজ সকল গোত্র এক দেহে এক আত্মায় বিলীন হয়ে যায়। এ ঐক্য-শৃংখলা বলেই রোম পারস্য সাম্রাজ্য ইসলামী আধিপত্যের সামনে লুটিয়ে পড়তে বাধ্য হয়।
এখানে বিশেষ লক্ষণীয় যে, উহুদের ময়দানে হযরত হামযার শহীদী লাশে কাফিরদের কৃত 'মুছলার' লোমহর্ষক দৃশ্য লক্ষ্য করে ব্যথিত প্রাণে মহানবীর যবান মুবারক থেকে বেরিয়ে আসে- "সুযোগ পেলে আমরাও অনুরূপ আচরণ করবো" এরি প্রেক্ষিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে সম্বোধন করে বলা হয়- অতঃপর পূর্ণ শান-শওকতের সাথেই মক্কা বিজয় হয়। আর বিজয়ীর বেশে তথায় তিনি প্রবেশ করেন। বিজিত কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে সে নবীরই দরবারে পেশ করা হয়, যাদের অত্যাচারে তিনি জর্জরিত, এমনকি দেশ ছাড়া হন। বন্দীদের মধ্যে সে ব্যক্তিও রয়েছে, যে নামাযে সিজদারত নবীর পিঠে উটের ভুঁড়ি তুলে দিয়েছিল, হিজরত করে আবিসিনীয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর নিকট আশ্রয় গ্রহণকারী मुसलमानों বিরুদ্ধে কুরাইশদের পক্ষ থেকে যেসব কর্মকর্তা আবিসিনিয়া গমন করেছিল, তারাও আজ হাজির। কালিমা তাওহীদের ওয়াজ করার কারণে হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা) কে আঘাতের চোটে জখমকারী এবং দারুন্নাদওয়ার মিলনায়তনে এক পরামর্শ সভায় মহানবীকে (সা) হত্যার প্রস্তাবকারী ও হত্যার চুক্তিনামায় শরীক ব্যক্তি তিনবছর ব্যাপী মহানবীকে (সা) "শাবে আবূ তালিবে" নযরবন্দী করে রাখার নায়করা, প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগে বাধ্যকারী জালিমরা, বদর, উহুদ ও খন্দক যুদ্ধে যোগদানকারী কাফিররা, হযরত হামজার ঘাতক 'মুছলা'কারী পাপিষ্ঠ, নবীর বিরুদ্ধে আরব গোত্রসমূহকে উস্কানী দানকারী এবং ইসলাম ও নবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের হোতারা মোটকথা হযরতের প্রাণের শত্রুরা আজ বন্দী অবস্থায় মহানবীর দরবারে যুদ্ধ অপরাধী হিসাবে নতশিরে উপস্থিত, অথচ বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করা সত্ত্বেও মহানবী (সা)-এর কন্ঠে এসব হত্যাযোগ্য অপরাধীদের সম্পর্কে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে-
مَنْ دَخَلَ دَارَ أَبِي سُفْيَانَ فَهُوَ أَمِنْ وَمَنْ أَغْلَقَ عَلَيْهِ بَابَهُ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَهُوَ آمِنٌ -
“যে ব্যক্তি আবূ সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি নিজ গৃহের দরজা বন্ধ করে দিবে এবং যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করবে এদেরকেও নিরাপত্তা দেয়া হলো।" অতঃপর কা'বা শরীফের দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন-
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ صَدَقَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ - أَلَا كُلُّ مَاشِرٍ أَوْ دَمٍ وَمَالِ يُدْعَى بِهِ فَهُوَ تَحْتَ قَدَمَيَّ هَاتَيْنِ إِلَّا سِدَانَةَ الْبَيْتِ وَسِقَايَةَ الْحَاجِّ -
"আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই, তিনি একক, যাঁর কোনো শরীক নাই, নিজের ওয়াদা তিনি সত্যে পরিণত করেছেন, স্বীয় বান্দাকে তিনি সাহায্য করেছেন আর একাই তিনি সকল গোত্রকে পরাজিত করেছেন। হুশিয়ার! সকল রক্তমূল্য অথবা খুন কিংবা দাবীযোগ্য সম্পদ আমার এ দু'পায়ের নীচে (দাবিয়ে দেয়া হল)। তবে বায়তুল্লাহর চাবি রক্ষণ এবং হাজীদের পানি পান করানোর খিদমতের দায়িত্ব সাবেক ব্যক্তিদের কাছেই।"
অতঃপর অতি গম্ভীর স্বরে মক্কার কুরাইশদেরকে সম্বোধন করে মহানবী ঘোষণা করলেন- يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ مَا تَظُنُّونَ أَنِّي فَاعِلٌ بِكُمْ؟
"হে কুরাইশগণ! আমার থেকে তোমরা আজ কি ধরনের ব্যবহার প্রত্যাশা করো?
জবাবে কুরাইশরা বলল- উত্তম, কারণ আপনি আমাদের দয়ালু ভাই এবং সম্ভ্রান্ত ভ্রাতুষ্পুত্র। তাদের জবাবে মহানবী (সা) তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণায় বললেন - إِذْهَبُوا فَانْتُمْ الطُّلَقَاءُ "যাও তোমরা সবাই আজ মুক্ত- স্বাধীন।" তাঁর এ দয়া ও অনুগ্রহ মানব জাতির গৌরবের বিষয়। তাদের সে অতীত দুষ্কর্মের প্রতিশোধ তিনি কিভাবে গ্রহণ করেছেন।
এই হল মহানবীর দয়া অনুগ্রহ, ইসলামী খিলাফতের অগ্রনায়কের খোদাভীতি, যা মানব জাতির জন্য উত্তম আদর্শ ও চিরস্থায়ী মুক্তি সনদ। اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلَّمْ وَبَارِكْ عَلَيْهِ -

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 সরকার বা রাষ্ট্র প্রধান হত্যাকারীদের শাস্তি প্রসঙ্গ

📄 সরকার বা রাষ্ট্র প্রধান হত্যাকারীদের শাস্তি প্রসঙ্গ


সুলতান বা খলীফাকে হত্যাকারী মুহারিব, তার উপর হদ্দ জারী করা হবে না কি নিষ্পত্তির ভার ওয়ারিশদের হাতে ন্যস্ত করা হবে, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কিংবা তাঁর প্রতিনিধি যদি হত্যাকারীকে তলব করে, কিন্তু গোত্রীয় বা দলীয় লোকেরা তার সাহায্যে এগিয়ে আসে আর সংঘর্ষের জন্য তারা প্রস্তুত হতে থাকে, এমতাবস্থায় ইসলামী আইনবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে, হত্যাকারী ও তার সহযোগী পক্ষালম্বনকারীদের পরাজিত ও গ্রেফতার না করা পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ করা মুসলমানদের উপর ফরয।
সুলতান, নায়েবে সুলতান, রাষ্ট্রপতি, সরকার প্রধান অথবা হাকিম, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যাকারীর উপর ন্যায় নীতির অধীন হদ্দ জারী করার উদ্দেশ্যে তাকে যদি আদালতে তলব করেন, সে সময় হত্যাকারীর সমর্থনকারীরা সংঘর্ষে লিপ্ত হতে প্রস্তুতি নিলে, এমতাবস্থায়' তাদের বিরুদ্ধে (সরকারী বাহিনীর সমর্থনে) জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়া সকল মুসলমানের উপর ফরয। যতক্ষণ পর্যন্ত না এরা পরাস্ত হয়, লড়াই অব্যাহত রাখবে। এ ব্যাপারে সর্বস্তরের ইসলামী আইনবিদগণ অভিন্ন মত পোষণ করেন। মৃত্যুদণ্ড ছাড়া এরা বশ্যতা স্বীকার না করলে যেভাবে সম্ভব এদেরকে দমন করতেই হবে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে হত্যাকারীর সমর্থনকারীগণসহ ব্যাপক হারে এসব বিদ্রোহীকে প্রাণদণ্ড দিতে হবে। কেননা সেটা ছিল হদ্দ জারী করার প্রশ্ন আর এটা হল ইসলামের বিরুদ্ধে মুকাবিলা। কাজেই এটা রীতিমত জিহাদ বিধায় এর গুরুত্ব অধিক। সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করে দলবদ্ধ হয়ে এরা ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে, ক্ষেতের ফসল ধ্বংস ও প্রাণহানি ঘটিয়ে সমাজ বিধ্বংসী কার্যে এরা লিপ্ত। দ্বীন কায়েম করা কিংবা দেশের খিদমত করা এদের উদ্দেশ্য নয়। এরা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত লোকদেরই সমপর্যায়ের, যারা দুর্গ, শৈলচূড়া কিংবা উপত্যকায় পার্টি করে পথিকদের সর্বস্ব লুণ্ঠন করে, অন্যায় হত্যাকাণ্ড চালায়। বাদশাহ বা হাকিম, শাসনকর্তা অথবা সৈন্যবাহিনী যদি তাদের আনুগত্যের আহ্বান জানায় এবং তওবা করতে, ক্ষমা চাইতে, মুসলমানদের দলভুক্ত হতে ও হদ্দ জারীর উদ্দেশ্যে তাদের বলে, জবাবে তারা যুদ্ধ শুরু করে দেয়। আত্মরক্ষার পদক্ষেপ নেয়। তাদের অবস্থা হজ্জযাত্রী এবং পথচারীদের মালামাল লুণ্ঠনকারীদের ন্যায় অথবা পাহাড়ের টিলায় ওঁৎ পেতে বসে থাকা দস্যু-ডাকাতদের অনুরূপ কিংবা ছিনতাইকারী ব্যক্তিদের ন্যায় অপর দেশগামী যাত্রীদের উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও এদের সাথে মুকাবিলা আর কাফিরদের সাথে মুকাবিলা এক কথা নয়। কেননা এরা কাফির নয়। এরা পরস্ব লুণ্ঠন করার পূর্বে এদের সম্পদ লুট করা বৈধ নয়। আর তারা যদি লুণ্ঠন করেও, তবে তাদের কাছ থেকে সমপরিমাণ ক্ষতি পূরণ আদায় করতে হবে, যদি লুণ্ঠনকারীকে চিহ্নিত করা সম্ভব না হয়। কিন্তু যদি প্রকৃত লুণ্ঠনকারী চিহ্নিত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে লুণ্ঠনকারী ও তার সাহায্যকারী সবাই সমপর্যায়ের অপরাধী যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে। সুতরাং লুণ্ঠনকারী নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে লুটকৃত মালের সমপরিমাণ মাল জরিমানাস্বরূপ তার কাছ থেকে আদায় করা হবে। অন্যথায় তার স্বগোত্রীয় বিত্তবানদের উপর তার দায়িত্ব বর্তাবে। কিন্তু তাদের থেকে যদি জরিমানার অর্থ আদায় করা কঠিন হয়, তবে জাতির স্বার্থে তাদের সঙ্গে যুদ্ধরত সৈনিকদের মাসিক বেতন ধার্য করে দিতে হবে। কেননা এ যুদ্ধ ইকামতে হদ্দ এবং সামাজিক বিপর্যয় রোধ করার লক্ষ্যে করা হচ্ছে। ইসলাম ও গণদুশমনদের কেউ গুরুতর জখমী হলে তার চিকিৎসার দায়িত্ব তাদের। মরে তো বিনা ঔষধে মরুক। এরা পালিয়ে গেলে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশংকা না থাকলে পশ্চাদ্ধাবন করার প্রয়োজন নেই। অবশ্য যদি কারো উপর হদ্দ জারী করা ওয়াজিব হয় অথবা জনগণের নিরাপত্তা হুমকীর সম্মুখীন হওয়ার আশংকা দেখা দেয় তবে, তাদের পশ্চাদ্ধাবন করা অপরিহার্য।
এদের মধ্যে যারা বন্দী হয়ে আসে, অন্যদের ন্যায় তাদের উপর হদ্দ জারী করতে হবে। কোন কোন ফকীহ্ আরো কঠোর নীতি অবলম্বনের পক্ষপাতি যে, এদের থেকে গনীমতের মাল আদায় করে তা থেকে খুমুস বা পঞ্চমাংশ পৃথক করা বিধেয়। কিন্তু অধিকাংশ ফকীহ্ এ মতের বিরোধী। কিন্তু তারা যদি ইসলামী রাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোন দেশে আশ্রয় নেয় আর সেখানে বসে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সক্রিয় চক্রান্তে অংশ নেয়, তাহলে مسلمانوں বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণের অপরাধে তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।
একদল লোক ডাকাতি রাহাজানী তো করে না কিন্তু কাফিলার পাহারাদারী ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে পথচারী মুসাফিরদের কাছ থেকে জনপ্রতি ও উট ইত্যাদি পশুর মাথাপিছু নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায় করে থাকে, এটা শুল্কের পর্যায়ভুক্ত। সুতরাং তাদেরকে অন্যায় শুল্ক উসূলকারীদের ন্যায় শাস্তি দিতে হবে। এ জাতীয় অপরাধীদের হত্যার ব্যাপারে ইসলামী আইনবিদদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। কেননা এরা ডাকাত ও রাহযান ছিনতাইকারী নয়, অথচ এদের ছাড়াও রাস্তা যাতায়াত পথ নিরাপদ থাকে। এরা- أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ (কিয়ামতের দিন কঠোর সাজা প্রাপ্ত হবে।)
নবী করীম (সা) জনৈকা গামেদিয়া মহিলা সম্পর্কে বলেছেন- لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ تَابَهَا صَاحِبُ مَكْسٍ لَغْفِرَ لَهُ -
“সে এমন তওবাই করেছে যদি জঙ্গী কর আদায়কারীরা এরূপ তওবা করতো তবে তারাও ক্ষমা পেয়ে যেতো।"
আর যাদের মাল-সম্পদ উদ্ধারে মুসলিম বাহিনী মুহারিবদের সাথে যুদ্ধরত তাদের জন্য অর্থ ব্যয় আদৌ করা যাবে না, যতক্ষণ যুদ্ধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়। মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন- مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ - وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دَمِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ - وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ حُرْمَتِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ .
"মালের হিফাজতে যে ব্যক্তি নিহত হয় সে শহীদ, যে ব্যক্তি প্রাণ রক্ষার্থে নিহত হয় সে শহীদ, যে ব্যক্তি দ্বীন রক্ষার্থে নিহিত হয় সে শহীদ, আর যে ব্যক্তি নিজ পরিবারের মান-সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে কতল হয়, সেও শহীদ।"
ফকীহগণ এক্ষেত্রে الصائل শব্দটি ব্যবহার করেছেন যার অর্থ হলো, তাবীল বা রাষ্ট্রীয় শক্তি ছাড়া জুলুমকারী।
যুদ্ধ ছাড়া এদের দমন করা সম্ভব না হলে অগত্যা যুদ্ধেরই আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু সংঘর্ষে না জড়িয়ে সংশোধনকল্পে কিছু অর্থ ব্যয়ে যদি এদের এই খারাপ পথ থেকে ফেরানো যায়, তবে এটাও জায়েয।
কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য যদি হয় কারো সম্মানে আঘাত করা, কারো মা-বোন, স্ত্রী-কন্যা ইত্যাদির সম্ভ্রম বিনষ্ট করা অথবা কোন মহিলা কিংবা বালকের সাথে কুকর্ম করা, তবে প্রাণ-সম্পদ সব দিয়ে হলেও এদের মুকাবিলা করতে হবে। এমনকি প্রয়োজন হলে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করতে হবে। অর্থাৎ, কোন অবস্থাতেই এ ধরনের পাপাচারের সুযোগ দেয়া যাবে না। কিন্তু যদি অর্থের বিনিময়ে উদ্দেশ্য সফল করা যায়, তবে সেটা জায়েয। তবুও নিজের কিংবা মহিলাদের সম্ভ্রম নষ্টের বিষয়টি সহ্য করা যাবে না।
আর যদি তার উদ্দেশ্য হয় কাউকে হত্যা করা, তবে তো প্রাণ রক্ষা অবশ্যই জরুরী এবং আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
এ সম্পর্কে উলামা, ইমাম আহমদ এবং অন্যান্যদের মযহাবে দু'ধরনের মতামত পরিলক্ষিত হয়। এটা দেশের সুলতান বা শাসনকর্তা বিদ্যমান থাকাকালীন সামরিক ব্যবস্থা মাত্র। কিন্তু "আল্লাহ না করুন" যদি দু'জন শাসনকর্তার ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণে দেশে বিরাট ফিৎনার সৃষ্টি হয়, এমন অবস্থায় কোনো পক্ষে যোগদান না করে জনগণের উচিত নিরপেক্ষতা অবলম্বন করা। এ সম্পর্কে ইমাম আহমদসহ অন্যান্য মযহাবে দু'ধরনের মত রয়েছে।
বাদশাহ চোর, গুণ্ডা, ডাকাত, লুটেরাদেরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে লুণ্ঠিত মালামাল এদের থেকে উসূল করে প্রকৃত মালিককে তা ফেরত দিতে হবে এবং এদের উপর হদ্দ জারী করতে হবে। চোরের বেলায়ও একই হুকুম। সঠিক প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনে প্রহার করে সাজা দিয়ে এদের থেকে চোরাই মাল উদ্ধার করে মালিককে ফেরত দেবে এবং এদেরকে জেলখানায় বন্দী করে রাখবে। অতঃপর এরা উকিল দ্বারা লুণ্ঠিত মাল হাজির করবে অথবা মাল কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে সন্ধান দেবে। পাওনাদারদের প্রাপ্য আদায় না করাতে যেরূপ শাস্তি দেয়া হয়, এদের বেলায়ও একই শাস্তি দিতে হবে। অনুরূপভাবে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের হক আদায় করতে অস্বীকার করলে কিংবা স্ত্রী অবাধ্য হলে, শরীয়তে শাস্তির বিধান থাকবে, এক্ষেত্রেও তাই। বরং এরা হকদারের হক আদায় না করার কারণে অধিকতর শাস্তির যোগ্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও অপরাধীকে ক্ষমা করার অধিকার মালিকের থাকবে, সুবিধাজনক বিবেচনায় তিনি সাজাও মাফ করে দিতে পারেন। অবশ্য হদ্দের ব্যাপার অন্যরকম। হদ্দ জারী করতে বাধা দেয়া বা ক্ষমার অধিকার কারো নেই। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত অকাট্য বিধান।
ইমাম বা হাকিমের কর্তব্য হল চোরাই মাল বিনষ্ট করে ফেললে চোরের নিকট থেকে ক্ষতি পূরণ আদায় করা। যেমন, গোমকারীর নিকট থেকে যেমনিভাবে ক্ষতি পূরণ আদায় করা হয়। ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমদ এ মতের সমর্থনকারী। কিন্তু অপারগ অবস্থায় তাকে সময় দিতে হবে। কেউ বলেছেন- জরিমানা ও হাত কাটা একই সাথে দুটো চলতে পারে না। ইমাম আবূ হানীফা (রহ)-এর সমর্থক। কারো মতে, জরিমানার হুকুম কেবল আর্থিক সচ্ছলতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইমাম মালিক (রহ) এর সমর্থক। চোর, ডাকাতের মুকাবিলা কিংবা মাল অনুসন্ধান করার খরচ পত্র, বিনিময় ইত্যাদি মালিকের কাছ থেকে আদায় করা সরকারের জন্য জায়েয নয়। সরকারী কর্তৃপক্ষ নিজের অথবা সৈন্যদের জন্য কোনক্রমেই মালিককে বিনিময় আদায়ের জন্য চাপ দেয়া জায়েয নয়। বরং তাদের মুকাবিলা করা জিহাদতুল্য। কাজেই যে খাত থেকে জিহাদের ব্যয় নির্বাহ করা হয়, এক্ষেত্রেও একই খাত থেকে খরচ বহন করতে হবে। মুজাহিদগনকে যদি জমাজমি দেয়া হয়ে থাকে কিংবা সরকার থেকে তাদের বেতন ধার্য করা থাকে তবে তাই যথেষ্ট, নতুবা বায়তুল মাল থেকে তাদের প্রয়োজন মিটানো হবে। কেননা এটাও “জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর” অন্তর্ভুক্ত।
যাকাত অনাদয়কারী কোন মুসাফির যদি ঘটনাচক্রে চোরের সাথে বন্দী হয়ে আসে, তবে তার নিকট থেকে যাকাত আদায় করে আলোচ্য জিহাদে খরচ করতে হবে, যেমন ডাকাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সৈন্যদের পিছনে ব্যয় করা হয়।
এরা শক্তিশালী হওয়ার ফলে এদের মন জয়ের উদ্দেশ্যে আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন দেখা দিলে 'ফাঈ' এবং যাকাত তহবিল থেকে কেবল সরদারদেরকে এ শর্তে দিতে হবে যে, হয় বাকীদের হাজির করবে, না হয় সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ ছেড়ে দেবে। ইমামের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা করা জায়েয। কেননা এর ফলে তাদের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। আর এরা “মুয়াল্লাফাতুল কুলূবের” পর্যায়ভুক্ত হবে। কুরআন, হাদীস, শরীয়তের মূলনীতি, ইমাম আহমদ এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ইমামগণ এর সমর্থনকারী।
চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসবাদী এদের মুকাবিলায় দুর্বল, মুসাফির, ব্যবসায়ী এবং ধনী লোকদের প্রেরণ করা উচিত নয়। বরং শাসনকর্তার উচিত হল, বিত্তশালীদের থেকে আর্থিক সাহায্য নেয়া আর শক্তিশালী, সাহসী ও বিশ্বাসী লোকদের এ কাজে পাঠানো। কিন্তু যদি এ ধরনের লোক পাওয়া না যায়, তবে অবশ্য বিকল্প চিন্তা করা যেতে পারে।
কোন কোন সরকারী কর্মকর্তা, নেতা, উপনেতা, সরদার, শাসনকর্তা এবং উচ্চ পদস্থ সামরিক অফিসার কি প্রকাশ্যে বা গোপনে সন্ত্রাসবাদী, সমাজ বিরোধী চোর ডাকাতদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সমর্থন পৃষ্ঠপোষকতা করে এদের লুন্ঠিত মালের একটা অংশ হাতিয়ে নেয়। এরা ফরিয়াদীকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে রাজী করিয়ে নেয়, বাধ্য হয়ে তারাও রাজী হয়ে যায়। এটা একটা গুরুতর অপরাধ। এরা চোর, ডাকাতের সরদারের চাইতেও মারাত্মক অপরাধী। কেননা, তাদেরকে দমন করা সম্ভব কিন্তু এদের দমন করা কঠিন।
সুতরাং এদের সম্পর্কে বিধান হলো- সমাজ বিরোধীদের সমর্থনের দায়ে এরাও শাস্তিযোগ্য অপরাধে অপরাধী। তাই ডাকাতরা খুন করলে হযরত উমর (রা) এবং অধিকাংশ আলিমের মতে এদেরকেও প্রাণদণ্ড দিতে হবে। আর ডাকাতরা মাল লুট করলে এদেরও ডান হাত-বাম পা কাটা যাবে। যদি তারা খুন এবং লুট উভয় অপরাধে জড়িত থাকে, তবে এদেরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে শূলীতে চড়াতে হবে।
একদল আলিমের মতে এদের হাত-পা কেটে, কতল করে, অতঃপর শূলে ঝুলাতে হবে। কারো মতে কতল অথবা শূলী দুটার যে কোন একটা করার ইখতিয়ার রয়েছে। কেননা কার্যতঃ যদিও এরা লুণ্ঠন বা ডাকাতিতে অংশ নেয়নি কিংবা প্রকাশ্য অনুমিত দেয়নি কিন্তু লুণ্ঠিত মালে ভাগ বসিয়েছে। আর ধৃত হওয়ার পর শরীয়তের বিধান এদের হুকুম বানচাল করে ব্যক্তিগত স্বার্থে অর্থের লোভে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। অথচ তাদের উপর হদ্দ জারী করা ওয়াজিব ছিল। আর আল্লাহ ও বান্দার হক আদায় করা ফরয। তাদেরকে আশ্রয় দিতে ও আশ্রয় দিয়ে হত্যা ও লুণ্ঠনে এরা সমভাবে শরীক রয়েছে। তাই এরাও অপরাধী যাদের সম্পর্কে আল্লাহ ও রাসূলের অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে। সুতরাং হযরত আলী (রা)-এর রেওয়ায়েতক্রমে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেন-
لَعَنَ اللَّهُ مَنْ أَحْدَثَ حَدَثًا أَوْ أَرَى مُحْدِثًا -
"অপরাধ। গুনাহগার এবং অপরাধকারীর আশ্রয়দাতা, এদের উপর আল্লাহ লানত করেছেন।"
কোন লোক সমাজ বিরোধীকে আশ্রয় দিয়েছে বলে যদি প্রমাণিত হয় তবে অপরাধীকে উপস্থিত করার অথবা তার অবস্থান নির্দেশ করার জন্য আশ্রয়দাতার প্রতি নির্দেশ দিতে হবে। যদি নির্দেশ সে যথাযথ পালন করে, তবে উত্তম নতুবা অপরাধী গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত তাকে আটক রেখে তার অবস্থান জানার জন্য প্রয়োজন সাপেক্ষে প্রহার, দৈহিক নির্যাতন চালানো অবৈধ নয়। উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, এমন লোককে সাজা দেয়া ব্যতীত গত্যন্তর নেই যে ব্যক্তি ওয়াজিব মাল আদায় করতে বাধা দেয় অথবা টালবাহানা করে।
প্রার্থিত ধন কিংবা জনের অবস্থান সম্পর্কে যে ব্যক্তি জ্ঞাত, এ সংবাদ প্রকাশ করে দেয়া তার উপর ওয়াজিব। গোপন রাখা তার জন্য আদৌ জায়েয নয়। কেননা প্রকৃতপক্ষে এটা সৎকাজে সহযোগিতার শামিল আর তাকওয়া ও সৎকাজে সহযোগিতা করা ওয়াজিব। পক্ষান্তরে যদি অন্যায়ভাবে জুলুম অত্যাচারের উদ্দেশ্যে কারো জানমালের তথ্য তালাশ করা হয়, তবে এ সংবাদ প্রকাশ করা আদৌ জায়েয নয় কারণ মূলত এটা হল পাপ ও অসৎকাজে সাহায্য করার নামান্তর। বরং এ সংবাদ গোপন রাখা এবং প্রতিহত করা ওয়াজিব। কারণ মজলুমের সাহায্য করা ওয়াজিব। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেন-
اُنْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنْصُرُ مَظْلُومًا فَكَيْفَ أَنْصُرْ ظَالِمًا ؟ قَالَ تَمْنَعُهُ مِنَ الظُّلْمِ فَذَالِكَ نَصْرُكَ إِيَّاهُ -
“তুমি তোমার জালিম কিংবা মজলুম ভাইয়ের সাহায্য কর। আমি বললাম : হে রাসূলুল্লাহ (সা)! মজলুম ভাইয়ের সাহায্য তো যথার্থ। কিন্তু জালিমের সাহায্য কিরূপে করব? তিনি বললেন : তাকে জুলুম করা থেকে বাধা দাও, এটাই তাকে তোমার সাহায্য করা।” (বুখারী, মুসলিম)
হযরত বারা ইবনে আযিব (রা) থেকে বুখারী, মুসলিমে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সা) আমাকে সাতটি জিনিসের হুকুম করেছেন এবং সাত বিষয়ে নিষেধ করেছেন। আমাকে হুকুম দিয়েছেন : রোগীর শুশ্রূষা করতে, জানাযায় শরীক হতে, হাঁচির জবাব দিতে, কসম পূর্ণ করতে, দাওয়াত কবুল করতে এবং মজলুমের সাহায্য করতে। আর স্বর্ণের আংটি ব্যবহার, রূপার পাত্রে পান, মোটা, মিহিন, চিকন তথা যাবতীয় রেশমী কাপড় পরিধান এবং জুয়া খেলতে নিষেধ করেছেন।
মোটকথা, অপরাধীর অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তি সূত্র জানাতে অস্বীকার করলে, তা না জানানো পর্যন্ত তাকে আটক রাখা অথবা অন্য কোন সাজা দেয়া জায়েয। কিন্তু সাজার পূর্বে এটা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হতে হবে যে, ঠিকানা তার জানা আছে। 'গভর্ণর' বিচারপতি এবং সংশ্লিষ্ট সবাই গুরুত্বসহকারে এমনভাবে এ হুকুম পালন করবে যে, এ ধরনের জ্ঞাত ব্যক্তিকে সাজা দেয়ার পূর্বে নিখুঁত তদন্তের মাধ্যমে অবশ্যই প্রমাণ করে নিতে হবে যে, গোপন তথ্য সে জানে। বিষয়টা এমন নয় যে, জানিয়ে দেয়া কেবল তারই উপর ওয়াজিব ছিল, তোমাদের দায়িত্ব পালন তোমাদের উপর ওয়াজিব ছিল না, অথবা এমন নয় যে; একের সাজা অপরকে দিতে হবে। কেননা কুরআনে বলা হয়েছে-
- الأَتَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
"কোন গুনাহগার অপরের গুনাহ্ বোঝা বহন করবে না।" (সূরা নজম : ৩৮)
মহানবী (সা) বলেছেন- اَلا لَا يَجْزِى جَانُ الْاً عَلَى نَفْسِهِ “জেনে রাখবে, প্রত্যেক গুনাহগার নিজের জন্যই গুনাহ করে থাকে।” অর্থাৎ এর কুফল তার নিজেকেই ভোগ করতে হবে।
এর দৃষ্টান্ত, যেমন এক ব্যক্তি কারো জামিন বা উকিলও হয়নি এবং তার কাছ থেকে আদায় করার মতো এমন কোন মালও নাই, এমন লোকের নিকট টাকা দাবী করা অথবা নিজ আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশীর কৃত অপরাধের কারণে কাউকে শাস্তি দেয়া অথচ কোন ওয়াজিব তরকের সে অপরাধী নয়, হারাম কাজও সে করেনি, জালিমের ঠিকানা প্রকৃতই তার জানা নাই। কাজেই তাকে সাজা দেয়া জায়েয নয়। সাজা তারই প্রাপ্য, যে প্রকৃত অপরাধী। অবশ্য জানা থাকলে প্রকাশ করা তার উপর ওয়াজিব। এ সহযোগিতা কুরআন, হাদীস ও ইজমার ভিত্তিতে তার উপর ওয়াজিব। আর সাম্প্রদায়িক, গোত্রবাদী লোকদের ন্যায় সে যদি জালিমের অন্যায় সহযোগিতা, আনুকূল্য অথবা তার ভয়ে ঠিকানা প্রকাশ করতে অস্বীকার করে কিংবা বিরত থাকে অথবা মজলুমের সাথে ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে তথ্য গোপন করে, তাহলে এমর্মে আল্লাহ্র ইরশাদ নিম্নরূপ-
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى أَنْ لَا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوى - (سورة مائدة : ٨)
"কোনো মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ স্পৃহা যেন তোমাদের বেইনসাফীর কারণ না হয়। তোমরা ইনসাফ করবে, কেননা ন্যায়পরায়ণতা তাকওয়া-খোদাভীতির সাথে সম্পৃক্ত।” (সূরা মায়েদা : ৮)
অথবা এও হতে পারে যে, ইনসাফ কায়েম করতে, ভীরুতাবশত দ্বীনের সহযোগিতা করতে অভিযুক্ত অস্বীকার করছে কিংবা আল্লাহর দ্বীনকে হেয় করার উদ্দেশ্যে সে অস্বীকার করছে যেমন ধর্ম বিমুখ লোকেরা করে থাকে। এদেরকে যখন বলা হয়- চল আল্লাহর পথে জিহাদ করতে তখন এরা নিস্পৃহ হয়ে মাটিতে বসে যায়। মোটকথা, এমন সব লোক সর্বস্তরের আলিমগণের মতে শাস্তিযোগ্য।
এ পথে সক্রিয় ব্যক্তিরা আল্লাহর নির্ধারিত হদ্দ এবং বান্দার হক বিনষ্ট করে। নিজেদের বল শক্তি, শৌর্য-বীর্যে দুর্বল এসব লোক সেই ব্যক্তির ন্যায়, যার নিকট জুলুমবাজ ও ধোকাবাজের মালামাল রয়েছে অথচ দ্বীনি দায়িত্ব পালনরত ন্যায়পরায়ণ হাকিম ও শাসকের হাতে সে তা সোপর্দ করছে না। ফলে এর অসহযোগিতার কারণে তাঁরা তাদের কর্তব্য সম্পাদনে বাধা প্রাপ্ত হচ্ছেন। কাজেই এরা শাস্তিযোগ্য অপরাধী।
কিন্তু তার সংবাদ না দেয়া বা অপরাধী বা অপহৃত মাল হাজির না করার কারণ এই যে, তলবকারী নিজে তার উপর জুলুম-অত্যাচার চালাবে। অন্যথায় সে একজন জনহিতৈষী ও সৎকর্মশীল ব্যক্তি, তবে এটা চিহ্নিত করা সুকঠিন যে, অবৈধ সহযোগিতা কোনটা আর জুলুম-অত্যাচার থেকে বাঁচার প্রেরণায় উদ্ভূত পরিস্থিতি কোনটা। সন্দেহ এবং রিপুর তাড়না উভয়টি একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা এখানে বর্তমান। কাজেই সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করা হাকিমের কর্তব্য।
গ্রাম্য কিংবা শহুরে বিত্তবানদের মধ্যেই সাধারণতঃ এ অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে। আত্মীয় বন্ধু কিংবা কোন আশ্রয় প্রার্থী তাদের সাহায্য কামনা করলেই তাদের অন্তরে এ অন্যায় পক্ষপাতিত্বের আগুন জ্বলে উঠে। তদুপরি সমাজের চরিত্রহীন লোকদের মহলে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি কায়েমের লালসাই তাদেরকে এ অন্যায় কাজে উৎসাহিত করে। কাজেই জালিম মজলুম উভয়ের ন্যায্য অধিকার, বৈধ পাওনা তারা নস্যাৎ করে দেয়। বিশেষতঃ মজলুম যদি তাদের নিজেদের সমকক্ষ কোন বিত্তশালী হয়, তবে আশ্রয় প্রার্থীকে সোপর্দ করা তার নিজের জন্য অপমানকর এবং আত্মসম্মানের পরিপন্থী বলে সে বিবেচনা করে। অথচ এটা মূর্খতাপ্রসূত জাহেলী চিন্তার অবৈধ ফসল। বস্তুতঃ এরাই হল দ্বীন ও দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে বিপর্যয় সৃষ্টির মূল উৎস। বর্ণিত আছে, জাহেলী যুগের অধিকাংশ যুদ্ধ, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এ কারণেই সংঘটিত হয়েছে। স্বজনপ্রীতি ও গোত্রবাদের প্রেরণাই বনু বকর ও বনু তাগলিব ইতিহাস খ্যাত “হরবুল বসূস” (বসূস যুদ্ধ) নামক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উৎসাহিত করেছিল। অন্ধযুগীয় গোত্রবাদী চিন্তা ও আত্মাভিমানের অনলশিখা দিয়েই তুর্কী-তাতারী বর্বররা মুসলিম জাহানকে ছারখার করতে সক্ষম হয়েছিল। মাওয়ারা উন্‌ নহর, খুরাসান ইত্যাদির সুলতান বাদশাহদের উপর একই কারণে তাদের প্রভুত্ব কায়েম করার পথ সুগম হয়েছিল। একই জাহেলী, গোত্রবাদ, জাত্যাভিমান ও আভিজাত্যের মিথ্যা জৌলুসের অন্তরালে তারা মুসলিম সাম্রাজ্য গ্রাস করে সহস্র বছরে গড়া মুসলিম সভ্যতাকে ধূলিস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হয়। ইতিহাসে এর অসংখ্য প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে।
যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজেকে হেয় করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদাশালী করেন। যে ব্যক্তি ন্যায় বিচার করে, নিজেকে তুচ্ছ জ্ঞান মনে করে; আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেন। কেননা খোদাভীরু, মুত্তাকী-পরহেযগাররাই আল্লাহর নিকট সম্মানী ও অধিক মর্যাদাবান। কিন্তু যে ব্যক্তি সত্যকে নস্যাৎ, জোর-জুলুম দ্বারা মর্যাদা লাভের প্রয়াস চালায়, সে গুনাহগার-পাপী, আল্লাহ তাকে অপমানিত করেন এবং নিজের কৃত কর্মের দ্বারাই সে লাঞ্ছিত হয়। আল্লাহ বলেন-
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا.
"নিজের সম্মানেরই যে প্রত্যাশী তার জানা উচিত, সম্মান কেবল আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত।” (সূরা ফাতির : ১০)
মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
يَقُولُونَ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلُّ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ.
"কপট বিশ্বাসী মুনাফিকরা বলে, আমরা মদীনায় ফিরে গেলে সেখানকার সম্মানী লোকেরা লাঞ্ছিতদের বের করে দেবে, অথচ প্রকৃত সম্মান, আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদের জন্য, কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।" (সূরা মুনাফিকূন: ৮) এ জাতীয় চরিত্রের লোকদের সম্পর্কে আরো ইরশাদ হচ্ছে-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَى مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ الدُّ الْخِصَامِ. وَإِذَا تَوَلَّى سَعَى فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيْهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْصَ وَالنَّسْلَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادِ إِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللَّهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّهُ بِالْإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمَ. وَلَبِئْسَ الْمِهَادِ. (سورة بقرة : ٢٠٦-٢٠٤)
“হে নবী! কোন কোন লোকের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা আপনার নিকট আকর্ষণীয় মনে হয় আর তারা অন্তরের বাসনা সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী বানায়, অথচ আপনার দুশমনদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে মারাত্মক ঝগড়াটে। আর ফিরে যাওয়ার পর তারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য বিশেষ তৎপর হয়ে ওঠে। ক্ষেতের শস্যাদি, মানুষ ও প্রাণীর বংশধারা বিনষ্ট করতে তারা সক্রিয় হয়ে পড়ে, আর আল্লাহ ফেৎনা-ফাসাদ ভালবাসেন না। এরূপ ব্যক্তিকে যদি বলা হয়, আল্লাহকে ভয় করো, তখন তার অসার অহংকার ও গৌরববোধ তাকে গুনাহে লিপ্ত করে দেয়। সুতরাং এহেন ব্যক্তির জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট, যা অতিশয় মন্দ ও নিকৃষ্ট আবাসস্থল।” (সূরা বাকারা: ২০৪-২০৬)
সুতরাং আশ্রয়প্রার্থী যথার্থই মজলুম কিনা এটা যাচাই করে নেয়া আশ্রয়দাতার কর্তব্য। প্রকৃতই যদি সে নির্যাতিত নিপীড়িত হয় তবে তাকে আশ্রয় দেবে। আর শুধু দাবী করলেই মজলুম প্রমাণিত হয় না বরং এর পিছনে সঠিক কারণ ও কার্যকর ভূমিকা থাকতে হবে। কেননা, অনেক সময় দেখা যায়, এক ব্যক্তি নিজেকে নির্যাতিত বলে কারাচ্ছে অথচ নিজেই সে জালিম অত্যাচারী। এজন্য তার পার্শ্ববর্তী লোকদের নিকট কোনো প্রতিপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রকৃত ঘটনা জেনে নিতে হবে। যদি সে প্রকৃত জালিম বলে অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়, তবে তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে জুলুম থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করবে, বিনম্র ব্যবহার দ্বারা তাকে সৎ পথে আনতে সচেষ্ট হবে, সম্ভব হলে উভয়পক্ষকে ডেকে নিয়ে মীমাংসার উপায় খুঁজবে, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করবে। সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, তাকে রাষ্ট্রীয় আইনের হাতে সোপর্দ করে দেবে।
অবস্থা যদি এমন হয় যে, পক্ষদ্বয়ের প্রত্যেকেই জালিম আবার মজলুমও যেমনটি নফসের গোলাম ও ভোগবাদীরা সচরাচর হয়ে থাকে, যেমন কায়েস ও ইয়ামনী গোত্রসমূহ, শহর ও পল্লীবাসীদের মধ্যে প্রায়শঃ তা লক্ষ্য করা যায়। অথবা পক্ষদ্বয়ের কেউই জালিম নয় কিন্তু কোন সন্দেহের বশবর্তী কিংবা কোন ভুল ব্যাখ্যাজনিত কারণে তারা পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় বিরোধের মূল সমস্যা মীমাংসার চেষ্টা করবে, এমনকি দরকার হলে সালিশের আশ্রয় নিতে হবে। আল্লাহ বলেছেন-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا، فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَى هُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ، فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا. إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ. إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ. (سورة حجرات : ١٠-٩)
“মুমিনদের দু'টি দল যদি পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তাদের বিবাদ মিটিয়ে দাও, আর তাদের এক পক্ষ যদি অপর পক্ষের উপর জুলুম করে, তবে আল্লাহর বিধানের প্রতি প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত জালিম দলের বিরুদ্ধে লড়াই কর। অতঃপর যদি তারা ফিরে আসে তবে, সাম্য ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালবাসেন। মুমিনগণ হচ্ছে পরস্পর ভাই ভাই। তাই নিজের ভাইদের মধ্যে তোমরা মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর, পরিণামে তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হবে।” (সূরা হুজুরাত : ৯-১০)
আরো ইরশাদ হচ্ছে-
لا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِّنْ نَجُوهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحِ بَيْنَ النَّاسِ، وَمَنْ يَفْعَلْ ذَالِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا. (سورج النساء : ١١٤)
“তাদের অধিকাংশ পরামর্শে কোনই কল্যাণ নেই, অবশ্য যে ব্যক্তি দান-খয়রাত, সৎ কর্ম এবং মানুষের মধ্যে কল্যাণধর্মী পরামর্শ দান করে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এরূপ করবে, তাকে আমি বিরাট সওয়াব দান করব।” (সূরা নিসা: ১১৪)

টিকাঃ
* টীকা: তৎকালীন আরবের বিখ্যাত গোত্র 'বকর' ও 'তাগাল্লুব'-এর মধ্যে 'হরবুল বসূস" নামে সংঘটিত যুদ্ধের কারণ ছিল- প্রভাবশালী গোত্রপতি "কুলায়ব ওয়ায়েল ইবনে রবীআ" একদিন স্বীয় উটনীর সাথে অপরিচিত অপর এক উটনিকে চরতে দেখেন, যেটি ছিল 'তামীম গোত্রীয় "বসূস বিনতে মুনকিয"-এর জনৈক অতিথির। স্বীয় উটনীর সাথে তার চারণভূমিতে অপরের উটনী চরে বেড়াবে, ঘাস খাবে? এটা তাঁর আত্মাভিমানকে বিশেষভাবে আহত করে। সাথে সাথে সে তীরের আঘাতে ঐ উটনীর স্তন জখমী করে এবং সেটিকে তাড়িয়ে দেয়। আহত উটনী বাড়ী ফিরলে তা দেখে বসূস মাথায় হাত দিয়ে ওআযালা’ ‘হায়...রে অপমান’- বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। সাথে সাথে 'বকর' গোত্রে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বকর গোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে বর্শার আঘাতে কুলায়বকে হত্যা করে। ফলে উভয় গোত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেধে যায়- যা ৪৯১ খৃষ্টাব্দ দীর্ঘ চল্লিশ বছরব্যাপী অবিরাম চলতে থাকে। পরিণামে দুই তরফের অগণিত প্রাণ, অসংখ্য খান্দান বিরাণ ও বরবাদ হয়ে যায়। অথচ এর মূলে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো ঘটনাই ছিল না। নিছক কৃত্রিম জাত্যাভিমান, কুল-গৌরব, অন্যায় বাড়াবাড়ি আর সর্বনাশা প্রতিশোধ স্পৃহা ছিল এ যুদ্ধের প্রধান কারণ।
* টীকা: পূর্ব পশ্চিম দিগন্ত ব্যাপী আব্বাসী সাম্রাজ্যের ভিত ধ্বসে পড়ার পিছনে অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে আভিজাত্য ও অন্যায় আত্মাভিমানও বহুলাংশে দায়ী ছিল। আরব অনারব, ইরান, রোম থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ডে যার সীমানা বিস্তৃত ছিল। ইউরোপ এশিয়া ছিল যার প্রভাব বলয়ে, সেই সম্রাট মনসুর আব্বাসী, হারুনুর রশীদ, মামুনুর রশীদের ন্যায় পরাক্রমশালী সম্রাটগণ মানব সভ্যতার বিকাশ সাধনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বার উন্মোক্ত করেছিলেন। বিশ্বকে যারা রাজ্য শাসন পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন, এদের উদার নীতির ফলেই ইউরোপীয়রা জ্ঞানের সন্ধান লাভ করেছিল। সাম্রাজ্যের বিশাল বিস্তৃত পরিধিতে তাঁদের প্রেরণায়ই জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাদপীঠ, খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ স্থাপিত হয়েছিল। এক কথায় তাঁদেরকে গোটা বিশ্বের শিক্ষক বললেও অত্যুক্তি হবার কথা নয়। তৎকালীন শক্তি হিসাবে তারা ছিলেন মর্যাদার উত্তুঙ্গ চূড়ায়। কিন্তু দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে (১০৭ খৃ. পর) জাহেলী গোত্রবাদ, মযহাবী দ্বন্দু, শিয়া-সুন্নীর ঝগড়া ইত্যাদি বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়ে গোটা জাতি হীন বল ও অথর্ব হয়ে পড়ে, যা মহানবী (সা)-এর সময়কালীন ইহুদী খৃষ্টানদের অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যাদের অবস্থা আমরা অনুধাবন করতে পারি কুরআনের ভাষায় যেমন, وَقَالَتِ الْيَهُودُ لَيْسَتِ النَّصَارَى عَلَى شَيْءٍ - وَقَالَتِ النَّصَارَى لَيْسَتِ الْيَهُودُ علَى شَيْءٍ وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ - "আর ইহুদীরা বলত নাসারাদের ধর্ম। এটা কোন ধর্মই নয়। পক্ষান্তরে নাসারা বলত ইহুদীদের ধর্মও মূল্যহীন, অথচ উভয়পক্ষই কিতাব পাঠ করে থাকে।" (সূরা বাকারা: ১১৩) যাহোক গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে, মসজিদ-মাদ্রাসায় এক কথায় সর্বত্র জনগণ থেকে শুরু করে সৈন্যদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও গোত্রবাদের বীজ ছড়িয়ে পড়ে। এহেন আত্মকলহের পরিণতিতে নিজেদের মধ্যে হানাহানি, কাটাকাটি শুরু হয়ে যায়। শিয়া সম্প্রদায় নিজস্ব রাষ্ট্র কায়েমের চিন্তা করে। অবশেষে এক পর্যায়ে তারা সুযোগ পেয়েও যায়। আব্বাসী খেলাফতের শিয়া প্রধানমন্ত্রী 'আলকামী' ফিরকাবন্দীর সুবাদে চেঙ্গিস খাঁকে খেলাফতের উপর আক্রমণের আহ্বান জানায়। গোত্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অন্তরালে জাতি পূর্ব থেকেই বিচ্ছিন্নতার জালে আটকা পড়েছিল। তাই এখন আর তাতারী দস্যুদের আটকায় কে? সুতরাং বাগদাদে রক্তের স্রোত বহায়ে দেয়া হল। প্রায় দেড় লক্ষ মুসলমানের পবিত্র খুনে মহানগরী বাগদাদ ভাসতে থাকে, যাদের মধ্যে বেশীর ভাগই ছিল আলিম, ফাজিল, আমীর, ধনী এবং সেনানায়ক। মোটকথা, আত্মকলহ এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ শত শত বছরের সাধনায় গড়া ইসলামী সভ্যতা নিমিষে ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়। এহেন পরিস্থিতিতেও জাতির হুশ ফিরে আসেনি। খাওয়ারযিম শাহ এবং আব্বাসী খলিফাদের মধ্যে পারস্পরিক মতবিরোধ তখন তুঙ্গে। ঘোর, আফগানিস্তান ও ভারতে তখন 'ঘোরী' বংশীয়দের রাজত্ব। সালাহউদ্দীন আয়্যুবীর হাতে মিসরের ফাতেমী বংশ নিধন হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতেই খাওয়ারযিম শাহের সমর্থনপুষ্ট হিংস্র তাতারীরা ইসলামী সাম্রাজ্যে চরম আঘাত হানে। ফলে ইসলামী সাম্রাজ্য, এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহ তাতারীদের অধিকারে চলে যায়। এমনিতর সহস্রাধিক বছরের প্রচেষ্টায় তিলে তিলে গড়া ইসলামী সভ্যতা ও মুসলিম সাম্রাজ্য আত্মহননের করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যায়। তাই فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ চিন্তাকর হে জ্ঞানীজন! যেই খেলাফতের বুনিয়াদ স্বয়ং মহানবী (সা) রেখেছিলেন মদীনা তাইয়্যেবাতে, হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা), হযরত ফারূক আযম (রা), سروری در دین ما خدمت گریست "আমাদের ধর্মে নেতৃত্বের বিকাশ কেবল সেবা” নীতিতে পরিচালনা করেছিলেন, কুরআন-সুন্নাহ যার মূলনীতি, আসমান থেকে নাযিল হয়েছে যার সংবিধান, যে খেলাফত অর্ধশতাব্দীরও কম সময়ে অর্ধেক দুনিয়া পদানত করেছিল, সারা বিশ্বে যার প্রতিপত্তির দুর্বার গতি বিশ্ব মানবকে শান্তি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছিল, যে খেলাফতকে মানব জাতির নিরাপত্তার প্রাণকেন্দ্র মনে করা হতো, যে খেলাফত মানব সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, সহমর্মিতা, খোদাভীতি, ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত করেছিল, যা ছিল মানব জাতির কল্যাণে এক খোদাই অনুগ্রহ, যে খেলাফত ছিল দ্বীন দুনিয়ার সার্বিক সংস্কারের গ্যারান্টিস্বরূপ, আরবের বিবদমান গোত্রগুলোর মিলনকেন্দ্র ছিল যে খেলাফত এবং যার প্রতি তাকিয়ে আকাশের ফেরেশতাগণ পর্যন্ত নীড় বাঁধার কামনা করতো, এমনিভাবে অতীতের গর্ভে তার বাস্তব রূপ বিলীন হয়ে গেল। এভাবে অন্যায়, অত্যাচার, ভোগবিলাস ও পাপাচার ব্যক্তি পরিবার গোত্র তথা জাতিকে সমূলে বিনাশ করে, তদ্রূপ আলস্য, লোভ-লালসা, আভিজাত্য, জাত্যাভিমান জাতির রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেয়। .فَلْيَتَدَبِّرِ الْمُتَدَبِّرُونَ "সুতরাং জ্ঞানীজনদের গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত।”

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 সাক্ষ্য কিংবা নিজ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে চোরের হাতটাকা প্রসঙ্গ

📄 সাক্ষ্য কিংবা নিজ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে চোরের হাতটাকা প্রসঙ্গ


সাক্ষ্য কিংবা চোরের আপন স্বীকারোক্তির দ্বারা চুরি প্রমাণিত হলে, অনতিবিলম্বে তার হাত কেটে দিতে হবে। কারারুদ্ধ করা অথবা অর্থের বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয়া অবৈধ।
চোরের হাত কাটা ওয়াজিব। কুরআন, হাদীস ও 'ইজমা' দ্বারা এটা সুপ্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَالسَّارِقُ والسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ. فَمَنْ تَابَ مِنْ بَعْدِ ظُلْمِهِ وَأَصْلَحَ فَإِنَّ اللَّهَ يَتُوْبُ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُوْرٌ رَّحِيمٌ (سورة مائدة : ۳۹-۳۸)
"পুরুষ চোর এবং নারী চোর উভয়ের হাত কেটে দাও, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এদের কৃতকর্মের এটা শাস্তিমূলক বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী এবং প্রজ্ঞাময়। অপরাধ করার পর যে ব্যক্তি তওবা ও নিজেকে সংশোধন করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। কেননা, আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও মহা দয়ালু।” (সূরা মায়েদা : ৩৮-৩৯)
সাক্ষ্য কিংবা নিজ স্বীকারোক্তির পর চুরির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর অনতিবিলম্বে তার উপর "হদ্দ' জারি করে' নির্ধারিত সাজা কার্যকর করতে হবে, বিলম্ব করা জায়েয নয়। কারাগারে আটক কিংবা 'ফিদয়া' তথা অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া যাবে না। নির্দিষ্ট সময়ে দিবালোকে তার হাত কাটতে হবে। কেননা, আল্লাহর পথে জিহাদ করা যেমন ইবাদত, তেমনি 'হদ্দ' কার্যকর করা ইবাদতের মধ্যে গণ্য আর অন্তরে এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, হদ্দ কার্যকর করাটা মানুষের জন্য আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ।
সুতরাং শাসনকর্তা, বিচারপতি এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলগণ এ ব্যাপারে মায়া-দয়া না দেখিয়ে কঠোর হওয়া উচিত এবং হদ্দ কিছুতেই বাতিল করা চলবে না। তারা মনে মনে এ বিশ্বাসই পোষণ করবেন যে, জনগণের উপর আল্লাহ্ অনুগ্রহ স্বরূপ এবং অসৎ কাজ থেকে অপরাধপ্রবণ লোকদের বিরত রাখার উদ্দেশ্যে আমরা 'হদ্দ' জারি করার পদক্ষেপ নিয়েছি- অহংকার কিংবা ক্রোধ বশতঃ নয় বরং পিতা যেভাবে পুত্রকে শিক্ষা দেয়। সন্তানকে সুসভ্য করা থেকে গা বাঁচিয়ে পিতা যদি পুত্রকে মায়ের হাওলা করে দেয়, তাহলে মাতৃত্বসুলভ কোমলতার কারণে তার পক্ষে পুত্রকে গড়ে তোলা সম্ভব হয় না। ফলে ছেলের চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। বস্তুতঃ পিতার কড়া শাসনেই পুত্র সভ্য-শান্ত, শিক্ষিত ও চরিত্রবান হয়ে গড়ে ওঠে। এটাই হল পিতৃত্বের মূল দায়িত্ব এবং ছেলের প্রতি তার সত্যিকার অনুগ্রহ।
অথবা তারা হলেন সে সহৃদয় চিকিৎসকের ন্যায় যিনি রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে রোগীকে তিক্ত ঔষধের ব্যবস্থা দেন। কিংবা মানব দেহের পচনশীল সে অংগের ন্যায় অস্ত্রোপাচারের দ্বারা যেই অঙ্গ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেই দেহের বাকী অংশ রক্ষা পায়। কিংবা সিংগা লাগিয়ে দূষিত রক্ত বের করার আশায় যেমন শরীরে জখম করা হয় আর ভবিষ্যতের মঙ্গল চিন্তা করে সাময়িক এ যাতনা সহ্যও করা হয়। মোটকথা ব্যাধির উপশম ও সুখের জন্যই মানুষ এতসব কষ্ট সহ্য করে। হন্দের রহস্যও তাই যে, সাজার মাধ্যমে অপরাধী যেন চির শান্তি লাভ করতে পারে।
হদ্দ কার্যকর করাতে শাসনকর্তা ও বিচারপতির উদ্দেশ্য এটাই হওয়া উচিত যে, জনগণের সার্বিক কল্যাণ, দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালনের কল্যাণ অর্জন করা। উপরন্তু এটাও নিয়্যাত হওয়া উচিত যে, এদ্বারা একে তো আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়িত করা হলো, দ্বিতীয়তঃ এ শাস্তিই যেন অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়- আখিরাতে মুক্তির উপায় হয়। কেননা এদ্বারা তার আত্মিক পরিশুদ্ধি হয়ে যাচ্ছে। এমনিভাবে হদ্দ জারি অর্থাৎ ইসলামের অপরাধ দণ্ড বিধি কার্যকর করাটা সবার জন্য আল্লাহর সরাসরি অপার অনুগ্রহ বৈ কিছু নয়।
পক্ষান্তরে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য যদি হয় আল্লাহর বান্দাদেরকে গোলাম বানানো, স্বীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখা, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা, ব্যক্তি, গোষ্ঠী স্বার্থ ও আর্থিক সুবিধা আদায় করা তাহলে এর পরিণতি বিপরীত হয়ে দাঁড়াবে। মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে হদ্দের আসল উদ্দেশ্য দূরে সরে যাবে।
বর্ণিত আছে, হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ) খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পূর্বে ওলীদ ইবনে আবদুল মালিকের পক্ষ থেকে মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন। শাসন ও জনসেবায় তিনি যথাযথ দায়িত্ব পালনে আত্মনিয়োগ করেন। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ একবার ইরাক থেকে মদীনা পৌছে স্থানীয় লোকদের তিনি হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয সম্পর্কে প্রশ্ন করেন- كَيْفَ هَيْبَةٌ فَيْكُمْ
“তোমাদের উপর তাঁর প্রভাব কিরূপ?” লোকেরা বলল : “তাঁর প্রভাবের কথা আর কি বলবো, আমরা তো ভয়ে তাঁর প্রতি তাকাতেও পারি না।” হাজ্জাজ كَيْفَ مُحَبْتُكُمْ “তাঁর প্রতি তোমাদের ভালবাসা কিরূপ” তারা জবাব দিল : هُوَ أَحَبُّ إِلَيْنَا مِنْ أَهْلِنَا “নিজেদের পরিবার-পরিজন থেকেও তিনি আমাদের প্রিয়।” হাজ্জাজ- كَيْفَ أَدَبُهُ فِيْكُمْ “তোমাদের প্রতি তাঁর শাসনগত আচরণের কি অবস্থা?” তারা বলল : “তিন থেকে দশ কোড়া পর্যন্ত তিনি লাগিয়ে থাকেন।” অতঃপর হাজ্জাজ বললেন-
“এ ভালবাসা, ভয় ও প্রভাব এবং শাসনগত আচরণ আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছে, আল্লাহর বিধানও তাই।"
হাত কাটার পর সাথে সাথে কর্তিত স্থানে গরম তেলের সেক দেয়া বাঞ্ছনীয়। আর বিচ্ছিন্ন হাত তার গলদেশে ঝুলিয়ে দেয়া মুস্তাহাব।
দ্বিতীয়বার চুরি করলে তার বাঁ পা কাটতে হবে। তৃতীয়বার চুরি করলে সাজার ধরন কিরূপ হবে- এ সম্পর্কে সাহাবী ও পরবর্তী ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞগণের মধ্যে দ্বিমত লক্ষ্য করা যায়। কিছু সংখ্যক লোকের মতে তৃতীয় ও চতুর্থবার চুরি করলে তার বাম অথবা ডান হাত কেটে দিতে হবে। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ইমাম শাফেঈ এবং এক রেওয়ায়েতে ইমাম আহমদ এ মতের সমর্থনকারী। ইমাম আহমদের দ্বিতীয় মত হলো, তাকে কারারুদ্ধ করে রাখতে হবে। হযরত আলী (রা) এবং সূফীগণ এ মতের পক্ষপাতী।
হাত তখনই কাটতে হবে যখন চুরির 'নিসাব' পূর্ণ হয়। ইমাম মালিক, ইমাম শাফি'ঈ, ইমাম আহমদ প্রমুখ ইমাম, উলামা, হিজাযবাসী এবং হাদীসবিদগণের মতে এর পরিমাণ হল-৪ (এক চতুর্থাংশ) দীনার অথবা ৩ (তিন) দিরহাম। কারো কারো মতে, হাত কাটার নিসাবের পরিমাণ এক দীনার অথবা দশ দিরহাম। বুখারী-মুসলিমে হযরত ইবনে উমর (রা) নবী করীম (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সা) তিন দিরহাম মূল্যের একটি 'মিজান্ন' তথা একটি ঢাল চুরির দায়ে হাত কাটার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং মুসলিমের ইবারত হল- قَطَعَ سَارِقًا فِي مِجَنٌ قِيمَتُهُ ثَلَثَةٌ دَرَاهِمَ - "তিনি তিন দিরহাম মূল্যের একটি ঢাল চুরির অপরাধে চোরের হাত কেটেছিলেন।” হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা) বলেছেন- قَطْعُ الْيَدِ فِي رُبْعِ دِينَارٍ فَصَاعِدًا - "এক চতুর্থাংশ ৪ দীনার কিংবা এর চেয়ে অধিক পরিমাণ চুরির জন্য হাত কাটতে হবে।” একই মুসলিমে আরো বর্ণিত আছে- لا تُقْطَعُ يَدُ السَّارِقِ إِلَّا فِي رُبْعِ دِينَارٍ فَصَاعِدًا - "এক চতুর্থাংশ দীনার' কিংবা এর চেয়ে অধিক মূল্যের বস্তু চুরি করার জন্যই কেবল চোরের হাতকাটা যাবে।"
বুখারীর এক রেওয়ায়েতে নবী করীম (সা) বলেছেন- اقْطَعُوا فِي رُبْعِ دِينَارٍ وَلَا تُقَطِّعُوا فِي مَا دُونَ ذَالِكَ -
“এক চতুর্থাংশ দীনার চুরির দায়ে তোমরা হাত কাটো, এর চেয়ে কমের দায়ে কাটবে না।” তখনকার সময়ে ৪ দীনার মূল্য ছিল তিন দিরহাম আর পূর্ণ দীনারের মুদ্রামান ছিল ১২ দিরহামের সমান।
আর কোন সুরক্ষিত মাল অপহরণ করার পরই কেবল চুরির অপরাধ সাব্যস্ত হবে। যেমন, কোন বিনষ্ট, অরক্ষিত মাল কিংবা মাঠে-ময়দানে প্রাচীর ঘেরা বা বেড়াবিহীন বৃক্ষের ফল-ফুল অথবা রাখাল বিহীন পশু ইত্যাদি অপহরণ করাকে হদ্দ যোগ্য চুরি বলা হবে না। সুতরাং এমন সব দ্রব্য অপহরণের দায়ে হাতকাটা যাবে না। অবশ্য হরণকারীকে ‘তাযীর’ তথা শাসনমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে, যেমন হাদীসে বলা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণের মাত্রা কি হবে, সে সম্পর্কে আলিমগণের দ্বিমত রয়েছে। হযরত রাফি' ইবনে খাদীজ (রা) বর্ণনা করেন, আমি নবী করীম (সা)-কে ইরশাদ করতে শুনেছি। তিনি বলেছেন- لَا قَطْعَ فِي ثَمَرَةٍ وَلَا ثَمَرٍ “ফল এবং পাকা খেজুরে হাতকাটা যাবে না।” (সুনান)
আমর ইবনে শুআইবের দাদা বলেন: বনী মূযাইন গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে আমি নবী করীম (সা)-কে প্রশ্ন করতে শুনেছি-
يَا رَسُولَ اللَّهِ جِئْتُ أَسْأَلُكَ عَنِ الضَّالَّةِ مِنَ الْإِبِلِ -
“আমি নিখোঁজ উট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার জন্য আপনার নিকট হাজির হয়েছি।” তিনি বললেন-
مَعَهَا غِذَاؤُهَا وَسِقَاؤُهَا تَأْكُلُ الشَّجَرَةَ وَتَرِدُ الْمَاءَ حَتَّى يَأْتِيْهَا بَاغِيْهَا -
“আহারের ব্যবস্থা তার সাথেই রয়েছে, বৃক্ষ লতা খাবে আর ঘাটে পানি পান করবে। তাকে ছেড়ে দাও, তালাশকারী যেন এর কাছে পৌঁছে যায়।” লোকটি বলল- فَالضَّالَّةُ مِنَ الْغَنَمِ “নিখোঁজ বকরী সম্পর্কে আপনার কি হুকুম?” হুজুর (সা) বললেন-
وَلَكَ أَوْ لِأَخِيكَ أَوْ لِلذِّئْبِ تَجْمَعُهَا حَتَّى يَأْتِيْهَا بَاغِيْهَا -
“তোমার জন্য, তোমার ভাইয়ের অথবা বাঘের জন্য হবে, এর সন্ধানকারী আসা পর্যন্ত একে হেফাজত কর।” সে বলল-
فَالْحَرِيسَةُ الَّتِي تُؤْخَذُ مِنْ رَّائِعِهَا -
"'হারীসাহ' অর্থাৎ, রাখালের হেফাজত থেকে যা নিয়ে যাওয়া হয়।” তিনি বললেন-
فِيهَا ثَمَنُهَا مَرَّتَيْنِ وَضَرْبُ نَكَالٍ وَمَا أُخِذَ مِنْ عَطْنِهِ فَفِيهِ الْقَطْعُ إِذَا بَلَغَ مَا يُؤْخَذُ مِنْ ذَالِكَ ثَمَنُ الْمِجَنُ -
"এর দ্বিগুণ মূল্য দিতে হবে এবং 'তাযীর' করতে হবে। আর গোয়াল থেকে অপহৃত জন্তুর মূল্য যদি ঢালের মূল্যের সমান হয়, তবে হাত কাটতে হবে।" সে ব্যক্তি প্রশ্ন করল: হে রাসূলুল্লাহ! যদি ফল মূল চুরি করে তবে? হুজুর (সা) উত্তর দিলেন-
مَنْ أَخَذَ مِنْهَا بِفِيْهِ وَلَمْ يَتَّخِذْ خُبْنَةٌ عَلَيْهِ شَيْءٌ وَمَنِ احْتَمَلَ فَعَلَيْهِ ثَمَنُهُ مَرَّتَيْنِ وَضَرْبُ نَكَالِ وَمَا أُخِذَ مِنْ إِجْرَائِهِ فَفِيْهِ الْقَطْعُ إِذَا بَلَغَ مَا يُؤْخَذُ مِنْ ذَالِكَ ثَمَنُ الْمِجَنِّ وَمَا لَمْ يَبْلُغُ ثَمَنُ الْمِجَنِّ فَفِيْهِ غَرَامَةُ مِثْلَيْهِ وَجَلْدَاتُ نَكَالَ - (سنن)
"যে ব্যক্তি খোসা ছাড়া নিজ মুখে এসবের কিছুটা পুরে দেয় এর জন্য কোন সাজা হবে না। কিন্তু যদি নিজের সাথে করে কিছুটা নিয়ে যায়, তবে দ্বিগুন মূল্য দিতে হবে এবং 'তাযীর' করতে হবে। কিন্তু যদি ঝোপসহ নিয়ে যায়, তবে এর মূল্য ঢালের মূল্যের সমান হয়, তবে হাত কাটতে হবে, আর যদি এর দাম ঢালের দামের চেয়ে কম হয়, তবে দ্বিগুণ জরিমানা দিতে হবে এবং কোড়ার আঘাতে তাকে তাযীর করতে হবে।" (সুনান) অতঃপর তিনি আরো বলেন-
لَيْسَ عَلَى الْمُنْتَهِبِ وَلَا عَلَى الْمُخْتَلِسِ وَلَا الْخَائِنِ قِطْعُ -
"লুটকারী, ছিনতাইকারী এবং খেয়ানতকারীর হাতকাটা যাবে না।" পকেটমার, রুমাল কিংবা আস্তিনে রক্ষিত মাল অপহরণকারীকে আলিমগণের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী হাতকাটা যাবে।

টিকাঃ
১. টীকা: চুরির দায়ে হাত কাটাকে আধুনিক বিশ্বের অগভীর চিন্তার কোনো কোনো মানুষ একটা বর্বর আইন ও কঠোর সাজা বলে মন্তব্য করে থাকে। কিন্তু বাস্তব সত্য এ ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত স্বাক্ষরই বহন করে থাকে। যে গ্রাম-সমাজ-জনপদে চুরি হয়, সেখানকার দু’একজনের হাত কাটা গেলে গোটা জনপদ শান্তি ও নিরাপদ হয়ে যায়, পুনরায় কেউ চুরি করতে সাহসই পায় না। সুতরাং দেখা যায়, এ হাত কাটা সমাজের জন্য অশেষ কল্যাণ বয়ে আনে। পক্ষান্তরে আজকাল মানব উদ্ভাবিত আইনে চুরির যে সাজা প্রবর্তন করা হয়েছে তা কবির ভাষায় তীব্র হলো পাপের নিশা- সাজা পাওয়ার পরে.....।” এ ধরনের সাজায় সমাজের ক্ষতিই হয়, লাভ কিছুই হয় না। জেলে গিয়ে পুরান চোরদের সাথে মিশে নতুন চোর দক্ষ হয়ে আসে। অথচ ইসলাম যে শাস্তির বিধান দিয়েছে তা কার্যকর করা হলে চুরির সম্ভাবনা একেবারেই মিটে যায়। আল্লাহও রাজি থাকলেন। উপরন্তু সমাজে, শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তিও নেমে এল। আর হদ্দের উপকারিতা ও মূল রহস্য জানতে পেরে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিও এই মনে করে সন্তুষ্ট যে, আখিরাতের কঠিন সাজা থেকে মুক্তি লাভের একটা উপায় তো হলো। এতেও অপরাধীর তাকওয়া অবলম্বন করার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজে ও রাষ্ট্রে। মোটকথা, শরীয়তী বিধান 'হদ্দের' মধ্যে অশেষ বরকত ও বিবিধ কল্যাণ নিহিত রয়েছে। পার্থিব ও পারলৌকিক উভয় জীবনে শান্তি ধারা নেমে আসে। বিশ্ববাসীকে আল্লাহ বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধির তৌফিক দেন। সারা বিশ্ব না হোক অন্ততঃ মুসলিম দেশগুলো ইসলামের এ দণ্ড বিধানটি বাস্তবায়িত করে এর সুফল ভোগ করার সুযোগ লাভে যেন সচেষ্ট হয়।
টীকা-১ : আজকাল এর জন্য অন্যান্য ঔষধ ব্যবহার করা হয়। মূলতঃ রক্ত বন্ধ হওয়া এবং রক্ত ক্ষরণজনিত কারণে প্রাণহানি না ঘটাই এর উদ্দেশ্য।
টীকা-১: এ ব্যাপারে হযরত আবু হানীফার মত হলো, হাত কাটার মামলায় আর্থ-সামাজিক অবস্থা লক্ষ্য রাখতে হবে যে, সমাজে অর্থনৈতিক সুষম বণ্টন ব্যবস্থা আছে কি না? এছাড়া চৌর্যবৃত্তিটা অভাবজনিত না অভ্যাস তাড়িত?

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ব্যভিচারী ও সমকামীদের প্রতিঘাতে সাজা

📄 ব্যভিচারী ও সমকামীদের প্রতিঘাতে সাজা


ব্যভিচারীর সাজা, প্রস্তরাঘাতে বিবাহিত ব্যভিচারীর প্রাণ সংহার করা। 'লাওয়াতাত' অর্থাৎ, সমকামিতার সাজা। যে সমকামী এবং যার সাথে এই ঘৃণ্য কাজ করা হবে, উভয়কেই হত্যা করা।
'রজম' তথা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করাই হলো বিবাহিত ব্যভিচারীর সাজা। রাসূলুল্লাহ (সা) মায়েয ইবনে মালিক আসলামী, 'গামেদিয়া' মহিলা* এবং কোন কোন ইহুদীকে 'রজম' করিয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীন এবং মুসলমানগণ যিনার শাস্তিস্বরূপ 'রজম' করেছেন।
এখন 'রজমের' পূর্বে একশ কোড়া লাগিয়ে পরে 'রজম' করা হবে কিনা? এ ব্যাপারে ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ)-এর মযহাবে দু'ধরনের মত পরিলক্ষিত হয়।
(১) যিনাকারী যদি মুহসিন (বিবাহিত) না হয়, তবে কিতাবুল্লাহর বিধান মতে একশ কোড়া লাগাতে হবে।
(২) নবী করীম (সা)-এর হাদীসের নির্দেশ মতে একশ কোড়ার সাথে সাথে এক বৎসরের জন্য দেশান্তরিত বা নির্বাসনের হুকুম দিতে হবে। অবশ্য কোন কোন আলিমের মতে এক বছরের নির্বাসন দেয়া জরুরী নয়।
অধিকাংশ ইসলামী আইনবিদের মতে চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ অথবা সে নিজে চারবার স্বীকার না করা পর্যন্ত যিনাকারীর উপর হদ্দ (শাস্তি) জারী করা যাবে না। কিন্তু কোন কোন আইনবিদ বলেন- চারবার স্বীকার করা বিশেষ জরুরী নয়। বরং একবার স্বীকার করাই যথেষ্ট। কেউ যদি প্রথমবার স্বীকার করার পর, পরে অস্বীকার করে বসে? এক্ষেত্রে কোন কোন আলিমের মতে তার থেকে হদ্দ (যিনার শাস্তি) রহিত হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে, কারো কারো মতে হদ্দ রহিত হবে না (বরং তা কার্যকরী করতে হবে)।
'মুহসিন' তাকেই বলা হবে, যে ব্যক্তি 'আযাদ', 'হুর' মুকাল্লাফ (শরীয়তের বিধান পালনের যোগ্যা) এবং বৈধ বিবাহের পর আপন স্ত্রীর সাথে ন্যূনতম একবার মিলিত হয়েছে।
আর যার সাথে সহবাস করা হয়েছে উপরোক্ত শর্তাবলী পাওয়া যাওয়া সাপেক্ষে সে মুহসিন পর্যায়ভুক্ত কিনা? এ প্রশ্নও এখানে উত্থাপিত হয়। এ ব্যাপারে আলিমগণের মধ্যে দু'ধরনের মত লক্ষ্য করা যায়।
(১) মেয়ে 'মুরাহেকা' (বালেগ হওয়ার নিকটবর্তী) কিন্তু বালেগ পুরুষের সাথে যিনা করেছে। কিংবা পুরুষ 'মুরাহেক' (বালেগ হওয়ার নিকটবর্তী) বালেগা নারীর সাথে যিনা করেছে।
অতঃপর জিম্মিদের বেলায়ও একই হুকুম। যদি সে 'মুহসিন' হয় তবে, অধিকাংশ আলিমের মতে 'রজম' করা হবে। যথা- ইমাম শাফি’ঈ ও ইমাম আহমদ প্রমুখদের এই মত।
কেননা নবী করীম (সা) আপন মসজিদের দরজার সামনে ইহুদীদের 'রজম' করিয়াছেন আর ইসলামে এটাই ছিল প্রথম 'রজম'।
স্বামীহারা কোন নারীকে যদি গর্ভবতী অবস্থায় পাওয়া যায়। অধিকন্তু তার কোন মনিব বা প্রভু বর্তমান না থাকে এবং গর্ভে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ না থাকে তবে, ইমাম আহমদ (রহ) প্রমুখের মযহাবে দু'ধরনের মত পরিলক্ষিত হয়।
(১) তার উপর হদ্দ জারী করা যাবে না। কেননা হতে পারে বলপূর্বক তার সাথে যিনা করার পরিণামে সে গর্ভবতী হয়েছে। কিংবা জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অথবা আপন স্ত্রী সন্দেহে কোনো অবস্থায় তার সাথে সহবাস করা হয়েছিল।
(২) তার উপর হদ্দ জারী করতে হবে। খোলাফায়ে রাশেদীন থেকে রেহাই প্রমাণিত এবং এটা শরীয়তের উসূলের অনুকূল, অধিকন্তু মদীনাবাসীদের মযহাবেও এটাই। কেননা এটা বিরল সম্ভাবনা। আর এ ধরনের বিরল সম্ভাবনার প্রতি গুরুত্ব দেয়া সমীচীন নয়।
যেমন- সে মিথ্যা স্বীকারোক্তি করেছিল অথবা সাক্ষীগণের সাক্ষ্য মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা।
'নৃতী (পুং মৈথুনকারী) এবং 'লাওয়াতাত' (পুং মৈথুন) এর শাস্তি সম্পর্কে কোন কোন আইনবিদ বলেন- যিনার অনুরূপ হদ্দ অর্থাৎ সাজা তার উপরও প্রয়োগ করতে হবে। কারো কারো মতে, লাওয়াতাত তথা সমকামিতার অপরাধে যিনার চেয়ে অপেক্ষাকৃত লঘুদণ্ড প্রদান করা বিধেয়। অপর দিকে সাহাবা কিরাম (রা) সকলেরই এক ও অভিন্ন মত যে, মুহসিন কিংবা গায়র মুহসিন পুং মৈথুনকারী এবং পুং মৈথুনকৃত (فَاعِل وَمَفْعُول) উভয়কে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। কেননা হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত- নবী করীম (সা) বলেছেন-
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ كَقَوْمٍ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُول .
- "যাকে, কওমে লুতের অনুরূপ কর্মরত দেখতে পাও (পুং মৈথুনকারী ও কৃত) উভয়কে প্রাণদণ্ড দেবে।"
হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর রেওয়ায়েতক্রমে আবূ দাউদ বর্ণনা করেন: অবিবাহিত দূতী বালককে যদি কোন নারীর সঙ্গে পাওয়া যায় তবে, তাকে 'রজম' করতে হবে। এ সম্পর্কে হযরত আলী (রা)-ও একই মত পোষণ করেন। কিন্তু অন্যান্য সাহাবী (রা) তার কতলের ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেন এবং বিভিন্ন প্রকার মত ব্যক্ত করেছেন। হযরত আবূ বকর সিদ্দিক (রা) তাকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আর অন্যান্য সাহাবীগণ (রা) বলেন- তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হোক। কেউ বলেছেন- প্রাচীর চাপা দিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। কেউ বলেছেন- কোনও পচা দুর্গন্ধময় স্থানে তাকে বন্দী করে রাখতে হবে, যাতে এ অবস্থায়ই সে মারা যায়। কেউ বলেন, এলাকার সর্বোচ্চ প্রাচীর চূড়া থেকে ভূ-তলে নিক্ষেপ করে উপর থেকে তার উপর প্রস্তর নিক্ষেপ করতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক তদ্রূপ কওমে লূতকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। এটা ইবনে আব্বাস (রা)-র এক রেওয়ায়েত।
তাঁর অপর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তাকে রজম (প্রস্তারাঘাতে প্রাণদণ্ড) দিতে হবে। অধিকাংশ সল্ফে সালেহীনের অভিমতও এটাই। এ মতের প্রমাণস্বরূপ তাঁরা বলেন- মহান আল্লাহ তায়ালা কওমে লূতকে রজম করেছেন এবং এর সাথে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতেই রজমের দ্বারা যিনাকারীর শাস্তি বিধান করা হয়েছে। আর পুং মৈথুনজনিত পাপাচারীদ্বয় উভয়ে আযাদ হোক কিংবা গোলাম অথবা একজন কারো ক্রীতদাস হোক, এরা বালেগ হলে তাদের দু'জনকেই রজম করতে হবে।
তবে পুং মৈথুনকারী কিংবা কৃত তাদের উভয়ের একজন নাবালেগ হলে তাকে মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে নিম্নতর সাজা দিতে হবে। পক্ষান্তরে বালেগকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।

টিকাঃ
* টীকা: 'গামেদিয়া' বলে হাদীসে উল্লেখিত জনৈকা সাহাবিয়া মহিলার দ্বারা ব্যভিচারের কর্ম সংঘটিত হয়। এ বিষয়ে অন্য কারো খবর বা কল্পনাও ছিল না। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিল, আমার অপরাধ সম্পর্কে মহান আল্লাহ জ্ঞাত রয়েছেন, তাঁর আযাব দুনিয়ার যাবতীয় কষ্টের চেয়ে ভীষণ পীড়াদায়ক। তাই হুযুর (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে নিজের কৃত অপরাধ সবিস্তার বর্ণনাপূর্বক আবেদন করলেন: “যথাযোগ্য শাস্তি দিয়ে আমাকে পবিত্র করুন।" হুযুর (সা) এটাকে তেমন গুরুত্ব না দেয়াতে পুনরায় আরয করলেন: হুযূর! আমার একথা কোন পাগলের প্রলাপ নয়। স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে আমি এ বক্তব্য রাখছি। আমাকে রজম করিয়ে দিন, যেন পরকালের আযাব থেকে নিষ্কৃতি পাই।” তিনি আরো বলেন: "অবৈধ মিলনের ফলেই আমি অন্তঃসত্তা হয়েছি বলে আমার বিশ্বাস। "বিবরণ শুনে হুযুর (সা) বলেন: “যদি তাই হয় তবে, এখন তোমার উপর হদ্দ জারি করা যাবে না। প্রসবের পর আসবে।" প্রসবের পর সন্তান কোলে নিয়ে আল্লাহর সে বান্দী হুযূরের (সা) খিদমতে হাজির হয়ে আবেদন জানালেন "হুযূর। আমি অমুক অপরাধিনী মহিলা। সন্তান প্রসব হয়ে গেছে, তাই শাস্তি দানে আমাকে নির্মল করুন।" হুযূর (সা) বললেন: বাচ্চা এখনো মায়ের দুধের উপর নির্ভশীল। দুধ ছাড়িয়ে যখন রুটি খেতে শুরু করে তখন আসবে।" অতঃপর বাচ্চাটি রুটি খাওয়ার যোগ্য হওয়ার পর তার হাতে রুটির টুকরা দিয়ে হুযুরের (সা) নিকট হাজির হন। বাচ্চাটি তখন রুটি চাবাচ্ছিল। আবেদন করলেন : "হুযূর। আমি সেই অপরাধিনী। আমার বাচ্চার এখন দুধের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। দেখুন রুটি খাচ্ছে। এখন একে কারো হাতে সোপর্দ করে পরকালের আযাব থেকে আমার মুক্তির ব্যবস্থা করুন।" সুতরাং মহিলাটিকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হল। পাথর নিক্ষেপকারীগণের মধ্যে এ একজন বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। হুযূর (সা) একথা জানতে পেরে উক্ত সাহাবীকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি. এরূপ কেন করলেঃ তুমি জান কি, সে এমন তওবাই করেছে যে, মদীনাবাসীদের সকলের মধ্যে তা বণ্টন করে দিলে তাদের সবার নাজাতের জন্য যথেষ্ট।" আল্লাহু আকবর! পরকাল চিন্তার কি অপূর্ব নিদর্শন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00