📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 মাল-সম্পদ, ঋণ, যৌথ ব্যবস্থা, মুজারাবাত, আল্লাহর নির্দেশিত মোকদ্দমার ফয়সালা ইত্যাদি

📄 মাল-সম্পদ, ঋণ, যৌথ ব্যবস্থা, মুজারাবাত, আল্লাহর নির্দেশিত মোকদ্দমার ফয়সালা ইত্যাদি


সরকারী আমানতের অপর ধরন হলো মাল-সম্পদ এবং বিশেষ ও সাধারণ ঋণ, আমানতদারী, যৌথ ব্যবস্থা, তাওয়াক্কুল, মুজারাবাত, এতীমের সম্পদ, ওয়াকফ ইত্যাদি। ফকীর-মিসকীন সর্বস্বহীনকে দান-খয়রাত প্রদান, উসুলকারী, কর্মচারী, 'মোয়াল্লাফাতুল কুলুব', দাস মুক্তি, ঋণগ্রস্তকে অর্থ সাহায্য দান এবং আল্লাহর পথে দান-সাদকা প্রদান প্রভৃতি এ পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়।
আমানতের দ্বিতীয় প্রকারটি মাল-সম্পদের সাথে সংশ্লিষ্ট। কর্জ বা ঋণ সম্পর্কে আল্লাহ ইরশাদ করেন-
فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُمْ بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ .
"তোমাদের মধ্যে যদি একে অপরকে আমানতদার বানায়, তার উচিত উক্ত দাতাকে তার আমানত আদায় করে দেয়া এবং নিজ প্রভু আল্লাহকে ভয় করা।" (সূরা বাকারা : ২৮৩)
এ প্রকার আমানতের মধ্যে যেসব বিষয় শামিল তা হলো মূলধন, বিশেষ ও সাধারণ ঋণ, যেমন গচ্ছিত সম্পদ। যৌথ শরীকদার, মুয়াক্কিল, মুজারিব ও এতীমের মাল, ওয়াকফ সম্পত্তি, খরিদকৃত সম্পদের মূল্য আদায় করা, ঋণ, নারীদের মোহর, লভ্যাংশের মজুরী ইত্যাদি।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ الْإِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوْعًا - إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا - وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا إِلَّا الْمُصَلِّينَ - الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ - وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ (الى قوله) وَالَّذِينَ هُمْ لَأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ.
"জন্মগতভাবে মানুষ অসহিষ্ণু। যখন তাকে ক্ষতি স্পর্শ করে, সে বিচলিত হয়ে ওঠে আর যখন তাকে প্রাচুর্য স্পর্শ করে, সে কৃপণ হয়ে যায়। তবে নামাযী ব্যক্তিরা নয়, যারা নিজেদের নামাযে সদা নিষ্ঠাবান, যাদের সম্পদে ভিক্ষুক এবং বঞ্চিত উভয় শ্রেণীর মানুষের হক নির্ধারিত রয়েছে।... আর যারা আমানত ও নিজেদের কৃত চুক্তি ওয়াদা রক্ষা করে।" (মায়ারিজ: ১৯-৩২)
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন-
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ وَلَاتَكُنْ لِّلْخَائِنِينَ خَصِيْمًا.
"হে নবী! আমি তোমার কাছে সঠিকরূপে কিতাব নাযিল করেছি। তোমাকে আল্লাহ তায়ালা যেরূপ বাৎলিয়ে দিয়েছেন, তুমি ঠিক সেভাবে মানুষের পারস্পরিক বিরোধ, মামলা-মোকাদ্দমার ফয়সালা করবে। খেয়ানতকারী প্রতারকদের পক্ষাবলম্বন করবে না।” (সূরা নিসা: ১০৫)
রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ .
"তোমার কাছে যে ব্যক্তি আমানত রেখেছে, তুমি তাকে তা হুবহু বুঝিয়ে দাও। তোমার সাথে খেয়ানত-প্রবঞ্চনা ও বিশ্বাসঘাতকতা করলে, তুমি তার সাথে প্রবঞ্চনা করো না।"
মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন-
الْمُؤْمِنُ مَنْ آمِنَهُ الْمُسْلِمُونَ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ وَالْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْنَ مِن لِّسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هُجَرَ عَمَّا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ وَالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي ذَاتِ اللَّهِ -
"মুসলমানরা যাকে জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্বস্ত মনে করে সে-ই 'মুমিন'। আর ঐ ব্যক্তি হচ্ছে খাঁটি 'মুসলিম', যার হাত ও রসনা থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে। আর প্রকৃত 'মুহাজির' হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তেমনি সেই হচ্ছে খাটি মুজাহিদ, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যে আপন সত্তার বিরুদ্ধে লড়াই করে।"
এটি একটি সহীহ হাদীস। এর অংশ বিশেষ বুখারী এবং মুসলিমে উল্লেখিত আছে। কিছু অংশ তিরমিযী শরীফেও উল্লেখ আছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) আরও ইরশাদ করেছেন- مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَانَهَا أَدَاهَا اللَّهُ عَنْهُ - وَمَنْ أَخَذَهَا يُرِيدُ اخْلَافَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ .
"ফেরত দেয়ার অভিপ্রায়ে যে মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে, আল্লাহ তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর কেউ সম্পূর্ণ আত্মসাতের নিয়তে কারও কাছ থেকে কোনো অর্থ-সম্পদ নিলে, আল্লাহ তায়ালা তা ধ্বংস করে দেন।” (বুখারী)
সকল আমানত পরিশোধকে আল্লাহ ফরজ করেছেন। আমানতে খেয়ানত, লুট, ছিনতাই, চুরি, প্রতারণা যাই হোক, তা আদায়ের জন্য সতর্ক করা হয়েছে। এমনিভাবে হাওলাত বা ধার হিসাবে গৃহীত অর্থ সম্পদ ও জিনিসপত্র ফেরত দেয়া ফরজ।
রাসূলুল্লাহ (সা) এ সম্পর্কে বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন- الْعَارِيَةُ مُؤَدَّاةُ وَالْمَنْحَةُ مَرْدُودَةً وَالدَّيْنُ مُقْضَى وَالزَّعِيمُ غَارِمٌ - إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثِ -
"ধারে গৃহীত জিনিস ফেরত দিতে হবে, উটের শাবক যার জন্যে নিদিষ্ট করা হয়েছে, তাকেই দিয়ে দেবে। ঋণ অবশ্য পরিশোধ্য। নেতার উপর যে কর্তব্য নির্ধারিত, তাকে তা আদায় করতেই হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারকে তার হক (অধিকার) প্রদান করে দিয়েছেন। সুতরাং উত্তরাধিকারীর জন্যে অসিয়ত নেই।"
দেশের প্রধান শাসক, আঞ্চলিক শাসকবর্গ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ এবং জনগণের সকলেই এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। শাসক ও শাসিত উভয় শ্রেণীর উপরই এটা ফরজ বা কর্তব্য যে, তারা পরস্পরের উপর বর্তিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। রাষ্ট্র নায়ক এবং তার স্থলাভিষিক্ত কিংবা নিয়োজিত ব্যক্তি ও জনগণের ন্যায্য অধিকার দানে অবহেলা করা চলবে না। হকদারকে তার হক আদায় করে দিতেই হবে। তাদের ন্যায্য অধিকার আংশিকভাবে নয় পুরোপুরিই আদায় করে দেয়া তাদের উপর ফরজ করা হয়েছে। এমনিভাবে জনগণ ও রাষ্ট্রের যেসব হক তাদের কাছে দেয়া হয়েছে, তা পরিশোধ করে দেয়া ফরজ। রাষ্ট্রের অনধিকার ও অন্যায়ভাবে কিছু দাবী করাও বৈধ নয়। কেউ কোনো অন্যায় দাবী তুলে রাষ্ট্রীয় শান্তি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিপন্ন করে তুললে নিম্নলিখিত আয়াতের মর্মবাণী তাদের উপর প্রযোজ্য হবে। যেমন-
وَمِنْهُمْ مَنْ يَلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَاتِ - فَإِنْ أَعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِنْ لَّمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُوْنَ - وَلَوْ أَنَّهُمْ رَضُوا مَا آتَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَقَالُوا حَسْبُنَا اللهُ سَيُؤْتِيْنَا اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَرَسُولُهُ إِنَّا إِلَى اللَّهِ رَاغِبُوْنَ - إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَاتِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ - فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
“হে নবী! তাদের মধ্যে এমন কিছু লোকও রয়েছে, সাদকা-খয়রাতের প্রশ্নে তারা তোমার ব্যাপারে অভিযোগের সুরে কথা বলে। অতঃপর যখন এ থেকে তাদের কিছু দেয়া হয় তারা খুশি হয় আর যদি না দেয়া হয় তাহলে- সাথে সাথে বিগড়ে বসে। আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূল তাদের যা প্রদান করেছিলেন, তারা যদি এটা আনন্দে গ্রহণ করতো এবং বলতো যে, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, এখন দেননি তো কি হয়েছে, ভবিষ্যতে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল আমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ প্রদান করবেন, আমরা তো আল্লাহর সাথেই যোগসূত্র স্থাপন করে আছি, (তাহলে এটাই তাদের উপযুক্ত উক্তি হতো।) দান-খয়রাত তো শুধু ফকীর-মিসকীনদের হক আর ঐ সকল ব্যক্তির হক, যারা (রাষ্ট্রের) কর্মচারী হিসাবে দান-সাদকার অর্থ উসুল করার জন্যে নিযুক্ত। তেমনি যাদের অন্তরকে (দীনের সাথে) সংযোগ করা কাম্য, এগুলো তাদেরও হক। দাসমুক্তির ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করণে, আল্লাহর পথে এবং দুস্থ প্রবাসী মুসাফিরের পাথেয় হিসাবে দান-সাদকার অর্থ ব্যয়িত হবে। সাদকা বিলি-বণ্টনে এসব হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত খাত। আল্লাহই সবজান্তা এবং অতি প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবা: ৫৮-৬০)
জনগণের উপর রাষ্ট্রের যেসব অধিকার রয়েছে, সেগুলো দানে বিরত থাকার অধিকার তাদের নেই। এমনকি শাসক অত্যাচারী হলেও রাষ্ট্রের স্বার্থে যেসব বিষয় তাদের দেয়, তা দিতেই হবে। এ মর্মে মহানবী (সা) ঠিক তখনই নিম্নোক্ত ইরশাদ করেছিলেন, যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসকের বিরুদ্ধে জুলুম নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল। যথা-
اَدُّوا إِلَيْهِمُ الَّذِي لَهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا اسْتَرَعَاهُمْ -
"তোমাদের উপর তাদের যেই হক বা অধিকার রয়েছে, তা আদায় করে দাও, কারণ, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে জনগণের অধিকারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন।"
হযরত আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক মহানবী (সা)-এর একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে-
كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوْسُهُمُ الأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيُّ خَلَفَهُ نَبِيُّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِى وَيَسَكُونُوا خُلَفَاءَ وَيُكْثِرُونَ قَالُوا فَمَا تَأْمُرْنَا - قَالَ أَوْفُوا بَيْعَةَ الأَوَّلِ فَالأَوَّلَ - ثُمَّ اعْطُوْهُمْ حَقَّهُمْ - فَإِنَّ اللَّهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا اسْتَرَعَاهُمْ - (صحیح بخاری ومسلم)
"বনী ইসরাঈলকে নবীগণ শাসন করতেন। তাদের কোনো একজন পয়গম্বরের ইন্তেকাল হলে তারা অপর এক পয়গম্বরকে তাঁর খলীফা তথা স্থলাভিষিক্ত করতেন। তবে আমার পর এভাবে আর কোনো নবী-রাসূল নেই এবং আসবেও না। তবে বহু খলীফা হবে। সাহাবীগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ সময়ের জন্যে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আপনার কি নির্দেশ।' রাসূল (সা) বললেন, তোমরা পূর্ণ বিশ্বস্ততা সহকারে তাদের আনুগত্য করে যাবে। প্রথম যিনি নির্বাচিত হবেন, তার প্রতি তোমাদের আনুগত্যের দায়িত্ব কর্তব্য যথাযথ পালন করবে। তারপর যিনি তার প্রতি। অতঃপর তোমাদের উপর যেসব হক পালনীয় হয়ে আছে, তা দিয়ে দেবে। জনগণের যেসব অধিকার রয়েছে, আল্লাহ সে ব্যাপারে শাসকদের নিকট কৈফিয়ত তলব করবেন। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) কর্তৃক সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ بَعْدِى أَثْرَةً تُنْكِرُونَهَا - قَالُوا فَمَا تَأْمُرُنَا يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ -
"আমার পরে তোমরা বহু ধন-ঐশ্বর্য দেখতে পাবে, আর এমন বিষয়ও দেখবে এবং এমন কথাও শুনবে, যেগুলো তোমরা পছন্দ করবে না। সাহাবা-এ কেরাম আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এরূপ মুহূর্তে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলুন।” রাসূল (সা) ইরশাদ করেন-
قَالَ أَدُّوا إِلَيْهِمْ حَقَّهُمْ وَاسْتَلُوا اللَّهَ حَقَّكُمْ -
"তোমাদের কাছে (সরকারী-বেসরকারী) যাদের হক বা অধিকার থাকে, তোমরা তা পরিশোধ করে দেবে আর নিজেদের অধিকারের জন্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাবে।"
জনসাধারণের তহবিলের দায়িত্বে যারা নিয়োজিত থাকবে, (ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা) অর্থ বণ্টনে স্বেচ্ছাচারিতা চালাবার কোনো অধিকার তাদের নেই। রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদকে ব্যক্তিগত অর্থ-সম্পদ মনে করবে না। যেভাবে খুশি সেভাবে সরকারী অর্থ ব্যয় করবে না। কারণ সরকারী অর্থ তহবিলের দায়িত্বে যিনি নিয়োজিত থাকবেন, তিনি এর মালিক নন, বরং আমানতদার মাত্র; (ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা তা নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা চলবে না)। মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন-
إِنِّي وَاللَّهِ لَا أُعْطِي أَحَدًا وَلَا أَمْنَعُ أَحَدًا إِنَّمَا أَنَا قَاسِمٌ - أَضَعُ حَيْثُ أُمِرْتُ - (بخاری)
"আল্লাহ্র কসম, না আমি কাউকে (অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ) প্রদান করি, না কারুর সম্পদ (অন্যায়ভাবে) গ্রহণ করি বা আটক রাখি। আমি যেভাবে আদিষ্ট ঠিক সেভাবেই জনগণের মাঝে সম্পদ বণ্টন করে থাকি।” (বুখারী)
লক্ষ্য করার বিষয় যে, মহানবী (সা) রাব্বুল আলামীন বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের রাসূল (বার্তাবাহক)। তিনি বলছেন, কাউকে দেয়া না দেয়ার প্রশ্নে তাঁর ইচ্ছারও কোনো মূল্য নেই। বিলি-বণ্টনে মালিকদের মতো নিজ ইচ্ছামাফিক সরকারী মাল সম্পদ ব্যয়ে তাঁর কোনো ইখতিয়ার নেই। দুনিয়াদার শাসক ও উচ্চ কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে স্বজনপ্রীতি অবলম্বন করে এবং তাদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় করে। অনেক হকদার লোককেও তারা শুধু এজন্যে বঞ্চিত করে যে, যেহেতু ঐ সকল লোক তাদের প্রিয়জনদের তালিকাভুক্ত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আল্লাহ যেখানে ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি সেখানেই তা ব্যয় করতেন।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবও (রা) (রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপারে) একই নীতির অনুসরণ করেছেন। একদা অনেক ব্যক্তি এসে তাঁকে বলল : আপনার আরও কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রয়োজন। আপনি বায়তুল মাল থেকে আরও কিছু বেশি অর্থ গ্রহণ করলে ভাল হবে। হযরত উমর (রা) বললেন : আমার এবং জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক তোমাদের জানা নেই। এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে এরূপ যেমন, কিছু লোক সফর করছে। সকলে নিজ নিজ মাল-সামান ও অর্থ-সম্পদ তাদের একজনের কাছে গচ্ছিত রেখে বললো : আপনি আমাদের এই অর্থ ও মালামাল আমাদের প্রয়োজনে ব্যয় করবেন। এমতাবস্থায় আমানতদারের জন্যে সেই অর্থ-সম্পদ থেকে কিছুটা ব্যয় করা এবং যেমন খুশি তেমনি খরচ করা বৈধ্য হবে কি?
একবার হযরত উমর (রা)-এর নিকট “খুমুসের” (গণীমতের পঞ্চাংশ) অনেক মাল এসেছিল। ঐগুলো দেখে তিনি বললেন : জনগণ তাদের আমানত দিয়ে দিয়ে বেশ কাজ করেছে। উপস্থিত দু'একজন বললেন, আপনি আমানতের মালসমূহ আল্লাহ্ হুকুমে যথাযথ ব্যয় করে থাকেন। এজন্যে জনগণও আমানতসমূহ (যাকাত, ওশর, কর ইত্যাদি সকরারী পাওনা) নিয়মিতভাবে এনে আপনার হাতে জমা দিয়ে দেয়। আপনি যদি এতে হেরফের করতেন তারাও করতো।
"উলিল আমর” বা নেতা বলতে কি বুঝায়, জনগণের তা জানা উচিত। তাঁর অধিকার এবং মর্যাদা কি, সে সম্পর্কেও অবহিত থাকা আবশ্যক। নেতার তুলনা অনেকটা বাজারের মতো। বাজারে তোমরা যে পরিমাণ মূল্য দাও, সে পরিমাণ পণ্য পাও, তাই হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ) বলতেন : তুমি যদি সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ হও এবং বিশ্বস্ততার পরিচয় দাও, তাহলে এর বিনিময়ে তুমিও একই প্রতিদান পাবে। পক্ষান্তরে যদি মিথ্যাচার, অন্যায়, অবিচার ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দাও, তাহলে তুমিও প্রতিদানে একই আচরণ পাবে।
অতএব দেশের প্রধান শাসক ও তাঁর অধীনস্থ অন্যান্য কর্মকর্তার উপর ফরজ হলো, ন্যায়নীতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থ সংগ্রহ করা এবং সেগুলো যেখানে ব্যয় করা সঙ্গত ওখানে সেভাবে ব্যয় করা। হকদারকে বঞ্চিত না করা।
হযরত আলী (রা)-এর নিকট একবার অভিযোগ আসলো যে, তাঁর কোনো কোন 'নায়েব' (প্রতিনিধি) জনগণের উপর জুলুম করে। তিনি তখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে উঠলেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي لَمْ أَمُرْهُمْ إِذْ يَظْلِمُوا خَلْقَكَ وَلَا يَتْرُكُوا حَقَّكَ -
- “হে আল্লাহ! আমি তাদের জুলুম-অত্যাচার এবং আপনার হক ত্যাগ করার নির্দেশ দেইনি।"

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 রাষ্ট্রীয় সম্পদ তিন প্রকার

📄 রাষ্ট্রীয় সম্পদ তিন প্রকার


এই পরিচ্ছেদের বিষয় বস্তুসমূহ: (১) গণীমতের মাল (তথা রণাঙ্গনে শত্রু পরিত্যক্ত সম্পদ), (২) সাদকা-খয়রাত, (৩) মাল-এ-ফাঈ। সকল পয়গম্বরের তুলনায় মহানবী (সা)-কে ৫টি অতিরিক্ত জিনিস দেয়া হয়েছে।
শ্রমজীবী দুর্বলদের কারণেই তোমরা যারা সবল তাদের খাদ্য জুটে এবং অন্যান্য সহায়তা মিলে। 'গানেম'দের (গনিমত লাভকারী) মধ্যেই মালে গণীমত বণ্টন করবে। বনী উমাইয়া, বনী আব্বাসও তাই করেছে।
কুরআন ও হাদীছে উল্লেখিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ তিন প্রকার। (১) গণীমতের মাল, (২) সাদকা-যাকাত, (৩) মাল-এ-ফাঈ। কাফেরদের সাথে লড়াইয়ের পর যেই সম্পদ হস্তগত হয়, তাকে মালে গণীমত বলা হয়। কুরআন মজীদের সূরা আনফালে মালে গণীমতের কথা আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন। বদর যুদ্ধের সময় এ সূরা নাযিল হয়েছিল। 'আনফাল' শব্দটি 'নফল' শব্দের বহুবচন। নফল অর্থ অতিরিক্ত, সূরার নাম 'আনফাল' রাখার কারণ ছিল, মুসলমানদের সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। যেমন: আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
يَسْتَلُوْنَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ - قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ.
“হে নবী! মুসলমান সৈনিকরা তোমার নিকট গণীমতের মাল (বণ্টনের) নিয়ম-বিধি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। তুমি তাদের বলে দাও যে, মালে গণীমত তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। (সূরা আনফাল : ১)
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ.
আর জেনে রেখো, যে সম্পদ তোমাদের হস্তগত হয়, তার এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ্র এবং তাঁর রাসূলের জন্য, রাসূলের নিকটাত্মীয় এবং ইয়াতীমদের জন্যে আর পরমুখাপেক্ষী ভিক্ষুক ও দুস্থ প্রবাসী মুসাফিরের জন্য।" (সূরা আনফাল: ৪১)
তিনি আরও ইরশাদ করেন-
فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
“গণীমতের যেসব মাল তোমাদের হস্তগত হয়, সেগুলো হালাল এবং পবিত্র জ্ঞানে ভক্ষণ করো আর আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান। (সূরা আনফাল : ৬৯)
সহীহ বুখারী এবং মুসলিম শরীফে হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন যে,
أُعْطِيْتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطِهِمْ نَبِيُّ نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيْرَةَ شَهْرٍ وَجُعِلَتْ لِي الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا فَأَيُّمَا رَجُلٌ مِنْ أُمَّتِي أَدْرَكَتْهُ الصَّلوةُ فَلْيُصَلِّ وَأُحِلَّتْ لِي الْغَنَائِمُ وَلَمْ تَحِلَّ لِأَحَدٍ قَبْلِي أُعْطَيْتُ الشَّفَاعَةَ وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً.
“এমন পাঁচটি জিনিস আমাকে দেয়া হয়েছে, যা ইতিপূর্বে আর কোনো নবীকে দেয়া করা হয়নি। (১) এক মাসের দূরত্বে (অবস্থান রত শত্রুর মনে) আমার ব্যক্তিত্বের ভীতি সৃষ্টির (মাধ্যমে) আমাকে বিজয় প্রদান করা হয়েছে। (২) গোটা ভূপৃষ্ঠকে আমার জন্যে মসজিদ এবং এর মাটিকে পবিত্রতা দানকারী বানানো হয়েছে। সুতরাং আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তির জীবদ্দশায় নামাযের সময় উপস্থিত হবে, সে যেন নামায আদায় করে নেয়। (৩) আমার জন্যে মালে গণীমত তথা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিত্যক্ত সম্পদ হালাল করা হয়েছে। আমার পূর্বে কারোর জন্যে তা হালাল ছিল না। (৪) আমাকে সুপারিশের অধিকার দেয়া হয়েছে। (৫) আমার পূর্বে নবী রাসূলদেরকে নিজ নিজ কওমের জন্যে প্রেরণ করা হতো আর আমি প্রেরিত হয়েছি গোটা বিশ্বমানবের জন্যে।”
মহানবী (সা) আরও ইরশাদ করেছেন যে,
بعِثْتُ بِالسَّيْفِ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ حَتَّى يَعْبُدُوا اللَّهَ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَجُعِلَ رِزْقِي تَحْتَ ظِلُّ رَمْحِي وَجُعِلَ الذُّلُّ وَالصِّغَارُ عَلَى مَنْ خَالَفَ أَمْرِي - وَمَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ.
'কিয়ামতকে সামনে রেখে আমি তরবারিসহ প্রেরিত হয়েছি, যেন মানুষ এক আল্লাহর ইবাদত করে যার কোনো শরীক নেই। আমার রিযিক আমার বল্লমের ছায়াতলে রাখা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধাচরণকারীর জন্যে রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা। যে অপর জাতির (ধর্মীয়) সাদৃশ্য অবলম্বন করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত রূপে গণ্য হবে। (মুসনাদে আহমদ)
অতএব, মালে গণীমতের বেলায় এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে ফরয। তার থেকে এ অংশ আলাদা করে আল্লাহর নির্দেশ মাফিক তা খরচ করবে। অবশিষ্ট মাল গণীমত আহরণকারীদের মধ্যে বিতরণ করবে। হযরত উমর ফারুক (রা)-এর উক্তি হলো, "তারাই মালে গণীমতের অধিকারী যারা জিহাদে অংশ গ্রহণ করে। চাই যুদ্ধ করুক বা না করুক। মালে গণীমত বণ্টনকালে কারোর পদমর্যাদা, কর্তৃত্ব- নেতৃত্বের পরোয়া করবে না। বংশ মর্যাদা বা আভিজাত্যের সামনেও ভীরুতা দেখাবে না। সম্পূর্ণ ন্যায় নীতি ও ইনসাফের সাথে এ মাল বণ্টন করবে। মহানবী (সা) ও তাঁর খলীফাগণ কি করতেন? সহীহ বুখারী শরীফে আছে যে, হযরত সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা) অন্যদের তুলনায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। যেমন, আল্লাহর রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন,
هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلَّا بِضُعَفَائِكُمْ.
“তোমাদের বিজয় এবং রিযিক প্রদান করা হয় তোমাদের দুর্বলদের অসিলায়।
মুসনাদে আহমদ হাদীস গ্রন্থে সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) সমীপে এ মর্মে আরয করলাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! জনৈক ব্যক্তি আপন কওমের মর্যাদা ও নেতৃত্ব বজায় রাখার লড়াই করছে। তাঁর অংশও কি অন্যদের মতোই সমান হওয়া উচিত? হুযূর (সা) বললেন-
ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ ابْنَ أُمِّ سَعْدٍ وَهَلْ تُرْزَقُوْنَ وَتُنْصَرُونَ إِلَّا بِضُعَفَائِكُمْ.
"হে ইবনে উম্মে সা'দ! তোমার মরে যাওয়াই শ্রেয়। তোমাদেরকে কি তোমাদের দুর্বলদের অসিলায় রিযিক ও বিজয় প্রদান করা হয় না?"
বনী উমাইয়া এবং বনী আব্বাসের শাসনামলে গণীমতের মাল আহরণকারীদের মধ্যেই বিলি-বণ্টন করা হতো। তখন মুসলমানরা রোম, তুরস্ক এবং বারবারদের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত থাকত। জিহাদে কেউ যদি দুঃসাহসিক কোনো কাজ করে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো অভিযান চালায় যেমন দুর্গ দখল করা, যদ্দরুন যুদ্ধ জয়ের পথ উন্মুক্ত হয় কিংবা শত্রুবাহিনীর নেতার উপর হামলা চালিয়ে দুশমনকে পরাস্ত করে অথবা অনুরূপ অন্য কোনো কাজ করে, তাহলে এহেন ব্যক্তিকে 'নুফল' বা অতিরিক্ত দেয়া যাবে। কেননা খোদ রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর খলীফাগণ 'নুফল' দিতেন। যেমন, 'বেদায়া' যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) 'খুমুস' (এক পঞ্চমাংশ) ছাড়াও এক চতুর্থাংশ আরও দিয়েছিলেন। তেমনি গাযওয়া-এ-রাজফায় 'খুমুস' এর অতিরিক্ত এক তৃতীয়াংশ দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে উলামা-এ-কিরামের মতভেদ আছে, কারও মতে 'নুফল' ও অতিরিক্ত দান 'খুমুস' তহবিল হতে দেয়া হবে। কারও মতে 'খুমুস-এর এক পঞ্চমাংশ থেকে দেয়া হবে, যেন যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী কারও উপর কারোর প্রাধান্য প্রকাশ না পায়।
সঠিক কথা হলো এই যে, খুমুস-এর এক চতুর্থাংশ থেকে নুফল ও অতিরিক্ত মালে গণীমত প্রদান করবে, তাতে কারোর উপর কারোর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলেও হতে পারে। তবে এই 'নুফল' প্রদান কোনো দ্বীনী স্বার্থেই হতে হবে- ব্যক্তির খেয়াল-খুশি বা স্বার্থপরতার তাতে কোনো স্থান নেই। মহানবী (সা) একই লক্ষ্যে কয়েকবার 'নুফল' প্রদান করেছেন। সিরীয় ফকীহগণ এবং ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আহমদ প্রমুখের মত হচ্ছে এটিই। এ মতের ভিত্তিতেই বলা হয়েছে যে, এক চতুর্থাংশ এবং এক তৃতীয়াংশ শর্তহীনভাবেই দিয়ে দেবে। এর অধিক পরিমাণ দিতে হলে তাতে শর্ত আরোপ করতে হবে। যেমন, নেতা কিংবা সেনাবাহিনীর সিপাহসালার বলবেন, "যে ব্যক্তি অমুক কিল্লাটি ধ্বংস করবে" অথবা "শত্রু দলের অমুককে হত্যা করবে, তাকে এটা দেয়া হবে। কারও কারও অভিমত হলো, নুফল এক তৃতীয়াংশের অধিক না দেয়া। তবে হাঁ শর্ত আরোপ করে দেয়া যাবে। এ দুটি অভিমত হচ্ছে ইমাম আহমদ ও অন্যদের।
সঠিক বর্ণনা মতে, নেতার জন্যে এটা বলা জায়েয আছে যে, “যে ব্যক্তি যে জিনিস নিয়েছে সেটি তারই"। বদর যুদ্ধে মহানবী (সা) এরূপ বলেছিলেন। তবে এটা তখনই বলা যায়, যদি কল্যাণের মাত্রা অধিক হয় এবং অসন্তোষের মাত্রা কম হয়।
ইমাম বা নেতা কারও পক্ষে কোনো প্রকার জুলুম, প্রতারণা, বাড়াবাড়ি কিংবা মালের ক্ষতি করার অধিকার নেই। কেউ এরূপ করলে কিয়ামতের দিন এজন্যে তাকে আল্লাহর কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে। কারণ, এ ধরনের কাজও খিয়ানত। মাল-এ-গণীমতের মধ্যে লুটতরাজ করাও নাজায়েয। যার যার খেয়াল খুশি মত লুটপাট করে গণীমতের মাল নিয়ে যাওয়া থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিমগণকে বিরত রেখেছেন।
গণীমতের মাল বণ্টন হবার পূর্বে যদি নেতা এই সাধারণ অনুমতি প্রদান করেন যে, "যে যেইটা হস্তগত করে নিয়েছো সেটা তারই” এটা তখনই জায়েয এবং হালাল হবে যদি তা 'খুমুস আদায় করার পর হয়ে থাকে। অনুমতির জন্যে বিশেষ কোনো শব্দ বা বাক্য নেই। যেভাবেই হোক নেতা বা ইমামের পক্ষ থেকে অনুমতি হলেই হবে। তবে যে ক্ষেত্রে সাধারণ অনুমতি দেয়া না হয়, তখন যদি কেউ কোনো জিনিস নেয়, ঐ অবস্থায় এতদূর ন্যায়নীতিবোধ নিয়ে কাজ করবে যে, অনুমতি পেলে তার ভাগে যে পরিমাণ মাল আসতো, ঠিক ঐ পরিমাণই সে গ্রহণ করতে পারে।
ইমাম যদি গণীমতের মাল সংগ্রহ করা বন্ধ করে দেন এবং অবস্থা কিছুটা এরূপই হয় যে, তিনি যেটা ইচ্ছা সিদ্ধান্ত নিবেন, তাহলে পরস্পর বিরোধী দুটি মত দেখা দিলে উভয়টিই বাদ দিবে এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে। কারণ আল্লাহর দ্বীনের পথ হচ্ছে মধ্যপন্থা।
মাল বণ্টনকালে ন্যায়-নীতি হচ্ছে এই যে, এক অংশ পাবে 'পেয়াদা' অর্থাৎ পদাতিক আর তিন অংশ পাবে ঘোড় সওয়ার বাহিনী যারা আরবী ঘোড়া রাখে। এক অংশ তার আর দুই অংশ ঘোড়ার। খায়বর যুদ্ধে মহানবী (সা) এরূপই করেছিলেন।
কোনো কোনো ফকীহ-এর মতে সওয়ার (আরোহী) পাবে দুই অংশ। এক অংশ থাকবে তার আর এক অংশ তার ঘোড়ার। তবে প্রথমোক্ত মতটিই সঠিক। সহীহ হাদীসও এ ব্যাপারে পোষকতা করে। কারণ ঘোড়ার সাথে তার সহিস ইত্যাদিও থাকে। তাই ঘোড়া অধিক সাহায্যের মুখাপেক্ষী। "পেয়াদা'র তুলনায় সহিস বা সওয়ারের দ্বারাই অধিক কল্যাণ সাধিত হয়।
কোনো কোনো ফকীহর অভিমত হলো, আরবী ঘোড়া এবং 'হাজীন' ঘোড়াকে সমান অংশ দিতে হবে। কারও মতে আরবী ঘোড়াকে দুই অংশ এবং হাজীন ঘোড়াকে এক অংশ দেবে। রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবা-এ-কিরাম থেকে এরূপ বর্ণিত আছে, 'হাজীন' ঐ ঘোড়াকে বলা হয় যার মা হচ্ছে ‘নাবতিয়া’- (১) তাকে ‘বিরযাওন' এবং ‘বাস্তরী’ও বলা হয়। ছিন্নমুষ্ক ও অছিন্নমুষ্ক উভয় ঘোড়ার একই হুকুম। যেই পুরুষ ঘোড়া মাদী ঘোড়ার উপর প্রজননে ব্যবহৃত হয়নি, অতীত যুগের লোকেরা তাকে অপেক্ষাকৃত অধিক গুরুত্ব দিত। কারণ এরূপ ঘোড়া অধিক শক্তিশালী এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন হয়ে থাকে।
গণীমতের মালের মধ্যে যদি মুসলমানের মাল থাকে- চাই সেটা জমিন হোক কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি- যা বণ্টনের পূর্বে অন্য মানুষও জানতো, তাহলে সে মাল তাকে ফেরত দিয়ে দেবে। এটা মুসলিম উম্মাহ্র সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
গণীমতের মাল এবং এর বণ্টন সম্পর্কিত অনেক বিধি বিধান রয়েছে। এ ব্যাপারে পূর্বসূরীদের পক্ষ থেকে রয়েছে অনেক বক্তব্য ও দৃষ্টান্ত। কোনটি সর্বসম্মত এবং কোনটিতে মত পার্থক্য রয়েছে, যেগুলোর আলোচনার অবকাশ এখানে কম। এখানে মোটামুটি মৌলিক ক'টি কথাই শুধু পেশ করা হয়েছে।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 যাকাতের খাতসমূহ

📄 যাকাতের খাতসমূহ


যাকাত ৮ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বণ্টন করবে
সাদকা এবং যাকাত ঐ সকল লোকের জন্যে, যাদের আল্লাহ তায়ালা কুরআন মজীদে সূরা আত-তাওবার ৬০নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে যাকাত চাইলে তিনি ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَرْضَ فِي الصَّدَقَةِ تَقْسِيمَ نَبِيٍّ وَلَا غَيْرِهِ وَلَكِنْ جَزَاهُ ثَمَانِيَةَ أَجْزَاء فَإِنْ كُنْتَ مِنْ تِلْكَ الْأَجْزَاءِ أَعْطَيْتُكَ.
"সাদকা এবং যাকাত বণ্টনে আল্লাহ তায়ালা কোনো নবী বা অপর কারো ইচ্ছাতে সম্মত না হয়ে নিজেই আট শ্রেণীর মানুষের মধ্যে তা বণ্টন করেছেন। তুমি ঐ আট শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হলে তোমাকেও দেবো।"
)১-২( اَلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينَ - ফকীর মিসকীন: তাদেরকে তাদের প্রয়োজন মতো দেবো। ধনী মালদারের জন্যে সাদকা ও যাকাত জায়েয নেই। সুস্থ সবল ব্যক্তি, যে কাজকর্ম করে খেতে পারে, তার জন্যেও সাদকা ও যাকাত জায়েয নেই। (এটি ইমাম ইবনে তাইমিয়ার নিজস্ব মত)
)৩( وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا - সাদকা যাকাত উসূলকারী: এগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণকারী এবং এ সম্পর্কিত বিষয়ের লেখক প্রমুখ সকলে এর মধ্যে শামিল।
)৪( وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ : যাদের হৃদয়কে দ্বীনের স্বার্থে আকৃষ্ট করা প্রয়োজন তাদের জন্যে। ফাইলব্ধ সম্পদের আলোচনায় আমি এর উল্লেখ করেছি।
)৫( وفي الرِّقَابِ : গোলাম আযাদ, কয়েদী মুক্তির ক্ষেত্রে সাদকা যাকাতের অর্থ ব্যয় করা। এটিই বলিষ্ঠ রায়।
)৬( وَالْغَارِمِينَ : করযদার ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের "গারেমীন" বলা হয়, যারা ঋণ এনে তা সময় মতো আদায় করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। তাদেরকে এ পরিমাণ দেবে, যদ্বারা তারা ঋণ পরিশোধে সক্ষম হয়। কোনো ব্যক্তি আল্লাহ্ অবাধ্যতা জনিত কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে, যে পর্যন্ত না সে তওবা করে ঐ কাজ থেকে বিরত হবে, তাকে গনীমতের মাল দেবে না।
وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ (৭) : আল্লাহর রাস্তায় নিবেদিত ব্যক্তি। এতে ঐ সকল লোক অন্তর্ভুক্ত যারা যোদ্ধা, যারা আল্লাহর মাল থেকে এ পরিমাণ পায়নি, যা তাদের প্রয়োজনে যথেষ্ট। আর যারা যুদ্ধে যেতে সক্ষম তাদেরকে এ পরিমাণ দেবে, যাতে তারা যুদ্ধে অংশ নিতে পারে কিংবা পুরোপুরি যুদ্ধ-সামগ্রীতে ব্যয় করতে এবং মজুরী আদায় করে দিতে পারে। হজ্জও ফী সাবীলিল্লাহ-এর অন্তর্ভুক্ত। রাসূল (সা)-এর উক্তিও এর প্রতি সমর্থন জানায়।
وَابْنِ السَّبِيلِ (৮) : ইবনুস সাবীল। দুস্থ প্রবাসী যে সফরে রত।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 গনীমতের মালের আলোচনা এবং কর্মকর্তাদের অবৈধ কমিশন প্রসঙ্গ

📄 গনীমতের মালের আলোচনা এবং কর্মকর্তাদের অবৈধ কমিশন প্রসঙ্গ


"মাল-এ-ফাঈ” কাকে বলে? তার ব্যয়ের খাত কি কি? মহানবীর যুগে আনুষ্ঠানিক অর্থ দফতর বা অর্থ বিভাগ ছিল না। তেমনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর যুগেও না। হযরত ওমরের যুগে যখন বিভিন্ন দেশ জয় হয় এবং মালে গণীমত হিসাবে অসংখ্য ধন-সম্পদ আসতে থাকে, তখন তিনি এজন্যে দিওয়ান (দফতর) খোলার নির্দেশ দেন। ঘুষ-রিশওয়াত সম্পূর্ণ হারাম। কর্মকর্তাদের কার্যসিদ্ধির মতলবে হাদিয়ার নামে যা দেয়া হবে, তাও রিশওয়াত বা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত。
"ফাঈ” সম্পর্কে সূরা হাশরের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো হচ্ছে মূল। বদর যুদ্ধের পর অনুষ্ঠিত বনী নযীরের যুদ্ধের সময় এসব আয়াত নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطَ رُسُلَهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُوْلِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ والرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ لا كَيْ لَا يَكُوْنَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ ، وَمَا أَتْكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَ وَمَا نَهُكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا ، وَاتَّقُوا اللَّهَ وَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ لِلْفُقَرَاءِ الْمُهْجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُوْنَ فَضْلاً مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنْصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ، أُولَئِكَ هُمُ الصَّدِقُوْنَ ، وَالَّذِينَ تَبَوَّقُ الدَّارَ وَالْإِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّوْنَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ، وَمَنْ يُوْقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ. وَالَّذِينَ جَاءُو مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوْبِنَا غِلا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ (سورة الحشر : ٦-١٠)
"আল্লাহ তায়ালা তাদের নিকট হতে তাঁর রাসূলকে বিনা যুদ্ধে যা প্রদান করেছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়া বা উটে আরোহণ করে যুদ্ধ করোনি, কিন্তু আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যাদের উপর ইচ্ছা তাদের ওপর কর্তৃত্ব দান করেছেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর অত্যাধিক ক্ষমতাশালী। আল্লাহ তায়ালা ঐ সকল জনপদবাসী থেকে যেসব সম্পদ তাঁর রাসূলকে দিয়ে দিয়েছেন, তা আল্লাহর এবং রাসূলের, রাসূলের নিকটাত্মীয়দের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও রিক্তহস্ত দুস্থ প্রবাসীদের হক। [এই হুকুম এজন্যেই প্রদান করা হয়েছে,] যেন তোমাদের মধ্যকার সম্পদশালীদের মধ্যে অর্থ সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে ঘুরপাক না খায়। (হে ঈমানদারগণ!) রাসূল তোমাদেরকে যা প্রদান করেন, তা তোমরা নিয়ে নাও আর যা গ্রহণে নিষেধ করেন, তা থেকে তোমরা বিরত থাকো। আল্লাহকে ভয় করো। কারণ- আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। [বিনা যুদ্ধে যেসব মাল হস্তগত হয়েছে, তাতে অন্যান্য হকদারের মধ্যে] মুহতাজ মুহাজিরদেরও হক রয়েছে, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় কাফিরদের জুলুম নিপীড়নের কারণে (হিজরত করে), নিজ বাসগৃহ ও সম্পদ-সম্পত্তি থেকে বেদখল হয়েছে, তারা এখন আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূলের সাহায্যে দৃঢ়পদে দণ্ডায়মান। এরাই সত্যিকারের মুসলমান, আর হ্যাঁ, তারাও বিনাযুদ্ধে হস্তগত সম্পদের হকদার যারা ইতিপূর্বে মদীনায় বসবাস করতো এবং ইসলামে প্রবেশ করেছে। তাদের নিকট যারা হিজরত করে এসেছে, তাদেরকে তারা ভালবাসে। গণীমতের মাল থেকে মুহাজিরদেরকে যা কিছু প্রদান করা হয়, এজন্যে তারা মনে কোনো প্রকার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। আপন অস্বচ্ছলতা সত্ত্বেও তারা মুহাজিরদেরকে (সুযোগ-সুবিধা প্রদানে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। নিজ প্রকৃতিকে যারা কার্পণ্য থেকে রক্ষা করে, তারাই সফলকাম আর ঐ সকল মানুষেরও এতে অধিকার রয়েছে, যারা প্রথম পর্যায়ের মুহাজিরদের পরে হিজরত করে এসেছে এবং এই বলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছে যে-
“হে পরোয়াদেগার! আমাদিগকে এবং আমাদের ঐ সকল ভাইকে আপনি মাফ করে দিন, যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছেন। যারা পূর্বে ঈমান এনেছেন, আমাদের অন্তরে যাতে ঐ সকল ব্যক্তির ব্যাপারে হিংসাবিদ্বেষ আমরা পোষণ না করি, (আমাদেরকে সেই তওফীক দান করুন।) হে আমাদের প্রভু! আপনি অতি দয়ালু, মেহেরবান।" (সূরা হাশর: ৬-১০)
আল্লাহ তায়ালা এসব আয়াতে মুহাজির, আনসার এবং ঐ সকল লোকের কথাও উল্লেখ করেছেন, যারা পরে এসব গুণ-বৈশিষ্টের অধিকারী হবে। সুতরাং তৃতীয় প্রকারে এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী প্রত্যেক ব্যক্তিই এতে শামিল, আর কিয়ামত পর্যন্তই এ হুকুম বিদ্যমান থাকবে।
وَالَّذِينَ آمَنُوا مِنْ بَعْدُ وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا مَعَكُمْ فَأُولَئِكَ مِنْكُمْ.
"যেসব লোক পরে ঈমান এনেছে এবং হিজরত করেছে ও তোমাদের সাথে জিহাদেও শরীক হয়েছে, তারা তো তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আনফাল : ৭৫) আল্লাহর এই বক্তব্যেও তাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ হয়েছে-
وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانِ
"আর যারা নিষ্ঠা সহকারে তাদের অনুসরণ করে। (সূরা তাওবা: ১০০) এই আয়াতটিতেও অনুরূপভাবেই তাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ হয়েছে-
وَأَخَرِيْنَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُوا بِهِمْ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.
"আর ঐ সকল লোক যারা এখনও তাদের সাথে শামিল হয়নি (তবে শেষ পর্যন্ত তাদের সাথে এসে মিলিত হবে)। আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।" (সূরা জুমুআ : ৩)
فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ অর্থাৎ তোমরা জিহাদের জন্য উট নিয়ে কোনো ছুটাছুটি ও তৎপরতা চালাওনি- জিহাদের উদ্দেশ্যে তোমাদের এসব পরিচালনা করতে হয়নি। ইসলামী আইনবিদগণ এ অর্থের প্রেক্ষিতেই বলেছেন যে, “কাফিরদের সাথে যুদ্ধ বিগ্রহ ছাড়া যে সম্পদ হাতে আসে তাকেই 'মাল-এ-ফাঈ' বলা হয়। أَوْ جَفْتُمْ শব্দটি ইজাফ হতে সংগঠিত। 'ইজাফ' অর্থ যুদ্ধ সংঘর্ষ। اَلْخَيْلُ وَالرَّكَابُ অর্থ হলো, ঘোড়া এবং উটসমূহ অর্থাৎ এগুলো চালনা করে তোমাদের যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়নি।
এ জাতীয় মালকে "ফাঈ” এজন্যে বলা হয় যে, আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদেরকে কাফিরদের কাছ থেকে বিনা যুদ্ধে এ মাল এনে দিয়েছেন।
মূল কথা হলো, আল্লাহ তায়ালা মাল দৌলত এজন্যে দিয়েছেন, যেন এসব ইবাদতের ক্ষেত্রে মানুষের সহায়ক হয়। বলাবাহুল্য, মানব সৃষ্টির মূল লক্ষ্যই হলো, আল্লাহর ইবাদত বা পূর্ণ দাসত্ব-আনুগত্য করা। সুতরাং কাফিররা যেহেতু আল্লাহর ইবাদত করে না এবং নিজেদের মাল সম্পদও আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করে না, এজন্যে (সত্যের পথে বাধা দানকারীদের) এ সম্পদকে مسلمانوں জন্যে হালাল ও জায়েয করা হয়েছে, যেন এ সম্পদের দ্বারা তাদের শক্তি সঞ্চয় হয় এবং তারা ইবাদত করতে পারে। কারণ মুসলমানরা একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করে থাকে।
সুতরাং 'মাল-এ-ফাঈ' তাদেরকে দেয়া হয়েছে, যারা এর হকদার ছিল। এটা এরূপ যেমন কারোর মীরাস বা উত্তরাধিকার ছিনিয়ে নেয়া হলে তার হক তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়, যদিও সেটা ইতিপূর্বে অপরের করায়ত্তে থাকে। অথবা এটা সেরূপ যেমন ইহুদী ও নাসারাদের নিকট থেকে জিযিয়া নেয়া হয় কিংবা ঐ মালের মতো, যদ্দ্বারা দুশমনের সাথে সন্ধি করা হয় অথবা এটা ঐ সম্পদের ন্যায় যা অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উপঢৌকন হিসাবে রাষ্ট্রপ্রধান পেয়ে থাকে। এটাকে সেই সম্পদের সাথেও তুলনা করা যায়, কোনো খৃষ্টান জনপদ বা অপর জনপদের উপর দিয়ে যাবার সময় সওয়ারীর ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্যভাবে যা ব্যয়িত হয়। মোটকথা, মাল-এ-ফাঈ মুসলমানদের জন্য হালাল ও জায়েয করা হয়েছে যেন মুসলমান এই সম্পদের দ্বারা শক্তি অর্জন করতে পারে এবং আল্লাহর ইবাদতে সমর্থ হয়।
শত্রু পক্ষের সওদাগর এবং ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে যা কিছু নেয়া হয়, সেটা হচ্ছে তাদের মোট সম্পদের এক দশমাংশ তথা উশর। এ সকল বণিক-সওদাগর যদি যিম্মী হয় এবং নিজ জনপদ থেকে বের হয়ে অপরের জনপদে গিয়ে ব্যবসায় বাণিজ্য করে, তাহলে তাদের নিকট থেকে উশরের অর্ধেক তথা বিংশতম অংশ গ্রহণ করবে। দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) তাই করতেন।
সন্ধি ভঙ্গকারীদের পক্ষ হতে দণ্ডস্বরূপ যে অর্থ গ্রহণ করা হয়, সেই অর্থও এরি মধ্যে শামিল। খারাজের মালও এরি অন্তর্ভুক্ত হবে, যা কাফিরদের উপর আরোপিত ছিল। যদিও এর মধ্য থেকে কিছু অংশ কোনো মুসলমানের উপরও আরোপিত হবে।
অতঃপর “মাল-এ-ফাঈ”-এর সাথে সকল প্রকার মাল জমা করা হবে। যে পরিমাণ সরকারী মাল থাকে, তার সবই مسلمانوں বায়তুল মালে জমা করা হবে। যেমন লা-ওয়ারিশ মাল। হয়তো কোনো মুসলমান মারা গেছে এবং তার কোনো ওয়ারিশ নেই অথবা ছিনতাইকৃত মাল কিংবা হাওলাতী বা আমানতী মাল যেগুলোর মালিকরা নিরুদ্দেশ। এ মাল জমিন হতে পারে কিংবা স্থাবর কোনো সম্পত্তি। এ ধরনের অন্যান্য মালসহ সবগুলোই मुसलमानों সম্পদ এবং এগুলো রাষ্ট্রীয় অর্থভাণ্ডার বায়তুল মালেই জমা করা হবে।
কুরআন মজীদে শুধু “মাল-এ-ফাঈ”-এর কথাই উল্লেখিত- অন্য মালের কথা উল্লেখ নেই। কারণ মহানবী (সা)-এর যুগে যেসব লোক মারা গেছে, তাদের উত্তরাধিকারী ছিল। সাহাবা-এ-কিরামের বংশ পরিচয় জানা ছিল। একবার কোনো এক গোত্রের জনৈক ব্যক্তি মারা গেলে মহানবী (সা) তার পরিত্যক্ত সম্পদ সংশ্লিষ্ট গোত্র প্রধানের হাওলা করেন। সে সরদার বংশ পরিচয়ের দিক থেকে তার দাদার নিকটাত্মীয় ছিল। ইমাম আহমদ প্রমুখ উলামা-এ-কিরামের এক অংশের এটিই অভিমত। ইমাম আহমদ (রহ) এর ব্যাখ্যা করেছেন। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে যদি তার উত্তরাধিকারী না থাকে, তাহলে তার উত্তরাধিকার তার আযাদকৃত গোলামকে দিয়ে দিবে। ইমাম আহমদের শিষ্যদের একটি বড় জামায়াত এ মতেরই অনুসারী।
কোনো ব্যক্তি মারা গেলে যদি তার উত্তরাধিকারী না থাকে, তাহলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের মধ্যে বণ্টন করে দেবে। মহানবী (সা) এবং খুলাফা-এ-রাশেদীনের অনুসৃত নীতি এটিই ছিল যে, মৃত বক্তি এবং তার উত্তরাধিকার দাবিদারদের মধ্যে আত্মীয়তার সামান্যতম সম্পর্কের প্রমাণই যথেষ্ট।
মুসলমানদের নিকট থেকে নিয়মিতভাবে যে মাল সংগ্রহ করা হতো, তা ছিল যাকাত। যাকাত ব্যতীত তাদের নিকট থেকে আর কিছু গ্রহণ করা হতো না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলতেন, মুসলমানকে জানমাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শরীক হতে হবে এবং আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে হবে।
মহানবী (সা) এবং হযরত আবু বকর (রা)-এর যুগে অধিকৃত মাল যা বণ্টন করা হতো এজন্যে কোনো পূর্ণাঙ্গ দেওয়ান বা দফতর ছিল না। বরং ন্যায়সঙ্গত পন্থায় মুসলমানদের মধ্যে তা বণ্টন করে দেয়া হতো। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর যুগে সম্পদ ও শাসন পরিধি উভয়েরই ব্যাপ্তি ঘটে। তখন যোদ্ধা, মুজাহিদীন এবং ভাতা প্রাপ্তদের জন্যে দেওয়ান এবং দফতর খোলা হয়। উমর (রা) খোদ এ দেওয়ান ও দফতর তৈরী করেন। তাতে মুজাহিদীন এবং নিয়মিত সেনাবাহিনীর নাম ঠিকানা লেখা থাকতো। এই দেওয়ান এবং দফতরই مسلمانوں জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময় বিষয়। বিভিন্ন শহর এবং জনপদ থেকে যে সকল খারাজ এবং 'ফাঈ' পাওয়া যেতো, তার দফতর আলাদা ছিল।
ফারুকী যুগে এবং তার পূর্বে সরকারী পর্যায়ে আগত সম্পদ তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। এক শ্রেণীর মালের উপর ইমাম ও আমীরের অধিকার ছিল। তিনিই এর অধিকারী বলে বিবেচিত হতেন। এর উপর আল্লাহর কিতাব, সুন্নাহ্ এবং মুসলিম উম্মাহ্র ইজমা (ঐক্যমত্য) রয়েছে। আর এক প্রকার মাল রয়েছে, যা গ্রহণ করা ইমাম এবং আমীরের জন্যে হারাম। যেমন, অপরাধে জড়িত থাকার কারণে যদি কাউকে হত্যা করা হয়, তাহলে তার সম্পদ অপর কোনো জনপদ থেকে বায়তুল মালের জন্যে উসূল করতে হবে, যদিও তার উত্তরাধিকারী থাকুক কিংবা সে কোনো 'হদ' বা শরয়ী দণ্ডপ্রাপ্ত হোক।
আর এক শ্রেণীর মাল আছে, যে ব্যাপারে ইজতিহাদ (বা প্রয়োগ বুদ্ধির) অবকাশ থাকে। এ ব্যাপারে উলামা-এ-কিরামের মতপার্থক্য রয়েছে। যেমন, কোনো ব্যক্তি সম্পদ রেখে মারা গেছে। তার নিকটাত্মীয় রয়েছে। কিন্তু তার ফুল ফুরূয বা আসাবা অথবা তৎসম পর্যায়ের কোনো ওয়ারিশ নেই। তাতে কি পন্থা অনুসৃত হবে, এ ব্যাপারে উলামা-এ-কিরামের মত ও পথের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
অধিকাংশ জনগণ জুলুম-নিপীড়নে জর্জরিত হয়। শাসনকর্তা ও উচ্চ সরকারী কর্মকর্তারা হালাল হারামের কোনো পরোয়া করে না। জনগণ থেকে কর উসূল করে থাকে। আবার জনগণও কোনো সময় নিজের কর্তব্য পালন থেকে বিরত থাকে। বায়তুল মালে সম্পদ সঞ্চয়ের পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে ফৌজ (সামরিক খাত) এবং কৃষি পেশায় নিয়োজিতদের উপর জুলুম হয়ে থাকে। অথবা জনগণ জিহাদ রূপ ফরয ছেড়ে দেয়। অপরদিকে রাষ্ট্রনায়করা বায়তুল মালে অর্থ জমা করেন। কিন্তু তাতে হালাল হারামের আদৌ লেহাজ করেন না। সরকারী অর্থ-সম্পদ অনাদায়ে জনগণকে শাস্তি দেন। মুবাহ এবং ওয়াজিব কাজ ছেড়ে দিয়ে এমন সব কাজে লিপ্ত হন, যা রাষ্ট্র পরিচালকদের জন্যে কিছুতেই হালাল বা জায়েয নয়।
মূল কথা হলো, কারোর নিকট যদি এমন মাল থাকে, যা রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা দেয়া তার উপর ফরয, কিন্তু ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সে তা আদায় করছে না, এমন ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে হবে। ঐ সকল মালের দৃষ্টান্ত হলো, যেমন, গচ্ছিত মাল, মুজারাবাত বা সমঅংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসায় বা কৃষিজাত মাল, ইয়াতীমের মাল কিংবা ওয়াকফকৃত মাল, বায়তুল মালের সম্পদ। ঋণ গ্রহীতা ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঋণ আদায় না করলে, তাকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে তার মাল বাজেয়াপ্ত করতে হবে। অথবা সে মালের জায়গার সন্ধান দেবে যে, অমুক জায়গায় আছে। অতঃপর যখন এটা নিঃসন্দেহ হওয়া যাবে, তার কাছে মাল আছে, তখন তাকে গ্রেফতার করবে। মালের সন্ধান না দেয়া পর্যন্ত তাকে আটক রাখবে। অবশ্য প্রহার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু মালের সন্ধান দান কিংবা ঋণ পরিশোধের জন্যে তাকে প্রহার করবে, যেন হকদারের হক আদায় করে দেয় কিংবা আদায় করা সম্ভব হয়। 'নাফকা-এ-ওয়াজিবা' তথা 'অবশ্য দেয়' খোরপোশের ক্ষেত্রেও একই হুকুম, যদি বিবাদী খোরপোশ দিতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তা আদায় না করে। মহানবী (সা) থেকে উরওয়া ইবনে শারীদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বলেছেন-
الْوَاحِدُ يَحِلُّ عَرْضَهُ وَعَقُوبَتُهُ.
"সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি পাওনা দেয় না, তার মাল জব্দ এবং তাকে শাস্তি দান বৈধ।"
সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে আছে- .مَطْلُ الْغَنِيُّ ظُلْمٌ
"প্রাপ্য অনাদায়কারী বিত্তশালী জালেম।"
হকদারের হক আদায়ে গড়িমসি করাটাও হক না দেয়ার নামান্তর এবং জুলুম। আর জালেম ব্যক্তি অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধী। এটা সর্বস্বীকৃত কথা যে, হারামে লিপ্ত এবং ওয়াজিব তরককারী শাস্তিযোগ্য। অতএব শরীয়তে যদি তার শাস্তি নির্ধারিত না থাকে, তাহলে 'উলুল আমর' বা নেতা এ ব্যাপারে ইজতিহাদের আশ্রয় নিবেন। হক অনাদায়কারী বিত্তবানকে শাস্তি দেবেন। যে অনাদায়ে জেদ ধরে তাকে দৈহিক শাস্তি দেবে, যেন তা আদায়ে বাধ্য হয়। এ ব্যাপারে ফকীহদের স্পষ্ট অভিমত রয়েছে। ইমাম মালিকের শিষ্যবর্গ এবং ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমদ এর পূর্ণ ব্যবস্থা প্রদান করেছেন। এতে কারোর দ্বিমত নেই। এটি সর্বস্বীকৃত বিষয়।
ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে ইবনে উমরের একটি রিওয়ায়েত উল্লেখ করেন। তাতে ইবনে উমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন খায়বরের ইহুদীদের সোনা, রূপা এবং অস্ত্র-শস্ত্রের বদলে তাদের সাথে সন্ধি করেন, তখন কোনো কোনো ইহুদী রাসূলুল্লাহ (সা)-কে হুই ইবনে আখতাবের ধনভাণ্ডার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, তখন হুযুর (সা) ইরশাদ করেন- - أَذْهَبَتْهُ النَّفَقَاتُ وَالْحُرُوبُ
"ঐ সকল সম্পদ খরচ হয়ে গেছে আর যুদ্ধে সব নিয়ে গেছে।"
ইহুদী নেতা সাঈদ (হুই ইবনে আখতাবের চাচা) রাসূল (সা)-কে বলল, আপনার সাথে তো এখন চুক্তি হলো আর চুক্তির ভিত্তিতে এ মালের পরিমাণ অনেক বেশী। রাসুলুল্লাহ (সা) সাঈদকে হযরত যুবায়েরের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি সাঈদকে শাস্তি দেন। বর্ণনাকারী বলেছেন, আমি হুই ইবনে আখতাবকে বিরান ভূমিতে ঘুরাফেরা করতে দেখেছি। তখন লোকজন সেখানে গিয়ে সবকিছু ভালভাবে দেখলো। তারা ঐ বিরান ভূমি থেকে অনেকগুলো মশক বের করে আনলো। উল্লেখ্য যে, ঐ ব্যক্তি ছিল যিম্মী আর কোনো অপরাধ ব্যতীত যিম্মীকে শাস্তি দেয়া যায় না। শাস্তির এ নির্দেশ হচ্ছে এমন সব ব্যক্তির জন্যে, যারা অত্যাবশ্যকীয় জিনিস গোপন করার অপরাধে অপরাধী। সুতরাং ওয়াজিব তরকের ভিত্তিতে সে শাস্তিযোগ্য।
অর্থ বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্যায়ভাবে মুসলিম জনগণের যেই অর্থ-সম্পদ উসূল করে, ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্বের জন্য ফরয হলো, ঐ সকল অফিসার হতে অন্যায়ভাবে আদায়কৃত মালসমূহ বাজেয়াপ্ত করা। হাদিয়া, তোহফা, সালামী, উপঢৌকনের নামে ঐ সকল কর্মকর্তা (অফিসার) নিজ নিজ শাসনামলে ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা জনগণের ঐ অর্থ-সম্পদ কুক্ষিগত করেছিল। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন- هَدَايَا الْعُمَّالِ غُلُولٌ.
এ ক্ষেত্রে হাদিয়া, উপঢৌকন হচ্ছে, অন্যায়ভাবে জোরপূর্বক আদায় কৃত জনসম্পদ, যা এক শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্তারা করে থাকেন।
ইবরাহীম হারাবী (রহ) তার كتاب الهدايا "কিতাবুল হিদায়া" গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা) থেকে রিওয়ায়েত করেন-
إِنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ هَدَايَةِ الْأَمْرَاءِ غُلُولٌ.
"রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন যে, শাসকদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত হাদিয়া, তোহফা হচ্ছে আমানতে খেয়ানত এবং জোরপূর্বক জনসম্পদ আদায় করার নাম।"
সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে আবূ হামীদ সাঈদী (রহ) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) 'আযদ' গোত্রের ইবনুল্লা তবিয়া নামক এক ব্যক্তিকে যাকাত উসূলকারী কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। সে এসে হযরতের সামনে যাকাতের মাল রেখে বললো, এ মাল হচ্ছে আপনার, আর ঐগুলো হচ্ছে আমার, যা হাদিয়াস্বরূপ মানুষ আমাকে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন-
مَا بَالُ الرَّجُلِ نَسْتَعْمِلُهُ عَلَى الْعَمَلِ مِمَّا وَلَانَا اللهُ فَيَقُولُ هَذَا لَكُمْ وَهَذَا أَهْدِى إِلَى فَهَلَّا جَلَسَ فِي بَيْتِ أَبِيْهِ أَوْبَيْتِ أُمِّهِ فَيَنْظُرَ أَيَهْدِى إِلَيْهِ أَمْ لَا - وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يَأْخُذُ مِنْهُ شَيْئًا إِلا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَحْمِلُهُ عَلَى رَقَبَتِهِ إِنْ كَانَ بَعِيْرًا لَهُ رُغَاء أَوْ بَقَرَةٌ لَهَا خُوَارٌ أَوْ شَاةٌ تَبْعَرُ ثُمَّ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى رَأَيْنَا عَفْرَ إِبطَيْهِ - اَللَّهُمَّ هَلْ بَلَغْتُ اَللَّهُمَّ هَلْ بَلَغْتُ ثَلَاثًا. (بخارى ومسلم)
"এ ব্যক্তি কেমন লোক! তাকে আমরা কাজের দায়িত্ব দিয়েছি, যে কাজের দায়িত্ব আল্লাহ আমাদের উপর ন্যস্ত করেছেন। সে এখন বলছে, এটা আপনার মাল আর ওটা আমাকে 'হাদিয়া'স্বরূপ প্রদান করা হয়েছে। সে তার পিতা-মাতার বাড়ী গিয়ে বসে থেকে দেখুক না, তার কাছে হাদিয়া-উপঢৌকন পৌঁছে কিনা? সেই মহান সত্তার কসম, যার কুদরতী হাতে আমার জান, ঐ ব্যক্তি যে জিনিসই গ্রহণ করুক না কেন, কিয়ামতের দিন তা তার ঘাড়ে সওয়ার হবে। উট হলে সেটা চীৎকার দিতে থাকবে, মুখে ফেনা বের হবে আর গাভী হলে সেটা হাম্বা করবে এবং বকরী হলে করবে ভ্যাঁ, ভ্যাঁ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের বাহুযুগল উপরে এতদূর উত্তোলন করেন যে, আমরা তাঁর বগলদ্বয় দেখতে পাই। তিনি তিনবার বললেন, হে আল্লাহ! আমি কি (আপনার বাণী) পৌঁছে দিয়েছি, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?” (বুখারী ও মুসলিম)
হাদীসটির উল্লেখিত মর্ম সমাজের বিভিন্ন স্তরের ঐ সকল "উলূল আমর" (আঞ্চলিক শাসক-প্রশাসনিক কর্মকর্তা)-এর বেলায়ও প্রযোজ্য, যারা ঘুষ, হাদিয়া-তোহফা ইত্যাদি নিয়ে কারোর কাজে সাহায্য করে। যেমন, (অফিসে) ব্যবসায়-বাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, চাকুরী ও বেতনের প্রশ্নে, মুজারাবাত, মুসাকাত, মুযারায়াত ইত্যাদিতে এ ধরনের কাজে-কারবারে উপকার করা হলে, এখানেও একই হুকুম প্রযোজ্য হবে। এ কারনেই হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) কোনো কোনো কর্মচারীর বেতন অর্ধেকে হ্রাস করে দিয়েছিলেন। তাদের মাল-সম্পদ থাকলেও তারা ঋণীও ছিল। আবার খেয়ানতকারী হিসাবেও তারা অভিযুক্ত ছিল না। তাঁর কর্মচারীদের সাথে এই আচরণ করার কারণ ছিল এই যে, তারা কর্মকর্তা হিসাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে হাদিয়া-তোহফা নিয়েছিল। হযরত উমর (রা) তাদেরকে গভর্ণর ও কর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন। তাই তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ নেতা ও শাসক হিসাবে সম্পদের সঠিক বন্টন নিশ্চিত করণার্থে (প্রশাসনে স্বচ্ছতা বিধান এবং আর্থ-সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে) এ ধরনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
শাসক ও জনগণের মধ্যে বিকৃতি দেখা দিলে প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হলো, আপন আপন কর্তব্যসমূহ যথাযথ পালনে সচেষ্ট হওয়া। হারাম বর্জন করা এবং আল্লাহ যে কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন, তা হারাম মনে না করা।
সরকারী কর্মকর্তাদের উপঢৌকন না দিলে অনেক সময় জনগণকে বিপদের কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। উপঢৌকন না দেয়া হলে ঐ সকল কর্মকর্তার জুলুম-নিপীড়ন থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। তারপরও তারা এভাবে মানুষের উপর জুলুম-অত্যাচার চালিয়েই নিজেদের দায়িত্ব পালন করে। জোর করে তাদের থেকে অধিক (কর) যাকাতের মাল আদায় করে। বৈষয়িক স্বার্থে নিজের আখিরাতকে সর্বনাশ করে। যে ব্যক্তি এভাবে অপরকে বৈষয়িক শান্তি ও আনন্দ দানের জন্যে এরূপ করে, সে তার আখিরাতকে বিনষ্ট করে। তার কর্তব্য ছিল যথাসম্ভব জুলুমের প্রতিরোধ করা। জনগণের সুযোগ সুবিধার প্রতি লক্ষ্য দেওয়া। মানুষের অভাব অভিযোগ দূর করা। রাষ্ট্রপ্রধানকে জনগণের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা। জনগণের কোনো অংশ অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইলে, তা থেকে সমাজকে রক্ষা করা।
রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
أَبْلِقُونِي حَاجَةَ مَنْ لا يَسْتَطِيعُ إِبْلَاغَهَا فَإِنَّهُ مَنْ أَبْلَغَ ذَا السُّلْطَانِ حَاجَةَ مَنْ لَا يَسْتَطِيعُ ابْلَاغَهَا ثَبَّتَ اللَّهُ قَدَمَيْهِ عَلَى الصِّرَاطِ يَوْمَ تَزِلُّ الْأَقْدَامُ.
"যারা নিজেদের অভাব-অভিযোগের কথা আমার কাছে পৌঁছাতে পারে না, তোমরা তাদের অভাব-অভিযোগ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবে। কারণ, যারা জনগণের অভাব-অভিযোগের প্রতি শাসন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, আল্লাহ তা'আলা পুলসিরাতে তাদের পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন- বড় বড় ব্যক্তির পাও সেদিন (পরিস্থিতির ভয়াবহতায়) কাঁপতে থাকবে।"
ইমাম আহমদ (রহ) এবং সুনানে আবূ দাউদের মধ্যে আবূ 'উমামা বাহেলী কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন- مَنْ شَفَعَ لأَحَدٍ شَفَاعَةً فَأَهْدِى لَهُ عَلَيْهَا هَدْيَةً فَيَقْبَلُهَا فَقَدْ أَتَى بَابًا عَظِيمًا مِنْ أَبْوَابِ الرِّبَا.
"কোনো ব্যক্তি যদি অপর কোনো ভাইয়ের জন্যে সুপারিশ করে আর তার বিনিময়ে সে কোনো উপঢৌকন পাঠায় এবং ব্যক্তিটি সেটা গ্রহণ করে, তাহলে সে সুদের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলো।"
ইবরাহীম হারবী (রহ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে তার প্রয়োজন পূরণের অনুরোধ জানালো। সে তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিলে অপরজন হাদিয়া পাঠালো আর সে তা কবুল করে নিল। তাহলে এটা হারাম হলো।
হযরত মাসরূক কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, তিনি ইবনে যিয়াদের সাথে কোনো একটি জুলুমের ব্যাপারে কথা বলেছিলেন। অতঃপর ইবনে যিয়াদ সেই জুলুম বন্ধ করেন। তাতে মাসরূক সন্তুষ্ট হয়ে একটি গোলাম হাদিয়াস্বরূপ তাঁর নিকট পাঠান। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-কে বলতে শুনেছি যে, কোনো মুসলমানের উপর থেকে কোনো জুলুম বা অন্যায় দূরীভূত হলে, এর বিনিময়ে যদি সে কম হোক বা বেশি কোনো কিছু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রদান করে, তাহলে সেটা হারাম হবে। ইবনে যিয়াদ বলেন, আমি বললাম, হে আবদুর রহমান! আমরা তো এখন সুহৃৎ (অবৈধ লেন-দেন) ছাড়া কিছুই বুঝি না। তিনি জবাব দিলেন, ঘুষ বা রিশওয়াত তো কুফরী।
অতএব কোনো শাসনকর্তা বা উচ্চ কর্মচারী যদি নিজের জন্যে কর্মচারীদের নিকট থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করে, যা ঐ ব্যক্তির নিজের ও পরিবারের জন্যে নির্দিষ্ট করা ছিল, এমতাবস্থায় দাতা গ্রহীতা উভয়ের কাউকেই সাহায্য করা উচিত নয়। উভয়ই জালেম। এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, এক চোর কর্তৃক অপর চোরের মাল চুরি করার মতো। অথবা এমন দু'টি দলের লড়াইর মতো, যারা নিজেদের বংশ গৌরব এবং নেতৃত্ব ও ক্ষমতার জন্যে লড়াই করছে। এমন সময় জুলুমের সহযোগিতাকরণ কিছুতেই জায়েয নহে। কারণ, সহযোগিতা দু'ধরনের হয়ে থাকে :
১. সৎ এবং তাকওয়া-পরহেযগারীর কাজে সাহায্য করা, যেমন জিহাদ করা, শরী'আতী দণ্ডবিধি সমাজে কায়েম করা। হকুকুল ইবাদ তথা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, হকদারকে হক প্রদানের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এ ধরনের সহযোগিতা করার জন্যে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ পাক এবং তাঁর রাসূল (সা) এ সহযোগিতাকে ফরয করে দিয়েছেন। কোনো প্রকার ভীতি সন্ত্রাসের কারণে কেউ সৎ ও নেকীর কাজ থেকে বিরত হলে এবং জালিমের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লে, তখন অন্য মুসলমানরা মজলুমের সাহায্যে এগিয়ে না আসলে এটা ফরযে আইন ও ফরযে কেফায়া ছেড়ে দেয়ার অপরাধ হবে। নিজ খোশ-খেয়ালে যদি কেউ এটা মনে করে যে, সে তাকওয়া পরহেযগারীর অধিকারী, এজন্যে ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকার দরকার, তাহলে এ পরিস্থিতিতে যদি সে মজলুমকে সাহায্য না করে, এতে সে ফরয তরকের অপরাধে অপরাধী বলে গণ্য হবে। ভীরুতা এবং পরহেযগারীর মধ্যে অনেক সময় বিভ্রান্তি ঘটে। ভীরুতা বশতঃ যেমন কেউ (ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়) অপরের সাহায্য থেকে বিরত থাকে, তেমনি নির্লিপ্ত ভূমিকাকেও পরহেযগারী মনে করা হয়।
২. এ শ্রেণীর সহযোগিতা গুনাহ এবং আল্লাহর অবাধ্যতা। যেমন, মাসূম নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা কিংবা তার মাল লুট ও ছিনতাই করা। যে প্রহারের অপরাধ করেনি, তাকে প্রহার করা। এ ধরনের অপরাধমূলক কাজে সাহায্য সহযোগিতা করা আর গুনাহের কাজে সাহায্য সহযোগিতা একই কথা। এ জাতীয় সাহায্য সহযোগিতা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল হারাম করে দিয়েছেন।
অবশ্য অন্যায়ভাবে যদি কেনো জনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয় বা ছিনিয়ে আনা হয়, যা পরে নানা কারণে এর মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অসম্ভব হয়, তাহলে সে সম্পদ জনকল্যাণে ব্যয় করাটাও তাকওয়া এবং পুণ্য কর্মের শামিল। এ জাতীয় সরকারী সম্পদ مسلمانوں কল্যাণে ব্যয় করা উচিত। যেমন জিহাদ, জিহাদের জন্যে বিভিন্ন মোর্চা তৈরির কাজ কিংবা মুজাহিদীন তথা সামরিক প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় ইত্যাদি তাকওয়া ও পুণ্য কর্মের অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রের ব্যয়ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতারই কাজ। কেননা, শাসক অন্যায়ভাবে যাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে, তারা বা তাদের কোনো উত্তরাধিকারীর অনুপস্থিতিতে এ সম্পদ এখন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা শাসকের উপর ফরয। সাথে সাথে শাসককে আল্লাহর কাছে অনুতাপ অনুশোচনা করে তওবা করতে হবে। এটিই সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলামী আইনবিদদের অভিমত। ইমাম মালিক, ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম আহমদ প্রমুখের একই মত। অনেক সাহাবা-এ-কিরাম থেকেও এটা বর্ণিত আছে। শারঈ দলীল প্রমাণাদিও এই অভিমতের সমর্থন করে।
(অবৈধভাবে আদায়কৃত) মাল অপর কেউ যদি নিয়ে নেয়, তাহলে শাসকের উপর ফরয হলো, তা (উদ্ধার করে) যার মাল তাকে বা তার উত্তরাধিকারীদেরকে ফেরত দেয়া কিংবা সেটা তাদের কল্যাণে ব্যয় করা। অথবা তাদের অনুপস্থিতিতে মুসলমানদের কল্যাণমূলক কোনো কাজে লাগানো। সম্পদ বিনষ্ট করার চাইতে مسلمانوں কল্যাণে ব্যয় করা অতি শ্রেয়। কারণ, আল্লাহর একথার উপরই শরীয়আত নির্ভরশীল-
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ. "যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।” (তাগাবুন: ১৬)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ. “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর ব্যাপারে যতদূর সাবধান হওয়া আবশ্যক, সাবধান হও।"
এর ব্যাখ্যা নির্ভর করছে মহানবী (সা)-এর নিম্নোল্লেখিত হাদীসের উপর-
إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ. "আমি যখন তোমাদের কোনো ব্যাপারে নির্দেশ দেই, তোমরা সেটা সম্পাদনে যথাসাধ্য চেষ্টা করো।"
সামাজিক কল্যাণ প্রচেষ্টার লক্ষ্যমাত্রায় উপনীত হওয়া এবং সমাজ থেকে পুরোপুরি অশান্তি দূরীভূত হওয়া কিংবা হ্রাস পাওয়া, সবকিছু নির্ভরশীল হচ্ছে যথাক্রমে উপরোল্লিখিত আয়াত এবং হাদীসের দাবী বাস্তবায়নের উপর।
সমাজে কল্যাণ এবং অকল্যাণের সংঘাত দেখা দিলে, কল্যাণকর দু'টি বিষয়ের মধ্যে যেটি অপেক্ষাকৃত অধিক কল্যাণকর সেটিই গ্রহণ করবে। ক্ষতির মধ্যেও যেটি বেশি ক্ষতিকর, সেটিই পরিহার করবে।
যেই ব্যক্তি জালিমকে সাহায্য করে সে গুনাহ এবং আল্লাহর অবাধ্য কাজের সাহায্যকারী। 'পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মজলুমকে সাহায্য করে কিংবা কোনো জুলুম নির্যাতনের পরিমাণ হ্রাস করার ব্যাপারে সহায়তা করে অথবা জুলুম অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণে সচেষ্ট থাকে, তাহলে সে মজলুমের উকিল ও প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করলো- জালিম বা অত্যাচারীর নয়। এটা সেই ব্যক্তিরই অনুরূপ যে ঋণ দিয়েছে কিংবা জালিমের জুলুম থেকে বাঁচানোর জন্যে কারোর সম্পদের প্রতিনিধি হয়েছে। যেমন ইয়াতীমের মাল, ওয়াকফ সম্পত্তির মাল। এসব মালে হয়তো অন্যায়ভাবে কোনো জালিম ভাগ বসাতে চায়, সে অবস্থায় এর মুতাওয়াল্লী অক্ষমতা হেতু কিছু না দিয়ে পারছে না, কিন্তু সে যথাসম্ভব কম দেয়ার চেষ্টা করেছে, এমতাবস্থায় মুতাওয়াল্লী পূর্ণ চেষ্টা চালিয়ে যদি কিছুটাও কম দিতে পারে, সেটা পুণ্যবানের কাজ হবে। (তবে ঐ জালিম সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে সরকারী প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা ও জন-প্রতিরোধ আবশ্যক।)
এই নির্দেশের অধীন সেই উকিল বা প্রতিনিধিও অন্তর্ভুক্ত যে মাল আদায় করার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করে থাকে, তা লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে অংশ গ্রহণ করে। যে ব্যক্তি মাল বাজেয়াপ্তকরণে এবং তা দেয়ার কাজে অংশ নেয় তারও একই হুকুম।
কোনো জনপদ, গ্রাম, অথবা রাস্তাঘাট, বাজার কিংবা শহরে যদি কোনো অন্যায় বা জুলুম হতে থাকে আর কোনো পরোপকারী ব্যক্তি সেই জুলুম প্রতিরোধে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেয় এবং সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করে, কোনো ঘুষ গ্রহণ ব্যতিরেকে ইনসাফ ন্যায়-নীতির সাথে হকদারকে হক দিতে চেষ্টা করে আর ভর্ৎসনাকারীদের ভর্ৎসনা উপেক্ষা করে নির্ভীকভাবে একাজ করে, তাহলে সেও পরোপকারী এবং পুণ্যকর্মশীল।
কিন্তু আজকাল যে কেউ এ জাতীয় মহৎ কাজে অন্যায় হস্তক্ষেপ করে, সে ঐ জালিমেরই প্রতিনিধি হয়ে সহায়তা করে। জালিমকে ভয় করে, বিচারপ্রার্থী থেকে ঘুষ গ্রহণ করে, এজন্যে গর্ববোধও করে, যার থেকে যা পায় অর্থ গ্রহণ করে। এরা জালিম- এদের স্থান জাহান্নাম ছাড়া আর কোথায় হতে পারে? তাদের সহযোগীরাও জাহান্নামী। তাদেরকে অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00