📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 জনপ্রদি সাহসী নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব

📄 জনপ্রদি সাহসী নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব


যার চরিত্রে ক্ষমতা ও বিশ্বস্ততা- এ দুটি মহৎ গুণের সমন্বয় ঘটেছে, এমন লোকের সংখ্যা আজকের দুনিয়ায় খুব কমই দেখা যায়। এমন দু'জন ব্যক্তি যাদের একজন বিশ্বস্ত অপরজন শক্তিমান- এ দু'জনের মধ্যে তাকেই কর্তৃত্ব নেতৃত্ব দেয়া উচিত যার দ্বারা দেশ ও জাতি ক্ষতির সম্মুখীন হয় না। ইমাম আহমদ (রহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এমন দু'জন লোক যাদের একজন সাহসী ও রণনিপুণ কিন্তু কাজে পাপাচারী, অপরজন সৎ ও সাধু কিন্তু ভীরু এবং সাহসহীন, কার সাথে থেকে জেহাদ করা বাঞ্ছনীয়? তিনি জবাবে বলেছিলেন, রণনিপুণ সবল ব্যক্তি 'ফাজের' হলেও তার সাথে থেকেই জেহাদ করবে। কেননা, তার শক্তি এখানে মুসলমানের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে আর তার পাপ তার নিজের জীবনের জন্যে। সৎ সাধু ব্যক্তির ব্যাপারটি সম্পূর্ণ তার বিপরীত।
শক্তি সাহস ও বিশ্বস্ততা এ দু'টি মহৎ গুণের অধিকারী ব্যক্তির সংখ্যা আজকাল নেহায়েত কম। এ কারণেই হযরত উমর (রা) দু'আ করতেন:
- اللَّهُمَّ أَشْكُرْ إِلَيْكَ جَلْدَ الْفَاجِرِ وَعِجْزَ الْبُقَةِ .
“হে আল্লাহ! তোমার কাছে পাপাচারীর নিষ্ঠুরতা এবং ভীরুর অক্ষমতার অভিযোগ জানাচ্ছি। (এ দুয়ের হাত থেকেই রক্ষা করুন।)"
অতএব যে কোন দেশ ও ভূখণ্ডের জন্যে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা হিসাবে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব অনুসন্ধান করা উচিত। কোন দেশের নেতা যদি শাসনকর্তা বা প্রশাসক নিয়োগের ইচ্ছা করেন, তখন তার কর্তব্য হবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বা দেশের সব চাইতে উত্তম ব্যক্তিকে এ দায়িত্ব প্রদান করা আর যদি এমন দু'জন থাকে যাদের একজন বিশ্বস্ত অপরজন শক্তিধর সাহসী, তখন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগের ব্যাপারে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, কোন অঞ্চল বা রাজ্যের শাসন প্রশাসনে এ গুণদ্বয়ের ভারসাম্যপূর্ণ কর্তৃত্বের দ্বারা দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত এবং ক্ষতির মাত্রা হ্রাস পাবে।
সুতরাং সমর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকেই মনোনীত করা উচিত যিনি বা যারা শক্তি সাহস ও বীরত্বের অধিকারী। তুলনামূলকভাবে তার আমল কিছুটা কম হলেও দুর্বল সমরনেতৃত্বের চাইতে সাহসী ব্যক্তিকেই যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেবে।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এমন দু'জন ব্যক্তি আছে উভয়ই লড়াইয়ের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের একজন ‘ফাজের’ তথা পাপাচারী তবে সে অধিক শক্তি সাহসের অধিকারী আর অপরজন সৎ সাধু বটে কিন্তু দুর্বলমনা। এমতাবস্থায় উভয়ের মধ্যে কার নেতৃত্বে লড়াই করা উচিত। তিনি জবাবে বললেন, ফাজেরের বলিষ্ঠতা ও শক্তিমত্তা মুসলমানদের কল্যাণার্থে আর তার ‘ফুজুর’ বা পাপাচার নিজ জীবনের জন্যে। সৎ সাধু ব্যক্তি দুর্বল হলে তার সেই সততা ও সাধুতা তার জন্য নিজের কিন্তু দুর্বল হওয়ার কারণে সে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় দুর্বলতার নিমিত্ত হবে।
অতএব শক্তিধর সমরানায়ক ‘ফাজের’ হলেও তার সাথে থেকেই জিহাদ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইরশাদ :
إِنَّ اللَّهَ يُؤَيِّدُ هُذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ -
“আল্লাহ তায়ালা ‘ফাজের’ লোক দ্বারাও তাঁর দীনের সাহায্য নেন।” (অপর এক রেওয়ায়তে بِأَقْوامِ لاَخَلاقَ لَهُمْ بالرَّجُلِ الْفَاجِر “এমন সব ব্যক্তি ও সম্প্রদায়র্কে দিয়েও তাঁর দীনের সাহায্য করান, যাদের নেক কাজে অংশ নেই।)
সুতরাং যখন নির্ভীক কোন সমরনায়ক না পাওয়া যায় এবং তার স্থলাভিষিক্ত করার মতো এমন কোন সেনাপতি না মিলে, তখন দীনী দিক থেকে অধিক যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকেই উক্ত পদে নিয়োজিত করবে। মহানবী (সা) খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে (রা) ইসলামের সেনাধ্যক্ষ করেছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই এ দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর সম্পর্কে মহানবী (সা) বলতেন-
سَيْفُ سَلَّهُ اللهُ عَلَى الْمُشْرِكِينَ -
“খালিদ এমন এক তরবারী যা আল্লাহ মুশরিকদের নিপাত করার জন্যে উন্মুক্ত করেছেন।"
তা সত্ত্বেও হযরত খালিদ (রা) কর্তৃক এমন দু'একটি ঘটনা ঘটেছে যা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অপছন্দনীয় ছিল। যেমন একবার আল্লাহর রাসূল (সা) আসমানের দিকে হাত উত্তোলন করে বলেছিলেন:
اللَّهُمَّ أَبْرَأَ إِلَيْكَ مِمَّا فَعَلَ خَالِدُ -
“হে আল্লাহ! খালিদ (যুদ্ধ ক্ষেত্রে) যা কিছু (বাড়াবাড়ি) করে ফেলেছে, আমি এ ব্যাপারে অব্যাহতি চাই।"
মহানবী (সা) এ দোয়াটি তখন উচ্চারণ করেছিলেন, যখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা) জুযায়মা গোত্রের লোকদের ঈমান সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে সেখানকার কিছু লোককে হত্যা করে ফেলেছিলেন আর তাদের অর্থ-সম্পদ ছিনিয়ে এনেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। তাঁর সাথে অপরাপর যেসব সম্মানিত সাহাবী ছিলেন- তাঁরা হযরত খালিদকে তা করতে বারণ করেছিলেন। মহানবী (সা) খোদ গিয়ে জুযায়মা গোত্রের লোকদের কাছে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। রণাঙ্গনে তাদের পরিত্যাক্ত অর্থ-সম্পদ ফেরত দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ এহেন ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা) সকল সময় হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদকেই ইসলামী ফৌজের সেনাধ্যক্ষের পদে বহাল রেখেছেন। তা করার একমাত্র কারণ ছিল এই যে, তিনি রণনিপুণতা ও সমর কুশলতায় অন্যান্যের তুলনায় অধিক যোগ্য ছিলেন। ঘটনার সাধারণ মূল্যায়ন তিনি ভুল করে ফেলতেন। পক্ষান্তরে সত্যের সৈনিক আবু যর (রা) ছিলেন সততা ও সাধুতার অধিক যোগ্য। কিন্তু এ সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বলেছেন:
يَا أَبَا ذَرِّ إِنِّي أَرَاكَ ضَعِيفًا وَإِنِّي أُحِبُّ مَا أُحِبُّ لِنَفْسِي - لَا تَأْمُرَنَّ عَلَى اثْنَيْنِ وَلَا تُؤْرِيَنَّ مَالَ يَتِيم - (رواه مسلم)
"হে আবু যর! আমি তোমাকে দুর্বল দেখতে পাচ্ছি। তোমার ব্যাপারে আমি তাই পছন্দ করি, যা আমার নিজের ব্যাপারে পছন্দ করি। তুমি কোন সময় দু'জন ব্যক্তিরও নেতা হয়ো না। ইয়াতীমের মালের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিও না।" (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আবু যরকে নেতৃত্ব এবং অভিভাবকত্ব গ্রহণে নিষেধ করেছেন। অথচ তাঁরই সততা ও সুমহান চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসায় মহানবী (সা) বলেছেন:
مَا أَظَلَّتِ الْخَضْرَاءُ وَلَا أَقَلَّتِ الْغَبْرَاءُ أَصْدَقُ لَهْجَةً مِنْ أَبِي ذَرٍّ.
“আবু যর সত্যবাদিতার উত্তুঙ্গচূড়ায় সমাসীন ছিলেন। [এখানে ‘খাযরা’ এবং ‘গাবরার’ উপমাসূচক প্রবাদের ব্যবহার এ বিশেষণে নেই]।
হযরত আমর ইবনুল আস (রা)-কে রাসূল (সা) ‘যাতেসালাসিল’-এর যুদ্ধে এজন্যে প্রেরণ করেছিলেন যে, সেখানে তাঁর নিকটাত্মীয়রা বসবাস করতো। তাঁর প্রতি রাসূল (সা) অনুগ্রহসূচক আচরণ করতে চেয়েছেন। তাঁর চাইতে উত্তম লোক থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁকেই সেখানে পাঠিয়েছেন অপর কাউকে পাঠাননি।
উসামা ইবনে যায়দকে একবার রাসূলুল্লাহ (সা) সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রধান করেছিলেন।
মোটকথা, বিশেষ জাতীয় স্বার্থরক্ষার প্রেক্ষিতে কোন কোন ব্যক্তিকে তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যে তাকে গভর্নর, প্রশাসক বা সেনাধ্যক্ষ নিয়োগ করা হতো। অথচ ধার্মিকতা, জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও ঈমানের দিক থেকে হয়তো তাদের চাইতেও যোগ্য লোক বিদ্যমান থাকতো।
এমনিভাবে প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর শাসনামলে যখন ‘মুরতাদ" ফিৎনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, তা দমানোর জন্যে তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে (রা) সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন। ইরাক এবং সিরিয়ার জিহাদেও তাঁকেই সেনানায়ক করে পাঠানো হয়। অথচ হযরত খালিদ (রা) কর্তৃক অনেক সময় অবাঞ্ছিত কাণ্ড-কারখানা ঘটতো। কথিত আছে যে, তাঁর এসব কার্যকলাপে অনেক সময় ব্যক্তিগত ঝোঁক প্রবণতা কাজ করতো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাঁকে সেনাধ্যক্ষের পদ থেকে অপসারণ করা হতো না বরং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে হঠাৎ ইষৎ ভর্ৎসনা করে ছেড়ে দেয়া হতো এবং ‘ক্ষতিকর দিকে’র চাইতে তাঁর ‘কল্যাণকর দিক’কেই প্রাধান্য দেয়া হতো।' তাঁর স্থলে অপর কাউকে স্থলাভিষিক্ত করার চিন্তা করা হতো না।
এছাড়া রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা অর্থাৎ খলীফার মধ্যে যদি কঠোরতা কম থাকে, তাঁর স্থলাভিষিক্তের মধ্যে কঠোরতা থাকার দরকার হয় বৈ কি। তেমনি রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা যদি বেশী কঠোর স্বভাবের হন, তাঁর অধীনস্থ প্রতিনিধির নমনীয় স্বভাবের প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। খলীফা হবার পূর্বে হযরত ওমর (রা) সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)-কে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে সেনাপতি পদে নিয়োগ করতে। কারণ হযরত খালিদের স্বভাবেও ছিল কঠোরতা। অপরদিকে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর চরিত্রেতো কঠোরতা ছিলই। আবু উবায়দা ছিলেন নরম স্বভাবের মানুষ। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ছিলেন নম্রতার জ্বলন্ত প্রতীক। ঐ সময় আবু বকর যা করেছিলেন তাই সঠিক ছিল। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ হযরত আবু বকরের যুগে ইসলামী ফৌজের প্রধান ছিলেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে ইসলামী সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ। এভাবেই প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত থাকে। মহানবী (সা) নিজ ব্যক্তি সত্তার ব্যাপারে বলে গেছেন:
أَنَا نَبِيُّ الرَّحْمَةِ أَنَا نَبِيُّ الْمَلْحَمَةِ - “আমি রহমতের নবী, আমি যুদ্ধবিগ্রহের নবী।” অর্থাৎ প্রয়োজনে আত্মরক্ষার্থে শক্তি প্রয়োগও আমার কর্ম। মহানবী (সা) আরও ইরশাদ করেছেন:
أَنَا الضَّحُوكُ الْقِتَالُ وَأُمَّتِي وَسَطُ . “(ন্যায় সত্য প্রতিষ্ঠায়) আমি সহাস্যবদনে যুদ্ধকারী আর আমার উম্মত হচ্ছে মধ্যমপন্থী।” সাহাবায়ে কেরামের শানে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلاً مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا - (فتح : ۲۹) “কাফেরদের মুকাবেলায় তারা বড় কঠোর; কিন্তু পরস্পর সহানুভূতিশীল। তুমি তাদের দেখতে পাবে কখনও রুকূ করছে এবং কখনও সিজদা করছে- আল্লাহর দান এবং সন্তুষ্টি কামনায় তারা রত আছে।” (সূরা ফাতাহ : ২৯)
أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ - "মু’মিনদের সাথে নরম এবং কাফের তথা আল্লাহর অবাধ্যদের প্রতি কড়া।"
এ কারনেই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এবং হযরত উমর ফারুক (রা)-এর কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব ছিল পরিপূর্ণ। তাঁদের কর্তৃত্ব সুষ্ঠু পন্থায় পরিচালিত হতো এবং তাতে ছিল ভারসাম্য। মহানবী (সা)-এর যুগে এ দুই মহান ব্যক্তিত্ব হযরতের দুই বাহুরূপে বিবেচিত ছিল। একজন ছিলেন নরম দিল নরম স্বভাবের, অপরজন ছিলেন কঠোর হৃদয় এবং কঠোর স্বভাবের। খোদ মহানবী (সা)-এ দু'জন সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন: اقْتَدُوا بِالَّذِينَ مِنْ بَعْدِي - "আমার পরে তোমরা আবু বকর এবং উমরের আনুগত্য করো।"
তাই দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) 'মুরতাদ'দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এমন বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন যে, হযরত উমর (রা) পর্যন্ত বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর (রা) থেকে এরূপ সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা তিনি কখনও প্রত্যাশা করেননি। অন্যান্য সকল সাহাবীও এ ব্যাপারে অনবহিত ছিলেন। তাঁরা বলতেন, শুধু যাকাত অস্বীকারে আপনি কিভাবে তাদের সাথে জিহাদ করবেন?
অতএব ব্যাপার যদি এমন হয় যে, সেখানে সততা সাধুতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি গুণের সাথে সাথে কঠোরতা ও বলিষ্ঠতারও প্রয়োজন, তাহলে সেক্ষেত্রে কঠোর নেতৃত্বকেই এগিয়ে দেবে। যেমন, অর্থ-সম্পদের হেফাযতের প্রশ্নে কঠোর স্বভাব বিশিষ্ট লোকের প্রয়োজন। কেননা, অর্থ-সম্পদ উসূল ও তার সংরক্ষণের জন্যে শক্তি ও বিশ্বস্ততা উভয়েরই প্রয়োজন হয় বৈ কি। এজন্যে সেখানে স্থানীয় প্রশাসক ও কর্মকর্তাকে কঠোর ও শক্তিমান হতে হবে, যেন তার কড়াকড়ির ফলে অর্থ আদায়ে গড়িমসি প্রশয় না পায়। সচিব, কেরানী ও কোষাধ্যক্ষকে যোগ্য ও বিশ্বস্ত হতে হবে। তাদের যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার দ্বারাই অর্থ-সম্পদের যথাযথ হেফাযত হওয়া সম্ভব। যুদ্ধ ক্ষেত্রের নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের প্রশ্নেও একই অবস্থা এবং একই বিধান। প্রাজ্ঞ ও ধার্মিক ব্যক্তিদের পরামর্শের ভিত্তিতে যুদ্ধ পরিচালক নিযুক্ত করবে। তাতে উভয় প্রকার যোগ্যতা ও গুণ বৈশিষ্ট্যের প্রতিই লক্ষ্য রাখা হবে। বস্তুতঃ প্রশাসনিক সকল কর্তৃত্ব ও সকল প্রকার নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একই দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধানই অনুসরণ যোগ্য।
কোন একক ব্যক্তিত্বের দ্বারা যদি কর্তৃত্ব-নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য ও কল্যাণকারিতা পূর্ণ না হয়, তাহলে দুই, তিন অথবা তারও অধিক ব্যক্তি একই কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। তবে সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তিকেই প্রাধান্য দেবে। একের দ্বারা কাজ না চললে প্রয়োজনে একাধিক গভর্নর ও কর্মকর্তা নিযুক্ত করবে এবং সর্বাবস্থায়ই যোগ্যতর ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেবে।
বিচার কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অধিক জ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ খোদাভীরু, যোগ্য লোককে প্রাধান্য দেবে। যদি একজন অধিক জ্ঞানী এবং অপরজন অধিক মুত্তাকী ও খোদাভীরু হয় তাহলে লক্ষ্য করতে হবে যে, দ্বিধাদ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে অধিক জ্ঞানী ব্যক্তির জ্ঞান-প্রজ্ঞা এবং অধিক মুত্তাকী ব্যক্তির আগ্রহ-আখাঙ্ক্ষা সংশ্লিষ্ট বিধান প্রযোগে বাধা সৃষ্টি করছে না তো?
কেননা হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে,
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْبَصِيرَ النَّاقِدَ عِنْدَ وُرُودِ الشُّبُهَاتِ وَيُحِبُّ الْعَقْلَ عِنْدَ حُلُولِ الشَّهَوَاتِ -
“(সিদ্ধান্ত গ্রহণে) দ্বিধা-সন্দেহের মুহূর্তে দূরদর্শী ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারীকে আল্লাহ তায়ালা ভালবাসেন, আর ভালবাসেন ঐ বুদ্ধিমত্তাকে যা কোন ব্যাপারে আগ্রহ-আকাঙ্ক্ষার প্রাবল্যের মুহূর্তে ভারসাম্য বজায় রাখতে সমর্থ।”
কাযী (বিচারক) কে যুদ্ধবিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা, সেনাধ্যক্ষ কিংবা সাধারণ প্রশাসনিক প্রধানের সমর্থনপুষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়, তবে তা জরুরী নয়। বিচারকের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ শিক্ষা ও জ্ঞান বিষয়ক বৈশিষ্ট্য থাকা এবং ধার্মিকতার গুণকে প্রাধান্য দিতে হবে, যদি জ্ঞান ও ধার্মিকতার মুকাবেলায় শক্তি সামর্থ্যের প্রয়োজন অধিক দেখা দেয়, সে ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী ও স্বাবলম্বী ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেবে।
কোন কোন 'আলিম তথা ইসলামী জ্ঞান বিশেষজ্ঞদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, বিচারের ফয়সালার জন্যে কোন যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না, গেলেও সে ফাসিক আলিম কিংবা জাহিল দ্বীনদার। এ দু'য়ের মধ্যে কাকে প্রাধান্য দিতে হবে? তারা জবাব দিয়েছিলেন, ঐ ব্যক্তির মধ্যে সত্য এবং কল্যাণের পথ থেকে দূরে থাকার ভাব-প্রবণতা অধিক হলে দ্বীনের কাজে ত্রুটি দেখা দেয়া স্বাভাবিক বিধায় দ্বীনদার ব্যক্তিটিকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত। শাসকদের অবহেলার দরুন দ্বীনের কাজের ত্রুটি হতে থাকলে আলিমকেই সে ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেবে। অধিকাংশ আলিম ব্যক্তি দ্বীনদারকেই এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেবার পক্ষে মত দিয়েছেন। কারণ, এ ব্যাপারে সকল ইমাম মুজতাহিদ একমত যে, কর্মকর্তা, আমীর এমন ব্যক্তিকে হতে হবে যিনি ন্যায় বিচারক এবং সাক্ষ্যদানের যোগ্য।
'ইলমের শর্তের বেলায় মত পার্থক্য রয়েছে যে, কি ধরনের আলিমকে কোন ব্যাপারে কর্মকর্তা করা হবে? সে আলিমকে মুজতাহিদ হতে হবে, না মুকাল্লিদ, অথবা যে ধরনের পাওয়া যায় তাকেই নিয়োগ করা। এ ব্যাপারে অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তার অবকাশ খুব কম। তবুও সংক্ষিপ্ত বক্তব্য হলো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বিচারপূর্বক আপেক্ষিক কর্মযোগ্য ব্যক্তিকে প্রয়োজনে শাসক-কর্মকর্তা বানানো বৈধ। কারণ, পরিস্থিতি ও পরিবেশের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখাও কর্তব্য যাতে মন্দকে যথাসম্ভব নির্মূল করা যায়। কোনো ব্যক্তি হয়তো জ্ঞান প্রজ্ঞার দিক থেকে অধিকতর যোগ্য কিন্তু কোনো বিশেষ এলাকার আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে হয়তো দুর্বল। সে ক্ষেত্রে কম প্রজ্ঞাশীল হলেও শক্ত লোক দরকার।
সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব হচ্ছে জনগণের প্রয়োজনে। সে প্রয়োজন কিভাবে পূরণ হবে তা দেখতে হবে। যেমন, সমাজের অস্বচ্ছল নাগরিকদের গৃহীত নিজ নিজ ঋণের টাকা পরিশোধ করা কর্তব্য। কিন্তু বর্তমানে তার থেকে এ পরিমাণেরই তাগাদা দেয়া উচিত, সে যে পরিমাণ আদায় করতে সক্ষম। যেমন, জিহাদের তৈরির জন্যে শক্তি সঞ্চয় এবং এ জন্যে অধিক ঘোড়ার ব্যবস্থা (তথা সমরোপকরণ জোগাড়) রাখার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু অক্ষমতা ও অসমর্থতার সময় কোনো নাগিরকের উপর থেকে এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। তখন তার যদ্দুর সাধ্যে কুলায়, তাই তার জন্য ফরয হয়ে দাঁড়ায়। ফরয আদায় করাটাই তখন তার কর্তব্য। অবশ্য হজ্জ এবং অন্যান্য ইবাদতের কথা ভিন্ন। সেক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য নয়। বরং হজ্জ ইত্যাদি পালন তার ওপর ফরয।
مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا -
“যার হজ্জে যাবার ক্ষমতা ও সামর্থ্য রয়েছে।” (সূর আলে ইমরান : ৯৭)
এটা ফরয নয় যে, সে বিশেষভাবে ক্ষমতা ও সামর্থ্য সৃষ্টিতে লেগে যাবে। কেননা, হজ্জ তখনই ফরয হয় যখন তার মধ্যে স্বাভাবিক উপায়ে সামর্থ্য আসে, এ জন্যে বিশেষ কায়দায় সামর্থ্য সৃষ্টি করা ফরয নয়।

টিকাঃ
১. সাহাবীগণ সকলেই ছিলেন عدول ন্যায়পরায়ণ। তাঁদের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল হয়ত হয়ে যেতো, কিন্তু তাতে ব্যক্তিগত স্বার্থের ছোঁয়া ছিল না। খালিদকে হযরত উমর পদচ্যুত করেছিলেন, তা সত্ত্বেও খালিদ সাধারণ সৈনিক হিসেবে জিহাদ করে আনুগত্যের চরম ইসলামী দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। তাঁরা ছিলেন আদর্শ চরিত্রের অধিকারী। (সম্পাদক)

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ইসলামে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের লক্ষ্য : কুরআন সুন্নাহর শিক্ষা, আইন-কানুন বাস্তবায়ন

📄 ইসলামে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের লক্ষ্য : কুরআন সুন্নাহর শিক্ষা, আইন-কানুন বাস্তবায়ন


যোগ্যতর ব্যক্তির পরিচয়, শাসন-কর্তৃত্বের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচিতি, কর্তৃত্বের লক্ষ্য দীনের প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার, জুমুআ ও জামাআতের সুষ্ঠু প্রতিষ্ঠা, জনগণের দীনী সংশোধন- এই পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলতেন, আমি এজন্য তোমাদের নিকট কোনো শাসক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রেরণ করি, তারা যেন তোমাদেরকে মহাপ্রভু আল্লাহ্ কিতাব এবং নবীর আদর্শ শিক্ষা দেয় আর দীন তথা ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে সক্রিয় ও স্থায়ী রাখে।
সর্বাধিক যোগ্যতর ব্যক্তির পরিচয় তখন জানা যাবে, যখন শাসন কর্তৃত্বের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যে পৌঁছার পদ্ধতি জানা যাবে। তোমার কাছে যখন লক্ষ্য স্পষ্ট হবে এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছার পদ্ধতি জানা হয়ে যাবে, তখন মনে করবে যে, তোমার করণীয় বিষয়টি তুমি পূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পেরেছো।
রাজা-বাদশাহ তথা শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে যদি বৈষয়িক স্বার্থ প্রাধান্য পায় আর তারা ধর্ম, ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধ ত্যাগ করে বসে, তখন শাসক কর্তৃপক্ষ শাসন যন্ত্রে এমন সব লোককেই পদোন্নতি দেন, যাদের দ্বারা তাদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য-লক্ষ্যই অধিক হাসিল হয়। যে শাসক নিজ ব্যক্তি স্বার্থের জন্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রত্যাশী, সে নিয়োগ-বদলিতে ঐ ব্যক্তিকেই প্রাধান্য দেবে, যে তার রাষ্ট্র, কর্তৃত্ব পদ বহাল রাখতে সহায়ক। মহানবী (সা)-এর রাজনৈতিক আদর্শে আমরা দেখতে পাই, শাসন ক্ষমতা ও যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও সেনাপতিগণ যারা রাষ্ট্র প্রধানের প্রতিনিধি এবং ফৌজী সিপাহসালার, তারা মুসলমানদের জুমআর নামায এবং জামাআতের ইমামত করতেন। জনগণের সামনে মূল্যবান বক্তৃতা দান করতেন। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর তিরোধানের প্রাক্কালে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে নামাযের ইমামতের দায়িত্বে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। মুসলিম মিল্লাতে সমর নেতৃত্বের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও তাঁকেই অগ্রগামী রাখতেন।
মহানবী (সা) যখন কাউকে সেনাপতি নিয়োগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করতেন, সর্বপ্রথম তাঁকে প্রদত্ত সরকারী অর্ডারে নামায কায়েমের হুকুম করতেন। এমনিভাবে যখন কাউকে কোনো শহর জনপদের শাসনকর্তা করে পাঠাতেন, প্রথমে তাকে জামাআতের সাথে নামায পড়াবার নির্দেশ দিতেন। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সা) আত্তাব ইবন উসায়দ (রা)-কে মক্কার শাসনকর্তা করে পাঠিয়েছিলেন। তেমনি উসমান ইবনে আবিল আস (র)-কে পাঠিয়েছিলেন তায়েফের শাসনকর্তা করে। হযরত আলী (রা) হযরত মুয়ায (রা) এবং হযরত আবু মূসা (রা)-কে ইয়ামেনের শাসনকর্তারূপে পাঠিয়েছিলেন। আমর ইবনে হাযম (রা)-কে পাঠিয়েছিলেন নাজরানের শাসনকর্তা করে। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নায়েব বা প্রতিনিধি হিসাবে জামাআতের নামাযে ইমামত করতেন এবং শরী'য়াতী শাসন তথা হুদূদ ইত্যাদি কায়েম করতেন। যুদ্ধের সেনাপতিও ঠিক একই কাজ করাতো। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইনতিকালের পর ইসলামী রাষ্ট্রে তাঁর স্থলাভিষিক্ত খলীফাগণও একই নিয়মে এসব রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পাদন করতেন। বনী উমাইয়া-র বাদশাহগণ এবং দু'একটি ব্যতিক্রম ছাড়া আব্বাসী শাসকগণও তাই করেছেন। এটা এজন্যে করা হতো যেহেতু দীন ইসলামে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নামায এবং জিহাদ।
এ কারনেই বহু হাদীসে নামায এবং জিহাদকে একই সাথে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি কোনো রুগীর শুশ্রুসায় গেলে বলতেন-
اللَّهُمَّ اشْفِ عَبْدَكَ لِيُشْهِدَ لَكَ صَلوةٌ وَيَنْكَا عَدُوا ...
“হে আল্লাহ তোমার এ বান্দাকে আরোগ্য দান করো, যেন সে নামাযে হাজির হতে পারে এবং তোমার দুশমনদের মোকাবেলা করতে পারে।"
يَا مُعَادُ إِنَّ أَهَمَّ أَمْرٍ عِنْدِي الصَّلوةُ.
“হে মুআয! আমার কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নামায।"
আঞ্চলিক শাসক ও কর্মচারীদের কাছে হযরত উমরের নির্দেশনামা : হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় নিয়োজিত কর্মচারী ও গভর্ণরদের উদ্দেশ্যে যে সরকারী ফরমান লিখে পাঠাতেন। ঐগুলোতে লিখা থাকতো-
إِنْ أَهَمَّ أُمُورِكُمْ عِنْدِي الصَّلُوةُ فَمَنْ حَافَظَ عَلَيْهَا وَحَفِظَهَا حَفِظَ دِيْنَهُ وَمَنْ ضَيَّعَهَا كَانَ سِوَاهَا مِنْ عَمَلِهِ أَشَدُّ إِضَاعَةً.
"আমার কাছে তোমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নামায। যে ব্যক্তি নামাযের হেফাজত করলো, সে দীনের হেফাজত করলো। যে নামায নষ্ট করলো সে অন্যান্য কাজও বেশী নষ্ট করবে।"
হযরত উমরের এ কথার তাৎপর্য হলো, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
الصَّلُوةُ عِمَادُ الدِّينِ.
"নামায হচ্ছে দীনের স্তম্ভ।" প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যখন এই স্তম্ভটির হেফাজত করবে, তখন নামায তাকে অশ্লীলতা এবং সকল গর্হিত কাজ ও দুর্নীতি থেকে রক্ষা করবে এবং অন্যান্য ইবাদতের কাজে নামায তার সাহায্যকারী হবে। ("কারণ إِنَّ الصَّلوةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ নামায গর্হিত-অবাঞ্চিত কাজ থেকে বিরত রাখে।")
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ.
"(দীনের উপর) অটল-অবস্থান এবং নামাযের দ্বারা (আল্লাহর) সাহায্য কামনা কর আর (মনে রেখো) নামায অত্যন্ত ভারি জিনিস। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে এটি ভারি নয়।” (সূরা বাকারা : ৪৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصابرين.
“হে মুসলমানগণ, (সকল সময় তোমরা দীনের উপর অটল অবস্থান নিয়ে) ধৈর্য ও নামাযের দ্বারা (আল্লাহর) সাহায্য কামনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যধারণকারীদের সাথে থাকেন।" (সূরা বাকারা : ১৫৩)
আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা)-কে সম্বোধন করে বলেছেন:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَانَسْئَلُكَ رِزْقًا - نَحْنُ نَرْزُقُكَ - وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوى.
“(হে নবী!) নিজের পরিবারস্থ লোকদের নামাযের তাগিদ করো। নিজেও পাবন্দির সাথে নামাযে রত থাকবে। আমি তো তোমাদের নিকট কোনো রিযিক চাই না- বরং আমি নিজেই তোমাদের রিযিক দেই। উত্তম পরিণতি তো তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি পূর্ণ সাবধানী জীবন অবলম্বনেই রয়েছে।” (সূরা ত্ব-হা: ১৩২)
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ - مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونَ - إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينِ.
"জিন এবং ইনসানকে আমি একমাত্র আমার ইবাদত তথা নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও দাসত্ব করার জন্যেই সৃষ্টি করেছি। তাদের থেকে আমি কোনো রিযিকের প্রত্যাশী নই। আর তাদের কাছে এটাও চাইনা যে তারা আমাকে খাবার দিক। আল্লাহ নিজেই তো অধিক রিযিকদাতা, প্রচণ্ড শক্তিধর এক মহাসত্তা।” (সূরা যারিয়াত: ৫৬-৫৮)
অতএব এটা বুঝা গেল যে, কর্তৃত্ব নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের সেবা করা এবং তাদের সংশোধন করা। মানুষ যদি দীনকে পরিত্যাগ করে তাহলে তারা কঠিন দুর্গতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে, আর তাদেরকে যেসব পার্থিব নেয়ামত সুযোগ-সুবিধা ও উপভোগ্য জিনিস দান করা হয়েছে, সেগুলো তাদের জন্যে কখনও কল্যাণকর হবে না। বৈষয়িক সেই কাজের দ্বারা তাদের যেই দীনী কল্যাণ সাধিত হতো, তা হবে না।
বৈষয়িক যেই জিনিসের দ্বারা মানুষ দীনী কল্যাণ লাভ করতে পারে, তা দু'প্রকার। এক. সম্পদকে তার হকদারের কাছে পৌঁছানো। দুই. বাড়াবাড়ি এবং অন্যায়ভাবে সম্পদ হস্তগতকারীকে শাস্তি প্রদান। সুতরাং যে ব্যক্তি সীমা অতিক্রম ও বাড়াবাড়ি করে না, জেনে রেখো, সে তার দীনের কাজে অভ্যস্ত হয়েছে। এজন্যে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা) বলতেন:
إِنَّمَا بَعَثْتُ عُمَّالِي إِلَيْكُمْ لِيُعَلِّمُواكُمْ كِتَابَ رَبِّكُمْ وَسُنَّةَ نَبِيِّكُمْ وَيُقِيمُوا بَيْنَكُمْ دِينَكُمْ.
“হে জনগণ, আমি আমার কর্মচারী ও গভর্ণরদেরকে এজন্যে তোমাদের কাছে পাঠাই, যেন তারা তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর কিতাব এবং নবীর আদর্শ শিক্ষা দেয় আর তোমাদের মধ্যে দীন কায়েম রাখে।"
বর্তমানে যেহেতু শাসক-শাসিত উভয়ের মধ্যে বিকৃতি ঘটেছে, যদ্দরুন সকল ক্ষেত্রের কার্যকলাপেই বিকৃতি দেখা দিয়েছে, এজন্যে সংশোধনও একটি কষ্ট সাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈ কি। তাই যেসব শাসক সম্ভাব্য সকল উপায়ে জনগণের দীন-দুনিয়া উভয়টির কল্যাণার্থেই কাজ করবে, সেসব ব্যক্তি যুগশ্রেষ্ঠ এবং উত্তম মুজাহিদ হিসাবে গণ্য হবে। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
يَوْمُ مِنْ إِمَامٍ عَادِلٍ أَفْضَلُ مِنْ عِبَادَةِ سِتِّينَ سَنَةً.
"ন্যায়পরায়ণ ইমাম বা নেতার একটি দিন ৬০ বছরের ইবাদতের চাইতে উত্তম।" মুসনাদে ইমাম আহমদ গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, তিনি ইরশাদ করেছেন-
أَحَبُّ الْحَقْلِ إِلَى اللَّهِ عَادِلٌ وَابْغَضُهُمْ إِلَيْهِ إِمَامٌ جَائِرٌ.
"মানুষের মধ্যে আল্লাহর অতি প্রিয় ব্যক্তি হচ্ছে ন্যায়পরায়ণ নেতা। আর আল্লাহর রোষে অধিক নিপতিত ব্যক্তি হচ্ছে জালিম নেতা।"
বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلُّهِ يَوْمَ لَأَظِلُّ إِلَّا ظِلَّهُ - إِمَامٌ عَادِلٌ وَشَابٌ نَشَا فِي عِبَادَةِ اللَّهِ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ بِالْمَسْجِدِ إِذْ خَرَجَ مِنْهُ حَتَّى يَعُودَ إِلَيْهِ وَرَجُلَانِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعًا عَلَى ذَالِكَ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَاةٌ ذَاتَ مَنصَبٍ وَجَمَالٍ إِلَى نَفْسِهَا قَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدْقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ. (متفق عليه)
"আল্লাহর ছায়া ছাড়া যেদিন আর কোনো ছায়া থাকবে না, তখন সাত শ্রেণীর লোককে আল্লাহ তায়ালা নিজের রহমতের ছায়াতলে স্থান দেবেন। (১) ন্যায়পরায়ণ নেতা, (২) ইবাদতগুযার যুবক, (৩) ঐ ব্যক্তি যিনি নামায শেষে মসজিদ থেকে বের হবার পরও পুনরায় কখন মসজিদে যাবেন তার অন্তর সে ভাবনায় মগ্ন থাকে, (৪) সেই দুই ব্যক্তি যাদের বন্ধুত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্যে- ঐ বন্ধুত্বের ভিত্তিতেই তারা মিলিত হয় এবং বিচ্ছিন্ন হলেও ঐ কারণেই বিচ্ছিন্ন হয়, (৫) যে ব্যক্তি একান্তে মানুষের অগোচরে আল্লাহর যিকির করে এবং চোখের পানি ছেড়ে দেয়, (৬) যে ব্যক্তিকে কোনো অভিজাত সুন্দরী রমণী কামাচারের আহ্বান জানালে সে এই বলে জবাব দেয় যে, বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে আমি ভয় করি, (৭) যে ব্যক্তি এমন গোপনে দান খয়রাত করে যে, ডান হাতে খরচ করলে তার বাম হাত জানে না।” (বুখারী ও মুসলিম) সহীহ মুসলিম শরীফে হৈয়াদ ইবনে হাম্মাদ (রহ) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
أَهْلُ الْجَنَّةِ ثَلَاثَةٌ سُلْطَانُ مُقْسِطُ وَرَجُلٌ رَحِيمٌ رَقِيقُ الْقَلْبِ لِكُلِّ ذِي قُرْبَى وَمُسْلِهِ وَرَجُلٌ غَنِيٌّ عَفِيْفٌ مُتَصَدِّقٌ.
"তিন প্রকারের লোক বেহেশতী। (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান (২) দয়ালু ব্যক্তি, নিকটাত্মীয় এবং মুসলমানদের সহমর্মিতায় যার হৃদয় বিগলিত, (৩) সেই ধনী ব্যক্তি, যিনি চরিত্রবান এবং দানশীল।”
সুনানে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি হাদীস উল্লেখিত আছে যে-
السَّاعِي عَلَى الصَّدَقَةِ بِالْحَقِّ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ.
"দান খয়রাতের কাজে নিষ্ঠাবান সচেষ্ট ব্যক্তি হচ্ছে আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদের মতো। তবে দান হতে হবে লোক দেখাবার জন্যে নয়।"
আল্লাহ তায়ালা জুলুম-অন্যায়ের ধ্বজাধারী সন্ত্রাসী, আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন-
وَقَاتِلُوا هُمْ حَتَّى لَا تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّيْنُ لِلَّهِ.
"যতদিন (সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষদের বিরুদ্ধে) ফিৎনা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার অবসান না ঘটবে এবং (সমাজে) একমাত্র আল্লাহর দ্বীনেরই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত না হবে, তোমরা (মানবতা বিরোধী ঐ প্রতিকূল শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সম্ভাব্য সকল উপায়ে) লড়ে যেতে থাকো।" (সূরা বাকারা: ১৯৩)
একবার রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আরয করা হলো যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মানুষ কোন সময় আপন বীরত্ব দেখাবার জন্যে লড়াই করে, কখনও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রেরণা তাদের লড়াইর পেছনে অনুপ্রেরণা যোগায়, আবার কখনো লড়াইর পেছনে লোক দেখানো ভাবও সক্রিয় থাকে। এহেন অবস্থায় কোনটিকে “আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ” বলা যাবে? হযরত রাসূল (সা) ইরশাদ করলেন-
مَنْ قَالَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي الْجِهَادِ سَبِيلِ اللَّهِ
আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত রাখার জন্যে যে ব্যক্তি লড়াই করবে, সেটিই হবে “জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহ্র পথে জিহাদ।” (হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত।)
অতএব বুঝা গেল, জিহাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, সর্বত্র আল্লাহর শ্রেণী বৈষম্যমুক্ত ন্যায় বিধান তাঁর দীনেরই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁর বাণীকে সমুন্নত করা। كَلِمَةُ الله তথা “আল্লাহর বাণী” কথাটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর দ্বারা আল্লাহ্ বিধান গ্রন্থ কালামুল্লাহকেও বুঝানো হয়ে থাকে।
এভাবে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন-
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ.
"আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট দলীল দিয়ে প্রেরণ করেছি। তাদের মাধ্যমে প্রেরণ করেছি 'কিতাব' ও 'মীযান' (ন্যায়দণ্ড), যেন তাঁরা (ইসলামের) ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।" (সূরা হাদীদ: ২৫)
বিভিন্ন পয়গম্বর এবং কিতাব প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন আল্লাহর হক এবং বান্দার হকসমূহ ইনসাফ ও ন্যায়নীতি সহকারে প্রতিষ্ঠিত করে।
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَاسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ.
"আমি লোহা সৃষ্টি করেছি। তাতে রয়েছে বিরাট ভীতিপূর্ণ উপাদান। মানুষের কল্যাণও তাতে নিহিত আছে। আর তাতে অন্য এক উদ্দেশ্য এটাও নিহিত যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যক্ষভাবে জানতে চান যে, এর মাধ্যমে কারা তাঁকে ও তাঁর রাসূলদের সাহায্যে এগিয়ে আসে।" (সূরা হাদীদ: ২৫)
অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের বিধানসমূহ ও এর নীতি-আদর্শ বাদ দিয়ে ভিন্ন মতাদর্শ ও নীতির অনুসরণ করে চলে, আল্লাহ্র অভিপ্রায় হলো, সে প্রতিরোধে এগিয়ে এলে তাকে লোহা উপকরণ দ্বারা গঠিত হাতিয়ার দ্বারা হলেও অন্যায় পথ থেকে ফেরানো উচিত। কারণ, দীনের প্রতিষ্ঠা, দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব আল্লাহর কিতাব এবং (শক্তির প্রতীক) তরবারীর উপরও ক্ষেত্র বিশেষে নির্ভরশীল।
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, মহানবী (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন أَنْ نَضْرِبَ بِهَذَا অর্থাৎ “আমরা যেন সেই অগ্রগামী ব্যক্তির প্রতি তরবারী তথা উপযুক্ত অস্ত্রের আঘাত হানি যে ব্যক্তি কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে এর অনুসারীদের নিশ্চিহ্ন করতে এগিয়ে আসে।
সুতরাং উদ্দেশ্য যখন এই, তখন 'আকরাব ফাল আকরাব' (নিকটতর অতঃপর নিকটস্থ) এ পন্থায় লক্ষ্য হাসিল করা বাঞ্ছনীয়। কর্তৃত্ব-নেতৃত্বের প্রশ্নে এমন দুই ব্যক্তিকে বেছে নেবে এবং লক্ষ্য করবে যে, উভয়ের মধ্যে কে লক্ষ্যের অতি নিকটতর? উভয়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জনের যোগ্যতার দিক থেকে যে শ্রেষ্ঠ, তাকেই কর্মকর্তা বা শাসনকর্তা নিযুক্ত করবে।
নেতৃত্বের প্রশ্নে কাকে অগ্রাধিকার দেয়া বাঞ্ছনীয়? এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বক্তব্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন- يَوْمُ الْقَوْمَ أَقْرَءُهُمْ لِكِتَابِ اللَّهِ - فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ كَانُوا فِي السُّنَّةِ فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءٌ فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءٌ فَأَقْدَمُهُمْ سَنًا وَلَا يؤْمُ الرَّجُلُ فِي سَلْطَانِهِ - وَلَا يَجْلِسُ عَلَى تَكْرِمَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ -
"(ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজে) জাতির ইমামত বা নেতৃত্ব সে ব্যক্তিই করবে, যে আল্লাহ্ আইনের কিতাব অধিক পাঠ ও মর্মার্থ অনুধাবনকারী। তাতে যদি একাধিক ব্যক্তির যোগ্যতা সমপর্যায়ের হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে হযরতের সুন্নাত-নীতি আদর্শ সম্পর্কে যে ব্যক্তি বিশেষভাবে অবগত, তাকেই প্রাধান্য দেবে। তাতেও সকলে সমপর্যায়ের হলে ঐ ব্যক্তিই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবেন, যিনি হিজরত গমনে অগ্রবর্তী ছিলেন। যদি হিজরত গমনের যোগ্যতাও সকলের সমান সমান হয়, তাহলে যে বয়সে অপেক্ষাকৃত বড়, তাকে নেতা নির্ধারণ করবে। তাঁর প্রভাব বলয়ের মধ্যে অপর কোনো ব্যক্তি নেতৃত্ব করবে না এবং তাঁর মর্যাদার আসনে অনুমতি ছাড়া বসবে না।” (মুসলিম)
একাধিক ব্যক্তির মধ্যে যদি সমযোগ্যতা থাকে এবং তাদের মধ্যে কে যে অধিক যোগ্য তা জানা না যায়, তখন 'কোরা' বা লটারীর মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করবে। যেমন সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) কাদেসিয়ার যুদ্ধে করেছিলেন। কে আযান দেবে, তা নিয়ে সেনাবাহিনীতে বিরাট বাক-বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটে। এমনকি পরস্পর সংঘর্ষের উপক্রম দেখা দেয়। সকলেই বলছে 'আমি আযান দেবো।' অনেকেই অগ্রাধিকার প্রাপ্তির যৌক্তিকতা তুলে ধরে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিম্নোক্ত নির্দেশের অনুসরণ করা হয়।
لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي النِّدَاءِ وَالصَّفُ الْأَوَّلِ ثُمَّ لَمْ يَجِدُوا إِلَّا أَنْ يَسْتَهِمُوا عَلَيْهِ لَاَسْتَهِمُوا .
"মানুষ আযান এবং নামাযের সামনের সারির সওয়াবের গুরুত্ব বুঝার ফলে যদি লটারীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তাহলে তাই করবে।"

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 মাল-সম্পদ, ঋণ, যৌথ ব্যবস্থা, মুজারাবাত, আল্লাহর নির্দেশিত মোকদ্দমার ফয়সালা ইত্যাদি

📄 মাল-সম্পদ, ঋণ, যৌথ ব্যবস্থা, মুজারাবাত, আল্লাহর নির্দেশিত মোকদ্দমার ফয়সালা ইত্যাদি


সরকারী আমানতের অপর ধরন হলো মাল-সম্পদ এবং বিশেষ ও সাধারণ ঋণ, আমানতদারী, যৌথ ব্যবস্থা, তাওয়াক্কুল, মুজারাবাত, এতীমের সম্পদ, ওয়াকফ ইত্যাদি। ফকীর-মিসকীন সর্বস্বহীনকে দান-খয়রাত প্রদান, উসুলকারী, কর্মচারী, 'মোয়াল্লাফাতুল কুলুব', দাস মুক্তি, ঋণগ্রস্তকে অর্থ সাহায্য দান এবং আল্লাহর পথে দান-সাদকা প্রদান প্রভৃতি এ পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়।
আমানতের দ্বিতীয় প্রকারটি মাল-সম্পদের সাথে সংশ্লিষ্ট। কর্জ বা ঋণ সম্পর্কে আল্লাহ ইরশাদ করেন-
فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُمْ بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ .
"তোমাদের মধ্যে যদি একে অপরকে আমানতদার বানায়, তার উচিত উক্ত দাতাকে তার আমানত আদায় করে দেয়া এবং নিজ প্রভু আল্লাহকে ভয় করা।" (সূরা বাকারা : ২৮৩)
এ প্রকার আমানতের মধ্যে যেসব বিষয় শামিল তা হলো মূলধন, বিশেষ ও সাধারণ ঋণ, যেমন গচ্ছিত সম্পদ। যৌথ শরীকদার, মুয়াক্কিল, মুজারিব ও এতীমের মাল, ওয়াকফ সম্পত্তি, খরিদকৃত সম্পদের মূল্য আদায় করা, ঋণ, নারীদের মোহর, লভ্যাংশের মজুরী ইত্যাদি।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ الْإِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوْعًا - إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا - وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا إِلَّا الْمُصَلِّينَ - الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ - وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ (الى قوله) وَالَّذِينَ هُمْ لَأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ.
"জন্মগতভাবে মানুষ অসহিষ্ণু। যখন তাকে ক্ষতি স্পর্শ করে, সে বিচলিত হয়ে ওঠে আর যখন তাকে প্রাচুর্য স্পর্শ করে, সে কৃপণ হয়ে যায়। তবে নামাযী ব্যক্তিরা নয়, যারা নিজেদের নামাযে সদা নিষ্ঠাবান, যাদের সম্পদে ভিক্ষুক এবং বঞ্চিত উভয় শ্রেণীর মানুষের হক নির্ধারিত রয়েছে।... আর যারা আমানত ও নিজেদের কৃত চুক্তি ওয়াদা রক্ষা করে।" (মায়ারিজ: ১৯-৩২)
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন-
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ وَلَاتَكُنْ لِّلْخَائِنِينَ خَصِيْمًا.
"হে নবী! আমি তোমার কাছে সঠিকরূপে কিতাব নাযিল করেছি। তোমাকে আল্লাহ তায়ালা যেরূপ বাৎলিয়ে দিয়েছেন, তুমি ঠিক সেভাবে মানুষের পারস্পরিক বিরোধ, মামলা-মোকাদ্দমার ফয়সালা করবে। খেয়ানতকারী প্রতারকদের পক্ষাবলম্বন করবে না।” (সূরা নিসা: ১০৫)
রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ .
"তোমার কাছে যে ব্যক্তি আমানত রেখেছে, তুমি তাকে তা হুবহু বুঝিয়ে দাও। তোমার সাথে খেয়ানত-প্রবঞ্চনা ও বিশ্বাসঘাতকতা করলে, তুমি তার সাথে প্রবঞ্চনা করো না।"
মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন-
الْمُؤْمِنُ مَنْ آمِنَهُ الْمُسْلِمُونَ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ وَالْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْنَ مِن لِّسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هُجَرَ عَمَّا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ وَالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي ذَاتِ اللَّهِ -
"মুসলমানরা যাকে জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্বস্ত মনে করে সে-ই 'মুমিন'। আর ঐ ব্যক্তি হচ্ছে খাঁটি 'মুসলিম', যার হাত ও রসনা থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে। আর প্রকৃত 'মুহাজির' হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তেমনি সেই হচ্ছে খাটি মুজাহিদ, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যে আপন সত্তার বিরুদ্ধে লড়াই করে।"
এটি একটি সহীহ হাদীস। এর অংশ বিশেষ বুখারী এবং মুসলিমে উল্লেখিত আছে। কিছু অংশ তিরমিযী শরীফেও উল্লেখ আছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) আরও ইরশাদ করেছেন- مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَانَهَا أَدَاهَا اللَّهُ عَنْهُ - وَمَنْ أَخَذَهَا يُرِيدُ اخْلَافَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ .
"ফেরত দেয়ার অভিপ্রায়ে যে মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে, আল্লাহ তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর কেউ সম্পূর্ণ আত্মসাতের নিয়তে কারও কাছ থেকে কোনো অর্থ-সম্পদ নিলে, আল্লাহ তায়ালা তা ধ্বংস করে দেন।” (বুখারী)
সকল আমানত পরিশোধকে আল্লাহ ফরজ করেছেন। আমানতে খেয়ানত, লুট, ছিনতাই, চুরি, প্রতারণা যাই হোক, তা আদায়ের জন্য সতর্ক করা হয়েছে। এমনিভাবে হাওলাত বা ধার হিসাবে গৃহীত অর্থ সম্পদ ও জিনিসপত্র ফেরত দেয়া ফরজ।
রাসূলুল্লাহ (সা) এ সম্পর্কে বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন- الْعَارِيَةُ مُؤَدَّاةُ وَالْمَنْحَةُ مَرْدُودَةً وَالدَّيْنُ مُقْضَى وَالزَّعِيمُ غَارِمٌ - إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثِ -
"ধারে গৃহীত জিনিস ফেরত দিতে হবে, উটের শাবক যার জন্যে নিদিষ্ট করা হয়েছে, তাকেই দিয়ে দেবে। ঋণ অবশ্য পরিশোধ্য। নেতার উপর যে কর্তব্য নির্ধারিত, তাকে তা আদায় করতেই হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারকে তার হক (অধিকার) প্রদান করে দিয়েছেন। সুতরাং উত্তরাধিকারীর জন্যে অসিয়ত নেই।"
দেশের প্রধান শাসক, আঞ্চলিক শাসকবর্গ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ এবং জনগণের সকলেই এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। শাসক ও শাসিত উভয় শ্রেণীর উপরই এটা ফরজ বা কর্তব্য যে, তারা পরস্পরের উপর বর্তিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। রাষ্ট্র নায়ক এবং তার স্থলাভিষিক্ত কিংবা নিয়োজিত ব্যক্তি ও জনগণের ন্যায্য অধিকার দানে অবহেলা করা চলবে না। হকদারকে তার হক আদায় করে দিতেই হবে। তাদের ন্যায্য অধিকার আংশিকভাবে নয় পুরোপুরিই আদায় করে দেয়া তাদের উপর ফরজ করা হয়েছে। এমনিভাবে জনগণ ও রাষ্ট্রের যেসব হক তাদের কাছে দেয়া হয়েছে, তা পরিশোধ করে দেয়া ফরজ। রাষ্ট্রের অনধিকার ও অন্যায়ভাবে কিছু দাবী করাও বৈধ নয়। কেউ কোনো অন্যায় দাবী তুলে রাষ্ট্রীয় শান্তি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিপন্ন করে তুললে নিম্নলিখিত আয়াতের মর্মবাণী তাদের উপর প্রযোজ্য হবে। যেমন-
وَمِنْهُمْ مَنْ يَلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَاتِ - فَإِنْ أَعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِنْ لَّمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُوْنَ - وَلَوْ أَنَّهُمْ رَضُوا مَا آتَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَقَالُوا حَسْبُنَا اللهُ سَيُؤْتِيْنَا اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَرَسُولُهُ إِنَّا إِلَى اللَّهِ رَاغِبُوْنَ - إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَاتِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ - فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
“হে নবী! তাদের মধ্যে এমন কিছু লোকও রয়েছে, সাদকা-খয়রাতের প্রশ্নে তারা তোমার ব্যাপারে অভিযোগের সুরে কথা বলে। অতঃপর যখন এ থেকে তাদের কিছু দেয়া হয় তারা খুশি হয় আর যদি না দেয়া হয় তাহলে- সাথে সাথে বিগড়ে বসে। আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূল তাদের যা প্রদান করেছিলেন, তারা যদি এটা আনন্দে গ্রহণ করতো এবং বলতো যে, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, এখন দেননি তো কি হয়েছে, ভবিষ্যতে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল আমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ প্রদান করবেন, আমরা তো আল্লাহর সাথেই যোগসূত্র স্থাপন করে আছি, (তাহলে এটাই তাদের উপযুক্ত উক্তি হতো।) দান-খয়রাত তো শুধু ফকীর-মিসকীনদের হক আর ঐ সকল ব্যক্তির হক, যারা (রাষ্ট্রের) কর্মচারী হিসাবে দান-সাদকার অর্থ উসুল করার জন্যে নিযুক্ত। তেমনি যাদের অন্তরকে (দীনের সাথে) সংযোগ করা কাম্য, এগুলো তাদেরও হক। দাসমুক্তির ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করণে, আল্লাহর পথে এবং দুস্থ প্রবাসী মুসাফিরের পাথেয় হিসাবে দান-সাদকার অর্থ ব্যয়িত হবে। সাদকা বিলি-বণ্টনে এসব হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত খাত। আল্লাহই সবজান্তা এবং অতি প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবা: ৫৮-৬০)
জনগণের উপর রাষ্ট্রের যেসব অধিকার রয়েছে, সেগুলো দানে বিরত থাকার অধিকার তাদের নেই। এমনকি শাসক অত্যাচারী হলেও রাষ্ট্রের স্বার্থে যেসব বিষয় তাদের দেয়, তা দিতেই হবে। এ মর্মে মহানবী (সা) ঠিক তখনই নিম্নোক্ত ইরশাদ করেছিলেন, যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসকের বিরুদ্ধে জুলুম নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল। যথা-
اَدُّوا إِلَيْهِمُ الَّذِي لَهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا اسْتَرَعَاهُمْ -
"তোমাদের উপর তাদের যেই হক বা অধিকার রয়েছে, তা আদায় করে দাও, কারণ, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে জনগণের অধিকারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন।"
হযরত আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক মহানবী (সা)-এর একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে-
كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوْسُهُمُ الأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيُّ خَلَفَهُ نَبِيُّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِى وَيَسَكُونُوا خُلَفَاءَ وَيُكْثِرُونَ قَالُوا فَمَا تَأْمُرْنَا - قَالَ أَوْفُوا بَيْعَةَ الأَوَّلِ فَالأَوَّلَ - ثُمَّ اعْطُوْهُمْ حَقَّهُمْ - فَإِنَّ اللَّهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا اسْتَرَعَاهُمْ - (صحیح بخاری ومسلم)
"বনী ইসরাঈলকে নবীগণ শাসন করতেন। তাদের কোনো একজন পয়গম্বরের ইন্তেকাল হলে তারা অপর এক পয়গম্বরকে তাঁর খলীফা তথা স্থলাভিষিক্ত করতেন। তবে আমার পর এভাবে আর কোনো নবী-রাসূল নেই এবং আসবেও না। তবে বহু খলীফা হবে। সাহাবীগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ সময়ের জন্যে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আপনার কি নির্দেশ।' রাসূল (সা) বললেন, তোমরা পূর্ণ বিশ্বস্ততা সহকারে তাদের আনুগত্য করে যাবে। প্রথম যিনি নির্বাচিত হবেন, তার প্রতি তোমাদের আনুগত্যের দায়িত্ব কর্তব্য যথাযথ পালন করবে। তারপর যিনি তার প্রতি। অতঃপর তোমাদের উপর যেসব হক পালনীয় হয়ে আছে, তা দিয়ে দেবে। জনগণের যেসব অধিকার রয়েছে, আল্লাহ সে ব্যাপারে শাসকদের নিকট কৈফিয়ত তলব করবেন। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) কর্তৃক সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ بَعْدِى أَثْرَةً تُنْكِرُونَهَا - قَالُوا فَمَا تَأْمُرُنَا يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ -
"আমার পরে তোমরা বহু ধন-ঐশ্বর্য দেখতে পাবে, আর এমন বিষয়ও দেখবে এবং এমন কথাও শুনবে, যেগুলো তোমরা পছন্দ করবে না। সাহাবা-এ কেরাম আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এরূপ মুহূর্তে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলুন।” রাসূল (সা) ইরশাদ করেন-
قَالَ أَدُّوا إِلَيْهِمْ حَقَّهُمْ وَاسْتَلُوا اللَّهَ حَقَّكُمْ -
"তোমাদের কাছে (সরকারী-বেসরকারী) যাদের হক বা অধিকার থাকে, তোমরা তা পরিশোধ করে দেবে আর নিজেদের অধিকারের জন্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাবে।"
জনসাধারণের তহবিলের দায়িত্বে যারা নিয়োজিত থাকবে, (ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা) অর্থ বণ্টনে স্বেচ্ছাচারিতা চালাবার কোনো অধিকার তাদের নেই। রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদকে ব্যক্তিগত অর্থ-সম্পদ মনে করবে না। যেভাবে খুশি সেভাবে সরকারী অর্থ ব্যয় করবে না। কারণ সরকারী অর্থ তহবিলের দায়িত্বে যিনি নিয়োজিত থাকবেন, তিনি এর মালিক নন, বরং আমানতদার মাত্র; (ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা তা নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা চলবে না)। মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন-
إِنِّي وَاللَّهِ لَا أُعْطِي أَحَدًا وَلَا أَمْنَعُ أَحَدًا إِنَّمَا أَنَا قَاسِمٌ - أَضَعُ حَيْثُ أُمِرْتُ - (بخاری)
"আল্লাহ্র কসম, না আমি কাউকে (অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ) প্রদান করি, না কারুর সম্পদ (অন্যায়ভাবে) গ্রহণ করি বা আটক রাখি। আমি যেভাবে আদিষ্ট ঠিক সেভাবেই জনগণের মাঝে সম্পদ বণ্টন করে থাকি।” (বুখারী)
লক্ষ্য করার বিষয় যে, মহানবী (সা) রাব্বুল আলামীন বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের রাসূল (বার্তাবাহক)। তিনি বলছেন, কাউকে দেয়া না দেয়ার প্রশ্নে তাঁর ইচ্ছারও কোনো মূল্য নেই। বিলি-বণ্টনে মালিকদের মতো নিজ ইচ্ছামাফিক সরকারী মাল সম্পদ ব্যয়ে তাঁর কোনো ইখতিয়ার নেই। দুনিয়াদার শাসক ও উচ্চ কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে স্বজনপ্রীতি অবলম্বন করে এবং তাদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় করে। অনেক হকদার লোককেও তারা শুধু এজন্যে বঞ্চিত করে যে, যেহেতু ঐ সকল লোক তাদের প্রিয়জনদের তালিকাভুক্ত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আল্লাহ যেখানে ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি সেখানেই তা ব্যয় করতেন।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবও (রা) (রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপারে) একই নীতির অনুসরণ করেছেন। একদা অনেক ব্যক্তি এসে তাঁকে বলল : আপনার আরও কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রয়োজন। আপনি বায়তুল মাল থেকে আরও কিছু বেশি অর্থ গ্রহণ করলে ভাল হবে। হযরত উমর (রা) বললেন : আমার এবং জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক তোমাদের জানা নেই। এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে এরূপ যেমন, কিছু লোক সফর করছে। সকলে নিজ নিজ মাল-সামান ও অর্থ-সম্পদ তাদের একজনের কাছে গচ্ছিত রেখে বললো : আপনি আমাদের এই অর্থ ও মালামাল আমাদের প্রয়োজনে ব্যয় করবেন। এমতাবস্থায় আমানতদারের জন্যে সেই অর্থ-সম্পদ থেকে কিছুটা ব্যয় করা এবং যেমন খুশি তেমনি খরচ করা বৈধ্য হবে কি?
একবার হযরত উমর (রা)-এর নিকট “খুমুসের” (গণীমতের পঞ্চাংশ) অনেক মাল এসেছিল। ঐগুলো দেখে তিনি বললেন : জনগণ তাদের আমানত দিয়ে দিয়ে বেশ কাজ করেছে। উপস্থিত দু'একজন বললেন, আপনি আমানতের মালসমূহ আল্লাহ্ হুকুমে যথাযথ ব্যয় করে থাকেন। এজন্যে জনগণও আমানতসমূহ (যাকাত, ওশর, কর ইত্যাদি সকরারী পাওনা) নিয়মিতভাবে এনে আপনার হাতে জমা দিয়ে দেয়। আপনি যদি এতে হেরফের করতেন তারাও করতো।
"উলিল আমর” বা নেতা বলতে কি বুঝায়, জনগণের তা জানা উচিত। তাঁর অধিকার এবং মর্যাদা কি, সে সম্পর্কেও অবহিত থাকা আবশ্যক। নেতার তুলনা অনেকটা বাজারের মতো। বাজারে তোমরা যে পরিমাণ মূল্য দাও, সে পরিমাণ পণ্য পাও, তাই হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ) বলতেন : তুমি যদি সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ হও এবং বিশ্বস্ততার পরিচয় দাও, তাহলে এর বিনিময়ে তুমিও একই প্রতিদান পাবে। পক্ষান্তরে যদি মিথ্যাচার, অন্যায়, অবিচার ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দাও, তাহলে তুমিও প্রতিদানে একই আচরণ পাবে।
অতএব দেশের প্রধান শাসক ও তাঁর অধীনস্থ অন্যান্য কর্মকর্তার উপর ফরজ হলো, ন্যায়নীতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থ সংগ্রহ করা এবং সেগুলো যেখানে ব্যয় করা সঙ্গত ওখানে সেভাবে ব্যয় করা। হকদারকে বঞ্চিত না করা।
হযরত আলী (রা)-এর নিকট একবার অভিযোগ আসলো যে, তাঁর কোনো কোন 'নায়েব' (প্রতিনিধি) জনগণের উপর জুলুম করে। তিনি তখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে উঠলেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي لَمْ أَمُرْهُمْ إِذْ يَظْلِمُوا خَلْقَكَ وَلَا يَتْرُكُوا حَقَّكَ -
- “হে আল্লাহ! আমি তাদের জুলুম-অত্যাচার এবং আপনার হক ত্যাগ করার নির্দেশ দেইনি।"

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 রাষ্ট্রীয় সম্পদ তিন প্রকার

📄 রাষ্ট্রীয় সম্পদ তিন প্রকার


এই পরিচ্ছেদের বিষয় বস্তুসমূহ: (১) গণীমতের মাল (তথা রণাঙ্গনে শত্রু পরিত্যক্ত সম্পদ), (২) সাদকা-খয়রাত, (৩) মাল-এ-ফাঈ। সকল পয়গম্বরের তুলনায় মহানবী (সা)-কে ৫টি অতিরিক্ত জিনিস দেয়া হয়েছে।
শ্রমজীবী দুর্বলদের কারণেই তোমরা যারা সবল তাদের খাদ্য জুটে এবং অন্যান্য সহায়তা মিলে। 'গানেম'দের (গনিমত লাভকারী) মধ্যেই মালে গণীমত বণ্টন করবে। বনী উমাইয়া, বনী আব্বাসও তাই করেছে।
কুরআন ও হাদীছে উল্লেখিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ তিন প্রকার। (১) গণীমতের মাল, (২) সাদকা-যাকাত, (৩) মাল-এ-ফাঈ। কাফেরদের সাথে লড়াইয়ের পর যেই সম্পদ হস্তগত হয়, তাকে মালে গণীমত বলা হয়। কুরআন মজীদের সূরা আনফালে মালে গণীমতের কথা আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন। বদর যুদ্ধের সময় এ সূরা নাযিল হয়েছিল। 'আনফাল' শব্দটি 'নফল' শব্দের বহুবচন। নফল অর্থ অতিরিক্ত, সূরার নাম 'আনফাল' রাখার কারণ ছিল, মুসলমানদের সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। যেমন: আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
يَسْتَلُوْنَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ - قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ.
“হে নবী! মুসলমান সৈনিকরা তোমার নিকট গণীমতের মাল (বণ্টনের) নিয়ম-বিধি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। তুমি তাদের বলে দাও যে, মালে গণীমত তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। (সূরা আনফাল : ১)
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ.
আর জেনে রেখো, যে সম্পদ তোমাদের হস্তগত হয়, তার এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ্র এবং তাঁর রাসূলের জন্য, রাসূলের নিকটাত্মীয় এবং ইয়াতীমদের জন্যে আর পরমুখাপেক্ষী ভিক্ষুক ও দুস্থ প্রবাসী মুসাফিরের জন্য।" (সূরা আনফাল: ৪১)
তিনি আরও ইরশাদ করেন-
فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
“গণীমতের যেসব মাল তোমাদের হস্তগত হয়, সেগুলো হালাল এবং পবিত্র জ্ঞানে ভক্ষণ করো আর আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান। (সূরা আনফাল : ৬৯)
সহীহ বুখারী এবং মুসলিম শরীফে হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন যে,
أُعْطِيْتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطِهِمْ نَبِيُّ نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيْرَةَ شَهْرٍ وَجُعِلَتْ لِي الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا فَأَيُّمَا رَجُلٌ مِنْ أُمَّتِي أَدْرَكَتْهُ الصَّلوةُ فَلْيُصَلِّ وَأُحِلَّتْ لِي الْغَنَائِمُ وَلَمْ تَحِلَّ لِأَحَدٍ قَبْلِي أُعْطَيْتُ الشَّفَاعَةَ وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً.
“এমন পাঁচটি জিনিস আমাকে দেয়া হয়েছে, যা ইতিপূর্বে আর কোনো নবীকে দেয়া করা হয়নি। (১) এক মাসের দূরত্বে (অবস্থান রত শত্রুর মনে) আমার ব্যক্তিত্বের ভীতি সৃষ্টির (মাধ্যমে) আমাকে বিজয় প্রদান করা হয়েছে। (২) গোটা ভূপৃষ্ঠকে আমার জন্যে মসজিদ এবং এর মাটিকে পবিত্রতা দানকারী বানানো হয়েছে। সুতরাং আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তির জীবদ্দশায় নামাযের সময় উপস্থিত হবে, সে যেন নামায আদায় করে নেয়। (৩) আমার জন্যে মালে গণীমত তথা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিত্যক্ত সম্পদ হালাল করা হয়েছে। আমার পূর্বে কারোর জন্যে তা হালাল ছিল না। (৪) আমাকে সুপারিশের অধিকার দেয়া হয়েছে। (৫) আমার পূর্বে নবী রাসূলদেরকে নিজ নিজ কওমের জন্যে প্রেরণ করা হতো আর আমি প্রেরিত হয়েছি গোটা বিশ্বমানবের জন্যে।”
মহানবী (সা) আরও ইরশাদ করেছেন যে,
بعِثْتُ بِالسَّيْفِ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ حَتَّى يَعْبُدُوا اللَّهَ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَجُعِلَ رِزْقِي تَحْتَ ظِلُّ رَمْحِي وَجُعِلَ الذُّلُّ وَالصِّغَارُ عَلَى مَنْ خَالَفَ أَمْرِي - وَمَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ.
'কিয়ামতকে সামনে রেখে আমি তরবারিসহ প্রেরিত হয়েছি, যেন মানুষ এক আল্লাহর ইবাদত করে যার কোনো শরীক নেই। আমার রিযিক আমার বল্লমের ছায়াতলে রাখা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধাচরণকারীর জন্যে রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা। যে অপর জাতির (ধর্মীয়) সাদৃশ্য অবলম্বন করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত রূপে গণ্য হবে। (মুসনাদে আহমদ)
অতএব, মালে গণীমতের বেলায় এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে ফরয। তার থেকে এ অংশ আলাদা করে আল্লাহর নির্দেশ মাফিক তা খরচ করবে। অবশিষ্ট মাল গণীমত আহরণকারীদের মধ্যে বিতরণ করবে। হযরত উমর ফারুক (রা)-এর উক্তি হলো, "তারাই মালে গণীমতের অধিকারী যারা জিহাদে অংশ গ্রহণ করে। চাই যুদ্ধ করুক বা না করুক। মালে গণীমত বণ্টনকালে কারোর পদমর্যাদা, কর্তৃত্ব- নেতৃত্বের পরোয়া করবে না। বংশ মর্যাদা বা আভিজাত্যের সামনেও ভীরুতা দেখাবে না। সম্পূর্ণ ন্যায় নীতি ও ইনসাফের সাথে এ মাল বণ্টন করবে। মহানবী (সা) ও তাঁর খলীফাগণ কি করতেন? সহীহ বুখারী শরীফে আছে যে, হযরত সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা) অন্যদের তুলনায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। যেমন, আল্লাহর রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন,
هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلَّا بِضُعَفَائِكُمْ.
“তোমাদের বিজয় এবং রিযিক প্রদান করা হয় তোমাদের দুর্বলদের অসিলায়।
মুসনাদে আহমদ হাদীস গ্রন্থে সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) সমীপে এ মর্মে আরয করলাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! জনৈক ব্যক্তি আপন কওমের মর্যাদা ও নেতৃত্ব বজায় রাখার লড়াই করছে। তাঁর অংশও কি অন্যদের মতোই সমান হওয়া উচিত? হুযূর (সা) বললেন-
ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ ابْنَ أُمِّ سَعْدٍ وَهَلْ تُرْزَقُوْنَ وَتُنْصَرُونَ إِلَّا بِضُعَفَائِكُمْ.
"হে ইবনে উম্মে সা'দ! তোমার মরে যাওয়াই শ্রেয়। তোমাদেরকে কি তোমাদের দুর্বলদের অসিলায় রিযিক ও বিজয় প্রদান করা হয় না?"
বনী উমাইয়া এবং বনী আব্বাসের শাসনামলে গণীমতের মাল আহরণকারীদের মধ্যেই বিলি-বণ্টন করা হতো। তখন মুসলমানরা রোম, তুরস্ক এবং বারবারদের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত থাকত। জিহাদে কেউ যদি দুঃসাহসিক কোনো কাজ করে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো অভিযান চালায় যেমন দুর্গ দখল করা, যদ্দরুন যুদ্ধ জয়ের পথ উন্মুক্ত হয় কিংবা শত্রুবাহিনীর নেতার উপর হামলা চালিয়ে দুশমনকে পরাস্ত করে অথবা অনুরূপ অন্য কোনো কাজ করে, তাহলে এহেন ব্যক্তিকে 'নুফল' বা অতিরিক্ত দেয়া যাবে। কেননা খোদ রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর খলীফাগণ 'নুফল' দিতেন। যেমন, 'বেদায়া' যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) 'খুমুস' (এক পঞ্চমাংশ) ছাড়াও এক চতুর্থাংশ আরও দিয়েছিলেন। তেমনি গাযওয়া-এ-রাজফায় 'খুমুস' এর অতিরিক্ত এক তৃতীয়াংশ দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে উলামা-এ-কিরামের মতভেদ আছে, কারও মতে 'নুফল' ও অতিরিক্ত দান 'খুমুস' তহবিল হতে দেয়া হবে। কারও মতে 'খুমুস-এর এক পঞ্চমাংশ থেকে দেয়া হবে, যেন যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী কারও উপর কারোর প্রাধান্য প্রকাশ না পায়।
সঠিক কথা হলো এই যে, খুমুস-এর এক চতুর্থাংশ থেকে নুফল ও অতিরিক্ত মালে গণীমত প্রদান করবে, তাতে কারোর উপর কারোর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলেও হতে পারে। তবে এই 'নুফল' প্রদান কোনো দ্বীনী স্বার্থেই হতে হবে- ব্যক্তির খেয়াল-খুশি বা স্বার্থপরতার তাতে কোনো স্থান নেই। মহানবী (সা) একই লক্ষ্যে কয়েকবার 'নুফল' প্রদান করেছেন। সিরীয় ফকীহগণ এবং ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আহমদ প্রমুখের মত হচ্ছে এটিই। এ মতের ভিত্তিতেই বলা হয়েছে যে, এক চতুর্থাংশ এবং এক তৃতীয়াংশ শর্তহীনভাবেই দিয়ে দেবে। এর অধিক পরিমাণ দিতে হলে তাতে শর্ত আরোপ করতে হবে। যেমন, নেতা কিংবা সেনাবাহিনীর সিপাহসালার বলবেন, "যে ব্যক্তি অমুক কিল্লাটি ধ্বংস করবে" অথবা "শত্রু দলের অমুককে হত্যা করবে, তাকে এটা দেয়া হবে। কারও কারও অভিমত হলো, নুফল এক তৃতীয়াংশের অধিক না দেয়া। তবে হাঁ শর্ত আরোপ করে দেয়া যাবে। এ দুটি অভিমত হচ্ছে ইমাম আহমদ ও অন্যদের।
সঠিক বর্ণনা মতে, নেতার জন্যে এটা বলা জায়েয আছে যে, “যে ব্যক্তি যে জিনিস নিয়েছে সেটি তারই"। বদর যুদ্ধে মহানবী (সা) এরূপ বলেছিলেন। তবে এটা তখনই বলা যায়, যদি কল্যাণের মাত্রা অধিক হয় এবং অসন্তোষের মাত্রা কম হয়।
ইমাম বা নেতা কারও পক্ষে কোনো প্রকার জুলুম, প্রতারণা, বাড়াবাড়ি কিংবা মালের ক্ষতি করার অধিকার নেই। কেউ এরূপ করলে কিয়ামতের দিন এজন্যে তাকে আল্লাহর কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে। কারণ, এ ধরনের কাজও খিয়ানত। মাল-এ-গণীমতের মধ্যে লুটতরাজ করাও নাজায়েয। যার যার খেয়াল খুশি মত লুটপাট করে গণীমতের মাল নিয়ে যাওয়া থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিমগণকে বিরত রেখেছেন।
গণীমতের মাল বণ্টন হবার পূর্বে যদি নেতা এই সাধারণ অনুমতি প্রদান করেন যে, "যে যেইটা হস্তগত করে নিয়েছো সেটা তারই” এটা তখনই জায়েয এবং হালাল হবে যদি তা 'খুমুস আদায় করার পর হয়ে থাকে। অনুমতির জন্যে বিশেষ কোনো শব্দ বা বাক্য নেই। যেভাবেই হোক নেতা বা ইমামের পক্ষ থেকে অনুমতি হলেই হবে। তবে যে ক্ষেত্রে সাধারণ অনুমতি দেয়া না হয়, তখন যদি কেউ কোনো জিনিস নেয়, ঐ অবস্থায় এতদূর ন্যায়নীতিবোধ নিয়ে কাজ করবে যে, অনুমতি পেলে তার ভাগে যে পরিমাণ মাল আসতো, ঠিক ঐ পরিমাণই সে গ্রহণ করতে পারে।
ইমাম যদি গণীমতের মাল সংগ্রহ করা বন্ধ করে দেন এবং অবস্থা কিছুটা এরূপই হয় যে, তিনি যেটা ইচ্ছা সিদ্ধান্ত নিবেন, তাহলে পরস্পর বিরোধী দুটি মত দেখা দিলে উভয়টিই বাদ দিবে এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে। কারণ আল্লাহর দ্বীনের পথ হচ্ছে মধ্যপন্থা।
মাল বণ্টনকালে ন্যায়-নীতি হচ্ছে এই যে, এক অংশ পাবে 'পেয়াদা' অর্থাৎ পদাতিক আর তিন অংশ পাবে ঘোড় সওয়ার বাহিনী যারা আরবী ঘোড়া রাখে। এক অংশ তার আর দুই অংশ ঘোড়ার। খায়বর যুদ্ধে মহানবী (সা) এরূপই করেছিলেন।
কোনো কোনো ফকীহ-এর মতে সওয়ার (আরোহী) পাবে দুই অংশ। এক অংশ থাকবে তার আর এক অংশ তার ঘোড়ার। তবে প্রথমোক্ত মতটিই সঠিক। সহীহ হাদীসও এ ব্যাপারে পোষকতা করে। কারণ ঘোড়ার সাথে তার সহিস ইত্যাদিও থাকে। তাই ঘোড়া অধিক সাহায্যের মুখাপেক্ষী। "পেয়াদা'র তুলনায় সহিস বা সওয়ারের দ্বারাই অধিক কল্যাণ সাধিত হয়।
কোনো কোনো ফকীহর অভিমত হলো, আরবী ঘোড়া এবং 'হাজীন' ঘোড়াকে সমান অংশ দিতে হবে। কারও মতে আরবী ঘোড়াকে দুই অংশ এবং হাজীন ঘোড়াকে এক অংশ দেবে। রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবা-এ-কিরাম থেকে এরূপ বর্ণিত আছে, 'হাজীন' ঐ ঘোড়াকে বলা হয় যার মা হচ্ছে ‘নাবতিয়া’- (১) তাকে ‘বিরযাওন' এবং ‘বাস্তরী’ও বলা হয়। ছিন্নমুষ্ক ও অছিন্নমুষ্ক উভয় ঘোড়ার একই হুকুম। যেই পুরুষ ঘোড়া মাদী ঘোড়ার উপর প্রজননে ব্যবহৃত হয়নি, অতীত যুগের লোকেরা তাকে অপেক্ষাকৃত অধিক গুরুত্ব দিত। কারণ এরূপ ঘোড়া অধিক শক্তিশালী এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন হয়ে থাকে।
গণীমতের মালের মধ্যে যদি মুসলমানের মাল থাকে- চাই সেটা জমিন হোক কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি- যা বণ্টনের পূর্বে অন্য মানুষও জানতো, তাহলে সে মাল তাকে ফেরত দিয়ে দেবে। এটা মুসলিম উম্মাহ্র সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
গণীমতের মাল এবং এর বণ্টন সম্পর্কিত অনেক বিধি বিধান রয়েছে। এ ব্যাপারে পূর্বসূরীদের পক্ষ থেকে রয়েছে অনেক বক্তব্য ও দৃষ্টান্ত। কোনটি সর্বসম্মত এবং কোনটিতে মত পার্থক্য রয়েছে, যেগুলোর আলোচনার অবকাশ এখানে কম। এখানে মোটামুটি মৌলিক ক'টি কথাই শুধু পেশ করা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00