📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 শরীয়তী শাসন কর্তৃত্বের দায়িত্ব ও কর্তব্য

📄 শরীয়তী শাসন কর্তৃত্বের দায়িত্ব ও কর্তব্য


প্রথম পরিচ্ছেদের বিষয়বস্তু হলো: নেতৃত্বের অধিকারী, পৌর কর্মকর্তা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসকবৃন্দ, বিচারকমণ্ডলী, বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, অর্থবিভাগীয় কর্মকর্তাগণ, মন্ত্রীবর্গ, মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ, সাদকা-খয়রাত ও সরকারী যাকাত আদায়কারী-গণের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত আলোচনা।
দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ব্যাপারটি দুই প্রকার। (১) কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্ব। মহানবী (সা) যখন মক্কা জয় করেন, তখন তিনি কা'বা শরীফের চাবিসমূহ বনী শাইবা থেকে নিয়ে নিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাচা আব্বাস (রা) এ সকল চাবি চেয়ে বসলেন যেন হাজীদের পানি পান করানোর ব্যবস্থাপনা এবং একই সাথে কা'বার অভিভাবকত্ব লাভ ও কা'বার খেদমতের দায়িত্বও নিজে পেতে পারেন। কিন্তু তাঁর এই আগ্রহ আল্লাহ পছন্দ করেননি। তিনি আয়াত নাযিল করলেন এবং কা'বা শরীফের কার্যসমূহ পূর্ববর্তী খাদেম বনী শাইবার লোকদেরকেই প্রদান করার নির্দেশ দিলেন। অতএব এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, নেতার জন্যে ফরয (কর্তব্য) হচ্ছে মুসলমানদের কোনো কাজকে এমন ব্যক্তিদের হাতে সোপর্দ করা, যারা ঐ কাজের জন্যে অধিক যোগ্যতার অধিকারী। যেমন মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন,
مَنْ وَلَّى مِنْ أَمْرِ الْمُسْلِمِينَ شَيئًا فَوَلَّى رَجُلًا وَهُوَ يَجِدُ مَنْ هُوَ أَصْلَحُ لِلْمُسْلِمِينَ فَقَدْ خَانَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ .
"মুসলমানদের কোন কাজে কেউ কর্তৃত্ব লাভ করার পর যদি সে এমন এক ব্যক্তিকে শাসক নির্বাচন করে, যার চাইতে সেই এলাকায় অধিক যোগ্যতর মুসলমান রয়েছে, তাহলে সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো।"
مَنْ قَلَّدَ رَجُلاً عَمَلاً عَلَى عَصَابَةٍ وَهُوَ يَجِدُ فِي تِلْكَ الْعِصَابَةِ أَرْضَى مِنْهُ فَقَدْ خَانَ اللَّهَ وَخَانَ رَسُوْلَهُ وَخَانَ الْمُؤْمِنِينَ -
যে (রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা) সেনাবানিহীতে এমন ব্যক্তিকে নেতা নির্ধারণ করে, যার চাইতে জাতীয় সেনাবাহিনীতে আরও যোগ্যতর ব্যক্তি রয়েছে, সে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। বিশ্বাসঘাতকতা করলো মুসলমানদের সাথে। (আল হাকিম তাঁর সহীহ হাদীস সংকলনে এটি রেওয়ায়েত করেছেন।)
কোন কোন আলিম এটিকে হযরত উমরের (রা) বাণী বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, হযরত উমর (রা) একথাটি তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন। উমরের (রা) ছেলেই একথার বর্ণনাকারী। হযরত উমর (রা) বলেন,
مَنْ وَلَّى مِنْ أَمْرِ الْمُسْلِمِينَ شَيْئًا فَوَلَّى رَجُلًا لِمُوَدَّةٍ أَوْ قَرَابَةٍ بَيْنَهَا فَقَدْ خَانَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالْمُسْلِمِينَ -
"যে বক্তি মুসলমানদের কোন ব্যাপারে (নির্বাহীর) দায়িত্ব পেয়ে (যোগ্যতর লোককে বাদ দিয়ে) এমন ব্যক্তিকে কর্মকর্তা নিযুক্ত করে, যার সংগে তার স্নেহের সম্পর্ক আছে কিংবা সে তার স্বজন, তবে সে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল এবং মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো।”
বিষয়টির ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করা শাসনকর্তাদের প্রথম কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে কোন্ লোক প্রকৃত যোগ্য, শহর ও পৌর এলাকাসমূহে (এবং স্থানীয়) প্রশাসনে কি ধরনের সরকারী প্রতিনিধি বা কর্মকর্তা নিয়োগ বাঞ্ছনীয়, এ ব্যাপারে যাচাই-বাছাই ও পরামর্শ করা অপরিহার্য। কারণ, যারা সেনা ইউনিটের কমাণ্ড অফিসার হবে, যারা ছোট বড় ইসলামী সেনাদলের নেতৃত্ব দেবে, যারা মুসলমানদের নিকট থেকে নানা প্রকার শুল্ক কর আদায় করবে, যারা জনগণের অর্থ ব্যবস্থার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে, তারাই এসবের নিয়ন্ত্রক।
সরকারী প্রশাসনিক কাজ কর্মের পরিচালকও তারা। এজন্যে উচ্চ কর্মকর্তা ও প্রধান শাসকের জন্যে একান্ত অপরিহার্য বিষয় হলো, এমন সব লোককে সরকারী গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে নিয়োগ দান করা, যারা মুসলমানদের জন্যে উত্তম এবং যোগ্য বলে গণ্য। এটাও লক্ষ্য রাখতে হবে যে, যোগ্য লোক থাকতে যাতে কোন অযোগ্য ব্যক্তি নিয়োগপত্র পেয়ে না যায়। এ নীতি রাষ্ট্রীয় সকল প্রশাসনিক বিভাগে অবশ্যই পালনীয়। যেমন, নামাযে ইমাম ও মুয়ায্‌যিন, শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষক, হজ্জ অনুষ্ঠানে খতীব বা কর্মকর্তা, খাবার পানির ব্যবস্থাপক, (নদ-নদী, খাল) ঝর্ণার তত্ত্বাবধায়ক রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সংরক্ষক, সেনানিবাসের প্রহরী, সেখানকার অস্ত্রনির্মাতা, অস্ত্রাগারে পাহারাদার, ছোট বড় বিভিন্ন বাহিনীর পরিচালক, বাজারের শুল্ক আদায়কারী, গ্রামীণ তথা স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এদের প্রত্যেকের নিয়োগে সততা ও যোগ্যতাকেই প্রাধান্য দিতে হবে।
কেউ মুসলিম সমাজের নেতা ও শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী হলে তাঁর দায়িত্ব হলো নিজের অধীনস্থ এমন সব লোককে কর্মচারী হিসাবে নিয়োগ করা, যারা সৎ বিশ্বস্ত এবং সংশ্লিষ্ট কাজের ব্যাপারে দক্ষ, পারদর্শী। এমন সব ব্যক্তিকে কিছুতেই সামনে এগিয়ে নেয়া উচিত নয়, যারা নিজেরাই কর্তৃত্ব পাবার খাহেশ পোষণ করে কিংবা পদের দাবী করে। বরং যারা পদলোভী, উক্ত পদ পাবার প্রশ্নে তাদের এই লোভই হচ্ছে বড় অযোগ্যতা।
সহীহ আল বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ قَوْمًا دَخَلُوا عَلَيْهِ سَتَلُوهُ وَلَايَةً فَقَالَ إِنَّا لَا نُوَلَّى أَمْرَنَا هَذَا مَنْ طَلَبَهُ -
রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা তাঁর দরবারে কিছু লোক উপস্থিত হয়ে তাঁর পক্ষ থেকে শাসন কর্তৃত্ব প্রাপ্তির অনুরোধ জানালো। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: যারা স্বেচ্ছায় কর্তৃত্ব চায়, আমরা এমন লোককে কোন কিছুর কর্তৃত্ব দেই না। (বুখারী-মুসলিম)
আবদুর রহমান ইবনে সুমারা কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, يَا عَبْدَ الرَّحْمَنِ لَا تَسْئَلِ الْإِمَارَةَ فَإِنَّكَ إِنْ أُعْطِيْتَهَا مِنْ غَيْرِ مَسْئَلَةٍ أُعِنْتَ عَلَيْهَا - وَإِنْ أُعْطَيْتَهَا عَنْ مَسْئَلَةٍ وَكُلْتَ إِلَيْهَا - (اخرجاه في الصحيحين)
“হে আবদুর রহমান! নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চেয়ে নিও না। অপ্রার্থিতভাবে যদি তোমার হাতে নেতৃত্ব আসে, তাহলে তুমি দায়িত্ব পালনে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য পাবে আর যদি তুমি নেতৃত্ব চেয়ে নাও, তাহলে সেটার (ভালমন্দের) পুরো দায়িত্ব তোমার উপরই বর্তাবে (এবং তুমি আল্লাহর সাহায্য পাবে না।")
মহানবী (সা) বলেছেন, مَنْ طَلَبَ الْقَضَاء وَاسْتَعَانَ عَلَيْهِ وَكُلَ إِلَيْهِ وَمَنْ لَمْ يَطْلُبْ الْقَضَاءَ وَلَمْ يَسْتَعِنْ عَلَيْهِ أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَيْهِ مَلَكًا يُسَدده. (رواه اهل السنة)
“যে ব্যক্তি বিচারকের পদ চায় আর এজন্য কারুর সাহায্য প্রার্থনা করে, তার উপর সে কাজের (ভালমন্দ) সোপর্দ করা হবে। আর যে বিচারকের পদ দাবী না করে এবং এজন্যে কারুর সাহায্য না চায়, তা হলে আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে একজন ফেরেশতা পাঠান। ঐ ফেরেশতা তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।" (আহলুস সুন্নাহ)
অতএব প্রধান শাসক যদি দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলেন এবং অধিক সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে বন্ধুত্ব, স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বদেশীকতা যেমন ইরানী, তুর্কী, রোমী কিংবা অপর কোন সম্পর্কের ভিত্তিতে অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন, তাহলে সেটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। ঠিক তেমনিভাবে উৎকোচ অথবা অপর কোন সুযোগ- সুবিধার বিনিময়ে কিংবা এ জাতীয় অন্য কোন সংকীর্ণ স্বার্থ যদি কারও নিয়োগের কারণ হয় অথবা যোগ্য সৎ ব্যক্তির প্রতি কপটতা ও বৈরিতার কারণে তাকে বাদ দিয়ে অযোগ্য অসাধু ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয়, তাহলে সেটাও অবশ্যই আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও সাধারণ মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বৈ কিছু নয়। আল্লাহ তা'আলা এহেন বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে নিষেধ করে বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ - (سورة انفال : (۲۷)
"হে মুমিনগণ! জেনে শুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও না।” (সূরা আনফাল : ২৭)
অতঃপর আল্লাহ ইরশাদ করেন,
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ -
"জেনে রেখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি হচ্ছে একটি ফিৎনা বা পরীক্ষা। নিঃসন্দহে আল্লাহর নিকটই রয়েছে বিরাট প্রতিদান। (সূরা আনফাল: ২৮)
মহান আল্লাহর একথা বলার তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, মানুষ অনেক সময় নিজ সন্তান ও আপনজনদের ভালবাসায় আচ্ছন্ন হয়ে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় কোন গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্ব দিয়ে বসে। অযোগ্যকে ক্ষমতার অধিকারী বানিয়ে দেয়। এটা অবশ্যই আল্লাহর আমানতে খেয়ানত ছাড়া কিছু নয়। এমনিভাবে সম্পদের প্রাচুর্য ও অর্থের পাহাড় গড়ে তোলার ব্যাপারে তার আগ্রহের শেষ থাকে না। তার এই সম্পদপ্রীতি তাকে অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিতে এবং অন্যায়ে প্রবৃত্ত হতে বাধ্য করে। সে অন্যায়, অবৈধ পন্থায় সম্পদ লাভ করতে গিয়ে জনগণকে শোষণ করে। কোন কোন এলাকার আঞ্চলিক শাসক বা বড় সরকারী কর্মকর্তা এমন চরিত্রের হয়ে থাকে যে, সে ঊর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিকে তোষণে পারদর্শী। ফলে তোষামোদী লোকদেরকে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আপন লোকদের দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করে বসে। এহেন ব্যক্তি নিঃসন্দহে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও আমানতের খেয়ানত করে।
দায়িত্বপূর্ণ সরকারী ব্যক্তি যদি আল্লাহকে ভয় করে লোভ সংবরণ করতে পারে এবং নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকতে সক্ষম হয়, তাহলে আল্লাহ তাকে ন্যায়নীতির উপর অটল থাকতে সাহায্য করেন। তাকে সকল প্রতিকূলতা থেকে হেফাযত করেন।
যে শাসক নিজ প্রবৃত্তির দাস, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন। তার উদ্দেশ্য ও আশা আকাংখার স্বপ্নসৌধকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেন। তার সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনকেও অসম্মানজনক অবস্থায় রাখেন। সে হারায় তার অবৈধ পন্থায় অর্জিত সম্পদসমূহ।
এ সম্পর্কে একটি বিখ্যাত ঘটনা আছে যে, একবার আব্বাসী শাসকদের একজন আলিমদের ডেকে বললেন, আপনারা নিজেদের দেখা কিংবা শোনা কিছু ঘটনা লিপিবদ্ধ করুন। একবার উমর ইবনে আবদুল আযীযকে (রহ) আমি দেখেছি, জনৈক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বললো, "আমীরুল মু'মিনীন! আপনি আপনার সন্তানদেরকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে দূরে রেখেছেন। তাদেরকে ফকীর ও অসহায় অবস্থায় রেখে যাবার পথ করেছেন। তাদের জন্যে আপনি কিছুই রেখে যাচ্ছেন না।” উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ) তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। তিনি বললেন, ঠিক আছে, সন্তানদেরকে আমার সামনে হাজির করো। তাদের সকলকে সামনে হাজির করা হলো। খলীফার সন্তান সংখ্যা ছিল দশের ঊর্ধ্বে। তাদের সকলেই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। সন্তানদের দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, বৎসগণ! তোমাদের যা হক ছিল তা আমি তোমাদের পুরোপুরি দিয়ে দিয়েছি- কাউকে বঞ্চিত করিনি। এছাড়া জনসাধারণের কোন সম্পদ আমি তোমাদের দিতে পারবো না। তোমাদের প্রত্যেকের অবস্থা তো এই যে, হয় তোমরা সৎ সাধু ব্যক্তি হবে আর আল্লাহ তাঁর সৎকর্মশীল বান্দাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী, নয় তোমরা অসৎ ও অসাধু হবে। আমি অসৎ ও অসাধু ব্যক্তিদের জন্যে কিছুই রেখে যেতে চাই না। কারণ ঐ অবস্থায় তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে। قُومُوْا عَنِّى "যাও, সকলে এবার আমার নিকট থেকে যেতে পারো, এটুকুনই আমার কথা।"
অতঃপর তিনি বলেন, মহাপ্রাণ উমর ইবনে আবদুল আযীযের সেই সন্তানদেরকেই আমি পরবর্তীকালে দেখেছি, তাদের কেউ কেউ শত শত ঘোড়ার অধিকারী ছিলেন, সেগুলো আল্লাহর রাস্তায় দান করেছেন। ইসলামের মুজাহিদগণ সেগুলোর উপর সওয়ার হয়ে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় জিহাদ করতেন।
অতঃপর সেই আব্বাসী খলীফা বললেন, উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ) ছিলেন “খলীফাতুল মুসলিমীন”।
পূর্বে তুর্কীদের দেশ এবং পশ্চিমে মরক্কো ও স্পেন তাঁর শাসনাধীন, সাইপ্রাস দ্বীপ, সিরীয় সীমান্তবর্তী এলাকা, তরসূস ইত্যাদিতে তাঁর শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। দক্ষিণে ইয়ামেনের শেষ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটেছিল তাঁর শাসনের। এতদসত্ত্বেও তাঁর সন্তানরা পৈত্রিক উত্তরাধিকার থেকে অতি সামান্য কিছুরই মালিক হয়েছিলেন। কথিত আছে যে, তাঁর পরিত্যক্ত সম্পদের পরিমাণ যা ছিল তা সন্তানদের মাথা পিছু বিশ দেরহামের চাইতেও কম ছিল। অথচ ঐ সময়ই আমি খলীফাদের মধ্যে এমন সব শাসকও দেখেছি, যারা এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন যে, তাঁদের মৃত্যুর পর যখন সন্তানরা সেগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করেছে, তখন প্রত্যেকের ভাগে ৬ শ' কোটি পর্যন্ত 'আশরাফী' পড়েছে। তারপরও ঐ সকল সন্তানের কেউ কেউ শেষে ভিক্ষা করতো। এ সম্পর্কে অসংখ্য কাহিনী, চাক্ষুষ ঘটনাবলী এবং পূর্ববর্তীদের শ্রুত অনেক অবস্থার কথা বিক্ষিপ্তভাবে যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে। সেগুলোতে জ্ঞানবানদের জন্য বহু কিছু শিক্ষার আছে।
নবী জীবনের আদর্শ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব ও শাসন ক্ষমতাও একটি আমানত, এই আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করা 'ওয়াজিব।'
বিভিন্নভাবে পূর্বাহ্নেই এ বিষয়ে হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে। আবু যর গিফারী (রা)-কে মহানবী (সা) নেতৃত্ব সম্পর্কে বলেছেন,
إِنَّهَا أَمَانَةً وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةً إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا وَأَدَّى الَّذِي عَلَيْهِ فِيهَا - (رواه مسلم)
“নেতৃত্ব হচ্ছে একটি আমানত। এ নেতৃত্ব (ক্ষেত্র বিশেষে) কিয়ামতের দিন লজ্জা ও অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তবে যিনি ন্যায়-নীতি ভিত্তিক নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন এবং এর হক সঠিকভাবে পালন করেছেন, তার কথা আলাদা।” (মুসলিম)
ইমাম বুখারী (রহ) কর্তৃক সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরায়রার (রা) একটি রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে,
إِنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا ضَيَّعْتَ الْأَمَانَةَ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ - قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا إِضَاعَتُهَا ؟ قَالَ إِذَا وُسِدَ الْأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ - (بخاری)
মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন, "আমানত নষ্ট (তথা খেয়ানত) হতে থাকলে তোমরা কিয়ামতের প্রতীক্ষায় থেকো।" বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! "আমানত নষ্ট” বলতে কি বুঝায়? হযরত বললেন, যখন শাসন ক্ষমতা ও নেতৃত্ব কর্তৃত্বের আসনে অযোগ্য ব্যক্তিদের আগমন ঘটে, তখন তোমরা কিয়ামতের প্রতীক্ষায় থেকো। (বুখারী)
আমানতের এই অর্থের প্রেক্ষিতেই এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ্র 'ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ইয়াতীমের অভিভাবক বা অসী, ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক এবং কোন দায়িত্বে নিয়োজিত ইনচার্জ বা প্রতিনিধির যদি সংশ্লিষ্ট মালিকের সম্পদ থেকে ব্যয় করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন উত্তম পদ্ধতিতে তা ব্যয় করবে (অর্থাৎ স্বীকৃত পরিমাণের বেশী ব্যয় করবে না এবং কোনরূপ আত্মসাৎ করবে না।) যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ.
"ইয়াতীম বয়োঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হইও না।"
শাসক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা হচ্ছেন বকরীর রাখালের ন্যায় জনগণের রক্ষক বা তত্ত্বাবধায়ক। যেমন, মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন :
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالْإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ - وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَّةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا - وَالْوَلَدُ رَاعٍ فِي مَالِ أَبِيْهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالْعَبْدُ رَاعٍ فِي مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ اَلا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ - (اخرجاه في الصحيحين)
“তোমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের রক্ষক। প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের কার্যকলাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের যিনি নেতা, তাঁকে তাঁর অধীনস্থ জনগণের কার্যাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীগৃহের রক্ষক। উক্ত গৃহে যা তার কর্তৃত্বাধীন সে ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। সন্তান তার পিতৃ সম্পদের রক্ষক, সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। দাস ভৃত্য তার মনিবের মাল-সম্পদের রক্ষক। তাকে সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। সাবধান! মনে রেখো, তোমাদের প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জন্য রক্ষক। সকলকে নিজ নিজ অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন যে,
مَا مِنْ رَاعٍ يَسْتَرْعِيْهِ اللهُ رَعْيَةً يَموتُ يَموتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشِ لَهَا - إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ - (مسلم)
“আল্লাহ যাদেরকে অপরের উপর রক্ষণা বেক্ষণের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব দিয়েছেন, সে যদি তার দায়িত্ব পালনে উদাসীন থেকে মারা যায়, আল্লাহ তার জন্যে বেহেশতের গন্ধও হারাম করে দেবেন।” (মুসলিম)
একবার আবু মুসলিম খাওলানী (রহ) হযরত মুআবিয়া (রা) ইবনে আবু সুফিয়ানের নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন,
اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا الْأَجِيْرُ “)হে মজুর! তোমার প্রতি সালাম(”
দরবারের সভাসদগণ বললেন- 'আইউহাল আজীর' না বলে أَيُّهَا الْأَمِيرُ বলুন। তিনি অতঃপর বললেন, اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا الْأَجِيْر পুনরায় বলা হলো "আইউহাল আমীর” বলুন। কিন্তু আবু মুসলিম খাওলানী একই বাক্যের তিনবার পুনরাবৃত্তি করেন। উপস্থিত লোকজন বার বার তাঁকে 'আইউহাল আমীর' বলতে স্মরণ করিয়ে দেন। অবশেষে আমীর মু'আবিয়া বললেন, আবু মুসলিমকে তোমরা বলতে দাও। তাঁর কথার অর্থ তিনিই ভাল জানেন। অতঃপর আবু মুসলিম বললেন, হে মু'আবিয়া! তুমি একজন মজুর। এই বকরীর দলের দেখা শোনা করার জন্যে তোমাকে বকরীর প্রভু মজুরীর ভিত্তিতে নিয়োগ করেছেন। তুমি যদি চর্ম রোগাক্রান্ত বকরীসমূহের তত্ত্বাবধান কর এবং রুগ্ন বকরীগুলোর চিকিৎসা করে সেগুলোর রক্ষণা বেক্ষণ কর, তাহলে বকরীর মালিক তোমাকে এর মজুরী দেবেন। আর যদি চর্ম রোগাক্রান্ত বকরীগুলোর খোঁজখবর না নাও, রুগ্ন বকরীসমূহের চিকিৎসা না কর এবং সেগুলোর রক্ষণা বেক্ষণে যথাযথ দায়িত্বের পরিচয় না দাও, তাহলে এগুলোর মালিক তোমাকে শাস্তি দেবেন।"
একজন শাসকের উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের জন্যে এ ঘটনাটিই যথেষ্ট। কারণ, গোটা মানবজাতিই হচ্ছে আল্লাহর বান্দা। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাগণ হচ্ছেন আল্লাহর বান্দাদের পরিচালনার জন্যে তাঁরই প্রতিনিধি। জনগণের জানমাল মানসম্ভ্রম সবকিছুর হেফাযতের দায়িত্ব তাঁদের উপর ন্যস্ত।
দেশের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক এবং কৃষি ফসল উৎপাদনের উৎসভূমি সংক্রান্ত ব্যাপারে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও এসব ব্যাপারে অনভিজ্ঞ ও অযোগ্য কোনো ব্যক্তিকে ঐ পদে নিয়োগ প্রদান করা অবশ্যই খেয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতার কাজ। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এমন কাজ করলে তিনি খেয়ানতকারী হবেন। কারণ দেশের অর্থনীতি ও এর প্রাণসত্তা কৃষি শিল্প বাণিজ্য সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি ব্যবসায়ে পণ্য উপকরণাদি অন্যায্য দামে বিক্রি করে দেবে। ভাল এবং সাধু খরিদদার, যিনি অতিরিক্ত বা ন্যায্য মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও, হুমকি, বন্ধুত্ব ও নিকটাত্মীয়তার দরুন তাকে ন্যায্য মূল্যে পণ্য সামগ্রী না দেওয়া খেয়ানত ছাড়া কিছু নয়। তাতে পণ্য সামগ্রীর মালিক অব্যশই তার প্রতি বিদ্বিষ্ট হবেন এবং নিন্দা জ্ঞাপন করবেন।
কাজেই রাষ্ট্রীয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফরয হলো, কোনো খেয়ানতকারী ব্যক্তিকে প্রতিনিধি বা শাসন পরিচালক না করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও দেশের অর্থনীতি কিংবা ভূমি ইত্যাদির ব্যাপারে ভাল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে সরকারী প্রতিনিধি বা শাসক নিয়োগ করা।

টিকাঃ
১. আল্লাহ নেক বান্দাদের সাহায্য করেন, যেমন 'উমর ইবনে 'আবদুল আযীযের (রহ) সন্তানদের করেছিলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে তারা তেমন কিছু পায় নাই। কিন্তু আল্লাহ তাদের এমন সাহায্যই করেছিলেন যে, প্রত্যেকই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "আমার অভিভাবক তো আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং তিনিই সৎকর্মপরায়ণদের অভিভাবকত্ব করে থাকেন। (৭ : ১৯৬) -সম্পাদক

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ক্ষমতা ও শাসন কর্তৃত্বের যোগ্যতা

📄 ক্ষমতা ও শাসন কর্তৃত্বের যোগ্যতা


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয় হলো : যোগ্যতর ব্যক্তিকেই ক্ষমতা ও শাসন কর্তৃত্ব দেয়া উচিত। যোগ্যতর ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও যোগ্য ব্যক্তিকেই ক্ষমতা ও শাসন কর্তৃত্ব প্রদান। প্রশাসনিক প্রত্যেক স্তরের বিভিন্ন পদে আদর্শ ব্যক্তিকে ক্ষমতাসীন ও প্রতিনিধি করা। শাসন কর্তৃত্বের জন্যে শক্তি ও বিশ্বস্ততা অপরিহার্য, যেন শরীয়তী বিধানের প্রয়োগ ও জনগণের অধিকার আদায়ের কাজ সহজ হয়। বিচারকের প্রকারভেদ।
উপরোক্ত আলোচনার পর এখন এটা অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, নেতার উপর কি কি ফরয? সংক্ষেপে বলতে গেলে তা হলো, তিনি এমন সব ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি, কর্মকর্তা কিংবা দেশের কোন এলাকার শাসক নিযুক্ত করবেন, যারা সৎ ও যোগ্য। তবে কোন কোন সময় এমন অবস্থা দেখা দেয় যে, কাজের জন্য ইঙ্গিত যোগ্যতাসম্পন্ন লোক পাওয়া যায় না। সে সময় নেতার কর্তব্য হলো আপেক্ষিক যোগ্যতার ভিত্তিতে ঐ কাজে লোক নিয়োগ করা। প্রত্যেক পদের জন্যে তুলনামূলক বিচারে যে যোগ্য, তাকেই সে পদে বসানো। পূর্ণ নিরপেক্ষতা, সততা ও বিচার বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে যদি নেতা এ কাজটি সমাধা করেন, তাহলে তিনি তাঁর কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করলেন। আর তখনই তাঁকে ন্যায়পরায়ণ নেতা বলা যাবে। মহান আল্লাহর কাছেও তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে বিবেচিত হবেন। অবশ্য তারপরও বিভিন্ন কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দেবে না, এমনটি জোর দিয়ে বলা যায় না। তবুও এছাড়া আর করারই বা কি থাকবে। আল্লাহ তায়ালাও সম্ভাব্য চেষ্টার কথাই বলছেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ -
“হে মুসলমানগণ! তোমাদের দ্বারা যতটুকুন সম্ভব তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো।” (সূরা তাগাবুন: ১৬)
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا -
"আল্লাহ কারুর উপর তার সাধ্যাতীত বোঝা অর্পণ করেন না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)
জেহাদের নির্দেশ দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন: فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - لَا تُكَلَّفُ إِلَّا نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ. “তোমরা আল্লাহর পথে দুশমনদের সাথে লড়ো। তোমার আপন সত্তা ব্যতীত অপর কারুর দায়িত্ব তোমার উপর নেই। তবে হাঁ, অন্যান্য মুসলমানদেরও এ ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করো। (সূরা নিসা: ৮৪)
আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন; يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ - “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন থাকো। তোমরা সঠিক পথে থাকলে, গোমরাহ্ ব্যক্তিরা তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।" (সূরা মায়েদা: ১০৫)
অতএব প্রশাসনিক সকল পর্যায়ে যেই শাসক বা কর্তৃপক্ষ সৎ লোক নিয়োগে সম্ভাব্য সকল চেষ্টা ত্রুটি করবেন না এবং আপন কর্তব্য পালনে পূর্ণ সচেষ্টা হবেন, তাতে ধরে নেয়া যাবে যে, তিনি হেদায়েত বা সঠিক পথের অনুসারী। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন: إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ - (اخرجاه في الصحيحين) "আমি যখন তোমাদের কোন কাজের নির্দেশ দেই, তখন তোমরা তা নিজেদের সাধ্যানুযায়ী করো।” (বুখারী-মুসলিম)
তবে কোন ব্যক্তি যদি শরীয়তের অসমর্থিত অক্ষমতার অজুহাত দেখিয়ে উক্ত কাজে ত্রুটি করে, তাহলে সেটা খেয়ানত হবে। তাকে সেই কর্তব্য অবহেলাজনিত খেয়ানতের শাস্তি প্রদান করা হবে। কাজেই তার কর্তব্য হলো, যোগ্যতর দক্ষ ও কল্যাণকর কোনটি, তা ভালোভাবে জেনে নেয়া এবং প্রত্যেক পদের জন্য যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করা। কারণ, কোন কিছুর কর্তৃত্ব-ক্ষমতার দুটি স্তম্ভ রয়েছে, একটি শক্তি, অপরটি আমানত বা বিশ্বস্ততা। যেমন কুরআন মজীদে ইরশাদ হচ্ছে- إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ -
তোমার ভৃত্য হিসাবে সেই-ই অতি উত্তম ব্যক্তি হবে, যে সবল ও বিশ্বস্ত। (সূরা কিসাস : ২৬)
মিসর সম্রাট হযরত ইউসুফ (আ)-কে বলেছিলেন: إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ -
"আজ থেকে তুমি আমাদের মধ্যে অতি সম্মানিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্ব।”
হযরত জিবরাঈল (আ)-এর মর্যাদা ও গুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُول كَرِيمٍ - ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينِ - مُطَاع ثُمَّ آمِين -
"নিশ্চয় কুরআন মজীদ এক অতি সম্মানিত ফেরেশতা কর্তৃক পৌছানো বাণী, যিনি ওহীর গুরুভার বহনে সক্ষম এবং আরশের অধিকারী সত্তার কাছে রয়েছে তাঁর উচ্চ মর্যাদা। তিনি সেখানে গণ্যমান্য সত্তা এবং বিশ্বস্ত। (সূরা তাকভীর : ১৯-২১)
প্রত্যেক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং শাসন কর্তৃত্বের মূল শক্তি হচ্ছে দেশের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা। রণাঙ্গনে যুদ্ধ-নেতৃত্বের শক্তি হলো সেনাপতির বীরত্ব ও সাহস। তাকে সকল প্রকার রণকৌশল সম্পর্কে অবগত ও দক্ষ হতে হবে। দুশমনের ধোকাবাজি ও চাল সম্পর্কে তাকে থাকতে হবে সচেতন। কেননা الْحَرْبُ خَدْعَةُ "লড়াইর অপর নাম হচ্ছে প্রতারণা।” যুদ্ধ পরিচালককে রণকৌশল জানতে হবে। সে অনুযায়ী কাজ করার জন্যে তাকে হতে হবে পূর্ণ দক্ষতার অধিকারী। (তৎকালীন সময়) যুদ্ধ পরিচালককে তীর নিক্ষেপ করা ও মারার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হতো, যেন শত্রু বাহিনীকে উপযুক্ত আঘাত হানতে পারে। তাকে হতে হবে দক্ষ ঘোড়সওয়ার।
যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করছেন: وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رَبَاطِ الْخَيْلِ -
"মুসলমানগণ! সামরিক শক্তি-উপকরণ সঞ্চয় এবং অধিক পরিমাণে যুদ্ধের ঘোড়া সংগ্রহের মধ্যদিয়ে তোমরা কাফেরদের মোকাবেলায় যথাসাধ্য রণ প্রস্তুতি নিয়ে থাকো। (সূরা আনফাল : ৬০)
রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন:
ارْمُوا وَارْكَبُوا وَإِنْ تَرْمُوا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ تَرْكَبُوا وَمَنْ تَعَلَّمَ الرَّمْيَ ثُمَّ نَسِيَهُ فَلَيْسَ مِنَّا -
“তোমরা তীর চালানো শেখো এবং সওয়ারীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করো। আমার কাছে সওয়ারীর চাইতে তীর চালানো অতি প্রিয়। যে ব্যক্তি তীর চালানো শিক্ষা করে অবহেলা করে তা পরে ভুলে যায়, সে আমার দলভুক্ত নয়।” অপর এক রেওয়ায়েতে আছে,
فَهِي نِعْمَةً مَنْ نَسِيَهَا جَهَدَهَا -
“তীর চালানো (তথা সামরিক যোগ্যতা অর্জন) একটি নেয়ামত। যে তা ভুলে গেল সে এই নেয়ামতকে অস্বীকার করলো।” (মুসলিম)
এসব বক্তব্যের মধ্যদিয়ে সমাজে জ্ঞান প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার ও খোদায়ী বিধান প্রতিষ্ঠার অন্তরায়সমূহ দূরীকরণে মুসলমানদের সামরিক যোগ্যতাসহ যাবতীয় শক্তিমত্তার অধিকারী হবার উপরই জোর দেয়া হয়েছে। যার তাগিদ রয়েছে খোদ কুরআন ও সুন্নায়।
১. আমানতদারী ও বিশ্বস্ততা হচ্ছে খোদাভীতি নির্ভর একটি গুণ।
২. পার্থিব সামান্য সম্পদের বিনিময়ে হক্কুল্লাহকে বিসর্জন দেয়া সঙ্গত নয়।
৩. অন্তর থেকে মানুষের ভয় সম্পূর্ণ বের করে দেবে।
প্রত্যেক শাসনকর্তা, নেতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহ তায়ালা এই তিনটি মহৎ গুণ অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছেন।
কুরআন মজীদে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:
فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلاً - وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
“তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো। আমার আয়াতসমূহকে হীন স্বার্থে ব্যবহার করো না। আল্লাহর বিধান মুতাবেক যারা জনগণকে শাসন করে না তারাই কাফের (অবাধ্য)।' (সূরা মায়েদা : ৪৪)
১. তার পূর্বে বলেছেন, ফাসিক ও জালিম।
এর ভিত্তিতে মহানবী (সা) শাসক ও বিচারকদের তিন ভাগে ভাগ করেছেন। তন্মধ্যে দু'ভাগকেই জাহান্নামী বলেছেন। এক শ্রেণীর বিচারককেই শুধু জান্নাতী বলেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন: اَلْقُضَاةُ ثَلَاثَةٌ قَاضِيَانِ فِي النَّارِ وَقَاضِي فِي الْجَنَّةِ فَرَجُلٌ عَلِمَ الْحَقَّ وَقَضَى بِهِ فَهُوَ فِي الْجَنَّةِ - (رواه اهل السنه)
“কাযী শাসক ও বিচারক তিন শ্রেণীর। দু'শ্রেণীর বিচারক জাহান্নামী এবং এক শ্রেণীর বিচারক জান্নাতী। অতএব যেই ব্যক্তি সত্যকে অনুধাবন করে ন্যায় বিচার করবে, সে জান্নাতী হবে।” (আহলুল সুন্নাহ)
বিবদমান দু'দলের মধ্যে যারা ফয়সালা করে দেয়, তাদেরই কাযী বা বিচারক বলা হয়। বিচারক এ দু'পক্ষকে নির্দেশ দিবেন। তাই এদের মধ্যে কেউ খলীফা হোক কি বাদশাহ, কিংবা ওয়ালী ও হাকিম কিংবা এমন কেউ যিনি রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন, এমনকি যিনি শিশুদের লেখাপড়ার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে নিয়োজিত, সকলেই একই হুকুমের শামিল। মহানবীর সম্মানিত সঙ্গী-সাথীগণ বিষয়টি এভাবেই উল্লেখ করেছেন। তাঁরাও তাই করতেন আর এটাই স্বাভাবিক।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 জনপ্রদি সাহসী নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব

📄 জনপ্রদি সাহসী নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব


যার চরিত্রে ক্ষমতা ও বিশ্বস্ততা- এ দুটি মহৎ গুণের সমন্বয় ঘটেছে, এমন লোকের সংখ্যা আজকের দুনিয়ায় খুব কমই দেখা যায়। এমন দু'জন ব্যক্তি যাদের একজন বিশ্বস্ত অপরজন শক্তিমান- এ দু'জনের মধ্যে তাকেই কর্তৃত্ব নেতৃত্ব দেয়া উচিত যার দ্বারা দেশ ও জাতি ক্ষতির সম্মুখীন হয় না। ইমাম আহমদ (রহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এমন দু'জন লোক যাদের একজন সাহসী ও রণনিপুণ কিন্তু কাজে পাপাচারী, অপরজন সৎ ও সাধু কিন্তু ভীরু এবং সাহসহীন, কার সাথে থেকে জেহাদ করা বাঞ্ছনীয়? তিনি জবাবে বলেছিলেন, রণনিপুণ সবল ব্যক্তি 'ফাজের' হলেও তার সাথে থেকেই জেহাদ করবে। কেননা, তার শক্তি এখানে মুসলমানের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে আর তার পাপ তার নিজের জীবনের জন্যে। সৎ সাধু ব্যক্তির ব্যাপারটি সম্পূর্ণ তার বিপরীত।
শক্তি সাহস ও বিশ্বস্ততা এ দু'টি মহৎ গুণের অধিকারী ব্যক্তির সংখ্যা আজকাল নেহায়েত কম। এ কারণেই হযরত উমর (রা) দু'আ করতেন:
- اللَّهُمَّ أَشْكُرْ إِلَيْكَ جَلْدَ الْفَاجِرِ وَعِجْزَ الْبُقَةِ .
“হে আল্লাহ! তোমার কাছে পাপাচারীর নিষ্ঠুরতা এবং ভীরুর অক্ষমতার অভিযোগ জানাচ্ছি। (এ দুয়ের হাত থেকেই রক্ষা করুন।)"
অতএব যে কোন দেশ ও ভূখণ্ডের জন্যে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা হিসাবে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব অনুসন্ধান করা উচিত। কোন দেশের নেতা যদি শাসনকর্তা বা প্রশাসক নিয়োগের ইচ্ছা করেন, তখন তার কর্তব্য হবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বা দেশের সব চাইতে উত্তম ব্যক্তিকে এ দায়িত্ব প্রদান করা আর যদি এমন দু'জন থাকে যাদের একজন বিশ্বস্ত অপরজন শক্তিধর সাহসী, তখন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগের ব্যাপারে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, কোন অঞ্চল বা রাজ্যের শাসন প্রশাসনে এ গুণদ্বয়ের ভারসাম্যপূর্ণ কর্তৃত্বের দ্বারা দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত এবং ক্ষতির মাত্রা হ্রাস পাবে।
সুতরাং সমর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকেই মনোনীত করা উচিত যিনি বা যারা শক্তি সাহস ও বীরত্বের অধিকারী। তুলনামূলকভাবে তার আমল কিছুটা কম হলেও দুর্বল সমরনেতৃত্বের চাইতে সাহসী ব্যক্তিকেই যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেবে।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এমন দু'জন ব্যক্তি আছে উভয়ই লড়াইয়ের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের একজন ‘ফাজের’ তথা পাপাচারী তবে সে অধিক শক্তি সাহসের অধিকারী আর অপরজন সৎ সাধু বটে কিন্তু দুর্বলমনা। এমতাবস্থায় উভয়ের মধ্যে কার নেতৃত্বে লড়াই করা উচিত। তিনি জবাবে বললেন, ফাজেরের বলিষ্ঠতা ও শক্তিমত্তা মুসলমানদের কল্যাণার্থে আর তার ‘ফুজুর’ বা পাপাচার নিজ জীবনের জন্যে। সৎ সাধু ব্যক্তি দুর্বল হলে তার সেই সততা ও সাধুতা তার জন্য নিজের কিন্তু দুর্বল হওয়ার কারণে সে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় দুর্বলতার নিমিত্ত হবে।
অতএব শক্তিধর সমরানায়ক ‘ফাজের’ হলেও তার সাথে থেকেই জিহাদ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইরশাদ :
إِنَّ اللَّهَ يُؤَيِّدُ هُذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ -
“আল্লাহ তায়ালা ‘ফাজের’ লোক দ্বারাও তাঁর দীনের সাহায্য নেন।” (অপর এক রেওয়ায়তে بِأَقْوامِ لاَخَلاقَ لَهُمْ بالرَّجُلِ الْفَاجِر “এমন সব ব্যক্তি ও সম্প্রদায়র্কে দিয়েও তাঁর দীনের সাহায্য করান, যাদের নেক কাজে অংশ নেই।)
সুতরাং যখন নির্ভীক কোন সমরনায়ক না পাওয়া যায় এবং তার স্থলাভিষিক্ত করার মতো এমন কোন সেনাপতি না মিলে, তখন দীনী দিক থেকে অধিক যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকেই উক্ত পদে নিয়োজিত করবে। মহানবী (সা) খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে (রা) ইসলামের সেনাধ্যক্ষ করেছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই এ দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর সম্পর্কে মহানবী (সা) বলতেন-
سَيْفُ سَلَّهُ اللهُ عَلَى الْمُشْرِكِينَ -
“খালিদ এমন এক তরবারী যা আল্লাহ মুশরিকদের নিপাত করার জন্যে উন্মুক্ত করেছেন।"
তা সত্ত্বেও হযরত খালিদ (রা) কর্তৃক এমন দু'একটি ঘটনা ঘটেছে যা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অপছন্দনীয় ছিল। যেমন একবার আল্লাহর রাসূল (সা) আসমানের দিকে হাত উত্তোলন করে বলেছিলেন:
اللَّهُمَّ أَبْرَأَ إِلَيْكَ مِمَّا فَعَلَ خَالِدُ -
“হে আল্লাহ! খালিদ (যুদ্ধ ক্ষেত্রে) যা কিছু (বাড়াবাড়ি) করে ফেলেছে, আমি এ ব্যাপারে অব্যাহতি চাই।"
মহানবী (সা) এ দোয়াটি তখন উচ্চারণ করেছিলেন, যখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা) জুযায়মা গোত্রের লোকদের ঈমান সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে সেখানকার কিছু লোককে হত্যা করে ফেলেছিলেন আর তাদের অর্থ-সম্পদ ছিনিয়ে এনেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। তাঁর সাথে অপরাপর যেসব সম্মানিত সাহাবী ছিলেন- তাঁরা হযরত খালিদকে তা করতে বারণ করেছিলেন। মহানবী (সা) খোদ গিয়ে জুযায়মা গোত্রের লোকদের কাছে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। রণাঙ্গনে তাদের পরিত্যাক্ত অর্থ-সম্পদ ফেরত দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ এহেন ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা) সকল সময় হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদকেই ইসলামী ফৌজের সেনাধ্যক্ষের পদে বহাল রেখেছেন। তা করার একমাত্র কারণ ছিল এই যে, তিনি রণনিপুণতা ও সমর কুশলতায় অন্যান্যের তুলনায় অধিক যোগ্য ছিলেন। ঘটনার সাধারণ মূল্যায়ন তিনি ভুল করে ফেলতেন। পক্ষান্তরে সত্যের সৈনিক আবু যর (রা) ছিলেন সততা ও সাধুতার অধিক যোগ্য। কিন্তু এ সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বলেছেন:
يَا أَبَا ذَرِّ إِنِّي أَرَاكَ ضَعِيفًا وَإِنِّي أُحِبُّ مَا أُحِبُّ لِنَفْسِي - لَا تَأْمُرَنَّ عَلَى اثْنَيْنِ وَلَا تُؤْرِيَنَّ مَالَ يَتِيم - (رواه مسلم)
"হে আবু যর! আমি তোমাকে দুর্বল দেখতে পাচ্ছি। তোমার ব্যাপারে আমি তাই পছন্দ করি, যা আমার নিজের ব্যাপারে পছন্দ করি। তুমি কোন সময় দু'জন ব্যক্তিরও নেতা হয়ো না। ইয়াতীমের মালের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিও না।" (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আবু যরকে নেতৃত্ব এবং অভিভাবকত্ব গ্রহণে নিষেধ করেছেন। অথচ তাঁরই সততা ও সুমহান চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসায় মহানবী (সা) বলেছেন:
مَا أَظَلَّتِ الْخَضْرَاءُ وَلَا أَقَلَّتِ الْغَبْرَاءُ أَصْدَقُ لَهْجَةً مِنْ أَبِي ذَرٍّ.
“আবু যর সত্যবাদিতার উত্তুঙ্গচূড়ায় সমাসীন ছিলেন। [এখানে ‘খাযরা’ এবং ‘গাবরার’ উপমাসূচক প্রবাদের ব্যবহার এ বিশেষণে নেই]।
হযরত আমর ইবনুল আস (রা)-কে রাসূল (সা) ‘যাতেসালাসিল’-এর যুদ্ধে এজন্যে প্রেরণ করেছিলেন যে, সেখানে তাঁর নিকটাত্মীয়রা বসবাস করতো। তাঁর প্রতি রাসূল (সা) অনুগ্রহসূচক আচরণ করতে চেয়েছেন। তাঁর চাইতে উত্তম লোক থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁকেই সেখানে পাঠিয়েছেন অপর কাউকে পাঠাননি।
উসামা ইবনে যায়দকে একবার রাসূলুল্লাহ (সা) সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রধান করেছিলেন।
মোটকথা, বিশেষ জাতীয় স্বার্থরক্ষার প্রেক্ষিতে কোন কোন ব্যক্তিকে তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যে তাকে গভর্নর, প্রশাসক বা সেনাধ্যক্ষ নিয়োগ করা হতো। অথচ ধার্মিকতা, জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও ঈমানের দিক থেকে হয়তো তাদের চাইতেও যোগ্য লোক বিদ্যমান থাকতো।
এমনিভাবে প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর শাসনামলে যখন ‘মুরতাদ" ফিৎনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, তা দমানোর জন্যে তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে (রা) সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন। ইরাক এবং সিরিয়ার জিহাদেও তাঁকেই সেনানায়ক করে পাঠানো হয়। অথচ হযরত খালিদ (রা) কর্তৃক অনেক সময় অবাঞ্ছিত কাণ্ড-কারখানা ঘটতো। কথিত আছে যে, তাঁর এসব কার্যকলাপে অনেক সময় ব্যক্তিগত ঝোঁক প্রবণতা কাজ করতো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাঁকে সেনাধ্যক্ষের পদ থেকে অপসারণ করা হতো না বরং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে হঠাৎ ইষৎ ভর্ৎসনা করে ছেড়ে দেয়া হতো এবং ‘ক্ষতিকর দিকে’র চাইতে তাঁর ‘কল্যাণকর দিক’কেই প্রাধান্য দেয়া হতো।' তাঁর স্থলে অপর কাউকে স্থলাভিষিক্ত করার চিন্তা করা হতো না।
এছাড়া রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা অর্থাৎ খলীফার মধ্যে যদি কঠোরতা কম থাকে, তাঁর স্থলাভিষিক্তের মধ্যে কঠোরতা থাকার দরকার হয় বৈ কি। তেমনি রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা যদি বেশী কঠোর স্বভাবের হন, তাঁর অধীনস্থ প্রতিনিধির নমনীয় স্বভাবের প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। খলীফা হবার পূর্বে হযরত ওমর (রা) সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)-কে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে সেনাপতি পদে নিয়োগ করতে। কারণ হযরত খালিদের স্বভাবেও ছিল কঠোরতা। অপরদিকে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর চরিত্রেতো কঠোরতা ছিলই। আবু উবায়দা ছিলেন নরম স্বভাবের মানুষ। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ছিলেন নম্রতার জ্বলন্ত প্রতীক। ঐ সময় আবু বকর যা করেছিলেন তাই সঠিক ছিল। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ হযরত আবু বকরের যুগে ইসলামী ফৌজের প্রধান ছিলেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে ইসলামী সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ। এভাবেই প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত থাকে। মহানবী (সা) নিজ ব্যক্তি সত্তার ব্যাপারে বলে গেছেন:
أَنَا نَبِيُّ الرَّحْمَةِ أَنَا نَبِيُّ الْمَلْحَمَةِ - “আমি রহমতের নবী, আমি যুদ্ধবিগ্রহের নবী।” অর্থাৎ প্রয়োজনে আত্মরক্ষার্থে শক্তি প্রয়োগও আমার কর্ম। মহানবী (সা) আরও ইরশাদ করেছেন:
أَنَا الضَّحُوكُ الْقِتَالُ وَأُمَّتِي وَسَطُ . “(ন্যায় সত্য প্রতিষ্ঠায়) আমি সহাস্যবদনে যুদ্ধকারী আর আমার উম্মত হচ্ছে মধ্যমপন্থী।” সাহাবায়ে কেরামের শানে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلاً مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا - (فتح : ۲۹) “কাফেরদের মুকাবেলায় তারা বড় কঠোর; কিন্তু পরস্পর সহানুভূতিশীল। তুমি তাদের দেখতে পাবে কখনও রুকূ করছে এবং কখনও সিজদা করছে- আল্লাহর দান এবং সন্তুষ্টি কামনায় তারা রত আছে।” (সূরা ফাতাহ : ২৯)
أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ - "মু’মিনদের সাথে নরম এবং কাফের তথা আল্লাহর অবাধ্যদের প্রতি কড়া।"
এ কারনেই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এবং হযরত উমর ফারুক (রা)-এর কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব ছিল পরিপূর্ণ। তাঁদের কর্তৃত্ব সুষ্ঠু পন্থায় পরিচালিত হতো এবং তাতে ছিল ভারসাম্য। মহানবী (সা)-এর যুগে এ দুই মহান ব্যক্তিত্ব হযরতের দুই বাহুরূপে বিবেচিত ছিল। একজন ছিলেন নরম দিল নরম স্বভাবের, অপরজন ছিলেন কঠোর হৃদয় এবং কঠোর স্বভাবের। খোদ মহানবী (সা)-এ দু'জন সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন: اقْتَدُوا بِالَّذِينَ مِنْ بَعْدِي - "আমার পরে তোমরা আবু বকর এবং উমরের আনুগত্য করো।"
তাই দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) 'মুরতাদ'দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এমন বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন যে, হযরত উমর (রা) পর্যন্ত বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর (রা) থেকে এরূপ সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা তিনি কখনও প্রত্যাশা করেননি। অন্যান্য সকল সাহাবীও এ ব্যাপারে অনবহিত ছিলেন। তাঁরা বলতেন, শুধু যাকাত অস্বীকারে আপনি কিভাবে তাদের সাথে জিহাদ করবেন?
অতএব ব্যাপার যদি এমন হয় যে, সেখানে সততা সাধুতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি গুণের সাথে সাথে কঠোরতা ও বলিষ্ঠতারও প্রয়োজন, তাহলে সেক্ষেত্রে কঠোর নেতৃত্বকেই এগিয়ে দেবে। যেমন, অর্থ-সম্পদের হেফাযতের প্রশ্নে কঠোর স্বভাব বিশিষ্ট লোকের প্রয়োজন। কেননা, অর্থ-সম্পদ উসূল ও তার সংরক্ষণের জন্যে শক্তি ও বিশ্বস্ততা উভয়েরই প্রয়োজন হয় বৈ কি। এজন্যে সেখানে স্থানীয় প্রশাসক ও কর্মকর্তাকে কঠোর ও শক্তিমান হতে হবে, যেন তার কড়াকড়ির ফলে অর্থ আদায়ে গড়িমসি প্রশয় না পায়। সচিব, কেরানী ও কোষাধ্যক্ষকে যোগ্য ও বিশ্বস্ত হতে হবে। তাদের যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার দ্বারাই অর্থ-সম্পদের যথাযথ হেফাযত হওয়া সম্ভব। যুদ্ধ ক্ষেত্রের নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের প্রশ্নেও একই অবস্থা এবং একই বিধান। প্রাজ্ঞ ও ধার্মিক ব্যক্তিদের পরামর্শের ভিত্তিতে যুদ্ধ পরিচালক নিযুক্ত করবে। তাতে উভয় প্রকার যোগ্যতা ও গুণ বৈশিষ্ট্যের প্রতিই লক্ষ্য রাখা হবে। বস্তুতঃ প্রশাসনিক সকল কর্তৃত্ব ও সকল প্রকার নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একই দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধানই অনুসরণ যোগ্য।
কোন একক ব্যক্তিত্বের দ্বারা যদি কর্তৃত্ব-নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য ও কল্যাণকারিতা পূর্ণ না হয়, তাহলে দুই, তিন অথবা তারও অধিক ব্যক্তি একই কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। তবে সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তিকেই প্রাধান্য দেবে। একের দ্বারা কাজ না চললে প্রয়োজনে একাধিক গভর্নর ও কর্মকর্তা নিযুক্ত করবে এবং সর্বাবস্থায়ই যোগ্যতর ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেবে।
বিচার কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অধিক জ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ খোদাভীরু, যোগ্য লোককে প্রাধান্য দেবে। যদি একজন অধিক জ্ঞানী এবং অপরজন অধিক মুত্তাকী ও খোদাভীরু হয় তাহলে লক্ষ্য করতে হবে যে, দ্বিধাদ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে অধিক জ্ঞানী ব্যক্তির জ্ঞান-প্রজ্ঞা এবং অধিক মুত্তাকী ব্যক্তির আগ্রহ-আখাঙ্ক্ষা সংশ্লিষ্ট বিধান প্রযোগে বাধা সৃষ্টি করছে না তো?
কেননা হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে,
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْبَصِيرَ النَّاقِدَ عِنْدَ وُرُودِ الشُّبُهَاتِ وَيُحِبُّ الْعَقْلَ عِنْدَ حُلُولِ الشَّهَوَاتِ -
“(সিদ্ধান্ত গ্রহণে) দ্বিধা-সন্দেহের মুহূর্তে দূরদর্শী ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারীকে আল্লাহ তায়ালা ভালবাসেন, আর ভালবাসেন ঐ বুদ্ধিমত্তাকে যা কোন ব্যাপারে আগ্রহ-আকাঙ্ক্ষার প্রাবল্যের মুহূর্তে ভারসাম্য বজায় রাখতে সমর্থ।”
কাযী (বিচারক) কে যুদ্ধবিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা, সেনাধ্যক্ষ কিংবা সাধারণ প্রশাসনিক প্রধানের সমর্থনপুষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়, তবে তা জরুরী নয়। বিচারকের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ শিক্ষা ও জ্ঞান বিষয়ক বৈশিষ্ট্য থাকা এবং ধার্মিকতার গুণকে প্রাধান্য দিতে হবে, যদি জ্ঞান ও ধার্মিকতার মুকাবেলায় শক্তি সামর্থ্যের প্রয়োজন অধিক দেখা দেয়, সে ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী ও স্বাবলম্বী ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেবে।
কোন কোন 'আলিম তথা ইসলামী জ্ঞান বিশেষজ্ঞদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, বিচারের ফয়সালার জন্যে কোন যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না, গেলেও সে ফাসিক আলিম কিংবা জাহিল দ্বীনদার। এ দু'য়ের মধ্যে কাকে প্রাধান্য দিতে হবে? তারা জবাব দিয়েছিলেন, ঐ ব্যক্তির মধ্যে সত্য এবং কল্যাণের পথ থেকে দূরে থাকার ভাব-প্রবণতা অধিক হলে দ্বীনের কাজে ত্রুটি দেখা দেয়া স্বাভাবিক বিধায় দ্বীনদার ব্যক্তিটিকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত। শাসকদের অবহেলার দরুন দ্বীনের কাজের ত্রুটি হতে থাকলে আলিমকেই সে ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেবে। অধিকাংশ আলিম ব্যক্তি দ্বীনদারকেই এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেবার পক্ষে মত দিয়েছেন। কারণ, এ ব্যাপারে সকল ইমাম মুজতাহিদ একমত যে, কর্মকর্তা, আমীর এমন ব্যক্তিকে হতে হবে যিনি ন্যায় বিচারক এবং সাক্ষ্যদানের যোগ্য।
'ইলমের শর্তের বেলায় মত পার্থক্য রয়েছে যে, কি ধরনের আলিমকে কোন ব্যাপারে কর্মকর্তা করা হবে? সে আলিমকে মুজতাহিদ হতে হবে, না মুকাল্লিদ, অথবা যে ধরনের পাওয়া যায় তাকেই নিয়োগ করা। এ ব্যাপারে অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তার অবকাশ খুব কম। তবুও সংক্ষিপ্ত বক্তব্য হলো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বিচারপূর্বক আপেক্ষিক কর্মযোগ্য ব্যক্তিকে প্রয়োজনে শাসক-কর্মকর্তা বানানো বৈধ। কারণ, পরিস্থিতি ও পরিবেশের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখাও কর্তব্য যাতে মন্দকে যথাসম্ভব নির্মূল করা যায়। কোনো ব্যক্তি হয়তো জ্ঞান প্রজ্ঞার দিক থেকে অধিকতর যোগ্য কিন্তু কোনো বিশেষ এলাকার আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে হয়তো দুর্বল। সে ক্ষেত্রে কম প্রজ্ঞাশীল হলেও শক্ত লোক দরকার।
সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব হচ্ছে জনগণের প্রয়োজনে। সে প্রয়োজন কিভাবে পূরণ হবে তা দেখতে হবে। যেমন, সমাজের অস্বচ্ছল নাগরিকদের গৃহীত নিজ নিজ ঋণের টাকা পরিশোধ করা কর্তব্য। কিন্তু বর্তমানে তার থেকে এ পরিমাণেরই তাগাদা দেয়া উচিত, সে যে পরিমাণ আদায় করতে সক্ষম। যেমন, জিহাদের তৈরির জন্যে শক্তি সঞ্চয় এবং এ জন্যে অধিক ঘোড়ার ব্যবস্থা (তথা সমরোপকরণ জোগাড়) রাখার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু অক্ষমতা ও অসমর্থতার সময় কোনো নাগিরকের উপর থেকে এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। তখন তার যদ্দুর সাধ্যে কুলায়, তাই তার জন্য ফরয হয়ে দাঁড়ায়। ফরয আদায় করাটাই তখন তার কর্তব্য। অবশ্য হজ্জ এবং অন্যান্য ইবাদতের কথা ভিন্ন। সেক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য নয়। বরং হজ্জ ইত্যাদি পালন তার ওপর ফরয।
مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا -
“যার হজ্জে যাবার ক্ষমতা ও সামর্থ্য রয়েছে।” (সূর আলে ইমরান : ৯৭)
এটা ফরয নয় যে, সে বিশেষভাবে ক্ষমতা ও সামর্থ্য সৃষ্টিতে লেগে যাবে। কেননা, হজ্জ তখনই ফরয হয় যখন তার মধ্যে স্বাভাবিক উপায়ে সামর্থ্য আসে, এ জন্যে বিশেষ কায়দায় সামর্থ্য সৃষ্টি করা ফরয নয়।

টিকাঃ
১. সাহাবীগণ সকলেই ছিলেন عدول ন্যায়পরায়ণ। তাঁদের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল হয়ত হয়ে যেতো, কিন্তু তাতে ব্যক্তিগত স্বার্থের ছোঁয়া ছিল না। খালিদকে হযরত উমর পদচ্যুত করেছিলেন, তা সত্ত্বেও খালিদ সাধারণ সৈনিক হিসেবে জিহাদ করে আনুগত্যের চরম ইসলামী দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। তাঁরা ছিলেন আদর্শ চরিত্রের অধিকারী। (সম্পাদক)

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ইসলামে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের লক্ষ্য : কুরআন সুন্নাহর শিক্ষা, আইন-কানুন বাস্তবায়ন

📄 ইসলামে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের লক্ষ্য : কুরআন সুন্নাহর শিক্ষা, আইন-কানুন বাস্তবায়ন


যোগ্যতর ব্যক্তির পরিচয়, শাসন-কর্তৃত্বের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচিতি, কর্তৃত্বের লক্ষ্য দীনের প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার, জুমুআ ও জামাআতের সুষ্ঠু প্রতিষ্ঠা, জনগণের দীনী সংশোধন- এই পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলতেন, আমি এজন্য তোমাদের নিকট কোনো শাসক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রেরণ করি, তারা যেন তোমাদেরকে মহাপ্রভু আল্লাহ্ কিতাব এবং নবীর আদর্শ শিক্ষা দেয় আর দীন তথা ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে সক্রিয় ও স্থায়ী রাখে।
সর্বাধিক যোগ্যতর ব্যক্তির পরিচয় তখন জানা যাবে, যখন শাসন কর্তৃত্বের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যে পৌঁছার পদ্ধতি জানা যাবে। তোমার কাছে যখন লক্ষ্য স্পষ্ট হবে এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছার পদ্ধতি জানা হয়ে যাবে, তখন মনে করবে যে, তোমার করণীয় বিষয়টি তুমি পূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পেরেছো।
রাজা-বাদশাহ তথা শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে যদি বৈষয়িক স্বার্থ প্রাধান্য পায় আর তারা ধর্ম, ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধ ত্যাগ করে বসে, তখন শাসক কর্তৃপক্ষ শাসন যন্ত্রে এমন সব লোককেই পদোন্নতি দেন, যাদের দ্বারা তাদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য-লক্ষ্যই অধিক হাসিল হয়। যে শাসক নিজ ব্যক্তি স্বার্থের জন্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রত্যাশী, সে নিয়োগ-বদলিতে ঐ ব্যক্তিকেই প্রাধান্য দেবে, যে তার রাষ্ট্র, কর্তৃত্ব পদ বহাল রাখতে সহায়ক। মহানবী (সা)-এর রাজনৈতিক আদর্শে আমরা দেখতে পাই, শাসন ক্ষমতা ও যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও সেনাপতিগণ যারা রাষ্ট্র প্রধানের প্রতিনিধি এবং ফৌজী সিপাহসালার, তারা মুসলমানদের জুমআর নামায এবং জামাআতের ইমামত করতেন। জনগণের সামনে মূল্যবান বক্তৃতা দান করতেন। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর তিরোধানের প্রাক্কালে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে নামাযের ইমামতের দায়িত্বে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। মুসলিম মিল্লাতে সমর নেতৃত্বের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও তাঁকেই অগ্রগামী রাখতেন।
মহানবী (সা) যখন কাউকে সেনাপতি নিয়োগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করতেন, সর্বপ্রথম তাঁকে প্রদত্ত সরকারী অর্ডারে নামায কায়েমের হুকুম করতেন। এমনিভাবে যখন কাউকে কোনো শহর জনপদের শাসনকর্তা করে পাঠাতেন, প্রথমে তাকে জামাআতের সাথে নামায পড়াবার নির্দেশ দিতেন। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সা) আত্তাব ইবন উসায়দ (রা)-কে মক্কার শাসনকর্তা করে পাঠিয়েছিলেন। তেমনি উসমান ইবনে আবিল আস (র)-কে পাঠিয়েছিলেন তায়েফের শাসনকর্তা করে। হযরত আলী (রা) হযরত মুয়ায (রা) এবং হযরত আবু মূসা (রা)-কে ইয়ামেনের শাসনকর্তারূপে পাঠিয়েছিলেন। আমর ইবনে হাযম (রা)-কে পাঠিয়েছিলেন নাজরানের শাসনকর্তা করে। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নায়েব বা প্রতিনিধি হিসাবে জামাআতের নামাযে ইমামত করতেন এবং শরী'য়াতী শাসন তথা হুদূদ ইত্যাদি কায়েম করতেন। যুদ্ধের সেনাপতিও ঠিক একই কাজ করাতো। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইনতিকালের পর ইসলামী রাষ্ট্রে তাঁর স্থলাভিষিক্ত খলীফাগণও একই নিয়মে এসব রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পাদন করতেন। বনী উমাইয়া-র বাদশাহগণ এবং দু'একটি ব্যতিক্রম ছাড়া আব্বাসী শাসকগণও তাই করেছেন। এটা এজন্যে করা হতো যেহেতু দীন ইসলামে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নামায এবং জিহাদ।
এ কারনেই বহু হাদীসে নামায এবং জিহাদকে একই সাথে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি কোনো রুগীর শুশ্রুসায় গেলে বলতেন-
اللَّهُمَّ اشْفِ عَبْدَكَ لِيُشْهِدَ لَكَ صَلوةٌ وَيَنْكَا عَدُوا ...
“হে আল্লাহ তোমার এ বান্দাকে আরোগ্য দান করো, যেন সে নামাযে হাজির হতে পারে এবং তোমার দুশমনদের মোকাবেলা করতে পারে।"
يَا مُعَادُ إِنَّ أَهَمَّ أَمْرٍ عِنْدِي الصَّلوةُ.
“হে মুআয! আমার কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নামায।"
আঞ্চলিক শাসক ও কর্মচারীদের কাছে হযরত উমরের নির্দেশনামা : হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় নিয়োজিত কর্মচারী ও গভর্ণরদের উদ্দেশ্যে যে সরকারী ফরমান লিখে পাঠাতেন। ঐগুলোতে লিখা থাকতো-
إِنْ أَهَمَّ أُمُورِكُمْ عِنْدِي الصَّلُوةُ فَمَنْ حَافَظَ عَلَيْهَا وَحَفِظَهَا حَفِظَ دِيْنَهُ وَمَنْ ضَيَّعَهَا كَانَ سِوَاهَا مِنْ عَمَلِهِ أَشَدُّ إِضَاعَةً.
"আমার কাছে তোমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নামায। যে ব্যক্তি নামাযের হেফাজত করলো, সে দীনের হেফাজত করলো। যে নামায নষ্ট করলো সে অন্যান্য কাজও বেশী নষ্ট করবে।"
হযরত উমরের এ কথার তাৎপর্য হলো, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
الصَّلُوةُ عِمَادُ الدِّينِ.
"নামায হচ্ছে দীনের স্তম্ভ।" প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যখন এই স্তম্ভটির হেফাজত করবে, তখন নামায তাকে অশ্লীলতা এবং সকল গর্হিত কাজ ও দুর্নীতি থেকে রক্ষা করবে এবং অন্যান্য ইবাদতের কাজে নামায তার সাহায্যকারী হবে। ("কারণ إِنَّ الصَّلوةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ নামায গর্হিত-অবাঞ্চিত কাজ থেকে বিরত রাখে।")
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ.
"(দীনের উপর) অটল-অবস্থান এবং নামাযের দ্বারা (আল্লাহর) সাহায্য কামনা কর আর (মনে রেখো) নামায অত্যন্ত ভারি জিনিস। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে এটি ভারি নয়।” (সূরা বাকারা : ৪৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصابرين.
“হে মুসলমানগণ, (সকল সময় তোমরা দীনের উপর অটল অবস্থান নিয়ে) ধৈর্য ও নামাযের দ্বারা (আল্লাহর) সাহায্য কামনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যধারণকারীদের সাথে থাকেন।" (সূরা বাকারা : ১৫৩)
আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা)-কে সম্বোধন করে বলেছেন:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَانَسْئَلُكَ رِزْقًا - نَحْنُ نَرْزُقُكَ - وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوى.
“(হে নবী!) নিজের পরিবারস্থ লোকদের নামাযের তাগিদ করো। নিজেও পাবন্দির সাথে নামাযে রত থাকবে। আমি তো তোমাদের নিকট কোনো রিযিক চাই না- বরং আমি নিজেই তোমাদের রিযিক দেই। উত্তম পরিণতি তো তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি পূর্ণ সাবধানী জীবন অবলম্বনেই রয়েছে।” (সূরা ত্ব-হা: ১৩২)
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ - مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونَ - إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينِ.
"জিন এবং ইনসানকে আমি একমাত্র আমার ইবাদত তথা নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও দাসত্ব করার জন্যেই সৃষ্টি করেছি। তাদের থেকে আমি কোনো রিযিকের প্রত্যাশী নই। আর তাদের কাছে এটাও চাইনা যে তারা আমাকে খাবার দিক। আল্লাহ নিজেই তো অধিক রিযিকদাতা, প্রচণ্ড শক্তিধর এক মহাসত্তা।” (সূরা যারিয়াত: ৫৬-৫৮)
অতএব এটা বুঝা গেল যে, কর্তৃত্ব নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের সেবা করা এবং তাদের সংশোধন করা। মানুষ যদি দীনকে পরিত্যাগ করে তাহলে তারা কঠিন দুর্গতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে, আর তাদেরকে যেসব পার্থিব নেয়ামত সুযোগ-সুবিধা ও উপভোগ্য জিনিস দান করা হয়েছে, সেগুলো তাদের জন্যে কখনও কল্যাণকর হবে না। বৈষয়িক সেই কাজের দ্বারা তাদের যেই দীনী কল্যাণ সাধিত হতো, তা হবে না।
বৈষয়িক যেই জিনিসের দ্বারা মানুষ দীনী কল্যাণ লাভ করতে পারে, তা দু'প্রকার। এক. সম্পদকে তার হকদারের কাছে পৌঁছানো। দুই. বাড়াবাড়ি এবং অন্যায়ভাবে সম্পদ হস্তগতকারীকে শাস্তি প্রদান। সুতরাং যে ব্যক্তি সীমা অতিক্রম ও বাড়াবাড়ি করে না, জেনে রেখো, সে তার দীনের কাজে অভ্যস্ত হয়েছে। এজন্যে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা) বলতেন:
إِنَّمَا بَعَثْتُ عُمَّالِي إِلَيْكُمْ لِيُعَلِّمُواكُمْ كِتَابَ رَبِّكُمْ وَسُنَّةَ نَبِيِّكُمْ وَيُقِيمُوا بَيْنَكُمْ دِينَكُمْ.
“হে জনগণ, আমি আমার কর্মচারী ও গভর্ণরদেরকে এজন্যে তোমাদের কাছে পাঠাই, যেন তারা তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর কিতাব এবং নবীর আদর্শ শিক্ষা দেয় আর তোমাদের মধ্যে দীন কায়েম রাখে।"
বর্তমানে যেহেতু শাসক-শাসিত উভয়ের মধ্যে বিকৃতি ঘটেছে, যদ্দরুন সকল ক্ষেত্রের কার্যকলাপেই বিকৃতি দেখা দিয়েছে, এজন্যে সংশোধনও একটি কষ্ট সাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈ কি। তাই যেসব শাসক সম্ভাব্য সকল উপায়ে জনগণের দীন-দুনিয়া উভয়টির কল্যাণার্থেই কাজ করবে, সেসব ব্যক্তি যুগশ্রেষ্ঠ এবং উত্তম মুজাহিদ হিসাবে গণ্য হবে। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
يَوْمُ مِنْ إِمَامٍ عَادِلٍ أَفْضَلُ مِنْ عِبَادَةِ سِتِّينَ سَنَةً.
"ন্যায়পরায়ণ ইমাম বা নেতার একটি দিন ৬০ বছরের ইবাদতের চাইতে উত্তম।" মুসনাদে ইমাম আহমদ গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, তিনি ইরশাদ করেছেন-
أَحَبُّ الْحَقْلِ إِلَى اللَّهِ عَادِلٌ وَابْغَضُهُمْ إِلَيْهِ إِمَامٌ جَائِرٌ.
"মানুষের মধ্যে আল্লাহর অতি প্রিয় ব্যক্তি হচ্ছে ন্যায়পরায়ণ নেতা। আর আল্লাহর রোষে অধিক নিপতিত ব্যক্তি হচ্ছে জালিম নেতা।"
বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلُّهِ يَوْمَ لَأَظِلُّ إِلَّا ظِلَّهُ - إِمَامٌ عَادِلٌ وَشَابٌ نَشَا فِي عِبَادَةِ اللَّهِ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ بِالْمَسْجِدِ إِذْ خَرَجَ مِنْهُ حَتَّى يَعُودَ إِلَيْهِ وَرَجُلَانِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعًا عَلَى ذَالِكَ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَاةٌ ذَاتَ مَنصَبٍ وَجَمَالٍ إِلَى نَفْسِهَا قَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدْقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ. (متفق عليه)
"আল্লাহর ছায়া ছাড়া যেদিন আর কোনো ছায়া থাকবে না, তখন সাত শ্রেণীর লোককে আল্লাহ তায়ালা নিজের রহমতের ছায়াতলে স্থান দেবেন। (১) ন্যায়পরায়ণ নেতা, (২) ইবাদতগুযার যুবক, (৩) ঐ ব্যক্তি যিনি নামায শেষে মসজিদ থেকে বের হবার পরও পুনরায় কখন মসজিদে যাবেন তার অন্তর সে ভাবনায় মগ্ন থাকে, (৪) সেই দুই ব্যক্তি যাদের বন্ধুত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্যে- ঐ বন্ধুত্বের ভিত্তিতেই তারা মিলিত হয় এবং বিচ্ছিন্ন হলেও ঐ কারণেই বিচ্ছিন্ন হয়, (৫) যে ব্যক্তি একান্তে মানুষের অগোচরে আল্লাহর যিকির করে এবং চোখের পানি ছেড়ে দেয়, (৬) যে ব্যক্তিকে কোনো অভিজাত সুন্দরী রমণী কামাচারের আহ্বান জানালে সে এই বলে জবাব দেয় যে, বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে আমি ভয় করি, (৭) যে ব্যক্তি এমন গোপনে দান খয়রাত করে যে, ডান হাতে খরচ করলে তার বাম হাত জানে না।” (বুখারী ও মুসলিম) সহীহ মুসলিম শরীফে হৈয়াদ ইবনে হাম্মাদ (রহ) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
أَهْلُ الْجَنَّةِ ثَلَاثَةٌ سُلْطَانُ مُقْسِطُ وَرَجُلٌ رَحِيمٌ رَقِيقُ الْقَلْبِ لِكُلِّ ذِي قُرْبَى وَمُسْلِهِ وَرَجُلٌ غَنِيٌّ عَفِيْفٌ مُتَصَدِّقٌ.
"তিন প্রকারের লোক বেহেশতী। (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান (২) দয়ালু ব্যক্তি, নিকটাত্মীয় এবং মুসলমানদের সহমর্মিতায় যার হৃদয় বিগলিত, (৩) সেই ধনী ব্যক্তি, যিনি চরিত্রবান এবং দানশীল।”
সুনানে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি হাদীস উল্লেখিত আছে যে-
السَّاعِي عَلَى الصَّدَقَةِ بِالْحَقِّ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ.
"দান খয়রাতের কাজে নিষ্ঠাবান সচেষ্ট ব্যক্তি হচ্ছে আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদের মতো। তবে দান হতে হবে লোক দেখাবার জন্যে নয়।"
আল্লাহ তায়ালা জুলুম-অন্যায়ের ধ্বজাধারী সন্ত্রাসী, আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন-
وَقَاتِلُوا هُمْ حَتَّى لَا تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّيْنُ لِلَّهِ.
"যতদিন (সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষদের বিরুদ্ধে) ফিৎনা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার অবসান না ঘটবে এবং (সমাজে) একমাত্র আল্লাহর দ্বীনেরই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত না হবে, তোমরা (মানবতা বিরোধী ঐ প্রতিকূল শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সম্ভাব্য সকল উপায়ে) লড়ে যেতে থাকো।" (সূরা বাকারা: ১৯৩)
একবার রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আরয করা হলো যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মানুষ কোন সময় আপন বীরত্ব দেখাবার জন্যে লড়াই করে, কখনও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রেরণা তাদের লড়াইর পেছনে অনুপ্রেরণা যোগায়, আবার কখনো লড়াইর পেছনে লোক দেখানো ভাবও সক্রিয় থাকে। এহেন অবস্থায় কোনটিকে “আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ” বলা যাবে? হযরত রাসূল (সা) ইরশাদ করলেন-
مَنْ قَالَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي الْجِهَادِ سَبِيلِ اللَّهِ
আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত রাখার জন্যে যে ব্যক্তি লড়াই করবে, সেটিই হবে “জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহ্র পথে জিহাদ।” (হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত।)
অতএব বুঝা গেল, জিহাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, সর্বত্র আল্লাহর শ্রেণী বৈষম্যমুক্ত ন্যায় বিধান তাঁর দীনেরই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁর বাণীকে সমুন্নত করা। كَلِمَةُ الله তথা “আল্লাহর বাণী” কথাটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর দ্বারা আল্লাহ্ বিধান গ্রন্থ কালামুল্লাহকেও বুঝানো হয়ে থাকে।
এভাবে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন-
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ.
"আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট দলীল দিয়ে প্রেরণ করেছি। তাদের মাধ্যমে প্রেরণ করেছি 'কিতাব' ও 'মীযান' (ন্যায়দণ্ড), যেন তাঁরা (ইসলামের) ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।" (সূরা হাদীদ: ২৫)
বিভিন্ন পয়গম্বর এবং কিতাব প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন আল্লাহর হক এবং বান্দার হকসমূহ ইনসাফ ও ন্যায়নীতি সহকারে প্রতিষ্ঠিত করে।
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَاسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ.
"আমি লোহা সৃষ্টি করেছি। তাতে রয়েছে বিরাট ভীতিপূর্ণ উপাদান। মানুষের কল্যাণও তাতে নিহিত আছে। আর তাতে অন্য এক উদ্দেশ্য এটাও নিহিত যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যক্ষভাবে জানতে চান যে, এর মাধ্যমে কারা তাঁকে ও তাঁর রাসূলদের সাহায্যে এগিয়ে আসে।" (সূরা হাদীদ: ২৫)
অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের বিধানসমূহ ও এর নীতি-আদর্শ বাদ দিয়ে ভিন্ন মতাদর্শ ও নীতির অনুসরণ করে চলে, আল্লাহ্র অভিপ্রায় হলো, সে প্রতিরোধে এগিয়ে এলে তাকে লোহা উপকরণ দ্বারা গঠিত হাতিয়ার দ্বারা হলেও অন্যায় পথ থেকে ফেরানো উচিত। কারণ, দীনের প্রতিষ্ঠা, দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব আল্লাহর কিতাব এবং (শক্তির প্রতীক) তরবারীর উপরও ক্ষেত্র বিশেষে নির্ভরশীল।
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, মহানবী (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন أَنْ نَضْرِبَ بِهَذَا অর্থাৎ “আমরা যেন সেই অগ্রগামী ব্যক্তির প্রতি তরবারী তথা উপযুক্ত অস্ত্রের আঘাত হানি যে ব্যক্তি কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে এর অনুসারীদের নিশ্চিহ্ন করতে এগিয়ে আসে।
সুতরাং উদ্দেশ্য যখন এই, তখন 'আকরাব ফাল আকরাব' (নিকটতর অতঃপর নিকটস্থ) এ পন্থায় লক্ষ্য হাসিল করা বাঞ্ছনীয়। কর্তৃত্ব-নেতৃত্বের প্রশ্নে এমন দুই ব্যক্তিকে বেছে নেবে এবং লক্ষ্য করবে যে, উভয়ের মধ্যে কে লক্ষ্যের অতি নিকটতর? উভয়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জনের যোগ্যতার দিক থেকে যে শ্রেষ্ঠ, তাকেই কর্মকর্তা বা শাসনকর্তা নিযুক্ত করবে।
নেতৃত্বের প্রশ্নে কাকে অগ্রাধিকার দেয়া বাঞ্ছনীয়? এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বক্তব্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন- يَوْمُ الْقَوْمَ أَقْرَءُهُمْ لِكِتَابِ اللَّهِ - فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ كَانُوا فِي السُّنَّةِ فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءٌ فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءٌ فَأَقْدَمُهُمْ سَنًا وَلَا يؤْمُ الرَّجُلُ فِي سَلْطَانِهِ - وَلَا يَجْلِسُ عَلَى تَكْرِمَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ -
"(ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজে) জাতির ইমামত বা নেতৃত্ব সে ব্যক্তিই করবে, যে আল্লাহ্ আইনের কিতাব অধিক পাঠ ও মর্মার্থ অনুধাবনকারী। তাতে যদি একাধিক ব্যক্তির যোগ্যতা সমপর্যায়ের হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে হযরতের সুন্নাত-নীতি আদর্শ সম্পর্কে যে ব্যক্তি বিশেষভাবে অবগত, তাকেই প্রাধান্য দেবে। তাতেও সকলে সমপর্যায়ের হলে ঐ ব্যক্তিই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবেন, যিনি হিজরত গমনে অগ্রবর্তী ছিলেন। যদি হিজরত গমনের যোগ্যতাও সকলের সমান সমান হয়, তাহলে যে বয়সে অপেক্ষাকৃত বড়, তাকে নেতা নির্ধারণ করবে। তাঁর প্রভাব বলয়ের মধ্যে অপর কোনো ব্যক্তি নেতৃত্ব করবে না এবং তাঁর মর্যাদার আসনে অনুমতি ছাড়া বসবে না।” (মুসলিম)
একাধিক ব্যক্তির মধ্যে যদি সমযোগ্যতা থাকে এবং তাদের মধ্যে কে যে অধিক যোগ্য তা জানা না যায়, তখন 'কোরা' বা লটারীর মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করবে। যেমন সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) কাদেসিয়ার যুদ্ধে করেছিলেন। কে আযান দেবে, তা নিয়ে সেনাবাহিনীতে বিরাট বাক-বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটে। এমনকি পরস্পর সংঘর্ষের উপক্রম দেখা দেয়। সকলেই বলছে 'আমি আযান দেবো।' অনেকেই অগ্রাধিকার প্রাপ্তির যৌক্তিকতা তুলে ধরে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিম্নোক্ত নির্দেশের অনুসরণ করা হয়।
لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي النِّدَاءِ وَالصَّفُ الْأَوَّلِ ثُمَّ لَمْ يَجِدُوا إِلَّا أَنْ يَسْتَهِمُوا عَلَيْهِ لَاَسْتَهِمُوا .
"মানুষ আযান এবং নামাযের সামনের সারির সওয়াবের গুরুত্ব বুঝার ফলে যদি লটারীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তাহলে তাই করবে।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00