📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 লেখকের ভূমিকা

📄 লেখকের ভূমিকা


সমস্ত প্রশংসা সেই মহান সত্তার জন্য, যিনি তাঁর নবী-রাসূলগণকে সুস্পষ্ট দলীল- প্রমাণাদি সহকারে মানব জাতির নিকট প্রেরণ করেছেন। যিনি মানুষের জন্যে সরল সোজা পথে চলার উদ্দেশ্যে এবং ন্যায়-নীতির অনুসারী হবার লক্ষ্যে নবী-রাসূলগণের সাথে কিতাব এবং মীযান তথা ন্যায়ের মানদণ্ড পাঠিয়েছেন। (সকল প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য) যিনি লোহা ও লৌহজাত বস্তু প্রেরণ করেছেন, যার মধ্যে একদিকে রয়েছে কঠিন শক্তি ও ভীতি, অপরদিকে রয়েছে মানব কল্যাণের অসংখ্য উপকরণ।
আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সব চাইতে বেশী অবগত যে, কার সাহায্য করা এবং কাকে পয়গম্বর বানানো উচিত। তিনিই একক শক্তিমান, প্রবল পরাক্রমশালী সত্তা, যিনি হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে নবুয়্যত ধারার পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন এবং তাঁকে শেষ নবী বানিয়েছেন। - هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ ...... شَهِيدًا
"আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে পথ-নির্দেশক বিধি-বিধানসমূহ এবং সত্য জীবন ব্যবস্থা দিয়ে এজন্যে প্রেরণ করেছেন, যেন তিনি সকল মনগড়া জীবন ব্যবস্থা ও ধর্ম মতাদর্শের উপর এর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করেন।" (সূরা ফাতাহ : ২৮)
মহানবীর মদদকল্পে তিনি পাঠিয়েছেন "সাহায্যকারী বলিষ্ঠ দলীল,” জ্ঞান-প্রজ্ঞা, কলম, হিদায়াত, যুক্তি-প্রমাণ, ক্ষমতা, শক্তি-সামর্থ্য, প্রভাব প্রতিপত্তি ও (শক্তির প্রতীক) তরবারী। বলাবাহুল্য, মান-মর্যাদা ও অন্যায়-অসত্যের উপর বিজয়ের জন্যে এ সকল গুণ অত্যাবশ্যক। আমি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করছি যে, আল্লাহ ব্যতীত মা'বূদ হবার যোগ্য অপর কোন সত্তা নেই, তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁর কোন সহকর্মী ও সমকক্ষ নেই। এ সাথে আরও ঘোষণা করছি যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহ্ একজন বান্দা ও রাসূল। তাঁর প্রতি আল্লাহ্র অসংখ্য রহমত বর্ষিত হোক। রহমত বর্ষিত হোক তাঁর বংশধর ও সকল সাহাবীর উপর। তাঁদের উপর নেমে আসুক শান্তি, করুণার অফুরন্ত ধারা। আমার এই ঘোষণা ও সাক্ষ্যদান হোক সেই মর্যাদার অধিকারী, যদ্দ্বারা ঘোষণাকারী সকল সময়ের জন্যে খোদায়ী নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানে চলে যায়।
গ্রন্থটি লেখার মূল প্রেরণা
মূলতঃ এটি একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ হলেও তাতে আল্লাহ প্রদত্ত রাজনৈতিক বিধি-ব্যবস্থা এবং মহানবীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়সমূহ পরিপূর্ণরূপে বিবৃত হয়েছে।
এ থেকে সকল শাসক, শাসিত, রাজা-প্রজা কারও পক্ষেই কোন অবস্থায় আপন দায়িত্বের প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন বা তা থেকে অব্যাহতি লাভের কোন অবকাশ নেই। এ গ্রন্থ রচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সকল কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা এবং দেশের নীতি নির্ধারক, পরিচালকবৃন্দকে এমন উপদেশ বা পথ নির্দেশনা প্রদান করা, যা আল্লাহ তা'আলা ঐসব শাসক-পরিচালকের উপর অপরিহার্য করে দিয়েছেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلَاثَةً أَنْ تَعْبُدُوهُ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَأَنْ تَنَاصَحُوا مَنْ وَلَاهُ اللَّهُ أَمْرَكُمْ .
“তিনটি কাজে আল্লাহ তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। (১) তোমরা একমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব করবে, (২) তাঁর সাথে অপর কাউকে শরীক করবে না, (৩) সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ় হস্তে ধারণ করবে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না আর আল্লাহ তোমাদেরকে যাদের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন, তাদেরকে সদোপদেশ প্রদান করবে।"
"আসিয়াসাতুশ্ শারইয়্যা" বা শরীয়তী রাষ্ট্রব্যবস্থা গ্রন্থটির মূল ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহর কিতাবের সে সকল আয়াত, যেগুলোতে বলা হয়েছে যে-
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا - وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ - إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ - إِنَّ اللهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا . (٥٨) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ - فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً.
“(মুসলমানগণ!) আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ করছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ অর্থাৎ মানুষের অধিকারসমূহ ঐগুলোর মালিক তথা হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও। তোমরা যখন জনগণের পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নাও, তখন ন্যায়-নীতির মধ্য দিয়ে তা ফয়সালা করো। আল্লাহ তোমাদের যে উপদেশ প্রদান করেন, সেটা তোমাদের জন্যে কতই না উত্তম। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ সব কিছুই অধিক শুনেন, অধিক দেখেন। (হে মুসলমানগণ!) তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলো এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মেনে চলো আর মেনে চলো তোমাদের (রাষ্ট্রীয়) দায়িত্বশীল নেতাদের নির্দেশও। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন প্রকার মতবিরোধ দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা এবং আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের শর্ত হচ্ছে, বিরোধীয় বিষয়টির ফয়সালা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের হাওলা করো। এটা যেমন তোমাদের জন্য উত্তম, তেমনি পরিণামের জন্যে অতি শ্রেয়।” (সূরা নিসা: ৫৮-৫৯)
শরীয়ত বিশেষজ্ঞ আলিমদের অভিমত হলো, প্রথমোক্ত আয়াতটি إِنَّ اللَّهَ …. يَأْمُرُكُمْ রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারক কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের সাথে সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। তারা যেন জনগণের অধিকারসমূহ তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন এবং মামলা-মোকদ্দমা ও জনগণের অন্যান্য অভিযোগের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেন।
দ্বিতীয় আয়াতটির أَطِيعُوا اللَّهَ …. مِنْكُمْ মধ্যদিয়ে প্রজা সাধারণ ও বিভিন্ন বাহিনীর লোকদের বলা হয়েছে, তারা যেন নিজ নিজ নেতা ও কর্মকর্তাদের কথা মেনে চলেন। এসব কর্মকর্তাই সরকারী সম্পদ বণ্টন এবং যুদ্ধের নির্দেশসমূহ জারি করেন, যুদ্ধ বিগ্রহ ইত্যাদিতে কাজ করেন। তবে যে স্তরের নেতাই হোন তিনি আল্লাহ্ অবাধ্য হওয়ার নির্দেশ দিলে তা মানা যাবে না এবং আল্লাহর নির্দেশের পরিপন্থী কোনো আইন বা হুকুম করলে কখনও তা পালন করবে না। এ ব্যাপারে মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন যে,
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ.
“স্রষ্টার অবাধ্যতাজনিত কাজের হুকুম করা হলে তা মানা জায়েয নেই।”
অতএব, যখন কোন ব্যাপারে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, তখন তোমরা মনোনিবেশ করো কুরআন ও সুন্নাহ কি বলে সে দিকে অতঃপর সে অনুযায়ীই ফয়সালা করো। বিবাদমান ব্যক্তিরা যদি এভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি না করে, তখন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের উপর ফরয হলো উপরোল্লেখিত আয়াতের নির্দেশ অনুসারে কাজ করা এবং আল্লাহর নির্দেশকেই কার্যকর করা। আল্লাহর নির্দেশ হলো:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ.
"কল্যাণ এবং সংযমী হবার কাজে তোমরা একে অপরের সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
এ আয়াত অনুযায়ী কাজ করা হলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা হবে এবং তাদের হকও যথারীতি আদায় হবে।
উল্লেখিত আয়াতের মধ্যে আমানত আদায় করা ও হকদারের হকসমূহ তার কাছে যথাযথ পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা বাহুল্য, আমানত আদায় তথা জনগণের অধিকার প্রদান করা ও তাতে ন্যায়-নীতির অনুসরণ- এ দু'টি বিষয়ই হচ্ছে ন্যায়-নীতির শাসন, সৎ নেতৃত্ব এবং কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। এর মধ্যদিয়েই আমানত আদায় হবে।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

📄 ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী


মুসলিম জাতিকে অনুকূল প্রতিকূল উভয় অবস্থার মধ্যদিয়েই সামনে এগিয়ে আসতে হয়েছে। খৃস্টীয় তের এবং চৌদ্দ শতকের মুসলিম দুনিয়ার ইতিহাস ছিল বড় করুণ ও মর্মান্তিক। সর্বত্র অশান্তি, অস্থিরতা ও ভাঙ্গনের জোয়ার দেখা দিয়েছিল। তাদের সকল ঐতিহাসিক বীরত্বের কাহিনী যেন আরব্য উপন্যাসের কাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। ভীরুতা, নিষ্ক্রীয়তা মুসলমানদের আষ্টে পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল।
ঠিক সে সময় অর্থাৎ তের শতকের প্রারম্ভে মঙ্গোলিয়ার মরুচারী তাতারিয়া গোষ্ঠী প্রগৈতিহাসিক যুগের অসভ্য বর্বরদের অনুকরণে তাদের দলপতি চেংগীজ খানের নেতৃত্বে মুসলিম জাহানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সর্বপ্রথম আজকের রুশ অধিকৃত বুখারার তৎকালীন শাসনকর্তা সুলতান মুহাম্মদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। জীহুন নদীর উত্তরে এক বিশাল প্রান্তরে সুলতানের চার লাখ আট হাজার সৈন্য চেংগীজ বাহিনীকে আক্রমণ করে এবং প্রথম দিনের যুদ্ধেই এক লাখ ৬০ হাজার সৈন্য নিহত হয়। এভাবে পরবর্তী যুদ্ধে সুলতান মুহাম্মদের সৈন্যরা নির্মমভাবে পরাজিত ও নিহত হয়। এরপর মঙ্গোলীয় তাতার সৈন্যরা মুসলিম রাজ্যগুলো একের পর এক ধ্বংস করে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অন্য দিক থেকে সুসমৃদ্ধ দামেশক ও তৎকালীন মুসলিম দুনিয়ার রাজধানী বাগদাদ নগরীও তাতারীদের অত্যাচার ও ধ্বংসের লীলাভূমিতে পরিণত হয়।
রাজনৈতিক এ পতনের সাথে সাথে মুসলমানরা ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা ও চরিত্রেও অধঃপতনের শেষ প্রান্তে গিয়ে উপনীত হয়। তৎকালীন সময় শিক্ষিত বলতে সমাজের আলিমদেরকেই বুঝাতো। আলিমগণের মধ্যে ইখতিলাফ ও মতবিরোধ চরমে উঠে। সাধারণ বিষয়কে কেন্দ্র করেও একদল মুসলমান আরেক দলকে নির্মমভাবে হত্যা করতে ও তিরস্কারবানে জর্জরিত করতে দ্বিধা করতো না। আলিমদের পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ দলাদলির ফলে মুসলিম সমাজ শতধাবিভক্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে। মুসলমানদের সেই অনৈক্যের সুযোগে দুশমনরা এ জাতির সব তছনছ করে ফেলে।
অপরদিকে ইসলামের প্রাণসত্তাকে নিঃশেষকারী বিদ'আত, শিরক, পীর পূজা, কবর পূজা ইত্যাদি কুসংস্কার মারাত্মকরূপে বিস্তার লাভ করে। তাওহীদের বাস্তব সংজ্ঞা এক রকম বিলুপ্ত হবার পথে। কুরআন, সুন্নাহ্ শিক্ষা অনুসরণের চাইতে বিদ'আতী পীর-মাশায়েখের বক্তব্যকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হতে থাকে। ইসলামের বিশুদ্ধ ধারণা ও এর নির্মল জ্যোতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। অজ্ঞতার অন্ধকার যখন এভাবে মুসলমানের ঈমানী জ্যোতিকে প্রায় নিষ্প্রভ করে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই দামেশকের আকাশে এক উজ্জ্বল সূর্যের উদয় ঘটলো। তিনিই হলেন আল্লামা তাকিউদ্দীন আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে আবদুল হালীম ইবনে আবদুস সালাম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবুল কাসিম শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া আল হাওয়ানী আল দামেশকী।
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে আবির্ভূত হয়ে বাতিল আকীদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন। তিনি এ সবের বিরুদ্ধে এক রকম জিহাদ ঘোষণা করেন। জিহাদী প্রেরণাদীপ্ত তাঁর এই সংস্কারধর্মী আন্দোলন ছিল বহুমুখী। লেখা, বক্তৃতা ও আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ সকল উপায়ে তাঁর এই প্রতিরোধ চলে। সকল প্রকার বিরোধিতা ও অজ্ঞতার মধ্যেই তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে নির্ভীকভাবে কাজ করে যান। ন্যায় এবং সত্যের বাণীকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে তাঁকে অনেক দুঃখ কষ্টেরই সম্মুখীন হতে হয়। তিনি বন্দী জীবন যাপন করেন। কারা-জীবনের দুঃসহ যন্ত্রণা তিনি ঈমানী শক্তি বলে সহ্য করেন।
শাসকবৃন্দ রাজা-বাদশাহ, আমীর-উমারাদের অনৈসলামিক ভূমিকার প্রতিবাদ ও বিরোধিতার কারণেই তিনি তাদের রোষানলে পড়েন। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র) সততা, নিঃস্বার্থতা ও আল্লাহর পথে ঈমানী দৃঢ়তার পরিচয় দিতে গিয়ে যেই জুলুম-নিপীড়ন ও ভ্রুকুটি সহ্য করেছেন, তার নজির অতি বিরল। দীনের জন্যে আত্মত্যাগের কঠিন অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি যদি "আফজালুল জিহাদ” তথা "অত্যাচারী শাসকের সামনে ন্যায় ও সত্য কথা বলা উত্তম জিহাদ"-এর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সংগ্রামের পথ দেখিয়ে না যেতেন, তাহলে পরবর্তী যুগে বিভ্রান্ত অত্যাচারী মুসলিম শাসক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মারমুখো ব্যক্তিদের সামনে হক কথা বলার লোকের অভাব দেখা দিত। সংগ্রামী ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র)-এর গোটা কর্ম জীবনের প্রতি তাকালে তাঁর সম্পর্কিত এ সকল বক্তবকে অতিশয়োক্তি বলার কোন উপায় নেই।
প্রায় আটশ বছর অতীত হয়ে যাবার পরেও তাঁর লিখিত মূল্যবান গ্রন্থসমূহের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়নি। মিসর, হেজাজ, ইরান প্রভৃতি দেশের অসংখ্য লাইব্রেরীতে ইবনে তাইমিয়া (র)-এর গ্রন্থাবলী সংশ্লিষ্ট সমাজের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে আছে। বার্লিন, লন্ডন, ফ্রান্স ও রোমের বহু পাঠাগারের শোভাবর্ধন করছে এ সংগ্রামী মনীষীর জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থাবলী।
তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দ্বারা একদিকে ইসলামের 'সীরাতুল মুস্তাকীম'কে যাবতীয় আবিলতা মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন, অপরদিকে সকলকে যাবতীয় বিভ্রান্তির পথ পরিহার করে আল্লাহ্র শাসন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুগে যে তাগুতী শক্তি ইসলাম এবং মুসলমানদের চলার পথকে অবরোধ করে এগিয়ে এসেছিল, তিনি তার বিরুদ্ধে তরবারীও ধারণ করেন। ফলে চেংগীজী বর্বরদের পাশবিক বিক্রমকেও এর সামনে প্রতিরুদ্ধ হতে হয়েছিল। বলাবাহুল্য, ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (র) যেভাবে সর্বাত্মক সংগ্রাম করে গেছেন, পরবর্তী যুগে সঠিকভাবে প্রতিটি মুসলিম দেশের ইসলামী নেতৃত্ব যদি সেই জিহাদী ভাবধারা অনুসরণ করতে পারতেন, তাহলে মুসলিম দুনিয়ার ইতিহাস অন্যভাবে গড়ে উঠতো। তা না হওয়াতেই মুসলমানরা আজ সর্বত্র তাগুতী শক্তির করুণার পাত্র।
জন্ম ৬৬১ হিজরী সালে রবিউল আউয়াল মাসের দশ তারিখ হাররান নামক এক শহরে ইবনে তাইমিয়া (র)-এর জন্ম হয়। তাঁর সাত বছর বয়সে যখন এ শহরটি তাতারীদের আক্রমণের শিকার হয়, তিনি তখন তাঁর পিতার সাথে জন্মভূমি ত্যাগ করে দামেশকে চলে যান। কুরআন হিফজসহ অন্যান্য প্রাথমিক শিক্ষা তিনি ঘরেই লাভ করেন। অতঃপর ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের তৎকালীন প্রাণকেন্দ্র দামেশকের বড় বড় সুদক্ষ উস্তাদদের কাছে তিনি ইসলামী শিক্ষা সমাপ্ত করেন।
তাঁর জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও কর্ম-কৌশলের কথা অল্পদিনেই সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। হাদীসশাস্ত্রে তাঁর পাণ্ডিত্ব এতই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, জনগণ এই বলে বলাবলি করতো, "ইবনে তাইমিয়া যে হাদীসকে হাদীস বলে জানেন না, তা আদৌ হাদীস নয়।" ইবনে তাইমিয়া সকল সমস্যার সমাধান কুরআনের আয়াতের আলোকে পেশ করতেন। তিনি পূর্ববর্তী যুগের তাফসীরকারকদের কোন ভ্রান্তি থাকলে, তা পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধরতেন। মাত্র বিশ বছর বয়সে, তিনি এই জ্ঞান বৈদগ্ধ ও দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল গম্ভীর, সরস ও মিষ্ট; ঐতিহাসিক ইবনে কাসীরের মতে "ইবনে তাইমিয়া (র)-এর উপদেশপূর্ণ অপূর্ব ও জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুনে অনেক বড় বড় পাপী, আল্লাহদ্রোহীও তওবা করে সৎপথের অনুসারী হয়েছে।” শেখ সালেহ তাজুদ্দীন বলেন: আমি ইবনে তাইমিয়া (র)-এর অধ্যাপনা কক্ষে রীতিমতো হাযির থাকতাম। তিনি বন্যার গতিতে ছুটতেন, খরস্রোতা নদীর মতো প্রবাহিত হতেন। শ্রোতামগুলী চোখ মুদে স্তব্ধ বসে থাকতো। অধ্যাপনা শেষে তাঁকে অধিক গম্ভীর ও ভয়ঙ্কর মনে হতো অথচ তিনি ছাত্রদের সাথে স্নিগ্ধ হাসি ও খোশ মিজাযে কথা বলতেন। অধ্যাপনার সময় তাঁকে মনে হতো, তিনি এক অদৃশ্য জগতে বিচরণ করছেন এবং পর মুহূর্তে দুনিয়ার বাস্তব জগতে ফিরে এসেছেন। জীবনের অধিকাংশ সময় কারা-প্রকোষ্ঠে অতিবাহিত করলেও তাঁর স্বল্পকালীন শিক্ষকতার যুগে ছাত্রদের সংখ্যা কয়েক হাজারে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর কয়েকজন ছাত্র যারা ছিলেন বিদ্যায়, জ্ঞানে, প্রতিভায়, কর্মদক্ষতায় ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। যেমন, আল্লামা ইবনে কাইয়্যেম, আল্লামা যাহবী, হাফিজ ইবনে কাসীর, হাফিজ ইবনে কুদামাহ, কাযী শরফুদ্দীন, শায়খ শরফুদ্দীন প্রমুখ মনীষীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আরবী ভাষায় গ্রীক দর্শনের অনুবাদ শুরু হয় হিজরী দ্বিতীয় শতকে। তখন থেকে মুসলিম সমাজের উপর গ্রীক দর্শনের বস্তুবাদী মর্মবাদের প্রভাব পড়ে। ফলে মানুষ খাঁটি ইসলামী জীবন দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সকল কিছু চিন্তা করতে শুরু করে। আব্বাসীয় রাজত্বের শুরুতে এ যুক্তিবাদী আন্দোলন অন্ধ আবেগের রূপ নেয়। এই মু'তাযিলাবাদ "খালকে কুরআনের" ন্যায় তুমুল ঝগড়ার উৎপত্তি করে। মুতাযিলাবাদ কুরআন পন্থীদেরকে গ্রীক দর্শনের দুর্জয় প্রভাবে পরাজিত করছিল। "কালাম শাস্ত্র” মুসলিম সমাজকে সূক্ষ্ম মানতিকী আলোচনায় ব্যস্ত রেখে বাস্তব কর্মজগত থেকে একেবারে গাফিল করে দিচ্ছিল।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র) মুসলিম দুনিয়াকে এ অবাঞ্ছনীয় অর্থহীন গুমরাহীর পথে ধাবিত হতে দেখে এর বিরুদ্ধে কলম ধারণ করেন। ৬৯৮ হিজরীতে তিনি একটি কিতাব লিখে 'মুতাকাল্লেমীন'-এর আকীদা ও ধ্যান-ধারণার তীব্র সমালোচনা করেন এবং একে বাতিল প্রমাণ করে কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভেজাল আদর্শকে অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করেন। এ গ্রন্থ ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের বুকে তীরের আঘাত হানে। এ কিতাবের দ্বারা তিনি চিন্তা জগতে এক নতুন বিপ্লর নিয়ে আসেন। এর কারণেই তাঁর নির্যাতনমূলক জীবনের সূচনা ঘটে।
ইমামের মতবাদ সম্পর্কে মিসরের শাসনকর্তা নাসের শাহের নিকট বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হলে ৭০৫ হিজরীতে তিনি দামেশকের গভর্নরকে স্থানীয় আলিমদের একটি মজলিস ডাকার ও ইমামের মতবাদ পরীক্ষা করে দেখার নির্দেশ দেন। একাধিক বৈঠকে ইমামের মতই প্রাধান্য লাভ করে।
সূফীদের নাম ভাঙ্গিয়ে ভণ্ডপীর-ফকীর-দরবেশের পেশাধারী একশ্রেণীর লোক যেমন আজকাল অর্থোপার্জন করে এবং তাদের কাছে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমায়, তৎকালেও মুসলিম সমাজ এ ফিত্নায় কম ভারাক্রান্ত ছিল না। আহমদিয়া ও নিসারিয়া ফকীর সম্প্রদায় দুটির একটি যুক্ত দল ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র)-এর বিরুদ্ধে দামেশকের গভর্নরের কাছে তিক্ত সমালোচনা করলে, তিনি তাঁকে ডেকে পাঠান। ইমাম অকুতভয়ে জবাব দেন, এ ফকীরদের দু'টি দল রয়েছে- (১) একটি পরহিযগারী, সাধুতা, নৈতিকতা ও দারিদ্র্যের কারণে প্রশংসার যোগ্য। তবে এদের অধিকাংশই ভণ্ড ফকীর। শিরক, বিদ'আত ও কুফুরী ধারণার পংকিলতায় নিমজ্জিত। ইসলামের মৌল শিক্ষা কুরআন-হাদীসকে পরিত্যাগ করে মিথ্যা ও প্রতারণাকেই জীবনের সম্বল করে নিয়েছে। এরা দুনিয়ার মূর্খ মানুষগুলোকে ধোঁকা দিয়ে নানা প্রকার বিদ'আত, শিরকের জালে জড়িত করে। নিজেদের পকেট ভর্তির জন্য সদাসর্বদা সাধুতার ভান করে থাকে। নিজেদের চারি পাশে এমন এক বিষাক্ত পরিবেশের সৃষ্টি করে নেয় যে, যারাই তাদের সংস্পর্শে যেতো, তাদের মানসিক গোলামে পরিণত হতো। নিজেদের পকেট উজাড় করে সেই বিদ'আতী ফকীরদের পদমূলে সর্বস্ব ঢেলে দিত।
ইমামকে মিসরে তলব
ইমামের সত্য ভাষণে গভর্নর নিরব থাকলেও অন্যদের পক্ষ থেকে গোপনে তাঁর বিরুদ্ধে ভীষণ চক্রান্ত চলে। নাসরুল্লাহ মুঞ্জী মিসরের রাজন্যবর্গকে ইমামের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে। তাঁরা দামেশকের গভর্নরের কাছে লিখে পাঠায় যেন ইমামকে মিসরে পাঠানো হয়। গভর্নর জবাবে বললেন: তাঁর সাথে দু'বার আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে কিন্তু তাঁর মতবাদে কোন দোষ পাইনি। অবশ্য পরবর্তীতে তাঁর প্রতি নির্দেশ এলো, "ভালো চাওতো শাহী ফরমান অনুযায়ী কাজ করতে দ্বিধা করো না।” গভর্নর মজবুর হয়ে ইমামকে মিসর পাঠান।
৭০৫ হিজরীতে ১২ই রমযান সোমবার ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র) দামেশক থেকে বের হলে শহরবাসী তাঁর পেছনে পেছনে তিন মাইল পর্যন্ত গিয়েছিলো। বিদায় সম্বর্ধনায় আগত জনগণ অশ্রুসিক্ত নয়নে ইমামের প্রতি তাকিয়ে থাকে।
মিসরে পৌঁছে তিনি কায়রো শহরে শুক্রবার দিন একটি কেল্লার অভ্যন্তরে প্রধান বিচারপতি ও রাজদরবারীদের এক সমাবেশে তাঁর মতামত নির্ভীকচিত্তে বর্ণনা করেন। কিন্তু তারপরও তিনি রেহাই পাননি। অন্য মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে আটক রাখা হয়। ৭০৭ হিজরীতে তিনি মুক্তি পান। অতঃপর তিনি জামেয়াতুল হিকাম-এর মসজিদে জুমার নামায পড়ান এবং প্রায় ৪ ঘণ্টা- 'ইয়‍্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন'- (অর্থাৎ "একমাত্র তোমারই দাসত্ব করি আর একমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য কামনা করি।") আয়াতের তাফসীর বর্ণনা করেন।
এভাবে মিসরে কিছু দিন থেকে তিনি তাঁর মতাদর্শ (ইসলাম) প্রচার করতে থাকেন এবং যাবতীয় ভ্রান্ত মতবাদের সমালোচনা ও প্রতিবাদ করতে লাগলেন। মুঈউদ্দীন ইবনে আরাবীর অদ্বৈতবাদের ভ্রান্তি স্বপ্রমাণ তুলে ধরতে লাগলেন। কিন্তু বিরুদ্ধবাদীদের জন্যে এটা ছিল অসহ্য। সূফী তাজুদ্দীন সাধারণ মানুষকে সভা-সমিতির মাধ্যমে ক্ষেপিয়ে তুলে তাঁর বিরুদ্ধে কতিপয় অভিযোগ আনেন এবং সরকারের নিকট তাঁর শাস্তি বিধানের দাবী তোলেন। সরকার তখন তাঁকে প্রথমে নজরবন্দী এবং পরে কারাগারেই আবদ্ধ করে রাখেন। কারা-জীবনেও তিনি বসে থাকেননি। নানান প্রকার অবৈধ খেল-তামাশা ও লক্ষ্যহীন জীবনবোধে লিপ্ত কয়েদীদের মধ্যে তিনি ইসলামের শিক্ষা দান কাজ শুরু করেন। তাদের নামাযী ও চরিত্রবান করে তোলেন। এতে জেলখানার পথহারা মানুষগুলো মনুষ্যত্বের সন্ধান পায়।
কারা প্রকোষ্ঠে ইমাম ইবনে তাইমিয়া
শত্রুরা ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র)-এর এ কাজের টের পেয়ে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে আলেকজান্দ্রিয়ার জেলে স্থানান্তর করে। এখানে একটি দুর্গে ১৮ মাস থাকাকালে একাধিকবার তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যাতে মুসলিম জাহানের লোকেরা কেঁদে কেঁদে অস্থির হতো। ৭০৯ হিজরীতে বাদশাহর হুকুমে তিনি মুক্তি পেয়ে আলেকজান্দ্রিয়া থেকে কায়রো রওনা দিলে স্থানীয় জনগণ এক বিরাট মিছিল করে তাঁকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করেন। কায়রোর মাশহাদ-এ তিনি অবস্থান কালে কুরআন-হাদীস ও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
এ সময় (৭১১ হিঃ) জামে মসজিদে প্রতিপক্ষীয় একদল লোক এসে ইমামের উপর হামলা করে এবং তাঁকে এক নির্জন ঘরে আটক করে নির্মমভাবে প্রহার করে। শহরে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর নিকট লোকজন দলে দলে দৌড়ে আসে এবং অভিপ্রায় ব্যক্ত করে যে, হুযুর অনুমতি দিলে গোটা মিসর শহর জ্বালিয়ে দেব। কিন্তু তিনি কোনরূপ প্রতিশোধ না নিয়ে বরং বললেন: আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। এরপরও তিনি অনেক দিন মিসরে থেকে পরে বায়তুল মুকাদ্দাস সফর করে স্বদেশ ভূমি দামেশকে ফিরে আসেন। জনগণ আনন্দে মিছিল করে তাঁর আগমন সম্বর্ধনা জানায়।
স্বদেশ ভূমি দামেশকে প্রত্যাবর্তন
দামেশকে আসার পর তিনি দীনী শিক্ষা বিস্তার, গ্রন্থ প্রণয়ন ও মানব সেবামূলক কাজে হাত দেন। তাঁর নির্ভীক কর্মতৎপরতা ও স্পষ্ট ভাষণে কায়েমী স্বার্থবাদী কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকদের গা-জ্বালার সৃষ্টি হয়। তারা আবার সরকারের কাছে অভিযোগ আনলে এ মর্মে সরকারী ফরমান জারী হয় যে, ইবনে তাইমিয়া আর কোন ফতোয়া জারী করতে পারবেন না।
কিন্তু ইমাম বললেন, “সত্য গোপন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” তাঁর পক্ষ থেকে সরকারী ফরমানের এহেন বিরুদ্ধাচরণে ৭২০ হিজরীতে 'দারুস্ সাদাত'-এ অনুষ্ঠিত এক অধিবেশনে ইমামকে পুনরায় বন্দী করার সরকারী ফরমান জারী হয়। তখন তিনি পাঁচ মাস আঠার দিন পর্যন্ত দুর্গে বন্দী ছিলেন। এক বছর পর তাঁকে মুক্তি দেয়া হলে তিনি সেই পুরাতন কাজ শুরু করেন। ইমাম জ্ঞান প্রসারের কাজে নিমগ্ন হন। তিনি দেখলেন, বহু বুযুর্গের কবর পূজা হচ্ছে। মকসূদ হাসিলের জন্য হাজার হাজার মানুষ কবরে শায়িত বুযুর্গদের কাছে প্রার্থনা জানাবার জন্যে দলে দলে ছুটে আসছে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া ৭২৬ সনে ফতোয়া জারী করলেন যে, “কবর যিয়ারত করার নিয়তে দূর দেশ সফর করা জায়েয নয়। এ ফতোয়া জারীর পর তাঁর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিরুদ্ধবাদীরা বড় বড় সভা করে তাঁর বিরুদ্ধে আগুন ঝরা বক্তৃতা দেয়। মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলে। কেউ বলে জিহবা কেটে দিতে হবে, কেউ বলে চাবুক মারতে হবে। কারও মত হলো যাবজ্জীবন কারারুদ্ধ করে রাখতে হবে। একদল মিসরের বাদশাহর কাছে দাবী তুলল, তাঁকে যেন কতল করা হয়। পরে সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রেফতারকারী পুলিশ তাঁর নিকট গেলে তিনি সহাস্যে তাদের সাথে কারাগারে চলে যান। বাগদাদে এ খবর পৌছুলে সেখানকার তদানীন্তন শ্রেষ্ঠ আলিমগণ ইমামের ফতোয়াকে ইসলামের মূল ভাবধারার সাথে সামঞ্জস্যশীল বলে তাঁর প্রতি সমর্থন জানান। তাঁরা বাদশাহর কাছে দু'খানা চিঠি পাঠান। ঐ সকল চিঠির সারমর্ম হলো: ইমাম ইবনে তাইমিয়া যুগশ্রেষ্ঠ শতাব্দীর মুজতাহিদ ইসলামী মিল্লাতের নেতা, পৃথিবীর সাত একলীমের ধনভাণ্ডারও তাঁর মূল্য দিতে অক্ষম। আশ্চর্যের বিষয় যে, জাতির এ কর্ণধার যেখানে রাজপ্রাসাদে থাকার কথা, তাঁকে রাখা হয়েছে কারাগারে। তাঁর প্রতি ভিত্তিহীন দোষারোপ করা হয়েছে। তাঁকে আশু মুক্তি দেয়া উচিত।
ইরাকীরা ইমামের কারা-নির্যাতনের কথা শুনলে সারা দেশে অন্তর্বেদনার প্রচণ্ড আগুন জ্বলে উঠে। আলিমদের সম্মিলিত এক ঘোষণায় বলা হয়, ইমাম ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য সন্দেহাতীতভাবে সত্য। সুতরাং শায়খুল ইসলামকে দীনের খিদমতের জন্য মুক্তি দেয়া হোক। তাতে বিশ্ব-মুসলিমের প্রতি বিরাট অনুগ্রহ করা হবে। বাগদাদের শ্রেষ্ঠ ওলামা-এ-কিরামের এ চিঠি মিসর বাদশাহ্র দরবার পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি কিংবা পৌছুলেও তা এমন সময় যে, তখন ইসলামী দুনিয়ার শতাব্দীর এ উজ্জ্বল সূর্য অস্তমিত হয়ে গেছে। ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ মর্দে মুজাহিদ শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া চিরদিনের তরে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেলেন।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র) জীবনের শেষ দিনগুলো কারাগারে ইবাদত বন্দেগী, কুরআন তিলাওয়াত ও এর গবেষণাতেই কাটাতেন। শেষবারে ইমাম দীর্ঘ তিন বছর তিন মাস কালেরও বেশি দিন কারারুদ্ধ ছিলেন। কারাগারের এ নিষ্ঠুর বন্দী জীবনও কেটেছে তাঁর অসংখ্য মৌলিক ও মূল্যবান গ্রন্থ রচনায়।
ইসলামের শিক্ষা আদর্শ থেকে বিচ্যুতির ফলে সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে মুসলমানদের উপর আল্লাহর গযব রূপে তাতারীদের যেই হামলা আসে, তখনও মুসলিম বিশ্বে অসংখ্য আলিম ছিলেন, পীর-মাশায়েখ ছিলেন। কিন্তু আরাম- আয়েশ বাদ দিয়ে এ মহাবিপদের মুকাবিলা করা এবং মুসলিম জনতাকে সংগঠিত করার মতো লোক খুব কমই ছিল। উদ্ভাবনী জ্ঞান দিয়ে সে দায়িত্ব পালন করেছিলেন একমাত্র ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র)। ইসলাম মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে একটি বিপ্লবের আহ্বান নিয়ে এসেছে- বাতিলের সাথে মিতালি করে চলার জন্যে নয়, ইমাম ইবনে তাইমিয়া অসহ্য কষ্ট-নির্যাতনের মধ্যদিয়ে তারই প্রমাণ রেখে গেছেন। আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠাকল্পে বাতিলের বিরুদ্ধে লেখা, বক্তৃতা ও প্রয়োজনে অস্ত্রধারণ করেছেন এবং কষ্ট ত্যাগের মধ্যদিয়েও কি করে ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, ইমাম ইবনে তাইমিয়ার সংগ্রামী জীবন উন্মুক্ত গ্রন্থতুল্য এরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 শরীয়তী শাসন কর্তৃত্বের দায়িত্ব ও কর্তব্য

📄 শরীয়তী শাসন কর্তৃত্বের দায়িত্ব ও কর্তব্য


প্রথম পরিচ্ছেদের বিষয়বস্তু হলো: নেতৃত্বের অধিকারী, পৌর কর্মকর্তা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসকবৃন্দ, বিচারকমণ্ডলী, বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, অর্থবিভাগীয় কর্মকর্তাগণ, মন্ত্রীবর্গ, মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ, সাদকা-খয়রাত ও সরকারী যাকাত আদায়কারী-গণের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত আলোচনা।
দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ব্যাপারটি দুই প্রকার। (১) কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্ব। মহানবী (সা) যখন মক্কা জয় করেন, তখন তিনি কা'বা শরীফের চাবিসমূহ বনী শাইবা থেকে নিয়ে নিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাচা আব্বাস (রা) এ সকল চাবি চেয়ে বসলেন যেন হাজীদের পানি পান করানোর ব্যবস্থাপনা এবং একই সাথে কা'বার অভিভাবকত্ব লাভ ও কা'বার খেদমতের দায়িত্বও নিজে পেতে পারেন। কিন্তু তাঁর এই আগ্রহ আল্লাহ পছন্দ করেননি। তিনি আয়াত নাযিল করলেন এবং কা'বা শরীফের কার্যসমূহ পূর্ববর্তী খাদেম বনী শাইবার লোকদেরকেই প্রদান করার নির্দেশ দিলেন। অতএব এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, নেতার জন্যে ফরয (কর্তব্য) হচ্ছে মুসলমানদের কোনো কাজকে এমন ব্যক্তিদের হাতে সোপর্দ করা, যারা ঐ কাজের জন্যে অধিক যোগ্যতার অধিকারী। যেমন মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন,
مَنْ وَلَّى مِنْ أَمْرِ الْمُسْلِمِينَ شَيئًا فَوَلَّى رَجُلًا وَهُوَ يَجِدُ مَنْ هُوَ أَصْلَحُ لِلْمُسْلِمِينَ فَقَدْ خَانَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ .
"মুসলমানদের কোন কাজে কেউ কর্তৃত্ব লাভ করার পর যদি সে এমন এক ব্যক্তিকে শাসক নির্বাচন করে, যার চাইতে সেই এলাকায় অধিক যোগ্যতর মুসলমান রয়েছে, তাহলে সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো।"
مَنْ قَلَّدَ رَجُلاً عَمَلاً عَلَى عَصَابَةٍ وَهُوَ يَجِدُ فِي تِلْكَ الْعِصَابَةِ أَرْضَى مِنْهُ فَقَدْ خَانَ اللَّهَ وَخَانَ رَسُوْلَهُ وَخَانَ الْمُؤْمِنِينَ -
যে (রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা) সেনাবানিহীতে এমন ব্যক্তিকে নেতা নির্ধারণ করে, যার চাইতে জাতীয় সেনাবাহিনীতে আরও যোগ্যতর ব্যক্তি রয়েছে, সে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। বিশ্বাসঘাতকতা করলো মুসলমানদের সাথে। (আল হাকিম তাঁর সহীহ হাদীস সংকলনে এটি রেওয়ায়েত করেছেন।)
কোন কোন আলিম এটিকে হযরত উমরের (রা) বাণী বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, হযরত উমর (রা) একথাটি তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন। উমরের (রা) ছেলেই একথার বর্ণনাকারী। হযরত উমর (রা) বলেন,
مَنْ وَلَّى مِنْ أَمْرِ الْمُسْلِمِينَ شَيْئًا فَوَلَّى رَجُلًا لِمُوَدَّةٍ أَوْ قَرَابَةٍ بَيْنَهَا فَقَدْ خَانَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالْمُسْلِمِينَ -
"যে বক্তি মুসলমানদের কোন ব্যাপারে (নির্বাহীর) দায়িত্ব পেয়ে (যোগ্যতর লোককে বাদ দিয়ে) এমন ব্যক্তিকে কর্মকর্তা নিযুক্ত করে, যার সংগে তার স্নেহের সম্পর্ক আছে কিংবা সে তার স্বজন, তবে সে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল এবং মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো।”
বিষয়টির ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করা শাসনকর্তাদের প্রথম কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে কোন্ লোক প্রকৃত যোগ্য, শহর ও পৌর এলাকাসমূহে (এবং স্থানীয়) প্রশাসনে কি ধরনের সরকারী প্রতিনিধি বা কর্মকর্তা নিয়োগ বাঞ্ছনীয়, এ ব্যাপারে যাচাই-বাছাই ও পরামর্শ করা অপরিহার্য। কারণ, যারা সেনা ইউনিটের কমাণ্ড অফিসার হবে, যারা ছোট বড় ইসলামী সেনাদলের নেতৃত্ব দেবে, যারা মুসলমানদের নিকট থেকে নানা প্রকার শুল্ক কর আদায় করবে, যারা জনগণের অর্থ ব্যবস্থার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে, তারাই এসবের নিয়ন্ত্রক।
সরকারী প্রশাসনিক কাজ কর্মের পরিচালকও তারা। এজন্যে উচ্চ কর্মকর্তা ও প্রধান শাসকের জন্যে একান্ত অপরিহার্য বিষয় হলো, এমন সব লোককে সরকারী গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে নিয়োগ দান করা, যারা মুসলমানদের জন্যে উত্তম এবং যোগ্য বলে গণ্য। এটাও লক্ষ্য রাখতে হবে যে, যোগ্য লোক থাকতে যাতে কোন অযোগ্য ব্যক্তি নিয়োগপত্র পেয়ে না যায়। এ নীতি রাষ্ট্রীয় সকল প্রশাসনিক বিভাগে অবশ্যই পালনীয়। যেমন, নামাযে ইমাম ও মুয়ায্‌যিন, শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষক, হজ্জ অনুষ্ঠানে খতীব বা কর্মকর্তা, খাবার পানির ব্যবস্থাপক, (নদ-নদী, খাল) ঝর্ণার তত্ত্বাবধায়ক রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সংরক্ষক, সেনানিবাসের প্রহরী, সেখানকার অস্ত্রনির্মাতা, অস্ত্রাগারে পাহারাদার, ছোট বড় বিভিন্ন বাহিনীর পরিচালক, বাজারের শুল্ক আদায়কারী, গ্রামীণ তথা স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এদের প্রত্যেকের নিয়োগে সততা ও যোগ্যতাকেই প্রাধান্য দিতে হবে।
কেউ মুসলিম সমাজের নেতা ও শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী হলে তাঁর দায়িত্ব হলো নিজের অধীনস্থ এমন সব লোককে কর্মচারী হিসাবে নিয়োগ করা, যারা সৎ বিশ্বস্ত এবং সংশ্লিষ্ট কাজের ব্যাপারে দক্ষ, পারদর্শী। এমন সব ব্যক্তিকে কিছুতেই সামনে এগিয়ে নেয়া উচিত নয়, যারা নিজেরাই কর্তৃত্ব পাবার খাহেশ পোষণ করে কিংবা পদের দাবী করে। বরং যারা পদলোভী, উক্ত পদ পাবার প্রশ্নে তাদের এই লোভই হচ্ছে বড় অযোগ্যতা।
সহীহ আল বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ قَوْمًا دَخَلُوا عَلَيْهِ سَتَلُوهُ وَلَايَةً فَقَالَ إِنَّا لَا نُوَلَّى أَمْرَنَا هَذَا مَنْ طَلَبَهُ -
রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা তাঁর দরবারে কিছু লোক উপস্থিত হয়ে তাঁর পক্ষ থেকে শাসন কর্তৃত্ব প্রাপ্তির অনুরোধ জানালো। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: যারা স্বেচ্ছায় কর্তৃত্ব চায়, আমরা এমন লোককে কোন কিছুর কর্তৃত্ব দেই না। (বুখারী-মুসলিম)
আবদুর রহমান ইবনে সুমারা কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, يَا عَبْدَ الرَّحْمَنِ لَا تَسْئَلِ الْإِمَارَةَ فَإِنَّكَ إِنْ أُعْطِيْتَهَا مِنْ غَيْرِ مَسْئَلَةٍ أُعِنْتَ عَلَيْهَا - وَإِنْ أُعْطَيْتَهَا عَنْ مَسْئَلَةٍ وَكُلْتَ إِلَيْهَا - (اخرجاه في الصحيحين)
“হে আবদুর রহমান! নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চেয়ে নিও না। অপ্রার্থিতভাবে যদি তোমার হাতে নেতৃত্ব আসে, তাহলে তুমি দায়িত্ব পালনে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য পাবে আর যদি তুমি নেতৃত্ব চেয়ে নাও, তাহলে সেটার (ভালমন্দের) পুরো দায়িত্ব তোমার উপরই বর্তাবে (এবং তুমি আল্লাহর সাহায্য পাবে না।")
মহানবী (সা) বলেছেন, مَنْ طَلَبَ الْقَضَاء وَاسْتَعَانَ عَلَيْهِ وَكُلَ إِلَيْهِ وَمَنْ لَمْ يَطْلُبْ الْقَضَاءَ وَلَمْ يَسْتَعِنْ عَلَيْهِ أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَيْهِ مَلَكًا يُسَدده. (رواه اهل السنة)
“যে ব্যক্তি বিচারকের পদ চায় আর এজন্য কারুর সাহায্য প্রার্থনা করে, তার উপর সে কাজের (ভালমন্দ) সোপর্দ করা হবে। আর যে বিচারকের পদ দাবী না করে এবং এজন্যে কারুর সাহায্য না চায়, তা হলে আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে একজন ফেরেশতা পাঠান। ঐ ফেরেশতা তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।" (আহলুস সুন্নাহ)
অতএব প্রধান শাসক যদি দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলেন এবং অধিক সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে বন্ধুত্ব, স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বদেশীকতা যেমন ইরানী, তুর্কী, রোমী কিংবা অপর কোন সম্পর্কের ভিত্তিতে অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন, তাহলে সেটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। ঠিক তেমনিভাবে উৎকোচ অথবা অপর কোন সুযোগ- সুবিধার বিনিময়ে কিংবা এ জাতীয় অন্য কোন সংকীর্ণ স্বার্থ যদি কারও নিয়োগের কারণ হয় অথবা যোগ্য সৎ ব্যক্তির প্রতি কপটতা ও বৈরিতার কারণে তাকে বাদ দিয়ে অযোগ্য অসাধু ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয়, তাহলে সেটাও অবশ্যই আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও সাধারণ মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বৈ কিছু নয়। আল্লাহ তা'আলা এহেন বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে নিষেধ করে বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ - (سورة انفال : (۲۷)
"হে মুমিনগণ! জেনে শুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও না।” (সূরা আনফাল : ২৭)
অতঃপর আল্লাহ ইরশাদ করেন,
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ -
"জেনে রেখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি হচ্ছে একটি ফিৎনা বা পরীক্ষা। নিঃসন্দহে আল্লাহর নিকটই রয়েছে বিরাট প্রতিদান। (সূরা আনফাল: ২৮)
মহান আল্লাহর একথা বলার তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, মানুষ অনেক সময় নিজ সন্তান ও আপনজনদের ভালবাসায় আচ্ছন্ন হয়ে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় কোন গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্ব দিয়ে বসে। অযোগ্যকে ক্ষমতার অধিকারী বানিয়ে দেয়। এটা অবশ্যই আল্লাহর আমানতে খেয়ানত ছাড়া কিছু নয়। এমনিভাবে সম্পদের প্রাচুর্য ও অর্থের পাহাড় গড়ে তোলার ব্যাপারে তার আগ্রহের শেষ থাকে না। তার এই সম্পদপ্রীতি তাকে অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিতে এবং অন্যায়ে প্রবৃত্ত হতে বাধ্য করে। সে অন্যায়, অবৈধ পন্থায় সম্পদ লাভ করতে গিয়ে জনগণকে শোষণ করে। কোন কোন এলাকার আঞ্চলিক শাসক বা বড় সরকারী কর্মকর্তা এমন চরিত্রের হয়ে থাকে যে, সে ঊর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিকে তোষণে পারদর্শী। ফলে তোষামোদী লোকদেরকে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আপন লোকদের দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করে বসে। এহেন ব্যক্তি নিঃসন্দহে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও আমানতের খেয়ানত করে।
দায়িত্বপূর্ণ সরকারী ব্যক্তি যদি আল্লাহকে ভয় করে লোভ সংবরণ করতে পারে এবং নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকতে সক্ষম হয়, তাহলে আল্লাহ তাকে ন্যায়নীতির উপর অটল থাকতে সাহায্য করেন। তাকে সকল প্রতিকূলতা থেকে হেফাযত করেন।
যে শাসক নিজ প্রবৃত্তির দাস, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন। তার উদ্দেশ্য ও আশা আকাংখার স্বপ্নসৌধকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেন। তার সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনকেও অসম্মানজনক অবস্থায় রাখেন। সে হারায় তার অবৈধ পন্থায় অর্জিত সম্পদসমূহ।
এ সম্পর্কে একটি বিখ্যাত ঘটনা আছে যে, একবার আব্বাসী শাসকদের একজন আলিমদের ডেকে বললেন, আপনারা নিজেদের দেখা কিংবা শোনা কিছু ঘটনা লিপিবদ্ধ করুন। একবার উমর ইবনে আবদুল আযীযকে (রহ) আমি দেখেছি, জনৈক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বললো, "আমীরুল মু'মিনীন! আপনি আপনার সন্তানদেরকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে দূরে রেখেছেন। তাদেরকে ফকীর ও অসহায় অবস্থায় রেখে যাবার পথ করেছেন। তাদের জন্যে আপনি কিছুই রেখে যাচ্ছেন না।” উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ) তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। তিনি বললেন, ঠিক আছে, সন্তানদেরকে আমার সামনে হাজির করো। তাদের সকলকে সামনে হাজির করা হলো। খলীফার সন্তান সংখ্যা ছিল দশের ঊর্ধ্বে। তাদের সকলেই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। সন্তানদের দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, বৎসগণ! তোমাদের যা হক ছিল তা আমি তোমাদের পুরোপুরি দিয়ে দিয়েছি- কাউকে বঞ্চিত করিনি। এছাড়া জনসাধারণের কোন সম্পদ আমি তোমাদের দিতে পারবো না। তোমাদের প্রত্যেকের অবস্থা তো এই যে, হয় তোমরা সৎ সাধু ব্যক্তি হবে আর আল্লাহ তাঁর সৎকর্মশীল বান্দাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী, নয় তোমরা অসৎ ও অসাধু হবে। আমি অসৎ ও অসাধু ব্যক্তিদের জন্যে কিছুই রেখে যেতে চাই না। কারণ ঐ অবস্থায় তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে। قُومُوْا عَنِّى "যাও, সকলে এবার আমার নিকট থেকে যেতে পারো, এটুকুনই আমার কথা।"
অতঃপর তিনি বলেন, মহাপ্রাণ উমর ইবনে আবদুল আযীযের সেই সন্তানদেরকেই আমি পরবর্তীকালে দেখেছি, তাদের কেউ কেউ শত শত ঘোড়ার অধিকারী ছিলেন, সেগুলো আল্লাহর রাস্তায় দান করেছেন। ইসলামের মুজাহিদগণ সেগুলোর উপর সওয়ার হয়ে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় জিহাদ করতেন।
অতঃপর সেই আব্বাসী খলীফা বললেন, উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ) ছিলেন “খলীফাতুল মুসলিমীন”।
পূর্বে তুর্কীদের দেশ এবং পশ্চিমে মরক্কো ও স্পেন তাঁর শাসনাধীন, সাইপ্রাস দ্বীপ, সিরীয় সীমান্তবর্তী এলাকা, তরসূস ইত্যাদিতে তাঁর শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। দক্ষিণে ইয়ামেনের শেষ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটেছিল তাঁর শাসনের। এতদসত্ত্বেও তাঁর সন্তানরা পৈত্রিক উত্তরাধিকার থেকে অতি সামান্য কিছুরই মালিক হয়েছিলেন। কথিত আছে যে, তাঁর পরিত্যক্ত সম্পদের পরিমাণ যা ছিল তা সন্তানদের মাথা পিছু বিশ দেরহামের চাইতেও কম ছিল। অথচ ঐ সময়ই আমি খলীফাদের মধ্যে এমন সব শাসকও দেখেছি, যারা এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন যে, তাঁদের মৃত্যুর পর যখন সন্তানরা সেগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করেছে, তখন প্রত্যেকের ভাগে ৬ শ' কোটি পর্যন্ত 'আশরাফী' পড়েছে। তারপরও ঐ সকল সন্তানের কেউ কেউ শেষে ভিক্ষা করতো। এ সম্পর্কে অসংখ্য কাহিনী, চাক্ষুষ ঘটনাবলী এবং পূর্ববর্তীদের শ্রুত অনেক অবস্থার কথা বিক্ষিপ্তভাবে যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে। সেগুলোতে জ্ঞানবানদের জন্য বহু কিছু শিক্ষার আছে।
নবী জীবনের আদর্শ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব ও শাসন ক্ষমতাও একটি আমানত, এই আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করা 'ওয়াজিব।'
বিভিন্নভাবে পূর্বাহ্নেই এ বিষয়ে হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে। আবু যর গিফারী (রা)-কে মহানবী (সা) নেতৃত্ব সম্পর্কে বলেছেন,
إِنَّهَا أَمَانَةً وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةً إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا وَأَدَّى الَّذِي عَلَيْهِ فِيهَا - (رواه مسلم)
“নেতৃত্ব হচ্ছে একটি আমানত। এ নেতৃত্ব (ক্ষেত্র বিশেষে) কিয়ামতের দিন লজ্জা ও অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তবে যিনি ন্যায়-নীতি ভিত্তিক নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন এবং এর হক সঠিকভাবে পালন করেছেন, তার কথা আলাদা।” (মুসলিম)
ইমাম বুখারী (রহ) কর্তৃক সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরায়রার (রা) একটি রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে,
إِنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا ضَيَّعْتَ الْأَمَانَةَ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ - قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا إِضَاعَتُهَا ؟ قَالَ إِذَا وُسِدَ الْأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ - (بخاری)
মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন, "আমানত নষ্ট (তথা খেয়ানত) হতে থাকলে তোমরা কিয়ামতের প্রতীক্ষায় থেকো।" বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! "আমানত নষ্ট” বলতে কি বুঝায়? হযরত বললেন, যখন শাসন ক্ষমতা ও নেতৃত্ব কর্তৃত্বের আসনে অযোগ্য ব্যক্তিদের আগমন ঘটে, তখন তোমরা কিয়ামতের প্রতীক্ষায় থেকো। (বুখারী)
আমানতের এই অর্থের প্রেক্ষিতেই এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ্র 'ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ইয়াতীমের অভিভাবক বা অসী, ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক এবং কোন দায়িত্বে নিয়োজিত ইনচার্জ বা প্রতিনিধির যদি সংশ্লিষ্ট মালিকের সম্পদ থেকে ব্যয় করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন উত্তম পদ্ধতিতে তা ব্যয় করবে (অর্থাৎ স্বীকৃত পরিমাণের বেশী ব্যয় করবে না এবং কোনরূপ আত্মসাৎ করবে না।) যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ.
"ইয়াতীম বয়োঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হইও না।"
শাসক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা হচ্ছেন বকরীর রাখালের ন্যায় জনগণের রক্ষক বা তত্ত্বাবধায়ক। যেমন, মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন :
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالْإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ - وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَّةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا - وَالْوَلَدُ رَاعٍ فِي مَالِ أَبِيْهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالْعَبْدُ رَاعٍ فِي مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ اَلا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ - (اخرجاه في الصحيحين)
“তোমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের রক্ষক। প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের কার্যকলাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের যিনি নেতা, তাঁকে তাঁর অধীনস্থ জনগণের কার্যাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীগৃহের রক্ষক। উক্ত গৃহে যা তার কর্তৃত্বাধীন সে ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। সন্তান তার পিতৃ সম্পদের রক্ষক, সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। দাস ভৃত্য তার মনিবের মাল-সম্পদের রক্ষক। তাকে সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। সাবধান! মনে রেখো, তোমাদের প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জন্য রক্ষক। সকলকে নিজ নিজ অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন যে,
مَا مِنْ رَاعٍ يَسْتَرْعِيْهِ اللهُ رَعْيَةً يَموتُ يَموتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشِ لَهَا - إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ - (مسلم)
“আল্লাহ যাদেরকে অপরের উপর রক্ষণা বেক্ষণের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব দিয়েছেন, সে যদি তার দায়িত্ব পালনে উদাসীন থেকে মারা যায়, আল্লাহ তার জন্যে বেহেশতের গন্ধও হারাম করে দেবেন।” (মুসলিম)
একবার আবু মুসলিম খাওলানী (রহ) হযরত মুআবিয়া (রা) ইবনে আবু সুফিয়ানের নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন,
اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا الْأَجِيْرُ “)হে মজুর! তোমার প্রতি সালাম(”
দরবারের সভাসদগণ বললেন- 'আইউহাল আজীর' না বলে أَيُّهَا الْأَمِيرُ বলুন। তিনি অতঃপর বললেন, اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا الْأَجِيْر পুনরায় বলা হলো "আইউহাল আমীর” বলুন। কিন্তু আবু মুসলিম খাওলানী একই বাক্যের তিনবার পুনরাবৃত্তি করেন। উপস্থিত লোকজন বার বার তাঁকে 'আইউহাল আমীর' বলতে স্মরণ করিয়ে দেন। অবশেষে আমীর মু'আবিয়া বললেন, আবু মুসলিমকে তোমরা বলতে দাও। তাঁর কথার অর্থ তিনিই ভাল জানেন। অতঃপর আবু মুসলিম বললেন, হে মু'আবিয়া! তুমি একজন মজুর। এই বকরীর দলের দেখা শোনা করার জন্যে তোমাকে বকরীর প্রভু মজুরীর ভিত্তিতে নিয়োগ করেছেন। তুমি যদি চর্ম রোগাক্রান্ত বকরীসমূহের তত্ত্বাবধান কর এবং রুগ্ন বকরীগুলোর চিকিৎসা করে সেগুলোর রক্ষণা বেক্ষণ কর, তাহলে বকরীর মালিক তোমাকে এর মজুরী দেবেন। আর যদি চর্ম রোগাক্রান্ত বকরীগুলোর খোঁজখবর না নাও, রুগ্ন বকরীসমূহের চিকিৎসা না কর এবং সেগুলোর রক্ষণা বেক্ষণে যথাযথ দায়িত্বের পরিচয় না দাও, তাহলে এগুলোর মালিক তোমাকে শাস্তি দেবেন।"
একজন শাসকের উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের জন্যে এ ঘটনাটিই যথেষ্ট। কারণ, গোটা মানবজাতিই হচ্ছে আল্লাহর বান্দা। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাগণ হচ্ছেন আল্লাহর বান্দাদের পরিচালনার জন্যে তাঁরই প্রতিনিধি। জনগণের জানমাল মানসম্ভ্রম সবকিছুর হেফাযতের দায়িত্ব তাঁদের উপর ন্যস্ত।
দেশের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক এবং কৃষি ফসল উৎপাদনের উৎসভূমি সংক্রান্ত ব্যাপারে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও এসব ব্যাপারে অনভিজ্ঞ ও অযোগ্য কোনো ব্যক্তিকে ঐ পদে নিয়োগ প্রদান করা অবশ্যই খেয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতার কাজ। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এমন কাজ করলে তিনি খেয়ানতকারী হবেন। কারণ দেশের অর্থনীতি ও এর প্রাণসত্তা কৃষি শিল্প বাণিজ্য সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি ব্যবসায়ে পণ্য উপকরণাদি অন্যায্য দামে বিক্রি করে দেবে। ভাল এবং সাধু খরিদদার, যিনি অতিরিক্ত বা ন্যায্য মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও, হুমকি, বন্ধুত্ব ও নিকটাত্মীয়তার দরুন তাকে ন্যায্য মূল্যে পণ্য সামগ্রী না দেওয়া খেয়ানত ছাড়া কিছু নয়। তাতে পণ্য সামগ্রীর মালিক অব্যশই তার প্রতি বিদ্বিষ্ট হবেন এবং নিন্দা জ্ঞাপন করবেন।
কাজেই রাষ্ট্রীয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফরয হলো, কোনো খেয়ানতকারী ব্যক্তিকে প্রতিনিধি বা শাসন পরিচালক না করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও দেশের অর্থনীতি কিংবা ভূমি ইত্যাদির ব্যাপারে ভাল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে সরকারী প্রতিনিধি বা শাসক নিয়োগ করা।

টিকাঃ
১. আল্লাহ নেক বান্দাদের সাহায্য করেন, যেমন 'উমর ইবনে 'আবদুল আযীযের (রহ) সন্তানদের করেছিলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে তারা তেমন কিছু পায় নাই। কিন্তু আল্লাহ তাদের এমন সাহায্যই করেছিলেন যে, প্রত্যেকই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "আমার অভিভাবক তো আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং তিনিই সৎকর্মপরায়ণদের অভিভাবকত্ব করে থাকেন। (৭ : ১৯৬) -সম্পাদক

📘 শরীয়াতি রাষ্ট্রব্যবস্থা > 📄 ক্ষমতা ও শাসন কর্তৃত্বের যোগ্যতা

📄 ক্ষমতা ও শাসন কর্তৃত্বের যোগ্যতা


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয় হলো : যোগ্যতর ব্যক্তিকেই ক্ষমতা ও শাসন কর্তৃত্ব দেয়া উচিত। যোগ্যতর ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও যোগ্য ব্যক্তিকেই ক্ষমতা ও শাসন কর্তৃত্ব প্রদান। প্রশাসনিক প্রত্যেক স্তরের বিভিন্ন পদে আদর্শ ব্যক্তিকে ক্ষমতাসীন ও প্রতিনিধি করা। শাসন কর্তৃত্বের জন্যে শক্তি ও বিশ্বস্ততা অপরিহার্য, যেন শরীয়তী বিধানের প্রয়োগ ও জনগণের অধিকার আদায়ের কাজ সহজ হয়। বিচারকের প্রকারভেদ।
উপরোক্ত আলোচনার পর এখন এটা অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, নেতার উপর কি কি ফরয? সংক্ষেপে বলতে গেলে তা হলো, তিনি এমন সব ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি, কর্মকর্তা কিংবা দেশের কোন এলাকার শাসক নিযুক্ত করবেন, যারা সৎ ও যোগ্য। তবে কোন কোন সময় এমন অবস্থা দেখা দেয় যে, কাজের জন্য ইঙ্গিত যোগ্যতাসম্পন্ন লোক পাওয়া যায় না। সে সময় নেতার কর্তব্য হলো আপেক্ষিক যোগ্যতার ভিত্তিতে ঐ কাজে লোক নিয়োগ করা। প্রত্যেক পদের জন্যে তুলনামূলক বিচারে যে যোগ্য, তাকেই সে পদে বসানো। পূর্ণ নিরপেক্ষতা, সততা ও বিচার বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে যদি নেতা এ কাজটি সমাধা করেন, তাহলে তিনি তাঁর কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করলেন। আর তখনই তাঁকে ন্যায়পরায়ণ নেতা বলা যাবে। মহান আল্লাহর কাছেও তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে বিবেচিত হবেন। অবশ্য তারপরও বিভিন্ন কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দেবে না, এমনটি জোর দিয়ে বলা যায় না। তবুও এছাড়া আর করারই বা কি থাকবে। আল্লাহ তায়ালাও সম্ভাব্য চেষ্টার কথাই বলছেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ -
“হে মুসলমানগণ! তোমাদের দ্বারা যতটুকুন সম্ভব তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো।” (সূরা তাগাবুন: ১৬)
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا -
"আল্লাহ কারুর উপর তার সাধ্যাতীত বোঝা অর্পণ করেন না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)
জেহাদের নির্দেশ দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন: فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - لَا تُكَلَّفُ إِلَّا نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ. “তোমরা আল্লাহর পথে দুশমনদের সাথে লড়ো। তোমার আপন সত্তা ব্যতীত অপর কারুর দায়িত্ব তোমার উপর নেই। তবে হাঁ, অন্যান্য মুসলমানদেরও এ ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করো। (সূরা নিসা: ৮৪)
আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন; يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ - “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন থাকো। তোমরা সঠিক পথে থাকলে, গোমরাহ্ ব্যক্তিরা তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।" (সূরা মায়েদা: ১০৫)
অতএব প্রশাসনিক সকল পর্যায়ে যেই শাসক বা কর্তৃপক্ষ সৎ লোক নিয়োগে সম্ভাব্য সকল চেষ্টা ত্রুটি করবেন না এবং আপন কর্তব্য পালনে পূর্ণ সচেষ্টা হবেন, তাতে ধরে নেয়া যাবে যে, তিনি হেদায়েত বা সঠিক পথের অনুসারী। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন: إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ - (اخرجاه في الصحيحين) "আমি যখন তোমাদের কোন কাজের নির্দেশ দেই, তখন তোমরা তা নিজেদের সাধ্যানুযায়ী করো।” (বুখারী-মুসলিম)
তবে কোন ব্যক্তি যদি শরীয়তের অসমর্থিত অক্ষমতার অজুহাত দেখিয়ে উক্ত কাজে ত্রুটি করে, তাহলে সেটা খেয়ানত হবে। তাকে সেই কর্তব্য অবহেলাজনিত খেয়ানতের শাস্তি প্রদান করা হবে। কাজেই তার কর্তব্য হলো, যোগ্যতর দক্ষ ও কল্যাণকর কোনটি, তা ভালোভাবে জেনে নেয়া এবং প্রত্যেক পদের জন্য যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করা। কারণ, কোন কিছুর কর্তৃত্ব-ক্ষমতার দুটি স্তম্ভ রয়েছে, একটি শক্তি, অপরটি আমানত বা বিশ্বস্ততা। যেমন কুরআন মজীদে ইরশাদ হচ্ছে- إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ -
তোমার ভৃত্য হিসাবে সেই-ই অতি উত্তম ব্যক্তি হবে, যে সবল ও বিশ্বস্ত। (সূরা কিসাস : ২৬)
মিসর সম্রাট হযরত ইউসুফ (আ)-কে বলেছিলেন: إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ -
"আজ থেকে তুমি আমাদের মধ্যে অতি সম্মানিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্ব।”
হযরত জিবরাঈল (আ)-এর মর্যাদা ও গুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُول كَرِيمٍ - ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينِ - مُطَاع ثُمَّ آمِين -
"নিশ্চয় কুরআন মজীদ এক অতি সম্মানিত ফেরেশতা কর্তৃক পৌছানো বাণী, যিনি ওহীর গুরুভার বহনে সক্ষম এবং আরশের অধিকারী সত্তার কাছে রয়েছে তাঁর উচ্চ মর্যাদা। তিনি সেখানে গণ্যমান্য সত্তা এবং বিশ্বস্ত। (সূরা তাকভীর : ১৯-২১)
প্রত্যেক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং শাসন কর্তৃত্বের মূল শক্তি হচ্ছে দেশের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা। রণাঙ্গনে যুদ্ধ-নেতৃত্বের শক্তি হলো সেনাপতির বীরত্ব ও সাহস। তাকে সকল প্রকার রণকৌশল সম্পর্কে অবগত ও দক্ষ হতে হবে। দুশমনের ধোকাবাজি ও চাল সম্পর্কে তাকে থাকতে হবে সচেতন। কেননা الْحَرْبُ خَدْعَةُ "লড়াইর অপর নাম হচ্ছে প্রতারণা।” যুদ্ধ পরিচালককে রণকৌশল জানতে হবে। সে অনুযায়ী কাজ করার জন্যে তাকে হতে হবে পূর্ণ দক্ষতার অধিকারী। (তৎকালীন সময়) যুদ্ধ পরিচালককে তীর নিক্ষেপ করা ও মারার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হতো, যেন শত্রু বাহিনীকে উপযুক্ত আঘাত হানতে পারে। তাকে হতে হবে দক্ষ ঘোড়সওয়ার।
যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করছেন: وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رَبَاطِ الْخَيْلِ -
"মুসলমানগণ! সামরিক শক্তি-উপকরণ সঞ্চয় এবং অধিক পরিমাণে যুদ্ধের ঘোড়া সংগ্রহের মধ্যদিয়ে তোমরা কাফেরদের মোকাবেলায় যথাসাধ্য রণ প্রস্তুতি নিয়ে থাকো। (সূরা আনফাল : ৬০)
রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন:
ارْمُوا وَارْكَبُوا وَإِنْ تَرْمُوا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ تَرْكَبُوا وَمَنْ تَعَلَّمَ الرَّمْيَ ثُمَّ نَسِيَهُ فَلَيْسَ مِنَّا -
“তোমরা তীর চালানো শেখো এবং সওয়ারীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করো। আমার কাছে সওয়ারীর চাইতে তীর চালানো অতি প্রিয়। যে ব্যক্তি তীর চালানো শিক্ষা করে অবহেলা করে তা পরে ভুলে যায়, সে আমার দলভুক্ত নয়।” অপর এক রেওয়ায়েতে আছে,
فَهِي نِعْمَةً مَنْ نَسِيَهَا جَهَدَهَا -
“তীর চালানো (তথা সামরিক যোগ্যতা অর্জন) একটি নেয়ামত। যে তা ভুলে গেল সে এই নেয়ামতকে অস্বীকার করলো।” (মুসলিম)
এসব বক্তব্যের মধ্যদিয়ে সমাজে জ্ঞান প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার ও খোদায়ী বিধান প্রতিষ্ঠার অন্তরায়সমূহ দূরীকরণে মুসলমানদের সামরিক যোগ্যতাসহ যাবতীয় শক্তিমত্তার অধিকারী হবার উপরই জোর দেয়া হয়েছে। যার তাগিদ রয়েছে খোদ কুরআন ও সুন্নায়।
১. আমানতদারী ও বিশ্বস্ততা হচ্ছে খোদাভীতি নির্ভর একটি গুণ।
২. পার্থিব সামান্য সম্পদের বিনিময়ে হক্কুল্লাহকে বিসর্জন দেয়া সঙ্গত নয়।
৩. অন্তর থেকে মানুষের ভয় সম্পূর্ণ বের করে দেবে।
প্রত্যেক শাসনকর্তা, নেতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহ তায়ালা এই তিনটি মহৎ গুণ অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছেন।
কুরআন মজীদে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:
فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلاً - وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
“তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো। আমার আয়াতসমূহকে হীন স্বার্থে ব্যবহার করো না। আল্লাহর বিধান মুতাবেক যারা জনগণকে শাসন করে না তারাই কাফের (অবাধ্য)।' (সূরা মায়েদা : ৪৪)
১. তার পূর্বে বলেছেন, ফাসিক ও জালিম।
এর ভিত্তিতে মহানবী (সা) শাসক ও বিচারকদের তিন ভাগে ভাগ করেছেন। তন্মধ্যে দু'ভাগকেই জাহান্নামী বলেছেন। এক শ্রেণীর বিচারককেই শুধু জান্নাতী বলেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন: اَلْقُضَاةُ ثَلَاثَةٌ قَاضِيَانِ فِي النَّارِ وَقَاضِي فِي الْجَنَّةِ فَرَجُلٌ عَلِمَ الْحَقَّ وَقَضَى بِهِ فَهُوَ فِي الْجَنَّةِ - (رواه اهل السنه)
“কাযী শাসক ও বিচারক তিন শ্রেণীর। দু'শ্রেণীর বিচারক জাহান্নামী এবং এক শ্রেণীর বিচারক জান্নাতী। অতএব যেই ব্যক্তি সত্যকে অনুধাবন করে ন্যায় বিচার করবে, সে জান্নাতী হবে।” (আহলুল সুন্নাহ)
বিবদমান দু'দলের মধ্যে যারা ফয়সালা করে দেয়, তাদেরই কাযী বা বিচারক বলা হয়। বিচারক এ দু'পক্ষকে নির্দেশ দিবেন। তাই এদের মধ্যে কেউ খলীফা হোক কি বাদশাহ, কিংবা ওয়ালী ও হাকিম কিংবা এমন কেউ যিনি রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন, এমনকি যিনি শিশুদের লেখাপড়ার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে নিয়োজিত, সকলেই একই হুকুমের শামিল। মহানবীর সম্মানিত সঙ্গী-সাথীগণ বিষয়টি এভাবেই উল্লেখ করেছেন। তাঁরাও তাই করতেন আর এটাই স্বাভাবিক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00