📄 যবেহ ও খাদ্য বিষয়ক নিষেধাবলী
মৃত জন্তুর গোশত খাওয়া, এই মৃত্যু যে কোন কারনে হোকনা কেন? যেমনঃ পানিতে ডুবে বা ফাঁসিতে আটকিয়ে, অজ্ঞান হয়ে, উঁচু থেকে পড়ে গিয়ে অথবা অন্য কোন জানওয়ারের ঘুতো খেয়ে অথবা কোন হিংস্র প্রানীর আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে ইত্যাদি কারনে মৃত্যুবরণ করলে। তবে আঘাত প্রাপ্ত জন্তুটিকে জীবন্ত অবস্থায় পাওয়া যাওয়ার পর তাকে যদি শরীয়ত সম্মত উপায়ে জবেহ করা হয়ে থাকে তাহলে তা খাওয়া নিষেধ নয়। রক্ত খাওয়া, শুকরের গোশত খাওয়া। আল্লাহ্র নাম ব্যতিত অন্য কোন নামের উপরে জবেহ করা এবং ঐ সকল পশুর গোশত খাওয়া যে গুলোকে ভূত বা শয়তানের নামে জবেহ করা হয় এবং যেগুলোকে জবেহ করার সময় ইচ্ছা পূর্বক বিসমিল্লাহ্ বলা হয় না।
ঐ সব চতুষ্পদ জন্তুর গোশত খাওয়া যারা সর্বদা নাজাসাত ও কদর্য্য বস্তু আহার করে। অনুরূপ ভাবে এই সকল জীব জন্তুর দুধ পান করা। তাছাড়াও দাঁত বিশিষ্ট হিংস্র প্রাণী এবং থাবা বিশিষ্ট পাখির গোশত খাওয়া(১) গৃহ পালিত গাধার গোশত খাওয়া। ঔষধ হিসাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বেঙ নিধন করা, কেননা এই গুলো অপবিত্র, সর্ব সম্মত ওলামাদের মতে ইহা খাওয়া জায়েজ নয়। জন্তু জানোয়ারকে হত্যার উদ্দেশ্যে বেঁধে রেখে কোন কিছুর সাহায্যে প্রহার করা অথবা বিনা দানা পানিতে আটকিয়ে রাখা আর যে পশুকে আঘাতে আঘাতে হত্যা করা হয় তা স্বাভাবিক মৃত পশুর মত, এরূপ পশুর গোশত খাওয়াকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। যেহেতু ইহা শরিয়ত সম্মত উপায়ে জবেহ করা হয় না।
শিকারী নয় এমন কুকুরের শিকার করা পশু খাওয়া, অথবা শিকারী কুকুরের সঙ্গে যদি অন্যান্য কুকুর থাকে তাহলে সে পশু খাওয়াও নিষেধ; কেননা শিকার করা পশুটি কোন কুকুরে শিকার করেছে তা নিশ্চিত ভাবে জানা নেই।
অনুরূপ ভাবে ঐ শিকার করা পশুও খাওয়া বৈধ নয় যাকে কোন অস্ত্রের সাহায্যে শিকার করা হয়েছে আর পশুটি উক্ত অস্ত্রটির ভার বা আঘাতের চোটে নিহিত হয়েছে, যেমন: এমন তীর যার মাথায় ধারাল ফলক নেই। তবে ধারাল কোন অস্ত্র দ্বারা আঘাত পাওয়ার পর পশুটি যদি ক্ষত বিক্ষত হয়ে মারা যায় এবং অস্ত্র নিক্ষেপ করার সময় যদি বিস্মিল্লাহ্ বলা হয়ে থাকে তাহলে সে পশুটি খাওয়া জায়েজ আছে। দাঁত এবং হাতের নখ দ্বারা জবেহ করা, এক পশুর সামনে অন্য পশু জবেহ করা, অনুরূপ ভাবে পশুর সামনে ছুরি ধারাল করা।
দুজন প্রতিযোগীর প্রতিযোগিতা মূলক তৈরী খাবার খাওয়া। অর্থাৎ এমন দুজন পাচকের তৈরী খাবার খাওয়া যারা গর্ব, লোক দেখানো এবং এ বিষয়ে প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্যে খাবার তৈরী করে; কেননা এই ধরনের কার্যকলাপ অন্যায় ও অবৈধ ভাবে সম্পদ ভক্ষনের শামিল।
টিকাঃ
(১) অর্থাৎ যে সব হিংস্র প্রাণী দাঁত দিয়ে শিকার করে আহার করে যেমন: শিয়াল, কুকুর, বাঘ ইত্যাদি। অনুরূপ ভাবে যে সব পাখী থাবার সাহায্যে আহার করে, যেমন: চিল, শকুন।
📄 পোষাক পরিচ্ছেদ ও সাজ সজ্জা বিষয়ক নিষেধাবলী
পোশাকে অতিরঞ্জন করা, পুরুষদের স্বর্ণ ব্যবহার করা, মধ্যমা ও ততসংলগ্ন ছাব্বাবা আংগুলিতে আংটি পরিধান করা এবং লোহার আংটি ব্যবহার করা। উলঙ্গ হওয়া ও বিবস্ত্র হয়ে চলা ফেরা করা অনুরূপভাবে উরু খুলে রাখা। পায়ের গিরার নীচে কাপড় পরিধান করা এবং অহংকার বশে কাপড় টেনে নেয়া। রেশমী কাপড় পরিধান করা এবং লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দামী পোষাক পড়া।
মেয়েদের বেশে পুরুষদের চলা ও তাদের পোশাকাদি পরিধান করা। অনুরূপ ভাবে মেয়েরাও পুরুষদের মত বেশ ধরা ও তাদের পোশাক পরিচ্ছেদ পরিধান করা। তাছাড়াও মেয়েদের শর্ট (খাট) পাতলা এবং টাইট ফিটিং কাপড় ব্যবহার করা।
দাঁড়ানো অবস্থায় জুতা পরিধান করা আর এ কথাটি ঐ ধরনের জুতার বেলায় প্রযোজ্য যা দাঁড়িয়ে পরিধান করা কষ্টকর। যেমন: ঐ সব জুতো যেগুলো ফিতার সাহায্যে বাঁধার প্রয়োজন হয়। অনুরূপ ভাবে এক পাটি জুতা পরিধান করে চলা ফেরা করা; কেননা এটি শয়তানের কাজ।
শরীরের কোন অঙ্গ প্রতঙ্গে খোঁদাই করে নকশা করা। সৌন্দর্য্যের উদ্দেশ্যে দাঁতের মাঝে ফাঁক তৈরী করা এবং ধারালো ও মিহি (পাতলা) করা। তবে বর্তমান যুগে ডাক্তারী মতে তৈরী সূতা বা তার এই জাতীয় কোন জিনিষের সাহায্যে দাঁত সুবিন্যস্ত করা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় নয়।
দাঁড়ি কামানো ও গোঁফ লম্বা করার মাধ্যমে মুশরিকদের অনুসরণ করা বরং আমাদের জন্য উচিত হলো দাঁড়ী ছেড়ে দেয়া আর গোঁফ ছোট করা।
মুখ মণ্ডলের পশম উঠানো, এর চেয়ে আরো অধিক গুরুতর অন্যায় হচ্ছে ভুরু কামানো বা উঠানো।
মেয়েদের মাথার চুল নেড়ে করা, পুরুষ ও মহিলাদের জন্য পরচুলা ব্যবহার করা। পাকা চুল তুলে ফেলা, সাদা চুল কালো করা, কালো কলপ ব্যবহার করা, মাথার কিয়দংশ নেড়ে করা।
কাপড়, দেয়াল, কাগজ ইত্যাদিতে কোন প্রাণীর ছবি তৈরী করা, এই ছবি তৈরী যে কোন ধরনের হোক না কেন, যেমনঃ আঁকানো, প্রিন্ট করা, খোদাই করা নকশা করা বা ফ্রেমে ঢেলে তৈরী করা ইত্যাদি। তবে যদি ছবি আঁকানো প্রয়োজন হয় তাহলে গাছ বৃক্ষ এবং যে কোন জড় পদার্থের (যাদের জীবন নেই) ছবি আঁকানো যেতে পারে।
রেশমের বিছানা, বাঘের চামড়া এবং এমন প্রত্যেক জিনিস ব্যবহার করা যাতে অহংকার প্রকাশ পায়। অনুরূপ ভাবে দেয়ালে পর্দা ঝুলানো।
📄 জিহ্বা সম্পর্কিত নিষেধাবলী
মিথ্যে সাক্ষ্য দেয়া, সতী সাধবী নারীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া। কোন নির্দোষ ব্যক্তিকে মিথ্যে দোষী সাব্যস্ত করা, যে কোন ধরনের অপবাদ রটানো।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে কারো দোষ বর্ণনা করা, খারাপ নামে ডাকা, গীবত ও নিন্দা চর্চা করা। কোন মুসলমানকে বিদ্রুপ করা, বংশ গৌরব দেখানো, বংশ মর্যাদার প্রতি আঘাত করা, গাল মন্দ করা, অশ্লীল ও ঘৃণ্য আচরণ করা, অনুরূপ ভাবে অত্যাচারের শীকার না হয়েও মন্দ বিষয় প্রকাশ করা। মিথ্যে বলা আর সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যে হচ্ছে কাল্পনিক স্বপ্ন বলা। যেমন: ফজিলত, বিশেষ মর্যাদা বা অর্থ উপার্জনের অভিপ্রায়ে মিথ্যে ও অলীক ঘটনার বর্ণনা দেয়া অথবা স্বপ্নের কথা বলে ঐ ব্যক্তিকে ভীতি প্রদর্শন করা, যার সঙ্গে শত্রুতা রয়েছে আর এ ধরনের কাজের শাস্তি হচ্ছে এই যে ঐ ব্যক্তিকে কিয়ামত দিবসে কঠিন ও অসম্ভব কাজের দায়িত্ব দেয়া হবে, যেমনঃ দুটি চুলের একটিকে আরেকটির সঙ্গে গিঁট দেয়া। নিজেকে পুত পবিত্র মনে করা, কানা ঘুষা করা, তৃতীয় ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে দুজনের মধ্যে কোন কথা বলা; কেননা তাতে সে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যায়।
অনুরূপ ভাবে অন্যায় ও সীমালংঘন মুলক তৎপরতার ব্যাপারে গোপন শলা পরমর্শ করা, তেমনি ভাবে মোমিন মুসলমানকে অভিশাঁপ করা এবং এমন ব্যক্তিকে লানত করা যে এর উপযুক্ত নয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার আওয়াজের চেয়ে নিজের আওয়াজ বুলুন্দ করা, এ পর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস পাঠকারীর আওয়াজের চেয়ে কারো কণ্ঠস্বর বেড়ে যাওয়া এবং তাঁর (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরের পার্শ্বে উচ্চ স্বরে কথা বলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আওয়াজের চেয়ে ব্যক্তির আওয়াজ বাড়িয়ে দেয়ার শামিল।
মৃত ব্যক্তিকে গালি দেয়া, মোরগকে গালি দেয়া; কেননা মোরগ নামাজের জন্য ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়, বাতাসকে গালি দেয়া, যেহেতু বাতাস আল্লাহর আদেশে চলে, জ্বরকে গালি দেয়া; কেননা উহা গুনা মাপের কারন হয়, শয়তানকে গালি দেয়া, যেহেতু সে নিজকে বড় মনে করে, বরং এক্ষেত্রে শয়তানের অনিষ্টতা থেকে আল্লাহ্র নিকট সাহায্য চাওয়াই লাভ জনক।
মৃত্যু কামনা করে দোয়া করা অথবা কোন বিপদের মুখে মৃত্যু আশা করা, অনুরুপভাবে নিজের আত্মা, সন্তান-সন্ততি চাকর- চাকরানী ও মাল-মালের উপর বদদোয়া করা।
আঙ্গুরকে অতিথি পরায়নের অর্থে ব্যবহার করা, কেননা জাহেলী যুগের লোকেরা বিশ্বাস করত যে, মাদক দ্রব্য অতিথি পরায়ন হতে সাহায্য করে।
কোন ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে এ কথা বলা যে, "আমার আত্মা খারাপ হয়ে গেছে” এবং এ রকম কথা বলা যে, "আমি অমুক আয়াত ভূলে গেছি” বরং বলা উচিৎ যে, আমাকে ভুলানো হয়েছে, এ কথা বলা সমীচীন নয় যে, হে আল্লাহ তুমি যদি ইচ্ছা কর তাহলে আমাকে মাফ কর, বরং আল্লাহর নিকট দোয়া করা ও কোন কিছু চাওয়ার সময় দৃঢ় প্রত্যয় পোষন করা। "সায়্যেদ” বা নেতা শব্দটিকে মোনাফিকের অর্থে ব্যবহার করা, কারো খারাপ কামনা করা, বিশেষ করে স্বামী তার স্ত্রীর জন্য খারাপ কামনা করা। যেমন "আল্লাহ তোমাকে কুৎসিত করুন" বলে দোয়া করা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উদ্দেশ্যে 'রায়িনা'(১) (যার অর্থ দাঁড়ায় হে আমাদের রাখাল) বলা, সালাম দেবার পূর্বেই প্রশ্ন করা এবং একে অপরের প্রশংসা করা।
টিকাঃ
(১) এই শব্দটি মোনাফিক ও ইয়াহুদীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হেয় প্রতিপন্ন করে বলত।
📄 খানা পিনার আদব সম্পর্কিত নিষেধাবলী
একত্রে খেতে বসলে অন্যদের সম্মুখ থেকে (হাত বাড়িয়ে) খাওয়া। খাবারের মাঝ খান থেকে খাওয়া বরং নিয়ম হচ্ছে খাবারের পাত্রের এক পার্শ্ব থেকে খাওয়া; কেননা খাবারের মাঝখানেই বরকত অবর্তীণ হয়। অনুরূপ ভাবে হাতের লোকমা পড়ে গেলে তা উঠিয়ে না খাওয়া বরং উচিৎ হলো পড়ে যাওয়া খাবারকে পরিস্কার করে পুনরায় খাওয়া, লোকমাটিকে শয়তানের জন্য রেখে না দেয়া।
স্বর্ণ ও রুপার তৈরী পাত্রে পানি পান করা, দাঁড়িয়ে পান করা। ভাঙ্গা পাত্রের ভাঙ্গা স্থলে মুখ লাগিয়ে পান করা; কেননা তাতে পান করতে কষ্ট হয়। সরাসরি পাত্রের মুখের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে পান করা এবং পানীয় পাত্রের ভিতরে নিঃশ্বাস ফেলা ও এক দমে পানি পান করা বরং তিন বারে পান করা; কেননা ইহা সবচেয়ে তৃপ্তি দায়ক ও আরাম দায়ক পন্থা।
খাদ্য ও পাণীয় পাত্রে ফুঁ'দেয়া। বাম হাতে খাওয়া ও পান করা, পেট ছেড়ে দিয়ে খেতে বসা। কোন ব্যক্তি দুটি খেজুর একত্রে খেয়ে ফেলা। তবে তার খাবারের সঙ্গী যদি তাকে অনুমতি দেয় তাহলে এভাবে খেতে দোষ নেই; যেহেতু এ ধরনের জোড়ায় জোড়ায় খাওয়ার মধ্যে তার পেটুক হওয়া প্রমাণ করে এবং তার সঙ্গীর জন্য বিরক্তিকর হয়।
আহলে কিতাবদের (ইয়াহুদী ও খৃষ্ঠানগণ) ব্যবহৃত তৈজস পত্র ব্যবহার করা, তবে হ্যাঁ এগুলো ছাড়া যদি অন্য কোন পাত্র না থাকে তাহলে ভাল করে ধুয়ে নিয়ে সেগুলোতে খেতে পারে। অনুরূপ ভাবে যে সব খাবার অনুষ্ঠানে মদের ব্যবস্থা থাকে সেখানে শরীক হওয়া।