📄 ভূমিকা
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি উভয় জাহানের রব, দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর বংশধর, সাহাবায়ে কেরামদের সকলের উপর।
ইতিপূর্বে “যে সব হারাম কাজগুলোকে মানুষ তুচ্ছজ্ঞান করে” নামক একটি বই লেখা হয়েছে। সেখানে শরিয়ত বিরোধী বিভিন্ন কার্যকলাপের একটি তালিকা দেখা হয়েছে। যার মধ্যে শির্ক, কবিরাহ ও ছগীরাহ গুনাহগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং সেই সঙ্গে কুরআন সুন্নাহ্ থেকে প্রমানাদিও পেশ করা হয়েছে।
এ ছাড়াও উক্ত বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এবং বাস্তব অবস্থার আলোকে মানুষেরা কিভাবে এই সকল গুনাহ ও পাপের মধ্যে নিমজ্জিত হয় তার বিভিন্ন প্রকার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।
শরীয়তে অসংখ্য নিষিদ্ধ কাজ রয়েছে, যেগুলোকে আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারাম ঘোষনা করেছেন আর এ সব নিষিদ্ধ ও হারাম কাজের সাথে পরিচিত হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য; যাতে করে সে আল্লাহ্ তায়া'লার ক্রোধ, শাস্তি এবং ইহকালীন ও পরকালীন অনিষ্টতা হতে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। তাই আমি কতকগুলো নিষিদ্ধ কাজ একত্রে সন্নিবেশিত করা সমীচীন মনে করেছি।
তাছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বাণী “দ্বীন হচ্ছে উপদেশ” আমাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমি আশা পোষণ করি যে আমার এক্ষুদ্র প্রচেষ্টা দ্বারা আমার ও সকল মুসলমান ভাইদের উপকার হবে। আমি এখানে ঐ হারাম কাজগুলোকে একত্রিত করেছি যেগুলো কুরআন ও ছহীহ হাদীস হতে গৃহীত, যে হাদীসগুলোকে ওলামাগণ(১) ছহীহ হিসাবে গন্য করেছেন এবং আলোচনার বিষয় বস্তুগুলোকে অনেকটা ফেক্হ বা আইন শাস্ত্রের পুস্তকের কায়দায় সুবিন্যস্ত করেছি। কোন বিষয়ে প্রমানের জন্য কুরআন হাদীসের "প্রামাণ্য উদ্ধৃতি” পূর্ণভাবে লিপিবদ্ধ করার পরিবর্তে শুধু মাত্র দলিল বা প্রমানের জন্য যে অংশটুকু প্রয়োজন তা পেশ করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঐ সমস্ত উদ্ধৃতি গুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। একই অর্থবোধক কোন শব্দ বা ঐ ধাতু থেকে নির্গত সমঅর্থবোধক শব্দ রয়েছে, অথবা সরাসরি "নিষেধ" মূলক শব্দ রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে জটিল শব্দের ব্যাখ্যাসহ নিষেধ হবার কারণ উল্লেখ করারও চেষ্টা করা হয়েছে।
পরিশেষে আল্লাহ্র কাছে এই মুনাজাত করছি তিনি যেন আমাদেরকে সকল প্রকার পাপ ও যাবতীয় অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখেন এবং আমাদের সকলের প্রতি মার্জনা প্রদর্শন করেন। সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যিনি উভয় জাহানের প্রতিপালক।
টিকাঃ
(১) অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লামা মুহাঃ নাসির উদ্দীন আলবানী যে হাদীস গুলোকে ছহীহ বলেছেন সেগুলোর উপর নির্ভর করা হয়েছে।
📄 কুরআন হাদীসে বর্ণিত কতকগুলো নিষিদ্ধ কাজ
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে অনেক ব্যাপারে নিষেধ করেছেন যেগুলো থেকে দূরে থাকার উপর নির্ভর করছে অন্যায়, অবিচার ও সকল প্রকার অনিষ্টতার মোকাবেলায় সফলতা অর্জন ও কল্যাণ সাধন। ঐ সকল নিষিদ্ধ কাজ সমূহের মধ্যে কতকগুলো রয়েছে মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। কিন্তু প্রতিটি মুসলমানের উচিৎ হলো সকল প্রকার নিষিদ্ধ কাজ থেকেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে যে সব বিষয়ে নিষেধ করেছি সেগুলো বর্জন কর”। তাই নিষ্ঠাবান মুসলমানগণ সকল প্রকার নিষেধাবলীকেই- হারাম হোক বা মাকরুহ - সচেতন ভাবে পরিহার করে চলে এবং কখনো দুর্বল ঈমান-দারদের মতো আচরণ করে না যারা অপছন্দনীয় কাজ করতে এতটুকু দ্বিধা করে না; কেননা তারা জানে যে মাকরুহ কাজ গুলোকে সহজ ও উদার ভাবে দেখলে তা এক সময় হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারন হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই সব মাকরুহ বা অপছন্দনীয় কাজগুলো হারাম কাজগুলোর জন্য একটি সংরক্ষিত এলাকার মতো, যদি কেহ এখানে সাহসিকতার সাথে বিচরণ করে তাহলে তার আল্লাহ্ কর্তৃক হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার যথেষ্ঠ আশংকা রয়েছে। তদুপরি কোন মুসলমান যদি এই মাকরুহ কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরিহার করে চলে তাহলে সে ছওয়াবেরও ভাগী হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মাকরুহ কাজ এবং হারাম কাজের মধ্যে পার্থক্য সুচিত হয় না। তাছাড়াও উভয়ের মাঝে সূক্ষ পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানেরও আবশ্যক। উপরোন্তু এখানে যে সব নিষিদ্ধ কাজ সমূহ নিয়ে আলোচনা করা হবে তার অধিকাংশই হারামের অন্তর্ভূক্ত, মাকরুহের নয়। সুহৃদ পাঠকবৃন্দ! আপনাদের সমীপে কতকগুলো শরীয়ত নিষিদ্ধ কাজসমূহ তুলে ধরা হলো:
📄 আকীদাহ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ কাজ সমূহ
সাধারন ভাবে ছোট, বড়, স্পষ্ট ও প্রচ্ছন্ন সকল প্রকার শির্ক গুনাহসমূহ, গনক ও জোতিষীদের নিকট যাওয়া এবং তাদের কথা বিশ্বাস করা, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু জবাই করা, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সম্পর্কে অজ্ঞতা বশতঃ কোন কথা বলা, তাবীজ লটকানো, যেমন: খেরজ - এক ধরনের মালা যা মানুষের নজর থেকে বাঁচার জন্য লটকানো হয় এবং তেওয়ালাহ - যাদুর সাহায্যে দু'ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সম্পর্কচ্ছেদের মাধ্যম - ইত্যাদি এর অন্তর্ভূক্ত। সাধারনভাবে সকল প্রকার যাদুটোনা, ভাগ্য গণনা, মানব জীবন ও পৃথিবীর বিচিত্র ঘটনা প্রবাহের উপর নক্ষত্র, তারকারাজী ও বিভিন্ন গ্রহ উপগ্রহের প্রভাব আছে বলে বিশ্বাস করা এবং কোন কোন বস্তু সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করা যে এতে কল্যান রয়েছে, অথচ সৃষ্টিকর্তা তাকে এ কাজের জন্য সৃষ্টি করেননি। আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষনা না করে আল্লাহর স্বত্তা নিয়ে গবেষনা করা। আল্লাহ তায়া'লার প্রতি খারাপ ধারনা নিয়ে কোন মুসলমানের মৃত্যুবরণ করা ঠিক নয় বরং তাঁর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করতঃ মৃত্যুবরণ করা।
কোন দ্বীনদার ব্যক্তিকে দোযখী বলা, কোন মুসলমানকে শরীয়তের প্রমাণ ব্যতীত কাফের ফতোয়া দেয়া, আল্লাহর নাম করে পার্থিব কোন বিষয় চাওয়া, আল্লাহর ওয়াস্তে কোন কিছু চাওয়া হলে তা নিষেধ করা, বরং আল্লাহ তায়া'লার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তাকে কিছু না কিছু দিয়ে বিদায় করা যদি তা গুনাহের কারন না হয়।
যুগ বা কালকে গালি দেয়া; কেননা আল্লাহই তো যুগের নিয়ন্ত্রন কর্তা (তাই যূগকে গালি দিলে আল্লাহকে গালি দেয়া হয়)। কোন কাজকে অশুভ ও অলক্ষুনে মনে করা। কাফের, মুশরিক ও অমুসলিমদের দেশ (বিনা প্রয়োজনে) ভ্রমন করা এবং তাদের সঙ্গে সহ অবস্থান করা, মুসলমানদেরকে বাদ দিয়ে ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও আল্লাহ্র দুশমনদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা, যার ফলে তারা শলাপরামর্শ ও ভালবাসার দাবীতে মুসলমানদের নৈকট্য লাভ করে।
কারো প্রতি অনুগ্রহ করে তার খোঁটা দেয়া, দুনিয়ায় খ্যাতি অর্জন ও লোক দেখানোর নিয়তের মাধ্যমে সৎ কাজ বিনষ্ট করা।
তিনটি মসজিদ ব্যতীত ইবাদাতের উদ্দেশ্যে কোন স্থান ভ্রমন করা। মসজিদ গুলো হচ্ছেঃ- পবিত্র কাবাঘর, মদীনার মসজীদে নববী এবং মসজিদে আকসা, (বায়তুল মাকদাস)। তাছাড়াও কবরের উপর ইমারত নির্মান করা এবং কবর গুলোকে মসজিদ বানানো।
সাহবাদেরকে গালি দেয়া এবং তাদের মাঝে যে সব ফেতনা সৃষ্টি হয়েছিল সে সব ব্যাপারে অনর্থক তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে পড়া। ভাগ্যের ব্যাপারে গভীর আলোচনায় মগ্ন হওয়া, অজ্ঞতা বশতঃ কুরআন নিয়ে তর্ক বিতর্কে লিপ্ত হওয়া, যারা কুরআন সম্পর্কে অন্যায় ভাবে তর্কে লিপ্ত হয় তাদের সঙ্গে উঠা-বসা করা, কাদারিয়াহ(১) এবং এই জাতীয় কোন বেদয়াত পন্থী রোগীদের পরিচর্যা করা এবং তাদের জানাযা নামাজে শরীক হওয়া।
কাফেরদের ইলাহ্ গুলোকে গালি দেয়া, যদি তা আল্লাহ্ তায়ালাকে গালি দেয়ার কারন হয়। নানা প্রকার মত ও পথের (ইসলাম ব্যতিত) অনুসরন করা এবং দ্বীনে হকের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করা। আল্লাহ্র আয়াত ও নিদর্শন সমূহকে ঠাট্টা বিদ্রুপের বিষয় হিসাবে গ্রহন করা। আল্লাহ্পাক যা কিছু হারাম করেছেন তাকে হালাল মনে করা, অথবা যা কিছু হালাল করেছেন তাকে হারাম মনে করা। আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে সেজদা বা মাথা নীচু করা। মোনাফেক বা ফাসেক শ্রেণীর লোকদের সঙ্গে বন্ধুত্বের উদ্দেশ্যে উঠা বসা করা এবং হক পন্থী ইসলামী জামাতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।
সাধারন ভাবে ইহুদী, খৃষ্টান, অগ্নিপূজক ও কাফেরদের অনুসরণ করা, কাফেরদেরকে আগে সালাম দেয়া, আহলে কেতাবগণ তাদের গ্রন্থসমূহ থেকে এমন কোন বিষয়ে খবর দিলে যার সত্য হওয়া না হওয়া সম্পর্কে আমাদের জানা নেই তা বিশ্বাস করা অথবা মিথ্যা মনে করা এবং শরীয়তের কোন ব্যাপারে আহলে কেতাবদের নিকট ফতোয়া চাওয়া (জ্ঞান ও ফায়দা লাভের উদ্দেশ্যে)। আমানতদারী, বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি এবং তাগুতদের নামে শপথ করা, আল্লাহ্র ইচ্ছা ও তোমার ইচ্ছা এ ধরনের উক্তি করা, কোন ভৃত্য বা চাকর তার মনিবকে এই বলে সম্বোধন জানানো যে, হে আমার রব বরং তার বলা উচিৎ যে, হে আমার মনিব, দায়িত্বশীল। এমনি ভাবে মনিবেরও তার চাকর ও চাকরানীকে 'হে আমার বান্দা বা বান্দী বলা, বরং সে তাকে হে যুবক, যুবতী বা বৎস বলে সম্বোধন করবে। যুগ সম্পর্কে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর লা'নত অথবা তার ক্রোধ বা দোযখের আগুন নিয়ে পরস্পরকে লা'নত করা।
টিকাঃ
(১) যারা ভাগ্যকে অস্বীকার করে।
📄 পবিত্রতার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বিষয় সমূহ
যেমনঃ বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করা, রাস্তার উপর, ছায়া বিশিষ্ট স্থানে যেখানে মানুষ ছায়া গ্রহন করে এবং পানির উৎস স্থলে পায়খানা করা, প্রস্রাব পায়খানার সময় কেবলার দিকে মুখ করা বা পিঠ দেয়া, এ ক্ষেত্রে কোন কোন আলেমগণ ঘরে বা চার দেয়ালের ভিতর কেবলামুখী হয়ে বা কেবলার দিকে পিঠ দিয়ে প্রস্রাব-পায়খানা করাকে নিষেধের আওতায় মনে করেন না। ডান হাত দিয়ে গুপ্তাংগ মুছে নেয়া ও শৌচ কার্য করা। হাড় হাড্ডি ও গোবরের সাহায্যে কুলুখ করা; কেননা উহা আমাদের জ্বিন ভাইদের খাদ্য, আর গোবর হচ্ছে জ্বিনদের আওতাভূক্ত চতুষ্পদ জন্তুর অন্ন। প্রস্রাব করা অবস্থায় কোন পুরুষ ডান হাত দিয়ে তার লিংগ ধরে রাখা, প্রস্রাব পায়খানারত কোন ব্যক্তিকে সালাম দেয়া। ঘুম থেকে জেগে উঠা মাত্র হাত ধৌত না করেই কোন পাত্রে প্রবেশ করানো।