📘 সংশয়বাদী > 📄 ‘যৌন শিক্ষা’র উদ্দেশ্য

📄 ‘যৌন শিক্ষা’র উদ্দেশ্য


যৌন শিক্ষা ক্লাসের শিক্ষার্থীদের বয়স দিন দিন কমছে। আমি যখন স্কুলে ছিলাম তখন যৌন শিক্ষা শুরু হতো ক্লাস টেন থেকে। এখন শুরু হয় হাইস্কুল থেকে, অনেক ক্ষেত্রে প্রাইমারি স্কুলেও। শিশুর মানসিকতা এবং গঠনের ওপর এ ধরনের ক্লাসের প্রভাব কেমন হতে পারে? বৃহত্তর সমাজের ওপর এর কেমন প্রভাব পড়তে পারে?
মুসলিম সংস্কৃতিতে বয়ঃসন্ধির আগে বাবা-মা সন্তানের সাথে যৌনতার ব্যাপারে কথা বলে না। আর যখন বলে তখনো সেটা বলা হয় ইঙ্গিতে। কারণ, মানুষের কৌতূহলের ক্ষমতা অনেক। শিশুকে যখন এ ব্যাপারগুলো নিয়ে বলা হবে তখন সে কৌতূহলী হবে। তার নিজে নিজে অনুসন্ধানের সম্ভাবনা বাড়বে। আর আধুনিক মনোবিজ্ঞান আমাদের যতই 'সেক্স পসিটিভ' হবার কথা বলুক না কেন, এর ফলাফল নেতিবাচক। যৌন শিক্ষা ক্লাসে কী পড়ানো হচ্ছে, তাও খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলের শিশুদের এখন সমকামিতা, সেক্সুয়াল ফ্লুয়িডিটি, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন, জেন্ডার আইডেন্টিটির মতো বিষয়গুলো শেখানো হচ্ছে। শিশুদের প্রশ্ন করা হচ্ছে, তুমি ছেলেদের পছন্দ করো নাকি মেয়েদের? নাকি ছেলে-মেয়ে দুটোকেই? নাকি কোনোটাকেই না? তুমি কি নিজেকে ছেলে মনে করো নাকি মেয়ে? নাকি কোনোটাই না?
শিশুদের ওপর এবং আমাদের ভবিষ্যতের ওপর এ ধরনের শিক্ষা এবং চিন্তা-ভাবনার প্রভাব কেমন হবে তা বোঝার জন্য জ্যোতিষী হতে হয় না।
তবে সবচেয়ে বিচিত্র জিনিস হলো যৌন শিক্ষার পেছনের লিবারেল দর্শন। লিবারেল দর্শন অনুযায়ী-
যৌনতা আমাদের জীবনের একটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক অংশ। তাই শিশুরা যৌনতা নিয়ে জানবে এটাই স্বাভাবিক। মানবদেহ নিয়ে জানতে লজ্জার কী আছে? শিশুদের এসব না জানানোর কারণ কী? তারা তো এমনিতেই টিভি থেকে কোনো-না-কোনো সময় এগুলো জানবে।
কথাগুলোর সাথে ইবলিসের কথাবার্তার মিল আছে। আদম আর হাওয়া (আলাইহিমুস সালাম)-কে প্রতারিত করে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাইয়েছিল ইবলিস। এই ফল খাবার পর তাঁদের লজ্জাস্থান তাঁদের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যায়।
শিশুরা কথা বলতে শেখামাত্র তাদের যৌনতা শেখানো—একে ইতিবাচক, স্বাস্থ্যকর, প্রগতিশীল কিছু একটা হিসেবে উপস্থাপন করার এই পুরো ব্যাপারটা ইবলিসের বেশ পছন্দ হবার কথা।
বাস্তবতা হলো যৌনতা মূলত লজ্জাজনক। এটা শুধু তখনই ইতিবাচক, স্বাস্থ্যকর এবং গ্রহণযোগ্য যখন এটা আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী সংঘটিত হয়। কিন্তু শিশুদের শেখানো হচ্ছে উল্টোটা। সমাজে যে ধর্মকে অপ্রাসঙ্গিক এবং সেকেলে মনে করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, এতে অবাক হবার কিছু নেই। কাউকে যদি স্কুলে শেখানো হয়, যৌনতা সব সময় স্বাস্থ্যকর, তাহলে যে জিনিস যৌনতার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় তা নিঃসন্দেহে অবাস্তব, অযৌক্তিক এবং খারাপ বলেই মনে হবে।

টিকাঃ

📘 সংশয়বাদী > 📄 ইখতিলাত

📄 ইখতিলাত


নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান নিয়ে আপাতভাবে দ্বীনের জ্ঞানসম্পন্ন মুসলিমদেরও অভিযোগ-অনুযোগ করতে দেখা দুঃখজনক। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা অর্থাৎ ইখতিলাত থেকে বিরত থাকা ইসলামের প্রাথমিক একটি শিক্ষা। নারী ও পুরুষের মেলামেশা থেকে শুরু হয় ফ্লার্ট করা। ফ্লার্ট করা থেকে ব্যাপারটা গড়ায় একে অপরেরকে স্পর্শ করার দিকে। আর তারপর ব্যাপারটা যায় যিনায়। যিনা বিয়ে আর পরিবারকে ধ্বংস করে। আর পরিবারের ধ্বংস মানবতার পতন ঢেকে আনে।
এটা কি অতিরঞ্জন? আমি কি বাড়িয়ে বলছি? একেবারেই না। যার চোখ আছে, বোধবুদ্ধি আছে, যে নিজের সাথে সৎ-সে জানে যে নারী-পুরুষের মেলামেশা শুধু এসব পরিণতি ডেকে আনে না; বরং মানুষকে এর চেয়েও খারাপ এক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়-জাহান্নাম।
লিবারেল-ফেমিনিস্টরা এসব কথা মানবে না, আমি জানি। কিন্তু আজ এমন অনেক লোক আছে, যারা বাহ্যিকভাবে আলিমের পোশাক পরলেও ভেতরে ভেতরে লিবারেল-ফেমিনিস্টদের মতো ধ্যানধারণা পোষণ করে। পাবলিক স্পেইসে নারী ও পুরুষের পৃথক অবস্থানের যে ইসলামী বিধান, তারা সেটার বিরোধিতা করে। এমন-সব নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ কথাবার্তা বলে, যেগুলো তাদের অজ্ঞতা এবং চিন্তার সংকীর্ণতা প্রকাশ করে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার পরিণতির ব্যাপারে আমার বক্তব্য নিয়ে যদি আপত্তি থাকে তাহলে দয়া করে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন-
• বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নামে নারী-পুরুষের যে ধরনের অবাধ মেলামেশা আজ আমরা মুসলিম এবং অমুসলিম সমাজে দেখি, সেখানে কি ফ্লার্ট করা হয় নাকি হয় না?
• এ ধরনের মেলামেশা কি মানুষকে বিপরীত লিঙ্গের দিকে তাকানো এবং স্পর্শ করার মতো হারামের দিকে নিয়ে যায় না?
• সমাজে যিনা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে গেলে বিয়ে কি কঠিন হয়ে যায় না?
• যিনা কি বিয়েকে ধ্বংস করে না?
• পশ্চিমা বিশ্বে ৫০% শিশুর জন্ম হয় ডিভোর্সী, অবিবাহিত কিংবা সেপারেটেড মায়ের গর্ভে। এ ধরনের শিশুদের বেকারত্ব, ডিপ্রেশনে ভোগা, অপরাধ কিংবা মাদকে জড়ানোর হার অনেক বেশি। এগুলোর জন্য কি যিনার ব্যাপক প্রচলন দায়ী না?
• ৫০% এর দম্পতির ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে। ২৫% এর বেশি বিবাহিত পুরুষ, এবং ১৫% নারী পরকীয়া করার কথা স্বীকার করছে। অ্যাশলিম্যাডিসন এর মতো সাইটগুলো কোটি কোটি নিবন্ধিত সদস্যদের ব্যভিচারের সঙ্গী বেছে নিতে সাহায্য করছে। বিয়ে আর পরিবার কি পশ্চিমা সমাজে আজ ধ্বংসের মুখোমুখি না?
এত কিছু জানার পরও একজন মুসলিম কীভাবে এ ব্যাপারগুলো নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে তা আমার বোধগম্য না। আমরা জানি কিয়ামতের একটি লক্ষণ হলো যিনা বেড়ে যাওয়া। কিয়ামতের আগে রাস্তায় প্রকাশ্যে যিনা করা হবে। আজ আমরা চারপাশে কী দেখছি? তারপরও কীভাবে মুসলিম হিসেবে নিশ্চিন্ত থাকা যায়? আধুনিক সমাজে যিনার এই বৃদ্ধির জন্য কি নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা দায়ী না? যদি আপনি মনে করেন অবাধ মেলামেশার কোনো ভূমিকা এখানে নেই তাহলে দয়া করে ব্যাখ্যা করুন, কেন আমরা এমন অবস্থা দেখছি?
এ বাস্তবতাগুলোকে উপেক্ষা করে অনেকে কেবল বলে, 'মুসলিমদের তাকওয়া থাকা দরকার।' দেখুন, নারী-পুরুষের মেলামেশার সুনির্দিষ্ট নিয়ম এবং সীমারেখা শরীয়াহতে ঠিক করা আছে। এই সীমারেখাগুলো মেনে চলাই হলো তাকওয়ার দাবি। তাকওয়ার কথা বলে এগুলো উঠিয়ে দেয়ার কথা কীভাবে বলা যায়? আপনার যত তাকওয়াই থাক না কেন, বিপরীত লিঙ্গের কারও সাথে একাকী অবস্থান করা হারাম। এটা নারী ও পুরুষ, উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। শুধু মজা করা, কিংবা সোশ্যালাইযিং এর জন্য বিপরীত লিঙ্গের কারও সাথে মেলামেশা করা জায়েজ না। নারীপুরুষের যে ধরনের মেলামেশাকে পশ্চিমা লিবারেল সমাজে স্বাভাবিক মনে করা হয় সেটা ইসলামে জায়েজ না।
মসজিদে নারী ও পুরুষের সালাত আদায়ের জায়গার মধ্যে পার্টিশন থাকা নিয়েও অনেকে আপত্তি তোলে। তারা জানে পার্টিশানকে হারাম বা বিদআত বলা সম্ভব না। তাই তারা বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময় মাসজিদে নববীতে নারী ও পুরুষের সালাতের স্থানের মধ্যে কোনো পার্টিশন ছিল না। এটা তারা খুব জোর দিয়ে বলে। কিন্তু সাহাবিয়্যাতদের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুন্না) পোশাক কেমন ছিল, মসজিদে যাবার সময় তাঁরা কীভাবে যেতেন, মসজিদে কোথায় কীভাবে দাঁড়াতেন, কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁদের মাসজিদে যেতে মানা করা হয়েছিল-সেই হাদীসগুলো নিয়ে তারা কথা বলে না। সেগুলো তারা এড়িয়ে যায়।
নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ হবার শর'ঈ বিধান নিয়ে মুসলিমদের হীনম্মন্যতায় ভোগার কোনো কারণ নেই। নারী-পুরুষের মেলামেশাকে সীমিত করা শুধু তাকওয়া এবং আল্লাহর বিধান সম্পর্কে সচেতন হবার চিহ্ন না; বরং সভ্য এবং পরিশীলিত হবার বৈশিষ্ট্য হলো অবিবাহিত নারী ও পুরুষ অবাধে একে অপরের সাথে মেলামেশা করবে না। ফ্লার্ট করবে না, পশুর মতো একে অপরের সাথে গড়াগড়ি করবে না।
বি.দ্র.-ইমাম আল-গাযযালি বলেছেন- 'অন্তরের প্রথম ভাবনাকে দূর না করলে কামনা তৈরি হবে। কামনা থেকে তৈরি হবে আকাঙ্ক্ষা, আকাঙ্ক্ষা থেকে নিয়্যাত আর নিয়ত থেকে কাজ। আর সেই কাজ বান্দাকে ধ্বংস করবে, আল্লাহর ক্রোধের উদ্রেক করবে। তাই মন্দকে শেকড়েই কেটে ফেলতে হবে। যখন অন্তরে ভাবনা আসবে, তখনই থামিয়ে দিতে হবে। কারণ, বাকি সবকিছুর উৎপত্তি এই ভাবনা থেকেই'।[৯৮]

টিকাঃ
[৯৮] আল-গাযযালি

📘 সংশয়বাদী > 📄 Sex sells...

📄 Sex sells...


আজকের মিডিয়া যৌনতাকেন্দ্রিক কেন?
কারণ, যৌনতার মার্কেট আছে। জনগণ যৌনতা চায়। তারা যৌনতা দেখতে চায়, ভোগ করতে চায়। চাহিদা আছে, তাই ইন্ডাস্ট্রিগুলো সেই চাহিদার যোগান দিচ্ছে। ব্যস। তবে জনগণের মধ্যে এ চাহিদা তৈরি করছে এই একই ইন্ডাস্ট্রিগুলো। মানুষের মাথার ভেতরে তারা ক্রমাগত বিষ ঢোকাচ্ছে। একসময় মানুষ বিষে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
ঠিক একই কারণে আজ পৃথিবীজুড়ে মাদকাসক্তি বাড়ছে। কোনো স্বাভাবিক মানুষ বুকের ভেতরে ধোঁয়া ঢোকাতে চায় না। কোনো স্বাভাবিক মানুষ ঘুম থেকে উঠে নিজের শিরার মধ্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল প্রবেশ করাতে চায় না। স্বাভাবিক অবস্থায় কেউ ভাত, ফল-সবজি পচানো, কড়া গন্ধের, গা গোলানো তরল গিলতে চায় না। এগুলোর চাহিদা তৈরি করতে হয়। মানুষের মধ্যে এসব চাহিদা তৈরির জন্য এই ইন্ডাস্ট্রিগুলো প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে। বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কারিগরির মাধ্যমে মানুষকে ভাবতে শেখায় যে চাহিদাগুলো সহজাতভাবে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, আর তাই এগুলো পূরণ করতে হবে।
মানুষের প্রাকৃতিক অধিকার আর প্রাকৃতিক চাহিদা অনুযায়ী কাজ করাই সবচেয়ে নৈতিক-লিবারেল মানবাধিকার এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই 'অধিকার' আর 'চাহিদা'-গুলো আসলে কতটা প্রাকৃতিক, সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। আর কোনো কিছু যদি প্রাকৃতিক হয়ও, তাহলে সেটা অনুযায়ী কাজ করতে আমরা নৈতিকভাবে কেন বাধ্য হব সেটাও প্রশ্ন।

টিকাঃ

📘 সংশয়বাদী > 📄 আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কেন যৌনতা ফেরি করে?

📄 আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কেন যৌনতা ফেরি করে?


মানুষ অশ্লীলতায় লিপ্ত হলে লাভ কার? যে অশ্লীলতা করছে তার কোনো লাভ নেই। সে নিজেকে ছোট করছে, অপমানিত করছে। এতে লাভ আছে শয়তানের। শয়তান চায় মানুষ তার পদাঙ্ক অনুসরণ করুক, যাতে সে মানুষকে তার সাথে জাহান্নামে নিয়ে যেতে পারে।
আর কার লাভ?
অশ্লীলতা আর অবাধ যৌনতা ছড়িয়ে পড়লে সমাজে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। এর মধ্যে এক নম্বর হলো ভোগবাদ। কেউ যখন নিজের সব শারীরিক কামনাবাসনা, সব ফ্যান্টাসি চরিতার্থ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে কোনো ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ আর কাজ করে না। এ ধরনের মানুষ খুব ভালো ভোক্তা আর ক্রেতা হয়। যতক্ষণ পকেটে টাকা থাকে ততক্ষণ যা ইচ্ছে তা-ই সে কেনে। যা ইচ্ছে তা-ই করে। এ ধরনের মানুষ সব সময় শরীরের তৃপ্তি আর আরাম খোঁজে। তার মধ্যে কাজ করে চাহিদা উদিত হওয়ামাত্র তা পূর্ণ করার তীব্র তাড়না। কারণ, তাৎক্ষণিকভাবে কামনাবাসনা তৃপ্ত করায় সে নিজেকে অভ্যস্ত করে ফেলেছে। এ ধরনের মানুষ আসলে আদর্শ ভোক্তা। কাজেই অশ্লীলতা এবং অবাধ যৌনতার প্রভাবে ভোগবাদ বাড়ে।
ভোগবাদ বাড়লে কাদের লাভ? বিভিন্ন কর্পোরেশান আর সরকারের লাভ, যারা এই নিরন্তর ভোগ থেকে মুনাফা অর্জন করে। আজ আমরা চারপাশে তীব্র বস্তুবাদী এবং ভোগবাদী একটা সমাজ কেন দেখি? কারণ নিজের কামনাবাসনাকে যে নিয়ন্ত্রণ করে, যে নিজেকে সংযত করে, সে ভালো ভোক্তা না। কোনো শহরের অধিবাসীদের মধ্যে মদের আসক্তি বাড়লে যেমন মদবিক্রেতার লাভ, তেমনি মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে কামনাবাসনা পূরণে অভ্যস্ত করে তুলতে পারায় কর্পোরেশানগুলোর লাভ।
তা ছাড়া এভাবে একটা আত্মকেন্দ্রিক সমাজ গড়ে ওঠে। এমন সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। যে সমাজের মানুষ চরমভাবে আত্মকেন্দ্রিক, প্রত্যেকটা মানুষ যেখানে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো-সেই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সোজা। অন্যদিকে যে সমাজে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হয়, ভালোবাসা এবং আনুগত্যের সম্পর্ক থাকে, মানুষ একে অপরের জন্য আত্মত্যাগে প্রস্তুত থাকে-সেই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন। বিচ্ছিন্ন, একাকী মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। সংঘবদ্ধ সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
কিন্তু সংঘবদ্ধ সমাজের অংশ হতে হলে অনেক সময় নিজের কামনাবাসনা আর ইচ্ছের ওপর সমাজের স্বার্থকে স্থান দিতে হয়। কোনো পরিবার তখনই মজবুত হয় যখন পরিবারের সদস্যরা একে অপরের জন্য নিজ স্বার্থ আর চাহিদা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে। অন্যদিকে ব্যক্তিবাদ মানুষকে শেখায় শুধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করতে-নাফসি, নাফসি, নাফসি! মানুষ যখন এভাবে চিন্তা করতে শুরু করে তখন ওই ক্ষমতাসীনরা লাভবান হয়, যারা মানুষকে শয়তানী পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে চায়। এটাই হলো ভোগবাদী আত্মকেন্দ্রিকতার চূড়ান্ত গন্তব্য।
সমাজে অশ্লীলতা এবং অবাধ যৌনতার প্রসার ঘটানোর আরেকটা উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভালোমন্দ নির্ধারণের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়া। মানুষের যখন তাকওয়া থাকে না, তাকওয়া দূরের কথা প্রাথমিক পর্যায়ের শালীনতাবোধও যখন থাকে না, তখন সত্যমিথ্যা আর ভালোমন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষমতাসীনরা লাভবান হয়। মানুষ যদি মন্দকে চিনতেই না পারে তাহলে মন্দকে প্রতিরোধ করবে কীভাবে? ভালো কী, সেটাই যদি মানুষ না জানে তাহলে তারা কীভাবে খারাপ থেকে ভালোর দিকে পরিবর্তন চাইবে? আজকের ক্ষমতাসীনরা জঘন্য ধরনের সব কাজ করে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করছে না। কেন?
আমার বাবা বেড়ে উঠেছিলেন সিরাজে। সিরাজ ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। সেখানে এক চালের আড়তদার ছিল। পুরো সিরাজে যত চাল বিক্রি হতো সব তার হাত ঘুরে আসত। এই আড়তদার একদিন চালের দাম ৫০% বাড়িয়ে দিলো। বেশি দাম মানে বেশি লাভ, তাই সে দাম বাড়িয়ে দিলো। ইরানের মানুষ দু-বেলা ভাত খায়। কাজেই চালের দাম বাড়িয়ে দিলে কিছু মানুষকে উপোস করত হবে। যারা আগে দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে ছিল তারা নিচে চলে যাবে। নিঃসন্দেহে এটা যুলুম।
তখন বিশাল প্রতিবাদ হলো। বিক্ষোভ-মিছিল হলো। সেই আড়ত ঘেরাও হলো। সবাই চালের দাম কমানোর দাবি জানাল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানুষ রাস্তায় নামল। মুক্তবাজার অর্থনীতি কিংবা অন্য কিছুর দোহাই দিয়ে আড়তদারের পক্ষে কেউ সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করল না। কারণ, সবাই বুঝতে পেরেছিল যা হচ্ছে তা অন্যায়। এই যুলুম বন্ধ করতে হবে।
কিন্তু মানুষের ভালো-মন্দ চেনার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলে ক্ষমতাসীন অপরাধীরা যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারে। প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ নিয়ে তাদের আর মাথা ঘামাতে হয় না। কারণ, অন্যায় যে হচ্ছে সেটাই বেশির ভাগ মানুষ বুঝতে পারে না।
সমাজে অশ্লীলতা এবং অবাধ যৌনতার প্রসার ঘটানোর আরেকটা কারণ হলো, মানুষ যখন ইচ্ছেমতো কামনা-বাসনা চরিতার্থ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তখন অন্যায়কে চিনতে পারলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে কথা বলতে চায় না। অন্যায়ের প্রতিরোধ করার মতো ইচ্ছাশক্তি আর সাহস তার মধ্যে থাকে না। তার মধ্যে একধরনের অভ্যস্ত আলস্য কাজ করে। আল্লাহর আদেশ অমান্য করে, তাঁর বেঁধে দেয়া সীমালঙ্ঘন করে ক্রমাগত নফসকে সন্তুষ্ট করার কারণে, তার মধ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো আত্মিক শক্তি আর থাকে না।
ভোগবাদ, আত্মতুষ্টির পেছনে ছোটার মানসিকতা, এবং গুনাহতে অভ্যস্ত হয়ে পড়া সমাজকে এভাবে দুর্বল করে এবং একসময় সভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনে। অল্প কিছু ক্ষমতাসীন মানুষ আজ খুব নিপুণভাবে মানবজাতির নফসকে উস্কে দিচ্ছে। মানুষকে ক্রমাগত উদ্বুদ্ধ করছে যেকোনো মূল্যে তার কামনাবাসনা চরিতার্থ করতে। আর এই কাজকে বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দিচ্ছে লিবারেলিসমের দর্শন। তৈরি হচ্ছে চরম মাপের আত্মকেন্দ্রিক, বস্তুবাদী আর ভোগবাদী সমাজ। লিবারেলিসম মানুষকে শেখাচ্ছে- ভোগ করো। নিজেকে তৃপ্ত করো। নিজেকে সন্তুষ্ট করো-নাফসি, নাফসি, নাফসি।
আর এভাবেই ধ্বংস হচ্ছে সভ্যতা।

টিকাঃ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00