📄 পশ্চিমা বিশ্বের যৌন দুর্দশা
ষাটের দশকে পশ্চিমে ঘটা 'যৌন বিপ্লব' অনেকের জন্য অনেক আশা আর উৎসাহ নিয়ে এসেছিল। কিন্তু একসময় উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ে। সময়ের পরিক্রমায় এই আন্দোলনকে আজ ত্রুটিপূর্ণ, এমনকি কুৎসিত মনে হচ্ছে। যৌনতার লক্ষ্য, তাৎপর্য এবং যৌনতার মাধ্যমে প্রকৃত সন্তুষ্টির প্রশ্নগুলোর মোকাবিলা করতে এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। বিপ্লব মানেই অগ্রগতি না।
এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রতি চার জন পশ্চিমা নারীর মধ্যে কমপক্ষে এক জন যৌন হয়রানি কিংবা নির্যাতনের শিকার। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমা নারীদের প্রতি চার জনে এক জন জীবনের কোনো-না-কোনো সময় পারিবারিক সহিংসতার শিকার হবে। এ দুটো তথ্য যেন একে অপরের প্রতিবিম্ব। এ পরিসংখ্যানগুলো বাস্তবতার প্রতিফলন। পশ্চিমের মানুষ আজ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে তাদের এবং লিবারেল সেক্যুলার বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যার একটি হলো নারী ও কন্যাশিশুদের ব্যাপারে তাদের অসুস্থ চিন্তা।
বিউটি কনটেস্টের নামে ৫ বছর বয়সেই কন্যাশিশুদের নামিয়ে দেয়া হচ্ছে শরীর দেখানোর নোংরা প্রতিযোগিতায়। অন্যদিকে, যুবতীরা কেন হাত-পা ছড়িয়ে, চোখ বন্ধ করে উদ্যম যৌনতায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে না, তা নিয়ে সমালোচনায় মুখর 'sex-positive' নারীবাদীরা। আর পশ্চিমা নারী যদি কোনোভাবে এসবের কবল থেকে বেঁচেও যায় তাহলে তার জন্য অপেক্ষা করছে পারিবারিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, আর তা না হলে একাকিত্ব আর ডিপ্রেশনে ভরা এক বিবর্ণ জীবন।
নারী নির্যাতন রোধে কর্মক্ষেত্র আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরুষদের জন্য বিস্তারিত গাইড বানানো হচ্ছে, যাতে তারা যথাযথ আচরণ শিখতে পারে। সেই সাথে গাইড বানিয়ে তাদের শেখানো হচ্ছে-পুরুষত্ব বিষাক্ত। পুরুষমাত্রই সম্ভাব্য ধর্ষক।
যৌনতা যখন পণ্য
যৌনতা আজ একটা পণ্য। লিবাবেলিসম চরমভাবে যৌনায়িত এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে। যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ, আর নারীদেহের পর্নোগ্রাফিক ছবিতে ভরপুর বিজ্ঞাপনের মিশেলে যৌনতার এই পণ্য তৈরি হচ্ছে নিউইয়র্ক, লন্ডন কিংবা অ্যামস্টারডামের মতো জায়গাগুলোতে। যৌনায়িত পরিবেশ ভোঁতা করে ফেলেছে মানুষের অনুভূতি আর সংবেদনশীলতাকে। এমন এক বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে যেখানে নেশাখোরের মতো প্রতিনিয়ত আরও তীব্র উত্তেজনার খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছে মানুষ। যত-দিন যাচ্ছে, একই মাত্রার উত্তেজনা আর সন্তুষ্টির জন্য ততই মানুষকে খুঁজতে হচ্ছে আরও চরম যৌনতা এবং বিকৃতির। দেখা দিয়েছে পশুকাম থেকে শুরু করে শিশুকামের মতো নানান যৌন বিকৃতি। সামাজিক ন্যায়বিচার আর অধিকার আদায়ের অজুহাতে প্রত্যেক বিকৃতিকে গ্রহণযোগ্য আর প্রশংসনীয় করে তোলার লক্ষ্যে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন গ্রুপ আর সামাজিক আন্দোলন।
পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশেই যৌনতা আজ একটা প্যারাডক্স। মানুষ এমনভাবে জীবন কাটায় যেন যৌনতাই সব। কিন্তু একইসাথে সাময়িক উত্তেজনার বাইরে যৌন সম্পর্কের আর কোনো অর্থ কিংবা তাৎপর্য তাদের জীবনে নেই। যৌনতা একইসাথে সবকিছু, আবার একেবারেই অর্থহীন।
একদিকে স্কুলের রাগবি টিমের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে আপাত শ্রদ্ধাভাজন সংসদ সদস্যরা কিশোরী তরুণীদের কাছে অযাচিতভাবে নিজেদের যৌনাঙ্গের ছবি পাঠাচ্ছে। অন্যদিকে কিশোরীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে ইন্সটাগ্রাম, কিংবা স্ন্যাপচ্যাটে শরীর প্রদর্শনে। নিজেদের 'অ্যাসেট' দেখাতে, কিংবা ইনবক্সে 'নুডস' পাঠাতে। সোশ্যাল মিডিয়া এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে মানুষ একইসাথে আত্মমুগ্ধ আবার অন্যের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা পাবার জন্য বেপরোয়া।
নারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ
পশ্চিমের দৈনন্দিন আলাপচারিতায় নারীর আলোচনা প্রায় সব সময় উপস্থিত। পশ্চিমা শ্রেষ্ঠত্ব, প্রগতি এবং অনন্যতার যে মিথগুলো আছে, সেগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য 'স্বাধীন পশ্চিমা নারী'র গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এদেশগুলোর অনেকগুলোতে জনপরিসরে অংশ নিতে হলে নারীকে কার্যত তার জরায়ুকে ত্যাজ্য করতে হয়। কারণ, মাতৃত্ব আর 'তুচ্ছ গৃহিণী'-র জীবনে নারী সন্তুষ্ট হয়ে গেলে সেটা প্রগতিশীলতা আর নারীবাদের ওই প্যারাডক্সকে প্রকাশ করে দেবে, যা পশ্চিমা বিশ্ব আজও অস্বীকার করার চেষ্টা করে যাচ্ছে-হয়তো পশ্চিমা নারীর পক্ষে ঘরে-বাইরের সবকিছু একসাথে পাওয়া সম্ভব না।
মাতৃত্ব-কে ওখানে দেখা হয় অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে। অনেকে বলে লম্বা মাতৃত্বকালীন ছুটির কারণে প্রফিট কমে। মা-কে সম্মান করা হয় যখন দেখানোর মতো কোনো কর্পোরেট কৃতিত্ব তার থাকে। যেমন 'অমুক কোম্পানির সিনিয়র ভাইসপ্রেসিডেন্ট এবং সফল মা', অথবা 'অমুক কোম্পানির উদীয়মান ম্যানেজার এবং সফল মা'। এই বৈপরীত্যগুলো তৈরি করে এক অসহনীয় টেনশান। নারীত্বের কোনো পথ কিংবা প্রকাশভঙ্গি আর টিকে থাকে না। একসময় পরিবারকে মনে করা হতো ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও সহায়তার উৎস। কিন্তু এখন পরিবারকে দেখা হয় বোঝা হিসেবে। এমন বোঝা, যা থেকে পালিয়ে বেড়াতে হবে।
এ সবকিছুর ফলে তৈরি হওয়া যৌন এবং মনস্তাত্ত্বিক দুর্দশা অনেক সময় অস্বাভাবিকতা কিংবা উন্মাদনায় গিয়ে শেষ হয়। মানুষ পারিবারিক ভালোবাসা চায়। কিন্তু সেই ভালোবাসা পাওয়ার রাস্তাগুলো-বিয়ে, সন্তান, পারিবারিক স্থিতিশীলতা-আজ বন্ধ। পশ্চিমের অর্ধেকের বেশি শিশু জন্ম নেয় ডিভোর্সী, অবিবাহিত কিংবা সেপারেটেড মায়ের গর্ভে। ব্যাপারটা দুশ্চিন্তার। ভাঙা পরিবার আর অপরাধের হারের মধ্যে সম্পর্ক অনস্বীকার্য। পশ্চিমা দেশগুলোতে যে খুন এবং সহিংস অপরাধের মাত্রা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ, হয়তো এটা তার অন্যতম কারণ। হাতেগোনা যে ক'জন বিয়ে করে, তাদের পরিবারের ওপর অশরীরী প্রেতাত্মার মতো ঘুরতে থাকে পরকীয়ার ছায়া। ব্যভিচারেরও বাণিজ্যিকীকরণ করেছে পশ্চিম। অ্যাশলিম্যাডিসন এর মতো সাইটগুলো তাদের কোটি কোটি নিবন্ধিত সদস্যদের সাহায্য করছে ব্যভিচারের সঙ্গী বাছাই করতে।
কিছু কিছু পশ্চিমা দেশে নারীত্ব যেন প্রহসন। কসমেটিক আর পারফিউম বাবদ প্রতিবছর পশ্চিমা নারীর খরচ ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। কসমেটিক সার্জারি বাবদ খরচ হয় আরও ১২ বিলিয়ন ডলারের মতো। অথচ মাত্র ২২ বিলিয়ন ডলার দিয়ে পুরো পৃথিবীর সব গরিব মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব! কর্পোরেশানগুলোর বেঁধে দেয়া সৌন্দর্য আর ফ্যাশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী কসমেটিক আর কসমেটিক সার্জারির পেছনে টাকার পাহাড় খরচ করা হয়। পশ্চিমা নারীর নিজেকে যৌন আবেদনময়ী হিসেবে উপস্থাপন করার বেপরোয়া প্রয়োজনকে ব্যবহার করে প্রফিট করে কর্পোরেশানগুলো।
যৌন আবেদনময়ী হবার এই অতৃপ্ত তাড়না তৈরি হয়, কারণ সমাজ আর সংস্কৃতি নারীকে তার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে শেখায়। নিজের শরীর আর চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতার কারণে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ নারী ইটিং ডিসঅর্ডার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের মানসিক ব্যাধিতে ভোগে। এদের অনেকের সমস্যা শুরু মাত্র ১১ বছর বয়স থেকে!
দুঃখজনভাবে, অপরের মন কাড়ার জন্য আক্ষরিকভাবে উপোস করা এই নারীরা, পশ্চিমা পুরুষের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেই মনোযোগ পায় না। পুরুষত্বের সংকটে ভোগা পশ্চিমা পুরুষকে রক্তমাংসের, অ-নিখুঁত নারী আকর্ষণ করে না। ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফির অসীম স্রোতে গা ভাসানো এই পুরুষ তার সংবেদনশীলতা হারিয়ে অবশ হয়ে গেছে বহু আগেই। নিরন্তর মনোযোগের ঘাটতি আর অস্থিরতায় ভোগা এই পুরুষের দিন কাটে পর্ন দেখে, হস্তমৈথুন করে, ভিডিও গেইম খেলে অথবা আত্মহত্যা করে। কিছু কিছু পশ্চিমা দেশে ২০-৪৯ বছর বয়েসি পুরুষদের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ হলো আত্মহত্যা।
কল্পজগৎ নাকি বাস্তবতা?
এই অসহনীয় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে অনেকে হারিয়ে যেতে চায় কল্পজগতে। ফ্যান্টাসির জগৎকে তারা বাস্তবে খুঁজে বেড়ায়। কেউ হলিউডের রোমান্টিক সিনেমা কিংবা ডিসনি কার্টুনে দেখা নিখুঁত সৌলমেইট আর 'টু-লাভ' খুঁজে বেড়ায়। আবার কেউ গা ভাসিয়ে দেয় শর্তহীন বহুগামিতায়। বাস্তবতা যেন কোনো পর্নোগ্রাফিক সিনেমার সেট। কোনো সম্পর্ক, শর্ত, পরিণতি নেই-যে যত পারে তত মানুষের সাথে বিছানায় যাবে।
পশ্চিমা মিডিয়া মুন্সিয়ানার সাথে এই বাস্তবতা তুলে ধরে। মাইলি সাইরাসের মতো একসময়কার শিশু তারকাদের চরম কুৎসিতভাবে যৌনায়িত করে উপস্থাপন করা হয়। ছোট মেয়ে আর কিশোরীদের যৌনকরণকে দেখা হয় নারীর ক্ষমতায়ন হিসেবে। তারা নিজেদের 'যৌন স্বাধীনতা' প্রকাশ করে পর্ন তারকাদের মতো পোশাক আর আচরণে। বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর আগেই তাদের শরীর আর যৌনতার প্রতিশ্রুতিকে নিলামে তোলা হয়।
পশ্চিমা নারী সরলমনে বিশ্বাস করে যে তার পোশাক তার মুক্তি আর স্বাধীনতার প্রতিফলন। কিন্তু দেখা যায়, অল্প কিছু খুঁটিনাটি পার্থক্য ছাড়া তাদের অধিকাংশ একইরকম পোশাক পরে।
পশ্চিমে সেক্স থেরাপিস্টদের সংখ্যা অগণিত। গোগ্রাসে তাদের 'পরামর্শ' গেলা হয়, তা যতই সাংঘর্ষিক, বিচিত্র, কিংবা বিকৃত হোক না কেন। শরীর, ভালোবাসা আর যৌনতা নিয়ে আলোচনার একচেটিয়া কর্তৃত্ব এই আত্মস্বীকৃত 'সেক্সগুরু'দের। তাদের বাতলে দেয়া বিভিন্ন 'টিপস' ইন্টারেনেট, টিভি এবং গসিপ ম্যাগাযিনের কল্যাণে দানবীয় রূপ ধারণ করে। তৈরি হয় একধরনের পর্নো-মনস্তত্ত্ব।
যৌনতা এখানে সর্বত্র বিরাজমান। বিশেষ করে স্কুলগুলোতে। বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি আসলেই সহজপ্রাপ্য কোনো শরীরের ওম খুঁজে বের করতে হবে। যৌন 'অভিজ্ঞতা অর্জন' আবশ্যিক। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পৌঁছে যাবার পর যৌনতা থেকে বিরত থাকা অনেকটা সামাজিকভাবে অদ্ভুত হবার মতো। পারিপার্শ্বিক চাপ, মিডিয়ার প্রচার করা অন্তহীন যৌনতা আর যৌনায়িত সমাজের মিশেলে এক বিপজ্জনক মিশ্রণ তৈরি হয়।
মেয়ে ক্লাসমেটকে গণধর্ষণ করেছে প্রাথমিক স্কুলের ছেলেরা, অনেক পশ্চিমা শহরে এমন ঘটনা দেখা যায়। আর এর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ছোট্ট মেয়েদের দুশ্চিন্তা শুধু ক্লাসমেটদের নিয়ে না। সহিংস যৌন অপরাধীদের বিস্ময়কর রকমের হালকা শাস্তি দেয়া হয় পশ্চিমে। অপরাধ প্রমাণিত হবার পরও তুলনামূলক অল্প সময় জেলে কাটিয়ে 'পুনর্বাসিত' হয়ে তারা সমাজে ফিরে আসতে পারে। পশ্চিমের কিছু দেশে একই যৌন নির্যাতন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর করলে যে শাস্তি, শিশুর ওপর করলে শাস্তি তার চেয়ে কম। সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ হওয়া ১০ দেশের লিস্টে ইন্ডিয়া আর জিম্বাবুয়ে ছাড়া বাকি নামগুলো পশ্চিমা দেশের।
শুধু যে অন্ধকার গলিতে ঘুরে বেড়ানো অপরাধীরা শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে, তা না। শিশু পর্নোগ্রাফি এবং যৌন দাসত্বের প্রযোজক, পরিবেশক এবং গ্রাহকের খাতায় নাম আছে বিখ্যাত চিত্রনির্মাতা থেকে শুরু করে বিলিয়েনেয়ার হেজ-ফান্ড ম্যানেজার এবং অন্যান্য সেলিব্রিটিদের। এমনকি হার্ভাড ল স্কুলের অ্যালান ডারশোউইটযের মতো প্রভাবশালী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে শিশুকাম এবং সেক্স ট্রাফিকিংয়ের। নিষ্পাপ শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা পশ্চিমের ধনী আর বিখ্যাতদের জন্য যেন অসম্ভব। যারা সফল হতে পারে, বিখ্যাত হতে পারে, ধনী আর ক্ষমতাবান হতে পারে, শিশু ধর্ষণের 'অতিপ্রাকৃত উত্তেজনা' তাদের জন্য বরাদ্দ।
এই অবিশ্বাস্য হৃদয়-বিদারক দুর্দশা সত্ত্বেও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের যৌন বিপ্লব বাকি পৃথিবীতে রপ্তানি করতে চায়। এটাকে পবিত্র কর্তব্য মনে করে। সামরিক দখলদারিত্ব আর এনজিও-র মাধ্যমে সুশীল সমাজ তৈরি করে, 'উন্নয়নশীল' বিশ্বের নারীদের তারা মুক্ত করতে চায়। তাদের শেখাতে চায় যৌনতার পশ্চিমা তরিকা।
দীর্ঘদিন ধরে যেটাকে দূরের কোনো জগতের দৃশ্য মনে হচ্ছিল, আজ সেটাকে মনে হচ্ছে বিশ্বজুড়ে চলা সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংঘাত। ভৌগোলিক দূরত্ব আর বিচ্ছিন্নতার কারণে গতকাল যা নিয়ে চিন্তা করা অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছিল, গ্লোবালাইযেইশানের কল্যাণে আজ সেটা পরিণত হয়েছে প্রত্যক্ষ হুমকিতে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী লুটপাট আর ধর্ষণের শিকার হওয়া বাকি পৃথিবীর মানুষ আজ ভয় আর দুশ্চিন্তার সাথে আবিষ্কার করছে, পশ্চিমা বিশ্বের যৌনতা অসুস্থ। আর এই ব্যাধি অনেক দিন ধরেই সংক্রমিত করে চলেছে বাকি বিশ্বকে।
টিকাঃ
📄 নিরাপদ যৌনতা = বিয়ে
আস্তিক হোন কিংবা নাস্তিক, বিয়ের বাইরে নিরাপদ যৌনতা বলে যে কিছু নেই, এ কথা আপনাকে স্বীকার করতেই হবে। যার সাথে শুচ্ছেন সে যদি আপনার স্বামী বা স্ত্রী না হন, তাহলে ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা দুর্ঘটনাবশত যাই ঘটুক না কেন, আপনাকে পুরোপুরিভাবে নির্ভর করতে হবে তার করুণার ওপর। নতুন কোনো জীবনের কথা বলুন, মারাত্মক যৌনতাবাহিত অসুখের কথা বলুন কিংবা শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের কথা বলুন-আক্ষরিকভাবেই এটা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
একসময় এটা ছিল কমন সেন্সের বিষয়। সবাই জানত, মানত। কিন্তু আজ এ কথা বললে আপনি হয়ে যাবেন ধর্মীয় মৌলবাদী-যে মানবাধিকার, যৌন স্বাধীনতা বোঝে না।
এই কথাটা বোঝা কি এতই কঠিন? মানুষ আসলে কতটা অন্ধ হতে পারে? মুসলিম হিসেবে আমরা যিনা থেকে বিরত থাকি, কারণ এটা আল্লাহর আদেশ। তবে একইসাথে চারপাশের এই এলেমেলো বাস্তবতা থেকেও এই সত্যের উপকারিতা এবং এর পেছনের প্রজ্ঞাকে আমরা চিনতে পারি।
টিকাঃ
📄 ভিকটিমবিহীন অপরাধ?
মানুষ অনেক সময় মজা করে বলে—গাড়ি চালাতে লাইসেন্স লাগে, কিন্তু সন্তানের অভিভাবক হতে লাইসেন্স লাগে না, এটা কেমন কথা?
হালকা চালে বলা হলেও কথাটার পেছনে যুক্তি আছে। ভেবে দেখুন, স্কুলে পড়ানো, ডাক্তার কিংবা আইনজীবী হওয়া, এমনকি মেকানিক হতে হলেও সার্টিফিকেট লাগে। এগুলোর তুলনায় একটা শিশুকে লালনপালন করা অনেক বেশি নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু এটার জন্য কোনো সার্টিফিকেট, লাইসেন্স বা প্রশিক্ষণ নেই কেন?
শিশুরা সমাজের ভবিষ্যৎ। তাদের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, চরিত্র আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। যেসব শিশু উপযুক্ত অভিভাবকত্ব পায় না, তাদের বেকারত্ব, মাদক এবং অপরাধে জড়ানোর আশঙ্কা বেশি থাকে। সমাজের কর্মক্ষম সদস্য এবং ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ হবার ক্ষেত্রেও ব্যর্থতার আশঙ্কা থাকে সাধারণের চেয়ে বেশি।
কাজেই শিশুর সঠিক পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা যেন যোগ্য অভিভাবক এবং যথাযথ পরিচর্যা পায় তা নিশ্চিত করার কোনো-না-কোনো ব্যবস্থা সভ্য জাতিগুলোর মধ্যে থাকা উচিত। অযোগ্য, দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকেরা যেন শিশুদের ভবিষ্যৎ অগ্রাহ্য করে যা ইচ্ছে তা-ই করতে না পারে, তাদের সন্তানেরা যেন সমাজের বোঝায় পরিণত না হয় তা নিশ্চিত করা কি সামাজিক দায়িত্ব না?
এ ধরনের একটা লাইসেন্সের বিধান ইসলামে আছে—নিকাহ। যথাযথভাবে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাহ পালন করে বাস্তবায়ন করা হলে নিকাহ একটি স্থিতিশীল পরিবারের নিশ্চয়তা দেয়, যেখানে পিতা ও মাতা সন্তানের লালনপালন করবে। আর তাদের সমর্থন দেয়ার জন্য থাকবে বৃহত্তর পরিবার এবং সার্বিক সমাজ। অথচ দশকের পর দশক ধরে লিবারেল এবং মডার্নিস্টরা ইসলামী মূল্যবোধের ওপর নিরন্তর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
তাদের মতে বিবাহ-পূর্ব যৌনতাকে নিষিদ্ধ করে ইসলাম যৌন স্বাধীনতার গলা চেপে ধরেছে। অথচ বাস্তবতা হলো যিনার নিষেধাজ্ঞার বিধান মানুষের স্বাধীনতাকে রক্ষা করে। কারণ, এই নিষেধাজ্ঞা ডিভোর্সি, অবিবাহিত নারী এবং সন্তান পালনের অনুপযুক্ত নারী-পুরুষের সন্তানের সংখ্যা সীমিত রাখে। এতে করে শিশুর এবং সমাজের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়। বিষয়টা এতই স্পষ্ট যে বিবাহ-পূর্ব যৌনতা নিষিদ্ধের যৌক্তিকতা বোঝার জন্য ধার্মিক হওয়াও জরুরি না। সব ধরনের সমাজ-বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এই বিধানকে সমর্থন করে।
কাজেই বিবাহ-পূর্ব যৌনতায় কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এটা একটা ভ্রান্ত বিশ্বাস। বিবাহ-পূর্ব যৌনতাকে ভিকটিমহীন অপরাধ বলা যায় না।[৯৭]
যিনা একটা বড় ধরনের অপরাধ। আধুনিক রাষ্ট্র এই অপরাধের লাগামহীন বৈধতা দিয়েছে। ফলে অপরাধের হার বেড়েছে। একইসাথে বেড়েছে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা। যিনা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হবার আরেকটা দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল হলো, রাষ্ট্রের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়া। আর রাষ্ট্রের ওপর জনগণের নির্ভরতা যত বাড়ে ততই জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা। এতে দিনশেষে লাভ হয় রাষ্ট্র, ক্ষমতাসীন আর কর্পোরেশানগুলোর। এ কারণেই হাজার হাজার বছর ধরে যৌনতার ব্যাপারে চলে আসা অনুশাসন ও মূল্যবোধ নিয়ে আধুনিক জাতি রাষ্ট্রের কোনো মাথাব্যথা নেই।
যৌনতার ব্যাপার ইসলামী মূল্যবোধ কেন যৌক্তিক এবং সেক্যুলার লিবারেল অবস্থানের চেয়ে নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠতর তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব। ডেইটিং কিংবা যিনার ব্যাপার ধর্মীয় যুক্তি কারও মনঃপূত না হলে, এই যৌক্তিক প্রমাণগুলো এই বিধানগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে যথেষ্ট।
টিকাঃ
[৯৭] অবধারিতভাবে এখানে কেউ-না-কেউ জন্মনিয়ন্ত্রণের কথা তুলবে-যদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির কারণে গর্ভধারণই না হয়, তাহলে এখানে ভিকটিম কে? এ প্রশ্নের জবাব দুইভাবে দেয়া যায়।
১। আমরা লাইসেন্সের কথা বলছিলাম। অন্যান্য লাইসেন্স এবং সার্টিফিকেটের সাথে বিষয়টার তুলনা করা যায়। অনেক বছর ধরে বিমানগুলোতে অটো-পাইলট সুবিধা আছে। কিন্তু তার মানে এই না যে বিমান চালাতে হলে পাইলটদের লাইসেন্স লাগবে না।
২। জন্মনিয়ন্ত্রণ আর যৌন শিক্ষা যদি অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ প্রতিবোধে সফল হতো, তাহলে গত ৫০ বছরে এমন গর্ভধারণ এবং গর্ভপাতের হার কমার কথা। কিন্তু হয়েছে উল্টোটা। গত পঞ্চাশ বছরের প্রতি দশকে সিঙ্গেল মাদার-দের সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে অ্যামেরিকার প্রায় অর্ধেক শিশু শুধু মায়ের কাছে বড় হচ্ছে। আর সব ধরনের পরিসংখ্যান সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে এভাবে বড় হওয়া শিশুরা সুস্থ পরিবাবে বড় হওয়া শিশুদের তুলনায় অনেক দিক থেকে পিছিয়ে থাকে।
📄 ‘যৌন শিক্ষা’র উদ্দেশ্য
যৌন শিক্ষা ক্লাসের শিক্ষার্থীদের বয়স দিন দিন কমছে। আমি যখন স্কুলে ছিলাম তখন যৌন শিক্ষা শুরু হতো ক্লাস টেন থেকে। এখন শুরু হয় হাইস্কুল থেকে, অনেক ক্ষেত্রে প্রাইমারি স্কুলেও। শিশুর মানসিকতা এবং গঠনের ওপর এ ধরনের ক্লাসের প্রভাব কেমন হতে পারে? বৃহত্তর সমাজের ওপর এর কেমন প্রভাব পড়তে পারে?
মুসলিম সংস্কৃতিতে বয়ঃসন্ধির আগে বাবা-মা সন্তানের সাথে যৌনতার ব্যাপারে কথা বলে না। আর যখন বলে তখনো সেটা বলা হয় ইঙ্গিতে। কারণ, মানুষের কৌতূহলের ক্ষমতা অনেক। শিশুকে যখন এ ব্যাপারগুলো নিয়ে বলা হবে তখন সে কৌতূহলী হবে। তার নিজে নিজে অনুসন্ধানের সম্ভাবনা বাড়বে। আর আধুনিক মনোবিজ্ঞান আমাদের যতই 'সেক্স পসিটিভ' হবার কথা বলুক না কেন, এর ফলাফল নেতিবাচক। যৌন শিক্ষা ক্লাসে কী পড়ানো হচ্ছে, তাও খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলের শিশুদের এখন সমকামিতা, সেক্সুয়াল ফ্লুয়িডিটি, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন, জেন্ডার আইডেন্টিটির মতো বিষয়গুলো শেখানো হচ্ছে। শিশুদের প্রশ্ন করা হচ্ছে, তুমি ছেলেদের পছন্দ করো নাকি মেয়েদের? নাকি ছেলে-মেয়ে দুটোকেই? নাকি কোনোটাকেই না? তুমি কি নিজেকে ছেলে মনে করো নাকি মেয়ে? নাকি কোনোটাই না?
শিশুদের ওপর এবং আমাদের ভবিষ্যতের ওপর এ ধরনের শিক্ষা এবং চিন্তা-ভাবনার প্রভাব কেমন হবে তা বোঝার জন্য জ্যোতিষী হতে হয় না।
তবে সবচেয়ে বিচিত্র জিনিস হলো যৌন শিক্ষার পেছনের লিবারেল দর্শন। লিবারেল দর্শন অনুযায়ী-
যৌনতা আমাদের জীবনের একটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক অংশ। তাই শিশুরা যৌনতা নিয়ে জানবে এটাই স্বাভাবিক। মানবদেহ নিয়ে জানতে লজ্জার কী আছে? শিশুদের এসব না জানানোর কারণ কী? তারা তো এমনিতেই টিভি থেকে কোনো-না-কোনো সময় এগুলো জানবে।
কথাগুলোর সাথে ইবলিসের কথাবার্তার মিল আছে। আদম আর হাওয়া (আলাইহিমুস সালাম)-কে প্রতারিত করে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাইয়েছিল ইবলিস। এই ফল খাবার পর তাঁদের লজ্জাস্থান তাঁদের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যায়।
শিশুরা কথা বলতে শেখামাত্র তাদের যৌনতা শেখানো—একে ইতিবাচক, স্বাস্থ্যকর, প্রগতিশীল কিছু একটা হিসেবে উপস্থাপন করার এই পুরো ব্যাপারটা ইবলিসের বেশ পছন্দ হবার কথা।
বাস্তবতা হলো যৌনতা মূলত লজ্জাজনক। এটা শুধু তখনই ইতিবাচক, স্বাস্থ্যকর এবং গ্রহণযোগ্য যখন এটা আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী সংঘটিত হয়। কিন্তু শিশুদের শেখানো হচ্ছে উল্টোটা। সমাজে যে ধর্মকে অপ্রাসঙ্গিক এবং সেকেলে মনে করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, এতে অবাক হবার কিছু নেই। কাউকে যদি স্কুলে শেখানো হয়, যৌনতা সব সময় স্বাস্থ্যকর, তাহলে যে জিনিস যৌনতার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় তা নিঃসন্দেহে অবাস্তব, অযৌক্তিক এবং খারাপ বলেই মনে হবে।
টিকাঃ