📄 মডার্নিস্ট গাইডবুক
লিবারেল মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক এমন যেকোনো ইসলামী অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নিচের গাইডটি ব্যবহার করুন! আমাদের শিখিয়ে দেয়া পদ্ধতিতে তর্ক করে আপনি জায়েজ বানাতে পারবেন যেকোনো কিছু। একইসাথে প্রমাণ করতে পারবেন ইসলামী ইতিহাসের আলিমরা আপনার পক্ষেই আছেন।
আমাদের এই গাইড আপনাকে শেখাবে কিংবা বিরক্তিকর ট্র্যাডিশানাল মুসলিমদের দাঁতভাঙা জবাব দিতে হয়। সেই সাথে আপনি শিখবেন কীভাবে সূক্ষ্মদর্শী, মনীষী, আলিম এবং সংস্কারবাদী ইসলামের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়। আমাদের এই গাইড একবার ব্যবহার করেই দেখুন না, বিফলে মূল্য ফেরত!!
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এই ব্যাপারে ইজমা আছে।
মডার্নিস্ট যুক্তি-আসলে ইজমার ধারণা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এই বর্ণনাগুলো মুতওয়াতির।
মডার্নিস্ট যুক্তি-আসলে তাওয়াতুর নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এটা চার মাযহাবের মত।
মডার্নিস্ট যুক্তি-চার মাযহাবের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রাখা উচিত না, কারণ আজ আমরা এক ভিন্ন বাস্তবতায়, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বেঁচে আছি।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এটা অমুক মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মত।
মডার্নিস্ট যুক্তি-হ্যাঁ, কিন্তু জুমহুর আলিম এখানে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাই সংখ্যালঘু অবস্থান বাদ দাও।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এটা জুমহুরের মত।
মডার্নিস্ট যুক্তি-হ্যাঁ, কিন্তু অল্প কিছু আলিম এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন, তাই আমরা অধিকাংশের মত বাদ দিতে পারি।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এই আয়াত কাত'ই।
মডার্নিস্ট যুক্তি-না।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এই হাদীসের বক্তব্য স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন।
মডার্নিস্ট যুক্তি-কিন্তু এটা আহাদ হাদীস। আমরা এটা বাদ দিতে পারি।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এটা এই মাযহাবের সবচেয়ে শক্তিশালী মত।
মডার্নিস্ট যুক্তি-কিন্তু একজন বর্ণনাকারীর সূত্রে একজন সাহাবী থেকে একটা বর্ণনা আছে, যা এই মতের বিরুদ্ধে যায়। তাই আমরা এই মত বাদ দিতে পারি।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-অধিকাংশ তাফসিরে এই আয়াতের ব্যাপারে একই ব্যাখ্যা এসেছে।
মডার্নিস্ট যুক্তি-হ্যাঁ, কিন্তু একটা তাফসিরে একটু আলাদা ব্যাখ্যা এসেছে, যা প্রমাণ করে বাকি সব তাফসির আসলে মুফাসসিরদের কালচারাল বায়াসের ফল।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এই ব্যাপারে ফকীহগণ একমত।
মডার্নিস্ট যুক্তি-ফকীহদের হাদীসের জ্ঞান সীমিত। এই ব্যাপারে মুহাদ্দিসিনের বক্তব্য কী, সেটা দেখতে হবে।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-এই ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ একমত।
মডার্নিস্ট যুক্তি-কিন্তু মুহাদ্দিসদের ফিকহের জ্ঞান সীমিত। তাই ফকীহগণ কী বলেছেন সেটা দেখতে হবে।
ট্র্যাডিশানালিস্ট-ফকীহগণ এবং মুহাদ্দিসগণ এই ব্যাপারে একমত।
মডার্নিস্ট যুক্তি-কিন্তু আমরা একটা ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন বাস্তবতায় বসবাস করি। তাই আমাদের ইজতিহাদ করতে হবে। ইসলাম জীবন্ত, ইসলাম সব যুগে আধুনিক, ইসলাম...।
দেখলেন তো! কত সহজে যেকোনো চিপা থেকে বের হওয়া সম্ভব? যখন আপনার বিন্দুমাত্র সততা থাকবে না, কনসিসটেন্সির কোনো স্ট্যান্ডার্ড থাকবে না, তখন যেকোনো কিছুকে জায়েজ বানানো সম্ভব।
তাহলে আর দেরি কেন? আজই কিনুন এবং যাচাই করে দেখুন আমাদের মডার্নিস্ট গাইডবুক। বিফলে মূল্য ফেরত!!
টিকাঃ
📄 জ্ঞান বনাম জ্ঞানের ভান
মহান আল্লাহ বলেছেন, আর যখন তাদের বলা হয়, 'তোমরা ঈমান আনো যেমন লোকেরা ঈমান এনেছে', তারা বলে, 'আমরা কি ঈমান আনব যেমন নির্বোধরা ঈমান এনেছে?' জেনে রাখো, নিশ্চয় তারাই নির্বোধ; কিন্তু তারা জানে না। [তরজমা, সূরা আল-বাকারাহ, ১৩]
আজও এমন মানুষ আছে, যারা মুমিনদের নির্বোধ বলে। নিশ্চিতভাবে এই লোকগুলোই হলো প্রকৃত নির্বোধ। তারা সত্য জানে না এবং তারা যে জানে না সেটাও তারা জানে না।
আফসোসের বিষয় হলো, অনেক মুসলিমও এ ব্যাপারটা জানে না। সত্য প্রত্যাখ্যান করা লোকদের নির্বোধ হিসেবে দেখার বদলে তাদের দেখা হয় বিশেষজ্ঞ, পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী হিসেবে। তাদের ধ্যানধারণা, তত্ত্ব, দর্শন মুসলিমদের মধ্যে এমনভাবে প্রচার করা হয় যে একসময় এসব চিন্তা আর তত্ত্বের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য মুসলিমরা নিজেদের বিশ্বাসকে বদলাতে শুরু করে। অথচ এগুলো আসছে এমন মানুষদের কাছ থেকে যারা কঠোরভাবে ঈমানকে অস্বীকার করে। এমন আচরণের পরস্পরবিরোধিতা মুসলিমদের চোখে ধরা পড়ে না।
সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এসব লোকদের মুসলিমরা সম্মানের এমন আসনে বসায়, তাদের প্রতি এতই শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস মুসলিমদের মধ্যে কাজ করে, যে তারা আলিমদের নিন্দা করা শুরু করে-আলিমরা কিছু জানে না, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দৌড় সীমিত, তারা আসলে খেয়ালখুশি অনুযায়ী কথা বলে, কুরআন-সুন্নাহর সঠিক অর্থ তারা বোঝেনি, ইত্যাদি।
এমন হবার কারণ কী? অন্যতম প্রধান কারণ হলো, মুসলিমরা এমন কিছু ধ্যানধারণা নিয়ে মুগ্ধ হয়ে আছে, যেগুলো তারা পুরোপুরিভাবে বোঝে না। আপনি যখন কোনো কিছু ঠিকমতো বুঝবেন না তখন আপনার হাতে দুটো অপশান থাকে।
আপনি সেটা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করবেন (যদিও কেন প্রত্যাখ্যান করছেন সেটা আপনি জানেন না)। অথবা আপনি বাহ্যিক অবস্থা থেকে সেই জিনিসের মূল্য বিচার করার চেষ্টা করবেন।
এটা কি দেখে ঠিকঠাক মনে হচ্ছে? ভালো মনে হচ্ছে? কথাগুলো শুনতে কি জ্ঞানী জ্ঞানী মনে হচ্ছে? নামিদামি লোকেরা কি এই কথাকে সমর্থন করছে? জনগণ কি এটা গ্রহণ করেছে? এটা কি জনপ্রিয়?
অর্থাৎ, কোনো কিছু আপাতভাবে 'জ্ঞান' মনে হওয়াই যথেষ্ট। মুসলিমরা আজ যেসব মডার্নিস্ট আদর্শ গ্রহণ করেছে, তার অধিকাংশই গ্রহণ করা হয়েছে এ মূলনীতির ভিত্তিতে।
খুব অল্প কিছু মানুষ পাবেন, যারা কোনো কিছু পুরোপুরি না বুঝতে পারলে, নিশ্চিত না হতে না পারলে প্রত্যাখ্যান করে। যদিও এটা নিরাপদ রাস্তা কিন্তু এতে করে বৃহত্তর উম্মাহ লাভবান হয় না। তাই এই আদর্শগুলোকে আমাদের পুরোপুরি বুঝতে হবে। আমার অভিজ্ঞতা এবং দাবি হলো, এই আদর্শগুলো পুরোপুরি বুঝলে এগুলো আসলে কতটা ঘৃণ্য এবং মূর্খতাপূর্ণ তা মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে। আর আপনি অবধারিতভাবে তখন অনুধাবন করবেন সত্যিকারের নির্বোধ কারা।
টিকাঃ
📄 প্রগতিবাদী ও আধুনিক মুসলিম ‘সংস্কারক’
ফিকহের মাযহাবগুলোর মধ্যে পর্যালোচনা করলে দেখবেন কোনো মাযহাবের অবস্থান যদি এক বিষয়ে কঠিন হয়, তাহলে অন্য কোনো দিকে সেই মাযহাবের অবস্থান অন্য মাযহাবগুলোর তুলনায় সহজ হয়। যেমন, ওযুর শর্তের ক্ষেত্রে 'ক' মাযহাবের অবস্থান হয়তো 'খ' মাযহাবের তুলনায় কঠোর। কিন্তু সফরের ক্ষেত্রে 'খ' মাযহাবের তুলনায় 'ক' মাযহাবের অবস্থায় নমনীয়। কিন্তু আধুনিক সংস্কারবাদীদের অবস্থানের দিকে তাকালে দেখবেন তাদের সব মত একমুখী। সবক্ষেত্রে তারা ওই অবস্থানটাই গ্রহণ করে, যা আধুনিক পশ্চিমা, বুর্জোয়া ধ্যানধারণা, সংস্কৃতি আর রুচির সাথে খাপ খায়।
যেকোনো বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বুঝবে যে এটা কোনো কাকতাল না। দৈবক্রমে এমন হচ্ছে না; বরং এটা হলো স্পষ্ট প্রমাণ যে এই সংস্কারবাদীদের কোনো নির্দিষ্ট উসুল বা মূলনীতি নেই। তারা ওই মতটাই গ্রহণ করে, যা ওই সময়ের কর্তৃত্বশালী সমাজ-সংস্কৃতির প্রথাপ্রচলনের সাথে মেলে। প্রথমে তারা উপসংহার ঠিক করে নেয়, তারপর এর পক্ষে দলীল-প্রমাণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। কুরআন-সুন্নাহ থেকে বেছে বেছে ওই আয়াত বা হাদীসগুলো বের করে যেটাকে কোনো-না-কোনোভাবে নিজের উপসংহারের পক্ষে উপস্থাপন করা যাবে। পাশাপাশি পূর্ববর্তী আলিমদের বিভিন্ন দুর্লভ, বিচ্ছিন্ন মত তারা নিয়ে আসে।
এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ইলমী জোচ্চুরির পরও তারা আশা করে যে মুসলিমরা তাদের গুরুত্বের সাথে নেবে!
টিকাঃ
📄 ‘সংস্কার’-এর নামে ভণ্ডামি
আধুনিক সংস্কারবাদী মুসলিমরা অনেক সময় তাদের অবস্থানের পক্ষে ক্লাসিকাল আলিমদের কিছু দুর্লভ, বিচ্ছিন্ন মত নিয়ে আসে। এটা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। তারা যেটা করে তা সেটাকে বলা হয় 'পোস্ট হক জাস্টিফিকেশান' (post hoc justification)। অর্থাৎ তারা আগেই ঠিক করে রেখেছে তারা কী অর্জন করতে চায়। পরে সেটার একটা ব্যাখ্যা তারা তৈরি করেছে। প্রথমে তারা উত্তর ঠিক করে। তারপর ইসলামী জ্ঞানের সমুদ্র সেঁচে কুড়িয়ে কুড়িয়ে ওইসব জিনিস খুঁজে আনে, যেটা তাদের উপসংহারকে সমর্থন করে। আবার অধিকাংশ সময় ক্লাসিকাল টেক্সট বুঝতেও তারা ভুল করে। অথবা আলিমদের বক্তব্যকে তারা প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপন করে।
এসব সংস্কারবাদীদের মুখোমুখি হলে, আমাদের তাদের প্রশ্ন করা দরকার। নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে তারা যখন বলে-অমুক মাযহাবে এমন একটা মত আছে। তখন আমাদের বলা দরকার-হ্যাঁ, এমন মত থাকতে পারে। কিন্তু তুমি কেন খুঁজে খুঁজে এই দুর্লভ এবং বিচ্ছিন্ন মতগুলো বের করছ? তোমার উদ্দেশ্য কী? তুমি কি লিবারেল মতাদর্শের প্রসার চাইছ, যা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ?
এভাবে খেয়ালখুশি মতো আলিমদের বক্তব্য বিকৃত করার বদলে, লিবারেলিসমের অবস্থানগুলো নিয়ে চিন্তা করা যায় না? লিবারেলিসমের পূর্বধারণাগুলোকে ক্রিটিক করা যায় না?
অর্থাৎ, দ্বীনের ব্যাপারে আন্তরিক হবার একটি দিক হলো, উম্মাহর অধিকাংশ আলিমগণের মতকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা (যদিও কিছু ক্ষেত্রে দলীলের ভিত্তিতে ব্যক্তি ভিন্নমত অনুসরণ করতে পারে)। কারণ, শুধু সম্ভাব্যতার দিক থেকেই বলা যায়, অধিকাংশ বিষয়ে উম্মাহর ইতিহাসের জুমহুর আলিমগণের অবস্থান সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু কারও মূল উদ্দেশ্যই যদি হয় যেকোনো মূল্যে নিজের অবস্থানকে বৈধতা দেয়া, তাহলে সে ওইসব মতই খুঁজে খুঁজে বের করবে, যেগুলো তার পক্ষে যায়। সেগুলো যত দুর্বলই হোক না কেন।
টিকাঃ