📘 সংশয়বাদী > 📄 মুসলিম-বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের পশ্চিমা কৌশল

📄 মুসলিম-বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের পশ্চিমা কৌশল


ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি সরকারি নথি থেকে জানা গেছে, মুসলিম-বিশ্বে 'ইসলামী সংস্কার' প্রচার করার জন্য মুসলিম নারী ও তরুণদের ব্যবহারের ব্যাপারে মার্কিন স্টেইট ডিপার্টমেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনকে পরামর্শ দিয়েছিল। তাদের মতে নারীর ক্ষমতায়নের ওপর ফোকাস করা মুসলিম-বিশ্বে অ্যামেরিকান শক্তি আর মুক্তির বয়ানকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ করে দেবে।[৯১]
১। ইসলামকে বিকৃত করা এবং মুসলিম উম্মাহকে নিয়ন্ত্রণের জন্য নারী আর তরুণদের ব্যবহারের কৌশল নতুন না। বরাবরই এটা ছিল ঔপনিবেশিক দখলদারদের মূল কৌশল। শুধু মুসলিম-বিশ্বে না, গত কয়েক শ বছর ধরে অ্যামেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, চীন-এই কৌশল তারা প্রয়োগ করেছে সব জায়গাতেই।
লর্ড ক্রোমারসহ অন্যান্য দখলদাররা সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করত, মুসলিম পুরুষরা নারীদের বন্দী এবং পরাধীন করে রেখেছে। ইউরোপীয় পুরুষ মুসলিম-বিশ্বে ইউরোপীয় মূল্যবোধ নিয়ে এসেছে মুসলিম নারীকে মুক্ত করার জন্য। ক্রোমাররা বলত, নারী অধিকারকে জায়গা করে দেয়ার জন্য ইসলামী আইনের (শরীয়াহর) সংস্কার করা জরুরি।
'মুক্ত' হবার জন্য মুসলিম নারীর প্রথম করণীয় হলো, হিজাব খুলে ফেলে পশ্চিমা নারীদের মতো পোশাক পরা। পাশাপাশি মুসলিম নারীকে সব ধরনের পুরুষের কর্তৃত্ব অস্বীকার করতে হবে। সেটা বাবা হোক, স্বামী হোক, কিংবা পুরুষ আলিম হোক। সেই সাথে বিলুপ্ত করতে হবে বহুবিবাহের 'বর্বর' বিধান। ঘরের ভেতর 'ধুঁকে ধুঁকে মরা'র জীবন ছেড়ে যেকোনো মূল্যে বেরিয়ে এসে নারীকে যোগ দিতে হবে কাজে। এসব কথাবার্তার সুবাদে দখলদাররা পেল সস্তা আর সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য অনেক শ্রমিক। আর মুসলিম সমাজে পড়ল সুদূরপ্রসারী প্রভাব। মুসলিম বিশ্বে চালানো এসব ঔপনিবেশিক প্রকল্পের আলোচনা বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক কাজে উঠে এসেছে।
ঔপনিবেশিক দখলদারদের এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল, প্রতিষ্ঠান হিসেবে মুসলিম পরিবারকে ভেঙে দেয়া। মজবুত, সুসংহত পরিবার উম্মাহর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী, পিতার বিরুদ্ধে কন্যা, ভাইয়ের বিরুদ্ধে বোনকে উস্কে দিয়ে খুব সহজেই এই প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা যায়। এভাবে ধীরে ধীরে মুসলিম জনগণের ওপর বাড়ে ঔপনিবেশিক দখলদারের নিয়ন্ত্রণ এবং কর্তৃত্ব। শত শত বছর ধরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে আসছে ওরা। আর এসব করা হয়েছে নারী ক্ষমতায়নের স্লোগানের আড়ালে। দুই শতাব্দী ধরে এভাবেই হয়েছে এই পরিকল্পনার মার্কেটিং। মুসলিম ফেমিনিস্টরা যখন ইসলামের ইলমী সিলসিলাকে অস্বীকার করে শরীয়াহ সংস্কারের আহ্বান করে, তারা তখন মূলত ঔপনিবেশিক আর সাম্রাজ্যবাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এ কারণেই একইসাথে ফেমিনিস্ট আর 'ডিকলোনিয়াল' অথবা ফেমিনিস্ট আর 'সাম্রাজ্যবাদবিরোধী' হওয়ার দাবি পরস্পরবিরোধী এবং সাংঘর্ষিক।
২। আমার বিরোধিতাকারীরা বলেন, নারীবাদ আর নারীবাদীদের নিয়ে আমি অনেক বেশি মাথা ঘামাই। কিন্তু আমার কী করার আছে বলুন, যখন খোদ মার্কিন স্টেইট ডিপার্টমেন্ট বলছে, ইসলামকে আক্রমণ করার মূল পথ হলো 'নারী অধিকার' সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুকে পুঁজি করে আগানো? ইসলামের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে জেনেও শত্রুদের নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আপনার পক্ষে কি সম্ভব?
৩। বিভিন্ন সময়ে কিছু অ্যামেরিকান মুসলিম সংস্থার অসাধু কর্মকাণ্ড নিয়ে আমি লিখেছি। এসব সংস্থা, যারা নিজেদের 'সংস্কারপন্থী' বলে থাকে। 'নারীর ক্ষমতায়ন' নিয়ে কাজ করার জন্য মার্কিন সরকারের কাছ থেকে এসব সংস্থা হাজার হাজার ডলার পায়। মার্কিন সরকার কেন ছোট ছোট মুসলিম সংস্থাগুলোকে এত টাকা দিয়ে সাহায্য করবে? কোন স্বার্থে?
এ প্রশ্নের উত্তর এ নথিতেই দেয়া আছে। এ সবকিছু হলো সাম্রাজ্যবাদীদের ইচ্ছেমতো ইসলামের সংস্কার করার সার্বিক পরিকল্পনার অংশ। এসব সংস্কারবাদী আর নারীবাদী সংগঠনগুলো মার্কিন সরকারের অতিউৎসাহী এজেন্ট, যারা আগ্রাসীভাবে আমাদের মসজিদ, এবং দ্বীন শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

টিকাঃ
[৯১] Leaked State Department Memo Advised Trump Administration To Push For "Islamic Reformation", The Intercept, June ১৯, ২০১৮

📘 সংশয়বাদী > 📄 হাদীস এবং জ্ঞানতত্ত্ব : আদম (আলাইহিস সালাম)-এর উচ্চতা

📄 হাদীস এবং জ্ঞানতত্ত্ব : আদম (আলাইহিস সালাম)-এর উচ্চতা


নিচের হাদীসটি দেখে অনেক মুসলিম সংশয়ে পড়ে যায়-
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। এরপর তিনি (আল্লাহ) তাঁকে (আদমকে) বললেন, যাও। ওই ফিরিশতা দলের প্রতি সালাম করো এবং তাঁরা তোমার সালামের জবাব কীরূপে দেয় তা মনোযোগ দিয়ে শোনো। কেননা, এটাই হবে তোমার এবং তোমার সন্তানদের সালামের রীতি। তারপর আদম (আলাইহিস সালাম) (ফিরিশতাদের) বললেন, "আস্সালামু আলাইকুম।” ফিরিশতাগণ তার উত্তরে “আস্সালামু আলাইকা ওয়া রাহমাতুল্লাহ” বললেন। ফিরিশতারা সালামের জবাবে "ওয়া রাহমাতুল্লাহ" শব্দটি বাড়িয়ে বললেন। যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন তারা আদম (আলাইহিস সালাম) এর আকৃতি-বিশিষ্ট হবেন। তবে আদমসন্তানদের দেহের দৈর্ঘ্য সর্বদা কমতে কমতে বর্তমান পরিমাপ পর্যন্ত পৌঁছেছে।[৯২]
সংশয়ে পড়ে যাওয়া অনেকে প্রশ্ন করে, 'আদম আলাইহিস সালাম এবং অতীতের মানুষরা যে আসলেই এত লম্বা ছিল তার প্রমাণ কী?'
প্রশ্নটা আসলে মজার। কারণ, মুসলিমের জন্য সহীহ হাদীসই প্রমাণ। কুরআন এবং সুন্নাহই তো প্রমাণ। সহীহ হাদীসের বক্তব্য দেখারও পর কারও মধ্যে সংশয় বা সন্দেহ বা সংশয় কাজ করতে পারে দুটি কারণে: ১) সে ঢালাওভাবে সব হাদীসের ব্যাপারে সন্দিহান, ২) আদম আলাইহিস সালাম-এর উচ্চতার ব্যাপারে জ্ঞানের উৎস হিসেবে সহীহ হাদীসের তুলনায় বর্তমান বিজ্ঞানের বক্তব্যকে সে বেশি সঠিক মনে করে।
যদি ১ হয়, তাহলে আদম আলাইহিস সালাম-এর উচ্চতার হাদীসের চেয়ে আরও গুরুতর বিষয় নিয়ে তার দুশ্চিন্তা করা উচিত।
যদি ২ হয়, তাহলে এই ব্যক্তি আসলে মনে করছে আদম আলাইহিস সালাম-এর দৈর্ঘ্যের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুল করেছেন অথবা হাদীস বর্ণনাকারীরা ভুল করেছেন। মনে রাখবেন, আদম আলাইহিস সালাম-এর উচ্চতার কথা একাধিক সহীহ হাদীসে কথা এসেছে। এটা যদি বর্ণনাকারীর ভুল হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে বেশ ক'জন বর্ণনাকারী এখানে ভুল করেছেন।
কিন্তু এ হাদীস নিয়ে সংশয় তৈরি হবার আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই।
প্রথমত, বিজ্ঞানের বর্তমান ঐকমত্যকে হাদীসে বর্ণিত অনেক বিষয়ের ক্ষেত্রে আমরা প্রাসঙ্গিক মনে করি না। আল ইসরা ওয়াল মি'রাজের কথা চিন্তা করুন। নবীদের (আলাইহিমুস সালাম) যেকোনো মু'জিযার কথা চিন্তা করুন। কিয়ামতের বিভিন্ন আলামত যেমন, ইয়া'জুজ-মা'জুজের কথা চিন্তা করুন। এসব ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বক্তব্যকে আমরা প্রাসঙ্গিক মনে করি না।
আর আপনার যদি হাদীস নিয়ে সমস্যা থাকে, তাহলে কুরআনেও এমন অনেক ঘটনার বর্ণনা আছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের বক্তব্যের সাথে মেলে না। আধুনিক বিজ্ঞানের বক্তব্য যদি এসব বিষয়ে প্রাসঙ্গিক না হয়, তাহলে হঠাৎ করে আদম আলাইহিস সালাম-এর উচ্চতার ব্যাপারে কেন বিজ্ঞানই সত্যমিথ্যার চূড়ান্ত মাপকাঠি হয়ে গেল?
তা ছাড়া বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য-কে যারা এত গুরুত্বের সাথে নেন, আমার মনে হয় তারা আসলে বিজ্ঞানের ধরন এবং ইতিহাস নিয়ে জানেন না। আমার এ বিষয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়েছে। আমি হার্ভাডে ফিযিক্স নিয়ে পড়েছি। দর্শন আর বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে পড়েছি হার্ভার্ড এবং টাফটসে। আমি এমন প্রফেসরদের কাছে পড়েছি, যারা নোবেল বিজয়ী ছিলেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসের একেবারে প্রাথমিক কিছু বিষয়ে তাদের অজ্ঞতা ছিল অবাক হবার মতো। বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে জানার আদৌ কোনো দরকার আছে বলেও তারা মনে করেন না। জ্ঞান এবং জানার ইচ্ছার অভাবের কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞানের ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ এবং মায়োপিক। এত বড় বড় বিজ্ঞানীর মধ্যে এমন ব্যাপার দেখাটা বেশ অদ্ভুত।
আমাদের এই আলোচনার সাথে বিজ্ঞানের ইতিহাসের ব্যাপারে একটি তথ্য প্রাসঙ্গিক। অতীতের প্রত্নতত্ত্ববিদরা বিশালাকায় মানুষের অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। এ ধারণার ভিত্তি ছিল মাটি খুঁড়ে পাওয়া বিভিন্ন ফসিল এবং হাড়। যেমন মেগানথ্রোপাস (Meganthropus) নামের একটি প্রজাতির ফসিল। তবে অধিকাংশ আধুনিক বিজ্ঞানী এ ব্যাপারে জানে না। কিন্তু তাদের এই না জানার কারণে পূর্ববর্তী কাজ এবং ঐতিহাসিক রেকর্ড মুছে যায় না।
ব্যক্তিগতভাবে আমি নিশ্চিত জ্ঞানের ওপর অনুমানকে প্রাধান্য দিই না, কারণ আমি একজন মুসলিম। সহীহ হাদীস বিনাবাক্য ব্যয়ে গ্রহণ করে নিতে এবং এতে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সন্তুষ্ট আমার কোনো সমস্যা হয় না; বরং কুরআন ও হাদীসের যে বক্তব্যগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে যায়, সেগুলো আমার প্রিয়। কারণ, এ আয়াত এবং হাদীসগুলো মহাবিশ্ব এবং ইতিহাসের ব্যাপারে এমন কিছু তথ্য আমাকে জানাচ্ছে যেগুলো অন্য কোনোভাবে জানার উপায় আমার ছিল না।
***
বি.দ্র. ১-উচ্চতা আর হাড়ের শক্তির কথা এনে অনেকে এই হাদীসগুলোর ব্যাপারে আপত্তি করতে চায়। এটা নিতান্তই নির্বুদ্ধিতা। পর্যাপ্ত ঘনত্ব থাকলে হাড় যেকোনো উচ্চতার প্রাণীকে ধরে রাখতে পারে। হাড়ের গঠনের কথা বলে এই হাদীসের ব্যাপারে আপত্তি তোলা হলো অ্যারোডায়ানামিক হবার কথা বলে বুরাকের গতির ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার মতো।
বি.দ্র. ২-এই হাদীসের ব্যাপারে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রহ. এর দেয়া একটি ব্যাখ্যার কথা মুফতী তাকী উসমানী উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতে অনেক লম্বা ছিলেন। কিন্তু পৃথিবীতে আসার পর তার উচ্চতা কমে আসে।[৯৩] এ ব্যাখ্যা তিনি গ্রহণ করেছেন হাদীসের ভাষা বিশ্লেষণ করে। এ বিশ্লেষণ ঠিক নাকি ভুল, তা আল্লাহই ভালো জানেন। কিন্তু মনে রাখার বিষয় হলো, এই ব্যাখ্যা আধুনিক বিজ্ঞানের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে দেয়া না।

টিকাঃ
[৯২] সহীহ বুখারী
[৯৩] Usmani, Muhammad Taqi, Takmila Fath al-Mulhim, Vol. 6, p.15 As cited by Waqar Akbar Cheema: Hadith about height of Adam and later generations explained

📘 সংশয়বাদী > 📄 ‘কমিউনিস্ট ইসলামের’ ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা

📄 ‘কমিউনিস্ট ইসলামের’ ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা


বিংশ শতাব্দীর অনেক অ্যাকাডেমিক মুসলিমদের মধ্যে সমাজতন্ত্র একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল। এসব মুসলিমদের চোখে কমিউনিসম ছিল ন্যায়বিচার আর পার্থিব সভ্যতার শিখর। সোভিয়েত ইউনিয়নও এ সময় অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। মুসলিমদের কেন কমিউনিসমের আদর্শ গ্রহণ করা উচিত তা নিয়ে অ্যাকাডেমিক মুসলিমরা অত্যন্ত উৎসাহের সাথে লেখালেখি শুরু করল। ইসলামের মূল শিক্ষা যে আসলে সমাজতান্ত্রিক, তা প্রমাণে উঠেপড়ে লেগে গেল। কুরআন-হাদীসের মধ্যেও তারা কমিউনিসম খুঁজে পেল। যাকাত, আর সাদাকাহর বিধান দেখিয়ে বলল, 'এই যে দেখো প্রমাণ! ইসলাম ব্যক্তি-মালিকানার বিরোধী!'
ইসলামী আইনের এমন অনেক দিক আছে, যেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যক্তি-মালিকানার ধারণা মেনে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো কমিউনিসমের সাথে সাংঘর্ষিক হবার কারণে মুসলিম কমিউনিস্টরা ফিকহশাস্ত্রকে আক্রমণ করে বসল। বলল- ফিকহ সেকেলে, ফিকহের অবস্থান অন্যায্য এবং ফিকহ আসলে আল্লাহর দেয়া দ্বীনের পুঁজিবাদী বিকৃতি। ক্লাসিকাল আলিমরা সবাই সম্পদের মালিক ছিল। নিজেদের বুর্জোয়া এজেন্ডা রক্ষার জন্যে আর শ্রমিক-শ্রেণিকে শোষণের লক্ষ্যে তারা ফিকহের আইন-কানুন বানিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই সে সময়কার অনেক মুসলিম এসব কথাবার্তার বিরোধিতা করল। মুসলিম কমিউনিস্টদের যুক্তির নানা ফাঁকফোকর তুলে ধরল। প্রতিবাদ করল আলিমগণের ওপর দেয়া অপবাদের বিরুদ্ধে। এভাবে বারবার বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হতে এই মুসলিম কমিউনিস্টরা আরও উগ্র হতে থাকল। একসময় তারা ইসলাম থেকে বেরই হয়ে গেল।
মার্ক্স কি বলেননি, ধর্ম জনগণের আফিম? আর এই ট্র্যাডিশানাল মুসলিমরাই না কমিউনিসমের সুস্পষ্ট ন্যায়বিচার আর ঐতিহাসিক বস্তুবাদের গভীর অন্তর্দৃষ্টিকে অস্বীকার করছে! মূল সমস্যা তাহলে ইসলামেই!
তাদের চোখে মুসলিমরা ছিল ধর্মান্ধ ভেড়া। তাই ইসলাম ত্যাগ করে তারা মুরতাদ হয়ে গেল। তাদের আশা ছিল, অদূর ভবিষ্যতে কমিউনিসমের উজ্জ্বল আলো ইসলামী টট্র্যাডিশানের গাঢ় অন্ধকারকে দূর করে দেবে। পুরো মুসলিম-বিশ্ব তাদের অনুসরণ করে তখন প্রবেশ করবে এনলাইটেনমেন্টের এক নতুন পর্যায়ে।
কিন্তু তারপর কী হলো? সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল। কমিউনিসমের বাজার পড়ে গেল। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে দেখা গেল, এই অ্যাকাডেমিকদের লেখাজোখা আর বক্তব্য, কারও মনে নেই। তারা এবং তাদের কাজ বিস্মৃত। তাদের পুরো আন্দোলনের স্থান হলো ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।
আজ যারা অশালীনতা আর অবাধ্যতার দিকে আহ্বান করছে, যারা আলিমদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে এবং তাদের ওপর অপবাদ দিচ্ছে, যারা মুসলিমদের অন্তরে বিভ্রান্তি আর সংশয় তৈরি করছে, যারা শরীয়াহ পরিবর্তনের দাবি আর চক্রান্ত করছে সেই মডার্নিস্ট লিবারেল মুসলিমরা, নিকট অতীতের কমিউনিস্ট মুসলিমদের মতো ঠিক সেই একই পথে, একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে।
আল্লাহ তাদের পরিণতিকে ত্বরান্বিত করুন।

টিকাঃ

📘 সংশয়বাদী > 📄 ‘ইসলামী সংস্কার’ নামক হাইড্রা

📄 ‘ইসলামী সংস্কার’ নামক হাইড্রা


তথাকথিত প্রগতিশীল কিংবা সংস্কারবাদী মুসলিমদের ধ্যানধারণার খণ্ডন করা কি জরুরি?
না। এদের সাথে বিতর্ক করা অর্থহীন, কারণ তাদের কোনো উসুল নেই। কোনো স্থায়ী মূলনীতি নেই। তারা যেসব বিচিত্র, আজগুবি মত নিয়ে হাজির হয়, সেগুলোর পেছনে কোনো স্পষ্ট কাঠামো নেই। তাদের অবস্থানকে যখন একদিক থেকে আক্রমণ করবেন সাথে সাথে তারা সুর পাল্টে অন্য দিকে চলে যাবে। ক্রমাগত গোলপোস্ট সরাবে। শেষ পর্যন্ত আলোচনা কোনোদিকেই আগাবে না। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথাগুলো বলছি।
এসব প্রগতিশীল কিংবা সংস্কারবাদীদের অবস্থানকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণের জন্য তাদের সাথে বিতর্ক করা জরুরি না; বরং ওই আদর্শগুলোকে আক্রমণ করুন, যেগুলো তাদের অবস্থানের মূল ভিত্তি-অর্থাৎ লিবারেল-মডার্নিস্ট চিন্তা।
নিচের উদাহরণটা দেখুন, হিজাব আর পাবলিক প্লেইসে নারী-পুরুষের পৃথক অবস্থান নিয়ে কথিত মুসলিম সংস্কারবাদীরা অনেক চেঁচামেচি করে। এসব বিধান পুরুষতান্ত্রিক, এগুলো যুলুম, ইত্যাদি ইত্যাদি। এদের মধ্যে যারা একটু সূক্ষ্মবুদ্ধির, তারা ইসলামী ইতিহাস থেকে বেছে বেছে এমন কিছু উদাহরণ বের করে নিয়ে আসে, যেগুলো তাদের বক্তব্যের পক্ষে যায়। তারপর এর সাথে 'মাকাসিদ-ভিত্তিক বিশ্লেষণ' এর খিচুড়ি বানিয়ে উপস্থাপন করে।
অনেকে এদের সবগুলো ভুল ধরে ধরে দেখাতে চান। কুরআন, সুন্নাহ, মাকাসিদুশ শরীয়াহ, মাসলাহাসহ ফিকহের বিভিন্ন নীতির বিকৃতি ও অপপ্রয়োগ-প্রতিটা পয়েন্ট তারা দলীল-প্রমাণসহ বিস্তারিত আলোচনা করে দেখান। নিঃসন্দেহে এটা প্রশংসনীয়। কিন্তু দিনশেষে এটাতে তেমন একটা কাজ হয় না, কারণ ভুল ধরিয়ে দেয়া মাত্র সংস্কারবাদী তার বক্তব্য বদলে ফেলে। একইরকমের জোড়াতালি দিয়ে অন্য যুক্তি নিয়ে আসে। এদের অবস্থা গ্রীক পুরানের হাইড্রা দানবের[৯৪] মতো। একটা মাথা কাটা হলে সেই জায়গায় নতুন দুটো মাথা উদিত হয়।
এ দানবকে মারার কার্যকরী উপায় হলো সোজা এর হৃৎপিণ্ডে আঘাত করা। সংস্কারবাদীদের পালের হাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে যখন পোশাক, অত্যাচার, শোষণ, পুরুষতন্ত্র, নারী-পুরুষের ভূমিকার মতো বিষয়গুলোর ব্যাপারে মডার্নিস্ট, লিবারেল ধারণাগুলোকে আক্রমণ করা হবে এবং এগুলোকে ভুল প্রমাণ করা হবে। সংস্কারবাদীদের অধিকাংশই আসলে ভাসাভাসা চিন্তা করতে অভ্যন্ত। নিজেদের আদর্শের শেকড় নিয়ে এরা কখনো গভীরভাবে চিন্তা করেনি। কখনো ক্রিটিক করার চেষ্টা করেনি। কাজেই মূলে আঘাত করলে এদের বালুর প্রাসাদ খুব দ্রুত ধসে পড়ে।
ব্যাপারটা আসলে একদিক থেকে দুঃখজনক। নিজেদের ঈমানকে এরা এত নড়বড়ে কিছু ধারণার ওপর ভিত্তি করে ধ্বংস করছে যেগুলোর কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক শক্তি নেই। এগুলো প্রাসঙ্গিক হবার একমাত্র কারণ হলো এগুলো সময়ের ট্রেন্ড হওয়া।

টিকাঃ
[৯৪] হাইড্রা-গ্রিক পুরাণে বর্ণিত জলদানবী। গ্রিক পুরাণ অনুসারে: হাইড্রা দানবীর ৯টি মাথা ছিল, যার মধ্যে একটি ছিল অমর। বাকি মাথাগুলোর একটিকে কেটে ফেলা হলে কাটা জায়গা থেকে দুটো নতুন মাথা গজাত। হারকিউলিস হাইড্রাকে হত্যা করে। অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00