📄 প্রগতিবাদ এবং ফিরাউনের উত্তরসূরি
ইতিহাসের ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রগতিবাদী না। কুরআনে বর্ণিত মুসা, ইসা, ইউসুফ, ইব্রাহিম (আলাইহিমুস সালাম) এর মতো নবীদের ঘটনা জানার সময় আমাদের ভাবা উচিত না যে এগুলো কেবল অতীতের কাহিনি, আর আমরা হলাম আধুনিক সময়ের মানুষ। আমাদের পৃথিবী আলাদা। আমাদের সমাজ, প্রতিষ্ঠান, সরকারগুলো অনেক বেশি উন্নত এবং সূক্ষ্ম।
না, এক মুহূর্তের জন্যও এভাবে চিন্তা করা যাবে না। কারণ, এটা কাফিরদের চিন্তা। মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে এটা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহ বলেছেন- ...যারা কুফরী করেছে তারা বলে, 'এটা পূর্ববর্তীদের কল্পকাহিনি ছাড়া কিছুই নয়।' [তরজমা, সূরা আল-আন'আম, ২৫]
পূর্ববর্তী নবী এবং তাঁদের শত্রুদের মধ্যকার সংঘাতের বর্ণনা আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন। এর কারণ আছে। আমরাও সেই একই সংঘাতের মুখোমুখি। দুনিয়াতে যেমন 'নবীদের ওয়ারিশ'-রা আছে, তেমনিভাবে ইবলিশ, ফিরআউন, আবু জাহল এবং আবু লাহাবের উত্তরসূরিরাও আছে। এই বাস্তবতার ব্যাপারে অন্ধ হয়ে থাকলে, আমার রবের সতর্কতাবাণী অগ্রাহ্য করলে, আমরা অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্রমণের সম্মুখীন হব।
টিকাঃ
📄 জ্ঞানের ধারণা—আধুনিকতা বনাম ট্র্যাডিশান
জ্ঞান হলো এমন কিছু যা বই, হার্ড ড্রাইভ কিংবা ডিজিটাল ক্লাউডে খুঁজে পাওয়া যায়-আধুনিক এই ধারণা একটা বিচ্ছিন্ন চিন্তা। ইসলামী ইলমের সিলসিলা এ ধরনের 'জ্ঞানের' ওপর গড়ে ওঠেনি। প্রকৃত জ্ঞান বিমূর্ত হয় না। সত্যিকারের জ্ঞান কখনো রক্তমাংসের মানুষ থেকে আলাদা হয় না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আল্লাহ ওয়াহি নাযিল করেছেন জিব্রিল (আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে। সেই জ্ঞান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখিয়েছেন তাঁর সাহাবীগণকে (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)। সাহাবাগণ শুধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা থেকে শিক্ষা নেননি। তাঁরা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তাঁর কাজ, তাঁর আচার-আচরণ, এমনকি তাঁর নীরবতা থেকেও। কাজেই জ্ঞানের প্রবাহের মাধ্যম হলো মানুষ। এ কারণেই ইসলামী জ্ঞানে ইসনাদ বা সনদের (বর্ণনাসূত্র) ধারণা এত গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহর নাযিলকৃত ইলমের কিছু অংশ সত্যিকারভাবে জানার দাবি করতে হলে, যাদের মাধ্যমে এই ইলম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে-শেষ পর্যন্ত আপনার উস্তাদের মাধ্যমে আপনার কাছে এসে পৌঁছেছে-সেই ধারা সম্পর্কে আপনাকে জানতে হবে। ইন্টারনেট থেকে কোনো বই নামিয়ে পড়ে ফেলা কখনোই এর বিকল্প হতে পারে না। এর মাধ্যমে বড়জোর কোনো রচনার সাথে পরিচিত হওয়া যায়, এর বেশি কিছু না।
আমাকে ভুল বুঝবেন না, যদি সঠিকভাবে করা হয় তাহলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জানার অনেক উপকারিতা আছে। তবে আলিম হতে হলে, দ্বীনের বিষয়ে কর্তৃত্বের সাথে কথা বলতে হলে অনেক ক্ষেত্রে ইসনাদ একটা শর্ত। এভাবেই আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে হেফাযত করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'আল্লাহ তাআলা ইলমকে এমনভাবে তুলে নেবেন না যে বান্দাদের (অন্তর) থেকে তা তুলে নিলেন; বরং ইলমকে তুলে নেবেন আলিমদের তুলে নেওয়ার মাধ্যমে। অবশেষে যখন আলিম থাকবে না তখন লোকেরা বেইলম লোকদের নেতা বানাবে আর তারা ইলম ছাড়া ফতোয়া দেবে। ফলে নিজেরা গোমরাহ হবে, অন্যদের গোমরাহ করবে।[৮২]
এর সাথে জ্ঞানের আধুনিক ধারণার তুলনা করে দেখুন। আধুনিক ধারণায় জ্ঞান বিমূর্ত। জনমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। আর এর কোনো নৈতিক অক্ষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সের কোনো ক্লাসে যান। ফর্মুলাগুলো কীভাবে এল, কে কাকে শেখাল-এ ধরনের ইতিহাসের আলোচনা খুব কমই দেখবেন, বা একেবারেই দেখবেন না। হয়তো এ ধরনের বিচ্ছিন্নতা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে থাকতে পারে। হয়তো বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এমন হলে সমস্যা নেই। কিন্তু বিশ্বাসের ক্ষেত্রে, ধর্মের ক্ষেত্রে এটা হতে পারে না। দ্বীনের ব্যাপারে জ্ঞানের সব উৎস আমাদের অতীতে। তাই অতীত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার অর্থ সেই জ্ঞান থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। জ্ঞানের ব্যাপারে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ধারণাকে আমরা যেন প্রকৃত দ্বীনি জ্ঞান মনে করে না বসি।
টিকাঃ
[৮২] সহীহ বুখারী ও মুসলিম
📄 সত্যিকারের মুক্তচিন্তক কে?
ওই নাস্তিক- সত্যিকারের মুক্তচিক্তক কে?
১) যে সেক্যুলার পৃথিবীতে বসবাস করে।
২) যে সেক্যুলার স্কুলে পড়াশোনা করে, যেসব স্কুলের কারিকুলাম গড়ে উঠেছে সেক্যুলার দর্শনের ভিত্তিতে। ক্রমাগত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা আর সমালোচনার ভিত্তিতে।
৩) যে এমন এক উন্নাসিক কালচারের অংশ, যা স্রষ্টা কিংবা ধর্মকে স্বীকার করে না।
৪) যে প্রতিদিন মিডিয়াতে এমন অগণিত সিনেমা, সিরিয, ডকুমেন্টারি কিংবা গান দেখছে যেগুলো হয় স্রষ্টাকে উপেক্ষা করে অথবা স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
৫) যে এমন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে অবস্থান করে যেখানে ধার্মিক হবার মানে বোকাসোকা হাবাগোবা গণ্য হওয়া, আর ধর্মের ব্যাপারে সংশয়বাদী হবার মানে এনলাইটেন্ড বা আলোকিত হওয়া।
নাকি সত্যিকারের মুক্তচিক্তক ওই মুসলিম-
১) যে সেক্যুলার বিশ্বে বসবাস করে
২) সেক্যুলার স্কুলে পড়াশোনা করে। যেসব স্কুলের কারিকুলাম গড়ে উঠেছে সেক্যুলার দর্শনের ভিত্তিতে। ক্রমাগত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা আর সমালোচনার ভিত্তিতে।
৩) যে এমন এক উন্নাসিক সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে থাকে, যা ইসলামকে সেকেলে, পশ্চাৎপদ এবং জঙ্গিবাদী মনে করে
৪) যে প্রতিদিন মিডিয়াতে এমন অগণিত সিনেমা, সিরিয, ডকুমেন্টারি কিংবা গানের মুখোমুখি হয়, যেগুলো হয় স্রষ্টাকে উপেক্ষা করে অথবা স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে
৫) যে এমন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে অবস্থান করে যেখানে ধার্মিক হবার মানে বোকাসোকা হাবাগোবা গণ্য হওয়া, আর ধর্মের ব্যাপারে সংশয়বাদী হবার মানে হলো এনলাইটেন্ড বা আলোকিত হওয়া। আর মুসলিম হবার অর্থ হলো বোকাসোকা হওয়া অথবা মধ্যযুগীয় বর্বর হওয়া।
এতকিছুর পরও সে ইসলামের ওপর অটল থাকে। শত প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জ্বলন্ত কয়লার মতো করে সে ইসলামকে আঁকড়ে ধরে রাখে।
কে আসলে স্রোতের বিপরীতে যাচ্ছে? দুর্বার প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে কে সত্যের অনুসরণ করছে?
টিকাঃ
📄 নৈতিকতার যৌক্তিক গতিপথ
আমরা প্রায়ই কিছু মানুষকে বলতে শুনি- ইসলামী আইনকে যুগোপযোগী করে তোলা দরকার। আজকের পৃথিবী আর ১৪০০ বছর আগের আরবের বাস্তবতা এক না। যেহেতু সময় বদলেছে তাই ইসলামী আইন এবং নীতিও বদলানো দরকার।
প্রথমত, মানুষ যত বলে পরিবর্তন আসলে অত হয়নি। মানুষ এখনো মানুষই আছে। আমাদের মৌলিক প্রকৃতিতে এমন কোনো ব্যাপক পরিবর্তন আসেনি, যার জন্য প্রগতিবাদী আর সংস্কারবাদী মুসলিমদের কথামতো ইসলামের মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এই পুরো বক্তব্য আসলে আইন এবং নৈতিকতার গতিপথের ব্যাপারে তাদের ভুল ধ্যানধারণা এবং বিভ্রান্তির বহিঃপ্রকাশ। পৃথিবী কেমন, সেটা বর্ণনা করা নৈতিকতার কাজ না। নৈতিকতা আলোচনা করে, 'পৃথিবী কেমন হওয়া উচিত', তা নিয়ে। পৃথিবী যা ঘটছে তার ভিত্তিতে নৈতিক অবস্থান বদলে ফেলা তাই যুক্তির দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ। হ্যাঁ, সময়ের সাথে আমরা হয়তো এমন কোনো কিছু জানতে পারি, যা আমাদের নৈতিক অবস্থানের প্রয়োগকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু এর ফলে মূলনীতি বদলাবে না।
উদাহরণ-আমরা জানি রিবা হারাম। সুদ অনৈতিক। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে সব জায়গাতে রিবা প্রচলিত। কেউ এখন বলে বসতে পারে, রিবার ব্যাপারে কতটা কঠোর হওয়া উচিত, সেটা এই 'নতুন বাস্তবতার' আলোকে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। ইসলামের একধরনের অর্থনৈতিক 'সংস্কার' দরকার।
কিন্তু এই বাস্তবতা এমন নতুন কিছু না, যার জন্য এমন 'সংস্কার' করতে হবে। বেচাকেনা, লাভক্ষতির নীতি আজও একই আছে। মানবসভ্যতার সূচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত এসব নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। খুঁটিনাটি কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে এবং আলিমগণ এ ধরনের বাস্তবতাগুলো মাথায় রেখেই যুগে যুগে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু মূল নীতিমালাগুলো অপরিবর্তনীয়। ধ্রুব। পুরো পৃথিবীও যদি রিবায় নিমজ্জিত হয়ে যায়, তাহলে মুসলিমদের দায়িত্ব হবে এই বিদ্যমানতার প্রতি আরও তীব্রভাবে বিরোধী হওয়া। আরও সজাগ হওয়া।
আমারা চাই ইসলামী নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের ভিত্তিতে পৃথিবীর উন্নতি করতে চাই। পৃথিবীর চাহিদা কিংবা রীতি অনুযায়ী আমরা আমাদের নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ পালটে ফেলি না।
হ্যাঁ, কখনো কখনো পৃথিবীর অবস্থা বদলানো অসম্ভব মনে হতে পারে। কখনো কখনো সত্য ও ইনসাফ থেকে এত বেশি বিচ্যুতি দেখা যায়, যে একে অপ্রতিরোধ্য মনে হয়। কিন্তু আমাদের কখনো আশা হারানো উচিত না। কখনো উচিত না সমগ্র মানবজাতির প্রতি নায়ালিস্টিক [৮৩] ঘৃণায় নিমজ্জিত হওয়া।
এ ব্যাপারে নিচের হাদীসটির কথা চিন্তা করে দেখুন- 'যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগমুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তাহলে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।[৮৪]
পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন, সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাওয়া আমাদের দায়িত্ব।
টিকাঃ
[৮৩] নায়ালিসম (Nihilism)—বাংলায় ধ্বংসবাদ বা নিরর্থবাদ। নায়ালিসম শব্দটি এসেছে ল্যাটিন-nihil-থেকে। যার অর্থে 'কিছুই না/nothing। নায়ালিসম একধরনের দার্শনিক অবস্থান, যা মনে করে সব মূল্যবোধ এবং নীতিনৈতিকতা দিনশেষে ভিত্তিহীন। মহাবিশ্ব এবং মানবঅস্তিত্ব উদ্দেশ্যহীন এবং অর্থহীন। সব অর্থ আর নৈতিকতার আলোচনা মানুষের বানানো, অর্থহীন এবং অকার্যকর। নায়ালিসম সব ধরনের ধর্মীয়, সামাজিক, নৈতিক রীতিনীতি অস্বীকার করে। নায়ালিস্ট-নায়ালিসমে বিশ্বাসী ব্যক্তি। - অনুবাদক
[৮৪] মুসনাদ আহমাদ