📄 নৈতিক প্রগতির অসংলগ্নতা
লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীরা (নাস্তিক, হিউম্যানিস্ট এবং তথাকথিত সংস্কারপন্থী মুসলিমরাও এর অন্তর্ভুক্ত) মনে করে সময়ের সাথে নৈতিকতার পরিবর্তন হওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। তাদের চোখে এটা এক প্রাকৃতিক এবং অবধারিত প্রক্রিয়া, যা সবার মেনে নেয়া উচিত। আসলে তারা নৈতিকতার ব্যাপারে বিভ্রান্তির মধ্যে আছে। সময়ের সাথে ধর্মীয় নৈতিকতাকে ছুঁড়ে ফেলার মধ্যে তারা কোনো সমস্যা দেখে না, কারণ ধর্মীয় বিধান এবং অবস্থানকে তারা কখনো নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক মনে করত না। যেমন তারা বলে-
অতীতে বিয়ে-বহির্ভূত যৌনতাকে অনৈতিক মনে করা হতো ধর্মীয় অনুভূতির কারণে। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। এখন আর আমরা এটাকে খারাপ মনে করি না, কারণ আমাদের অগ্রগতি হয়েছে।
এ ধরনের চিন্তাধারা যে তালগোল পাকানো তা সহজেই দেখানো যায়।
এমন কোনো একটা মূল্যবোধ বা নৈতিক অবস্থানের কথা চিন্তা করুন যেটা মেনে চলাকে লিবারেল-সেক্যুলাররা বাধ্যতামূলক মনে করে। যেমন, জাতিগত বা বর্ণগত সমতা (racial equality)। এবার তাদের প্রশ্ন করুন-
বর্ণগত সমতাকে আজ নৈতিক মনে করা হয়। কিন্তু সময়ের সাথে এটা তো পাল্টাতে পারে, তাই না? একসময় হয়তো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদকেও নৈতিক বা গ্রহণযোগ্য মনে করা হবে। হয়তো নৈতিকতার বিবর্তনে একসময় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ অনুসরণীয় মূল্যবোধ হবে। সবাই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শ অনুসরণের চেষ্টা করবে। তখন কি তুমি সেটাকে নৈতিক বলে মেনে নেবে? হয়তো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদে আসলে আপত্তি করার মতো কিছু নেই। আমাদের সীমিত জ্ঞানের কারণে এটা আমরা এখন বুঝতে পারছি না, কিন্তু ভবিষ্যতের মানুষ বুঝতে পারবে। যিনাকে একসময় খারাপ মনে করা হতো কিন্তু আধুনিক মানুষ 'আবিষ্কার' করল যিনার মধ্যে আসলে খারাপ কিছু নেই। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের ক্ষেত্রেও তো এমন ঘটতে পারে, তাই না? পার্থক্য কোথায়? এভাবে কি নৈতিকতার অগ্রগতি, প্রগতি, বিবর্তন হতে পারে না?
এ প্রশ্নের জবাবে কেউ হয়তো বলতে পারে-নৈতিকতার বিবর্তন এলেমেলোভাবে হয় না। এর অগ্রগতি হয় একটা নির্দিষ্ট দিকে। সময়ের সাথে সাথে আমরা কুসংস্কার কাটিয়ে উঠি। ক্ষতিকর বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে শিখি। এভাবে আমাদের নৈতিকতা আরও নির্ভুল হয়ে ওঠে। আর সত্যিকার অর্থে একমাত্র অনৈতিক কাজ হলো অন্য কারও ক্ষতি করা। একে বলা হয় 'হার্ম প্রিন্সিপাল'।[৮০]
লিবারেল-সেক্যুলারিসমে দীক্ষিত মানুষদের মধ্যে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। তারা বলে, যিনা আসলে মানুষের ক্ষতি করে না। এটা আধুনিক মানুষ আবিষ্কার করেছে। কাজেই যিনাকে অনৈতিক মনে করার কোনো কারণ নেই (যদিও আসলে এর বিপরীত অনেক প্রমাণ ও উদাহরণ আছে)। একইভাবে আমরা আবিষ্কার করেছি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতাদর্শ ক্ষতিকর, অতএব তা অনৈতিক।
কিন্তু এখানে একটা ঘাপলা আছে। একটু পিছিয়ে আসলে বিষয়টা ধরা পড়ে। হার্ম প্রিন্সিপাল যদি সকল নৈতিকতার মাপকাঠি হয় তাহলে হার্ম প্রিন্সিপালেরও তো বিবর্তন হতে পারে। এই নীতির মধ্যেও তো পরিবর্তন আসার কথা, তাই না? ভেবে দেখুন, যদি নৈতিকতা পরিবর্তনশীল হয় এবং নৈতিকতার একমাত্র মূলনীতি হয় হার্ম প্রিন্সিপাল, তাহলে হার্ম প্রিন্সিপালের মধ্যেও তো পরিবর্তন আসার কথা।
কিন্তু লিবারেল সেক্যুলারিস্টরা কি এ কথা মেনে নেবে?
হয়তো একসময় আমরা আবিষ্কার করব অনেক ক্ষেত্রে মানুষের ক্ষতি করাও নৈতিকভাবে বৈধ হতে পারে, এবং হার্ম প্রিন্সিপাল আসলে অতীতের সেকেলে, অচল রদ্দি মাল ছাড়া আর কিছু না।
লিবারেল-সেক্যুলারিস্টরা যদি বলে এমন হওয়া সম্ভব না, হার্ম প্রিন্সিপাল সর্বাবস্থায়, সকল সময়ে বৈধ এবং বাধ্যতামূলক-অর্থাৎ ধ্রুব সত্য-তাহলে তারা আসলে নৈতিকতার ক্ষেত্রে প্রগতিশীল না; বরং তারা মনে করে তাদের নৈতিকতাই পরম সত্য এবং ধ্রুব। তাহলে প্রশ্ন হবে-মুসলিমরাও নৈতিকতার এক পরম, ধ্রুব মানদণ্ডে বিশ্বাস করে। পরম নৈতিকতায় বিশ্বাস করার কারণে মুসলিমদের কেন সমালোচনা করা হচ্ছে?
আসলে হার্ম প্রিন্সিপালের খণ্ডনও বেশ সোজা।
ক্ষতির সংজ্ঞা কী?
এই সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে?
এই সংজ্ঞার ভিত্তি কী?
ক্ষতির ধারণা গড়ে ওঠে ব্যক্তির নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের ভিতের ওপর। কোন জিনিসটাকে আপনি ক্ষতিকর মনে করেন সেটা নির্ভর করে আপনার নৈতিক এবং অন্টোলজিকাল কমিটমেন্টের ওপর।[৮১] তাই এ প্রশ্নগুলো আনলেই হার্ম প্রিন্সিপালের অসাড়তা স্পষ্ট হতে শুরু করে।
তবে আমি এখানে মনোযোগ দিতে চাই 'পরিবর্তনশীল নৈতিকতা'-র ধারণার ওপর। হার্ম প্রিন্সিপালকে চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করা লোকেরা সময়ের সাথে নৈতিকতার পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করে ক্ষতির ব্যাপারে নতুন নতুন আবিষ্কারের ফাংশান হিসেবে। অর্থাৎ কোন জিনিস ক্ষতিকর আর কোন জিনিস ক্ষতিকর না, সেটা আমরা সময়ের সাথে সাথে আবিষ্কার করি। এই আবিষ্কারের ভিত্তিতে নৈতিকতার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়।
এটা তাদের বক্তব্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো 'আবিষ্কারের' এই প্রক্রিয়াটা কেমন?
ক্ষতি আবিষ্কার করার ব্যাপারটা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে আসলে কী রকম? এটা কি নতুন কোনো গ্রহ বা নতুন কোনো কেমিক্যাল আবিষ্কারের মতো? এটা কি গবেষণাগারে পরীক্ষার মাধ্যমে করা হচ্ছে? ক্ষতি কি দেখা যায়? তারচেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এ ধরনের অগ্রগতি দেখার কিংবা বোঝার সক্ষমতা সময়ের সাথে বদলায় কীভাবে? সময়ের সাথে প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে, বড় বড়, ভালো ভালো টেলিস্কোপ তৈরি হয়েছে, তাই আমরা নতুন নতুন গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ আবিষ্কার করতে পারছি। এটা বোঝা গেল। কিন্তু নতুন নতুন ক্ষতি কীভাবে আবিষ্কৃত হচ্ছে? এটা আমরা কীভাবে সনাক্ত করছি? কী দিয়ে দেখছি?
লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিশীলদের কাছে এই প্রশ্নের এমন কোনো জবাব নেই, যা আবেগপ্রসূত কিংবা ফাঁপা বুলিসর্বস্ব না। তাই সে শেষমেশ বলবে-
আসলে ক্ষতিগুলো সব সময় জানা ছিল। কিন্তু ক্ষতিগুলো দূর করার জন্যে নৈতিকতার যে পরিবর্তনগুলো দরকার ছিল, দুষ্ট, স্বার্থপর লোকেরা তা করতে দেয়নি।
এ ধরনের উত্তরের ব্যাপারে দুটো বড় আপত্তি থাকে।
প্রথমত, যেগুলোকে আজ 'ক্ষতি' মনে করা হচ্ছে, মানুষ যে সব সময়ই সেগুলোকে 'ক্ষতিকর' মনে করত তার প্রমাণ কী? বরং ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আজ এমন অনেক বিষয়কে গুরুতর রকমের ক্ষতিকর মনে করা হচ্ছে, যেগুলোকে এর আগে কখনো এভাবে দেখা হয়নি। যেমন, সমকামিতার বিরোধিতাকে আজ ক্ষতিকর মনে করা হয়। আগে মনে করা হতো না। কেবল মনের খেয়াল বশে পুরুষ লিঙ্গ বদলে নারী হবে, নারী পুরুষ হবে, আর কেউ এটার বিরোধিতা করলে সেটাকে ক্ষতিকর বলা হবে-এমন কোনো অবস্থান ইতিহাসে এর আগে আমরা দেখি না। আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জেন্ডার স্টাডিসের অধীনে যেসব বিষয়কে অত্যাচার, নিপীড়ন, শোষণ কিংবা যৌন বৈষম্য বলে শেখানো হচ্ছে, সেগুলো তো ইতিহাসের এর আগে কেউ শোনেইনি। যে ধারণাগুলোর ওপর ভিত্তি করে এসব ক্ষেত্রে ক্ষতি বা অন্যায়ের কথা বলে হচ্ছে, সেগুলোর জন্মই হয়েছে দুই থেকে তিন দশক আগে। কাজেই লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীরা যেসব জিনিসকে আজ 'ক্ষতিকর' মনে করে, সেগুলোকে সব সময় ক্ষতিকর মনে করা হতো, এই কথা সঠিক মনে করার কোনো কারণ নেই।
দ্বিতীয়ত, 'ক্ষতিগুলো সব সময় জানা ছিল, কিন্তু দুষ্ট লোকেরা নৈতিকতার পরিবর্তনের পথ আটকে রেখেছিল'-এ উত্তর আসলে 'পরিবর্তনশীল নৈতিকতার' ধারণার বিরুদ্ধে যায়। ক্ষতি যদি সব সময় জানা থাকে তাহলে ক্ষতি আসলে পরিবর্তনশীল না। তাহলে নৈতিক অগ্রগতি কোথায় হলো?
লিবারেল-সেক্যুলাররা বলবে, দুষ্ট লোকেরা যখন পরাজিত হয় আর ভালো লোকেরা যখন সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, তখন অগ্রগতি ঘটে। কিন্তু এটা নৈতিক অগ্রগতির বেশ দুর্বল একটা ধারণা। এ ধরনের অগ্রগতিতে সবাই বিশ্বাস করে। সবাই মনে করে ভালো-মন্দের মধ্যে চিরন্তন লড়াই চলছে। এ লড়াইয়ে অনেক সময় সত্যের পক্ষ বিজয়ী হয়। অনেক সময় মিথ্যের পক্ষ বিজয়ী হয়। অ-লিবারেল, অ-সেক্যুলার আস্তিকরাও এটা বিশ্বাস করে। কিন্তু এটাকে নৈতিকতার সেই ক্রমবিবর্তন বলা যায় না, যার কথা লিবারেল-সেক্যুলাররা বলে থাকে।
আসলে খুঁটিয়ে দেখতে গেলে নৈতিক প্রগতির ধারণা ধোপে টিকে থাকে না। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই তা ধসে পড়ে। এ ধারণা গড়ে উঠেছে বেশ গুরুতর কিছু জ্ঞানতাত্ত্বিক ত্রুটির ওপর। আর এই ত্রুটিগুলোর অনেকগুলো এসেছে হার্ম প্রিন্সিপালের অসম্পূর্ণতা এবং ত্রুটি থেকে।
টিকাঃ
[৮০] হার্ম প্রিন্সিপাল-মানুষের যা ইচ্ছে করার অধিকার আছে যতক্ষণ না সেটা অন্য কারোর ক্ষতির কারণ হচ্ছে। যদি অন্য কারও ক্ষতি না হয়, তাহলে মানুষের কোনো কাজে বাধা দেয়ার অধিকার সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই। বাধা কেবল তখনই দেয়া যাবে যখন ব্যক্তির কাজ অন্য কারোর ক্ষতি করবে। কোনো কাজ নৈতিকভাবে অননুমোদিত কিংবা অবৈধ হবে—যখন তা অন্যের ক্ষতি করবে। এর বাইরে বাকি সব বৈধ, বাকি সব অনুমোদিত। অনুবাদক
[৮১] অনটোলজি-অনটোলজি (Ontology)-বাংলায় পরাবিদ্যা বা তত্ত্ববিদ্যা। দর্শনের ওই শাখা, যা বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে। কী আছে, কী নেই? কোনটা বাস্তব, কোনটা অবাস্তব? অস্তিতশীল কী? অস্তিত্বশীল হবার অর্থ কী? বস্তু কী? সত্তা কী?- এ ধরনের প্রশ্নগুলো অনটোলজির আলোচনা। অর্থাৎ এখানে লেখক বলছেন-'ক্ষতির' ব্যাপারে একজন ব্যক্তির ধারণা নির্ভর করে অনটোলজির প্রশ্নগুলোর উত্তর সে কীভাবে দিচ্ছে তার ওপর। অনুবাদক
📄 আমরাই সর্বশেষ, আমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ
নৈতিক প্রগতির ধারণার অন্যতম চালিকাশক্তি হলো বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ওপর বিশ্বাস। আধুনিক যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যেহেতু এত অগ্রগতি হয়েছে, তাই ধরে নেয়া যায় নৈতিকভাবেও অগ্রগতি হয়েছে। প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের মতোই, নৈতিক জ্ঞানের দিক থেকেও আমাদের সভ্যতা অতীতের সভ্যতাগুলোর চেয়ে অগ্রসর।
এ ধরনের চিন্তা আসলে নতুন না। যুগে যুগে সব বড় বড় সভ্যতা নিজেদের ব্যাপারে এমন ধারণা পোষণ করে এসেছে। আল্লাহ কুরআনে সরাসরি এই মনোভাবের বিরুদ্ধে বলেছেন। আল্লাহ আমাদের ওইসব সভ্যতার কথা চিন্তা করতে বলেছেন, বিভিন্ন প্রযুক্তিগত অর্জন সত্ত্বেও ঔদ্ধত্য এবং আল্লাহর ও তাঁর রাসূলদের (আলাইহিমুস সালাম) বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণে যারা ধ্বংস হয়ে গেছে। আল্লাহ আমাদের আরও জানিয়েছেন, শক্তি, ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত অর্জনের বদৌলতে নিজেদের ন্যায়পরায়ণ এবং নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ মনে করা ভুল এবং ঔদ্ধত্যের পরিচায়ক। শুধু তা-ই না, নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর সভ্যতা মনে করাও সঠিক না। এমনও সভ্যতা ছিল যারা শক্তি আর সংখ্যায় আরও প্রভাবশালী ছিল। আল্লাহ বলেছেন,
আর তারা কি যমীনে ভ্রমণ করে না? তাহলে তারা দেখত, কেমন ছিল তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম। অথচ তারা তো শক্তিতে ছিল এদের চেয়েও প্রবল। আল্লাহ তো এমন নন যে, আসমানসমূহ ও যমীনের কোনো কিছু তাকে অক্ষম করে দেবে। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। [তরজমা, সূরা ফাতির, ৩৫]
এরা কি যমীনে বিচরণ করে না? তাহলে দেখত, তাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের পরিণতি কেমন হয়েছিল। তারা এদের তুলনায় যমীনে শক্তিমত্তা ও প্রভাব বিস্তারে প্রবলতর ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের পাকড়াও করলেন তাদের পাপাচারের কারণে। আর তাদের জন্য ছিল না আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো রক্ষাকারী। [তরজমা, সূরা গাফির, ২১]
তারা কি যমীনে ভ্রমণ করেনি, তা হলে তারা দেখত, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল? তারা যমীনে ছিল তাদের চেয়ে সংখ্যায় অধিক, আর শক্তিতে ও কীর্তিতে তাদের চেয়ে অধিক প্রবল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তা তাদের কোনো কাজে আসেনি। রক্ষাকারী। [তরজমা, সূরা গাফির, ৮২]
তারা কি যমীনে ভ্রমণ করে না? তাহলে তারা দেখত যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল। তারা শক্তিতে তাদের চেয়েও প্রবল ছিল। আর তারা জমি চাষ করত এবং তারা এদের আবাদ করার চেয়েও বেশি আবাদ করত। আর তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এসেছিল। বস্তুত আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তাদের প্রতি যুলম করবেন, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজদের প্রতি যুলম করত। [তরজমা, সূরা আর-রুম, ৯]
...আমি যাকে ইচ্ছা তার মর্যাদা উঁচু করে দিই এবং প্রত্যেক জ্ঞানীর ওপর রয়েছে একজন মহাজ্ঞানী। [তরজমা, সূরা ইউসুফ, ৭৬]
অতীতে কি এমন কোনো সভ্যতা ছিল, যা ছিল প্রযুক্তিগতভাবে আজকের সভ্যতার চেয়েও অগ্রসর? আল্লাহই ভালো জানেন। এমন কোনো সভ্যতা ছিল না, এটা আমাদের ধরে নেয়া উচিত না। তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষ কত 'আধুনিক' সেটা দিয়ে তাদের মূল্যবোধকে বিচার করা উচিত না; বরং মানুষের মূল্যবোধের বিচার করা উচিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনীত শরীয়াহর আলোকে।
টিকাঃ
📄 প্রগতিবাদ এবং ফিরাউনের উত্তরসূরি
ইতিহাসের ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রগতিবাদী না। কুরআনে বর্ণিত মুসা, ইসা, ইউসুফ, ইব্রাহিম (আলাইহিমুস সালাম) এর মতো নবীদের ঘটনা জানার সময় আমাদের ভাবা উচিত না যে এগুলো কেবল অতীতের কাহিনি, আর আমরা হলাম আধুনিক সময়ের মানুষ। আমাদের পৃথিবী আলাদা। আমাদের সমাজ, প্রতিষ্ঠান, সরকারগুলো অনেক বেশি উন্নত এবং সূক্ষ্ম।
না, এক মুহূর্তের জন্যও এভাবে চিন্তা করা যাবে না। কারণ, এটা কাফিরদের চিন্তা। মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে এটা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহ বলেছেন- ...যারা কুফরী করেছে তারা বলে, 'এটা পূর্ববর্তীদের কল্পকাহিনি ছাড়া কিছুই নয়।' [তরজমা, সূরা আল-আন'আম, ২৫]
পূর্ববর্তী নবী এবং তাঁদের শত্রুদের মধ্যকার সংঘাতের বর্ণনা আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন। এর কারণ আছে। আমরাও সেই একই সংঘাতের মুখোমুখি। দুনিয়াতে যেমন 'নবীদের ওয়ারিশ'-রা আছে, তেমনিভাবে ইবলিশ, ফিরআউন, আবু জাহল এবং আবু লাহাবের উত্তরসূরিরাও আছে। এই বাস্তবতার ব্যাপারে অন্ধ হয়ে থাকলে, আমার রবের সতর্কতাবাণী অগ্রাহ্য করলে, আমরা অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্রমণের সম্মুখীন হব।
টিকাঃ
📄 জ্ঞানের ধারণা—আধুনিকতা বনাম ট্র্যাডিশান
জ্ঞান হলো এমন কিছু যা বই, হার্ড ড্রাইভ কিংবা ডিজিটাল ক্লাউডে খুঁজে পাওয়া যায়-আধুনিক এই ধারণা একটা বিচ্ছিন্ন চিন্তা। ইসলামী ইলমের সিলসিলা এ ধরনের 'জ্ঞানের' ওপর গড়ে ওঠেনি। প্রকৃত জ্ঞান বিমূর্ত হয় না। সত্যিকারের জ্ঞান কখনো রক্তমাংসের মানুষ থেকে আলাদা হয় না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আল্লাহ ওয়াহি নাযিল করেছেন জিব্রিল (আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে। সেই জ্ঞান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখিয়েছেন তাঁর সাহাবীগণকে (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)। সাহাবাগণ শুধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা থেকে শিক্ষা নেননি। তাঁরা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তাঁর কাজ, তাঁর আচার-আচরণ, এমনকি তাঁর নীরবতা থেকেও। কাজেই জ্ঞানের প্রবাহের মাধ্যম হলো মানুষ। এ কারণেই ইসলামী জ্ঞানে ইসনাদ বা সনদের (বর্ণনাসূত্র) ধারণা এত গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহর নাযিলকৃত ইলমের কিছু অংশ সত্যিকারভাবে জানার দাবি করতে হলে, যাদের মাধ্যমে এই ইলম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে-শেষ পর্যন্ত আপনার উস্তাদের মাধ্যমে আপনার কাছে এসে পৌঁছেছে-সেই ধারা সম্পর্কে আপনাকে জানতে হবে। ইন্টারনেট থেকে কোনো বই নামিয়ে পড়ে ফেলা কখনোই এর বিকল্প হতে পারে না। এর মাধ্যমে বড়জোর কোনো রচনার সাথে পরিচিত হওয়া যায়, এর বেশি কিছু না।
আমাকে ভুল বুঝবেন না, যদি সঠিকভাবে করা হয় তাহলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জানার অনেক উপকারিতা আছে। তবে আলিম হতে হলে, দ্বীনের বিষয়ে কর্তৃত্বের সাথে কথা বলতে হলে অনেক ক্ষেত্রে ইসনাদ একটা শর্ত। এভাবেই আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে হেফাযত করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'আল্লাহ তাআলা ইলমকে এমনভাবে তুলে নেবেন না যে বান্দাদের (অন্তর) থেকে তা তুলে নিলেন; বরং ইলমকে তুলে নেবেন আলিমদের তুলে নেওয়ার মাধ্যমে। অবশেষে যখন আলিম থাকবে না তখন লোকেরা বেইলম লোকদের নেতা বানাবে আর তারা ইলম ছাড়া ফতোয়া দেবে। ফলে নিজেরা গোমরাহ হবে, অন্যদের গোমরাহ করবে।[৮২]
এর সাথে জ্ঞানের আধুনিক ধারণার তুলনা করে দেখুন। আধুনিক ধারণায় জ্ঞান বিমূর্ত। জনমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। আর এর কোনো নৈতিক অক্ষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সের কোনো ক্লাসে যান। ফর্মুলাগুলো কীভাবে এল, কে কাকে শেখাল-এ ধরনের ইতিহাসের আলোচনা খুব কমই দেখবেন, বা একেবারেই দেখবেন না। হয়তো এ ধরনের বিচ্ছিন্নতা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে থাকতে পারে। হয়তো বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এমন হলে সমস্যা নেই। কিন্তু বিশ্বাসের ক্ষেত্রে, ধর্মের ক্ষেত্রে এটা হতে পারে না। দ্বীনের ব্যাপারে জ্ঞানের সব উৎস আমাদের অতীতে। তাই অতীত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার অর্থ সেই জ্ঞান থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। জ্ঞানের ব্যাপারে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ধারণাকে আমরা যেন প্রকৃত দ্বীনি জ্ঞান মনে করে না বসি।
টিকাঃ
[৮২] সহীহ বুখারী ও মুসলিম