📘 সংশয়বাদী > 📄 লিবারেলিসমের নৈতিক ‘অগ্রগতি’: সম্মতি ট্যাবু!

📄 লিবারেলিসমের নৈতিক ‘অগ্রগতি’: সম্মতি ট্যাবু!


নাস্তিকদের অনেকে অজাচারকে সমর্থন করে। লরেন্স ক্রউস আর রিচার্ড ডকিন্সের মতো নাস্তিকতার বিখ্যাত আইডলরা খোলাখুলি অজাচার এর সমর্থনে বলেছে। তাদের যুক্তি হলো, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয় তাহলে সেটাকে বৈধতা দেয়া উচিত-তারা যদি সম্পর্কে মা-ছেলে, বাবা-মেয়ে, ভাই-বোন, ভাই-ভাই ইত্যাদি হয়-তবুও। এটা আসলে নাস্তিক সেক্যুলার নৈতিকতার পরিচিত ছক। ট্যাবু[৭৮] ভাঙা। ট্যাবু ভাঙাকে সেক্যুলারিসম বীরত্ব ও কৃতিত্বের কাজ মনে করে।
একসময় ব্যভিচারকে অনৈতিক মনে করা হতো। কিন্তু সেক্যুলাররা এসে বলতে শুরু করল যে এটা একটা অযৌক্তিক ট্যাবু। পায়ুকামিতাকে বরাবরই নোংরা এবং ঘৃণ্য হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সেক্যুলাররা বলতে শুরু করল এটা একটা অযৌক্তিক ট্যাবু। নিছক আবেগের বসে এর বিরোধিতা করা হচ্ছে। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে পায়ুকামের বিরোধিতা করার কোনো যৌক্তিক কারণ পাওয়া যায় না। তাই এই বিরোধিতা বৈধ না।
একই ধরনের চিন্তা অজাচারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নাস্তিক ও সেক্যুলারিস্টদের ট্যাবু-ভাঙার পুরোনো অভ্যাস অজাচারের ক্ষেত্রে এসে থামবে কেন? অজাচারের ব্যাপারে বিরোধিতাকেও তো অযৌক্তিক ট্যাবু বলা যায় তাই না? এর বিরোধিতা করার কারণ কী? শুধু আবেগের বসে বিরোধিতা করলে হবে? ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে বিরোধিতা করার মতো যৌক্তিক কোনো কারণ কি পাওয়া যায়?
সমকামিতার বৈধতার জন্য যদি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতি যথেষ্ট হয়, তাহলে অজাচারের ক্ষেত্রে কেন হবে না? একই যাত্রায় উল্টো ফল কেন? এই যুক্তিকে আরও এগিয়ে নেয়া যায়। যেমন, নাস্তিক আর সেক্যুলারদের অবস্থান থেকে কি বলা যায় না-
'আগেরকার পশ্চাৎপদ লোকেরা পায়ুকামিতাকে নোংরা, ঘৃণ্য, অস্বাভাবিক, পাপাচার মনে করত। একইভাবে আজকের পশ্চাৎপদ লোকেরা পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া যৌনসংগমকে ঘৃণ্য এবং সীমালঙ্ঘন মনে করে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই তাদের মতের কোনো যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক কারণ পাওয়া যায় না। এগুলো সবই সেকেলে ট্যাবু।'
দয়া করে কেউ আবার বলে বসবেন না যে আমি ধর্ষণের পক্ষে ওকালতি করছি। আমি শুধু নাস্তিক ও সেক্যুলারদের বানানো নৈতিকতা আর যুক্তি-কাঠামো অনুসরণের চেষ্টা করছি। পারস্পরিক সম্মতিকে নাস্তিক আর সেক্যুলাররা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, প্রায় পবিত্র কিছু একটা মনে করে। কিন্তু এই 'মনে করা'র বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী? এর যৌক্তিক প্রমাণ কী?
এমন কোনো প্রমাণ কি আছে?
নেই।
আজকের অধিকাংশ নাস্তিকরা লিবারেল মতাদর্শে বিশ্বাসী। তারা লিবারেলরা উপযোগবাদী নৈতিকতার অনুসারী। সহজ ভাষায় উপযোগবাদের অবস্থান হলো- যা কিছু আনন্দ বৃদ্ধি (ম্যাক্সিমাইয) করে আর ক্ষতি হ্রাস (মিনিমাইয) করে, তা-ই নৈতিক।
যেমন তারা বলে, যা অন্যের ক্ষতি করে না তা নৈতিক। সমকামিতা, উভকামিতা, যিনা, ব্যভিচারসহ সব ধরনের যৌন বিকৃতির পক্ষে লিবারেলদের যুক্তির মূল ভিত্তি হলো 'লাভ-ক্ষতির' এই তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যৌন আচরণের ব্যাপারে কোনো ট্যাবু থাকা অর্থহীন। কারণ, নৈতিক-অনৈতিকের আসল মাপকাঠি হলো আনন্দ আর ক্ষতির হিসেব। কারও কাছে নোংরা কিংবা ঘৃণ্য লাগলো কি না, তার কোনো মূল্য এখানে নেই। এই যুক্তি ব্যবহার করে অনেক ধরনের যৌন আচরণের উদাহরণ দেয়া যায় যেখানে পারস্পরিক সম্মতি ছাড়াও আনন্দ বাড়ে আর ক্ষতি কমে।
যেমন ভয়ারিসম (voyeurism)। বিনা অনুমতিতে বা গোপনে কারও নগ্ন, অর্ধনগ্ন শরীর বা কারও যৌনকর্ম দেখে সুখ অনুভব করাকে বলা হয় ভয়ারিসম (ঈক্ষণকামিতা)। এটা একধরনের যৌন বিকৃতি। তো ধরুন, একজন পাক্কা উপযোগবাদী লোক মহিলাদের পাবলিক টয়লেটের ভেতরে গোপন ক্যামেরা লাগিয়ে দিলো। তারপর সেই ক্যামেরার লাইভ ফিড ব্রডক্যাস্ট করা হলো সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন মানুষের কম্পিউটার কিংবা মোবাইলে। এতে মোট সামষ্টিক (নেট) আনন্দ অনেক বেড়ে যাবে, তাই না? সেই তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ কিন্তু নগণ্য। মহিলারা তো ক্যামেরার কথা জানছেই না। আর পরিচয় গোপন রাখার জন্য তাদের চেহারা ঝাপসা করে দেয়া হবে। তাহলে ক্ষতি কার হলো? মোটকথা, লাভ-লোকসানের নেট হিসেব করলে সব মিলিয়ে লাভের পাল্লা ভারী হবে।
তাহলে নাস্তিকদের লজিক অনুযায়ী বলা যায়, এ কাজটা নৈতিক। কারও কোনো ক্ষতি হচ্ছে না, অন্যদিকে যে আনন্দ পাওয়া যাচ্ছে তার মাত্রা আর পরিমাণ অনেক। এখানে পারস্পরিক সম্মতি নিয়ে ত্যানা প্যাঁচানোর কিছু নেই। এসব সেকেলে চিন্তা বাদ দিয়ে সবার উচিত মানবজাতির আনন্দ বৃদ্ধির এ প্রচেষ্টায় যোগ দেয়া। নিদেনপক্ষে এর বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকা।
লিবারেল-সেক্যুলারিস্ট আর নাস্তিকরা তাদের আদর্শে কনসিসটেন্ট হলে সমকামিতার মতো বিষয়ের পক্ষে তারা যেভাবে প্রচারণা চালায় ঠিক সেভাবে ভয়ারিসমের পক্ষেও প্রচারণা চালাত। আন্দোলন করত।
এ রকম আরও অনেক দিক থেকে প্রমাণ করা যায় নাস্তিকতা এবং সেক্যুলারিসম আসলে মোটাদাগে নায়ালিস্টিক। এই মতাদর্শগুলো তাদের যৌক্তিক উপসংহার এবং চূড়ান্ত অবস্থানে নিয়ে গেলে এগুলোর অর্থহীনতা এবং অযৌক্তিকতা স্পষ্ট হয়ে যায়।

টিকাঃ
[৭৮] ট্যাবু (taboo)-কোনো কাজ বা কথার বিরুদ্ধে সমাজ বা ধর্মের প্রচ্ছন্ন নিষেধাজ্ঞা। এমন কিছু, যার চর্চা সমাজে নিষিদ্ধ মনে করা হয়। কারণ তা ওই সমাজের সংস্কৃতি বা ধর্মের মূল্যবোধের বিরোধী, অথবা ওই কাজ বা কথা মানুষের কাছে ঘৃণ্য হিসেবে পরিগণিত। - অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 লিবারেলিসমের মেকি সহিষ্ণুতা

📄 লিবারেলিসমের মেকি সহিষ্ণুতা


লিবারেল বুলি: তোমরা অসহিষ্ণু! তরজমা: আমি যা মানি তোমরা তা মানো না
সহিষ্ণুতার একটা সংজ্ঞা হলো-সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অনুমোদিত পার্থক্য।
ফ্যাক্টরিতে বানানো পণ্য কখনো ১০০% এক রকম হয় না। কিছুটা এদিক-সেদিক থাকে। কোনো ফ্যাক্টরিতে ১০০,০০০ পিস্টন তৈরি হলে ২টা হুবহু এক হবে না। কিছু-না-কিছু পার্থক্য থাকবেই। তবে সে পার্থক্য হবে এক নির্দিষ্ট সীমার ভেতর। এটাই হলো পার্থক্যের অনুমোদিত সীমা। কোনো পিস্টন পার্থক্য-সীমার বাইরে চলে গেলে সেটা বাতিল। অকেজো ধরে নিয়ে সেটাকে আর্বজনায় ফেলে দেয়া হবে।
লিবারেলরা দেখাতে চায় যে তাদের সহিষ্ণুতা সীমাহীন। আর বাকি সবাই অসহিষ্ণু। কিন্তু বাস্তবতা হলো লিবারেল সহিষ্ণুতারও একটা নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। সীমাহীন সহিষ্ণুতা বলে কিছু নেই। এটা একটা অক্সিমোরন।[৭৯] নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সহিষ্ণুতা সব দর্শন এবং বিশ্বাসেই থাকে। ইসলামেও আছে। পার্থক্য হলো ইসলামে সহিষ্ণুতার ভিত্তি শরীয়াহ, হিকমাহ, ইসলামী হিদায়াহ। আর লিবারেলিসমের ক্ষেত্রে সহিষ্ণুতার ভিত্তি হলো এলেমেলো, ক্রমাগত বদলাতে থাকা সাংস্কৃতিক রীতিনীতি আর প্রথা।
ফ্যাক্টরির উদাহরণে ফেরত যাই। অনুমোদিত পার্থক্যের সঠিক মাত্রা ফ্যাক্টরির মেশিনগুলোতে ঠিক করে দেয়া না হলে উৎপাদিত পার্টসগুলো অকেজো এবং ত্রুটিপূর্ণ হবে। মানুষের ক্ষেত্রেও সঠিক মাপকাঠি অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে পার্থক্য বা ভ্যারিয়েশান বা বৈচিত্র্য মেনে নেয়া যায়। কিন্তু সব ধরনের পার্থক্য মেনে নেয়া যায় না। সব ধরনের ভ্যারিয়েশন চলতে দিলে সেটা হবে মানুষের দেহ, মন এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। আর মানুষ এবং মানবসমাজের জন্য কোনটা উত্তম, সেটা মানবজাতির স্রষ্টার চেয়ে আর কে বেশি ভালো জানবে?

টিকাঃ
[৭৯] দুটি পরস্পরবিরোধী শব্দ বা ধারণার একত্রীকরণ, যা কোনো যৌক্তিক অর্থ প্রকাশ করে না। যেমন-আলোকিত অন্ধকার, একসাথে একাকী, নীরব আওয়াজ ইত্যাদি। - অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 লিবারেল-সেক্যুলারিসমের ভণ্ডামি

📄 লিবারেল-সেক্যুলারিসমের ভণ্ডামি


লিবারেল-সেক্যুলারিসম বলে—কী সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। মানুষ যে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন এটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই যুক্তি দিয়ে লিবারেল-সেক্যুলারিসম আসমানী দিকনির্দেশনাকে প্রত্যাখ্যান করে। সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাই যদি মুখ্য হয় তাহলে কী সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে দিনশেষে সেটা মূল্যহীন। তাহলে আর আসমানী নির্দেশনার কী দরকার? হাতে ম্যাপ, কম্পাস, বাতি থাকার কী দরকার? সঠিক রাস্তা খুঁজে বের করার কী দরকার? গন্তব্য পৌঁছানোরও-বা কী দরকার? আমার এ পথ চলাতেই আনন্দ!
আর কোনো দর্শন, নৈতিকতার আর কোনো কাঠামো সম্ভবত লিবারেল-সেক্যুলারিসমের মতো এতটা অন্তঃসারশূন্য না। অন্যান্য মানবরচিত আদর্শ ও দর্শনগুলো আর কিছু না হোক, তাত্ত্বিকভাবে হলেও মানুষকে দিকনির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করে। এমন কিছু নির্দেশনা আর মূলনীতি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে যেগুলো মানুষকে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক প্রশান্তির দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু লিবারেল-সেক্যুলারিসমের এসব নিয়ে মাথাব্যথাই নেই। লিবারেল-সেক্যুলারিসমের বক্তব্য হলো,
সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই হলো, আর কিছু লাগবে না। কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা থাকাটাই মুখ্য। কেউ যদি স্বেচ্ছায় সবচেয়ে জঘন্য, বিপজ্জনক, কিংবা অর্থহীন সিদ্ধান্তও নেয়, তবে তা-ই সই। স্রষ্টা আমাকে বলে দেবে কী করবে হবে? ভুল সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষমা চাইতে হবে? অনুশোচনা বোধ করতে হবে? না, কক্ষনো না!
এর চেয়ে অসংলগ্ন কোনো দর্শন পৃথিবীতে আর আসেনি। তবু এই চিন্তা আধুনিক মানুষের মনে রাজত্ব করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00