📄 বাস্তবতার বর্ণনায় ইসলাম ও বিজ্ঞানের সংঘাত
কুরআন এবং হাদীসে এমন বক্তব্য এসেছে যেগুলো থেকে মনে হয় পৃথিবী সূর্যের চারদিকে আবর্তিত হয় না। সূরা কাহফের এ আয়াতটির কথা চিন্তা করুন, চলতে চলতে যখন সে (যুলকারনাইন) সূর্যের অস্তগমন-স্থানে পৌঁছল তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল পানিতে অস্ত যেতে দেখল এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল; আমি বললাম: হে যুলকারনাইন, তুমি তাদের শাস্তি দিতে পারো অথবা তাদের সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারো। [তরজমা, সূরা আল-কাহফ, ৮৬]
এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এই হাদীসটি,
একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা কি জানো, এ সূর্য কোথায় যায়? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: এ সূর্য চলতে থাকে এবং (আল্লাহ তা'আলার) আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও! অনন্তর সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল দিয়েই উদিত হয়। তা আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই উদিত হয়।
সে আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থান-স্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই সে উদিত হয়। এমনিভাবে চলতে থাকবে; মানুষ তার থেকে অস্বাভাবিক কিছু হতে দেখবে না। শেষে একদিন সূর্য যথারীতি আরশের নিচে তার নির্দিষ্ট-স্থলে যাবে। তাকে বলা হবে, উঠো এবং অস্তাচল থেকে উদিত হও। অনন্তর সেদিন সূর্য পশ্চিম গগনে উদিত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন দিন সে অবস্থা হবে তোমরা জানো? সে দিন ওই ব্যক্তির ঈমান কোনো কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি পূর্বে ঈমান আনেনি কিংবা যে ব্যক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করেনি।[৭৩]
এই আয়াত এবং হাদীসগুলোকে কীভাবে বোঝা উচিত? এগুলোকে রূপক বলে দেয়া সোজা। হয়তো আসলেই এই আয়াত এবং হাদীসে কিছুটা রূপকার্থে বলা হয়েছে। কিন্তু ঢালাওভাবে সবগুলোকে রূপক বলার সিদ্ধান্ত একটু নড়বড়ে বলে মনে হয়। আর কোনো বিকল্প কি নেই?
ধরুন, মহাবিশ্বের ব্যাপারে দুজন মানুষের জ্ঞান সমানভাবে সঠিক। দুজন দুইভাবে তাদের জ্ঞান প্রকাশ করে। একই জিনিসের বর্ণনা দেয়ার সময় দুজন আলাদা ধরনের ভাষা, ছবি এবং ধারণা ব্যবহার করে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে আক্ষরিকভাবে কোনো কিছু বর্ণনা দেয়ার সময়ও এ দুজনের ভাষা এবং বর্ণনা আলাদা হতে পারে।
একটা সহজ উদাহরণ দেখুন। সিংহের জন্য বেদুইন আরবদের অনেক নাম আছে। বরফ বোঝানোর জন্য এস্কিমোরা অনেক ধরনের শব্দ ব্যবহার করে। সিংহের ব্যাপারে আরব বেদুইন কিংবা বরফের ব্যাপারে একজন এস্কিমো যেভাবে কথা বলে, একজন প্রাণীবিদ কিংবা আবহাওয়াবিদ সেভাবে কথা বলে না। তার মানে কিন্তু এই না যে আরব বা এস্কিমো রূপক অর্থে কথা বলছে আর প্রাণীবিদ বা আবহাওয়াবিদ আক্ষরিকভাবে বর্ণনা দিচ্ছে। সবাই আক্ষরিকভাবে কথা বলছে, কিন্তু আরব-এস্কিমোদের ভাষায় এমন কিছু ধারণা আছে, যেগুলো আধুনিক বিজ্ঞানীদের ভাষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর মধ্যে অনুপস্থিত। আবার এর উল্টোটাও সত্য।
আধুনিক সময়ের মানুষ এটা ধরে নিতে অভ্যস্ত যে বিজ্ঞানের ভাষা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবতার বর্ণনা দেয়। কিন্তু আমরা—মুসলিমরা এটা মেনে নিতে বাধ্য না। এটা মেনে নেয়া আবশ্যিক না এবং এটা মেনে নেয়া উচিতও না, কারণ বিজ্ঞানের ভাষা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে।
ব্যাপারটার আরও গভীরে যাওয়া যায়। মনে করুন, দুজনের মানুষের মধ্যে প্রথম জন মহাবিশ্বের ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান রাখে। দ্বিতীয় জন রাখে না, তবে সে মনে করে মহাবিশ্বের ব্যাপারে তার জ্ঞান সঠিক।
এবার আগের উদাহরণে ফিরে যাওয়া যাক। সিংহের ব্যাপারে বেদুইনের জ্ঞান শতাব্দীর পর শতাব্দী সিংহের সাথে একই পরিবেশে বসবাস করা অসংখ্য প্রজন্মের পুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতার ফসল। অন্যদিকে প্রাণীবিদ ওই পরিবেশে আসে বাইরে থেকে, অল্প কিছুদিনের জন্য। কয়েক মাস ফিল্ডওয়ার্ক করে সে আবার বাড়ি ফিরে যায়। তাই এ দুজনের মধ্যে সিংহের ব্যাপারে বেদুইন যে আরও ভালো ধারণা রাখে সেটা বলা যেতে পারে। তা ছাড়া প্রাণীবিদ্যা তুলনামূলকভাবে নতুন শাস্ত্র। তাই এ দুজনের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেদুইনের ভাষা আরও সমৃদ্ধ হবে যেহেতু এই ভাষায় বেদুইনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ গভীর জ্ঞানের ছাপ আছে।
কিন্তু প্রাণীবিদ এ কথাটা মেনে নিতে চাইবে না। সে মনে করে বেদুইনরা অজ্ঞ। সে মনে করে সিংহের ব্যাপারে প্রাণীবিদদের জ্ঞানের তুলনায় বেদুইনের জানাশোনা তেমন কিছুই না। এই ধারণাকে সত্য প্রমাণের জন্য, বেদুইন কীভাবে সিংহের বর্ণনা দেয় সেটা প্রাণীবিদ তুলে ধরবে। তারপর বলবে বেদুইনের এই বর্ণনা ভুল। কিন্তু বেদুইনের বর্ণনাকে সে কিসের ভিত্তিতে 'ভুল' বলছে? তার নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে। আর আমরা ইতিমধ্যে ধরে নিয়েছি যে সিংহের ব্যাপারে প্রাণীবিদের চেয়ে বেদুইনের জ্ঞান আরও গভীর এবং সমৃদ্ধ। প্রাণীবিদ তবু আত্মবিশ্বাসের সাথে বলবে বেদুইনরা আসলে এ ব্যাপারে কিছুই জানে না।
এটা হলো আধুনিক বিজ্ঞানের অজ্ঞতাপূর্ণ, করুণ ঔদ্ধত্যের অবস্থা।
প্রথমে ধরে নেয়া হয়, বিজ্ঞানের ভাষাই বাস্তবতার বর্ণনা দেয়ার একমাত্র সঠিক, আক্ষরিক এবং গ্রহণযোগ্য ভাষা। তারপর বিজ্ঞান ধরে নেয় মহাবিশ্ব আসলে কেমন সেটা সে জানে। অথচ এ দুটোই ধারণা। দুটো ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করা যায় এবং আমরা প্রত্যাখ্যান করি।
একটা জিনিস ভেবে দেখুন। বিজ্ঞান নিয়ে স্কুলে যা যা শেখানো হয়, যেমন জ্যোতির্বিদ্যা, পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ, তার অধিকাংশ শেখানো হয় নিউটোনিয়ান ভাষা ব্যবহার করে। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানীদের অনেকেই এ ধারণা ব্যক্ত করেছেন যে মহাবিশ্বের স্থানিক মাত্রার (spatial dimension) সংখ্যা তিনের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার বাইরেও মাত্রা থাকতে পারে। অভিকর্ষের ক্ষেত্রে নন-ইউক্লিডিয়ান গণিত; যেমন রাইমেনিয়ান জ্যামিতি ব্যবহার করে পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাপারে এভাবে চিন্তা করার শুরুটা করেছিলেন আইনস্টাইন।
গত কয়েক দশকে স্ট্রিং থিওরিতে বিশ্বাসী বিজ্ঞানীরা এমনও বলেছে যে মহাবিশ্বের ২১ টি মাত্রা থাকতে পারে। অবশ্য এ সবই তাদের জল্পনা-কল্পনা, কোনো কিছুই প্রমাণিত না। আসল বাস্তবতা কী, সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। কিন্তু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের যে সীমাকে আজ গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, তার মধ্য থেকেই মহাবিশ্বের বর্ণনা দেয়ার জন্য 'সমতল' কিংবা 'আসমানকে গুটিয়ে নেয়া'র[৭৪] মতো কথাগুলো বলা যেতে পারে। চতুর্মাত্রিক জগতে কোনো ত্রিমাত্রিক বস্তুকে মুড়িয়ে নেয়া সম্ভব। ঠিক যেভাবে ত্রিমাত্রিক জগতে একটা দ্বিমাত্রিক বৃত্তকে মুড়িয়ে নেয়া সম্ভব।
বিজ্ঞানের ভাষা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। মহাবিশ্বের ব্যাপারে বিজ্ঞানের জ্ঞানও বদলাচ্ছে। এই ক্রমপরিবর্তনশীল ধ্যানধারণার মাপকাঠিতে কেন আমরা আল্লাহর কালামকে বিচার করতে যাব?
কুরআনের যে আয়াত এবং হাদীসগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের বুঝের সাথে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিগতভাবে সেগুলো আমার খুব পছন্দের। এগুলো আমার কাছে অমূল্য রত্নের মতো। যখনই এগুলো পড়ি তখন আমার ঈমান আরও শক্তিশালী হয়, হৃদয় প্রশান্ত হয়। কারণ, এখানে আল্লাহ আমাকে এমন কিছু জানাচ্ছেন, এমন কিছুর ব্যাপারে সচেতন করছেন, যা আধুনিক বিজ্ঞান এখনো জানতে পারেনি, বুঝতে পারেনি। ওপরে উল্লেখ করা সূরা আল-কাহফের আয়াত এবং হাদীসটি এ কারণে আমার খুব প্রিয়। এ আয়াত এবং হাদীসগুলো অত্যন্ত সুন্দর এবং শক্তিশালী। তড়িঘড়ি করে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এগুলোর ব্যাখ্যা করা কিংবা এগুলো রূপক সাব্যস্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলোকে বাস্তবতার বিশুদ্ধ, অবিকৃত এবং পূর্ণাঙ্গ বিবরণ হিসেবেই গ্রহণ করা উচিত, যে বিবরণ আমাদের জানাচ্ছেন আল্লাহ-বাস্তবতার স্রষ্টা এবং একচ্ছত্র মালিক।
আল্লাহ আমাদের ঈমানকে মজবুত করে দিন, তাঁর আয়াতসমূহের মাধ্যমে আমাদের হৃদয়গুলো আলোকিত করে দিন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণার বিপরীতে সুরক্ষিত করে দিন।
টিকাঃ
[৭৩] সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান
[৭৪] আল্লাহ 'আযযা ওয়া জাল সূরা আম্বিয়ার ১০৪ নং আয়াতে বলেন (তরজমা): সেদিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলীল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই।