📄 কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিস্ময় : প্রচলিত ভুল ধারণা
কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিস্ময় (scientific miracle of the Quran) দিয়ে গুগল সার্চ করলে লাখ লাখ লেখা, ভিডিও এবং ইমেজ পাওয়া যায়। বিজ্ঞান দিয়ে কুরআনের বৈধতা বা সঠিকত্ব প্রমাণের এই প্রবণতা স্বাভাবিক। বিজ্ঞান বর্তমান যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী জ্ঞানতাত্ত্বিক শাখা। জাতি-ধর্ম-বিশ্বাস নির্বিশেষে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কাছে বিজ্ঞান হলো সত্যের সমার্থক। বেশির ভাগ মানুষ মনে করে কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ আসলেই স্রষ্টার কাছ থেকে এসে থাকলে সেটা অবশ্যই বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। কেউ যখন এমন চিন্তা করে, তখন তার কাছে মনে হবে, ১৪০০ বছর আগে নাযিল হওয়া কুরআনে যদি এমন বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকে, যা সেই সময়ের কোনো মানুষের জানার সুযোগ ছিল না, তাহলে সেটা কুরআনের সত্যতা এবং কুরআন স্রষ্টার বাণী হবার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ।
আপাতভাবে যৌক্তিক এবং আকর্ষণীয় মনে হলেও, এ ধরনের চিন্তার কিছু দিক নিয়ে সতর্কতার সাথে চিন্তা করা প্রয়োজন। এ নিয়ে বেশ কিছু ভুল ধারণা আমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে, সেগুলো শুধরে নেয়াও দরকার।
১। কুরআন ও বিজ্ঞান কখনো সাংঘর্ষিক হয় না
অনেক মুসলিম দাবি করে কুরআন বৈজ্ঞানিকভাবে ১০০% সঠিক। যেমনটা বললাম, তারা কেন এমন বলে থাকেন বা বলার প্রয়োজন অনুভব করেন, তা বোধগম্য। বিজ্ঞানকে আজ বাস্তবতার সবচেয়ে নিখুঁত উপস্থাপনা মনে করা হয়। অন্যদিকে কুরআন হলো বাস্তবতার নির্মাতার বাণী। কাজেই কুরআন ও বিজ্ঞানের মধ্যে নিখুঁত সামঞ্জস্য থাকাটাই যৌক্তিক।
কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে। সমস্যাটা হলো বিজ্ঞান আসলে বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিনিধিত্ব করে না। এ কথা মানার জন্য কুহনিয়ান পোস্ট-মডার্নিস্ট[৬৩] হবার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ বিজ্ঞানীও স্বীকার করেন, বিজ্ঞানের বড় একটা অংশজুড়ে থাকে নানা অস্থায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন ব্যাখ্যা। নতুন নতুন তথ্যের সাথে বিজ্ঞানের অবস্থান ক্রমাগত বদলায়, আপডেট হয়। এ এক ক্রমাগত চলমান প্রক্রিয়া।
যেমন, বর্তমানের সবচেয়ে মজবুত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা মনে করেন এই থিওরি হয় পুরোপুরি ভুল অথবা অন্য এমন কোনো থিওরির অপূর্ণ রূপ, যা এখনো অজানা। বিজ্ঞানীরা মনে করেন অজানা এই থিওরি অভিকর্ষ বলকে আমলে নিয়ে মহাবিশ্বের আরও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে পারবে।
নিজস্ব গবেষণাক্ষেত্রের ব্যাপারে চূড়ান্ত সত্য জানার দাবি করে এমন বিজ্ঞানী খুব বেশি পাওয়া যায় না। কার্ল পপারের [৬৪] মতো করে চিন্তা করা বিজ্ঞানীরা হয়তো এও বলবে যে, বিজ্ঞান কখনোই পুরোপুরিভাবে বাস্তবতাকে জানতে পারে না। বিজ্ঞান কেবল বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী হাইপোথিসিসকে ভুল প্রমাণ করতে পারে। মোদ্দাকথা হলো, বিজ্ঞানের কাছে থাকা তথ্যের ভান্ডার অপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুল। বিজ্ঞানীরা আজ যেটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করছেন, কাল সেটার ব্যাপারে তাদের মত বদলে যেতে পারে।
একটা উদাহরণ দিই। বিগ ব্যাং থিওরি[৬৫] আর মহাকাশের পর্যায়ক্রমিক গঠন নিয়ে বিজ্ঞানীরা গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেন ১৯৩০ এর দিকে। এর আগে, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পদার্থবিজ্ঞানীরা মনে করতেন মহাবিশ্ব অসীম আকার এবং বয়সের এক অনন্ত স্থিতিশীল অবস্থায় আছে, যাকে স্টেডি স্টেইট মডেল বলা হয়।[৬৬] চিরন্তন মহাবিশ্বের এ ধারণা অবশ্যই কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক। আল্লাহ কুরআনে মহাবিশ্বকে তাঁর এক সীমিত সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু ভেবে দেখুন, কুরআনকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ করার জন্য সে সময়কার মুসলিমরা যদি স্টেডি স্টেইট মডেলের আলোকে বিভিন্ন আয়াতের নতুন নতুন ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করত, তাহলে কী হতো? কয়েক দশক পর নিজেদের অবস্থান বদলাতে তারা বাধ্য হতো। কারণ, ততদিনে স্টেডি স্টেইট মডেল বাতিল হয়ে গেছে এবং বিগ ব্যাং থিওরি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একইভাবে আজকের যেসব বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে সত্য ধরে নিয়ে সেগুলোর আলোকে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতকে অনেকে ব্যাখ্যা করছে, সেই তত্ত্বগুলো যে তিন-চার দশক পর ভুল প্রমাণিত হবে না তার নিশ্চয়তা কী? বিজ্ঞানের ক্রমপরিবর্তনশীল এবং উত্থান-পতনের ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন হবার সম্ভাবনাই বরং জোরালো মনে হয়।
দিনশেষে, বিজ্ঞান বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিনিধিত্ব করে না এবং কখনো যে করবে তাও আসলে বলা যায় না। কমসেকম আজকের বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এমন দাবি করা যায় না। অন্য দিকে আল্লাহর কালাম নিখুঁত। কাজেই মানবরচিত এবং সহজাতভাবে অপূর্ণ, দুর্বল এবং ক্রমপরিবর্তনশীল বিজ্ঞানের সাথে কুরআনের ১০০% সামঞ্জস্যের দাবি করা যথাযথ না।
তার মানে কি আমরা কুরআন নিয়ে চিন্তা করব না? বিজ্ঞানের বিভিন্ন আইডিয়ার আলোকে কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা করতে পারব না? পারব। এভাবে চিন্তা করে অনেক মুসলিমের ঈমান মজবুত হয়। তাই এটাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু নিজস্ব এসব চিন্তাভাবনা যদি 'তাফসীরে' পরিণত হয়, মানুষ যদি সেটা অন্যকে বলে বেড়াতে শুরু করে অথবা কুরআন ও বিজ্ঞান নিয়ে ঢালাও কোনো দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়ে যায়, তাহলে সমস্যা। কুরআনের যেকোনো ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার করতে হলে সেটা অবশ্যই তাফসীরের সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম এবং আল্লাহর কালামের প্রতি যথাযথ সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক হওয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো আমাদের মনে রাখা দরকার।
'যে ব্যক্তি নিজের মত অনুযায়ী কুরআন প্রসঙ্গে কথা বলে, সে সঠিক বললেও অপরাধ করলো (এবং সঠিক ব্যাখ্যা করলেও-সে ভুল করলো)'।[৬৭]
২। কুরআন বিজ্ঞানের পাঠ্যবই না
এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য। কুরআন বিজ্ঞানের পাঠ্যবই না। তবে কথাটা বলার সময় অনেকে পরোক্ষভাবে অন্য কিছু বুঝিয়ে থাকে। কিছু মুসলিম যেমন বিজ্ঞান আর কুরআনের সম্পর্কের ওপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে দাবি করে কুরআন আর বিজ্ঞান কখনো সাংঘর্ষিক হতে পারে না, তেমনিভাবে আরেকদল মুসলিম বলে, কুরআন বিজ্ঞানের পাঠ্যবই না। তারা বোঝাতে চায় মহাবিশ্ব আর পার্থিব বাস্তবতার ব্যাপারে কুরআনের (এবং ধর্মের) কিছু বলার নেই। এ রকম মুসলিমরা মনে করে ধর্ম আর বিজ্ঞানের বলয় আলাদা এবং স্বতন্ত্র। ধর্ম আর বিজ্ঞানের কর্তৃত্ব এবং প্রয়োগযোগ্যতার ক্ষেত্র আলাদা। বায়োলজিস্ট স্টিফেন জেই গুল্ড[৬৮] এ ধারণার নাম দিয়েছেন, নন ওভারল্যাপিং ম্যাজিস্টেরিয়া (Non-overlapping Magesteria-NOMA)। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, চারপাশের পৃথিবী নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেবে বিজ্ঞান। এই কর্তৃত্ব বিজ্ঞানের। আর নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা, জীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য-ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেবে ধর্ম। এখানে কর্তৃত্ব ধর্মের। ধর্ম আর বিজ্ঞানের রাজ্য আলাদা। একজন আরেকজনের রাজ্যে নাক গলাবে না।
কিন্তু কুরআনের ক্ষেত্রে, ইসলামের ক্ষেত্রে এ কথা খাটে না। চারপাশের পৃথিবী নিয়ে অনেক বক্তব্য কুরআনে আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন। কুরআন আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহার করে না ঠিক, কিন্তু বিশ্ব, ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে বক্তব্যে কুরআন পরিপূর্ণ। কুরআনের মাধ্যমে এমন কী কী তথ্য আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন তার কিছু উদাহরণ দেখা যাক-
১। মহাবিশ্ব সৃষ্ট
২। ফেরেশতাদের অস্তিত্ব এবং দুনিয়াতে তাদের কার্যক্রম
৩। জ্বিনের অস্তিত্ব ও কার্যক্রম
৪। সক্রিয় মস্তিষ্কের অবর্তমানেও চেতনার (consciousness) অস্তিত্ব থাকে (রূহ)
৫। মৃত্যু এবং মৃতদেহের পচনের পর পুনরুত্থান
৬। জান্নাত ও জাহান্নাম
৭। ইসরা ওয়াল মি'রাজ
৮। বিভিন্ন নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) মু'জিযা (চাঁদের দ্বিখণ্ডিতকরণ, লোহিত সাগর দু-ভাগ হওয়া, মৃতকে পুনর্জীবিত করা)
৯। কিছু মানুষের অস্বাভাবিক দীর্ঘ জীবন (যেমন নূহ আলাইহিস সালাম, আসহাবে কাহফ)
১০। আল্লাহর আরশ এবং কুরসি
১১। সাত আসমান
১২। আসমান, পৃথিবী এবং পর্বতসমূহ কর্তৃক কুরআনের আমানাহ/নৈতিক দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি
১৩। বিভিন্ন জীবজন্তু মহান আল্লাহর তাসবীহ করে। নবীদের (আলাইহিমুস সালাম) সাথে বিভিন্ন জীবজন্তুর কথোপকথন
১৪। জান্নাতে আদম আলাইহিস সালাম-এর সৃষ্টি
১৫। সুলাইমান আলাইহিস সালামকে দেয়া ক্ষমতা
১৬। জাদু এবং নজরের অস্তিত্ব
১৭। কবরের জীবন
১৮। ক্রমাগত অনুশোচনাহীনভাবে গুনাহ করার কারণে আল্লাহ বিভিন্ন জনপদ এবং মানুষকে ধ্বংস করে দিয়েছেন
১৯। বারাকাহর বাস্তবতা
আমি ইচ্ছে করেই এমন উদাহরণ আনলাম যেগুলো আধুনিক বিজ্ঞান এবং ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক। এগুলো ছাড়াও, কুরআনের অনেক আয়াতে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঘটনার কথা এসেছে, যেমন বৃষ্টি, মাতৃগর্ভে ভ্রূণের গঠন, গ্রহ, নক্ষত্রের গতি ইত্যাদি।
এই আয়াতগুলো পড়ার পর আজকের বিজ্ঞানময় যুগের একজন মুসলিম কী উপসংহার টানবে? আমরা কি ধরে নেব যে এই সবগুলো আয়াত রূপক অথবা মিথ? এগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেয়া? আশা করি অধিকাংশ মুসলিম এভাবে চিন্তা করে না।
নাকি আমরা ধরে নেব এই আয়াতগুলোতে মুজিযা, কারামাত এবং গ্লাইবের (অদৃশ্য জগৎ) কথা বলা হচ্ছে, যা বিজ্ঞান এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞানের আওতার বাইরে?
নাকি আমরা এই দুই অবস্থানের একটা মিশ্রণ করার চেষ্টা করব?
ওপরের সবগুলো উদাহরণ কিন্তু মুজিযা বা কারামতের শ্রেণিতে পড়ে না। সবগুলো গ্লাইবের আওতাধীন কি না, সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ। আধুনিক মুসলিমদের মধ্যে বহুল-প্রচলিত একটা ধারণা হলো, দৃশ্যমান আর অদৃশ্যমান জগতের সীমারেখা গবেষণালব্ধ বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের সীমারেখার সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। সম্ভবত নন-ওভারল্যাপিং ম্যাজেস্টেরিয়ার ধারণার সাথে সুন্দরভাবে মিলে যাওয়ার কারণেই অনেকে এমন মনে করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কিন্তু এ ধারণা আসলে সঠিক না।
কথাটা এভাবে বলা যায়-ক্লাসিকাল আলিমগণ গ্লাইব (অদৃশ্য) আর হিস্স (দৃশ্যমান/উপলব্ধিযোগ্য)-এর যে বিভাজন করেছেন, তা যদি গবেষণালব্ধ বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের সীমারেখার আধুনিক পশ্চিমা ধারণার সাথে হুবহু মিলে যায় তাহলে সেটা বেশ বিস্ময়কর রকমের কাকতালীয় ঘটনা, তাই না?
হিগস-বোসনের মতো সাব-অ্যাটমিক পার্টিকেলকে কি গাইবের অংশ ধরা হবে, যেভাবে জ্বিন জাতি ঘাইবের অংশ? হিগস-বোসন পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের কাছে অদৃশ্য। অল্প কিছুদিন আগে পার্টিকেল কোলাইডারের মাধ্যমে আমরা হিগস বোসনের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পেয়েছি। কিন্তু কারও চোখ কোনোদিন হিগস বোসন দেখেনি এবং দেখবেও না।
এ ধরনের শ্রেণিবিভাগের জটিলতা থেকে মূল সমস্যাটা পরিষ্কার হয়-এমন কোনো নীতিমালা এবং শ্রেণিবিভাগ আমাদের কাছে নেই, যা একই সাথে ক্লাসিকাল আলিমদের অবস্থান এবং আধুনিক বিজ্ঞানের অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যা কিছু আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে অদৃশ্য, সেটা ঘাইবের অন্তর্ভুক্ত'-এমন ঢালাও বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব না। কারণ, বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। আজ যেটা বিজ্ঞানের কাছে অদৃশ্য, সেটা কাল দৃশ্যমান হতে পারে। তখন কি সেটা ঘাইবের জগৎ থেকে বের হয়ে যাবে? কোনো কিছু ঘাইবের-অদৃশ্য জগতের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সেই জিনিসের সহজাত প্রকৃতির সাথে জড়িত। কোন বিজ্ঞানী, কোন সময়, কী গবেষণা করছে সেটার ওপর তো এটা নির্ভর করতে পারে না!
কাজেই দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যের শ্রেণিবিভাগজনিত এ জটিলতাকে ঢালাও বক্তব্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আমি নিজে এ ধরনের কোনো শ্রেণিবিভাগ করার চেষ্টা করব না এবং এতে আমার আগ্রহও নেই। এটা নিয়ে চিন্তা করার কাজ আমরা যোগ্য, উপযুক্ত আলিমদের জন্য ছেড়ে দিতে পারি। তবে যে বিষয়টা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তা হলো, আমরা যখন কুরআন পড়ি তখন মহাবিশ্বের মৌলিক প্রকৃতির ব্যাপারে এমন অনেক কিছু জানতে পারি, যা বিজ্ঞান কখনোই আমাদের জানাতে পারবে না। বিজ্ঞান যেসব তথ্য দেয় তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সূক্ষ্ম এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন তথ্য আমরা কুরআন থেকে জানতে পারি।
আমার মনে হয়, আধুনিক যুগে বসবাস করার কারণে ওপরের লিস্টে আসা বিষয়গুলোর বাস্তবতা আমরা অতটা গভীরভাবে অনুভব করি না, যেভাবে বিজ্ঞানের দ্বারা স্বীকৃত বিভিন্ন জিনিসের ব্যাপারে আমরা অনুভব করি। এমন অনেক মুসলিম আছে, যারা বিজ্ঞান নিয়ে কোনোদিন পড়াশোনা করেনি। সায়েন্টিফিক কোনো রিসার্চ পেপার জীবনে পড়ে দেখেনি, কখনো কোনো ল্যাবরেটরির ভেতর ঢোকেনি। কিন্তু সে চরম আত্মবিশ্বাস (ইয়াক্বীন) নিয়ে বিবর্তনবাদ কিংবা পরমাণুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। অথচ ফেরেশতা, জ্বিন কিংবা বারযাখের জীবন নিয়ে একই ধরনের আত্মবিশ্বাস তার মধ্যে কাজ করে না। আমার এ লেখার উদ্দেশ্য বিজ্ঞানের মূল্য কিংবা বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা না। কিন্তু উম্মাহর মধ্যে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমাগত বাড়ছে। আর এটা আধুনিক মুসলিমদের এপিস্টেমোলজি [৬৯] এবং অন্টোলজির [৭০] ভগ্নদশার উপসর্গ।
তাহলে এত কথার শেষে মূল বার্তা কী?
নন-ওভারল্যাপিং ম্যাজেস্টেরিয়ার ধারণা আমাদের বাদ দিতে হবে। মহাবিশ্ব এবং মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে অনেক জ্ঞান কুরআনে এসেছে। আমরা যখন বলি চারপাশের পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করার জ্ঞানতাত্ত্বিক কর্তৃত্ব বিজ্ঞানের, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কুরআনে বর্ণিত বাস্তবতা আমাদের চিন্তায় পেছনের সারিতে চলে যাবে। সত্যতা এবং যথার্থতার দিক থেকে সেগুলোর অবস্থান চলে যাবে বিজ্ঞানের স্বীকৃত জিনিসের নিচে। এর ফলে ঈমানী ও আত্মিক অবস্থার ওপর যে গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা সহজেই বোধগম্য। আমাদের প্রত্যেকের উচিত কুরআন এবং সুন্নাহর বক্তব্যগুলো জানার, বোঝার এবং আত্মীকরণের চেষ্টা করা। যাতে কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্যের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে ইয়াক্বীন তৈরি হয়, যা আমাদের ভেতর সেগুলোর বাস্তব হওয়ার তীব্র অনুভূতি তৈরি করবে।
এক সত্তা প্রতিনিয়ত আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে এবং আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছ-পাহাড়পর্বত, আসমান-যমীন এবং এর মধ্যেকার সবকিছু (যে সৃষ্টিগুলোকে আমরা জড় বা অচেতন মনে করি সেগুলোও) প্রতিনিয়ত আল্লাহর তাসবীহ করছে- আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটে, যত তুচ্ছ যত ছোট হোক, সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী ঘটে-এ কথাগুলো আমরা সত্য বলে জানি। কিন্তু এই সত্যগুলো এমনভাবে আত্মীকরণের চেষ্টা করা উচিত যেন আমরা এ বাস্তবতা গভীরভাবে অনুভব করছি।
টিকাঃ
[৬৩] থমাস কুহন-মৃত্যু ১৯৯৬। পদার্থবিজ্ঞানী এবং দার্শনিক, 'প্যারাডাইম শিফট' ধারণার জনক। থমাস কুহন, ফিলোসফি অফ সায়েন্সের প্রধানতম দার্শনিকদের অন্যতম। অ্যাকাডেমিক প্রভাব এবং জনপ্রিয়তা, দু-দিক থেকেই তার বিখ্যাত রচনা The Structure Of Scientific Revolutions- কে গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী বইগুলোর মধ্যে ধরা হয়। এই বইতে দেয়া কুহনের ধারণার ওপর ভিত্তি করে অনেক পোস্ট-মর্ডানিস্ট দার্শনিক অবজেক্টিভ সায়েন্টিফিক ট্রুথ বা নৈর্ব্যত্তিক বৈজ্ঞানিক সত্যের ধারণা প্রত্যাখ্যান করে। যদিও কুহন নিজে এ অবস্থান সমর্থন করতেন না। - অনুবাদক
[৬৪] কার্ল পপার-মৃত্যু, ১৯৯৪। ফিলোসফি অফ সায়েন্সের আরেক দিকপাল। Falsifiability বা বাতিলযোগ্যতা/মিথ্যায়ন তত্ত্বের জনক। - অনুবাদক
[৬৫] বিগ ব্যাং থিওরি (Big Bang Theory)- বিগ ব্যাং অর্থাৎ মহা বিস্ফোরণ তত্ত্বকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে এ পর্যন্ত চলে আসা ধারণাগুলোর মধ্যে বর্তমানে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৭৫ কোটি বছর আগে থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয় একটি অতি ঘন এবং উত্তপ্ত অবস্থা থেকে। প্রায় শূন্য থেকে মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে এক মহাবিস্ফোরণ ঘটে। সেই বিস্ফোরণের ফলে স্থান, শক্তি ও পদার্থসহ মহাবিশ্ব তৈরি হয়। অর্থাৎ মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছে এক সুপ্রাচীন বিন্দুর মতো অবস্থা থেকে। তারপর থেকে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। - অনুবাদক
[৬৬] স্টেডি স্টেইট মডেল (steady state model)-এই মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্ব চির সম্প্রসারণশীল। কিন্তু তার গড় ঘনত্ব সর্বদা ধ্রুব। মহাবিশ্বের প্রসার আছে, কিন্তু প্রসারিত শূন্যস্থানে নিরন্তর নতুন বস্তু সৃষ্টি হচ্ছে, যার ফলে সামগ্রিকভাবে সময়ের সাথে মহাবিশ্বের চেহারা অপরিবর্তিত থাকছে। ক্রমবর্ধমান মহাজগতে যেকোনো সময়ে পদার্থের ঘনত্ব অপরিবর্তিত। স্টেডি স্টেইট তত্ত্বে কোনো 'বিগ ব্যাং' তথা 'মহাবিস্ফোরণ' নেই। মহাবিশ্ব এক অনন্ত স্থিরাবস্থায় আছে। অনুবাদক
[৬৭] আবু দাউদ, তিরমিযী
[৬৮] স্টিফেন জেই গুল্ড-মৃত্যু: ২০০২। ইভ্যুলুশানারি বায়োলজিস্ট এবং বিজ্ঞান নিয়ে অনেক জনপ্রিয় বইয়ের লেখক। - অনুবাদক
[৬৯] এপিস্টেমোলজি (Epistemology)-বাংলায় জ্ঞানতত্ত্ব। দর্শনের ওই শাখা, যা জ্ঞান, মানবীয় জ্ঞানের প্রকৃতি, উৎস ও সীমানা নিয়ে আলোচনা করে। জ্ঞান কী? জানার অর্থ কী? জ্ঞানের উৎসগুলো কী? জ্ঞান অর্জনের পথ কী? জ্ঞানের সাথে ধারণা, দাবি, কুসংস্কার কিংবা ব্যক্তিগত মতের পার্থক্য কী-এ ধরনের প্রশ্নগুলো নিয়ে এপিস্টেমোলজির আলোচনা। - অনুবাদক
[৭০] অনটোলজি (Ontology)-বাংলায় পরাবিদ্যা বা তত্ত্ববিদ্যা। দর্শনের ওই শাখা, যা বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে। কী আছে, কী নেই? কোনটা বাস্তব, কোনটা অবাস্তব? অস্তিত্বশীল কী? অস্তিত্বশীল হবার অর্থ কী? বস্তু কী? সত্তা কী? অন্টোলজি আলোচনা করে এ ধরনের প্রশ্নগুলো নিয়ে। - অনুবাদক
📄 বিজ্ঞানে ‘বহুত্ববাদের’ স্থান নেই
এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে মতবৈচিত্র্যের কোনো স্থান নেই। বহুত্ববাদের ধারণা সেখানে খাটে না। বিজ্ঞানের কথাই ধরুন। ধরে নেয়া হয়, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রত্যেক প্রশ্নের কেবল একটা সঠিক উত্তর আছে। কোনো ব্যাপারে প্রাথমিক পর্যায়ে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী থিওরি থাকতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেকোনো একটা থিওরিকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বিজ্ঞানীদের কাজ হলো বিশ্লেষণ, গবেষণা, অনুসন্ধানের মাধ্যমে সঠিক থিওরিটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা।
কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে আধুনিক মানুষের মনোভাব পুরোপুরি আলাদা। আমাদের শেখানো হয়, কোনো ধর্মকে পুরোপুরি সঠিক বা ভুল মনে করা যাবে না; বরং ধর্ম হলো ব্যক্তিগত পরিচয় আর অনুভূতির ব্যাপার। প্রত্যেক মানুষ নিজের মতো করে ধর্মকে অনুভব করে। ধর্ম তথ্যপ্রমাণ আর জ্ঞান নিয়ে কাজ করে না, তাই কোনো এক ধর্মকে সঠিক বা সত্য বলে বিবেচনা করা যায় না। ধর্মের ব্যাপারে কেউ এই 'সাবজেক্টিভিস্ট' দৃষ্টিভঙ্গি[৭১] গ্রহণ করলে তার মধ্যে কোনো-না-কোনোভাবে 'সব ধর্মই সত্য' মনে করার প্রবণতাও কাজ করতে পারে।
কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে সব সময় এভাবে চিন্তা করা হতো না; বরং আজ যেভাবে বিজ্ঞানের ব্যাপারে মানুষ চিন্তা করে, ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে ধর্মকে দেখা হতো অনেকটা সেভাবে। মানুষ মনে করত, বাস্তবতাকে বোঝার মানে স্রষ্টাকে বোঝা, আর স্রষ্টাকে বোঝার মানে স্রষ্টা কী বলেছেন তা বোঝা জরুরি। এটা নিছক কাকতালীয় ব্যাপার না যে, সাধারণত অতীতে সমাজের সবচেয়ে জ্ঞানী এবং শিক্ষিত মানুষরা সবচেয়ে ধার্মিকও হতেন। আগেরকার যুগে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিতর্কগুলো হত ধর্মতাত্ত্বিক বা আকীদাহগত বিষয়ে। যেমন খ্রিষ্টান এবং মুসলিমদের মধ্যে বিতর্ক হতো আল্লাহর প্রকৃতি, তাঁর বৈশিষ্ট্যসমূহ ইত্যাদি নিয়ে। কিন্তু আজকে যেসব বিতর্ক হয়, সেখানে বিতর্কের বিষয়বস্তু থাকে নৈতিকতার বিভিন্ন ধারণা, যেমন মানবাধিকার, নারী অধিকার, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি।
এখানে একটা বিষয় বলে রাখা দরকার। ধর্মের ব্যাপারে অবজেক্টিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি[৭২] গ্রহণ করা মানে সহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে যাওয়া না। কেউ যদি মনে করে তার ধর্মই সঠিক, অন্য সব ধর্ম ভুল, তার মানে এটা না যে সে অন্য ধর্মের লোকের প্রতি অসহিষ্ণু হবে।
দেখুন, আধুনিক সেক্যুলার সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপারে অবজেক্টিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। কিন্তু তবুও ওইসব লোকের প্রতি সহিষ্ণুতা দেখানো হয় যারা বিজ্ঞানের ব্যাপারে অজ্ঞ অথবা একেবারে ভুল ধারণা রাখে। তবে কারও ভুল বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ালে সমাজ সেখানে সীমা টানে। উল্লেখ্য, এখানে 'ক্ষতি'র সংজ্ঞা ঠিক করা হয় ওই সময়ে কোনো বৈজ্ঞানিক প্যারাডাইমকে সঠিক মনে করা হচ্ছে তার সাপেক্ষে। ভ্যাকসিন নিয়ে বিতর্ক এর একটা ভালো উদাহরণ। শিশুদের ওপর ভ্যাকসিনের প্রভাব ভালো নাকি মন্দ, এটা নিয়ে মানুষ যা ইচ্ছে তা-ই বিশ্বাস করতে পারে। কিন্তু একসময় সরকারকে টীকাদান বাধ্যতামূলক করার ম্যান্ডেট দেয়া হলো। সরকার বলল প্রত্যেক শিশুকে টীকা দিতে হবে। কারণ, তখন ধরে নেয়া হয়েছিল, মানুষ যদি ভ্যাকসিনের ব্যাপারে তাদের 'ভুল বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস'গুলো আঁকড়ে ধরে রাখে, তাহলে একটা নির্দিষ্ট সীমার পর সমাজের ওপর সেটার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
হয়তো ইসলামের সহিষ্ণুতাকেও আমরা একইভাবে দেখতে পারি। ইহুদী, খ্রিষ্টান এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি মুসলিম এবং ইসলামের সহিষ্ণুতার বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। কর্তৃত্বশালী প্যারাডাইমের-অর্থাৎ ইসলাম-অবস্থান থেকে ভুল মনে করা হয়, এমন কোনো বিশ্বাস বা অবস্থান নেয়ার সুযোগ ছিল। তবে সেই সহিষ্ণুতার একটা সীমা ছিল। আজকের সেক্যুলার সমাজের ব্যাপারটাও একইরকম। যদিও আমরা বিষয়টাকে ওইভাবে দেখি না।
টিকাঃ
[৭১] Subjective থেকে। বাংলায়-ব্যক্তিক, আত্মবাদী। ধর্মের ব্যাপারে সাবজেক্টিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির উপসংহার হলো, কোন ধর্ম সঠিক (আর কোন ধর্ম ভুল) সেটা জানার কোনো সর্বজনীন, ধ্রুব, বস্তুনিষ্ঠ উপায় নেই অথবা এবং এ প্রশ্নের আদৌ কোনো সঠিক উত্তর নেই। স্থান-কাল-পাত্র-সমাজ-সভ্যতা ভেদে একেক সময় একেক ধর্মকে সঠিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। সব একইভাবে সঠিক কিংবা ভুল। যে যেটাকে সত্য মনে করে তার জন্য সেটাই সঠিক। - অনুবাদক
[৭২] সাবজেক্টিভিস্ট অবস্থানের বিপরীত। অর্থাৎ ধর্মের ক্ষেত্রে অবজেক্টিভিস্ট অবস্থান হবে: সত্য ধর্ম আছে, কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্ম, নৈতিকতার মানদণ্ড, বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে সঠিক, ইত্যাদি। - অনুবাদক
📄 বিজ্ঞানের বাস্তবতা
একজন অন্ধ, বধির, বোবা লোকের কথা চিন্তা করুন। তার জন্য দুনিয়াকে জানার একমাত্র মাধ্যম স্পর্শ। ধরুন, তার অবস্থা আরও খারাপ। চারপাশের দুনিয়াকে সে সরাসরি স্পর্শ করতে পারে না। তার হাতে একটা সুঁই ধরা। বিভিন্ন জিনিসের ওপর সুঁইয়ের ডগা ঘষে সে স্পর্শের অনুভূতি পায়। তার জন্য এই ছোট্ট সুইয়ের ছোট্ট ডগা হলো মহাবিশ্বের সুবিস্তৃত বাস্তবতাকে জানার একমাত্র উপায়। একমাত্র জানালা।
এই মানুষটা যদি তার নিজের মতো করে বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে তাহলে সেটা আমাদের কাছে কত অদ্ভুত শোনাবে চিন্তা করুন। নিজের কাছে থাকা অতি সীমিত তথ্য দিয়ে পৃথিবী, মহাবিশ্ব, মানবজাতির অস্তিত্বের অর্থের মতো বিষয়গুলো সে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবে। যদি সে দাবি করে, তার সুইয়ের ডগা দিয়ে যা অনুভব করা যায় শুধু ওই জিনিসগুলোরই অস্তিত্ব আছে-তাহলে সবাই খুব আমোদিত হবে।
আচ্ছা এবার চিন্তা করুন, লোকটার হাতে সুঁই নেই। তার হাতে একটা সুতো আছে। বিভিন্ন জিনিসের ওপর এই সুতো টেনে টেনে সে বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করে। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান আর পর্যবেক্ষণের অবস্থা হলো এই সুতো টানা মানুষের মতো।
কথাটা শোনাতে অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। তড়িৎচৌম্বকীয় বর্ণালীর খুব অল্প এক ফালি মানুষের কাছে দৃশ্যমান। আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে এমন কিছু তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ আমরা সনাক্ত করতে পারি, যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা পারতেন না, যেমন ইনফ্রারেড রশ্মি, আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি, এক্স রশ্মি, গামা রশ্মি ইত্যাদি। হয়তো তথ্যের এমন আরও অনেক পথ আছে বা অস্তিত্বের এমন অনেক স্তর আছে, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে যেগুলোর ব্যাপারে আমাদের কোনো ধারণা নেই। আপনার কাছে অদ্ভুত মনে হলেও এমন কিছু যে আসলে নেই, সেটা আমরা কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছি?
আমাদের উপলব্ধি করার ক্ষমতা নিয়ে ভেবে দেখুন। কী জানি না, সেটা জানার কোনো উপায়ও আমাদের নেই। ভাগ্য ভালো হলে পথ চলার সময় হোঁচট খেতে খেতে আমরা নতুন কিছু আবিষ্কার করি। জানতে পারি, মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় আমাদের এই পৃথিবী অত্যন্ত ক্ষুদ্র। অথচ এই ছোট্ট পৃথিবীর ব্যাপারেও অনেক কিছু এখনো আমাদের অজানা। কাজেই আমরা যে এখনো বাস্তবতার ব্যাপারে মোটাদাগে অন্ধকারেই আছি, এটা মনে করা খুব একটা অযৌক্তিক হবে না।
এবার আমাদের মানসিক সক্ষমতার কথা ভাবুন। মানুষের উপলব্ধি করার ক্ষমতা অবধারিতভাবে তার মস্তিষ্কের তথ্য 'প্রক্রিয়াকরণের' ক্ষমতার সাথে যুক্ত। কোনো তথ্য সচেতনভাবে উপলব্ধি করার জন্য আগে সেটা প্রসেস করতে হবে। এমন কি হতে পারে যে আমাদের পঞ্চ-ইন্দ্রিয় কিছু কিছু জিনিসের অস্তিত্ব অনুভব করে বা সনাক্ত করতে পারে, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক সেগুলো 'দেখতে' পায় না? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়াও আমাদের পক্ষে সম্ভব না, কারণ কোনো কিছু 'মিস' করছি কি না, মস্তিষ্কের 'বাইরে' বের হয়ে সেটা যাচাই করার ক্ষমতা আমাদের নেই।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই চরম সীমাবদ্ধতার কথা বিজ্ঞান পরোক্ষভাবে স্বীকার করে। আধুনিক বিজ্ঞানের ঐকমত্য অনুযায়ী মানুষ বিবর্তিত বানর (ape) ছাড়া আর কিছু না। আমাদের উপলব্ধি আর চিন্তাশক্তি নাকি বিবর্তিত হয়েছে খাবার উপযোগী ফল আর প্রজননের সম্ভাব্য সাথি খুঁজে বের করার জন্যে। এটা বিজ্ঞানেরই কথা। আবার সেই একই বিজ্ঞান ধরে নিচ্ছে বানর-জীবনের দৈনন্দিন কাজ চালানোর জন্য বিবর্তিত এই মস্তিষ্ক আর চিন্তাশক্তি নাকি মহাবিশ্বের গভীরতা অনুসন্ধান, অস্তিত্বের তাৎপর্য নিয়ে ভাবা, মানবপ্রকৃতি থেকে শুরু করে নৈতিকতার জৈবিক উৎস নিয়ে দার্শনিক আলাপে মেতে ওঠার জন্য উপযুক্ত।
ব্যাপারটা হাস্যকর রকমের ঔদ্ধত্যপূর্ণ না?
টিকাঃ
📄 বাস্তবতার বর্ণনায় ইসলাম ও বিজ্ঞানের সংঘাত
কুরআন এবং হাদীসে এমন বক্তব্য এসেছে যেগুলো থেকে মনে হয় পৃথিবী সূর্যের চারদিকে আবর্তিত হয় না। সূরা কাহফের এ আয়াতটির কথা চিন্তা করুন, চলতে চলতে যখন সে (যুলকারনাইন) সূর্যের অস্তগমন-স্থানে পৌঁছল তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল পানিতে অস্ত যেতে দেখল এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল; আমি বললাম: হে যুলকারনাইন, তুমি তাদের শাস্তি দিতে পারো অথবা তাদের সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারো। [তরজমা, সূরা আল-কাহফ, ৮৬]
এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এই হাদীসটি,
একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা কি জানো, এ সূর্য কোথায় যায়? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: এ সূর্য চলতে থাকে এবং (আল্লাহ তা'আলার) আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও! অনন্তর সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল দিয়েই উদিত হয়। তা আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই উদিত হয়।
সে আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থান-স্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই সে উদিত হয়। এমনিভাবে চলতে থাকবে; মানুষ তার থেকে অস্বাভাবিক কিছু হতে দেখবে না। শেষে একদিন সূর্য যথারীতি আরশের নিচে তার নির্দিষ্ট-স্থলে যাবে। তাকে বলা হবে, উঠো এবং অস্তাচল থেকে উদিত হও। অনন্তর সেদিন সূর্য পশ্চিম গগনে উদিত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন দিন সে অবস্থা হবে তোমরা জানো? সে দিন ওই ব্যক্তির ঈমান কোনো কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি পূর্বে ঈমান আনেনি কিংবা যে ব্যক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করেনি।[৭৩]
এই আয়াত এবং হাদীসগুলোকে কীভাবে বোঝা উচিত? এগুলোকে রূপক বলে দেয়া সোজা। হয়তো আসলেই এই আয়াত এবং হাদীসে কিছুটা রূপকার্থে বলা হয়েছে। কিন্তু ঢালাওভাবে সবগুলোকে রূপক বলার সিদ্ধান্ত একটু নড়বড়ে বলে মনে হয়। আর কোনো বিকল্প কি নেই?
ধরুন, মহাবিশ্বের ব্যাপারে দুজন মানুষের জ্ঞান সমানভাবে সঠিক। দুজন দুইভাবে তাদের জ্ঞান প্রকাশ করে। একই জিনিসের বর্ণনা দেয়ার সময় দুজন আলাদা ধরনের ভাষা, ছবি এবং ধারণা ব্যবহার করে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে আক্ষরিকভাবে কোনো কিছু বর্ণনা দেয়ার সময়ও এ দুজনের ভাষা এবং বর্ণনা আলাদা হতে পারে।
একটা সহজ উদাহরণ দেখুন। সিংহের জন্য বেদুইন আরবদের অনেক নাম আছে। বরফ বোঝানোর জন্য এস্কিমোরা অনেক ধরনের শব্দ ব্যবহার করে। সিংহের ব্যাপারে আরব বেদুইন কিংবা বরফের ব্যাপারে একজন এস্কিমো যেভাবে কথা বলে, একজন প্রাণীবিদ কিংবা আবহাওয়াবিদ সেভাবে কথা বলে না। তার মানে কিন্তু এই না যে আরব বা এস্কিমো রূপক অর্থে কথা বলছে আর প্রাণীবিদ বা আবহাওয়াবিদ আক্ষরিকভাবে বর্ণনা দিচ্ছে। সবাই আক্ষরিকভাবে কথা বলছে, কিন্তু আরব-এস্কিমোদের ভাষায় এমন কিছু ধারণা আছে, যেগুলো আধুনিক বিজ্ঞানীদের ভাষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর মধ্যে অনুপস্থিত। আবার এর উল্টোটাও সত্য।
আধুনিক সময়ের মানুষ এটা ধরে নিতে অভ্যস্ত যে বিজ্ঞানের ভাষা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবতার বর্ণনা দেয়। কিন্তু আমরা—মুসলিমরা এটা মেনে নিতে বাধ্য না। এটা মেনে নেয়া আবশ্যিক না এবং এটা মেনে নেয়া উচিতও না, কারণ বিজ্ঞানের ভাষা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে।
ব্যাপারটার আরও গভীরে যাওয়া যায়। মনে করুন, দুজনের মানুষের মধ্যে প্রথম জন মহাবিশ্বের ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান রাখে। দ্বিতীয় জন রাখে না, তবে সে মনে করে মহাবিশ্বের ব্যাপারে তার জ্ঞান সঠিক।
এবার আগের উদাহরণে ফিরে যাওয়া যাক। সিংহের ব্যাপারে বেদুইনের জ্ঞান শতাব্দীর পর শতাব্দী সিংহের সাথে একই পরিবেশে বসবাস করা অসংখ্য প্রজন্মের পুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতার ফসল। অন্যদিকে প্রাণীবিদ ওই পরিবেশে আসে বাইরে থেকে, অল্প কিছুদিনের জন্য। কয়েক মাস ফিল্ডওয়ার্ক করে সে আবার বাড়ি ফিরে যায়। তাই এ দুজনের মধ্যে সিংহের ব্যাপারে বেদুইন যে আরও ভালো ধারণা রাখে সেটা বলা যেতে পারে। তা ছাড়া প্রাণীবিদ্যা তুলনামূলকভাবে নতুন শাস্ত্র। তাই এ দুজনের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেদুইনের ভাষা আরও সমৃদ্ধ হবে যেহেতু এই ভাষায় বেদুইনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ গভীর জ্ঞানের ছাপ আছে।
কিন্তু প্রাণীবিদ এ কথাটা মেনে নিতে চাইবে না। সে মনে করে বেদুইনরা অজ্ঞ। সে মনে করে সিংহের ব্যাপারে প্রাণীবিদদের জ্ঞানের তুলনায় বেদুইনের জানাশোনা তেমন কিছুই না। এই ধারণাকে সত্য প্রমাণের জন্য, বেদুইন কীভাবে সিংহের বর্ণনা দেয় সেটা প্রাণীবিদ তুলে ধরবে। তারপর বলবে বেদুইনের এই বর্ণনা ভুল। কিন্তু বেদুইনের বর্ণনাকে সে কিসের ভিত্তিতে 'ভুল' বলছে? তার নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে। আর আমরা ইতিমধ্যে ধরে নিয়েছি যে সিংহের ব্যাপারে প্রাণীবিদের চেয়ে বেদুইনের জ্ঞান আরও গভীর এবং সমৃদ্ধ। প্রাণীবিদ তবু আত্মবিশ্বাসের সাথে বলবে বেদুইনরা আসলে এ ব্যাপারে কিছুই জানে না।
এটা হলো আধুনিক বিজ্ঞানের অজ্ঞতাপূর্ণ, করুণ ঔদ্ধত্যের অবস্থা।
প্রথমে ধরে নেয়া হয়, বিজ্ঞানের ভাষাই বাস্তবতার বর্ণনা দেয়ার একমাত্র সঠিক, আক্ষরিক এবং গ্রহণযোগ্য ভাষা। তারপর বিজ্ঞান ধরে নেয় মহাবিশ্ব আসলে কেমন সেটা সে জানে। অথচ এ দুটোই ধারণা। দুটো ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করা যায় এবং আমরা প্রত্যাখ্যান করি।
একটা জিনিস ভেবে দেখুন। বিজ্ঞান নিয়ে স্কুলে যা যা শেখানো হয়, যেমন জ্যোতির্বিদ্যা, পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ, তার অধিকাংশ শেখানো হয় নিউটোনিয়ান ভাষা ব্যবহার করে। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানীদের অনেকেই এ ধারণা ব্যক্ত করেছেন যে মহাবিশ্বের স্থানিক মাত্রার (spatial dimension) সংখ্যা তিনের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার বাইরেও মাত্রা থাকতে পারে। অভিকর্ষের ক্ষেত্রে নন-ইউক্লিডিয়ান গণিত; যেমন রাইমেনিয়ান জ্যামিতি ব্যবহার করে পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাপারে এভাবে চিন্তা করার শুরুটা করেছিলেন আইনস্টাইন।
গত কয়েক দশকে স্ট্রিং থিওরিতে বিশ্বাসী বিজ্ঞানীরা এমনও বলেছে যে মহাবিশ্বের ২১ টি মাত্রা থাকতে পারে। অবশ্য এ সবই তাদের জল্পনা-কল্পনা, কোনো কিছুই প্রমাণিত না। আসল বাস্তবতা কী, সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। কিন্তু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের যে সীমাকে আজ গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, তার মধ্য থেকেই মহাবিশ্বের বর্ণনা দেয়ার জন্য 'সমতল' কিংবা 'আসমানকে গুটিয়ে নেয়া'র[৭৪] মতো কথাগুলো বলা যেতে পারে। চতুর্মাত্রিক জগতে কোনো ত্রিমাত্রিক বস্তুকে মুড়িয়ে নেয়া সম্ভব। ঠিক যেভাবে ত্রিমাত্রিক জগতে একটা দ্বিমাত্রিক বৃত্তকে মুড়িয়ে নেয়া সম্ভব।
বিজ্ঞানের ভাষা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। মহাবিশ্বের ব্যাপারে বিজ্ঞানের জ্ঞানও বদলাচ্ছে। এই ক্রমপরিবর্তনশীল ধ্যানধারণার মাপকাঠিতে কেন আমরা আল্লাহর কালামকে বিচার করতে যাব?
কুরআনের যে আয়াত এবং হাদীসগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের বুঝের সাথে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিগতভাবে সেগুলো আমার খুব পছন্দের। এগুলো আমার কাছে অমূল্য রত্নের মতো। যখনই এগুলো পড়ি তখন আমার ঈমান আরও শক্তিশালী হয়, হৃদয় প্রশান্ত হয়। কারণ, এখানে আল্লাহ আমাকে এমন কিছু জানাচ্ছেন, এমন কিছুর ব্যাপারে সচেতন করছেন, যা আধুনিক বিজ্ঞান এখনো জানতে পারেনি, বুঝতে পারেনি। ওপরে উল্লেখ করা সূরা আল-কাহফের আয়াত এবং হাদীসটি এ কারণে আমার খুব প্রিয়। এ আয়াত এবং হাদীসগুলো অত্যন্ত সুন্দর এবং শক্তিশালী। তড়িঘড়ি করে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এগুলোর ব্যাখ্যা করা কিংবা এগুলো রূপক সাব্যস্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলোকে বাস্তবতার বিশুদ্ধ, অবিকৃত এবং পূর্ণাঙ্গ বিবরণ হিসেবেই গ্রহণ করা উচিত, যে বিবরণ আমাদের জানাচ্ছেন আল্লাহ-বাস্তবতার স্রষ্টা এবং একচ্ছত্র মালিক।
আল্লাহ আমাদের ঈমানকে মজবুত করে দিন, তাঁর আয়াতসমূহের মাধ্যমে আমাদের হৃদয়গুলো আলোকিত করে দিন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণার বিপরীতে সুরক্ষিত করে দিন।
টিকাঃ
[৭৩] সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান
[৭৪] আল্লাহ 'আযযা ওয়া জাল সূরা আম্বিয়ার ১০৪ নং আয়াতে বলেন (তরজমা): সেদিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলীল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই।